নিশির ডাক – অনুষ্টুপ শেঠ

নিশির ডাক – অনুষ্টুপ শেঠ

সমাপ্তিসঙ্গীত

বৃষ্টি থেমে গেছে একটু আগে। বাতাসে এখনও সোঁদা গন্ধ। সামনে উচ্ছল পাহাড়ি বৃষ্টি রাখে সে করেছে এসে যাচ্ছে। নবীর সে প্রথম ছুঁয়ে ফেলা পাথরটায় একা দাড়ি পূরবী।

তার গোলাপি ত্বকে, উজ্জ্বল চোখের মণিতে লালচে আভা খেলা করছিল। সে আলোছায়ায় তার মুখে হাসি ফুটে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে। তৃপ্তির হাসি। চারপাশের নিবিড় জঙ্গল যেন সে রূপের সামনে মুগ্ধ, নিশ্চুপ…। খালি দূর থেকে ভেসে আসছিল পাখিদের ডাক। খোলা একঢাল চুল, মন্দিরগাত্রের নর্তকীর মতো নিখুঁত দেহের অধিকারী মেয়েটিকে

মনে হচ্ছিল যেন অপরূপা কোনও পরী, এই বুঝি ডানা মেলে উড়ে যাবে।

এবার পাথরের উপর হাঁটু মুড়ে বসল সে। তার মুখের উপর লালচে আভার নৃত্য আরো স্পষ্ট হল। আভাটা আসছে ওই আগুন থেকে—নদীর জলের উপরিভাগ জুড়ে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল একটু আগে।

স্তিমিত হয়ে আসতে আসতে এবার একেবারেই মিলিয়ে গেল সে আভা। তবে পূরবীর মুখে সেই মৃদু হাসির রেশ কিন্তু রয়েই গেল।

চোখ খুলে সায়নের মনে হল মরা হলুদ রঙের একটা ধোঁয়াটে স্রোতের মধ্যে সে ভেসে আছে। শুধু সে নয়, তার খাট, গায়ে জড়ানো লোমশ কম্বল, ওপাশের চেয়ারটা— সব সেই স্রোতে মৃদু তরঙ্গ তুলে ভেসে চলেছে… অজানার দিকে। কোথাও কোনও সীমা নেই…

তারপর ঘুম ভাঙা চোখ আস্তে আস্তে সয়ে এল। ঘরের চার দেওয়াল এবার চোখে পড়ছে। ফ্যাকাসে হলুদ রঙ দেওয়ালগুলোর। ঘরে একটা মাত্র হলুদ বাল্ব। তার ম্লান আলো এখন যেন আরও নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে গত চব্বিশ ঘণ্টার ক্লান্তিতে তার মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন। সব মিলিয়ে ঘুম পুরোপুরি ভাঙার আগের দৃশ্য ছিল— ভাসমান, অসীম।

চৌকো ঘরটা একদমই বদ্ধ। জানলা নেই। লোকটা বলেছিল ঠান্ডা এড়াতেই এমন ঘর বানায় ওরা। হোটেল তো নয়ই, হোম-স্টেও নয় সেই অর্থে। এ জায়গাটা তো ট্যুরিস্ট ম্যাপে আসেনি এখনও। তবে যে ব্লগ থেকে এ জায়গার খোঁজ পেয়েছিল সায়ন, তাতে বলা ছিল গ্রামবাসীরাই এখানে নিজেদের বাড়িতে ঠাঁই দেয়। সে ভরসাতেই চলে আসা। লোকজন বেশি নেই, এমনই ভালো৷ মন এরকম একটা অজ্ঞাতবাসই খুঁজছিল।

যখন পথের শেষ বাঁক ঘুরে হেঁটে আসছিল সায়ন, তখনই এই বুড়োর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। এতক্ষণের চলার পথে এই প্রথম কোনও মানুষ দেখতে পেয়েছিল

সে।

‘পানলিং আর কতদূর বলতে পারবেন? ‘

‘কার কাছে যাবেন ?

ঘষা গলা। শ্লেষ্মা থাকলে যেমন হয়। খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, কাঁচা-পাকা ভুরু।

‘যে থাকতে দেবে। চিনি না কাউকে। বেড়াতে এসেছি।”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে ওকে জরিপ করছিল।

হাঁটতে শুরু করার মিনিট পনেরো বাদেই নেটওয়ার্ক চলে গেছে ফোন থেকে। দামি জিনিসটা এখানে নেহাত খেলনা মাত্র। নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেট নেই, গুগল ম্যাপ কাজ করে না৷

মেজাজ খারাপ করে হুট করে চলে আসার প্ল্যান না করলে এমন জায়গায় আসত না সায়ন। আগের মতো সঙ্গী জুটিয়ে ফুর্তি করার জন্য কোনও রিসর্টে যেত। স্টাইল মেরে ছবি তুলে পোস্ট দিত, সারা সন্ধে ধরে মাল-টাল খেত। আর তারপর … কিন্তু, আপাতত রিসর্টের নামে আতঙ্ক হয়ে গেছে তার। সংবৃতার সঙ্গে যা হল… উফ! ভাববে না মনে করেও বার বার ভেবে ফেলছে কথাটা। নিজের উপরেই মাথা গরম হয়ে যায় তার।

তখনই লোকটা বলেছিল, ‘চলুন। আমার বাড়িতেই থাকবেন।’

তার পিছন পিছন ডানদিকের সবুজ ঢাল বেয়ে উঠে, জঙ্গলের ভিতরে প্রায় অদৃশ্য সরু পথ বেয়ে এসে কাঠের যে বাড়িটায় ঢুকেছিল সায়ন, নীচের রাস্তা থেকে সেটা বিন্দুমাত্র চোখে পড়ে না। আশপাশে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আরো কিছু বাড়ি, মুরগির খাঁচা, কাঠ জড়ো করার ছাউনি

কমতে…’ লোকটা বলেছিল, ‘এই হল পানলিং। আমরা আঠেরো ঘর আছি এখন কমতে

ব্লগটা থেকে যেটুকু জেনেছিল সায়ন পানলিং সম্পর্কে, তাতে গ্রামটা সে কখনওই খুঁজে পেত না। ভাগ্যিস দেখা হয়েছিল লোকটার সঙ্গে! এমনিও কেমন যেন খাপছাড়া ছিল ব্লগটা, কিছুদূর গিয়ে দুম করে শেষ—বোঝাই যাচ্ছিল যে লিখেছিল সে মাঝপথেই ছেড়ে দিয়েছে।

দূর হোক গে! তার এখন কিছুদিন নিরিবিলি থাকা নিয়ে কথা !

প্রথম দেখায় কিন্তু ঘরটা এত দমচাপা লাগেনি। জানলা না থাকলেও, উপরদিকে দুদিকের দেওয়ালে স্কাইলাইট আছে। দিনের বেলা সেগুলো দিয়ে আলো আসছিল, রোদও এসেছিল এক ঝলক। তখন কাঠের মেঝে, একপাশে চেয়ার-টেবিল, অন্যপাশে বাহারি ফুলকাটা কম্বলে ঢাকা বিছানা —সব মিলিয়ে বেশ উষ্ণ আরামদায়ক মনে হচ্ছিল। দিল্লির ট্রেন লেট করায় একটুও জিরিয়ে নেওয়ার গ্যাপ না পাওয়া, সারারাত

বাস জার্নি, আর তারপর রুকস্যাক ঘাড়ে নিয়ে আড়াই ঘণ্টার ট্রেকিং সেরে এখানে পৌঁছানো… সায়নের শরীর দিচ্ছিল না আর। বুড়ো এক বালতি গরম জল দিয়ে যাওয়ার পর কোনওমতে স্নান করে, মোটা মোটা চাপাটি আর আলুর তরকারি দিয়ে লাঞ্চ সেরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে গেছিল তার।

এখন ঘুম ভেঙে উঠে কিন্তু ঘরটাকে জেলখানার মতো লাগছে। এত চাপা, চারদিক থেকে দেওয়ালগুলো যেন তার গায়ের ওপর উঠে আসতে চাইছে। আর এই… খাটের পাশে দেওয়াল থেকে খানিকটা ছেড়ে এই থামটা ছিল নাকি এখানে ? ঘরের মধ্যিখানে?

নিজেকেই ধমকাল সায়ন। না থাকলে কি এটা গজিয়েছে নাকি তার ঘুমের মধ্যে? তখন যা হাল ছিল, খেয়াল করেনি নিশ্চয়ই।

গা ম্যাজম্যাজ করছে। বাথরুমে গেল সায়ন মুখে চোখে জল দিতে। এবার একটু চা চাই, ইলেকট্রিক কেটলি আর টি ব্যাগ, কফি পাউচ এসব তো সঙ্গেই আছে৷ ঠান্ডা জল মুখের চামড়ায় যেন কেটে গেল। তোয়ালেটায় মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়েই মনে হল, সে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না।

কী হল? ওঃ! কারেন্ট নেই।

লোকটাকে বলতে হবে তাহলে গিয়ে। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে টর্চ খুঁজে সেটাকে জ্বালিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সায়ন।

চাবিটা সবে হাতে নিয়েছে, দরজাটা ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ করে খুলে গেল। একটুই। তারপর সেভাবেই স্থির হয়ে রইল।

সায়ন টের পাচ্ছে তার গায়ের রোমকূপ খাড়া হয়ে গেছে। দরজাটা সে বন্ধ করেই শুয়েছিল, স্পষ্ট মনে আছে৷ ছিটকিনি দিয়েছিল কিনা মনে নেই যদিও। দেয়নি নিশ্চয়ই, দিলে বাইরে থেকে কেউ দরজা খোলে কী করে ?

একবার মনে হল, কেউ না। হাওয়া-টাওয়া হয়তো৷ কিন্তু ঠেসে বন্ধ করা ভারী কাঠের দরজা হাওয়ায় খুলবেই বা কী করে! ঝড় উঠেছে নাকি? কই, শব্দ নেই তো! গিয়ে দেখলেই অবশ্য বোঝা যায়, কিন্তু ভিতর থেকে কেমন একটা অস্বস্তি যেন ওকে সেটা করতে বারণ করছে। তবু অনিশ্চিতভাবে দু-তিন পা এগিয়ে গেল সে৷ একী, টর্চটা জ্বলছে না কেন? নতুন ব্যাটারি ভরা টর্চ… তবে সুইচটা একটু নড়বড়ে আছে, দু-তিনবার চেষ্টা করতে হয় কখনও কখনও। এই ভেবে সায়ন আরও দু-পা এগোল… আর তখনই গন্ধটা তার নাকে এসে লাগল।

ঘাস মাটি ব্যাঙের ছাতা বুনো ফুল গরু ছাগল সব মেশানো একটা আদিম, মেঠো গন্ধ।

সায়নের মনে হল, অন্ধকার ঘরের বাইরে, দরজার ওপাশের অন্ধকার প্যাসেজে, গাঢ় কালো রঙ দিয়ে গড়া কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ সায়নের কানে আসছে, মনে হচ্ছে তার ক্ষুধিত চোখ যেন তার দিকেই চেয়ে আছে!

আসার পথে এক দোকানে জিজ্ঞাসা করেছিল এখানকার ব্যাপারে, সেই দোকানদারের বলা কথাগুলোই ভেসে এল তার কানে, ‘পানলিং? কেন? এত ভালো ভালো জায়গা

আছে… ও তো মরা গ্রাম, কেউ যায় না… কিচ্ছু নেই।’

তাতে সায়ন পাত্তা না দেওয়ায় লোকটা আবার বলেছিল, ‘কেন যাচ্ছেন? জায়গাটা ভালো না। মত যাও উধার।’

সায়ন তবুও এসেছিল এ রাস্তায়। লোকটার চোখে-মুখে কেমন ভয় ফুটে উঠেছিল। তার দিকে চেয়ে কীসব বিড়বিড় করছিল।

তবে কি লোকটার কথা না শুনে ভুল করল সায়ন!

সেই ডেলা-বাঁধা অন্ধকার যেন দুলে দুলে উঠল এবার। যেন সে খুশি হয়েছে। সায়নের তেত্রিশ বছরের টাটকা জোয়ান শরীরের রক্ত-মাংস-মজ্জা তাকে লালায়িত করে তুলেছে৷

শিউরে উঠে টর্চটায় এক মরিয়া থাপ্পড় মারল সায়ন। অমনি সেটা থেকে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ল নাতি প্রশস্ত বারান্দার কালচে মেঝেতে, কাঠের চৌকো চৌকো খোপকাটা রেলিংগুলোয়। আর সেই সঙ্গে সামনে দাঁড়ানো ঝোল্লা জামাকাপড় পরা বুড়ো পাহাড়ি লোকটার উপর।

চোখ কুঁচকে, ময়লা দাঁত বার করে সে বলল, ‘চা এনেছিলাম বাবু। রাতে কী খাবেন এখনই বলে দিতে হবে কিন্তু !

পরদিন সকালের সূর্যোদয় দেখে সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছিল সায়নের। ‘যেন অরুণস্পর্শে সকলই সোনা হইয়া উঠিল’…

কোন বইতে পড়েছিল যেন লাইনটা…। মনে করতে ইচ্ছেও করছে না।

চা জলখাবার খেয়েই সে বেরিয়ে পড়েছে। হেঁটেই চলেছে পথ ধরে। মাঝে মাঝে জঙ্গলের আশেপাশে ঘুরে আসছে কিছুদূর… বুড়ো বলে দিয়েছে বেশি দূরে না যেতে, ফেরার পথ গুলিয়ে যায় নইলে

তবে এই জঙ্গলটার নিজস্ব একটা মাদকতা আছে। সায়নের সব চেতনা জুড়ে এখন শুধু সবুজ, আর আলো-ছায়ার আঁকিবুকি। এইভাবে হেঁটে চলাটা যেন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

সায়নের মন থেকে এক এক করে মুছে যাচ্ছিল তার কলকাতার ঘুপচি ফ্ল্যাট, কাজের জায়গার কূটকচালি। সে ভুলে যাচ্ছিল শরীরের ক্লান্তি, মনের অবসাদ, বিবাহিত জীবনের অসুখী তিক্ত স্বাদ, এমনকী ভুলে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তটাও, সংবৃতার সেই বেদম তাচ্ছিল্যের হেসে ওঠার জ্বালা।

শুধু সারি সারি পাইনের গুঁড়ি, ঝরাপাতা, গোল গোল পাথরের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া মোটা মোটা শিকড়… আর দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক—এগুলো বাদে সবকিছু তার মন থেকে মুছে যাচ্ছিল। যেন ইরেজার দিয়ে কেউ খাতা থেকে সব পেন্সিলের দাগ তুলে দিচ্ছে।

বুড়োর সাবধানবাণীও তার মাথা থেকে মুছে গেল এক সময়ে। এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতেই সায়ন রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। তারপর ক্রমে চলে যেতে থাকল আরও গভীরে।

পূরবী আজও বনে ঘুরছিল। পাইন গাছের ভিড়ে তার আকাশনীল পোশাকের ওড়না ভেসে বেড়াচ্ছিল—যেন একটুকরো মেঘ ফাঁকি দিয়ে নেমে এসেছে। অনিশ্চিতের অপেক্ষা এক দীর্ঘ শ্রান্তিকর বোঝা। কিন্তু আজ সকাল থেকে বাতাসে সেই মায়াময় সুবাস পাচ্ছে পূরবী। তার বুকের মধ্যে বেজে উঠছে কথাগুলো ‘আর বেশিদিন নেই, আর বেশিক্ষণ নেই’…

এই পর্যায়ে এসে অপেক্ষা, এক অনির্বচনীয় সুখ।

আজকের হাওয়া বড় অস্থির। এই হুশ করে একবার এদিকে বইছে, তো একবার উলটোদিকে। হাওয়াটা পূরবীর ওড়না ওড়াচ্ছে, এলোমেলো করে দিচ্ছে, মুখে জড়িয়ে চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। মজা পেয়ে পূরবী গলা তুলে হাসতে থাকে।

দূরে একটা পাখি ডাকতে ডাকতে আচমকাই চুপ করে গেল। পূরবী চোখ না তুলেও টের পায়, দুরন্ত হাওয়া আস্তে আস্তে থেমে গেছে, গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ আর নেই। নদীর উচ্ছলতা যেন আচমকা কোন জাদুতে মিলিয়ে আসতে শুরু করেছে… সময় উপস্থিত। পূরবীর সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো শিহরন খেলে গেল। আসছে… সে আসছে…

সায়ন হাঁপাচ্ছিল। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে সে। জঙ্গল ক্রমে ঘন হতে হতে নিবিড় হয়েছে এখানে। থিকথিক করা বুনো ঝোপ আর লতার মধ্যে যেটুকু মাটি সে চোখে দেখতে পাচ্ছিল তার প্রায় পুরোটাই ঢেকে রেখেছে আঁকাবাঁকা, স্থূল শিকড়েরা। না দেখে চললেই মুশকিল। বেশ কয়েকবার হোঁচটও খেয়েছে সে এর মধ্যেই।

এতক্ষণে তার খেয়াল হল, কাজটা সে মোটেই ঠিক করেনি। এভাবে কিছু চিহ্ন

না রেখে এত দূর চলে আসার পর যদি আর ফেরার পথ খুঁজে না পায় ? আসলে সকালের ফোন কলটা তাকে খেপিয়ে দিয়েছিল। নেটওয়ার্ক নেই দেখে গতকাল খুশি হয়েছিল, রুমকি চাইলেও ওকে বিরক্ত করতে পারবে না এখন পাঁচদিন। কিন্তু রাস্তায় কিছুদূর আসতেই ফোনটা বেজে উঠল। কী করে টাওয়ার পেল কে জানে ! রুমকি… তার স্ত্রী…

বিয়ের পর বছরও ঘোরেনি দুজনের মানসিকতার আসমান-জমিন তফাত টের পেতে। আত্মকেন্দ্রিক, সততা বা ভদ্রতার পরোয়া না করে নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু আদায় করে নিতে অভ্যস্ত সায়ন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ভিতু, শান্ত আর নরম স্বভাবের রুমকির সমস্ত কিছু নিয়মমাফিক মেনে চলার অভ্যাসে।

কিন্তু বিয়েটা টিকিয়ে রাখাটাও দরকার। বড়লোক বাড়ির একমাত্র মেয়েকে নিজে থেকে প্রচুর আগ্রহ দেখিয়ে বিয়েটা করেছিল সে। যে বিয়ের সূত্রে তার একাধিক আর্থিক

লাভও ঘটেছিল, দুম করে সেটা ভেঙে দিলে ক্ষতি যে তারই হবে, সে কি আর ও জানে না!

সেই হতাশাই সে রুমকির উপর ঝাড়তে শুরু করেছিল। প্রতি কাজে খুঁত ধরে, প্রতি পদে ঠাট্টা করে, অন্যের সামনে অপদস্থ করে।

রুমকি যদি এসব নিয়ে রুখে দাঁড়াত, ফিরে ঝগড়া করত, দুটো চড় থাপ্পড় মারার বাহানা তৈরি করে দিত সায়নকে—তাহলে তার ওপর এতটা বিতৃষ্ণা হয়তো আসত না সায়নের৷ কিন্তু রুমকির বেহদ্দ বিনীত আচরণের সামনে সায়নের মেজাজ দেখানোটাও কেমন পানসে হয়ে যায়। এ দাম্পত্যে কোথাও কোনও সুখ পায় না সায়ন—না প্রভুত্ব করার সুখ, না অপমান করার সুখ, আর না কষ্ট দেওয়ার সুখ… যে সবই মুখ বুজে সহ্য করে তাকে অত্যাচার করে সুখ নেই !

” তাই প্রতি পদে এখন তার অসহ্য লাগে। সংসারের এতটুকু কাজ করতে হলে মনে হয় এ বোঝা কি কোনওদিনই নামবে না তার ঘাড় থেকে!

ইদানীং প্রতিবার কথা বলার সময়েই তার দাঁত-নখ বেরিয়ে আসছে। আজ রুমকি ফোন করে যখন বলল, তার সেই ভীরু মিনমিনে গলায়… রান্নাঘরের কলটা সারাতে হবে, সমানে জল পড়েই যাচ্ছে… সায়ন গলার শির ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘বেড়াতে এসেও শান্তি দেবে না? সারাতে হবে, সারাও! নিজে না পারলে তোমার বাবাকে বলো এসে সারিয়ে দিয়ে যেতে। একটা অপদার্থ অকম্মা মেয়ে ঘাড়ে গছিয়েছে… ফালতু সাতসকালে ঘুমটা নষ্ট করলে এর জন্য! ‘

চিৎকারটা নিজের কানেই যেন বাজছে সেই থেকে।

তার এই উৎকট রোষ কি আসলে বিব্রত বোধ করার কারণে? রুমকির ভদ্রতার কাছে প্রতিবার তার মাথা হেঁট হয়ে যায় !

এ চিন্তা মনে আসামাত্র সরিয়ে দেয় সায়ন, যেরকম দ্রুত লোকে খাবার থেকে মাছি তাড়ায়।

না না… কিসের বিব্রত! কেন বিব্রত হবে সে? অন্যায়টা কী বলেছে! ও মেয়েটা আসলে, ন্যাকা সেজে থাকে। এগুলো ঔদ্ধত্য ওর। ভদ্রতা দেখানোর ঔদ্ধত্য।

মন সরাতেই হনহন করে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল সায়ন। ধাপে ধাপে উঠে গেল অনেকখানি… তারপর একটা বাঁক ঘুরতেই সামনে নদীটা এসে পড়ল।

আশ্চর্য তো!

এমন গতিতে জল বইছে, পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে—কোনও শব্দ হচ্ছে না

কেন ?

এই কথাটা মনে হতে খেয়াল হল, পাখিদের ডাকাডাকিও কখন যেন থেমে গেছে। চারদিকে এখন লি-লি করছে নৈঃশব্দ্য।

ঝড়-টড় হবার আগে পশুপাখিরা টের পায় না? বা হিংস্র জন্তু এলে? সেরকমই কিছু কি?

ভাবনাটা স্বস্তিদায়ক নয়। ফিরে যাবে ?

তখনই কাঠের সাঁকোটার দিকে তার চোখ পড়ল। সাঁকোর অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকেও।

সায়নের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

এমন তো গল্পে হয়। সিনেমায় হয়।

যে অপাপবিদ্ধ সৌন্দর্য তার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তেমন কিছু সে আগে কখনও দেখেনি। না, তার অজস্র অভিজ্ঞতা, অসংখ্য গোপন কল্পনা ম্লান হয়ে

যাচ্ছে এই মেয়ের সামনে।

স্থানীয় মেয়ে। পুরো পাহাড়ি মুখচোখ। কী ফিগার !

সায়নের চোখ সরছিল না।

মেয়েটা অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। সাঁকোর এপাশে এই শহুরে চেহারার আগমন তার চোখে পড়েনি। আচমকা চমকে যেন কারও ডাকে সাড়া দিয়ে উঠল সে। তারপর এক ছুটে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের অন্য দিকে ৷

‘কোথায় যাবেন, বাবুসাব?’

অচেনা পুরুষ গলায় প্রশ্নটা ভেসে এল। সায়ন চমকে ফিরে তাকাল। লম্বা, আধবুড়ো একটা লোক। এড়ানোর ভঙ্গিতে সায়ন উত্তর দিল, ‘কোথাও না। এমনি ঘুরছি।’

সঙ্গে।’ ‘এখানে এভাবে ঘুরতে নেই বাবু। জঙ্গলে হারিয়ে গেলে বিপদ। আসুন আমার

বিরক্ত লাগলেও কথাটা কিন্তু ফেলার নয়। সত্যিই এতক্ষণ এলোমেলো ঘুরে তার দিকের আন্দাজ ঘেঁটে গেছে। তবে কি ফিরেই যাবে এর সঙ্গে? না। আবার চোখ চলে গেল সাঁকোর ওপারে। না, মেয়েটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে

লোকটা আবার বলল, ‘চলুন। আকাশ ভালো ঠেকছে না। জঙ্গলে দু-চারটে জন্তু যে নেই, তা নয়। ‘

মনে মনে প্ল্যান ঠিক করে নিল সায়ন। ফিরেই যাওয়া যাক এখন, এসব বলছে যখন। যেতে যেতে রাস্তাটা খুব ভালো করে চিনে নেবে। তারপর কাল আবার আসবে। আসতেই হবে। অমন একটা মেয়ে…

‘বেশি ভিতরে না যাওয়াই ভালো বাবু। আর ও সাঁকো বহু পুরোনো৷ কমজোরি। পড়লে নদী সঙ্গে সঙ্গে ভাসিয়ে নেয় কিন্তু, দেখে বোঝা যায় না ওর তেজ।’ তারপর হঠাৎ বুড়ো গলাটা নামিয়ে ফিসমিস করে বলল, ‘তাছাড়া… ওদিকের জঙ্গল ভালো না৷ জোয়ান বয়স আপনার…’

মানেটা কী! জোয়ানরাই তো বেশি ফিট থাকে, বিপদ-আপদে পালিয়ে বাঁচতে পারে। যত বাজে ভাট।

কথা না বাড়িয়ে এগোয় সায়ন। প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা গাছ-পাথর মনে ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাতে আবার আসা যায় কাল।

‘ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে যান বাবুসাব। এ দুনিয়ার সব জায়গায় যেতে নেই। শখ আর মওৎ খুব ইয়ারদোস্ত, জানেন? ‘

নিস্তরঙ্গ গলায় কথাগুলো বলতে বলতে ঘুরে তাকায় লোকটা। সায়নের ঘাড়ের কাছের লোমগুলো অকারণেই খাড়া হয়ে যায়। মৃত্যু শব্দের উচ্চারণেও কি বাতাসে এমন আতঙ্ক জন্ম নেয় ?

নাকি সেটা লোকটার চোখের মণি এত ধূসর দেখাচ্ছে বলে? এত ধূসর যেন সাদাই, যেন অন্ধের চোখের ঢেলা। অথচ অন্ধ নয় তো, হলে সে চোখের দৃষ্টি সায়নকে এভাবে ফালা ফালা করে দিত না ৷

‘বহোত খুবসুরৎ হ্যায় উয়ো!”

নাকি? সায়ন আবার আঁতকে ওঠে। কে? কার কথা বলছে? এও মেয়েটাকে দেখেছে

জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে সায়ন ধমকায়, ‘কে? কী সব বলছেন ?

লোকটা অদ্ভুত ভাবে হেসে বলে, ‘মওৎ। বহুত সুন্দর। নয়, বলুন?’ রাস্তায় এসে গেছে ওরা ততক্ষণে। সায়ন আর দাঁড়ায় না, প্রায় ধাক্কা দিয়ে লোকটার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। তারপর চেনা ঢাল বেয়ে উঠে যেতে থাকে। লোকটা তীব্র চোখে ওকে দেখতে থাকে যতক্ষণ দেখা যায়। তারপর মাথা নেড়ে নেমে যায় উলটো দিকে।

উপরে পৌঁছে পিছু ফিরে দেখে সায়ন। এঁকেবেকে সর্পিল পথ পড়ে আছে তার অজস্র চুলের কাঁটার বাঁক নিয়ে। কোথাও কেউ নেই।

মেয়েটা যেন জানত সে আসবে। ঠিক ওইখানেই স্থির দাঁড়িয়ে ছিল সে৷ সায়নের বুকের মধ্যে দামামা বেজে উঠল উল্লাসে।

চোখাচোখি হল আজ।

সায়ন আর দেরি করল না, দৃঢ় পায়ে সাঁকো পেরোল। কাঠের মচমচ আওয়াজ হল, দুলে উঠল প্রাচীন সেতু, কিন্তু তার বেশি কিছু হল না৷ কী বাজে ভয় দেখাচ্ছিল কাল লোকটা!

আবার সেই মাতাল বাতাস বয়ে গেল আচমকা। ঘাস মাটি বুনোছাগল জংলি ফুলের আদিম গন্ধ মেশানো, মাদক এক বাতাস।

মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়াল সায়ন। তার মাথার মধ্যে যে অজস্র চিন্তা চলছিল তার একটাও ভদ্রসমাজে বলার উপযুক্ত নয়। অবশ্য… তাই তো হওয়ার কথা !

এইমাত্র সে সেই সাঁকো পার হয়েছে, যে সাঁকো একবার পেরোলে সন্তও অমানুষ হয়ে ওঠে!

পূরবীর চোখের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। আলতোভাবে খোলা চুল সামনে টেনে এনে সে ওড়নার উপরে আরেক প্রস্থ আবরণ দিল, কারণ সায়নের চোখ তার মুখ থেকে আস্তে আস্তে নামতে শুরু করেছে। বলা বাহুল্য সে দৃষ্টিতে শুধুই মুগ্ধতা নেই।

সায়ন টের পাচ্ছিল তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে, কানের কাছে গরম লাগছে। তবু, তাকে তো নিরীহ ট্যুরিস্টের ভান করতেই হবে; এতদিনের অভ্যাস কি বৃথা যাবে ! ‘বড় রাস্তা কোন দিক দিয়ে যাব বলতে পারো?”

ভাব। প্রশ্নটা ছুড়ে দিতে দেরি করেনি সে। সেই সঙ্গে মুখে ফুটিয়ে তুলেছে অসহায়

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল তার কথা শুনে। বলল, ‘বাবুজি হারিয়ে গেছেন বুঝি ? ”

সায়ন হিসহিসে গলায় বলল, ‘একদম হারিয়ে গেছি। তুমি রাস্তা খুঁজে দাও।’ ‘বেশ তো, আসুন আমার সঙ্গে।’

এককথায় যেতে নেই। সায়ন বিজ্ঞ ভাবে বলল, ‘রাস্তা চেনো তো? কোথায় বাড়ি তোমার?’

‘এই তো, এখানেই !

যা ভেবেছিল! একদম স্থানীয় মেয়েই।

সায়ন ঠিক তিন পা গিয়ে হোঁচটটা খায়। হুমড়ি খেয়ে পড়ে প্রায় মেয়েটার গায়ে। মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ধরে নেয়। তার উষ্ণ হাতের স্পর্শে কেঁপে ওঠে সায়নের গোটা শরীর। হাতের মুঠোয় খপ করে চেপে নেওয়া নরম হাতটা আর ছাড়ে না সে। কারণ সে লক্ষ করেছে, হাত ধরার পরেও মেয়েটার চোখে কোনও সতর্কতা ফুটে ওঠেনি, মুখ থেকে সহজ হাসিটাও মিলিয়ে যায়নি।

সাব্বাশ! এই তো চাই !

ওহ্! ভাবা যায় না !

এটা ওটা কথা বলতে বলতে তার সঙ্গে এগোয় সায়ন। আরো গভীরে। সেই জঙ্গলের আরো অনেক গভীরে যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে ঠিক একচুল দাগ। তাও শুধু যারা জানে, তারাই দেখতে পায়।

এক আশ্চর্য বৃষ্টি নেমেছিল তারপর। নরম আদরের মতো। এত মায়াময় আলোয় ভরে গেছিল চরাচর, যে সায়ন টেরও পায়নি কখন যেন আঁধার নেমে এসেছিল তাদের

পূরবী গ্রামের মেয়ে হয়েও কী আশ্চর্য ফরোয়ার্ড।

ঘিরে।

সায়ন হাতে হাত ঘষা দিয়ে শুরু করেছিল। প্রতিটা ইঙ্গিত এত অবিশ্বাস্য ভাবে গ্রহণ করছিল মেয়েটা, এত সহজে সাড়া দিচ্ছিল যে নিজের সৌভাগ্যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না তার। তার কর্মজীবনের সাফল্য আর ব্যক্তিজীবনের একাকিত্বের দুঃখ—সব গল্প নিখুঁত বলে যাচ্ছিল সে। আর পূরবীর ডাগর চোখে পরতে পরতে জমে উঠতে দেখছিল মায়া, সমবেদনা, মুগ্ধতা৷ উপযুক্ত মুহূর্ত আসামাত্র প্রস্তাবটা ভাসিয়ে দিয়েছিল সে…

তবে পূরবী অমন এককথায় রাজি হবে সায়ন ভাবেনি। কিন্তু আর কিছু ভাবার মতো অবস্থা তার ছিলও না। হাতের নাগালে এই আগুন শরীর…

আর মাথার মধ্যে ভুলেও ভুলতে না পারা সেই তাচ্ছিল্যের হাসি… দুটো তাকে দুদিক থেকে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিচ্ছিল। পূরবীর ঠোঁট তীব্র আবেগে পিষে দিতে দিতেও নিজেকে সামলাতে চাইছিল সে… আবার তেমন যেন না হয়, যেন সে যথেষ্ট সময়টুকু পেরোতে পারে… ,

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছিল তার। ব্যথা লাগবে জেনেও আঙুলগুলোর আরো কঠিন হয়ে ওঠা আটকাতে পারছিল না। পূরবীর সুন্দর মুখটা তার চোখের সামনে ভেঙেচুরে কেমন যেন একবার রুমকির মতো গোলগাল হচ্ছিল, একবার সংবৃতার মতো রুক্ষ চিবুকের, আরও কত মুখ… সব পালটে পালটে যাচ্ছিল। ঘাম হচ্ছিল সায়নের, নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছিল…

ঠিক তখনই দুটো নরম হাত ওকে জড়িয়ে নিল। চোখে ফোকাস ফিরে এল, সায়ন দেখল অপূর্ব মায়াবী এক হাসি মুখে নিয়ে পূরবী তার দিকেই চেয়ে আছে। সায়নের মনে হতে লাগল সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চুড়োয় পৌঁছে যাবে এবার এক দৌড়ে।

অবশেষে শরীর আলগা করে ঘাসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে খেয়াল হল, আহা, একটা ভিডিও করে রাখলে হতো! সংবৃতাকে দেখানো যেত! শালা… বলে কিনা পারি না !

রুমকি? হ্যাঁ! ওকে এটা দেখালে ওই ভদ্রতার মুখোশ একঝটকায় খসে যেত! দূর দূর, এখন এসব ভাববার সময় নয়, তীব্র মাদকতায় ডুবে যেতে যেতে সায়ন যেন তলিয়ে গেল কোন অজানা গহিনে।

মিলনশ্রান্ত চোখে ঘুম নেমে আসার কথা। কিন্তু সায়নের চোখে ঘুমের লেশমাত্র ছিল না। পূরবীর নরম মসৃণ গাল এখনও তার বাহুর উপর। খসে পড়া ওড়নাটা দিয়েই তার গোলাপের মতো সুন্দর নগ্নতা ঢেকে দিয়েছে সায়ন একটু আগে। নিশ্চিন্ত ঘুমের নিঃশ্বাস টের পাচ্ছে সে বুকের কাছে। ঘুমোক, ভালো করে ঘুমিয়ে নিক। তাজা হয়ে উঠবে তাহলে পরের বারের জন্য।

আহা! কী তীব্র ছিল মেয়েটার খানিক আগের বিপুল আশ্লেষ, তুমুল ঝর্ণার মতো

8

তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। এখনও যেন সায়নের সারা গা কেঁপে কেঁপে উঠছে সেই স্মৃতিতে।

রাত নেমে গেছে কখন। মাথার উপরে রাশি রাশি চুমকির মতো তারা বসানো ঘন কালো আকাশ। ওই তারায় তারায় যেন লেখা আছে তার আসন্ন সুখের কথা। আরো ক’দিন তো এখানে আছে সে। চুটিয়ে উপভোগ করে নেবে দিনগুলো। পূরবীকে এক মুহূর্তও বিশ্রাম দেবে না। পারবে। সে জানে সে পারবে। তার ভোগক্লান্ত শরীর আবার আগের মতো উত্তাল হয়ে জেগে উঠেছে।

হাওয়ার দিক পরিবর্তন হল কি? খুচরো পাতারা এমন নাচতে নাচতে ভেসে আসছে কেন? ঝড় উঠছে? যদি বৃষ্টি নামে আবার?

তারা? তবে কি এই খোলা আকাশের নীচের ভূমিশয্যা ছেড়ে আড়ালের খোঁজে যাবে

সায়ন চোখ নামিয়ে দেখল, পূরবীরও ঘুম ভেঙেছে৷ আধশোয়া হয়ে উঠে সে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে তারই দিকে। কী অসামান্য সুন্দর এই নারী, তার সর্বঅঙ্গ এখনও উন্মুখ উদ্ধত… আর চোখে কী মগ্ন আহ্বান… !

নিজেকে আর সামলাতে পারল না সায়ন, ঝাঁপ দিল মোহনা খুঁজে। ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘছেঁড়া হিম তরলের স্পর্শ পেল সে পিঠের উপর, কিন্তু তখন আর থামার ক্ষমতা ছিল না তার।

পূরবী কি তাকে থামাত পারত সেই মুহূর্তে? কে জানে। কিন্তু এটা সত্যি, সে

ওকে থামানোর কোনও চেষ্টাই করেনি। সমস্ত শব্দ চাপা দিয়ে একটানা বৃষ্টির মৃদু রিমঝিম ভরিয়ে দিতে লাগল চরাচর। সমস্ত বন জুড়ে যেন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল।

তারপর সেই আগুন জ্বলে উঠল। সেই আগুন, যা জলে নেভে না। সেই আগুন যার অপেক্ষায় এতদিন ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছে পূরবী।

সে আগুন জ্বলল মুহূর্তের মধ্যে। যেন কোন অদৃশ্য হাতের ইশারায় পাইনের ঋজু ডাল থেকে ডালে, আঁকাবাঁকা শিকড়ে, পাথরের গায়ে গায়ে ধক ধক করে জ্বলে

উঠল টকটকে লাল-কমলা অগ্নিশিখা। নেচে নেচে ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে। অঝোর বৃষ্টিও সে আগুন এতটুকু কমাতে পারছিল না। ছুঁতেই পারছিল না—যেন এই বৃষ্টি, আর এই আগুন দুই আলাদা জগতে ঘটছে…

সায়নের টের পেতে একটু দেরি হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে পর পর এই পারঙ্গমতা, যা কিনা সে বহুকাল হারিয়ে ফেলেছিল অতি ব্যবহারে। যে অভাব তাকে ক্রমশ করে তুলেছিল রাগী, বিরক্তিতে ভরপুর এক হিংস্র অস্তিত্ব… সেই তৃপ্তির আবেশ কাটতে চাইছিল না তার।

কিন্তু তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া আগুনের বলয় ক্রমে তীব্র থেকে তীব্রতর লেলিহান হচ্ছিল, উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না আর…

সায়ন চিৎকার করতে চাইল, পূরবীর হাত ধরে একছুটে এই মরণকূপের থেকে

বেরিয়ে যেতে চাইল। তখনও কিছু কিছু ফাঁক ছিল, যাওয়া যেত….

কিন্তু পূরবীর হাত ধরতে গিয়ে ছ্যাঁকা খেল সে। খানিক আগের উষ্ণ পেলব

বাহু এখন জ্বলন্ত কাঠের মতো পুড়িয়ে দিল তার হাতের তালু। সায়ন কঁকিয়ে উঠল যন্ত্রণায়।

তার চোখের সামনে পূরবী পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে… নাকি সেও হয়ে উঠছে আগুনের অংশ? চোখে ধাঁধা লাগে… এই আলো, এই অন্ধকার…

আর কী ভয়ানক… ওই আগুনে গড়া শরীর… কিন্তু এখনও অবিকল একইরকম, যেমন সে দেখেছিল প্রথমবার, সেই সুপুষ্ট ঢেউ, সেই কোমরের বাঁক… এখনও চুল উড়ছে… যদিও সে চুল এখন আগুনের হলকা…

পূরবী তার দিকে চেয়ে আছে তীব্রভাবে …

সে চোখ কয়লার মতো ধিকিধিকি জ্বলছে…

এটুকু ভাবতে ভাবতেই সায়নের নীচের মাটি তেতে উঠল, আগুন এগিয়ে আসছে এবার তার দিকে…

ছুট ছুট …

আগুনের ফাঁক দিয়ে কোথাও কি একটুও গলে যাওয়ার জায়গা নেই আর? কোথাও কি নেই ফিরে যাওয়ার রাস্তা?

সায়ন আতঙ্কে পাগল হয়ে উঠছিল। কিন্তু না, আগুন ঘিরে ধরেছে তাকে একমাত্র বাকি তার পায়ের নীচের পাথরটা, আর সামনের নদীটা। তবে কি নদীতে? তুমুল স্রোত যে! কিন্তু পূরবীর সেই আগুনে গড়া শরীর যে এগিয়ে আসছে তারই দিকে… মূর্তিমতী আতঙ্ক এক…

সায়ন লাফ দিল জলে। তারপর…

সায়নের বিস্ফারিত চোখের সামনে নদীর জল জুড়ে, উথালপাথাল ঢেউ জুড়ে, এমনকী জলের নীচের পাথরগুলোতেও দপ করে জ্বলে উঠল সেই অপার্থিব আগুন … যাকে আকাশভাঙা বৃষ্টিও ছুঁতে পারে না…

কিন্তু সায়নের শরীর তো পারে। জ্বলে পুড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যাওয়ার আগে অবধি সে মর্মান্তিক চেঁচিয়ে গেছিল। পরিত্রাহী আর্তনাদ করে আরেকটিবার সুযোগ পেতে চেয়েছিল বাঁচার… কিন্তু কে জানে সে চিৎকার এ পৃথিবীতে শোনা গেছিল কিনা!

মায়াবন বিহারিণী হরিণী

তার অপেক্ষা আবার শুরু হল পরবর্তী আহুতির জন্য। মানুষই যে তার পছন্দ৷ মানুষ প্রজাতির পুরুষরাই তাকে উত্তেজনার সেই শীর্ষে আরোহণ করাতে পারে যা তার অন্য সঙ্গীরা কেউ পারে না। যে পুরুষের যত পাপী মন, তত তৃপ্তি তাকে খেয়ে। আগে গ্রামের বা এ অঞ্চলের লোকজন ছুটকো ছাটকা এসে পড়ত এ জঙ্গলে৷

কিন্তু বহুকাল হল তারা কীভাবে যেন বুঝে গেছে। ওই সাঁকো আর পার হয় না কেউ! কিন্তু পূরবী তা বলে উপবাস করবে নাকি ! গ্রামের পুরুষ না হলে, শহরেরই সই। টেনে আনার উপায় সে ঠিকই জানে। সে একইসঙ্গে দুই ভুবনে বিচরণ করতে

পারে।

কম্পিউটারের সার্চ হিস্ট্রির বহু কিছু সায়ন ডিলিট করে এলেও, একটা খুব সাদামাটা ট্রাভেল ব্লগের লিঙ্ক ডিলিট করার প্রয়োজন সে মনে করেনি। তবে সে সাইটে এখন মানালির খুব চেনা ট্যুরিস্ট স্পটগুলো ছাড়া আর কিছু ছিল না, পানলাং তো নয়ই। পুলিশ মানালিতে খোঁজখবর করেছিল রুমকির মিসিং ডায়েরি পাওয়ার পর, কিছুই পায়নি।

ব্লগটা এখন বেশ কিছুকাল অমনই থাকবে। কেউ খুঁজেও পাবে না সেটা। তারপর আচমকা একদিন আবার জীবনের সহজ সুখগুলো খুঁজে পেতে ব্যর্থ কোনও পুরুষের গুগল সার্চের রেজাল্টে ভেসে উঠবে সেই লিঙ্ক; পুরুষটি পড়ে ফেলবে অফবিট এক গ্রামের লোভনীয় সৌন্দর্য আর নির্জনতার কথা। তার মনের মধ্যে আকুলিবিকুলি শুরু হবে চুপিচুপি ঘুরে আসার জন্য। সে টিকিট কাটবে, ব্যাগ গুছোবে, তারপর বাড়িতে ‘মানালি যাচ্ছি’ বলে বেরিয়ে পড়বে পানলাং-এর রাস্তায় ।

আসবে… আসতেই হবে তাদের… পূরবী যে তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *