হরিহর আত্মা

হরিহর আত্মা

হরিহর আত্মা ও মানিকজোড় প্রবাদ দুটি প্রায় সমার্থক। অন্তরঙ্গ বা অভিন্নহৃদয় সখাদের ক্ষেত্রে এই প্রবাদ প্রযোজ্য হয়। এই বন্ধুত্ব কিন্তু ভালো অথবা মন্দ উভয় অর্থেই হতে পারে। দু’জন প্রচণ্ড খারাপ লোকের অন্তরঙ্গ ভাবও এ পর্যায়ে গণ্য।

হরি এবং হর উভয় শব্দই বহু অর্থবাচক। কিন্তু প্রবাদভুক্ত হরি ও হর যথাক্রমে পালনকর্তা বিষ্ণু ও বিনাশকর্তা শিব বা মহাদেব। কিন্তু সৃষ্টি পালন ও সৃষ্টি ধ্বংসের কর্তা দু’জনের মধ্যে আবার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক কেন? দুজনের আচরণ ও কর্মকাণ্ড বিপরীতধর্মী এবং দ্বন্দ্বমূলক হবে এটিই তো স্বাভাবিক।

মহাদেব বা শিব অনার্যদের শক্তিমান দেবতা। আদি বিষ্ণুভক্তরা তাকে মাঝে মাঝে হেলা করলেও তার প্রচণ্ড তেজের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। রামায়ণ ও মহাভারতে লক্ষণীয় যে, অনার্য শিবের সাহায্য ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বৈদিক দেবতারা অসহায়। মহাভারতে দেখা যায় যে, ব্রহ্মা থেকে আরম্ভ করে পিশাচ পর্যন্ত সকলেই মহাদেবের পূজা করেন।

মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অনেক কাহিনী রয়েছে। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরোধের মধ্যে এক সমন্বয় স্থাপন করার চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। শিব ও বিষ্ণু যে এক অভিন্ন সত্তা তা প্ৰমাণ করার চেষ্টাও আছে শাস্ত্রগ্রন্থে। বেদে মহাদেবের কথা নেই। কিন্তু সেখানে রুদ্রের উল্লেখ আছে। এই রুদ্রকেই পরবর্তীকালে শিব বা মহাদেবে পরিণত করা হয়েছে। রুদ্র একাধারে রুদ্র (ভয়ানক) এবং শিব (মঙ্গলময়)। বিষ্ণু বা নারায়ণও মঙ্গলময় পালনকর্তা। সৃষ্টিপালন ও ধ্বংস এবং ধ্বংসের পর আবার নতুন সৃষ্টিকে পালন করার জন্য প্রয়োজন বিষ্ণু (হরি) এবং মহাদেবের (হর)। তাদের এই সমন্বিত শক্তি ছাড়া জগৎ অচল। এ কারণে বিষ্ণু ও মহাদেবের মিলিত মূর্তি হরিহর সৃজন করেছে ভক্তরা।

হরিহরের অভিন্ন মূর্তি যেমন, তেমনি অভিন্ন হৃদয়ের দুই মানুষ একই রকমভাবে বন্ধুত্বে বদ্ধ হলে এবং দুইয়ের মধ্যে সম্প্রীতির নজির লক্ষণীয় হলে মানুষ তাদের হরিহর আত্মা বলে উল্লেখ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *