কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান
কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান
প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – সুবিনয় দাস
.
সিনাপুকে—
যে আমাকে আলুভাজা খাওয়াবে বলেও খাওয়ায়নি,
আর,
মাটির তলায় ঘুমিয়ে থাকা কালো বিড়াল জামকে—
যার জন্য একটা রাত জাগতে হয়েছিল…
.
ভূমিকা
আগের বছর বইমেলায় সই নিতে এসে এক ভদ্রমহিলা আমাকে পাকড়াও করে বলেছিলেন, ‘আপনার ভূমিকায় তো হেব্বি খিল্লি টিল্লি থাকে, বইতে এত বীভৎস রস কেন?’ সেকালে ‘বীভৎস রস’ বলতে ‘প্রচুর রস’ গোছের কিছু একটা বুঝতাম। তো আনন্দিত হয়ে তাকে বলেছিলাম, ‘আমি মানুষটাই আসলে বীভৎস রসে ভর্তি!’ মহিলা আমার হাতে উদ্যত পেনের দিকে চেয়ে পত্রপাঠ বইপত্র গুছিয়ে সরে পড়তে পড়তে বলেছিলেন, ‘ইয়ে…আমার হাসব্যান্ড আবার বইতে কালির দাগ-টাগ…’
তো বাড়ি এসে সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম যে বইয়ের ভিতরে যত খুনখারাবি, রক্তারক্তি, আতঙ্কের ঝাঁকানাকা থাকবে—ভূমিকায় ফাজলামি করে লেখককে তত নিজেকে স্টিফেন কিং আর লায়ন কিং-এর মধ্যে ব্যালান্স করতে হবে।
সত্যি বলতে ভূমিকা লেখা হয় ওই কারণেই। ব্যাটম্যানকে দিনে প্লে-বয় সেজে থাকতে হয়, ক্লার্ক কেন্টকে বড়জ্যাঠা মার্কা চশমা পরতে হয়, সলমান খানকে বুকে বিইং হিউম্যান ছাপতে হয়, আর লেখককে ভূমিকা লিখতে হয়।
তো এই তত্ত্ব অনুযায়ী এই উপন্যাসের ভূমিকায় দু’একটা চুটকি ফুটকি না লিখলেই চলছে না।
ডাইনি!
হ্যাঁ, এর থেকে বড় চুটকি পৃথিবীর ইতিহাসে কমই লেখা হয়েছে। ভয়ঙ্কর চুটকি! কেন, কী বেত্তান্ত তা বইতেই লেখা আছে। তবে কী জানেন, আসলে এ উপন্যাস ডাইনি নিয়ে লেখা না। এ আমাদের এক আভ্যন্তরীণ খোঁজের গল্প। কীসের খোঁজ তা বলা মুশকিল। সবসময় আমরা কী খুঁজছি আমরা নিজেরাই কি বুঝতে পারি?
কেবল কিছু একটা হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়। আপনি কোনওদিন স্কুলের শেষ দিনে চকের গুঁড়োয় সাদা হয়ে যাওয়া ব্ল্যাকবোর্ডকে জড়িয়ে কাঁদেননি? খেলার মাঠের কচি ঘাস, কাটাকুটিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে হারিয়ে যেতে চাওয়া রাফখাতার পেছনের পাতা, বুকের মাঝে ছোট্ট কুটিরে ঘুমিয়ে পড়া কিশোরীকে জড়িয়ে ধরে বলেননি, ‘তোরা কেউ হারিয়ে যাস না, আমি এখানেই থেকে যেতে চাই?’
সেদিন ঠিক কী হারিয়ে যাচ্ছিল বলুন তো? নাকি আমরাই হারিয়ে গেছি? তাদের খোঁজ করেছি ভুল জায়গায়। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে একদিন দেখেছি সময় শেষ হয়ে এসেছে। সেদিন আমাদের চিতায় তুলতে হয়েছে জননীকে, ছোটবেলাকে, রঙ পেনসিলকে, আদরের আঁচলকে, হঠাৎ ভোরে কুড়িয়ে পাওয়া শিউলি ফুলকে…
তাদের নিভে আসা চিতার পাশে শুয়ে নোনাজল আর ছাই মেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছি আমরা। আর আমাদের অজান্তেই কোনও অচিন বাউল দোতারা হাতে সেই চিতার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে সন্ধ্যার ঘন কুয়াশার দিকে—
মন তুই রইলি খাঁচার আসে,
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশের।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে,
ফকির লালন কেঁদে কয়,
খাঁচা খুলে সে পাখি কোনখানে পালায়।
আচ্ছা, এই কুয়াশার মধ্যে কী আছে বলুন তো? ভয়? রাক্ষস? উঁহু, হারিয়ে যেতে চাওয়ার ইচ্ছা। যারা সত্যিকারের কুয়াশায় মিশে যেতে পারে তাদের জন্য অচিন কিশোরী রেখে যায় কুয়াশার ফুল। আমাদের সব অজানা হারিয়ে ফেলার খোঁজ!
আমাকে এই বই লিখতে সাহায্য করেছে আমার বিছানা থেকে না উঠতে চাওয়া, বেকারত্ব, ‘কিছু তো করে খেতে হবে’ গোছের মুখঝামটা এবং গুগল ভয়েজ টাইপিং। যে সহৃদয় ব্যক্তি ভুজুংভাজুং করে ক’দিনের জন্য আমার নেটফ্লিক্স অ্যাকাউন্ট গেঁড়িয়ে দিয়েছিল তাকেও ‘বন্দেগি জনাব’!
যে পাঠকগণ আগের চারটে বইয়ের পরেও আমার পাঁচনম্বর বইটা কিনছেন তাদের মতো বাজে খরচের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় একদিন পৌঁছাব এই আশা রাখি। শুধু একটাই অনুরোধ—যাদের প্রজ্ঞাপারমিতা, যাজ্ঞসেনী, কিংবা গবাক্ষবন্ধু গোছের নাম, তারা কোথাও লেখকের সই নিতে হলে এবং লেখকের ‘বীভৎস রস’ বা ‘বীভৎস বানানবোধ’ চাক্ষুষ করতে না চাইলে দয়া করে ডাকনামটা বলবেন।
এই বইয়ের প্রোডাকশন নিয়ে কোন কুরুক্ষেত্র চলেছে তা এষাদি, অনিন্দিতাদি আর সুবিনয়দা জানে। আমি কেবল আড়াল থেকে ভয়ানক তলোয়ার ঠোকাঠুকি আর হাঁকডাক শুনতে পেয়েছি। শেষপর্যন্ত এ জিনিসটা বইমেলায় আপনার আঙুল ছুঁতে পেরেছে সেটা ওঁরা না থাকলে সম্ভব হত না।
আর যাদের আঙুল ছুঁল, আই মিন, প্রিয় পাঠক, জানেন তো—আপনার আমার জীবন কেবল হারিয়ে ফেলার খেলা। চলুন, আজ বাজি পালটে দেওয়া যাক, শুরু হোক এক হারিয়ে যাওয়ার খেলা। ঘন কুয়াশায় হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যাব আমরা। খুঁজে পাব কেবল গন্ধহীন, বিবর্ণ এক কুয়াশার ফুল…
সায়ক আমান






please provide access
Please ‘Log In to Enroll.’
Kajal Bhattacharya r book chai
Novels
Ok
Thank you