কণ্ঠস্বর

কণ্ঠস্বর

এক

আমরা চলছি উটের উপর সওয়ার হয়ে, আর জায়েদ গান গাইছে। বালিয়াড়িগুলি এখন আগের চেয়ে আরো প্রশস্ত। এখানে ওখানে বালু জায়গা ছেড়ে দেয় নূড়ি পাথরের শয্যার জন্য এবং খণ্ড খণ্ড বেসল্টের জন্য, আর আমাদের সম্মুখেই, অনেক দক্ষিণে, জেগে ওঠে গিরিশ্রেণীর ছায়া ছায়া রেখাঃ জাবাল শাম্মার পর্বতশ্রেণী।

জায়েদের গানের পদগুলি একাকার হয়ে ভেদ করে আমার নিদ্রালূতাকে – কিন্তু ঠিক অমন মাত্রায় যে, আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে যে- শব্দগুলি সেগুলিই এমন এক বিস্তৃততরো, গভীরতরো তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠছে যার সাথে তাদের বাহ্য অর্থের কোনো যোগই নেই!

এ  হচ্ছে উট সওয়ারের সেই গানগুলির একটি, যা আপনি প্রায়ই শুনতে পাবেন আরব দেশে- এমন গান যা মানুষ গায় তাদের জন্তগুরির পদক্ষেপকে নিয়মিত ও ক্ষিপ্র রাখতে এবং ঘুমিয়ে-পড়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে- মরু- মানবের সুর, যারা অমন স্থানের সাথে দিন গুজরান করে যার কোন সীমা- সরহদ নেই, প্রতিধ্বনিও নেইঃ যে সুর সবসময়ই তোলা হয় বাদ্যবন্ত্রের প্রধান চাবিতে, সুরের একই সমতলে, ঢিলা-ঢালা আর কিছুটা কর্কশ- বেরিয়ে আসছে গলার একেবারে উপর থেকে, আর আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে শুস্ক হাওয়ায়ঃ যেনো মরুভূমির নিশ্বাস ধরা পড়েছে মানুষের একটি কণ্টস্বরে। মরুভূমির ভেতর দিয়ে যে মানুষ কখনো সফর করেছে সে কিছুতেই ভূলতে পারবে না এই কণ্টস্বর। এ কণ্টস্বর যেখানে জমি নিষ্ফলা, বাতাস উষ্ণ আর চতুর্দিকে উন্মুক্ত অবারিত আর জীবন কঠিন- সব জায়গায় একই।

আমরা চলেছি উটের উপর সওয়ার হয়ে আর জায়েদ গেয়ে চলেছে, যেমন তার আগে নিশ্চয়ই গেয়েছে তার আব্বা এবং তার কবিলার আর সকল মানুষ এবং আরো বহু কবিলার মানুষ, হাজার হাজার বছর ধ’রে; কারণ, এই গভীর, একঘেয়ে সূরগুলি গড়ে তুলতে এবং তাদেরকে চূড়ান্ত রূপ দিতে দরকার হয়েছে হাজার হাজার রছরের। বহু সুরে সুরেলা পাশ্চাত্য সংগীত প্রায় সবসময়ই প্রকাশ করে কোনো না- কোন ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিন্তু এই আরকীয় সুরগুলি- অগণিতবার যাতে তোলা হয়েছে একই সুরের আমেজ- এগুলি যেনো, অনুভূমি থেকে পাওয়া উপলব্ধির সুরময় প্রতীক মাত্র, যার অভিজ্ঞতা রয়েছে বহু মানুষের, যার উদ্দেশ্যে কোন একটা বাব জাগানো নয়, বরং আপনাকে আপনার আত্মিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। এইসব সুরের জন্ম হয়েছিলো বহু বহু আগে, মরুভূমির আবহাওয়া থেকে, বাতাসের আর যাযাবর জিন্দেগীর ছন্দ থেকে, বিশাল মাঠ- প্রান্তরের বিশালতার অনুভুতি থেকে, এক চিরন্তন বর্তমানের ধ্যান থেকেঃ এবং ঠিক যেমন জীবনের মৌলিক বিষয়গুলি সব সময়ই একই থাকে তেমনি এই সুরগুলিও সময়ের অতীত, পরিবর্তনের অতীত।

এই ধরনের সুরের কথা প্রতীচ্যে ক্বচিৎ কেউ ধারণা করতে পারে। প্রতীচ্যে, আলাদা আলাদা সুর কেবল সংগীতেরই একটা দিক নয়, এ তার অনুভুতি ও কামনা- বাসনারও একটি দিক। শীতল আবহাওয়া, ছুটে চলা নদী-নালা, পর পর চারটি ঋতু- এসব উপাদান জীবনকে এতো বহুমুখী তাৎপর্য ও দিক নির্দেশ করে যে, পাশ্চাত্যের মানুষ অতি স্বাভাবিকভাবেই পীড়িত হয় বহু কামনা- বাসনা দ্বারা’ এবং পরিণামে একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষার দ্বারা, সে আকাঙ্ক্ষা কেবলমাত্র করার তাগিদেই কাজ করার আকাঙ্ক্ষা। তাকে সবসময়ই সৃষ্টি করতে হবে, নির্মাণ করতে হবে, জয়ী হতে হবে, তার নিজর জীবনের বিভিন্ন রূপের মধ্যে, নিজের অস্তিত্বকে বারবার উপলব্ধি করার জন্য; আর এই নিত্য পরিবর্তনশীল জটিলতা তার সংগীতেও প্রতিফলিত। তরংগিত উদাত্ত পশ্চিমা সংগীতেও ধ্বনি আসে বুকের ভেতর থেকে এবং উদাত্ত সব সময়ই বিভিন্ন তালে ওঠা নামা করতে করতে; এ সংগীতে কথা বলে সেই ‘ফাউস্টীয় প্রকৃতি- যার প্রবাবে পশ্চিমী মানুষেরা অনেক বেশি স্বপ্ন দেখে, অনেক বেশি কামনা করে এবং জয়লাভের ইচ্ছায় অনেক বেশি সংগ্রাম করে- কিন্তু তার সংগে হয়তো ওরা হারায়ও অনেক বেশি এবং তা হারায় বেদনাদায়ভাবে! কারণ, পশ্চিমী মানুষের জগৎ হচ্ছে ইতিহাসের জগৎঃ কেবলি হওয়া, ঘটা আর অতীত হয়ে যাওয়া; এতে শান্ত থাকার প্রশান্তিটুকু নেইঃ সময় হচ্ছে একটি দুশমন- যাকে সবসময়ই দেখতে হবে সন্দেহের নজরে; এবং ‘এখন’ এই কথাটি কখনো বহন করে না চিরন্তনের কোনো ইংগিত…..

পক্ষান্তরে মরুভূমি আর স্তেপ অঞ্চলের আরবকে তার চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য স্বপ্নের মায়াময় জগতে নিয়ে যায় না, এ দৃশ্য তার কাছে দিনের মতোই কঠোর বাস্তব; এতে অনুভুতির আলো-ছায়া খেলার কোনো অবকাশ নেই। বাহির আর ভেতর, আমি আর পৃথিবী তার কাছে বিপরীত এবং পরস্পরবিরোধী কোনা সত্ত্বা নয়, বরং এক অপরিবর্তনীয় বর্তমানেরই বিভিন্ন দিক; গোপন ভয় তার জীবনের উপর প্রভুত্ব করে না এবং যখনই সে কোনো কাজ করে সে তা করে বাহ্য প্রয়োজনে, মানসিক নিরাপত্তার বাসনার তাগিদে নয়। ফলের দিক দিয়ে সে পশ্চিমাদের মতো দ্রুত বৈষয়িক ‘সাফল্য’ হাসিল করতে পারেনি সত্য, কিন্তু সে তার আত্মাকে বাঁচাতে পেরেছে।

….      ….         …..      …..

 

….. ‘কতো কাল’- আমি প্রায় একটা শরীরী চমকের সাথে নিজেকে নিজে সুধাই- জায়েদ আর জায়েদের জাতের লোকেরা, অমন সূক্ষ্মভাবে, অমন নির্দয় কঠোরতার সাথে যে-বিপদ তাদেরকে ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে তার মুকাবিলায় বাঁচাতে পারবে তাদের আত্মাকে? আমরা বাস করছি অমন একটা সময়ে যখন অগ্রসরমান পশ্চিমের মুকাবিলায় আর নিষ্ক্রিয় থাকতে পারবে না প্রাচ্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক- হাজারো শক্তি এসে আঘাত করছে মুসলিম জাহানের দরোজায়। মুসলিম জাহান কি অভিভূত হয়ে পড়বে পশ্চিমী বিশ শতকের চাপে এবং এই প্রক্রিয়ায় হারাবে কেবল তার নিজের ঐতিহ্যিক রূপগুলিকে নয়, তার আত্মিক বুনিয়াদকেও?

দুই

মধ্যপ্রাচ্যে আমি যে বছরগুলি কাটিয়েছি ১৯২২ থেকে ১৯২৬ তক, একজন সহানুভূতিশীল বাইরের লোক হিসাবে এবং এরপর থেকে, মুসলিম হিসাবে ইসলামী কওমের আশা- আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যের অংশীদার রূপে সেই সময়টাতে আমি লক্ষ্য করেছি, কীভাবে ইউরোপীয়রা ধীরে ধীরে অপ্রতিহতভাবে মুসলমানদের তাদ্দুনিক জীবন ও রাজনৈতিক আযাদীকে গ্রাস করে চলেছে; এবং যেখানেই মুসলিম জাতিগুলি এই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজেদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাধারণ জনমমত তাদের প্রতিরোধকে আখ্যায়িত করছে ‘জেনোফোবিয়া বলে, তাদের সরল বিশ্বাস আহত হয়েছে, এই মনোভাব নিয়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু ঘটছে তাকে এমনি স্থুলভাবে সরল করে দেখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ইতিহাসকে কেবলমাত্র ইউরোপের স্বার্থের এলাকা বিচার করতে ইউরোপ বহুকাল ধরে অভ্যস্ত। যদিও পশ্চিমাদের সর্বত্র (বৃটেন ছাড়া) জনমত সব সময়ই প্রচুর সহানুভূতি দেখিয়েছে আইরিশ আযাদী আন্দোলনের প্রতি অথবা (রাশিয়া ও জার্মানীর বাইরে) পোল্যান্ডের জাতীয় জাগরণের প্রতি, তবু মুসলমানদের এরূপ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতি সে সহানুভুতি কখনো সম্প্রসারিত হয়নি। পশ্চিমের প্রধান যক্তিই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভাঙন এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা; এবং প্রত্যেকটি সক্রিয় পশ্চিমী হস্তক্ষেপেরই উদ্দেশ্য, এই হস্তক্ষেপের উদ্যোক্তাদের মতে (এবং খালিস নিয়তের ভান করেই তারা এরূপ বলে থাকে), কেবল পশ্চিমের আইনসংগত’ স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, স্থানীয় লোকদের নিজেদের প্রগতি সাধনও বটে!

বাইরের প্রত্যেকটি সরাসরি, এমনকি, সদাশয় হস্তক্ষেপও যে একটি দেশের বিকাশকে কেবল বিঘ্নিতই করে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের পশ্চিমী জ্ঞানার্থীরা তা বেমালূম ভূলে গিয়ে এ ধরনের দাবিগুলি গিলতে হামেশাই উৎসুক! তারা কেবল দেখে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি দ্বারা তৈরি নতুন রেলপথসমূহ; একটি দেশের সামাজিক কাঠামোর ধ্বংস তাদের নজরে পড়ে না। তারা নতুন বিজলীর কিলোয়াট গোণে, একটি জাতির আত্মগৌরবের উপর যে আঘাত হানা হয় তা গোণে না।

বলকানে অস্ট্রিয়ার হস্তক্ষেপের যুক্তিসংগত অজুহাত হিসাবে অস্ট্রিয়া কর্তৃক বলকানকে ‘সভ্য করার মিশন’ যে- সব লোক কখনো গ্রহণ করবে না, তারাই কিন্তু একই রকমের অজুহাত সাগ্রহে গ্রহণ করে থাকে ব্রিটেনের বেলায় মিসরে, রাশিয়ার বেলায় মধ্য এশিয়ায়, ফ্রান্সের বেলায় মরক্কোতে এবং ইতালীর বেলায় লিবিয়াতে; এবং একথা কখনো তাদের মনে জাগে না যে, মধ্যপ্রাচ্য যে – সব সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাধিতে ভুগছে তার অনেকগুলিই এই পশ্চিমী স্বার্থের প্রত্যক্ষ পরিনাম; একথাও তাদের মনে জাগে না যে, পশ্চিমী হস্তক্ষেপের অনিবার্য লক্ষ্য হচ্ছে আভ্য্ন্তরীণ যে ভাঙন এরি মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তাকে স্থায়ী এবং প্রশস্ততরো করে তোলা আর এভাবে সংশ্লিষ্ট জাতিগুলির আত্মস্থ হওয়াকে অসম্ভব করে তোলা।

আমি এটা পয়লা অনুভব করতে শুরু করি ১৯২২ সনে, যখনআমি আরব আর জিওনিস্টদের বিরোধের ব্যাপারে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বৈত ভূমিকা লক্ষ্য করি। আমার কাছে তা আরো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠলো ১৯২৩ সনের শুরুর দিকে, যখন অনেকগুলি মাস ফিলিস্তিনে ঘুরে ঘুরে কাটানোর পর আমি আসি মিসরে। মিসর তখন প্রায় একটানা বৈপ্লবিক আন্দোলন করে চলেছে ব্রিটিশ প্রটেকটরেটের বিরুদ্ধে। যে- সব প্রকাশ্য জায়গায় ব্রিটিশ সেপাইরা প্রায়ই যেতো সেখানেই নিক্ষেপ করা হতো বোমা- এং তার জবাব দেওয়া হতো নানারকম দমনমূলক পন্হায়- সামরিক শাসন, রাজনৈতিক গ্রেফতারী, নেতাদের নির্বাসন, পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু এ ব্যবস্থাগুলি যতো কঠোরই হোক এর কোনটিই জনসাধারণের আযাদী স্পৃহাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। গোটা মিসরীয় জাতির মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিলো ব্যাকুল নিরুদ্ধ কান্নার ঢেউ-এর মতো একটা কিছু- নৈরাশ্যে নয়, বরং এ ছিলো ব্যগ্র উৎসাহজনিত কান্না, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির মূল আবিস্কারের উত্তেজনায় ক্রন্দন!

সেই দিনগুলিতে কেবলমাত্র ধনী পাশারা, বিশাল বিশাল জমিদারীর যারা ছিলো মালিক, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তারাই ছিলো আপোসধর্মী। বাকী অগণিত মানুষ, যাদের মধ্যে ছিলো হতভাগা ‘ফেলাহিনে’রা, এক একর জমি যাদের মনে হতো একটা গোটা পরিবারের জন্য আর্শীবাদস্বরূপ এক সম্পদ, তারা সবাই সমর্থন করতো আযাদী আন্দোলনকে। একদিন হয়তো শোনা গেলো, খবরের কাগজের হকারেরা রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করছে- ‘ওয়াফদ পার্টির সকল নেতা মিলিটারী গভর্নর কর্তৃত গ্রেফতার’ কিন্তু পরদিনই, নতুন নেতার দ্বারা পূর্ণ হয়ে যেতো তাদের স্থান- এভাবে আযাদীর ক্ষুধা এবং বিদ্বেষ দুই বাড়তে থাকে। ইউরোপীয়দের এর জন্য একটি মাত্র শব্দই ছিলো- ‘জেনোফেবিয়া’।

সে সময়ে আমার মিসরে আসার মূলে ছিলো একটি ইচ্ছা- আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর জন্য আমার কাঝের পরিসর সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলাম ফিলিস্তিনের বাইরে, অন্যান্য দেশেও। ডোরিয়ান মামার আর্থিক অবস্থা অমন ছিলো না যে তিনি আমার জন্য অত্যুৎসুক তখন তিনি নিজেই অগ্রণী হয়ে আমাকে কিছু আগাম টাকা দিলেন, যাতে আমার জেরুজালেম থেকে কায়রো যাওয়া- আসার রেলের ভাড়া এবং সেখানে পনেরো দিন থাকার খরচ কোনো রকমে চলে।

কায়রোতে আমি থাকবার জায়গা পেলাম একটি চিপা গলিতে, যেখানে প্রধানত আরব হস্তশিল্পী ও গ্রীক দোকানদাররাই বাস করতো। আমার বাড়ির মালিক ছিলেন ত্রিয়েস্তিনের এক বৃদ্ধা, দীর্ঘংগী, ভারিক্কি, এলোমেলো, শুভ্রকেশী। তিনি সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত কড়া গ্রীক শরাব গলায় ঢালতেন এবং এক মেজাজ থেকে আরেক মেজাজে হোঁচট খেয়ে পড়তেন। তাঁর মেজাজ ছিলো খুবই উগ্র আর তীব্র, যা কখনো তার নিজ স্বরূপ বুঝতো বলে মনে হয় না। কিন্তু তিনি আমার প্রতি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্না, আর তাঁর উপস্থিতিতে আমার ভালোই লাগতো।

প্রায় এক হপ্তা পরে আমার হাতের নগদ টাকা প্রায় ফুরিয়ে এলো। আমার ইচ্ছা ছিলো না যে আমি অতো তাড়াতাড়ি ফিলিস্তনে আমার মামার বাড়ির নিরাপত্তায় ফিরে যাই। তাই আমি আমার রুজির অন্য উপায় খুঁজতে শুরু করি।

আমার জেরুজালেমের বন্ধু ডঃ দ্যা হা’ন কায়রোর এক ব্যবসায়ীর নিকট একটি চিঠি দিয়েছিলেন আমার পরিচয় দিয়ে। আমি তাঁর কাছেই গেলাম পরামর্শের জন্য। তিনি হল্যাণ্ডের লোক; দেখলাম, তিনি খুবই উদার আর সহৃদয়, আর তাঁর নিজের কর্মক্ষেত্র অতিক্রম করে বহু দূর বিস্তৃত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎসুক্য ও আকর্ষণ। ইয়াকব দ্যা হা’নের চিঠি থেকে তিনি জানতে পারলেন যে, আমি ‘ফ্রাংকফুর্টার শাইটুঙ’- এর একজন সংবাদদাতা। তাঁর অনুরোধে আমি যখন তাঁকে হালে ছাপা আমার কয়েকটি প্রবন্ধ দেখালাম, বিস্ময়ে তাঁর চোখের ভুরু একেবারে কপালে উঠে গেলোঃ

-‘বলুন, আপনার বয়স কতো?’

-‘বাইশ বছর’।

-‘তাহলে মেহেরবানী করে আমাকে অন্য কথা বলুন। এই প্রবন্ধগুলি দিয়ে আপনাকে কে সাহায্য করেছে?- দ্যা হা’ন?’

আমি হাসলাম- ‘অবশ্যি নয়, আমি নিজেই লিখেছি! আমি আমার কাজে হামেশা নিজেই করি। কিন্তু আপনি সন্দেহ করছেন কেন?’

তিনি তাঁর মাথা নাড়েন যেনো বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে- ‘কিন্তু খুবই তাজ্জব মনে হচ্ছে… এ ধরনের প্রবন্ধ লেখার পরিপক্কতা আপনি কোত্থেকে পেলেন? আপনি কেমন করে অর্ধেক একটি বাক্যে, যে- সব ব্যাপার অতো সাধারণ বলে মনে হয়, তাতেও প্রায় মরমী এক তাৎপর্য দান করেন?’

এর মধ্যে যে শ্রদ্ধা লুকানো ছিলো তাতে আমি অতোটা গৌরববোধ করি যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফলে, আমার আত্মমর্যাদাবোধ বেড়ে গেলো অনেক। আমার এই নতুন পরিচিত দোস্তের সাথে আলোচনায় বোঝা গেলো, তাঁর নিজের ব্যবসায়ে কর্ম- সংস্থানের কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু তিনি মনে করেন, তিনি হয়তো একটি মিসরীয় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আমাকে একটি কাজ যোগাড় করে দিতে পারেন- যে প্রতিষ্ঠানটির সংগে রয়েছে তাঁর নিজের লেনদেন।

তিনি আমাকে যে অফিসটি দেখিয়ে দিলেন সেটি ছিলো কায়রোর এক প্রাচীনতরো মহল্লায়। আমার বাসা থেকে তা খুব দূরে ছিলো নাঃ একটি চিপা গলি- যার দু’পাশে রয়েছে এককালের অভিজাত বাড়িঘর; এখন যা অফিস আর সস্তা এপার্টমেন্টে রূপান্তরিত। আমার ভাবী মুনিব একজন বয়স্ক, টেকো, মিসরীয় ব্যবসায়ী, যার মুখখানা সময়ে-পাকা এক শকুনেরই মুখের মতো। তাঁর একজন পার্ট- টাইম কেরানী দরকার, তাঁর হয়ে ফরাসী ভাষায় চিঠি- পত্রের আদান- প্রদানের জন্য। আমি তাঁকে এ বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে পারলাম যে, এ দায়িত্ব পালন আমি করতে পারবো, যদিও ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা আমার একদম নেই। আমাকে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করতে হবে। সে অনুপাতে মাইনেও কম, কিন্তু এ মাইনেও আমার বাড়িভাড়া চুকানো আর অনির্দিষ্টকাল আমাকে রুটি, দুধি ও জলপাই-এ তৃপ্ত রাখার জন্য ছিলো যথেষ্ট।

আমার বাসা আর অফিসের মধ্যেই পড়ে কায়রোর বারাংগনা পল্লী। এলাকাটি হচ্ছে একটি জটিল গোলক- ধাঁধাঁ বিশেষ, যেখানে অভিজাত আর নীচ বারাংগনারা কাটায় তাদের দিন আর রাত। বিকালে আমি যখন কাজে যাই অলিগলিগুলি দেখি শূণ্য, নীরব। ঘুলঘুলি দেয়া জানালায় ছায়ায় কোনো নারী হয়তো তার দেহ ছড়িয়ে দিতো আলসভরে; এ-বাড়ি না হয় ও-বাড়ির সম্মুখে, ছোটো ছোটো টেবিলের পাশে বসে গম্ভীর মুখে, দাড়িওয়ালা লোকদের সাথে, শান্তভাবে কফি পান করে বালিকারা, আর তারা আর দৈহিক মত্ততা থেকে অনেক দূরের বলে মনে হতো।

কিন্তু সন্ধ্যায় যখন আমি ঘরে ফিরে আসি তখন দেখতে পাই মহল্লাটি অন্য যে- কোনো মহল্লা অপেক্ষা অধিকতরো প্রাণবন্ত। আরবীয় বাঁশির নরম মোলায়েম সুর এবং ঢোল ও নারীর হাসিতে গুঞ্জন উঠেছে মহল্লাটিতে। বহু বিজলী বাতি আর রঙিন লণ্ঠনের আলোর নিচ দিয়ে যখন আপনি হাঁটছেন, প্রতি পদক্ষেপেই একটি মোলায়েম বাহু জড়িয়ে ধরবে আপনার গলায়, বাহুটি হতে পারে বাদামী অথবা সাদা- কিন্তু সব সময়ই তা সোনা ও রূপার চেন আর চুড়িতে ঝনঝন করবে এবং সবসময়ই তাতে পাওয়া যাবে মেশক, গুগগুল ও উষ্ণ জন্তু-ত্বকের গন্ধ। আপনাকে খুবই দৃঢ় থাকতে হবে- নিজেকে এই সব সহাস্য আলিংগন এবং ‘ইয়া হাবিবী’ ‘হে আমার প্রিয় সাআদাতাক’, ‘সুখী হও তুমি’- এই সব আহবান থেকে মুক্ত রাখতে। আপনাকে পথ করে যেতে হবে স্পন্দিত অংগ-প্রত্যংগের মধ্য দিয়ে, যার অধিকাংশই সরল, সুন্দর এবং ইংগিতপূর্ণ দেহ-ভাজ দ্বারা আপনাকে মাতিয়ে দেয়। গোটা মিসর যেন ভেঙে পড়ছে আপনার উপর, ভেঙে পড়ছে মরক্কো, আলজিরিয়া, ভেঙে পড়ছে সুদান, নুবিয়া, ভেঙে পড়ছে আরব, আর্মেনিয়া, সিরিয়া, ইরান- গৃহের দেয়ালের সাথে লম্বালম্বি করে রাখা বেঞ্চির উপর পাশাপাশি বসেছে লম্বা, রেশমী জামা-কাপড় পরা লোকেরা- হর্ষে উৎফুল্লা… হাসছে, মেয়েদের ডাকছে, অথবা নীরবে নারকেলের হুকা টানছে। ওরা সকলেই কিন্তু এখানকার ‘খদ্দের’ নয়… অনেকেই এসেছে, এই মহল্লার গতানুগতিকতামুক্ত হর্ষোৎফুল্ল আবহাওয়ায় দু-একটা ঘণ্টা কাটাতে… কখনো বা আপনাকে পিছিয়ে যেতে হ্চেছ সুদানের ছেঁড়া-জীর্ণ কাপড় পরা দরবেশের সমুখ হতে, যিনি ভিক্ষা চেয়ে গান গাইছেন আবিষ্ট মুখে, অনড় দু’হাত বাড়িয়ে। সুগন্ধি বিক্রেতা হকারের দোলায়মান ধুনচি থেকে ওঠা ধুপের ধোঁয়া, কুণ্ডলী-পাকানো মেঘের আকারে আপনার মুখকে বুরুশ করে দিচ্ছে! প্রায়ই আপনি শুনতে পাচ্ছেন মিলিত কণ্টে গান এবং আপনি বুঝতে শুরু করবেন শোঁ শোঁ করা, মোলায়েম আরবী ধ্বনিগুলির কোন কোনটির অর্থ। …. এবং ঘুরে ফিরে আপনি শুনতে পাচ্ছেন কোমল, কল- কল্লোলের মতো, সুখের উক্তি… ঔসব বালিকার জান্তব সুখ (কারণ ওরা সন্দেহাতীতভাবেই উপভোগ করছিলো নিজেদেরকে), যাদের পরনে রয়েছে হালকা-নীল, হলদে, লাল, সবুজ, সাদা, ঝিলিক-মারা সোনালি পোশাক, মিহি রেশমী, সূক্ষ্ম জালি জালি করে বোনা পাতলা টিউল, ভয়েল অথবা বুটিদার কাপড় তৈরি- আর ওদের হাসি যেন নূড়ি বিছানো ফুটপাতের উপর দিয়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদক্ষেপে ছুটে চলেছে- এই উচ্ছাসিত, এই নিম্নগামী এবং পরমহূর্তেই আবার স্ফূরিত হচ্ছে অন্যদের ওষ্ঠ থেকে…।

এই মিসরীয়রা- কী করে ওদের পক্ষে সম্ভব হতো এই হাসি? কী আনন্দ আর ফুর্তির সংগেই না ওরা, দিন নেই রাত নেই, চলতো কায়রোর পথে পথে, দুলনী চালে, লম্বা লম্বা ধাপে পা ফেলতে ফেলতে, ওদের দীর্ঘ শার্টের মতো ‘গাল্লাবিয়া’ গায় দিয়ে, যাতে থাকতো ডোরা, রংধনুর প্রত্যেকটি রঙের- চলতো ওরা লঘু চিত্তে, মুক্ত মনে, যাতে করে মনে হতো, মানুষের জীবনকে চূর্ণ করা দারিদ্র্য, অসন্তোষ আর রাজনৈতিক বিক্ষোভ, এ সমস্তকে মানুষ গুরুত্ব দেয় কেবলি আপেক্ষিক অর্থে। এই মানুষগুলির প্রচণ্ড বিস্ফোরণমুখী উত্তেজনায় সবসময়ই, দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন ভাবান্তর ছাড়াই অবকাশ থাকতো। পরিপূর্ণ শান্তি, এমনকি আলস্যৈর যেন কিছুই কখনো ঘটেনি এবং কিছুই খোয়া যায়নি। এজন্য অধিকাংশ ইউরোপীয়রা মনে করতো (এবং হয়তো এখনো মনে করে) আরবরা মানুষ হিসাবে লঘু, ভাসাভাসা! কিন্তু প্রথমদিকে, সেই দিনগুলিতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম- আরবদের প্রতি পশ্চিমের এই তাচ্ছিল্যের মূলে রয়েছে যে- সব আবেগ ‘গভীর’ প্রতীয়মান হয় সেগুলিকে অতি-গুরত্বি দেয়ার প্রবণতা এবং যা-কিছু ‘লঘু’ ভাসাভাসা, যা কিছু হাল্কা, বায়বীয় এবং নির্ভার তাকেই নিন্দা করার প্রবণাত। আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে সব মানসিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ও চাপ পশ্চিমের বৈশিষ্ট্য আরবরা মুক্ত রয়েছে সেগুলি থেকে। কাজেই আমাদের মাপকাঠি আমরা ওদের বেলায় কী করে ব্যবহার করতে পারি?ওদের যদি ‘লঘু’ ভাসাভাসাই মনে হয়, তারো কারণ হয়তো এই যে, ওদের আবেগগুলি দ্বন্দ্ব- সংঘাতের মুকাবিলা না করেই স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হয় ওদের আচরণের মধ্যে। হয়তো ‘পশ্চিমীকরণের’ চাপে ওরাও ধীরে ধীরে বাস্তবের সাথে সাক্ষাৎ যোগাযোগের এই স্বাভাবগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বসবে। কারণ, ঐ পশ্চিমী প্রভাব নানাভাবে সমকালীন আরব চিন্তার ক্ষেত্রে একটা উদ্দীপক ও ফলপ্রসূ নিমিত্ত হওয়া সত্ত্বেও অনিবার্যভাবেই তা আরবদের মধ্যে সেই সব মারাত্মক সমস্যাই সৃষ্টি করে যার দ্বারা পশ্চিমের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবন পীড়িত, বিড়ম্বিত।

…..     …..        …..      …..

 

আমার ঘরের ঠিক বিপরীতদিকেই- এবং অতো নিকটে যে আমি হাত বাড়িয়ে প্রায় নাগাল পেতে পারি- দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা মসজিদ, যার রয়েছে সরু একটি মিনার, যে মিনার থেকে রোজ পাঁচবার সালাতের জন্য দেয়া হয় আযান। সাদা পাগড়ি পরা একজন লোক মিনারে চড়ে দু’হাত তুলে সুর করে গায়- আল্লাহু- আকবার’ – আল্লাহ মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল… এ যখন ধীরে ধীরে চারদিকে মুখ ফেরায় তার কণ্ঠের ধ্বনি উঠতে থাকে উর্ধ্ব দিকে, পরিষ্কার হাওয়ায় তা  বুলন্দ হয়ে ওঠে, আরবী ভাষায়- গলা থেকে- আসা গভীর শব্দগুলির উপর দোল খেতে খেতে, আন্দোলিত হয়ে, কখনো আগিয়ে কখনো পিছিয়ে। ওর গলার স্বর গাঢ় উদাত্ত, 

মোলায়েমএবং দৃঢ়- যার মধ্যে অবকাশ রয়েছে অনেক ওঠা- নামার। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, তপ্ত আবেগই কণ্ঠস্বরকে করেছে সুন্দর, বলার চাতর্য নয়!

-‘মুয়াজ্জিন’- এর এই সুর ছিলো কায়রোতে আমার দিবস ও সন্ধ্যার মূল সংগীত- ঠিক যেমন তা আমার জন্য মূল সংগীত ছিলো প্রাচীন জেরুজালেম নগরীতে এবং পরবর্তিকালেও মুসলিম দেশগুলিতে তা-ই আমার প্রত্যেকটি সফরকালে বিদ্যমান ছিলো আমার একমাত্র সংগীতরূপে। উপভাষার পার্থক্য এবং লোক- সমাজের রোজকার কথাবার্তার উচ্চারণের যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা সত্ত্বেও আযান ঘোষিত হয় সর্বত্রঃ শব্দের এই ঐক্য থেকে, আমি আমার কায়রোর সেই দিনগুলিতেই উপলব্ধি করি, সকল মুসলমানের মধ্যে অন্তরের ঐক্য কতো গভীর এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের যে রেখা রয়েছে তা কতো কৃত্রিম আর অর্থহীন। ওদের চিন্তার পদ্ধতি একই, ভাল-মন্দ সৎ-অসতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের বেলায় সকল মুসলমানই এক এবং মহৎ জীবনের উপাদানগুলি সম্পর্কে ওদের ধারণাও অভিন্ন।

এই প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো আমি অমন একটি জনগোষ্ঠির দেখা পেয়েছি যেখানে মানুষে মানুষে আত্মীয়তা, দৈবক্রমে একই রক্ত- বংশজাত হওয়ার উপর বা অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক নয়- বরং তার ভিত্তি অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি স্থায়ী কিছু। এ আত্মীয়তার উৎস একই দৃষ্টিভংগি, যে দৃষ্টিভংগি মানুষে মানুষে নিঃসংগতাস্বরূত যতো রকম প্রতিবন্ধক রয়েছে সমস্ত কিছুকেই করে উন্মুলিত।

১৯২৩ সনের গ্রীষ্মে মধ্যপ্রাচ্যের জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছতরো দৃষ্টিভংগিতে সমৃদ্ধ হয়ে আমি ফিরে আসি জেরুজালেমে।

আমার বন্ধু ইয়াকব দ্য হানের সহায়তায় পাশ্ববর্তী এলাকা ট্রানসজর্ডানের আমীর আবদুল্লাহর সাথে আমি পরিচিত হই। তিনি আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর মুলুকে। এখানেই আমি পয়লা দেখলাম একটা খাঁটি বেদুঈন দেশ। রাজধানী আম্মান, টলেমিআস ফিলাডেলফাস কর্তৃক নির্মিত গ্রীক উপনিবেশ ফিলাডেলফিয়ার ধ্বংসাবশেষের উপর তৈরি একটি ছোট শহর ছিলো তখন। লোক সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি ছিলো না। রাস্তাঘাটগুলি ভর্তি বেদুঈনদের দ্বারা, খোলা স্তেপ অঞ্চলের খাঁটি বেদুঈন!, যাদের ক্বচি* দেখা যায় ফিলিস্তিনে- স্বাধীন যোদ্ধা আর উটপালক বেদুঈন! সার্কসিয়ান গরুর গাড়িগুলি (কারণ, শহরটি প্রথম আবাদ করেছিলো সার্কাসিয়ানরা; ওরা উনিশ শতকে ওদের স্বদেশ রাশিয়ানরা দখল করে নিলে এদেশে চলে এসে এখানে বসতি স্থাপন করে) আস্তে আস্তে কষ্টে- সৃষ্টে চলতো বাজারের মধ্য দিয়ে। বাজারটি আকারে বড় হলেও এতে যে হট্টগোল ও উত্তেজনা দেখা যেতো তা অনেক বেশি বড়ো এক নগরীকেই মানায়।

শহরে দালান-কোঠা খুব বেশি ছিলো না; তাই আমীর আবদুল্লাহ তখন বাস করছিলেন পাহাড়ের উপর এক তাঁবু খাটানো ক্যাম্পে; পাহাড়টি যেনো উপর দিক হতে তাকিয়ে আছে নিচে, আম্মানের দিকে। তাঁর তাঁবুটি ছিলো অন্যান্য তাঁবুর চেয়ে কিছুটা বড়ো; তার মধ্যে ছিলো ক্যানভাসের পার্টিশন দেয়া কয়েকটি কোঠা; চূড়ান্ত সরলতায় তাঁবুটি আলাদা ছিল অন্য সকল তাঁবু থেকে। এরি একটি কোঠায়, এক কোণে জমিনের উপর কালো ভালুকের চামড়া বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিছানা। অভ্যর্থনা কোঠায়, কেউ যখন গালিচার উপর বসতো তখন তার বাহুদ্বয় রাখার জন্য সেখানে ছিলো রূপার কাজ-করা অগ্রভাগ বিশিষ্ট এক জোড়া সুন্দর উটের জীন।

আমীরে’র প্রধান পরামর্শদাতা ডঃ রিজা তওফিক বে’র করে যখন আমি তাঁবুতে ঢুকলাম, তখন কেবল একজন নিগ্রোই ছিলো সেখানে, যার পরনে ছিলো জমকালো ব্রোকেডের জামা-কাপড় আর কোমরে একটি সোনার ছুরি। রিজা তওফির বে’ ছিলেন একজন তুর্কী, আগে ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক,আর কামাল আতাতুর্কের আগে, তিন বছরের জন্য ছিলেন তুর্কী মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি আমাকে বললেন, আমীর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরবেন। এই মুহূর্তে তিনি কয়েকজন বেদুঈন সর্দারের সাথে আলাপ করছেন দক্ষিণ ট্রান্সজর্ডানে সর্বশেষ নযদী হানা নিয়ে। ঐ সব নযদী ওয়াহাবীরা, ডঃ রিজা আমাকে বোঝালেন, ইসলামের অভ্যন্তরে অমন একটি ভূমিকা গ্রহণ করেছে যা খৃশ্চান জগতের গোঁড়া সংস্কারপন্হীদের থেকে আলাদা নয়, কারণ ওরা পীর-দরবেশের পূজার ঘোর বিরোধী, বহুশতকের পরিক্রমায় যে-সব মরমী কুসংস্কার ইসলামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে সেগুলিরও ঘোর বিরোধী। তা’ছাড়া, ওরা শরীফী খান্দানেরও আপোসহীন দুশমন, যে-খান্দানের প্রধান হচ্ছে ‘আমীরে’র পিতা, হিজাজের বাদশাহ হোসাইন। রিজা তওফিক বে’র মতে, ওয়াহাবীদের ধর্মীয় মতামত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা যায় না; আসলে, ওদের মতামত, অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের জনসাধারণের মধ্যে যে-সব ধারণা রয়েছে তার চেয়ে আল কুরআনের মর্মের অনেক কাছাকাছি। আর তা ইসলামের সাংস্কৃতিক বিকাশের উপর বিস্তার করতে পারে এক কল্যাণকর প্রভাব। অবশ্য ওদের অতিশয় গোড়ামি অন্যান্য মুসলমানের পক্ষে ওয়াহাবী আন্দোলনকে পুরাপুরি বোঝা কিছুটা কঠিন করে তুলেছে; আর এই ক্রটি, তিনি বলেন, কোন কোন বিশেষ মহলে হয়তো অনভিপ্রেত নয়, যারা আরব জাতিগুলির সম্ভাব্য পূনর্মিলনকে এক ভয়ংকর বিপদের সম্ভাবনা বলে গন্য করে।

কিছুক্ষণ পর ‘আমীর এসে ঢুকলেন। চল্লিশের মতো বয়স- মাঝারী আকৃতি, ছোট সোনালী রঙের দাড়ি, কালো প্যাটেন্ট চামড়ার চটি পায়ে, মৃদু পদক্ষেপে, সাদা ঝকঝকে রেশমের ঢিলা আরবী পোশাকে- যার উপরে রয়েছে প্রায় স্বচ্ছ সাদা সূতী ‘আবায়া। তিনি বলেনঃ

-‘আহলান ওয়া সাহলান’- ‘এ আপনারই ঘর, সহজ হোন’, এই প্রথম আমি শুনলাম- এই সুন্দর আরবী অভিবাদন!

আমীর আব্দুল্লাহর ব্যক্তিত্বের মধ্যে অমন কিছু রয়েছে যা আকর্ষণীয়, যা প্রায় বলপুর্বক জয় করে নেয় মানুষকে- আর সে জিনিস হচ্ছে তাঁর প্রগাঢ় রসবোধ, তাঁর আবেগ- তৃপ্ত কথাবার্তা আর তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। সে সময় যে তিনি কী জন্য তাঁর লোকজনের কাছে অতো জনপ্রিয় ছিলেন তা বুঝতে কষ্ট হয় না। অবশ্য তিনি তুর্কীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের প্ররোচিত শরীফীয় বিদ্রোহে যে ভূমিকা গ্রহণ করেন তার জন্য বহু আরব খুশি ছিলো না। ওরা তাঁর এই ভূমিকাকে মুসলিমের প্রতি মুসলিমের বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে করতো। তা সত্ত্বেও জিওনিজমের বিরুদ্ধে আরবদের স্বার্থ রক্ষার নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তিনি বেশ কিছুটা মর্যাদা হাসিল করেন। সেদিন তখনো আসেনি যখন তার রাজনীতির পাকচক্র তাঁর নামকে গোটা আরব জাহানে করে তুলবে ঘৃণ্য।

হাবশী পরিচালক, ছোট ছোট যে পেয়ালায় আমাকের কফি পরিবেশন করলো,এ থেকে চুমুক দিয়ে কফি খেতে খেতে আমরা কথা বলছিলাম। মাঝে মাঝে আমাদের সাহায্য করছিলেন ডঃ রিজা, তিনি চমৎকার ফরাসী বলতেন। আমরা কথা বলছিলাম এই নতুন দেশ ট্রান্সজর্ডানের শাসন বিষয়ক অসুবিধাগুলি নিয়ে। ওখানে প্রত্যেক ব্যক্তিই অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে এবং কেবল নিজের কবিলার আইন-কানুন মানতেই সে অভ্যস্ত।– ‘কিন্তু, ‘আমীর বললেন, ‘আরবদের কাণ্ডজ্ঞান চমৎকার। বেদুঈনরা পর্যন্ত বুঝতে শুরু করেছে- বিদেশী প্রভুত্ব থেকে মুক্ত হতে হলে, ওদের পুরানো যেমন- খুশি চলার অভ্যাস অবশ্যি বর্জন করতে হবে। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যেসব ঝগড়া-ফাসাদের কথা আপনি নিশ্চয় শুনে থাকবেন সেগুলি এখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।

এরপর তিনি অসংযত চঞ্চল বেদুঈনদের বর্ণনা করে চলেনঃ ওরা সামান্যতম উসিলায়ই নিজেদের মধ্যে লড়াই করে থাকে। ওদের খান্দানগত শক্রতা প্রায়ই বহু পুরুষ ধরে চলতে থাকে এবং কখনো কখনো তা পিতা থেকে পায় পুত্র, এমনকি শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে- যার ফলে চলতে থাকে নিত্যনতুন খুনজারি, রক্তপাত এবং নবতরো তিক্ততা, আদি কারণটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ মাত্র একটিই আছে; পূর্বতর নিহত ব্যক্তিটির গোত্র ও কবিলার কোন জোয়অন যদি অপরাধীর গোত্র ও কবিলার কোন  কুমারীকে অপহরণ করে এবং তাকে বিয়ে করে, তাহলে বিয়ের রাতের রক্ত- যা খুনীর কবিলার রুক্ত- প্রতীক- রূপে এবং চূড়ান্তভাবে, হত্যার সময় যে রক্তপাত করা হয়েছিলো তারই প্রতিশোধরূপে গণ্য হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায়, বহু পুরুষ ধরে বিদ্যমান শক্রতায় উভয় গোত্রের লোকেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কারণ তাতে উভয় দলেরই শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। এমন সব ক্ষেত্রে প্রায়ই তৃতীয় গোত্রের কোন ঘটক কর্তৃক অপহরণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

-‘আমি এর চাইতেও ভালো করেছি’, আমীর আমাকে বললেন, ‘আমি যথার্থ খান্দানী শক্রতা কমিশন’ গঠন করেছি; এই কমিশন বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে গঠিত। ওরা সারা দেশে ঘুরে বেড়ায় এবং বিবাদমান গোত্রগুলির মধ্যে  এই ধরনের প্রতীকী অপহরণ ও বিয়ের ব্যবস্থা করে থাকে।

‘কিন্তু’, বলতে তাঁর চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে- ‘আমি সবসময় কমিশনের সদস্যদের বোঝাবার চেষ্টা করি’- যেন তারা কুমারীদের নির্বাচন করতে গিয়ে হুশিয়ারির সাথে কাজ করে- কারণ, আমি চাই না যে, বরের সম্ভাব্য হতাশার কারণে আবার পরিবারের ‘ভেতরেই শক্রতা সৃষ্টি হোক’।,,,,

দরমের আড়াল থেকে বার হয়ে একটি বালক, বারো বছরের মতো ওর বয়স। সন্ধ্যার আঁধার নামা তাঁবুর কামরার ভেতর দিয়ে ও ছুটে যায় ক্ষিপ্রগতিতে, নিঃশব্দ পদক্ষেপে, আর তাঁবুর বাইরে রাখা একটা ঘোড়ার পিঠে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে, রেকাবে পা না রেখেই; একটি নওকর, ঘোড়াটিকে ধরে দাঁড়িয়েছিলো- ওরি জন্য প্রস্তুত ছিলো ঘোড়াটি; ছেলেটি আর কেউ নয়, ‘আমীরের বড়ো ছেলে তালা; তার হালকা দেহে, ঘোড়ার পিঠি একলাফে তার আরোহণে, তার উজ্জ্বল চাহনিতে আবার আমি লক্ষ্য করলাম সেই জিনিসঃ নিজের জীবনের সাথে স্বপ্নমুক্ত বাস্তব যোগ, যা আমি ইউরোপে যা- কিছু জানবার সুযোগ পেয়েছিলাম তার সব কিছু থেকেই আরবকে স্থাপন করেছে অত দূর ব্যবধানে!

তাঁর ছেলের প্রতি আমার এই সুস্পষ্ট সপ্রশংসা দৃষ্টি  লক্ষ্য করে

‘আমীর’ বললেন- ‘অন্য প্রত্যেকটি আরব শিশুর মতোই সে বেড়ে উঠেছে কেবল একটিমাত্র চিন্তা মনে নিয়েঃ মুক্তি, আযাদী।‘ আমরা আরবরা মনে করি না যে, আমাদের কোন ক্রটি নেই অথবা আমরা ভূল থেকে মুক্ত। তবে আমরা আমাদের ভূলগুলি নিজেরাই করতে চাই এবং এভাবে শিখতে চাই- কেমন করে এই ভূলগুলি থেকে বাঁচা যায়। ঠিক যেমন একটি গাছ বাড়তে বাড়তেই জানে কেমন করে বাড়তে হয়; কিংবা একটি স্রোত চলতে চলতে খুঁজে পায় ওর নিজের সঠিক চলার পথ। সে সব লোকের নিজেদের কোন প্রজ্ঞা নেই- যাদের আছে কেবল ক্ষমতা আর বন্দুক আর অর্থবিত্ত, যারা জানে কেবল সেইসব বন্ধুদের হারাতে যাদেরকে ওরা সহজেই রাখতে পারতো নিজেদের বন্ধুরূপে- আমরা চাই না যে, তারা আমাদেরকে প্রজ্ঞার পথ দেখাক! [সে সময়ে (১৯২৩) কেউই আঁচ করেনি যে, পরবর্তীকালে আমীর আবদুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র তালালের সম্পর্ককে নষ্ট করে দেবে তীব্র বিরোধীতা- পুত্র ঘেন্ন করছেন আরব জগতে ব্রিটিশ নীতির প্রতি তাঁর পিতার আপস মনোভাবকে এংব পিতা তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করছেন তাঁর তীব্র স্পষ্ট ভাষণের বিরুদ্ধে। তখন কিংবা পরে তালালের মধ্যে কখনো আমি দেখিনি- কোন মানসিক ব্যাধির লক্ষণ, যে ওজুহাত তাঁকে ১৯৫২ সনে বাধ্য করা হয় জর্ডানের তখত ত্যাগ করতে।]

অনির্দিষ্টকালের জন্য ফিলিস্তিনে থাকার ইচ্ছা আমার ছিলো না। ইয়াকব দ্য হা’ন আবার ছুটে এলেন আমার সাহায্যে। সাংবাদিক হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিলো সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ইউরোপের সর্বত্র নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে ছিলো তাঁর সম্পর্ক। তাঁর সুপারিশের ফলে আমি দুটি ছোট খবরের কাগজের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে সক্ষম হই ধারাবাহিকভাবে কতকগুলি প্রবন্ধ লেখার জন্য; কাগজ দু’টির একটি ইংল্যান্ডের, অপরটি সুইজারল্যান্ডের। চুক্তি হলোঃ কাগজ দুটি আমার পারিশ্রমিক পরিশোধ করবে ডাচ গিল্ডারে এবং সুইস ফ্রাঁ-তে। কাগজগুলি ছিলো প্রাদেশিক ধরনের আর এদের খুব বেশি মর্যাদাও ছিলো না। মোটা মাইনা দেবার ক্ষমতা ওদের ছিলো না। কিন্তু আমার চালচলন সরল হওয়ায় ওদের কাছ থেকে আমি যে অর্থ পেলাম তাই আমার পরিকল্পিত মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত সফরের খরচের জন্য যথেষ্ট মনে হলো।

আমার ইচ্ছা ছিলো- প্রথমে আমি যাই সিরিয়ায়। কিন্তু ফরাসী কর্তৃপক্ষ, যারা সবেমাত্র এক শক্রভাবাপন্ন জনতার মাঝখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, অষ্ট্রিয়ার একজন প্রাক্তন বিদেশী শক্র-সৈন্যকে প্রবেশ পত্র দিতে রাজী ছিলো না। এ আঘাত ছিলো নিষ্ঠুর; কিন্তু এ ব্যাপারে আমার করবার কিছুই ছিলো না। তাই আমি স্থির করলাম- আমি হাইফা যাবো এবং সেকানে গিয়ে জাহাজে উঠবো ইস্তাম্বুলের পথে। বলাবাহুল্য এ-ও ছিলো আমার পরিকল্পনার অন্তর্গত।

জেরুযালেম থেকে হাইফা যাওয়ার ট্রেনে সফরে আমি এক মুসিবতে পড়ি।আমার একটা কোট পথে হারিয়ে যায়, যার মধ্যে ছিলো আমার ছাড়পত্র আর একটি ছোট্ট থলে। আমার কাছে রইলো কেবল কটি রূপার মুদ্রা আমার প্যান্টের পকেটে। কাজেই এখনকার মতো আমার ইস্তাম্বুল যাওয়ার কোন প্রশ্নইওঠে নাঃ পাসপোর্ট নেই, টাকাও নেই। বাসে করে জেরুযালেম ফেরা ছাড়া আমার আর কোন গতি রইলো না। ভাড়া পরিশোধ করতে হবে সেখানে পৌঁছুনোর পর, বরাবরকার মতোই, ডোরিয়ান মামার কাছ থেকে ধার করে। জেরুযালেম আমাকে অপেক্ষা করতে হবে কয়েক সপ্তাহ, কায়রোর অস্ট্রীয় কনসুলেট থেকে একটি ছাড়পত্রের জন্য (কারণ, তখন ফিলিস্তিনে কোন কনসুলেট ছিলো না) এবং হল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড থেকে আরো কিছু অর্থের জন্য।

এমনি করে পরদিন সকালবেলা আমি গিয়ে হাজির হই হাইফার প্রান্তে, একটি বাস- অফিসে। ভাড়া সম্পর্কে কথাবার্তা শেষ করে নিলাম। বাস ছাড়ার তখনো এক ঘন্টা বাকি। সময় কাটানোর জন্য আমি রাস্তায় পায়চারি শুরু করি, কখনো সামনে, কখনো পেছনে ফিরে আসি; নিজের প্রতি আমার অপরিসীম বিরক্তি- বিরক্তি আমার ভাগ্যকে নিয়ে যা আমাকে বাধ্য করছে জীবন সংগ্রামে অমন হীনভাব পিছু হটতে। ইস্তেজারি সবসময়ই অপ্রীতিকর- এবং জেরুজালেম প্রত্যার্তনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, আমার এই চিন্তা, এই পরাজয়বোধ ছিলো সবচাইতে তিক্ত, বেশি করে আরো এ কারণে যে, এরূপ সামান্য টাকা-পয়সা নিয়ে আমি আমার পরিকল্পনা কার্যকরী করতে পারবো কি-না, এ সম্বন্ধে ডোরিয়ান ছিলেন হামেশাই সন্দিহান। তাছাড়া আমি সিরিয়া সফর করতে পারবো না এবং আল্লাহই জানেন, আবার কখনো আমি আসতে পারবো কি-না পৃথিবীর এই এলাকায়। এ সম্ভাবনা অবশ্যি ছিলো যে, পরবর্তী কোন সময় ‘ফ্লাঙ্কফুর্টার শাইটুঙ’ মধ্যপ্রাচ্যে আমার আরেকটি সফরের খরচ বহন করতে পারে এবং ফরাসী সরকারও পারে কোন একদিন  প্রাক্তন-শক্র বিদেশীদের উপর থেকে তাদের বাধা-নিষেধ তুলে নিতে। কিন্তু তা নিশ্চিত ছিলো না এবং ইত্যবসরে দামেশক সফরের সৌভাগ্য আমার এবার আর হলো না… ‘কেন’ আমি নিজেকে জিগগাস করি, তিক্তভাবে, ‘দামেশক নিষিদ্ধ হলো আমার জন্য?’

কিন্তু আসলে কি তা-ই সত্য? অবশ্য আমার পাসপোর্ট নেই, টাকা-কড়িও নেই। কিন্তু পাসপোর্ট আর টাকা-কড়ি কি সত্যি একেবারে অপরিহার্য ছিলো…?

চিন্তায় এতোদূর আগানোর পর হঠাৎ আমি থেকে যাই। যদি মনোবল থেকে যথেষ্ট, আমি পায়দল সফর করতে পারি, আরব গেরামবাসীদের উপর ভরসা করে। এবং হয়তো- বা আমি কোন-না কোনভাবে গোপেন পার হয়ে যেতে পারি সরহদ-পাসপোর্ট আর প্রবেশপত্রের জন্য মাথা না ঘামিয়েই…।

এবং আমি এ ব্যাপারে পূরাপূরি অবহিত হওয়ার আগেই আমার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়ে গেলোঃ আমি দামেশ যাচ্ছি। আমি আবার মত বদলে ফেলেছি এবং শেষতক আমি জেরুযালেম যাচ্ছি না, বাস চালকদের একথা বোঝাতে মিনিট দূয়েক সময়ই ছিলো যথেষ্ট। আমার আরো কয়েক মিনিট লাগলো, একজোড়া নীল ওভার-অল ও একটি আরবী ‘কুফিয়া’ যোগাড় করতে… (এ হচ্ছে আরবের ঝলসানো রোদ্দুর থেকে বাঁচার সম্ভাব্য উত্তম উপায়) কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনস একটি থলেতে ভরতে আর আমার স্যুটকেসটি ডোরিয়ান, সি. ও ডি- এর নিকট পাঠাবার ব্যবস্থা করতে। এরপর আমি রওনা দিলাম দামেশকের দীর্ঘ পায়ে হাঁটা-পথে।

যে অদম্য মুক্তিবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করেছিলো তাকে সুখ থেকে আলঅদা করা সম্ভব ছিলো না। আমার পকেটে ছিলো মাত্র কয়েকটি ভাঙতি মুদ্রা। আমি একটি বেআইনী কাজের ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি, যার ফলে আমি নিক্ষিপ্ত হতে পারি জিন্দানখানায়। অস্পষ্ট, অনিশ্চিতরূপে আমার সামনে রয়েছে সরহদ পার হবার সমস্যাটি। আমি কেবল আমার চাতুর্যের উপর বাড়ি দিয়েছি এই উপলব্ধিই হলো আমার সুখের কারণ, আজ আমি সুখী।

আমি গ্যালিলির পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। বিকালের দিকে ‘ইস্ত্রেলন’ প্রান্তর পড়লো আমার ডানদিকে। আমি যে-পথ দিয়ে হাঁটছিলাম তার থেকে নিচু সেই প্রান্তর; এখানে ওখানে পড়েছে আলো আর ছায়ায় টুকরা টুকরা ফালি। আমি আগিয়ে গেলাম নাজারাতের মধ্য দিয়ে এবং রাতের আগেই পৌঁছুলাম একটি আরবীয় গায়েঁ- দারুচিনি আর সাইপ্রেস তরুর ছায়াঘেরা একটি পল্লীতে। পয়লা বাড়িটির দরোজায় বসে আছে তিন চারজন পুরুষ ও মেয়েলোক। আমি ওখান থেকে জিগগাস করি- এ গাঁ’টি ‘আর-রায়না’ কি না। যখন শুনলাম তা’ই, আমি আবার রওনা করতে উদ্যত হই। অমন সময় মেয়েদের একজন আমাকে ডাকলো- ‘ইয়া সিদি, আপনি কি নিজেকে একটু তাজা করে নেবেন না?’ তারপর, যেনো আমার পিয়াসের কথা বুঝতে পেরেই সে ঠাণ্ডা পানি ভর্তি একটি সুরাহী আগিয়ে দেয় আমার দিকে।

যখন আমি পানি খেয়ে জিঁউ ঠাণ্ডা করেছি তখন পুরুষদের একজন, বলাবাহুল্য, ঐ মেয়েটিরই স্বামী, আমাকে জিজ্ঞেস করেঃ

-‘আপনি কি মেহেরবানী করে আমাদের সাথে খানা খাবেন না? এবং রাতটা আমাদের ঘরেই কাটাবেন না?’

ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করলো না, আমি কে, কোথায় চলেছি এবং আমার উদ্দেশ্যই বা কী! আমি রাতটা ওখানেই কাটিয়ে দিলাম ওদের মেহমান হিসাবে।

কোন আরবের মেহমান হওয়া- ইউরোপের স্কুলের ছাত্র- ছাত্রীরা পর্যন্ত এ সর্ম্পে নানা কাহিনী শুনতে পায়। -কোন আরবের মেহমান হওয়ার অর্থই হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার জন্য, কিছুক্ষণের জন্য, সত্যিকারভাবে ও সম্পূর্ণভাবে এমন সব মানুষের জীবনে প্রবেশ করা যারা হতে চায় ‘আপনার ভাই বা বোন’। আরবদের অমন প্রবল, প্রাণঢালা মেহমানদারির মূলে যে কেবল একটা মহৎ ঐতিহ্যই কাজ করছে তা নয়, এর আসল কারণ হচ্ছে ওদের অন্তরের স্বাধীনতা। ওরা ওদের নিজেদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে অতোটা মুক্ত যে ওরা সহজেই ওদের হৃদয়কে মেলে ধরতে পারে অপরের কাছে। পশ্চিমী দেশগুলিতে প্রতিটি মানুষ তার নিজেরও পড়শীর মধ্যে যে-সব আপাতসুন্দর প্রাচীর গড়ে তোলে তার একটিও দরকার হয় না এই সব আরবের।

আমরা এক সঙ্গে খেলাম নারী ও পুরুষে মিলে, একটা মস্তবড়ো থালার চারপাশে, মাদুরের উপর পায়ের উপর পা রেখে বসে। থালাটি, মোটা করে ভাঙা গম আর দুধ মিশিয়ে তৈরি ‘পরিজে ভর্তি’। আমার মেজবানেরা বড়ো বড়ো অথচ কাগজের মতো পাতলা রুটির ছোট ছোট টুকরা ছিঁড়ে নিয়ে তার দ্বারা অমন কৌশলের সাথে পরিজ তুলছিলো যে, ওদের আঙুল কখনো লাগছিলো না পরিজে। আমাকে ওরা একটি চামচ দিলো; কিন্তু আমি তা না নিয়ে চেষ্টা করলাম, সাফল্যের সংগেই চেষ্টা করলাম ওদের সহজ অথচ পরিচ্ছন্ন চমৎকার খাবার পদ্ধতি অনুকরণ করতে এবং তাতে আমার বন্ধরা স্পষ্টই খুশি হলো।

আমরা যখন শুয়ে পড়লাম, প্রায় এক ডজন মানুষ, একই কোঠায়, আমি তাকালাম উপরে কড়িকাঠের দিকে, যেখান থেকে সারি সারি শুকনা মরিচ ও বেগুন গাছ ঝুলছে, তাকালাম তামা ও পাথরের তৈজস-পত্রে ভর্তি দেয়ারের তাকগুলির দিকে, আর ঘুমন্ত নারী ও পুরুষের দেহগুলির দিকে আর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আমার নিজের বাড়িই কি কখনো এর চাইতে বেশি আপনতরো মনে হতে পারতো আমার কাছে?

এরপরের দিনগুলিতে, যুদী পাহাড়ের মর্টে-বাদামী রঙ, তার নীলাভ-ধূসর আর বেগুনি ছায়া ধীরে ধীরে পেছনে পড়লে গ্যালিলির প্রসন্নতরো এবং উর্বরতরো পাহাড়গুলি নজরে এলো। বহু ফোয়ারা আর নহর আত্মপ্রকাশ করলো অপ্রত্যাশিতভাবে। লতাপাতা উদ্ভিত ক্রমেই ঘনতরো হয়ে ওঠে। দেখতে পেলাম- সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ঘন পত্রপুঞ্জে ছাওয়া জলপাই এবং উঁচু গাঢ় সাইপ্রেস বৃক্ষ; বিগত গ্রীষ্মের ফুল তখনো দেখা যাচ্ছিলো পাহাড়ের ঢালুগুলিতে।

কখনো কখনো আমি উট চালকের সাথে পথের কিছুটা অংশে হাঁটি এবং কিছুক্ষণের জন্য ওদের সরল হৃদয়ের উষ্ণতা উপভোগ করি। আমরা সবাই আমার ক্যান্টিন থেকে পানি খই এবং সকলে মিলে একই সিগ্রেট পান করি; তারপর আমি একাকী হাঁটি, রাতগুলি কাটাই আরবদের বাড়িতে,আর তাদের সংগে বসে তাদের রুটি খাই। আমি দিনের পর দিন হাঁটতে থাকি, গ্যালিলি হৃদের কিনার ঘেঁষে প্রসারিত গরম নিছু এলাকার ভেতর এবং হিউল হৃদ এলাকার মোলায়েম স্নিগ্ধ শৈত্যের মধ্য দিয়ে। হ্রদটি একটি ধাতব আয়নার মতো যার উপর রয়েছে রূপালী কুয়াশা, পানির উপর ঝুলে পড়া সন্ধ্যা- সূর্যের শেষ কিরণে কিছুটা রক্তিমাভ। উপকূলের নিকটেই বাস করে আরব জেলেরা, ডাল-পালা দিয়ে তৈরি করা চারের উপর কোন রকমে চাপিয়ে দেয়া পড়ের চাটাই- এর ঘরে। ওরা খুবই গরীব, কিন্তু ওদের এই হাওয়াই কুটিরে, রঙ-চটা, বিবর্ণ কিছু পরিচ্ছদ গায়ে, রুটি তৈরির জন্য কয়েক মুঠা গম এবং ওদের নিজেদের হাতে ধরা মাছ- এর বেশি কিছুর প্রয়োজন ওদের আছে বলে মনে হয় না, এবং সবসময়ই মনে হয় মুসাফিরকে ওদের ঘরে আহবান করা ও সংগে বসে খাওয়ার জন্য ওদের দাওয়াত প্রচুর রয়েছে।

ফিলিস্তিনের সবচাইতে উত্তরের স্থান হচ্ছে ইয়াহুদী উপনিবেশ মেতুলা; পরে আমি জানতে পেরেছিলাম এই মেতুলা ব্রিটিশ-শাসিত ফিলিস্তিন আর ফরাসী অধিকৃত সিরিয়ার মধ্যে একটুখানি ফাঁকা বিশেষ। দু’ গভর্নমেন্টের মধ্যে একটি চুক্তির ভিত্তিতে কিছুদিন পরই মেতুলা এবং পাশ্ববর্তী আরো দুটি উপনিবেশ ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্তবর্তীকালীন এই অল্প কটি হপ্তায় দু’ গভর্নমেন্টের কোনটিরই কার্যকর কোন কর্তৃত্ব ছিলো না মেতুলার উপর। কাজেই এটি ছিলো এক উত্তম স্থান, যেখান থেকে অতি সহজেই সিরিয়ায় ঢুকে পড়া যায়। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এরপর থেকে বড়ো রাস্তায় মুসাফিরদের কাছে থেকে সনাক্তি কাগড়-পত্র দাবি করা হয়। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণই নাকি কঠোর ছিলো বেশি। কার্যত বেশি দূর আগানো সম্ভবই ছিলো না। পুলিশ প্রত্যেক যাত্রীকেই বাধ্য করতো থামতে। তখনো মেতুলাকে মনে করা হতো সিরিয়ার একটি অংশ। কাজেই দেশের অন্য জায়গার বাসিন্দাদের মতোই, এখানকার প্রত্যেকটি বাসিন্দাদের ফরাসী কর্তৃপক্ষের দেয়া পরিচয়-পত্র বহন করতে হতো। এ ধরনের একটি পরিচয-পত্র যোগাড় করা আমার জন্য বিশেষ জরুরী হয়ে পড়লো।

আমি খুব সতর্কতার সাথে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর করতে থাকি। শেষপর্যন্ত আমাকে এমন একজন লোকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যিনি, হয়তো- বা কিছুটা লাভের বিনিময়েই, তাঁর নিজের পরিচয়-পত্রটি আমাকে দিয়ে দিতে পারেন। তিনি ছিলেন এক বিশাল পুরুষ, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স; বুক-পকেট থেকে ভাঁজকরা তেল চিটচিটে যে দলিলখানা তিনি বের করলেন তাতেও তাঁর বর্ণনা এরূপই ছিলো। কিন্তু দলিলটিতে কোন ফটোগ্রাফ না থাকায় সমস্যাটি অসমাধ্য মনে হলো না।

-‘আপনি এর জন্য কতো চান?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

-‘তিন পাউণ্ড’।

আমি আমার পকেটে যে ক’টি মুদ্রা ছিলো সব কটি বের করে গুণতে শুরু করি; গুণে দেখলাম পঞ্চান্ন ‘পিয়াস্তার’ আছে- অর্থাৎ কুল্লে আধ পাউণ্ডের সামান্য কিছু উপরে।

-‘এ-ই আমার সব’, আমি বললাম, ‘এ থেকে কিছুটা আমার সফরের বাকি অংশের জন্য অবশ্যি আমাকে রাখতে হবে। আমি আপনাকে কুড়ি পিয়াস্তারের বেশি দিতে পারবো না (অর্থাৎ তাঁর দাবির ঠিক এক-পঞ্চমাংশের বেশি দেবার ক্ষমতা আমার নেই)।

কয়েক মিনিট দর-কষাকষির পর ঠিক হলো পঁয়ত্রিশ ‘পিয়াস্তার’ দেয়া হবে। দলিলটা এখন আমার হাতে। এর একটা পাতা ছিলো ছাপানো, তাতে দু’টি কলাম- একটি ফরাসী ভাষায়, আরেকটি আরবীতে। প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ কালিতে লেখা হয়েছে বিন্দু বিন্দু রেখার উপরে। তাতে ব্যক্তিগত যে বর্ণনা রয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর খুব প্রয়োজন হয়নি আমার, কারণ এ ধরণের বর্ণনার বেলায় সাধারণত যা হয়ে থাকে এটিও তাই; অর্থাৎ বিস্ময়কভাবে অস্পষ্ট ঝাপসা এই বর্ণনা। কিন্তু তাতে যে বয়েস লেখা হয়েছে তা উনচল্লিশ অথচ আমার বয়স মাত্র তেইশ বছর এবং আমাকে দেখতে দেখায় কুড়ি বছরের। একজন অসতর্ক পুলিশ অফিসারের কাছেও এই গরমিল সহজেই ধরা পড়বে; কাজেই দলিলে বয়সের পরিমাণটা কমানো জরুরী হয়ে পড়লো, তবে বয়সের উল্লেখ কেবল এক জায়গায় থাকলে এ পরিবর্তন তেমন অসুবিধাজনক হতো না, কিন্তু আমারই বদনসিব, তা লেখা হয়েছে ফরাসী এবং আরবী উভয় ভাষাতেই। খুবই হুঁশিয়ারির সাথে আমি কলম ব্যবহার করি এই অংকটি বদলাবার জন্য; কিন্তু তাতে যা দাঁড়ালো সে জালিয়াতি বিশ্বাস পয়দা করার খুব উপযোগী মনে হলো না। আর চোখ আছে অমন হরেক আদমির কাছেই ধরা পড়বে যে, দুটি কলমেই অংকটি বদলানো হয়েছে। কিন্তু এছাড়া আর কোন করণীয় ছিলো না আমার। আমাকে নির্ভর করতে হবে আমার কপাল এবং পুলিশের অমনোযোগিতার উপর।

খুব সকালে আমার ব্যবসায়ী ইয়ারটি আমাকে নিয়ে গেলো গাঁয়ের পেছনে একটি গলিতে এবং প্রায় আধ মাইল দূরের কয়েকটি টিলার দিকে আঙুলি নির্দেশকরে বলল- ‘অই যে সিরিয়া’।

আমি গলির ভেতর দিয়ে চলছিলাম। তখন সকাল হলেও খুবই গরম পড়েছিলো এবং যে বৃদ্ধা আরব মহিলাটি টিলার কাছে এক গাছতলায় বসেছিলো, যে- টিলার ওপারেই রয়েছে সিরিয়া, তারো নিশ্চয়ই খুবই গরম লাগছিলো, কারণ সে শুকনো ভাঙা গলায় আমাকে ডেকে বললঃ

-‘তুমি কি এই বুড়িকে একটু পানি খাওয়াবে বেটা?’

আমি আামর এই মাত্র ভর্তি করা ক্যান্টিন কাঁধ থেকে নামিয়ে ওকে দিই। বুড়ি লোভীর মত ঢক ঢক করে খায় এবং ক্যান্টিনটি আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলেঃ

-‘আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত করুন; তিনি তোমাকে সহিসালামতে রাখুন এবং তোমার কাম্য মনযিলে পৌঁছিয়ে দিন।‘

-‘শুকরিয়া মা, আমি এর বেশি কিছু চাই না। এবং যখন আমি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম বৃদ্ধার ঠোঁট দুটি প্রার্থনায় কাঁপছে- আন্দোলিত হচ্ছে; আমি এক অদ্ভুত উল্লাস অনুভব করলাম।

আমি টিলাগুলি পর্যন্ত পৌঁছে সেসব পেছনে ফেলে যাই। আমি এখন সিরিয়ার। আমার সামনে পড়ে আছে এক বিস্তীর্ণ অনুর্বর সমতল এলাকা। বহু দূরে, দিগন্তের কাছে আমি দেখতে পেলাম গাছপালার চেহারা, আর অমন কিছু যা দেখতে অনেকটা ঘরের মতো। নিশ্চয়ই এ ‘বানিয়াস’ শহর। এই সমতল এলাকাটি আমার ভালো লাগলো না; কারণ এতে নেই গাছপালা, ঝোপঝাড় যার আড়ালে আবডালে গা ঢাকা দেয়া যেতে পারে, যা সরইদের অতো নিকটে বলেই প্রয়োজনীয় হযে উঠতে পারে। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। কেউ যখন স্বপ্নে এক জনবহুল রাস্তার মধ্য দিয়ে উলংগ হয়ে হাঁটে তখন তার স্বপ্নে যেমন মনে হয় আমারও নিজেকে ঠিক সেইরূপ মনে হলো।

তখন অনেকটা দুপুর হয়ে গেছে যখন আমি একটা ছোট নহরের কাছে পৌঁছুই- যে নহরটি প্রস্তরটিকে করেছে দু’ভাগ। আমি বসে জুতা ও মোজা খোলার চেষ্টা করছি এমন সময় দূরে তাকিয়ে দেখি চারটি ঘোড়-সওয়ার আসছে আমার দিকে। ওদের রাইফেলগুলি জিনের উপর আড়াআড়িভাবে রাখা; ফলে ওদেরকে দেখাচ্ছিলো ভয়ানক চেহারার ফৌজী পুলিশের মতো। আসলে ওরা ফৌজী পুলিশই ‘বটে’। তাই আমার পালানেরা চেষ্টা করার কোন মানেই হতো না। আমি মনে মনে এভাবে সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করি যে, যা ঘটনার তাই ঘটবে। এখন যদি ধরা পড়ি, আমাকে হয়তো রাইফেলের কয়েক ঘার বেশি দেয়া হবে না, আর আমাকে ওরা আবার নিয়ে যাবে মেতুলায়।

আমি নহরটি পার হয়ে উপরে গিয়ে বসি এবং খুব আস্তে আস্তে পা শুকাতে থাকি আর ফৌজী পুলিশেরা কাছে আগিয়ে আসক, তারি ইন্তেজারি করি। ওরা এসে আমার দিকে সন্দেহের নজরে তাকায়; কারণ যদিও আমি আরবী পাগড়ী পরেছিলাম, আমি যে একজন ইউরোপীয় তাতে কোন সন্দেহই ছিলো না।

-‘কোত্থেকে?’ ওদের একজন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আরবী জবানে আমাকে জিগগাস করে।

-‘মেতুলা থেকে।‘

-‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’

-‘দামেশকে’।

-‘মতলব?’

-‘ও, তেমন কিছু নয়, প্রমোদ ভ্রমণ!’

-‘কাগজপত্র কিছু আছে?’

-‘অবশ্যি’।

সংগে সংগে ‘আমর’ পরিচয়-পত্র বের হয়ে এলো আমার পকেট থেকে আর তার সংগে আমার হৃদপিণ্ডটা উঠে এলো আমার মুখে। ফৌজী পুলিশ কাগজের ভাঁজ খুলে তার দিকে তাকিয়ে দেখলো। আমার হৃদপিণ্ডটি আবার পিছলে নেমে গেলো যথাস্থানে আর স্পন্দিত হতে শুরু করলো। কারণ আমি দেখতে পেলাম, কাগজটির উপর দিকটা ও নিচু করে ধরেছে; বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ও পড়তে জানে না। দু’তিনটি বড়ো বড়ো সরকারী মোহরেই সে সন্তুষ্ট, কারণ সে কী ভাবতে ভাবতে কাগজটি আাবর ভাঁজ করে আমার হাতে ফিরিয়ে দেয়ঃ

-‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে, যেতে পারেন’।

মুহূর্তের জন্য ইচ্ছা হলো, আমি ওর সাথে মুসাফা করি, কিন্তু পরে আবার ভাবলাম আমাদের সম্পর্কটিকে পুরোপুরি সরকারী সম্পর্ক রাখাই ঠিক হবে; লোক চারজন ঘোড়া ঘুরিয়ে কদমতালে দূরে হারিয়ে যায় এবং আমি আবার সফর শুরু করি আমার নিজ পথে।

বানিয়াসের কাছে এসে আমি পথ হারিয়ে ফেলি। আমার ম্যাপে যা বর্ণিত ছিলো ‘চাক্কাওয়ালা গাড়ি-ঘোড়া চলার লায়েক রাস্তা’ হিসাবে, দেখা গেলো, তা প্রায় এক অদৃশ্য পথ, আর স্তেপভূমি, জলা, ও ছোট-খাট নদী-নহর পার হয়ে একেঁ বেঁকে চলে গেছে সেই পথ এবং শেষতক একদম ফূরিয়ে গেছে বড়ো বড়ো পাথর-ছড়ানো কতকগুলি টিলার কাছে এসে। এই টিলাগুলির উপর আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াই কয়েক ঘণ্টা, চড়াই-উৎরাই ভেঙে এবং এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বিকালে দেখা হয়ে গেলো দুটি আরবের সাথে; ওরা গাধার পিঠে চাপিয়ে আঙুর আন পনির নিয়ে যাচ্ছিলো বানিয়াসে। রাস্তার শেষ নাগাদ আমরা এক সাথেই হাঁটি। ওরা আমাকে খেতে দিলো রসালেঅ আঙুর। শহরের আগে বাগানে পৌঁছে আমরা নিজ নিজ পথ ধরি। রাস্তার পাশে একটি স্বচ্ছ, সরু খরগতি স্রোত উচ্ছ্বলিত! আমি আমার বুকপেট যমীনে রেখে শুয়ে পড়ি, বরফ-ঠান্ডা পানিতে কান নাগাদ মাথা ডুবিয়ে দিই এবং পানি গিলতে থাকি- খেতে থাকি।

আমি খুবই লেংগা, খুবই ক্লান্ত বটে, তবু বানিয়াসে থাকার ইচ্ছা আমার নেই- কারণ আমার আশংকা, এটি সিরিয়ার দিকের পহেলা ফাঁড়ি হওয়ায় এখানে নিশ্চয়ই পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ফৌজ পুলিশের সাথে আমার মোলাকাত সাধারণ সিরীয় সেপাই সম্পর্কে আমাকে অনেকটা নিশ্চিত করেছে- কারণ ধরে নেয়া যায়, ওদের বেশির ভাগই উম্মী, নিরক্ষর এবং সে কারণে ওরা আমার জালিয়াতি ধরতে অক্ষম, অপারগ। কিন্তু পুলিশ ফাঁড়ি, যেখানে রয়েছে একজন অফিসার, তার কথা আলাদা। আমি তাই ক্ষিপ্র পায়ে অলিগলির ভেতর দিয়ে বাজারের বড়ো রাস্তাটি এড়িয়ে চলতে শুরু করি, কারণ পুলিশ ফাঁড়ি ঐ রাস্তায়ই থাকার সম্ভাবনা বেশি। একটি গলিতে আমি শুনতে পেলাম বাঁশের বাঁশির সুর আর হাততালির সংগে একটি মানুষের গান। তাতে আকৃষ্ট হয়ে আমি ঘুরে আসি বাঁকটি আর এক্কেবারে নির্বাক, নিশ্চল দাঁড়িয়ে যাই। আমার ঠিক উল্টা দিকেই সম্ভবত দশ পা দূরে রয়েছে একটি দরোজা যার উপর খোদিত রয়েছে দুটি শব্দ ‘পুলিশ-ফাঁড়ি, তাতে রয়েছে কয়েকজন সিরীয় পুলিশ, তাদের মধ্যে একজন অফিসার। ওরা বিকালে রোধে টুলের ওপর একজন সাথীর গান উপভোগ করছে। এখন পিছু হটার কোন উপায় নেই; কারণ ওরা এরি মধ্যে আমাকে দেখে ফেলেছে এবং অফিসারটি, বাহ্যত সে-ও একজন সিরীয়, আমাকে ডেকে বলল- ‘ওহে এদিকে আসো!

হুকুম তামিল করা ছাড়া উপায় নেই। ধীরে ধীরে আসতে থাকি আমি, হঠাৎ আমার মগজে একটি বুদ্ধি খেলে যায়। ক্যামেরা হাতে নিয়ে আমি অফিসারটিকে ফরাসী ভাষায় অভিনন্দন জানাই এবং তার সওয়ালের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকিঃ

-‘আমি মেতুলা থেকে আসছি এই শহরে, সংক্ষিপ্ত সফরের জন্য। কিন্তু আপনার যে-বন্ধুর গান আমাকে অমন মোহবিষ্ট করেছে, তার এবং আপনার ফটো না নিয়ে আমি এখান থেকে ফিরছি না’।

আরবরা তোষামোদ পছন্দ করে। তার উপর ওরা নিজেদের ছবি তুলে আনন্দ পায়। তা্ই অফিসারটি মৃদু হাসির সাথে আমার প্রস্তাবে সম্মতি জানায় এবং আমাকে অনুরোধ করে আমি যেনো ফটো ডেভেলপ আর প্রিন্টিং-এর পর তার ফটো তাকে পাঠাই (আমি তা পাঠিয়েছিলাম আমার ধন্যবাদসহ)। আমার পরিচয়-পত্র চাওয়ার কথা তার আর মনেই পড়লো না। তার বদলে সে আমাকে মিষ্টি চা খাইয়ে আপ্যায়িত করে। এবং অবশেষে আমি যখন মেতুলায় ফিরে যাবার জন্য উঠলাম, আমাকে সে ‘শুভ বিদায়’ জানালো। আমি যে পথে এসেছিলাম সে পথে আবার পেছনে ফিরে যাই, শহরের চারদিকে চক্কর দিয়ে আসি এবং এভাবে আবার দামেশকের পথ ধরি।

হাইফা ছাড়ার ঠিক দু’হপ্তা পর আমি বেশ বড়ো একটি গাঁয়ে এসে পৌঁছাই, বলা যায় একটি শহর, যার নাম মাজদাল আশশামস। এ গাঁয়ে বেশির ভাগই দ্রুজ এবং কিছু খ্রিস্টান বাস করে। আমি একটি বাড়ি পছন্দ করলাম; মনে হলো বেশ সম্পন্ন মানুষের বাড়ি। কড়া নাড়তেই দরোজা ফাঁক করে বার হয়ে এলো এক নৌযোয়ান। ওকে আমি বললাম, রাতের জন্য আশ্রয় পেলে আমি সরফরায হবো। চিরাচরিত ‘আহলান ওয়া সাহলান’ সম্ভাষণের সাথে দরোজা একেবারে খুলে গেলো এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখতে পেলাম, আমি এই ছোট্ট পরিবারে সাদরে গৃহীত হয়ে গেছি।

আমি এখন সিরিয়ার অনেক ভেতরে। এখান থেকে অনেক পথই রয়েছে দামেশকের। তাই আমি আামার দ্রুজ মেজবানকে বিশ্বাস করে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইবার ইরাদা করি। আমি জানতাম যে, কোন আরবই তার মেহমানের প্রতি বে-উফাই বা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। তাই আমি তাকে সমস্ত কিছু খুলে বলি, এমন কি, আমি যে জাল পরিচয়-পত্র নিয়ে সফর করছি-তা’ও। আমার মেজবান তখন আমাকে বলল, বড়ো রাস্তা ধরে চলা আামার পক্ষে বিপজ্জনক হবে খুবই। কারণ, এখান থেকে শুরু করে গোটা রাস্তাই ফরাসী ফৌজী পুলিশেরা পাহারা দিচ্ছে; ওরা সিরীয় পুলিশের মতো অতো সহজে আমাকে ছেড়ে দেবে না।

-‘আমি ভাবছি, তোমার সাথে আমার ছেলেকে পাঠাবো, আমার মেজবান বলল- যে নৌযোয়ান আমার জন্য দরোজা খুলে দিয়েছিলো তার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে- ‘ও তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, তোমাকে মদদ করবে, যাতে তুমি এড়িয়ে চলতে পারো বড়ো রাস্তাগুলি’।

সন্ধ্যার আহারের পর আমরা বাড়ির সামনে খোলা চত্বরে বসি এবং পরদিন সকালে কোন পথ ধরবো তাই নিয়ে আলোচনা করি। আমার হাঁটুর উপর মেলা রয়েছে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার একখানি ছোট্ট ম্যাপ, জার্মানীতে তৈরি। আমি জেরুজালেম থেকে এটি নিয়ে এসেছি সাথে করে। এই ম্যাপের উপর অনুসরণের চেষ্টা করি আমার দ্রুজ বন্ধুর প্রদর্শিত রাস্তা। আমরা যখন এই আলাপে মশগুল রয়েছি, পুলিশ অফিসারের উর্দিপরা একটি লোক, বোঝাই যাচ্ছিলো একজন সিরীয়, সে গাঁয়ের পথে পায়চারি করতে করতে এসে হাজির হয়। আড়াল থেকে লোকটি অমন হঠাৎ আবির্ভূত হলো যে, ম্যাপটি ভাঁজ করারই সময় পেলাম না, ওর নজর থেকে ওটি গোপন করার তো কথাই ওঠে না। অফিসারটি বুঝতে পারলো যে, আমি একজন পরদেশী, কারণ মেজবানের প্রতি একটুখানি মাথা ঝুঁকিয়ে চত্বরটি পার হয়ে সে আস্তে আস্তে আমাদের কাছে পৌঁছে।

-‘কে আপনি?’ ফরাসী জবানে আমাকে ও জিজ্ঞাসা করে এমন এক স্বরে যা খুব নির্দয় বলে মনে হলো না।

আমি আামর চিরদিনের অভ্যাস মতো দীর্ঘ অংসলগ্ন বক্তৃতায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকি, আমি মেতুলাবাসী একজন ঔপনিবেশিক, প্রমোদ সফরে বেরিয়েছি। তবু যখন সে আমার কাছে পরিচয়-পত্র দাবি করে বসলো আমি তা ওর হাতে না দিয়ে পারলাম না। মনোযোগের সাথে ও কাগজটি দেখলো, আর তার ঠৌঁট দু’টি বেঁকে গেলো একটা শুকনো হাসিতে। – ‘কিন্তু আপনার হাতে ওটি কী?’ জার্মান ম্যাপটির দিকে ইশারা ক’রে আমাকে ও প্রশ্ন করে।

-‘এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়’, আমি বলি; কিন্তু অফিসারটি ওটা দেখবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয় এবং ম্যাপ দেখতে অভ্যস্ত মানুষের কুশলী আঙুল দিয়ে ভাঁজ খুলে কয়েক সেণ্ডে ম্যাপটির দিকে চেয়ে থাকে, তারপর সযত্নে আবার ভাঁজ করে স্মিত হাসির সাথে আমার হাতে তা ফিরিয়ে দেয়। তারপর ভাঙা জার্মান জবানে বলেঃ

-‘যুদ্ধের সময় আমি জার্মানদের পাশাপাশি তুর্কী বাহিনীতে কাজ করেছি’। -কথা শেষ করে ফৌজ কায়দায় আমাকে স্যালুট করে দাঁত বের করে ও আবার হাসে, তারপর চলে যায়।

-‘ও বুঝতে পেরেছে তুমি একজন ‘আলেমানি’- অর্থাৎ জার্মান, জার্মানদের ও ভালবাসে এবং ফরাসীদের ঘেন্না করে। ও আর তোমাকে বিরক্ত করবে না’।

পরদিন সকালে, আমি আমার তরুণ দ্রুজ সাথীটিকে নিয়ে পথচলঅ শুরু করি। খুব সম্ভব এ সফর ছিলো আমার জীবনের দুরূহতম সফর। দুপুরে বিশ মিনিটের খানিক বিরতিসহ আমরা এগারো ঘণ্টারও বেশি চলি, শিলাময় পাহাড় ডিঙিয়ে, বড়ো বড়ো পাথরের মধ্য দিয়ে, ধারালো নূড়ি পাথরের উপর সন্তর্পণে পা ফেলে, উৎরাই-চড়াই চড়াই-উৎরাই ভেঙে- যতক্ষণ না আমি টের পেলাম যে, আমার আর হাঁটার শক্তি নেই। যখন আমরা বিকালে দামেশকের সমতল অঞ্চলে আল-কাতানা শহরে পৌছুলাম তখন আমি একেবারে ভেঙে পড়েছি- আমার পায়ের আঙ্গুলগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে, আর আমার পা দু’টি গেছে ফুলে। আমার ইচ্ছা হলো, রাতটা এখানেই কাটাই, কিন্তু আমার তরুণ বন্ধুটি বাধা দেয় প্রবলভাবে, চারপাশে বহু ফরাসী পুলিশ রয়েছে এবং এটি যখন গাঁ নয় শহর, এখানে মনোযোগ আকর্ষণ না করে আশ্রয় পাওয়অ সহজ হবে না মোটেই। একমাত্র উপায় হচ্ছে, এখান থেকে দামেশকের মধ্যে যে মোটর চলাচল করে তারি একটিতে চড়ে বসা। এখনো আমার হাতে রয়েছে কুড়ি ‘পিয়াস্তার’ (হাইফা থেকে, আমার গোটা সফরে একটি পেনিও খরচ করতে হয়নি)। এবং এখান থেকে দামেশকে যাওয়ার গাড়ি ভাড়াও কুড়ি ‘পিয়াস্তার’।

শহরের প্রধান চকে ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদারের ভাঙাচোরা অফিসে আমি জানতে পারলাম পরবর্তী গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত আমাকে এখানে প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমি আমার বন্ধু রাহনুমার কাছ থেকে বিদায় নিই; ও আমাকে আলিংগন করে আপন ভাইয়ের মতো, তারপর দেরী না করে নিজ বাড়ি ফেরার পথ ধরে। বুকিং অফিসের দরোজার কাছে ন্যাপস্যাকটি পাশে রাখে শেষ বিকালের মিষ্টি রোদে আমি ঢুলছিলাম। হঠাৎ একজন লোক আমার কাঁধ ধরে খুব জোরে ঝাঁকুনি দেয়ায় আমার ঝিমুনি টুটে যায়; লোকটি একজন সিরীয় ফৌজী পুলিশ। আমি মামুলি প্রশ্নাদির মুকাবিলা করি এবং মামুলি জওয়াব দিই। কিন্তু মনে হলো, লোকটি আামার জবাবে খুশি হতে পারেনি।

-‘আমার সাথে থানায় চলুন’, -এ বলে, ভারপ্রাপ্ত অফিসারের সাথে কথা বলূন’।

আমি এমনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি ধরা পড়ি বা না পড়ি তা আর আমার জন্য মোটেই ভাবনার বিষয় ছিলো না।

ইস্টিশন-কামরায় পেছনে বসা ‘অফিসার’টি একজন হৃষ্টপুষ্ট লম্বা চওড়া ফরাসী সার্জেন্ট; তার সামনেই ডেস্কের উপর রয়েছে আরকের একটি খালি বোতল আর একটি ময়লা গ্লাস। সে শরাবে একেবারেই চুর হয়ে রেগে মেগে আছে; খুন-রাঙা চোখ মেলে উৎকট দৃষ্টিতে সে তাকালো পুলিশটির দিকে যে আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে।

-‘এখন আবার কী?’

পুলিশটি তাকে আরবী জবানে বোঝায়- সে আমাকে, একজন পরদেশীকে, প্রধান চকে বাস থাকতে দেখে। এদিকে আমি তাকে ফরাসী জবানে বুঝাই যে, আমি পরদেশী নই, আমি একজন অনুগত নাগরিক।

-‘অনুগত নাগরিক?’ সার্জেন্টটি চিৎকারে করে ওঠে- ‘তোমরা হচ্ছো নচ্চর, বাউণ্ডেলে। দেশের ভেতর ঘোরাফেরা করো- কেবল আমাদেরকে উত্ত্যক্ত করার জন্য। কোথায় তোমার কাগজপত্র?

নিতান্ত অসহায়ভাবে আমি সোজা শক্ত আঙুল দিয়ে পকেট হাতড়চ্ছি আমার পরিচয়- পত্রের জন্য, এমন সময় সে তার বদ্ধমুষ্ঠি দিয়ে একটি কিল মারে টেবিলের ওপর আর ঝড়ের মত গর্জন করে ওঠেঃ

-‘থাক, দরকার নেই, বেরোও এখান থেকে’ এবং বের হয়ে আসতে আসতে যখন আমি আমার পেছন দিকে দরোজা লাগাচ্ছি আমি দেখতে পেলাম, সে আবার হাতে গ্লাস ও বোতল তুলে নিচ্ছে।

দীর্ঘ, দরাজ পায়দল সফরের পর আল-কাতানা থেকে মোটরে করে কোশাদা রাজপথের উপর দিয়ে, ফল-ফুলের বাগিচায় ঢাকা দামেশক প্রান্তরে প্রবেশ- কী যে এক মুক্তি, কী যে আরাম সে গাড়ি চড়ে! না, যেনো হাওয়ায় ভয় করে ভেসে চলা! দিগন্তে রয়েছৈ আমার মনযিল, ঘন সন্নিবিষ্ট গাছের মাথায় মাথায় তৈরি এক অন্তহীন সমুদ্দুর, আসমানের পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে কয়েকটা গম্বুজ এবং মিনার, আবছা আবছা। অনেক দূরে কিছুটা ডানদিকে, দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ অনাবৃত পাহাড়টির চূড়া, এখনো সূর্যের কিরণে স্নাত, যদিও নরম ছায়া এরি মধ্যে লতিয়ে উঠতে শুরু করেছে ওর তলদেশে। সেই পাহাড়ের উপর ঝুলে আছে কেবল একখন্ড মেঘ- সরু, দীর্ঘ, ঝলোমলো, কালচে; দূরে হালকা নীল আসমান, একেবারে সোজা, খাড়া-প্রান্তরের উপর আমাদের ডান ও বাঁয়ের পাহাড়গুলির পটভূমিকায় ছড়িয়ে আছে ঘুঘু-ধুসর এক স্বর্ণাভা। আর হাওয়া- সে কতো হালকা!

তারপর- পথে পড়ে ফুলের উঁচু উঁচু বাগিচা, মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা; নানা রকমের সওয়ারী, ঠেলাগাড়ি, জানোয়ারে টানা গাড়ি, সৈনিক (ফরাসী সৈনিক) কতো কি! গোধূলি সবুজ হয়ে এলো পানির মতো। একজন অফিসার মোটর সাইকেলে করে প্রচণ্ড ধ্বনি তুলে পাশ দিয়ে ছুটে যায়, চোখে তার মস্ত বড়ো গগলস- এক ধরনের গভীর সমুদ্দুরের মাছের মতো দেখতে। তারপর- প্রথমে বাড়িটি পাশে পড়ে। তারপর- তারপরই দামেশক, খোলা প্রান্তরের নীরবতার পর হট্টগোলে উচ্ছ্বাসিত, উদ্বোলিত ফেনপুঞ্জ যেনো। জানালায় আর রাস্তায় সন্ধ্যার প্রথম বাতি সব জ্বলে উঠেছে। আমার সত্ত্বা উল্লাসিত হলো অমন একটা আনন্দের অনুভূতিতে যা আমি মনে রাখতে পারিনি।

কিন্তু আমার খুশি, আমার আনন্দ হঠাৎ চুরমার হয়ে গেলো, যখন শহরের কিনারায় ‘থানা’র কাছে এসে গাড়িটি থেমে গেলো।

-‘ব্যাপার কী?’ আমি আমার পাশে বসা গাড়ি-চালককে জিজ্ঞাস করি।

-‘ওহ, কিছুই না। বাইরে থেকে যতো গাড়ি আসে তার প্রত্যেকটিকে এখানে পৌঁছুনোর পর পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে হয়’।

ইস্টিশন থেকে একজন সিরীয় পুলিশ বের হয়ে আসেঃ

-‘আপনি কোত্থেকে আসছেন?’

-‘কেবল আল-কাতানা থেকে,’ ড্রাইভারটি জবাব দেয়।

-‘বেশ, তাহলে যেতে পারেন, (কারণ এ হচ্ছে নেহায়েতই স্থানীয় সফর) ড্রাইভার দাঁত কিড়মিড় করে গাড়ি স্ট্রার্ট দেয়। আমরা চলতে শুরু করি এবং অবাধে শ্বাস-প্রশ্বাস নিই। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আবার কে একজন রাস্তা থেকে চিৎকার করে ওঠে- ‘ছাদ ঢিলা হয়ে পড়েছে’, এবং ‘থানা’ ছাড়িয়ে কয়েক পা পরেই ড্রাইভারটি তার নড়বড়ে গাড়িখানা থামালো খোলা ছাদটি ঠিক করার জন্য, যা এতোক্ষণ ঝুলে পড়েছে একপাশে। ড্রাইভার যখন এ নিয়ে ব্যস্ত তখন পুলিশটি আবার আস্তে আস্তে আগিয়ে এলো আমাদের দিকে- মনে হলো ড্রাইভারের যান্ত্রিক গোলাযোগ ছাড়া আর কিছুর প্রতিই সে আকৃষ্ট নয়। পরে অবশ্য, তার নজর পড়লো আামার উপর, আমি দেখলাম আর সংগে সংগে আমার সারা শরীর কঠিন হয়ে উঠলো; ওর চোখ দু’টি সজাগ-সতর্ক হয়ে উঠেছে; আমার মাথা থেকে পা নাগাদ ও জরীপ করছে। আরো কাছে এসে ও তীর্যক দৃষ্টিতে তাকালো গাড়ির মেঝের দিকে, যেখানে আমার ন্যাপস্যাকটি পড়ে আছে।

-‘আপনি কে?’ সন্দিগ্ধ কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাস করে।

-‘মেতুলা থেকে’ – আমি শুরু করি; কিন্তু দেখলাম, পুলিশটির মাথা সন্দেহে দুলছে। তারপর ও ফিসফিস করে কথা বলে ড্রাইভারটির সাথে। আমি শব্দগুলি বুঝতে পারছিলাম- ‘ইংরেজ সিপাই, দলত্যাগী’। এবং এই পহেলা আমার জ্ঞান হলো যে, আামার নীল ওভারকোট, আমার বাদামী জরীর কাজ করা ইগাল-চাপা ‘কুফিয়া’ আর আমার ফৌজী-ধরনের ন্যাপস্যাক (যা আমি কিনেছিলাম জেরুজালেমে, একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে( সবকিছুরই মিল রয়েছে আইরিশ কনস্টেবলের পোশাকের সাথে, যাদেরকে সে সময়ে নিয়োগ করেছিলেন ফিলিস্তিন সরকার। এ-ও আমার মনে পড়লো, ফরাসী ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে, উভয়ই নিজ নিজ দলত্যাগীদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবে।

আমি আমার ভাঙা ভাঙা আরবী বুলিতে পুলিশটিকে বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি দলত্যাগী নই, কিন্তু ও আমার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বলেঃ

-‘সবকিছু ইন্সপেকটর সাবকে বুঝান’।

এবং এভাবে আমাকে মজবুর হয়েই যেতে হলো থানায়। ড্রাইভার বিড়বিড় করে বলল- ও আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না; এরপর সত্যি ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আমার চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলো। ইন্সপেকটর তখন থানায় ছিলেন না; তবে আমাকে বলা হলো, যে- কোন মুহূর্তেই তিনি ফিরে আসতে পারেন। আমাকে একটি কামরায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কামরাটিতে একটিমাত্র বেঞ্চি রয়েছে বসবার জন্য, আর দরোজা রয়েছে দু’টি, প্রধান প্রবেশ পথটি ছাড়া। একটির উপর খোদাই রয়েছে ‘কারারক্ষি’ এই কথা দুটি; আর অন্যটির উপর লেখা ‘কয়েদখানা’ এই শব্দটি। এই অস্বাস্তকর পরিবেশে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো আধ ঘন্টারও বেশি, এবং প্রতি মুহুর্তে আমার এ বিশ্বাস পাকাপোক্ত হতে লাগল যে, আমার সফরের এই খানেই শেষ; কেননা আমার কাছে ইন্সপেকটর শব্দটি শুধু অফিসার শব্দটির চেয়ে অনেক অনেক বেশি অশুভ মনে হলো। আমি যদিএখন ধরা পড়ি, আমাকে কয়েকদিন, হয়তো, কয়েক হপ্তা হবে জেলে, বিচারাধীন কয়েদী হিসেবে; তারপর আমাকে দেওয়া হবে প্রথা অনুযায়ী তিন মাসের শাস্তি। এভাবে জেলখানায় তিন মাসের শাস্তি ভোগের পর আমাকে আবার রওনা করতে হবে পায়দল—ঘোড় সওয়ার ফৌজী পুলিশের প্রহরাধীনে, আবার ফিলিস্তিন সহরদের দিকে এবং সর্বপরি, পাসপোর্ট আইনের খেরাপ করার অপরাধে আমাকে হয়তো বের করে দেয়া হবে ফিলিস্তিন থেকে। ওয়েটিংরুমে যে বিষন্নতা বিরাজ করছে আমার বিতরের বিষাদের তুলনায় কিছুই নয়।

হঠাৎ আমার কানে এলো একটি গাড়ির শব্দ। গাড়িটি থানায় ঢুকে পথের সামনেই এসে থামে; মুহূর্তকাল পরেই, গাড়ি থেকে নেমে এলো একজন লোক, বেসামরিক পোশাকে, মাথায় ‘তারবুশ’ পরা। তার পিছু পিছু নামে একটি পুলিশ যে উত্তেজিতভাবে কিছু বোঝাতে চেষ্টা করছে সাদা পোশাক পরা লোকটাকে। বোঝাই যাচ্ছে, ইন্সপেক্টর অতিমাত্রায় ব্যস্ত।

এরপর যা ঘটলো তা যে ঠিক কেমন করে ঘটলো তা আমি জানি না। সেই সংকট মুহূর্তে আমি যা করলাম তা হয়তো প্রতিভার সেই দুর্লভ এক হঠাৎ-ঝলকানির ফল, যা আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে আর ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে এমন-একেকটি ঘটনার জন্ম দেয় যা ইতিহাসকে দেয় বদলে। আমি এক লাফ মেরে দাঁড়ালাম এসে ইন্সপেক্টরের একেবারে কাছে, তারপর তার প্রশ্নাদির অপেক্ষা না করেই তার উপর ছুঁড়ে মারলাম ফরাসী জবানে এক ঝাঁক অনর্গল নালিশ, পুলিশটির অপমানজনক বিশ্রী ব্যবহারের বিরুদ্ধে, যে আমাকে আমার মতো একজন মাসুম নাগরিককে দলত্যাগী সেপাই গণ্য করেছে, যার জন্য শহরে যাওয়ার গাড়ি আমাকে হারাতে হয়েছে! ইন্সপেক্টর কয়েকবার আমাকে থামাবার চেষ্টা করলো- কিন্তু আমি তাকে সুযোগ দিলাম না একবারও, আর এক অনর্গল শব্দ- প্রবাহ দ্বারা আমি আচ্ছন্ন করে দিই তাকে, যার দশ ভাগের এক ভাগও সে বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না, ‘মেতুলা’ ‘দামেশক’- এ দু’টি নাম ছাড়া। যা অগুণতিবার আমি উল্লেখ করেছি আামার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে আমি উল্লেখ করেছি আমার কথার মধ্যে। বোঝা গেলো, তার এক জরুরী কাজ থেকে তাকে আটকে রাখার জন্য সে বিব্রত বোধ করছে। কিন্তু আমি তাকে একটি কথাও বলতে দিলাম না, নিশ্বাস নেবার জন্যও না থেমে আমি অবিরাম চালিয়ে যাই আমার শব্দের গোলাবাজি। শেষপর্যন্ত সে তেক্ত-বিরক্ত হয়ে হাত ছুঁড়ে মারলো শূন্যে আর চিৎকার করে উঠলোঃ

-‘থামুন, থামুন, আল্লাহর ওয়াস্তে থামুন। আপনার কোন কাগজপত্র আছে?’

আমার হাত যান্ত্রিকভাবেই প্রবেশ করে আমার বুক-পকেটে এবং তখনো অনর্গল স্রোতে কথার পর কথা বলতে বলতেই আমি আমার জাল পরিচয়-পত্রকানা তার হাতে গুঁজে দেই। অসহায় লোকটির হয়তো তখন এই উপলব্ধিই হয়েছিলো যে, সে ডুবে যাচ্ছে, কারণ সে দ্রুত ভাঁজ করে কাগজটির একটি কোণের উপর লক্ষ্য করে এবং সরকারী স্ট্যাম্পটি দেখে আর তারপর সেটি ছুঁড়ে মারে আমার উপর।

-‘ঠিক আছে, হু, সব ঠিক আছে, এখন যান, মেহেরবানী করে কেবল যান।‘ আমি তার অনুরোধের পুনরাবৃত্তির জন্য অপেক্ষা করলাম না।

কয়েকমাস আগে জেরুজালেমে এক দামেশকী শিক্ষকের সাথে আমার দেখা হয়। তিনিই আমাকে দাওয়াত করেছিলেন, আমি যখন দামেশকে আসি, আমি যেন তাঁর মেহমান হই। তাঁর বাড়ির খোঁজে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একটি ছোট্ট ছেলে রাজী হয়ে গেলো আমার পথ-প্রদর্শক হতে। সে-ই আমার হাত ধরে আমার উদ্দিষ্ট বাড়ির পথ ধরলো।

গাঢ় সন্ধ্যা, পুরানো নগরী। রাস্তাগুলি চিপা; সংকীর্ণ রাস্তার উপর ঝুলে থাকা কোঠাগুলির জানালা, রাত যতোটা আঁধার করে তুলতে পারে তার চাইতে বেশি আঁধার করে তুলেছে রাস্তাগুলিকে। এখানে ওখানে কেরোসিনের হলদে আলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি- কোন-না কো ফলওয়ালার দোকান, যার সামনেই রয়েছে স্তূপীকৃত তরমুজ এবং ঝুড়িভর্তি আঙুর। মানুষগুলি যেনো ছায়ামূর্তি। কখনো কখনো খড়খড়ির জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসে কোন রমনীর বাজখাঁই গলার আওয়াজ। তারপর সেই ছোট্ট ছেলেটি একবার বলে উঠলো- ‘এই যে সেই বাড়িটি’।

আমি একটা দরোজায় ধাক্কা দিই। কে একজন ভেতর থেকে জবাব দেয়। আমি দরোজার সিটকিনি খুলে প্রবেশ করি একটি শান-বাঁধা প্রাংগণে। আঁধারেও আমি দেখতে পেলাম, ফলের ভারে নুয়ে পড়া আঙুরের গাছসমূহ এবং একটি পাথরের বেসিন যা থেকে উচ্ছিত হচ্ছে একটি ফোয়ারা। কে একজন উপর থেকে ডেকে বলল-

-‘তফদ্দল, ইয়া সিদি, মেহেরবানী করে প্রবেশ করুন’! আমি তখন ঘরের বাইরের দেয়ালের পাশ ঘেঁষে ওঠা একটি সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি এবং একটি খোলা চত্বর পার হয়ে একেবারে আমার বন্ধুর দরাজ আলিংগনে গিয়ে পড়ি।

আমি তকন ক্লান্ত অবসন্ন- একেবারেই হৃতশক্তি। তাই আমাকে যে বিছানা দেয়া হলো তাতেই আমি ধপ করে ছেড়ে দিলাম নিজেকে। সুমুখের প্রাংগণের গাছগুলিতে এবং বাড়ির পেছনের বাগানের গাছপালার হাওয়ার মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। দূর থেকে ভেসে এলো অনেক স্তিমিত ধ্বনিঃ এক বৃহৎ আরব্য নগরী ঘুমিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তারই আওয়াজ!

একটা নতুন উপলিব্ধির উত্তেজনা নিয়ে, যে-সব বস্তু বা বিষয় সম্বন্ধে আগে আমার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিলো না সেগুলির প্রতি চোখ খোলা রেখে, আমি সেই গ্রীষ্মের দিনগুলিতে দামেশকের পুরানো বাজারের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আর তার বাসিন্দাদের জীবনকে যে অপূর্ব প্রশান্তি ঘিরে রেখেছে তা অনুভব করছিলাম। ওদের অন্তরের এই নিরাপত্তাবোধ লক্ষ্য করতাম একের প্রতি অন্যের ব্যবহারে, যে আবেগ-উষ্ণ মর্যাদাবোধের সাথে ওরা একে অপরের সাথে দেকা করে বা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয় তাতে, অপরকে বন্ধু বলে ভাবে কেবল এ-কারণেই শিশুদের মতো পরস্পর হাত ধরে দু’টি মানুষ যেভাবে এক সাথে চলে তার মধ্যে- দোকানীদের একের প্রতি অন্যের আচরণে, ছোটো দোকানের সেইসব ব্যবসায়ী যারা অবশ্যই পথচারীদের চিৎকার ক’রে ডাকবে- মনে হতো না এ- সব নাছোড়বান্দা দোকানীর কোন বুক চাপা ভয় আছে কিংবাওদের মধ্যে কোন ঈর্ষা আছে, -বিশ্বাস অতোটা চূড়ান্ত পর্যায়ের যে দোকানের মালিক, যখনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাবার দরকার হয় সে তার দোকনপাট তার প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দোকানদারের হেফাজতে রেখে চলে যায় বিনাদ্বিধায়। আমি প্রায়ই দেখতাম, এভাবে ফেলে যাওয়া দোকানের সামনে থেমেছে কোন সত্যিকারের খদ্দের, বোঝাই যাচ্ছে সে নিজের মনে মনে ভাবাগোনা করছে- দোকানদার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, না সে যাবে পাশের দোকানে জিনিস কিনতে। আর সে অবস্থায় প্রত্যেকবারই পাশের দোকানীট, যে আসলে অনুপস্থিত দোকানীর প্রতিদ্বন্দ্বী, আগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করছে, খদ্দের কি চায় এবং তার নিকট বিক্রি করছে অনুপস্থিত দোকানীর দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসাপাতি- তার নিজের জিনিস নয়, তার অনুপস্থিত প্রতিবেশীর জিনিস, এবং দামটা সে রেখে দিচ্ছে প্রতিবেশীর বেঞ্চির উপর। ইউরোপে এ  ধরনের বেচাকেনা কে কবে কোথায় দেখেছে!

 

বাজারের কোন কোন বাস্তায় জটলা পাকায় শক্ত সবল পরিশ্রমী বেদুঈনেরা, প্রশস্ত লম্বা ঝুলওয়ালা জোমব্বা প’রে। ওরা এমনিতরো মানুষ যে, দেখলেই মনে হয় ওরা যেনো নিজেদের জীবনকে নিজেরাই সংগে নিয়ে চলেছে এবং সবসময়ই চলছে নিজেদের পথে। দীর্ঘদেহী লোকগুলি, গভীর জ্বলজ্বলে ওদের চোখ, দল বেঁধে ওরা দাঁড়া, না হয় বসে পড়ে দোকানের সামনে। একে অন্যকে খুব বেশি কথা ওরা বলে না- একটি শব্দ, একটি ছোট্ট বাক্য মন দিয়ে বললে এবং মন দিয়ে তা শুনলে, দীর্ঘ আলাপের জন্য তা-ই হয় যথেষ্ট। বুঝতে পারলাম, এই বেদুঈনের দল অযথা বকবক করতে জানে না। বকবক করা মানে সেই ধরনের কথা বলা যার কোন বিষয় নেই, যাতে নেই কোন ঝুঁকি, যা ক্ষয়িত আত্মার একটা বিশেষ চিহ্ন। এবং আমার মনে পড়লো আল-কুরআনের সেই শব্দগুলি যাতে বর্ণনা করা হয়েছে জান্নাতের জীবনকে- ‘এবং তুমি সেখানে শুনতে পাবে না কোন অসার কথা’। মনে হলোঃ নীরবতা হচ্ছে একটি বেদুঈন গুণ। ওরা নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করে চওড়া বাদামী, সাদা অথবা কালো জোব্বায় এবং চুপ করে থাকে। ওরা যখন আপনার পাশ দিয়ে যায় ওরা আপনার দিকে তাকাবে শিশুর নীরব দৃষ্টিতে- গর্বিত, নম্র ও সজাগ। আপনি যখন ওদের সম্বোধন করেন ওদের ভাষায় ওদের কালো চোখের তারায় সহসা স্ফূরিত হয় স্মিত হাস্য! কারণ ওরা নিজেদের মধ্যে ডুবে থাকে না এবং ওরা চায় যে, অপরিচিতরা ওদের বুঝুক। ওরা হচ্ছে ‘অভিজাত…. শরীফ’ …. একেবারেই চুপচাপ অথচ জীবনের সকল বিষয়ের প্রতিই মুক্ত হৃদয়।

শুক্রবারে, যা মুসলমানদের  ছুটির দিন, আমি দামেশকের জীবনে লক্ষ্য করতাম এক ছন্দ পরিবর্তন, আনন্দময় উত্তেজনার একটুখানি চাঞ্চল্য, একটা ঝটকা এবং তারই সাথে ভাবের গাম্ভীর্য। আমার মনে পড়লো- ইউরোপে আমাদের রোববারগুলির কথা- নগরীর নির্জন রাস্তাঘাট এবং বন্ধ দোকানপাটের কথা, সেই সব অর্থহীন শূন্যগর্ভ দিন আর সেই শূণ্যতা যা দুর্বহ পীড়ন এনে দিতো, তার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এরূপ কেনই বা হবে। ক্রমে আমার এই উপলব্ধি হতে লাগলোঃ এর কারণ, প্রতীচ্যের প্রায় সকল লোকের কাছেই ওদের রোজকার জীবন হচ্ছে একটি বোঝা, যা থেকে কেবল রোববারগুলিই ওদের দিতে পারে নিস্তার। রোববার এখন আর অবকাশের দিন নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অবাস্তত জগতে, এক আত্মপ্রতারণামূলক বিস্মৃতিতে পালানোর একটি উপায়, যে বিস্মৃতির পেছনে উকি মারছে দ্বিগুণ ভারী আর ভয়ংকর বিগত হপ্তার দিনগুলি।

এদিকে, আরবদের কাছে কিন্তু শুক্রবার হপ্তার বাকি দিনগুলি বিস্মৃত হবার একটি সুযোগ নয়; এর মানে এ নয় যে, এ লোকগুলির কোলে জীবনের ফল-ফসল সহজে এবং অনায়াসে ঝরে পড়ে। বরং এর সোজা মানে হচ্ছে- ওদের পরিশ্রম, হোক না কঠোরতম, ওদের ব্যক্তিগত আরজু- আকাঙ্ক্ষার সাথে সংঘাত বাঁধায় না। রুটিনের জন্যে রুটিন এদের জীবনে নেই। তার পরিবর্তে একজন কর্মরত মানুষ ও তার কাজের মধ্যে রয়েছে একটা নিবিড় আন্তরিক যোগ। কাজেই এদের জীবনে বিশ্রামের শুধু তখনি প্রয়োজন হয় যখন ওরা ক্লান্তি বোধ করে। মানুষ আর তার কাজের মধ্যে সংগতি, এই মিলকে ইসলাম নিশ্চয়ই স্বাভাবিক অবস্থা বলে বিবেচনা করে, আর এজন্যই শুক্রবার বাধ্যতামূলক বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। কুটির শিল্পী এবং দামেশক বাজারের দোকানীরা কয়েক ঘণ্টা  কাজ করে, কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকানপাট রেখে দিয়ে ওরা যায় মসজিদে জুম’আর সালাত আদায় করতে। তারপর কোন ক্যাফেতে গিয়ে বসে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ করে। এরপর ওরা আবার ফিরে আসে ওদের দোকানপাটে, নিজ নিজ কাজে। এবং আরো কয়েক ঘণ্টা আনন্দ ও স্ফুর্তির সাথে তারমুক্ত হৃদয়ে ওরা কাজ করে চলে, যার যেমন খুশি। মাত্র অল্প ক’টি দোকানই আমি বন্ধ করতে দেখেছি এবং সে-ও কেবল সালাতের সময়ে, যখন লোকজন গিয়ে জমা হতো মসজিদে। দিনের বাকি সময়ে রাস্তাগুলিতে মানুষ গমগম করে, কর্মমুখর থাকে হপ্তার অন্য দিনগুলির মতোই।

এক শুক্রবারে আমি ‘উমাইয়া মসজিদে’ গিয়েছিলাম আমার এক দোস্তকে নিয়ে, যাঁর মেহমান ছিলাম আমি। মসজিদের গম্বুজ অনেকগুলি স্তম্বের উপর দাঁড়িয়ে আছে; জানালার ভেতর দিয়ে আলো এসে পড়ায় তা ঝলমল করছে। বাতাসে ভাসছে মেশকের খোশবু। মসজিদের মেঝেটি লাল নীল কার্পেট দিয়ে ঢাকা। দীর্ঘ সমান সমান সারিতে কাতারবন্দী হয়ে লোকেরা দাঁড়িয়েছে ‘ইমামে’র পেছনে। ওরা মাথা নিচু করছে, হাঁটু গেড়ে বসছে ভূমিতে ঠেকাচ্ছে কপাল এবং আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে; সকলের মধ্যে এক সুশৃংখল ঐক্য, সৈনিকদের মতো। এমনি নিরিবিলি চুপচাপ ব্যাপার। লোকেরা যখন জামা’আতে দাঁড়ালো, আমি অনেক দূরে। বিশাল মসজিদের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম বৃদ্ধ ‘ইমামে’র কণ্ঠস্বর। তিনি কুরআনের আয়াত আবৃত্তি করছিলেন। তিনি যখন মাথা নিচু করছেন বা সিজদায় যাচ্ছেন, গোটা জামা’আতেই একটিমাত্র ব্যক্তির মতো অনুসরণ করছে তাঁকে। আল্লাহর সামনে তারা মাথা নিচু করছে এবং সিজদায় যাচ্ছে, যেন আল্লাহ তাদের চোখের সামনেই রয়েছেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলামঃ এই লোকগুলির কাছে ওদের আল্লাহ এবং ধর্ম কতো কাছের, কতো আপন!

-‘কী বিস্ময়কর! কী চমৎকার!’ আমি আমার বন্ধুকে বলি মসজিদ থেকে বের হতে হতে- ‘তোমরা আল্লাহকে তোমাদের এতো কাছে বলে অনুভব করো! আমার ইচ্ছা হয়, আমি নিজেও যদি ঠিক এরূপ অনুভব করতে পারতাম’।

-‘কিন্তু ভাই, এর চেয়ে অন্যরূপ হওয়াই বা কি করে সম্ভব? আমাদের পবিত্র কিতাব যেমন বলে, “আল্লাহ কি তোমাদের গর্দানের রগের চেয়েও তোমার নিকটতরো নন?’

এই নতুন উপলব্ধিতে চঞ্চল হয়ে আমি দামেশকে আমার প্রচুর সময় ব্যয় করি, ইসলাম সম্পর্কে যখনি যে কিতাব পাই তা-ই পড়ে পড়ে। আরবী ভাষার উপর আমার দখল কথাবার্তার জন্য যথেষ্ট হলেও তখনো তা মূল কুরআন পাঠের জন্য ছিলো খুবই অপ্রচুর। কাজেই আমি দু’টি তর্জমার আশ্রয় নিই- একটি ফরাসী, অপরটি জার্মান। তর্জমাগুলি আমি সংগ্রহ করেছিলাম এক লাইব্রেরী থেকে এছাড়া বাকী সবকিচুর জন্য আমাকে নির্ভর করতে হলো ইউরোপীয় প্রাচ্যাতত্ত্ববিদদের বই-পুস্তক আর আমার বন্ধুর ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণের উপর।

যতো আংশিক এবং বিচ্ছিন্নই হোক না কেন, আমার জন্য এই সব পড়াশোনা এবং আলাপ-আলোচনা হলো যবনিকা তোলার মতো- এমন একটি চিন্তার জগৎ দেখতে শুরু করলাম যার বিষয়ে  এতোদিন আমি ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

 

মনে হলোঃ ধর্মকে সাধারণ অর্থে লোকে যা বোঝে ইসলাম সে রকম কিছু নয়- বরং এ যেন এক জীবন-ব্যবস্থা, শাস্ত্রবিধি এ যতোটুকু নয় তার চইতে অনেক অনেক বেশি গুণে, এ হচ্ছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের একটি কর্মসূচী, যার  ভিত্তি আল্লাহর উপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআনে কোথাও আমি কোন উল্লেখ পেলাম না

‘পরিত্রাণের’ প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। ব্যক্তি এবং তার নিয়তিম মধ্যে কোন আদি জন্মগত পাপ দাঁড়িয়ে নেই; কারণ মানুষ কিছুই পাবে না যার জন্য সে চেষ্টা-সাধনা করে তা ছাড়া’। পবিত্রতার কোন গোপন প্রবেশদ্বার খোলার জন্য কোন কৃচ্ছব্রত বা সন্ন্যাসের প্রয়োজন নেই- এবং আল্লাহ যে-সব সহজাত কল্যাণকর গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন প্রতিটি মানুষকে সেগুলি থেকে বিচ্যুতিই তো পাপ। পাপ তো এছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের প্রকৃতি বিচার করতে গিয়ে কোন দ্বৈতবাদের অবকাশ রাখা হয়নি। দেহ আর আত্মা মিলে এক অখণ্ড সত্তা মনে করে ইসলাম।

প্রথমে আমি কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং আপাতদৃষ্টিতে যা জীবনের তুচ্ছ এবং বৈষয়িক ব্যাপার তা নিয়েও আল-কুরআনের ঔৎসুক্যে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে শুরু করলামঃ মানুষ যদি দেহ আর আত্মা নিয়ে একটি গোটা সত্তা হয়ে থাকে, যা ইসলাম দাবি করে, তাহলে জীবনের কোনদিকই এতো তুচ্ছ হতে পারে না যে, তা ধর্মীয় এখতিয়ারের বাইরে পড়বে। এ সব বিষয়কে নজরে রেখেই কুরআন কখনো তার অনুসারীদের একথা ভূলতে দেয় না যে মানুষের এই পার্থিব জীবন মানুষের উচ্চতর জীবনের পথে একটি স্তর মাত্র এবং তার চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক প্রকৃতির। বৈষয়কি উন্নতি ও সমৃধ্ধি কাম্য, কিন্তু তা-ই লক্ষ্য নয়। এজন্য, মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণার যদিও নিজস্ব যৌক্তিকতা আছে তবু তা নৈতিক চেতনার দ্বারা অবশ্য সংযত ও নিয়ন্ত্রিক করতে হবে। কেবল যে আল্লাহর সংগে মানুষের সম্পর্কের সাথে এই চেতনার যেগা থাকবে তা নয়, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের সাথেও এর যোগ থাকবে; কেবল সৃষ্টির সংগেও তার সম্পর্ক থাকবে যা সকলের আত্মিক বিকাশেরও অনুকুল, যা’তে করে সকল মানুষই পূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে।

এ সবই ছিলো, এর আগে আমি ইসলাম সম্বন্ধে যা কিছু শুনেছি এবং পড়েছি সে-সব থেকে, মানসিক নৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশি ‘শ্রদ্ধেয়’। আত্মিক জগতের সমস্যাবলী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভংগী ওল্ড টেস্টামেন্টের চাইতে অনেক বেশি গভীর মনে হলো। অধিকন্তু বিশেষ একটি জাতির প্রতি ওল্ড টেস্টামেন্টের যে পক্ষপাত দেখা যায় এতে তা-ও নেই। তা ছাড়া, জৈবিক সমস্যাবলীর প্রতি এর দৃষ্টি নিউ টেস্টামেন্টের চাইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং খুবই ইতিবাচক। আত্মা ও দেহের সম্পর্ক, দুয়ের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট নিয়ে, আল্লাহ-র সৃষ্ট মানব-জীবনর যগল দিক ছাড়া আর কিছু নয়।

-‘এই শিক্ষাই কি,’ আমি জিজ্ঞাসা করি নিজেকে,’ এতোদিন আরবদের মধ্যে যে আবেগ অনুভূতির নিশ্চয়তা আমি উপলব্ধি করেছি, তার জন্য দায়ী নয়?’

এক সন্ধ্যায় আমার মেহমানদার আমাকে দাওয়াত করেন তাঁর সংগে দামেশকের এক ধনী বন্ধুর বাড়িতে খানার মজলিসে। বন্ধুটি তাঁর এক পুত্রের জন্মোৎসব পালন করেছিলেন।

আমরা দু’জনে হাঁটছিলাম ভেতরের নগরীর আঁকা-বাঁকা গলিপথে। এতোই সংকীর্ণ সে গলি যে, রাস্তার দু’পাশের বাড়ি-ঘরের দেয়াল থেকে রাস্তার উপর বের হয়ে আসা জানালা ও জাফরি দেওয়া ব্যালকনি প্রায় গায়ে গায়ে ঠেকেছে। পাথরের তৈরি পুরানো বাড়িগুলির মধ্যে জেঁকে আছে গাঢ় ছায়া আর প্রশস্ত নীরবতা, কখনো কখনো দু’একটি কালো বোরখায় ঢাকা মেয়ে ত্বরিৎ ছোট্ট পদক্ষেপে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। একবার দেখলামঃ একজন দাড়িওয়ালা লোক লম্বা ‘কাফতান’ গায়ে, পথের একটি মোড় থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো অন্য এক মোড়ে। রাস্তার মোড় এবং অনিয়মিত কোণগুলি সর্বত্র একই ধরনের; একই রকম সংকীর্ণ গলি, যার একটি অপরটিকে কেটে চলে গেছে নানাদিকে, হামেশাই এই প্রতিশ্রুতিসহ যে, সামনেই কোন-না- কোন বিস্ময়কর আবিষ্কার রয়েছে এবং প্রত্যেকবারই একই ধরনের অন্য এক গলিতে গিয়ে মিশিছে!

কিন্তু আবিস্ক্রিয়াটি ঘটলো একেবারে শেষে। আমার বন্ধু এবং রাহনুমা একটা সাদামাটা, মাটির আস্তর দেয়া দেয়ালের উপর স্থাপিত নাম নম্বরহীন এক কাঠের দরোজার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং মুষ্টবদ্ধ হাত দিয়ে দরোজায় ধাক্কা দিতে দিতে বললঃ এই যে, আমরা এসে পড়েছি।

একটা ক্যাঁচকোচ শব্দ করে দরজাটা খুলে যায়। একজন একদম বুড়ো লোক তার দন্তহীন মুখে আমাদের খোশ আমদেদ জানালো ‘আহলান ওয়া সাহলান’ বলে। তারপর আমরা একটি ছোট্ট করিডোরের ভেতর দিয়ে, যার ছিলো দুটি সমকোণবিশিষ্ট বাঁক, ঢুকলাম বাড়ির প্রাংগণে- যা বাইরে থেকে একটি মেটে রঙের খোলার বেশি কিছু মনে হচ্ছিলো না।

প্রাংগণটি প্রশস্ত এবং হাওয়া খেলানো। সাদা এবং কালো রঙের মার্বেলের টুকরা দিয়ে প্রাঙগণটি মোড়ানো। দেখতে মনে হয় যেন মস্ত বড়ো একটা দাবার ছক। মাঝখানে একটি নিচু আট কোণা বেসিন থেকে একটি ফোয়ারা খেলছে, গুঁড়া গুঁড়া পানি ছিটাচ্ছে। মার্বেলে মোড়া মেঝের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ছোট ছোট ফাঁক। সেই ফাঁকগুলিতে লাগানো লেবু গাছ এবং ওলিয়েগুরের ঝোপ তাদের ফুল-ফলে নূয়ে পড়ে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে সমস্ত প্রাংগণের উপর এবং ভেতরের গৃহপ্রাচীরের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে, দেয়ালগুলি ভূমি থেকে ছাদ পর্যন্ত অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য করা অ্যালাবাস্টার রিলিফে ঢাকা যাতে রয়েছে জটিল জ্যামিতিক নকশা আর লতাপাতা আঁকা আরাবেষ্ক, ব্যতিক্রম কেবল খিড়কিগুলি যাতে স্থাপন করা হয়েছে মার্বেলের উপর খোলা জলির কাজ করা প্রশস্ত ফ্রেম। প্রাংগণের একদিকে দেয়ালগুলি বেঁকে গিয়ে ভূমি থেকে প্রায় তিন ফুযট উঁচুতে তৈরি করেছে একটি গভীর কুলুংগি, যার আকার একটি বড় কোঠার মতো, যেখানে উঠতে হয় মার্বেরের প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে। এই যে কুলুংগিটি, যাকে বলা হয় ‘লিওয়ান’- এর তিনটি দেয়াল ঘেঁষে পাতা রয়েছে নিচু বুটিদার দিওয়ান এবং মেঝের উপর বিছানো রয়েছে একটি খুব দামী গালিচা। কুলুংগির দেয়ালগুলিতে লাগানো হয়েছে বড় বড় আয়না, যার একেকটির উচ্চতা হবে প্রায় পনেরো ফুট এবং গোটা প্রাংগণটি, তার গাছপালা, তার সাদা-কালো মেঝে, তার অ্যালাবাস্টার, রিলিফ, মার্বেলের জানালার জালি এবং বাড়ির ভেতরে ঢোকার খোদাই করা দরোজা, আর মেহমানদের বর্ণাঢ্য ভিড়, যাদের কেউ কেউ বসেছে দিওয়ানে আর কেউ কেউ পানির বেসিনটির চারপাশে ঘোরাফেরা করছে- এ সব কিছুই প্রতিবিম্বিত হচ্ছিলো লিওয়ানের’ আয়নাগুলিতে এবং আমি যখন সেগুলির দিকে তাকালাম, আমি আবিস্কার করলাম, উঠানের বিপরীত প্রাচীরটিও আগাগোড়া এমনি আয়না  দিয়ে মোড়ানো, যার ফলে গোটা দৃশ্যটিই প্রতিবিম্বত হচ্ছিলো দু’বার চারচার শতবার এবং এভাবে রূপ নিচ্ছিলো এক ইন্দ্রজালে, মার্বেল আ্যলবাস্টার, ফোয়ারা, অগণিত লোকজন, লেবু গাছের ঝাড়, ওলিয়েণ্ডার, ঝোপের অন্তহীন পরিক্রমণ- এক অন্তহীন স্বপ্নপূরী ঝলমল করছে সান্ধ্য আকাশের নিচে, যার বর্ণ অন্তহীন সূর্যের রশ্মিতে এখনও গোলাপী।

এ ধরনেদর একটি বাড়ি, রাস্তার দিকে সাদামাটা, অলংকৃত, ভেতরে জমকালো ও মনোরম, আমার কাছে ছিলো একেবারেই অভিনব। কিন্তু কালক্রুমে আমি জানতে পারলাম, কেবল সিরিয়া এবং ইরাকে নয়, বরং ইরানেরও সংগতিপন্ন মানুষের চিরাচরিত বাসগৃহের এই হচ্ছে নমুনা। আগেকার দিন আরব কিংবা ইরানী কেউই বাড়ির সমুখভাগ নিয়ে মাথা ঘামাতো না। তাদের কাছে ঘর ছিলো বাস করার জন্য এবং এর উপযোগিতা ছিলো ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ জিনিসটি, আধুনিক পশ্চিমা স্থাপত্যে জোর করে যে ‘উপযোগিতা’ সৃষ্টির এতো চেষ্টা করা হয়ে থাকে কতোই না ভিন্ন। এক ধরনের বিকৃত রোমান্টিসিজমের জালে আটকা পড়া, নিজস্ব অনুভূতি সম্পর্কে অনিশ্চিত প্রতীচ্যের লোকেরা আজকাল বাড়ির নকশা করতে গিয়ে তৈরি করে সমস্যা, আর আরব এবং ইরানীরা তৈরি করে, অথবা গতকালও তৈরি করতো, ঘর।

আমার মেহমানদার আমাকে তাঁর ডান পাশে দেয়ালের উপর বসালেন। একটি নগ্নপদ নওকর ছোট্ট একটি পিতলের ট্টেতে করে কফি পরিবেশন করে; গুড় গুড় আওয়াজ ওঠা ‘নারকেলে’র হুকা থেকে ধোঁয়া উঠে ‘লিওয়ানে’ গোলাব পানির খোশবু মিশানো হাওয়ার সংগে মিলে যায় এবং কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেসে যায় কাঁচের ঢাকনা দেয়া মোমবাতিরগুলির দিকে আর মোমবাতিগুলি জ্বলানো হচ্ছিলো একটির পর একটি, দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে এবং গাছপালায় ঘনায়মান সবুজের ফাঁকে ফাঁকে।

উপস্থিত লোকজন সকলেই পুরুষ এবং অতি বিচিত্র ধরনের। ওদের অনেকের গায়ে ডোরাকাটা খসখসে দামেশকী রেশেম অথবা হাতীর দাঁতের বর্ণবিশিষ্ট মোটা চীনা রেশেমের কাফতান অথবা নীলচে মিহি পশমের বিশাল ‘জোব্বা’। আর মাথায় লাল ‘তরবুশে’র উপর জরির কাজ করা সাদা পাগড়ি।কেউ কেউ পরেছে ইউরোপীয় পোশাক, কিন্তু তা নিয়েই, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ওরা দিওয়ানের উপর, গায়ের উপর পা রেখে বসে আছে পরম আরামে। কোন কোন বেদুঈন সর্দার ওদের দলবল নিয়ে এসেছে স্তেপ অঞ্চল থেকে, ওদের চোখগুলি উজ্জ্বল, আর কৃশ বাদামী রংয়ের মুখে খাট কালো দাড়ি। ওদের প্রত্যেকটি অংগ সঞ্চালনের সংগে সংগে ওদের নতুন কাপড়-চোপড়ের খসখস আওয়াজ হচ্ছে; ওরা প্রত্যেকেই বহন করছে রূপার খাপে ঢাকা তলোয়ার। আলস্যভরে পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত আরামের ভংগী ওদেরঃ খাঁটি অভিজাত ওরা- কেবল ওদের বেলা ইউরোপীয় অভিজাতদের থেকে তফাতটা এই যে, ওরা বহু পুরুষের আন্তরিক যত্ন এবং ভদ্র জীবন- যাপনের ফলে উদ্ভুত মৃদু উজ্জ্বল এক জাত নয়, বরং ওরা যেন নিজেদের অনুভূতির নিশ্চয়তা থেকে বার হয়ে আসা তপ্ত আগুন। সুন্দর বাতাস, একটি শুকনা পরিষ্কার আবহাওয়া ওদেরকে ঘিরে আছে। ঠিক একই ধরনের আবহাওয়া তার বিশুরদ্ধতার দ্বারা ঘিরে রেখেছে সবাইকে, তবে অযাচিতভাবে নয়। এই লোকগুলি যেন সূদুরের বন্ধু, এ জায়গার ক্ষণিক মুসাফিরঃ ওদের মুক্ত লক্ষ্যহীন জীবন ওদের  জন্য অপেক্ষা করছে অন্য কোথাও।

 

নাচনেওয়ালী এক মেয়ে বের হয়ে এলো একটি দরোজা দিয়ে এবং হালকা পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো ‘লিওয়ানে’। মেয়েটি বয়সে খুবই কাঁচা, নিশ্চয়ই কুড়ি বছরের বেশি হবে না এবং দেখতে অতি খুবসুরত। চড়চড় আওয়াজ করা, অবস্থান বদলের সাথে সাথে রং বদলায় এমনি এক ধরনের রেশমের ঢেউ খেলানো ইজার পরে, সোনালী রয়ের এক জোড়া চটি পায়ে আর মুক্তার বর্ডার দেয়া বডিস পরে, যা যতোটুকু না ঢেকেছে তার চাইতে বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে তার উঁচু উন্নত স্তন যুগকে, মেয়েটি আগালো এমনি এক তরুণীর ইন্দ্রিয়জ সৌন্দর্য ছড়িয়ে যে সকলের প্রশংসা পেতে ও বাঞ্ছিত হতে অভ্যস্ত আর তরুণীটির নরম মোলায়েম অংড়-প্রত্যংগ এবং তার টান টান হাতির দাঁতের মতো শ্রভ্র ত্বকের দৃশ্যে এই মজলিসের ভেতর দিয়ে আনন্দের যে একটা কল্লোল উঠলো, আমি যেন তা শুনতে পেলাম।

মেয়েটি তার সাথেই ‘লিওয়ানে’ যে মাঝারি বয়সের লোকটি এস ঢুকেছে তার হাতের তবলার বোলের সংগে তাল রেখে ঐ ধরনের চিরাচরিত কামোদ্দীপক নাচ নাচতে শুরু করে যা প্রাচ্যের অতি প্রিয় জিনিস, ঘুমন্ত বাসনাকে জাগিয়ে তোলা আর রুদ্বশ্বাস বাসনা পূর্তির আশ্বাস দানই যে নাচের উদ্দেশ্য।

-‘ওহো, কি বিস্ময়কর তুমি! ওহো, কি চমৎকার তুমি!’ আমার মেহমানদার বিড় বিড় করে, তারপর আমার হাঁটুতে আলতো করে থাপপড় মেরে বলে, ‘ছুড়ি কি একটি জখমের ওপর স্নিগ্ধ শীতল মলমের মতো নয়?’

নাচনেওয়ালীটি যেমন দ্রুত এসেছিলো তেমনি ত্বরিৎ আবার সে চলে গেলো- তার কিছুই আর অবশিষ্ট রইলো না কেবল বেশিরভাগ লোকের চোখে একটি অস্পষ্ট ঝিকিমিকি ছাড়া। ‘লিওয়ানে’র গালিচার উপর এখন নাচনেওয়ালীর স্থান গ্রহণ করেছে চারজন গায়ক। মেহমানদের একজন আমাকে বললঃ ‘এদের মধ্যে কেউ কেউ হচ্ছে সিরিয়ার সেরা গায়ক’। ওদের একজনের হাতে একটি লম্বা গলাওয়ালা বাঁশের বাঁশী। অপরজনের হাতে একটা চ্যাপটা এক মাথাওয়ালা ঢোল, অনেকটা ঘুংঘুর ছাড়া তাম্বয়ার মতো, তৃতীয় জনের হাতে এমন একটি যন্ত্র রয়েছে যা দেখতে গীটারের মতো এবং চতুর্থ জন নিয়েছে একটি মিসরীয় ‘তাম্বুরা’ যেনো একটা খুব চওড়া পিতলের বোতল, যার তলা ঢোলের চামড়া দিয়ে মোড়া।

প্রথমে ওরা খেলাচ্ছলে সূক্ষ্মভাবে টুঙটাঙ আওয়াজ তোলে, ঢোলে আঘাত করে, কোন রকম অনুভবযোগ্য স্পষ্ট তান লয় ছাড়াই; যেন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, যেন তারা যন্ত্রগুলিতে সূর তুলছে একটা সাধারণ উর্ধ্বমূখী তাল সৃষ্টির প্রস্তুতি হিসাবে। যার হাতে গীটার রয়েছে সে তার যন্ত্রে তারগুলির উপর দিয়ে উঁচু থেকে নিচু দিকে কয়েকবার তার আঙৃলের ডগা টেনে নেয়, ফলে একটা নিয়ন্ত্রিত বীণাধ্বনির আমেজ সৃষ্টি হয়। তাম্বারা-বাদক মোলায়েমভাবে তার ‘তাম্বারা’ বাজায়, বিরতি নেয় এবং আবার বাজায়। বাঁশীওয়ালা যেন আনমরা পর পর দ্রুতপতিতে কয়েকটি নিচু, তীক্ষ্ণ তন্ত্রীতে আঘাত করে, এমন সব তন্ত্রী, যা মনে হয়, যেন আকস্মিকভাবেই শুষ্ক একঘেঁয়ে বার বার আঘাত করা খঞ্জনীর সংগে মিলে যাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে বাঁশীর, পরমূহূর্তে গীটারের তারের প্রচণ্ড ঝংকারের প্রতি দ্বিধার সংগে সাড়া  দিতে

‘তাম্বুরা’কে বাধ্য করছে- আমি এ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার আগেই একটি ঐকিক তান লয়, চারটি যন্ত্রকে এক সংগে বেঁধে দিলো আর একটি ঐকতানে রূপ নিলো। একটি ঐকতান?- আমি বলতে পারবো না, আমার মনে হলো, একটি সংগীত অনুষ্ঠানের প্রতি আমি যতোটা না মন দিয়েছি তার চেয়ে বেশি আমি প্রত্যক্ষ করছি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা। আর যন্ত্রগুলির অবোধ্য তীক্ষ্ম স্বর থেকে জন্ম নিলো একটি নতুন তান লয়, যা উঠছে উচ্চগ্রামে, যেন গাঢ়, শংখের মত পেঁচানো রেখায় এবং তারপর হঠাৎ নেমে যাচ্ছে একেবারে নিচুতে, একটা ধাতব বস্তুর ছন্দময় উত্থান ও পতনের মতোঃ কখনো দ্রুতগতিতে, কখনো আস্তে, কখনো মোলায়েম ভাবে, কখনো সজোরে, নিস্পৃহ ঐকান্তিকতা ও আন্তহীন পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নির্বিঘ্ন ঘটনা, এই ধ্বনি ও শ্রুতিগত ব্যাপার, যা কাঁপছে একটি সংগত নেশার মধ্যে, বেড়ে উঠে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে প্রবেশ করে আমার চেতনায়ঃ এবং যখন ক্রমে, উচ্চগ্রামে ধাবমান এক সংগীতের মধ্যে হঠাৎ (তা কতো শীঘ্র আহা! কতো শীঘ্রই না থেমে গেলো!-) আমি বুঝতে পারলামঃ আমি বন্দী হয়েছি। এই সংগীতের উত্তেজনা আমাকে আমার অলক্ষ্যেই করে তুলেছিলো মোহবিষ্ট, আমাকে যেন পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই সব সূরে রাজ্যে, যে সূরগুলি তাদের বাহ্যিক একঘেয়েমিরই মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেয় অস্তিত্ববান সকল বস্তুর চিরন্তন পুনরাবৃত্তির কথা, এবং আমার অনুভূতির দরজায় ধাক্কা দিয়ে, আমার অজ্ঞাতে যা- কিছু আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে সবকিছুকে ধাপে ধাপে আনে বা’র করে- এমন কিছুকে অনাবৃত ক’রে সামনে রাখে যা সবসময়ই ছিলো, যা এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এমন এক তীব্র উজ্জ্বলতার সংগে যে, আমার হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো।

পাশ্চাত্য সংগীতের সাথে আমি পরিচিত। এ সংগীতের সুরকারের আবেগের সমগ্র পটভূমি পতিটি স্বতন্ত্র সূরে টেনে আনা হয় এবং প্রতিটি মেজাজে প্রতিফলিত করে সম্ভাব্য আর সকল মেজাজকে। কিন্তু এই আরবী সংগতি যেন উৎসারিত হলো চেতনার একই সমতল থেকে, একটি মাত্র নাজুক হালত থেকে- নাজুক হালত ছাড়া আর কিছুই যা ছিলো না- আর সে কারণেই তার প্রত্যেক শ্রোতার অনুভূতির ব্যক্তিগত মেজাজগুলিকে ধারণ করতে ছিলো সক্ষম….

কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর নিচু চাপা ভারিক্কি সূরে ‘তাম্বুরা’ বেজে ওঠে এবং বাকি যন্ত্রগুলি করে তার অনুসরণ। এবারকার সুর আগের চেয়ে অনেব বেশি নারীসুলভ; প্রসারণ অনেক বেশি মোলায়েম, প্রত্যেকের আলাদা- আলাদা কণ্টস্বর একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে যায় নিবিড়ভাবে, পরস্পরকে আলিংগন করে আবেগ-উষ্ণতার সাথে এ যেন একটা যাদুমন্ত্রে একত্র বাঁধা পড়ে অনেক-অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওরা একে অন্যকে আঘাত করে একে অপরকে ঘিরে প্রবাহিত হয় মৃদু তরংগায়িত রেখায়, যা প্রথমে কয়েকবার সংঘর্ষ বাঁধায় ‘তাম্বুরা’র দ্রুত তালের সংগে যেন একটি কঠিন বাধার সংগে সংঘর্ষ। কিন্তু ধীরে ধীরে ওরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ‘তাম্বুরা’র উপর বিজয়ী হয়ে এক বন্দী করে ফেলে, ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আপসে একটি সাধারণ, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠা সুরের উচ্চগ্রামে এবং তাম্বুরা প্রথম অনিচ্ছুক হলেও শিগগিরই সাধারণ বিহ্বলতার শিকার হয়ে পড়ে আর নেশায় মাতাল হয়ে যোগ দেয় আর সবার সংগে। তরংগায়িত রেখা হারিয়ে ফেলে তার নারীসূলভ কমনীয়তা আার ছুটে চলে বেড়ে ওঠা প্রচণ্ডতার সংগে, দ্রুততরো উচ্চতরো তীক্ষ্ণতরো হয়ে- সচেতন প্রবৃক্তির এক শীতল ক্রোধের মধ্যে, যে- প্রবৃত্তি সংযমের সমস্ত বাঁধন ছিড়ে ফেলেছে! সে তরংগায়িত রেখাই এবার পরিণত হলো শক্তি ও সার্বভেৌমত্বের অদৃশ্য কয়েকটি চূড়ার দিকে এক মাতাল বিহ্বল উর্ধ্বাভিসারে; কিছুক্ষণ আগেকার একে-অপরকে ঘিরে ঘূর্ণামান প্রবাহ থেকে জন্ম নেয় সূরের সঙ্গতিতে এক প্রচণ্ড চক্রবৎ ঘূর্ণন, চিরন্তন থেকে চিরন্তনের দিকে ছুটে চলা চক্রসমূহ, যার মান নেই, সীমা নেই, লক্ষ্য নেই, যেন অতল গর্তের ছুরির মতো ধারালো কিনারের উপর দিয়ে টানা রাশির উপর ছুটে চলেছে এক রুদ্ধশ্বাস বেপরোয়া বাজিকর, এক চিরন্তন বর্তমানের মর্ধ দিয়ে, এমন একটি উপলব্ধির দিকে যাকে বলা যায় মুক্তি এবং শক্তি- এবং যা সমস্ত চিন্তার অগোচর। হঠাৎ এক উর্ধ্বভিমুখী প্রসারণের মাঝখানে বিরতি, একটি মৃত্যুর নীরবতা- নির্দয়! সৎ। স্বচ্ছ।

গাছের পাতার মর্মর ধ্বনির মতো শ্বাস ফিরে এলো শ্রোতা ও দর্শকরে মধ্যে এবং দীর্ঘায়িত গুঞ্জত ‘ইয়া আল্লাহ ইয়া আল্লাহ’ উঠলো তাদের মধ্য থেকে। ওরা যেন এমনিতরো বুদ্ধিমান শিশু যারা এমন সব খেলায় মগ্ন থাকে, যা তাদের বহু পরিচিত এবং হামেশা তাদেরকে প্রলুব্ধ করে। ওরা সুখে আনন্দে স্মিত হাসি হাসছিলো।

তিন

আমরা আমাদের উট হাঁকিয়ে চলি এবং জায়েদ গান গায়; সবসময় একই তালে, সবসময় একই একঘেয়ে সুরে। কারণ, আরবের মনই হচ্ছে একঘেয়ে; কিন্তু তার মানে এ নয় যে, কল্পনার দিক দিয়ে সে দরিদ্র। কল্পনা শক্তি তার যথেষ্ট। কিন্তু তার সহজাত অনুভূতি প্রতীচ্যের মানুষের মতো বিস্তার, ত্রিমাত্রিক মহাশূণ্য এবং এক সংগে আবেগের নানা সূক্ষ্ম পরিবর্তন নিয়ে মগ্ন নয়। আরবীয় সংগীতের মাধ্যমে কথা বলে একটি মাত্র বাসনা, প্রতিবার, একটি একক আবেগধর্মী অভিজ্ঞতাকে তার সীমার একেবারে শেষপ্রান্তে নিয়ে যাবার জন্য। এই খাঁটি মনোটনিতে, অনুভূতিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন উর্ধ্বভিসারী রেখার ঘনীভূত করে দেখার এই প্রায়- ইন্দ্রিয়জ বাসনার মধ্যে আরব চরিত্রের শক্তি এবং ক্রটি- দু-ই নিহিত রয়েছে। এর ক্রটিঃ এই জগৎ জাগতিক পরিসরেও আগে অভিজ্ঞ হতে চায়। আর এর শক্তিঃ আবেগধর্মী জ্ঞান একটি অনন্ত রেখায় উর্ধ্বভিসারী হতে পারে, এ সম্ভাবনায় বিশ্বাসের পরিণাম মনোজগতে মানুষকে পৌছতে পারে আল্লাহর উপলব্দিতে, অন্য কোথাও নয়। কেবলমাত্র এই জন্মগত প্রবণতা, যা মরুবাসীদের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য, এর বুনিয়াদের উপরেই সম্ভব হয়েচিলো আদি ইহুদীদের তৌহিদ বা একেশ্বরবাদের উদ্ভদ এবং তার সাফল্যজনক পরিপূর্ণ রূপ, মুহাম্মদের ধর্মের। দুয়েরই পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমি, মায়ের মতো।