কুকুর – ডা. রেজা আহমদ

কুকুর

কিছুদিন যাবৎ লক্ষ করছি, রাকিব সাহেবের বাসার লাইট সারারাত জ্বালানো থাকে। আমরা দু’জন একটি আবাসিক এলাকায় থাকি। খুব ছিমছাম সারিবদ্ধভাবে সাজানো ফ্ল্যাটবাড়ি। আমি আর রাকিব সাহেব দু’নম্বর বিল্ডিঙের চারতলায় পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাটে থাকি।

আমার ফ্যামিলি থাকে ঢাকায়। মাসে দুয়েকদিনের জন্য আসে। আর রাকিব সাহেবের ফ্যামিলি থাকে আমেরিকায়। বছরে দুয়েকদিনের জন্য আসে।

চাকরির প্রয়োজনে আমাদের দু’জনেরই জীবন-যাপন প্রায় একইরকম। কাজে ডুবে থেকে নিঃসঙ্গতা ভুলে থাকার চেষ্টা আমাদের অবিরত। কিন্তু, ক’দিন হলো রাকিব সাহেব বোধহয় ঠিকমত ঘুমাতে পারছেন না।

সাধারণত, কারও ব্যক্তিগত জীবনে আমি হস্তক্ষেপ করি না। তবুও কৌতূহলবশত একদিন বিকেলে চায়ের স্টলে ওঁকে দেখতে পেয়ে বলেই ফেললাম, ‘রাকিব সাহেব, কী ব্যাপার! আপনার কি রাতে ঘুম হচ্ছে না?’

তিনি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। বললেন, ‘খুব সমস্যায় পড়ে গেছি, ভাই। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।’

বললাম, ‘সমস্যা সমাধানের জন্যেই তো বন্ধুরা আছে। অবশ্য যদি আমাকে আপনার বন্ধু বলে বিবেচনা করেন।

তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। তা হলে, আজ রাতে কাজ শেষে আমার বাসায় চলে আসেন।’

আমাদের অফিস ছুটি হয় রাত ন’টায়। ওজন কমানোর জন্য আমি আর রাকিব সাহেব দু’জনেই রাতের খাবার খাই না। তাই, অফিস ছুটি হওয়ামাত্র আমরা বাসার পথ ধরলাম। আমাদের এই আবাসিক প্রকল্পটি যমুনা নদীর পাড়ে। নদীতে বাঁধ দিয়ে গড়ে তোলা। চারদিকে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত। বেশ কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড রাতে পাহারা দেয়। মাঝে-মাঝে রাস্তায় গুইসাপ দেখা যায়। তারা নিরীহ প্রাণী। তবে, কুকুরের খুব উপদ্রব। সারারাত তারা চিৎকার করে।

যাই হোক, আমরা দু’জন নিঃশব্দে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি। রাস্তার দু’ধারে কাঠবাদামের গাছ। আজ পূর্ণিমার রাত। চাঁদের আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে গায়ে এসে পড়ছে। অদ্ভুত মৌন সুন্দর পরিবেশ।

কিছুক্ষণ পরেই আমরা বাড়ি পৌঁছে গেলাম। খুব গরম পড়েছে। তাই, রাকিব সাহেবকে বললাম, ‘আপনি কাপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে ছাদে চলে আসুন। সেখানেই আড্ডা দেয়া যাবে। আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।’

ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে দু’কাপ লাল চা বানিয়ে ছাদে চলে এলাম। দেখি রাকিব সাহেব রেলিঙে ভর দিয়ে যমুনার দিকে তাকিয়ে আছেন। চাঁদের আলো পড়ে যমুনা নদী অপার্থিব সৌন্দর্য লাভ করেছে। আমাদের ফ্ল্যাটের ছাদটা মোজাইক করা। নিঃশব্দে চা খেয়ে আমরা মেঝেতে বসে পড়লাম।

‘এবার বলুন, রাকিব সাহেব, কী ব্যাপার!’

তিনি এখনও ইতস্তত করছেন। মাথার উপর থালার মত চাঁদ। অদূরে যমুনা। রাতের গুমট ভাবটা কেটে গিয়ে এখন শীতল হাওয়া বইছে। এসময় গলা খাঁকারি দিয়ে রাকিব সাহেব বলা আরম্ভ করলেন।

‘কুকুর জিনিসটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। ছোটবেলা থেকেই কুকুরে আমার অ্যালার্জি। আমার স্কুলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রবিন। সে বলত, ‘কুত্তা দেখলে প্রথমে একটা লাথি মারবি। তারপর দিবি দৌড়।’

‘সে অবলীলায় কুকুর দেখলেই লাথি মেরে দৌড় দিত। আমি তার সাথে থাকায় আমিও দৌড়াতাম। কিন্তু, আমি কখনও লাথি মারিনি। একবার একটা কুকুর আমার অজান্তে গা ঘেঁষে বসেছিল। তাতে আমার পুরো শরীর রি-রি করে উঠেছিল। একজন মানুষ কীভাবে কুকুরের সাথে খেলা করে, আদর করে, আমি ভেবে পাই না। আমার ছোটবেলার সেই বন্ধু রবিন, ক্লাস নাইনে উঠে একই কাজ করতে গিয়ে কুকুরের কামড় খেল। কিন্তু, ২২টা ইঞ্জেকশন নিতে হবে এই ভয়ে বাসার কাউকে জানাল না।

‘ফলে সপ্তাখানেক পর তার জলাতঙ্ক দেখা দিল। তাকে তখন ঘরে আটকে রাখা হত। পশুর মত গোঙাত। প্রায় নয় দিন নরক যন্ত্রণা ভোগ করে সে মারা যায়।

‘এ ঘটনার পর থেকে কুকুরের প্রতি ঘৃণা আমার আরও বেড়ে যায়।

‘ভার্সিটিতে পড়ার সময় একটা মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু, যখন শুনলাম সে কুকুর পালে তখনই আমার সব উৎসাহ উবে গেল।

‘আমি বোধহয় খুব বেশি কথা বলছি।’

বললাম, ‘না, রাকিব সাহেব। বলে যান। শুনতে ভালই লাগছে।’

‘আচ্ছা। শুনুন তা হলে। এবার ঈদের ছুটিতে আপনারা সবাই যখন চলে গেলেন তখন আমি একলা হয়ে গেলাম। এদেশে কারও বাড়িতে গিয়ে কথা বলবার কিংবা থাকার মত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমার নেই। গ্রামে আমার কিছু জায়গা- জমি আছে। একজন কেয়ারটেকার সেগুলো দেখাশোনা করে। তাই ভাবলাম এবার এখানেই ঈদের ছুটিটা কাটাই। তাই রয়ে গেলাম। পুরো ফ্ল্যাটে আমি একা। সকালে আলসেমি করে উঠতে আমার দেরি হয়ে যায়।

‘ডাইনিংও বন্ধ ছিল। তাই বাইরে খেতাম। এজন্যে প্রতিদিন হাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বের হতাম। নাস্তা করে যমুনার পাড়ে হাওয়া খেয়ে দুপুরে ভূরিভোজ সেরে একবারে ঘরে ফিরতাম। এমনই একদিন দুপুর বেলায় ফ্ল্যাটে ফিরে আসছিলাম। ঢোকার মুখে হঠাৎ দেখি সিঁড়িরুমের নিচে অন্ধকারে একটা কুচকুচে কালো কুকুর গুটিসুটি মেরে বসে আছে। কুকুরটার চোখদুটো লাল। দেখে মনে হলো জ্বরে কাঁপছে। আমাকে দেখে ধীরে-ধীরে সেটা উঠে দাঁড়াল। দেখি তার মুখের ডানদিকে একটা দগদগে ঘা। এবড়োখেবড়ো টিউমারের মত ফুলে আছে। ডানদিকের দাঁতের মাড়ী থেকে ডান চোখ পর্যন্ত। তা থেকে জায়গায় – জায়গায় ফেটে পুঁজ বেরিয়ে আসছে। আর অন্যসব কুকুরের মতই সেটা জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে।

‘মনে পড়ল, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে কাফিরদের দুনিয়াদারীর প্রতি উৎকণ্ঠাকে কুকুরের সাথে তুলনা করে বলেছেন, তাদের অবস্থা কুকুরের মত। যখন পরিশ্রম করে তখনও হাঁপায়, যখন বিশ্রাম নেয় তখনও হাঁপায়।

‘আমার খুব ঘেন্না আর খানিকটা ভয় লাগছিল। কোনমতে আল্লাহ-আল্লাহ করে দেয়ালের দিকে চেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম।

‘সেদিন বিকেলে আর বের হলাম না। রাতে খাবার খাই না। আর, একা- একা ভাল লাগছিল না। প্রচণ্ড গরম। তাই ভাবলাম ছাদে গিয়ে একটু হাওয়া খেয়ে আসি। ছাদে আলো নেই। সিঁড়ির বাল্বও নষ্ট। তাই দরজা খুলে রেখে ছাদে চলে গেলাম। ছাদে মোবাইলের নেটওয়ার্ক ভাল পাওয়া যায়। তাই, আমেরিকায় ফোন দিয়ে বউ আর ছেলের সাথে কথা বলে ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দিলাম। এরপর বেডরুমের টেবিলে ল্যাম্পটা অন করে চেয়ারটা টেনে বসেছি, আর কী বলব! ছিটকে উঠে এলাম। দেখি সেই নোংরা কুকুরটা টেবিলের নিচে বসে হাঁপাচ্ছে। চোখদুটো অপ্রকৃতিস্থ।

‘আমি দ্রুত পাশের রুমে গেলাম। আমার একটা স্কিপিং-এর দড়ি আছে। সেটাতে Lasso knot, মানে গরুর গলার দড়িতে যে গিঁট দেয় বা ফাঁসির গিট্টু যা-ই বলেন, সেই গিঁট দিয়ে কুকুরটার মাথার দিকে ছুঁড়লাম। মাথা উপরের দিকে তুলল কুকুরটা আর রশিটা মাথা গলে ঘাড়ে এঁটে গেল।

‘তখনই কুকুরটা রশি ছাড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। তবে এ নট বা গিঁট যতই টানা হয় ততই শক্ত হয়ে এঁটে বসে। তাই, সে তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। আমি কুকুরটাকে টেনে ড্রয়িংরুমের দরজার কাছে আনলাম।

‘আমার মাথায় তখন খুনের নেশা চেপেছে। আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কুকুরের কামড়ে মারা গেল আর এখন তার এক জাতভাই এসেছে আমাকে কামড়াতে। আমি এটাকে ছাড়ব না।

‘বাইরের দরজাটা খুলে দড়িটা দরজার উপর গলিয়ে দিয়ে কুকুরটাকে টেনে উপরে তুলে ফেললাম। আর কুকুরটা ছটফট করতে লাগল। তারপর দরজাটা চাপিয়ে দিলাম যাতে দড়িটা পিছলে বেরিয়ে না পড়ে। মিনিট পাঁচেক পর সেটার ছটফটানি থেমে গেল। তারপর মরা কুকুরটাকে দড়ি ধরে ছেঁচড়ে নিচে নিয়ে এলাম।

‘ফ্ল্যাটের পেছনে অনেক আগাছার জঙ্গল। সেখানে লাশটা ফেলে এলাম। ভাবলাম, কাল সকালে গার্ডকে বলে দেব দূরে কোথাও ফেলে আসতে।

‘বাসায় ফিরে গোসল সেরে দেখি রাত প্রায় দুটো বাজে। এসময়টায় এখানকার সব কুকুর একসাথে ডেকে ওঠে। কিন্তু আজ রাতে একটা কুকুরও ডাকল না। যাক, বাবা, বাঁচা গেল। আমি আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। ফেসবুক ব্রাউজ করছি আর থেকে-থেকে বারবার কুকুরটার কথা মনে পড়ছে। কিছুতেই ওটার চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না। হঠাৎ আমার ডান পায়ে খুব নরম আঠাল কিছুর স্পর্শ টের পেলাম। আমার চেয়ারটা পেছনে ঠেলে টেবিলের নিচে তাকিয়ে দেখি সেই কুকুরটা বসে আছে।

‘বিকট চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালাম। এরপর চোখ মেলে দেখি ঝকঝকে দিনের আলো। আমি মেঝেতে শুয়ে আছি। দ্রুত উঠে কোন রকমে হাতমুখ ধুয়ে নিচে নেমে এলাম। কিন্তু রাতে যেখানে কুকুরটাকে ফেলেছি সেখানটায় কিছু নেই। আমার সেই Skipping-এর দড়িটাও নেই। গার্ডদের জিজ্ঞেস করলাম। তারাও মরা কুকুর সম্বন্ধে কিছু বলতে পারল না।

‘সেদিনই ভয়ে আমি গ্রামের বাড়ি চলে গেলাম। আপনাদের ফেরার সময় হলে তারপর বাসায় ফিরলাম। ইদানীং রাতের বেলায় খুব ভয় লাগে, তাই লাইট জ্বেলে ঘুমাই।’

ভয় পাবারই কথা!

রাকিব সাহেবের বলার ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল যে সবকিছু সত্যি মনে হচ্ছিল! ফলে, আমিও খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ঢাকায় বসে এ গল্প হয়তো গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেয়া যেত, কিন্তু এখানে এই যমুনার পাড়ে পূর্ণিমার আলোয় সবই বাস্তব মনে হচ্ছিল।

রাকিব সাহেব বললেন, ‘জানি, আপনি হয়তো আমাকে পাগল ভাবছেন। কিন্তু পাগলেরা এত ডিটেলস বর্ণনা দিতে পারে না, যুক্তিও দেখাতে পারে না। যাই হোক, আপনাকে কথাগুলো বলতে পেরে আমার মনটা খুব হালকা হয়ে গেল।

গল্প শুনে বাসায় ফিরে এলাম। এরকম গল্প সবসময়ই মনের উপর চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষত, কুকুর জিনিসটা আমারও ভাল লাগে না। গভীর রাতে ডাক শুনলে রক্ত শীতল হয়ে যায়। রাকিব সাহেবকে অভয় দিয়ে বলে এসেছি, ‘এরপর যখনই ভয় লাগবে আমার দরজা নক করবেন।’

আরেক কাপ চা বানিয়ে আমার ল্যাপটপটা খুলে বসলাম। দ্রুত গতিতে গল্পটা টাইপ করতে লাগলাম। রহস্যগল্প। গল্পের সাথে একটা বিকটদর্শন কুকুরের ছবি থাকবে, যেটা চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। নেটে সার্চ করে এমন ছবিও পেয়ে গেলাম। লেখা শেষ। ক্লান্ত চোখে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছি। চোখদুটো বুজে আসছে। এমন সময় টের পেলাম আমার ডান পায়ে ভেজা-ভেজা নরম কিছু একটার অস্তিত্ব। ছিটকে পেছনে এসে টেবিলের নিচে তাকিয়ে দেখি সেই কুকুরটা টেবিলের নিচে বসে হাঁপাচ্ছে। আর তখনই আমার চারদিক থেকে অসংখ্য কুকুর যেন একসাথে ডেকে উঠল 1

.

ডা. রেজা আহমদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *