1 of 3

মানস অভয়ারণ্য – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

মানস অভয়ারণ্য – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

বাঘের ঘরবাড়ি

এদীনা পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জায়গা তো বিস্তর ৷ কিন্তু মানসে গেলে যেন মরে যেতে ইচ্ছে করে ৷ মরার জায়গা পৃথিবীতে বোধহয় ওই একটাই ৷ মানস ৷ সেটাও বন্ধ হয়ে গেল ৷

সেই ১৯২৮ সাল থেকে মানস সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৷ বেশ চলছিল ৷ কেউ যেত না ৷ জানত না ৷ গোল বাধল প্রখ্যাত বনবিশারদ ই-পী-গী ‘ভারতের বন্যপ্রাণী’ (ওয়াইল্ড লাইফ ইন ইন্ডিয়া) নামে বইটি লেখার পর, যা বেরোয় ৫০ দশকের মাঝামাঝি ৷ বন্ধুবর জওহরলাল নেহরু লিখলেন ফোরওয়ার্ড ৷ শ্রীযুক্ত গী ওই বইতে মানস সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় লিখলেন ৷ তিনি লিখলেন, সোনালি লোমে-ভরা দীর্ঘদেহী হনুমানদের কথা (গোল্ডেন লেঙ্গুর) যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই ৷ মানসকে তিনি ঘোষণা করলেন ‘পৃথিবীর সুন্দরতম স্যাংচুয়ারি’ বলে ৷

বাস! রে-রে করে সাহেবরা উড়ে আসতে লাগল, সঙ্গে মেম ৷ যদিও সৌভাগ্যের বিষয়, সাহেবদের পছন্দ হল নদীর ওপারে ভুটান সরকারের মস্ত ও আধুনিক ট্যুরিস্ট বাংলোটি ৷ নদীপাড়ে ক্যাম্প ফেলে থাকতে তাঁরা আরও পছন্দ করেন ৷ তাঁরা প্রাণী-নিরীক্ষণ করেন গোলাকার রাবার বোটে ভেসে যেতে যেতে ৷ অবশ্য, তাঁদের একটা সুবিধা এই যে ভারতীয় বাঘ সম্ভবত সাহেবদের খায় না ৷ নইলে তো, রুদ্রপ্রয়াগের চিতাটা কবেই করবেটকে সাবাড় করে দিত ৷

একবার একজনা লাফ দিয়েছিল বটে করবেটের দিকে ৷ তৎক্ষণাৎ শূন্যে মৃত্যু, থ্রি-নট-থ্রি’র মাত্র একটি গুলিতে ৷ আমি মোহনের মানুষ খেকো’র কথা বলছি ৷

আসলে, সেই কোম্পানির আমল থেকেই ওরা জানে, খাবে তো, কেলেকুলে দেখে খাও ৷ কেউ কিছুটি বলবে না ৷ কিন্তু, সাহেব খেয়েছ কি মরেছ ৷ পুলিশ-দারোগা আসবে ৷ মিলিটারি আসবে ৷ তখন কেলেঙ্কারি! কিম্বা কে জানে, হয়তো সাহেবদের খেতে বিচ্ছিরি ৷ নইলে অত সুযোগ পেয়েও এবং যথেষ্ট ক্ষুধিত থাকা সত্বেও (বিশেষত জালিয়ানওয়ালাবাগের পর) কই, একটা-কেও তো পুড়িয়ে খাইনি আমরা?

মানসে বাঘের সংখ্যা প্রচুর ৷ তাই এ বাঘের কিসসা ৷

বাঘ-সুমারিতে সুন্দরবন ফার্স্ট ৷ মানস দ্বিতীয় ৷ মানসে গেলেন, তবু বাঘ দেখতে পেলেন না, এমনটা হতে পারে ৷ উনি স্বয়ং দেখা না দিলে কেউ তাঁর দেখা তো পায় না! তবে, মানসে তিনদিন থাকলেন, অথচ ব্যাঘ্রগর্জনে রাতের বাংলো একদিনও কেঁপে উঠল না, শার্সি ঝনঝনিয়ে উঠল না, এমন ঘটনা মানসে না ঘটারই সম্ভাবনা ৷

কেননা, মানসের বাংলোটি বনবিভাগের ভাষায়, কোর এরিয়ায় ৷ যেখানে বাঘের ঘরবাড়ি ৷

এক আকাশে চন্দ্রসূর্য

মানসে আমি প্রথমবার যাই ১৯৮১ সালে ৷ সঙ্গী বন্ধুবর পার্থসারথি চৌধুরী ও নিমাই সেন ৷ ‘যাই’ না বলে বলা উচিত ভ্রমপূর্বক অনট প্রত্যয় যোগে (ভ্রম Ô অনট ñ ভ্রমণ) আমরা ওখানে গিয়ে পড়ি ৷ সারা আসাম টো-টো করতে করতে, হঠাৎ ৷ মানস সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছুই তখন জানতাম না ৷

অবশ্য, পরে মানস যাওয়া জলভাত হয়ে গিয়েছিল ৷ বিকেলে হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস ৷ পরদিন বিকেলে বরপেটা রোড স্টেশনে ৷ বরপেটা থেকে সেদিনই মানসে-ট্যাক্সিতে ৪০ কিলোমিটার ৷

তখনও নিউ বঙ্গাইগাঁও-এ নেমে, মিটার গেজে যেতে হত বরপেটা রোড ৷ আমরা যখন যাই ৷ রাতে থাকতে হত ওখানে ৷ পরদিন মানস ৷

মানস স্যাংচুয়ারির বাংলো যে-জায়গায়, তার নাম মথানগুড়ি ৷ মথানগুড়িতে দুটি বাংলো ৷ আপার ও লোয়ার ৷ বলা বাহুল্য বাংলোটি কাঠের ৷ আপার বাংলোটি দোতলা ৷ টিলার ওপর ৷ সুসজ্জিত ৷ এমনকী, একটি বিশাল গ্লাস-প্লানেল-ওয়ালা পর্যবেক্ষণ কক্ষও রয়েছে ৷ পাহাড়ি সিঁড়িশ্রেণী নেমে গেছে ৫০০ ফিট নিচে বেঁকি নদী পর্যন্ত ৷ ওপারে ভুটানের পাহাড় ও অরণ্যানী ৷

লোয়ার বাংলো টিলার নিচে ৷ দুই বাংলোতেই অনেকগুলো ঘর আছে ৷ তখন ভাড়া ছিল ৩০ টাকা ৷ এছাড়া আছে নদীর ধারে ল্যা-কেবিন ৷

জানুয়ারি ১৯৮১-র গোড়ায় আমরা তিন হরিহর (আত্মা) যখন এখানে পৌঁছই, তখন বিকেলবেলা ৷ যে সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম, ভাষায় তার বর্ণনা হয় না ৷ সাধে বিভূতিভূষণ বারবার লিখেছেন, ‘এ অপূর্ব দৃশ্য যে না দেখিয়াছে, তাহাকে কী বুঝাইব!’ সেদিন ছিল পূর্ণিমা ৷ তখন ভুটান হিলসের পিছনে চাঁদ উঠে পড়েছিল, যদিও তখনও সূর্যাস্ত হয়নি ৷ একই আকাশে চাঁদ ও সূর্য-তাদের মেশামেশি আলোয় যে রং তৈরি হয়ে ঝরে পড়ছিল, মানস ও বেঁকি নদীর মিলন-মোহনায়, নানাভাবে, তাকে ‘স্বর্গ-রং’ ছাড়া আর কী বলব?

স্বর্গের রাজধানীতে এসে পড়েছি বলে মনে হয়েছিল ৷

ওপারেতে সর্বসুখ

নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস ৷ নীল নৌকায় চেপে ওপারে ভুটানে গেলে অবশ্য, দীর্ঘশ্বাস সহ, একথা মনে না পড়ে পারে না ৷ নদীতীর ছেড়ে কিছুটা ওপরে উঠলেই দেখা যাবে, কমপক্ষে ফুট পাঁচেক সোনা-লোমের ল্যাজ ঝুলিয়ে (হরিদ্রাভ বা সোনালি নয়) গোল্ডেন লেঙ্গুরের দলবল ৷ ডান দিকে বনপথের প্রবেশমুখে অবিশ্বাস্য পথ-ফলক-To The Bar! সেখানে পৌঁছলে রঙিন ছাতার নিচে বেতের সাদা চেয়ার-টেবিল ৷ পৃথিবীর যাবতীয় খাদ্য ও পানীয়, এক নরমাংস ছাড়া, থরে-থরে সাজানো ৷ ইতস্তত কিছু সোনালি মানব-মানবী ৷ হাজার দুই ফুট নিচে গর্জের (GORGE) মধ্য দিয়ে নেমে আসছে সরু মানস নদী ৷ পাহাড়-কাটা সিঁড়ি তদবধি নেমে গেছে ৷

অথচ, মথানগুড়ির বাংলোয় আরামদায়ক ঘর পাওয়া গেলেও, সুন্দর কিচেন থাকা সত্বেও খাবার-দাবার সেখানে কিছুই পাওয়া যায় না ৷ প্রথম রাতে আমাদের ডিনার বলতে ছিল এক বোতল ভুটানি রাম ও এক কেজি লেড়ো বিস্কুট ৷ আমাদের ফুড পয়েজনিং হয় ৷ যা পরদিন ওপারের সর্বসুখ বিফ স্টেক ও কাঁচা কর্বুশিয়ের খেতে হবে সারে ৷

প্রথম রাতে দুই-বাংলোর একটিতেও আমরা জায়গা পাইনি ৷ মানস এমনিতে আদৌ কোনও ভিড়-ভাট্টার জায়গা নয় ৷ কিন্তু, সেদিন শিলং থেকে নববছরে কলেজের একটা পুরো ক্লাস এসে পড়েছিল ৷

নদীর ধারে সাত-আটটি লজ-কেবিন ৷ এম ভি হর্ষবর্ধনের কেবিনের চেয়ে অনেক ছোট ৷ পাশাপাশি দুটি বাঙ্ক কোনওমতে ৷ মাঝখানে টি-পাই ৷ কমন টয়লেট-কক্ষ ৷ প্রথম রাতে আমরা তিনজনে সেখানেই গুঁজে যাই ৷ কারণ, ওই যে বললাম, কোর-এরিয়া ৷ বাঘের ঘরবাড়ি ৷ (বনবিভাগের জিপে আমরা এসেছি ৷ সঙ্গে ছিল, দিনেরবেলাতেও, একজন রাইফেলধারী ফরেস্ট গার্ড) ৷

ঘুম ভাঙল খুব ভোরে ৷ কেবিন থরথর করে কাঁপছে ৷ ভূমিকম্প? না ৷ বাঘ? না ৷ কেবিনের পোর্ট হোলের হিমাদ্র কাচ হাত-ওয়াইপার দিয়ে মুছে আমরা দেখলাম, একটি চিত্রল পুরুষ-হরিণ তার সুদীর্ঘ বাঁকা শিং ঘষছে কেবিনের গায়ে ৷

সেই থেকে জীবজগতের কাছে আমি ঋণী ৷

মানস, পুনর্বার

মানসে দ্বিতীয়বার ১৯৮৩ সালে ৷

এক আমেরিকা ছাড়া, আমি যেখানেই গেছি, ভালো লাগলে দু’বার করে গেছি ৷ আমেরিকা ভালো লাগেনি ৷

এবার মে মাসের শেষের দিকে ৷

এবার পাকাপাকি ব্যবস্থা ৷ আপার বাংলোর দোতলায় বুক করা ছিল তিন তিনটি ঘর ৷

ছিল তিন দিনের মতো চাল-ডাল, ডিম ও তৈজসপত্র ৷ এবং প্যাকেট-কুড়ি মশলা-ম্যাগি ৷ স্ত্রী-কন্যা সহ আমি আগের দিন থেকে আছি ৷ ২৪ মে রাত সাতটা-কুড়িতে গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট থেকে এসে পৌঁছল বন্ধুবর বরুণ চৌধুরী ৷ সঙ্গে স্ত্রী মীনা ও ছেলেমেয়ে জয় আর রাখি ৷ গুয়াহাটি থেকে প্রলয়পয়োধি ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে ১৬৮ কিলোমিটার পথ রাইনো ট্র্যাভেলস-এর ঝরঝরে অ্যাম্বাসাডরে চেপে (ড্রাইভার মাতাল) ওরা সেদিন শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল ৷ এটা ঘটনা ৷

মানসে ওদের আবির্ভাবের মুহূর্তটি বরুণ চৌধুরীর ভাষায় এরকম:‘টিলার মাথায় মানস নদীর দিকে পিঠ বেঁকিয়ে ওই সেই স্বপ্নের বাংলো ৷ শুধু পৌঁছবার মইটা কেউ সরিয়ে রেখেছে ৷ ঘনঘোর অন্ধকারে অঝোর বৃষ্টির মধ্যে আকাশ-প্রদীপ (হ্যারিকেন) দুলছে বারান্দায় ৷ ওপরে পৌঁছনোর রাস্তা ছিল না কিছুতেই ৷ রিনা আর সন্দীপের আর্তকণ্ঠ উড়ছে গর্জনকারী হাওয়ায় ৷ তৃণার হাতে দু-সেল টর্চের সিগনাল!

‘শেষ পর্যন্ত রৈ-রৈ ৷ হৈ-হৈ ৷ মহামিলন ৷ ঘড়িতে তখন সাতটা-কুড়ি ৷’

‘রাত আটটায় দুই স্যাঙাৎ আপার বাংলোর ইনস্পেকসান ঘরে ৷ মাঝখানে এক বোতল তরল সোনা ৷ যেন, আজ নয় ৷ চল্লিশ মিনিট আগে নয় ৷ কতকাল এসেছি! রান্নাঘর থেকে রিনার তৈরি খিচুড়ির সুগন্ধ ৷’ (কলকাতার কাউবয়) ৷

পরদিন দুটি হাতির পিঠে চেপে আমরা বন্যজন্তু প্রদর্শনে যাই ৷ তখন দুপুরবেলা ৷ একটিতে মাহুত, আমি, রাখি ও মীনা যথাক্রমে ৷ অন্যটিতে মাহুত, জয়, তৃণা ও রিনা ৷ বরুণ গেল না ৷

বাঘ ছাড়া সবারই দেখা এখানে মেলে ৷ ১৪০ জন তারা ৷ কোথায় যে থাকে! অথচ, সাহেবদের জন্য যথেষ্ট পোজ দিয়েছে ৷ এক বেলজিয়ান বাংলোর রেজিস্ট্রারে লিখে গেছে: ‘টাইগার অ্যাট ফোর পি-এম ৷’ মায়, ফটোও খিঁচেছে ৷ ২৯-৪-৮২’র অপর একটি এন্ট্রিতে দেখলাম: ‘ড্যাড, ইটস স্টিল রেইনিং ৷ -জিম ফুলার ৷ সাউথঅল ৷ লন্ডন ৷’ তার বাবা যখন এসেছিল, সে বহুবছর আগে, বুঝলাম, সেদিনও বৃষ্টি পড়ছিল ৷ মনে হল, ইতিমধ্যে যে ‘ইতি ভাগ্যহীন’ হয়েছে ৷ ডেম এডিথ সিটওয়েলের ক’টি উক্তি আমার মনে না এসে পারে না:

‘স্টিল ফলস দা রেইন

ডার্ক অ্যাজ আওয়ার লস

লাইক নাইনটিন হানড্রেড অ্যান্ড ফিফটি নেলস

আপন দ্য ক্রশ….’

বলা বাহুল্য কবিতাটি ১৯৫০ সালে লেখা ৷

এক অমূল্য চলচ্চিত্র

তো, যা বলছিলাম ৷

যেতে-যেতে গভীর বনের মধ্যে আমাদের এক একা-বাইসনের সঙ্গে দেখা ৷ মানসের একা-বাইসন কুখ্যাত ৷ এদের খুরের ব্যাস দেড় ফুট এবং বৃন্তের পর বৃন্তে গোলাকার শিং সাত ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে ৷ এরা শিঙে তুলে নাকি বাঘও ছুড়ে ফেলে দেয় ৷ (দ্রঃ ই-পি-গী’র গ্রন্থে মানস-অধ্যায়) ৷

মাত্র একশো গজ দূরে সে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে ৷

পিছন থেকে মিনতি-মাখা গলায় মীনা বলল, ‘সন্দীপন, আর-একটু এগিয়ে চল ৷’

মীনা ই-পি-গী পড়েনি ৷ কিন্তু সে তো মাহুতও পড়েনি ৷ সে শুধু মুখে তর্জনী তোলে ৷ অর্থাৎ, চুপ ৷

পাশের হাতি থেকে মেয়ে তৃণার চাপা গলা, ‘বাবা, ফিরে চল ৷’ হাতির মুখ ঘুরিয়ে মাহুতও হাতিকে নিয়ে-যাবার খোঁচা দিল ৷

কিন্তু, মীনার ওই কথা, কথা ৷ যদিও, আরও চাপা স্বরে, ‘আর-একটু এগিয়ে যেতে বল মাহুতকে ৷ আমি আর-একটু কাছ থেকে দেখব ৷’

দেখবার মতো দৃশ্যই বটে ৷ নির্জন নদীতীরে একা-বাইসন, তার মাথায় জড়ানো কতদিনের লতাপাতার মুকুট, পিছনে একটু পরেই সূর্য অস্ত যাবে ৷

কুড়ি গজের মতো এগোতে হল মাহুতকে ৷

‘আর-একটু চল সন্দীপন ৷ ওকে বলো প্লীজ ৷’

কিন্তু, হাতি এবার পা তোলার প্রয়াস করামাত্র-বনের দখল-নেওয়া বিকট এক রণভেরী বাজাল সে, দলছুট একা-বাইসন! সে রীতিমতো চঞ্চল হয়ে উঠেছে ৷ এই চাঞ্চল্য ভয়াবহ ৷ এ-দিকেই যে ছুটে আসবে, তা বোঝার জন্য ই-পি-গী’র দ্বারস্থ হবার আর দরকার পরে না ৷ এবং ছুটে সে কিছুটা এলও ৷ তারপর কী যে হল, কেন সে, কী মনে করে আর এগোল না-তা জানি না ৷ হঠাৎ থেমে পড়ে ও এক প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পিছন ফিরে হাতি-ঘাসের জঙ্গলের দিকে দিল দৌড় ৷ অগণন নুড়ি ও বোল্ডারের ওপর দিয়ে খুরধ্বনি ও প্রতিধ্বনি তুলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে ৷ ওপারে উঠল ৷ তারপর সোজা ছুটতে লাগল ৷ সূর্য অস্ত যাচ্ছিল ওদিকেই ৷ বোধহয় তার শিংয়ে খোঁচা খেয়েই দিগন্তে সূর্যও উঠল ঈষৎ লাফিয়ে ৷

হাকোয়া নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে তার মাথা থেকে খসে পড়া লতাপাতার মুকুট ৷ এই অমূল্য চলচ্চিত্র চোখ বুজলে আজও দেখতে পাই ৷

মানস একটি কবিতা

এই তো গেল মানসের গল্প ৷ গল্পই; যদিও প্রকৃত প্রস্তাবে মানস একটি কবিতা ৷ যদি মানসের শাখানদীগুলি, বেঁকি, সাঙ্কোশ ও হাকোয়ার অববাহিকা ধরে বর্তুল সাদা-লাল রাবার-বোটে করে ভেসে যাওয়া যায় ৷ তীরে গাছগাছালি সব দাঁড়িয়ে পড়েছে ৷ অবাক চোখে, আপনি নয়, হরিণ, সম্বর, হাতি, গণ্ডার, বাইসন-মায় কপালে থাকলে বাঘ-বাঘিনীও আপনাকেই যেন দেখতে এসেছে ৷

এবং যদি নির্জন নৌকায় চেপে অপরাহ্নের নদী পেরিয়ে, ওপারে ভুটানে যাওয়া যায় ৷ জল বরফ-নীল ৷ ওখানে শাখায় শাখায় স্বর্ণমৃগ ৷ গোল্ডেন লেঙ্গুর ৷ তারা তো এপারে আসে না ৷ তারা তো কোথাও যায় না ৷ পৃথিবীর আর-কোথাও তারা তো নেই!

আর, ওপারে ভুটানের রাজবাড়িটি! মন্দ্রিয়নের এঁকে যাওয়া আনফিনিশড ক্যানভাস যেন একটি! আজ তার কত কোটি ডলার দাম কে জানে! একবার দেখলে মাথা-গ্যালারিতে জীবনভর ঝুলে থাকবে ৷

তাই বলছিলাম ৷ বেঁচে-থাকার জায়গা? সে তো অনেক ৷ কিন্তু মরে যাবার জায়গা ওই একটাই ৷ মানস ৷ সেটাও বন্ধ হয়ে গেল!

ভ্রমণ মার্চ, ১৯৯৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *