তেলিয়াভোলা – অভীক সরকার

তেলিয়াভোলা

ক্লাবঘরে ঢোকার অনেক আগে থেকেই অট্টহাসির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন চাটুজ্জেমশাই৷ কিন্তু তার কারণ বুঝতে পারছিলেন না৷ অবশ্য এই ক্লাবে হইচই নিত্যই লেগে থাকে, নতুন কিছু না৷ আর সেই জন্যই সভ্যদের সঙ্গে বয়সের অনেকটা ব্যবধান থাকলে কী হবে, এই ক্লাবে নিয়মিত হাজিরা দেন তিনি৷ ওঁর মতে তরতাজা ছেলেপিলেদের মধ্যে থাকলে মন সতেজ থাকে, চট করে বুড়ো হয় না৷

ক্লাবে ঢুকতেই সবাই হই হই করে উঠল৷ চাটুজ্জেমশাই দেখলেন একজন অচেনা মধ্যবয়সি ভদ্রলোক চৌকিতে বসে চা খাচ্ছেন৷ তাঁকে ঘিরেই জটলা৷ পরিচয় করিয়ে দিল রঘু, ‘‘আসুন কাকা, আলাপ করিয়ে দিই৷ ইনি বাদল সরকার, আমাদের দূর সম্পর্কের কাকা হন৷ বাংলাদেশে থাকেন, গারমেন্টের ব্যবসায়ী৷ ব্যাবসার কাজে এদেশে আসছেন শুনে ধরে নিয়ে এলাম৷ আমাদের বাড়িতে থাকবেন ক’দিন৷’’

চাটুজ্জেমশাই শান্তপ্রকৃতির লোক৷ চট করে তাঁর মুখের ভাব বোঝা যায় না৷ তাও তাঁর মুখে বেশ একটা আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল৷ হাত জোড় করে হাসিমুখে বললেন, ‘‘বাহ বাহ, খুব ভালো করেছ রঘু! সরকারমশাইয়ের কাছ থেকে ওদেশের হাল-হকিকত জানা যাবে৷ দেশ-বিদেশের কথা শুনতে আমার খুব ভালো লাগে৷’’

কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে৷ সেই সূত্রে আলোচনাটা দামি মাছের দিকে ঘুরে গেল৷ সমস্ত দুর্লভ, দুর্মূল্য মাছ, যেমন- সার্ডিন, নীলপাখনা টুনা, আলাস্কান ওয়াইল্ড কিং স্যামন, এসবের কথা উঠল৷ তর্ক-বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে, এমন সময় চাটুজ্জেমশাই মৃদু হেসে বললেন, ‘‘তোমরা তেলিয়াভোলার নাম শুনেছ?’

তেলিয়াভোলা মাছের নাম শুনেছে অনেকেই, কিন্তু কেউ চট করে মনে করতে পারল না৷ বাদলকাকু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘‘নাম শুনেছি বটে, কিন্তু দেখার সৌভাগ্য খুব একটা হয়নি৷’’

মাথা নাড়লেন চাটুজ্জেমশাই, ‘‘দেখা না-হওয়ারই কথা৷ কলকাতার বড়ো বড়ো মাছের আড়তেও এ মাছ চট করে দেখা যায় না৷ আর দেখা যাবেই বা কী করে? সমুদ্র থেকে তোলার পর সোজা রফতানি হয়ে যায় বিদেশের বাজারে৷’’

‘‘বটে? তা এই মাছ আমাদের এখানে পাওয়া যায় নাকি?’’

‘‘যায় তো বটেই৷ শংকরপুর, মোহনা, সুন্দরবনের জেলেদের জালে কখনো-সখনো ধরা দেয় এই মাছ৷ আর একবার ধরা দিলে ট্রলার মালিকের বরাত রাতারাতি খুলে যায়৷’’

‘‘কীরকম?’’ উৎসুক হলেন বাদলবাবু৷

‘‘কীরকম? এই তো কয়েকদিন আগে একটা কাজে দীঘার মোহনায় গেছিলাম৷ দেখলাম একটা বিশাল তেলিয়াভোলা ধরা পড়েছে, প্রায় পঞ্চান্ন কেজি ওজন৷ বিক্রি হল তেরো লক্ষ টাকায়৷’’

বাদলবাবু একটা হেঁচকির শব্দ করলেন৷ আমরাও শুনে হাঁ! একটা মাছের দাম তেরো লক্ষ টাকা?

আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন চাটুজ্জেমশাই, ‘‘অত বড়ো না হলেও একটা সাধারণ আকারের তেলিয়াভোলার দামও লক্ষাধিক টাকা হওয়া বিচিত্র নয়৷ বিভিন্ন দামী ওষুধ তৈরিতে এর পটকার গুরুত্ব অপরিসীম৷ তাই বিদেশের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নিলাম করে কিনে নিয়ে যায় এই মাছ৷

এই মাছ নিয়ে বহু ইতিহাস, গল্প, লোকমুখে ঘুরে বেড়ায় দীঘা মোহনার জেলেদের মধ্যে৷ আর এই তেলিয়াভোলা নিয়েই এক আশ্চর্য ঘটনার মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম৷ শুনতে চাও নাকি?’’

আমরা কেউ কিছু বলার আগেই বাদলবাবু হইহই করে উঠলেন, ‘‘কন কী মশয়? হেইডা আবার জিগানের লাগে নাকি? কইয়া ফালান, কইয়া ফালান৷’’

হাতে একটা চায়ের গ্লাস নিয়ে গল্প শুরু করলেন চাটুজ্জেমশাই৷

‘‘আমি তখন রাগের মাথায় একটা কাজ ছেড়ে দিয়ে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছি৷ এমনিতে খাওয়া-পরার অভাব নেই, বাপ-মা মরে যাওয়ার আগে যা রেখে গেছেন তাতে অন্তত দু’বেলার ডাল-ভাত হয়ে যায়৷ কিন্তু জোয়ান ছেলে, কাঁহাতক আর কাজকর্ম না করে বাপ-মায়ের জমানো পয়সায় অন্ন ধ্বংস করতে মন চায় বলো?

এমন সময় এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সূত্রে একটা কাজ জুটে গেল৷ ভদ্রলোকের অনেক ব্যাবসার মধ্যে একটা হচ্ছে মাছের ব্যবসা৷ দীঘার মোহনায় মস্তবড় মাছের আড়ত৷ ট্রলারও আছে দুটো, এম ভি সারদা আর এম ভি বিবেক৷ আর এই ব্যবসাটা সামলান ভদ্রলোকের এক জ্ঞাতি, নাম সৌমেন মহাপাত্র৷ ভদ্রলোক সৌমেনবাবুকে একটা ফোন করে দিয়ে আমাকে বললেন, ‘‘কালই রওনা হয়ে যাও হে৷ সৌমেন ভালো লোক৷ লেগে থাকলে তোমার উন্নতি আটকায় কে!’’

যেদিন মহাপাত্রবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যাই, সেদিনটা এখনও মনে আছে৷ সে এক স্মরণীয় দিন বটে৷ আড়তে পৌঁছে দেখি হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার৷ জেটিতে একটা ট্রলার এসে নোঙর করেছে, তাতে নাকি এক নয়, দুই নয়, প্রায় তেত্রিশটা তেলিয়াভোলা উঠেছে! জেটি একেবারে ভিড়ে ভিড়াক্কার৷ দেখি একজন হর্তাকর্তা গোছের মানুষ সব কিছু তদারক করছেন৷ শুনলাম উনিই সৌমেন মহাপাত্র৷ ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, ‘‘কী হে সৌমেন, তোমার তো কপাল ফিরে গেল হে! এবার দোতলাটা তুলেই ফেল৷’’ আর একজন বলে উঠল, ‘‘সমুদা, এবার কিন্তু তোমায় ছাড়ছি না গুরু৷ কেলাবে ফিস্টি হবে, আর এবার দেশিতে হবেনি, বিলিতি চাই!’’ এক বৃদ্ধ বললেন, ‘‘তোমার ছোটোমেয়েটি বড়ো পয়মন্ত হয়েছে সমু৷ অন্নপ্রাশনে একটা রুপোর গোট গড়িয়ে দিও!’’

আমাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল অনিল মান্না, সৌমেনবাবুর কুক কাম ড্রাইভার কাম সর্বক্ষণের সঙ্গী৷ সে আমার কানে কানে বলল, ‘‘কাণ্ড দেখেছেন দাদা, এই বাজারে তেত্রিশটা তেলিয়াভোলা, এক-একটা কম করে হলেও প্রায় দশ কেজির বেশি বই কম নয়৷ মানে কম করে হলেও পৌনে এক কোটি৷’’

শুনে মাথাটা বাঁই করে ঘুরে গেল৷ তখন মাসে এগারো-বারো হাজার টাকায় আমার দিব্যি হেসেখেলে চলে যেত৷ এক কোটি টাকা শুনেইছি কেবল, চোখে কখনও দেখিনি৷

অনিল অবশ্য থামল না, গলাটা নামিয়ে বলল, ‘‘আর তার থেকে তিরিশ লাখ পাবে ওই মাঝি-মাল্লাদের দল৷ সোমুদা ভাগ করে দেবে৷’’

গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘বলেন কী! সে তো অনেক টাকা! মাছের ব্যাবসায় তা’লে ভালো লাভ আছে বলুন?’’

‘‘কই আর,’’ হাত উলটোল অনিল, ‘‘ওই মাঝেসাঝে এক-আধবারই যা এদের কপাল খোলে৷ না হলে এই ব্যাবসার এখন যা হাল, এদের সংসারই চলে না ঠিকমতো৷ সোমুদা আর ক’দিন এই ব্যাবসা চালাতে পারে সেটাই দেখার৷’’

পরে শুনেছিলাম কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি অনিল৷ বেশ কয়েক বছর ধরে নাকি এই ব্যাবসায় ভাটার টান দেখা দিয়েছে৷ তেলের টাকা, জেলেদের মজুরি, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে কয়েকজন ট্রলার মালিক নাকি ট্রলার বেচে সেই টাকা বালি আর কাজুর ব্যাবসায় লাগিয়েছে৷ যেসব সাপ্লায়াররা সেইসব ট্রলারে তেল, মোবিল, জাল এসব সাপ্লাই দিয়েছিল তারা টাকার জন্য দোরে দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷

আমি আর কিছু বললাম না৷ পাত্রমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলব বলে এগিয়ে গেলাম৷

* * *

হপ্তাখানেক পরের কথা৷ ততদিনে পাত্রমশাইয়ের কল্যাণে আড়তে বেশ জমিয়ে বসেছি৷ কাজ বলতে খাতা দেখা, হিসেবপত্র ঠিক রাখা, এইসব৷ আমার অবশ্য কাজটা ধরে নিতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি৷ একে কমার্সের স্টুডেন্ট, তার ওপর কয়েকদিন কলেজ স্ট্রিটে এক পাবলিশারের কাছে এই একই ধরনের কাজ করে বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছিলাম৷

তবে আশ্চর্য লাগছিল পাত্রমশাইয়ের সঙ্গে মিশে৷ কঠিনে-কোমলে মিশেল এমন লোক আজকাল পাওয়া যায় না বললেই চলে৷ কাজের জায়গায় যেমন কড়া, তেমনই কর্মচারীদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন৷ তাঁর দৃষ্টি সব দিকে ঘোরে৷ কাজে ফাঁকি দিয়ে পার পাবে এমন কেউ এ-পাড়ায় নেই৷ আর এই ব্যাবসার একেবারে খুঁটিনাটি সব মুখস্থ৷ দাদন দেওয়া থেকে আরম্ভ করে আড়ত, বাজার সামলানো, সব পাত্রবাবু একাই সামলান৷

সেদিন পাত্রমশাইয়ের মেজাজ দিব্যি শরিফ ছিল৷ কয়েকদিন আগে ব্যাংকে তেলিয়াভোলা বেচার টাকা ঢুকেছে৷ কাল পাত্রমশাইয়ের পাড়ার ছেলেপিলের দল মদে-মাংসে মোচ্ছব করেছে বেহদ্দ৷ বলা বাহুল্য আমিও সেই প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হইনি৷ সকাল থেকে তাই মাথা টিপটিপ করছে আর ক্রমাগত হাই উঠছে৷ সঙ্গী ছিল অনিল, তারও অবস্থা খুব একটা সুবিধের না, চোখ এখনও লাল হয়ে আছে৷

বলতে নেই, এই ক’দিনেই অনিলের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি৷ বেশ হাসিখুশি ছেলে৷ এখানেই বাড়ি৷ পাত্রমশাইয়ের লতায়-পাতায় কীরকম আত্মীয় হয় যেন৷

অনিল একটা হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘‘সোমুদা, তোমার মাঝিরা সব গেছে কই? আড়ত তো ফাঁকা দেখছি৷’’

পাত্রমশাই বললেন, ‘‘কাল যা গিলেছে ব্যাটারা৷ দেখ গিয়ে পড়ে আছে কোন আঘাটায়! কিন্তু তাতে তোর কী?’

‘‘তা কত টাকা পেল তোমার মাঝিরা?’’

চোখ পাকালেন পাত্রমশাই, ‘‘সেটা তোকে কেন বলতে যাব রে? তোর কি চোখ টাটাচ্ছে নাকি?’’

অনিল ফিক করে হেসে বলল, ‘‘আহা, বলোই না৷’’

পাত্রমশাই মুখখানা ছদ্ম-কোপে গম্ভীর করে বললেন, অত জেনে কাজ নেই৷ তবে ‘‘খারাপ পায়নি, এটুকু বলতে পারি৷’’

একগাল হেসে দিল অনিল, ‘‘খারাপ যে পায়নি সে তো জানি সোমুদা, আর সেই জন্যই তো চোখটা টাটাচ্ছে৷ নইলে আর জিজ্ঞেস করব কেন! শোনো না, একটা কথা আছে!’’

সৌমেন মহাপাত্রের ভুরু কুঁচকে গেল৷ তিনি সন্দিগ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘‘কী কথা শুনি?’’

‘‘আমাকেও একবার ট্রলারে তুলে দাও না৷ তেলিয়াভোলা উঠলে অন্তত কিছু টাকা তো পাবই৷’’

প্রস্তাবটা এত অদ্ভুত যে আমরা সবাই একটু হকচকিয়ে গেলাম৷ পাত্রমশাই অবাক হয়ে বললেন, ‘‘হঠাৎ করে তোর এরকম বেয়াড়া শখ হল কেন শুনি?’’

অনিল সলজ্জ মুখে যা জানাল সে এক ভারি রোমান্টিক কাহিনি৷ অনেকদিন ধরেই বাড়িতে অনিলের বিয়ের কথা চলছে৷ গত হপ্তায় অনিল বন্ধুবান্ধব নিয়ে মেয়ে দেখতে গেছিল কাঁথির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে৷ মেয়ে থার্ড ইয়ারে পড়ে, বাপের কাজু আর বালির ব্যবসা৷ মেয়ে দেখতে শুনতে ভালো, তার ওপর রবীন্দ্রসংগীত আর ফিশফ্রাই দুটোই খুব ভালো পারে৷ মোটমাট কাজলবালা সাঁপুইকে ভারি মনে ধরেছে অনিলের৷ দুই বাড়িতে কথা হয়ে গেছে একপ্রকার৷ মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা মিটলেই সামনের অঘ্রানে বিয়ে৷

এখন কথা হচ্ছে যে বিয়ের কিছু খরচখরচা থাকেই৷ এদিকে অনিল, যাকে বলে ভারি প্রিন্সিপলড ছেলে৷ সে ভাবী শ্বশুরবাড়ি থেকে পণ নেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না৷ সে গোঁ ধরে বসে আছে যে শুধু শাঁখা-সিঁদুরে মেয়ে নিয়ে আসবে৷ তাই নিজের বিয়ের খরচখরচাবাবদ তার কিছু টাকার প্রয়োজন৷

কথাটা শুনে পাত্রমশাই যে অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন সে তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল৷ আর আমি তো পারলে ক্ল্যাপ দিয়ে উঠতাম৷ অনিলের চরিত্রের এই দিকটা জানতাম না৷ ছেলেটার ওপর আমার শ্রদ্ধাই বেড়ে গেল৷

সৌমেন মহাপাত্র বললেন, ‘‘কথাটা তো খারাপ বলিসনি বাপধন! কিন্তু সমুদ্রে যাওয়ার অনেক হ্যাপা, জানিস তো?’’

অনিল কপট রাগে বলল, ‘‘এমন করে বলছ যেন আমি ওই ভব’র মতো শহুরে ছেলে৷ আমার বাপের যে এককালে একটা ছোটো ট্রলার ছিল আর তাতে করে যে আমি সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতাম সে যেন তুমি জানো না?’’

সামান্য অপ্রস্তুত দেখাল পাত্রমশাইকে, ‘‘আহা, তা কী আর জানি না বাপু! তোর বাপ মানে সুনীলকাকা’কে এই পাড়ায় কে না চেনে? তবে কথাটা হচ্ছে গিয়ে তুই তো সমুদ্রে বেশি গভীরে যাসনি, কাছেপিঠে গিয়েছিস৷ মানে, কথাটা অন্যভাবে নিস না, সুনীলদা’র ট্রলার তো বেশি গভীর সমুদ্রে যাওয়ার মতো ছিল না৷ এদিকে তেলিয়াভোলা কিন্তু যাকে বলে গভীর জলের মাছ৷ যেখানে পাওয়া যায় সেখানে যেতেই লাগে দিনদুয়েক, আসতেও তাই৷ অত দিনের ধকল কি তুই পারবি?’’

অনিল চওড়া হেসে বলল, ‘‘পারব না কেন, সমুদ্রে যাওয়ার অভ্যেস তো আছেই৷ আর কয়েকদিন ঝালিয়ে নিলেই ব্যাপারটা সড়গড় হয়ে যাবে৷ আর তাছাড়া সঙ্গে ভব তো থাকবে সঙ্গে৷ বিপদে পড়লে ওই গার্ড দেবে আমাকে৷ দু-জনে মিলে একটা ট্রিপ করে আসি না সোমুদা!’’

আমি তো হাঁ৷ পাত্রমশাইও তাই৷ তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি, ‘‘শাব্বাশ অনিল, শাব্বাশ! কথাটা বেড়ে বলেছিস বটে ৷ ভব’র মতো কলকাতার বাবু, যে কি না পুকুর আর সুইমিং পুল ছাড়া সাঁতার কাটেনি কোথাও, আর গঙ্গা পারাপারের জন্য লঞ্চে চড়া ছাড়া অন্য কোনো ভেসেলে চড়েনি, সে নাকি যাবে তেলিয়াভোলা ধরতে! সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া এমন কী কঠিন কাজ? দীঘা, মন্দারমণিতে আউটিং করতে আসার মতোই সহজ, তাই না রে?’’

অনিল হাসিটা ধরে রেখে বলল, ‘‘তা নয় গো দাদা৷ আসলে ও থাকলে একটু ভরসা পাই৷ তুমি তো জানোই, ও কতবার আমাকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচিয়েছে৷’’

কথাটা যে খুব মিথ্যে তা নয়৷ আবার পুরোপুরি সত্যিও নয়৷ ব্যাপারটা খুলে বলা দরকার৷

জানি না তোমরা জানো কি না, আমার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে৷ আমি যদি কারও খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হই, বা কারও ব্যাপারে খুব চিন্তা করি, তাহলে তার কোনো আসন্ন বিপদের ছায়া আমার মনের চোখে ভেসে ওঠে৷ অনিলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই ওকে একবার বলেছিলাম আগুন থেকে সাবধানে থাকতে৷ আর একইদিনে ওর পায়ের ওপর জ্বলন্ত স্টোভ পড়ে অনেকটা পুড়ে যায়৷

সেই থেকেই দেখেছি আমার ওপর ওর একটা আলাদা বিশ্বাস এসেছে৷ প্রায়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরোবার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করে যায় আজ যাওয়াটা শুভ হবে কী হবে না? বা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে যায় আজ ওর মায়ের বাঁ চোখ নেচেছে, সেটা ভালো না খারাপ? আমি যতই বোঝাই যে এসব কুসংস্কার, এতে মাথা ঘামানো মানে মনকে দুর্বল করা, ছেলে কিছুতেই শোনে না৷ এরকম আরও ছোটোখাটো কিছু ঘটেছে, তাতে আমার ওপর ওর বিশ্বাস দিনে দিনে আরও বেড়েছে৷

পাত্রমশাই গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘‘বাজে কথা রাখ অনিল৷ ছেলেমানুষের মতো বায়না জুড়িস না৷ মাঝি হওয়া কি মুখের কথা? রোদে পুড়তে হয়, নোনা জলের গন্ধ মাখতে হয়, দিক চিনতে হয়, স্রোত চিনতে হয়, রাতের আকাশ চিনতে হয়, মোহনার বাঁক চিনতে হয়, তবে গিয়ে না একজন ভালো মাঝি তৈরি হয়৷ ভব’র পুকুরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাই নেই, আর আমি ওকে ভেসেলের সঙ্গে তেলিয়াভোলা ধরতে পাঠিয়ে দেব? আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? একটা অঘটন ঘটলে তার দায় কে নেবে?’’

কথাটা খুব আঁতে লাগল, বুঝলে৷ তখন আমার প্রথম যৌবন৷ ওই বয়েসটাই স্পর্ধার বয়েস, অসম্ভবকে ছুঁয়ে দেখার বয়েস, খ্যাপা মোষের শিং রোখের মুঠোয় চেপে ধরার বয়েস৷ আমি বলে বসলাম, ‘‘কেন, এমন কী হাতি-ঘোড়া কাজ শুনি? এত লোকে পারলে আমি পারব না কেন? না সৌমেনদা, আমি যাবই৷’’

পাত্রমশাই আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘‘প্রশ্নই ওঠে না ভব৷ হাজার হোক তুমি আমার এখানে কাজ করো৷ তোমার প্রতি আমার একটা দায়-দায়িত্ব আছে, তোমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই৷’’

কিন্তু শেষমেশ আমার আর অনিলের চাপে পাত্রমশাইকে রাজি হতেই হল৷ একে তো উনি দু-জনকেই অত্যন্ত স্নেহ করেন৷ তার ওপর অনিল জোর দিয়ে বলল যে আমাকে ও পরের একমাস ট্রেনিং দিয়ে একেবারে চোস্ত করে তুলবে৷ তখন শীতকাল, সমুদ্র এমনিতেই শান্ত থাকে, ফলে বিপদের ভয় কম৷ তাই সাত-পাঁচ ভেবে পাত্রবাবুও নিমরাজি হয়ে গেলেন৷

* * *

পাত্রমশাইয়ের ভেসেল সাম্রাজ্য বেশ বড়ো বললেই চলে৷ কয়েকদিন পর তারই একটা ছোটো নমুনা টেনে মহা উৎসাহে আমার সমুদ্রযাত্রার ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল৷ রোজ ভোর-ভোর উঠি, সামান্য ব্যায়াম করে ব্রেকফাস্ট করে নিই৷ তারপর অনিল ওর স্কুটার নিয়ে চলে আসে আমাকে তুলতে৷ আমাদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্বে আছে বুড়ো আসগর মাঝি৷ এখন বয়েস হওয়াতে আর সমুদ্রে যেতে পারে না ঠিকই, তবে এলাকার প্রায় সব জোয়ান মাঝিই আসগরের হাতে তৈরি৷

প্রথম প্রথম মন্দ লাগছিল না৷ সকালের দিকে সমুদ্র শান্ত থাকে৷ তা ছাড়া অক্টোবরের শেষ দিক, ঝড়-ঝঞ্ঝা-তুফানের চান্স নেই৷ তাই একটু একটু করে রোজই যাত্রার দূরত্ব বাড়তে লাগল৷ প্রাথমিক ভাবে বিষয়টা একটু সড়গড় হয়ে গেলে আমি একটু একটু করে ভেসেলের অন্যান্য কাজকর্ম রপ্ত করা শুরু করলাম৷ যেমন কম্পাস, নেভিগেশনাল জিপিএস, ভিএইচএফ অপারেট করা এইসব৷ যদিও আমার এসব শেখার দরকার আছে তা নয়, যে ভেসেলে যাব বলে ঠিক হয়েছে তাতে অভিজ্ঞ মাঝিমাল্লা কম নেই৷ খানিকটা নিজের শখেই শিখে রাখা আর কী!

এমন সময় একদিন একটা ঘটনা ঘটল৷

দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার, তার ওপর পূর্ণিমা৷ সাগরে সেদিন স্রোতের টান অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশিই৷ ফিরে আসছি, এমন সময় হঠাৎ করে দেখি আমাদের লঞ্চটা বেগড়বাঁই করা শুরু করেছে৷ সাইকেলের চাকা টাল খেলে যেমন হয়, ঠিক তেমন৷ খাঁড়ির মুখটা পেরিয়েছি, দেখি লঞ্চবাবাজি একবগ্গা হয়ে ধেয়ে চলেছে বাঁদিকের তীরের দিকে৷ আসগর মাঝিকে জিজ্ঞাসা করতে দেখি তার ভুরুতে গভীর ভাঁজ৷ বলল, ‘‘কী করে হল জানি না বাবু, হঠাৎ করে দেখছি স্টিয়ারিং লক হয়ে গেছে৷ ঘোরাতেই পারছি না৷’’

অনিল বিরক্ত হয়ে বলল, ‘‘স্টার্ট করার আগে দেখে নাওনি কেন?’’

আসগর মাথা চুলকে জবাব দিল, ‘‘এতক্ষণ তো সব ঠিকঠাকই ছিল বাবু৷ দিব্যি তো ঘুরে এলাম৷ কোথাও কোনো গড়বড় দেখলেন? হঠাৎ করে যে কী হল…’’

কথাটা মিথ্যে নয়৷ এদিকে হঠাৎ করেই দেখছি খাঁড়ির জল একদম শান্ত হয়ে গেছে৷ বিন্দুমাত্র ঢেউ নেই৷ একটু আগে আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি নজরে আসছিল, এখন সেটাও নেই৷ চারিদিকে একটা অস্বস্তির ভাব৷

আস্তে আস্তে ভেসেলটা তীরে গিয়ে ভিড়তে আসগর নোঙর ফেলল৷ তারপর বিরক্ত হয়ে কলকবজা নেড়েঘেঁটে দেখতে দেখতে বলল, ‘‘চিন্তা করবেন না বাবু, এ ভেসেলের নাড়িনক্ষত্র আমার চেনা৷ একটু টাইম দিন, ঠিক হয়ে যাবে৷’’

আমি বললাম, ‘‘চলো অনিল, আশপাশ একটু হেঁটে আসি৷ আসগর মিয়া যতই বলুক, আমার মনে হচ্ছে এ জিনিস ঠিক হতে টাইম নেবে৷’’

আসগর মাঝি একটা তক্তা পেতে দিল৷ সেটা বেয়ে আমি আর অনিল নেমে এলাম সেই নোনা আঘাটায়৷

আমরা চারিদিকে চেয়ে একটু অবাকই হলাম৷ সমুদ্রের ধার ঘেঁষে এত ঘন ঝাউবন চট করে চোখে পড়ে না৷ বোঝাই যাচ্ছে যে এদিকে লোকজন আসে না বললেই চলে৷

অনিল ঝাউবন, কেয়াঝোপ এসব ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল৷ আমি বললাম, ‘‘আরে কী করছ! ওর মধ্যে সাপখোপ কী আছে জানা নেই৷ কী দরকার যাওয়ার?’’

অনিল বলল, ‘‘এখন শীতকাল শুরু হয়েছে ভব৷ সাপখোপের ভয় নেই৷ আর তুমি শহুরে লোক, তোমাদের ওসবে ভয় থাকতে পারে৷ আমরা এই জলাবাদাড় এলাকার লোক, এসব নিয়েই আমাদের সংসার৷ এসবে আমাদের ভয় পেলে চলে?’’

কী আর করা? অগত্যা লোকটার পিছু নিতেই হল৷

* * *

ঝোপঝাড় ঠেলে মোটামুটি মিনিট দশেক হাঁটার পর জঙ্গল একটু পাতলা হয়েছে, একটা আশ্চর্য জিনিস নজরে এল৷ সেটা আর কিছুই না, একটা ভাঙাচোরা মন্দির৷ উচ্চতা বেশি নয়, দেড় মানুষ সমান হবে৷ তাই বাইরে থেকে নজরে আসেনি৷ মন্দিরটা পাথরের তৈরি, লাল রঙের পাথর৷ নোনা হাওয়ায় এমনিতেই বাড়িঘর খুব বেশি টেকে না৷ এরও তাই অবস্থা৷ চূড়া ভেঙে পড়েছে, দেওয়াল ধসে পড়ছে৷ বোঝাই যায় যে শেষের সেই দিনের আর বেশিদূরে নেই৷

অনিল ভুরু কুঁচকে বলল, ‘‘এখানে এই জঙ্গলের মধ্যে মন্দির? আশ্চর্য ব্যাপার তো!’’

আমি বললাম, ‘‘আশ্চর্যের কী আছে! এমন কত ভাঙাচোরা মন্দিরই ছড়িয়ে আছে বাংলার গাঁয়েগঞ্জে৷ এটাও সেরকম একটা কিছু হবে৷’’

অনিল মাথা নেড়ে বলল, ‘‘উঁহু, ব্যাপারটা এত সহজ নয় ভব৷ এই মোহনা, খাঁড়ি আর তার আশপাশের এলাকা, এর ইঞ্চি-ইঞ্চি আমাদের চেনা৷ আর দীঘা-মন্দারমণিতে আজকাল এত ট্যুরিস্ট আসে যে ফাঁকা জায়গা বিশেষ নেই বললেই চলে৷ আমাদের নজর এড়িয়ে এত পুরোনো একটা মন্দির এখানে রয়েছে আর আমরা লোকাল লোকজন তার খবর রাখি না? উঁহু, কিছু তো একটা গড়বড় আছে৷’’

বলতে বলতেই অনিল মন্দিরটার দিকে এগিয়ে গেল৷ আমিও গেলাম পেছন পেছন৷

গিয়ে দেখি মন্দিরটার হাল দূর থেকে যতটা ভেবেছিলাম তার থেকেও অনেক বেশি খারাপ৷ ঝুরঝুরে দেওয়ালে টোকা দিলে মনে হয় পাথর খসে যাবে, এরকম অবস্থা৷ দেখে মনে হয় কোনো অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহী, শেষ শীতের অপেক্ষায়৷ একটা ঝড় এলেই সব ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাবে৷

অনিলের ভুরু কোঁচকানো ভাবটা যায়নি৷ সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘‘আশ্চর্য, এ তো অবাক কাণ্ড!’’

বললাম, ‘‘আবার কী হল?’’

কিছু না, বলে মাটির দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল সে৷

দেখি মাটিতে এদিক-ওদিক ছড়ানো আছে কিছু কড়ি আর ধানের ছড়া৷ সবক’টাতেই সিঁদুর লাগানো৷ একটু খুঁজে-পেতে একটা কলাপাতা, শেষ হয়ে যাওয়া দুটো ধূপের কাঠি, একটা মাটির প্রদীপ, ছোটো ধুনুচি, এসবও খুঁজে পাওয়া গেল৷

এবার আমার ভুরু কুঁচকোনোর পালা, ‘‘মানে এখানে নিয়মিত পুজো হয়? এ তো সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার! এই নিরালা নির্জনে কে আসে পুজো দিতে?’’

অনিল এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘‘ব্যাপারটা আমার খুব একটা সুবিধের লাগছে না ভব৷ আর একটা জিনিস লক্ষ করেছ? এমন নয় যে নিয়মিত এখানে পুজো হত৷ রিসেন্টলি শুরু হয়েছে৷’’

কথাটা সত্যি৷ যেখানে নিয়মিত পুজো হয় তার একটা লক্ষণ থাকে৷ তেলসিঁদুর দিয়ে লেপা মূর্তি, প্রচুর পুরোনো প্রদীপ, একটা ঢিবির মতো জায়গা যেখানে ধূপকাঠি গোঁজা থাকে, বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধ, ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা ফুল-বেলপাতা এইসব৷ এখানে সেসব কিছুই নেই৷ এমনকি যে প্রদীপ আর ধুনুচি পড়ে আছে সেগুলোও রীতিমতো নতুন৷

অনিল বিড়বিড় করতে করতে বলল, ‘‘এই নির্জন জায়গায় এমন একটা ভাঙাচোরা মন্দির, সেখানে আবার পুজোর সামগ্রী… না বাপু, আমার ভালো ঠেকছে না৷ এখন ফেরা যাক, পরে না হয় লোকজন নিয়ে আসা যাবে৷ এতক্ষণে আসগর মাঝি নিশ্চয়ই স্টিয়ারিং সারিয়ে ফেলেছে৷’’

আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম৷ তোমরা তো জানো আমার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে৷ কোথাও কোনো অলৌকিক কিছু ঘটলে আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়তে ধরা পড়ে৷ আমার মন বলছিল এখানে তেমনই কিছু একটা ঘটছে৷ তবে সেই অনুভূতির প্রাবল্য বড়োই ক্ষীণ, পদ্মপাতায় বৃষ্টির ফোঁটা একবার পড়েই হারিয়ে যাওয়ার মতো৷

ফিরে আসতে আসতে একটা জিনিস দেখে থমকে গেলাম৷ মন্দিরের পেছনে, ঝাউবনের একটু ভেতরে কী একটা পোঁতা আছে না মাটির মধ্যে?

অনিলেরও চোখে পড়েছে সেটা৷ আমরা দু-জন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে৷

গিয়ে বোঝা গেল জিনিসটা কী৷ একটা নৌকার গলুই৷ নৌকাটার প্রায় পুরোটাই চাপা পড়েছে বালির তলায়৷ বালির ওপর শুধু গলুইয়ের মাথাটা জেগে আছে, সেটাই প্রায় এক মানুষ সমান৷

অনিল অস্ফুটে বলল, ‘‘সর্বনাশ!’’

বললাম, ‘‘কী হল?’’

‘‘যে নৌকার গলুই এত বড়ো, সে তো বিশাল বড়ো নৌকো, কম করে তিরিশ-চল্লিশ জনের ভেসেল৷’’

আমি প্রথমে বুঝলাম না এতে সর্বনাশের কী আছে! অনিলই ব্যাখ্যা করে বোঝাল৷

নৌকোর গলুই দেখে বোঝা যায় নৌকাটা কত বড়ো৷ এই যেমন অনিল বুঝেছে৷ কিন্তু গলুই দেখে এও বোঝা যাচ্ছে যে এ নৌকা হাল আমলের নয়৷ পুরোনো কালের, অনেক অনেক পুরোনো৷

জিজ্ঞেস করলাম কত পুরোনো?

আগেকার দিনে যেমন পালতোলা নৌকা ভেসে বেড়াত এই নদীতে, সাগরে, ঠিক তেমন৷

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘‘এতদিনের পুরোনো নৌকো এখানে পোঁতা আছে? আর এখনও ধসে-পচে যায়নি?’’

অনিল বলল, ‘‘সেটাই তো আশ্চর্যের! এত পুরোনো নৌকো এই নোনা জলে-হাওয়ায় টিঁকে থাকল কী করে?

বললাম, ‘‘তুমি শিওর যে নৌকাটা ওই পালতোলা যুগের নৌকা?’’

অনিল গলুইয়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘‘ডিজাইনটা দেখেছ? শুনেছি আমার ঠাকুরদারও বাপ-দাদাদের আমলে এমন নৌকো চলত৷ এ হাল আমলের জিনিস হতেই পারে না৷’’

কাছে গিয়ে দেখলাম গলুইয়ের সারা শরীর জুড়ে চিত্রবিচিত্র সব অলংকরণ খোদাই করা৷ আর তার কারুকার্য দেখে অবাক হতে হয়, এমনই নিখুঁত আর অসাধারণ সৌন্দর্য তার৷

তবে আমার মন কেড়ে নিল মাথার ঠিক দুইধারে দুটি হাতি৷ তারা শুঁড় তুলে কাকে যেন অভিবাদন জানাচ্ছে৷ তাদের শরীরের সুঠাম গঠন, দেহসৌষ্ঠব থেকে ঝরে পড়া ঔদ্ধত্য, সুউন্নত দাঁত দু-খানি, সবই এত জীবন্ত যে দেখে অবাক হতে হয়৷ এমন জীবন্ত ও মনোহর কাঠখোদাই জীবনে দেখিনি বললেই চলে৷

দূর থেকে আসগর মাঝির ডাক কানে এল৷ এবার আমাদের যেতে হবে৷

* * *

দিন দশেক পরের কথা৷ আড়তে ঢুকতে একটু দেরি হয়ে গেছিল৷ অফিস ঘরে ঢুকে দেখি পাত্রমশাইয়ের পাশে অনিল, আর টেবিলের উলটোদিকে আর একজন বসে৷ অনিল যে ভাব নিয়ে আগন্তুক ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে আছে, তাকে ভক্তি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না৷

আমি ঢুকতেই হইহই করে উঠলেন পাত্রমশাই, ‘‘এসো ভব, এসো৷ এতক্ষণ তোমার কথাই হচ্ছিল৷ এই দেখ মাখন, এই হচ্ছে ভবতারণ৷ আমার কাছে কাজ শিখছে এখন৷ জেদ ধরেছে তেলিয়াভোলা ধরতে যাবে৷ যেন তেলিয়াভোলা ধরা পুকুরে চার ফেলে সরপুঁটি ধরার মতো সহজ৷ কী অন্যায় আবদার বলো দেখিনি! আবার আমাদের অনিলের কাছে ট্রেনিংও নিচ্ছে সমুদ্রে যাওয়ার৷’’

লোকটা আমার দিকে ফিরল৷ কিছু কিছু লোক আছে, যার উপস্থিতিটাই একটা ঘোষণা৷ এই লোকটা সেইরকম৷ পাকানো আঁটোসাঁটো চেহারা, চওড়া কপাল, আর ঘোলাটে অথচ তীব্র চোখ৷ একবার দেখলেই মনে হয় লোকটি বড়ো সামান্য নয়৷

আমি হাত জোড় করে নমস্কার করে আমার নাম বললাম৷ লোকটিও প্রতিনমস্কার করে বলল, ‘‘আমার নাম মাখন, মাখন মাঝি৷’’

শুনে সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল৷ মাঝি পাড়ার লিভিং লিজেন্ড মাখন মাঝি আমার সামনে? সেই জেদি একরোখা লোকটা, যার হাতে নাকি ট্রলার কথা বলত, আর যে লোকটা নোনা বাতাস শুঁকে বলে দিতে পারত কোনদিকে কতদূর গেলে মাছের ঝাঁক পাওয়া যাবে, সেই লোকটা? জেলে পাড়ার সব উঠতি মাঝিদের কাছে হিরো একজনই, আইডল একজনই, মাখন মাঝি৷

আরও শুনেছি লোকটির বেপরোয়া একরোখা স্বভাবের কথা৷ মায়ের পুজো না করে সে ট্রলারে পা রাখত না৷ রগচটা মানুষ, বেশির ভাগ সময় পড়ে থাকত নেশা করে৷ কিন্তু ট্রলারে পা দিলেই যেন অন্য মানুষ৷ ট্রলার নিয়ে শিকারি হাঙরের মতো ধেয়ে যেত মাছের পালের দিকে৷ তার নির্দেশে জাল ফেললেই যেন কোন অনির্দেশ্য মন্ত্রবলে মাঝের ঝাঁক উঠে আসত সেই জাল বেয়ে৷ তারপর জলের যুদ্ধ জয় করে, সমুদ্রের নোনা বাতাস বুকে মেখে সে যখন বন্দরে ফিরত তখন সে আবার অন্য মানুষ৷ সবাই উৎসবে ভাসলেও সে চলে যেত নিজের ঘরে৷ আবার নেশা করত৷ শুধু গম্ভীর গলায় বলত, সবই মা চণ্ডীর কৃপা৷

পাত্রমশাই বললেন, ‘‘বুঝলে ভব, একটা সময় ছিল যখন আমাদের ট্রলার জলে গেলেই পেট ভরে মাছ আনত৷ ও যখন ছিল আমরা প্রায় বিশবার তেলেভোলা তুলেছি৷ ওর জন্যেই তো, বলতে নেই, আমাদের এত নামডাক৷ মাখনও তো কম টাকা কামায়নি৷ সেও গেল, যেন মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদও আমাদের ওপর থেকে চলে গেল৷

মাখন অল্প হেসে বলল, ‘‘অমন বলবেন না বাবু, আপনারা সাপোর্ট না দিলে মাখন মাঝি কি আর সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারত? যাক, ফের তাহলে জলে নামছি কবে?’’

আবার চমকাবার পালা৷ মাখন মাঝির বয়েস শুনেছি পঁয়ষট্টির কাছাকাছি৷ আড়ত ছেড়েছে বহুদিন৷ জমানো টাকা দিয়ে বালির ব্যাবসা করে এখন নাকি বেশ বড়োলোক সে৷ দুই ছেলেকেও সেই ব্যাবসায় লাগিয়েছে৷ সেই মাখন মাঝি এই বুড়ো বয়সে আবার সমুদ্রে যাবে মাছ ধরতে? কিন্তু কেন?

আমার দিকে চেয়ে পাত্রমশাই বোধহয় প্রশ্নটা বুঝতে পারলেন৷ একটু গম্ভীর হয়ে যা বললেন তা এইরকম :

মাখনের অবস্থা আগের থেকে অনেক পড়ে গেছে৷ দুই ছেলে বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে গেছে ব্যাবসার ভাগ নিয়ে৷ সেই শোকে মাখনের স্ত্রীও দেহ রেখেছেন বছরখানেক হল৷ এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মাখন মাঝির এখন প্রায় ভিখিরির অবস্থা৷ তাই মাখন চাইছে একবার শেষবারের মতো সমুদ্রে যেতে৷ তেলিয়াভোলা আনতে পারলে একটা বড়ো টাকা পাবে সে৷ সেই টাকা নিয়ে, স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু আছে সব বেচেবুচে দিয়ে মাখন চলে যেতে চায় তার গ্রামের বাড়ি৷ শেষ জীবনটা শান্তিতে সেখানেই কাটাতে চায় সে৷ এই যাত্রাই তার শেষ সমুদ্রযাত্রা, কর্মমুখর জীবন থেকে তার বিদায়সংগীত৷

অনিল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল৷ পাত্রবাবু তার আগেই বলে উঠলেন, ‘‘মাখন, তুমি যে আবার সমুদ্রে যাবে এ আমাদের কল্পনাতেও ছিল না৷ তুমি তৈরি হও৷ নতুন ভেসেল আছে, কামিন্সের ইঞ্জিন৷ অনিল আর ভব যাবে সঙ্গে৷ আর সঙ্গে জনা পাঁচেক ভালো জেলে দিয়ে দেব৷ ভব, তুমিও রেডি হয়ে নাও৷ এর থেকে বড়ো সুযোগ আর পাবে না৷

আমার নিজের কানকে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ আমার প্রথম সমুদ্রযাত্রা, আর সেটাও জেলে পাড়ার সাক্ষাৎ লিজেন্ডের সঙ্গে?

মাখন উঠে পড়ল৷ গম্ভীর গলায় বলল, ‘‘তাহলে ওই কথাই থাকল বাবু৷ পাঁচদিন পর অমাবস্যা, পাঁজিতে দেখেছি শুভযোগ আছে৷ ওইদিনই বেরোব৷ আমি আগের দিন চলে আসব এখানে৷’’

পাত্রমশাইও উঠে দাঁড়ালেন৷ বললেন, ‘‘এককালে আমাদের অনেক সেবা করেছ মাখন৷ আমারও কর্তব্য তোমার খারাপ সময়ে তোমার পাশে দাঁড়ানো৷ কথা দিচ্ছি, এবার যদি সেরকম তেলিয়াভোলা আনতে পারো, তাহলে একের তিন নয়, তুমি অর্ধেকই পাবে৷’’

মাখন মাঝি ছলছল চোখে পাত্রমশাইয়ের হাত চেপে ধরল৷ তার মুখে কথা জোগাল না৷ তারপর চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল সে৷

* * *

পরের কয়েকদিন মহা উৎসাহে হইহই করে কেটে গেল৷ আমাদের সঙ্গে যাবে এম ভি বিবেক৷ নতুন ইঞ্জিন, তবুও সব যন্ত্রপাতি চেক করে নেওয়া হল৷ বাইরের দিকটা রং করা হল এক প্রস্থ৷

যাত্রা শুরুর ঠিক আগের দিন একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল৷

আগেই দেখেছিলাম যে শংকরপুরের জাহাজঘাটার গেটের ঠিক বাইরে এক পাগলা বুড়ো বসে ভিক্ষা করে৷ আমি মাঝেমধ্যে ওদিকে গেলে বুড়োকে চা আর লেড়ো বিস্কুট খাওয়াতাম, তাতে বুড়ো ভারি খুশি হত আর আগড়ম-বাগড়ম কত কী যে বকে যেত তার ঠিকানা নেই৷ শুনেছিলাম বুড়োর নাকি এক ছেলে ছিল, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে মারা যায়৷ সেই থেকে বুড়োর মাথা খারাপ৷ জেলেদের দেখেছি ভেসেলে রসদ ভরার সময় বুড়োকে কিছু-না-কিছু দিতে৷ জিজ্ঞেস করতে অনিল বলেছিল, লোকটার নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করার স্বভাব আছে৷ আর তার কিছু কিছু হঠাৎ করে মিলেও যায়৷ তাই ভয়ে হোক বা ভক্তিতে হোক, জেলেরা বুড়োকে এটা-ওটা দিয়ে তুষ্ট রাখে৷

আগের দিন আমি আর মাখনকাকা জাহাজঘাটায় যাচ্ছিলাম তদারকি করতে৷ তদ্দিনে মাখন মাঝি আমার কাকা হয়ে উঠেছে৷ কাকার সঙ্গে রোজই বিভিন্ন মাছ ধরতে যাওয়ার অভিযানের গল্প শুনি৷ এই ক’দিনেই বুঝেছি লোকটা বাইরে রুখুশুখু হলে কী হবে, অন্তরে স্নেহ-ভালোবাসার অভাব নেই৷ আর ছেলেদের আলাদা হয়ে যাওয়াটাও যে লোকটাকে ভেতরে ভেতরে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে সেটাও বুঝতে পারতাম৷

আমরা জাহাজঘাটায় ঢুকতে যাব, এমন সময় হঠাৎ করে দেখি সেই বুড়ো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে৷ তাকে দেখে সেই বকবক করা পাগল বলে চেনা মুশকিল৷ তার চুলগুলো উশকোখুশকো, দু’চোখ লাল৷ হাড্ডিসার রোগা বুক জুড়ে জেগে উঠেছে শতসহস্র রাগি শিরা-উপশিরা৷

বুড়ো রাস্তা আটকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল ‘‘তোর লোভ এখনও যায়নি? এত খেয়েও শান্ত হলি না তুই? আয়, এবার আয় তুই৷ মা নিজেই তোকে টেনে এনেছে বুঝলি! তোর সব গেছে, আরও যাবে৷ সব যাবে, সব নষ্ট হবে…’’

মাখনকাকার বেশ কিছু অনুরাগী আশপাশেই ছিল৷ তারা তাড়াতাড়ি বুড়োকে সরিয়ে নিয়ে গেল৷ বুড়ো গেল বটে, তবে শাপমন্যি করতে করতে৷ মাখনকাকা কিছু বলল না, খানিকক্ষণ বুড়োর দিকে অপলক চোখে চেয়ে রইল৷ আমি বুড়োকে সামলাতে গেলাম৷ এসে দেখি মাখনকাকা নেই৷ কাউকে না বলে কোথায় যেন চলে গেছে৷

* * *

পরের দিন সব জিনিসপত্তর নিয়ে তৈরি হয়ে পৌঁছোতে পৌঁছোতে আমার বেশ দেরিই হয়ে গেল৷ গিয়ে দেখি জাহাজঘাটা জুড়ে হইহই রব৷ বাকিরা আগেই পাঁছে গেছিল৷ তারপর ঘাটের পাশে ঘট বসিয়ে সাড়ম্বরে মা চণ্ডীর পুজো করেছে মাখনকাকা৷ সবাই প্রসাদ পেয়েছে৷ প্রসাদের মধ্যে অন্যতম ছিল দেশি মদ৷ তার গন্ধে চারিদিক ভুরভুর করছে৷

এম ভি বিবেক নতুন ভেসেল৷ উঠে নিজের জায়গায় ছোটো হ্যান্ডব্যাগটা রেখেই খেয়াল হল একটা প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে ভুলে গেছি৷ ফের একবার ঘাটে নেমে এলাম৷ কাছেই মা শঙ্করী ফার্মেসি, চেনা দোকান৷ দোকানি ওষুধটা প্যাক করে বললেন, ‘‘এই প্রথমবার সমুদ্দুরে যাচ্ছ ভাই, মায়ের আশীর্বাদটা নিয়ে গেলে পারতে৷’’

 কথাটা মনে লাগল৷ তাই একবার পুজোর জায়গাটা দেখতে গেলাম৷ আর গিয়েই মনে হল আমার পা দুটো কে যেন মাটিতে আটকে দিয়েছে৷

ঘটের চারিপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সিঁদুর লাগানো কড়ি, ধানের ছড়া, শেষ হয়ে যাওয়া ধূপের কাঠি, নতুন মাটির প্রদীপ আর ছোটো ধুনুচি!

যখন ফের জাহাজে উঠলাম, তখনও বোধহয় আমার ভুরু কুঁচকে থাকবে৷ মাখনকাকা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী ব্যাপার ভব? কিছু নিয়ে চিন্তায় আছ মনে হচ্ছে? ভয় পাচ্ছ না তো?’’

মাখনকাকাকে আশ্বস্ত করতে করতেই দেখলাম ভেসেল নড়তে শুরু করেছে৷ মাঝিরা উল্লাসধ্বনি করে উঠল৷ আমি একবার মা ভবতারিণীর নাম নিয়ে হাত জোড় করে মাথায় ঠেকালাম৷

* * *

আমাদের ট্রলার জল কেটে এগোতে লাগল৷ স্টিয়ারিং-এ মাখনকাকা৷ বাকিরা কেউ ডেকের ওপর, কেউ-বা ইঞ্জিনঘরে ব্যস্ত৷

আস্তে আস্তে দেখলাম ট্রলার একটা সরু খাঁড়িতে ঢুকছে৷ এটা বোধহয় সমুদ্রে যাওয়ার চালু রুট নয়৷ কারণ বাকিদের দেখলাম মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে৷ দু-জন মাঝি এসে মাখনকাকাকে কী যেন একটা বলল৷ মাখনকাকা উত্তর দিতে তারা ফের নিজের কাজে চলে গেল৷

আমি মাখনকাকার কাছে গেলাম৷ অনিলও ছিল৷ সে বলল, ‘‘এটা কোন রুট ধরলে কাকা?’’

মাখনকাকা উত্তর দিল, ‘‘ তোরা আজকালকার ছেলে, এসব জায়গা চিনিস না৷ এ হচ্ছে আমার পয়া খাঁড়ি, বুঝলি৷ এককালে এই পথ দিয়েই লোকে সমুদ্রে যেত৷ তারপর নদীও বাঁক নিল, এই রাস্তাও লোকে ভুলে গেল৷

আমি দৈবাৎ এর খোঁজ পাই৷ তারপর যতবার এই রাস্তা দিয়ে গেছি,ততবার আমার ট্রলার কাঁড়ি কাঁড়ি মাছ নিয়ে ফিরেছে৷ এই আমার শেষ মাছ ধরতে যাওয়া৷ ভাবলাম তোদেরও খাঁড়িটা চিনিয়ে দিই৷ মায়ের কৃপা হলে তোরা একদিন মাখন মাঝির থেকেও ডবল ডবল মাছ আনবি৷’’

ট্রলার একটা জায়গায় আসতে মাখনকাকা ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলল৷ আস্তে আস্তে ইঞ্জিনের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল৷ চারিদিকে জলের শব্দ আর পাখিদের কলকাকলি৷ শনশন সমুদ্রের হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের কানের পাশ থেকে গড়িয়ে পড়া ঘামের ফোঁটা৷

আমাদের ভেসেলের গতি এখন প্রায় স্থির৷ মাখনকাকা দেখলাম ডানদিকে ঘুরে প্রণাম করল, বিড়বিড় করে মন্ত্রও পড়ল একটা৷ আমি আর অনিল ততক্ষণে স্ট্যাচু হয়ে গেছি৷

কারণ এতক্ষণে এই খাঁড়িটা আমরা চিনতে পেরেছি৷

আর মাখনকাকা যে আঘাটার দিকে ঘুরে প্রণাম করছেন সেটাও আমরা চিনি৷

মন্ত্র পড়া শেষ হলে কাকা প্রসন্নমুখে ইঞ্জিন চালানোর নির্দেশ দিলেন৷ আবার জল কেটে উদ্ধত রাজহাঁসের মতো ছুটতে লাগল এম ভি বিবেক৷

অনিল একবার জিজ্ঞেস করল, ‘‘কাকে প্রণাম করলে কাকা?’’

মাখনকাকা বলল, ‘‘মা চণ্ডীকে৷ আমার আরাধ্যা দেবী৷’’

‘‘কিন্তু এখানে?’’

‘‘এখন আঘাটা হলে কী হবে অনিল, এককালে এটাই ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো জাহাজঘাটা৷ শয়ে শয়ে নৌকা ছাড়ত এখান থেকে, আর কোথায় না কোথায় যেত, শ্রীলঙ্কা, চট্টগ্রাম, ভিয়েতনাম, বালি, মালয়েশিয়া!’’

‘‘এই ঘাটের কী নাম কাকা? কখনও শুনিনি তো এর ব্যাপারে!’’

‘‘এর নাম ছিল ধনাঘাট৷’’

‘‘ধনাঘাট?’’

‘‘হ্যাঁ, ধনপতির ঘাট৷’’

কে ধনপতি, আর তার নামে একটা আস্ত জাহাজঘাটার নাম কেন হয়েছিল সে আর জানা হল না৷ একটু পরেই আমরা সমুদ্রে গিয়ে পড়লাম৷

* * *

ভেসেল ছেড়েছে প্রায় ন’ ঘণ্টা হতে চলল৷ সারাদিনে ঘটার মতো কিছুই ঘটল না৷ তবে মাছ পাওয়া গেল প্রচুর৷ আমি শহরের ছেলে, এসবের অর্ধেক মাছ চোখেই দেখিনি কখনও৷ মাঝিদের মধ্যে বেশ একটা খুশির আবহাওয়া৷

আমি শুধু দেখছিলাম মাখনকাকাকে৷ এত সাবলীলভাবে, অনায়াসে ট্রলার চালাচ্ছিল মাখনকাকা যেন মনে হচ্ছিল অলস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিশাল অ্যালবাট্রস৷ আর এই সমুদ্র যেন হাতের তালুর মতো চেনা লোকটার৷ যেখানে গিয়ে জাল ফেলতে বলছে, সেখান থেকেই প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে৷ কোনো যন্ত্রপাতি নয়, কোনো আধুনিক প্রযুক্তি নয়, স্রেফ অসামান্য ইনট্যুইশন৷

দু-একবার লোকটার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম৷ লোকটা পাত্তা দিল না৷ ট্রলার সমুদ্রে গিয়ে পড়া ইস্তক লোকটা সেই যে মদ খাওয়া শুরু করেছে তার আর বিরাম নেই৷ অথচ স্টিয়ারিং-এর মুঠো এক মুহূর্তের জন্যও শিথিল হয়নি৷ শুধু মুখখানা গম্ভীর আর চোখের কোনা সামান্য লাল৷

সন্ধে হয়-হয়৷ তোমরা যদি কখনও সমুদ্রে যাও তাহলে দেখবে যে প্রথম দিকে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধটা সয়ে সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার পর সমুদ্র খুব শান্ত৷ আর সে ছিল ভারি মনোরম দিন৷ মাথার ওপর শীতের নির্মেঘ আকাশ৷ চারিদিকে সুনীল জলরাশি৷ ইঞ্জিনের গম্ভীর গুঞ্জন, ঢেউয়ের মৃদু উচ্ছ্বাস আর শনশন হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই৷ মাঝে মাঝে দূর থেকে দু-একটা অন্য ট্রলার দেখা যাচ্ছে৷

সন্ধের পর জেলেদের সঙ্গে বসে এটা-ওটা গল্প করতে করতে কেটে গেল৷ মাখনকাকা কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলছে না৷ মাঝে একবার-দু’বার দেখলাম ডেকের সামনে গিয়ে হাত কোমরে রেখে শূন্য দৃষ্টিতে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে৷

একটু পর কাকা আমাকে, অনিলকে আর জেলেদের সর্দারকে ডাকল৷ বলল, ‘‘এভাবে হবে না৷ এখানে অনেক ভেসেলের ভিড়৷ তেলেভোলা এখানে নেই৷ ওরা নিশ্চয়ই তাড়া খেয়ে দক্ষিণে গেছে আরও৷ কাল আরও দক্ষিণে যেতে হবে৷’’

হেড জেলের নাম আক্রাম৷ ষণ্ডাগুন্ডা গোছের চেহারা৷ সে মাথা চুলকে বলল ‘‘কিন্তু কাকা, ওরা তো শুনেছি পুবের দিকে বেশি যায়৷ দক্ষিণের সমুদ্র আরও উত্তাল হবে৷ এই ভেসেলে অতদূর যাওয়া কি ঠিক হবে?’

মাখনকাকা কথাটা শুনে একবার শুধু লাল-লাল চোখে আক্রমের দিকে চাইল৷ সেই দৃষ্টি দেখে আমাদের তো বটেই, আক্রমেরও প্রাণ উড়ে গেল বোধহয়৷ অত বড়ো ষণ্ডা লোকটা তখন পালাতে পারলে বাঁচে৷ মাখনকাকা ফের চলে গেল ইঞ্জিন রুমে স্টিয়ারিং ধরতে৷ আমি রাতের খাওয়া খেয়ে ঘুমোতে গেলাম৷

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড দুলুনিতে৷ উঠে দেখি দক্ষিণে অনেকটা চলে এসেছি৷ এদিকে সমুদ্র অত শান্ত নয়৷ বড়ো বড়ো ঢেউ উঠছে আর ভেসেলটা সাংঘাতিক ভাবে দুলে উঠছে৷ আমাদের ট্রলার এমনিতে বেশ শক্তিশালী হলেও এত দূরের যাত্রার জন্য নয়৷ মাঝিদের মধ্যে যে কানাকানি শুরু হয়েছে সেটাও নজর এড়াল না৷

পরের ছ’ঘণ্টা ধরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে এম ভি বিবেক চলল আরও দক্ষিণে৷ ততক্ষণে মাঝিদের কানাকানি প্রায় বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে৷ আমি আর অনিল তাদের বুঝিয়ে পারছি না৷ ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে অনিল ছুটে গেল মাখনকাকাকে ডেকে আনতে৷ সঙ্গে গেল আক্রাম, মাখনকাকা না থাকলে এই উত্তাল সমুদ্রে স্টিয়ারিং ধরতে একমাত্র ওই-ই ভরসা৷

মাখনকাকা এসে দাঁড়াল সবার মাঝে৷ ততক্ষণে তার চোখ পুরো লাল৷ চুল উশকোখুসশকো৷ পোশাক আলুথালু৷ চারিদিকে ভয়াল সমুদ্রগর্জনের মধ্যে সে এসে দাঁড়াল কালান্তক অশনির মতো৷ এসেই উদ্ধতস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কী হয়েছে? এত গোলমাল কীসের?’’

একজন নেতা গোছের জেলে বেশ উগ্রভাবে সামনে এসে বলল ‘‘এত তেলেভোলা-তেলেভোলা করে কী হবে কাকা? মাছ তো ভালোই উঠছে৷ এর পরেও এতদূর আসার কারণ কী? দেখছ তো সমুদ্রের অবস্থা৷ ভেসেল টানতে পারছে না৷ তোমার মাতলামি আর পাগলামির জন্যে সবাই বিপদে পড়বে নাকি?’’

মাখনকাকা কিছু বলল না৷ শরীরের ডানদিকটা সামান্য বেঁকিয়ে একটা ঘুসি মারল লোকটার চোয়ালে৷ লোকটা সামান্য উড়ে প্রায় ৬ ফিট দূরে ছিটকে পড়ল!

আমার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা ভয়ের স্রোত নেমে গেল৷ মাখনকাকার এই রূপ কি কেউ কখনও দেখেছে? চুলগুলো উড়ছে যেন আগুনের শিখা৷ চোখের মণি বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে৷ রগের শিরা ফুলে উঠেছে ক্রোধী কালসাপের মতো৷ লোকটা একটানে নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলল ফরফর করে৷ আমরা অবিশ্বাস্য চোখে দেখলাম ওই পঁয়ষট্টি বছরের বুড়োটার সারা শরীরে কিলবিল করছে পেশি৷ তারা ফুলে উঠেছে এই দক্ষিণ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, উন্মত্ত সর্বনাশের মতো, অহংকারী বাসুকির ফণার মতো৷ আমরা ভয়ার্ত আর বিহ্বল চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম৷

মাখনকাকা একটা অচেনা কাটা-কাটা গলায় বলল ‘‘এর পর যেন আর কারও বাঁদরামি না দেখি৷ নইলে গলা কেটে জলে ফেলে দেব৷ আর তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে এখানে হাঙর আছে৷’’

বাকি মাঝিরা চুপ৷ আমি আর অনিল চুপ৷

মাখনকাকা ইঞ্জিনরুমে যাবে বলে পেছন ফিরল৷ আর তক্ষুনি আমি আর অনিল আশ্চর্য হওয়ার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলাম৷

মাখনকাকার পিঠের সমস্তটা জুড়ে দুটো মস্ত উল্কি আঁকা৷ দুটো উদ্ধত, মদোন্মত্ত হাতির উল্কি৷ আর তাদের শুঁড়দুটো এসে মিলেছে কাকার ঠিক কাঁধের কাছে৷

ওই হাতির ছবি আমি চিনি৷ তাদের বলিষ্ঠ দেহভঙ্গিমা, উদ্ধত শুঁড়, সুউন্নত দাঁত, এসব আমরা দেখেছি৷ কয়েকদিন আগেই৷

অনিল কিছু বলার আগেই শুনলাম মেঘের গুরুগুরু৷ তাকিয়ে দেখলাম সারা আকাশ জুড়ে ঘনিয়ে এসেছে অসময়ের ঝোড়ো মেঘ৷ তার ভ্রূকুটি দেখে অতি বড়ো সাহসীরও বুক কেঁপে ওঠে, আমরা তো সাধারণ মানুষ!

ঝড়টা আছড়ে পড়ল দুপুর তিনটে নাগাদ৷ সারা আকাশ ঘন কালো হয়ে এসেছে৷ মুশলধারে বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে বজ্রপাত৷ মনে হচ্ছে যেন সর্বগ্রাসী হাহাকারের বুক চিরে দিচ্ছে শেষনাগের ক্রুদ্ধ ছোবল৷ সমুদ্রের জল ফুঁসে উঠেছে, অচেনা সর্বনাশের মতো৷ ঢেউয়ের মাথায় আমাদের ভেসেল এমন ভাবে দুলছে যেন মোচার খোলা৷ সমুদ্রের উন্মত্ত অনবরত ঢেউ ডেকের ওপর আছড়ে পড়ছে৷ সব কিছু ওলটপালট, তছনছ হয়ে গেছে৷ জাল রাখা যাচ্ছে না৷ জাল বাঁধার হুইলের স্ট্যান্ড থরথর করে কাঁপছে৷ একবার একটা দমকা হাওয়া ঝাপট মারতে ট্রলারের কেবিনের কাচগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠল৷

কিন্তু মাখনকাকার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ লোকটা যেন একা হাতে লড়াই করতে নেমেছে সাক্ষাৎ মহাপ্রলয়ের সঙ্গে৷ তার মুঠোয় ধরা স্টিয়ারিং হুইল আমদের ট্রলারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওই ভয়াবহ হাহাকারের দিকে৷

একটু পরে যেটা শুরু হল তাকে মহাপ্রলয় ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না৷ মনে হল কালো আকাশ আর তার নীচে আরও কুচকুচে কালো জলরাশির মধ্যে আমাদের ট্রলার যেন নিয়তির হাতের খেলনা মাত্র৷ মাখনকাকা আর আক্রম ছাড়া বাকিরা ভেসেলের পেটের ভেতর গিয়ে লুকিয়েছে৷ আমি সিঁড়ির ঠিক মুখটার কাছে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি৷

জানি মৃত্যু হয়তো সামনেই৷ আমার সারা শরীর ভিজে৷ শীতে আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছি৷ তবু বারবার কেন জানি না মনে হচ্ছে মরণের এই প্রলয়ংকারী রূপ না দেখে মরলে আমার শান্তি নেই৷

চোখের ডান কোণ দিয়ে দেখলাম একটা মস্ত পাহাড়ের মতো ঢেউ এগিয়ে আসছে আমাদের ট্রলারের দিকে৷ তার সর্বগ্রাসী সর্বনাশী হাঁ দেখে বুঝলাম এবার আর আমাদের নিস্তার নেই৷ আকাশের মেঘের স্তূপ তখন ঘনকালো ভ্রূকুটি মেলে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে৷ আর মনে হল তারা যেন কোনো একটা রূপ নেওয়ার চেষ্টা করছে৷ কীসের রূপ নিচ্ছে ওরা?

ভাবতে ভাবতেই দেখতে ঢেউটা আছড়ে পড়ল ট্রলারের ওপর৷ আর আমাদের ভেসেলটা জলে সম্পূর্ণ ডুব দিয়ে ভেসে উঠল৷ রেলিং থেকে আমার হাত ছিটকে যেতে যেতেও যায়নি৷ উঠে দেখলাম জালের হুইল ভেঙে পড়েছে আক্রামের মাথায়৷ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ বোঝার বাকি রইল না আমাদের ট্রলার আর মাখন মাঝির নিয়ন্ত্রণে নেই৷ বাকি জেলেরাও বোধহয় সবাই জ্ঞান হারিয়েছে৷ সলিল সমাধির হাত থেকে আর বোধ হয় নিস্তার নেই…

ঠিক এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলাম মাখন মাঝির পৈশাচিক চিৎকার৷ ঝড়ের হুংকার ছাপিয়ে পাগলের মতো অট্টহাসি হেসে উঠেছে সে, ‘‘ওই ওই! হা হা হা, জানতাম এখানেই আছে ওরা৷ ওই দেখ তেলেভোলার ঝাঁক৷ ঢেউয়ের ওপর কেমন নাচতে নাচতে যাচ্ছে দেখ৷ হুইল ধর আক্রম, হুইল ধর৷ আমি জাল ধরতে যাচ্ছি৷’’

বলতে বলতেই দেখলাম মাখন মাঝি দৌড়ে যাচ্ছে ভেসেলের মাথার দিকে, আর একটা ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল ডেকের ওপর৷ আর তারপরেই দেখলাম মাখনকাকা আর নেই!

অজ্ঞান হওয়ার আগে আকাশের দিকে চোখ গেল আমার৷ এবার বুঝতে পারলাম আকাশের মেঘের স্তূপ কীসের রূপ নেওয়ার চেষ্টা করছিল৷

দেখলাম সমগ্র আকাশ জুড়ে কোল পেতে বসেছে এক আশ্চর্য নারীমূর্তি৷ মেঘই তাঁর শরীর৷ মেঘই তাঁর কেশরাজি৷ আর দু’খানি চোখ যেন স্থিরবিদ্যুতে আঁকা৷ কী আশ্চর্য ভয়ংকর সুন্দর তাঁর অবয়ব! যেন এই সমস্ত বিশ্বচরাচর তাঁর কোলে আসন পেতে বসেছে৷ সৃষ্টি-স্থিতি-বিলয় সবই তাঁর ওই বদ্ধ জমাট কালো অবয়বের মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে৷

আর দেখলাম তাঁর দুই হাতে দুটি হাতি৷ তিনি একবার এক হাতিকে মুখে গিলে ফেলে উগরে দিচ্ছেন৷ আবার অন্য হাতে অন্য হাতিকে ধরে তাকে গিলে তাকেও উগরে দিচ্ছেন!

কতক্ষণ এই আদিম অলৌকিক দৃশ্য দেখতাম জানি না৷ আমার শরীরের সমস্ত শক্তি তখন নিঃশেষ প্রায়৷ চোখের সামনে মৃত্যুর ভারী পর্দা নেমে আসছে৷ সারা চৈতন্য জুড়ে মরণের পদধ্বনি৷ আমার চোখ বুজে নেমে এসেছে শেষের সেই অমোঘ ঘুম৷ আর সেই বুজে আসা চোখের সামনে আকাশ জুড়ে চলেছে সেই অনৈসর্গিক খেলা৷ চরাচর জুড়ে ব্যাপ্ত এক মোহময়ী মেঘরমণী তাঁর দুই হাতে ধরা দুই হাতিকে একবার গিলে ফেলছেন, আবার উগরে দিচ্ছেন৷

জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে ভেসেলের অন্যদিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম৷ যেটা দেখলাম সেটার থেকে অবিশ্বাস্য আর কিছু হতে পারে না৷ কোন অলৌকিক বলে আমাদের ভেসেলের পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছে এক অতিকায় পালতোলা নৌকো৷ যেন কোন অতি প্রাচীন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে সে৷ তার বিশাল গলুই থেকে অব্যর্থ হাতে ছোড়া কয়েকটা নোঙর দ্রুত এসে গেঁথে গেল আমাদের ভেসেলে৷ আর এক প্রবল হ্যাঁচকা টানে আমরা ফিরতে লাগলাম উত্তরের দিকে, ঝড়ের উলটো পথে!

আর সেই প্রাগৈতিহাসিক নৌকোর গলুইতে আঁকা দুটি হাতির ছবি বিদ্যুতের আলোতে ঝলসে উঠতেই জ্ঞান হারালাম আমি৷

তারপর আমার আর কিছু মনে নেই৷

* * *

পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর রোদের তাপে চোখ খুলে দেখলাম অনেকগুলো উদবিগ্ন মুখ ঝুঁকে আছে আমার ওপর৷ সবার আগে পাত্রমশাইকে দেখতে পেলাম৷ আমার চোখ খুলেছে দেখেই তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা প্রণাম ঠুকে দিলেন৷

ধীরে উঠে বসলাম৷ শরীরের অবস্থা আর কহতব্য নয়৷ জামাকাপড় ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই৷ পায়ের জুতো কোথায় গেছে কে জানে! সারা গায়ে বিষব্যথা৷ মাথার ডানদিকটা একদম অসাড় হয়ে আছে৷ বাঁ-হাতটা আর জীবনে কোনোদিন নাড়াতে পারব বলে মনে হচ্ছে না৷ মাথার ডানদিকে তীব্র যন্ত্রণা৷

আস্তে আস্তে ঘাড়টা নাড়ালাম, দেখলাম একটু দূরে একটা আঘাটায় নোঙর বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভেসেল৷ কে বলবে তার ওপর দিয়ে এত ঝড়ঝাপটা চলে গেছে? যে অবস্থায় তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেছিলাম, ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে তাকে৷ সূর্যের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে তার উদ্ধত মসৃণ দেহ৷ পলকাটা হিরের মতোই রোদের আলোয় ঝকঝকিয়ে উঠছে আমাদের এম ভি বিবেক, তেমনই বেদাগ, উজ্জ্বল, নিষ্কলুষ৷

সবাই ধরাধরি করে তুলল আমাকে৷ তখন মাথাটা পরিষ্কার হয়েছে সামান্য৷ জায়গাটা চিনতে পেরেছি৷ কেন জানি না মনে হল এখানেই আসার ছিল আমার, এই গল্পের শেষটুকু জানার জন্য৷

ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কাছেপিঠে কোনো মন্দির দেখলেন আপনারা?’’

পাত্রমশাই বোধহয় অন্য প্রশ্ন আশা করেছিলেন, যেমন আমি কোথায়, এখানে কীভাবে এলাম, সেসব৷ তার বদলে মন্দিরের খোঁজ করছি শুনে দৃশ্যতই অবাক হলেন৷ বললেন, ‘‘এখানে এসে দেখলাম একটা ছোটো মন্দির আছে বটে, কিন্তু সে তো দেখলাম মাটিতে মিশে গেছে একেবারে৷ কিন্তু কেন বলো তো?’’

উত্তর দিলাম না৷ তার বদলে পরের প্রশ্নটা করলাম, ‘‘আর একটু দূরে একটা মস্তবড়ো নৌকো বালিতে পোঁতা ছিল না?’’

সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল৷ পাত্রমশাই বললেন, ‘‘নৌকো? বালিতে পোঁতা? কই না তো! আমরা তো ট্রলারের জিপিএস সিগন্যাল খুঁজে খুঁজে এখানে এসে দেখি ভেসেল এখানে নোঙর করে আছে, তুমি বালিতে পড়ে আছ অজ্ঞান হয়ে, আর বাকিরা ট্রলারের মধ্যে৷ সবার ওই একই অবস্থা৷ সেই থেকে এক-এক করে তোমাদের জ্ঞান ফিরিয়ে আনছি আর হাসপাতালে পাঠাচ্ছি৷ এর মধ্যে গোটা এলাকাটা আমরা ঘুরেফিরে দেখে নিয়েছি৷ মন্দিরের কথা তো বললামই, তার আর দেখার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ এছাড়া আর কোনো কিছু, মানে ওই বালিতে পোঁতা নৌকা না কী একটা বললে, সেসব তো দেখিনি বাপু!’’

বললাম, ‘‘মন্দিরটা যে আর থাকবে না সেটা জানতাম৷ কাল রাতে অত ঝড়… ’’

পাত্রমশাই বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘‘ঝড়? কীসের ঝড়?’’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘‘সে কী? কাল যে অত বড়ো ঝড়টা হল? তাতেই তো আমাদের আর আমাদের ট্রলারের এই অবস্থা৷’’

পাত্রমশাই বললেন, ‘‘কোন অবস্থা?’’

‘‘সেই যে জালের হুইল স্ট্যান্ড ভেঙে…’’

বলতে বলতেই এম ভি বিবেকের ডেকের দিকে চোখ গেল৷ হুইল স্ট্যান্ড যেমন থাকার তেমনই আছে!

পাত্রমশাই কানে কানে বললেন, ‘‘যা দেখেছ সব ভুলে যাও ভব৷ কারণ তুমি আর তোমার সঙ্গীরাও এই একই কথা বললে কী হবে এই অঞ্চলে গত আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে কোনো ঝড় হয়নি৷ ফলে তোমরা কেন অজ্ঞান হয়ে গেলে, আর আমার ভেসেল এত মাছ নিয়ে কীভাবে এই আঘাটায় ভিড়ল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই কিন্তু৷’’

‘‘আর মাখনকাকা?’’

‘‘কোনো খোঁজ নেই গো’, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সৌমেন মহাপাত্র, ‘‘ লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷’’

আমার চোখে যেন ধাঁধা লেগে গেল৷ তাহলে কাল সন্ধেবেলা যা দেখলাম সবই ভুল? অত বিধ্বংসী ঝড়, অত সর্বগ্রাস দুর্বিপাক, আকাশে মেঘের মধ্যে ঘটা সেই অপার্থিব অলৌকিক দৃশ্যাবলি, সবই কি মিথ্যে?

উত্তরটা পেলাম কয়েকদিন পর৷

সেসব ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় গোটা একটা মাস৷ ততদিনে একটা বনদফতরে সরকারি চাকরির চিঠি পেয়ে গেছি, পোস্টিং নর্থ বেঙ্গল৷ পরের মাসে জয়েনিং৷ হাতে বেশ কিছু টাকাও এসেছে তখন৷ তার কারণ হচ্ছে আমাদের আনা ভেসেলে নাকি প্রায় পঞ্চাশটা তেলিয়াভোলা পাওয়া গেছিল৷ কী করে কেউ জানে না, কারণ আমরা কেউ আমাদের জালে তেলিয়াভোলা উঠতে দেখিনি৷

যে বিশালকায় নৌকা আমাদের ওই মহাবিপদ থেকে টেনে এনেছিল তার আর খোঁজ করতে যাইনি৷ কিছু রহস্য চাপা থাকাই ভালো৷ তবে গল্পের শেষটুকু শুনে এসেছিলাম শঙ্করপুরের জাহাজঘাটার সেই আধপাগলা বুড়োর কাছে৷

আজ থেকে বিশ বছর আগে সৌমেন মহাপাত্রর ভেসেল এম ভি বিজয় গেছিল এরকমই এক অভিযানে, তেলিয়াভোলা ধরতে৷ তারও ক্যাপ্টেন ছিল মাখন মাঝিই৷ তফাতের মধ্যে সময়টা ছিল এপ্রিলের শেষ, কালবৈশাখী- ঝড়ঝঞ্ঝার সময়৷ এবারের মতো সেবারেও মাখন মাঝির জেদে ট্রলার নিয়ে যাওয়া হয় গভীর সমুদ্রে, আর অবধারিতভাবে এম ভি বিজয় পড়ে উথালপাতাল ঝড়-জলের মধ্যে৷ প্রতিবাদ করেছিল একজন তরুণ মাঝি, এম ভি বিজয়ের মতো একটা মাঝারি মানের ট্রলারকে অত গভীর সমুদ্রে নিয়ে আসার জন্য৷ মদের নেশায় বেসামাল মাখন মাঝি একটি ঘুসিতে তার রগ ফাটিয়ে দেয়, ফলে ছেলেটি তৎক্ষণাৎ মারা যায়৷

‘‘ও আমার একমাত্র ছেলে ছিল বাবু, অন্ধের যষ্টি৷ ওই মাখনের লোভই তাকে শেষ করে দিল৷ দাহ করার জন্য দেহটা অবধি পাইনি জানেন৷ মাখন পয়সা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল৷ সেই শোকে আমার পরিবার গেল, সংসার গেল, সব গেল৷ এখন আপনাদের কাছে হাত পেতে ভিক্ষে করে এই বুড়োর পেট চলে৷ বলুন, এই কি আমার প্রাপ্য ছিল?’’

বুড়োকে জবাব দিতে পারিনি বটে৷ তবে কথাটা পাত্রমশাইয়ের কাছে তুলেছিলাম৷ তিনি বিষণ্ণমুখে কথাটা স্বীকার করলেন, ‘‘বড়ো পাপ করেছিল মাখন, খুব বড়ো পাপ৷ নিজের লোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে অন্যের প্রাণ নিয়েছিল৷ এ পাপের ক্ষমা নেই ভব৷’’

‘‘কিন্তু মাখনকাকা তো মা চণ্ডীর বড়ো ভক্ত ছিল সৌমেনদা!’’

প্রশ্নটা বোধহয় বোকার মতোই করে ফেলেছিলাম৷ শুনে পাত্রমশাই ম্লান হেসে বললেন, ‘‘অমন ভয়ংকর পাপ কি আর দুটো পুজোমন্তরে ধুয়ে যায় বাবা? তিনি সবার মা৷ তিনি সব দেখেন, সব শোনেন, সব জানেন৷ বুড়ো যত কেঁদেছে, যত কষ্ট পেয়েছে, সেসব গেছে তাঁর কানে৷ যখন তিনি নিজেই পাপীর শাস্তিবিধান করেন, তখন তাঁর মার থেকে কারও নিস্তার নেই ভব৷ মা নিজেই ডেকে এনেছিলেন মাখনকে৷ তার শেষ শাস্তি সে পেয়ে গেল৷’’

এই বলে উঠে পড়লেন পাত্রমশাই৷ আমিও নিজের বাড়ির রাস্তা ধরলাম৷

* * *

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *