সতী – ৮

দক্ষ যজ্ঞশালায় বসিয়া আছেন, সতী বিনা নিমন্ত্রণেই আসিয়াছেন, এ সংবাদ তাঁহার কর্ণগোচর হইয়াছে। একবার ভাবিতেছেন—সতী আমার বড় আদরের কন্যা; আমার শয়নপ্রকোষ্ঠে দিনরাত্রি আমার পরিচ্ছদাদি যত্নপূর্ব্বক রাখিত, কতদিন বাহু দিয়া আমার কণ্ঠ জড়াইয়া ধরিয়া আমার প্রাণ স্নিগ্ধ করিত; আমাকে অপর কন্যারা ভয় করিয়াছে, তাহাদের আমার নিকট যাহা কিছু প্রার্থনা থাকিত, সতীর মুখে তাহারা তাহা আমাকে জানাইত। সতীকে কখনও কোন বহুমূল্য অলঙ্কার, এমন কি সামান্য একটি বনফুল দিলেও, সে তাহার ভগিনীদিগের সকলকে তদ্রূপ এক একটি না দিলে নিজে লইত না; আমার নিকট হইতে কত ছন্দে তাহা আদায় করিয়া তবে ছাড়িত। সতী চলিয়া যাইবার পরে আমি দিনরাত্রি স্বপ্নের ন্যায় তাহার ছায়া আমার শয়নপ্রকোষ্ঠে, আম্রবাটিকায়, যজ্ঞশালে, পূজামণ্ডপে, খেলাঘরে দেখিতে পাইতাম; সতীর সেই মধুর হাসি, রত্নানুজড়িত কর্ণাবলম্বী কেশদাম, পদের অলক্তক-প্রভা ও নূপুর-শিঞ্জন আমার সর্ব্বদা মনে পড়িত। আহারের পর যে আমার ভুক্তাবশেষ খাইয়া তৃপ্ত হইত, নিদ্রায় যে শিয়রে বসিয়া আমায় ব্যজন করিত, কোথায়ও যাইতে হইলে পাদুকাদ্বয় ও উষ্ণীষ লইয়া আমার পার্শ্বে ভৃত্যের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকিত, যাওয়ার কালে দিদিদের জন্য এবং আমার জন্য এই জিনিষ আনিবে বলিয়া কানে কানে কত কহিয়া দিত, ব্রাহ্মণ ভোজন করাইবার জন্য, কাঙ্গালীর জন্য, কত সামগ্রী চাহিয়া লইত, প্রাতে সদ্যঃস্নাত হইয়া মূর্ত্তিমতী ঊষার ন্যায় দেবপূজার জন্য ফুল কুড়াইত, ঐ পথ দিয়া নিত্য নিত্য অন্তঃপুরে প্রবেশ করিত, সেই সতীকে ঐ পথ দিয়াই কৈলাসপুরীতে বিদায় করিয়া দিয়াছি। এই উৎসবে আজ ত্রিজগৎ নিমন্ত্রিত, যে আসিলে আমার গৃহ আনন্দময় হইবে, সেই আনন্দময়ীকে বাদ দিয়াছি—তথাপি আসিয়াছে। একবার বক্ষের ধনকে বক্ষে লইতে পারিলে যেন হৃদয়ের সকল জ্বালা জুড়াইত; আজ এই উৎসবের দিনে কেন জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিতেছি।

কিন্তু সহসা শিবের সেই নিশ্চেষ্ট প্রশান্ত উপেক্ষা ও নন্দীর ভ্রূকুটিকুটিলানন মনে পড়িল, চিন্তাস্রোত ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হইল—“আমি প্রজাপতিগণের অধীশ্বর, সর্ব্বভূতের কর্ত্তা ও অধিনায়ক, আমাকে খুস্তূরসেবী ভাঙ্গড় অপমান করিয়াছে—সতীকে সেই ভূতপ্রেতসেব্য বিরূপাক্ষের হস্তে দিয়াছি! আমি সতীকে আর দেখিতে চাহি না। সতী পিতৃগৃহে তাহার পিতার বৈভব দেখিয়া যাক্‌ এবং সে যে উপেক্ষিতা, তাহার স্বামী যে নগণ্য, এ কথা ভাল করিয়া বুঝিয়া যাক।”

এই সময় পূষা ঋষি বলিলেন, “সেই শিবদূত নন্দীটার মতো কালো একটা বীভৎস আকৃতি দেখা যাইতেছে, অন্তঃপুরের দ্বারের পার্শ্বে ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া দাঁড়াইয়া আছে।”

দক্ষের ক্রোধাগ্নিতে এইবার আহুতি পড়িল। “কি ভাঙ্গড় বেটা সেই দুরাত্মা অনুচরকে সতীর সঙ্গে পাঠাইতে সাহসী হইয়াছে? আজ সতীকে আমি উচিত শিক্ষা দিব।”

ভগদেবের দিকে বক্র-দৃষ্টিপাত করিয়া দক্ষ বলিলেন, “সতীকন্যা এসেছে; এত বড় উৎসবটা, ভাঙ্গড় আর না পাঠাইয়া কি করে। যা হোক দুষ্টের শিক্ষা দেওয়া উচিত; আমি সতীকে যজ্ঞস্থলে আনিয়া এইখানে সেই মর্কটাক্ষ যোগীর ইতিহাস কীর্ত্তন করিব, সভাস্থলে এই সকল কথা হইলে তাহার অপমানের চূড়ান্ত হইবে।”

ভৃগু ও পূষার উৎসাহে স্পর্দ্ধিত দক্ষ সতীকে অন্তঃপুর হইতে সেই যজ্ঞশালায় ডাকাইয়া আনিলেন। প্রসূতি বাতাহত কদলীপত্রের ন্যায় অন্তঃপুরে কম্পিত দেহে রহিলেন, আজ কি ঘটিবে ভাবিয়া তাঁহার মুখখানি বিশুষ্ক হইয়া গেল।

ধূসর তমিস্রাবৃত গোধূলির ন্যায় বহুলবসনা, অক্ষবলয়া সতী সভাস্থলে উপস্থিত হইয়া, নতচক্ষে দক্ষ এবং অপরাপর পূজনীয়বর্গকে প্রণাম করিলেন। তাঁহার পাদপদ্মের প্রভাব হোমাগ্নি জ্যোতিষ্মান্‌ হইল, তাঁহার নিশ্বাসে যজ্ঞকর্ম্ম নির্ম্মলতর হইল, তাঁহার জটাবন্ধ রক্তবর্ণ জবা শিবের ক্রোধের ন্যায় যেন ধ্বক্‌ধ্বক্‌ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। এই অপূর্ব্ববেশী কন্যাকে দেখিয়া মদগর্ব্বিত দক্ষ ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, “সতি! তোর কপালে যা ছিল তাহা ঘটেছে, এখন তুই মনে কর যেন তুই বিধবা, সধবা হইয়াও ত বিধবার বেশেই আছিস, মনে করিতে বিশেষ কষ্টকল্পনা করিতে হইবে না। তুই কি প্রজাপতিগণের অধীশ্বর, সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মার প্রিয়তম মানসপুত্র দক্ষের কন্যা, না সেই ধুস্তূরসিদ্ধিসেবী, কুসুম্ভাপ্রিয় ভাঙ্গড়ের স্ত্রী? তুই এই বেশে এখানে আসিতে লজ্জা বোধ করিলি না! ভৃগুর যজ্ঞসভায় সমস্ত দেবমণ্ডলীর সমক্ষে আমি তাহাকে প্রহার করিতে বাকী রাখিয়াছিলাম, সেই অপমানসত্ত্বেও তোকে আবার পাঠাইল কোন্‌ মুখে? ভূতপ্রেতের সঙ্গী, চিতাভস্মপ্রিয় জন্তুর হস্তে তোকে দিয়াছি, শুধু পিতৃইচ্ছায়। এখন তুই মরিলে আমার এ লজ্জা দূর হয়। তুই নাকি বড় পতিব্রতা! তবে কি জানিস্‌ না যে, দুরাত্মা বৃষারূঢ় শিবকে আমি দেব-সমাজ হইতে নিষ্কাষিত করিয়া দিয়াছি; যজ্ঞভাগে তাহার কোন অধিকার নাই; তথাপি তুই কেন এসেছিস্? এই কি তোর পতিভক্তি? সে সাপুড়ে, পার্ব্বত্যরাজ্যের অসভ্য, জাতি-কুলের বিচারহীন, বর্ণাশ্রম মানে না; তাহার লঘুগুরুভেদ নাই। আমি তোকে আমার আলয়ে স্থান দিতে পারি, যদি প্রায়শ্চিত্ত করিয়া কৈলাসে আর কখনও যাইতে পারিবি না বলিয়া অঙ্গীকার করিস্‌।”

ভৃগু এই নিন্দাবাদে পরম প্রীতিলাভ করিয়া শ্মশ্রু দোলাইতে লাগিলেন, এবং মহাহর্ষে পূষা ঋষির সমস্ত দন্তপংক্তি কেতকীকুসুমের ন্যায় বিকশিত হইয়া পড়িল। অপর অপর ঋষিরাও দক্ষের কথা অনুমোদন-পূর্ব্বক ক্রমাগত শিবের কাহিনী কীর্ত্তন করিয়া তাঁহাকে ধিক্কার দিতে লাগিলেন। দেবতাদের মধ্যেও অনেকে প্রকাশ্যভাবে কিছু বলিতে সাহসী না হইলেও দক্ষের প্রবল শক্তিতে আশ্বস্ত হইয়া নিশ্চিন্ত মনে দক্ষের নিন্দাবাদ শুনিতে কৌতুহল প্রদর্শন করিতে লাগিলেন।

দেবী আর শুনিতে পারিলেন না। শিবনিন্দা শুনিতে শুনিতে কর্ণের শক্তি চলিয়া গেল, সেই নিন্দা উচ্চারণকালে পিতৃমুখের ভ্রূকুটি দেখিতে দেখিতে তাঁহার দর্শনশক্তি তিরোহিত হইল। সেই শিবহীন যজ্ঞভূমিতে দাঁড়াইয়া পদদ্বয় নিশ্চল হইয়া গেল, হোমাগ্নির অশিব দ্যুতি-স্পর্শে প্রাণের স্পন্দন রুদ্ধ হইতে উদ্যত হইল। শিবনিন্দকের দেহ হইতে তিনি জাত হইয়াছেন, এই ঘৃণায় সেইস্থলে চিতার ন্যায় অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল, সেই অগ্নি তাঁহার কটিবিলম্বিত বল্কলাগ্র লেহন করিয়া প্রজ্বলিত হইল। বাহ্যজ্ঞান রুদ্ধ করিয়া মহাদেবী যোগবলে দেহত্যাগে সংকল্পারূঢ় হইলেন। তাঁহার মহিমাম্বিত মূর্ত্তি দ্বিগুণ প্রখর হইয়া উঠিল। পিতৃরক্ত যে ধমনীতে প্রবাহিত, সেই ধমনী যোগপ্রভাবে রুদ্ধ করিয়া মহাযোগিনীর বেশে তিনি নিশ্চল চিত্রপটের ন্যায় স্থির রহিলেন। নির্ব্বাণকালে দীপশিখার ন্যায় যোগিনীর অঙ্গরাগ অধিকতর সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে সান্ধ্যগগনের শোভার ন্যায় একটি মৃদু প্রভা সেইস্থানে বিকীর্ণ হইয়া ধূমময় জ্যোতিঃশিখায় পর্য্যবসিত হইয়া গেল—সেই জ্যোতিঃশিখা দক্ষপুরী ছাড়িয়া চলিয়া গেল। ক্ষণ পরে দেখা গেল, সতীর মৃতদেহ সেই স্থানেই পড়িয়া আছে। মহাদেব সেই চিহ্ন দেখিবেন এজন্য তাহা দগ্ধ হয় নাই।

নন্দিকেশ্বর সেই সভার পশ্চাতে দাঁড়াইয়াছিল, সে সতীর সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃপুরের দ্বার ছাড়িয়া আসিয়াছিল; যখন দেখিল সতী দেহত্যাগ করিলেন, তখন ভীষণ শূল লইয়া সে যজ্ঞশালাকে আক্রমণ করিল। কৃতান্তের ন্যায় তাহার মুর্ত্তি ভীষণ হইল, তাহার মস্তকের অসংস্কৃতজটাকলাপ বর্ষাকালের মেঘের ন্যায় প্রধূমিত ও কৃষ্ণবর্ণ হইয়া উঠিল, দেহ হইতে জ্বালা বিকীর্ণ হইতে লাগিল। যজ্ঞ নষ্ট হয় দেখিয়া হোতা ভৃগু অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিলেন, তাহাতে ঋভু নামক এক খড়্গহস্ত দেবতা হোমানল হইতে উদ্ভূত হইল, সে নন্দীর শূল কাড়িয়া লইল ও যজ্ঞশালা হইতে তাহাকে তাড়াইয়া দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *