মায়াচক্র

মায়াচক্র – রোমেনা আফাজ

দস্যু বনহুর যুবকের পাশে এসে কাঁধে হাত রাখলো। চমকে ফিরে তাকালো যুবক।

বনহুর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললো–মিঃ জন, এবার আপনি মুক্ত। যেতে পারেন, বাইরে আপনার গাড়ী অপেক্ষা করছে।

মিঃ জন ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো–তুমি কে? আর কেনই বা আমাকে এভাবে ভূগর্ভে আটকে রেখেছিলে?

মিঃ জন, আপনি বাড়ী ফিরে গিয়ে সব জানতে পারবেন। আসুন, আর বিলম্ব নয়…….

 বনহুর আর মিঃ জন পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ীর পাশে এসে দাঁড়ালো। গাড়ীর দরজা খুলে ধরে বললো বনহুর—নিন উঠুন।

মিঃ জন ড্রাইভ আসনে উঠে বসে ষ্টার্ট দিলো।

বনহুর হাত নেড়ে তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানালো—গুডবাই, গুডবাই….

.

মিঃ লাহিড়ী ও মিঃ রায় পুলিশ অফিসে বসে আজকের ঘটনা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলেন, এমন সময় টেবিলে ফোনটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো—মিঃ লাহিড়ী রিসিভার হাতে উঠিয়ে নিলেন—হ্যালো, স্পিকিং মিঃ লাহিড়ী। আপনি কে কথা বলছেন?

ও পাশ থেকে ভেসে এলো বনহুরের কণ্ঠ—আমি মিঃ জন।

আপনি! ব্যাপার কি?

আমি এবার বিদায় নিচ্ছি বন্ধু।

সেকি? হ্যালো, সেকি কথা বলছেন?

হাঁ, আসলে মিঃ জন আমি নইমিঃ জনের ভূমিকায় আমি অভিনয় করেছি।

আপনি—আপনি এ সব কি বলছেন?

মিঃ লাহিড়ী, আমার নাম জানলে আপনি আমাকে গ্রেপ্তার না করে ছাড়বেন না। আমি যেই হই, আমার উদ্দেশ্য ছিলো মালতীর আসল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করা এবং একমাত্র সেই কারণেই আমি বাধ্য হয়েছিলাম আপনাদের সকলের চোখে ধূলো দিয়ে মিঃ জনের চরিত্র, বেছে নিতে। সে জন্য আমি তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। শুধু তাই নয়, আপনাদের নিকট আমাকে অনেক মিথ্যা বলতে হয়েছে। আসল জন ফিরে এসেছেন, আমি এবার বিদায় নিচ্ছি।

হ্যালো…..হ্যালো, আপনি কে? বলুন আপনি কে? মিঃ লাহিড়ীর মুখমন্ডল উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলো।

অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ অবাক হতভম্ভ হয়ে মিঃ লাহিড়ীর মুখভাব লক্ষ্য করছিলো। মিঃ রায় বুজতে পারছিলেন, নিশ্চয়ই ওপাশে এমন কোন আলোচনা চলছে যা মিঃ লাহিড়ীকে ভীষণভাবে উত্তেজিত করে তুলছে।

তখনও মিঃ লাহিড়ী বার বার হ্যালো…..হ্যালো করছিলেন।

হঠাৎ তিনি যেন মনোযোগ সহকারে নিশ্চুপ হয়ে পড়লেন, শান্তকণ্ঠে বললেন—আপনার পরিচয় দিন।

ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই অতি পরিচিত কণ্ঠ—আমি দস্যু বনহুর।

মিঃ লাহিড়ীর হাত থেকে রিসিভার খসে পড়লো–আচম্বিতে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন তিনি—দস্যু বনহুর!

মুহূর্তে পুলিশ অফিসার সকলের চোখেমুখে একটা প্রচন্ড ভীতিভাব ছড়িয়ে পড়লো। দূর দেশ হলেও দস্যু বনহুৱের নাম তাদের কাছেও অতি পরিচিত। কারণ, দস্যু বনহুর সম্বন্ধে তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।

মিঃ রায় বলে উঠলেন—মিঃ লাহিড়ী, কে আপনার সঙ্গে কথা বলছিলো?

মিঃ লাহিড়ী তখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছেন, তিনি বললেন-দস্যু বনহুর।

দস্যু বনহুর! এখানেও তার আবির্ভাব ঘটেছে?

হাঁ মিঃ রায়। শুধু ঘটেনি, সে একদিন আমাদের মধ্যেই বিচরণ করছিলো।

বলেন কি?

মিঃ রায়, প্রথমেই আমার সন্দেহ হচ্ছিলোলোকটির আচরণ স্বাভাবিক ছিলো না। যদিও তার গতিবিধি আমার কাছে অত্যন্ত রহস্যপূর্ণ মনে হচ্ছিলো, তবু আমি তাকে কিছুই করতে বা বলতে পারছিলাম না।

মিঃ রায় বলে উঠেন—কারণ, তার কার্যে দোষণীয় কিছু ধরা পড়েনি কোন সময়।

হাঁ, সে কথা সত্য।

বরং সে আমাদের উপকারই করেছে।

মিঃ লাহিড়ী বললেন—–উপকার করলেও সে অপরাধী মিঃ রায়। সে একজন দুর্ধর্ষ দস্যু।

অন্য একজন পুলিশ অফিসার বলে উঠেন-দস্যু বনহুর তাহলে এই মহানগরেও এসে হাজির হয়েছে?

অপর একজন থানা অফিসার বলে উঠলেন দস্যু বনহুর যে এই দেশেও এসে হাজির হবে, এ যেন ধারণার বাইরে।

মিঃ রায় উৎকণ্ঠা ভরা কণ্ঠে বললেন-সত্যি আশ্চর্য।

মিঃ লাহিড়ী ভাবগম্ভীর গলায় বলে উঠলেন-দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই মিঃ রায়। তার মত দুর্ধর্ষ দস্যু পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় নেই। একটু থেমে বললেন তিনিকান্দাই নগর থেকে মহানগর তো সামান্য। পৃথিবীর যে কোন স্থানে তার আবির্ভাব ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মিঃ রায়, দস্যু বনহুর শুধু দস্যুই নয়, সে একজন মহাপ্রাণ ব্যক্তি।

হাঁ, এ কথা আমরা অবগত আছি মিঃ লাহিড়ী। সত্যই এই দস্যু অদ্ভুত।

কিন্তু দস্যু মহাপ্রাণ হলেও তাকে আইনের চোখে ক্ষমা করা যায় না। মিঃ রায়, আপনি এখনই তৈরী হয়ে নিন–আমার সঙ্গে বেরুতে হবে।

কোথায় যাবেন?

মিঃ জনের ওখানে। কথা শেষ করেই উঠে পড়েন মিঃ লাহিড়ী।

০২.

মিঃ জনের গাড়ী এসে থামলো গাড়ী-বারান্দায়।

ছুটে এলো এ্যানি গাড়ী দেখতে পেয়ে, উৎফুল্ল কণ্ঠে ডাকলোডার্লিং কোথায় গিয়েছিলে…..কথা শেষ হয় না এ্যানির, বিস্ময় ভরা চোখে থমকে পাড়ায়।

মিঃ জন এ্যানির মুখের দিকে তাকিয়ে উফুল্ল হতে গিয়ে থ মেরে যায়—কারণ, এ্যানি তাকে চিনতে পারছে না। তার মুখে খোঁচা খোঁচা এক মুখ দাড়ি, মাথার চুলগুলো রুক্ষ, দেহটাও কেমন জীর্ণ হয়ে গেছে। মিঃ জন গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়ালো।

এ্যানি পিছিয়ে গেলো কয়েক পা।

মিঃ জন বলে উঠলো—এ্যানি।

কে, কে তুমি? এ্যানির দুচোখে রাজ্যের বিস্ময়।

এ্যানি, আমি জন। আমাকে তুমি চিনতে পারছো না?

না…..জন, জন কই?

এ্যানি, তুমি বিশ্বাস করো আমিই জন।

এ্যানি অপলক নয়নে তাকালো, মুখে চোখে তার গভীর বিস্ময় ফুটে উঠেছে। বললো সে-তুমি জন…..কিন্তু…..

হাঁ, এ্যানি আমিই জন, আর যাকে তুমি এতদিন জন ভেবে এসেছিলে, সে জন নয়।

কে তবে সে?

আমিও জানি না এ্যানি, কে সে? চলো অনেক কথা আছে, সব শুনলে তুমি বুঝতে পারবে।

এ্যানির মন থেকে সন্দেহ দুর হয় না, সে তখনও কেমন একটা ভাব নিয়ে তাকাচ্ছিলো জনের মুখের দিকে।

জন বললো–চলো এ্যানি।

এ্যানি অনুসরণ করলো জনকে।

কক্ষের মধ্যে গিয়ে একটা সোফায় বসে পড়লো জন, বললো—এ্যানি, বসো।

এ্যানি জনের নিকট থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে একটা সোফায় বসে পড়লো।

জন নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভরা চিবুকে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বললো—এখনও তুমি আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছোনা এ্যানি?

এ্যানি কোন জবাব না দিয়ে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জনের মুখের দিকে, মাঝে মাঝে এ্যানির দৃষ্টি জনের পা থেকে মাথা অবধি বিচরণ করে ফিরছিলো।

বললো জন–বলো, কবে তুমি লন্ডন থেকে এসেছে?

এ্যানি এবার জবাব দিলো জুনের পহেলা তারিখে।

জন একটু চিন্তা করে বললো—দেড় মাস হলো এসেছো এ্যানি?

হাঁ।

আর আমি এ বাড়ি ত্যাগ করেছি পুরো দুমাস হলো।

কেনো? আচম্বিতে প্রশ্ন করে বসে এ্যানি।

জন একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে—এ্যানি, আমার অদৃষ্টে যা ছিলো। তাই ঘটেছে। তোমার কাছে সব খুলে বলবো, তুমি বিশ্বাস করো—আমিই জন।

আর সে?

বললাম তো জানি না কে সে, কি তার পরিচয়…

জনের কথা শেষ হয় না; কক্ষে প্রবেশ করেন মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায়।

মিঃ লাহিড়ীকে দেখে উঠে দাঁড়ায় এ্যানি, কারণ তার সঙ্গে পূর্ব হতেই পরিচয় ছিলো এ্যানির।

এ্যানিকে উঠে দাঁড়াতে দেখে জনও আসন ত্যাগ করলো। জন ছিলো অত্যন্ত ঘরোয়া ধরনের যুবক, তাই সে মিঃ লাহিড়ী কিংবা মিঃ রায়ের সঙ্গে পরিচয় ছিলো না। জন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো পুলিশ অফিসার দুজনার মুখে।

এ্যানিও কেমন বিব্রত রোধ করছিলো, কারণ জনকেই সে এখনও সম্পূর্ণ চিনে উঠতে পারেনি।

মিঃ লাহিড়ী বুঝতে পারলেন এদের দুজনার মধ্যেই এখন একটা দ্বন্দ্ব চলছে। তিনি নিজেই পরিচয় দিলেন—আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী আর ইনি ইন্সপেক্টর রায়। বসুন মিঃ জন, আপনার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে এলাম।

মিঃ লাহিড়ী নিজেই আসন গ্রহণ করলেন।

অন্যান্য সকলেই আসন গ্রহণ করলো।

মিঃ জন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে পুলিশ অফিসারদ্বয়ের মুখে।

এ্যানি নিশ্চুপ।

মিঃ রায় অবাক হয়ে জনকে দেখছেন। আসল জন আর নকল জনের মধ্যে কতখানি তফাৎ ছিলো। জুনও সুপুরুষ বটে, কিন্তু নকল জনের মত অতোখানি অদ্ভুত সুন্দর নয়। লম্বা চেহারা, উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, মাথায়। কোঁকড়ানো একরাশ চুল। ওর চোখ দুটি কোন দিন দেখে নাই বা দেখবার সুযোগ ঘটেনি কারো। এর চোখ দুটি স্বাভাবিক অনুজ্জল।

মিঃ লাহিড়ী বললেন—হাঁ, কি বলছিলেন আপনারা?

জন বললো-ইন্সপেক্টার, আপনারা নিশ্চয়ই এ ব্যাপার জানেন, আমাকে এক অজ্ঞাত যুবক অখ্যাত এক গলির অন্ধকারে একটি পড়োবাড়ীর ভূগর্ভে আটক করে রেখেছিলো।

না, এ ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মিঃ জন, আপনার নিকটে এ ব্যাপারটা আমি পুরোপুরিভাবে জানতে চাই। অবশ্য যদি আপনি কিছুমাত্র না গোপন করে বলেন?

মিঃ জন বললো—হাঁ, আমি কিছুমাত্র গোপন না করে সব বলবো এবং যতক্ষণ না বলতে পেরেছি ততক্ষণ আমি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিনা। এ্যানির দিকে তাকিয়ে বললো, এ্যানিও এখনো আমাকে জন বলে বিশ্বাস করতে পারনি।

আচ্ছা, তাহলে আপনার সব কথা আমাদের যেমন শোনার প্রয়োজন, তেমনি মিস এ্যানিরওকেমন, তাই না?

এ্যানি একবার মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নত করে নিলো। মনোভাব—নিশ্চয়ই জানা দরকার।

জন বলতে শুরু করলো আজ থেকে প্রায় মাস দুই আগে একদিন আমি নিজের ঘরে টেবিলের পাশে বসে একখানা চিঠি লিখছিলাম, রাত তখন দেড়টার বেশী হবে। চিঠি খানা আমি লন্ডনে এ্যানির কাছেই লিখছিলাম। অনেক রাত–তবু চোখে ঘুম আসছে না, বার বার মনে পড়ছে এ্যানির কথা। এ্যানিকে লন্ডন ছেড়ে এসে মন আমার কিছুতেই সুস্থির হচ্ছিলো না। চিঠি লেখা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, নীচে নাম লিখে এবার উঠে দাঁড়াবো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পিঠে একটা ঠান্ডা শক্ত কোন জিনিস অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকালাম পিছনে। ভয়ে বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম।

মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায় স্তব্ধ হয়ে শুনছেন।

মিস এ্যানির অবস্থাও তাই, তার চোখে প্রবল আগ্রহ আর উদ্দীপনা। জনের কথাগুলো যেন সে গিলছে বলে মনে হলো।

জন বলে চলেছে–আমি দেখলাম, মুখে কালো রুমাল বাঁধা একটা লোক আমার পিঠে রাইফেল ঠেশে ধরেছে। আমি চীৎকার করতে যাবো, অমনি লোকটা মুখে হাত চাপা দিয়ে বললো চীৎকার করলেই মরবে।  কাজেই আমি জীবনের ভয়ে চুপ করে গেলাম! যুবকটা আমাকে বললো তখন, ভয় নেই, আমি তোমাকে কিছুই বলবো না বা হত্যা করবো না, শুধু আমার কথামত তোমাকে কিছুদিন সরে থাকতে হবে।  আমি এবার তাকে প্রশ্ন করলাম–কে তুমি? কি চাও? জবাব দিলো সে আমি কে, পরে জানতে পারবে। আর চাইনা কিছুই; শুধু দরকার—তোমার জিনিস-পত্র ব্যবহার করবো।

যুবকটা তারপর আমাকে আমার গাড়ীতে বসিয়েই নিয়ে গেলো নিজেই ড্রাইভ করে। তারপর এক পোড়োবাড়ীর গভীর মাটির তলায় একটা ঘরের মধ্যে আটকে রাখলো।

বলেন কি? বলে উঠলেন মিঃ রায়।

হাঁ, আমাকে আটকে রাখলো সে ঐ কক্ষটার মধ্যে।

মিঃ লাহিড়ী বললেন—আপনার সেখানে অসুবিধা হলো না?

ইন্সপেক্টার, কোন অসুবিধা আমার হয়নি সেখানে। যদিও সেদ্ধ পাক-শাক আমার পেটে পড়েনি, কিন্তু অজস্র ফল-মূল আমার খাবার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতো। পানীয় এবং দুধ আমার সেখানে দেওয়া হয়েছিলো। তবু আমি নিজকে সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করতে পারিনি, কারণ নানা দুশ্চিন্তা আমাকে অহরহ যাতনা দিয়েছে। এমন কি আমাকে সেখানে সেভ করার সরঞ্জাম দেওয়া স্বত্ত্বেও আমি সেভ করতে পারিনি।

তারপর মিঃ জন?

তারপর বেশ কিছু দিন চলে গিয়েছে, আজ হঠাৎ সেই যুবক আমাকে মুক্ত করে দিয়ে বললো–এবার আমার কাজ শেষ হয়েছে আপনি যেতে পারেন। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে বললো সে-সব জানতে পারবেন। বলুন ইন্সপেক্টার, আপনি তার পরিচয় জানেন কি?

হাঁ মিঃ জন, জানি।

মিঃ জন ও এ্যানি এক সঙ্গে তাকালো মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে।

মিঃ লাহিড়ী বললেন—আপনাকে আটকে রাখার মূলে রয়েছে একটি হত্যাকান্ড।

অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো মিঃ জন—হত্যাকান্ড?

হাঁ, হত্যাকান্ড।

তাহলে সেই যুবক খুনী?

না, আপনি শুনুন মিঃ জন, সব বলছি।

বলুন ইন্সপেক্টার?

মিস মালতী নিহত হয়েছে।

মিস মালতী নিহত! বলেন কি?

হাঁ, তারই হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করার ব্যাপারে আপনাকে আটক রেখে রহস্যজাল ভেদ করেছে সেই যুবক। কারণ, আপনার চরিত্র তাকে এ হত্যারহস্য উদঘাটন করারব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।

কে-কে তাকে হত্যা করেছে ইন্সপেক্টার?

তার পিতা বাসুদেব।

বাসুদেব। অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে মিঃ জন।

হাঁ, বাসুদেব মিস মালতীর হত্যাকারী, এবং সে তার পিতা নয়।

পিতা নয়?

না।

কি কারণে বাসুদেব মালতীকে হত্যা করেছে?

সেই হীরক হার যা আপনি মিস মালতীর নিকটে গচ্ছিত রেখেছিলেন—

মিঃ লাহিড়ীর কথা শেষ হয় না, এ্যানি ক্ষিপ্তের ন্যায় বলে উঠলো–আমার হীরক হার মালতীর নিকটে গচ্ছিত….দুহাতে মাথা টিপে ধরে এ্যানি—একি বলছেন?

মিঃ লাহিড়ী বলে উঠেন—ব্যস্ত হবার কিছু নেই মিস এ্যানি। কারণ, আপনার হীরক হারটি পুনরায় আপনার হাতে ফিরে এসেছে….কথা শেষ করে মিঃ লাহিড়ী এ্যানির হীরক হার ছড়া তার সম্মুখে বাড়িয়ে ধরলেন–আপনার ভাগ্য ভালো মিস এ্যানি। তাই এতে ঘটনার পরও আপনি হীরক হার ফিরে পেলেন।

এ্যানির চোখে মুখে খুশীর উৎস। আনন্দিত মনে মিঃ লাহিড়ীর হাত থেকে হার ছড়া নিয়ে এ্যানি নিজের চোখের সামেন তুলে ধরলো। এতো খুশী সে বুঝি আর কোন দিন হয় নাই। বললো এবার সে-ইন্সপেক্টার, আপনাকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মিঃ লাহিড়ী বলে উঠলেন—মিস এ্যানি, এ হার ছড়া ফিরে পাবার জন্য ধন্যবাদ পাবার পাত্র আমি নই।

তবে?

দস্যু বনহুর!

এক সঙ্গে এ্যানি আর মিঃ জন অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো-দস্যু বনহুর।

হাঁ, দস্যু বনহুর। তার অফুরন্ত চেষ্টা আর সহায়তায় মিস মালতীর হত্যা-রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, এবং আপনার মূল্যবান হীরক হার ছড়া উদ্ধার পেয়েছে।

মিঃ জন বলে উঠেন—কি আশ্চর্য-দস্যু বনহুর?

হাঁ, দস্যু বনহুর। দস্যু বনহুরই আপনাকে আটক রেখেছিলো মিঃ জন।

মিস এ্যানির দুচোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। আনমনা হয়ে গেলো এ্যানি….কালো চশমা পরা সুন্দর একটি মুখ ভেসে উঠলো তার মানসপটে…ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে চশমাটা তুলে নিলো হাতে।

০৩.

কান্দাই থেকে মহানগর হাজার হাজার মাইল দূরে।

কান্দাই আর মহানগরের প্রায় মাঝামাঝি হলো ঝিল শহর। বনহুর যখন ঝিল শহরে বিরাজ করছিলো তখন বনহুরের কার্যকলাপ এবং তার সমস্ত খবরা খবর মহানগরের জনগণের কানে কানে ছড়িয়ে পড়েছিলো। দস্যু বনহুরের দুর্ধর্ষ আচরণের কথা সবাই জ্ঞাত ছিলো। সেই দস্যুর আর্বিভাব সংবাদ যখন প্রতিটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় বৃহৎ আকারে প্রকাশ পেলো, তখন মহানগরের প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রত্যেকটি মানুষের প্রাণে জাগলো একটা ভীত ভাব। বনহুরকে তারা চোখে না দেখলেও তার সম্বন্ধে সকলের মনেই রয়েছে একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক। দস্যু বনহুর মহানগরে পদার্পণ করেছে—খবরটা বিদ্যুৎ গতিতে মহানগরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো।

দোকানে, হোটেলে, ক্লাবে, জলসায় পথে-ঘাটে দস্যু বনহুরের সম্বন্ধে আলোচনা চলতে লাগলো। সকলের মনেই ভয়াতুর ভাব। না জানি সে কেমন দেখতে…..কেমন ভয়ঙ্কর তার চেহারা, এমনি কত কি। দস্যু বনহুর নাকি দিব্য দিনের আলোতেও লোকের বুকে ছোরা বসিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেনা। পথে-ঘাটে কোন মেয়ে বের হবার জো নেই, সে নাকি প্রকাশ্যে তাদের চুরি করে নিয়ে যায়। কেউ বাধা দিতে পারে না তার কাজে। আরও গুজব ছড়ালো লোকের মুখে মুখে, দস্যু বনহুর নাকি নর-মাংস ভক্ষণ করে।

হোটেল লারফাং আলোয় ঝলমল করছে। শহরের সবচেয়ে বড় হোটেল এটা। এখানে আভিজাত্য আর বংশ গৌরবে যারা গৌরবান্বিত, তাদেরই পদার্পণ হয়ে থাকে। সাধারণ কোনো নাগরিকের হোটেল লারফাং এ প্রবেশের উপায় নেই।

লারফাং সরগরম হয়ে উঠছে।

টেবিলে টেবিলে চলেছে নানা রকম খানা-পিনা আর হাসি গল্প। নানা জাতীয় যুবক-যুবতী হাসি আর গল্পের লহরীতে ভরে উঠছে লারফাং হোটেল।

এক পাশের একটি টেবিলের সম্মুখে আনমনে বসে কফি পান করছিলো বনহুর। ভাবছিলো সে…..এবার তার এখানের কাজ শেষ হয়েছে। মালতী হত্যা-রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে, নিরাপরাধ অরুণবাবু মুক্তি পেয়েছে। মালতীর নিহতকারী বাসুদেব বন্দী, বিচারে তার ফাসি কিংবা দ্বীপান্তর হয়ে। যাবে—তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবার বনহুর ফিরে যাবে নিজের দেশে, সেই কান্দাই শহরে। মনিরা তার প্রতীক্ষায় পথচেয়ে বসে আছে। তার মা না জানি কত উগ্রীব হয়ে পড়েছেন। হয়তো বা কত কান্দা-কাটা করছেন তিনি। মনিরার মুখখানা মনে পড়তেই বনহুরের হৃদয়ে একটা অপুলক শিহরণ বয়ে গেলো। মনের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হলো, মনিরাকে কাছে পাবার প্রবল বাসনা তাকে উন্মত্ত করে তুললো। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো নূরীর কথা মুহর্তে একটা বিষণ্ণতার ছাপ ছড়িয়ে পড়লো বনহুরের। গোটা মুখে। নূরী আজ বেঁচে নেই, তার হয়ত সলিল সমাধি হয়ে গেছে। নিষ্পাপ ফুলের মত একটি জীবন….নূরীর পবিত্র প্রেম-শিখা বনহুরের গোটা অন্তরে ছড়িয়ে আছে ধূপশিখার মত। এতোটুকু প্রেম ভালবাসার জন্য নূরী কিইনা করেছে। নূরীর অতৃপ্ত আত্মার কথা স্মরণ করে বনহুরের চোখ দুটো আশ্রু ছলছল হয়ে উঠে, তার মনের পর্দায় ভেসে উঠে আর একটি ছোট্ট সুন্দর কচি মুখ-মনি, সেও মুছে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে….বনহুর এবার রুমালে চোখ মোছে।

এমন সময় হঠাৎ বনহুরের কানে আসে হোটেলের মাইকে একটি গম্ভীর কণ্ঠস্ব—আপনারা সাবধানতা সহকারে চলাফেরা করবেন, মহানগরেও দস্যু বনহুরের আর্বিভাব ঘটেছে। যে কোন মুহূর্তে দস্যু বনহুর আপনাদের উপর হামলা চালাতে পারে।

বনহুর তখন কফির খালি কাপটায় শেষ চুমুক দিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখছিলো। হাতখানা তার থেমে গেল কাপটার পাশে, একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। মিঃ লাহিড়ী তাহলে তার উপস্থিতিটা মহানগরের প্রতিটি নাগরিকের কানে পৌঁছে দিয়েছে।

বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো, হোটেল লারফাং ভরে উঠলো মৃদু গুঞ্জনে। সকলেরই চোখেমুখে দেখা দিলো ভীতি ভাব। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো লারফাং এর প্রতিটি জনতার মুখমন্ডল। সবাই তাকাতে লাগলো হোটেলের দরজার দিকে।

হোটেল কক্ষের দক্ষিণ দিকে একটা টেবিলে বসে ছিলো দুজন যুবতী-কোন ধনিক দুহিতা হবে। অঙ্গে শোভা পাচ্ছে মূল্যবান অলঙ্কার। যুবতীদ্বয়ের মুখভাব অত্যন্ত ভয়-কাতর হয়ে পড়লো। তাদের সঙ্গে কোন পুরুষ নেই বোঝা গেলো, তাই এতো ভীতভাব দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে। যুবতীদ্বয় ফিস ফিস করে কথা বলতে শুরু করলো। বনহুরের অনতি দূরেই তাদের টেবিল, কাজেই তাদের কথাবার্তা যদিও নীচুস্বরে চলছিলো তবু কানে ভেসে আসতে লাগলো তার।

প্রথম যুবতী চাপা স্বরে দ্বিতীয় যুবতীকে লক্ষ্য করে বললো—পত্রিকার সংবাদটা জানার পর আমাদের এভাবে বের হওয়া ঠিক হয় নাই মলি!

দ্বিতীয় যুবতী ফ্যাকাশে মুখে কক্ষের দিকে একবার ভীতভাবে তাকিয়ে নিয়ে বললো—সত্যি জলি, আমার হৃদকম্প শুরু হয়েছে। দস্যু বনহুর নাকি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।

হাঁ মলি, আমি শুনেছি–সে নাকি দিন-দুপুরে মানুষের বুকে ছোরা বসিয়ে দেয়। অসুরের শক্তি নাকি তার দেহে, দশ বিশজন শক্তিশালী পুরুষ। নাকি তার কাছে কিছু নয়।

শুধু কি তাই, দস্যু বনহুর নরমাংস ভক্ষণ করে।

সত্যি?

বনহুর কথাটা শুনে আপন মনেই হেসে উঠলো। বনহুরের হাসির শব্দে ফিরে তাকালো জুলি, বনহুর তখন একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে তাকালো উপরের দিকে নিজকে সংযত করে নেবার জন্য।

মলি বললো–আপনি হাসলেন কেনো?

বনহুর দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো যুবতীদ্বয়ের মুখের দিকে, একটু গম্ভীর হয়ে নিয়ে বললো-দস্যু বনহুর মানুষ হয়ে মানুষের মাংস ভক্ষণ করে কথাটা শুনে।

জলি বনহুরের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো, এতোক্ষণ জলি এবং মলি বনহুরকে তেমন করে লক্ষ্যই করে নাই। বনহুরের সুন্দর বলিষ্ঠদীপ্ত চেহারায় মুগ্ধ হলো ওরা। জলি সহসা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না।

মলিই প্রশ্ন করলো–কেনো, আপনার বিশ্বাস হচ্ছেনা বুঝি?

হাসার চেষ্টা করে বললো বনহুর–বিশ্বাস না করে উপায় নেই। কারণ, তাকে যখন চোখে দেখিনি কোন দিন।

ভয় বিবর্ণ মুখে বললো মলি–সর্বনাশ, আপনি দস্যু বনহুরকে স্বচক্ষে দেখবার বাসনা রাখেন নাকি?

হাঁ, রাখি।

ভয় করে না আপনার?

সে তো বাঘ নয়। বললো বনহুর।

এবার জলি বললো–বাঘের চেয়েও সে ভয়ঙ্কর।

তাই নাকি? বললো বনহুর।

হাঁ, আপনি কি এ কদিনের পত্রিকা পড়েন নি? বললো মলি!

বনহুর যদিও সবগুলি পত্রিকা এবং সংবাদ সংগ্রহ করেছিলো বা পড়েছিলো তবু একটু না জানার ভান করে বললো বিশেষ কোন কারণে পত্রিকা দেখবার সময় আমার হয়ে উঠেনি।

মলি এবার বললো আসুন না আমাদের টেবিলে। প্লিজ আসুন। আমাদের বড্ড ভয় করছে।

বনহুর উঠে মলি আর জলির টেবিলে গিয়ে বসলো। জলি অপূর্ব সুন্দরী বটে, উজ্জ্বল গৌরবর্ণ গায়ের রঙ, মাথায় কৃষ্ণ কালো চুল। টানা টানা ডাগর দুটি চোখ, উন্নত নাসিকা, লম্বা গঠন-সুন্দরী না বলে উপায় নেই। নিঃসঙ্গ সন্ধ্যাটা বনহুরের কাছে যেন স্বপ্নময় হয়ে উঠলো। হেসে বললো বনহুর কেনো, আপনাদের সঙ্গে কেন…..

না, আমাদের সঙ্গে কোন পুরুষ নেই, তাই আপনি যদি একটু….থেমে গেলো জলি।

বলুন কি করতে পারি?

মলিই বলে উঠলো-আমাদের একটু বাড়ী অবধি পৌঁছে দেবেন? অবশ্য মনে যদি কিছু না করেন।

এতো শীঘ্রই চলে যাবেন? বনহুর হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললো… এখন তো সবে আটটা বাজে।

আমাদের বড্ড ভয় করছে। বললো জলি।

বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে বললো—কেনো এতো ভয়?

মলি বললো–দস্যু বনহুরের জন্য ভয় পাচ্ছি আমরা–আপনাকে তো বললাম।

মুখভাব স্বাভাবিক করে নিয়ে বললো বনহুর-এতোগুলো লোকের মধ্যে দস্যু বনহুর প্রবেশ করবে, এতোবড় সাহস আছে তার?

জলি আর মলি এক সঙ্গে বলে উঠলো—কি বললেন?

বললাম, সে এই ভর সন্ধায় এই লোকজনে ভরা হোটেলে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে?

আপনি ঠিক্ জানেন না, দস্যু বনহুর স্বাভাবিক দস্যু নয়।

সে নরখাদক, তাই না? বনহুর কোন রকমে হাসি চাপতে চেষ্টা করে।

হাঁ সে নর-মাংস খায়। তার চেহারা নাকি অতি ভয়ঙ্কর বিশ্রী। রাক্ষসের মত….

এবার বনহুর চোখ বড় বড় করে বললো—এ রকম চেহারার লোক, আছে নাকি দুনিয়ায়?

নেই, বলেন কি? দস্যু বনহুরকে যদি দেখতেন একবার…..তাহলে তো আমার জীবন নিয়ে ফিরে আসা দায় হতো।

জলি, মলি আর দস্যু বনহুর যখন আলাপ আলোচনা চলছিলো, তখন সমস্ত হোটেল কক্ষেই প্রতিটি লোক দস্যু বনহুরকে নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সকলেরই মুখে ঐ এক কথা–না জানি কোন্ মুহূর্তে দস্যু বনহুরের এই হোটেলে আবির্ভাব হবে।

জলি উঠে দাঁড়ালো—আমার ভয় হচ্ছে, আর বিলম্ব করা উচিৎ নয় মলি।

মলিও ততক্ষণে উঠে পড়েছে–চলো, এখন ভালয় ভালয় বাড়ী পৌঁছতে পারলে বেঁচে যাই।

জলি বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো-অনুগ্রহ করে আপনি যদি আমাদের সঙ্গে..•••

নিশ্চয়ই চলুন। বনহুর উঠে দাঁড়ালো, তখনও তার ঠোঁটের ফাঁকে মৃদু হাসির আভাষ লেগে রয়েছে।

জলি আর মলি বনহুরের পাশে পাশে হোটেল কক্ষ ত্যাগ করলো।

জলি বললো—আমাদের গাড়ী আছে, আসুন।

অদূরে থেমে থাকা একটা গাড়ীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো জলি আর মলি। জলি পিছনের দরজা খুলে ধরে বললো-উঠুন।

বনহুর উঠে বসলো।

জলি ড্রাইভ-আসনে বসলো, মলি তার পাশে।

গাড়ী ছুটতে আরম্ভ করলো।

অদ্ভুত এ পরিবেশটা বনহুরের কাছে ভালই লাগছে। যার ভয়ে ভীত আতঙ্ক গ্রস্ত, তাকেই নিজেদের গাড়ীতে বসিয়ে নিয়ে চলেছে। আপন মনে হাসতে লাগলো বনহুর।

জলি বললো-ভাগ্যিস, আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে এসেছেন, নইলে ভয়ে মরে যেতাম।

মলিও বান্ধবীর কথায় যোগ দিয়ে বললো—সত্যি, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো। আচ্ছা আপনার নাম বা পরিচয় এখনও জানা হয়নি কিন্তু।

বনহুর বললে—যদি বলি আমিই দস্যু বনহুর।

এক সঙ্গে হেসে উঠলো জলি আর মলি।

মলি বললো-দস্যু বনহুর যদি আপনি হতেন তবে তো আমাদের আনন্দের সীমা থাকতো না।

তাই নাকি?

মলি পুনরায় বললো–যদি আপনার আপত্তি না থাকে, বলুন না আপনার পরিচয়টা?

আমার নাম নাসিম চৌধুরী। মহানগরের একজন নাগরিক আমি। আর আপনারা? বললো বনহুর।

মলিই জবাব দিলো—আমি মিঃ রায় এর কন্যা মলি। আর আমার বান্ধবী পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ীর একমাত্র কন্যা জলি।

বনহুর চমকে উঠলো, অন্ধকার বলে মলি লক্ষ্য করতে পারলো না। জলি তো ড্রাইভ করছিলো।

এ শহরের আর কেউ তাকে না চিনুক মিঃ রায় এবং মিঃ লাহিড়ী তাকে চিনতে পারবেন—এ সুনিশ্চয়। বনহুর প্রমাদ গুণলো, এদের পৌঁছে দিতে গিয়ে মিঃ লাহিড়ীর নিকটে পাকড়াও না হয়ে পড়ে। এখন কি ভাবে এদের কবল থেকে ফসকানো যায়।

হঠাৎ বলে উঠলো জলি—এসে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ী থেমে পড়লো।

জলি নেমে দাঁড়িয়ে বললো-আসুন মিঃ নাসিম।

ততক্ষণে বনহুর নেমে দাঁড়িয়েছে গাড়ী থেকে আপনারা পৌঁছে গেছেন, এবার আমি চলি?

না তা হয় না মিঃ নাসিম, আপনি আসুন-বাবার সঙ্গে আপনার পরিচয় হলে অনেক খুশী হবেন। কথাগুলো বললো, জুলি।

মলিও জেদ ধরে বসলো—এতোখানি উপকার যখন করলেন তখন আর একটু বইতে নয়, আসুন না জলি যখন বলছে।

বনহুর অগত্যা জলি আর মলিকে অনুসরণ করলো।

পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ীর ড্রইং রুম।

মিস মলি আর জলির সঙ্গে বনহুর প্রবেশ করলো ড্রইংরুমে। সুসজ্জিত কক্ষ, ফিকে নীল রঙ করা দেয়াল। মেজের কার্পেটখানাও ফিকে নীল, কক্ষের মাঝখানে কাপেৰ্টের বুকে গোলাকার করে সাজানো কয়েকটা সোফা সেট। সোফার কভারগুলোও ফিকে নীল রঙ এর। দরজা জানালার পর্দাও ফিকে নীল রঙ কাপড়ের তৈরী। কক্ষ মধ্যে একটা নীল রঙ এর আলো জ্বলছিলো।

মিস জলি বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো—বসুন, বাবাকে ডেকে আনছি।

জলি ভিতরে চলে গেলো, মলিও অনুসরণ করলো তাকে।

একটু পরে ফিরে এলো মলি আর জলি—সঙ্গে সঙ্গে মিঃ লাহিড়ী। কক্ষে প্রবেশ করে হতবাক স্তম্ভিত—কেউ নেই কক্ষে!

মিঃ লাহিড়ী অবাক হলেন, বললেন–কই সেই ভদ্রলোক যিনি তোমাদের পৌঁছে দিয়েছেন?

জলি আর মলি এক সঙ্গেই বলে উঠলো—এখানেই তো তিনি বসেছিলেন!

হঠাৎ মিঃ লাহিড়ী দেখতে পেলেন—সোফার উপর একটি কাগজের টুকরা পড়ে আছে। তিনি কাগজের টুকরাখানা হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন, সঙ্গে সঙ্গে তার মুখমন্ডল অন্ধকার হয়ে উঠলো।

জলি বললো-কি হলো বাবা?

মিঃ লাহিড়ী গম্ভীর, কণ্ঠে বললেন-পড়ে দেখো।

জলি কাগজের টুকরোখানা নিয়ে উচ্চ কণ্ঠে পড়লো। তাতে লিখা রয়েছে মাত্র কয়েকটা শব্দ :

মিঃ লাহিড়ী।

আপনার কন্যা মিস জলি আর তার বান্ধবী মিস মলি দস্যু বনহুরের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ায় তাদের বাড়ী পৌঁছে দিয়ে গেলাম।

–দস্যু বনহুর।

জলি আর মলির চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। মিঃ লাহিড়ী রাগে গস গস করে উঠলেন।

জলি আর মলির মুখে কোন কথা বের হচ্ছে না। দুজন তাকাচ্ছে দুজনার মুখের দিকে।

মিঃ লাহিড়ী বলে উঠলেন—বাইরের কাউকে বিশ্বাস করো না তোমরা। দস্যু বনহুর তোমাদের উপর কোন অন্যায় আচরণ করে নি তো?

মিস জলি বলে উঠলোনা বাবা, তার ব্যবহার অত্যন্ত মধুর ছিলো। আমাদের প্রতি কোন রকম খারাপ ব্যবহার করেনি।

মিঃ লাহিড়ী তখনও রাগে অধর দংশন করছিলেন।

জলি পুনরায় বললো—দস্যু বনহুর অমন হবে তা ভাবতেও পারিনি।

মিঃ লাহিড়ীর কন্যার কথায় কান না দিয়ে তখনই অফিসে ফোন করলেন। জানিয়ে দিলেনদস্যু বনহুর তাদের আশে-পাশেই বিচরণ করে ফিরছে। পুলিশ বাহিনী যেন সদা সজাগ থাকে এবং শহরময় যেন সজাগ করে দেওয়া হয় এ ব্যাপারে।

০৪.

এই ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন।

বনহুর সম্বন্ধে শহরময় নানা আতঙ্ক ভরা ভাবের সৃষ্টি হলেও বনহুর আজও কারো উপর হামলা চালায় নি বা কারো ধনভান্ডার লুটে নেয় নি, কিংবা কারো বুকে ছোরা বসিয়ে রক্তপাত ঘটায় নি।

শান্ত নাগরিকের মতই বনহুর মহানগরের বুকে আত্মগোপন করে রইলো।

শহরবাসীর মন থেকে দস্যু বনহুরের ভীতিভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত না হলেও অনেকটা হাল্কা হয়ে এসেছে। সবাই আপন আপন মনে নিজ নিজ কাজ করে চলেছে।

নগরবাসী বনহুর সম্বন্ধে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও পুলিশ মহল তাকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন রইলো, শহরের নানা স্থানে নানাভাবে সি আই ডি পুলিশ গোপনে অনুসন্ধান করে চললো। কিন্তু এতো করেও তারা বনহুরের সন্ধান পেলোনা।

বনহুর তখন লারফাং হোটেলের দ্বিতল একটি ক্যাবিনে দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় দৈনিক পত্রিকাখানা পড়ছিলো। বাম হস্তের আংগুলের ফাঁকে অর্ধদগ্ধ সিগারেট থেকে ক্ষীণ একটি ধুম্র রেখা ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিলো।

অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পত্রিকার পাতায় দৃষ্টি বুলিয়ে যাচ্ছিলো। দস্যু বনহুরের আবির্ভাবে মহানগরে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রতিটি পত্রিকার পাতায় পাতায় বিরাট আকারে প্রকাশ পেতো বনহুরের আগমন বার্তা।

সমস্ত পত্রিকাখানায় একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বনহুর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। পত্রিকা ওয়ালারা বনহুরের নামে এ কদিনে বেশ দুপয়সা কামিয়ে নিয়েছে। কারণ, দস্যু বনহুরের আবির্ভাব সংবাদ পত্রিকায় এমন একটা আতঙ্ক আনয়ন করেছিলো যার ফলে নগরের প্রতিটি জনগণ সর্বক্ষণ পত্রিকার অপেক্ষায় প্রহর গুণতো। ধনী-দরিদ্র নারী-পুরুষ বিদ্বান-অবিদ্বান সবাই খরিদ করতে একখানা দৈনিক পেপার। দস্যু বনহুরের সংবাদ জানবার জন্য উদগ্রীব হয়ে সবাই পেপার দেখতো।

 আজ পত্রিকার পৃষ্ঠায় দস্যু বনহুর সম্বন্ধে কোন তাজা খবর ছিলোনা। বনহুর নিজেও এ কদিন পত্রিকায় তার নামে নানা ধরনের আজগুবি গুজব পড়ে একটা কৌতুক অনুভব করতো, নিজ মনেই হাসতো সে।

বনহুর আজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, যাক পত্রিকাগুলি তাহলে আশ্বস্ত হয়েছে। হঠাৎ বনহুরের নজর চলে গেলো পত্রিকা খানার একটি জায়গায়—আজ সন্ধ্যায় আন্দাম বন্দর থেকে জাহাজ কাংঙ্গেরী কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছে। কান্দাই–কান্দাই শব্দটা বনহুরের হৃদয় স্পর্শ করলো, আচম্বিতে মনের পর্দায় ভেসে উঠলো দুটি ব্যাকুল আঁখি উগ্রীব নয়নে তাকিয়ে আছে চৌধুরী বাড়ীর মুক্তাগবাক্ষে। তাকিয়ে তাকিয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে আঁখি দুটি গন্ড বেয়ে, গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। তার মনিরা–বনহুর মনস্থির করে ফেললোআজ সন্ধ্যায় সে আন্দাম থেকে কাংঙ্গেরী জাহাজে কান্দাই এর পথে রওয়ানা দেবে।

সন্ধ্যার পূর্বেই হোটেল লারফাং ত্যাগ করে ট্যাক্সিতে উঠে বসলো দস্যু বনহুর। মহানগর ত্যাগ করতে মনটা তার আজ কেমন যেন আনচান করছিলো। একটা বেদনা বোধ হচ্ছিল তার হৃদয়ে, কোন আপন জনকে যেন ছেড়ে যাচ্ছে সে এই মহানগরের বুকে।

ট্যাক্সি আন্দাম বন্দরে পৌঁছতেই ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়লো বনহুর।

আন্দাম, বিরাট বন্দর।

অগণিত জাহাজ ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বন্দরের আশে পাশে। জেটিতে ভিড়ে পঁড়িয়েছে জাহাজ কাংঙ্গেরী। অগণিত যাত্রি জেটির সিঁড়ি বেয়ে এগুচ্ছে জাহাজ অভিমুখে।

ভোঁ বেজে উঠলো।

জেটি ত্যাগ করে কাংঙ্গেরী এগুতে লাগলো গভীর জলের দিকে।

ফার্স্ট ক্লাশ ক্যাবিনের একটি সোফায় গা এলিয়ে বসেছিল বনহুর। সম্মুখের কাঁচের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলো সে, ছেড়ে আসা মহানগরীর দিকে।

আন্দাম বন্দর ছেড়ে কাংঙ্গেরী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসছে মহানগরী। উচ্ছল জলরাশি খলখল শব্দে পিছিয়ে যাচ্ছে পিছনের দিকে। এবার বনহুর একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে অগ্নিসংযোগ করলো।

সন্ধ্যার অন্ধকার এখন কাংঙ্গেরীর বুকে জমাট হয়ে উঠেছে। ক্যাবিনে ক্যাবিনে জ্বলে উঠেছে বৈদ্যুতিক নীলাভ,আলো। যাত্রীরা সব আপন আপন জায়গা বেছে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দূর দেশের যাত্রী সবাই, বহুদিন তাহাদের কাটাতে হবে এই ভাসমান আবাসে। কাজেই সবাই চায় একটা আরামদায়ক সুখময় স্থান।

যাত্রীদের হই-হুল্লোড় আর জাহাজের ঝকঝক শব্দ মিলে একটা অদ্ভুত শব্দের সৃষ্টি করে চলছিলো।

ক্রমান্বয়ে রাত বেড়ে আসে।

জাহাজ এখন সাগরবক্ষে এসে পড়েছে।

যাত্রিগণ স্ব স্ব স্থান বেছে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে পড়ায় তেমন হই-চই আর নেই। তবু বেশী জনতার কলকণ্ঠের একটা প্রতিধ্বনি জাহাজটাকে মুখর করে রেখেছিলো।

বনহুর অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে আর একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করতে গেলো, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা নুপুরের শব্দ ভেসে এলো তার কানে; নুপুরের শব্দের সঙ্গে একটা বাঁশীর সুর।

বনহুর একমুখ ধুয়া সম্মুখের দিকে ছুড়ে দিয়ে সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। তারা ভরা আকাশের খানিকটা অংশ ভেসে ভেসে সরে যাচ্ছে তার চোখের সম্মুখ দিয়ে কাঁচের শার্শী পথে। আনমনে চেয়ে আছে সে।

বাঁশীর সুরের সঙ্গে নুপুরের আওয়াজ এখন আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে আরও কিছু শব্দ ভেসে আসছে জনগণের করতালি আর হাস্যধ্বনি।

বনহুর নিশ্চিন্ত মনে ধূম পান করে চলেছে।

ডেকে কোন নর্তকী হয়তো নাচ দেখাচ্ছে, ভাবলো বনহুর। বেশ কিছুক্ষণ হলো নুপুরের শব্দের সঙ্গে বাঁশীর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জনগণের হর্ষধ্বনি আর করতালি।

নিজের অজ্ঞাতেই বনহুর সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, এগিয়ে চললো ডেকের দিকে। দক্ষিণ হস্তের আংগুলের ফাঁকে তখনও অর্ধদগ্ধ একটী সিগারেট। তাকিয়ে দেখলো বনহুর সম্মুখের দিকে। ডেকের উজ্জ্বল আলোতে নজরে পড়লো কতকগুলি লোক ডেকের দক্ষিণ দিকে গোলাকার ভাবে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছে।

বনহুর থমকে দাঁড়ালো, যাবে কিনা ওখানে ভাবছে। এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ালো জাহাজের ক্যাপ্টেন মিঃ মুঙ্গের। বনহুরকে সম্বোধন করে বললেন—হ্যালো মিঃ সেন, চলুন নাচ দেখবেন।

দস্যু বনহুর এ জাহাজে মিঃ চন্দ্রসেন নামে নিজকে পরিচিত করেছিলো। ক্যাপ্টেনের কথায় হেসে বললো-ধন্যবাদ, চলুন।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরের সঙ্গে বনহুর এগিয়ে চললো ডেকের দিকে।

জাহাজ তখন সীমাহীন জলরাশি অতিক্রম করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে কোন অজানার পথে। চারিদিকে শুধু জল আর জল, স্থলের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও।

তারা ভরা আকাশ।

সপ্তমীর চাঁদ ডুবে গেছে কিছুক্ষণ আগে।

জনতামন্ডলীর পাশে এসে ঘাড় উঁচু করে উঁকি দিলো বনহুর—একটি নর্তকী এদিকে পিছনে ফিরে নাচছে। অপূর্ব অদ্ভুত সে নাচ। একটি লোক বাঁশী বাজাচ্ছে, শরীরে ঢিলা পাজামা আর পাঞ্জাবী মাথায় মস্তবড় একটা পাগড়ী বাধা। লোকটার বাঁশীর সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে নর্তকী। এতোটুকু শিথিলতা নেই সেই দুটি চরণ যুগলে।

বনহুর অবাক হয়ে নর্তকীর পা দুখানা লক্ষ্য করছিলো। লোকটার বাঁশীর সুরে যেন কোন যাদু আছে, যার জন্য নর্তকীর পা দুখানা যন্ত্রের মত দ্রুত ভাবে চলছিলো। আশ্চর্য এ নাচ।

হঠাৎ নর্তকী ঘুরে নাচতে লাগলো।

সঙ্গে সঙ্গে বনহুর অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো-নূরী! দুচোখে তার অতীব বিস্ময়। .

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী দাঁড়িয়ে ছিলেন বনহুরের পাশে, তিনি মিঃ সেনকে হঠাৎ নূরী শব্দ উচ্চারণ করতে দেখে এবং তার মুখভাব লক্ষ্য করে অবাক হলেন,বললেন-আপনি ওকে চেনেন?

যদিও বনহুর নূরীকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তবু চট করে নিজকে সংযত করে নিয়ে বললো—নাচনেওয়ালীকে এর পূর্বে আর একবার দেখেছিলাম।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী হেসে বললেন–ও।

নূরী তখনও চঞ্চল চরণে নেচে চলেছে। বংশীবাদকের বাঁশীর সুরে তার চরণ যুগল যেন আরও দ্রুত হয়ে উঠছিলো।

বনহুরের মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে উঠলো। নূরী বেঁচে আছে; আনন্দিত হওয়ার চেয়ে ক্রুদ্ধ হলো সে বেশী। নূরী নর্তকী হয়ে পথে-ঘাটে নেচে বেড়াচ্ছে-ছিঃ ছিঃ ছিঃ এর চেয়ে ওর মৃত্যু হলেও খুশী হতো সে। বনহুর তাকালো বংশীবাদকের মুখের দিকে। নরপিশাচের মতই দেখতে লোকটা। লম্বা-বিরাট দেহ; মস্ত মাথা, লম্বা নাক, মস্ত মস্ত একজোড়া গোঁফ, গোল গোল দুটি চোখ, কেমন শয়তানী ভরা চাহনী। বনহুরের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। আর দাঁড়াতে পারলো না সে, ফিরে এলো নিজের কামরায়।

কিছুক্ষণ পূর্বেও বনহুরের মনোভাব স্বাভাবিক ছিলো। হাজার ব্যথাও তাকে একেবারে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দিতে পারেনি। হঠাৎ নূরীকে এভাবে দর্শন করায় বনহুর যেন সত্তা হারিয়ে ফেললে। সে ভাবতেও পারেনি–নূরী একজন নাচনে ওয়ালী হতে পারে।

ক্যাবিনের মেঝেতে ক্রুদ্ধভাবে পায়চারী করতে লাগলো বনহুর। মাঝে মাঝে অধর দংশন করছে, নূরীকে সে এভাবে দেখবে আশা করেনি কোন দিন। নূরীর প্রেমকে সে এতো দিন অতি নির্মল সচ্ছবলে জেনে এসেছে। নূরীর ভালবাসা তার কাছে ফুলের মতই পবিত্র মনে হয়েছে, আর সেই নূরী কিনা–বনহুর দুহাতে নিজের মাথার চুল টেনে ছিড়তে লাগলো।

ডেকের বুকে নূরীর নুপুরের শব্দ বনহুরের কানে গরম সীসা ঢেলে দিচ্ছে যেন। বনহুর দুহাত কান চেপে ধরলো।

রাত বেড়ে আসছে।

এক সময় গোটা জাহাজটা সুপ্তির কোলে ঢলে পড়লো। নীরব হয়ে এলো যাত্রীদের কলকণ্ঠ। জাহাজের ইঞ্জিনের ঝক ঝক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই শোনা যাচ্ছে না।

বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো,বেরিয়ে এলো ক্যাবিনের বাইরে। সমস্ত জাহাজখানা নিস্তদ্ধ, ঘুমিয়ে পড়েছে যাত্রিগণ।

বনহুর অতি সৃন্তর্পণে এগিয়ে চললো। হঠাৎ চমকে উঠলো বনহুর তার অদূরে একটা ক্যাবিনের পাশ কেটে অন্ধকারে আর একটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে। বনহুর থমকে দাঁড়ালো, লক্ষ্য করলো কে এই লোক। কিন্তু বনহুর আশ্চর্য হয়ে দেখলো–লোকটার আপাদ মস্তক কালো আলখেল্লায় আবৃত। বুঝতে পারলো বনহুর-আলখেল্লাধারী নিশ্চয়ই কোন শয়তান। কোন কুমতলবে সে এগুচ্ছে। বনহুর অনুসরণ করলো আলখেল্লাধারীকে কিন্তু কিছু দূর এগুতেই হঠাৎ তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী। হাস্য উজ্জ্বল মুখে বললেন—হ্যালো মিঃ সেন।

বনহুর হেসে বললো—বড় গরম বোধ করছিলাম।

হাঁ, আজ আবহাওয়াটা বড় সুবিধে নয়। কেমন যেন একটি গুমোট ভাব দেখা দিয়েছে। ঝড় আসতে পারে।

তাই বুঝি আপনি–

না, ঠিক সে কারণে নয়, ইঞ্জিন-মেশিনটা একটু খারাপ বোধ হচ্ছিলো তাই দেখে এলাম। আচ্ছা, চলি মিঃ সেন। কথা শেষ করে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী চলে গেলো নিজের ক্যাবিনের দিকে।

বনহুর ফিরে তাকালো যে দিকে কিছুক্ষণ পুর্বে সেই আলখেল্লাধারীটিকে দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু কি আশ্চর্য লোকটা যেন হাওয়ায় মিশে গেছে।

বনহুর বিলম্ব না করে ফিরে এলো নিজের কামরায়।

শয্যায় শুয়েও এতোটুকু ঘুম এলোনা বনহুরের চোখে। সব সময় তার কানের কাছে যেন নূরীর চরণের নূপুরধ্বনি ভেসে আসছে। নূরী–নূরী–ছোট বেলা থেকে নূরীকে বনহুর সাথী রূপে পেয়েছিলো। নূরীর প্রেম-ভালবাসা তার মনকে আচ্ছন্ন করতে না পারলেও বনহুর তাকে কোনদিন উপেক্ষা করতে পারেনি। নূরীকে সে অন্তরের অনুভূতি দিয়ে ভালবেসেছে। নূরীর পবিত্র ভালবাসার মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে বনহুর। সেই নূরীকে সে আজ এরূপে দেখবে ভাবতে পারেনি–বনহুর এবার সোজা ডেকের বুকে এসে দাঁড়ালো। অদূরে যে ক্যাবিনটা দেখা যাচ্ছে-নূরী ওটাতেই রয়েছে। একবার ভাবলো বনহুর-সোজা নূরীর ক্যাবিনে প্রবেশ করে বলবে, কেনো-কেনো সে এ পথ বেছে নিয়েছে। এ পথ ছাড়া তার কি আর কোন গতি ছিলো না। রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করে বনহুর। উষ্ণ হয়ে উঠে তার ধমনীর রক্ত।

বনহুর ক্যাবিনের শার্শী খুলে প্রবেশ করলো ভিতরে।

অদূরে মেঝেয় কম্বল বিছিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে নূরী। ক্যাবিনের স্বল্পালোকে তাকিয়ে দেখলো নূরীকে।

কতদিন পর নূরীকে দেখছে বনহুর, কিন্তু কোন বিস্ময় তার মনে জাগলোনা, জাগলোনা কোন অনুভূতি। বনহুরের শিরায় শিরায় তখন উষ্ণ রক্তের প্রবাহ।

ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় বনহুর এগিয়ে গেলো নূরীর পাশে। দাঁতে দাঁত পিষছিলো বনহুর, রাগে তার মাংসপেশীগুলি শক্ত হয়ে উঠছিলো। হাটু গেড়ে

বসে পড়লো নূরীর শয্যার পাশে দুহাত বাড়িয়েটিপে ধরলো নূরীর গলা।

সঙ্গে সঙ্গে নূরী জেগে গেলো চীৎকার করতে গেলো সে। বনহুর দক্ষিণ হস্তে চেপে ধরলো নূরীর মুখ।

নৃরী তাকালো বনহুরের দিকে।

কিন্তু একি! বনহুরকে দেখেও নূরীর চোখে কোন ভাবের পরিবর্তন এলোনা।

নূরীর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বনহুরের হাত দুখান যেন শিথিল হয়ে এলো। নূরীর কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। নূরী নিজের গলায় হাত বুলোচ্ছে এবং তাকাচ্ছে বনহুরের মুখের দিকে-আশ্চর্য! নূরী বনহুরকে দেখে একটা শব্দও উচ্চারণ করলোনা। নূরী যে তাকে চিনতে পেরেছে এমন মনে হলোনা।

বনহুরের মুখেও কোন কথা বের হচ্ছেনা, তবে কি নূরী তাকে চিনতে পারছেনা।

হঠাৎ বলে উঠলো নূরী–কে তুমি?

বিস্মিত বনহুর আরও বিস্মিত হলো, নূরী তাকে তাহলে চিনতে পারেনি। না তার মিথ্যা অভিনয়। বনহুর গম্ভীর চাপা কণ্ঠে দাঁতে দাঁত পিষে বললো-নূরী, তোমাকে এ ভাবে দেখবার পূর্বে তোমার মৃত্যু হলে অনেক খুশী হতাম।

নূরী আশ্চর্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, বনহুরের কথায় তার চোখ দুটো আরও অবাক হলো। সে ওর কথাগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা।

বনহুর পুনরায় বলে উঠলো-নূরী, আমাকে তুমি থোকা দিতে পারবেনা।

নূরী এবার বলে উঠলো—কে তুমি? এসব কি বলছো?

বনহুর নূরীর কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো তার মুখের দিকে। তবে কি এ নূরী নয়, নূরীর আকারে অন্য কোন মেয়ে? হয়তো তাই হবে নাহলে এতোক্ষণ তাকে চিনতে পারবেনা—এও কখনও হতে পারে! বনহুর, অবাক নয়ননে নূরীর পা থেকে মাথা অবধি নিপুণ আঁখি মেলে। দেখতে লাগলো। না না, ভুল তার হয়নি—ঐ তো নূরীর কপালে সেই ক্ষত চিহ্নটা-যা একদিন তারই আঘাতে হয়েছিলো। সেই মুখ সেই চোখ-একি, কোনদিন ভুলে যাবার! সেই কথা বলবার ভঙ্গী। নূরী ছাড়া এ অন্য কোন মেয়ে নয়–তবে কি নূরী তার সঙ্গে মিথ্যা ছলনা করছে?

বনহুর দৃঢ় মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো নূরীর দক্ষিণ হাত-নূরী।

না, আমার নাম নূরী নয়।

নূরী নও তুমি? ছেড়ে দিলো বনহুর নূরীর হাত খানা, প্রশ্ন করলোকে তুমি? কি তোমার নাম?

নূরী বনহুরকে চিনতে পারেনি এটা সত্য। নূরীকে যাদুকর যাদুর মায়াজালে নিজ সত্তা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো। নূরী যা করছিলোসব যাদুকরের যাদুর মায়ায়। এমনকি নূরীর দৃষ্টিশক্তিও অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলো, আপন জনকে সে দেখলেও চিনতে পারবে না বা পারছিলো না। বনহুর নূরীর স্বপ্ন-সাধনা–প্রাণের চেয়েও সে ওকে ভালবাসে, অথচ আজ সেই বনহুরকে কাছে পেয়েও নূরী চিনতে পারে না। বনহুরের প্রশ্নে নূরী জবাব দেয়–আমি নাচনেওয়ালী। আমার নাম মায়া।

অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে বনহুর–মায়া। হাঁ মায়া।

বনহুরের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নত হয়ে আসে। সে অন্য একটি মেয়েকে নূরী বলে ভ্রম করেছে। আবার তাকালো বনহুর নূরীর মুখের দিকে—না, ভুল তার হয়নি—এই তো সেই নূরী–কিন্তু এর নাম যে মায়া।

বনহুর যেমনভাবে এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো। একটা অব্যক্ত বেদনা তার সমস্ত অন্তরটাকে যেন নিষ্পেষিত করে চললো নূরী ছাড়া সে কেউ নয়। কিন্তু একি পরিবর্তন নূরীর মধ্যে!

গোটা রাত নানা দুশ্চিন্তায় কাটলো বনহুরের।

পরেরদিন।

বনহুর ডেকে দাঁড়িয়ে সিগারেট পান করছিলো। ভোরের মিষ্টি হাওয়ায় দেহটা শান্ত-স্নিগ্ধ হলেও মনটা তখনও গুমড়ে কেঁদে মরছিলো। গত রাতের নূরীর কথাই স্মরণ হচ্ছিলো বার বার। যে নূরী তাকে না পেলে অস্থির হয়ে পড়তে, যে নূরী তার এতোটুকু ভালবাসার জন্য উদগ্রীব থাকতো-সেই নূরীর একি পরিবর্তন! হঠাৎ বনহুরের চিন্তাজালে বাধা পড়ে, সেই নুপুরের শব্দ।

বনহুর হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেট সাগরের জলে নিক্ষেপ করে ফিরে দাঁড়ালো। অদুরে অনেকগুলি লোক জটলা পাকিয়ে গোলাকার ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিক থেকেই ভেসে আসছিলো নূপুরের শব্দ।

বনহুরের মুখমন্ডল কঠিন হয়ে উঠলো, আর দাঁড়াতে পারলো না, সে চলেগেলো নিজের ক্যাবিনে।

এমন সময় ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী বনহুরের ক্যাবিনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো-হ্যালো মিঃ সেন, আসুন নাচ দেখা যাক।

না ক্যাপ্টেন, আমার শরীরটা ভাল বোধ হচ্ছে না আসুন এখানে বসে গল্প সল্প করা যাক।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী প্রবেশ করলো বনহুরের ক্যাবিনে। বনহুরের পাশের আসনে বসে পড়লেন ক্যাপ্টেন–এতো অল্প সময়ে অসুস্থ বোধ করলে। চলবে কি করে মিঃ সেন? এখনও বেশ কিছুদিন জাহাজ কোন বন্দরে ভিড়ছে না।

না না, তা বলছি না, আসলে মানে শরীরটা যেন একটু কেমন লাগছে আর কি।

বনহুর আর ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী কথাবার্তা হচ্ছিলো এমন সময় ডেকের জনতামন্ডলীর মধ্যে একটা হট্টগোলের শব্দ শোনা যায়।

ক্যাপ্টেন উঠে পড়েন-ব্যাপার কি, চলুন মিঃ সেন দেখা যাক।

বনহুরের ইচ্ছা না থাকলেও উঠতে বাধ্য হলো, এগিয়ে চললো সে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর সঙ্গে।

জনতার ভীড় ঠেলে এগুতেই চমকে উঠলো বনহুর অদূরে ডেকের উপর সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে আছে নূরী। পাশেই সেই পাগড়ীওয়ালা বংশীবাদ হাতে আজ তার বাঁশী নেই-এক গাছা বেত। লোকটার চোখ-মুখ হিংস্র হয়ে উঠেছে।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী এগুতেই দর্শকের মধ্য হতে একজন বলে উঠলো–যেভাবে ওকে প্রহার করেছে জ্ঞান হারাবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

অন্য একজন বললো-মরে যায়নি তো?

বনহুর সিংহের ন্যায় গর্জন করে উঠলো—কেনো ওকে মারা হয়েছে বলতে পারেন?

তা আর পারবো না সাহেব। মেয়েটা নাচতে চাইছিলো না। কথাটা বললো প্রথম ব্যক্তি।

বনহুরের ভ্রু কুঁচকে উঠলো, লোকটাকে দেখলেই শয়তান বলে মনে হচ্ছে তার। বনহুর তাকিয়ে রইলো লোকটার দিকে।

লোকটা তখন বিড়বিড় করে কি যেন মন্ত্র পাঠ করে নূরীর চোখেমুখে ফুঁ দিচ্ছিলো। কি আশ্চর্য, অল্পক্ষণের মধ্যেই নূরী চোখ মেলে তাকালো।

লোকটা এবার নূরীকে হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে একটা গেলাসে পানির মধ্যে কিছুটা ঔষধ মিশিয়ে নূরীর সম্মুখে বাড়িয়ে ধরলো-খেয়ে নে।

নূরী গেলাসটা হাতে নিতেই বনহুর দ্রুত এগিয়ে গেলো এবং সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় গেলাসটা নূরীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো দূরে।

মুহূর্তে শয়তান যাদুকর উঠে দাঁড়ালো দুচোখে তার আগুন ঝরে পড়ছে।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী স্তম্ভিত হলেন। মিঃ সেন কেনো একাজ করতে গেলো ভেবে পেলেন না।

অন্যান্য দর্শকগণও হকচকিয়ে গেলো।

নূরী তখন তন্দ্রাচ্ছন্নের মত তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে। কোন কথাই তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছেনা। বনহুর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।

বংশীবাদক অন্য কেহ নয়–শয়তান হরশঙ্কর।

হরশঙ্কর বনহুরের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো। মুখভাব তখন তার পিশাচের চেয়েও ভয়ঙ্কর দেখা যাচ্ছিলো।

সেদিন আর হরশঙ্করের নাচ-গান জমলো না।

বনহুর এ ব্যাপারের পর গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো। নিশ্চয়ই লোকটা কোন যাদুকর যাদুর মোহে নুরীকে সে তার সজ্ঞান অবস্থা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। না হলে নূরীর উপর সে এ ভাবে নির্মম ব্যবহার করতো না। বনহুরের মনে নূরীর প্রতি যে একটা অহেতুক রাগ হয়েছিলো সেটা এক্ষণে নষ্ট হয়ে গেলো-বুঝতে পারলো সে নূরী কোন শয়তান যাদুকরের মায়াচক্রে আবদ্ধ হয়েছে। যেমন করে হোক নূরীকে এই মায়াচক্রের আবেষ্টনী থেকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু তার উপায় কি নূরী তাকে কিছুতেই চিনতে পারছে না বা তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

বনহুর চিন্তাসাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলো। শয়তান লোকটাকে যেমন করে হোক পরাজিত করে নূরীকে উদ্ধার করা তার পক্ষে বিশেষ কোন কষ্টকর হবে না, কিন্তু নূরী যদি তার সঙ্গে না আসে কিংবা তাকে বিশ্বাস করতে না পারে তাহলে সব প্রচেষ্টা-সব সাধনা নষ্ট হয়ে যাবে।

সেদিন বৈকালে. ডেকের ধারে রেলিং ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো নূরী। দৃষ্টি তার সাগর বক্ষে সীমাবদ্ধ।

আশে পাশে কোন লোক নেই।

বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে ধীরে পদক্ষেপে এগুলো। পাশে এসে দাঁড়ালো নূরীর।।

চমকে ফিরে তাকালো নূরী, বনহুরকে দেখতে পেয়ে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করতে যাচ্ছিলো।

বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাত মুঠায় চেপে ধরলো—নূরী, যেওনা।

নূরী বিরক্তপূর্ণ চোখে তাকালো বনহুরের দিকে।

বনহুর পুনরায় ব্যাকুল কণ্ঠে বললো—নূরী আমাকে তুমি চিনতে পারছে? আমি–চাপা কণ্ঠে বলে উঠে সে আমি বনহুর।

নূরী বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে চিনবার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই সে. স্মরণ করতে পারে না-কোথায় কখন তাকে দেখেছে বা তার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ ছিলো কিনা মনে পড়ে না কোন কথা।

এমন মুহূর্তে অদূরে দেখা যায় হরশঙ্করকে সে নূরীকে তার কক্ষে না দেখে হন্তদন্ত হয়ে ডেকের দিকে আসছিলো। তখনকার সেই যুবকের পাশে নূরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হরশঙ্করের চোখ দুটো আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো।

নূরীকে উদ্দেশ্য করে ইংগিত করলো হরশঙ্কর।

নূরী আর দাঁড়ালো না, চলে গেলো সেখান থেকে।

বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো।

হরশঙ্কর একবার কটমট করে বনহুরের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।

০৫.

যে কোন বন্দরে জাহাজ পৌঁছানোর পূর্বেই নূরীকে উদ্ধার করতে হবে, না হলে শয়তান ওকে নিয়ে উধাও হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যতক্ষণ না নূরী স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে পেয়েছে ততক্ষণ তাকে রক্ষা করবার কোনো উপায় নেই। এ কদিন বনহুর নূরীকে, আরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সব ব্যর্থ হয়ে গেছে নূরী বনহুরকে আজও চিনতে পারেনি।

এক সপ্তাহ হলো জাহাজ আন্দাম বন্দরে থেকে যাত্রা করেছে। এর মধ্যে কোন বন্দরে জাহাজ নোঙ্গর করেনি। বনহুর সতর্ক দৃষ্টি সব সময় হরশঙ্কর ও নূরীকে অক্টোপাশের মত ঘিরে রেখেছে। এমনকি বনহুরের রাতের নিদ্রা অন্তর্ধান হয়েছে। সদা-সর্বদা সে সজাগ রয়েছে কোন সময় যেন শয়তান লোকটা নূরীকে নিয়ে পালাতে না পারে।

বনহুরের শ্যেন্য দৃষ্টি নূরী এবং হরশঙ্করের উপরে যেমন রয়েছে তেমনি হরশঙ্করও বনহুরকে সদা লক্ষ্য রেখে চলেছে। বনহুরের আচরণ তার কাছেও সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে। জাহাজে কত না লোক আছে–কেউ তো তাকে এ ভাবে ফলো করে না বা তার কার্যকলাপে কোন রকম আপত্তি করে না। কিন্তু ঐ যুবকটা কেনো তার সঙ্গে এমনভাবে লেগে রয়েছে। হরশঙ্করও কম লোক নয় সেও ওকে দেখে নেবে।

সেদিন রাতে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী যাত্রিগণকে জানিয়ে দিলেন আর দুদিন পর জাহাজ কাংঙ্গেরী চাই বন্দরে পৌঁছবে তারপর সেখানে চব্বিশ ঘন্টা অবস্থান করার পর পুনরায় লুইয়া বন্দর অভিমুখে যাত্রা করবে কাংঙ্গেরী।

বনহুর বুঝতে পারলোকান্দাই পৌঁছতে কাংঙ্গেরীর এখনও একমাসের বেশী সময় লাগবে। কিন্তু কান্দাই পৌঁছবার পূর্বেই নূরীকে উদ্ধার করে নিতে হবে।

হঠাৎ একটা শব্দে বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো। রাত এখন দুটোর বেশী হবে। বনহুর নিজের ক্যাবিনে বসে কাঁচের শার্শীর ফাঁকে তাকিয়ে ছিলো ডেকের ওদিকে যেখান থেকে নূরীর কক্ষ দেখা যায়। বনহুর কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো। শব্দটা তারই ক্যাবিনের দরজার বইরে থেকে আসছিলো। বনহুর বুঝতে পারলে কেউ তার ক্যাবিনের দরজা বাইরে থেকে খোলার চেষ্টা করছে।

মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর নিজের শয্যায় এসে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। চাদরের ফাঁকে চোখ দুটি সে সজাগ করে রাখলো। দক্ষিণ হাতখানা বালিশের পাশে রইলো যেখানে রয়েছে বনহুরের জমকালো রিভলভার খানা।

ক্যাবিনের দরজা খুলে গেলো।

অতি লঘু পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করলো একটা ছায়ামূর্তি সমস্ত শরীর তার কালো আলখেল্লায় ঢাকা। বনহুর চাদরের নীচে চমকে উঠলো, এই আলখেল্লাধারীকেই সে একদিন জাহাজের ডেকে আত্মগোপন করে বেরাতে দেখেছে। কি অভিসন্ধি নিয়ে তার ক্যাবিনে প্রবেশ করেছে এই ছায়ামূর্তি! বনহুর আপন মনে একটু হাসলো।

লোকটা সতর্ক চোখে তাকালো শয্যার দিকে, তারপর অতিলঘু পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো টেবিলের পাশে। আলখেল্লাধারী এবার অতি সাবধানে টেবিলে থেকে সিগারেট কেসটা তুলে নিলো হাতে-তারপর কি যেন করলো লোকটা সিগারেট কেসটা পুনরায় টেবিলে রেখে বেরিয়ে গৈলো বাইরে।

বনহুর সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো। ইচ্ছে করলে আলখেল্লাধারী যেই হোক তাকে কাবু করার তার পক্ষে কোনই কষ্টকর ছিলোনা, কিন্তু তাকে ধৈর্য ধরতে হলো, কাজ এখনও শেষ হয় নাই।

লোকটা ক্যাবিন ত্যাগ করতেই বনহুর শয্যা ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো। সিগারেট—কেসটা হাতে তুলে নিয়ে একবার দেখলো একটা ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেলো বনহুরের ঠোঁটের কোণে। সিগারেট কেসটা : প্যান্টের পকেটে রেখে দ্রুত সেও ক্যাবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো, সম্মুখে তাকাতেই দেখলো-ছায়ামূর্তি দ্রুত সম্মুখের একটা ক্যাবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বনহুর আর একদন্ড দেরী না করে রেলিং এর আড়ালে আত্মগোপন করে আলখেল্লাধারীকে অনুসরণ করলো।

একি! এ যে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ক্যাবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপার কি! তাহলে কি মুঙ্গেরীকেও হত্যা করবার চেষ্টা চলেছে? ক্যাবিনের নিকটে এসেই আলখেল্লাধারী যেন হাওয়ায় মিশে গেলো।

বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে ভাবলো–তার চোখেও ধুলো দিলো, এমন জন। এই আলখেল্লাধারী। কিন্তু ততক্ষণ বা কদিন বনহুরের দৃষ্টির আড়ালে আত্মগোপন করে থাকবে?

বনহুর ফিরে এলো নিজের ক্যাবিনে।

এবার বড় লাইটটা জেলে সিগারেটকেসটা হাতে তুলে নিলো বনহুর। একটা সিগারেট হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো–না, সিগারেটগুলি সম্পূর্ণ নিখুঁত রয়েছে। কিন্তু এ সিগারেটগুলি যে তার নিজস্ব সিগারেট নয় তার বেশ বুঝতে পারলো বনহুর। এগুলো নিশ্চয়ই কোন মারাত্মক বিষ দ্বারা তৈরী তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর একটা সিগারেট পান করলেই মৃত্যু তার অনিবার্য।

বনহুর সিগারেটগুলি সিগারেটকেস থেকে বের করে নিক্ষেপ করলো কাছের শার্শী দিয়ে সাগরবক্ষে। তারপর ক্যাবিনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে শার্শী খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। ডেকের রেলিংএর রড এগুলো—একটু পা ফসকে গেলেই অথৈ জল রাশি। নীচেই ইঞ্জিনের দাঁতওয়ালা চাকা, একবার যদি পড়ে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের চাকার মধ্যে দেহটা নিষ্পেষিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বনহুর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রেলিং বেয়ে এগুতে লাগলো। যেমন করে হোক নূরীর কক্ষে তাকে পৌঁছতে হবে।

ক্যাবিনের সম্মুখ ভাগ দিয়ে গেলে নিশ্চয়ই সে আলখেল্লাধারী তাকে দেখে ফেলবে বা দেখে ফেলতে পারে। কাজেই বনহুর এই পথে নূরীর ক্যাবিনের দিকে এগুচ্ছে। নূরীর ক্যবিনে পৌঁছতে আরও দুটি ক্যাবিন পার হয়ে তবে যেতে হবে। হঠাৎ বনহুরের কণ্ঠে ভেসে আসে চাপা গম্ভীর কণ্ঠস্বর। দুজন পুরুষ গুরুগম্ভীর গলায় কোনকিছু আলোচনা করছে বলে মনে হলো।

বনহুর অতি সাবধানে রেলিংএর উপর দিয়ে ক্যাবিনটার পিছনে শার্শীর পাশে এসে পৌঁছলো। একবার নীচে তাকিয়ে দেখে নিলো সে। নীচে অসীম জলরাশি গর্জণ করে ছুঁটে চলেছে। জাহাজের ইঞ্জিনের ঝক ঝক শব্দ আর ঝাকুনি বনহুরের দেহে এবং মনে এক অদ্ভুত আলোড়ণ সষ্টি করে চলেছিলো। অতি মনোযোগ সহকারে কান পাতলো বৃনহুর পিছনে শার্শীর ফাঁকে শুনতে পেলো কে যেন গম্ভীর চাপা গলায় বলছে–বন্দরে পৌঁছবার আগেই ওকে সরাতে হবে। অন্য আর একটি কন্ঠ–বোট নৌকাখানা তাহলে জাহাজের পিছনে অংশে বেঁধে রাখলেই চলবে। পূর্বের কণ্ঠ হ পিছনেই বোট-নৌকা বাধা থাকবে। তারপর গভীর রাতে মেয়েটিকে নিয়ে বোটে চাপতে হবে। দ্বিতীয় ব্যক্তির গলায় আওয়াজ–মেয়েটি সজ্ঞানে এভাবে বোটে চাপতে রাজি হবেনা। অন্য কণ্ঠ—না, ওকে অজ্ঞান অবস্থায় নিতে হবে বুঝলে? কাল রাত দুটো মনে রেখো।

বনহুর বুঝতে পারলো, নূরীকে সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নিশ্চয়ই তার গতিবিধি ওরা ধরে ফেলেছে। জাহাজ বন্দরে পৌঁছার পূর্বেই একাজ তারা সমাধা করবে।

বনহুরের কানে এলো আবার প্রথম ব্যক্তির কণ্ঠ-লোকটাকে আমার প্রথম থেকেই কেমন সন্দেহ হয়েছিলো। মায়ার নাচ দেখেই লোকটা কেমন। যেন গম্ভীর হয়ে পড়লো।

বনহুরের ঠোঁটের কোণে এবার একটা হাসির ক্ষীণ রেখাফুটে উঠলো। আর শোনার কিছু নেই। বনহুর অতি সাবধানে এগুলো এবার নিজের ক্যাবিনের দিকে। আজ আর চিন্তার কিছু নেই,কালকের জন্য তাকে তৈরী হতে হবে।

ক্যাবিনে ফিরে এসে সিগারেট কেসটায় সিগারেট ভর্তি করে টেবিলে রাখলো বনহুর, তারপর শয্যায় শুয়ে পড়লো নিশ্চিন্ত মনে।

পরদিন বেলা অনেক হয়ে গেছে তবু ঘুম ভাংছেনা বনহুরের।

ক্যাবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী মৃদু টোকা দিয়ে ডাকলেন—মিঃ সেন, মিঃ সেন?

বনহুর পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করলো।

পুনরায় ক্যাবিনের দরজায় টোকা পড়লো—মিঃ সেন?

দরজায় ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো। মুঙ্গেরী ক্যাবিনের মধ্যে প্রবেশ করে দ্রুত এগিয়ে গেলো শয্যার দিকে মিঃ সেন, মিঃ সেন? গলায় তাঁর উৎকণ্ঠা ভাব।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ধাক্কায় গা মোড়া দিয়ে পাশ ফিরে উঠে বসলো বনহুর হাই তুলে বললো-ক্যাপ্টেন।

গুডমর্নিং, মিঃ সেন।

গুডমর্নিং, বড়ড় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বসুন ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী, বসুন।

মুঙ্গেরী আসন গ্রহণ করেন।

বনহুর শয্যা ত্যাগ করে সোফায় এসে বসলো। টেবিল থেকে সিগারেট–সেটা হাতে তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো মিঃ মুঙ্গেরীর দিকে–নিন।

থ্যাঙ্ক ইউ। সিগাটে আমার কাছেই আছে। কথা শেষ করে নিজের পকেট থেকে সিগাটে-কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলেন ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী।

বনহুর একটা সিগারেট নিজের কেস থেকে নিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরলো।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর মুখমন্ডল ক্ষণিকের জন্য বিবর্ণ হলো যেন, পর মুহূর্তেই নিজকে সামলে নিয়ে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে ম্যাচের কাঠিটা বাড়িয়ে ধরলো বনহুরের ঠোঁটে চেপে ধরা সিগারেটটার দিকে।

বনহুর একটু নীচু হয়ে নিজের সিগারেটটা ক্যাপ্টেনের বাড়িয়ে ধরা ম্যাচে কঠি থেকে অগ্নি সংযোগ করে নিলো। এক মুখ ধোয়া ছেড়ে বললো বনহুর-আজ গোটারাত ঘুমিয়েছি ক্যাপ্টেন–আপনি?

আমিও ঘুমিয়েছি মিঃ সেন।

সুখনিদ্রা —কি বলেন?

হাঁ মিঃ সেন। কথার ফাঁকে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।

বনহুর সিগারেট থেকে ধুমরাশি নিক্ষেপ করলো সামনের দিকে।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী উঠে দাঁড়ালো—আমি একটু কাজে যাচ্ছি মিঃ সেন, পুনরায় অর্ধঘন্টা পর ফিরে আসছি।

আচ্ছা ক্যাপ্টেন।

গুডবাই। অস্ফুট কণ্ঠে বললো বনহুর—গুড বাই।

০৬.

গভীর রাত।

বনহুর বার বার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। একবার সে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলে। আজ আকাশের অবস্থা খুব ভাল নয়। সন্ধ্যার পর থেকে কেমন একটু ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ঝড় তুফান না হলেও দুর্যোগপূর্ণ রাত এটা।

সমস্ত জাহাজটা নিস্তব্ধ নিঝুম।

জাহাজের একটানা ঝক ঝক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই শোনা যাচ্ছেন। জাহাজের ঝক ঝক শব্দের মধ্যে তলিয়ে গেছে বৃষ্টির ঝুপ ঝাপ শব্দটা।

বনহুর ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে।

অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চললো পিছনে ডেকের দিকে।

কেউ যেন তাকে দেখে না ফেলে এইভাবে অতি সাবধানতার সঙ্গে আত্মগোপন করে চলেছে বনহুর।

ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ক্যাবিনের সম্মুখে এসে থামলো।

দক্ষিণ হাতখানা প্যান্টের পকেটে প্রবেশ করিয়ে বের করে আনলো গুলীভরা রিভলভারখানা তারপর অতি দ্রুত প্রবেশ করলো ক্যাবিনের মধ্যে।

ক্যাবিনের মেঝে তখন দাঁড়িয়ে আছে জমকালো পোষাক পরা একটি মূর্তি।

বনহুরকে উদ্যত রিভলভার হাস্ত ক্যবিনে প্রবেশ করতে দেখে আলখেল্লাধারীর চোখ দুটো আগুনের, ভাটার মত ধক করে জ্বলে উঠলো। মুহূর্ত বিলম্ব না করে ঝাপিয়ে পড়লো আলখেল্লাধারী বনহুরের উপর।

বনহুর চট করে সরে দাঁড়ালো এক পাশে।

অলখেল্লাধারী হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো ভূতলে।

বনহুর সেই দন্ডে চেপে বসলো আলখেল্লাধারীর বুকের উপর। বাম হতে টিপে ধরলো ওর গলা, দক্ষিণ হস্তে গুলীভরা রিভলভারখানা আলখেল্লাধালীর কণ্ঠনালীতে চেপে ধরে আলখেল্লাধারীকে কাবু করে ফেললো।

বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা সহজ ব্যাপার নয়।

বনহুরের বাম হাতখানা আলখেল্লাধারীর গলায় সাড়াশীর মত এটে বসলো।

বনহুর এবার দুই হাতে টিপে ধরলো ওরা গলা।

খানিকক্ষণ ছট ফট করে নীরব হয়ে গেলো আলখেল্লাধারীর দেহটা।

এবার বনহুর দ্রুতহস্তে আখেল্লাধারীর মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–শয়তান, ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী সেজে খুব বাহাদুরী করছিলে।

এবার বনহুর দ্রুত হস্তে মৃত মুঙ্গেরীর শরীর থেকে ঐ ড্রেস খুলে নিয়ে নিজে পরে নিলো। ক্যাবিনের আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখলো, না আর তাকে চিনবার কোন উপায় নেই।

বনহুর এবার রিভলভার পকেটে রেখে ক্যাবিনের একপাশে এগিয়ে গেলো। সম্মুখেই একটা চাকার আকারে জিনিস নজরে পড়লো তার। বনহুর দ্রুত চাকার মত জিনিসটায় চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা তক্তা খসে পড়লো। ভিতরে একটা খুপড়ীর মত কুঠি জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছে একটি লোক। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো কোঠরাগত; বুকের হাড় কখানা যেন গোনা যাচ্ছে। বনহুর ভূতলে লুণ্ঠিত লোকটার পাশে হাটু গেড়ে বসে ক্ষিপ্রহস্তে ওর শরীরের বাধন মুক্ত করে দিলো। লোকটা ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-পানি–

বনহুর পাশের ক্যাবিনে প্রবেশ করে এক গ্লাস পানি নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে গেলো লোকটার পাশে। হাতে দিয়ে বললো-খাও।

এক নিশ্বাসে গ্লাসের পানিটুকু পান করে বললো—শয়তান, কেনো তুমি আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো? আমাকে তার চেয়ে হত্যা করো।

বনহুর বুঝতে পারলো, আলখেল্লাধারী একে এই কুঠরিতে আটকে রেখে ভয়নক কষ্ট দিয়েছে।

বনহুর লোকটাকে বললো এবার আর তোমাকে কষ্ট দেবোন, তুমি মুক্ত।

লোকটা হাত-পায়ের বন্ধন মুক্ত হওয়ায় অনেকটা শান্তি পাচ্ছিলো। হাতে এবং পায় হাত বুলিয়ে বললোসত্যি তুমি আমাকে মুক্ত করে দিলে?

হাঁ, ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী আপনি মুক্ত। আর সেই শয়তান নকল মুঙ্গেরীকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত দিয়েছি।

তাহলে তুমি—তুমি কে?

আমি দস্যু বনহুর।

দস্যু বনহুর।

হাঁ, ভয় পাবার কিছু নেই।

কিন্তু–

আমি এই মুহূর্তে জাহাজ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছি।

তুমি–চলে–যাচ্ছো? টেনে টেনে কথাটা বললেন মিঃ মুঙ্গেরী।

হাঁ বন্ধু। কথা শেষ করে বনহুর হাতঘড়িটার দিকে তাকালোদুটো বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকী।

বনহুর জাহাজের পিছন ডেকে এসে দাঁড়ালো।

দেখতে পেলো, একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আলখেল্লাপরা বনহুরকে দেখে সরে এলো দ্রুত গতিতে তারপর বললো—এতো বিলম্ব হলো কেন তোমার?

কণ্ঠস্বরে বনহুর চিনতে পারলো এটাই সেই বংশীবাদক-নূরীর নৃত্যকালে বাঁশী বাজাতো।

বনহুর চাপা কণ্ঠে বললো—হঠাৎ মিঃ সেন অজ্ঞান হয়ে পড়ায়—

তাহলে সিগারেটের বিষক্রিয়া এতোক্ষণে শুরু হলো?

হাঁ, সেই রকম মনে হচ্ছে।

বেটা ঘুঘু দেখেছিলো কিন্তু ফাঁদ দেখেনি। আমার পিছনে লেগেছিলো সে, লোভ-মেয়েটিকে হস্তগত করা।

আমারও সেই রকম মনে হয়েছিলো। আচ্ছা সর্দার—

হেসে উঠলো ইরশঙ্কর—তুমি আবার সর্দার বলা শিখলে কবে থেকে?

আলখেল্লার মধ্যে বনহুর বিব্রত বোধ করলো। সর্বনাশ তার কথাটা তাহলে ভুল হয়েছে। তাড়াতাড়ি বললো বনহুর–আমি এখন থেকে সর্দার বলেই ডাকাবো।

কেনো হে, তুমি কি আমাকে সম্মান দেখাচ্ছো? পূর্বে যেমন হরশঙ্কর বলে ডাকতে তাই ডেকো। কিন্তু আর বিলম্ব নয়, সময় হয়ে এসেছে।

এদিকের সব কাজ ঠিকভাবে হয়ে গেছে তো? মানে ওকে বোটে উঠানো হয়েছে? কথাগুলো অতি সাবধানে বললো বনহুর।

হয়েছে। এদিকের সব কাজ শেষ-শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

তাহলে চলো বন্ধু।

আজ তোমাকে বেশ খুশী খুশী লাগছে কেশব। এমন না হলে চলে!

বললো আলখেল্লাধারী বনহুর—এতোক্ষণ মিঃ সেন হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

তাই বুঝি এতো আনন্দ?

হাঁ হরশঙ্কর কিন্তু এখন আমাদের জাহাজ ত্যাগ না করলেও চলতো। পথের কাঁটা দূর হলো তো?

এরি মধ্যে ভুলে গেলে সব কথা। আসছে পৃর্ণিমায় আমার যোগিণী পূজা আছে। তার পূর্বে আমাকে আশ্রমে পৌঁছতে হবে। না হলে আমার যাদুর মায়াচক্র নষ্ট হয়ে যাবে।

তাহলে যাত্রা শুরু না করলেই পারতে হরশঙ্কর। কি দরকার ছিলো এ জাহাজে এসে?

হেসে উঠলো হরশঙ্কর–তুমি এমন হয়ে গেলে কবে থেকে, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? জাহাজে আসার উদ্দেশ্যটাও ভুলে গেছো দেখছি।

ওঃ এবার সব মনে পড়েছে। চলো আর দেরী করা ঠিক নয়। মনে পড়ছে বললো বটে বনহুর, কিন্তু কেনো শয়তান হরশঙ্কর এ জাহাজে আশ্রয় নিয়ে এতোদূর এসে আবার ফিরে যাচ্ছে সেটা এখনও সে বুঝতে পারলোনা।

সেটা বুঝলে মোটর বোটে বসে।

হরশঙ্কর নিজে ইঞ্জিনে গিয়ে বসলো।

বোটের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে একটি নারীমূর্তি। বনহুর বুঝতে পারলো-নূরী ওটা। ওর দুপাশে দুটি বলিষ্ঠকায় লোক বসে। আলখেল্লাধারী বনহুর বসলো এক পাশে।

মোটর বোটখানার তলায় স্তুপকার নানা ধরনের মূল্যবান সামগ্রী। স্যুটকেস, ব্যাগ, নানা রকমের আরও কত কি রয়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো-এগুলি চুরি করার জন্যই শয়তান হরশঙ্কর এ জাহাজে আশ্রয় নিয়ে লোককে নাচ-গান শুনিয়ে মাতিয়ে রাখতো। আসল উদ্দেশ্য হলো এ সব লুটে নেওয়া।

বনহুর নীরবে বসে রইলো, এই মুহূর্তে সে এদের তিন জনকে কাবু করে সাগরের জলে নিক্ষেপ করতে পারে কিন্তু তাহলে তার সব উদ্দেশ্য সফল হবেনা। নূরী এখন স্বাভাবিক জ্ঞানে নেই বিশেষ করে ওকে নিয়ে বড় অসুবিধা হবে হয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। নূরী সাগরবক্ষে ঝাপিয়েও পড়তে পারে-কাজেই বনহুর নিশ্চুপ রইলো।

চলন্ত জাহাজের পিছনে উচ্ছল জলরাশির বুকে মোটর বোটখানা ছোট্ট একটা কুটোর মত দোল খাচ্ছিলো।

জাহাজ থেকে মোটর-বোটখানা খুলে নেওয়া হলো।

সঙ্গে সঙ্গে ঘুরপাক খেয়ে মোটর বোটখানা ছিটকে গেলো প্রায় এক শত গজ দূরে।

হরশঙ্কর কৌশলে ইঞ্জিন ঠিক রেখে ডুবু ডুবু মোটর বোট-খানাকে সামলে নিলো।

বনহুর অবাক না হয়ে পারলোনা, অতি দক্ষ শয়তান এটা বুঝতে পারলো।

নূরী পড়তে যাচ্ছিলো, বনহুর নূরীকে ধরে ফেলেছিলো অতি সাবধানে। মোটর-বোটখানা সোজা হতেই বনহুর নূরীকে ছেড়ে দিলো ক্ষিপ্রগতিতে। অন্য কেউ লক্ষ্য করবার পূর্বেই সে একাজ করে ফেললো।

নূরী চীকার করেছিলো বটে, কিন্তু কিসের ভয়ে সে চীৎকার করেছিলো কেউ বুঝতে পারলোনা। মোটর-বোট ডুবে যাওয়ার ভয়ে না, আলখেল্লাধারী তাকে ধরে ফেলেছিলো সেই জন্যে। অন্য কেউ না বুঝলেও বনহুর বুঝতে পেরেছিলোনূরী তাকেই দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো।

মোটর বোট থেকে লক্ষ্য করলো বনহুর, জাহাজখানা ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।

তীর বেগে ছুটে চলছে মোটর বোটখানা।

হরশঙ্কর দক্ষ মোটর-বোট চালকের মত বোটখানা চালিয়ে চলেছে।

এক সময় বললো হরশঙ্করের একজন অনুচর-গুরুদেব তোর হবার পূর্বেই কি আমরা আশ্রমে পৌঁছতে সক্ষম হবো?

হাঁ মহন্ত হবো। বললো হরশঙ্কর।

অন্য একজন অনুচর বলে উঠলো—গুরুদেব, আমাদের বন্ধ্যা বন ছেড়ে মহানগর কত দূর ছিলো?

পুনরায় হরশংকর জবাব দিলো-হাজার হাজার মাইল দূরে। আমরা প্রায় এক সপ্তাহ কাল চলে মহানগরে পৌঁছেছিলাম। এ কথা নিশ্চয়ই তোমাদের স্মরণ আছে?

হাঁ গুরুদেব, আছে।

এবার বললো আলখেল্লাধারী বনহুরহরশঙ্কর আমরা জাহাজে বন্ধ্যা বনের–

হাঁ কেশব, আমরা জাহাজে আমাদের বন্ধ্যা বনের অতি নিকটে এসে গেছি। ভোর হবার পূর্বেই আমরা আশ্রমে পৌঁছবো আশা করি।

হরশঙ্করের কথা সত্য হলো।

অবিরাম গতিতে মোটর বোটখানা চালিয়ে হরশঙ্কর ভোর হাবার কিছু পূর্বে বন্ধ্যা বনের ধারে এসে নেমে পড়লো।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর। পথে দিনের আলো ফুটে উঠলো আত্মগোপন করায় অসুবিধা হতো তার।

হরশঙ্করের সঙ্গে এগিয়ে চললো তার অনুচরদ্বয় ও নূরী। পিছনে আলখেল্লাধারী বনহুর।

সুন্দর বনটা, কোথাও এতোটুকু আগাছা বা ঝোপঝাড় নেই। মনে হচ্ছে কেউ যেন গোটা বনটা পরিস্কার করে রেখেছে।

এই সেই বন।

যে বনে নূরী মনিকে নিয়ে প্রথম পদার্পণ করেছিলো, যে বনে সন্ন্যাসী বাবাজী তাকে আশ্রয় দিয়েছিলো এই সেই বন-বন্ধ্যা এর নাম।

বেশ কিছু দূর এগুনোর পর হরশঙ্কর পূর্বদিকে অগ্রসর হলো।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো অন্যান্য অনুচারগণ ও নূরী। অগত্যা বনহুরও দাঁড়িয়ে পড়লো।

হরশঙ্কর আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে গহণ বনের অন্তরালে অদৃশ্য হলো।

অনুচরদ্বয় নূরীসহ অগ্রসর হলো পশ্চিমে।

বনহুরও তাদেরকে অনুসরণ করলো।

০৭.

মনিরা সন্তানকে ফিরে পেয়ে খুশীর অন্ত নেই তার। এটাই যে তার নূর তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক বছরের শিশু নূরকে যখন হারিয়েছিলো মনিরা তখন নূরের শিশু মুখ খানা আকাঁ ছিলো মায়ের হৃদয়পটে। সেদিন খেলা দেখতে গিয়ে মনিরার কিছুমাত্র ভুল হয়নি নূরকে চিনতে।

এতো সহজেই মনিরার তার নূরকে পাবে কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। মনিরা ভেবেছিলে নূরকে কপালিক সন্ন্যাসিগণ হত্যা করে ফেলেছে। আর কোনদিন তাকে ফিরে পাবে না। ঐ সুন্দর ফুটফুটে মুখখানা আর দেখতে পাবে না কোনদিন। কিন্তু সবই খোদার ইচ্ছা—তিনি কি না পারেন। তার ইচ্ছায় আজ মনিরা তার হারানো রত্ন ফিরে পেলো। হাজার হাজার শুকরিয়া করে মনিরা খোদার দরগায়।

শিশু নূরকে পেয়ে শুধু মনিরাই খুশী হয়নি, খুশী হয়েছেন মরিয়ম বেগম। তার সুপ্ত হৃদয়ে যেন আবার অনন্দের বান বয়ে চলছে। খুশীর অন্ত নেই। চৌধুরী বাড়ী বহুদিন পরে আবার শিশুর কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে।

বৃদ্ধ সরকার সাহেবও আজ আনন্দে আত্মহারা।

চৌধুরী বাড়ীর সুখ-দুঃখের সঙ্গে তিনি যে নিবিড়ভাবে জড়ানো। এ বাড়ীতে যখন দুঃখ আর বেদনার ছায়া ঘনিয়ে আসে, বৃদ্ধ সরকার সাহেবের মন তখন ব্যথায় কুঁকড়ে যায়, মুখের সাদা হাস্যময় ভাব বিলুপ্ত হয় কোন অজানার অন্ধকারে। আবার যখন চৌধুরী বাড়ীতে খুশীর বান ডেকে যায় তখন সরকার সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠে, আনন্দে তিনি ছোট্ট শিশুর মতই উহৃল্ল হয়ে উঠেন।

নূরকে পেয়ে বৃদ্ধ সরকার সাহেব ছোট্ট শিশুর মতই আনন্দে মেতে উঠেন।

এতো সুখেও এ বাড়ীতে যেন এতোদিন কোন সুখ ছিলোনা। অভাব ছিলোনা কোন জিনিসের, তবু যেন সদা অভাব কিসের অনুভব করতো বাড়ীর সবাই।

সারাটা দিন চৌধুরী বাড়ীর হিসেব-নিকেশ নিয়ে এতোটুকু অবকাশ ছিলোনা সরকার সাহেবের—আজ এতো কাজের মধ্যেও প্রচুর সময় তিনি নূরকে নিয়ে কাটিয়ে দেন। নূরও সরকার সাহেবকে পেলে কোন কথা নেই, আনন্দে আত্মহারা হয় সে।

নূর সরকার সাহেবকে দাদু বলে ডাকে।

ড্রইংরুমে দাদু আর নাতি মিলে চলতো কত হাসি আর গল্প।

ভূত-প্রেত আর রাক্ষসের গল্প শুনতে ভালবাসতো নূর। যুদ্ধ আর লড়াইয়ের কথা শুনলে শিশু নূরের ধমনীর রক্ত যেন উষ্ণ হয়ে উঠতো।

সরকার সাহেবকে বলতো নূর-এসো দাদু, লড়াই করি।

হেসে বলতেন সরকার সাহেব-না দাদু, আমি তো বাঘ নই,যে আমার সঙ্গে লড়াই করবে।

এসো না একটু দাদু।

নূর বৃদ্ধ সরকার সাহেবকে নাজেহাল ও পেরেশান করে তবে ছাড়তো।

বৃদ্ধ সরকার সাহেবকে হারিয়ে দিয়ে ছুটে যেতো নূর মায়ের পাশে–আম্মা আম্মা, আমি দাদুকে হারিয়ে দিয়েছি। দাদুকে হারিয়ে দিয়েছি।

মনিরা হাস্য উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে আসে দুহাতে নূরকে কোলে তুলে নিয়ে বলে–ছিঃ দাদুকে বুঝি হারিয়ে দিতে আছে।

ততক্ষণে বৃদ্ধ সরকার সাহেব এসে দাঁড়ান মা ও পুত্রের পাশে, মিষ্টি হেসে বলেন—মা মনিরা, তোমার ছেলে বড় হলে মস্ত একজন বীর পুরুষ হবে। এখন দাদুকে হারিয়ে দিয়ে জয়ী হয়েছে তখন হাজার হাজার সৈনিককে পরাজিত করে রাজ্যজয় করবেও।

হাসতো মনিরা।

মরিয়ম বেগমও এসে দাঁড়াতেন তাদের পাশে, তাঁর মুখেও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো।

নূর মনিরার পাশে শুয়ে বলতো—আম্মা আমার কিন্তু আর একটা মাম্মা ছিলো ঠিক তোমার মত।

নূরের উপর থেকে যাদুকরের যাদুক্রিয়া দূর হয়ে যাওয়ায় এখন তার মনে পড়তো নূরীর কথা। মাঝে মাঝে নূরীর জন্য মন খারাপ হতো শিশু নূরের।

সেদিন মনিরা খোলা জানালার পাশে দুগ্ধ-ফেননি বিছানায় শুয়ে আছে। কোলের কাছে নূর।

আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ হাসছে।

জোছনার আলো এসে পড়েছে মনিরা ও নূরের মুখে।

মনিরা নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে আর এক জনের কথা—যার দান এই অমূল্য রত্ন। না জানি সে আজ কোথায় কেমন আছে। বেঁচে আছে কিনা তাই বা কে জানে।

শিশু নূরের ছোট্ট সুন্দর ললাট থেকে কোঁকড়ানো চুলগুলি সরিয়ে দিয়ে মনিরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। গন্ড বেয়ে গড়িয়ে এলো দুফোটা অশ্রু।

এমনি আরও বহুদিন মনিরা তার স্বামীর জন্য নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেছে। কিন্তু শিশু নূরের সম্মুখে সে কোন দিন চোখের পানি ফেলে নি। যতদূর সম্ভব মনিরা নিজকে সংযত করে রাখতো নূরের কাছে।

আজ মনিরার চোখে অশ্রু দেখে বললো নূর—আম্মা, তুমি কাঁদছো!

তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে ফেলে বললো মনিরা-কই না তো। এমনি চোখে কুটো পড়েছিলো বাবা।

আম্মা, আমার কিন্তু আর একটা মাম্মা ছিলো ঠিক্ তোমার মত।

আমার মত?

হাঁ, মাম্মা সুন্দর গান জানতো। আমি না ঘুমোলে মাম্মা গান গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতো।

আশ্চর্য হয়ে শোনে মনিরা, শিশু নূরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলে সে-আচ্ছা নূর–

দুহাতে মনিরার গলা জড়িয়ে ধরে বলে নূর আম্মা, তুমি আমাকে নূর বলে ডাকো কোনো? আমার নাম যে মনি, মাম্মা আমাকে মনি বলে ডাকতো।

অবাক হয়ে শুনতো মনিরাকে সে নারী, যে তার সন্তানকে এতো স্নেহ-আদর দিয়ে মানুষ করেছে। ঐ শয়তান যাদুকরের সঙ্গে সে নারীর কি সম্বন্ধ কে জানে।

মনিরা বললো-বাপ, আমি তোমার নাম নূর রাখলাম। কেনো নূর নামটা তোমার ভাল লাগে না?

বেশ, তুমি আমাকে নূর বলে ডেকো আর মাম্মা আমাকে মনি বলে ডাকবে, আমার দুটো নাম হবে—কি সুন্দর, তাই না? তুমি নূর আর মাম্মা মনি–শুনো আম্মা, মাম্মা আমাকে অনেক ভালবাসতো।

আমি তোমাকে একটুও ভালবাসতে পারিনা তাই না?

তুমিও ভালবাসো। কিন্তু গান গাইতে জানো না, তাই—

তাই আমাকে ভাল লাগে না বুঝি?

আমার মাম্মার জন্য মন কেমন করছে।

শিশু নূর মুখখানা গম্ভীর বিষণ্ণ করে ফেললো।

মনিরা বুকে চেপে ধরে বললো-ওরে আমি যে তোর মা।

না, আমার মাম্মা আছে। আমি তার কাছে যাবো।

কোথায় আছে তোমার সেই মাম্মা?

জানি না।

তা হলে কি করে যাবে তার কাছে?

আমি বুঝি কোন দিন মাম্মার কাছে যেতে পারবো না?

পারবে। তোমার মাম্মা আসবে।

আমাকে নিতে?

মনিরা শিউরে উঠে, জবাব দিতে পারে না।

নূর মায়ের মুখে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে বলে-মাম্মা আমাকে কবে নিতে আসবে আম্মা বলো?

আসবে। তুমি এখন ঘুমোও নূর।

না, আমার চোখে ঘুম আসছেনা।

গান গাইলে ঘুমাবে?

তুমি গান গাইতে জানো আম্মা?

একটু একটু জানি বাপ।

তবে গাও–আমি ঘুমোবো আম্মা। নুর চোখ বন্ধ করে।

মনিরা নূরের গায়ে মৃদু মৃদু দোলা দিয়ে গান ধরে। সুমিষ্ট মধুর সুরে গান মনিরা:

আমার নূর ঘুমাবে
আকাশে চাঁদ হাসবে।
হাস্নাহেনার গন্ধ নিয়ে
সমীরণ ভাসবে।
তারার দল মিটি মিটি
চেয়ে চেয়ে দেখবে।
আমার নূর ঘুমাবে।

এতো সুন্দর সুরে গাইতে পারে তার আম্মা ভাবতেই পারেনি নূর, আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে—তুমি এতো সুন্দর গান গাইতে জানো আম্মা! রোজ এমনি করে গান গাইবে—আমি ঘুমোবো।

আচ্ছা, তুমি ঘুমোও নূর, আমি গান গাইছি।

মনিরার গানের সুরে ঘুমিয়ে পড়ে নূর। মনিরা জোছনার আলোতে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে পুত্রের ঘুমন্ত ঘুমের দিকে।

ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে যায় মনিরা তাকায় জোছনায় ভরা আকাশের দিকে। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে বনহুরের মুখখানা। মনে পড়ে অতীতে বিলীন হয়ে যাওয়া কত স্মৃতি–স্বামীর বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে মনিরা। নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেয় বনহুর ওকে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকে-মনিরা!

মনিরা মুখ তুলে তাকায় স্বামীর মুখের দিকে—বলো?

তুমি একি করলে মনিরা?

কেনো?

আমাকে স্বামীরূপে গ্রহণ করে তুমি ভুল করলে।

না, ভুল আমি করিনি। তোমাকে স্বামীরূপে পেয়ে আজ আমি ধন্য হয়েছি।

বনহুর মনিরার চিবুকটা তুলে ধরে—মনিরা।

মনিরা স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে অনুভব করে স্বর্গের শান্তি।

সব কথা মনের পর্দায় ভেসে উঠে মনিরার। কোথায় গেলো তার জীবনের স্বর্গসুখ। কোথায় গেলো তার এতো খুশী এতো আনন্দ–হাসিগান–

মনিরার বালিশ সিক্ত হয়ে উঠে চোখের পানিতে।

ঘুমন্ত নূরকে বুকে আঁকড়ে ধরে ডাকে মনিরা-বাপ আমার।

আকাশে চাঁদ তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে।

০৮.

বন্ধ্যার জঙ্গলে বনহুরকে ধরে রাখে এমন জন কেউ নেই। পিঞ্জরাবদ্ধ হিংস্র জন্ত ছাড়া পেলে যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে তেমনি দুর্দান্ত হয়ে উঠলো বনহুর।

হরশঙ্করের দলের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করলো সে বন্ধ্যার জঙ্গলে।

গাছের ফল আর ঝর্ণার জল হলো বনহুরের ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণের একমাত্র সম্বল। দিনের আলোতে সে লুকিয়ে থাকে গাছের শাখার অন্তরালে। রাতের অন্ধকারে নেমে আসে সে গহন বনের মধ্যে। চারিদিকে সর্তক দৃষ্টি নিয়ে বিচরণ করে বেড়ায় গোটা বনভূমি।

বনহুরের একমাত্র চিন্তা নূরীকে উদ্ধার করা।

কিন্তু যতক্ষণ নূরী তার স্বাভাবিক জ্ঞানে ফিরে না এসেছে ততক্ষণ বনহুর যেন নিরুপায়। নূরীকে জোর করে হরণ করতে পারে সে। পারলে কি হবে, তাকে নিয়ে এ বন ছেড়ে চলে যেতে হবে তো। চলে যাবার পথ কোথায়? বনপথে কিসে যাবে-ঘোড়া নেই। আর জল পথে যাওয়া যায় তবু নৌকা বা জলযানের প্রয়োজুন।

বনহুর নূরীর উদ্ধার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লো। সুযোগ খুঁজতে। লাগলো-এই দলের নেতা হরশঙ্করকে হত্যা করবে নাহলে কোন উপায় নেই।

বনহুর দুষ্টজনকে হত্যা করতে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনা। বরং আনন্দ লাভ করে।

বনহুর একদিন গভীর রাতে বন্ধ্যা বনের মধ্যে বিচরণ করে ফিরছিলো। অনেক সন্ধান করেও হরশঙ্করকে সে আজও আবিস্কার করতে সক্ষম হয়নি। আশ্চর্য হয়ে গেছে সে, লোকটা গেলো কোথায়।

গহন বনের মধ্যে একটা কাঠের তৈরী কুঠি নজরে পড়লো। বনহুর। জঙ্গলে আত্মগোপন করে কুঠিখানার নিকটে পৌঁছলো। বিস্ময়ে আরষ্ট হলে বনহুর কুঠির ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলো–শুধু নূরী নয় অমনি আরও কতকগুলি যুবতীকে সেই কুঠিতে আটকে রাখা হয়েছে। যুবতীদের দেহে তেমন কোন বস্ত্র নেই প্রায় উলঙ্গের মত রয়েছে সবাই।

বনহুর লজ্জায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।

আশ্চর্য, যুবতীগুলি যেন পাথরের মূর্তির মত চুপচাপ বসে আছে, কেমন এক তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তাদের চোখে মুখে।

বনহুর নূরীর কথা স্মরণ করে আবার কুঠরীর মধ্যে তাকালো নূরীকে উদ্ধার করতে হলে লজ্জা তাকে বিসর্জন দিতে হবে।

বনহুর প্রতিটি নারীর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে চললো। যদিও এটা তার অন্যায়, কোন পুরুষ নারীর যৌবন লুকিয়ে দেখা ঠিক নয়। বনহুরের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেলো একটি যুবতীর উপর এই তো তার নূরী পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে।

বনহুরের চোখে পানি এলো,তার চিরচঞ্চল নূরী কোনদিন এমনতো ছিলোনা। কি হয়েছে তার কেনই বা সে তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বনহুর যখন এই সব কথা ভাবছে ঠিক সেই মুহূর্তে কুঠির দরজা খুলে গেলো।

কুঠির মধ্যে প্রবেশ করলো হরশঙ্কর ও আরও দুজন পুরুষ। কুঠির মধ্যভাগে একটি মশাল জ্বলছিলো। মশালের আলোতে বনহুর সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

হরশংকর কুঠির মধ্যে এসে দাঁড়ালো।

পিছনের একটি লোকের হাতে মস্তবড় একটি মাটির পাতিল। হরশঙ্কর ইংগিত করতেই পিছনের আর একজন লোক মাটির পাতিল হতে একটি গেলাসে তরল পদার্থ জাতীয় কিছু তুলে নিয়ে প্রতিটি মেয়ের মুখে ধরলো।

হরশংকর গুরুগম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলো-খাও।

যুবতী ভয় কাতর চোখে তাকালো হরশঙ্করের দিকে। তারপর নিঃশব্দে পান করলো তরল পদার্থ।

বনহুর কাঠের ফাঁকে তখনও নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে।

হরশঙ্কর যমমূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। আর লোক দুটি মাটির পাতিল থেকে তরল পদার্থ নিয়ে পান করাচ্ছে একজনের পর একজনকে।

বনহুরের দুচোখে বিস্ময় এবার বুঝতে পারলো সে শয়তান হরশঙ্কর কোন মারাত্মক রস দ্বারা এ সব যুবতীকে সংজ্ঞাহারা করে রেখেছে। প্রতিদিন সে এইভাবে এদের ঐ রস খাওয়ায়। এবং ইচ্ছামত যাকে খুশী নিয়ে গিয়ে শহরে নাচ–গান দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করে তৎসহ করে চুরি ডাকাতি এমনি আর কত কি। রাগে বনহুরের শরীর জ্বালা করে দুচোখে তার আগুন ঠিকরে বের হয়।

বনহুর দেখলো, লোকটা এবার নূরীর দিকে গেলাস হাতে এগুচ্ছে।

বনহুর অধর দংশন করে।

লোকটা নূরীর মুখে গেলাস উঁচু করে ধরতেই বনহুরের রিভলবার থেকে একটা গুলী এসে বিদ্ধ হলো তার বুকে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ভূতলে।

হরশংকর কুদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জন করে ছুটে গেলো কুঠিরের বাইরে।

বনহুর তখন অদৃশ্য হয়েছে।

এরপর হরশঙ্কর বুঝতে পারলো-শত্রু তার অতি নিকটে পৌঁছে গেছে। তার অনুচরগণকে জানিয়ে দিলো এ বনের চারিদিকে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করতে।

হরশঙ্কর গহন বনে থাকলেও তার বিরাট একটা দল আছে। তার অনুচরগণ এক এক জন এক একটী নারী নিয়ে কেউ বা শিশুদের নিয়ে নানা রকমের যাদু খেলা দেখাতে দূর হতে দূর দেশে চলে যায়।

এই দোল পুর্নিমায় সবাই দূর দেশ থেকে ফিরে আসে বন্ধ্যার জঙ্গলে। হরশঙ্কর নরহত্যা করে দোল পূর্ণিমায় তার পূজা শেষ করে।

হরশঙ্করের অনুচরগণ সবাই এখন বন্ধ্যার জঙ্গলে রয়েছে। গুরুদেবের আদেশ পাওয়া মাত্র সবাই ছড়িয়ে পড়লো গোটা বনের মধ্যে। কে এই শত্রু, যার গুলীতে তাদের একজন নিহত হলো।

কেউ বা বল্লম, কেউ বা শরকী, দা, কুঠার, খর্গ-যে যা পারলো তাই নিয়ে চষে ফিরতে লাগলো বনভূমি।

কিন্তু কোথায় কাউকে খুঁজে পেলো না।

সন্ধ্যার পূর্বে সবাই হরশঙ্করের সম্মুখে হাজির হলো।

নত মস্তকে সবাই জানালো বনভূমি তারা চষে ফেলেছে কিন্তু কাউকে পাওয়া যায় নি।

একজন অনুচর এগিয়ে এলো-গুরুদেব আমি কাউকে খুঁজে না পেলেও এমন একটা জিনিস পেয়েছি যার দ্বারা বোঝা যায়-আমাদের এই বন্ধ্যা জঙ্গলে কোন–

কথা শেষ হয় না লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় মাটিতে। লোকটার বুকের রক্তে রাঙা হয়ে উঠে বন্ধ্যা জঙ্গলের শুকনো মাটি।

হরশঙ্কর ও অন্যান্য অনুচরগন শুনতে পেয়েছিলো একটা গুলীর শব্দ, পরক্ষণেই লোকটা পড়ে গিয়েছিলো ভূতলে।

হরশঙ্কর ইংগিত করলো অনুচরগণকে যেতে। কিন্তু কোন দিক থেকে। গুলীটা এসেছিলো এটা কেউ বলতে পারলোনা। তবু সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে।

হরশঙ্কর এগিয়ে গেলো মৃতলোকটার দিকে, কি পেয়েছিলো। সে, যার জন্য তার মৃত্যু ঘটলো।

হরশঙ্কর ঝুকে পড়লো লোকটার হাতের উপর, দেখতে পেলো-একটা সিগারেটের টুকরা রয়েছে তার হাতের মুঠায়।

হরশঙ্কর মৃতের হাতের তালু থেকে সিগারেটের টুকরাটা তুলে নিয়ে হেসে উঠলো-হাঃ হাঃ হাঃ–হাঃ হাঃ হাঃ।

০৯.

যাদুকর হরশঙ্করের দল যখন সমস্ত বন খুঁজে খুঁজে হয়রান পেরেশান তখন বনহুর সুউচ্চ এক ডালের ঘন পাতায় ফাঁকে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বসে মৃদু মৃদু হাসছে। একবার রিভলবারটা খুলে দেখে নিলো-মাত্র আর তিনটা গুলী অবশিষ্ট রয়েছে। ইচ্ছা করলে এ গুলী তিনটা দিয়ে তিন জনকে পর পারে পাঠাতে পারে কিন্তু এতো শীঘ্র রিক্তহস্ত হলে তার চলবেনা। যতক্ষণ নূরীকে উদ্ধার করা না যায় ততক্ষণ তাকে এ গুলী কটি সাবধানে ব্যয় করতে হবে।

কিন্তু সেই দিনের পর থেকে আবার হরশঙ্কর উধাও হলো।

বনহুর আশ্চর্য হলো—লোকটা আবার গেলো কোথায়। যেখানেই থাক বনহুর, হরশঙ্করের উপর ছিলো তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বনহুর গাছের ডালে ডালে থেকে সর্তক অনুসন্ধান চালালো। এ মুহূর্তে নূরীকে উদ্ধার করা মোটেই কোন অসুবিধাজনক নয়। কিন্তু নূরীকে উদ্ধারের পূর্বে জানতে হবে—কে এই পাষন্ড নরপিশাচ? কোথায় এর বাস, কি উদ্দেশ্য এর? .

বনহুর একদিন গাছের শাখায় বসে তাকাচ্ছিলো দূর হতে দূর-যত দূর তার দৃষ্টি যায়। হঠাৎ নজর তার চলে গেলো অদূরে এক বটবৃক্ষতলে এক সন্ন্যাসীর উপর।

চমকে উঠলো বনহুর-সন্ন্যাসী বাবাজী এই গহণ বনে!

বনহুরের চোখদুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এই সমস্ত জঙ্গলে মহৎ ব্যক্তিও বাস করে। সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিলন আশায় উদগ্রীব হয়ে উঠলো বনহুর।

হঠাৎ বনহুর শুনতে পেলো একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠ–বস, এসো, আমি তোমার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছি।

বনহুর বিস্ময়ভরা চোখে তাকালো, তার এখানে উপস্থিতি সন্ন্যাসী বাবাজী জানলো কি করে। বনহুর বৃক্ষ শাখা ত্যাগ করে নেমে এলো নীচে।

সন্ন্যাসী বাবাজী বললো-বৎস তুমি ঐখানে উপবেশন করো। বনহুর বসে পড়লো আদুরে একটা গাছের গুড়ির পাশে।

সন্ন্যাসী বললো-বৎস, জানি তুমি কিসের সন্ধানে আজ এই বন্ধ্যার জঙ্গলে এসেছে।

বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

কিন্তু বৎস, তুমি কোন সময় এ বনের পশ্চিম অংশে যাবে না।

বনহুর প্রশ্ন করলো—কেনো?

সন্নাসী বাবাজী বললো–ঐদিকে বিপদ আছে।

বিপদ!

হাঁ, মায়ারাণীর মায়াজালে জড়িয়ে পড়বে।

মায়ারাণীর মায়াজাল……..হঠাৎ অট্টহাসিতে ভেংগে পড়লো বনহুর। মুহূর্ত বিলম্ব না করে সন্ন্যাসীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। রিভলভার চেপে ধরলো সন্ন্যাসীর কণ্ঠনালীতে।

কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠলো বনহুর তুমি সন্ন্যাসী সেজে মায়ারাণীর মায়াজালে জড়িয়ে পড়ার ভয় দেখাচ্ছো হরশঙ্কর-জানো আমি কে?

সন্ন্যাসী বেশী হরশঙ্কর একটুও নড়লো না, চোখ দুটো দিয়ে অগ্নি বর্ষণ করলো। বনহুর ওর দৃষ্টির দিকে তাকাতেই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করলো, টলতে লাগলো তার পা দুখানা। এতে তেজ হরশঙ্করের চোখে! বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে রিভলভার থেকে গুলী ছুঁড়লো।

একটা আর্তনাদ হলো মাত্র।

বনহুর অবাক হয়ে দেখলো-হরশঙ্কর যেমন বসে ছিল তেমনি রইলো। একটু সরলো না সে।

বনহুর এবার ভাল করে লক্ষ্য করতেই আশ্চর্য হলো, সন্ন্যাসী বেশী হরশংকরের দেহটা সম্পূর্ণ বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

বনহুর হাত দিয়ে নাড়া দিতে লাগলো, মনের মধ্যে সন্দেহ জাগলো–হরশঙ্কর না হয়ে যদি সত্যই কোন সন্ন্যাসী হয়, তা হলে একটা নিরপরাধ মহৎ জনকে খুন করার অপরাধে অপরাধী হবে সে। বনহুর দাড়ি ধরে টানতেই খসে এলো–জটাজুটসহ মাথার চুলও খুলে এলো তার হাতের মুঠায়। এবার বনহুর আশ্বস্ত হলো, তার অনুমান তা হলে মিথ্যে হয়নি। অহেতুক একটি মহৎ জীবন নামের অপরাধে অপরাধী নয় তবে সে।

বনহুর এবার হরশঙ্করের মাথা ধরে টেনে তুলে ফেললো। আশ্চর্য একটা খোলসের মধ্যে সে জমাটভাবে বসেছিলো। খোলসটা দেখলে ঠিক বটবৃক্ষের শিকড় বলে ভ্রম হয়, অতি কৌশলে এ খোলসটা সে তৈরী করেছিলো তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বনহুর হরশঙ্করকে এতো সহজে মৃত্যুবরণ করতে দেখে হতবাক হয়েছিলো। এবার বুঝতে পারলো—গাছের শিকড়ে তৈরী খোলসটা অত্যন্ত আঁটসাট, ওর মধ্যে প্রবেশ করলে কেউ নড়তে পারবে না। যতক্ষণ না ধীরেসুস্থে সে পিছন দিয়ে বের হয়।

বনহুর খোলসটা নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো।

হঠাৎ খোলসের ভিতরে এক জায়গায় নজর পড়তেই বিস্ময়ে আড়ষ্ট হলো। কতকগুলো কল-কজার মত জিনিস আঁটা রয়েছে। বনহুর একটা সুইচের মত জিনিসে চাপ দিতেই অকস্মাৎ ধূম্র রাশিতে ভরে উঠলো স্থানটা। অবাক হলো বনহুর। আর একটা চাকার মত জিনিস নজরে পড়লো তার। এবার সে ঐ চাকার মত জিনিসটায় হাত দিলো। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো। সম্মুখে একটা জায়গার মাটি সরে গেলো ধীরে ধীরে এক পাশে। বনহুর দ্রুত এগিয়ে গেলো, দেখলো একটি সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে এসেছে।

বনহুর দ্রুত সেই সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করলো।

ভয় ভীতি বলতে কিছুই ছিলোনা তার। সুড়ঙ্গের ধাপে ধাপে পা রেখে সন্তর্পণে নীচে নামতে লাগলো। কিছুদূর এগুতেই বনহুরের শরীরে একটা গরম তাপ অনুভব করলো। আর একটু এগুতেই দেখতে পেলো একটা মেশিনের মত জিনিস অবিরাম চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারই একটা নল উঠে গেছে উপরের দিকে বনহুর বুঝতে পারলো—এই মেশিনটাই গভীর মাটির নীচে ধূম্র সৃষ্টি করছে, আর ঐ নলটা দিয়ে ধূম্র-রাশি উপরে উঠে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। হরশঙ্কর তার বটবৃক্ষের শিকড়ের খোলসের মধ্যে বসে এই সব যন্ত্র চালনা করতো। এটাই ছিলো মায়াজালের মায়াচক্র। এখান থেকে সৃষ্টি করতো সে নানা সময় না না অদ্ভুত জিনিস।

বনহুর আর বিলম্ব না করে দ্রুত সুড়ঙ্গ বেয়ে উঠে এলো উপরে, কিন্তু সুড়ঙ্গের বাইরে আসার সুযোগ তার হলো না, সঙ্গে সঙ্গে মাথায় প্রচণ্ড একটা আঘাত অনুভব করলো।

হরশঙ্করের কয়েকজন অনুচর দাঁড়িয়েছিলো সুড়ঙ্গ পথের মুখে, তারা গুরুদেবের মৃতদেহ বটবৃক্ষ তলায় পড়ে থাকতে দেখে বুঝতে পেরেছিলোনিশ্চয়ই কোন অজ্ঞাত লোক গুরুদেবকে হত্যা করেছে এবং তারা দেখতে পেয়েছিলো, সুড়ঙ্গের মুখ খোলা, তাই পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিলো।

বনহুর অকস্মাৎ মস্তকে আঘাত পাওয়ায় টাল সামলাতে পারলো না, ঘুরপাক খেয়ে পড়ে গেলো নীচে।

তারপর যখন জ্ঞান ফিরলো অসহ্য, একটা চাপ অনুভব করলো নিজের বুকে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো বনহুর, কিন্তু চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়লোনা। দক্ষিণ হাতখানা বুকের দিকে আনতেই বুঝতে পারলো তার বুকের উপর বিরাট একখানা পাথর রাখা হয়েছে।

বনহুরের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। মাথায় হাত বুলাতেই হাতখানা ভিজে চুপসে উঠলো। কেমন চটচটে মনে হলো, তবে কি তার মাথাটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়েছিলো!

বনহুর এবার বুকের উপর থেকে পাথরটা নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলো। অসমী শক্তির অধিকারী বনহুর। যদিও পাথরখণ্ডটা বিরাট বড় এবং ভয়ঙ্কর ভারী, তবু বনহুর অল্পক্ষণের মধ্যেই সেটা নামিয়ে ফেলতে সক্ষম হলো।

উঠে বসলো বনহুর, তাকালো চারিদিকে।

জমাট অন্ধকার।

একটা শব্দ কানে ভেসে আসছে বনহুরের। ভাল করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো—এটা সেই সুড়ঙ্গর মধ্যের মেশিন-কক্ষ। এতোক্ষণ সে ঐ মেশিন-কক্ষের মেঝেই শুয়েছিলো।

উঠে দাঁড়ালো বনহুর।

অতি সাবধানে এগুতে লাগলো, হঠাৎ যদি ঐ ঘূর্ণিয়মান মেশিনটায় গিয়ে পড়ে তাহলে তার দেহটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তাই বনহুর যে দিকে থেকে শব্দটা আসছিলো সেদিক না এগিয়ে অপর দিকে এগুতে লাগলো।

বনহুর আন্দাজেই বুঝে নিলো, সুড়ঙ্গ মুখটা তখন কোন দিকে ছিলো। অল্প সময়ে সুড়ঙ্গ মুখ আবিষ্কার করে নিলো সে। এবার বনহুর এগুতে লাগলো সুড়ঙ্গ পথে, কিন্তু সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ থাকায় বের হতে পারলো না।

সুড়ঙ্গ পথটা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও চাপা হওয়ায় কয়েক বার মাথায় আঘাত পেলো বনহুর। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। একটা ভ্যাপসা গন্ধে তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো।

বনহুর বাইরে বের হবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলো।

অসহ্য লাগছে, বৈশীক্ষণ এভাবে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলে মৃত্যু তার অনিবার্য।

বনহুর সুড়ঙ্গ পথের দেয়াল হাতড়ে দেখতে লাগলো ভিতর থেকে। বাইরে বের হবার কোন উপায় আছে কিনা। কিন্তু আর যেন দাঁড়াতে পারছে না, নিশ্বাস নিতে ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে। তবু অনেক কষ্টে দেয়াল হাতড়ে চললো বনহুর।

এই বুঝি তার জীবনের শেষ পরিণতি!

এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ মধ্যে ছিলো দস্যু বনহুরের মৃত্যু!

বসে পড়লো বনহুর,খুব কষ্ট হচ্ছে তার।

সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে উঠেছে। হাঁপাচ্ছে সে। তবু অনেক কষ্টে আবার উঠে দাঁড়ালো, মৃত্যুর পূর্বে আর একবার শেষ চেষ্টা করবে সে।

কিন্তু দাঁড়াতে পাড়লো না বনহুর, পা দুখানা শিথিল হয়ে আসছে। পড়ে গেলো হুমড়ি খেয়ে……

এখানে বনহুর যখন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলো—মা……

ঠিক সেই মুহূর্তে মরিয়ম বেগম ফজরের নামাজান্তে খোদার নিকটে হাত তুলে মোনাজাত করছিলেন–হে দয়াময়, পাক-পরওয়ারদেগার, তুমি আমার মনিরকে সুস্থ সবল রেখো। যেখানেই থাক সে, তাকে তুমি রক্ষা করো, দেখো প্রভু।

মায়ের এ প্রার্থনা খোদা কবুল করলেন।

বনহুর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েও বুক দিয়ে এগুতে লাগলো। হঠাৎ তার হাতে একটা লম্বা হ্যাণ্ডেলের মত কিছু লাগলো বলে মনে হলো তার।

বনহুর প্রাণ পণ চেষ্টায় হ্যাণ্ডেলের মত জিনিসটা ধরে টান দিলোসঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গ মুখ থেকে একটা বিরাট কিছু সরে যাচ্ছে বলে অনুভব করলো। একট ঝাপসা আলোর রশ্মি সুড়ঙ্গ পথে নেমে এলো নীচে।

বনহুর এতোক্ষণে বাঁচবার ভরসা পেলো। বুঝতে পারলো—ঐ হ্যাণ্ডেলটা অন্য কিছু নয়, সুড়ঙ্গ মুখের আবরণ উন্মোচন করার একটি যন্ত্র।

এবার বনহুর হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও বা বুকে চলে সুড়ঙ্গ-মুখের বাইরে এসে পৌঁছলো।

প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো বনহুর।

তারপর উঠে দাঁড়ালো, কপাল বেয়ে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। হাতের পিঠে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিয়ে ফিরে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো, দুজন যমদূতের মত বলিষ্ঠ লোক বর্শা হাতে ছুটে আসছে তাকে দেখতে পেয়ে।

বনহুর মুহূর্তে প্রস্তুত হয়ে নিলো।

মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিশ্বাস নিয়ে সে আবার পূর্ব শক্তি সঞ্চয় করে নিতে পেরেছে।

ভয়ঙ্কর লোক দুটো তীর বেগে ছুটে আসছে।

বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, পালাবার জন সে নয়। দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যুকে বরণ করবে, নয় ওদেরকে পরাজিত করবে।

লোক দুটি বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এলো।

বনহুর সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়লো।

অমনি লোকদুটি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো ভূতলে।

বনহুর মুর্হত বিলম্ব না করে একজন ভূতলশায়ী লোকের হাত থেকে বর্শা কেড়ে নিয়ে সজোরে বসিয়ে দিলো তার বুকে।

তীব্র আর্তনাদ করে লোকটা মুখ বিকৃত করে ফেললো।

অন্য একজন সে ধড়মড় করে উঠে রুখে এলো বনহুরের দিকে। কিন্তু বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা তার একার কাজ নয়। লোকটা যখন এগুলো অমনি বনহুরের বর্শা বিদ্ধ হলো তার বুকে।

বনহুর এক ঝটকায় লোকটার বুক থেকে বর্শা উচিয়ে নিতেই হুমড়ি খেয়ে লোকটা পড়ে গেলো ভূতলে,ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো।

আর এক দণ্ড বিলম্ব না করে বনহুর বর্শা হাতেই ছুটলো বনের পশ্চিমাংশে।

কাঠ দিয়ে তৈরী সেই কুটির নিকটে পৌঁছে হতবাক হলো। কাঠের তৈরী কুটিরখানা শূন্য পড়ে রয়েছে—কুঠরিতে একটি জনপ্রাণী নেই।

বনহুর হতভম্ব হলো, এতোগুলি নারী সব গেলো কোথায়? কোথায়ই বা

নূরী, বনহুরের মাথায় যেন আকাশ ভেংগে পড়লো। নূরীকে বুঝি পেয়েও আবার হারালো সে।

ক্ষুধায় পিপাসায় অত্যন্ত কাতর বনহুর। প্র

থমে তার এতোটুকু পিপাসা নিবারণের প্রয়োজন।

বনহুর চারিদিকে লক্ষ্য করে দ্রুত এগুতে লাগলো বনের মধ্যে পাহাড়িয়া নদীটার দিকে।

এতো বেশী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো বনহুর, আর হাটতে পারছেনা তবু চললো সে।

নদীটার নিকটবর্তী হয়ে বনহুর হাটু গেড়ে বসে পড়লো।

সচ্ছ সাবলীল জলধারা কল কল করে ছুটে চলেছে। বনহুর আজলা ভরে পানি তুলে নিয়ে পান করলো। একটা অনাবিল তৃপ্তি বনহুরের সমস্ত দেহ। মনকে ভরিয়ে দিলো। প্রাণ ভরে সুশীতল পানি পান করলো সে।

এমন সময় হঠাৎ একটা ঝুপ ঝাপ শব্দ কানে ভেসে এলো বনহুরের। ফিরে তাকালো আচম্বিতে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো বনহুর। অদূরে নদীবক্ষে একটা মোটর-বোট দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একটা লোক একটি যুবতীকে মোটর-বোটটায় তুলে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে।

বনহুর তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো-লোকটা যুবতীকে টেনে হিচড়ে মোটর-বোটে উঠিয়ে নিলো।

মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর ছুটলো সেই দিকে।

যুবতী যেই হোক তাকে নিশ্চয়ই কোন শয়তান জোরপূর্বক হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে।

বনহুর প্রাণপণে ছুটলো।

লোকটা তখন যুবতীর হাত পা মজবুত করে বাঁধছিলো।

যুবতী হাত পা ছোড়াছুড়ি করায় বাঁধতে বিলম্ব হচ্ছিল তার। হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিলো লোকটা।

বনহুরকে ছুটে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি ইঞ্জিনের পাশে গিয়ে বসেলো; যেমন স্টার্ট দিতে যাবে, অমনি বনহুর ব্যাঘের মত ঝাপিয়ে পড়লো মোটরবোট খানার উপরে।

বলিষ্ট মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো লোকটার গলা।

লোকটাও কম শক্তিশালী নয়, সেও দুহাত দিয়ে নিজকে বাঁচিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো।

শুরু হলো ভীষণ ধস্তাধস্তি।

একবার বনহুর পড়ে যাচ্ছে নীচে, লোকটা চেপে বসছে তার বুকে। আবার লোকটা নীচে পড়ে যাচ্ছে, বনহুর উঠে বসছে ওর বুকে। চললো সেকি অদ্ভুত লড়াই।

কিন্তু বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা সেকি যার তার কর্ম!

দৃঢ় মুষ্ঠিতে বনহুর টিপে ধরলো লোকটার গলা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ দিতে লাগলো।

একটা গোঙ্গানীর শব্দ বেরিয়ে এলো লোকটার মুখ থেকে। পরক্ষণেই তাজা লাল টুকটুকে রক্ত গড়িয়ে পড়লো মোটর-বোট খানার, মেঝেয়। কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে নীরব হয়ে গেলো লোকটার দেহ।

বনহুর এবার উঠে দাঁড়ালো লোকটার বুক থেকে, তারপর যুবতীর দিকে ফিরে তাকাতেই বিস্মিত হলো, যুবতী অন্য কেহ নয়-নূরী। আনন্দে বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

নূরী তখন বনহুরের দিকে অপরিচিতের মত তাকিয়ে আছে।

বনহুর দ্রুত এগিয়ে এলো নূরীর নিকটে, আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকলো–নূরী!

নূরী ভীতভাবে তাকিয়ে বললো, না না আমি তোমাকে চিনি নে। কে তুমি?

নূরী, আমি তোমার হুর—তোমার সাথী।

না, আমার মনে পড়ে না তোমার কথা। তোমাকে আমি কোন দিন দেখি নি।

অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে বনহুর-নূরী। দুহাতে ওকে টেনে নিতে যায় কাছে।

ঠিক সেই সময় অদূরে শোনা যায় অনেকগুলি লোকের চীৎকার–পালালো—পালালো ধরে ফেললা—ধরে ফেললা……..

বনহুর দেখলো বনের মধ্যে থেকে বর্শা আর বল্লম হাতে তীর বেগে ছুটে আসছে অগণিত লোক।

বনহুর দ্রুত হস্তে মৃত দেহটাকে পানিতে নিক্ষেপ করে ইঞ্জিনে ষ্টার্ট দিলো।

একটা শব্দ করে মোটর-বোটখানা তীর বেগে ছুটতে শুরু করলো। ততক্ষণে নদী তীরে অসংখ্য শয়তান বদমাইশের দল বল্লম আর বর্শা হস্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ মোটর-বোট লক্ষ্য করে বল্লম আর বর্শা ছুঁড়ে মারতে লাগলো।

কেউ কেউ নদীবক্ষে ঝাপিয়ে পড়ে মোটর-বোটখানা ধরতে গেলো। কিন্তু বনহুরের হস্তে বোটখানা উল্কা বেগে ছুটে চলেছে।

একটা বর্শা ছিটকে এসে পড়লো মোটর-বোর্টের উপরে। ভাগ্যিস, বনহুরের পিঠে বিদ্ধ না হয়ে হলো ঠিক পাশে, মোটর-বোটের তক্তায়।

বনহুর একবার ফিরে তাকিয়ে দেখি নিলো মাত্র, তারপর অতি দ্রুত চালাতে লাগলো মোটর-বোটখানা।

ক্রমে শয়তান লোকগুলির কলকণ্ঠ আর চিৎকার মিশে এলো। আর দেখা যাচ্ছেনা ওদের। বনহুর এবার তার মোটর-বোটের গতি স্বাভাবিক করে নিলো।

কিন্তু এখনও বন্ধ্যা বন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বনহুর নিশ্চিন্ত নয়!

মাঝে মাঝে বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো।

বোটের একটি আসনে চুপটি করে বসে আছে সে। চুল-গুলি এলোমেলো, চোখ দুটিতে কেমন অসহায়ার দৃষ্টি। মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন।

বনহুরের মায়া হচ্ছিলো নূরীর দিকে তাকিয়ে।

হাস্যময়ী নূরীর একি অবস্থা হয়েছে।

বনহুর কোনদিন কল্পনাও করেনি, নূরীকে সে এইভাবে দেখবে।

অবিরাম গতিতে প্রায় কয়েক ঘন্টা চালানোর পর বন্ধ্যা বনের বাইরে এসে পৌঁছলো বনহুরের মোটর-বোটখানা। এবার চারিদিকে শুধু ফাঁকা, দুধারে সমতল ভূমির মধ্যে মাঝে মাঝে দুএকটা ঝোপঝাড় ও টিলা দেখা যাচ্ছে।

এখানে নদীটা পূর্বের চেয়ে অনেকটা প্রশস্ত। গভীরও বেশ মনে হচ্ছে। স্রোতও রয়েছে খুব।

মোটর-বোটখানা যেন আপন মনে ছুটতে শুরু করলো।

একি! বনহুর চমকে উঠলো, বনহুর বাধ্য হয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো, তবু তীরবেগে মোটর-বোটখানা ছুটে চলেছে।

বনহুর মোটর-বোটখানার মোড় ফেরাতে চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে সক্ষম হচ্ছেনা সে। বনহুর এবার বুঝতে পারলোকোন নীচু জলপ্রপাতের সঙ্গে এ নদীটার যোগাযোগ রয়েছে। পাহাড়িয়া নদী অসম্ভব কিছু নেই।

বনহুর ভীত হলো—সত্যই যদি তাই হয়, এই জলধারা যদি কোন উচু স্থান থেকে গভীর নীচে গিয়ে আছড়ে পড়ে তাহলে উপায়! মৃত্যুছাড়া কোন পথ নেই।

কিন্তু এতো করে বেঁচে আসার পর মরতে হবে!

বনহুর সম্মুখের খরস্রোত জলধারার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগলো।

নূরীও তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে। সেও বুঝতে পারছে, তাদের মোটর-বোটখানা কোন বিপদের মুখে ছুটে যাচ্ছে। আজ যদি নূরীর পূর্বের কথা স্মরণ থাকতো তাহলে তার মনে ভেসে উঠতো আর একদিনের কথা। যেদিন নূরী মৃতবৎ শিশু মনিকে নিয়ে নৌকার মধ্যে এমনি এক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলো।

আজ নূরী সম্পূর্ণ অতীতকে বিস্মৃত হয়েছে।

যাদুকর হরশঙ্কর তাকে এমন একটা ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে যার জন্য নূরী কিছুতেই পূর্ব কথা স্মরণ করতে সক্ষম হচ্ছিলো না।

নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিলো শুধু। বুঝতে পারছিলো, বিপদ তাদের ঘনিয়ে আসছে।

বনহুর আর নূরীর মোটর-বোট আজ যেদিক ছুটে চলেছে, একদিন ঐ পথেই নূরী আর মনিসহ নৌকাখানা ছুটে চলেছিলো। ভাগ্য সেদিন প্রসন্ন ছিলো, তাই নৌকাখানা আটকে গিয়েছিলো দুটি পাথর খণ্ডের সঙ্গে। আর আজ ঠিক তার অপর দিক দিয়ে বনহুর আর নূরীর নৌকা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে।

আর বেশী নয়, প্রায় অর্ধমাইল দূরেই সেই ভীষণ জলপ্রপাত। হাজার হাজার ফিট নীচে আছড়ে পড়ছে খরস্রোত নদীটা।

বনহুর আর নূরী মৃত্যুর জন্য যেন প্রতীক্ষা করছে। নদীবক্ষে এবার মাঝে মাঝে পাথরখণ্ড দেখা যাচ্ছে। বনহুর আতঙ্কিত হলো, হঠাৎ যদি ওর একটা পাথরের সঙ্গে তাদের মোটর-বোট খানা ধাক্কা খায় তাহলে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে বোট-খানা, সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থাও হবে মর্মবিদারক।

বনহুর আর নূরীর মোটর বোট অতি অল্পক্ষণে সেই ভয়ঙ্কর জলপ্রপাতের নিকটবর্তী হয়ে পড়লো।

শিউরে উঠলো বনহুর।

তার সাহসী প্রাণও কেঁপে উঠলো। মুর্হত বিলম্ব না করে নূরীকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো নদীবক্ষে।

প্রচণ্ড জলোচ্ছাসে সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেলো উভয়ে।

বনহুর নূরীকে দৃঢ় হস্তে ধরে রাখলো অতি সাবধানে।

কিন্তু কিছুতেই বনহুর নিজকে স্থির রাখতে পারছেনা। খরস্রোতে ভেসে যাচ্ছে ওরা দুজনা।

নূরীও মরিয়া হয়ে ধরে আছে বনহুরকে।

সেকি দারুণ অবস্থা, একবার ডুবছে, একবার উঠছে, কখনও ভেসে যাচ্ছে। অদূরেই জলপ্রপাত।

হাজার হাজার ফিট নীচে আছড়ে পড়ছে পানিগুলো।

বনহুর আর নূরী মোটর-বোট থেকে নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়তেই বোটখানা তীর বেগে ছুটে গেলো, পরক্ষণেই হাজার ফিট নীচে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।

বনহুর আর নুরী ঝাপটা ঝাপটি করছে।

দুজন দুজনাকে আঁকড়ে ধরে আছে প্রাণপণে।

তবু ভেসে ভেসে গড়িয়ে যাচ্ছে ওরা, কিছুতেই আর রক্ষা নেই। হঠাৎ বনহুর সম্মুখে একটা পাথর পেয়ে আঁকড়ে ধরলো। প্রথম হাত ফসকে গেলো, এই হয়েছিলো আর কি, আবার বনহুর এটে ধরলো পাথরটা। কোনরকমে নূরীকে নিয়ে পাথরটার উপরে চড়ে বসলো বনহুর।

রীতিমত হাঁপাচ্ছে সে।

নূরীর শরীরের ওড়নাখানা কখন যে ভেসে গেছে স্রোতের টানে। শুধু ঘাড় আর একটা আট-সাট ব্লাউজ রয়েছে তার শরীরে।

বনহুর তাকালো এবার নূরীর দিকে।

নূরী নিজের ভিজে চুপসে যাওয়া শরীরের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলো।

এতা বিপদেও বনহুরের হাসি পেলো। এখনই মৃত্যু যার অনিবার্য ছিলো তার আবার এতো লজ্জা।

বনহুর নিজের গা থেকে জামাটা খুলে এগিয়ে ধরলো-নাও।

নূরী দ্রুত হস্তে বনহুরের হাত থেকে জামাটা নিয়ে নিজের যৌবন ভরা শরীরে চাপা দিলো।

মাথার উপরে অসীম আকাশ।

নীচে যমদূতের মত জলোচ্ছাস।

সামান্য একটা পাথরখণ্ডে উপবিষ্ট দুটি প্রাণ।

ভয়ঙ্কর বিপদের গভীর বেদান ভরা মুহূর্তেও বনহুর নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো-নূরী, এখনও তুমি আমাকে চিনতে পারছোনা? আমি কে?

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ালো নূরী, বললো–না।

নূরী! ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলো বনহুর।

নূরী দুচোখের ভীতি আর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।

বনহুর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো নূরীর পাশে।

প্রচণ্ড প্রচণ্ড ঢেউগুলি আছাড় খেয়ে পড়ছে পাথরটার গায়ে। উচ্ছ্বসিত জলরাশি বনহুর আর নূরীর শরীরকেও বার বার ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। যে কোন মুহূর্তে তারা গড়িয়ে পড়তে পারে এই অশান্ত জলস্রোতের মধ্যে। তখন কোন উপায় থাকবে না রক্ষার।

বনহুর নূরীকে ঐ ভীষণ জলপ্রপাতের দিকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললো–হঠাৎ যদি পড়ে যাও তাহলে ঐ হাজার ফিট নীচে গড়িয়ে পড়বে।

শিউরে উঠে নূরী।

সেই মুহূর্তে একটা প্রচণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়ে তাদের গায়ে।

নূরী ভয়-বিবর্ণ মুখে আঁকড়ে ধরে বনহুরকে।

বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।

বনহুরের প্রশস্ত বুকের মধ্যে নিজকে নির্ভয়শীলা মনে করে নূরী।

কিন্তু চোখে-মুখে তখনও তার অপরিচিতার ভাব। নূরী এখনও চিনতে পারেনি বনহুরকে।

গোটা বেলা কেটে গেলো, কতক্ষণ এইভাবে সামান্য একটা পাথরখণ্ডে বসে কাটানো যায়। সম্মুখে মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে। যে কোন দন্ডে গড়িয়ে পড়লে আর নিস্তার নেই।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

অস্তমিত সূর্যের রশ্মি এসে পড়লো বনহুর আর নূরীর মুখে। সন্ধ্যা হবার আর বেশী বিলম্ব নেই। বনহুরের ললাট কুঞ্চিত হয়ে উঠলোএখন উপায়? যতক্ষণ না এই স্থান থেকে তীরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে, ততক্ষণ বাঁচবার কোনও ভরসাই নেই তাদের।

বার বার ঢেউ এর উচ্ছ্বসিত জলরাশিতে বনহুর আর নূরীর দেহ স্কি হয়ে উঠছিলো। তার সঙ্গে ছিলো দমকা হাওয়া-নূরীর শরীরে কাঁপন ধরে গেলো।

ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে এলো।

চারিদিকে শুধু জলোচ্ছ্বসের প্রচণ্ড শব্দ

বনহুর আর নূরী উভয়ে উভয়েকে আঁকড়ে ধরে বসে রইলো—এতোটুকু নড়লে বা গড়িয়ে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য।

সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘন জমাট হয়ে উঠলো।

এখন কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা। মৃত্যুর বিভীষিকা যেন মহাকালবেগে গ্রাস করতে আসছে বনহুর আর নূরীকে।

যার দৃষ্টির কাছে নূরী কিছু সময় আগেও লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ছিলো, যাকে সে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা, এক্ষণে তারই বুকের মধ্যে খুঁজে নিয়েছে সে আশ্রয়।

বনহুর সজাগ ভাবে নূরীকে ধরে রাখলো।

এতোটুকু শিথিলতা এলেই নূরীকে হারাবে সে। রাত্রি বেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নূরী ঝিমিয়ে পড়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো, এতো বিপদের মধ্যেও তার দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। কিছুতেই নূরী নিজকে জাগিয়ে রাখতে পারছে না।

এক সময় নূরীর দেহটা ঘুমে এলিয়ে পড়লো।

বনহুর অতি সাবধানে ধরে রাখলো ওকে।

১০.

ভোরের আলো ফুটে উঠার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠলো নূরী। তাকালো চোখ মেলে। ফুটন্ত গোলাপ কুঁড়ির মত দুটো আঁখির পাতা মেলে ধরলো বনহুরের মুখের দিকে। এতোক্ষণে যেন লজ্জা আর সঙ্কোচ এসে তাকে সঙ্কুচিত করে তুললো। তাড়াতাড়ি সরে বসতে গেলো নুরী।

বনহুরের দ্ৰিাহীন চোখ দুটিতে ফুটে উঠলো অপরূপ এক দৃষ্টি, এক টুকরা হাসি দেখা দিলো তার ঠোঁটের কোণে। নূরীর গালে মৃদু চাপ দিয়ে বললো—নড়লেই ছিটকে পড়বে, আর রক্ষা থাকবে না।

নূরী ছুটে আসা ঢেউগুলির দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলো।

বনহুর নূরীর ভয়-বিহুল মুখের দিকে তাকিয়ে বললো ভয় নেই নূরী। আমি তোমাকে মরতে দেবোনা।

পূর্ব আকাশ রাঙা করে তখন উষার কিরণ ফুটে উঠেছে।

বনহুর ভাবতে লাগলো, কি করে এই মরণ-বিভীষিকা থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। দিনের পর দিন এখানে প্রতীক্ষা করলেও কোন নাবিক বা কোন জলযানের সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই। ক্ষুধায় কাতর তারা, ভাগ্য পানিটা লবণাক্ত নয়—তাই রক্ষা। যখন উচ্ছ্বসিত ঢেউগুলি আছড়ে পড়ে তাদের গায়ে এবং আশে পাশে, তখন নূরী আর বনহুর আজলা, ভরে পান করে সেই পানি। কিন্তু শুধু পানি পান করে কতক্ষণ এই পাথরটার উপরে বেঁচে থাকা যাবে!

যতই বেলা বেড়ে উঠছে, বনহুর ততই বিষণ্ণ মলিন হয়ে পড়ছে আর বুঝি রক্ষার কোন উপায় নেই। দেহের শক্তিও ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে আসছে যেন। বেঁচে থাকার যে উদ্দীপনা, সব যেন নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বনহুর যখন উদ্ধারের কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না, ঠিক তখন দূরে একটা মস্ত বড় কালো মত কিছু যেন এদিকে ভেসে আসছে বলে মনে হলো তার। বনহুর ভাল করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো-বিরাট একটা গাছ গড়িয়ে ভেসে আসছে। ধ্বসে পড়া তীরস্থ কোন বটবৃক্ষ বা ঐ ধরনের কোন বৃক্ষ হবে।

এতো বেশী স্রোতের টানেও অতি ধীরে ধীরে গাছটা গড়িয়ে আসছে। বনহুর বুঝতে পারলো-গাছটা ছোট খাটো বা পাতলা কোন গাছ নয়–অত্যন্ত ভারী এবং বৃহৎ বৃক্ষ।

বনহুর তাকিয়ে দেখলো, আশেপাশে তাদের পাথরটার অদূরে আরও কতকগুলি বড় বড় পাথর জলস্রোতের মধ্যে কচ্ছপের পিঠের মত উঁচু হয়ে আছে। আশায় আনন্দে ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কারণ, ঐ বিরাট গাছটা যদি কোনক্রমে তাদের এতোদূর এসে পড়ে তাহলে আর সামনে গড়িয়ে যেতে পারবে না। অনেকগুলি বড় বড় পাথর তার পথে বাধার সৃষ্টি করবে।

বিপুল আগ্রহ নিয়ে বনহুর তাকিয়ে রইলো গাছটার দিকে।

ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে গাছটা?।

বনহুর নূরীকে আঁকড়ে ধরে বললো–নূরী, এবার আমরা বাঁচবো। ঐ গাছটা আমাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে।

নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো, কোন জবাব দিলো না।

নূরীর জবাবের প্রতীক্ষা না করে বনহুর আবার তাকালো গাছটার দিকে।

অনেক এগিয়ে এসেছে গাছটা।

হঠাৎ একটা পাথরখণ্ডে গাছটা আটকে গেছে বলে মনে হলো বনহুরের, কারণ আর এগুচ্ছে না গাছটা।

বনহুরের গোটা মন হতাশায় ভরে উঠলো। হায়, এবার উপায়-গাছটা আর এগিয়ে আসতে সক্ষম হবে না। পাথরটার সঙ্গে আটকে গেছে গাছটা।

কিন্তু এখনও উচ্ছ্বসিত ঢেউএর আঘাতে দোল খাচ্ছে গাছটা। কোন ক্রমে পাথরটা গা থেকে ছাড়া পেলেই চলে আসতো তাদের দিকে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বনহুরের আশা পূর্ণ হলো, ঢেউএর আঘাতে গাছটা খসে এলো পাথরটার গা থেকে।

বনহুর আনন্দ ধ্বনি করে উঠলো–সাবাস!

এবার গাছটা বেশ দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। স্রোতের টান–এদিকে আরও শতগুণ বেশী।

ভীষণ বেগে ছুটে আসছে এবার গাছটা।

কিন্তু যে ভাবে আসছে, হঠাৎ পাথরটার গায়ে ধাক্কা খেয়ে তারা দুজনা ছিটকে না পড়ে।

বনহুর নূরীকে শক্ত করে এটে ধরলো, গাছটার ধাক্কা বা আঘাতে তারা যেন বিছিন্ন হয়ে না পড়ে।

এসে গেছে, অতি নিকটে এসে পড়েছে গাছটা।

যা ভেবেছিলো বনহুর, গাছটা তীরবেগে ছুটে এসে ঝাপটা খেয়ে আটকে পড়লো কয়েকটা পাথরখণ্ডের সঙ্গে।

প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি বা ঐ রকম কিছুর আশা করেছিল বনহুর কিন্তু আশ্চর্য, এতোটুক ঝাকুনি বা কোন রকম অসুবিধা হলোনা তাদের।

গাছটা সম্পূর্ণ আড়াআড়িভাবে লম্বা হয়ে আটকে পড়লো। এবার আর কোন জলস্রোতেই তাকে ভাসিয়ে নিতে সক্ষম হবে না। কোনদিনই গাছটা ঐ হাজার ফিট জলপ্রপাতের নীচে পাথরের উপর আছড়ে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হবেনা অনেকগুলি পাথরের গায়ে আটকে পড়েছে গাছটা।

বনহুরের চোখে-মুখে খুশীর উৎস।

এ ভাবে যে তাদের উদ্ধারের পথ হয়ে যাবে, কল্পনাও করতে পারেনি সে।

এবার বনহুর আর নূরী উঠে দাঁড়ালো, তাদের পাশেই গাছটার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আছে। বিরাট গাছ, প্রায় বিশ-পঁচিশ গজ লম্বা হবে। পুরোনো বটবৃক্ষ এটা। গাছটার গুড়ি প্রায় তীরের সন্নিকটে পৌঁছে গেছে। হাত কয়েক দূরেই তীর ভূমি।

বনহুর নূরীকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো, বললো বনহুর–নূরী, আমি তোমাকে ধরছি, তুমি দক্ষিণ হস্তে গাছটার ডাল ধরে গুড়িটার উপরে উঠে পড়ো। সাবধান, কোন সময় শাখা ছেড়ে দেবে না।

নূরী মাথা কাৎ করে জানালো—আচ্ছা।

১১.

অনেক কষ্টে গাছটার শেষ সীমান্তে এসে উপস্থিত হলো বনহুর আর নূরী। গাছটা ঢেউ এর চাপে দুলছে, সাবধানে এগুতে হয়েছে তাদের। নূরীকে বনহুর অতি কৌশলে ধরে ধীরে এতোদূর নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন উপায়, এখনও তীর প্রায় পাঁচ ছহাত দূরে। বনহুর একা হলে চিন্তা ছিলোনা, সে অতি কৌশলে সাঁতার কেটে এই জায়গাটুকু পার হয়ে আসতে পারতো। কিন্তু নূরীকে নিয়ে কি ভাবে এই ভয়ঙ্কর খরস্রোত পার হবে।

বনহুর যেন বিপদে পড়লো।

কিন্তু কোন উপায় নেই, সাঁতার দিয়ে এই জায়গাটুকু পার হতেই হবে।

বনহুর নূরীকে বললো-নূরী, হয় জীবন ফিরে পাবো, নয় মৃত্যু। চলো–অস্ফুট কণ্ঠে বললো নূরী–কোথায়?

এতো দুঃখেও বনহুরের মুখে হাসি ফুটলো, বললো সে-ঐ নদীবক্ষে।

ভয়ে নূরী বনহুরকে আঁকড়ে ধরলো।

বনহুর আর বিলম্ব না করে বললো নূরী, আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো, কোন রকমেই যেন তোমার হাত খসে না যায়। ধরো আমার গলা…

নৃরী বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।

বনহুর লাফিয়ে পড়লো ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে।

সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাত ভেসে গেলো দূরে, সেই মৃত্যুর মুখের দিকে, কিছুদূরেই জলপ্রপাত।

বনহুর প্রাণপণ চেষ্টায় সাঁতার কাটতে লাগলো।

তবু কিছুতেই স্রোতের অপর দিকে এগুতে সক্ষম হচ্ছেনা।

নূরীর হাত দুখানা ক্রমে শিথিল হয়ে আসছে। আর রক্ষা নেই। এমন সময় বনহুর যেন পায়ে মাটির ছোয়া পেলো।

অতি কষ্টে, অতি সাবধানে বনহুর তীরে উঠে আসতে সক্ষম হলো।

কিন্তু নূরী তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

ক্ষুধা তৃষ্ণার কাতর নূরী, তারপর এই প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসের বেগে কিছুতেই স্থির থাকতে পারলোনা, অজ্ঞান হয়ে পড়লো।

বনহুর যতই শক্তিশালী পুরুষই হোক, তবু মানুষতো।

তার অবস্থাও নাজেহাল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সে একেবারে হতাশ হয়ে। পড়েনি। নূরীর জ্ঞান ফেরানোর জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করতে লাগলো।

এতোটুকু সান্তনা এখন বনহুরের বুকে তারা তীরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। মস্ত একটা বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে বনহুর আর নূরী।

ঘন্টা কয়েক পরে জ্ঞান ফিরে এলো নূরীর।

বনহুরের মুখে খুশী ফুটে উঠলো।

নূরীকে নিবিড় ভাবে টেনে নিতে গেলে বনহুর কিন্তু নূরী ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়লো। অস্ফুট কন্ঠে বললো–আমাকে ছেড়ে দাও, নইলে ঐ জলস্রোতে ঝাপিয়ে পড়বো।

বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো—নূরী।

নূরী রাগে অধর দংশন করে বললো–তোমাকে আমি চিনিনা।

নূরী।

আমাকে তুমি যেতে দাও।

কোথায় যাবে?

নূরী আনমনা হয়ে যায়, গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করে।

বনহুর বলে–তাহলে যাও।

নূরী নতমুখে বসে থাকে।

বনহুর পুনরায় বলে উঠে—তুমি স্মরণ করো নূরী, মনে করতে চেষ্টা করো……. সেই কান্দাই বন, সেই ভূগর্ভে আস্তানা, তোমার বনহুর…. মনে পড়ে? নূরী, কোথায় তোমার সেই মনি? নূরী–নূরী, কি হয়েছে তোমার? বনহুর দুহাতে নিজের মাথার চুল টানতে থাকে, অধর দংশন করে সে।

নূরী বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কি যেন সব এলোমেলো হয়ে যায়, স্মরণ হয় না কিছু। অনেক চিন্তা করেও নূরী মনে করতে পারেনা ওর কথাগুলো।

১২.

গাছের ফল পেড়ে বনহুর নূরীকে দেয়—খাও।

নুরী নিজে খায়, ভাবে লোকটা তাকে সত্যি কত স্নেহ করে–ভালবাসে। বনহুর নূরীকে খেতে দিয়ে নিজে চুপ চাপ বসে থাকে বিমর্ষ মুখে।

নূরী দুঃখ পায়, সে খাচ্ছে অথচ লেকাটা খাচ্ছেনা। ব্যথা পায় হৃদয়ে। একটা ফল হাতে তুলে নিয়ে বনহুরের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে—তুমি খাও।

বনহুর ফিরে তাকায় নূরীর দিকে, অফুরন্ত একটা আনন্দ নাড়া দিয়ে যায় তার মনে। নূরীর হাত থেকে ফলটা নিয়ে খায় বনহুর।

একটা গাছের ছায়ায় ঘাসের উপর ঘুমিয়ে পড়ে বনহুর। আজ দুদিন তার চোখে এতোটুকু ঘুম নেই।

নূরী বসে থাকে তার পাশে।

বনহুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নূরী নিষ্পলক নয়নে। এর পূর্বে কোথাও তাকে দেখে ছিলো কিনা স্মরণ করতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতে ওর মনে পড়ে না কোন কথা।

নূরীর মায়া হয়লোকটা তার জন্য কতইনা কষ্ট করেছে তাকে বাঁচাবার জন্য নিজের জীবন বিনষ্ট করতেও সে কুণ্ঠা বোধ করছিলোনা। নূরী এগিয়ে আসে, বনহুরের মাথাটা ধীরে ধীরে তুলে নেয় নিজের কোলে।

বনহুর গভীর ঘুমে মগ্ন থাকলেও সতর্ক ছিলো। একটু মাথায় হাত লাগতেই জেগে উঠলো, কিন্তু সে চোখ মেললো না। ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে রইলো।

নূরী ধীরে ধীরে বনহুরের চুলগুলি আংগুল দিয়ে আঁচড়ে দেওয়ার মত ঠিক করে দিতে লাগলো অতি যত্ন সহকারে বেশ কিছুক্ষণ এই কাজ করলো নূরী।

বনহুর হঠাৎ উঠে বসলো।

নূরী লজ্জায় মরিয়া হয়ে মাথা নত করলো।

বনহুর বললো—এতে লজ্জার কি আছে। সত্যি তুমি কত সুন্দর নূরী!

নূরী আরও জড়োসড়ো হয়ে পড়লো।

বনহুর নূরীর চিবুক ধরে উচু করে তুলে বললো আমাকে তোমার কেমন লাগে?

নূরী নীরব রইলো, কোন জবাব দিলোনা।

বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে আবেগ ভরা কন্ঠে বললো নূরী, জবাব দাও? জবাব দাও?

নূরী পাথরের মূর্তির মতই নিশ্চুপ বসে রইলো।

বনহুর হঠাৎ প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিলো নূরীর গালে।

নূরী তবু স্থিরভাবে যেমন বসেছিলো তেমনি রইলো।

বনহুর নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতখানাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে লাগলো, হঠাৎ এ–সে কি করে বসলো। নৃরীকে সে আঘাত করলো! বনহুর নিজের হাতখানাকে মাটিতে আছড়াতে লাগলো।

নূরী ধরে ফেললো বনহুরকে।

বনহুর স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকালো নূরীর দিকে, একি নূরীর চোখে পানি নেই। এতোটুকু বিচলিত হয়নি সে।

বনহুর দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো ছোট্ট বালকের মত।

নূরী অবাক হয়ে দেখছে তার দিকে।

১৩.

বনহুর নূরীকে যতই স্মরণ করাতে চেষ্টা করছে, ততই মূরী যেন কিছুই বুঝতে পারছেনা। বনহুর যতই পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে, ওকে নিবিড়ভাবে পেতে চায়, নূরী ততই সরে যায় দূরে, সঙ্কুচিতভাবে নিজকে সরিয়ে রাখে বনহুরের পাশ থেকে।

কিন্তু রাতের বেলায় হয় যত মুস্কিল।

গহন বন। অন্ধকার রাত্রি, চারিদিকে হিংস্র জন্তুর গর্জন। নূরী ভয়ে কাঁপতে থাকে, তখন জড়োসড়ো ভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে বনহুরের কাছে।

অন্ধকারে নূরীর গতিবিধি লক্ষ্য করে হাসে বনহুর।

এমনি করে কেটে যায় দুটি দিন আর দুটি রাত।

নূরী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে এসেছে। বনহুর এবার বুঝতে পারলো–নূরীর হাটতে এখন কোন কষ্ট হবেনা!

নদীর ধার ধরে বনহুর আর নূরী এগিয়ে চললো।

সমস্ত দিন একটানা চলার পর ক্লান্ত অবশ পা দুখানা আর যেন উঠতে চায়না তাদের। বনহুর যদিও তেমন কোন অসুবিধা বোধ করছেনা তবু নূরীর জন্য তাকেও ধীরে ধীরে চলতে হচ্ছিলো বা বনহুর নূরীকে হাত ধরে চলায় সাহায্য করছিলো।

গোটা দিন অবিরাম চলে এমন একস্থানে এসে তারা পৌঁছলো যেখানে নদীটা প্রশস্ত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। তীর থেকে সম্মুখে তাকালে শুধু জল আর জল। আকাশ যেন মিশে গেছে ঐ সাগরবক্ষে।

বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো নূরী, আমরা সাগর তীরে এসে গেছি। হয়তো কোন জাহাজ এই পথে এসে যেতে পারে, তাহলেই আমরা বাচবো।

নূরীর কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছে।

এ কয়টা দিন একমাত্র গাছের জংলী ফল খেয়ে বেঁচে আছে তারা। পানি পান করবার সুযোগ হয়নি আর।

নূরীর ক্লান্ত অবসন্ন করুণ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে বললো বনহুর তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না নূরী?

নূরী মাথা নীচু করলো।

বনহুর বুঝতে পারলোনূরীর আর চলবার শক্তি নেই। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো বনহুর–কোথাও গাছ-পালা বা কোন ছায়া নেই, ফল-মূল তো দূরের কথা।

বনহুর নিজের জন্য যতখানি চিন্তিত না হলো, তার চেয়ে বেশী হলো নূরীর জন্য। নূরীকে আর বুঝি রক্ষা করা যাবে না।

নূরী বালির উপর বসে পড়লো।

বনহুর তাড়াতাড়ি নূরীর পাশে হাটু গেড়ে বললো—খুব কষ্ট হচ্ছে?

হাঁ, আমি আর পারছিনা।

নূরী, কি করবো বলো?

নূরী নীরব আঁখি দুটি তুলে ধরলো বনহুরের মুখের দিকে।

বেলা শেষ হয়ে এসেছে।

সূর্যের আলোকরশ্মি স্তিমিত হয়ে আসছে।

শুভ্র বলাকার দল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে দূর হতে দূরান্তে।

বনহুর বললো–নূরী, ঐ পাখীগুলির আশ্রয় আছে। তারাও সন্ধ্যার আগে ফিরে যাচ্ছে নিজ নিজ ঘরে আর আমরা………. আমাদের কোন আশ্রয়

নেই, নেই কোন মাথা লুকোবার ঠাই। কোথায় যাই বলো?

নূরী নীরব।

অসহ্য লাগে বনহুরের কাছে নূরীর এ নীরবতা। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করে তার। কিন্তু কি হবে কেঁদে, তার কাদা নূরীর প্রাণে এতোটুকু দোলা জাগাবেনা।

ঐ রাত্রি বালির মধ্যেই কেটে গেলো বনহুর আর নূরীর।

পরদিন আবার হলো তাদের যাত্রা শুরু।

এবার বনহুর আর নূরী সাগর তীরে ধরে এগিয়ে চললো। যদিও নূরী অবসন্ন ক্লান্ত তবু বনহুরের হাত ধরে অতি কষ্টে এগুতে লাগলো।

চলেছে তো চলেছে।

কিন্তু নূরী আর পারছে না, বসে পড়লো ভূতলে।

বনহুর বিপদে পড়লো, বুঝতে পারলোনূরী একেবারে ক্ষীণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। চলতে আর পারছেনা—এখন উপায়!

না চললেও নয়, যতক্ষণ নিশ্বাস আছে ততক্ষণ বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেই হবে।

বনহুর নূরীকে তুলে নিলো হাতের উপরে।

নূরী লেতিয়ে পড়লো, আর বাধা বা আপত্তি করতে পারলো না।

বেশ কিছুদূর এগুলো বনহুর নূরীকে ঐ ভাবে দুহাতের উপর তুলে নিয়ে। হঠাৎ বনহুরের নজরে পড়লো, দূরে—কিছু দূরে দুটি লোক বালির উপরে ভীষণভাবে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে।

নূরীকে নিয়ে থমকে দাঁড়ালো বনহুর। ভাল করে লক্ষ্য করতেই চমকে উঠলো, একটি লোকের হস্তে সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরা অপর ব্যক্তি নিরস্ত্র। ছোরাওয়ালা লোকটার কবল থেকে স্যুটপ্যান্ট পরা লোকটা নিজেকে বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি চলেছে। আশেপাশে বেশ কিছুটা ঝোপঝাড় রয়েছে।

বনহুর বুঝতে পারলো কোন অসহায় ভদ্রলোক কোন দস্যু কবলে। আক্রান্ত হয়েছে। বনহুরের ধমনীর রক্ত মুহূর্তে উষ্ণ হয়ে উঠলো, যদিও সে আজ কদিন সম্পূর্ণ উপবাসী—তবু এতোটুকু বিচলিত হলোনা। নূরীকে বালির উপর নামিয়ে দিয়ে দ্রুত ছুটে চললো সে লোক দুটির দিকে।

বনহুরের লক্ষ্য আর কোন দিকে নেই, সোজা সে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোক দুটির উপরে। ছোরাওয়ালা লোকটার নাকে প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিতেই, চারিদিক থেকে বেরিয়ে এলো কতকগুলো স্যুট-প্যান্ট-ক্যাপ পরা লোক, একসঙ্গে সবাই বলে উঠলো–আহা একি করছেন? একি করছেন?

বনহুর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকালো—এ কি! তার চারপাশে অনেকগুলি ভদ্রলোক গোলাকার হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অদূরে তাকাতেই। বনহুরের মাথাটা লজ্জায় নুয়ে এলো। একি করেছে সে! কিছুদূরে একটা ঝোপের পাশে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক মোটা মত ভদ্রলোক, মুখে-চোখে তার বিরক্তির ছাপ।

ভীড় ঠেলে বনহুরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন পরিচালক স্বয়ং, গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বললেন—আপনি নিশ্চয়ই ভুল করেছেন, আমাদের কুন্তিবাঈ ছবির সুটিং হচ্ছিলো।

বনহুর হেসে বললো—মাফ করবেন—না জেনে…..

নিশ্চয়ই? কিন্তু আপনি কে?

অন্যান্য সবাই তখন বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে, কে এই লোক—নির্জন সাগর সৈকতে এলোই বা কোথা থেকে। যে লোকটার নাকে বনহুর প্রচণ্ড ঘুষি লাগিয়ে দিয়েছিলো, তার নাক দিয়ে তখন রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। লোকটা বারবার রুমালে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিচ্ছিলো।

পরিচালকের প্রশ্নের জবাবে একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিলো বনহুর জাহাজডুবিতে আমাদের এই অবস্থা হয়েছে। কোন রকমে আমি ও আমার বোন প্রাণে বেঁচে গেছি। কান্দাই শহরে আমার বাড়ী।

পরিচালক উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন-কান্দাই শহরে আপনার বাড়ী? আপনার পরিচয়?

জনাব হায়দার উদ্দিন চৌধুরীর সন্তান আমি। আমার নাম মকছুদ চৌধুরী।

বনহুর কান্দাই এর সবচেয়ে ধনি ব্ল্যাক মার্কেটার হায়দার চৌধুরীর সন্তান বলে নিজকে পরিচিত করলো।

পরিচালক খুশী হয়ে বললেন আমাদের বাড়ী বসুন্দা নগরে। যদিও কান্দাই থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে, তবু কান্দাই এর সঙ্গে আমাদের যথেষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। জনাব হায়দার উদ্দিন চৌধুরীর নাম শুনেছি। তিনি মস্ত ধনবান ব্যক্তি একথাও আমরা জানি। আপনি তারই পুত্র…………. পরিচালকের গলা ব্যথায় জড়িয়ে এলো।

বনহুর বলে উঠলো—হাঁ, আজ আমারই এ দশা………..

দুঃখ করবেন না, সবই অদৃষ্ট। কই, আপনার ভগ্নি কোথায়?

বনহুর দূরে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললো—ঐ যে ওখানে। আজ কদিন আমি এবং আমার ভগ্নি সম্পূর্ণ উপবাসী। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।

পরিচালক বনহুরকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—আপনাদের আর কোন চিন্তা নেই। এবার আমাদের হাতে আপনারা এসে গেছেন। তারপর নিজেদের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন–এসো, আগে এনাদের ব্যবস্থা ঠিক করে তবে আবার সুটিং শুরু করবো।

অদূরে একটা বাকের মত জায়গায় কুন্তিবাঈ ছবির ইউনিটের জাহাজ নোঙ্গর করে ছিলো। ছোট ছোট কয়েকখানা বোটনৌকা ছিলো তাদের সঙ্গে, বনহুর আর নূরীকে নিয়ে পরিচালক নাহার সাহেব তাদের জাহাজে গেলেন। এবং বনহুর আর নুরীর জন্য একটা ক্যাবিন ছেড়ে দিলেন। থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা তিনি নিজে করলেন। বনহুর ও নৃরীর জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, এসবও তিনি সংগ্রহ করে দিলেন। জাহাজে এসব জিনিসের কোন অভাব ছিলো না।

কুন্তিবাঈ এর নায়িকা জ্যোছনা রায় ও তার সহচরী অনেক যুবতীই ছিলো এই জাহাজে, কাজেই নূরীকে পেয়ে তারা খুশীই হলো।

 বনহুর যখন বাথরুম থেকে বের হলো তখন তাকে রাজ পুত্রের মতই সুন্দর লাগছিলো।

পরিচালক নাহার চৌধুরী জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে, বনহুরের অপরূপ সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে ফেললো।

এতোক্ষণ বনহুরের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ থাকায় তার সত্যিকারের রূপ, ঢাকা পড়েছিলো, এখন সেভ করে নতুন পোষাক পরায় তাকে অপরূপ দেখাচ্ছে।

কুন্তিবাঈ ছবির সুপুরুষ নায়ক অরুণ সেন বনহুরের দীপ্ত চেহারার কাছে সঙ্কুচিত হলো। সে মনে করতো, তার চেয়ে সুন্দর সুপুরুষ আর বুঝি কেউ নেই। হিংসা হলো অরুণ সেনের মনে, সকলের অলক্ষ্যে তাকালো অরুণ সেন জ্যোছনা রায়ের দিকে।

অদূরে দাঁড়িয়ে জ্যোছনা রায় তখন নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে।

পরিচালক অরুণ সেন ও জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন বনহুরের।

আমার ছবির নায়িকা জ্যোছনা রায়।

হাত জুড়ে নমস্কার জানালো জ্যোছনা রায়।

আর ইনি নায়ক অরুণ কুমার সেন।

বনহুর অরুণের দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করলো।

বৈকালে বাকী সুটিং শেষ করে কুন্তিবাঙ্গ ছবির ইউনিট যাত্রা শুরু করলো।

হঠাৎ বনহুরের ভাগ্য এতো প্রসন্ন হবে, ভাবতেও পারেনি সে নিজে। মৃত্যুর মুখ থেকে যেন ফিরে এলো তারা।

পরিচালক নাহার চৌধুরী বনহুরের সঙ্গে গভীরভাবে ভাব জমিয়ে ফেললেন। এমন একজন ব্যক্তি যদি তাদের দলে থাকে তবে তাদের সৌভাগ্য বলতে হবে। নাহার চৌধুরী জানেন–কান্দাই এর হায়দার উদ্দিন চৌধুরী বিরাট ধনবান, ইচ্ছা করলে তিনি এক সঙ্গে পাঁচখানা ছবির প্রযোজনা করতে পারেন। আর এমন সুন্দর সুপুরুষ তার ছেলে, হিরো বাইরে খুঁজতে হবে কেনো। কিন্তু বড় বেরসিক ভদ্রলোক, এতো অর্থের মালিক হয়েও এ ব্যবসায় দৃষ্টি দেন না।

পথে আরও একটা দৃশ্যের সুটিং শেষ করে তবেই ফিরবেন পরিচালক। একটা ঘোড়দৌড়ের দৃশ্য নেওয়া হবে। কিন্তু সেই দৃশ্যটা এমন স্থানে হতে হবে যেখান বেশ ফাঁকা বিস্তৃত মাঠ ও কিছুটা পাহাড় রয়েছে, আরও থাকতে হবে কিছু ঝোপ-ঝাড়-টিলা। এই দৃশ্যটা নেওয়া হলেই কুন্তিবাঈ ছবির ইউনিট স্বদেশে ফিরে যাবে।

জাহাজখানা তীরের অনতিদূর দিয়ে এগুতে লাগলো। ডেকে দাঁড়িয়ে দুরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে দেখছেন পরিচালক স্বয়ং। ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবুও মাঝে মাঝে পরিচালকের হাত থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা নিয়ে দেখছিলেন।

কিন্তু মনমতো জায়গা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। যদি পাওয়া যায় সুন্দর বালুকাময় বিস্তৃত প্রান্তর, আশেপাশে কোথাও টিলা বা পাহাড়ের চিহ্ন নেই আবার যদি পাওয়া যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়, আশেপাশে কোন ফাঁকা মাঠ বা বিস্তৃত প্রান্তর নেই। গোটা দুটো দিন মনমতো জায়গার অভাবে কেটে গেলো কুন্তিবাঈ ইউনিটের।

জাহাজ আজ দক্ষিণ পূর্ব কোণ ধরে এগুচ্ছে।

পরিচালক নাহার চৌধুরী দুরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। হঠাৎ একদিন জুটে গেলো তার মনমতো জায়গা।

তীরের অনতিদুরে জাহাজ নোঙ্গর করলো।

ঠিক পরিচালকের মনের মত স্থান। খুশীতে আত্মহারা হলেন নাহার চৌধুরী। জাহাজ থেকে বোট নামানো হলো, সবাই বোটে চেপে তীরে এলেন।

পরিচালকের আনন্দ আর ধরছেনা।

যেমনটি চেয়েছিলেন ঠিক তেমনটিই নাকি পেয়েছেন।

বিস্তৃত বালুকাময় বেলাভূমি, মাছে মাঝে ছোট ছোট টিলা আর ঝোপঝাড়। একটু দূরেই ছোটখাটো কয়েকখানা পাহাড়।

সুটিং শুরু করবেন পরিচালক।

জাহাজ থেকে দুটো ঘোড়া নামিয়ে আনা হলো। একটি সাদা ধবধবে, একটি সাদা-কালো মেশানো! ঘোড়া দুটি যেমন বলিষ্ঠ, তেমনি তেজী।

জায়গা বেছে নিয়ে ক্যামেরা বসানো হলো।

নায়িকা জ্যোছনা রায়কে মেকআপ দিচ্ছেন মল্লিক বাবু।

এ দৃশ্যে থাকবে নায়িকা, নায়ক ও ভিলেন।

নায়ক অরুণ কুমার ও ভিলেন নায়ক বিশুর মেকআপ নেওয়া হয়ে গেছে। এ দৃশ্যে থাকবে…..

নায়িকা কলসী কাখে জল নিয়ে ফিরছিলো।

একটা ঘোড়ার পিঠে হঠাৎ এগিয়ে এলো ভিলেন। রাজার সেনাপতির বেশ চোখে মুখে লালসা পূর্ণ ক্ষুব্ধ শার্দুলের চাহনী। অশ্বপষ্ঠে ছুটে আসছে। ভিলেন নায়িকার দিকে, নায়িকার পাশ কেটে চলে যাবার সময় এক ঝটকায় ভিলেন নায়িকাকে তুলে নিলো ঘোড়ার পিঠে। নায়িকার হাত থেকে ভরা কলসীটা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে গেলো। নায়িকা তীব্র চীৎকার করে উঠলো–বাঁচাও, বাঁচাও, বাঁচাও…

অদূরে একটা ঘোড়ার পিঠে নায়ক ছুটে আসে, দাঁড়ায় একটু ঘোড়াটা দুপা উঁচু করে চিহি শব্দ করে তারপর তীর বেগে ছুটে যায়….

মেকআপ নেওয়া হয়ে গেলো।

নায়িকা কলসী কাখে এসে দাঁড়ালো পথের মধ্যে।

পরিচালক স্ক্রিপ্ট খুলে তার কার্যসূচী বুঝিয়ে দিলেন নায়িকা জ্যোছনা রায়কে।

ক্যামেরা নায়িকাকে ধরে এগুচ্ছে।

নায়িকা আপন মনে কলসী নিয়ে পথ বেয়ে চলেছে।

পরিচালক চীকার করে উঠলো-কাট।

এদিকে অশ্বপৃষ্ঠে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভিলেন। ক্যামেরা এবার অশ্বসহ ভিলেনকে ধরলো। ক্যামেরা ধীরে ধীরে ঘুরছে।

দ্রুত এগিয়ে আসছে ভিলেন।

পরিচালক নাহার চৌধুরীর কণ্ঠস্বর-কাট।

আবার নায়িকাকে ধরলো ক্যামেরা, ছুটে আসছে ভিলেন অশ্বপৃষ্ঠে। ক্যামেরায় এক সঙ্গে ধরা হলো ভিলেন নায়িকাকে এক ঝটকায় তুলে নিলো অশ্বপৃষ্ঠে, তারপর অশ্বপৃষ্ঠে নায়িকা সহ ভিলেন ছুটে চলেছে। কলসীটা নায়িকার হাত থেকে খসে পড়ে খান খান হয়ে ভেংগে গেলো। এ দৃশ্যটাও ক্যমেরা ম্যান অনন্ত বাবু ধরে নিলেন একই সঙ্গে।

পরিচালক আনন্দধ্বনি করে উঠলেন–সাবাস!

এখন নায়ক অরুণ কুমারের কাজ।

অরুণ কুমার তার সাদা ধবধবে ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

ক্যামেরা ঠিক করে নিলেন অনন্ত বাবু।

পরিচালক অরুণ বাবুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন স্ক্রিপ্ট হাতে।

অন্যান্য যার যা কাজ সবই ঠিক হয়ে কাজ শুরু করবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন।

শব্দযন্ত্রী কাওসার আহম্মদের এখন কোন কাজ নেই। তিনি ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দ পরে সংযোগ করে নেবেন, এখন তিনি কাজ দেখে যাচ্ছেন শুধু।

অরুণ কুমারকে পরিচালক তার কাজ বুঝিয়ে দিতেই অরুণ বাবুর মুখ বিবর্ণ হলো, তাকে অনেক করে ঘোড়া চড়া শেখানো হয়েছিল, কিন্তু আজ বলছেন, আমি এটা পারবো কিনা সন্দেহ।

পরিচালক বিপদে পড়লেন; এমনটি যে হবে কল্পনাও করতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন, অরুণ কুমারকে যে ভাবে ঘোড়ায় চড়া শিখিয়ে নেওয়া হলো তাতেই কাজ চলবে।

কিন্তু এখন একেবারে তিনি বেঁকে বসলেন, ঘোড়ায় চড়ে দৌড়তে পারবেন না।

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন পরিচালক নাহার চৌধুরী।

স্টুডিওতে ছবির প্রাথমিক কাজ শেষ করে আউটডোরে সুটিং এ বেরিয়েছেন নাহার চৌধুরী। আউটডোরের কিছু দৃশ্য গ্রহণের পর ইনডোরে কাজ শুরু করবেন—এই তার ইচ্ছা। হিরোর দুটো মাত্র দশ্য ইতিপূর্বে গ্রহণ করা হয়েছে। ঘোড়া চড়া দৃশ্যগুলি বাকী রেখে, তাকে ঘোড়া চড়া শেখানো হচ্ছিলো।

আজ পরিচালক নাহার চৌধুরী বিপদে পড়ে গেলেন। এ দৃশ্য এই স্থানেই গ্রহণ করতে হবে। বিস্তৃত বালুকাভূমি, মাঝ মাঝে টিলা আর ঝোপ জাড়, অদূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে।

পরিচালক অরুণ কুমার চেষ্টা নিতে বললেন।

তিনি ঘোড়ায় চড়লেন বেটে কিন্তু ঘোড়ার পিঠে এই উঁচু নীচু স্থান দিয়ে দৌড়াতে রাজি হলেন না, ভয়ে কুকড়ে গেলেন—যদি পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেংগে যায়!

বেশ কিছুক্ষণ এ সব নিয়েই কেটে গেলো।

এবার উপায়? অন্ততঃপক্ষে ঘোড়ায় চড়া ব্যাপারটা আর একজনকে নিয়েও চালানো যায়, কিন্তু তাদের ইউনিটে কেউ ঘোড়ায় চাপতে জানেনা। পরিচালক এনিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

পরিচালক যখন উপায়ন্তর না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়লেন তখন বনহুর এগিয়ে এলো—নায়ক ছাড়া যদি চলে তবে আমি একবার চেষ্টা নিতে পারি কি?

আনন্দে অস্ফুট ধ্বনি করে বনহুরকে জড়িয়ে ধরলেন পরিচালক নাহার চৌধুরী। খুশীতে যেন ফেটে পড়লেন বললেন–আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো।

হেসে বললো বনহুর—থাক আগে কাজ হোক।

দৃশ্যটা গ্রহণ করা হয়ে গেলো।

গোটা ইউনিট জয়ধ্বনি করে উঠলো।

বনহুরকে সামান্য মেকআপ দেওয়া হয়েছিলো–তাতেই তকে অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছিলো। তাছাড়া ঘোড়ায় চড়া কালে মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয় নাই, কাজেই অসুবিধা হলোনা কিছু।

পরিচালক নাহার চৌধুরী জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে।

সুদক্ষ অভিনেতার মতই নাকি সে কাজ করেছে। বনহুরের প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। এতো অল্প সময়ে এতো সুন্দরভাবে কোন অভিজ্ঞ অভিনেতাও নাকি কাজ করতে পারেনা।

সেদিনের সুটিং শেষ করে আবার যাত্রা শুরু করলেন পরিচালক নাহার চৌধুরী।

কিন্তু সেদিনের পর হঠাৎ অরুণ কুমার বেঁকে বসলেন, এ ছবিতে তিনি আর কাজ করবেন না।

পরিচালক কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন।

অনেক করেও অরুণ কুমারকে মত করানো গেলোনা।

সেদিনে বনহুরের কৃতিত্ব তার আত্মমর্যাদায় চরম আঘাত করেছিলো। একেই অরুন কুমার বনহুরের সৌন্দর্য দর্শনে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। চিত্রজগতে অরুন কুমার নামকরা সুপুরুষ। শহরের বহু যুবতী অরুণ কুমারের সঙ্গে এতোটুকু আলাপ করার জন্য সদা উন্মুখ। সেই অরুণ কুমার সেনের এই চরম অপমান। তার সৌন্দর্য স্নান হয়ে গেছে মকছুদ চৌধুরীর কাছে। নিজকে অপমানিত বোধ করে অরুণ কুমার।

অরুণ কুমার কুন্তিবাঈ ছবির জন্য চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি অসম্ভবভাবে বেঁকে বসলেন।

পরিচালক নাহার চৌধুরী ভেংগে পড়বার লোক না। অরুণ কুমার তার ছবিতে কাজ না করলেও তিনি ছবি ছেড়ে পালাবেন না। কুন্তিবাঈ ছবির প্রযোজক আরফান উল্লাহর দৃঢ় বিশ্বাস নাহার চৌধুরীর উপর। ভদ্রলোকের আরও তিনখানা ছবিতে নাহার চৌধুরী পরিচালনা করেছেন। প্রত্যেকটা ছবি তিনি আপ্রাণ চেষ্টা ও আন্তরিকতা নিয়ে সমাধা করেছিলেন। তিন খানাই হিট ছবি হয়েছিলো। প্রচুর পয়সা পেয়েছেন প্রযোজক আরফান উল্লাহ!

.

নাহার চৌধুরী প্রত্যেকটা ছবিতে নতুন মুখ আবিষ্কার করেন। প্রাণঢালা যত্নে তিনি এদের শিখিয়ে কার্যক্ষম করে গড়ে তোলেন। এহেন জন অরুণ কুমারের এই অহেতুক অভিমানে হতাশ হলেন না।

সেদিন বনহুর আর নূরী ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস দেখছিলো, আর মাঝে মাঝে বনহুর নুরীকে দুএকটা পূর্ব কথা বলে তার স্মরণশক্তি ফেরবার চেষ্টা করছিলো বনহুর যতই যা করুক, সব সময় নূরীর জন্য তার চিন্তার অন্ত নেই। নারীর স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে না আসা অরধি নানাভাবে নানা কাজের মধ্যে দিয়ে ওকে পূর্ব কথা স্মরণ করাতে চেষ্টা করত সে। আজও এ-কথা সে-কথা বলে নূরীর জ্ঞান পরীক্ষা করছিলো।

এমন সময় পরিচালক নাহার চৌধুরী ও নায়িকা জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়ালেন তাদের পাশে।

আকাশে পূর্ণ চন্দ্র।

জ্যোছনার আলোতে ডেকখানা আলোকিত।

নাহার চৌধুরী হেসে বললেন-আপনারা এখানে; আর আমরা খুঁজে এলাম আপনাদের ক্যাবিনে।

হেসে বললো বনহুর-সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস দেখছিলাম।

সত্যি, প্রকৃতির অপরূপ লীলা–কিন্তু এ সব দেখবার বা উপভোগ করবার শক্তি কজনার আছে বলুন? সারা দিন থাকি ছবির চিন্তা নিয়ে। রাতে যে ঘুমোবা তারই কি যো আছে; পর দিনের প্রোগ্রাম ভাবতেই গোটা রাত কাবার হয়ে যায়। তারপর ফিরে তাকালেন নাহার চৌধুরী জ্যোছনা রায়ের দিকে—কি বললা জ্যোছনা, সত্যি কিনা?

জ্যোছনা রায় একটু হাসলো।

নাহার চৌধুরী এবার বললেন–মিঃ মকছুদ, আপনার সঙ্গে একটি জরুরী কথা আছে।

বেশ বলুন?

এখানে নয়, চলুন ক্যাবিনে সেখানেই বলবো।

ধন্যবাদ। চলুন। বনহুর এবার নূরীকে লক্ষ্য করে বললো—তুমি ক্যাবিনে যাও নূরী, আমি এক্ষুনি আসছি।

নূরী নীরবে তাদের নিজ ক্যাবিনের দিকে চলে গেলো।

বনহুর এগুলো নাহার চৌধুরী আর জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে।

পরিচালক নাহার চৌধুরীর ক্যাবিনে এসে তিন জন মুখো-মুখী বসলো। ক্যামেরা ম্যান অনন্ত বাবুও আছেন সেখানে।

অনন্ত বাবু বয়সী ভদ্রলোকে—ধীর গম্ভীর মানুষ। ক্যামেরায় তার দক্ষতা অপরিসীম। অনন্ত বাবু নীরবে সিগারেট পান করছিলেন। ক্যাবিনে চতুর্থ জন অনন্ত বাবু ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।

নাহার চৌধুরী সিগারেট-কেসটা বাড়িয়ে ধরলেন বনহুরের দিকে নিন। বনহুর একটা সিগারেট তুলে নিলো আংগুল দিয়ে।

নাহার চৌধুরী নিজেও একটা সিগারেট নিয়ে খুঁজলেন ঠোঁটের ফাঁকে। তারপর অগ্নি সংযোগ করে এক মুখ ধোয়া ছুড়ে দিলেন সম্মুখে।

বনহুর আপন মনে সিগারেট থেকে ধূম্র নির্গত করছিলো।

নাহার চৌধুরী তাকে এখানে কি কথা বলার জন্য ডেকে এনেছেন, এখনও সে জানে না।

বনহুর একবার নিজের অজ্ঞাতে তাকালো জ্যোছনা রায়ের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে জ্যোছনা রায়ের দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার। জ্যোছনা রায় নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই জ্যোছনা রায় দৃষ্টি নত করে নিলো।

নাহার চৌধুরী বললেন——মিঃ মকছুদ, আপনাকে যে কথা বলবো বলে এখানে ডেকেছি—সত্যি তা বলতে আমি কুণ্ঠা বোধ করছি, কাজেই আমাকে কিছুটা ভূমিকা গ্রহণ করতে হচ্ছে।

বলুন? হেসে বললো বনহুর।

নাহার চৌধুরীর হাতের সিগারেটে বেশ জোরে কয়েকটা টান দিয়ে এ্যাসট্রেতে সিগারেটটা নিক্ষেপ করে সোজা হয়ে বসলেন।

বনহুর ও অন্যান্য সবাই তাকালো নাহার চৌধুরীর মুখের দিকে।

নাহার চৌধুরী বললেন এবার আপনি শুনেছেন এবং জানেন আমার কুন্তিবাঈ ছবির নায়ক অরুণ কুমার সেন। অরুণ কুমারকে আমি এ ছবির জন্য পঁচিশ হাজার টাকা কন্ট্রাক করেছি। কিন্তু অরুণ কুমার এখন বেঁকে বসেছেন—এ ছবিতে তিনি কাজ করবেন না।

বনহুর কিছুমাত্র আশ্চর্য হলোনা, কারণ এ কথা সে পূর্বেই শুনেছিলো। নিচুপ ধুম নির্গত করে চললো সে। দৃষ্টি তার ক্যাবিনের ছাদে সীমাবদ্ধ। সোফায় ঠেস দিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে নাহার চৌধুরী ও শুনে যাচ্ছিলো বনহুর।

নাহার চৌধুরী বলে যাচ্ছেন—অনেক অনুরোধ করা সত্বেও তাকে রাজি করাতে সক্ষম হলাম না। এখন আমি বিপদগ্রস্ত।

বনহুর এবার শান্ত কণ্ঠে বললো-চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও তিনি কি করে মত পাল্টান?

কি করবো বলুন, সব ওদের ইচ্ছা।

না, এ হতে পারে না, তাকে বাধ্য করতে হবে ছবি ব্যাপারে।

কিন্তু তা হয় না মিঃ মকছুদ, জোর করে কাউকে দিয়ে অভিনয় আদায় করানো যায় না।

বনহুর সোজা হয়ে বসলো, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো সে–আপনি এতো সোজায় তাকে ছাড়বেন কেনো? শুনেছি ছবির কয়েকটা দৃশ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অরুণ বাবু আছেন।

হাঁ, কিন্তু মাত্র দুটি দৃশ্যে অরুণ বাবু কাজ করেছেন। এখন সে সরে পড়েলেও আমাদের তেমন কোন ক্ষতি হবেনা।

তাহলে অন্য কোন নায়ক….

বনহুরের মুখের কথা লুফে নিলেন নাহার চৌধুরী হাঁ, আমি সেই কথাই ভাবছি মিঃ মকছুদ এবং সেই চিন্তাই করছি। আগামীকাল আমাদের জাহাজ বসুন্দায় পৌঁছে যাবে। আজ জাহাজে আমাদের শেষ দিন, তাই ভাবছি আপনাকে একটা কথা বলবো…..

থামলেন নাহার চৌধুরী।

বনহুর তার কথা শুরু করবার পূর্বেই জানতে পেরেছে তাকে কি বলবেন বা বলবার জন্য নাহার চৌধুরী এখানে ডেকে এনেছেন। মনে মনে হাসলো বনহুর আজ যদি তার আসল পরিচয় জানতো, তাহলে…..

বনহুরের চিন্তাধারায় বাধা পড়লো, বললেন নাহার চৌধুরী–বসুন্দায় পৌঁছেই আমার ছবির কাজ শুরু হবে। নায়ক-নায়িকা উভয়ের কাজ একাধারে চলবে। নাহার চৌধুরী রুমাল বের করে নিজের মুখখানা একবার মুছে নিলেন, তারপর ঢোক গিলে একটু কেশে বললেন–আমার ইচ্ছা, আপনি যদি আমাদের কুন্তিবাঈ ছবির….. মানে……নায়ক হিসাবে কাজ করেন……

বনহুর মিছামিছি বিস্ময় টেনে বললো–এ আপনি কি বলছেন মিঃ নাহার? অসম্ভব এটা।

না, অসম্ভব নয়। এতোক্ষণে নাহার চৌধুরী নিজের কণ্ঠে জোর পেলেন যেন। যা বলতে গিয়ে এতোখানি ভুমিকা টানলেন, এতোক্ষণে যেন সব স্বচ্ছ হয়ে গেছে। একটু থেমে বললেন–আপনার কাছে আমার অনুরোধ মিঃ মকছুদ। হাতজুড়ে কথাটা বললেন তিনি।

বনহুর দস্যু হলেও তার মানুষের প্রাণ, তাছাড়াও আজ নাহার চৌধুরী ছাড়া তার জীবন রক্ষা পেতোনা। শুধু তার নয়–নরীও না খেয়ে শুকিয়ে মরতো ঐ নির্জন সাগর সৈকতে। এতোখানি উপকার যে করেছে তাকে কি করে বনহুর বিফল করবে। কিন্তু কত দিন দেখে নাই তার মাকে, মনিরাকে……. ওদের জন্য মনটা ছট ফট করে উঠলো, আনমনা হয়ে গেলো বনহুর।

নাহার চৌধুরী অনুনয়ের সুরে বললো আপনি আমাকে বাঁচান মিঃ মকছুদ।

বনহুর সম্বিৎ ফিরে পেলো, বললেন—আমি তো অভিনয় জানিনা।

বনহুরের কথায় নাহার চৌধুরীর দুচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বনহুরের নরম সুরে তিনি যেন ভরসা পেলেন খুজে। আনন্দ ভরা কণ্ঠে বললেনআপনি শুধু রাজি হলে আমরা কৃতার্থ। অভিনয় আপনাকে জানতে হবেনা, যা করতে হয় আমি সব শিখিয়ে নেবো!

বেশ রাজি।

নাহার চৌধুরী আর একবার বনহুরকে জড়িয়ে ধরলেন আনন্দের আতিশয্যে।

অনন্ত বাবুর চোখমুখেও খুশীর উচ্ছ্বাস, তিনি এতোক্ষণ গম্ভীর মুখে প্রতীক্ষা করছিলেন মিঃ মকসুদ রাজি হন কি না। অনন্ত বাবুই নাহার চৌধুরীকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, অরুণ বাবু কাজ করতে চান না বেশ ভাল কথা। দেখুন যদি মিঃ মকছুদ সাহেবকে রাজি করাতে পারেন…..

বাস্-কথাটা নাহার চৌধুরীর মনে লেগে গিয়েছিলো। তিনিও অন্তরে অন্তরে এমনি চিন্তাই করছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেননি। অনন্ত বাবু। কথাটা বলায় তার মনে একটা উদ্যম বাসনা ছাড়া নিয়ে উঠেছিলো, তিনি খুশী হয়েছিলেন খুব। এবং কথাটা ছবির নায়িকা, জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে আলাপ করে আরও আনন্দিত হয়েছিলেন।

জ্যোছনা রায় বলেছিলো—অরুণ কুমার বাবু যদি কাজ না করতে চান তবে তাকে দিয়ে জোর করে কাজ আদায় করা যাবে না। এতে ছবি হতে পারে কিন্তু ছবির মধ্যে কোন আন্তরিকতা থাকবে না। শেষ পর্যন্ত ছবি হিট না-ও করতে পারে। মিঃ মকছুদ সাহেব যদি রাজি হন তবে কোন কথা নেই।

নাহার চৌধুরীর মন খুশীতে ভরে উঠেছিলো। তিনি জ্যোছনা রায় সহ, তাই মিঃ মকছুদের পাশে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

বনহুর রাজি হওয়ায় জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল দীপ্তময় হয়ে উঠলো।

বনহুর ওর দিকে চাইতে হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো জ্যোছনা রায়।

১৪.

বৈকালে নির্জন শান্ত পরিবেশে ডেকে দাঁড়িয়েছিলো বনহুর। ফুরফুরে হওয়ায় বনহুরের কোঁকড়ানো চুলগুলি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। বনহুর বারবার হাত দিয়ে চুলগুলি পিছনে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলো। দক্ষিণ হস্তে ধুমায়িত সিগারেট।

জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে হ্যালো মিঃ মকছুদ।

ফিরে তাকালো বনহুর, স্মিত হাসি হেসে বললো—আসুন।

জ্যোছনা রায় এক থোকা রজনী গন্ধার মত বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো, সুমধুর কণ্ঠস্বরে বললো–আপনার বোন কোথায়?

বললো বনহুর-ক্যাবিনে।

এই সুন্দর বৈকালে ক্যাবিনের অন্ধকারে? আশ্চর্য মেয়ে সত্যি আপনার বোনটা। কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলতে চান না।

হাঁ, আগে ঠিক অমন ছিলোনা, জাহাজডুবির পর থেকে ওর কি যেন হয়েছে—কারো সঙ্গে মিশতে বা কথা বলতে চায় না। এমন কি আমার সঙ্গেও ঠিকভাবে কথাবার্তা বলে না।

জ্যোছনা রায় বললো সত্যি বড় দুঃখের কথা! নিশ্চয়ই ব্রেনে কোন গোলযোগ হয়েছে।

হাঁ, আমারও তাই মনে হয়।

ওকে ঠিকভাবে চিকিৎসা করা দরকার।

শহরে পৌঁছে ওর চিকিৎসা ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।

কিছুক্ষণ উভয়ে নীরবে কাটে।

জ্যোছনা রায়ের দেহে আজ ফিকে গোলাপী শাড়ী! ব্লাউজটাও ঠিক শাড়ীর রঙ-ফিকে গোলাপী। একরাশ কালো কোঁকড়ানো চুল মাথায় উপরে চূড়ো করে বাধা। একটা গোলাপ ফুল গোজা রয়েছে চূড়োর বাম পাশে। ফুলটা অবশ্য সত্যি গোলাপ নয়, প্লাষ্টিকের ফুল। কিন্তু দেখলে কেউ ভাবতে পারবে না ওটা নকল ফুল। একেবারে যেন সদ্য গাছ থেকে তুলে আনা গোলাপ ওটা। পায়ের জুতোও গোলাপী, ভ্যানিটি ও রুমালখানাও সে শাড়ীর সঙ্গে ম্যাচ করে পরেছে। তার দুধে আলতা মেশানো দেহটার সঙ্গে মিশে গেছে যেন এসব। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে জ্যোছনা রায়কে আজ।

অভিনেত্রী জ্যোছনা রায় শুধু সুন্দরীই নয়। তার মিষ্টি হাসিটুকু দর্শকগণকে উন্মাদ করে তোলে। জ্যোছনা রায় যে ছবিতে থাকে সে ছবি হিট না করে যায় না। সমস্ত দেশজোড়া নাম জ্যোছনা রায়ের। জ্যোছনা রায়কে না দেখলে দর্শকমণ্ডলীর প্রাণই যেন ভরে না।

সেই সুন্দরী অভিনেত্রী জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়িয়েছে বনহুরের পাশে। সেন্টের একটা সুমিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চার ধারে। সদ্য ফোটা গোলাপ ফুলের সুবাসের মত। বনহুর চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না। তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ নয়নে।

মৃদু হেসে বললো জ্যোছনা রায়–কি দেখছেন?

অপূর্ব।

কি?

আপনি।

বনহুরের মুখে এই কথাটা শুনবার জন্যই যেন জ্যোছনা উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতিক্ষা করছিলো। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো যে সে। দৃষ্টি নত করে নিয়ে বললো জ্যোছনা রায় –বেশী বাড়িয়ে বলছেন।

মোটেই না। মিস রায়, সত্যি আপনি অপূর্ব। 

যাক ওসব বাজে কথা।

এটা যদি বাজে কথা হয় তবে কোনটা কাজের কথা, বলুন?

সত্যি, আপনি আমার বিপরীতে কাজ করবেন জেনে অনেক খুশী হয়েছি। ধন্যবাদ জানাতে এলাম আপনাকে।

ও? এই কথা? হাঁ, আপনার ধন্যবাদটুকু, এখনও পাইনি। কিন্তু এখন তো আপনারা খুব ধন্যবাদ দিচ্ছেন, যখন দেখবেন ক্যামেরার সম্মুখে দাঁড়িয়ে একেবারে সব গোল পাকিয়ে দেবো তখন হবে মজা। কথা শেষ করে হেসে উঠলো বনহুর।

জ্যোছনা রায় বনহুরের হাস্য উজ্জ্বল দীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক নয়নে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *