বাঘ শিকারি রাজামশাই

বাঘ শিকারি রাজামশাই

মিঠিন, টুবাই, ঝিমলিরা যখনই দেওয়ানগঞ্জে মামার বাড়িতে বেড়াতে যায়, তখনই ওদের চাই বলরামদাদুকে। বলরামদাদু থাকেন শিমুলতলির খাল পাড় ধরে কিছুটা এগিয়ে বঁা-দিকে একটা বড়ো পুকুর পাড়ে। লোকে বলে ‘মিত্তিরদিঘি’। এখন অনেকটা মজে গেলেও, যা বিস্তার, মিঠিন-টুবাইরা ভয় পায়। ওদের বিশ্বাস, এই দিঘি এপার-ওপার করতে বড়ো সাঁতারুও ভয় পাবে, ওরা তো কোন ছার! যাক সে-কথা, দিঘি ছাড়িয়ে খানিক এগিয়ে গেলে একটা নিশিবটতলা পড়বে। ওরা বলরামদাদুর মুখে শুনেছে, নিশিবটতলায় নাকি এমন অনেক কান্ড ঘটে সন্ধে-রাতে, সূর্য ডুবে গেলে ওদিকপানে না যাওয়াই ভালো। তো সেই নিশিবটতলার ওপারে বলরামদাদুর বাড়ি। উনি একলা মানুষ, বিয়ে-থা করেননি।

ওরা শুনেছে বলরামদাদুর মুখে, আগে নাকি দেওয়ানগঞ্জে রাজা ছিল, রানি ছিল, রাজপুত্র-রাজকন্যা ছিল। বিরাট রাজবাড়িও ছিল। সেই রাজবাড়ির দেওয়ান ছিল চারজন। তাদের মধ্যে খাস দেওয়ান মহাদেব মহাকাল। মহাদেব মহাকাল ছিলেন বলরামদাদুর ছেলেবেলার বন্ধু। দু-জনে একসঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে বইয়ের ব্যাগ গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে ফড়িং-প্রজাপতি ধরতেন। তাল গাছ থেকে পেড়ে আনতেন বাবুই পাখির বাসা। মোষের ল্যাজের লোম দিয়ে বানানো ফাঁদ পেতে পাখি ধরার জন্যে বসে থাকতেন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত। বর্ষার সময় হলে পুকুরে হুইল ছিপ ফেলে বসে থাকতেন বেলার পর বেলা। তা সেই মহাদেব মহাকাল কাকে যেন ধরে-করে ঢুকে পড়লেন রাজবাড়ির চাকরিতে। তাও আবার যে-সেচাকরি নয়, খাসদেওয়ানের চাকরি। না, একদিনে মহাদেবদাদু খাসদেওয়ান হয়ে যাননি।

রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ মহাদেবদাদুকে খুব বিশ্বাস করতেন। তাঁর শিকারের বন্দুকটায় একা মহাদেবদাদু ছাড়া আর কেউ হাত দিতে পারত না। রাজামশাই বলে দিয়েছিলেন সে-কথা রাজবাড়ির সকলকে।

আর দীপেন্দ্রনারায়ণের শিকারযাত্রার সঙ্গী হবেন মহাদেবদাদু, এ আর নতুন কথা কী! যত লোকলশকর নিয়ে রাজামশাই শিকারে যান না কেন, মহাদেবদাদু থাকবেন একেবারে রাজামশাইয়ের বঁা-দিকে। প্রথম প্রথম খুব ভয় করত মহাদেবদাদুর। প্রত্যেকবার শিকারে যাওয়ার আগে দিদিমাকে বলে যেতেন, আর হয়তো না-ও ফিরতে পারেন। যদি এমন খবর আসে যে, মহাদেবদাদুকে বাঘে খেয়েছে, কেউ যেন অবাক না হয়। কিন্তু শিকার থেকে ফিরলে তবে স্বস্তি হত মহাদেবদাদুর।

