দেবতাদের দেশে

দেবতাদের দেশে

ঘোড়া যখন পাহাড় বেয়ে উঠবে, তুমি সামনের দিকে ঝুঁকে বসবে । আর যখন নীচের দিকে নামবে তুমি পেছনে হেলে যাবে । পথে ঝরনা পড়বে । ছোট নদী পড়বে । ঘোড়া তার ওপর দিয়ে যাবার সময়, জলে মুখ নামাতে চাইলে জানবে তার তেষ্টা পেয়েছে, সে জল খেতে চায়, তুমি লাগাম আলগা করে দেবে যাতে সে জলে মুখ দিতে পারে ।

আমাকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়ে আবু ঘোড়ায় চড়ার এইসব নিয়ম বুঝিয়ে দেয় । কথা বলছিল হিন্দি-উর্দু মিশিয়ে । মাঝে মাঝে একটু একটু বাংলাও লাগাচ্ছিল । বলল, পানিমে মু দেনে নেই সাকে ত উসকো বহোত গোসসা আ যায়গা । বহোত রাগ হয়ে যাবে । আমাদের ঘোড়া ঠিকমত দানাপানি পায় না । তাতেই এমন দুবলা হয়ে গেছে । বড্ড রোগা । পাহাড়ের চড়াই-উতরাই ভাঙতে ওর তকলিফ হয় । ইয়াদ রাখনে চাহিয়ে । অর্থাৎ এসব কথা মনে থাকে যেন ।

কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে বাসে গুলমার্গ এসেছি । এদিকটায় এখনও বরফ পড়া শুরু হয়নি । পাহাড়ের মধ্যে আরও এগিয়ে গেলে, আরও ওপরের দিকে যেতে পারলে নাকি বরফ দেখা যাবে । হাত দিয়ে পাহাড়ের গায়ের বরফ ছোঁয়া যাবে ।

গুলমার্গের পর বাস আর যায় না । বাসরাস্তা এখানেই শেষ । বাস থেকে নামতেই কাশ্মীরি ঘোড়াওলারা ছেঁকে ধরল । সবাই একসঙ্গে চেঁচাতে লাগল, আমার ঘোড়া সবসে আচ্ছা ঘোড়া । আমার ঘোড়া বিলকুল পক্ষীরাজ । একজন বলল, তার ঘোড়াটা নাকি মোগল সম্রাটদের ঘোড়ার বংশধর । সবাই চেঁচাচ্ছে, আমার ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের বরফ দেখে আসুন । দো ঘন্টা বিশ রুপয়া । তিন ঘন্টা পঁয়ত্রিশ রুপয়া । চার ঘন্টার জন্য ঘোড়া নিলে পঁচাশ রুপয়া ।

লোকগুলোর চেহারা দেখে মনে হয় যেন একদল পাহাড়ি দস্যু । পোশাক অনেকটা কাবুলিওলাদের মতোই, মুখে ছুঁচল দাড়ি । চোখগুলো সা৯াতিক জ্বলজ্বলে । লোকগুলো যেভাবে আমাকে তেড়ে-ফুঁড়ে এসে ঘিরে দাঁড়াল, প্রথমটা আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । ভাবলাম, এই বুঝি আমার ব্যাগ-ট্যাগ লুট করে । একটু পরেই বুঝতে পারলাম, এরা খুবই নিরীহ আর বড্ড গরিব । যে যার নিজের ঘোড়া গছাবার জন্যই ওরকম চেঁচামেচি করছে । যার ঘোড়া নেব, সেই তো টাকা পাবে । কটা টাকার জন্য ওই দস্যুর মতন চেহারার লোকগুলোর এমন ভিখিরির মতন কাণ্ড- চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না ।

যাই হোক, শেষপর্যন্ত ওদের মধ্যে যে লোকটাকে ঠিক একেবারে গল্পের বইয়ে পড়া তাতার দস্যুর মতন দেখতে, তাকে বললাম, চলো, তোমার ঘোড়াই নেব ।

বলা মাত্র লোকটা এক ঝটকায় আমাকে ঘোড়াওলাদের ভিড় থেকে বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের কানে একহাত চাপা দিয়ে গলা তুলে ডাক পাড়ল, আ-বু-উ, এ আ-বু-উ ।

জায়গাটা ছোট একটা মাঠের মতন । একদিকে কয়েকটা দোকান । একটু দূরে অনেকগুলো ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে । এদিক-ওদিক কয়েকটা বাড়ি, হোটেল এইসব । তারপরই পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে বনজঙ্গল ।

লোকটা তার জামার পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হিন্দিতে বলল, দুঘন্টায় পাহাড়ের ওপরে বরফের দেশে ঘুরে আসুন । যানে দো ঘন্টা, আনে দো ঘন্টা । অর্থাৎ যেতে দুঘন্টা, আসতে দুঘন্টা । চার ঘন্টাকে লিয়ে আপ সওয়ার বন যাইয়ে । দূর পাহাড়ে গিয়ে নিজের চোখে দেখুন কীভাবে বরফ পড়ে ।

ততক্ষণে রোগা ফরসা চেহারার একটা ছেলে তার মতোই রোগা চেহারার একটা ঘোড়া নিয়ে এসেছে । তার বাঁ গালে একটা ঘা । লোকটার কথা শুনে সেও বলল, কমসে কম দো ঘন্টা নেহি যায়গা তো বরফ বিলকুল নেহি মিলেগা ।

দুঘন্টায় ঘোড়া কত দূর যায় আমি কিছুই জানি না । একা একা অত দূর যাবার কথা ভেবে আমার একটু ভয়ই হল । তাছাড়া ঘোড়া নিজে থেকে পথ চিনে বরফের কাছে গিয়ে আবার ঠিকমতো ফিরতে পারবে তো!

আমি লোকটাকে বললাম, তুমি আমার সঙ্গে যাবে নিশ্চয়ই?

মেরা বেটা আপকা সাথ সাথ রহেগা । ডরিয়ে মাৎ । ভয়ের কিছু নেই ।

ছেলেটার বয়েস খুব বেশি হলে দশ-বারো বছর । ওইটুকু ছেলে আমার সঙ্গে থেকে কী লাভ?

আমি বললাম, না, না, তুমি চলো ।

লোকটা এ-কথায় হঠাৎ রেগে গিয়ে বলল, চার বছর হল গরমিন্ট (সরকার) আমার এই ছেলেকে ট্যুরিস্টদের ঘোড়ায় চড়িয়ে ঘুরিয়ে আনার অনুমতি দিয়েছে । এই দেখো ওর সরকারি কার্ড ।

ছেলেটার বুকের কাছে জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লোকটা একটা ছাপানো কার্ড বের করে প্রায় আমার নাকে ঘষে দেয় আর কি!

তারপর হঠাৎ তার আলখাল্লার পকেট থেকে ছোট্ট একটা আপেল বের করে আমাকে দিয়ে বলল, গোসসা মাপ কিজিয়ে । আমার রাগ মাপ করে দিন । মিঠা শেফ খেতে খেতে চলে যান । ভয়ের কিছু নেই । রোজই এ পথে ঘোড়া যায় । ঘোড়ার খুরে খুরে পথে দাগ পড়ে গেছে । সেই চেনা পথ ছেড়ে ঘোড়া এদিক-ওদিক এক পা-ও যাবে না ।

ছেলেটা আমার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে জামার ভেতরে রেখে বলল, চলিয়ে সাব, ঘোড়ে পর বৈঠিয়ে ।

আমি টাকা বের করতে যাচ্ছি, লোকটা বলল, আভি নেহি । ঘুরে এসে টাকা দেবেন ।

এটাই নাকি এখানকার নিয়ম ।

ছেলেটা আমাকে ও ঘোড়াটাকে মাঠের কিনারে নিয়ে গিয়ে বেশ কায়দা করে আমাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল । পেছন থেকে ঘোড়াওলা চেঁচিয়ে বলল, এ আবু- দেরি করবি না । চার ঘন্টার মধ্যেই ফিরে আসা চাই । মনে রাখিস ।

ঠিক হ্যায় আব্বাজান । বলে সে আমার হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরিয়ে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার নিয়ম বোঝাতে বোঝাতে আমার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে চলল ।

এতক্ষণ হিন্দিতে সে আমাকে দুয়েকবার বাদে আপনি আপনি করেই কথা বলছিল, এবার কিন্তু পুরোপুরি তুমি বলতে শুরু করল । এই বৈশাখে আমি সতেরো শেষ করে আঠেরোয় পড়েছি, আবুর থেকে প্রায় সাত-আট বছরের বড়, সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বৃত্তির টাকা পেয়ে কাশ্মীর বেড়াতে এসেছি, ও কিন্তু বেশ তুমি তুমি করে বলে যাচ্ছিল ।

পাহাড়ের গায়ে ঘোড়া খুব খাড়া মতন জায়গায় উঠছে, আবু বলল, বহোত চড়াই ।

সামনে ঝুঁকো, সাব । হাঁ অ্যাইসাই, ব্যস, সিধা হো যাও ।

আবার ঘোড়া যখন পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় মই দিয়ে নামার মতন নীচে নামে, আবু চাপা গলায় হিস হিস করে ওঠে, পিছে হিল যাও । আরও, আরও হেলে বসো । পা দুটো সামনের দিকে ঘোড়ার কান বরাবর লম্বা করে দাও ।

এরকম একবার উঁচুতে উঠে, একবার নীচের দিকে নেমে, সামনে ডাইনে বাঁয়ে বিরাট বিরাট পাহাড়ের চুড়ো দেখতে দেখতে এগোচ্ছি, আবু বোধহয় একটু পিছিয়ে পড়েছে, হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের গা বেয়ে একেবারে কিনার ঘেঁসে ঘোড়া নীচের দিকে নামছে । আমার ডানদিকেই বিরাট খাদ । পাঁচ-ছশো ফুট গভীর তো হবেই । ঘোড়া একবার পা হড়কালে…. উঃ, ভাবতে গিয়েই আমার মাথার মধ্যে চিরিক করে উঠল । ভয়ে ভয়ে যতবারই নীচে তাকাচ্ছি ততবারই দমবন্ধ হয়ে আসে ।

নিচামে মৎ দেখো, উপরমে দেখো, পাহাড় দেখো, আশমান দেখো, আরামসে বয়ঠো ।

বলতে বলতে আবু আমার সামনে ডানদিকের জঙ্গল থেকে প্রায় দৌড়ে আমার কাছে চলে এল । পাহাড়ি পথে এতক্ষণ হেঁটে এমনিতেই তার হাঁপ ধরে গেছে, তার ওপর দৌড়ে এসে তার গলার আওয়াজ হয়ে গেছে ফ্যাসফ্যাসে । রাস্তা এত সরু যে সে ঘোড়ার পাশে এসে লাগাম ধরে ঘোড়াকে ঠিক সাবধানে নিয়ে যেতে পারছে না । ঘোড়ার পিছনে থেকে চাপা ফ্যাসফ্যাসে গলায় আমাকে শুধু ওই এক কথাই বলে চলেছে- উপরমে পাহাড় দেখো, আশমান দেখো, আরামসে বয়ঠো ।

বিপদের ওপর বিপদ, ঘোড়াটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল । আর এগোবে না । আমি দুহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রায় চিৎ হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছি, নীচের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছি না । ঘোড়া কেন এভাবে এরকম বিপজ্জনক রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল কিছুই বুঝতে পারছি না । এদিকে আবু পিছন থেকে ঘোড়ার গায়ে চটাচট চাপড় মারছে আর মুখ দিয়ে হুরুরুর হ্যাট হ্যাট করে তাকে এগোবার জন্য বৃথাই ব্যস্ত করে তুলতে চাইছে ।

ভয়ে বিরক্তিতে আমি আকাশের দিকে চোখ রেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, আ! তাড়া দিচ্ছ কেন? ঘোড়া খাদে পড়ে যাবে যে!

আবু আমার কথা যেন শুনতেই পায়নি, সে একভাবে ঘোড়াকে হাঁটাবার চেষ্টা করতে লাগল ।

আমি তো ভয়ে কাঠ । সাহস করে মাথাটা বাঁদিকে একটু ঘুরিয়ে দেখি, ঘোড়া যেখানটায় থেমে আছে তার সামনের রাস্তা আরও সরু ও আরও বিপজ্জনকভাবে বাঁক নিয়েছে । আর তার বাঁদিকে বেশ চওড়া একটা রাস্তা ঢালুর ওপর বড় বড় গাছের তলা দিয়ে এগিয়ে গেছে । ওই অবস্থায়ই আমার হঠাৎ চোখে পড়ল, বাঁদিকের ওই ভালো রাস্তার মুখে বড় বড় তিনটে পাথরের চাঁই আর গাছের ডালপালা জড়ো করে কেউ রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়েছে । ঘোড়াটা মাঝে মাঝেই মুখ ঘুরিয়ে একবার ওই রাস্তার দিকে আর একবার সামনের বিপজ্জনক রাস্তাটা দেখছে আর বোধহয় ভয়ে পিছন দিক দিয়ে বিশ্রী আওয়াজ বের করছে ।

আবু তখনও আশা ছাড়েনি । ও কি বোকা, না ইচ্ছে করেই আমাকে খাদের মধ্যে ফেলে দিতে চায়? সামনের বিপজ্জনক রাস্তায় ঘোড়াকে জোর করে ঠেলে না দিয়ে বাঁদিকের চওড়া

রাস্তার পাথর-টাথর সরিয়ে ওই পথে গেলেই তো বাঁচা যায় । সেটা ওর মাথায় আসছে না কেন?

আমি বললাম, আবু, বাঁদিকের রাস্তাটা বন্ধ । পাথর আর গাছের ডালপালা পড়ে আছে । ওগুলো সরিয়ে দাও, ঘোড়া ওই পথেই যেতে পারবে ।

আবু এক লাফে ঘোড়ার পেটের কাছে চলে এসে আমাকে চমকে দিয়ে বলল, আমিই তো ওই রাস্তা বন্ধ করলাম । না হলে তো ঘোড়া এতক্ষণে খুরের চিহ্ন ধরে ওই রাস্তায়ই উঠে পড়ত । আমি চাই ও সামনের রাস্তা ধরেই যাবে ।

আমি ভীষণ রেগে গিয়ে বললাম, কেন? তুমি আমাকে খাদে ফেলে দিতে চাও?

এত শীতেও আবুর কপাল ঘামে ভেজা । সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, তোমাকে ফেলে দিতে চাই না, তোমার সঙ্গে এখান থেকে পালিয়ে যেতে চাই ।

কথাটা শেষ করে আবু আমাকে খুব সাবধানে ধরে ঘোড়া থেকে নামিয়ে আনল ।

বলল, একটু জিরিয়ে নাও । ঘোড়াটাও একটু জিরোক । তুমি এবার ঘন্টাখানেক হাঁটতে পারবে তো? এবার আমি ঘোড়ায় উঠব । না হলে ওকে এই রাস্তা দিয়ে কিছুতেই হাঁটানো যাবে না ।

আবুর কথা শুনে আমি তো অবাক । বড় বড় গাছের নীচে কনকনে ঠান্ডায় একটা ঢিবির ওপর বসে আমি ভালো করে আবুকে দেখলাম । ও ততক্ষণে ঘোড়াটাকে একটু পিছিয়ে এনে নিজের আলখাল্লার মতন জামার ভেতর থেকে ঠিক এক মুঠো ঘাস বের করে খেতে দিল । তারপর আমার পাশে বসে পড়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল, আমি বাঙালি । আমাদের বাড়ি কলকাতায় ।

সেকি? তোমার নাম কী? তুমি কাশ্মীরের ছেলে নও?

আমার নাম শিবু । এখানে আমার নাম আবদুল্লা । আবু বলে ডাকে ।

ওই ঘোড়াওলা লোকটা যে তোমাকে নিজের ছেলে বলল?

খুব ছোটবেলায় আমি যখন নার্সারিতে পড়তাম, তখন আমাকে ছেলেধরারা চুরি করে । জলন্ধর বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে নিয়ে গিয়েছিল । প্রায় এক বছর আমি ওখানে ছিলাম । তারপর একদিন রাতে সুযোগ পেয়ে আমি ছেলেধরাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাই । কলকাতার পথ তো চিনি না । ঘুরতে ঘুরতে একদিন কাশ্মীরে চলে আসি । এই ঘোড়াওলা আমাকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়ে কাজ শেখায় । তারপর থেকে ওর কাছেই আছি ।

আর এই ঘোড়ার কাজ করি । ঘোড়াওলা লোকটা আমাকে এমনিতে খুব ভালোবাসে । কিন্তু রোজই শাসায়, পালাবার চেষ্টা করলে একেবারে শেষ করে দেবে ।

আমি বললাম, কলকাতায় তোমার বাড়ি কোথায়? ঠিকানা কী?

আবু খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, ঠিকানাটা আমি জানি না । আমাদের বাড়ির কাছেই একটা হাসপাতাল আছে ।

সূর্য হেলে পড়েছে । ঠান্ডাও বাড়ছে । মনে হয় গায়ে একেকবার কেউ যেন বরফের চাঁই চেপে ধরছে । তার মধ্যেই একটা দৃশ্য দেখে আমার মন ভরে গেল । রোদ পড়ে দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়ের চুড়োগুলো একেবারে সাদা ধপধপ করছে । আমি এতদিন যত সাদা দেখেছি এই সাদার কাছে সেসব কিছুই নয় । একেবারে সত্যিকার সাদা ।

আবু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি রাজি তো? আমাকে এখান থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করবে তো?

আমি উঠে তার হাত ধরলাম । বললাম, আবু, থুড়ি শিবু, আমি তো ভাবতেই পারছি না তুমি এত বছর ধরে তোমার মা-বাবাকে ছেড়ে এত দূর-দেশে পড়ে আছ । কলকাতায় চলো, আমি ঠিক তোমার ঠিকানা খুঁজে বার করব ।

আবু তিড়িং করে একবার লাফিয়ে নিয়ে বলল, আমি জানতাম । তোমাকে দেখেই আমি বুঝেছি তুমি আর সকলের মতো ওই রাস্তার ভয়ে এখান থেকে ফিরে যেতে চাইবে না । তুমি খুব ভালো ।

তুমি কি রোজই এরকম সবাইকে তোমার পালানোর প্ল্যান বলো নাকি?

না, না । বছরে দুয়েকবার চেষ্টা করি । কারও মুখ দেখে যদি মনে হয় লোকটা খুব ভালো শুধু তখনই আমি এই রাস্তাটা বন্ধ করে ঘোড়াকে ওই রাস্তায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করি ।

কিন্তু মুখ দেখে তো সব সময় মানুষ চেনা যায় না । ওই রাস্তাটায় পৌঁছেই সওয়ার আমাকে গালিগালাজ করে, তখন আর কী করি, ওপরের চওড়া রাস্তাটা পরিষ্কার করে ওই রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে দূর থেকে বরফ দেখিয়ে আবার সেই ঘোড়াওলার কাছে ফিরে যাই ।

ওই বিপজ্জনক রাস্তা ছাড়া কি তোমার পালাবার আর রাস্তা নেই?

চলে যেতে হলে ওই একটাই রাস্তা ।

এবার আবু চলেছে ঘোড়ার পিঠে, আমি ঘোড়ার পিছু পিছু পায়ে হেঁটে । এভাবে হেঁটে গেলে খাদে পড়বার ভয় নেই । ভয় একটাই, কেবলই মনে হয় এই বুঝি আবু ঘোড়াসুদ্ধ খাদে পড়ে গেল ।

পথটা একইভাবে কিছুদূর গিয়ে বাঁয়ে মোড় নিয়েছে । সেখানে রাস্তাটাও খানিকটা চওড়া । এখান থেকে রাস্তা ঘুরে ঘুরে ওপরের দিকে উঠে গেছে ।

আবু এইখানে ঘোড়া থেকে নেমে আরেকবার তার জামার ভেতর থেকে ঘাস বের করে ঘোড়াকে খেতে দিল । খাওয়া হয়ে গেলে সে আমাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে নিজে ঘোড়ার লাগাম ধরে টানতে টানতে প্রায় দৌড়তে লাগল । মুখে সেই হুরুরুর হ্যাট । পাহাড়ের গায়ে ওরকম উঁচু রাস্তা, সে দিব্যি ঘোড়াকে দৌড় করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আমিও তালে তালে ঘোড়ার পিঠে বেশ ঝাঁকুনি খাচ্ছি । আ, এই নাহলে আর ঘোড়া!

উঠতে উঠতে হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরে আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম । মাত্র কুড়ি-পঁচিশ হাত দূরে পাহাড়ের চুড়ো বেয়ে নেমে এসেছে বিরাট সাদা চাদরের মতো বরফের ঢল । মাইলের পর মাইল শুধু বরফ আর বরফ । এই কি স্বর্গ? দেবতাদের দেশ?

ঠান্ডায় আমার মুখের চামড়া জ্বালা করছে । হাত-পা নাড়তে পারছি না । কিন্তু এই আশ্চর্য সুন্দর জায়গায় মনে হচ্ছে এত কষ্টও যেন কিছু না । এমন জায়গাও আছে পৃথিবীতে! না-কি এ আমাদের পৃথিবীর বাইরে!

আবু এসব ছেড়ে কলকাতায় ফিরে যেতে চায়?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *