১২
মীনাক্ষী জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন, দুটো ট্যাক্সি এসে থামল। ভেতর থেকে কারা নামছে ওরা? একদল ভিখিরি মতন! একজন আবার জিনস পরা, একটা রোগা মতন আধ—ফরসা মেয়ে ওপর দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—মা! ও মা!
ও কী? ও যে মধুবন? নিজের মেয়েকে চিনতে পারছেন না মীনাক্ষী। আরে ওই তো জিনস—এর এক হাতে বালা, এক কানে মাকড়ি। ও তো ঋজু!
এ কী দশা! পেছনে পিলপিল করে ক’টা মেয়ে নামল। পরি… তাই তো! কী চেহারা হয়েছে! ব্যাক টু স্কোয়্যার—এ। তার চেয়েও খারাপ।
মধুবন লিড করছে, প্রসেশন বাড়ি ঢুকল। রুস্তম নীচ থেকে চেঁচিয়ে বলল—মা আড়াইশো টাকা ট্যাক্সি ভাড়া দাও শিগগিরই।
বিস্ময়ে, ভয়ে মীনাক্ষীর মুখ দিয়ে কথা সরছে না।
পরি প্রণাম করে বলল মা, এ আমার বোন বাতাসি। এ পাশের বাড়ির তুলসী, এই যমুনা, এদিকে আয়, গঙ্গা দাঁড়িয়ে রইলি কেন? লক্ষ্মী! শোভা! মাকে সব পেন্নাম কর।
মধুবন কোনওমতে বলল—ওরা সব আমাদের বাড়ি কাজ করবে মা। বলে—টলে সে ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সুবুল ডাক্তারের কাছেই কল গেল। সব্বাইকে একধার থেকে পরীক্ষা করে তিনি ভিটামিন লিখে দিলেন, বললেন—সব ম্যালনিউট্রিশনের কেস। স্রেফ ভাতমাছ খাওয়ান, দু’দিনে চাঙ্গা হয়ে যাবে। সব প্রেশার লো। সুগারও খুব লো মনে হচ্ছে।
চানটান করে ধোপদুরস্ত পাজামা—পাঞ্জাবি পরে রুস্তম বাইরে এসেছে। বলল—তোমার নারীকল্যাণ সমিতির ভরসাতেই এদের আনলুম মা। তুমি যে কত বড়, কত বেসিক একটা কাজ করছ সত্যি আমি আগে বুঝিনি মাম্মি। শুধু শুধু ঠাট্টা—তামাশা করেছি।
ওরা সব চান করেছে। ভাতমাছ খেয়েছে। নীচের খাবার ঘরে ঢালাও কার্পেট পেতে, পাখা চালিয়ে এখন মড়ার মতন ঘুমোচ্ছে। ঋজুরুস্তম আর মধুবনেরও সাড় নেই কোনও। মীনাক্ষী একবার এর কপালে একবার ওর কপালে হাত রাখলেন। ইসস, মধুবনের কি সত্যিই বারো না হোক বত্রিশ কেজি ওয়েট হয়ে গেল? ঋজুটা খাড়া আছে। অসম্ভব মনের জোর। তবে টসকেছে ঠিকই। জামাকাপড়গুলো ঢলঢল করছে। মুখটা পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। সরু হয়ে গেছে মুখটা। পা টিপে টিপে ফোনের কাছে যান মীনাক্ষী।
যশো, যশো আছিস!
হ্যাঁ রে মিনি, আছি, কী খবর?
ভাল খবর। কাজের লোক খুঁজছিল না?
কখন আবার খুঁজলুম! আমার তো রান্নার, বাসন মাজার সব লোক রয়েছে।
তা জানি না বাবা, দেশ থেকে আনিয়েছি। খুব ভাল মেয়ে। তোদের অত বড় বাড়ি। ঝাড়াপোঁছা করতে, হাতেনাতে কাজ এগিয়ে দিতে একটা ফরমাশের লোক লাগবে না! কী করেই যে দিনরাতের লোক ছাড়া থাকিস! কিছু মনে করিসনি যশো, জ্যাঠামশাই বড্ড কঞ্জুষ ছিলেন। তোর অবশ্য দিল দরাজ। তোদের দু’বোনেরই। দু’জনে দুটো রাখ। ভাল দেশের মেয়ে সব। যদি বলিস তো আমি নয় হপ্তাখানেক ট্রেনিং দিয়ে পাঠাব। মধুকে ডাক। তার দিল তোর চেয়েও দরাজ। সে একটা রাতদিনের লোকের মর্ম আরও ভাল বুঝবে। শোন বাজারদর অনুযায়ী মাইনে দিবি নইলে আমার ছেলেমেয়ে আমাকে আস্ত রাখবে না। ছাড়লুম।
আর একটা নম্বর ডায়াল করলেন মীনাক্ষী।
কে সঙ্ঘদি?
না আমি রত্নাদি।
আমি মীনাক্ষী বলছি, সঙ্ঘকে একটু দাও না।
সঙ্ঘদি রে, কপাল জোরে ভাল কাজের লোক পেয়েছি। দেশ থেকে এসেছে। ফাইফরমাশের লোকের কথা বলছিলি না?
ফাইফরমাশের লোক আমার বড্ডই দরকার রে মিনি। ছেলেগুলো আর তাদের বাবাগুলোর পেছনে বড্ড খাটতে হয়।
বেশ, তোকে দু’দিনের মধ্যে লোক পাঠাচ্ছি। আমি নিজে যাব।
ডায়াল আবার ঘুরল—
সন্তোষজি! ইয়ে আপ কি বহেন মীনাক্ষী হ্যায়, কাম কাজকে লিয়ে একঠো লোক মাঙা না আপনে! খুশি কি বাত কি উও মিল গয়ি। বহোত আচ্ছি লড়কি!
আরে ইয়ার, আমাদের তো ফুলচাঁদ একাই একশোখানা। সব করে। খানা পাকানা আমি খুদ করি।—বাংলাতেই বললেন সন্তোষজি।
কী কঞ্জুষি করছেন সন্তোষজি? এত খাটেন, আপনার হাত—পা টিপে দিতেও তো একটা লোকের দরকার।
ও ভি তো ফুলচাঁদ হি করতা!
ফুলচাঁদ? ওই দামড়া লোকটা আপনার গা—হাত—পা সব টিপে দেয়! বহোত শরম কি বাত, সন্তোষজি খবরদার ও কাজ করবেন না। লোকটা খুব সন্দেহজনক। আপনার মতো ইয়াং লেডির হাত—পা টিপে দিচ্ছে—এ কখনও ভাল কথা হতে পারে না। সে দিনই তো কাগজে দেখলুম—প্রেমচাঁদ নামে একটা লোক বাড়ির গিন্নিকে খুন করে আলমারি ভেঙে পাঁচ লাখ নগদ, পাঁচ লাখের গয়না নিয়ে পালিয়েছে।
আরে বাপ রে! বলছেন কী মীনাক্ষী বহেন। লোকেন ইয়ে তো হাম লোগোকাঁ আদত হ্যায়। জওয়ান নোকর সব আচ্ছা সে সাফা রাখে গা।
বেশ তো নোকর থাক না। পার্সন্যাল কাজকর্মের জন্যে একটা ছোট মেয়ে রাখুন না। আপনার হাসব্যান্ড অত বড় বিজনেস ম্যাগনেট, আপনাদের বাড়ি একটা চটপটে ফাইফরমাশের মেয়ে না থাকলে স্টেটাস থাকে!
উও বাত তো ঠিকই হ্যায় লেকিন উও ছোটি লড়কি, ঔর উও জওয়ান ফুলচাঁদ…এ ভি তো আচ্ছি বাত নেই হ্যায় মীনাক্ষীজি! রিসকি হোচ্ছে না?
ছাড়ুন তো! আপনি বাড়িতে সব সময়ে মজুত থাকতে সাহস পাবে? মেয়েটা খুব ভাল।
উনকো পুছনা হোগা।
পুছিয়ে, লেকেন জলদি কিজিয়ে। হামারি সোসাইটি কি প্রেসিডেন্ট ভি ঢুঁড় রহি। আপকি মাফিকই স্টেটাস, বিজনেসম্যান…
ব্যস বাড়ি সাফ। শেষ মেয়েটি সোসাইটির ঘরদোর সাফ করবে, গুছিয়ে গাছিয়ে রাখবে। মিটিংয়ের দিন চা—টা করবে। রাত্তিরে এ—বাড়ি এসে পরির কাছে শুয়ে থাকবে।
ঋজুরুস্তম চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গম্ভীরভাবে বলল—মা তোমার নারীকল্যাণ সমিতির নামটা পালটে দাও।
কেন নামটা আবার কী দোষ করল?
ডোমেস্টিক হেলপ সার্ভিস! কমিশন নেবে পার পার্সন। ভাল রোজগার।
মীনাক্ষী ছেলের গঞ্জনা হজম করলেন। কিন্তু আর কী তিনি করতে পারেন। তাঁর সমিতিতে দুঃস্থ মেয়েরা সেলাই করে, আচার, জেলি, জ্যাম বড়ি তৈরি করে। তাঁরা সেগুলো মার্কেটিং করেন। থাকা—খাওয়ার বন্দোবস্ত তো সেখানে নেই। কী করবেন তিনি এই শহরে অনভ্যস্ত আনাড়ি, প্রায় নিরক্ষর মেয়েগুলোকে নিয়ে। ক’মাস পরেই এই মেয়েগুলোই চোখালো মুখোলো হয়ে যাবে। গায়ে গত্তি লাগবে। বাড়িতে টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় বাপ—জ্যাঠারা সার, বীজ কিনবে, কেরোসিন, জামাকাপড় কিনবে, এক পয়সা খরচ নেই, মাস মাস পুরো টাকাটা। খারাপ হল? এরা সব আকাশে পা দিয়ে হাঁটে। কোনও প্র্যাকটিক্যাল সেন্সই নেই।
বোনকে রুস্তম বলল—যে—সময়টা জিমে আর হন্টনে দিতিস সে সময়টা এদের পড়ানোর কাজটা চালিয়ে যা। একটা সময় ঠিক করে দে। ওরা সব এসে তোর কাছে পড়ে যাবে।
আই এস সি—র রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। মেয়েগুলো সব্বাই একধার থেকে ভাল করেছে। ছেলেগুলোর হয়েছে একরকম মোটামুটি। পঙ্কজের বাবা বললেন—ব্যাস, কারবারে লাগো। কী ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে ভোঁ ভোঁ করছ।
পঙ্কজ চুপচাপ গিয়ে পাবলোর সঙ্গে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভরতি হয়ে এল। কেমিস্ট্রি হনস। কার্জন ঢুকে গেল গোয়েঙ্কায়। উন্নী চলে গেল কানপুর আই আই টি। এবং সব্বাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে বল্লী প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাস নিয়ে ভরতি হয়ে গেল। মধুবন কাছাকাছি জে—ইউতে ঢুকল ইংরেজি নিয়ে।
বল্লী জয়েন্টে চান্স পেয়েছিল, উন্নী তাকে অনেক বোঝাল। হিস্ট্রি নিয়ে করবিটা কী?
হিস্ট্রি ইজ ওয়ান অব দা বেসিক সায়েন্সেজ অব সিভিলাইজেশন। আমি চেষ্টা করলে সবই পারব। কিন্তু ইচ্ছেটা আসল। আমি হিস্ট্রি পড়তে চাই। কীভাবে সভ্যতার গ্রাফ চলছে। আপ অ্যান্ড ডাউন। আজকের জেনারেশনের কোনও হিস্টরিক্যাল এক্সপ্লানেশন আছে কি না আমায় জানতে হবে।
মধুবনের মা মীনাক্ষীর আজকাল খুব রেলা। একমাত্র মেয়ে ইংরেজি নিয়ে জে ইউ—তে। মেয়ে স্লিম। তবে তিনি সাবধান আছেন। তাঁর চেয়েও সাবধান আছে মধুবন নিজে। তবে কেউ জানে না—আসলে মধুবনের খাদ্যের ওপর সেই প্রচণ্ড আকর্ষণটাই চলে গেছে। সে চায় কিন্তু পারে না। মাটন মুখে তুলতে গিয়ে ইঁদুর মনে পড়ে যায়। চিকেনে ব্যাং ব্যং গন্ধ। আইসক্রিম মুখে তুলতে গেলে সারিসারি কালো কালো ভুখা মুখ চোখের সামনে ফুটে ওঠে। নিজেকে কী রকম হৃদয়হীন, অপদার্থ, হ্যাংলা মনে হয়।
এখনও সলিড খাবার খেতে পারছিস না? কত দিন চলতে তোর এই রোগ?
প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট তো বলছে সব ঠিকঠাক আছে।
মা আমাকে দুধভাত দাও।
খাবি? খাবি? দুধভাত খাবি—তিন লাফে মীনাক্ষী রান্নাঘরে চলে যান।
গেলাস—ভরতি গো দুগ্ধ, ওপরে মোটা সর। থালায় বাসমতীর ভাত। মেয়ে খাবে বলেছে।
মধুবন দুধের ওপর থেকে সরটা তুলে একটা বাটিতে রাখে, বলে মা সর খেয়ে খেয়ে আবার যদি পঁচাত্তর হই আবার একটা মুড়কিশোলার দরকার হবে। তুমি দুধের সর পরিকে দিয়ো। খাটেখোটে ওর কিছু হবে না।
সুতরাং মধুবন দুধ পায়, পরি সর পায়। পরির চেহারায় চেকনাই আসে। মধুবন আগের থেকে কালো, রোগা থাকে। মেদের থাকের ভেতর থেকে তার আসল মুখখানি বেরিয়েছে।
যশোমাসির বাড়িতে ঢুকছে সে, পাবলোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দরজা খুলে পাবলো বলল—কে তুমি খুকু!
বাজে বকিস না। যেতে দে।
কী করে ঝরালি? সত্যি আমি তোকে চিনতে পারিনি। একদম চিনতে পারিনি। অন গড বলছি। আমার ঘরে একটা ছোটবেলাকার গ্রুপ ছবি আছে। সেইটার জন্যেই তোকে মেলাতে পারতুম। হ্যাঁরে তুই নাচতিস না?
তা নাচতুম! তো কী!
আমাদের ব্যান্ডে জয়েন কর।
তুই ব্যান্ড করছিস।
আরে সব রেডি। ব্যাপক বন্দোবস্ত। সবাই আছে গুরু। লেগে পড়।
ব্যান্ডে ক্ল্যাসিক্যাল ডান্স চলে না।
চলবে চলবে আমাদের ব্যান্ডে চলবে।
কেন? আমকে কাজিন বলে স্বীকার করতিস না যে!
যা বাব্বা কবে? পাবলো আবার কবে এই সব সম্পক্ক টম্পক্ক নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে! মধুবন ইজ মধুবন। কাজিন না ফ্রেন্ড তাতে কী এল গেল?
রোগা মধুবন কাজিন সে তোর ব্যান্ডে নাচবে, মোটা হলেই মধুবন আর মধুবন থাকে না, তখন তাকে হ্যাক থু করিস! শেম শেম! বলে মধুবন ভেতরে ঢুকে গেল।
পাবলোর মনে দৃঢ় সংকল্প জন্মাল মধুবনকে ব্যান্ডে আনতেই হবে। অত ভাল কত্থক আর ভরতনাট্যম আর কেউ জানে না। কবে যে সে মধুবনকে কাজিন বলতে অস্বীকার করেছিল তা তার মনেই নেই। যাচ্চলে!
মীনাক্ষীর রেলা শিগগিরই আরও বেড়ে গেল। তাঁর ছেলে ঋজুরুস্তম একটা দশ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের প্রজেক্ট আপাতত পেয়েছে, তার মুড়কিশোলা গ্রাম পর্যবেক্ষণের পুরস্কার হিসেবে। প্রথম কিস্তি। ক্যানবেরা ইউনিভার্সিটি ভীষণ ইমপ্রেসড। এই প্রজেক্টের ফলে মুড়কিশোলা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ডেভেলপমেন্ট প্লানিং তার হাতে, খোদ অস্ট্রেলিয়া থেকে দু’জন আসছে তার সঙ্গে কাজ করতে। শিগগিরই ঋজু ফিরছে। কথাবার্তা সেরে। মীনাক্ষীর সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না! ছেলে ডলারে রোজগারও করবে, আবার দেশেও থাকবে। আপাতত বাঁকুড়ার ডি এম তাকে তাঁর বিশাল বাংলোর একটি বিশাল ঘর অফিস করবার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। ঋজু এক্সপার্টদের পরামর্শ নেবার জন্য নানান জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। জমির পার্থক্য পশুপালনের খুঁটিনাটি, মৌ—চাষ, জল সংরক্ষণ।
রত্নমালা—সঙ্ঘমিত্রা খুব দমে গেছেন। সঙ্ঘমিত্রার মুখে আর চটপট মজাদার ফাজলামি শোনা যায় না। ছেলে পল্টন মাকে সাবধান করে দিয়েছে কার্জনকে কিছু বোলো না যেন, ও ভীষণ সেন্টিমেন্টাল। কী থেকে কী হয়!
রত্মমালা শিউরে উঠেছেন—কী বলিস তুই? যা করেছে ভাল করেছে। আমি তো ওকে খারাপ কিছু দেখছি না—দুঃখী—টুঃখি! একটু যেন উদাস উদাস, অন্য কোথাও চলে গেছে মনে মনে—তো এটা ওর বরাবরই আছে। কী বল সঙ্ঘ?
সঙ্ঘমিত্রা ঠোঁট উলটে বলেন—তুমিই ভাল জানো বিন্দুবাসিনী তোমার অমূল্যধনের মন—মেজাজ। আমি কে? আমি কেউ না।
মধুবন দেখে যশো মূর্ছা যান আর কী! তুই? তুই কী করে এমনটা হলি!
মধুবন হেসে বলল—স্রেফ না খেয়ে মাসি। দিনের পর দিন না খেয়ে আধপেটা খেয়ে।
ধ্যাঃ। কোথায় যে বেড়াতে গেছিস শুনলাম!
ওই তো গঙ্গা যমুনা তোমাদের বাড়ি কাজ করে ওদের ‘গেরামে।’
বলিস কী রে! সেখানে গোয়ালে গোরু, দিঘিতে মাছ, গাছে ফল, ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা চলে। তোকে না খেয়ে থাকতে দিলে?
কে বলেছে তোমায়? মাছ, ফল, ধান….এসব!
কে আবার বলবে। গঙ্গাই বলছিল। যমুনাও সায় দিল।
কী বলছিল গঙ্গা?
ওই বলছিল—ওদের তো সবই বাড়ির খাঁটি জিনিস। খাঁটি দুধ, খাঁটি ডিম, খাঁটি মাছ, খাঁটি সবজি। একটু দুধ নইলে বেচারিরা ভাত খেতে পারে না। তা না হয় খেল। এ—বাড়িতে দুধ দুধের সর যত কম হয় ততই ভাল। কী বল।
তা তো বটেই।
একটা কী সুবিধে জানিস! সরু চাল খেতে পারে না। চালের খরচটা আমার কম পড়ে। ভাবছি শঙ্করীটাকে ছাড়িয়ে দেব। গঙ্গাই সব করবে।
না, না অমন কাজও কোরো না মাসি। শঙ্করীকে কী দোষে ছাড়িয়ে দেবে গো!
তাছাড়া গঙ্গা যমুনা লেখাপড়া করছে। সব করতে হলে…
লেখাপড়া করছে? গঙ্গা যমুনা? কোথায়? কখন?
ওই করে আর কী!
সর্বনাশ!
কেন মাসি!
অমন কাজের লোকটা আমার! লেখাপড়া। শিখলেই ডানা গজাবে রে! মিনিটার এলেম আছে। কেমন ট্রেনিং দিয়ে পাঠিয়েছে।
মধুবন বলল—মাসি, গঙ্গা লেখাপড়া শিখে চলে গেলে তোমাকে আর একটা গঙ্গা এনে দেব গো। গঙ্গাদের শেষ নেই।
তা ভাল—তবে মেয়েটার ওপর মায়াও পড়ে যাচ্ছে। মেয়ে নেই তো? মেয়ে সন্তান দেখলেই বুকটা হু—হু করে বুঝলি!
তুমি যে বলতে আমিই তোমার মেয়ে!
সে তো বটেই। তুই হলি মেয়ে। আর গঙ্গা—টঙ্গা হল মেয়ে মেয়ে। তা এক গ্লাস মিল্কশেক খাবি? করি? এখন নিশ্চয় তোর রেসট্রিকশন উঠে গেছে।
মধুবন বলল—কী জানি! মিল্কশেক খাওয়া আমি ছেড়ে দিয়েছি মাসি।
তবে কী খাবি। এতদিন পরে এলি।
এক গ্লাস জল আর দুটো বাতাসা।
বাতাসা? বাতাসা কোথায় পাব? আচ্ছা মেয়ে তো তুই! ঠাট্টা করছিস।
মধুবন বলল,—জল—বাতাসা খুব ভাল জিনিস মাসি। জল আর গ্লুকোজ। সবচেয়ে সস্তা। ও কী মাসি! ওটা কার ছবি!
ছবিটার দিকে চেয়ে যশো নমস্কার করলেন।—ওটি আমাদের গুরুদেবের ছবি। অভীপ্সানন্দ মহারাজ।
তুমি গুরু করেছ!
তবে! বেলা যে পড়ে এল জলকে চল কবি বলেছেন কেন? একা আমি নই তোর মেসোও আছে।
বলো কী! মেসো যে একের নম্বরের নাস্তিক ছিল!
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তো মানুষের পরিবর্তনও হয়। তা ছাড়া আমাকে চোখে চোখে রাখতে হবে না?
তোমাকে? কেন?
তোর মেসোর ধারণা আমি সংসার ত্যাগ করতে পারি। ওর মা করেছিলেন তো। ঘর পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়।
তাই বুঝি? তা তোমার কি সত্যি সত্যি সংসার ত্যাগ করার বাসনা হয়?
হয়েছিল, তোকে চুপিচুপি বলি, ইদানীং মনে হত কে বা কার কে তোমার! আমার বলতে কেউ নেই এ বিশ্ব সংসারে। একজন সারাদিন আপিস করছে আর একজন সারদিন আড্ডা দিচ্ছে। বন্ধুই জ্ঞান বন্ধুই ধ্যান। তাই আমি গুরুতে মন দিলুম। অমনি গুরুই তাড়াহুড়ো করে সব ফিরিয়ে দিলেন। দেখলুম সব কিছুর সেন্টারে বসে আছি—এই আমি যশোধরা মুখুজ্জে। বুঝলি? ভগবানের সঙ্গে টাচটাও রইল। সংসারও বজায় রইল। গুরুদেব যখন হৃষীকেশ থেকে আসবেন তোদের ডাকব—অমৃতবাণী শোনাব এখন। তোর হবে। বুঝলি! তুই খুব ম্যাচিওর হয়ে গেছিস। আই এস সি—তে এ প্লাস করে তোর মলাট পালটে গেছে। তোর চোখের চাউনি দেখেই বুঝতে পারছি আমাদের সেই আহ্লাদি মধুবন আর নেই।
আশ্চর্য! এত লোকের মধ্যে যশোমাসিই একমাত্র এ—কথা বলল। তার পরিবর্তনটা ধরতে পেরেছে অনেকেই। কিন্তু সেটা ওপর ওপর। যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে সেই বলছে,—কী রোগা হয়ে গেছিস! চেনা যাচ্ছে না তোকে। বল্লী সুদ্ধু, আজ পাবলোও সেই প্রসঙ্গই তুলল। মা খুব ব্যস্ত হচ্ছে যে তার খাবার রুচি চলে গেছে, মুড়কিশোলায় গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে মেয়ে। হাজাররকমের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা, ডাক্তার, পথ্য। মা এই নিয়ে ব্যস্ত।
তার গোটা মনটাই যে পালটে গেছে, এটা কেউই ধরতেপারেনি। সবচেয়ে তরল, সবচেয়ে আহ্লাদি, বোকাসোকা যাকে ভাবা যেত সেই যশোমাসিই অবলীলায় ধরে ফেলল তাকে। কারণটা ধরতে পারেনি। কিন্তু আসল জিনিসটা ধরেছে। এমনকী সে নিজেও ঠিক এভাবে বোঝেনি নিজেকে। যশোমাসিই বুঝিয়ে দিল। সেই আহ্লাদি মধুবন আর নেই। তার মলাট ললাট সবই পালটে গেছে। সে বড় হয়ে গেছে মুড়কিশোলার ভয়াবহ, বিভীষিকাময় ঘটনায়।
ভেতরটা কি তার দমে গেছে? একটা খুব হালকা মজাদার সহজ স্বচ্ছল জীবনের মধ্যে বেঁচে ছিল। জীবনটা তো আদৌ এরকম নয়। এত রকম আলাদা আলাদা জীবন আছে! থাকে! রাত্রে ক্রিম মাখবে না—এটাই তো সে ভাবতে পারত না। দেখল রান্নার তেলই নেই। শাকভাত ছাড়া খাবার নেই, তা—ও যথেষ্ট নয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাবার জোগাড় করা, খাওয়ার জন্যে হা—পিত্যেশ করে বসে থাকা! শুনেছে খুব গরিব মানুষ আছে। বি পি এল বিলো পভার্টি লাইন শুনছে তো! কিন্তু বোঝেনি। আদৌ বোঝেনি। দুর্যোগে জলবন্দি। কোনও দিকে যাওয়ার উপায় নেই। কোথাও থেকে কেউ আসছে না। সন্ধে থেকেই কুপকুপ করছে অন্ধকার। মশার ঝাঁক। ব্যাং ডাকছে, কেমন ভৌতিক ডাক। অন্ধকারে যাতায়াত চলছে কঙ্কালসার মানুষগুলোর। ছেলেটার খুব পেট কামড়াচ্ছে, ছটফট করছে, দাদা ওষুধ আছে? ও শহুরে দাদা! দাদা ওষুধ নিয়ে বেরিয়ে গেল। এমনকী কিছু লোক মেয়ে ও ব্যাটাছেলে দুই—ই তাদের অপয়া ডাইনি—টাইনি বলতে শুরু করেছিল। কী ভয় করছিল তার। দাদা পর্যন্ত নেই। তারপর ভয়টা কেমন চলে গেল, মনে হল এই—ই তা হলে হবার ছিল। এইভাবে অপয়া ডাইনি—টাইনি বলে তাকে এরা মেরে ফেলবে। ফেলুক। তখন পরির পরিবার দশ হাতে তাকে আগলেছে। অপয়া! অপয়া! দিদি দাদার জন্যে যে মাছ ভেজে গেলে, শহুরে বিস্কুট লজেঞ্চুস খেলে মনে নেই, না? কে ওষুধ দিয়ে বাঁচাল চুনিকে, অঘোরদাদুকে, কে এখন ত্রাণ আনতে গেছে! থুঃ মড়ার দল। অপয়া!
খিদেয় নিঝুম হয়ে পড়েছিল সে। তখন ইঁদুরের মাংস, ব্যাঙের মাংস খাইয়ে টিকিয়ে রেখেছে তাকে পরিরা। কে জানে হয়তো সাপও খাইয়েছে। সে তখন জানতেও পারেনি। বুঝতেও পারেনি। কিন্তু প্রাণে বেঁচেছে। নাঃ এ অভিজ্ঞতা তার বন্ধুদের কারও নেই। বললেও বুঝতে পারবে না।
হঠাৎ তার মনে হল যশোমাসিরও একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। সংসারে কেউ কারও নয়। তা হলে গুরুতে মন দেওয়া যাক। যশোমাসির মতো উচ্ছ্বল, হাসিখুশি ইয়ারকিপ্রিয় মানুষের পক্ষে একেবারে আশ্চর্য। এবং যশোমাসিও বদলেছে। না হলে তাকে আর কেউ বুঝল না, যশোমাসি বুঝল কী করে?
মধুবন বাড়ি এসে মাকে জানান দিল। মায়েরা ভাবে। মায়েরা অনুভব করে। মায়েদের জানাতে হয়। সে ছাদে চলে গেল। জুলাই মাসের আকাশ। আজকে অল্প অল্প মেঘ, তারাগুলো ফিকে ফিকে। মুড়কিশোলা গ্রামে বৃষ্টির আগে গ্রীষ্মের আকাশে সে দুর্দান্ত কালো রং আর তারাদের ঝকমকানি দেখেছিল। চাঁদের আলোয় জামডুবির মাঠে গিয়ে ছোটাছুটি করেছিল। মধুবন পাঁচিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েই আছে, দাঁড়িয়েই আছে। এই বিশাল আকাশের তলায় কলকাতাও আছে মুড়কিশোলাও আছে, আছে আরও কত জনপদ! কত বিচিত্র মানুষ কী অদ্ভুত নিঃস্ব তাদের জীবনযাপন। তার বুকের মধ্যেটা খাঁ খাঁ করতে লাগল। তা হলে কী লাভ! কিছু মানুষ যদি এমন নিদারুণ অভাবে সংকটে থাকে তা হলে বেঁচেই বা শেষপর্যন্ত কী লাভ! পাবলোরা জানে না, বল্লীরা জানে না। তাই ওদের চলনবলনে কী আত্মবিশ্বাস যেন যা করছ ঠিক করছে। কোথাও কোনও ভুল নেই। সবটাই সত্যি। অথচ এই পুরো শহরটা জীবনটা তার কাছে কী ভীষণ অলীক হয়ে গেছে। পাঁচিল দিয়ে ঝুঁকে সে নীচটা দেখতে লাগল। অন্ধকার রাস্তা। আলো জ্বলছে। একটা দুটো লোক আসা—যাওয়া করছে। বাড়িগুলো সব চুপচাপ। ‘ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলি অঙ্গুলি ইঙ্গিত করি তোমা পানে আছে চাহিয়া।’ যদি সে এখন এখান থেকে ঝাঁপ দেয় নীচে, ভীষণ টানছে তাকে নীচের রাস্তাটা। পড়ে মরে যাবে। ব্যস এই সমাধানহীন অন্তহীন সমস্যার শেষ হয়ে যাবে। অন্তত তার নিজের জীবনে। তার এখন কারও কথাই মনে হচ্ছে না। মা, বাবা, দাদা—কারও কথা নয়। শুধু মনে হচ্ছে এভাবে চলবে না, চলতে পারে না। এ জীবনের কোনও মানে নেই। ‘নিম্নে গভীর অধীর মরণ উচ্ছলি শত তরঙ্গে তোমা পানে উঠে ধাইয়া।’
হেই হেই। এই মধুবন!
চমকে উঠেছে সে। অদূরে দাদা। এগিয়ে এল।
কী করছিস! মৌবটিকা!
হঠাৎ মধুবন দাদার বুকের ওপর মুখ রেখে কেঁদে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। দাদা কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। দাদাটাও যেন কেমন বদলে গেছে। মধুবনকে খ্যাপানো তার একমাত্র কাজ ছিল। দাদার মুখটা এখন অভিভাবকের হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ভরসার মুখ। দাদা অনেক অনেক কাছের মানুষ হয়ে গেছে তার।
বেরিয়ে আয়। এই মুডটা থেকে বেরিয়ে আয়। চল নীচে চল তো!
আমার কিচ্ছু ভাল লাগছে না।
ভাল লাগাতে হবে। মুখ হাঁড়ি করে থাকলে চলবে? তুইও তো করছিস। প্রথম কথা নিজেকে তৈরি করছিস। দ্বিতীয় কথা এই মেয়েগুলোকে তৈরি করবার চেষ্টা করছিস। কাজ কর। করে যা। বাস।
আর ঠিক পাঁচ বছর পরে মধুবন যখন স্কলারশিপ জোগাড় করে আইওয়ায় পড়তে যাবে, ছুটিতে ছুটিতে হিচ—হাইক করে দু’—একটি বন্ধুর সঙ্গে ঘুরবে, ক্যানিয়ন ভিলেজে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মহান প্রাকৃতিক স্থাপত্য ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আলোছায়া ও রঙের খেলা দেখবে, প্রকৃতি—সৃষ্ট ব্রহ্মামন্দির, শিবমন্দির দেখবে, বৌদ্ধ স্তূপের ওপর, তখন তার সঙ্গে আলাপ হবে তার চেয়েও ছোট, কিন্তু দেখতে বিরাট এক রেড ইন্ডিয়ান কিশোরের সঙ্গে। অত বড় শরীর কিন্তু কী বিনীত, এমনকী যেন একটু বা সন্ত্রস্তও। সামারে খাটতে এসেছে। রোজগার করবে। আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। একেবারেই আমেরিরকানদের মতো নয়। অথচ সে—ই প্রকৃত আমেরিকান।
বল্লী—সে তার বন্ধুকে ই—মেল করবে। তুই ঠিক বিষয় বেছেছিস। ইতিহাস। মানুষ, মানুষের সমাজ কীভাবে ভাঙছে গড়ছে, কীভাবে সভ্যতার কোপ কার ওপর গিয়ে পড়ছে। কেন—এইসব জানা খুব, খুব জরুরি। আমি বুঝতে পারি। না জানলে আমি কেন, কোথায় দাঁড়িয়ে, এইরকম কেন মানুষের জীবনের, মনের গড়ন—একটুও বুঝতে পারব না। আমি সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে বুঝছি, বোঝবার চেষ্টা করছি—আলেক্স হেইলি, টোনি মরিসন, নাদিন গার্ডিনার পড়ছি। এই অজানা বিশ্বের মনুষ্যযূথকে আমি জানতে চাই। পড়ছি হার্ডির ওয়েসেক্স টেলস, ডিকেন্স আবার। খালি মগজের খেলা আমার ভাল লাগে না। খুঁজে খুঁজে বার করতে হয় আশ্চর্য সব জনগোষ্ঠীর কথা। এক হিসেবে আমিও তাই ইতিহাসই পড়ছি।—মধুবন।
মেলটা পাঠিয়ে সে চুপুচাপ অনেকক্ষণ বসে থাকবে। তখন তার মনে পড়বে সেই ফিকে তারার রাত। জুলাইয়ের আকাশ। নীচের রাস্তার তাকে টেনে ধরা চুম্বক টানে। মনে পড়বে—হেই মধুবন! কী করছিস!…বেরিয়ে আয় এই মুডটা থেকে। দাদার সেই ভরসা—তুইও তো কাজ করছিস!
তার মনে পড়বে দাদা বিপদ বুঝে তাকে কাউন্সেলিং করেছিল অনেক দিন। তার মনে পড়ে কীভাবে দাদা পাবলোর ‘ভ্যাগাবন্ড’—এর সঙ্গে মিশে তাকে দিয়ে নাচিয়ে গাইয়ে, হইচই করিয়ে, পরিদের দিয়ে ওদের টুসু গান গাইয়ে ভ্যাগাবন্ড—এর আসর জমিয়ে দিয়েছিল। তবু তার ভেতরের ডিপ্রেশন ঘোচেনি। দাদা তার প্রজেক্ট ওয়র্ক দেখাতে মুড়কিশোলা নিয়ে গেল জিপে। সেই জনাকাকা, সনাকাকারা ছুটে এল। ঠাকমা বলল—কী গো সাদা—ডাইনি, এলে আবার? অস্ট্রেলিয়ান নীল আর শন তাকে বুঝিয়ে ছিল ফার্মিংয়ের খুঁটিনাটি। দেখিয়েছিল মুরগির খামার। তার বিশাল ব্যবস্থাপনা। বান হয়ে নাকি ওদের জমি অনেক ভাল হয়ে গেছে।
রবি—চাষ হচ্ছে তখন। চিনে, বাদাম, তিসি তিল, নানারকম সবজি। মাঠেঘাটের চেহারা পালটে গেছে। শীত বইছে শনশন করে। গায়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঠাকুমারা রোদে বসে।
তবু কি তার ডিপ্রেশন ঠিকঠাক ঘুচল!
দ্বিতীয় মেলটা সে দাদাকে পাঠাবে, ক্যানবেরায়—
দাদা, কেমন আছিস? তোর নিশ্চয় নিজের কথা ভাববার সময় নেই। তুই সব সময়েই কিছু না কিছু হিউম্যানপ্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত। কত জরুরি মেল আসে তোর। বেশি পড়বারও সময় নেই। দাদা, তুই এই বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিস। আমি বোধহয় হারিয়ে গেছি। যে—কাজটা নিয়েছিলুম, পারলুম কই। ওদের কাউকেই তো পুরোপুরি শেখাতে পারলুম না। গঙ্গা যমুনা বিয়ে করে পালিয়ে গেল। বরেদের মার খেয়ে, লোকের বাড়ি কাজ করে দিন চলছে। তুলসীটা অবশ্য মায়ের সমিতিতে বেশ সেলাই শিখেছে। রোজগার ভালই। মা দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছে। শোভার খবর ভাল না। বুঝতেই পারছিস! লক্ষ্মী এখনও পঙ্কজ ধুধুরিয়াদের বাড়িতে কাজ করছে। দেখ, পরিটারই মাত্র পড়াশোনার মাথা ছিল। কী চটপট সব শিখে নিত। পাটিগণিত একেবারে হাতের মুঠোয়। বাংলা হাতের লেখা কী চমৎকার! ম্যানার্স কী শিখেছিল! কে বলবে মুড়কিশোলার মেয়ে! টিভি দেখে দেখে কী যে মাথা ঘুরে গেল! সিরিয়ালে অ্যাক্টো করতে চলে গেল। নগণ্য সব রোল, তার জন্যে যে ওকে কী করতে হয় আর না হয়! ভগবান জানেন। মা তো বলছে বাড়িতে আর থাকতে দেবে না। অনেক কষ্টে মাকে আটকেছি। কাউকেই শিখিয়ে পড়িয়ে মুড়কিশোলায় ফিরিয়ে দিতে পারলুম না। কী আর পারলুম তবে!
রুস্তমের জবাবটা আসবে সঙ্গে সঙ্গে।—এখন অনেক রাত। তোর মেলটা পড়লুম। কে বলল তুই হারিয়ে গেছিস! হারিয়ে যাওয়াও একরকম খুঁজে পাওয়া। প্রত্যেকটা কাজে সেন্ট পারসেন্ট সাফল্য আশা করিস না, হয় না। যা করেছিস খুব করেছিস। আমাদের কাজ হিউম্যান ফ্যাক্টর নিয়ে। আনপ্রেডিক্টেবল। আমরা তো কোনও সিস্টেমের সাহায্যও পাইনি! ওরাও পায়নি। একেবারেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা। এখন মুড়কিশোলার চেহারা পালটে গেছে। দ্যাখ কার ভেতরে কী আছে, কে ঠিক কী চায় শেষপর্যন্ত সে নিজেই ঠিক করে। ওরা তোর কাছ থেকে কিছুটা রসদ সংগ্রহ করেছে। যে যার নিজের মতো বাঁচছে। ওদের ব্যাপারে তোর কাজ, তোর দায়িত্ব শেষ। সবাই কি আর যে যার মুড়কিশোলায় ফিরে যেতে পারে? আমি পারব কি না জানি না, তুইও পারবি কি না জানিস না। এই এক্সোডাস যদি রুটি—রুজির জন্যে বাধ্যতামূলক না হয়, যদি এর সঙ্গে আবিষ্কারের চৈতন্য থাকে তা হলে যেখানেই যাস তোর মূল ঠিক বেঁচে থাকবে। ভাবিন সা। উঁহুঁ, ভুল বললুম—ভাবিস।—দাদা।
আপাতত সে জানে না তার এই অনাগত ভবিষ্যৎ। আপাতত সে নাচছে। পাবলোর কোরিওগ্রাফি। যশোমাসি হেলপ করেছে। ওদের হাত—পা ছুড়ে কত রকমের ক্রিয়েটিভ ডান্স। তারই মধ্যে সে আপন মনে তিল্লানা নেচে যাচ্ছে। কোনও কস্টিউম নেই। সাধারণ একটা ছাপা শাড়ি, কুঁচি তুলে পরেছে। মাথায় তার কাঁধ পর্যন্ত গোছা গোছা চুল ক্লিপ দিয়ে বাঁধা। নিরাসক্ত হয়ে শুনছে কার্জন কী সুন্দর খানিকটা গদ্য পড়ল। ক্রিটিক্যাল লেখা। তাদের জেনারেশন পৃথিবীকে কীভাবে দেখে, কী চায়, কী পায়। পুরো গ্রন্থনাংশটাই ওর আর বল্লীর। কার্জন কবিতা লিখবে, এত সুন্দর গদ্য লিখবে কেউ কি কখনও ভেবেছিল? কিন্তু সামহাউ তার আশ্চর্য লাগে না। আনপ্রেডিক্টেবল। হিউম্যান ফ্যাক্টর ইজ অলওয়েজ আনপ্রেডিক্টেবল। এ সব যেন হবারই ছিল। হতেই পারে। পাবলোর নিজের হাতে আঁকা ‘ভ্যাগাবন্ড’—এর পোস্টার চারদিকে। তারাও রং বুলিয়েছে। ‘ভ্যাগাবন্ড’ দা ব্যান্ড অব দা জেনারেশন ওয়াই। আ টোট্যাল এন্টারটেনমেন্ট অ্যান্ড আ স্টেটমেন্ট।’ দৃঢ় রেখায় আঁকা স্কেচ, কালিতে রঙে, চারকোলে। কার হাতে স্প্যানিশ গিটার, কার হাতে একতারা, কে আবার ডুগডুগি নিয়ে পোজ দিয়েছে। পাবলো কী স্বতঃস্ফূর্ত গাইছে! ও চিরকালই খুব ঘ্যাম গায়। তাই বলে নিজে এমন দুর্দান্ত ক্যাচি আবার মন গলানো কান্না নিংড়োনো মজাদার সব সুর দিয়ে গাইবে? এমন সব লিরিক? দাদা ছবি তুলছে। পাবলিসিটিতেও লাগবে। হল—ভরতি গমগম করছে। বল্লীও গাইছে, আরমান আর দাদা হেঁড়ে গলায় হাঁকার দিচ্ছে মাঝে মাঝে—ধ্যাত্তেরিকা! যাচ্ছেতাই। ব্যাটাচ্ছেলে! খাওয়াচ্ছি! সবাই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পঙ্কজ সিনথিসাইজারে। তুলসী—পরি—শোভা—গঙ্গার গলায় পল্লিগীতি। একদম আলাদা গলা। আলাদা সুর। উচ্চারণ।
.
”আমার টুসু য্যামন অ্যামন, তোমার টুসু ভালা
উদের টুসু ফাস্টো কেলাস ঘর করেছে আলা—উদের ঘর করেছে আলা!
টুহুসু রে! ও টুহুসু রে!…”
.
পার্কাশনে একজন এক্সপার্ট ছেলে পাওয়া গেছে স্কটিশের স্যন্দন। স্পেশ্যাল এফেক্ট বিজয়মুকুলদার ছেলে বিনয়মুকুলদা। ওদের সবাই দাদা। বাবাও ছেলেও।
আমরা সবাই দাদা, আমাদের এই দাদার রাজত্বে।
.
মিটিং দাদা, মিছিল দাদা, তোলা দাদা ভোলা দাদা গ্যালো গ্যালো দাদার রাজত্বে আমরা সবাই ভ্যাদা।
দাদা যা বলে তাই শুনি
আমরা লেজকাটা টুনটুনি
এক টুনিতে টুনটুনাল লক্ষ টুনির ন্যাজ কাটাল
নাক কাটাল, কান কাটাল,
দাদার বড্ড গ্যাদা।
দাদাদের এই গ্যাদার রাজত্বে
আমাদের সবার গ্যাদা!
পেট উঁচু করে করে কাঠের পুতুলের মতো হেঁটে হেঁটে পাবলোরা তুমুল হাসির রোল তুলে সব জম্পঝম্প এক্কেবারে থামিয়ে দিল। এখন শব্দহীন প্রেক্ষাগৃহে গর্ভগৃহে কার্জনের বয়ঃভাঙা গলা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
আলো অন্ধকারে যাই, ঘুমে বা নির্ঘুমে,
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে, যা যা কাজ করে
ভাবনা, বাস্তব, ঘটনা, কল্পনা
আশা হতাশা আত্মঘাত, অন্তর্ঘাত, অপঘাত
ধনাত্মক, ঋণাত্মক যা যা খেলা করে
লাল নীল হলদে কালো মাছেদের মতো
শ্যাওলার প্রবালের জলজের মতো
শূন্যের ওপর দিয়ে
যত রং, যত মেঘ, বায়ুকণা, পাখি পোকা চামচিকে উড়ে যায়
মরুঝড়ে যত বালুকণা
নদীবুকে যত জলকণা
আমাদের এই সব শহরের নির্গত নিশ্বাসে বিশ্বাসে
যত ধূম, বিষকণা
যত টক্সিন, যত ইনটক্সিক্যান্ট
সমস্ত কিছু মুঠোয় করে মুঠোয় করে মুঠোয় করে … ছড়িয়ে দিলাম।
এবার পাবলোর গিমিক। প্রেক্ষাগৃহ থেকে গাইয়েরা গাইতে গাইতে উঠে যাচ্ছে, গ্রুপে, একে, ভাগ করে গাইছে :
যে যেখানে আছ পেরেন্টস টিচার্স শোনো শোনো
যে যেখানে করে খাচ্ছ লিডার্স শোনো শোনো
আঠারো বছরে ভোটই হয় না বিবেকও হয়
ছড়িয়ে যাচ্ছে দংশন, শুধু দংশন সারা বিবেকময়।
মদের পাউচ, সেক্সি আউচ! ড্রাগের কাউচ ভোটের বাক্স রক্তমাংস
সমস্ত ছুঁয়ে সমস্ত ছেয়ে বিবেক বইছে বিবেকময়! বিবেকময়!
(সমবেত গর্জন) কী করবে করো। কী করবে করো।
তারপর সব চুপ। দর্শক শ্রোতাদের বুঝতে সময় লাগল যে অনুষ্ঠান শেষ। তবু শেষ নয়।।
***
