মেছের শাহের গান
১
অনন্ত রূপেতে মাটি আছে এ সংসারে
মাটি হতে নিত্যলীলা সর্ব ঘরে ঘরে।
এক মাটি সব ঠাঁই অনন্ত তার রূপ
কতক কুৎসিত কতক দেখতে স্বরূপ।
অনন্ত রূপী তিনি বসুমতি নাম
মসজিদ-দরগা, মন্দির-ঘর মাটিতে তামাম।
নিরঞ্জনকে সেজদা দিলে এই মাটিতে পায়
মাটিকে জানলে খাঁটি সাধন সিদ্ধি হয়।
নির্বিকারে আছে মাটি সব জীবে খায়
মাটিতে জগতের সৃষ্টি মাটিতে প্ৰলয়।
সর্বশক্তিমান মাটি সংসার মাঝারে
বীর্যরূপে নুর-পানি তার শরীরে।
মেছের শাহ কয় মাটি হয়ে গুরু ভজো মন
হিংসা না থাকলে হবে রাজি নিরঞ্জন।
২
আগে না জেনে ভজোরে সন্ধান গো গুরুভাই
গুরুর দয়া হবে কেনে।
মন তুমি যারে ভোজে মুক্তি পাবে তারে,
কেন করো না মনে।
গুরু যার হয়েছে সখা, কি করবে তার কাল শমনে,
সে যে ভক্তের জীবন পতিত-পাবন
মুক্তি করে ভক্তি গুণে।
সেই যে গুরু দয়াল বটে
মন তারে চেনো না কেনে
তোমায় কোন গুণে করবে দয়া ভক্তি না হইলে মনে,
অধীন মেছের বলে দিন ফুরাইলে কুজনে
তুই ভজলি না মন গুরুর চরণ
কি হবে হিসাবের দিনে।
৩
আছে দেহের বাদাম দক্ষিণ দিদার
তত্ত্ব জেনে সে নারে রসনা চৌদ্দ পোয়া জানা।
চৌদ্দ পোয়া জমিখানি
নাইতো তার বেশি-কমি
জরিপ করে দেখলাম আমি
চারিদিগি তিন কোনা,
জমির ছয় হাজার উচিত
ছয় হাজার পতিত
ছয় হাজার আছে রে জলখানা
সবদিকে বয় সরোবর
ত্রিবেণী ছোটে জোয়ার শ্রীখোলা
প্রেমের বাজার দোকানী একজনা রে।
একবার যাই জমির কাছে
আবার মন উঠে গাছে
আবার যায় পঙ্খির পাছে বোকামী কারখানা।
পাখির হালে তার পাখা আছে
ভেবে কি দেখো না মন পাখির পাখা আছে
তত্ত্ব লও গুরুর কাছে
মুখ নাই তার বলো মিছে কথা কইতে দেখো না রে।
আবার যাই গাছের মূলে
দেখি সাঁইর আজব লীলে
ফল ধরে আছে মণিহর ঠিকানা।
ফলের মধ্যে অঙ্কুর আছে ভেঙে কি দেখো না,
ভেবে তাই মেছের বলে চর পড়লে চতুর্দলে
সেই চরে অঙ্কুর পড়লে গজায় তা কি দেখো না।
৪
আজব কথা শুনে প্রাণ বাঁচে না
হলো একেতে হিন্দু-মুসলমান সবে তা জানে না।
কেউ মালা কেউ পৈতা গলে
কেউ তসবি কেউ খোলক গলে
এক আদমের ছলে,
ও তার যার সেই সেই রইল
কারো তরিক কেউ লয় না।
চারজন চার তরিকে রলো
দৈব পিতার মরণ হলো কি হবে বলো,
তারে মুসলমানে দাফন করে
হিন্দুকে লাশ দেয় না।
ও মন মিছে করো নড়াচড়া
একলা আদম সৃষ্টি গড়া
জগতে জোড়া।
হলো সকল এক বাপের ছেলে
মেছের কয় কেউ পর না।
৫
আদমকে সেজদা করতে বলেন সাঁই
ভেবে দেখো মনে
অনুমানে সেজদা তখন বলেন নাই।
দেখো আদম ছবি যখন চেতনে এলো
ফেরেশতা কে খোদা হুকুম করলো
তোমরা সকলে সেজদাতে মিলো
আমি হলেম খোদে অন্য কেহ নাই।
তারে সকল ফেরেস্তায় সেজদা করল
আজাজিলের মনে অহংকার হলো
শয়তান বলে তার কলংক হলো
লানহুতের তক তার গলে দিল সাঁই।
দেখো আজাজিল যখন লানহুতি হলো
দয়া করে খোদা তাকে বললো
ইমান আনো মনের অহংকার ফেলে
আদমকে সেজদা দিলে আমি সেজদা পাই।
দেখো আপন মুখে সাঁই খোদে বললো
আদম সেজদা দিলে আমারই হলো।
মেছের বলে মনে ভরসা হলো
মুর্শিদরূপে খোদা তোমায় জেনো পাই।
৬
আমি আছি হুতাশ হালে রে
চরণ পাব বলে,
আমি এ দীনহীন তোমার অধীন
আমায় রেখো চরণ মূলে ॥
হারে দয়াল তোমারে বেপার বলে
আমি ফিরছি উদাসী হালে
সদা ডাকি দয়াল বলে
দাঁড়িয়ে ভবনদীর কূলে
দয়াল তোর প্রেমের হার লয়ে গলে
আমি ফিরছি এই বেহালে
তোরে কেউ ডাকবে না দয়াল বলে
দয়াল আমার হাল দেখিলে।
তোমার অধীন মেছের কেন্দে বলে
আমি অবোধ বালক বলে
তুমি নিজ গুণে না তরালে
দয়াল আমি যাব কোন কূলে ॥
৭
আমার আশায় জনম গেল রে
চরণ কবে পাবো।
দয়াল তোমার দুই চরণ ধরে
আমার মনের কথা কবো।।
দয়াল তোমার ওই চরণের আশে
আমি ভ্রমণ করি দেশে-বিদেশে
আমি দিনহীন কাঙালের বেশে
দয়াল আমি আর কতদিন রবো ॥
সদাভক্তি স্বরে ডাকি তোরে
দয়াল নিদয়া হয়ো না মোরে
আমার এ দেহ সঁপিয়া তোরে
চরণের দাসী হয়ে রবো ॥
৮
আমার গুরু পদে যে ডুবেছে প্রেমের ভাব জেনে
সদা তার মনে মনবাঞ্ছা আছে যখন থাকো সেখানে।
যেজন প্রেম করেছে সুজনার সাথে
দেখো প্রাণ থাকতে ছোঁবে না সে প্রেমে রবে যতনে।
জানো দুষ্টের সঙ্গে প্রেম করলে রবে না প্রেম কখনে
ও সেই প্রেমের মর্ম সেই প্রেমিক জানে
ও যার ভাবশূন্য প্রেমশূন্য দেহ সে জানবে কেমনে।
প্রেমের সন্ধান জেনে থেকো চেতনে
ও সে মদনা চোরা যায় না যেনো মাল খাজনার দোকানে
অধীন মেছের বলে যার গুরু সখা কি করবে তার শমনে।
৯
আমার কালার প্রেমে বিচ্ছেদের ফাঁস যার বেঁধেছে গলে
সে যে কোলের ছেলে দূরে ফেলে কান্দে বসে বিরলে।
ও সেই প্রেমের মানুষ কি সহজে মেলে
যেমন জল বিনে চাতকের গতি তেমন না হলে
জানো মরদেহে জীবন পাবে সহজ প্রেমে মজিলে।
ও সেই প্রেমের বাতি যার অন্তরে জ্বলে
ও মন থাকবে না তার শমনের ভয় ভুবন মণ্ডলে
দেখো চণ্ডীদাস মরে বাঁচে রজকিনীর প্রেম বলে।
যেমন সোনার সঙ্গে যেই সোহাগা মিলে
তেমনি গুরু পদে মিলতে পারলে প্রেমের ধন মিলে
অধীন মেছের কয় প্রেম সবের হলো, ঘটবে কি মোর কপালে।
১০
আশক যারা খোঁজে বটে সাঁই দরদীর নিগুম ঘরে
জানতে পারো নিগুমের খবর গুরু আছে সখা যার।
জেলা বলো থানা বলো
মণিপুর হৃদয় বলো
সব সীমানা জুড়ে আছে একখানি সাঁইর ঘর।
সব সীমানায় হাকিম একজন
থানায় পুলিশ নাই অন্যজন
বিচারপতি এমন পবন তারে মন রাজি করো।
দেখো যম রাজার নাই জমিদারি
স্বয়ং রাজার অধিকারী
রেখেছে সাঁই যত্ন করি চৌদ্দ পোয়ার পর
একশত বিশ ফরজ বলে তাই দিয়ে তার খাজনা দিলে
তাইতে কি আর মুক্তি মেলে ন্যায্য খাজনা আদায় করো।
চারজন নারী বৃথা বলো
চারগুণে এক নারী এলো
সব পুরুষ তার অঙ্গে ছিল অঙ্কুরের আকার।
মেছের চান্দে বলে
চৌদ্দভুবন একের মূলে।
১১
উজিরের ধর্মজ্ঞান কি হয় না,
কোথা হতে কোথায় এলে
কোথা যাবে তা ভেবো না।
এসে সুখের পরবাসে
কাল কাটালে মায়ারসে
কি হবে অবশেষে সে
জীবের তা মনে পড়ে না।
মুর্শিদপদে ভক্তি নাই যার
এ জীবনের কাজ কি করে তার
বিফলে জন্ম তার
জন্মে পাপী কেন মেলো না।
মজে জীব কামিনীর কোলে
পরমতত্ত্ব আছো ভুলে
কি হবে অন্তিমকালে
মেছের কয় তা যায় না জানা।
১২
একি রূপ দেখলাম গো আমি
সদায় ভাবি তাই ত্রিজগতে
এমন রূপ আর দেখি নাই।
ওই রূপ দেখবি যদি আয় গো তোরা
কুলের মুখে দিয়ে ছাই।
এমন স্বরূপে রূপ কোথায় ছিল
ওই রূপ হটাতে নয়নে পেলো গো
আমি দিবানিশি মনেপ্রাণে ভাবি তাই
আমি যে দিকে চাই নয়ন মেলে
সেই দিক সেরূপ দেখতে পাই।
ওই রূপ যখন আমার রে মনে
আমি চেয়ে থাকি আর নয়নে গো
যেমন মেঘের ফলে বিজলী খেলে দেখতে পাই
আমি গৃহকার্য সকল ছেড়ে নয়ন ভরে দেখি তাই।
সেইরূপ দেখে প্রাণ আকুল হলো
আমার মনপ্রাণ হরে নিলো গো
তারে না দেখলে মনে বলে কোথায় পাই
অধীন মেছের বলে ত্রিজগতে সেরূপের তুলনা নাই।
১৩
ও মন সু-মানুষের সাধ্য কর
দেখবি মানুষ দীপ্তকার
প্রেম কি রতন জেনে সাধন কর।
হলো আদ্যশক্তি মহামায়া যার
প্রেম বিলায়ছে ঘরে ঘরে
আপনি মোক্তার সেজে
প্রেম দিয়া প্রেম উদয় করে গো
দেখো সে এমনি প্রেমের কারিগর।
আর স্বয়ংশক্তি রাধা নামটি যার
আছে জীবের ঘরে ঘরে রূপে শ্রী সংসার,
সেই স্বয়ং শক্তির বীজ গজাতে গো
সব মেয়ের চতুৰ্দ্দলে বান্ধে চর।
হলো প্রেমের অঙ্কুর হৃদয়ে মাঝে যার
সদা থাকে প্রেম-আনন্দে মত্ত দীপ্তকার।
অধীন মেছের কয় সেই প্রেমের বলে গো
জীবের সৃষ্টি করে সৃষ্টিকার
১৪
ও যার জ্ঞান হলো না মনে
অজ্ঞান দেহ পশুর তুল্য ভজন করবে কেনে ॥
জ্ঞান হলো ভজনের গোরা
ও তা জানে জ্ঞানী জনে,
জ্ঞান যেমন তা ভজন তেমন বেশি পারবে কেনে ॥
লেবুর মর্ম মশায় জানে রে
ও তা কাকে কি আর জানে
মৌমাছিতে মধু চেনে
বলায় চিনবে কেনে
দেখো ধর্ম জ্ঞানের জ্ঞানী হলে রে
জালে ইমান হয় তার মনে
অধীন মেছের বলে বেইমানের ভজন হবে কেনে ॥
১৫
ও সেই দেশের খবর শুনবি রে এখন
তবে ছেড়ো না গুরুর চরণ।
আলেক দেশে ছিলাম আগে
হৃদপুরেতে এসেছিলাম
পরমের সঙ্গে সেথা হতে গর্ভে এলেম।
সঙ্গেতে লয়ে চারজন
উত্তরে-দক্ষিণে সেই গর্ভের আসন
পঞ্চমাস পরেতে হেথা পেলাম চেতন
গর্ভপুরে অন্ধকারে উজলা হলো তখন
আমি দশমাস দশদিন ছিলাম
মালেকুল মউতের সঙ্গে
মেছের তাই ভাবে এখন।
১৬
কর্মফলে কার ভক্তির উদয় হয়
এক ধর্ম বহুরূপ যার যা ইমানে লয়,
দেখো আল্লা হরি রামকৃষ্ণ কেউ কয়
যে নামে যার মুক্তির বাঞ্ছা হয়
সেই নামে তরাবে তারে
গুরুর ভজন যদি পায়।
ভজনের মূল ভক্তি জানা যায়
যার ভক্তি যেমন মুক্তি তেমন পায়,
যার কথায় ধন্য কাজে শূন্য
ও তার মুক্তি কিসে হয়।
ও মন দিন থাকতে সাধন করো তায়
দিন ফুরালে কি হবে উপায়
পস্তালে কি হবে শেষে
ফকির মেছের শাহ তাই কয়।
১৭
কামনদীতে যেতে সাধ্য নাই
জানা আছে সপ্ত দিবস তাই।
অমাবস্যা পূর্ণিমাতে যোগের জোয়ার রয়
জোয়ারে নৌকা দিলে হঠাৎ কেউ মারা যায়
জোয়ারে ভাটা পেলে নৌকার বাদাম তুলে
ইচ্ছামতো যেমন চলে চালাও।
বাঁকা নদীর গতি বোঝা জীবের সাধ্য নয়
আচৈমকা জোয়ার এসে শুকনাতে সাঁতার হয়।
রসিক ডুবালো যারা
ধার চিনে ডোবে তারা
যখন জোয়ারে পোরা ডুবতে নাউ,
জোয়ার গেলে ভাটা এলে নবীন বহে ধার
ভাব জেনে নামো ঘাটে সামনের ভয় কি আর
ভেবে তাই মেছের বলে, চর পেলে চতুৰ্দ্দলে
সেই চরে অঙ্কুর পেলে গজায় ভাই।
১৮
কি ধর্ম করলে যাচাই সব ধর্ম শাস্ত্রেতে লেখা
ধর্ম তো শাস্ত্র ছাড়া নাই।
আন্দাজি কথা শুনবো কেনো যদি না দেখি আপন নয়নে
দেখলে বিশ্বাস করি মনে
না দেখলে বিশ্বাস তবে নাই।
হারে আছে সব ধর্ম শাস্ত্রেতে লেখা সবে জানে নাই
পঞ্চআত্মা, পঞ্চতত্ত্ব, পঞ্চরস তার পেটির তত্ত্ব
শাস্ত্রে তাই লিখছে সত্য
ভক্তিহীন জানতে পারে নাই।
হারে একবার শিক্ষাগুরু আশ্রয় করো
জানতে পারে তাই
অধীন মেছের ফকির বলে শোনো রে তাহের বলি তোরে
পঞ্চরস থাকে পঞ্চদ্বারে
শাস্ত্রে তার নিশানা দেখতে পাই
আছে গুরুতত্ত্বে নিগুঢ় কথা বেদ-বিধিতে নাই।
১৯
কি সুখ পেয়েছে জীব বিদেশে এসে
ভুলে আছো মনমতো কামিনী পেয়ে
যে দিন এমন সুখ, না চিনলে তায়
আখেরে হিসাবের কালে কি হবে উপায়,
এত সুখের স্ত্রী-পুত্র সুখের বাড়িঘর
সকলে পড়ে রবে সংসার মাঝার
মউতের কষ্ট যা একেলা পাবে
স্ত্রী-পুত্রগণের তা মালুম না হবে।
কেবল মায়ার জন্য করে হাহাকার
আখেরে ভুল করে আপনার।
স্ত্রী-পুত্রধনের চিন্তা করে রাত্রি-দিনে
মাবুদের চিন্তা মানুষ না করে কখনে
ধনের গৌরব জীব সন্ধানী হয়ে
মানীর মান যে দিল তারে মান্য না করিলে।
২০
কেটে দাও মায়ারই বন্ধন শ্রীগুরু করো হে স্মরণ
গুরুর নাম নিল সে মন রবে না
হবে না অকালে মরণ।
শোনো বলি মন ও হারে
যে তোমায় করিয়া সৃষ্টি করছে পালন
এবার কেন তারে ভুলে গেলে
হয়ে এই মায়ার বন্ধন।
শোনো বলি মন ও হারে
শিক্ষাগুরু মুর্শিদ দাতা সেও তো মহাজন,
এবার কেহ মন তারে দাও ভোলা মন
কাণ্ডারি ঠিক না করো এখন রে
অধীন মেছের বলে দিন ফুরালে হবে না মন
ভোলা মন সাধন করো গুরুর চরণ।
২১
কোন্ হরফে কী ভেদ আছে ডুবে দেখতে হয়
আলেপ হে আর মীম দালেতে আহাম্মদ নাম হয়।
নফি দিলে মীম হরফে আকার পাওয়া যায়।
নিরাকারে ভোজবে কেনে আন্দাজে প্ৰায়।
আহাদে আহাম্মদ হলো জানো পরিচয়
জাতে সেফাত সেফাতে জাত জানিও নিশ্চয়।
ভেদ না জেনে গোল ধারায় যত কাঠমোল্লায়।
কুলুবেল মোমিন খোদা লিখল কোরানে
সব আকারের আছেন তিনি জানো সর্বজনে।
সব রূপে আছেন বলে আপে দয়াময়
মুর্শিদের আকারে তারে ভজন করতে হয়।
আকার ছেড়ে নিরাকারে ভজন করবে যেই
মেছের শাহ কয় মওলার দিদার না পাবে সেই।
২২
কোরান পড়ে দেখো মন আপন জ্ঞানে
খালি পড়তে পারলে ভজন হয় না,
মুর্শিদের ঠাঁই জানতে হয় তার মানে।
কোরানেতে গেল জানা
এক বিনে আর দুই মেলে না
একে হয় কোটির ঠিকানা
কাফের মমিন হলো যে কারণে।
সেই একেরে যে চিন্তা করে
মমিন বলে জানো তারে
এক ছাড়া দুই যে ফোকারে
কাকের বলে জানো তারে মনে।
মেছের শাহ কয় জানা গেল
এক নুরেসহ সৃষ্টি পেলে
হালাল হারাম কারে বলো খেতে পারে
যার স্রষ্টা যা মানে।
২৩
গুরুপূজা হবে কি তোমার ভুল থাকতে মনে
মন মাঝিকে করো রাজি, জ্ঞানশূন্য থাকিস নে ॥
তোমার মন টোলে যায় তুমি কোন জন
মুর্শিদের ঠাঁই তাই জানো মন,
তার তরি ডুববো না কখন ডাঙায় কি তুফানে
গুরুবাক্য রেখো মনে
থেকো ওই রূপের ধ্যানে
জ্ঞানের তফিল হারাও কেনো থেকো সচেতন ॥
আসল যায় মনে লয় না
খালি গয়নায় তার ধন মেলে না
মেছের কয় সেই মুর্শিদ চেনো মন গুরুর কারণে ॥
২৪
ঘরে বেঁধেছে অতি যতনে
ঘরের মধ্যে ঘর বেঁধেছে সন্ধানে অতি সন্ধানে।
আগুন পানি মাটি বাতাস চার চিজে ঘর
চারির আঠন চারির কারবার।
চারির ঘরামি যে জন
এক ঘরেতে যে মৃণালে দিয়ে বাঁধন গোপনে।
ঘরামি বেঁধেছে এক ঘর
আড়ে দিগে চৌদ্দ পোয়া নয় দাগে নয় দ্বার
বাঁধা ঘর আজব কলে
চালাচ্ছে জলে স্থলে
সর্বক্ষণ হাওয়া খেলে পবনে।
ষড়রিপু আছে ঘরে মিথ্যা জীবে কয়
একটি মনের ছয়টি স্বভাব রিপু আর কেউ নয়।
মেছের কয় জ্ঞান যাঁরা
মূলের ভেদ জানে তারা
সব ঘরে চলাফেরা একজনে।
২৫
চরণে পাবো বলে মনের বাসনা ও কি জানে না,
বুঝি আমার কথা তোর মনে পড়ে না,
আমি তোমার জন্য পাগলিনী মন ঘরে থাকে না।
আমি দিবানিশি ভাবি তোরে তোর দয়া কি হলো না,
তুমি নিজ গুণে করো দয়া নিদয় হইও না
আমার দয়াল চান।
দয়াল দেশে দেশে তোর নামের ধ্বনি করিল যে জনা
হারে দয়াল তোমার কি কঠিন হৃদয় তারে মন করো না
ডাকলে শোনো না।
তোমার অধীন মেছের ডাকে তোমায় তা শুনে কি শোনো না
দয়াল যার যাবে প্রাণ তোমার পথ তো থাকতে ছাড়ব না
তা কি জানো না।
২৬
চিন্তামণি করে চিন্তা নিরালে বসে মন
তুই রইলি কার আশে চিন্তামণি
মুখে বলো গুরু সাকার রেখে বিদেশে
হারে মন তোর দুই দেহে একজনা,
না হলে সে গুরু সাকার হয় কিসে,
সাধক, সিদ্ধি, স্থল, প্রবর্ত্ত নাই চার দেশে,
ও তুই বল দেখি রে কোন কর্মেতে সে গুণ সাকার হয় কিসে।
গুরু না হইলে কাণ্ডারি পার হবি কিসে
হারে মন তোর একা বসে কান্দতে হবে
ও তাই পারঘাটা বসে
মন তুই রলি কার আশে।
২৭
জন্মকথা প্রকাশ করি তুমি শোনো গো জননী
ছেড়ে দাও হস্তের বন্ধন
আর আমি খাবো না ননী।
বটবৃক্ষে ছিলাম যখন কৃষ্ণ নাম ছিল তখন
অকূলে পতিত হয়ে সেই অক্ষয় পত্র ধরি
আসিয়া কূলে দেখি নয়ন মেলে
দশভুজা এক নারী।
আমি তার উঠিয়া কোলে
ডাকি মা মা বলে হরি নাম রাখিল তিনি
শোনো গো জননী।
হেতায়ও রাজার ছেলে এসে ওই সুষ্ঠকুলে
কৌশলে মা বললো বলে
হলেন বনচারী খেয়ে গঙা জল আর বন ফল
হয়েছিলাম জটাধারী
সেদিন তখন ভক্ত মান বলে হয়ে রাম
সঙ্গে লক্ষণ জনক নন্দিনী।
দ্বাপরে মধুপুরে জন্মে দেবকীর কোলে কংসের ছলনা
এলেম গোকুল নগরে
এখন শততম বৈরী বাঞ্ছা পূর্ণ করি
সাজিয়া বিদেশিনী বলো দূরে কি হরে হরে
অধীন মেছের চান্দের বাণী শোনো গো জননী।
২৮
জপো রে তার নামের মালা হয় না যেন ভুল
গাঁথো ওই নাম আপন গলায়
দূরে যাবে দুঃখ জ্বালা
অন্ধকার হবে উজালা
এই দুনিয়ার মূল।
তুমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লা বলো
ওই আঁধার ছিঁড়ে চক্ষু মেলো
এই ভবের হাটে ভুলো না রে মহম্মদ রসুল।
নুহ আলএসবাৎ নফুয়াল নবি
ও তোমার ফানা ফাল্লা যখন হবি
মেছের শাহ কয় তবে রে তুই আল্লাহর মকবুল।
২৯
জানতে পাবে ভজো গুরুর পদেতে
হলো খোদার নুরে নুর নবিজি
আদম হয় তাঁর নুরেতে ॥
আগে এক আকার ছিল
এক হাতে চার কার হলো
চার রঙ ধরে সাঁই চার কারেতে ॥
শূন্যকার শেষে হলো
দীপ্তকার প্রকাশ পেলো তাইতে সেই আদম এলো
হাওয়া ছিল সঙ্গেতে ॥
এগার কার বলো,
সব ছেড়ে চার মেলো
সংসার গড়লো যে চার কারেতে ॥
ফকির দরবেশ বলো
সব ছেড়ে চার মূলে
সংসারের সৃষ্টি চলে
নিরাকারের জগতে ॥
আকারে মগ্ন যারা
কারের ভেদ জানে তারা
মেছের কয় মনের ব্যথা
বলবো তার ব্যথিত কোথা
তেরটি কারের কথা
জানে সাধক জনেতে ॥
৩০
জিম কলেতে কলমা ঘুরে
ও তার সন্ধান জানো কলমা ধরে
শাহাদাৎ কলেমা জবানের নাম লেখছে দলিলের পরে।
ওরে জিম থেকে উঠে জিমে কেয়াবিদ হয় এ সংসারে
তেহরকে তিল্লি আটা নাভি ফেপসা তার পরে
নুই রূপে লাপ ঘেরা অগ্নি থাকে তার ভিতর
অধীন মেছের চান্দ বলে শোনো রে তাহের বলি তোরে
ওরে নাভী হতে জন্ম হাওয়া নাসিকার পরে
ফেরেশতা ওঠে পবি ত্রিপণীতে উজান রে ও তার
নাম হলো অমৃত-বিন্দু জিঙার সংসারে ফেরে।
৩১
জেনে লও গুরু কেমন ধন রে এ দেহে থাকিতে জীবন।
শোনো বলি মন তাহারে ভবনদী পার হইতে দাঁড়াবি যখন
গুরু বিনে ভবপারে ভোলা মন তোমারে নিবে কোনজন রে,
শোনো বলি মন ও হারে, ভবনদীর নাই কাণ্ডারি ও আমার মন
এবার শিক্ষাগুরু আয়াত করো রে ভোলামন
কাণ্ডারির ঠিকানা কণ্ড এখন শোনো বলি মন,
অধীন মেছের বলে জানতে তারে না পাইল যেজন
মরিলে কি আর পাবি তারে রে ভোলা মন
এ কথা শুনিয়াছো কখন রে।
৩২
জ্ঞান যা ধরেন মুর্শিদ আপন অন্তরে
সে জ্ঞান হতে জ্ঞান দেন ভক্ত সকলে রে
ভেবে দেখো অজ্ঞান দেহ জঙ্গল সমান
জ্ঞান দিয়ে মুর্শিদ তাকে করে ফুল বাগান,
যার যেমন জ্ঞান হয় ভজন তেমন তার
অজ্ঞানে কি পারে কখন ভক্তি করবার,
সে যা বুঝতে পারে করতে পারে তাই
তা বিনে বেশি কারো পাবার সাধ্য নাই,
মুর্শিদের জ্ঞানে যার ঘুচিবে অন্ধকার
জ্ঞান চোখে পাবে সেই মওলার দিদার।
জুলুম পূর্বক ধর্ম যদি সেথায় অজ্ঞান জনে
সে ধর্ম অধর্ম তুল্য ভেবে দেখো মনে,
অজ্ঞানে কি জ্ঞানীর কার্য পারে সাধিবারে
বিরালে ফুরালে বাঁশি বাজতে কি পারে,
সে যারে করবে মুক্তি জ্ঞান হবে তার
সে পারবে মুর্শিদের ভক্তি করবার
মেছের শাহ কয় কিসের কথা বোঝো দিনদার
মুর্শিদের খেদমত বিনে না পাবে নিস্তার।
৩৩
জ্ঞানী হলে জ্ঞানের কার্য কি ফলে
জানো জ্ঞান হলো ভজনের গোড়া
তা কি জানে সকলে।
দিব্যজ্ঞান রূপে সেই দিন দয়াময়
অনন্তরূপ কার্য করে জানো না
বুঝলে কি কাজ করা যায়
করতে পারে বুঝলে।
আপনে গুরু জ্ঞানী হলো
আপনার নাম আপনি বললো
তিনি চার জ্ঞানে চার নাম ধরলো
চার নাম একজনার মিলে।
তিনি কোনরূপে গুরু হলো
জ্ঞান দিয়ে অন্ধকার ঘুচালো
যত ভক্তগণকে শিক্ষা দিলো
ফকির মেছের তাই বলে।
৩৪
জ্ঞানের দ্বারা এই মনে রে রাখো মনেতে
দেহ মন চলতে পবন
চলে কেবল স্মরণ হয় মনেতে।
হায় বায়ু বেগে আছে সে মন
ও সেই মনের বাদি নাই কোন জন
যত পাপ-পুণ্যি সব মনের কারণ
মনের স্বভাবের গুণেতে।
হায় সর্বদেহ একটি আত্মা
দেহে অন্য মানুষ বলো বৃথা
কখন দেহ ছাড়া নাইকো আত্মা
আত্মা থাকে কলেবেতে।
অধীন মেছের চান্দে বলে
শুনি এ সকল পাগলের লীলে
দেখা মন কি কখন হাতে মেলে
আত্মা থাকে কলবেতে।
৩৫
তুমি চরণ দাও আমারে গো
ও যতনে ডাকি তোরেও হারে শিশু যদি কান্দে
মায় তারে দয়া করে
নিজ গুণে দয়া করে জননী তারে গো
ও হলে পরম দয়াল
তুমি শুনি ঘরে ঘরে
আমি কোন দোষে হয়েছি দোষী
দয়া হয় না মোরে গো
অধীন মেছের বলে সাঁই
পতিত পাবন লোকে বলে তোরে
ভক্তের যদি পাপ না থাকে
তুমি তরাবে কারে গো।
৩৬
তুমি দিয়া চরণ উধার আমারে দয়াল চান।
দয়াল তোমার নাম ভরসা করে ফিরি ভক্তের দ্বারে
তুমি কৃপাবিন্দু বরিষণে উধারে আমারে।
আমার দয়াল চান।
আমি দিবানিশি তোমায় চিন্তা করি মনে মনে
তুমি মুর্শিদরূপে দিও দেখা এখানে-সেখানে
আমার দয়াল চান।
দয়াল যে মইজাছে তোমার প্রেমে
তা তরাইলে তারে
অধীন মেছের কয় নামের কলংক রবে এ সংসারে
আমার দয়াল চান।
৩৭
তোমার চরণে ভক্তের নিবেদন
শরিক নাই একেলা তুমি
ভক্তের মুক্তিদাতা নিরঞ্জন।
দয়াময় তোমার উদ্দেশে
ফিরতেছি উদাসীর বেশে
ডাকে তোমায় ভক্ত দাসে
দাও হে স্বরূপ রূপে দরশন।
তুমি পতিতের বন্ধু
পার করে দাও ভবসিন্ধু
দিয়ে তোমার চরণ বিন্দু
দয়াল তুমি পুরাও ভক্তের আকিঞ্চন।
রহমান নামটি ধরো
পাতকী তরাইতে পারো নিজ গুণে দয়া করো
ডাকে মেছের তোমার ভক্তজনে।।
৩৮
দয়া করে দয়াময় এলাহি আলামিন
মায়াজালে বন্দি হয়ে ভাবি রাত্র-দিন।
ভক্তজনার বন্ধু তুমি ওহে নিরঞ্জন
নিজ গুণে দয়া করো না জানি ভজন।
অকূল সংসার নদী কূল নাহি যার
পার করো দিনবন্ধু না জানি সাঁতার।
অকূলে পড়ে ডাকি ওহে করতার
ডুবে যদি মরি হবে কলঙ্ক তোমার
পরম দয়াল ওহে তুমি দয়াময়
কৃপাবিন্দু বরিষণে উদ্ধার আমায়।
কে আছে আর তোমা বিনে কার কাছে যাবো
মনের কপাট খুলে কার কাছে জানাব।
তোমার আশেকে ফিরি উদাসী হয়ে
তুমি কি জানো না তা অন্তর্যামী হয়ে
দাসের বাসনা যা সব জানো মনে
উদ্ধার করো প্রাণনাথ ধরি শ্রী চরণে
তুমি যারে করো দয়া ভাবনা কি তার
অধীন মেছের শা আছে ভরসায় তোমার।
৩৯
দয়ার শরীর যার সেই তো ইনসান
দয়া নাই যার দেহে সেই তো বেইমান
যেজন করবে দয়া মুর্শিদের পরে
আপনি সে আল্লাতাল্লা দয়া করবে তারে।
মুর্শিদের দয়া ভাবি জানো সর্বজনে
মুর্শিদ রূপে আখেরে তরাবে নিরঞ্জন
মুর্শিদকে তুষলে দানে নেকি হয় যত
শতজনকে দান করলে না হবে তত
মুষ্টি-সিন্নি দিলে পরম পিরের হুজুরায়
জাহেরে আখেরে তার মজুদ পাওয়া যায়
দশ-বিশ টাকা লয়ে কেহ পিরের ধামে যায়
হজের ছবাব আল্লা বিলাবে তারে
এক হজে যত ফল হবে মমিনগণ
গুরু ধাম হজের ফল তার শতগুণ
কেননা মুর্শিদের এত দরজা কি কারণ
ধ্যান করলে মুর্শিদের রূপ মেলে নিরঞ্জন
অনুমানে খুঁজিলে তারে হদিস না পাবে
মেছের শাহ কয় মুর্শিদ ভজো ওইরূপ মিলবে।
৪০
দয়াল তুমি যা করো দিয়াছি চরণে ভার
আমি দিয়াছি চরণে ভার আমি দিয়াছি চরণে ভার।
দয়াল তোমার ওই চরণের আশে,
ফিরতেছি উদাসীর বেশে,
দয়াল ডাকে তোমায় ভক্ত দাসে
নিজ গুণে করো পার
দয়াল নাম লিখে তার শ্রীচরণে
চেয়ে আছি পান্থপানে
যদি না তরাও সাই ভক্তগণে
কলংক হবে তোমার।
দয়াল তুমি করুণা সিন্ধু
জীবের জীবন ভক্তের বন্ধু
অধীন মেছের তোমার ভক্ত বিন্দু
ডাকলে ডাক শোনোনি তার।
৪১
দরদি গো দেখলাম কি আজব এক রূপের খাঁচা
এক অচিন পাখি রয়
পাখি মণিপুরেতে বিরাজ করে
নাসিকাতে আসে যায়।
অচিন পাখি আসে যায়
মণিরাম হাতিনা তায়,
ওরে ডানে বামে তার কারণে আয়না মহুর রয়,
ও তার শিকল আটা পাখির পায়
হারে আশ্চর্য কথা শুনে ভয়
পাখি একবার উড়ে একবার পড়ে পাংঙ্খা নাই তার গায়
কেবল হুতাশনে আসে যায়,
পাখি সাধকে তার সন্ধান পায়,
মেছের সাঁই ফকিরে কয় অধীন তাহের
তুই ভাবিসনে শিক্ষাগুরু আয়াত করে
হাওয়া নাই পাখির আত্মা ছাড়া বহুদূরে আসে যায়।
৪২
দিন থাকতে ডাকো দয়াময়
মারিফত বিহনে খালি শরিয়ত কি কবুল হয়।
দেখো শরিয়তের দলিল হলো
মারিফত বাতনে রলো
সিনার ভেদ সিনায় এলো জানো তাই।
মুর্শিদের দয়া হলে
মূলতত্ত্ব দিবে বলে
সিনার ভেদ যাবে খুলে
যার কথা সে যদি কয়।
দেখো শরিয়তরে ভেদ সফিনায়,
মারিফত রয় সিনায় সিনায়
অজ্ঞানে মর্ম কি পায় জানো না।
জানলে করতে পারে
না জেনে হাতরে ফিরে
যে জানে কয় না ডরে
ইসলামী দলিলের ভয়।
ও মন সাধ্যধর্ম যৌলআনা
অন্ধধর্ম ফল পাবা না,
জানো সেই ষৌলআনা ছেড়ো না।
দৈব্য এক খবর হলো
সাঁইর ভেদ সাঁই নিজে দিলো
জাহেরায় লেখা গেল
মেছের শাহ ফকিরে কয়।
8৩
দিন বৃথা যায় ডাকো তারে দয়াময়
দিনবন্ধু তার এক জীবনে
সবের জীবন চৌদ্দভুবন মিলে।
সে যে এক নিরঞ্জন জগত জোড়া
ও তার চারগুণে এক দেহ খাড়া
নেক করো নড়াচড়া
সে যে একলা অনেক রূপ ধরে আছে
অঙ্কুররূপ আর জীব আকারে আছে
সে ঘরে দেখো নয়ন মেলে
সে যে গুরুরূপে করবে গো দয়া ডাকো নিষ্ঠা হালে।
দেখো সর্বরূপ একজনার মেলে
কেহ বাঘ সিংহ কেউ গাভীর ছলে গাভীতে দুগ্ধ
মেছের শাহ তাই বলে,
তেমনি গুরুর চরণ করলে গো ভজন
আখেরের ধন মেলে।
৪৪
দিবানিশি থাকো মন ঐ ধ্যানে
দেখো যার প্রতি হয় গুরুর দয়া
সংসারে তাঁর বিপদ রবে কেন।
দেখো দিব্য জ্ঞানের জ্ঞানী যারা
খোদার কি রূপ জানে তারা
জানবে কেন ওহিকেরা
জ্ঞানের সন্ধান জ্ঞানী জানে।
দেখো মুর্শিদ জ্ঞান সঁপিলে যারে
তার মনের অন্ধকার গেল দূরে
জ্ঞান চোখে সে দেখলে তারে
চর্মচোক্ষে দেখবে কি সন্ধানে,
অধীন মেছের শাহ তাই কেন্দে
বলে বেঁধে তব মায়াজালে
সদা ডাকছি দয়াল দয়াল বলে
দৃষ্টি খোসাল দরবেশের চরণে।
৪৫
দিব্যজ্ঞানীর সাধ্য করো দেখবি মানুষ কোথায় রয়
প্রেম বিনে মানুষ ধরা যায়।
দেখো আছে মানুষ সর্বশক্তিময়
চার যুগেতে মানুষ নিত্যধামে রয়
সে যে প্রেমের গোলা করে খোলা গো
দেখো সে একলা প্রেমের কল চালায়।
প্রেমের মানুষ প্রেমানন্দে রয়।
আপনে পুরুষ আপনে নারী
চেনা বিষম দায়
সে আছে জীবের ঘরে ঘরে গো
সে প্রেম দিয়া মরা বাঁচায়।
সেই প্রেমের কথা অধীন মেছের কয়
প্রেমেতে জগতের সৃষ্টি, প্রেমেতে প্রলয়।
সে প্রেম করতে পারে প্রেমিক যারা গো
যদি সেই প্রেমের গুরু রাজি হয়।
৪৬
দুনিয়ার নিচে মুর্শিদ না ধরলো যারা
আখেরাতে শয়তানের উন্নত হবে তারা,
কিতাবেতে লিখেছে এ মত বয়ান
যার মুর্শিদ নাই সে হিত শয়তান,
করো যদি খালি শরিয়ত
মারিফত বিহনে হবে বরবাদ।
শরিয়তে নমাজ-রোজা করো মন
মারিফতে সন্তোষ করো মুর্শিদের মন,
মুর্শিদ যার সখা আছে দুনিয়ার উপরে
বিপদ না থাকবে তার হাশর মাঝারে
মুর্শিদের পদে ভক্তি না হবে যার
আখেরে দোজখি হবে সেই দুরাচার
মেছের শাহ কয় কিসের কথা করো অবদান
এখানে ভজলে পাবা সেখানে আছান।
৪৭
দেখে বিধির নিলে ভাবি তাই
চৌদ্দ পোয়া দেহ বাতির কমি নাই
আঠারো হাজার বাতি বাতির মূলে রয়
তিনশত ষাট ডালে মূলে সব স্থানে জোড়া রয়
ষাট বাতি তার প্রমাণ রয়
তত্ত্বে তাই ঠিক জানা যায়
তার প্রধান ত্রিশগাছ রয় জানো তাই।
ত্রিশ সের প্রধান দশ বাতি জানা যায়
শুশুষ্ম, ইড়া, পিঙ্গিলা দশতে তিন হয়
তিন বাতি একের মূলে
চারগুণে বাতি জ্বলে
জ্যোতি তার চক্ষের তিলে দেখে তাই।
বিন্দু তেল অগ্নি পানিতে বাতির সৃষ্টি হয়
জালে মন পবনে যখন চেতন পায়
মেছের কয় মন যায় বাতির আলো চলে
আলো হয় রঙমহলে দেখতে পাই।
৪৮
দেখো আকার ছাড়া জীবের ভজন কি আছে
আদম সুফি আকার করে
আপনি তার জবান খুলেছে,
দেখো আদমে আদম গড়েছে,
ও তার কোনো কোনো রূপ মুর্শিদ হয়ে
নিজের ধর্ম নিজে সাধিতে আছে।
যেমন এক বাপের ঔরসে সৃষ্টি
একে অনেক রূপ ধরতে আছে,
মুর্শিদ যা সখা হয়েছে
হাশরে তার ভয় কি আছে
অধীন মেছের শাহ বলে দিন বয়ে যায়
এখন জীবের সময় আছে।
৪৯
দেখো যার নিজের দয়া হলো না
ভবে তারে কে করবে দয়া
খুঁজলে তার ঠিক মেলে না।
দেখো নিজের দয়া হলে পরে
সামান্যে তার ভাব জানে না।
দেখো সে যারে করবে মুক্তি
তার মনে হবে উক্তি,
ভক্তি করো গুরুর প্রতি
অন্যরূপে মন ভোলে না।
গুরুর দয়া হলো যারে
ভয় কিসের তার রোজহাশরে
মেছের কয় খোঁজো তারে
দয়া করবে সাঁই রব্বানা।
৫০
দেখো হাতের কাছে আছে মানুষ
সাধক যেজন জানতে পারে
চেনো মানুষ চিনলে সাধন হয়।
সে যে এক মানুষ অনন্তরূপ রয়
যেরূপে যেভাবে তারে সেই রূপে সে পায়
সে যে স্বরূপে রূপ, রূপে স্বরূপ গো
তারে দেখলে জীবের ধান্দা যায়।
দেখো আছে মানুষ মানুষের আশ্রয়ে
সপ্তমানে আছেন তিনি খুঁজিলে দেখা যায়,
কেহ জ্ঞানচক্ষে দেখবি তোরা গো
চর্মচোক্ষে দেখবি নয়।
তারে গুরু বলে ভোজলে বাঞ্ছা হয় সর্বক্ষণ
চৈতন্য মানুষ চেনা বিষম দায়।
অধীন মেছের শাহ বলে দেখবি তোরা গো
তবে কুল ছেড়ে এই কুলে আয়।
৫১
দেহ জাতে মিলায় মিলে তায়
চৌদ্দ পোয়া দেহকে কেউ
তালাপ কয় কেহ নদী কয় ॥
তালাপেতে পানি যেমন সরোবর রয়
দেহ তালাপের অনন্তগুণ পায়,
এক ঘাটে নোনা পানি ঘোলা হয়
মহামণি একঘাটে মিঠাপানি সবে খায় ॥
এক তালাপে নয়খানি ঘাট নয় তরফে রয়
একটি মীন আছে তাতে দোসর কেউ নয়
থাকে মীন গভীর জলে
সব ঘাটেতে রতি খেলে পুশিদায় ॥
দিবানিশি সেই তালাপে প্রেমের জোয়ার রয়
প্রেমের লীলা খেলা প্রেমের ঢেউ হয়
ঢেউয়ের সঙ্গে বায়ু পোৱা
সব ঘাটে চালায় ধারা
মেছের কয় জ্ঞানী যাঁরা বুঝতে পায় ॥
৫২
ধান্যকল গড়েছে ও নিরঞ্জন
আছে একটি কল চৌদ্দ ভুবন
দুই দিবানিশি চালায় মন পবনে।
দেখো ইঞ্জিল কলটি যে গড়লে
খোদে খোদা তারে জ্ঞান সঁপিল
তাইতে তার ওই কল জুটলো
নইলে কিবা জুটতো জীবের জ্ঞানে ॥
কল লড়বে বলে দমের সনে
কত কব্জা দিয়ে স্থানে চালাচ্ছে কল ড্রাইভার জনে
দম বাঁধিলে খাড়া রয় তখনে ॥
তার রগে বায়ু খেলে
সকল কব্জা নড়ে বায়ুর জোরে ॥
৫৩
ধর্ম কিসে হবে গো জীবের নিদ্রা ভাঙে না,
সত্য ধর্ম যা বুঝায় গুরু জীবে তা বোঝে না,
খালি আটকুঠরি আঠারো মোকাম কয়
অনন্তকুঠরি গো দেহে তা তো গুণে নয়
মানুষ সব মোকামে একজন চলে
জ্ঞানের পর তার ঠিকানা।
শুনি চার জেলা সব ওহিক ঠাঁই
দেহশব্দ একটি গো জেলা বেশি কম
আছে সব জেলাতে হাকিম একজন
তার খবর কেন করো না,
ও তার দশ মোকাম দশ ইন্দ্ৰ কয়
মিথ্যা বলো গো রিপু একেলা মনুরায়
অধীন মেছের বলে একের টিক্ দিলে হয় ভজনা।
৫৪
নবির ভেদ তাই বলতে পারে কে
সেই যে নবি মুরিদ হলো বাতনের ঘরে
আবদুল্লার ঘরে বলো
রসুলের জন্ম হলো
তোমরা কারে নবি বলো জগতের পরে।
রসুল নাম ধরেন তিনি
জিবরাইলের মুরিদ তিনি
নুরি পিয়ালা পেলেন তিনি হজরত রঙ ধরে
রসুল হয় শালের যখন
নবি প্রকাশ হলেন তখন
প্রমাণ তার আবদুল্লাহ কাজেল ছওয়ালে পুছিল যে।
মেছের সাঁই ফকিরের কথা
ভক্তি রেখো নবির পায়
ভজন-সাধন বৃথা যাবে নবি না চিনলে।
৫৫
নারী কি মন্দ জানা যায়
নারীর তত্ত্ব জেনে মত্ত হয়।
ও সে দিন বন্ধুর বান্ধা সুখের ঘর
ও যার নামটি মেয়ে জগতে প্রচার
জানো নয় চুঙ্গা বুদ্ধি তোমার
ও সেই এক চুঙ্গাতে সৃষ্টি পায়।
জানো নারীর পিরিত অমূল্য রতন
পিরিত ভাঙলে ভাঙানা থাকে কখন
ফকির মেছের শাহ কয় নারীর উদরে
মুখ জন্ম নিলে মানুষ বলো তারে
ও মন ভক্তি রেখো নারীর পদে
যদি মুক্তি পাবার বাঞ্ছা হয়।
নারী মন্দ কিসে বলো
যত পির পয়গম্বর অলি সবের ঘরে নারী ছিল।
দেখো সেই আদম ছবি হয়ে হাওয়া বিবি
দেখো তার রূপের খুবি আসকে মাতিল
যত আল্লার বান্দা নবির উম্মত নারীর গর্ভে এলো
দেখো সেই নারীর কারণ মুসা নবি কহতুরে একরূপ দেখিলো
দেখো আপনি নবি
জেনে নারীর খুবি
আনলো চৌদ্দ বিবি দলিলে লিখলো
নবি উম্মেহানী দিনেতে ছিল
সেদিন দয়া করে মেরাজে নিল।
ডুবে তাই দেখো দেখি মন আমার
সেও কেন নারীর কারণ আশকে মজিল
মেছের বলে দয়াল আমার উপায় কি তাই বলো
সেই মজনু ফরহাদ নারী ভোজে বেহেশতে গেল।
৫৬
নিরাকারে পড়বি নমাজ কোনখানে।
দেখো কোরানেতে খবর আছে
বরজক রাখিও সামনে
দেখো আলেপ হে আর মীম দালেতে
আহাম্মদ হলো জাতে
নফি করো মীম হরপেতে
দেখবি আকার নয়নে
নিরাকারে সেজদা করো
মিছা বেগার খেটে মরো
আহাদ চিনে সেজদা করো
কাবুল পড়বে তখনে ॥
আমান্তবিল্লাহ কোরানেতে
বলেছে আল্লা তাতে
আগে হবে আমায় চিনতে
নইলে নমাজ হবে কেনো ॥
অনুমানে সেজদা করা
অন্ধকার ঘরে সৰ্প ধরা
অয়েল দোজখে যাবি তোরা,
সূরা আরায়তাল্লাজির মানে ॥
জাতে সেফাত সেফাতে জাত
অধীন মেছের বলে
ঘুচাও ধোকা প্রেম আনন্দে কাল কাটাই ॥
৫৭
নেঘা করে দেখো মন বিধির লীলে
তার এক আত্মায় সব আত্মা এলো
বিভাগ হয়ে চলেছে তিলেতিলে।
দেখো যে মানুষে মানুষে হলো
আর কেউ ছিল না, একলা এলো
আদ্য মানুষ নিদ্রা আসে
কাজলকোঠার ঘরে বসে
ডাকলে ডাক শোনে না শেষে
স্বপ্ন দেখে থেকে রঙমহলে।
জিন্দা মানুষ মরে গেলে
মুরদা বলে দেয় গো ফেলে
মেছের শাহ তাই ভেবে বলে
তুমি কোনজন বুঝে দেখো বলে।
৫৮
পড়ো নমাজ আপনার সন্ধান জেনে।
আগে আপনাকে না চিনলে
তার নমাজ হবে কেনে ॥
নমাজ পড়তে দাঁড়াও যখন
খোদা রয় সামনে তখন
সেজদা করো করে যতনে
ইমান ঠিক করে মনে
আবার কেন তারে ফেলে
সোবহানা-রব্বেল আজিম বলে
নজর দাও বুড়ি আঙুলে
তখন খোদা কোনখানে ॥
মেছের কয় মনে ব্যথা
বলি তার ব্যথিত কোথা
এ ব্যথা জানে নিরঞ্জন,
ময়নদ্দিন, মহিউদ্দিন, আলফে ছানি, বাহাউদ্দিন
এই চার পির স্বাধীন বেশি বলো কি কারণ ॥
৫৯
পতিতের বন্ধু বেঁধে বলে তোমায়
হলে আমি অতি পতিত ভক্ত
তোমার উদ্ধার আমায়।
যদি অপরাধ থাকে ক্ষমা করো
সাঁই আর কারে বলি তোমারে দোহাই,
ভক্তের বাসনা পূর্ণ করো তাই,
করতে পারো তোমার দেরি কিসের হয়।
জানতে পাই পরম পিতা হও তুমি
তোমার অতি আদরের আমি
সুপথ ছেড়ে যদি কুপথে ভ্ৰমি
নিজ গুণে তুমি সুপথ দাও আমায় ॥
তুমি পরম পিতা হয়ে মম হও পতি
তুমি বিনে আমার অন্য নাই মতি,
প্রাণনাথ তোমার দাসের প্রতি দয়া করো
তোমার অধীন মেছের কয়।
৬০
পহেলা একেলা নিরঞ্জন এলো
চার গুণ তার অঙ্গে ছিলে না
আগুন পানি মাটি বাতাস
চারজন তার সাথে এলো।
হলো চার তরিক জাহির
তাইতে চারজনা তার পির
একের তরিকে একেক গুরু
কিতাবে জিকির।
ও তার চার সমাতে চারজন ওলি হয়ে
চার কিতাব পেলো।
চারটি পেয়ালা জানা যায়
ও সে কথা মিথ্যা নয়
ও তার চার সোমাতে চার পেয়ালা
দুনিয়ায় পাঠায়
এলো আগে পেয়ালা শেষে
পির হয়ে পেয়ালা সাধিল।
মেছের শাহ তাই কয়
পাঁচটি পেয়ালা দুনিয়ায়
চারটি জাহির হলো আর একটি কোথায়
ও সেই বাকিটি কি তার নাম খুলে বলো।
৬১
পহেলা মাটি রূপে জানিবে আল্লার
দ্বিতীয়াতে নুর পানি তার ভিতর।
তৃতীয়াতে তেজ রূপ অগ্নি যারে কয়
চতুর্থে সে বায়ুবেগে উর্ধ্বমুখে ধায়।
চার হতে চার গুণ হলো পূরণ
ব্রহ্মাণ্ডের আকারে আকার পায় সর্বজন।
ব্রহ্মাণ্ডের চার চিজ দেহ মাঝে তাই
ইহা বিনে অন্য চিজ কোনো দেহে নাই।
মেছের শাহ ফকিরের কথা অমৃতভাণ্ডার
ভক্তিজ্ঞানে শুনলে কার্যসিদ্ধি হবে তার।
৬২
পৃথিবীতে খাদ্য যা পুরুষ খায়
তাতে পুরুষের দেহে রসের উদয়
রস হতে অস্থি জন্মে ঠিন যেন মনে
অস্থি হতে মাংস জন্মে জানো সর্বজন।
মাংস হতে রক্ত জন্মে শরীর মাজার
রক্ত হতে জন্মে মণি জানো সমাচার।
মণি হতে অঙ্কুর হয় ঠিক জেনে মনে
মাটি না পেলে অঙ্কুর গজাবে কেমনে।
এক হাতে দুই জাতি জন্মে পরিপাটি
পুরুষের দেহে অঙ্কুর হয়, মেয়েদের দেহে মাটি
এই রূপে চলছে সৃষ্টির কারণ
মেছের শাহ কয় বুঝে দেখো যত জ্ঞানীজন।
৬৩
প্রেম ডুবারু যেমন সেই জানে
ও সে প্রেমেতে হয়ে মত্ত আছে গোপনে
প্রেমেতে হয় প্রেমের খেলা প্রেম প্রেম বলে
প্রেমেতে সাধনসিদ্ধি বিধাতার নিলে
সেই প্রেমের এমনি ধারা জানে সব রসিক যারা
সে প্রেমে মজো গে তোরা নির্জনে।
ও মন যাবি যদি প্রেমের ঘরে প্রেমের মানুষ ধরো
কোথায় তার তালা চাবি আগে তার সন্ধান করো।
প্রেমে মজিলে পরে ভবভয় যাবে দূরে
খুঁজে লও গুরুর দ্বারে ফল চিনে।
প্রেমের মন্দিরে মানুষ থাকে পুসিদার
প্রেম রসের চাবি পেলে অনায়াসে খোলা যায়
মেছের কয় এমনি জ্বালা কঠিন সেই মানুষ খোলা
সখা যার বরিতালা সেই চেনে।
৬৪
বাইরে খুঁজলে কেন মন পাবি তারে
সে যে অধরনাম জগতে দিয়া লুকিয়েছে নিগুম ঘরে।
বাইরের জগৎ সৃষ্টি করে আছে সে বিরাজের পরে
এবার শিক্ষাগুরু আয়াত করে তালাশ করো দ্বিদল ঘুরে।
মানুষ মানুষ বলো যারে
মানুষ আছে রূপের ঘরে
এবার আত্মতত্ত্ব ঠিক করে
ধরো তারে নিহার করে।
মেছের শাহ ফকিরের কথা
ভেদ না জানলে ভজন বৃথা
সহজ মানুষ নত্তা দ্বিদলেতে বিরাজ করে।
৬৫
বেলা গেল সময় নাই রে
আর ভবনদী পাড়ি ধরো
এ মন গুরু যার কাণ্ডারি আছে
ঘাটে ভাবনা কি তার।
ভব নদীর তুফান ভারী
ভয় করো না মন বেপারী
গুরু রেখো নৌকাতে কাণ্ডারি
মন তুই করণে গুরুর নামের ধ্বনি
নৌকা আপনে হবে পার।
ভজো রে মন গুরুপদে
কি করবে তার ঘোর বিপদে
আনন্দে হয়ে যাবে পার।
সে যে টাকা লয় না, পয়সা লয় না
মাত্র ভক্তি করো তার
অধীনে মেছের কেন্দে বলে
খোসলে চান্দের চরণ তলে,
অকুল আমায় করো পার
হলেম আমি অধীন ভক্তি বিহীন
ভজন জানবে তোমার।
৬৬
ভজন হবে যাতে জানো তাই
অনুমানে সাধলে সাধন সিদ্ধি নাই,
রোজা নমাজ হজ যাকাত মানা কিছু নাই,
মুর্শিদ ভজনা বিনে জীবের আর গতি নাই।
মুর্শিদ হয় জ্ঞানের দাতা
জ্ঞান বিনে ভজন বৃথা
কেন ঘুরো যথাতথা
ভজন গুরুর ভজন চাই।
ধর্মজ্ঞানী গুরু হলে জ্ঞানের জ্ঞান বাড়ায়,
নদীর জল বর্ষার জলে যেমন ভালো হয়।
তাই জেনে মুর্শিদের চরণ
যথারূপ করো ভজন
না ভজলে বৃথা জীবন
মুর্শিদ ছাড়া জীবের মুক্তি নাই।
গুরু না হলে কাণ্ডারি কে করবে পার
একা কানতে হবে ফিরে কে চাবে আর
দিন থাকতে না সাধিলে কি হবে সময় গেলে
মেছের কয় অন্তিমকালে উপায় নাই
জীবের উপায় নাই।
৬৭
ভক্তি না হলে মওলার দিদার কি মেলে
আছে মানুষরূপে দিন দয়াময় তারে চিনো খেয়ালে,
দেখো ইব্রাহিম পয়গম্বর ছিল
মওলা তার মন বুঝলো
আপন পুত্রকে কুরবানী দিলো
মওলার মন পাবে বলে ॥
যেদিন খলিলের মেহেরবানী হলো
খোদা তথায় এসেছিল
কোন পির-পয়গম্বর না হলো
এলো ফকিরের ছলে ॥
জানো ফকিরকে দেখলে যেমন
মওলাকে দেখলে এমন
আর আলেমের পেলে দরশন
যেমন দেখলে রসুল
জানো হরদমে যে করে জিকির
তাকে জানবে ফকির
মওলা তার কালেবে হাজির
মেছের শাহ তাই বলে ॥
৬৮
ভক্তি নাই যার গুরু পদে
জীবনের কাজ কি তার
ও সেই ভবের হাটে পারের কালে
কে তোর করবে পার।
সেই ভবনদীর তুফান ভারী
যদি পারো হতে চাও মন বেপারী
গুরু করো সার
ও সেই গুরু বিনে ভবনদীর
কূলে যাওয়া হবে ভার।
ঘাটে আপনি হও ভবতরি
ও সে শ্রীগুরু রেখো কাণ্ডারি
অবোধ মন আমার
ও সে বাহাত্তর বছরের পাড়ি
নিমিষে করবে পার
অধীন মেছের কেন্দে বলে
ও সেই গুরুর কৃপা না হলে
কেমনে হবি পার
শেষে একা বসে কানতে হবে
ফিরে কেউ চাবে না আর।
৬৯
মন কি তারে মনে করো না
এ ঘরকড়ি সুখের শয্যা
দিলো তোমায় যে জনা
ও মন সুদিন গেল, কুদিন এলো
আজ কাল বলে দিন ফুরালো
সরকারি শমন এলো দেখো না ॥
দিন থাকতে ডাকো তারে
সে যদি দয়া করে ভব ভয় যাবে দূরে
কালশমনে ছুঁবে না ॥
ও মন ধন পেয়ে কি ধন হলে
কি দিলো ধন কোথায় পেলে
অন্তিম যাবে ফেলে জানো না ॥
স্বপুত্র পরিবারে খাবে ধন মজা মেরে
একেলা যাবে গোরে
সাথে কেউ যাবে না
ও মন কারে বলো আমার আমার
মন তুমি কার কেবা তোমার
সকল সরকারি খামার দেখো না ॥
তাই জেনে মুর্শিদ ধরে
সর্বক্ষণ ডাকো তারে
মেছের কয় তবে তারে
ফানা দিবে রব্বানা ॥
৭০
মন কি নাড়ির খবর জানো নাই
আছে নাড়িতে বেষ্টিত দেহশাস্ত্রে পাই
আঠারো হাজার নাড়ি দেহের মূলে রয়
তিনশত দশ ডালে-মূলে যে তার মর্ম পায়।
ষাট নাড়ি তার প্রমাণ রয়
বেদে তাই কি জানা যায়
তার প্রধান ত্রিশ গাছ রয় জানো তাই।
ত্রিশের প্রধান পঞ্চদশ জানা যায়
পঞ্চদশের মূলে পঞ্চগাছ প্রধান হয়
পঞ্চগাছ তিনের মূলে ইড়া পিঙ্গলা বলে
সুছম্মা মধ্যস্থলে দেখতে পাই।
যদ্যপি সকল নাড়ি শরীরেতে রয়
ধাতু কাহিনিরূপে শাস্ত্রে তাই জানা যায়
ভেবে তাই মেছের বলে নয়নে চন্দ্র মেলে
সূর্য রয় পিত্তস্থলের পূর্ব ঠাঁই।
৭১
মন কি মূলের খবর জানো না,
সাধন-ভজন হবে কিসে অহংকারী গেল না ॥
জানো নিরঞ্জনের যে নুর ছিল,
সেই নুরে এক ময়ূর হলো,
তার নুর অঙ্কুর বোল জানো না,
সেই অঙ্কুর ঝরে পড়লো
তনগু সৃষ্টি পেলো,
এক নুরে সকল হলো
কুলবাত্তি কয় জনা ॥
দেখো আবহায়য়াতে যে খাক ছিল
তাইতে যে নুর জমে ছিল
সেই খাকে আদম হলো জানো না,
সাঁইর জীবন রূহু এলো,
সেই নুরে অঙ্কুর পেল
তাইতে এক মেয়ে হলো,
হাওয়া বিবি যে জনা।
সেই হাওয়া আদম মিলন হলো,
মেয়ে ছেলে সৃষ্টি পেলো,
তাইতে তার আওলাদ হলো দেখো না,
কেউ কেউ পির গুরু হলো,
সাঁইর নাম সাঁই নিজে দিলো,
নিজে বুঝে বুঝালো,
মেছের কয় তা দেখো না।।
৭২
মন তোর আদ্য মানুষ সাধ্য করো
সব জেলার করো মণিপুরে আদায় করো ॥
চার জেলা আর বারখানা দেহ মাঝে কয়
জেলা কিংবা থানা বলো এক বিনে দুই নয়।
এক জীবন দেহেতে রয়
একলা সর্ব কার্য চালায়
পঞ্চতে কেউ চৌকিদার নয় একজন ধরো ॥
ষড়দল কমলের মাঝে প্রেমের বাগান কয়
জীবন সেথায় বাগের মালি সহস্র দলে রয়,
বাগানে জোয়ার এলে চর পড়ে চতুৰ্দ্দলে
পুরুষে রতি মেলে অঙ্কুর তার
দণ্ডেতে যে পিপুল বলে ভাবে জানা যায়
অবোধ বালক যেমন তালেরে বেল কয়
ভেবে তাই মেছের বলে বায়ুর কি খণ্ড মেলে
অনন্ত বেগ চলে ধারা তার ॥
৭৩
মন তোর আপন দেহের খবর জানো
আছে নয় মোকামে একজন মুন্দি জানো তার সন্ধান।
ছেরের নিচে চারটি মোকাম স্পষ্ট জানা যায়
আজরাইল জিবরাইল মেকাইল আর ইসরাফিল কয়
কাঙ্গুরা তার পরে রেখেছে যত্ন করে
চার তে আছে পুরে সোবহান।
খোদের অঙ্গ ছিল নুর জানো সর্বজন
এক নুর চার হিস্যা হয়ে সংসারে আগমন
ক্ষিতি, অব, আগুন, বাতাস এই চারটি নাম প্ৰকাশ
জানো তাই মুর্শিদের পাস হতো জ্ঞান।
লাহুত নাছুত মালকুত জবরুত হাউত মোকাম কয়
এই পাছের দর মিয়ানে সুলতানি মোকাম কয়
মেছের কয় জিকির করো
মুর্শিদের জাত ধরো
তবে তারে দেখতে পাবে বর্তমান।
৭৪
মন তোর আপন দেহের খবর নাই
যার হাতের সে চৌদ্দ পোয়া দেখতে পাই ॥
লাহুত নাসুত মলকুত জোবরুত দেহ মাঝে কয়
একটি দেহের নয়টি মোকাম এগারো গুণ পায়,
এক মানুষ দেহ বিচে
অন্যজন বলো মিছে,
গোপনে গুরুর কাছে জানো তাই ॥
চৌদ্দ পোয়া দেহের মাঝে
একলা মালেক সাঁই
শূন্যচোখে দেখতে পায়;
নাকেতে নিঃশ্বাস ফেলে
বদলে কথা বলে,
নফসতে রাতি খেলে দেখো তাই ॥
আরে আর খাকেতে হলো এ দেহের গঠন
আগুন বাতাসের জোরে পেলো চেতন,
মেছের কয় এ চার গুণে
এক জীবন ত্রিভুবন
মিছা আর ঘুরো কেন ভাবো তাই ॥
৭৫
মন তোর মণিপুরের খবর জানো
যেখানে খুঁজলে পাবে মানুষের সন্ধান।
মণিপুরে আছে মানুষ অঙ্কুরের আশ্রয়
সেখানে সাধনসিদ্ধি যে তার মর্ম পায়।
গুরুপ্রেমে সুধা পেলে
অঙ্কুরে মানুষ মেলে
রেখেছে যার কলাপে
আপে সোবহান, আলেপ সোবহান।
আসকের হেল্লালে মানুষ চলে সর্বদায়
মুর্শিদের আসক হলে সহজে প্রেম হয়,
সহজের প্রেমিক যারা
মূলের ভেদ জানে তারা
দেখলো নুর সেঁতারা যারা ভাগ্যবান।
মহাশক্তি সরোবরে ফাঁদ পাতলে ধরা যায়
মানুষ সেই পথে চলে যখন তার সময় হয়,
নহিংসা মানুষ যারা সেই পথে আছে তারা
মেছের কয় পেলে ধরা বর্তমান মানুষ বর্তমান।
৭৬
মন ভজনের কারণ জানো না
ডুবে রও মুর্শিদের প্রেমে
কুলের গৌরব করো না।
দেখো পুরুষ প্রকৃতি মহাতত্ত্ব
তিনেতে হয় একটি অর্থ
তিন তারে দড়ার মতো জানো না।
পয়লা মেলে দুই তার
তার মধ্যে বসায় একতার
দুই তারে মিল হয় না যার
সেখানে তার বসে না।
যেমন বনের পাখি ফাঁকি দিয়ে
পাখি ধরে পাখি দিয়ে
তেমনি দুই এক মন হয় ধরো না।
জেনে আত্মতত্ত্ব
হও তার প্রেমে মত্ত
ডাকো তারে ডাকার মতো
সামনের ভয় রবে না।
ও মন যে নামে ডাকবে তারে
জানিয়ে মুর্শিদের দ্বারে
সর্বক্ষণ এশকে ভরে থাকো না।
তার সাধনসিদ্ধি হবে
এ দেহের বিপদ যাবে
মণিপুর খবর হবে
মেছের কয় তা জানো না।
৭৭
মন যদি ধরবি তারে প্রেম রসিকের সঙ্গ করো
মিছামিছি হাতরে ফেরো প্রেম বিনে তারে পাওয়া ভার।
ও সেই প্রেমের গোলা করো খোলা
দূরে যাবে ভব জ্বালা
গলে পর চরণমালা দেখবি আজব নিলে তার
সেই প্রেমের মর্ম প্রেমিক জানে
অন্য সে ভেদ জানবে কেনে
প্রেমের ধারা নয়ন কোণে দুই অঙ্গে এক অঙ্গ যার
সহজ প্রেমের এমনি ধারা হাত হবে জ্যন্তমরা
মেছের কয় প্রেম করবি তোরা প্রেমের গুরু রাজি কর।
৭৮
মাটিরূপ সাকার তিনি নুর যেন পানি
সৃষ্টি স্থিতি যত কিছু নুর হতে জানি।
পানি রূপে আছে নুর ক্ষিতির ভিতরে
রসরূপে তরল হয়ে সর্বঘাটে ফেরে।
বাংলায় যারে বীর্য বলে আরবিতে নুর
এসব গোপন কথা জানিও মঞ্জুর।
এক নুর জমে বীজের অঙ্কুর হয়
নুর পিয়া সর্বজীবী জীবন বাড়ায়।
জীব-জন্তু বৃক্ষাদি এক নুর হলো
কেহ ভালো কেহ মন্দ না বুঝে বলো,
পানি পঁচে মশা-মাছি জন্ম দেখো সর্বজন
আমের মধ্যে কিড়া সেও নুরেতে সৃজন।
শিমুল গাছের শিমুল পোকা নুরে সৃষ্টি হয়।
ডুমুর গাছে ডুমুর ফুল দেখো সর্বজন
চরচা পিঁপড়া তার মধ্যে নুরেতে স্থাপন।
মেছের শাহ ফকিরের কথা বুঝে দেখো মনে
নুর বিনে সৃষ্টি স্থিতি নাই ত্রিভুবনে।
৭৯
মানুষের চরণ ভজন করো মন
একিন যেনো মনে মুর্শিদ রাজি হলে
রাজি নিরঞ্জন।
মানুষ রূপে করে আদম রে সৃজন
রুহু দিলো তাকে করতে চেতন,
অন্ধকার দেখে রুহু ফিরল তখন,
খোদার নিকটে দিলো দরশন।
খোদা রুহুকে পুছিল তখন
কালের হতে তুমি ফের কি কারণ
রুহু বলে সাঁই করি নিবেদন
তোমায় দেখি ফিরি এ কারণ।
রুহুকে হুকুম করে নিরঞ্জন
খোদে হলেম আমি মানুষের পূরণ
সেথা হতে শীঘ্র করো হে গমন,
কালবে পাবা আমার দরশন।
খোদা বলে আমি আছি মানুষে
আমরা মিথ্যা জানি কিসে
মেছের বলে থাকো চরণে মিশে
মানুষ ভজনে হবে খোদারই ভজন।
৮০
মূল ছাড়া আছে মানুষ বেদ বিধির উপরে
তারে কি ধরতে পারে।
স্কুলে নাই মূলে নাই মানুষ আছে ঘরে ঘরে
যদি করবি সেই মানুষের সন্ধান
খোঁজ গুরুর দ্বারে।
আলেক ধামে আছে মানুষ
ব্যক্ত এই সংসারে
আছে মূলছাড়া মূলেধর মানুষ
বেরাজের উপরে।
যেজন জেনে তত্ত্ব হয় মত্ত
চিন্তা করো তারে,
সে যে ভক্ত বাঞ্ছা পূর্ণ করে
আপনি থাকে দূরে।
মেছের শাহ কয় শোনো রে তাহের
সদাই বলি তোরে
এবার পাবি সেই মানুষের সন্ধান
যদি গুরু দয়া করে।
৮১
মূলে না পানি যুজাতে সেফাত
কোথায় খোদা কোথায় দয়াল
খোদা চিনবে কেমনে ॥
আসল চিনে ডাকলে খোদা
খোদে খোদা শীতল করে
না দেখলে মরি প্রাণে ॥
দয়াল তুমি আমার প্রাণের পতি
দয়াল তুমি বিনে নাই আমার গতি এ ত্রিভুবনে।
তুমি দয়া করে এ দাসেরে
ঠাঁই দাও তোমার চরণে ॥
আমি একা কি নিয়ে ঘরে থাকি
তোমায় শুইলে স্বপনে দেখি রে
জাগলে দেখি না।
তুমি একবার ফিরে চাও হে নাথ
বন্ধু নাই তোমা বিনে।।
আমায় দয়া না করলে তুমি
দয়াল কার ছায়ায় দাঁড়াব আমি
ভাবছি তাই মনে।
অধীন মেছের বলে দয়াল
আমারে দেখা দাও বর্তমানে ॥
৮২
মুক্তি কেন পাবে গো জীবন ভক্তি বিহনে
সে যেমন অমূল্যধন গুরু চরণ ভজন করো যতনে।
দেখো পাপীকে তরাতে দয়াময়
মুর্শিদরূপ ধরে ভজন জীবকে জানাই,
কত পাপী-তাপী উদ্ধারিলো গুরুর চরণ ভজনে।
ও জীব এসেছো এই ভবের বাজারে
মায়ারসে মন মজাইয়ে চিনলে না তারে
সে মুর্শিদরূপে দিয়েছেন শিক্ষা আপন ভোজে সর্বজনে।
তাঁরে মুর্শিদ রূপে করলি যতন
গুরুর দয়া হলে গো দয়া করবে নিরঞ্জন
অধীন মেছের কয় তার করণ করো
কূলের ভয় করো কেনে।
৮৩
মুর্শিদ বিনে জীবের গতি কি আছে
আউয়ালেতে আল্লা মুর্শিদ
দলিলে তার প্রমাণ আছে
আপনি সাঁই মুর্শিদ হয়ে
জীবকে শিক্ষা দিতেছেন।
তিনি আপনা ভজন বিতরণ করে
জীব তরাবার ফাঁদ পেতেছেন।
দেখো ঘরে ঘরে ফিরছেন মুর্শিদ
খুঁজলে কি অভাব আছে,
যার কথা শুনে ঘোচে মনের অন্ধকার
তত্ত্ব জানতে হয় তার কাছে,
দেখো মানুষ গুরু কল্পতরু
মনে যার একিন পড়েছে
অধীন মেছের শাহ বলে তার কিসের ভয়
দোজখ তার হারাম হয়েছে।
৮৪
মোমেল্লার জন্ম হলো আদম হাওয়াতে
মিথ্যা নয় সেই কথা সত্য জানবে দেলেতে।
আদম নবি খোদে খোদারে
তিনজন মিলন একসাথে
এক ফাতে আল্লার বা রাম নবিজি দেলেতে।
তেজ নুরেতে আগুন পয়দা রে
ওঠা তিন আহন মনেতে
হলো পানির জন্ম আগুনের জোরেতে।
মেছের সাঁই ফকির বলেরে জীবের ভাবনা কি জগতে
ওরে নবি আর খোদে খোদা
আছে সাথে সাথে।
৮৫
যখনেতে পাবে মুর্শিদের দর্শন
উঠিয়ে হবে খাঁড়া আদাব কারণ
ভক্তের আলোয়ে মুর্শিদ হলে উপস্থিত
দেখে থাকবে মনে অতি আনন্দিত
মনে মনে এইরূপ করবে ধারণ
ওই রূপ পাবে মাবুদের দর্শন।
সম্মানের সাথে দিবে পদ ধোলাতে
বসবার দিবে অতি মন যোগ্য স্থানেতে,
আসনে যেয়ে মুর্শিদ বসবে যখন
ভক্তি দিয়ে গুরুর পদ করবে চুম্বন
গুরুর মুখের পদ্ম যে জন করবে ধারণ
যে বাক্য কহেন তা করবে গ্রহণ
মুখ হতে কহেন যা করবে শ্রবণ
ধর্ম জেনে সব কথা রাখবে স্মরণ
যথাশক্তি রূপে করো মুর্শিদের যতন
মুর্শিদ রাজি হলে হবে নিরঞ্জন,
রূপ জীবন ধন গুরু পদে করো সমর্পণ।
যাতে সন্তোষ থাকে মুর্শিদের মন।
নিজে যদি দয়া করো মুর্শিদের তরে
মুর্শিদ করবে দয়া জানবে অন্তরে।
মুর্শিদ যারে করবে দয়া ভাবনা কি তার
মেছের শাহ কয় আল্লা তারে করবে উদ্ধার।
৮৬
যা লিখেছে খোদা তকদিরের লিখন
তার ভাগ্যে সেই ফল ফলবে
ও তা না যাবে খণ্ডন।
জানো দোজখি হবে যেই জন
সদা কুসঙ্গে তায় করাবে ভ্রমণ।
সুজনার সঙ্গে গেলে
ও তারে ফিরে আসে মন।
যারে জান্নাতি করাবে নিরঞ্জন
সদা গুরুর প্রেমে রাজি রয় তার মন।
সঙ্গ গুণে রঙ্গ পেলে
ও তার দেহ হয় চেতন।
ফকির মেছের শাহ কয় সঙ্গ গুণে ধন
সহজ জ্ঞানী যারা, জানবে কারণ
গুরুর সঙ্গ লয়ে করে ওই চরণ ভজন।
৮৭
যে দুঃখ আমার অন্তরে গো
ও সে দুঃখ বলবো কারে
দয়াল তোর রূপেতে নয়ন দিয়ে
মন থাকে না ঘরে।
আমি যেদিকে চাই নয়ন মেলে
সেই দিকে দেখি তোরে গো
আমি জীবন যৌবন দেহ প্রাণ
সব দিয়েছি তোরে
দয়াল আর কি আছে কি ধন দিব
তাই বলো আমারে গো,
অধীন মেছের কয় তোর প্রেমের হার পরে গলের পরে
দয়াল কামিনী সেজে আছে
পাব তোরে গো।।
৮৮
যে প্রেমের ভাব জেনেছে
সেই প্রেমের সঙ্গ ধরো
সেই প্রেমের ভাব জেনেছে,
যদি খুলতে চাও প্রেমের কুঠরি
প্রেমরসের এক দাবি করো।
ও সেই প্রেমের ঘরের কপাট আঁটা
খুলতে গেলে বিষম লেঠা
সামান্য তার ভাব জানে না পাষাণ দেহ যার
ও সেই রসিক জানে রসের মর্ম অরসিকের বোঝা ভার।
ও সেই সহজ প্রেমের ভাব যে জানে কি করবে তার কাল
সমানে ভক্তির উদয় তার মনে ভাবনা কি আর
ও সে করেছে গুরু নামের ধ্বনি রূপ রেখেছে নয়নের তার।
যদি খুলতে চাও সেই প্রেমের তালা
গলে পরো গে প্রেমের মালা
ঘুচে যাবে ভবজ্বালা দয়া হলে তার
ও তাই অধীন মেছের ভেবে বলে দিন থাকতে সন্ধান করো।
৮৯
যেজন বিচারপতি হয় জ্ঞানে
সে পারে করতে বিচার
মূলের সন্ধান জেনে।
ভণ্ডজ্ঞানী রাজা হলে সে কি বিচার করতে জানে
পাপ-পুণ্যির মানে।
খালাসকে ফাঁস, ফাঁসকে খালাস
দেখো ধর্ম অবতার হলে
ধর্মের জ্যোতি রয় তার মনে
দয়ার ধর্ম হিংসাতে পাপ
পশুতে কি জানে।
মেছের শাহ ফকিরে বলে
সত্যের আইন ছিল যার জ্ঞানে
ত্রিজগতের রাজা তিনি প্রজা পালন জানে।
১০
যেজন মহাজ্ঞানী হয়
জানতে পায় সে আত্মতত্ত্ব কানায় জানে নয়।
দেহনদী চৌদ্দ পোয়া হয়
তার নয় দিগেতে নয়টি ধারা খুঁজলে পাওয়া যায়।
তাতে চলেফেরে মন মনুরায় ডাকলে কথা কয়।
এই দেহনদীর তুফান যখন বয়
তার নিষ্ঠা রাতি মহব্বত গভীরে লুকায়
ও তার সব নদীতে রয় সরোবর
ঘামলে চেনা যায়।
দেখো মণিপুরে প্রেমের জোয়ার বয়
নিরাক পেলে উজান চলে মহব্বত জোগায়
অধীন মেছের বলে সেই মহব্বত সবের প্রতি রয়।
৯১
যেজনা আপনা খবর পায় না,
মিথ্যা তার ফকিরি করা
শুধু জ্ঞানে খোদা মেলে না ॥
তাঁর আত্মায় সব আত্মা পেলো,
জ্ঞান চোক্ষে কেউ দেখলো
দেখবে কেনে অজ্ঞান যে জনা ॥
না বুঝে আত্মা বলো,
দেহে অন্য মানুষ আর কে এলো
পর আত্মায় আত্মার ছিল
মণিপুর তার বারামখানা ॥
বিনা তেলে বাতি জ্বলে
যত জ্ঞান শূন্য ফকিরে বলে
চার বিনে এক কি মেলে
মেছের কয় চার গুণ একজনা ॥
৯২
রহিম রহমান নামটি বলিয়াছে সাঁই
তুমি পাতকীকে তরাইতে পারো কোরানে তার প্রমাণ পাই
তুমি নিজ গুণে তরাইলে সাঁই
কে আছে পতিতের বন্ধু পাব কার ঠাঁই।
আমি জন্মাবধি অপরাধী তোমার কাছে মুক্তি চাই,
তুমি রহমান রহিম নামটি ধরিলে
পাতকী তরাবে বলে দলিলে ভেজিলে,
তুমি জীবের জীবন পতিতপাবন
ভক্তের বাঞ্ছা পুরাও সাঁই;
তুমি অনন্তরূপে সৃষ্টি করে সাঁই
অরূপে খাদ্য দিয়ে পালিতেছ সাঁই
অধীন মেছের শাহ কয় ও দয়াময়
মুক্তি করো চরণ পাই।
১৩
শরিয়ত কারে বলে জানো না
যদি করতে চাও খোদার ভজন
দেখো ভেদ না জেনে পড়লে নমাজ
মিলবে না সেই নিরঞ্জন।
সত্যকে কয় শরিয়ত
নবির তরিক তরিকত
হকিকত এক পিরের বচন
মারিফত এবাদত করা হতে হয় জ্যান্তমরা
করতে কি পারবি তোরা সে বড়ো কঠিন ধন।
দলিলে জানা গেল
এক নবি সৃষ্টি পেলো
একিন গাছ ছিল যখন
গাছে গাছে ময়ূর হয়ে
পুরুষের গুণ পাইয়ে
মেয়ের আকার দেখিয়ে
ঘাম হলো সৃষ্টির কারণ।
সেই ঘামে সৃষ্টি স্থিতি
কেউ নারী কেউ তার পতি
দুই রূপে সৃষ্টি ত্রিভুবন
চারজন পির ভবে এলো
চার তরিক প্রকাশ পেল
ষৌল পির কেন বলো
মেছের কয় মূল মহাজন।
৯৪
সন্ধান যেন করো যত ইবাদত বন্দেগি করো
মুর্শিদ বিনে হবে না।
শেখ ফরিদ আউলিয়া ছিল
ছত্রিশ সাল জঙ্গলে রইলো
কিসে উঠলো দেখো না।
ক্ষুধায় না খাদ্য খেলো
ওই আল্লার নাম জপিল
তবু না হাসেল হলো
মনের অন্ধকার গেলো না।
চব্বিশ সাল মুর্শিদের ধারে
হাজির থেকে খেতমত করে
হাসেল হবে কিসে দেখো না।
একিন জানিও মনে
মুর্শিদ খেদমত বিনে
হাসেল হবে না জেনে
শেখ ফরিদের হলো না।
আল্লার নাম অমূল্য রতন
দিবানিশি করো যতন
আর করো গুরুর ভজন ছেড়ো না
ইবাদত হাসেল হবে
এই মনের অন্ধকার যাবে
আখেরে জান্নাত পাবে
মেছের শাহর ধারণা।
৯৫
সাঁই গড়েছে তরি সন্ধানে
আগুন পানি মাটি বাতাস চার গুণে।
চৌদ্দ পোয়া পত্তন দাঁড়া বেশি কম নাই
আবখাকের তক্তাগড়া জ্ঞান চক্ষে দেখো তাই
অগ্নি আর বায়ুর বলে
চৌদিকে সমান চলে
চালাচ্ছে শক্তি বলে একজনে।
কর্মান্তিফল চণ্ডি পটে লেখা দেখতে পাই,
দোসারি বত্রিশ গুরা হিসেবে মেলে তাই,
বাদাম তার দশম দলে
হাওয়াতে হেলে ধুলে
জলের খোপ ফেপসার মূলে লও দিনে।
সপ্তদ্বারে সেঁচে পানি ডুবে দেখো তাই
মাল বুঝায় মণিপুরে মহাজন মনাই,
মেছের কয় মাল ফুরালে
মহাজন চলে
এই তরি রবে মিলে চার গুণে।
৯৬
সে যে চিন্ময় চৈতন্য স্বরূপ
চার গুণে এক দেহ তার
আদ্য মানুষ সাধ্য করো যার।
ক্ষিতি অপ তেজ বায়ুর জোরে
নিত্যলীলা ঘরে ঘরে
চার দিয়া চার পূরণ করে
চার গুণে হয় এক আকার।
ঠিক যেন সে সর্বশক্তি জীবের
জীবন ভক্তের মুক্তি,
যত দেখো প্রতিমূর্তি
একজনার এইসব আকার।
অধীন মেছের চান্দের কথা
ওহিকে তা জানবে কোথা
এক মানুষ জগতের দাতা
শরিক নাই সে একেশ্বর।
৯৭
সে যে নুর নবিজি জগত পতি
প্রেম তার গিলটি আটা
প্রেম করতে পারবি কি তোরা
হলো নুর হতে সেই প্রেমের আলাপন
চলছে প্রেম ঘরে ঘরে নুরি মহাজন
হলো নুরের গতি প্রেমপ্রীতি
মানুষ দুই দেহে একজন পুরা
হলো প্রেম হতে সেই নুরের বরিষণ
মণিপুরে বিজলী খেলে মানুষের কারণ
সে নুর সর্বশক্তির মন চোরা
অধীন মেছের বলে প্রেম না জানে যে জন
গন্ধবিহীন পুষ্প যেমন তেমন তার জীবন
এলো প্রেমের কারণ সর্বনুরিতন
দেখো প্রেমেতে জীবন-মরণ।
৯৮
স্ত্রী লোকেরা খাদ্যবস্তু যতজনে খায়
তা হতে তাদের দেহে বংশের উদয়।
রজঃ হতে অস্থি-মজ্জা বাড়ে মাংসখানি
মাংসে জন্মে রক্ত, রজঃ বিধির করুনি।
রজঃ হতে মাটি জন্মে ছানার আকার
সেই মাটিতে চতুৰ্দ্দল কোমলে বান্ধে চর।
সেই চরে বীজ পেলে অঙ্কুর গজায়
বারো দল কোমলের মাঝে শিকড় বসায়।
দশ মাস পর্যন্ত জগদ্দল হয়ে রয়
ওই শিকড়ের মধ্যে বসে সে ঘুমায়।
সেই রজঃ বাড়ে দেহে শোনো সর্বজন
অসম্ভব হলে হয় ব্রহ্মাণ্ডের পতন,
শিকড়ে কেটে দুগ্ধ দেয় নাভিমূলে পড়ে।
সেই রসেতে দেহ বাড়ে দিনে দিনে,
সাবালকে আমরা যত খাদ্যবস্তু খাই
ব্রহ্মাণ্ডের জীবনে মোরা জীবন বাঁচাই।
মেছের শাহ ফকিরের কথা বুঝে দেখো মনে
এই রূপে সৃষ্টি সবে ত্রিভুবনে চলে।
৯৯
হলো এই মাটিতে সবের জন্ম
জেনে কি জানো না
নিগূঢ় তত্ত্ব জানলে হয় ভজন।
আছে মাটি রূপে সাকার নিরঞ্জন
তার নুর হতে সৃষ্টি ওর সর্বজীবগণ,
তার নুর জমে অগ্নি হয়ে গো
দেখো বায়ু রূপে দেয় চেতন।
মাটিকে সামান্য জানো মন
পানি আর আগুন বাতাস মাটিতে স্থাপন,
তার প্রমাণ আছে জীবের কাছে গো
মাটি না পেলে হারায় জীবন।
অধীন মেছের শাহ কয় বুঝে দেখো মন
মাটি হতে আকার পেল সর্ব নুরিগণ,
আগে এই মাটিতে সেজদা দিলে গো
জানো সেজদা পায় সেই নিরঞ্জন।
১০০
হলো চৌদ্দ পোয়া মাটির দেহ
অপ, তেজ, বায়ু হলো করা
সন্ধান জেনে সাধলে যায় ধরা।
দেখো পঞ্চআত্মা দেহেতে বলো
পাঁচ বলো কি পঁচিশ বলে
মানুষ একজন চলে,
হলো একজনের অনন্তধারা গো
মিছা নয় তার হিসাব করা।
সে যে একটি মানুষ সর্বঘটে রয়
জীব রূপে সে চলে ফিরে থাকে এই ধরায়
সেই নিরঞ্জনের নুর জমে গো
দেখো গাছের মধ্যে গাছ জন্মে।
সে যে একটি মানুষ তিনটি গুণ পেলো
এক আর তিন চার কড়া হলে আবার এক বলো
অধীন মেছের বলে একের মূলে গো,
মিছা শূন্য দিয়া দশ কড়া।
***