এভাবে শিকারে যেতে যেতে মহাদেবদাদুর সাহস গেল বেড়ে। তখন একাই এক-শো। শিকারে গিয়ে রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ দূরে জঙ্গলের মধ্যে যখন ডালপালা নড়ে উঠতে দেখতেন, তখন তাঁর সন্দেহ হত, এটা নিশ্চয়ই বাঘ। আর তখনই মহাদেবদাদু বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন। শুধু বন্দুকের মতো দেখতে একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস দেখাতেন। আর রাজামশাই তখন মহাদেবদাদুর পিঠ চাপড়ে দিতেন, ‘‘বা:! বেশ, বেশ! এই তো প্রকৃত শিকারি!’’ রাজপ্রসাদে ফিরে সাহসের পুরস্কার হিসেবে রাজামশাই মহাদেবদাদুকে দান করে দিতেন দু-দশ বিঘে পতিত জমি।

এমন সময় একদিন রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ বললেন, ‘‘মহাদেব, একজন লোক চাই, যে তোমার মতো আমার সঙ্গে শিকারে যেতে পারবে। শুধু শিকারে গেলেই তো হবে না, তার হাতের টিপও যেন ভালো হয়। মহাদেবদাদু রাজার আদেশ রাখতে অনেক ভাবলেন কয়েকদিন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কেন, বলরাম তো আছে! ও যখন বনে-বাদাড়ে গুলতি চালাত, টিপ লাগেনি, এমন হয়েছে বলে তো মনে পড়ে না।

মহাদেবদাদু খোঁজখবর করে বলরামদাদুকে নিয়ে এলেন রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণের কাছে। সে-দিনই চাকরি হয়ে গেল বলরামদাদুর।

এসব গল্প বলরামদাদুর মুখ থেকেই শোনা। দেখতে দেখতে রাজামশাইয়ের শিকারের সঙ্গী হয়ে উঠলেন বলরামদাদু। মহাদেবদাদুও শিকারে যেতেন। কিন্তু রাজামশাই শিকারে যাবেন, আর বলরামদাদু যাবেন না, এ তো হতে পারে না।

একবার রাজা ঠিক করলেন বেতস নদী পেরিয়ে যাবেন নিশিবনে। সেনাকি ভীষণ ঘন জঙ্গল। দিনের আলো নাকি মাটি ছোঁয় না। হঠাৎ খবর এল, বলরামদাদুর ধুম জ্বর। তখন হাতে আর মাত্র দু-দিন সময়। শিকারযাত্রার সব আয়োজন রেডি। রাজামশাই শিকারে যাবেন ঠিক করেছেন আর যাওয়া হয়নি, এ দেওয়ানগঞ্জের ইতিহাসে ঘটেনি। কিন্তু সেবার রাজামশাই ঘোষণা করলেন, ‘‘এবার শিকারে যাব না আমি।’’ চিন্তায় পড়লেন মহাদেবদাদুও। বন্দুকে তেল মাখিয়ে রাখা হয়েছে। এখন কী হবে? রাজামশাই বললেন, ‘‘আমি শিকারে যাব আর বলরাম থাকবে না, সেহয় নাকি? তোরা কি চাস আমাকে বাঘে খাক?’’

বলরামদাদু রাজামশাইয়ের শিকারসঙ্গী। ভারী সুন্দর চাকরি। রাজামশাই যদি বছরে একবার শিকারে যান, তো ওই একবারই সপ্তাহখানেকের কাজ। তারপর সারাবছর বন্দুকের দেখভাল। এর পর রাজামশাই কোন জঙ্গলে শিকারে যাবেন, তার প্ল্যান করা, এইসব নিয়ে কেটে যেত গোটা বছরটা।

গেলবার পুজোর সময় মিঠিনরা বলরামদাদুর কাছে বসে একটা দারুণ শিকারের গল্প শুনেছে। সেবার রাজামশাই শিকারে গেছেন হরিণভাসা জঙ্গলে। আর মহাদেবদাদুর হয়েছে বেজায় কাশি। রাজামশাই তাই শিকারে নিয়ে যাবেন না মহাদেবদাদুকে, ‘‘আহা, থাক না মহাদেব! তুই তো সবসময়ই যাস। এবার তোর কাশি শুনলে শিকার পালাবে যে!’’

তবু নাছোড় মহাদেবদাদু। তিনি কাশি সারাতে ছুটলেন রাজকবিরাজের কাছে। মধু-তুলসী পাতার রস খেলেন সাতদিন নিয়ম করে। মুখে সারাক্ষণ লবঙ্গ রাখলেন। আমপাতার উলটো দিকে তেল আর নুন গরম করে গলায় মাখলেন। আর কত কীসব খেতে হল রাজকবিরাজের নির্দেশে। কিন্তু শেষমেশ কাশি আর থামল না। মহাদেবদাদু রাগে রাজামশাইয়ের কাছে রাজকবিরাজের চাকরি খাওয়ারও সুপারিশ পর্যন্ত করেছিলেন। রাজা অবশ্য তা মেনে নেননি।

শেষপর্যন্ত মহাদেবদাদু বাদ পড়লেন শিকারযাত্রা থেকে। বলরামদাদুকে নিয়ে রাজামশাই চললেন শিকারে। লোকলশকর নিয়ে রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ চলেছেন আগে আগে। তাঁর পিছনে বলরামদাদু। অনেকটা ছায়াসঙ্গীর মতো। রাজামশাই তিনটে বন্দুক নিয়েছেন। নতুন কেনা বন্দুকটা নিয়েছেন রাজামশাই। আর দুটো বন্দুক বলরামদাদুর কাঁধে। পিছনে খাবারদাবার, জিনিসপত্র নিয়ে চলেছে জনাদশেক লোক।

জঙ্গলে একটা জায়গায় তাঁবু খাটানো হল। রাজামশাই যখন গভীর বনে শিকারে যাবেন, তখন সঙ্গে থাকার কথা মাত্র দু-জনের। একজন, মহাদেবদাদু। দ্বিতীয়জন, বলরামদাদু। এবার তো মহাদেবদাদু নেই। রাজামশাই আর কাউকেই সঙ্গে নিলেন না। বলরামদাদু আর রাজামশাই পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লেন শিকারে। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে ঢুকে পড়লেন গভীর বনে।

রাজামশাই খোঁজ পেয়েছেন, গভীর বনে নাকি একটা মস্ত দিঘি আছে। এই দিঘির নীচে নাকি কোনো নদীর একটা চোরা স্রোত এসে মিশেছে। তাই দিঘির জল লোনা। আর বাঘ নাকি এই দিঘিতে লোনা জল খেতে আসে। রাজামশাইরা পৌঁছলেন সেই দিঘির পাড়ে। দিনের বেলাতেও গা ছমছমে অন্ধকার। কোথাও একটা-দুটো পাখি ডেকে উঠছে। ডানা ঝাপটে হঠাৎ উড়ে গেল একটা পাখি। রাজামশাই একটু যেন ভয় পেয়ে গেলেন মনে হল। বলরামদাদু ফিসফিস করে কিছু একটা বলতে গেলেন। রাজামশাই ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করতে বললেন।

একটু পরে কোথাও যেন ঝটপটানির শব্দ হল। বলরামদাদু সরে এলেন রাজামশাইয়ের একেবারে গায়ের কাছে। রাজামশাই ফিসফিস করে বললেন, ‘‘ভয় পাচ্ছিস কেন বলরাম? হাতে বন্দুক থাকলে বাঘকে আবার শিকারির ভয় কী?’’

বলরামদাদু আরও ফিসফিস করে বললেন, ‘‘ভয়? এই শর্মা ভয় কাকে বলে জীবনে জানে না মহারাজ। আসলে ভীষণ খিদেও পাচ্ছে হুজুর।’’

রাজামশাই ফিক করে হেসে ফেললেন, ‘‘খাবার তো সঙ্গে আছে। নে, আমরা তা হলে একটু খেয়ে নিই। তবে, তুই যখন খাবি, আমি তাক করে রাখব বন্দুক। আর আমি যখন খাব, তুই বন্দুক তাক করে রাখবি। নে, তোর তো বেশি খিদে পেয়েছে। তুই আগে খেয়ে নে।’’

আসলে বলরামদাদুর খিদে নয়, ভয়ই পেয়েছিল। লজ্জায় সে-কথা রাজামশাইকে বলতে পারেননি। তাই দু-এক গ্রাস মুখে তুলে বললেন, ‘‘রাজামশাই, এবার আপনি খেয়ে নিন।’’

রাজামশাই খাওয়ায় মন দিলেন। দু-কাঁধে বন্দুক তাক করে নিশানার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন বলরামদাদু। হঠাৎ দূরে কিছু একটা নড়ে উঠল যেন। হ্যাঁ, একটা বোটকা গন্ধও যেন ভেসে আসছে। তাহলে। কি বাঘ…?

সঙ্গে সঙ্গে রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ খাবার ফেলে কাঁধে তুলে নিলেন নতুন বন্দুকখানা। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘‘তুই নয় বলরাম, এই বাঘটা শিকার করব আমি।’’ বলে যেই গুলি চালাতে গেলেন, তার আগেই বলরামদাদুর বন্দুক থেকে ছুটে গেল গুলি। তারপর হালুম করে বিকট একটা শব্দ। জঙ্গল তোলপাড় করে ছুটে পালাল বাঘটা। হঠাৎ পাশে তাকিয়ে বলরামদাদু অবাক হয়ে দেখলেন, রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ গোঁ গোঁ শব্দ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। রাজামশাইয়ের চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিতে গিয়ে বলরামদাদুরও মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। তারপর দু-জনের আর কিচ্ছু মনে নেই।

অনেক পরে জ্ঞান ফিরে এসেছিল দু-জনের। সেবার জঙ্গল থেকে ফেরার পথে রাজা দীপেন্দ্রনারায়ণ বলরামদাদুর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘‘বলরাম, সকলকে বলবি, তুই নয়, বাঘটা মেরেছি আমি। আর তুই নিজের চোখে তা দেখেছিস।’’

বলরামদাদু আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বলতে পারলেন না। রাজামশাই বললেন, ‘‘কত বছর আজ শিকারে আসছি। বাঘ-ভাল্লুক বা হাতি তো দূরের কথা, একটা শেয়ালও মারতে পারিনি। বাঘ একটা-আধটা না মারলে আর রাজা কীসের বল? তাতে কি প্রেস্টিজ থাকে রে? বল তুই বলরাম, তুইই বল?’’ বলরামদাদু রাজামশাইয়ের অনুরোধ রেখেছিলেন। দেওয়ানগঞ্জে ফিরে আসার পর বলরামদাদুর সঙ্গে গোটা রাজ্যের লোক এসে রাজামশাইকে ধন্য ধন্য করেছিল।

আর রাজামশাই করেছিলেন কী, রাজদরবারে জরুরি এক সভা ডেকে বলেছিলেন, ‘‘আমি যে বন্দুকটা দিয়ে হরিণভাসা জঙ্গলে বাঘটাকে মেরেছি, সেই বন্দুকটা আমি বলরামকে দান করছি। এটা ওর কাছেই থাকুক।’’

আজ মিঠিন, টুবাই আর ঝিমলিরা যাচ্ছে বলরামদাদুর বাড়ি। যে বন্দুকটা দিয়ে বলরামদাদু বাঘটাকে গুলি করেছিলেন, রাজামশাই সেই বন্দুকটাই তো বলরামদাদুকে দান করেছিলেন। বলরামদাদু সেবার বলেছিলেন, ‘‘এ বছর তোরা এলে সেই বন্দুকটা তোদের দেখাব।’’

ওরা যখন বলরামদাদুর বাড়ি আসবে বলে ঠিক করেছিল, তখন ছোটোমামা আর ন-মাসিরা বলেছিল, বলরামদাদুর সবই নাকি বানানো গল্প। বাঘ শিকার তো দূরের কথা, উনি নাকি জীবনে বাঘের ল্যাজও দেখেননি!

একথা ওরা তিনজনে কেউই বিশ্বাস করে না। তাই ওরা আজ নিশিবটতলায় গিয়ে যখন দাঁড়াল, তখন ঝিমলি বলল, ‘‘দ্যাখো টুবাইদা, যে বলরামদাদু অমন গা ছমছমে শিকারের গল্প বলেন, তিনি কি আর কখনো শিকারেই যাননি, তা কি হয়? আমার মনে হয়, সেবারের সেই যে বাঘ শিকারের গল্পটা, ওটা সবটা সত্যি।’’

টুবাই বিজ্ঞের মতো ঘাড় নেড়ে বলল, ‘‘দাঁড়া, আগে সেই বাঘমারা বন্দুকটা নিজের চোখে দেখি, তারপর!’’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *