তিমির প্রেম – ১০

দশ

অবশেষে খোকাও সঙ্গিনী খুঁজে পেল। আফ্রিকার গিনি উপসাগরের উত্তরে, প্রায় বিষুববৃত্তের কাছাকাছি।

মার্চ মাস। ফাগুন তখন শেষ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ হলে বলা যেত, তখন পলাশ ফুটেছে। লালে-লাল হয়ে গেছে কৃষ্ণচূড়া। গাছে গাছে কোকিল খুঁজছে তার সঙ্গিনীকে! ধান-শালিকের মধুর কিচির-মিচির মনে রঙ ধরায়। কিন্তু মধ্য আটলান্টিকে সে ফাগুনের কোন ছায়া পড়েনি, পড়ে না। তবু বসন্ত তো বসন্তই!

দক্ষিণ মেরুর বাৎসরিক ক্রিল মেলায় ভোজন শেষ করেই বিষুব অঞ্চলে এসেছে খোকা। এখন তার রাবার পুরু। তিন-চার মাস এই বিষুব অঞ্চলের উষ্ণ আবেশে খেয়াল খুশিমতো কাটিয়ে যাবার ইচ্ছে। প্রতি বছরই তাই যায়, কিন্তু এবারে নতুনত্ব আছে। তার নিঃসঙ্গ জীবনে লেগেছে প্রথম প্রেমের ছোঁয়া। নবীন সাথীর সঙ্গে কয় মাস চুটিয়ে প্রেম করবে। মহা আনন্দে কাটাবে। কিন্তু তাকে হতাশ করল তিমিনী। সাত দিন যেতে না যেতেই কেমন যেন উদাসী হয়ে ওঠে। শ্বাস নিতে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোঁজে। একদিন বলল, ‘সময় হয়েছে, চলো যাই।’

অবাক হয়ে যায় তরুণ তিমি, ‘কোথায়?’

‘কোথায় আবার! ক্রিল মেলায়!’

‘এখন, এই অসময়ে? এখন তো সব বরফে ঢাকা!’

‘অসময় দেখলে কোথায়? এটাই তো সময়। এখুনি রওনা না হলে সময় মতো পৌঁছতে পারব না। দূর তো অনেক!’

একজনের জন্ম উত্তর গোলার্ধে, অন্যজনের দক্ষিণে। দুজনের ক্রিল খেতে যাবার সময় আলাদা। তাই কারও কথা কেউ বুঝতে পারছে।

দল বেঁধে উত্তরে চলেছে অনেক ডানা তিমি। লক্ষ্য, উত্তর মেরুবলয়। তাদের যেতে দেখে দলে যোগ দেয়ার জন্যে আবার চাপাচাপি শুরু করল তিমিনী। খোকাকে ছেড়ে যেতে পারছে না সে, মন চাইছে না, কিন্তু না গিয়েও যে উপায় নেই। পেটে তার দারুণ খিদে। অথচ খোকার ব্লাবার পুরু, খাওয়ার দরকারই নেই। তাই দুজনের মতে মিলছে না। এদিকে প্রেম হয়ে গেছে, ছেড়েও দিতে পারছে না একে অন্যকে।

খোকা ভাবছে, উত্তরে গেলেও তো এখন কিছুই খেতে পারবে না। পেট যে ভরা। তারপর ওখান থেকে ফিরে আসতে আসতে দক্ষিণের মেলাও ফুরাবে। মারা পড়বে যে!

প্রেম মানুষকে দিয়ে অনেক অসাধ্য সাধন করায়। প্রেমের সে ক্ষমতা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানবেতর প্রাণীও স্বভাব বদল করে অনেক সময়। আর তিমির সঙ্গে তো মানুষের অনেকটাই মিল।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল খোকা। আগে যা কখনও করেনি কোন তিমি, প্রেমের তাড়নায় তা-ই করল সে। স্বভাবকে অতিক্রম করে অদৃষ্টকে মেনে নিল। বিয়ে করল। গোলার্ধ বদল করল তারপর। দুজনেই সিদ্ধান্ত নিল, এরপর দরকার পড়লে উত্তর থেকে দক্ষিণে আবার ফিরে আসবে ওরা, ফিরে যাবে দক্ষিণ থেকে উত্তরে।

আর অর্ধেক পৃথিবী নয়, পুরো পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াবে ওরা। খাবারের তাগিদে, বেঁচে থাকার তাগিদে, প্রজননের তাগিদে। পুরানোকে ভেঙে ফেলবে, জন্ম দেবে নতুনের, নইলে যে টিকবে না ওরা আর বেশি দিন, চিরতরে মুছে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে।

.

এই পর্যন্ত বলে থামল বাৰ্ট চাচা।

তন্ময় হয়ে শুনছিল ডগলাস, অশ্রুর ধারা নেমেছে তার দুগাল বেয়ে। গল্প শেষ হলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে লক্ষ করে দেখল, পুবের আকাশে ধূসর আলোর আভাস। সারাটা রাত যেন স্বপ্নের ঘোরে কেটে গেছে। শীতটা টের পাচ্ছে এখন। হিম পড়ছে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার।

হ্রদের মাঝখানে ডুবছে-ভাসছে তিমিনী। সাউথ চ্যানেলের ওপারে সাগরে ক্রমাগত পাক খাচ্ছে এখন খোকা।

সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল বার্ট চাচা, ‘চল ডগ, বাড়ি যাই।’

বিশাল এক হাই তুলে উঠে দাঁড়াল ডগলাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *