1 of 3

নেকড়ে বাঘ আর সাতটি ছাগলছানা

নেকড়ে বাঘ আর সাতটি ছাগলছানা

এক ছিল বুড়ি ছাগলী, তার ছিল সাতটি ছানা। মানুষের মা যেমন তার ছেলেপেলেদের ভালবাসে ছাগলীও ঠিক তেমনি করে তার বাচ্চাদের ভালবাসত। একদিন সে যখন বনে যাচ্ছিল তাদের জন্যে কিছু খাবার খুঁজে আনতে, সে ছানাদের ডেকে বললে—দেখ বাছারা, আমি এখন বনে যাচ্ছি। খুব সাবধানে থেকো, এখানে নেকড়ে আছে। একবার যদি নেকড়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকে তো তোমাদের সবাইকে খেয়ে ফেলবে—চামড়া থেকে চুল পর্যন্ত সব। বদমাইসটা অনেক সময় ছদ্মবেশে ঘোরাফেরা করে, কিন্তু তার হেঁড়ে গলা আর কালো পা দেখলেই তোমরা ধরে ফেলতে পারবে।

বাচ্চারা বললে—আমরা খুব সাবধানে থাকব মা। আমাদের নিয়ে কোন ভাবনা কোরো না।

ব্যা ব্যা করে ডাকতে ডাকতে বুড়ি ছাগলী নিজের কাজে গেল। একটু পরেই কে একজন দরজায় ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বললে—দরজা খোলো সোনার বাছারা। তোমাদের মা ফিরে এসেছে—দেখ তোমাদের জন্যে কী এনেছে!

কিন্তু গলা শুনেই ছানারা বুঝতে পেরেছে, নেকড়ে। তারা চেঁচিয়ে বললে—আমরা দরজা খুলব না। তুমি আমাদের মা নও। আমাদের মায়ের কেমন মিষ্টি গলা! তোমার গলা হেঁড়ে, তুমি নিশ্চয় নেকড়ে বাঘ।

কাজেই নেকড়ে এক দোকানে গিয়ে খানিকটা খড়িমাটি কিনে খেল। তাতে তার গলা হয়ে গেল বেশ মিহি।

ফিরে গিয়ে আবার সে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললে—দরজা খোলো সোনারা। তোমাদের মা এসেছে। দেখ তোমাদের জন্যে কী এনেছে।

কিন্তু জানলার গায়ে নেকড়ে তার একখানা থাবা রেখেছিল। ছাগলছানারা তাই দেখে চেঁচিয়ে বললে—আমরা দরজা খুলব না। আমাদের মায়ের তোমার মতো কালো-কালো পা তো নেই। তুমি নেকড়ে বাঘ।

তখন নেকড়ে এক রুটিওয়ালার কাছে গিয়ে বললে—আমার পা-টা বড় ছড়ে গেছে। ওতে একটু তোমার রুটির মাখনা মাখিয়ে দাও তো? রুটিওয়ালা যখন তার পায়ে রুটির মাখনা মাখিয়ে দিল, সে ময়দাওয়ালার কাছে ছুটে গিয়ে বললে—আমার পায়ে একটু ময়দা ছড়িয়ে দাও তো!

ময়দাওয়ালা ভাবল, নেকড়ে নিশ্চয়ই কাউকে খেতে চায়। তাই সে বললে—দেব না।

নেকড়ে বললে—বটে? ময়দা ছড়িয়ে যদি না দাও তাহলে তোমাকেই খেয়ে ফেলব! ময়দাওয়ালা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি পায়ে ময়দা ছড়িয়ে দিলে।

হতভাগাটা তখন আবার ছাগল-বাড়িতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললে—দরজা খোলো বাছারা, তোমাদের মা বন থেকে তোমাদের জন্যে কী নিয়ে এসেছে দেখ।

ছাগলছানারা বলে উঠল—আগে তোমার পা দেখাও, তাহলে বুঝব তুমি সত্যিই আমাদের মা।

নেকড়ে জানলার ধারে তার পা উঠিয়ে ধরল। বাচ্চারা যখন দেখল পাগুলো সাদা, তারা তার কথায় বিশ্বাস করে দরজা খুলে দিলে।

হায়, হায়, ঘরে এসে ঢুকল নেকড়ে বাঘ। ছাগলছানারা ভয়ের চোটে যে যেদিকে পারে লুকোবার চেষ্টা করল। একজন ঢুকল টেবিলের তলায়, আরেকজন বিছানায় উঠল, আরেকজন ফাঁকা উনুনের মধ্যে, আরেকটা বাচ্চা রান্নাঘরে গিয়ে লুকোলো, তার পরেরটা কাপড়-কাচা টবে আর সবচেয়ে ছোটটা ঘড়ির আলমারিতে। কিন্তু নেকড়ে একটিকে ছাড়া আর সবাইকে খুঁজে বার করল আর গপাগপ গিলে ফেলল চোখের পলকে। ছোটটা ঘড়ির আলমারির মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে ছিল, তাকে আর খুঁজে পেল না। খিদে মিটলে নেকড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঠের মধ্যে গিয়ে শুয়ে পড়ল। শুয়েই ঘুম।

একটু পরেই বুড়ি ছাগলী বন থেকে ফিরে এল। ফিরে এসে সবকিছু দেখে তার চক্ষুস্থির! বাড়ির দরজা হাট করে খোলা। টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চি সব উল্টে পড়েছে। কাঁচের গামলাটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে রয়েছে। বিছানা থেকে বালিস বালাপোস টেনে ফেলে দিয়েছে কে। সারা বাড়িতে আঁতি-পাঁতি করে সে ছানা খুঁজলে, কিন্তু কাউকে পেলে না। প্রত্যেকের নাম ধরে ডাকল, কেউ সাড়া দিলে না।

শেষে যখন ছোট ছানার নাম ধরে ডাকল, একটি খুব সরু গলা বলে উঠল—আমি মা, এখানে ঘড়ির আলমারির মধ্যে লুকিয়ে!

ছাগলী মা তাকে সেখান থেকে বার করতে সে বললে, নেকড়ে এসে তার বাকি ভাইবোনদের সব খেয়ে গেছে। ছাগলী মা ছানাদের শোকে যা কান্না কাঁদল সে আর কী বলব!

অবশেষে মনের দুঃখে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়ল, তার সঙ্গে ছোট ছানাটি। তারা যখন মাঠে এসে পৌঁছল, দেখলে গাছতলায় শুয়ে নেকড়ে ঘুমোচ্ছে আর তার নাক-ডাকার তোড়ে গাছের শাখা কাঁপছে। তারা ঘুরে ফিরে চারপাশ থেকে নেকড়েকে দেখল আর স্পষ্ট দেখতে পেলে তার পেটের মধ্যে কি-সব নড়ছে।

ছাগলী বুড়ি ভাবলে—হায় ভগবান! আমার ছানাগুলি কি ওর পেটের মধ্যে এখনও বেঁচে আছে?

ছাগল তার ছানাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দিল কাঁচি, ছুঁচ আর সুতো নিয়ে আসতে। তারপর সে সেই রাক্ষসটার পেটে একটা ফুটো করতে লাগল। সবে কাঁচি চালিয়েছে, অমনি একটি ছাগলছানা মাথা বার করে দিয়েছে। ফুটোটা একটু বড় হতেই ছটা বাচ্চাই তড়াক-তড়াক করে লাফিয়ে বার হয়ে এল। সবাই বেঁচে আছে, কারুর কোন অনিষ্ট হয়নি; কারণ রাক্ষসটার এমনই লোভ যে ছানাগুলিকে গোটা গিলে খেয়েছে। ছাগলী বুড়ির তখন যা আনন্দ হল!

শেষে ছাগলী বললে—যাও বাছারা, কতকগুলি বড়-বড় পাথর নিয়ে এস। বজ্জাতটা যতক্ষণ ঘুমোচ্ছে তার মধ্যে ওর পেটটাকে ভর্তি করে দেব।

ছানা সাতটা যত তাড়াতাড়ি পারে একগাদা পাথর এনে জমা করল। যত ধরে নেকড়ের পেটে ভরল, আর বুড়ি তাড়াতাড়ি সেলাই করে দিল তার পেট। নেকড়ে কিছু জানতেই পারল না।

নেকড়ে খুব এক ঘুম ঘুমিয়ে শেষে জেগে উঠল। পেটের মধ্যে পাথর থাকায় তার বেজায় তেষ্টা পেল। ভাবলে নদীতে যাই। কিন্তু যেই সে চলতে আরম্ভ করল অমনি পেটের মধ্যে পাথরগুলো নড়বড় করে উঠল। নেকড়ে বললে: —

কিবা এত হড়বড় নড়বড়!
পেট যেন করে ওঠে গড়গড়, —
কচি কচি ছাগলের হাড়গোড়
মনে হয় বড়-বড় পাথ্‌থর।

নদীর কাছে এসে নেকড়ে যখন জলে মুখ দিয়ে খেতে গেল, পাথরের ভারে সে পড়ে গেল মুখ থুবড়ে আর জলে ডুবে মরে গেল।

ছাগলছানারা তাই দেখে ছুটে এল খবর দিতে—নেকড়ে বাঘ মরে গেছে! নেকড়ে বাঘ মরে গেছে! এই বলে তারা হাত-ধরাধরি করে তাদের মায়ের সঙ্গে নাচতে লাগল নদীর ধারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *