আড়ালে মৃত্যুর ফাঁদ

আড়ালে মৃত্যুর ফাঁদ

০১.

জয়শ্রী সিনে স্টুডিও ম্যানেজার গোপালবাবু ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন। বললেন–উরেব্বা। একসঙ্গে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! তা যাগগে, ভালই হল।

কথাটা বলেই তিনি আমাদের তিনজনকে নমস্কার করে সোফায় বসলেন। তার হাতে একটা ব্রিফকেস।

কর্নেল বললেন–আজ গোপালবাবুর মুড বেশ চমৎকার দেখছি। ব্যাপার কি? নতুন কোনও ফ্লোর আপনাদের স্টুডিওতে চালু হয়েছে নাকি?

গোপালবাবু মুচকি হেসে বললেন–আর ফ্লোর! তিন নম্বর ফ্লোরে ব্রতীনবাবুর নতুন ছবির আজ শুভ মহরতের কথা ছিল। কিন্তু ভোরবেলা তিনি ফোন করে জানালেন, মহরৎ হচ্ছে না।

আমি জিগ্যেস করলুম–আপনি সম্ভবত স্টুডিও থেকেই সোজা কর্নেলের ডেরায় হাজির হয়েছেন। তার মানে, কিছু একটা অঘটন ঘটেছে।

গোপালবাবু মুখ খোলার আগেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় ‘হালদার মশাই’ বলে উঠলেন–হঃ বুঝসি! ক্যান কী, উনি ঢুইকাই আমাগো থ্রি মাস্কেটিয়ার্স কইলেন।

গোপালবাবু হাসিমুখেই বললেন–আপনি তো একসময়ে পুলিশ অফিসার ছিলেন। রিটায়ার করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। কোনও ফিল্ম প্রোডিউসার যদি শেষ মুহূর্তে নতুন ছবির মহরৎ বাতিল করেন তাহলে তার পেছনে কী কারণ আছে আপনার অনুমান করা উচিত।

হালদার মশাই মুচকি হেসে বললেন–দুইখান কারণ থাকতে পারে। একখান হইল গিয়া ডাইরেক্টরের সঙ্গে বিবাদ। অন্যখান হইল গিয়া হিরো বা হিরোইনের হঠাৎ কম্প দিয়া জ্বর আইসে।

কথাটা শুনে প্রথমে কর্নেল তারপর গোপালবাবু এবং আমি একসঙ্গে হেসে উঠলুম। ইতিমধ্যে ষষ্ঠীচরণ ট্রে-তে করে চার-পেয়ালা কফি আর একপ্লেট স্ন্যাকস এনে সেন্টার টেবিলে রেখে গিয়েছিল। সে জানে, কর্নেলের ঘরে কোনও অতিথি এলে কর্নেল আর এক দফা কফি খেতে চাইবেন।

কর্নেল বললেন–হালদার মশাই হিরো বা হিরোইনের কম্প দিয়ে জ্বর আসার কথা বললেন। আমার ধারণা ছবির হিরোইন-ই জ্বর বাধিয়ে বসেছেন।

গোপালবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-কর্নেল সাহেব ঠিক ধরেছেন। প্রোডিউসার ব্রতীনবাবুর টেলিফোনে কথাবার্তা থেকে সেরকম কিছু একটা আঁচ করেছি।

আমি বললুম–আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে। কারণ গোপালবাবু কর্মব্যস্ত মানুষ। আজকাল বাংলা ছবির পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে। স্টুডিও ছেড়ে কর্নেলের কাছে তার আসার কারণ নায়িকার জ্বরটা একটু অন্যরকম।

কর্নেল বললেন–জয়ন্ত। তুমি একজন সাংবাদিক। কাজেই তুমি গোপালবাবুকে প্রশ্ন করে ভেতরকার খবর বের করে নাও। এমন হতেই পারে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে।

গোপালবাবু এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন–কতকটা তাও বলা যায়। ব্রতীনবাবুর ছবির হিরোইন এতকাল মডেলিং করত। হঠাৎ ব্রতীনাবাবুর চোখে পড়ে তার ভাগ্য খুলতে যাচ্ছিল। কিন্তু জ্বর-এই ব্যাপারটা একটু সন্দেহজনক। বনশ্রী অর্থাৎ হিরোইন সম্পর্কে স্টুডিওতে একটা গুজব শুনে এলুম। তার নাকি এমন জ্বর যে, হঠাৎ রাতারাতি তাকে তার পিসিমা বিহার মুলুকে নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন। অবশ্য এ কথার সত্যি মিথ্যে আমি জানি না। বনশ্রী যেখানে থাকে, সেখানকার এক ভদ্রলোক আমাদের স্টুডিওর টেকনিশিয়ান। তিনি আমাকে চুপি চুপি বলেছেন, এই কেসটার পেছনে কিছু গণ্ডগোল আছে।

আমি বললুম–গণ্ডগোলটা কি জ্বরঘটিত?

গোপালবাবু মাথা নেড়ে বললেন–তা বলতে পারব না। এখানে আপনারা তিন-তিনজন বিচক্ষণ মানুষ আছেন।

ততক্ষণে কর্নেলের কফি-পান শেষ। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চুরুট টানছিলেন। এক টুকরো ছাই তার সাদা দাড়িতে আটকে ছিল। একফালি নীল ধোঁয়া ঘুরতে ঘুরতে তার প্রশস্ত উজ্জ্বল টাক ছুঁয়ে ফ্যানের হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। ওই অবস্থায় থেকেই তিনি বললেন–তাহলে বোঝা যাচ্ছে গোপালবাবু এখানে কোনও একটা রহস্যময় কেস নিয়ে ঢুকেছেন। গোপালবাবু এবার একটু ঝেড়ে কাশলে ভাল হয়।

গোপালবাবু চাপা স্বরে বললেন–আর একটু অপেক্ষা করুন কর্নেল সাহেব। যাঁর কেস, তিনি আমাকে আগে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এসে যাবেন।

গোয়েন্দাপ্রবর হালদার মশাই আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন–আমি জ্বর কইছিলাম। এখন দেখি জ্বরটা অন্যরকম জ্বর।

কথাটা বলে তিনি একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে নোংরা রুমাল বের করে নাক মুছলেন। হালদার মশাইয়ের গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ। শরীর শক্ত সমর্থ। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। কিন্তু তার গোঁফখানি দেখার মতো। পাতলা সরু গোঁফের দুই ডগা সূচালো। একটু উত্তেজনা হলেই তিনি দাঁতে দাঁতে ঘষেন এবং গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপে। এখন তাকে দেখে বুঝতে পারছিলুম তিনি রীতিমত উত্তেজিত। কারণ তিনি রহস্যের একটা গন্ধ পেয়ে গেছেন।

তার উত্তেজনা লক্ষ্য করে বললুম-হালদারমশাই! আমার ধারণা, গোপালবাবু যাঁর কথা বলছেন তিনি যদি এসে পড়েন তাহলে সম্ভবত কর্নেল আপনাকেই কেসটা দেবেন।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ তেমনই চাপা স্বরে বললেন–হিরোইনের নাম কি কইলেন য্যান?

আমি বললুম–বনশ্রী।

–হঃ বনশ্রী। আর বনশ্রীরে লইয়া তার পিসিমা বিহার মুল্লুকে গ্যাসেন। রাতারাতিই গ্যাসেন। না জয়ন্তবাবু! কেসটা মিস্টিরিয়াস মনে হইতাসে। এই সময়ে লক্ষ্য করলুম, কর্নেল সোজা হয়ে বসতেই তার সাদা দাড়ি থেকে ছাইয়ের টুকরোটা নীচে পড়ে গেল। তিনি গোপালবাবুর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন জনৈক ব্রতীনবাবুর ছবির নায়িকার নাম বনশ্রী। সে একসময় মডেলিং করত। আচ্ছা গোপালবাবু গতবছর হরনাথ দত্তের জুয়েলারির দোকানে একটা ডাকাতির ব্যাপারে ঠিক এই নামের একটি মেয়ে–সেও মডেলিং করত। তো সেই মেয়েটি জড়িয়ে পড়েছিল। পরে অবশ্য তার বিরুদ্ধে প্রমাণের অভাবে পুলিশ তাকে রেহাই দিয়েছিল। সেই বনশ্রী আর এই বনশ্রী কি একই মেয়ে?

গোপালবাবু যেন একটু চমকে উঠলেন। তিনি বললেন–আপনার স্মৃতিশক্তি প্রখর। তাছাড়া পুলিশ মহলে আপনার প্রভাবও আছে। কাজেই আমাকে সত্য কথাই বলতে হচ্ছে।

হালদারমশাই কথাগুলো শুনছিলেন। তাঁর গোঁফের ডগা যথারীতি তিরতির করে কাঁপছিল এবং চোখদুটিও গুলি গুলি হয়ে উঠেছিল। তিনি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন–আঁ! তা হইলে তো গোপালবাবু আইজ একখান হেভি ক্যাস আনসেন।

সেই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল যথারীতি হাঁকলেন–ষষ্ঠী।

একটু পরে একজন বেঁটে গাবদা-গোবদা চেহারার ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে গোপালবাবুকে বললেন–আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।

ভদ্রলোকের পরনে প্যান্ট শার্ট এবং গলায় টাই। তাঁর একহাতে গোপালবাবুর মতই একটা ব্রিফকেস। মাথায় একরাশ কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল। গোঁফদাড়ি যত্ন করে কামানো। তার গায়ের রং ফর্সা।

গোপালবাবু বললেন–আলাপ করিয়ে দিই। উনি হলেন স্বনামধন্য প্রকৃতিবিজ্ঞানী এবং রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আর আমার পাশে এই যুবক কর্নেলের স্নেহভাজন বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী। ইনি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার নামকরা সাংবাদিক। আর ওই ভদ্রলোক প্রাক্তন পুলিশ ইনস্পেক্টর এবং বর্তমান প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার। কর্নেল সাহেব! এই ভদ্রলোকের তাড়াতেই আমাকে ছুটে আসতে হয়েছে। এঁর নাম বিজয়েন্দু ব্যানার্জী। ইনি আমাদের সিনেমা মহলের লোক না হলেও ইদানিং এ মহলে ঢোকার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন।

বিজয়েন্দুবাবু গোপালবাবুর পাশে বসলেন। তারপর কর্নেলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন–আপনার কথা আমি গোপালবাবুর কাছে তো বটেই– আমার এক পুলিশ বন্ধুর সূত্রে শুনেছিলাম। কিন্তু আপনি যে এত–মানে…

তাঁর কথায় বাধা দিয়ে গোপালবাবু বললেন–এত বৃদ্ধ বলে মনে হচ্ছে তো? বিজয়েন্দুবাবু! ওঁকে অনেকে কৌতুক করে পাদ্রীবাবা বা সান্তাক্লস বলে থাকেন। কর্নেলসাহেবের বয়সের কথা তুলে লাভ নেই। কিন্তু আফটার অল উনি মিলিটারিতে জীবন কাটিয়েছেন। ওঁর শরীরে এখনও যে কোন যুবকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি।

বিজয়েন্দুবাবু কাঁচুমাচু মুখে কী বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসিটি হেসে উঠলেন। ঘর কেঁপে উঠল। তারপর উনি বললেন- গোপালবাবু আমার সম্পর্কে বাড়িয়ে বলতেই অভ্যস্ত। মিঃ ব্যানার্জি, শারীরিক শক্তির চেয়ে মানুষের মেধার শক্তি জীবনে বেশি কাজে লাগে। যাই হোক আপনার বক্তব্য শোনা যাক।

বিজয়েন্দুবাবু বললেন–গোপালবাবু আপনাকে কী বলেছেন আমি জানি না। কিন্তু আমি বিপদে পড়েই আপনার সাহায্য নিতে এসেছি। কর্নেল বললেন–এক মিনিট। আগে কফি খান। তারপর কথা হবে। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।

ষষ্ঠীচরণ সব সময়েই কফির জল তৈরি রাখে। সে শিগগির এক পেয়ালা কফি এনে দিল। তারপর আমাদের খাওয়া কফির পেয়ালাগুলো ট্রেতে তুলে নিয়ে সে চলে গেল।

বিজয়েন্দুবাবু অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন–গোপালবাবু, কথাটা গোপনীয়। তা আপনি জানেন। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত এবং প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় হালদার মশাইয়ের সামনে আপনি গোপন কথা খুলে বলতে পারেন। গোপালবাবুকে জিগ্যেস করুন। এঁরা দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী কি না।

গোপালবাবু বললেন–বিজয়েন্দুবাবু, আপনি নিশ্চিন্তে সবকথা খুলে বলতে পারেন। আমি আপনাকে আভাসে বলেছিলুম, দেয়ার আর থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে তা।

বিজয়েন্দুবাবু চুপচাপ কফিতে কয়েকবার চুমুক দেবার পর চাপা স্বরে বললেন–ফিল্ম প্রোডিউসার ব্রতীন সোমের পাল্লায় পড়ে আমার ব্যবসার কিছু বাড়তি টাকা দিতে চেয়েছিলুম। ব্রতীন আমার কাছে প্রথম দফায় এগারো লাখ টাকা নিয়েছে। তারপর ফিল্মের কাহিনী অভিনেতা অভিনেত্রী এবং বিশেষ করে নায়ক নায়িকাও সে ঠিক করে ফেলেছিল। সে বলেছিল ছবিটা শেষ করতে অন্তত চল্লিশ বিয়াল্লিশ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। আমি শু্যটিং শুরু হলে পর্যায়ক্রমে ওকে অর্ধেক টাকা দিতে রাজি হয়েছিলুম। ছবির শুভ মহরৎ-এর দিন ধার্য হয়েছিল আজ সকাল দশটায়। হঠাৎ কাল সন্ধ্যা ছ’টায় ব্রতীন টেলিফোনে আমাকে। ডেকেছিল। সে থাকে আমহার্স্ট স্ট্রিটে আমি থাকি শ্যামবাজারে। তখনই তার কাছে ছুটে গিয়েছিলুম। কারণ টেলিফোনে তার কণ্ঠস্বর শুনে আমার সন্দেহ হয়েছিল, কিছু একটা ঘটেছে। তো আমি যেতেই সে বলল, সর্বনাশ হয়েছে বিজয়েন্দু। নায়িকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে নাকি তার পিসিমা কোথায় নিয়ে গেছে। আমি জিগ্যেস করলুম কোথায় নিয়ে গেছে জানতে পেরেছ? সে বলল–ওদের পাড়ায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বিহারের কোথায় ওদের আত্মীয় আছে সেখানে গেছে। তার চেয়ে সংঘাতিক কথা, নায়িকা বনশ্রী রায় আমার টেবিলের ড্রয়ার থেকে তোমার দেওয়া এগারো লাখ টাকা আর আমারও বেশ কিছু টাকা কখন হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়েছে।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন–আপনার টাকা খোওয়া গেছে তা বুঝলাম। অন্তত ব্রতীনবাবু যখন আপনাকে এই কথাই বলেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন, আপনি ব্রতীনবাবুকে সঙ্গে না নিয়ে একা কেন আমার কাছে এসেছেন? উত্তরটা দিলেন গোপালবাবু-কর্নেলসাহেব, রহস্যের শুরু তো এখানেই। আজ সকাল থেকে ব্রতীনবাবু নাকি নিখোঁজ।

গোয়েন্দাপ্রবর জিগ্যেস করলেন–নিখোঁজ কইতাসেন ক্যান? ওঁর বাড়ির লোক আপনারে কি কইসে উনি নিখোঁজ হইয়া গ্যাসেন?

বিজয়েন্দুবাবু হতাশ ভঙ্গিতে বললেন–আজ্ঞে হ্যাঁ। ব্রতীন নাকি ভোরবেলায় এই গোপালবাবুকে ফোন করেছিল। কিন্তু আমি যখন ওর বাড়ি গেলুম তখন ওর স্ত্রী রমা কান্নাকাটি করে আমাকে এই কাগজটা দেখাল। এই দেখুন, এতে কী লেখা আছে।

বলে তিনি কর্নেলকে বুকপকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ দিলেন। কর্নেল সেটা পড়ে দেখার পর বললেন–ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত।

আমি কর্নেলের হাত থেকে কাগজটা নিলুম। তারপর পড়ে দেখলুম তাতে লেখা আছে

আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছি। নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। জীবনে ঘৃণা ধরে গেছে। তাই আমি অজানা দেশের পথে চলে গেলুম। কেউ আমার খোঁজ কোর না। খুঁজলেও আমাকে পাবে না। ইতি—
হতভাগ্য
ব্রতীন সোম।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন-ব্রতীনবাবুর হাতের লেখা আপনি চেনেন?

 বিজয়েন্দুবাবু বললেন–হ্যাঁ চিনি।

.

০২.

মার্চ মাসের সেই রবিবারের সকালবেলায় জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর গোপালবাবু এসে যে একটা জমজমাট রহস্যের মধ্যে আমাদের ফেলে দেবেন, ভাবতে পারিনি। বিজয়েন্দু ব্যানার্জি কর্নেলের কথামত তার নেমকার্ড এবং সেই সঙ্গে ব্রতীনবাবুর বাড়ির ঠিকানা, এমনকি নায়িকা বনশ্রীর বাড়ির ঠিকানাও নিয়েছিলেন। যাবার সময় কর্নেল মিটিমিটি হেসে গোপালবাবুকে বলেছিলেন–আপনি এর আগেও একবার ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এবারও দেখছি তাই।

হালদারমশাই বলেছিলেন-ফাল কী কন কর্নেল স্যার, এ যে হেভি লোহার যন্তরমন্তর।

আমি বলেছিলুম–কেসটা বেশ ধাপে ধাপে সাজানো। বিজয়েন্দু ব্যানার্জি নামে জনৈক ব্যবসায়ী সম্ভবত তার কালো টাকা ফিল্মে খরচ করার জন্য তার এক ফিল্ম প্রোডিউসার বন্ধু ব্রতীন সোমকে দিয়েছিলেন।

এদিকে শ্রী সোম তার নতুন ছবিতে নতুন একজন নায়িকা বনশ্রী রায়কে নিয়েছিলেন। যা বোঝা গেল, বনশ্রী তার ফিল্মের অফিসে ইদানীং প্রায়ই যাতায়াত করত। কোনও এক সুযোগে সে মিস্টার সোমের ড্রয়ার থেকে নাকি মোটা টাকা হাতিয়ে কেটে পড়েছে। বনশ্রীর একজন পিসিমা আছেন, তাও বোঝা গেল। সম্ভবত বনশ্রীর বাবা-মা বেঁচে নেই। তাই পিসিমাই তার গার্জেন। বনশ্রী তার পিসিমাকে অথবা তার পিসিমাই বনশ্রীকে নিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। তারপর সোমও একটা চিঠি লিখে রেখে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। কর্নেল! কেউ নিখোঁজ হলে–বিশেষ করে ব্রতীন সোমের কথাই বলছি–তার স্ত্রী নিশ্চয়ই পুলিশের মিসিং স্কোয়াডে ব্যাপারটা জানিয়েছেন। কর্নেল আপনি একবার মিসিং স্কোয়াডের কোনও অফিসারকে ফোন করে জেনে নিন না। আর আশ্চর্য ব্যাপার, চিঠিটা তার স্ত্রী রমাদেবী কেন বিজয়েন্দুবাবুর হাতে দিয়েছেন?

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বলেছিলেন–যথা সময়ে খোঁজ নেওয়া যাবে। তার আগে আমি হালদারমশাইকে একটা কাজের দায়িত্ব দিতে চাই।

হালদারমশাই যেন তৈরি হয়েই ছিলেন। তিনি বলেছিলেন–কন কর্নেল স্যার। আমারে কী করতে হইব। আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস, কর্নেলস্যার!

কর্নেল বলেছিলেন–আপনি বনশ্রী রায়ের বাড়ি গিয়ে একটু খোঁজখবর নিন না। আমি আপনাকে ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। আপনি তো অভিজ্ঞ প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। খোঁজখবরের ব্যাপারে কি করতে হবে আপনি তা ভাল জানেন।

কর্নেল একটা কাগজে বনশ্রীর ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন। কাগজটা তার হাত থেকে নিয়েই গোয়েন্দাপ্রবর অভ্যাসমতো সবেগে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

বলা নিষ্প্রয়োজন, আমাকে সেদিন কর্নেল সল্টলেকের ফ্ল্যাটে ফিরতে দেননি। কর্নেলের তিনতলার এই অ্যাপার্টমেন্টে আমার জন্য একটা ঘর রাখা আছে। সেখানে আমার পোশাক-আশাক এবং আরও সব দরকারি জিনিস সবই আছে। কারণ হাতে কোনও কেস পেলেই আমার এই বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিজ্ঞান অর্থাৎ বিরল প্রজাতির পাখি প্রজাপতি অর্কিড ক্যকটাস ইত্যাদির নেশা ভুলে সেই রহস্যের পেছনে ছুটে যান এবং আমাকে তার সঙ্গী হতে হয়।

কিছুক্ষণ পরে তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। তারপর সাড়া এলে বললেন-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি, একটু অমিতবাবুকে দেবেন….হ্যালো অমিতবাবু। মর্নিং…হ্যাঁ, আমি দরকার ছাড়া তো আপনাকে খুঁজিনি। আমার একটা প্রশ্ন আছে। আজ মিস্টার ব্রতীন সেন বলে একজন ফিল্ম প্রোডিউসারের নিখোঁজ হবার ব্যাপারে কেউ কি আপনার মিসিং স্কোয়াডে গিয়েছিলেন?….এখনও পর্যন্ত যান নি? ঠিক আছে…না। এমনি জানতে চাইলুম। অমিতবাবু! যদি কেউ যান, তাহলে আমাকে প্লিজ একটু রিং করে জানাবেন। রাখছি।

রিসিভার রেখে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসতেই জিগ্যেস করলুম–দেখা যাচ্ছে মিসেস সোম তার স্বামীর নিখোঁজ হবার ব্যাপারটা যেন চেপে রেখেছেন।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন–প্রায় বারোটা বাজে। আমরা আধঘন্টার জন্য বেরোব জয়ন্ত।

নীচে কর্নেলের গ্যারেজে আমার ফিয়াট গাড়িটা রাখা ছিল। একসময়ে কর্নেলের একটা লাল রঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি ছিল। সেই গাড়িটা তিনি বেচে দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্যারেজটা আমার গাড়ির জন্যই যেন কাকেও ভাড়া না দিয়ে ফেলে রেখেছিলেন।

গাড়ি বের করে লনে গেলুম। কর্নেল আমার বাঁদিকে বসলেন। তারপর বললেন–ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে হয়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ। তারপর সোজা শ্যামবাজার। সেন্ট্রাল এভিনিউতে যেতে যতে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম-আপনি কি বিজয়েন্দু ব্যানার্জির ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে শ্যামবাজার যাচ্ছেন?

কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন–বাগবাজারে আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক আছেন। তার সঙ্গে জাস্ট কয়েক মিনিট কয়েকটা কথা বলেই চলে আসব।

–কথাটা কি টেলিফোনে হত না?

কর্নেল বললেন-টেলিফোনে যখন কেউ কথা বলে, তখন তার হাবভাব বোঝা যায় না। মুখোমুখি কথা বললে অনেক আড়ালের কথা টের পাওয়া যায়।

রবিবার রাস্তায় তত ভিড় ছিল না। কর্নেলের নির্দেশে বাগবাজারে ঢুকে কিছুটা যাবার পর ডানদিকের একটা গলির মুখে কর্নেল গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। তারপর তিনি গাড়ি থেকে নেমে বললেন–তুমি গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে এখানেই অপেক্ষা কর। আমি শিগগির আসছি।

গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে আমি কর্নেলের অপেক্ষা করছি তো করছিই। ওঁর কোনও পাত্তা নেই। বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে ভাবছি, কর্নেলের মার্কামারা চেহারা নিশ্চয়ই কারও না কারও চোখে পড়বে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব তিনি কোন বাড়িতে ঢুকেছেন। এই ভেবে গাড়ি লক করার জন্য জানালার কাঁচ তুলেছি, এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে কর্নেল ফিরে এলেন।

বললুম–এখনই আসছি বলে আপনি নিশ্চয়ই কোনও বন্ধুর বাড়িতে কফি খেয়ে তারপর ছুটে আসছেন।

কর্নেল একটু হেসে বললেন–পুরোনো পরিচিত জনেরা দীর্ঘকাল পরে দেখা হলে সহজে ছাড়তে চান না। যাই হোক চল আমাদের লাঞ্চের আধঘন্টা দেরি হয়ে গেল।

তিনি গাড়িতে উঠে বসার পর স্টার্ট দিয়ে বললুম-আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই এই দেরিটুকু হত না। কোনও বাধা ছিল কি? কর্নেল বললেন–বাধা ছিল নাতবে তুমি লক্ষ্য করনি গলিটা এমন ঘিঞ্জি যে পাশাপাশি দুটো গাড়ির জায়গা হয় না।

হাসতে হাসতে বললুম–আসল কথাটা কিন্তু আপনি কিছুতেই বলছেন না। আমার ধারণা আপনি বনশ্রী রায় আর ব্রতীন সোমের অন্তর্ধানের ব্যাপারে কোনও সুত্র খুঁজতে গিয়েছিলেন।

কর্নেল বললেন–না! তুমি একজন সাংবাদিক সারাপথ যাবে আর আমাকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে জেরবার করবে তাই কথাটা বলেই ফেলি। আমি গিয়েছিলুম চন্দ্র জুয়েলারির মালিক হরনাথ চন্দ্রের কাছে।

-বুঝেছি। বনশ্রী এবং সেই জুয়েলারির কেস।

–ঠিক ধরেছ। আমি শুধু জানতে গিয়েছিলুম পুলিশ প্রমাণের অভাবে বনশ্রীকে রেহাই দিলেও হরনাথবাবুর মনে তার সম্পর্কে এখনও কোনো সন্দেহ থেকে গেছে কি না।

–হরনাথবাবু কী বললেন আপনাকে?

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন–তাঁর মনে বনশ্রী সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। আসলে কী ঘটেছিল তা তোমাকে বলি। ওঁদের জুয়েলারির একটা বিজ্ঞাপনের জন্য একটা বিজ্ঞাপন কোম্পানিকে ওঁরা দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু দুবৃত্তদের একটা গ্যাং সেটা জানতে পারে এবং শু্যটিংটা কোথায় হচ্ছে তাও কোনও সূত্রে জেনে ফেলে। শু্যটিং হচ্ছিল ওদের শো-রুমের পেছনদিকের একটা একতলা। ঘরে। এসব ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান রত্নব্যবসায়ীরা মেকি গয়নাগাটি ব্যবহার করেন কিন্তু ভিতরেই দোকান, তাই হরনাথবাবু বনশ্রীর জন্য প্রচুর দামী গয়নাগাটি এমনকি, হীরে খচিত একটা দু’লক্ষ টাকা দামের জড়োয়া নেকলেস দিয়েও বনশ্রীকে সাজিয়েছিলেন। তারপর যথারীতি শু্যটিং শুরু হয়। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেজে ওঠে। বনশ্রী অনেকগুলো পোজ দিয়ে দাঁড়ায় তারপরই হঠাৎ ঘরের আলো নিভে যায় এবং বনশ্রী চাপা আর্তনাদ করে ওঠে। কেউ সেই অন্ধকার ঘরে হুমকি দেয় টু শব্দ করলেই প্রত্যেকের লাশ ফেলে দেব।

জিগ্যেস করলুম-হরনাথবাবু সেখানে উপস্থিত ছিলেন?

কর্নেল বললেন–মানুষ হিসেবে তিনি সরল প্রকৃতির বলা যায়। তিনি কল্পনাও করেননি যে এই বদ্ধ ঘরে কেমন করে ডাকাতরা ঢুকে পড়বে আর তার গলায় আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঠেকিয়ে তাকে চুপ করিয়ে রাখবে। হরনাথবাবুর বক্তব্য, বড়জোর কয়েক মিনিটের ব্যাপার তারপরেই আলো জ্বলে ওঠে। তিনি দেখতে পান বনশ্রী মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার পরনের শাড়ি প্রায় খুলে গেছে আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার তার গায়ে একটাও গয়নাগাটি নেই। ডান কানে রক্ত ঝরছে। জড়োয়া নেকলেসটাও গলা থেকে অদৃশ্য।

বললুম-বিজ্ঞাপন কোম্পানির লোকেরা ক’জন ছিল তা কি হরনাথবাবু লক্ষ্য করেছিলেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন–না। কাজেই বিজ্ঞাপন কোম্পানির লোক বলে পরিচয় দিয়ে কেউ পিছনের দিক থেকে ঘরে ঢুকে পড়লে জানার উপায় থাকে না। বিজ্ঞাপন কোম্পানির লোকেদের বক্তব্য এসব কাজে তাদের অন্তত পাঁচ-ছ’জন টেকনিশিয়ান দরকার হয়। ওই ঘরে ঢোকার সময় তাদের সঙ্গে বাইরের দু-তিনজন লোক ঢুকে পড়লেও তাদের লক্ষ্য করার সময় থাকে না কারণ তখন তারা যে যার কাজে ব্যস্ত।

–এখানে একটু খটকা লাগছে আমার। পুলিশকে বিজ্ঞাপনের টেকনিশিয়ানরা কি এই কথাই বলেছিল?

-হ্যাঁ, কিন্তু পুলিশ তাদের রেহাই দেয়নি। শেষ পর্যন্ত কারও শাস্তি না হলেও সেই বিজ্ঞাপনে কোম্পানিটার নামে বাজারে প্রচণ্ড বদনাম হয়েছিল। শেষে কোম্পানিটাই উঠে যায়।

আমার গাড়ি যখন ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট হয়ে ইলিয়ট রোডে ঢুকছে তখন বললুম–আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিজ্ঞাপন কোম্পানির সেই টেকনিশিয়ানদের কারও সঙ্গে ডাকাতদের যোগাযোগ ছিল।

কর্নেল বললেন– কিন্তু কোর্ট তো অকাট্য প্রমাণ দাবী করে। তাছাড়া সেই গয়নাগুলোও পুলিশ উদ্ধার করতে পারে নি।

ইলিয়ট, রোড এলাকায় কর্নেলের সানি ভিলা নামক তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টহাউসের গেট দিয়ে যখন গাড়ি ঢোকাচ্ছি যখন তখন কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন– কেসটা খুব জটিল ছিল না কিন্তু হরনাথবাবু আমার ওপর তত। বেশি নির্ভর না করে পুলিশকেই সার করেছিলেন। যাই বল জয়ন্ত এই বৃদ্ধ বয়সে অভিমান জিনিসটা আমার মধ্যে এখনও আছে।

গাড়ি গ্যারেজে রেখে এসে কর্নেলের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতে উঠতে বললুম–সেই অভিমান এত দিনে আর নেই। তা থাকলে আজ হরনাথবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন না।

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন–ব্যর্থ হয়ে ফিরিনি জয়ন্ত। পুরোনো কথার আড়ালে অনেক সময় নতুন কথা লুকিয়ে থাকে। তাছাড়া আমি একটা কথা তোমাকে প্রায়ই বলি আমরা জানি না যে আমরা কী জানি।

ষষ্ঠীচরণ দরজা খুলে দিয়ে বলল–বাবামশাইদের লাঞ্চ খেতে আজ আধঘন্টা লেট।

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন- আজ আমরা স্নান করব না। শিগগির লাঞ্চ রেডি কর।

ষষ্ঠী কাঁচুমাচু মুখে ভিতরে চলে গেল।

 খাওয়া দাওয়ার পর অভ্যাসমত আমি ড্রয়িং রুমে ডিভানে লম্বা হয়েছিলুম। কর্নেলও তার অভ্যাসমত ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন। আমার চোখে সবে। ঘুমের টান এসেছে এমন সময়ে ডোরবেল বেঝে উঠল। এমন অসময়ে কে এলো। বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরলুম। কর্নেল যথারীতি ষষ্টি বলে হাঁক দিয়ে থেমে গেলেন। লক্ষ্য করলুম তিনি নিজেই ড্রয়িংরুমের সংলগ্ন ছোট্ট ওয়েটিংরুমের ভিতর দিয়ে অদৃশ্য হলেন। বুঝতে পারলুম বেচারা ষষ্ঠী এখন খেতে বসেছে তাই কর্নেল তার স্নেহভাজন পরিচারককে বিব্রত না করে নিজেই দরজা খুলতে গেলেন। এই দরজার কথাটা একটু উল্লেখ করা উচিত। দরজায় যে বিশেষ ধরনের তালা লাগানো আছে তা ঘরের ভিতর থেকে হ্যান্ডেল নামালেই খুলে যায় কিন্তু বাইরে। থেকে চাবির সাহায্য ছাড়া খোলা যায় না।

একটু পরে দেখলুম কর্নেলের সঙ্গে লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব ইন্সপেক্টর নরেশ ধর ঘরে ঢুকছেন। তাঁর মুখে গভীর উদ্বেগের স্পষ্ট ছাপ। সোফায় ধপাস করে বসে প্লেন ড্রেস পরা নরেশবাবু চাপাস্বরে বললেন– জয়ন্তবাবু কি ঘুমোচ্ছেন?

কর্নেল বললেন- আপনি তো জানেন জয়ন্তের এটা একটা বদঅভ্যাস। এসব কথা শুনেও আমি ঘুমের ভান করে পড়ে রইলুম। কিন্তু দুজনের মধ্যে যেসব কথাবার্তা শুরু হ’ল তা দিব্যি আমার কানে ভেসে আসছিল। কর্নেল বললেন আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে এবং আপনার ওপর। কর্তৃপক্ষ কড়া দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন। নরেশবাবু চাপাস্বরে বললেন- কিছু ঘটেছে তা সত্যি কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি যে ঘটনার মাথার দিকে আমাকে দাঁড়াতে হয়েছে সেটার পায়ের দিকে স্বয়ং আপনি দাঁড়িয়ে আছেন।

কর্নেল বললেন– অর্থাৎ ধরা যেতে পারে একটা বিষধর সাপের মাথার দিকে আপনি আর লেজের দিকে আমি।

নরেশবাবু বললেন– এখন আমার হাসি শোভা পায় না কিন্তু আপনার কথা শুনে একটু না হেসে পারলুম না কর্নেল সাহেব! বিষধর সাপটা কিন্তু বেঁচে নেই।

– বেঁচে নেই তা তো বোঝাই যাচ্ছে। বেঁচে থাকলে আপনাকে ছোবল দিত। যাই হোক এবার সরাসরি কাজের কথায় আসা যাক।

– আপনি বুঝতেই পারছেন ওটা একটা ডেডবডি। আপনি বিষধর বললেন তা ঠিকই। জীবদ্দশায়ই এই ডেডবডিটি অনেক দুষ্কর্ম করেছে। কিন্তু তার বড় পলিটিক্যাল গার্জেন থাকায় পুলিশকে সংযত হয়ে চলতে হয়েছে।

আমাকে চমকে দিয়ে কর্নেল বললেন- ডেডবডিটা কি ফিল্ম প্রোডিউসার ব্রতীন সোমের?

নরেশবাবু বললেন– আপনি এটা ঠিকই বুঝতে পারবেন বলেই একটু পরোক্ষে কথা শুরু করেছিলুম।

এবার আর আমার পক্ষে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকা সম্ভব হ’ল না। সটান উঠে বসে অবাক হয়ে বললুম- ব্রতীন সোমের ডেডবডি? তার মানে তাকে কেউ বা কারা খুন করেছে?

নরেশবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন–জয়ন্তবাবু যে ঘুমোচ্ছিলেন না তা বোঝা গেল।

এবার আমি উঠে গিয়ে সোফায় বসলুম। বললুম- আপনারা কোথায় ব্রতীন সোমের ডেডবডি পেলেন?

নরেশবাবু বললেন- আউট্রাম ঘাটের নীচে একটা ঝোঁপের ভিতরে ওটা আটকে ছিল। উপর থেকে খুনীরা গঙ্গায় ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু ওটা অত নীচে পড়েনি। ওখানকার নৌকোর মাঝিরা ওটা দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছিল।

এবার কর্নেল জিগ্যেস করলেন- ব্রতীনবাবুর লাশ কখন নৌকার মাঝিরা দেখতে পয়েছিল?

নরেশবাবু বললেন–দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে। এই ভদ্রলোকের যে পলিটিক্যাল গার্জেনের কথা বলছিলুম তিনিই খবর পেয়ে আমাদের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টকে কেসটা নেবার জন্য কমিশনার সাহেবকে অনুরোধ করেন। তো আপনার স্নেহভাজন ডি.সি.ডি.ডি. (ওয়ান) লাহিড়ী সাহেব ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো এই অভাগার কাঁধেই ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন–মিস্টার সোমকে কীভাবে খুন করা হয়েছে?

নরেশবাবু বললেন- মাথার পেছনে গুলি করা হয়েছে। মর্গের ডাক্তার চিত্তব্রত সান্যালকে তো আপনি চেনেন। পিজি হসপিটালের সেরা ডাক্তার। তিনি ক্ষতস্থান পরীক্ষা করেই বলেছেন ওই ভদ্রলোককে বেলা ন’টা থেকে দশটার মধ্যে কেউ পেছন থেকে গুলি করেছে।

আমার নিজের ধারণা ব্রতীন সোম ওখানে একটা বেঞ্চের ওপর বসেছিলেন। যে বা যারা তাকে খুন করেছে তারা মোটর সাইকেল চেপে এসেছিল। চাকার দাগ বেঞ্চের পেছনে নরম মাটিতে খুব স্পষ্ট। আমি বললুম-বেলা ন’টায় আউট্রাম ঘাটের আছে তো লোকজন থাকার কথা। বিশেষ করে আজ রোববার। কারও চোখে পড়েনি ব্যাপারটা?

নরেশবাবু বললেন–চোখে পড়লেও এসব ব্যাপারে কেউ মুখ খুলতে চাইবে? তবে এটুকু বলা যায় খুনী বা খুনীরা দুঃসাহসী।

কর্নেল বললেন–আপনি কিন্তু বডি ছুঁড়ে ফেলে দেবার কথা বলছিলেন।

নরেশবাবু বললেন–হ্যাঁ। খুন করে ব্রতীনবাবুকে অন্তত পাঁচ-ছ’হাত দূরে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। সেজন্যই আমি দুঃসাহসী কথাটা ব্যবহার করেছি।

কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন-ওখানে প্রচুর গাছপালা আছে। ঝোঁপজঙ্গলও প্রচুর কাজেই এমনও হতে পারে সে সময়ে কেউ কাছাকাছি ছিল না। কিন্তু আপনি কোন সুত্রে জানলেন যে এই ঘটনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে?

নরেশবাবু বললেন–ব্রতীনবাবুর বন্ধু জনৈক বিজয়েন্দু ব্যানার্জি আমার কাছে সব কথা খুলে বলেছেন।

কর্নেল এবার হাঁকলেন-ষষ্ঠী! এক পেয়ালা কফি নিয়ে আয়। শিগগির। নরেশবাবু বললেন–হ্যাঁ, দুপুরে তো ক্যান্টিন থেকে অখাদ্য খেয়ে খিদে মিটিয়েছি। ষষ্ঠীর হাতের কফি পেলে নার্ভ চাঙ্গা হবে। তারপর আপনার কাছে বিজয়েন্দুবাবুর দেওয়া এবং ব্রতীনবাবুর লেখা চিঠিটা দেখতে চাইব।

.

০৩.

ততক্ষণে ষষ্ঠীর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল এবং সে নিশ্চয়ই ওৎ পেতে ভিতরের ঘরের দরজায় পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। ষষ্ঠীর এই একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি লালবাজারের ডিটেকটিভ পুলিশ তার ভাষায় টিকটিকিবাবু–তাদের কাকেও। কর্নেলের কাছে আসতে দেখলে সে আড়াল থেকে কান পেতে শোনে। একদিন আমি তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলায় সে আমাকে চুপি চুপি জানিয়েছিল পুলিশদের টিকটিকিবাবুরা হালদার মশায়ের চেয়ে সাংঘাতিক। এখানে বলা দরকার হালদারমশাইকে সে আড়ালে টিকটিকিবাবু বলে থাকে। যাইহোক, লালবাজারের। খুব চেনা টিকটিকিবাবুর জন্য ষষ্ঠী খুব শিগগির কফি নিয়ে এলো। তারপর সন্দেহাকুল চোখে নরেশবাবুকে দেখার পর ভেতরে চলে গেল।

নরেশবাবু চুপচাপ কফি খেতে থাকলেন। ইতিমধ্যে কর্নেল উঠে ভেতরে গেলেন এবং একটু পরেই ফিরে এলেন। ইজিচেয়ারে বসে তিনি বললেন–চিঠিটা দিচ্ছি তার আগে আর একবার এটা আমি পরীক্ষা করে নিই। বলে তিনি টেবিলল্যাম্পের আলো জ্বেলে দিলেন তারপর আতস কাঁচ বের করে চিঠিটার ওপর রেখে যেন কী পরীক্ষা শুরু করলেন। চিঠিটা আমি পড়েছিলুম। পড়ার পর কেন কে জানে আমার মনে হয়েছিল নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যাবার আগে এভাবে কেউ। কোনও কারণ না দেখিয়ে তাড়াহুড়ো করে কি কোনও চিঠি লেখে? তাছাড়া চিঠিটার ভাষাও যেন কেমন বানানো।

কর্নেল প্রায় দীর্ঘ দশ মিনিট ধরে চিঠিটা পরীক্ষা করার পর নরেশবাবুর হাতে দিলেন। ততক্ষণে নরেশবাবুর কফি পান শেষ হয়েছে এবং তিনি উদগ্রীব হয়ে চিঠিটা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। কর্নেল তাকে চিঠিটা দিলে তিনিও বেশ সময় নিয়ে সেটা পড়লেন। তারপর একটু হেসে বললেন-কর্নেল সাহেব, এ যাবৎ অনেক চিঠি লিখে রেখে যাওয়া নিখোঁজ লোকের কেস আমাদের ডিল করতে হয়েছে। সেইসব চিঠির সঙ্গে এটার একটা প্রচন্ড পার্থক্য আছে। আপনি কী বলেন? কর্নেল মুচকি হেসে বললেন–আপনি ঠিকই ধরেছেন। এ যেন হঠাৎ দুম করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং চিঠি লিখে রেখে চুপি চুপি কেটে পড়া। নরেশবাবু বললেন–তা ঠিকই। কিন্তু মানুষ নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যাবার একমাত্র কারণ প্রচন্ড কোনও ঘটনায় মনে আঘাত পাওয়া এবং সেটা নিজের সংসারের প্রতি বিশেষ করে কোনও আপনজনের প্রতি অভিমানজাত। এই চিঠিটা পড়ে আমার মনে হল ব্রতীনবাবু যে কোনও কারণেই তোক সাময়িকভাবে কারও হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য চিঠিটা লিখে রেখে গা ঢাকা দিয়েছেন।

কর্নেল বললেন–কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল গা ঢাকা দিতে তিনি গঙ্গার ধারে গিয়েছিলেন এবং অজ্ঞাত আততায়ীরা তাকে বাঁচতে দেয়নি। তারা যেন তক্কে তক্কে ছিল।

নরেশবাবু সায় দিয়ে বললেন–আপনার ধারণা ঠিক বলেই মনে হচ্ছে। সত্যি সত্যি যাঁরা কোনও কারণে নিরুদ্দিষ্ট হতে চান তাঁদের লেখা চিঠিতে অনেক সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তা থাকে। ভাষাও হয় বেশ গুরুগম্ভীর।

কথাটা বলে নরেশবাবু হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন–আমার কিছু বলা উচিত নয় তবু একটা কথা আপনাকে বলতে চাই। আপনি ব্রতীনবাবুর স্ত্রী রমাদেবীকে এখনই গিয়ে জেরা করুন। আজ সকালে যতক্ষণ পর্যন্ত রমাদেবী তার স্বামীকে বাড়িতে দেখেছেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি তার স্বামীর হাবভাব লক্ষ্য করেছেন তাছাড়া কেউ সে সময়ে তার কাছে এসেছিল কিনা এটা জেনে নেবেন। এমনকি কেউ যদি তার স্বামীকে আজ সকাল ন’টার মধ্যে টেলিফোন করে থাকে এবং রমাদেবী সেই সময় যদি কাছাকাছি থেকে থাকেন তাহলে টেলিফোনে। ব্রতীনবাবু কী বলছিলেন এবং তাঁর হাবভাব কেমন ছিল, রমাদেবী সেটা লক্ষ্য করছিলেন কিনা তাও জেনে নেবেন।

আমি বললুম– আচ্ছা কর্নেল, একটা ব্যাপার আমার খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন–বল জয়ন্ত!

বললুম–স্বামী চিঠি লিখে রেখে নিখোঁজ হয়ে গেছেন সেই সময় তাঁর স্বামীর বন্ধু বিজয়েন্দবাবু সেখানে গেছেন। রমাদেবী তখন চিঠিটা বিশেষ করে এরকম একটা চিঠি কেনই বা বিজয়েন্দুবাবুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছে এটা অস্বাভাবিক।

কর্নেল বললেন–স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক সেটা নির্ভর করছে রমাদেবীর ব্যক্তিত্বের ওপর। এমনতো হতেই পারে স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে দেখে তিনি এত বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন সে তাঁর হাতেই চিঠিটা দিয়েই আসলে তার স্বামীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব তাকেই দিতে চেয়েছিলেন।

আমি চুপ করে গেলুম। কারণ ওই দুর্বল এবং বিচলিত মানসিক অবস্থায় এমনটা কোনও মহিলা করতেই পারেন।

নরেশবাবু চিঠিটা ভাঁজ করে বললেন–এবার একটা প্রশ্ন কর্নেল সাহেব, বিজয়েন্দুবাবু কি তার নিখোঁজ বন্ধুকে খুঁজে বের করার জন্য আপনার সাহায্য চাইতে এসেছিলেন?

কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। তাছাড়া আপনিই তো বলছিলেন বিজেয়ন্দুবাবু আপনাকে সব কথা খুলে বলেছেন।

নরেশবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–বিজয়েন্দুবাবু আমাকে আর একটা কথা বলেছেন সেটা আপনি আমাকে বললেন না।

কর্নেল সহাস্যে বললেন–টাকাকড়ির কথা তো?

নরেশবাবু বললেন–হ্যাঁ। ব্রতীনবাবুকে নাকি ফিল্ম করার জন্য বিজয়েন্দুবাবু এগারো লাখ টাকা ধার দিয়েছেন। কাজেই ব্রতীনবাবুর হত্যাকান্ডের ফলে তার অতগুলো টাকা আর ফেরত পাবার সম্ভাবনা নেই। কাজেই তিনি আমাকে তার টাকা ফেরত পাবার ব্যাপারেও অনুরোধ করেছেন। যেন আমরা ব্রতীনবাবুর বাড়ি সার্চ করলেই তার দেওয়া টাকা উদ্ধার করতে পারব। যাই হোক আপাতত চলি। রমাদেবীর কাছেই এই চিঠি নিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক কিছু সূত্র পাই কিনা।

কর্নেল বললেন–একটা অনুরোধ নরেশবাবু, ওই চিঠিটার একটা জেরক্স কপি বিশ্বস্ত কারও হাতে আমাকে যেন অবশ্যই পাঠিয়ে দেবেন।

–অবশ্যই দেব। বলে তিনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন–প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে। এবার কফি খাওয়া যেতে পারে।

আমি বললুম–ভাতঘুমের পর আমার চা খাওয়া অভ্যেস। ভাতঘুম না হলেও এখন কফি আমার ধাতে সইবে না। অতএব আপনি কফি খান আমার জন্য চা হোক।

কর্নেল হাঁক দিলেন–ষষ্ঠী!

আমার ধারণা যে সত্যি তার প্রমাণ হিসেবে ভিতরের দরজার পর্দার ফাঁকে ঠিক তখনই ষষ্ঠীর মুখ দেখা গেল। আমি তাকে বললুম-ষষ্ঠী! তুমি নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছ আমি চা খাব?

ষষ্ঠী নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে তার প্রশস্ত টাকে হাত বুলোতে থাকলেন। বুঝতে পারলুম আমার বৃদ্ধ বন্ধু তার মাথার ঘিলুকে চাঙ্গা করছেন।

ষষ্ঠী তার বাবামশায়ের জন্য এক পেয়ালা কফি এবং আমার জন্য এক পেয়ালা চা দিয়ে গেল। তারপরই টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন–বলুন হালদার মশাই… বাঃ তাহলে তো আপনি কাজের কাজ করেছেন। শিগগির চলে আসুন। ষষ্ঠী আপনার জন্য স্পেশাল কফি নিয়ে অপেক্ষা করছে। রাখছি। কর্নেল রিসিভার রাখার পর আমি জিগ্যেস করলুম-হালদার মশাইকে বনশ্রী রায়ের খবর জানতে পাঠিয়েছিলেন। আপনার কথা শুনে বোঝা গেল গোয়েন্দাপ্রবর সাকসেসফুল।

কর্নেল আমার কথার উত্তর না দিয়ে হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী। মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই তোর টিকটিকিবাবু এসে যাচ্ছেন। তার জন্য স্পেশাল কফি তৈরি করে। রাখবি।

আমি বললুম- বনশ্রী রায়ের বাড়ির ঠিকানা এখনও আমি জানি না। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে হালদার মশাই ট্যাক্সিতে চেপেই আসছেন। এতে পনেরো কুড়ি মিনিট সময় লাগা মানে বনশ্রীর বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়।

কর্নেল বললেন-বনশ্রী থাকে ল্যান্সডাউন রোড। এখন যেটার নাম হয়েছে শরৎ বোস রোড। তবে সে সদর রাস্তায়ই থাকে না একটু ভেতরের দিকে থাকে। ওই পাড়াটা কিন্তু উঠতি বড়লোকদের পাড়া নয়।

বললুম-বরাবর দেখে আসছি কলকাতা শহরটা যেন আপনার নখদর্পণে। আমার ধারণা আপনি আগের জন্মে পোস্টম্যানের চাকরি করতেন।

কর্নেল আমার কথা শুনে তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বললেন–ওই পাড়ায় একবার আমাকে একটা কাজের সূত্রে যেতে হয়েছিল–কোনও রহস্যে সূত্র খুঁজতে নয়। ও পাড়ায় সতীশচন্দ্র লোধ নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন। সোনারপুরে তার নার্সারি ছিল। আমাকে তিনি বিরল প্রজাতির কয়েকটা ক্যাকটাস আনিয়ে দিয়েছিলেন। এখন তিনি বেঁচে নেই তবে তাঁর ছেলেরা নার্সারির উন্নতি করেছে।

এরপর কর্নেল তার অভ্যাসমত সেই বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস নিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন। ভাগ্যিস কিছুক্ষনের মধ্যেই ডোরবেল বাজল এবং প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদার মশাই সবেগে ড্রইং রুমে প্রবেশ করলেন। তিনি সোফায় বসেই বললেন- ওঃ! কী ধকল না আমারে সামলাতে হইল। তবে কথা পরে আগে কফি খামু।

ষষ্ঠী তার আগের এক পেয়ালা কফি এনে দাঁড়িয়েছিল। সে যে সকৌতুকে টিকটিকিবাবুকে দেখছিল তা আমি লক্ষ্য করেছিলুম। হালদার মশায়ের সামনে সেন্টার টেবিল কফির পেয়ালা-প্লেট রেখে সে চলে গেল। স্পেশাল কফি বলতে হালদার মশায়ের পেয়ালায় দুধের পরিমাণ একটু বেশি থাকে। কর্নেল যে কফি খান তা নাকি হালদার মশায়ের ভাষায় তিতা লাগে।

হালদার মশাই অভ্যাসমত ফুঁ দিতে দিতে কফি খাচ্ছিলেন। কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানছিলেন। আমি হালদার মশায়ের মুখে বনশ্রীর খবর শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলুম। তিনি তারিয়ে তারিয়ে কফি শেষ করার পর প্যান্টের পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করলেন এবং একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে নোংরা রুমালে নাক মুছলেন। তারপর বললেন- বনশ্রী রায়ের বাড়ির খোঁজ করতেই এক পানওয়ালা আমারে জিগাইছিল আমি ফিল্ম কোম্পানির লোক কিনা। তারে কইছিলাম হঃ আমি স্টুডিও থেক্যা আইতাছি। বাড়িটা পানওয়ালার দোকানের পাশেই। বনেদী বাড়িটা দোতলা। একখান গেট আছে। গেটের উপর লাল লাল ফুল আর ভিতরে ছোট্ট একটা উঠান। উঠানের দুই পাশে ফুলের গাছ। আমি গেটের রেলিং-এ মুখ ঠেকাইয়া আছি এমন সময় ভিতর থেক্যা একটা ষন্ডামার্কা লোক আইয়া কইল–কাকে চান। আমি কইলাম–টালিগঞ্জের জয়শ্রী সিনে স্টুডিও থেক্যা আইতাছি। মিস রায়ের লগে কথা আছে।

সে ধমক দিয়া কইল–এখন এই বাড়িতে কেউ নাই। ওঁরা আউটডোর শু্যটিং-এ গেছেন। আপনার তো তা জানবার কথা।

কইলাম–সেকি আইজ তো আমার কর্তাবাবুর নতুন ছবির শুভ মহরতে ওঁর থাকার কথা।

লোকটা বদমেজাজি। সে আবার আমারে ইনসাল্টিং টোনে কইল–আপনি কি কানে কালা? কইলাম না উনি আউটডোর শু্যটিং-এ বাইরে গেছেন। যান আর বিরক্ত করবেন না।

এরপর হালদারমশাই যা বললেন তার সারমর্ম এই :

হালদার মশাই সেখান থেকে সরে এসে সেই পানওয়ালার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি কদাচিৎ পান খান কিন্তু ভাব জমানোর জন্য এক খিলি পান তাকে খেতে হয়েছিল। তারপর তিনি কথায় কথায় লোকটার কাছে জানতে পারেন বনশ্রীর বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। বনশ্রীর আর কোনও ভাইবোন নেই। প্রথমে তার মা। তারপর তার বাবা মারা যান। মৃত্যুর আগে বনশ্রীর বাবা তার ব্যবসা মালিকানা অন্য একজনকে বিক্রি করে দেন। বনশ্রী তখন সবে কলেজে ঢুকেছে। তার মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা মেয়ের দেখাশোনার জন্য বিহার মুলুকে রাজগ্রাম থেকে নিজের বিধবা দিদিকে বাড়িতে এনে রাখেন। ভদ্রমহিলার নাম রত্নাদেবী। খুব তেজি আর পুরুষালি স্বভাবের মহিলা। বনশ্রী দেখতে খুব সুন্দর ছিল তাই পাড়ার ছেলেরা তার পিছনে লাগত। রত্নাদেবী পাড়ার একজন গুন্ডামস্তান টাইপের যুবক রাজেনকে নিজের বাড়িতে রাখেন। রাজেনকে সবাই আড়ালে বলে গলাকাটা। রাজু। সে নাকি অনেক খুনখারাপি করেছে। কিন্তু পাড়ার একজন পলিটিক্যাল লিডার তাকে ভোটের সময়ে কাজে লাগাতেন। তাই পুলিশ তাকে এড়িয়ে চলত। এরপর রাজু হয়ে ওঠে বনশ্রীর বডি গার্ড।

এরপরের অংশ হালদার মশাই জানতে পেরেছেন পানওয়ালার দোকানে পাড়ার এক খদ্দের ভদ্রলোকের কাছ থেকে। সেই ভদ্রলোকের নাম নরেনবাবু। নরেনবাবু বনশ্রীর মডেল হওয়ার কাহিনী শুনিয়ে শেষে চুপিচুপি বলেছেন বনশ্রী নাকি সম্প্রতি বোম্বাইয়ের ফিল্ম করার চান্স পেয়েছে। তাই সে পিসিমাকে সঙ্গে নিয়ে বোম্বে চলে গেছে। বাড়িতে রেখে গেছে রাজুকে। কিন্তু সেই ভদ্রলোক চলে যাবার পর পানওয়ালা হালদার মশাইকে চুপি চুপি বলেছে বোম্বের ফিল্মওয়ালা বড় বাস্তার মোড়ে যে হোটেল আছে সেই হোটেলে উঠেছেন। বনশ্রী নাকি সেখানেই আছে। হোটেলটার নাম এশিয়া।

হালদার মশাইয়ের কথা শেষ হওয়ামাত্র আমি বলে উঠেছিলুম–হোটেল এশিয়া। কর্নেল, আপনার অনেক কেসের ঘটনাস্থল এই এশিয়া। কাজেই আপনি হোটেলের ম্যানেজার মিঃ রঙ্গনাথনকে ফোন করলেই বনশ্রীর খবর পেয়ে যাবেন।

কিন্তু আমাকে হতাশ করে হালদার মশাই বললেন– কী যে কন জয়ন্তবাবু। মিঃ রঙ্গনাথনের লগে আমারও পরিচয় আছে না? আমি তখনই ওনার লগে দেখা করতে গিছলাম। উনি কইলেন আমি যে নাম কইতেছি সে নামে কেউ হোটেল এশিয়ায় ছিল না বা এখন নাই। তবে বম্বে থেক্যা সুমোহন পারেখ নামে এক ভদ্রলোক তিনিদিন এই হোটেলে ছিলেন। গতরাত্রে পারেখের সঙ্গে একজন প্রৌঢ়া আর একজন খুব সুন্দর চেহারার তরুণী দেখা করতে আইছিলেন। আইজ মার্নিং-এ মিস্টার পারেখ হোটেল থেক্যা চেকআউট করেছেন। তবে মিস্টার রঙ্গনাথন লক্ষ্য করেছিলেন গেটের বাইরে একখান নীল রঙের মারুতি গাড়ি খাড়াইয়া ছিল। মিস্টার পারেখ তার লাগেজ লইয়া সেই গাড়িতে চাইপ্যা রওনা দিছেন।

আমি উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম। বললুম কর্নেল, আপনার কিন্তু এখনই মিস্টার রঙ্গনাথনকে টেলিফোন করা উচিত।

কর্নেল কিন্তু একটুও উত্তেজিত হন নি। তিনি সহাস্যে বললেন- ফোন পরে করা যাবে। তবে হালদার মশাইয়ের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে বনশ্রীর মারুতি গাড়ি, সম্ভবত সেই মিস্টার পারেখকে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে যায়। কারণ তাহলে বনশ্রী এবং তার পিসিমা রত্নাদেবীকে হালদার মশাই বাড়িতেই পেয়ে যেতেন। স্টুডিও থেকে আনা কোনও লোককে অর্থাৎ হালদার মশাইকে বনশ্রী বাড়িতে থাকলে নিশ্চয়ই ডেকে নিয়ে গিয়ে কথাবার্তা বলত।

হালদার মশাই বললেন– হঃ, ঠিক কইছেন কর্নেল সাহেব। আমার ক্যান য্যান মনে হইতাছে ওঁরা সত্যিই আউটডোর শু্যটিং-এ গেছেন।

.

০৪.

ততক্ষণে বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ষষ্ঠীচরণ এসে ড্রয়িং রুমের আলোগুলো জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিল। কর্নেল বলেছিলেন- হালদারমশাই আপনি জব্বর খবর এনেছেন। এবার আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনার এক ভাগ্নে তো মোটর ভেহিক্যালস ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে। যদিও কাজটা কঠিন, বনশ্রী রায়ের ঠিকানা তাকে দিয়ে তার মারুতি গাড়ির নাম্বারটা খুঁজে বের করতে বলবেন। যদি বেশি সময় লাগে তাতে কিছু যায় আসে না। মোটকথা বনশ্রীর গাড়ির নাম্বারটা–বাধা দিয়ে আমি বললুম– কী আশ্চর্য বনশ্রী যে সব বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে মডেলিং-এর কাজ করেছে খবরের কাগজ বা পত্রপত্রিকা থেকে বিজ্ঞাপন দেখে সেই কোম্পানির শরণাপন্ন হলে বনশ্রীর গাড়ির নাম্বার নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

কর্নেল আবার তার বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বললেন-বনশ্রীকে চেনা যাবে কী করে। তার ফটো তো আমরা এখনও দেখিনি। বললুম- জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপালবাবুকে ফোন করলে তিনি নিশ্চয়ই তার কোনও ছবি দিতে পারবেন।

কার্নেল বললেন– ঠিক আছে। তাহলে তুমি এই দায়িত্বটা নাও।

আমি সোৎসাহে টেলিফোনের কাছে গেলুম। গোপালবাবুর ফোন নাম্বার আমার মুখস্থ। প্রায় মিনিট দশেক চেষ্টার পর তার লাইন পাওয়া গেল। তাকে বললুম– গোপালবাবু আমি জয়ন্ত বলছি। একটা জরুরী দরকারে আপনাকে ফোন করছি… অন্য কিছু না বনশ্রী রায়ের ছবি নিশ্চয়ই আপনার কাছে আছে… নেই? সেকি… কেন? ব্রতীনবাবুর ফিল্মের অফিসে স্ক্রিনটেস্ট হওয়ার কথা… কী অদ্ভুত ব্রতীনবাবুর অফিস কি খোলা যায় না?… সর্বনাশ বলেন কী, পুলিশ তার অফিস সিল করে দিয়েছে… হা ব্রতীনবাবু মার্ডার হয়েছেন কিন্তু তাই বলে তার অফিস কেন পুলিশ সিল করল… আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু প্লিজ গোপালবাবু, কর্নেল বনশ্রীর একটা ছবি খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপিয়েছেন। তাই আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি এ ব্যাপারে আমাকে যেন সাহায্য করেন… ঠিক আছে রাখছি।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন আমি জানতুম বনশ্রীর ছবি নিশ্চয়ই আছে কিন্তু তা আপাতত আমাদের নাগালের বাইরে। আমার মতে তার ছবির কথা পরে, আগের কাজ হ’ল ছবি নয় ছবির মানবীকেই খুঁজে বের করা।

হালদার মশাই কী বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু বললেন না। তিনি একটিপ নস্যি নিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন।

আমি বললুম– হালদার মশাইয়ের ভাগ্নেকে তাহলে খড়ের গাদা থেকে। হারানো সূচ খুঁজে বের করতে হবে আর আপনার ক্ষেত্রেও তাই। যে মেয়েকে আপনি দেখেননি তাকে আপনি খুঁজে বের করার কথা বলছেন। আমার মাথায় আসছে না আপনি কীভাবে তাকে খুঁজে বের করবেন।

কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে বললেন–হালদারমশাই, তাহলে আজ রাত্রেই আপনি আপনার ভাগ্নেকে কাজটার দায়িত্ব দিন। এর আগেও সে আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। আশাকরি এবারও করবে।

হালদারমশাই চিন্তিতমুখে উঠে দাঁড়ালেন তারপর যথারীতি যাই গিয়া’ বলে বেরিয়ে গেলেন।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ষষ্ঠীকে আর এক দফা কফি আনতে বললেন। ষষ্ঠী কফি আনার পর কর্নেল চুপচাপ কফি-পানে মন দিলেন। কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুললেন। তারপর সাড়া এলে বললেন– কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। অরিজিৎ লাহিড়ী কি অফিসে আছেন?… নেই? ঠিক আছে যথাসময়ে আমি তাকে বড়িতে রিং করব। এখন সম্ভবত তিনি ক্লাবে গেছেন।

রিসিভার রেখে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অন্যমনস্কভাবে বললেন জীবনে এই প্রথম এমন একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি যা খুবই জটিল।

বললুম– আপনিই তো বলেন আপাতদৃষ্টে কোনও ঘটনা যত বেশি জটিল দেখায় তার সূত্র নাকি বেশ সরল।

কর্নেল হাসলেন।– তা ঠিক, কিন্তু এমন তালগোল পাকানো ঘটনার অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এ পর্যন্ত দেখছি না।

কথাটা বলে তিনি ভিতরের ঘরের পর্দা তুলে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন–জয়ন্ত, আমরা এবার বেরোবো।

অবাক হয়ে বললুম–সন্ধ্যার পর কলকাতা আমার কাছে কেন যেন আতঙ্ক। হয়ে ওঠে।

কর্নেল এবার গম্ভীর মুখে বললেন– খবরের কাগজের অফিস থেকে বেরোতে তোমার তো কোনও কোনওদিন রাত্তির হয়ে যায়। তখন কি তোমার কলকাতাকে আতঙ্ক নগরী মনে হয় না?

বললুম– ততটা হয় না কারণ আমি অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা পার্কস্ট্রিট হয়ে ই এম বাইপাসে পৌঁছই। তারপর সোজা সল্টলেক। বাইপাসে কোনও না কোনও জায়গায় পুলিশের গাড়ি টহল দেয়।

কর্নেল বললেন– ঠিক আছে। এই বৃদ্ধের সঙ্গে তুমি কিন্তু বহুবার রাতের কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরেছ। হঠাৎ আজ একথা কেন? হাসতে হাসতে বললুম না আসলে দিনে দুপুরে ব্রতীনবাবুকে যারা ওভাবে গুলি করে মেরেছে। তাদের পেছনে নিশ্চয়ই কোনও শক্ত গার্জেন আছে। রক্তাক্ত লাশটা স্বচক্ষে না দেখলেও মনের মধ্যে বারবার ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে শত্রুপক্ষের লোক হয়ত বিজয়েন্দুবাবুকে ফলো করে এসেছিল।

কর্নেল এবার হেসে উঠলেন। বললেন– যাও তোমার ঘর থেকে পোশাক বদলে এসো। সঙ্গে তোমার ফায়ার আর্মস নিতে ভুলবে না। তোমার টর্চটাও নিও।

অগত্যা আমি আমার ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে নিলুম তারপর আমার সিক্স রাউন্ডার রিভলভারে ছ’টা গুলি ভরে সাবধানে প্যান্টের ডান পকেটে রাখলুম।

একটু পরে আমার গাড়ি বের করে জিগ্যেস করলুম- কোন দিকে যাব?

কর্নেল সামনে বাঁদিকের সিটে বসলেন- আমরা যাব ভবানীপুরে। গেটম্যান সেলাম ঠুকে গেট খুলে দিল। আমরা বেরিয়ে গেলুম। পার্কস্ট্রিট হয়ে চৌরঙ্গীতে পৌঁছনোর পর কর্নেল বললেন- তোমার আতঙ্ক বাড়িয়ে আমি কিন্তু গলিপথেই ভবানীপুরে ঢুকব।

সত্যিই তাই। একটার পর একটা গলি এঁকেবেঁকে গিয়ে কোনও রাস্তায় মিশেছে আবার সেখান থেকে গলিপথে কিছুক্ষণ যাবার পর কর্নেল বললেন– সামনে একটা বড় রাস্তা পড়বে। তুমি মোড়ে গাড়ি দাঁড় করাবে। তার কথামত গাড়ি দাঁড় করালুম। সামনে একটা ছোট্ট পার্ক দেখা যাচ্ছিল। পার্কে উজ্জ্বল আলো জ্বেলে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলছিল। কর্নেলের নির্দেশে গাড়ির কাঁচ তুলে দিয়ে এবং লক করে তাকে অনুসরণ করলুম। ডানদিকে এগিয়ে কলে একটা বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ালেন। বারবার দেখে আসছি তার সঙ্গে কলকাতার যত বনেদি পরিবারের অভিজাত ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কর্নেলকে দেখামাত্র দারোয়ান সেলাম ঠুকে গেটের একটা অংশ খুলে দিল। কর্নেল তাকে জিগ্যেস করলেন মিঃ ভদ্র কি বাড়িতে আছেন?

দারোয়ান বলল– হ্যাঁ স্যার। আভি তিনি বাড়ি আসলেন। বলে সে অনুচ্চ স্বরে ডাকল রবীনবাবু! কর্নেল সাব এসেছেন।

দেখলুম, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে কর্নেলকে নমস্কার করলেন। তারপর বললেন– কর্তাবাবু আজই বলছিলেন, কর্নেল সাহেবকে ফোন করেছিলুম। কিন্তু তার পাত্তা নেই। তিনি আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময় গাড়ি বারান্দার ওপর থেকে পাজামা পাঞ্জাবি পরা লম্বা এবং তাগড়াই চেহারার এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন- যাক! তাহলে অবশেষে কর্নেল সাহেবের পায়ের ধুলো পড়ল। কিন্তু আপনি কি ট্যাক্সি চেপে এসেছেন? কী মুশকিল। রিং করে একটু খবর দিলেই আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিতুম।

কর্নেল বললেন আমার সঙ্গে যে তরুণ বন্ধুটিকে দেখছেন, তাঁর গাড়িতে চেপেই আমি এসেছি। তবে আড্ডা দেবার জন্য আসিনি। তাছাড়া আপনাকে। আপ্যায়নের জন্যও ব্যস্ত হতে হবে না। আমার হাতে সময় কম। আমি নীচের ঘরে বসেই আপনার সঙ্গে কয়েকটা জরুরি কথা বলে চলে যাব।

গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে এগিয়ে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে বিশাল দরজা। ভিতরে ঢুকে দেখলুম এটা একটা হলঘর। সোফায় বসে কর্নেল চাপাস্বরে বললেন- তুমি কিন্তু মুখটি বুজে থাকবে। কী ঘটেছে তা নিয়ে কোনও কথা নয়।

আমি বললুম- ঠিক আছে।

রবীনবাবু ভিতরে ঢুকে গেলেন। একটু পরে সেই তাগড়াই চেহারার ভদ্রলোক হাতে একটা ছড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন- কর্নেল সাহেব, আমি আপনাকে বিহারের ছোটনাগপুর থেকে আনা একটা আশ্চর্য অর্কিড দেখানোর জন্য ফোন। করেছিলুম। আর আপনি এলেন কিনা রাত্রিবেলায়।

কর্নেল বললেন– তাহলে বোঝা যাচ্ছে রাজগাঁওয়ের বাড়িটা এখনও আপনি হাতে রেখেছিন।

মিঃ ভদ্র সহাস্যে বললেন–রাজগাঁও এলাকা এখন আরও উন্নত হয়ে উঠেছে। তাই আপনাকে যদিও বলেছিলুম বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে ওখানকার পাট চুকিয়ে। দেব। শেষ পর্যন্ত সেই মত বদলেছি। এই তো কয়েকদিন আগে সেখান থেকে ফিরেছি। বাঙালিটোলা একথাটা এখনও তেমনই আছে।

কর্নেল বললেন– আমি একটা কথা আপনার কাছে জানতে এসেছি। আপনি তো রাজগাঁও-এ ছেলেবেলা কাটিয়েছেন এবং যৌবনের অধিকাংশ সময়ই সেখানে থেকেছেন। বাঙালিটোলায় সব বাঙালি পরিবারই আপনার পরিচিত ছিল।

মিঃ ভদ্র বললেন- তা ছিল। আমরা ওখানে বাঙালিরা নানারকম পুজোর উৎসবে যেমন মেতে উঠতুম, তেমনই জিমন্যাস্টিক ক্লাব, লাইব্রেরি– তাছাড়া ধরুন, মাঝে মাঝে কলকাতার আর্টিস্টদের নিয়ে গিয়ে ফাংশন– এসবও করেছি। তাই আমাদের পরস্পরের মধ্যে জানাশোনা ছিল খুব গভীর। পরস্পরের বিপদে সবাই ছুটে গেছি। যেমন ধরুম, সুবিমল চৌধুরী নামে আমার এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু ছিলেন। মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার। খনি দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। আমরা সেদিন তার বিধবা স্ত্রীর পাশে না দাঁড়ালে খনির মালিক সুবিমলের প্রাপ্য কোনও টাকাকড়িই হয়তো মিটিয়ে দিত না।

কর্নেল কতকটা তার কথার উপরই বললেন– হ্যাঁ, সে আমলের সব খনিই তো প্রাইভেট কোম্পানির হাতে ছিল। স্বাধীনতার পর ক্রমশ তা সরকার নিয়ে নেয়। যাই হোক, বাই এনি চান্স, সুবিমলবাবুর স্ত্রীর নাম কি রত্না চৌধুরী ছিল এবং তিনি কলকাতার মেয়ে ছিলেন?

কর্নেলের প্রশ্ন শুনে আমি অবাক। আমাকে আরও অবাক করে মিঃ ভদ্র বললেন– আপনি ঠিকই বলেছেন। সুবিমলের স্ত্রী ছিল রত্ন। কথাটা বলে তিনি হেসে উঠলেন। আসলে রত্নাবৌদি ছিলেন খুব তেজস্বিনী প্রকৃতির মহিলা। বাঙালিটোলায় সব ব্যাপারে মেয়েদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রণী। একটা কথা মনে পড়ছে। খুব বেশি দিনের কথা নয়। বছর অষ্টেক আগে ফরেস্ট এলাকা থেকে একটা বাঘ এসে প্রায়ই হামলা করত। বাঙালিটোলা রাজগাঁও-এর একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে। আর সামান্য দূরেই ফরেস্ট এলাকা। আপনি শুনলে অবাক হবেন, রত্নাবৌদি কুড়ুলের আঘাতে বাঘটাকে ভীষণ জখন করেছিলেন। পরে অবশ্যি আমি গিয়ে রাইফেল দিয়ে বাঘটাকে মেরে ফেলি। কিন্তু রত্নাবৌদির দুঃসাহস দেখে আমরা তখন স্তম্ভিত। পরে শুধু বাঙালিটোলা নয়; রাজগাঁওয়ের সব শ্রেণির মানুষ। একটা সভা করে রত্নাবৌদিকে সম্মান জানিয়েছিলেন।

কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন- আপনার রত্নাবৌদি কি এখনও সেখানে আছেন? মিঃ ভদ্র বললেন না। তার পরের পর তাঁর ভাই কলকাতা থেকে এসে তাকে নিয়ে যান। ভদ্রমহিলা ছিলেন নিঃসন্তান।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন- ওদের বাড়িটা তাহলে নিশ্চয়ই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল?

–না, রত্নাবৌদি তার ভাসুর অমলেন্দু চৌধুরীর ছেলে শ্যামলকে দান করে গিয়েছিলেন। শ্যামল ওখানকার খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। তার বাবা অমলেন্দু মদের নেশায় ছেলেমেয়েদের প্রায় পথে বসিয়ে গিয়েছিলেন। রত্নাবৌদি না থাকলে শ্যামলের ভীষণ দুর্গতি হত।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- আমি এবার চলি মিঃ ভদ্র। পরে একদিন এসে আপনার অর্কিড দেখে যাব।

মিঃ ভদ্র কর্নেলকে অনুসরণ করে হাসতে হাসতে বললেন– আপনার আবার অপরাধ রহস্য নিয়ে ছুটোছুটির বাতিক অছে। মনে হচ্ছে আপনি কোনও একটা রহস্যের পিছনে ছুটছেন এবং তার সঙ্গে আমাদের রত্নাবৌদি জড়িত। তাই না?

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন– সব কথা যথাসময়ে জানতে পারবেন। আপাতত আপনাকে অনুরোধ, আমি যে আপনার কাছে রত্নাদেবী সম্পর্কে জানতে এসেছিলুম, একথা যেন গোপন থাকে।

মিঃ ভদ্র কর্নেলের ডান হাতটা চেপে ধরে বললেন- এসব বলার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে যেমন জানি, আপনিও আমাকে তেমনই জানেন।

মিঃ ভদ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমরা গাড়িতে চেপেছিলুম। স্টার্ট দিয়ে বলেছিলুম ভদ্রলোকের হলঘরে কয়েকটা হরিনের মাথা– এমনকি চিতাবাঘের স্টাফড মুর্তি দেখলুম। ভদ্রলোক যে একমসয়ে শিকার করতেন তা নিশ্চিত।

কর্নেল বললেন- হ্যাঁ, আমার এই বন্ধুটি এখনও আমার মতো অরণ্যচর। রাস্তায় যেতে যেতে বললুম– রাজগাও কথাটা শুনেই দেখা যাচ্ছে আপনার মনে পড়েছিল এই শিকারী ভদ্রলোকের কথা।

কর্নেল একটু হেসে বললেন- মাঝে মাঝে আমার মাথায় কোনও একটা অঙ্ক এসে গেলে তা যদি শেষাবধি মিলে যায় অর্থাৎ দুয়ে দুয়ে চার হয়, তাহলে আজকাল আর আমি অবাক হই না।

জিগ্যেস করলুম- অভিনেত্রী বনশ্রী রায়ের পিসিমা সম্পর্কে আপনি যে তথ্য হাতে পেলেন, তা আপনি কিভাবে কাজে লাগাবেন বুঝতে পারছি না। হালদার মশায়ের সূত্রে জানা গেছে বোম্বের জনৈক মিস্টার পারেখ, পিসিমা ও ভাইঝিসহ মারুতিতে চেপে কলকাতা থেকে সম্ভবত বাইরে কোথাও চলে গেছেন। কিন্তু তাঁরা যে রাজগাঁওয়েই গেছেন, আপনার হিসেবটা কি এরকম?

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন– রাতের আতঙ্ক নগরীতে তোমার হঠাৎ সাহস বেড়ে গেছে। জয়ন্ত; সাবধানে গাড়ি চালাও। তোমাকে বরাবর বলে আসছি মানুষ একসময়ে যে কাজটা করছে, ঠিক সেই কাজটার প্রতি তার মনোযোগ থাকা উচিত।

তাঁর কথার ভঙ্গিতে হাসি পেল। কিন্তু হাসলুম না-বললুম ও.কে. বস!

অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর কর্নেল যথারীতি ষষ্ঠীকে কফির আদেশ দিয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুললেন। তারপর ডায়াল করতে থাকলেন। সাড়া এলে তিনি বললেন- অরিজিৎ! তুমি কি আজ ক্লাবে কোনও হোমরা-চোমরা ব্যক্তির আপ্যায়নে ব্যস্ত ছিলে… না, জাস্ট কথাটা মাথায় এলো আর কি… ইতিমধ্যে তুমি ফোন করেছিলে? দেখছ ষষ্ঠী কথাটা বলতে ভুলেই গেছে। দেখাচ্ছি ওকে… যাই হোক, শোনো। তোমাকে একটা জরুরি ব্যাপারে রিং করেছিলুম। তুমি তো ব্রতীন সোমের মার্ডার কেসের দায়িত্ব নরেশবাবুর ওপর চাপিয়ে দিয়েছ…হ্যাঁ তা বুঝেছি। ব্রতীনবাবুর পলিটিক্যাল গার্ডেনের চাপ থাকা স্বাভাবিক। এনি ওয়ে, আমার কথাটা শোনো। জয়শ্রী সিনে স্টুডিওকে সব ফিল্ম প্রোডিউসার নতুন কোনও ফিল্ম হাতে নিলে অস্থায়ীভাবে একটা অফিস খোলেন। শুনেছি ব্রতীনবাবুর গৌরীমাতা প্রোডাকশনের ওই অফিসটা তোমরা সিল করে রেখেছ… না। কাজটা ঠিকই করেছ। তবে আমার ধারণা– হ্যাঁ এই ধারণার যথেষ্ট ভিত্তি আছে। ব্রতীনবাবুর আসল অফিস কিন্তু তাঁর বাড়িতেই। আমি আগামীকাল সকাল আটটা নাগাদ ব্রতীনবাবুর বাড়িতে যেতে চাই। এ ব্যাপারে নরেশবাবু এবং তোমার ডিপার্টমেন্টের আরও দু-একজন অফিসার একটু আগে গিয়ে সেখানে হানা দিলে ভাল হয়… ধর, ছ’টা থেকে সাতটার মধ্যে কোনও এক সময়ে ওঁরা যাবেন। আমি ঠিক আটটায় পৌঁছব… এই ব্যবস্থাটা তুমি করে রাখবে। ছাড়ছি। উইশ ইউ এ নাইস স্লিপ।

কর্নেল রিসিভার রেখে আমার দিকে তাকালেন। বললুম- তার মানে, আমাকে কাল-ভোর সাতটার মধ্যেই উঠতে হবে।

এই সময়ই যষ্ঠী ট্রেতে দু’পেয়ালা কফি রেখে গেল। চুপচাপ কফি পানের পর কর্নেল চুরুট ধরালেন এবং ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ধ্যানস্থ হলেন। বললুম কর্নেল আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। কর্নেল ওই অবস্থা থেকেই শুধু বললেন– হুঁ।

–এমন তো হতেই পারে বনশ্রী ব্রতীনবাবুর টাকাকড়ি মেরে আপাতত কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে চেয়েছে।

— হুঁ।

– এদিকে সে তার পোষ্য গুন্ডা রাজেন বা রাজুকে দিয়ে ব্রতীনবাবুর মুখ বন্ধ করার জন্য তাকে গুলি করে মেরেছে।

–হুঁ।

–রাজু সম্ভবত তার কোনও বন্ধুর সাহায্য নিয়েছে সেই বন্ধুর মোটর সাইকেল আছে। এবার ব্রতীনবাবুকে ফলো করে তারা গঙ্গার ধারে গেছে এবং দেখেছে তিনি কিভাবে বসে আছেন। তারপর–

–হুঁ।

 এতক্ষণে বুঝতে পারলুম, আমি অকারণ কথাগুলো বলে যাচ্ছি। কর্নেল অন্য কোনও ভাবনায় মগ্ন। তাছাড়া কর্নেল যখন আমার কথার উত্তরে এভাবে হু দিয়ে যান, তখন আমি কেন যে ভুলে যাই উনি আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না? অতএব চুপ করে গেলুম।

সে রাতে খাওয়াদাওয়ার পর কর্নেল আমাকে বলেছিলেন- জয়ন্ত তোমার কথাগুলো যে আমার কানে যায়নি, তা নয়। তবে তোমার ওই আইডিয়ার গোড়ায় গলদ আছে। কোনও বুদ্ধিমতী মেয়েই একটা অপরাধ করার পর আরও একটা বড় অপরাধ করার ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়ত হোটেল এশিয়ায় বহিরাগত জনৈক সুমোহন পারেখ এবং তার সঙ্গে পিসিমা-ভাইঝির যোগাযোগের ব্যাপারটা রহস্যকে আরও জটিল করে ফেলেছে। বলে তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন– হ্যাভ এ নাইস স্লিপ ডার্লিং!

.

০৫.

পরদিন সকাল আটটায় কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে গিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটি গলির ভেতরে পুলিশের গাড়ি দেখতে পেলুম। আমার গাড়ি সেটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল, একটা দোতালা ছিমছাম বাড়ির গেটের সামনে পুলিশের লাল জিপ গাড়ি। বাড়ির গেট খোলা এবং সংকীর্ণ লনে দাঁড়িয়ে আছেন সাদা পোশাকে নরেশবাবু এবং কলকাতার পুলিশের উর্দিপরা একজন অফিসার। আমাদের দেখতে পেয়ে নরেশবাবু হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। মর্নিং কর্নেলসাহেব। মর্নিং জয়ন্তবাবু!

কর্নেল আস্তে মর্নিং বলার পর জিগ্যেস করলেন- আপনারা কি ইতিমধ্যে বাড়ি সার্চ করে ফেলেছেন?

নরেশবাবুর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। তিনি বললেন- বাড়ি সার্চ করার কোনও কথা তো আমাদের বলা হয় নি। তবে মিঃ লাহিড়ী ব্রতীনবাবুর যে অফিসটির কথা বলেছিলেন তার দরজায় আমাদের লোক মোতায়েন রেখেছি। শুধু ওই অফিসের সার্চ ওয়ারেন্ট আমি এনেছি।

–অফিসঘরের দরজা কি লক করা আছে?

–ছিল! তবে ব্রতীনবাবুর স্ত্রী রমাদেবী তালা খুলে দিয়েছেন। ভদ্রমহিলা প্রচন্ড ভেঙে পড়েছেন। তাই তাকে কোনও প্রশ্ন করি নি। ব্রতীনবাবুর লইয়ার প্রশান্ত হালদারকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মিঃ হালদার আপনাদের হালদার মশায়ের মতো নন। খুব তর্জন-গর্জন করছিলেন। সার্চ ওয়ারেন্ট দেখতে চেয়েছিলেন। সেটা অবশ্য তাঁকে দেখিয়েছি।

সিঁড়ি বেয়ে নরেশবাবু এবং কর্নেল বারান্দায় উঠলেন। তারপর ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। দেখলুম কালো কোট এবং সাদা প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক হাতে একটা ব্রিফকেস নিয়ে গম্ভীরমুখে সোফায় বসে আসেন। তার পাশে আরেকজন ভদ্রলোক। চুপচাপ বসে সিগারেট টানছেন। তার পরনে জিনস এবং গায়ে টি-শার্ট। মাথার চুল এলোমেলো।

নরেশবাবু কর্নেলকে বললেন- আলাপ করিয়ে দিই, এই ভদ্রলোককে দেখেই বুঝতে পারছেন ইনি একজন অ্যাডভোকেট। ইনি মিস্টার প্রশান্ত হালদার। আর উনি বিখ্যাত চিত্র পরিচালক রঞ্জন মিত্র। মিস্টার হালদার! মিস্টার মিত্র! আমরা এতক্ষণ যাঁর প্রতীক্ষা করছিলুম, তিনি এসে গেছেন। ইনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এবং ইনি জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবক প্রত্রিকার সাংবাদিক।

লক্ষ্য করলুম আইনজীবী ভদ্রলোক কপালে শুধু হাতটা ঠেকালেন। আর চিত্র পরিচালক রঞ্জনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে একটু হেসে আমাদের নমস্কার করলেন।

কর্নেল বললেন- আপনারা ততক্ষণ বসে গল্প করুন। আমরা মিস্টার সোমের অফিসটা একটু দেখে নিই।

আইনজীবী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন– আপনি একজন সামরিক অফিসার। আপনার যা বয়স তাতে আপনাকে রিটায়ার্ড বলেই মনে হচ্ছে। এই কেসে আপনার ভূমিকা কী তা জানতে পারি?

কর্নেল একটু হেসে বললেন– আমার ভূমিকা একটাই। তা হল ব্রতীন সোমের খুনীদের খুঁজে বের করা।

হালদার কী বলতে যাচ্ছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে চিত্র পরিচালক রঞ্জনবাবু বললেন- প্লিজ মিস্টার হালদার! আপনি অকারণ উত্তেজিত হবেন না। আমি জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপালবাবুর কাছে গতকাল কর্নেল সাহেবের পরিচয় পেয়েছি। উনি আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। এই সব কথা বলার সময় নরেশবাবু এবং একজন উর্দিপরা অফিসার অফিস ঘরে ঢুকেছিলেন। কর্নেল আর কোনও কথা না বলে অফিসঘরে ঢুকে গেলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলুম। প্রথমেই চোখে পড়ল প্রশস্ত ঘরের দেয়াল জুড়ে ইতস্তত অনেক যুবক-যুবতীর কাট-আউট আঁটা আছে। একপাশে দাঁড় করানো আছে একটা ক্যামেরা। তার উল্টোদিকে প্রায় দুমিটার চওড়া ভাজ করা রঙীন পর্দা ঝুলছে। ঘরের ওই অংশটার মেঝে কার্পেটে মোড়া। অন্যদিকে প্রকান্ড একটা সেক্রেটারিয়েট টেবিল এবং রিভলভিং চেয়ার। তার পিছনে দেয়াল ঘেঁষে কয়েকটা আলমারি। এককোণে ফিল্মের অনেকগুলো রিল রাখা আছে। টেবিলটার সামনে সারবন্দী গদি আঁটা চেয়ার। ঘরের উল্টোদিকে একটা দরজায় পর্দা ঝুলছিল! কর্নেল এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দরজাটা খুললেন। দেখলুম, ওদিকে একটা বারান্দা এবং নীচে ফুলবাগিচা। বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁসে কয়েকটা গাছও দাঁড়িয়ে আছে।

কর্নেল বললেন–নরেশবাবু! আপনারা এবার সার্চ শুরু করতে পারেন। নরেশবাবু আইনজীবী ভদ্রলোককে ডেকে বললেন-মিস্টার হালদার! মিসেস সোম আপনাকে এ ঘরের সব চাবি দিয়ে গেছেন। আপনি আমাদের একটু সাহায্য করুন।

আইনজীবী গম্ভীর মুখে বললেন– বলুন কী করতে হবে?

–আপনি একটা করে আলমারিগুলো খুলে দিন। তারপর এই সেক্রেটারিয়েট টেবিলের দুদিকের ড্রয়ারগুলোও খুলে দিন।

মিস্টার হালদার নরেশবাবুর কথামত সব আলমারি, ভিতরের লকার এবং ড্রয়ার চাবি দিয়ে খুলে দিলেন। নরেশবাবু এবং তার সঙ্গী অফিসার সার্চ শুরু করলেন। আলমারিতে অজস্র ফাইল। ফিল্মের রিল। কয়েকটা ক্যামেরা এবং ছবি প্রায় এক ডজন অ্যালবাম ভর্তি করা আছে। এদিক থেকে চিত্র পরিচালক রঞ্জনবাবু বললেন- কাল বিকেলে ব্রতীনদার মর্মান্তিক খবর পেয়েই আমি আগে ছুটে এসেছিলুম এই অফিসে। কারণ আমাদের নতুন ছবির স্ক্রিপ্ট এবং আরও কিছু দরকারি কাজগপত্র আলমারিতে রাখা ছিল। তবে ব্রতীনদার এই টেবিলের ড্রয়ার খুঁজে কোনও টাকা-পয়সা পাইনি।

নরেশবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন– তাহলে আপনি এসে আগেই এই ঘরাটা তন্নতন্ন সার্চ করেছিলেন?

রঞ্জনবাবু বললেন, করেছিলাম। কারণ আমাদের নতুন ছবির ব্যাপারে কিছু কনফিডেনশিয়াল কাগজপত্র ছিল, যা হারিয়ে গেলে অসুবিধায় পড়তে হত।

নরেশবাবু বললেন- ব্ৰতীনবাবু কাল ভোরে নাকি জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপালবাবুকে টেলিফোন করে জানিয়েছিলেন এদিন ছবির মহরৎ হচ্ছে না। কিন্তু তিনি আপনাকে নিশ্চয়ই তার আগেই কথাটা জানিয়েছিলেন? রঞ্জনবাবু বললেন– জানিয়েছিলেন শনিবার রাত এগারোটায়। তবে আমাকে তিনি কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ দেখান নি। পরে আমি রমাদির অর্থাৎ মিসেস সোমের কাছে শুনেছি, তার টেবিলের ড্রয়ারে নাকি কয়েক লক্ষ টাকা ছিল। সেই টাকা ছবির নায়িকা বনশ্রীই চুরি করে পালিয়েছে।

নরেশবাবু বললেন–কিন্তু ব্রতীনবাবু সেকথা কেন পুলিশকে জানাননি?

রঞ্জনবাবু বললেন–রমাদি আমাকে বলেছেন, টাকাটা কালো টাকা। তাই তিনি পুলিশকে তখনই জানানো উচিত মনে করেননি। তাছাড়া তার ভয় ছিল। ইনকাম ট্যাক্সের ব্যাপারে তাঁর নামে অলরেডি একটা মামলা চলছে।

এইসব কথাবার্তা হবার সময় আমি কর্নেলকে লক্ষ্য করছিলুম। তিনি উল্টোদিকে সেই ক্যামেরার কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একবার তিনি পর্দাটা তুলেও দেখলেন। তারপর মেঝে থেকে কী একটা যেন কুড়িয়ে নিলেন। কর্নেলের এইসব কীর্তিকলাপ আমি বরাবর দেখে আসছি। তাই অবাক হইনি।

একটু পরে কর্নেল এদিকে এসে টেবিলের ড্রয়ারগুলো প্রত্যেকটা টেনে দেখার পর রঞ্জনবাবুকে বললেন–এ ঘরের দেয়াল জুড়ে তো অনেক নায়িকার কাট-আউট দেখছি। আপনাদের ছবির নতুন নায়িকা বনশ্রীর কাট-আউট কোনটা?

রঞ্জনবাবু একটা কাট-আউটের কাছে গিয়ে বললেন-বনশ্রীর এই কাট আউটটাই আমার পছন্দ ছিল।

কর্নেল ছবিটা দেখার পর একটু দূরে সরে এলেন। তারপর তার গলায় ঝোলান। ক্যামেরা তুলে পরপর কয়েকটা ছবি নিলেন। বারবার ফ্ল্যাশবাল্ব ঝিলিক দিচ্ছিল।

রঞ্জনবাবু একটু হেসে বললেন– যেহেতু বনশ্রীর নামে ব্রতীনদা টাকা চুরির অভিযোগ করে গেছেন, তাই তার ছবি আপনাদের দরকার হবে। এক মিনিট। আমি আপনাকে তার বিভিন্ন ভঙ্গিতে তোলা কয়েকটা ছবির প্রিন্ট দিচ্ছি। বলে তিনি ড্রয়িংরুমে গেলেন। তারপর একটা ফাইল থেকে কয়েকটা ছবি কর্নেলের হাতে তুলে দিলেন। ছবিগুলো পকেটে রেখে কর্নেল বললেন–আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ রঞ্জনবাবু। কথাটা বলে তিনি নরেশবাবুর দিকে ঘুরলেন।–নরেশবাবু! আপনাদের কাজ আশাকরি শেষ হয়েছে?

নরেশবাবু বললেন–কাজ শেষ হয়েছে। তবে অ্যাডভোকেট মিস্টার হালদারকে জানাতে চাই, আলমারির লকারে রাখা একটা ফাইল আমরা সিজ করে নিয়ে যেতে চাই।

আইনজীবী রূষ্ট মুখে বললেন আপনারা পুলিশ। ইচ্ছে করলে আপনারা আমার ক্লায়েন্ট-এর বাড়িসুদ্ধ তুলে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু যে ফাইলটা নিয়ে যেতে চান সেটা আমি একবার দেখব।

নরেশবাবু একটু হেসে বললেন- ফাইলটার উপরে লেখা আছে। কনফিডেনশিয়াল। এটা আপনাকে দেখাতে পারছি না বলে দুঃখিত। তবে এই ফাইলের উপর নাম্বার দেওয়া আছে। আপনাকে আমি লিখে দিচ্ছি স্টিলের আলমারির লকার থেকে এত নম্বর ফাইল আমি আইনের স্বার্থে সিজ করে নিয়ে যাচ্ছি। সাক্ষী হিসেবে কর্নেল সাহেব এবং রঞ্জনবাবু এতে সই করবেন।

বলে তিনি চেয়ারে বসলেন। তারপর টেবিলে রাখা প্যাড থেকে একটা কাগজ নিয়ে লিখতে শুরু করলেন।

আইনজীবী আর কোনও কথা বললেন না। প্যাডের কাগজে নরেশবাবু সই করার পর সাক্ষী হিসেবে একপাশে কর্নেল এবং রঞ্জনবাবু সই করে দিলেন। এরপর কাগজটা আইনজীবীর হাতে গুঁজে দিয়ে ফাইলটা বগলদাবা করে নরেশবাবু বললেন- কর্নেলসাহেব! আমাদের কাজ শেষ। আপনার কাজ শেষ না হলে আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করব।

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন আমার আর কী কাজ? এবার শুধু ছবির পরিচালক রঞ্জনবাবুকে কয়েকটা কথা জিগ্যেস করব।

রঞ্জনবাবু বললেন–বলুন।

কর্নেল বললেন–বনশ্রী রায় বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে মডেলিং করত। তাকে আপনাদের নতুন ছবিতে কে বাছাই করেছিল?

রঞ্জনবাবু বললেন– আমরা এই ছবির জন্য একেবারে নতুন মুখ খুঁজছিলুম। আমি বনশ্রীকে চিনতুম না। ব্রতীনদাই একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন তার এক বন্ধু ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। তিনি তার ব্যবসার বিজ্ঞাপনের জন্য একটা বিজ্ঞাপন কোম্পানিকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন। সেই কোম্পানিতে বনশ্রী মডেলিং করত। সেই সূত্রে ব্রতীনদার সেই বন্ধু নাকি বনশ্রীর খোঁজ দিয়েছিলেন।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন তার সেই বন্ধুর নামটি কি ব্রতীনবাবু আপনাকে বলেছিলেন?

রঞ্জনবাবু বললেন– হ্যাঁ। তার নাম বিজয়েন্দু ব্যানার্জি। তিনিও নাকি ফিল্মে তার ব্যবসার উদ্বৃত্ত কিছু টাকা লগ্নি করতে চান।

কর্নেল বললেন–বিজয়েন্দু ব্যানার্জিকে নিশ্চয়ই আপনি দেখেছেন? রঞ্জনবাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন- দেখেছি। ভদ্রলোক টাকার কুমির। তবে তার ফিল্ম সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই। তিনি চেয়েছিলেন তার টাকা শুধু উসুল হওয়া নয়, যেন লাভ সমেত তিনি ফিরে পান।

–বিজয়েন্দুবাবু কি এই অফিসে কিংবা জয়শ্রী সিনে স্টুডিওতে আপনাদের নতুন অফিসে কখনও গেছেন?

-হ্যাঁ। বহুবার গেছেন। সত্যি বলতে কি, তিনিই আমাদের বনশ্রীর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বনশ্রীর গার্জেন তার পিসিমা। তিনি এক দজ্জাল ভদ্রমহিলা। বনশ্রী নাকি যখনই মডেলিং করতে যায়, তখন তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতে চান। তবে বনশ্রী আমাকে বলেছিল, সে পিসিমাকে তত গ্রাহ্য করে না। কাজেই যদি আউটডোরেও শু্যটিং হয়, বনশ্রীর একা যেতে আপত্তি নেই। সে তার পিসিমাকে লুকিয়েই চলে যাবে।

কর্নেল বললেন– ধন্যবাদ রঞ্জনবাবু! আপাতত আমার কাজ শেষ। রঞ্জনবাবু আমাদের ঠাণ্ডা বা গরম পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কর্নেল তার হাতে সময় কম বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের জিপের কাছে দাঁড়িয়ে কর্নেল এবং নরেশবাবুর মধ্যে চুরি চুপি কী কথা হয়েছিল আমি জানি না। তবে কর্নেলের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন কোনও মোক্ষম ক্লু পেয়ে গেছেন।

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছনোর পর ডাইনিং রুমে বসে দুজনে ব্রেকফাস্ট করলুম। তারপর ড্রয়িং রুমে ফিরে কফি খাওয়া হল।

কফি খাওয়ার পর আমি বললুম-বনশ্রীর প্রকাণ্ড কাট-আউট দেখেছি। কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্বে না দাঁড়ালে তার চেহারাটা কাট-আউট থেকে পরিষ্কার হয় না।

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন- তুমি বনশ্রীকে দেখতে চাও তো? এই দেখ তাকে। বলে তিনি বুক পকেট থেকে রঞ্জনবাবুর দেওয়া সেই ছবিগুলো আমার হাতে দিলেন।

ছবিগুলো দেখার পর বললুম– ফিল্মে অভিনয় করার মতো সৌন্দর্য বনশ্রীর আছে। তাছাড়া তার চেহারায় কী একটা দীপ্তি আছে যা আগুনের শিখার মতো। আমার ধারণা তার আগুনে অনেক পতঙ্গের প্রাণ গেছে। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন-সাবধান জয়ন্ত! তোমার প্রাণ যেন না যায়।

বললুম– এ যাবৎকাল আপনার পাল্লায় পড়ে তো বটেই তাছাড়া বিভিন্ন সূত্রে অনেক তিলোত্তমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কাজেই আমার সম্পর্কে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তাছাড়া তাকে খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না। এমনও হতে পারে বোম্বের সেই পারেখ সাহেব বনশ্রী আর তার পিসিমাকে হয়ত তুলে নিয়ে গিয়ে আরব সাগরের হাওয়া খাওয়াচ্ছেন।

কর্নেল বললেন–ওই মারুতি গাড়িতে বোম্বে যেতে হলে অনেক বাধা-বিপত্তি আছে।

বললুম– ধরুন, বনশ্রী গাড়িটা তার কোনও বন্ধুর বাড়িতে রেখে প্লেনে চেপে চলে গেছে।

কর্নেল আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না। তিনি রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকলেন, তারপর সাড়া এলে বললেন– কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। আমি প্রোপ্রাইটার মিস্টার বিজয়েন্দু ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলতে চাই… মর্নিং মিস্টার ব্যানার্জি! আজ সকালে পুলিশ আপনার প্রয়াত বন্ধু ব্রতীনবাবুর বাড়ি সার্চ করেছে… কেন সার্চ করেছে তা আমি জানি না। তবে আপনাকে আমি একটা কথা জানাতে চাই। আশাকরি সঠিক উত্তর পাব।… ঠিক আছে। আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি আপনিই নাকি বনশ্রী রায়কে আপনার বন্ধু ব্ৰতীনবাবুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটা কি সত্যি?… বাঃ আপনার সত্য ভাষণের জন্য ধন্যবাদ। এবার একটা কথা। আপনি আজ বিকেল চারটের মধ্যে কি আমার এখানে আসতে পারবেন? আপনার সঙ্গে খুব জরুরি কিছু কথা আছে।… ধন্যবাদ। রাখছি।

কর্নেল রিসিভার রাখার পর আমি বললুম-ব্যানার্জি কি স্বীকার করলেন যে তিনিই বনশ্রীকে ব্রতীনবাবুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ। বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ধ্যানস্থ হলেন।

এদিনও লাঞ্চের পর আমার ভাতঘুম পণ্ড হল ডোরবেলের শব্দে। একটু পরে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই সবেগে ঘরে ঢুকে সোফায় বসলেন তারপর বললেন আমার ভাগনা তন্ন-তন্ন সার্চ কইর‍্যা বনশ্রী রায়ের নাম পায় নাই। সে কইল এমনও হইতে পারে বনশ্রীর গাড়ি অন্য কোনও নামে রেজিস্ট্রেশন হইয়া আছে।

এখন প্রায় আড়াইটে বাজে। কর্নেল বললেন– আমার ধারণা আপনি মোটর ভেহিক্যালস অফিস থেকেই সোজা এখানে আসছেন।

হালদারমশাই বললেন–হঃ! মিস্ট্রিটা হেভি হইয়া গেল। হোটেল এশিয়ার ম্যানেজার আমারে কইছিলেন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বইয়াছিল একজন বিউটিফুল ইয়ং গার্ল।

বলে তিনি ডিভানে শায়িত আমার দিকে তাকালেন। চাপাস্বরে বললেন জয়ন্তবাবু ঘুমাইতাছেন?

–অমনিই আমি সটান উঠে বসে বললুম না হালদার মশাই আমার ভাতঘুম সবে আসছিল কিন্তু আপনার মুখে বিউটিফুল ইয়ং গার্ল শুনে ঘুমটা কেটে গেল। তবে আপনি যার কথা বললেন তার ছবি কর্নেল পেয়ে গেছেন।

গোয়েন্দাপ্রবর একটু হেসে বললেন– পাইছেন নাকি কর্নেলস্যার?

 কর্নেল তার পকেট থেকে ছবিগুলো বের করে তাকে দিলেন। হালদারমশাই ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন– মিঃ রঙ্গনাথন ঠিক কইছিলেন। কিন্তু ছবি দেইখ্যা আমার মনে হইতাছে কোথায় য্যান এই মাইয়াটারে আমি দ্যাখছি।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন- কোথায় দেখেছেন বলুন?

প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটু ভেবে নিয়ে বললেন- হঃ মনে পড়ছে আরে এ তো আমার এক রিটায়ার্ড কলিগ শম্ভু হাজরার মাইয়ার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। অঃ আমি দ্যাখছি।

.

০৬.

এরপর হালদারমশাই তার পুলিশ জীবনের এক সহকর্মী শম্ভু হাজরা এবং তার কন্যা সম্পর্কে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন। একসময়ে তিনি থামলে কর্নেল বললেন- আপনার সেই বন্ধু থাকেন কোথায়?

হালদার মশাই বললেন দেশপ্রিয় পার্কের কাছে। আপনি কইলে তারে এখনই ফোন করতে পারি।

কর্নেল বললেন তাকে ফোন করে তার মেয়ের খবর জেনে নিন। তারপর তাকে বলুন তার মেয়ে এখন কোথায় আছে, কী করে ইত্যাদি। তবে সাবধান হালদারমশাই কথাগুলো নিছক কথার কথা হিসেবেই যেন বলবেন!

হালদারমশাই তার বুক পকেট থেকে ছোট্ট নোটবই বের করে তার বন্ধুর ফোন নাম্বার খুঁজলেন। এরপর টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। কয়েকবার ডায়াল করার পর সাড়া এলে তিনি বললেন–হালদার কইতাছি, শম্ভু নাকি?… আরে আর কইয়ো না তোমার বাড়ি যে একদিন যামু তার সময় পাই না… হঃ ঠিক কইছ, প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খোলার কথা তোমারে একদিন কইছিলাম। তা আছ কেমন?… আর তোমার কইন্যাটিই বা কেমন আছে? কী করতাছে?… অ্যাা! কও কী? সে মডেলিং করতাছে?… আমি জানতাম তোমার মাইয়া নীপা দেখতে যেমন সুন্দর বুদ্ধিতেও তেমনি পাকা। নীপা কি এখন বাড়িতে আছে? অনেকদিন তারে দেখি নাই।… আচ্ছা ঠিক আছে। যখন বাড়ি ফিরবে তখন তারে কইয়ো তোমার হালদার কাকা ফোন করতে কইছে। একথাও কইয়া দিও আমার এক ভাগ্নি মডেলিং করতে চায় কিন্তু সুযোগ পাইতাছে না… হালদারমশাই হাসতে হাসতে বললেন ঠিক কইছ দরকার আছে বইলাই তোমারে ফোন করলাম। কথাটা তাহলে যেন কইয়ো।

হালদারমশাই রিসিভার রেখে বললেন–কী কাণ্ড! কর্নেল স্যার আপনি ঠিকই কন অনেক সময় আমরা জানি না যে আমরা কী জানি।

আমি বললুম- বনশ্রীর ছবি না দেখলে তো আপনি যা জানতেন তা চাপা থেকে যেত।

গোয়েন্দাপ্রবর খিঃখিঃ করে হেসে একটিপ নিস্যি নিলেন তারপর বললেন– জয়ন্তবাবু! ছবিটা দেইখ্যাই কত কথা যে আমার মনে পড়ল তার একটা কারণ হয়ত আছে। এই ছবির মুখ খুব চেনা মনে হয়। ক্যান তা হয় জানি না।

কর্নেল বললেন- বিজ্ঞাপনে প্রতিদিনই আমরা অনেক সুন্দরী মেয়েকে দেখি। এভাবেই মুখগুলো আমাদের স্মৃতিতে চাপা থেকে যায়। জয়ন্ত খবরের কাগজে কাজ করে কিন্তু জয়ন্ত নিজে কাগজ পড়ে কি না সন্দেহ। তাছাড়া সে আমাদের মতো পায়ে হেঁটে চলাফেরা করে না তাই পথেঘাটে বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ের দিকে তার চোখ পড়ে না। সে তো গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ততক্ষণে তিনটে বেজে গেছে। ষষ্ঠী ভিতরের দরজার পা তুলে বলল বাবামশাই! কফি খাবার টাইম হয়েছে। আমি জল চাপিয়ে দিয়েছি। কর্নেল বললেন– বাঃ ষষ্ঠীচরণ! বোঝা যাচ্ছে ক্লান্ত হালদার মশাইকে দেখেই তার জন্য স্পেশাল কফি করতে তোর হাত নিসপিস করছে। ততক্ষণে ষষ্ঠীর মুখ পর্দার আড়ালে চলে গেছে। আমি বললুম-হালদার মশাইয়ের বন্ধুর মেয়ে নীপার সঙ্গে যখন তিনি বনশ্রীকেও দেখেছেন তখন আশাকরি নীপার কাছ থেকে বনশ্রীর অনেক খবর পাওয়া যেতে পারে। কর্নেল আপনি কিন্তু হালদার মশায়ের এই কৃতিত্বের কোনও প্রশংসা করলেন না।

কর্নেল কিন্তু গম্ভীর মুখে বললেন– জয়ন্ত! হালদারমশাই কিন্তু সত্যিই একটা বড় খবর দিয়েছেন। এবার প্রশ্ন হল যতক্ষণ না তিনি নীপার মুখোমুখি হচ্ছেন ততক্ষণ আমরা বলতে পারছি না কেঁচো খুড়তে কেঁচোই বেরোবে নাকি সত্যিই কোনও সাপ বেরোবে।

হালদারমশাইও সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন

–তা ঠিক কইছেন কর্নেল স্যার। আইজ কালকার মাইয়ারা খুব স্মার্ট। তাছাড়া নিজেদের পেশার ব্যাপারে সবসময়ে মুখ খুলতে চায় না।

দেখলুম কর্নেল হালদার মশায়ের হাত থেকে ছবিগুলো নিয়ে এবার তার টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন তারপর তেমনি গম্ভীর মুখে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন।

আমি হালদার মশাইকে একটা কথা জিগ্যেস করতে যাচ্ছি এমন সময়ে আবার ডোরবেল বেজে উঠল। কর্নেল ওই অবস্থায় থেকেই বললেন–এত শিগগির তো মিস্টার ব্যানার্জির আসার কথা নয়। ষষ্ঠী এখন কফি করছে এ সময়ে সে ও-পাশের করিডোর দিয়ে দরজা খুলতে যাবে না কারণ তাহলে নাকি তার কফির টেস্ট বদলে যাবে অতএব জয়ন্ত তুমিই গিয়ে দেখ মিস্টার ব্যানার্জি এলেন মনে হচ্ছে।

আমি উঠে গিয়ে ছোট্ট ওয়েটিং রুম পেরিয়ে আগে লুকিং গ্লাসের ফুটো দিয়ে দেখে নিলুম কে এসেছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলুম ব্যানার্জি নন এসেছেন সকালে দেখা সেই চিত্র পরিচালক রঞ্জনবাবু। দরজা খুলে হাসিমুখে বললুম, আরে আপনি! আসুন আসুন। কর্নেল আছেন।

তাঁকে ভিতরে নিয়ে এলে কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন–আসুন রঞ্জনবাবু! কিছুক্ষণ আগে আমি ভাবছিলুম আপনার সঙ্গে একবার যোগাযোগ করব। তা মেঘ না চাইতেই জল। আলাপ করিয়ে দিই। হালদার মশাই! ইনি হতভাগ্য ব্রতীনবাবুর নতুন ছবির ডাইরেক্টর রঞ্জন মিত্র। আর রঞ্জনবাবু, ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. কে. কে. হালদার। আমরা এঁকে হালদার মশাই বলে ডাকি। ইনি একসময়ে ছিলেন ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন।

বলে তিনি হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী! আর এক পেয়ালা কফি চাই। একজন গেস্ট এসেছেন।

রঞ্জনবাবু সোফায় বসে বললেন- হঠাৎ আমাকে আপনার কাছে আসতে হল। আমি জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপালবাবুর কাছ থেকে আপনার ঠিকানা পেয়েছি।

কর্নেল বললেন–আগে কফি আসুক। আমার মতে কফি ঝিমিয়ে পড়া নার্ভকে চাঙ্গা করে। তাই আগে কফি তারপর কথা।

লক্ষ্য করলুম হালদার মশাই গুলি-গুলি চোখে ফিল্ম ডাইরেক্টরকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আমার চোখে আরও একটা ব্যাপার ধরা পড়ল। আজ সকালে উজ্জ্বল চেহারার স্মার্ট যে ভদ্রলোককে দেখেছিলুম তার সঙ্গে আগন্তুক এই ভদ্রলোক অর্থাৎ রঞ্জন মিত্রের চেহারার কিছুটা পার্থক্য আছে। তাকে কেমন যেন নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছিল।

একটু পরে ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে চার পেয়ালা কফি আর এক প্লেট চানাচুর রেখে গেল। হালদার মশাই একটু ঝুঁকে তার স্পেশাল কফির পেয়ালাটি শনাক্ত করলেন এবং সেটা তুলে নিয়ে ফুঁ দিয়ে চুমুক দিতে থাকলেন। কফি খেতে খেতে ঘড়ি দেখে নিয়ে রঞ্জনবাবু বললেন–আমার কথাটা কিন্তু খুব গোপনীয় কর্নেল সাহেব।

কর্নেল বললেন–যত গোপনীয়ই তোক আমার এই দুজন সহযোগীর কাছে আমার কিছু লুকোবার থাকে না। কারণ এঁদের সাহায্য নিয়েই আমাকে চলতে হয়।

রঞ্জনবাবু আরও কয়েকবার কফিতে চুমুক দেবার পর আস্তে বললেন–ব্রতীনদার স্ত্রী অর্থাৎ রমাবৌদি আপনারা চলে যাওয়ার পর আমাকে ডেকে কিছু কথা বলেছেন। তার মধ্যে একটা কথা শুনে আমার মনে সন্দেহ জেগেছে ব্রতীনদার বন্ধু বিজয়েন্দু ব্যানার্জি সত্যিই কি ফিল্ম করার জন্য ব্রতীনদাকে টাকা দিয়েছিলেন? আপনি বলবেন, কেন এ ব্যাপারে আমি সন্দেহ করছি। ব্রতীনদার সঙ্গে বিজয়েন্দুবাবুর টাকাকড়ি নিয়ে কথা হয়েছিল তা আমি জানি। আমার সামনে বসেই গত সপ্তাহে বিজয়েন্দুবাবু আমাদের নতুন ছবির ডিটেলস বাজেটের একটা কপি নিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন দুটো কিস্তিতে বাজেটের অর্ধেক টাকা দিতে তিনি রাজি। তবে এই ব্যাপারে আইন অনুযায়ী স্ট্যাম্প পেপারে একটা এগ্রিমেন্ট করতে হবে। আমরা দুজনেই তাতে সই করব। কর্নেল জিগ্যেস করলেন–রমাদেবী কী বললেন তাই বলুন।

রঞ্জনবাবু বললেন–গৌরীমাতা প্রোডাকশনের যতগুলি ছবি হয়েছে রমাবৌদি এই ব্যাপারে ব্রতীনবাবুকে পরামর্শ দিয়েছেন। ভদ্রমহিলা বুদ্ধিমতী। তো আজ সকালে তিনি আমাকে বলছিলেন ফিল্মের জন্য যে টাকাকড়ি বিশেষ করে নগদ টাকা যতটা হাতে আসে ব্রতীনদা তার স্ত্রীর কাছেই গচ্ছিত রাখতেন। পুলিশ তাদের লইয়ার প্রশান্তবাবুকে নাকি বলেছে বিজয়েন্দু ব্যানার্জি নগদ এগারো লক্ষ টাকা ব্রতীনদাকে দিয়েছিলেন। রমাবৌদি আমাকে জোর গলায় বলেছেন অতগুলো টাকা কেউ তার স্বামীকে দিলে তিনি অবশ্যই রমাবৌদিকে রাখতে দিতেন। কথাটা শোনার পর আমি জয়শ্রী সিনে স্টুডিওতে গোপালবাবুর কাছে গিয়েছিলুম। তাঁর কাছেও শুনলুম একই কথা। মিস্টার ব্যানার্জি নাকি সেই টাকা উদ্ধার করে দেবার জন্য আপনার কাছে এসেছিলেন। গোপালবাবু আমার কথা শুনে বললেন– তাঁকে বিজয়েন্দু ব্যানার্জি বলেছেন ব্রতীনদাকে তিনি নাকি এগারো লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন আর ব্রতীনবাবু নাকি শনিবার রাত্রে তাকে ফোন করে ডেকে বলেছিলেন টাকাগুলো তিনি ড্রয়ারে রেখেছিলেন এবং তখন বনশ্রী নাকি সেখানে উপস্থিত ছিল। কোন এক সুযোগে বনশ্রী নাকি টাকাগুলো চুরি করে নিয়ে চলে যায়। কর্নেল সাহেব! আমি জোর দিয়ে বলছি মিঃ ব্যানার্জির কথা মিথ্যা। কারণ শনিবার রাত্রে তিনি ব্রতীনদার কাছে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু রমাবৌদির মতে, ওই ধরনের কোন কথা দুজনের মধ্যে হয়নি। আর আমার মতে, ব্রতীনদার একটা চিঠি লিখে রেখে নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটাই গোলমেলে। এখানেই ব্রতীনদার হত্যাকাণ্ডের রহস্যের মূলসূত্র লুকিয়ে আছে। কেন ব্রতীনদা হঠাৎ সকালবেলায় গঙ্গার ধারে গিয়েছিলেন?

কর্নেল বললেন ব্রতীনবাবুর চিঠিটা তো রমাদেবী তার স্বামীর হাতের লেখা বলেই–তার কথার ওপর রঞ্জনবাবু বললেন–চিঠিটা হঠাৎ দেখে রমা বৌদি ভেঙে পড়েছিলেন। তার সেই মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করুন! তা না হলে চিঠিটা বিজয়েন্দুবাবু চাইবামাত্র তাকে দেবেন কেন?

কিন্তু লালবাজারের ডিটেকটিভ সাব-ইন্সপেক্টর নরেশবাবুকেও রমাদেবী বলেছেন, ওটা তার তার স্বামীর হাতের লেখা।

রঞ্জনবাবু বাঁকা হেসে বললেন- আমার ধারণা, বিজয়েন্দু ব্যানার্জিই বৌদির মাথায় কথাটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আজ আপনারা চলে যাবার পর বৌদি আমাকে বলেছেন, ওই রকম বড়-বড় আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা চিঠিটা সম্পর্কে এখন তার মনে সন্দেহ জেগেছে!

কর্নেল বললেন–ঠিক আছে। সেটা আবার রমাদেবীকে দেখিয়ে তার মতামত নেওয়া যাবে। তো এখন তিনটে পঁয়তাল্লিশ বাজে। চারটেতে এখানে বিজয়েন্দু ব্যানার্জি আসবেন। আপনি কি তার সামনে উপস্থিত থাকতে চান?

রঞ্জনবাবু বললেন–না। আমি তা হলে উঠি।

–একটা প্রশ্ন। বনশ্রীর কি নিজের গাড়ি আছে?

–আছে দেখেছি। মারুতি গাড়ি।

–গাড়িটার নাম্বার জানেন?

–না। নাম্বার লক্ষ্য করিনি।

–এমন কি হতে পারে কেউ বনশ্রীকে গাড়িটা ব্যবহার করতে দিয়েছে?

-তা হতেও পারে। ফিল্মমহলে গুজব শুনেছি, বোম্বের এক প্রোডিউসারের সঙ্গে বনশ্রীর ঘনিষ্ঠতা আছে। কলকাতা সে প্রায়ই আসে। বলে রঞ্জনবাবু উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজার দিকে পা বাড়িয়ে ফের বললেন- কর্নেল সাহেব! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কেউ ব্রতীনদাকে কোন ছলে গঙ্গার ধারে যেতে বলেছিল। ব্রতীনদা সরল মানুষ ছিলেন। আপনারা এদিকটা একটু ভেবে দেখবেন।

রঞ্জনবাবু চলে যাওয়ার পর হালদার মশাই বললেন- এক টিপ নস্যি লই। মাথা ব্যাবাক ঘুরাইয়া গেছে। বলে তিনি দ্রুত একটিপ নস্যি নিলেন।

আমি বললুম- একটা কথা স্পষ্ট বোঝা গেল। রঞ্জনবাবু বিজয়েন্দু ব্যানার্জিকে একেবারে পছন্দ করেন না। সম্ভবত গোড়া থেকেই রঞ্জনবাবুর এই বন্ধুটিকে ফিল্ম প্রোডাকশনে নেওয়ার বিরোধী ছিলেন। ব্রতীনবাবু তাঁর কথায় কান দেননি।

গোয়েন্দপ্রবর বললেন-কর্নেল স্যার! রঞ্জনবাবুরে বোম্বের সেই প্রোডিউসারের নাম জিগাইলেন না ক্যান? মিঃ রঙ্গনাথন আমারে কইছিলেন, তার নাম সুমোহন পারেখ। কর্নেল হাসলেন। নাম জানবার জন্য ব্যস্ততার দরকার নেই। যথাসময়ে নামটা বেরিয়ে পড়বে। নামটা সুমোহন পারেখ হতে পারে। অন্য কিছুও হতে পারে। এই সময়েই টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে বললেন– কে বলছেন?… হ্যাঁ আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি… কী নাম বললেন? বনশ্রী রায়? আপনি কোথা থেকে বলছেন?… ঠিক আছে। আপনি যদি দেখা করতে চান তাহলে সন্ধে ছটার দিকে আসতে যদি অসুবিধা না থাকে… আসলে চারটেয় বিজয়েন্দু ব্যানার্জি নামে এক ভদ্রলোক আসবেন বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছেন। আপনার যদি তার সামনেই আসতে কোনও বাধা না থাকে… আই সি! বুঝেছি আপনি তাহলে ঠিক ছটাতেই আসুন… আচ্ছা। রাখছি। বলে কর্নেল রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।

আমি উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিলুম। লক্ষ্য করলুম হালদার মশাইও প্রচণ্ড উত্তেজিত। তার গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপছে। তিনি খপ্ করে আমার হাত ধরে বলে উঠলেন– জয়ন্তবাবু! জমজমাট নাটক কি কন?

বললুম–তা ঠিক। তবে মনে মনে আমি যে অঙ্ক কষে রেখেছিলুম হঠাৎ বনশ্রী রায় তা একেবারে হিজিবিজি করে দিল।

কর্নেলকে কিন্তু একটুও উত্তেজিত মনে হল না। তবে তাঁর মুখে গাম্ভীর্যের ছায়া।

এই সময়েই ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল অভ্যাসমত হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী!

এবার নাটকের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন বিজয়েন্দু ব্যানার্জি। তার পরনে আজকে সাফারি স্যুট। হাতে ব্রিফকেসটা অবশ্য আছে। তাকে চিন্তিত এবং নির্জীব দেখাচ্ছিল। মুখে নমস্কার শব্দটা উচ্চারণ করে তিনি শান্তভাবে সোফায় বসলেন। তারপর বললেন–আপনারা তিনজনই আছেন দেখছি। আমি এসে আপনাদের কোনো অসুবিধার সৃষ্টি করিনি তো!

কর্নেল এবার হাসিমুখে বললেন–অসুবিধা হবার কারণ নেই মিঃ ব্যানার্জি। আমিই তো আপনাকে ডেকেছিলাম এবং আপনার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলাম। বিজয়েন্দু ব্যানার্জি বললেন–হঠাৎ একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল। ব্রতীনকে কেউ যে এভাবে খুন করবে আমি তা কল্পনাও করিনি। মাঝখান থেকে আমার টাকাগুলো একেবারে জলেই গেল। ফিরে পাবার কোন চান্সই রইল না।

কর্নেল বললেন–আগে কফি খেয়ে নিন। তারপর কথা হবে।

ব্যানার্জি বললেন–কফি খাওয়ার ইচ্ছে নেই। আপনি কেন ডেকেছিলেন যদি বলেন ভাল হয়। আমার ব্যবসার স্বার্থেই কিছুক্ষণের মধ্যে একজনের কাছে যাবার কথা আছে।

অবশ্য ষষ্ঠীচরণ যথারীতি এক পেয়ালা কফি এনে সেন্টার টেবিলে রেখে গেল। অনিচ্ছা করে ব্যানার্জি কফির পেয়ালায় চুমুক দিলেন। এবার কর্নেল তাকে বললেন–আমি কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর চাই মিস্টার ব্যানার্জি।

বিজয়েন্দুবাবু নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন–নিশ্চয়ই উত্তর দেব।

কর্নেল বললেন–আপনি ব্রতীনবাবুকে নগদ এগারো লাখ টাকা কবে এবং কখন দিয়েছিলেন? কোথায় দিয়েছিলেন? আমার আরও প্রশ্ন অত টাকা দেবার সময় সেখানে আর কে উপস্থিত ছিল?

মিঃ ব্যানার্জি বললেন- আজ ২৩ মার্চ। আমি ১৭ মার্চ বিকেল চারটেয় ব্রতীনের বাড়িতে তার প্রোডাকশনের অফিসেই টাকা দিয়েছিলাম। তখন ঘরে উপস্থিত ছিলেন ফিল্মের ডাইরেক্টর রঞ্জন মিত্র, বনশ্রী রায় এবং আমার একজন ব্যবসায়ী বন্ধু রমেশ বর্মন।

রমেশবাবু কোথায় থাকেন?

রমেশের হেড কোয়ার্টার বোম্বেতে। এখানে তার ব্রাঞ্চ অফিস আছে। অফিসটা ব্রাবোর্ন রোডে আমার অফিসের কাছাকাছি। রমেশ বোম্বেতেও ফিল্মে টাকা ইনভেস্ট করে। সত্যি বলতে কি তারই পরামর্শে আমি ব্ৰতীনের ছবিতে ইনভেস্ট করতে চেয়েছিলুম।

–স্ট্যাম্পড পেপারে লেখাপড়া নিশ্চয়ই হয়েছিল?

হয়েছিল। আপনি দেখতে চাইলে সেটা আমি বাড়ি থেকে এনে আপনাকে দেখাতে পারি।

–আপনি অতগুলো টাকা নিশ্চয়ই স্যুটকেস বা ব্রিফকেসে নিয়ে গিয়েছিলেন?

–হ্যাঁ একটা বড় ব্রিফকেসে নিয়ে গিয়েছিলাম।

 –টাকাগুলো গুনে নিয়ে ব্রতীনবাবু কোথায় রেখেছিলেন?

মিস্টার ব্যানার্জি কফি পুরোটা না খেয়ে পেয়ালাটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিলেন। তারপর বললেন–ব্রতীন আমারই ব্রিফকেসটা রেখে দিয়েছিল।

কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় আপনাকে ব্রতীনবাবু ডেকে বলেছিলেন অতগুলো টাকা এবং আরও কিছু টাকা নাকি তিনি টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন।

-হ্যাঁ আমাকে ব্রতীন তাই বলেছিল।

 –অতগুলো টাকা নিশ্চয়ই একটা ড্রয়ারে রাখা সম্ভব ছিল না?

প্রশ্নটা শুনে একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন ব্যানার্জি। তিনি চাপাস্বরে বললেন–ওঁর সেক্রেটারিয়েট টেবিলটা বেশ বড়। দুধারে চারটে করে আটটা ড্রয়ার আছে।

কর্নেল একটু হেসে বললেন- আপনি কি জানেন আজ সকালে পুলিশ ব্রতীনবাবুর ওই অফিস সার্চ করেছে এবং আমিও তখন সেখানে ছিলাম।

বিজয়েন্দুবাবু বললেন–হ্যাঁ আমি শুনেছি ব্রতীনের স্ত্রীকে আমি আজ অফিস থেকে টেলিফোন করেছিলাম। সে আমাকে সব বলেছে।

কর্নেল তেমনই হেসে বললেন–ড্রয়ারগুলো আমি নিজেও পরীক্ষা করে দেখেছি। প্রত্যেকটা ড্রয়ারে তালা দেওয়া ছিল। ব্রতীনবাবুর লইয়ার প্রশান্ত হালদার চাবি দিয়ে আটটা ড্রয়ার খুলেছিলেন। এবার আমার প্রশ্ন বনশ্রীর পক্ষে কী করে অতগুলো ড্রয়ার থেকে টাকা চুরি করা সম্ভব?

বিজয়েন্দুবাবু যেন একটু হকচকিয়ে গেলেন। কিন্তু তখনই সামলে নিয়ে বললেন-বনশ্রী ব্রতীনকে একেবারে পেয়ে বসেছিল। ব্রতীনের হাবভাব দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে যেন বনশ্রীর প্রেমে পড়ে গেছে। আপনি হাসতে পারেন কিন্তু বনশ্রীর মধ্যে কী একটা মোহ আমিও লক্ষ্য করেছি।

এবার কর্নেল যেন হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো বলে উঠলেন– কিন্তু আমার কাছে খবর আছে আপনিই নাকি বনশ্রীকে ব্রতীনবাবুর ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথমে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া আপনিই নাকি তাকে ছবির নায়িকা করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন?

বিজয়েন্দুবাবু এবার রুষ্ট মুখে বললেন- এসব কথা নিশ্চয়ই ওই হতচ্ছাড়া ডাইরেক্টর রঞ্জন মিত্তিরের কাছে আপনি শুনেছেন। আসল কথাটা আমি বলি, বনশ্রী আমার ব্যবসার একটা বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছিল সেই সূত্রে তার সঙ্গে আমার একটুখানি মাত্র পরিচয়। বনশ্রী নিজেই বলেছিল, ব্যবসার সূত্রে আমার তো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় আছে যদি তাকে আমি ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ করে দিই, সে কৃতার্থ হবে।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন- সে যাই হোক ব্রতীনবাবুর সঙ্গে বনশ্রীর প্রথম যোগাযোগ আপনিই করিয়ে দিয়েছিলেন এটা কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন না। বিজয়েন্দু ব্যানার্জি বললেন– তা আপনি বলতে পারেন। অস্বীকার করছি না কথাটার মধ্যে কিছু সত্য আছে। কিন্তু আমাকে ডেকে এসব কথা বলার কারণ বী আমি বুঝতে পারছি না। কর্নেল বললেন–এসব কথা আমি শুনেছি। তার সত্যটা আপনার কাছ থেকে যাচাই করে নেওয়াই আমার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু যাই বলুন মিস্টার ব্যানার্জি, ব্রতীনবাবুর টেবিলের ড্রয়ারগুলো আমি দেখেছি। প্রত্যেকটার মধ্যে অজস্র কাগজপত্র আর নানারকম জিনিস রাখা আছে। তাহলে ব্রতীনবাবু তার টেবিলের ড্রয়ারে আপনার এগারো লাখ এবং তার নিজের আরও টাকা রাখবার জায়গা কি করে পেয়েছিলেন?

এবার বিজয়েন্দুবাবু উত্তেজিত ভাবে বললেন– আমারও কিন্তু সেই একই প্রশ্ন অর্থাৎ ব্রতীন আমাকে মিথ্যা কথা বলেছিল তা বুঝতে পারছি। সে নিজেই টাকা আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দিয়েছে। কর্নেল সাহেব আমি আমার হারানো টাকা ফেরত পাবার জন্যই গোপালবাবুর মাধ্যমে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। আপনার আর কোন প্রশ্ন না থাকলে আমাকে এবার যেতে দিন।

কর্নেল বললেন–কোনও প্রশ্ন নেই। আপনি আসতে পারেন।

.

০৭.

বিজয়েন্দু ব্যানার্জি চলে যাবার পর হালদার মশাই খিঃখিঃ করে হেসে বললেন–এক্কেরে মুখের ওপর য্যান একখান বোম্ মারছেন কর্নেলস্যার। বোঝ গেল আপনার এ ক্লায়েন্ট আপনারে পুরো সত্য কন নাই। অনেক কিছু গোপন করছেন।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন– গোড়া থেকেই মিস্টার ব্যানার্জির ওপর আমার কিছু অবিশ্বাস ছিল। তাঁর কথায় এবার বোঝা গেল হোটেল এশিয়ায় যিনি। ছিলেন তার নাম সুমোহন পারেখ নয়। রমেশ বর্মন। কিন্তু এই রমেশ বর্মনকে হোটেল এশিয়া থেকে বনশ্রী কোথায় নিয়ে গিয়েছিল সেটা তার মুখেই আমরা শুনতে পারব।

আমি বললুম- সে যদি কথাটা অস্বীকার করে?

আমার কথার উত্তর দিলেন হালদার মশাই। তিনি বললেন–জয়ন্তবাবু! মিস্টার রঙ্গনাথন দ্যাখছেন বনশ্রীর গাড়িতে ওই ভদ্রলোক ঢুকতাছেন। বললুম-রঞ্জনবাবুও বোম্বের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বনশ্রীর ঘনিষ্ঠতার কথা বলছিলেন। তাঁর কথায় আমার ধারণা হয়েছে বনশ্রীকে মারুতি গাড়িটা সম্ভবত তিনিই উপহার দিয়েছেন। এদিকে দেখা যাচ্ছে রমেশ বর্মন বিজয়েন্দু ব্যানার্জির বন্ধু। তাহলে অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে বনশ্রী বিজয়েন্দু এবং রমেশের মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আছে।

কর্নেল তখন ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ধ্যানস্থ। আমি তার দেয়ালে টাঙানো জাপানি ঘড়িটির দিকে তাকালাম। পাঁচটা বেজে গেছে। আরও একঘণ্টা পরে এই রহস্য নাটিকার এক একটি চরিত্র কর্নেলের এই মঞ্চে প্রবেশ করবেন। একঘণ্টা সময় বড় দীর্ঘ। কিন্তু মিনিট দশেক পরেই আবার ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী। গোয়েন্দাপ্রবর চাপাস্বরে বললেন–এবার কেডা আইল?

অন্য কেউ না। ঘরে ঢুকলেন লালবাজারের সি.আই.ডি সাব ইন্সপেক্টর নরেশ ধর। তার হাতে একটা ফোলিও ব্যাগ।

কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন- আরে আসুন আসুন নরেশবাবু! এখনই ভাবছিলাম আপনাকে একটা ফোন করব নাকি।

নরেশবাবু সোফায় বসে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছলেন। তারপর বললেন– ভীষণ ক্লান্ত। কিন্তু না এসে উপায় ছিল না কর্নেল সাহেব! কিন্তু আগে কফি না খেলে নার্ভ চাঙ্গা হবে না।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ষষ্ঠী তার ভাষায় লালবাজারের টিকটিকিবাবুর জন্য কফি দিয়ে চলে গেল। নরেশবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন-আঃ! ফাস্ট ক্লাস! আপনার ষষ্ঠীচরণের তৈরি কফির কোনও তুলনা হয় না।

কর্নেল বললেন–আপনাকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে নরেশবাবু। আশা করি আমি আপনাকে সকালে যে কথাটা বলেছিলাম তার পজিটিভ উত্তর মিলেছে?

নরেশবাবু বললেন–হ্যাঁ। রাজগাঁও-এ স্বয়ং কমিশনার সাহেব ট্রাঙ্ককল করেছিলেন। কিছুক্ষণ আগে সেখান থেকে খবর এসেছে, বনশ্রীর পিসিমা রত্না দেবী সেখানে গেছেন। তিনি জনৈক ফিল্ম প্রোডিউসারকে সেখানে আউটডোর শু্যটিং-এর লোকেশান দেখাতে নিয়ে গেছেন। অবশ্য তিনি বলেছেন–তার একসময়ে এখানেই বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে এখন তাঁর ভাশুরের ছেলেরা বাস করে। এই সুযোগে তাদের সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎও হবে। আবার ফিল্ম প্রোডিউসারকে নিয়ে আউটডোর শু্যটিং-এর জায়গা দেখাতেও তিনি সাহায্য করবেন। রাজগাঁওয়ে তারা উঠেছেন ট্যুরিস্ট লজে। কর্নেলসাহেবের কথামত আমাদের কমিশনার সাহেব সেখানকার পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন, ভদ্রমহিলা যেমন আছেন তেমনই থাকুন। কিন্তু ওই ফিল্ম প্রোডিউসারকে পুলিশ যেন অ্যারেস্ট করে। আমাদের অফিসাররা আজ রাত্রের মধ্যেই সেখানে গিয়ে ধৃত লোকটিকে কলকাতা নিয়ে আসবে।

হালদার মশাই বলে উঠলেন–কী সর্বনাশ। তা হইলে সুমোহন পারেখ ওরফে রমেশ বর্মনেরে বনশ্রী তার পিসিমারে বিহারমুল্লুকে পাঠাইয়া দিছল? কী চালাক মেয়ে। নিজে কিন্তু সেখানে যায় নাই।

নরেশবাবু বললেন–হ্যাঁ। বনশ্রী যায়নি। এটাই আমার অবাক লাগছে।

কর্নেল বললেন–তাহলে দেখা যাচ্ছে অন্তত এই ক্ষেত্রে আমার অঙ্কটা ঠিকঠাক মিলে গেল। তবে রমেশ বর্মন কি সত্যিই রাজগাঁওয়ে লোকেশান দেখতে গিয়েছিল?

নরেশবাবু বললেন–হাতে পেলে তার পেট থেকে সব কথা বের করে নিতে দেরি হবে না। এবার আপনার দ্বিতীয় পরামর্শের রেজাল্ট শুনুন।

কর্নেল প্রায় শেষ হয়ে আসা চুরুটটা অ্যাসট্রেতে ঘষে নেভালেন।

নরেশবাবু বললেন–জয়শ্রী সিনে স্টুডিওতে ব্রতীনবাবুর গৌরীমাতা প্রোডাকশনের অস্থায়ী অফিসটা সার্চ করেছি। সেখানে কয়েকটা ফিল্মের ভিডিও টেপ পেয়েছি। সেগুলো সব ব্লু-ফিল্মের টেপ। সেই সঙ্গে কয়েকটা চিঠিও পেয়েছি। প্রক্যেকটা চিঠিতে ব্রতীনবাবুকে হুমকি দিয়ে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চিঠিগুলোর নিচে শুধু এস এবং এম এই দুটো অক্ষর ইংরেজিতে লেখা আছে। চিঠিগুলোর জেরক্স কপি আপনাকে দেবার জন্য এসেছি। বলে তিনি ফোলিও ব্যাগ খুলে একটা খাম কর্নেলের হাতে তুলে দিলেন।

কর্নেল খাম থেকে একটা চিঠি বের করে টেবিল ল্যাম্প জ্বাললেন এবং ড্রয়ার থেকে আতস কাঁচ বের করে সেটা কিছুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলেন। তারপর আপনমনে বললেন—হুঁ যা ভেবেছিলাম! ব্রতীনবাবুকে কেউ ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছিল।

আমার জিগ্যেস করার ইচ্ছা হল কে এই ব্ল্যাকমেলার? কিন্তু কর্নেলের গাম্ভীর্য দেখে চুপ করে গেলুম। হালদার মশাইও কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন। কিন্তু তিনিও চুপ করে গেলেন এবং এক টিপ নস্যি নিলেন।

নরেশবাবু বললেন–তা হলে আমি উঠি! বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং পা বাড়িয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বললেন–মাথার ঠিক নেই। আসল কথাটাই বলা হয়নি। রাজগাঁওয়ে যে লোকটিকে ধরা হয়েছে তার ব্যাগ সার্চ করে পুলিশ একটা সিক্স রাউন্ডার পয়েন্ট থার্টি এইট ক্যালিবারের রিভালবার পেয়েছে। রিভালবারে। কোন গুলি ভরা ছিল না। তবে একটা বুলেট কেসের মধ্যে চারটে তাজা গুলি পাওয়া গেছে। বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।

এবার হালদার মশাই বললেন–তা হইলে কি রমেশ বর্মনই খুনি?

কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন–এখনও সিওর নই।

আমি বললুম–তার সঙ্গে বনশ্রীর পিসিমা এবং বনশ্রী দুজনেই ছিল অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, হোটেল এশিয়া থেকে বনশ্রী মারুতি গাড়ি চালিয়ে তার পিসিমা এবং রমেশ বর্মনকে সম্ভবত হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় রমেশ বর্মন কী করে এবং কখন ব্রতীনবাবুকে গুলি করে মারলেন? শুধু তাই নয়, তার দেহ গঙ্গায় ফেলে দেবার চেষ্টাও করলেন। আমার মাথায় এই ব্যাপারটা ঢুকছে না। কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন–অকারণ মাথা ঘামিয়ে কোন লাভ নেই জয়ন্ত। কী ভাবে ব্রতীনবাবুকে খুন করা হয়েছে তা জানতে হলে আমাদের আরও অনেক দূর এগোতে হবে।

কথাটা বলে তিনি হঠাৎ গাম্ভীর্য চুরমার করে হেসে উঠলেন। বললুম–কী ব্যাপার?

কর্নেল সহাস্যে বললেন– ছটা নাগাদ তোমার দেখা সেই দীপ্তিময়ী সুন্দরী তরুণী তোমার মত যুবকের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে আসছে। অতএব অঙ্ক না কষে মনমেজাজ হাল্কা রাখো।

বললুম–আপনার সান্নিধ্যে থেকে মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মুখেও আপনার মতো সাদা দাড়ি গজিয়ে গেছে এবং টাক পড়েছে। কাজেই সুন্দরীদের সম্পর্কে আমি কোল্ড।

গোয়েন্দাপ্রবর কী বুঝলেন কে জানে। খি খি করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন–তা যা কইছেন। আমি যখন পুলিশে চাকরি করতাম তখন অনেক সুন্দরী মাইয়া দেখছি। বুঝলেন জয়ন্তবাবু! পুরুষ হোক, মাইয়া হোক এবং চেহারা যত সুন্দরই হোক, কারও-কারও ভেতরে কিন্তু বিষাক্ত সাপ থাকে। একবার এক সুন্দরী মাইয়ারে ধরছিলাম। সে তিন জনেরে দাও-এর কোপ মাইরা খুন করছিল।

বললুম-নিশ্চয়ই সে আত্মরক্ষার জন্য একাজ করতে বাধ্য হয়েছিল? হালদার মশাই কিছু বলতে যাচ্ছেন, এমন সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন-ষষ্ঠী! একটু পরে কানে ভেসে এলো ছোট ওয়েটিং রুমের ভেতরে কোনো মেয়ে কাকেও দমক দিয়ে বলছে তুমি কোথায় যাবে? বারবার বলছি গাড়িতে গিয়ে বসো। তবু শুনছ না। এবার আমি তোমাকে থাপ্পড় মারব। যাও বলছি।

তারপর দরজার পর্দা তুলে যার আবির্ভাব ঘটল তার ছবি আমরা দেখেছি। বনশ্রী রায়-ই বটে। কিন্তু সম্ভবত তার মুখে এখন প্রসাধন নেই বলে তার সেই তীক্ষ্ণ দীপ্তিটা দেখতে পাচ্ছি না। তার পরনে জিনসের প্যান্ট এবং গায়ে একটা জংলা ছাপের হাতকাটা ফতুয়া–যাকে আদর করে বলা হয় টপ। তার হাতে একটা ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ। প্রথমে সে কর্নেলকে নমস্কার করল তারপর আমাদের দুজনকে নিছক ভদ্রতা রক্ষার জন্যই যেন নমস্কার করে বলল–আমি কর্নেল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

কর্নেল হাসিমুখে বললেন– বসো বনশ্রী। তুমি বলছি বলে এই বৃদ্ধের উপর যেন রাগ কোরো না।

বনশ্রী সোফায় বসে বলল-রাগ করব কেন? বরং আপনি বললেই রাগ করতাম। আমি জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপালবাবুকে আজ দুপুরে ফোন করেছিলাম। তার সঙ্গে আমার তত বেশি পরিচয় নেই। তবে তাঁর মুখেই আপনার কথা শুনেছি। আজ গোপালবাবু বললেন–আমি যদি বাঁচতে চাই, তাহলে যেন অবশ্যই আপনার সঙ্গে দেখা করি।

কথাটা বলে সে আমাদের দিকে তাকাল। কর্নেল আমাদের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন–তোমার যা বলার কথা কিংবা আমার যা বলার কথা, সবই তুমি এঁদের সামনে বলতে পারো। কারণ তুমি যা বলবে এবং আমি যা বলব সবই এঁদের কাছে আমাকে জানাতে হবে। কারণ এঁরা দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তবে তার আগে আমরা আরেক রাউন্ড কফি খেয়ে নেব, তুমিও খাবে। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। বিশেষ করে তোমার মানসিক অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কাজেই তুমিও কফি খাবে।

বনশ্রী একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল– কফি খেতে আমার আপত্তি নেই। আপনি শুনে থাকবেন মডেলিং আমার পেশা। তাই আমাকে কোন কোন সময় রাত জাগতে হয়। তখন বাধ্য হয়ে আমি কফি খাই। কর্নেল হাঁক দিলেন–ষষ্ঠী কফি!

ষষ্ঠীচরণ যথারীতি তৈরি ছিল। সে ট্রেতে স্ন্যাকস সহ চার পেয়ালা কফি রেখে গেল।

হালদার মশাই সবার আগে হাত বাড়িয়ে তার স্পেশাল কফির পেয়ালাটি তুলে নিলেন। কর্নেল বনশ্রীর হাতে কফির পেয়ালা তুলে দিলেন। তারপর নিজে একটি পেয়ালা তুলে চুমুক দিলেন। আমি কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে বললুম–আমার সৌভাগ্য, মিস রায়ের একটা অনবদ্য কাট-আউট আমি দেখেছি।

বনশ্রী চুপচাপ কফিতে চুমুক দিতে থাকল। তারপর বলল–কর্নেল সাহেব! আপনি বিশ্বাস করুন, আমি সত্যিই জানতাম না যে আমি একটা ফাঁদে পা দিয়েছি। বিজয়েন্দু ব্যানার্জি নামে এক ভদ্রলোক ব্যবসা করেন। তাঁর ব্যবসা ইলেকট্রনিক গুডস্ থেকে শুরু করে নানারকমের বিদেশি প্রসাধনী এমনকি কম্পিউটারেরও। গতমাসে আমি ফেয়ার টোন নামে একটা বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে মডেলিং করছিলাম। সেই সময় এই ভদ্রলোকের ব্যবসার জন্য আমাদের কোম্পানি একটা বিজ্ঞাপন করেছিল। তাতে আমি মডেল ছিলাম। শুধু ম্যাগাজিনে নয়, কলকাতার নানা জায়গায়ই সেই বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং আছে। তাই প্রকাশ্যে বেরোলে অনেকে আমাকে চিনে ফেলে এবং ভিড় করে।

কর্নেল বললেন– বুঝেছি। এবার তোমার মূল কথাটা সংক্ষেপে আমাকে বলো।

বনশ্রী একটু চুপ করে থেকে বলল–ফিল্মে অভিনয়ের ইচ্ছা আমার ছিল বা আছে। কেউ-কেউ আমাকে অ্যাপ্রোচও করেছেন। কিন্তু আমার অনেক সময়ই এসব অ্যাপোচ ভালো লাগেনি। কিন্তু মিস্টার ব্যানার্জির বিজ্ঞাপনটা করার পর তিনি মাঝে মাঝে প্রায়ই আমাকে ফোন করে বলতেন, ব্রতীন সোম নামে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন। তিনি কয়েকটা ছবি ইতিপূর্বে করেছেন। এবার তার নতুন। ছবির জন্য তিনি একেবারে আনকোরা নায়িকা চাইছেন।

কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–এগুলো সবই আমি জানি। মিস্টার ব্যানার্জি ব্রতীনবাবুর কাছে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ব্রতীনবাবু তোমাকে নিতে চেয়েছিলেন। এখানে আমার একটা প্রশ্ন ব্রতীনবাবুর ছবির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কি কোনো লিখিত এগ্রিমেন্ট হয়েছিল?

হয়েছিল। আমি দুলাখ টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু মিস্টার ব্যানার্জির কথায় আমি এক লাখ টাকায় রাজি হয়েছিলাম। ব্রতীনবাবু আমাকে মাত্র দশ হাজার টাকা। অ্যাডভান্স করেছিলেন। বাকি টাকা চারটে ইন্সটলমেন্টে ছবির শুটিং শেষ হওয়ার আগে আমাকে দেওয়ার কথা ছিল।

এবার বলো, আগের সপ্তাহে এক সন্ধ্যাবেলায় কি বিজয়েন্দু ব্যানার্জি গৌরীমাতা প্রোডাকশনের পার্টনার-হিসাবে ব্রতীনবাবুর নতুন ছবির জন্য ব্রতীনবাবুকে এগারো লাখ টাকা দিয়েছিলেন এবং তখন তুমি উপস্থিত ছিলে?

বনশ্রী যেন একটু চমকে উঠল। সে জোরে শ্বাস ছেড়ে বলল–শুধু আমি নই। পরিচালক রঞ্জন মিত্র এবং বোম্বের ফিল্মপ্রোডিউসার রমেশ বর্মন উপস্থিত ছিলেন।

রমেশ বর্মন কি তোমার পরিচিত?

-হ্যাঁ, মিস্টার ব্যানার্জিই তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। মিস্টার বর্মন ফিল্ম ছাড়াও ইলেকট্রনিক্স গুডসের ব্যবসা করেন। ব্রাবোর্ন রোডে তার একটা ব্রাঞ্চ আছে। মিস্টার ব্যানার্জি আমাকে তার কাছে একবার নিয়ে গিয়েছিলেন। বুঝতেই পারছেন, বলিউডের ফিল্মে চান্স পাওয়ার সুযোগ ছাড়তে চাইনি। কিন্তু আমি পরে বুঝলাম মিস্টার বর্মনের ফাঁদে পা দিয়েছি। কলকাতা এলে সে হোটেল এশিয়াতে উঠত এবং আমাকে ফোন করে ডাকত। হোটেলের স্যুইটে আমাকে ড্রিঙ্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করত। এরপর একদিন সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কু-প্রস্তাব দিয়েছিল। কোনোক্রমে নিজেকে তার কবল থেকে ছাড়িয়ে এসেছিলাম। তারপর কথাটা আমি প্রথমে মিস্টার ব্যানার্জিকে বলেছিলাম। আশ্চর্য ব্যাপার, মিস্টার ব্যানার্জি ব্যাপারটা গ্রাহ্য করেননি। তিনি বলেছিলেন, ফিল্মে শাইন করতে চাইলে এ ধরনের ব্যাপার মেনে নিতেই হয়। এরপর একদিন এই ব্যানার্জিও আমাকে কু-প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি তাকে এড়িয়ে চলছিলাম। কিন্তু বর্মন আর ব্যানার্জি আমাকে সুযোগ পেলেই–

বনশ্রী হঠাৎ চুপ করল। কর্নেল বললেন-বুঝেছি। তুমি কি এসব কথা কাকেও জানিয়েছিলে?

-হ্যাঁ, ব্রতীনবাবুকে জানিয়েছিলুম। তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ওই শয়তান বর্মনকে তিনি শায়েস্তা করবেন। গত শনিবার হোটেল এশিয়া থেকে ফোন করে বর্মন আমাকে ডেকেছিল। আমি তার সুইটে যাইনি। হোটেলের লবিতে তাকে নেমে আসতে বলেছিলুম। সে নেমে এসে আমাকে বলেছিল, ব্রতীন সোম তাকে হুমকি দিয়েছেন, যেন সে এখনই কলকাতা ছেড়ে চলে যায়। না গেলে তার প্রাণ খাবে। কিন্তু এ হুমকি সে গ্রাহ্য করে না। সে কলকাতায় থেকেই আমাকে নিয়ে ফিল্ম করবে। তাই পরদিন ভোরে সে আমাকে নিয়ে আউটডোর শু্যটিংয়ের জন্য লোকেশান দেখতে যাবে। কিন্তু তার কথা শুনে আমার সন্দেহ জাগল। কথায়-কথায় পিসিমার আগের বাড়ি ছোটনাগপুর এলাকায় রাজগাঁওয়ের নাম করলুম। সে তখনই রাজি হল। পরদিন ভোরে যাওয়ার কথা বলল সে। বাড়ি ফিরে পিসিমাকে সব খুলে বললুম। পিসিমা সাংঘাতিক মহিলা। পিসিমা বলল, সে আমাদের বাড়ির কাজের লোক রাজুকেও সঙ্গে নেবে। তারপর রাজগাঁওয়ে গিয়ে বর্মনকে বাঘের মুখে ফেলে দেবে। পরদিন ভোরে গাড়ির ব্যাকসিটে পিসিমা আর রাজুকে বসিয়ে নিয়ে গেলাম। বর্মন গাড়িতে পিসিমা আর রাজুকে দেখে গম্ভীর হয়ে গেল। গাড়িতে চেপে সে বলল, তার হাতে একটা জরুরি কাজ আছে। তাকে ব্রাবোর্ন রোডে তার অফিসের কাছে নামিয়ে দিয়ে আমরা যেন হাওড়া স্টেশনে অপেক্ষা করি। সে ঠিক সময়ে পৌঁছবে। পিসিমার মাথায় তখন রাজগাঁওয়ে যাবার প্রচণ্ড ঝোঁক চেপেছে। কতবছর সেখানে যায়নি। সে বলল, রাজু আর আমার রাজগাঁও যাওয়ার ইচ্ছে হলে যেতে পারি। কিন্তু আমি বেঁকে বসলাম। পিসিমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে রাজুকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- গাড়িটা কি তোমার?

বনশ্রী বলল–হ্যাঁ। আমারই। তবে ইনকামট্যাক্সের ঝামেলার ভয়ে ওটা পিসিমা রত্না দেবীর নামে কিনেছি।

হালদারমশাই বলে উঠলেন। –হ! তাই কন!

বনশ্রী তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কর্নেল বললেন–তোমার পিসিমার সঙ্গে কিন্তু রমেশ বর্মন রাজগাঁও গিয়েছিল।

বনশ্রী বলল–জানি। পিসিমা স্টেশন থেকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, রমেশ বর্মন আমাদের রাজগাঁও না যাওয়ার কথায় কান করেনি। এটাই আশ্চর্য, সে পিসিমার সঙ্গে ফার্স্টক্লাসের টিকিট কেটে রাজগাঁও গিয়েছিল। আজ দুপুরে রাজগাঁও থেকে পিসিমা ট্রাঙ্ককলে জানিয়েছে, সেখানে পুলিশ নাকি বর্মনকে অ্যারেস্ট করেছে।

কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। রমেশ বর্মন আসলে রাজগাঁওয়ে গা ঢাকা দিতে চেয়েছিল। তাই অগত্যা সে তোমার পিসিমার সঙ্গী হয়েছিল।

বনশ্রী অবাক চোখে তাকাল। তারপর উত্তেজিতভাবে বলল–বাড়ি ফিরে শুনেছিলাম কে বা কারা ব্রতীনবাবুকে নাকি গঙ্গার ধারে খুন করেছে! তা হলে কি–

তার কথার উপর কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। বর্মন একটা বোঝাঁপড়ার জন্য ব্রতীনবাবুকে গঙ্গার ধারে আউট্রাম ঘাটের কাছে সকাল নটা থেকে দশটার মধ্যে ডেকেছিল। তার লেখা চিঠিটা আমি ব্রতীনবাবুর বাড়িতে তার অফিসঘরে খুঁজে পেয়েছি। ব্রতীনবাবু বোকার মতো তার ফাঁদে পা দিয়ে প্রাণে মারা পড়েছিল। বর্মন তাকে মেরে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। তা ছাড়া সে ভেবেছিল, তোমার ফিল্মে নামার চান্স এভাবে নষ্ট হলে তুমি তার প্রস্তাব মেনে নিয়ে তার ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না।

বনশ্রী ঘড়ি দেখে বলল–একটা কথা কর্নেল সাহেব!

-বলো! –পুলিশ আমাকে ব্রতীনবাবুর মার্ডারকেসে জড়াবে না তো?

কর্নেল হাসলেন। জড়াবে তবে সাক্ষী হিসেবে।

–আমি এবার উঠি।

–শেষ প্রশ্ন। মিস্টার ব্যানার্জি কি সত্যি ব্রতীনবাবুকে এগারো লাখ টাকা দিয়েছিলেন?

-হ্যাঁ কিন্তু…

–বলো!

–আমি জানি, মিস্টার ব্যানার্জি ব্রতীনবাবুকে ব্ল্যাকমেল করতেন। ব্যানার্জির কাছে শুনেছি, অবশ্য তখন তিনি মত্ত অবস্থায় ছিলেন–ব্রতীনবাবু নকি ব্লু-ফিল্মের। কারবার করেন। কাজেই মিস্টার ব্যানার্জির টাকা মিস্টার ব্যানার্জির হাতেই ফিরে। যেত। আচ্ছা, আমি চলি কর্নেল সাহেব! বলে কর্নেল এবং আমাদের দুজনকে নমস্কার করে বনশ্রী বেরিয়ে গেল।

.

০৮.

বনশ্রী চলে যাবার পর বললুম–ওয়েটিং রুমের ওখানে ষষ্ঠী দরজা খোলার সময় বনশ্রী চাপা গলায় কাকে ধমক দিচ্ছিল, কাকে নিচে গিয়ে বসতে বলছিল কিছু বোঝা গেল না।

হালদার মশাই তখনও হাতে একটিপ নস্যি নিয়ে বনশ্রীর গমন পথের দিকে তাকিয়েছিলেন। আমার কথা কানে গেলে তিনি চাপা স্বরে বললেন বোঝলেন না? ওটা সেই ষণ্ডামার্কা লোকই হইব। যারে আমি বনশ্রীর বাড়িতে দেখছিলাম। কী য্যান নামটা? হঃ রাজু। এখন দেখি সে মাইয়াটার বডি গার্ড হইয়া আইছিল। এই বলে হালদার মশাই নাকে নস্যি গুজলেন এবং নোংরা রুমাল দিয়ে যথারীতি নাক মুছলেন।

বললুম–কর্নেল, একটা কথা স্পষ্ট বোঝা গেল রমেশ বর্মনই ব্রতীনবাবুকে বোঝাঁপড়ার জন্য সকালে গঙ্গার ধারে ডেকেছিল। কিন্তু তার একজন সঙ্গী তো দরকার ছিল। তাছাড়া নরেশবাবু বলছিলেন, মোটর সাইকেলের চাকার দাগ পেয়েছেন।

কর্নেল বললেন–আর এখন ওসব কথা নয়। কে প্রকৃত খুনি এবং তার খুনের কী মোটিভ, সবই আমরা বুঝতে পেরেছি। কাজেই বাকি যে সব টুকরো রহস্য আছে,সেগুলো আশা করি কালকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। বাকি কাজটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দেওয়াই উচিত।

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন-হঃ! আমারও টায়ার্ড লাগতেছে। বাড়ি যাই গিয়া। বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং কর্নেলের উদ্দেশে বললেন কর্নেলস্যাব, আমারে কি আর কিছু করতে হইব?

কর্নেল বললেন–বিশেষ কিছু না। কাল মর্নিং-এ আপনি বিজয়েন্দু ব্যানার্জির পাড়ায় গিয়ে একটু খোঁজ নেবেন, তার কোন ডাক নাম আছে কি না।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ যেন একটু অবাক হলেন। তারপর তার অভ্যাসমত সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

একটু পরে দেখলুম, কর্নেল ব্রতীনবাবুর নিখোঁজ হয়ে যাবার চিঠিটার জেরক্স কপি এবং আরও কয়েকটা চিঠি ড্রয়ার থেকে বের করে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় আতস কাঁচের সাহায্যে পরীক্ষা করতে থাকলেন। অন্য চিঠিগুলো নরেশবাবুর দিয়ে যাওয়া চিঠি। সেগুলো জয়শ্রী সিনে স্টুডিওতে গৌরীমাতা প্রোডাকশনের অফিসে নরেশবাবু খুঁজে পেয়েছিলেন। ওগুলো ব্রতীনবাবুকে ব্ল্যাকমেল করা চিঠি।

বেশ কিছুক্ষণ চিঠিগুলো পরীক্ষা করার পর তিনি ড্রয়ারে সেগুলো রেখে দিলেন। আতস কাঁচটাও ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর যেন আপন মনেই বললেন– পুলিশের হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞরা অর্থাৎ যাঁদের গ্রাফোলজিস্ট বলা হয়, তাঁরা কী বলবেন জানি না। তবে আমার মতে, সবগুলো চিঠিই একটিই লোকের হাতের লেখা।

আমি বললুম–কিন্তু কর্নেল, ব্ল্যাকমেলের চিঠিগুলোর তলায় সই করা আছে ইংরেজিতে এস এবং এম। এই লোকটিকে তো এখনও খুঁজে বের করা হয়নি।

কর্নেল একটু হেসে বললেন–হয়তো হয়েছে। তবে এখন আর আমিও এই কেস নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না।

পরদিন সকালে আটটায় ঘুম ভাঙার পর বেড টি খেয়ে এবং বাথরুমে গিয়ে দাড়ি কামানো প্রাতঃকৃত্য ইত্যাদি সেরে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে গেলুম। দেখলুম কর্নেল তখনও তার ছাদের বাগান থেকে নেমে আসেন নি। আমি সোফায় বসে সেদিনকার ইংরেজি ও বাংলা কাগজগুলোতে চোখ বুলোতে থাকলুম। সব কাগজেই ফিল্ম প্রোডিউসার ব্রতীন সোমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক জল্পনা করেছে। আমাদের কাগজ দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় ফেনিয়ে তোলা খবরটা পড়ে বুঝলুম এটা আমাদের নতুন ক্রাইম রিপোর্টার প্রতীক চ্যাটার্জির লেখা। সে বনশ্রীকে নিয়ে একটা গল্প ফাঁদতে চেয়েছে। মনে মনে হেসে ভাবলুম আমাদের পত্রিকার চিফ অফ দ্য নিউজ ব্যুরো সত্যদা এই সময়ে আমার অফিস কামাই নিয়ে। খুব খাপ্পা। অবশ্য জানি না, তিনি আমার অজ্ঞাতসারে কর্নেলকে টেলিফোন করেছেন কি না।

একটু পরে কর্নেল ফিটফাট হয়ে ড্রইং রুমে এলেন। সহাস্যে বললেন–মর্নিং জয়ন্ত! আশাকরি সুনিদ্রা হয়েছে?

বললুম-মর্নিং কর্নেল! সত্যি বলতে কি আজ চমৎকার ঘুমিয়েছি। তিনি ইজিচেয়ারে বসার পর ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে দুপেয়ালা কফি আর স্ন্যাকস রেখে গেল।

এই সময় ডোরবেল বেজে উঠল এবং কর্নেলও হাঁক দিলেন ষষ্ঠী! তারপর সবেগে প্রবেশ করলেন গোয়েন্দাপ্রবর কে. কে. হালদার। তিনি সোফায় ধপাস। করে বসে বললেন–শ্যামবাজার থেক্যা আইতাছি। বিজয়েন্দু ব্যানার্জির বাড়ির কাছাকাছি চায়ের দোকান আর পানের দোকানে জিগাইছিলাম এখানে বিজয়েন্দুবাবুর বাড়ি কেউ চেনে কিনা। অনেক খোঁজ খবরের পর একজন কইলেন মোড়ের ওই বাড়িটা। কিন্তু ওনারে তো আমরা সন্তুবাবু নামে চিনি। আরেকজন বললেন–লোকটার হেভি বিজনেস। দুই নামে কারবার চালায় শুনেছি। সনৎ মুখার্জি আর বিজয়েন্দু ব্যানার্জি। তবে এ পাড়ায় আমরা তাকে সন্তু ব্যানার্জি নামেই চিনি।

কথাগুলো শোনামাত্র আমি বলে উঠলুম- কর্নেল, চিঠিতে লেখা ইংরেজি এস পেয়ে গেলেন। তবে এম বলতে আমার মনে হয় বিজয়েন্দুবাবুর দুনম্বর নাম সনৎ বা সন্তু মুখার্জি।

কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করার পর সাড়া এলে বললেন- গুড মর্নিং অরিজিৎ! সুখবর দিচ্ছি।… আগে কথাটা শোন। বিজয়েন্দু ব্যানার্জির আর একটা নাম সনৎ মুখার্জি বা সন্তুবাবু। কাজেই ব্রতীনবাবুর ব্ল্যাকমেইলার এই ভদ্রলোক। এরপর তোমরা যা করার কর… হ্যাঁ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজন ব্ল্যাকমেলারকে আইনে নিশ্চয়ই আটক করা যায়। পরে নরেশবাবুকে একবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবে। উইশ ইউ গুডলাক! রাখছি।

বুঝতে পারলুম, এখন কফির দিকেই এই বৃদ্ধের মন লেগে আছে। তাই ডি সি ডি ডি লাহিড়ী সাহেবের সঙ্গে স্বভাবসুলভ রসিকতা করলেন না। ইতিমধ্যে ষষ্ঠী হালদারমশাইয়ের জন্য স্পেশাল কফি এনেছিল এবং হালদার মশাই যথারীতি ফুঁ দিয়ে তাঁর কফি পান করছিলেন।

আজ এই সকালে হালদার মশাইকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। তিনি তার পুলিশ জীবনের ডবল নামধারী একজন অপরাধীর কাহিনী সবিস্তারে বলছিলেন।

কিছুক্ষণ পরে কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করতে যাচ্ছেন এমন সময়ে আবার ডোরবেল বাজল। জয়শ্রী সিনে স্টুডিওর ম্যানেজার গোপাল গুহ ঘরে ঢুকে বিরস মুখে নমস্কার করে আড়ষ্টভাবে বসলেন। তারপর বললেন আমি কর্নেল সাহেবের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। কর্নেল সহাস্যে জিগ্যেস করলেন কেন বলুন তো?

গোপালবাবু বিমর্ষ মুখে বললেন- বিজয়েন্দু ব্যানার্জি নামে লোকটা হাড়ে হাড়ে যে একজন সাংঘাতিক বজ্জাত, তা আমি কেমন করে জানব? বুঝতেই পারছেন মুখোশের আড়ালে অন্য মুখ থাকে। আমি এমন একজন লোককে আপনার কাছে নিয়ে এসেছিলাম, সেজন্য নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করেছে। আমিও ঠিক কাল থেকে এটাই চাইছিলাম। কারণ আমি স্টুডিওতে বসেই কাল শুনেছি, বিজয়েন্দুবাবু নাকি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে ব্রতীনবাবুকে ব্লু-ফিল্ম কেনাবেচায় প্ররোচিত করেছিলেন। তারপর সেই বিজয়েন্দুবাবুই নাকি ব্রতীনবাবুর কাছে মোটা টাকা আদায় করতেন। স্রেফ ব্ল্যাকমেলিং। আপনার কাছে তার আসার উদ্দেশ্য ছিল বনশ্রীকে চোর সাব্যস্ত করে তার কেরিয়ার খতম করা। কর্নেল বললেন- গোপালবাবু! আপনি কোনও দোষ করেননি। বরং এমন একটা জব্বর কেস আমাকে উপহার দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাছাড়া পরোক্ষে আপনি একটি নিষ্পাপ মেয়েকে কদর্য লোকের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

গোপালবাবু কফি খাওয়ার পর বেরিয়ে গেলেন। আবার হালদারমশাইয়ের পুলিশ জীবনের গল্প শুরু হল। কান পেতে শুনছিলুম না। তবে মুখে শুধু হু দিয়ে যাচ্ছিলুম। এরপর বেলা নটায় কর্নেলের দ্বিতীয় দফা কফির আদেশ পালন করেছিল ষষ্ঠী।

আমরা সবে দ্বিতীয় দফার কফি শেষ করেছি টেলিফোন বেজে উঠল, কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন- নরেশবাবু, ব্ল্যাকমেলার ভদ্রলোককে আশা করি পাকড়াও করেছেন।…

হ্যাঁ–ওই ভদ্রলোকই যে রমেশ বর্মনকে দিয়ে হংকং থেকে ব্লু-ফিল্মের চোরাই ভিডিও টেপ সাপ্লাই করতেন ব্রতীনবাবুকে। ব্রতীনবাবুর এই একটাই ভুল। আমার ধারণা, ব্ল্যাকমেলারের চাপে তার নতুন ছবির কাজে নামতে দেরি হচ্ছিল।… সেই ফাইলটা, যেটা আপনি ব্রতীনবাবুর আলমারি থেকে সিজ করেছিলেন… বুঝেছি। ওতেই তাহলে ব্লু-ফিল্ম কেনা-বেচার হিসেব ছিল।… বলেন কী? আলাদা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাশবই এবং চেক পেয়ে গেছেন? কিন্তু যার অ্যাকাউন্ট সে তো চিতায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।… আর একটা কথা। রমেশ বর্মন যে মোটর সাইকেল। ব্যবহার করেছিল এবং তাঁর সঙ্গে যে লোকটা ছিল, সে বিষয়ে কিছু হদিশ করতে পেরেছেন?… হ্যাঁ। ওটা সময় সাপেক্ষ এবং আপনাদের পুলিশ সোর্স থেকে শেষাবধি সফল হবেন, আমার এতে কোনও সন্দেহ নেই।… হা চাপ দিলে রমেশ বর্মনের পেট থেকেও ওসব কথা বেরিয়ে আসতে পারে। উইশ ইউ গুডলাক। ছাড়ছি।

রিসিভার রেখে কনেল বললেন–-গঙ্গার ধারে আউট্রাম ঘাটে কয়েকটা দিন ঘোরাঘুরি করলে আমি অবশ্য বর্মনের সঙ্গী এবং মোটর সাইকেলের সূত্র খুঁজে বের করতে পারতাম। কিন্তু আর অতটা পরিশ্রমের কারণ দেখছি না। ব্রতীনবাবুর প্রকৃত খুনি ধরা পড়েছে, এটাই যথেষ্ট।

আমি বললুম- আমার খুব আশ্চর্য লাগছে বিজয়েন্দু ব্যানার্জিই আপনাকে একগাদা মিথ্যে কথা শুনিয়েছিল। সত্যিই তো! এগারো লাখ টাকা ব্রতীনবাবুর ওই সেক্রেটারিয়েট টেবিলের আটটা ড্রয়ারেও ধরান যাবে না। আবার সেই টাকা নাকি বনশ্রী চুরি করেছে। একথা ব্রতীনবাবু নাকি তাকে বলেছিলেন। এখন ভেবে অবাক হচ্ছি, বনশ্রীই বা কীভাবে অতগুলো টাকা চুরি করবে। অতগুলো টাকা চুরি করতে গেলে তারও একটা স্যুটকেস দরকার। কী অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ব্রতীনবাবু অতগুলো টাকা ফেলে রেখে কোথাও যাবেন এবং বনশ্রী একা সেই ঘরে বসে থাকবে! নাঃ! আমি যে কথাগুলো স্বকর্ণে শুনেও দিব্যি বিশ্বাস করেছিলুম এটাই অদ্ভুত।

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন– জয়ন্ত! আমি বরাবর তোমাকে বলে আসছি তুমি বোঝ সবই। তবে বড্ড দেরিতে।

হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন কিন্তু কর্নেল স্যার, আপনি তো তখন কথাগুলো শুনছিলেন কিন্তু ব্যানার্জিরে জেরা করেন নাই।

কর্নেল বললেন- হালদার মশাই, আপনি অপরাধের ব্যাপারে একজন অভিজ্ঞ মানুষ। আপনি তো জানেন মাছ ধরতে হলে যেমন বঁড়শির সুতো কখনও ঢিলে করে দিয়ে বঁড়শি বেঁধা মাছকে লম্বা দৌড়ের সুযোগ দেওয়া হয়, তেমনই অপরাধীকে বঁড়শি বেঁধা মাছের মতো ডাঙায় তুলতে কিছুক্ষণ দৌড়নোর সুযোগ দিতে হয়।

গোয়েন্দাপ্রবর কী বুঝলেন কে জানে। খি খি করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন–হঃ এক্কেরে খাঁটি কথা কইয়া দিছেন কর্নেল স্যার। কথাটা বলেই হালদার মশাই একটু নড়ে বসলেন। তিনি বললেন–ওই যাঃ! আর একখান জরুরি কথা কইতে ভুইল্যা গেছি।

আমি বললুম-কী কথা হালদারমশাই?

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন–কাইল এখান থেক্যা বার কইরা আমার সেই কলিগ শম্ভুবাবুর বাড়ি গিছলাম। তার মাইয়া নীপার যদি দেখা পাই। তো নীপা তখনই স্টুডিও থেক্যা বাড়ি ফিরছে। আমারে দেখ্যা সে খুব খাতির করল। কথায় কথায় তারে জিগাইলাম, সে বনশ্রী রায়েরে চেনে কিনা। নীপা কইল, খুব চেনে। দুইজনে একসাথে কত বিজ্ঞাপনে মডেলিং করছে। নীপা কিন্তু বনশ্রীর প্রশংসা করল বটে, তবে সেই সঙ্গে একথাও কইল, বনশ্রী খুব অ্যাম্বিশাস মাইয়া। সে ফিল্মে চান্স পাইবার জন্য এক্কেরে পাগলা হইয়া গেছে। তেমনই অনেক জায়গায় ঠকছেও বটে। নীপা আরও কইল, বনশ্রী দুঃসাহসী মাইয়া। নীপার ভয় হয় কবে না কোন শয়তানের ফান্দে পা দিয়ে নিজের সর্বনাশ বাধায়।

হালদারমশাই চুপ করলে কর্নেল বললেন–বিজয়েন্দু ব্যানার্জির সঙ্গে বনশ্রীর যোগাযোগ নিয়ে নীপা কিছু বলেনি আপনাকে?

হালদারমশাই কথাটা শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন–হঃ কইছে। নীপা কইছে, ওই ব্যানার্জিবাবু তার ব্যবসার জন্য বনশ্রীরে লইয়া একখান বিজ্ঞাপন করছিলেন। তারপর বনশ্রীরে তিনি ফিল্মে নামবার জন্য সুযোগ দেবেন কইছিলেন। নীপা একদিন বনশ্রীর সাথে তার অফিসে গিছল। নীপা কইল, লোকটা তার অফিসের মধ্যে বইয়া দুই জনেরে স্কচ খাইতে.সাধছিল। নীপা তখনই রাগ কইরা বারাইয়া যায়। বনশ্রী কিন্তু বইয়া ছিল।

আমি বললুম–বোঝা যাচ্ছে, বনশ্রী সত্যিই ব্যানার্জির ফাঁদে পা দিয়েছিল। সে জোর বেঁচে গেছে।

কর্নেল বললেন–হ্যাঁ বনশ্রী আপাতত বেঁচে গেছে। মাঝখান থেকে ব্রতীনবাবু বোকার মত প্রথমে ব্যানার্জি এবং পরে বর্মনের ফাঁদে পা দিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিলেন। এখন শুধু এটুকুই সান্ত্বনা, ব্ৰতীনবাবুর খুনি ধরা পড়েছে এবং ব্যানার্জি পুলিশের জেরায় জেরবার হচ্ছে। হয়ত তাকেও শাস্তি পেতে হবে।