আশ্রয় কুটির – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

আশ্রয় কুটির

স্কুল শিক্ষক নীহারবাবু রাজনীতি করেন না। স্কুল-পরিবার আর অবসরে লেখালিখি এই নিয়েই আছেন তিনি। পৌরসভার চেয়ারম্যানসাহেবের সঙ্গে তাঁর একবারই মাত্র স্কুলের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল। সেই তিনিই হঠাৎ কেন তাঁকে জরুরি তলব করলেন তা জানা ছিল না নীহারবাবুর। চেয়ারম্যানসাহেবের ঘরে প্রবেশ করলেন নীহার। কাচের সেক্রেটেরিয়েট টেবিলের অপর পাশে নিজের চেয়ারে বসে তিনি। নীহারকে দেখে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আসুন স্যার আসুন। বসুন মাস্টারমশাই।”

তাঁকে প্রতিনমস্কার জানিয়ে তাঁর মুখোমুখি অতিথি অভ্যাগতদের জন্য রাখা চেয়ারগুলোর একটায় বসলেন প্রৌঢ় শিক্ষক নীহারবাবু। বেল টিপে একজন কর্মীকে ডেকে নীহারবাবুকে চা দিতে বলার পর চেয়ারম্যান তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনাদের স্কুল কেমন চলছে স্যার?”

নীহার জবাব দিলেন, ‘ভালোই। আপনাদের অনুদানের টাকায় তৈরি করা নতুন ঘরগুলো বেশ কাজে লেগেছে। ছাত্র সংখ্যাও এ বছর কিছুটা বেড়েছে।’

তাঁর কথা শুনে চেয়ারম্যান হেসে বললেন, ‘আমি চেষ্টা করি আপনাদের সঙ্গে নিয়ে শহরটাকে সুন্দর করে তোলার। তবে আজ আপনাকে ডেকেছি অন্য একটি বিশেষ কারণে।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর টেবিলে রাখা ফাইলগুলোর একটির ভিতর থেকে একটি পাতলা বই বের করে সেটি তুলে ধরে নীহারকে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা আপনারই লেখা তো?’

তাঁর হাতে এ বই দেখে বেশ অবাক হয়ে গেলেন নীহার। বই মানে একটা পিন আঁটা পুস্তিকা । হ্যাঁ, সেটি নীহারেরই লেখা। নীহারের একটু লেখালিখির অভ্যাস আছে। কিছুটা শখও। তাঁর মতে, কোনো জায়গা আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন হলেও তার একটা ইতিহাস নিশ্চিতরূপে থাকে। তাই একবার খেয়ালবশে এ শহর নিয়ে তেমনি কিছু লেখেছিলেন। তারপর সেটি পুস্তকাকারে ছাপিয়েও ছিলেন। সে প্রায় বছর দশেক আগের কথা। ব্যাপারটা খুব যে-একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছিল তা পরবর্তীতে নীহারের নিজেরও মনে হয়নি। তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, ওটা আমারই লেখা। এ শহর সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি বা পুরোনো লোকদের মুখে শুনেছি তা নিয়েই লেখা এ বই।’

চেয়ারম্যানসাহেবের ঘরের দেওয়াল জুড়ে টাঙানো আছে বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, দেশনায়কদের নানান ছবি। যেমন সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকে। নীহারের জবাব শুনতে শুনতে তিনি সেই সব ছবির দিকে তাকাতে লাগলেন। তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল এক বরেণ্য দেশনায়কের ছবির দিকে চেয়ে। তিনি বললেন, ‘আপনি আপনার বইতে লিখেছেন উনি এক সময় আমাদের শহরের একটি বাড়িতে সম্ভবত রাত্রিবাস করেছিলেন। এ ব্যপারটা কতটা সত্যি?’

নীহার জবাব দিলেন, ‘আমার ধারণা ব্যাপারটা সত্যি। ওঁর রচনাতেও উল্লেখ আছে যে কলকাতা থেকে লঞ্চে নদীয়ায় সভা করতে যাওয়ার পথে গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলে এক বর্ধিষ্ণু গৃহে একবার রাত্রিবাস করেন তিনি। যদিও রচনায় স্থানের উল্লেখ নেই। তবুও আমার ধারণা, তিনি এখানেই ছিলেন। আর বাড়িটিও আমার চেনা। শুধু ধারণাই বা বলি কেন? ব্যাপারটা নিশ্চিত বলা যায় । ‘

নীহারের বক্তব্য শুনে চেয়ারম্যানসাহেব তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এ ঘটনা সম্পর্কে আপনি কীভাবে নিশ্চিত? আর সে বাড়িই-বা কোথায় ?’

নীহার জানালেন, ‘পুরোনো চটকল জেটির ওদিকে একটি বহু প্রাচীন বাড়ি আছে। ইংরেজ আমলের। দুশোর মতো বয়স হবে তার। আমি ওই বাড়িটার সন্ধান পাই কিছুটা কাকতলীয় ভাবেই। ওই বাড়ির নাম ‘আশ্রয় কুটির।’ ঠিক ওই বাড়ির গায়েই একটি বাড়িতে এক সময় ভাড়া থাকতেন আমাদের স্কুলের প্রাক্তন প্রয়াত শিক্ষক ভূপতিবাবু। বছর পনেরো আগে একবার তাঁর বাড়িতে যাওয়ার পথে হঠাৎই চোখ আটকে যায় পুরোনো বাড়িটার সদর দরজায়। তাঁর এক পাশের স্তম্ভের গায়ে বিবর্ণ পাথরের ফলকে লেখা ‘আশ্রয় কুটির’, আর অন্য পাশের স্তম্ভের গায়ে একটি কুলুঙ্গির মতো জায়গাতে একটা গণেশ মূর্তি স্থাপিত । ছোট তোরণটা দেখেই কেন জানি মনে হল এই সদর দরজার, এই প্রবেশ পথের ছবি আগেও কোথাও দেখেছি! সেদিন ভূপতিবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পর হঠাৎ খেয়াল হল কোথায় দেখেছি ছবিটা। দেশনায়কের একটি ছবির বই আছে আমার কাছে। তাঁর নানা সময়ের নানা জায়গার নানা ছবিতে সেটি ভরা। বইটা খুলে কয়েকটি পাতা ওলটাতেই বেরিয়ে পড়ল কাঙ্ক্ষিত ছবিটি। ওই প্রবেশ পথেই দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত দেশনায়ক। মাথায় খদ্দরের টুপি। দরজার একপাশের স্তম্ভে লেখা ‘আশ্রয় কুটির’ আর অন্য পাশে গণেশ মূর্তি। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে সে সময় ব্যাপারটা জানিয়েওছিলাম বেশ কয়েকজনকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারা কেউ তেমন গা করেননি।’

নীহারের কথা শুনে মৃদু উত্তেজনার ভাব ফুটে উঠল চেয়ারম্যানের মুখে। এই সময় একজন লোক এসে চা দিয়ে গেল তাঁদের সামনে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর তাতে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, ‘ঘটনাচক্রে আপনার এই বইটা হাতে পাই ক-দিন আকে। লেখাটা পড়ি এবং তাতে আমার চোখ আটকায়। বিষয়টি সম্পর্কে আমি প্রবল আগ্রহী। ঘটনাটি সত্যি হলে বাড়িটিকে কেন্দ্ৰ করে আমাদের শহরের নাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। ওই বাড়ি মেরামত করে দেশনায়কের ছবি দিয়ে একটি সংগ্রহশালাও তৈরি করা যাবে। ওঁর নাম বললে সরকারি দপ্তরেও কোনো আপত্তি আসবে না বা টাকা পেতে অসুবিধা হবে না। আর তারপর দেশ-বিদেশের নানান মানুষ ছুটে আসবেন ওঁর স্মৃতিধন্য বাড়িটি দেখতে। আমাদের শহরে বিশেষ আকর্ষণীয় কিছু নেই বলে যে আক্ষেপ ছিল এতকাল সেটিও মিটবে।’ এর পর তিনি বাড়িটির বর্তমান অবস্থা বা সেখানে কেউ থাকেন কিনা জানতে চাইলে নীহার জবাব দিলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি জানি না। তবে সে সময় শুনেছিলাম মালিকানাহীন বাড়ি সেটি। কয়েকঘর মানুষ জবরদখল করে থাকে সেখানে। তবে আপনি বললে খোঁজ নিতে পারি। আপনার এই পরিকল্পনা সফল হলে আমাদের শহরের পক্ষে খুবই গৌরবের বিষয় হবে।

চেয়ারম্যান বললেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আর অহেতুক দেরি করতে চাইছি না। তবে কাজ শুরুর আগে শেষবারের মতো একবার ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। আমার অনুরোধ, কালই আপনি বাড়িটিতে গিয়ে আপনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান। তারপর সেখানে সরকারি লোক পাঠাব। নিজেও যাব। অবৈধভাবে যদি কেউ বসবাস করে তবে তাদের হঠাতে আমার তিন দিনও সময় লাগবে না। আর সব কিছু ঠিকঠাকভাবে মিটে গেলে পৌরসভার পক্ষ থেকে আপনাকে অবশ্যই উপযুক্ত সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’

চেয়ারম্যানসাহেবের সব কথা শুনে নীহার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমি কালই সেখানে যাব। তারপর ঘুরে এসে আপনাকে বিস্তারিতভাবে জানাব বাড়িটির বর্তমান অবস্থা।’

চেয়ারম্যান খুশি হয়ে বললেন, ‘তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন। সরকারিভাবে যতদিন না কাজ শুরু হচ্ছে ততদিন বাইরের লোকের কাছে বিষয়টি গোপন রাখতে হবে। ভালো কাজে বাঁধা দেওয়ার লোকের তো অভাব নেই।

দুই

এদিন পৌরসভা থেকে ফেরার পর বেশ উত্তেজনার মধ্যেই কাটল নীহারের। বাইরের কারও কাছে কথাটা না বললেও তিনি নিজের স্ত্রী আর সন্তানদের কাছে চাপতে পারলেন না। তারাও বেশ উত্তেজিত হলেন ব্যাপারটা শুনে। বিশেষত এ কাজে যুক্ত হওয়ার পুরস্কার হিসেবে ভবিষ্যতে নাগরিক সম্বর্ধনা প্রাপ্তির সম্ভাবনা আছে যখন। সেটি মনে করেই বেশ খুশি হলেন তারা।

পরদিন স্কুলে গিয়ে ছাত্র পড়ানোয় খুব বেশি মনোনিবেশ করতে পারলেন না নীহার ছুটির ঘণ্টা বাজতেই তিনি রওনা হলেন ‘আশ্রয় কুটির’ এর উদ্দেশ্যে। তিনি যখন সেখানে পৌঁছোলেন তখন বাড়িটির গায়ে গঙ্গার বুকে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। জীর্ণ ভগ্নপ্রায় বাড়িটার আশেপাশে বেশ কয়েকটি নতুন বাড়িও হয়েছে ইতিমধ্যে। তবে লোকজন বিশেষ চোখে পড়ল না। বাড়িটার ঠিক সামনেই কারা যেন একটা ইমারতি দ্রব্যের দোকান করেছে। সেটি এখন বন্ধ তবে তার ইট পাথরের আড়ালে সেই সদর দরজাটি প্রায় অদৃশ্য। কাঁধে বইয়ের ব্যাগটি নিয়ে সাইকেল থেকে নামলেন তিনি। তারপর সেই ইমারতি দ্রব্যের পাশ কাটিয়ে দেউড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই পনেরো বছরে সেটি আরও বিবর্ণ হয়েছে। স্তম্ভগুলো কিছুটা ঝুঁকেও পড়েছে। কোনোদিন হয়তোবা ঝড় বাদলে মুখ থুবড়ে পড়ার অপেক্ষায় তারা নীহার দেখলেন আশ্রয় কুটির লেখা পাথরের ফলকটা আর নেই। কুলুঙ্গিতে রাখা গণেশ মূর্তিটারও খুবই করুণ অবস্থা। বিচ্ছিন্ন হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হতে আর সময় বিশেষ বাকি নেই সেটিরও। এই স্তম্ভ এই দেউড়ি এ সময় সেই মহামানবের এ শহরে আসার একমাত্ৰ প্ৰমাণ । শেষবারের মতো তোরণটা পরীক্ষা করার জন্য সঙ্গে আনা দেশনায়কের সেই ছবির বইখানার সঙ্গে মেলাতে গিয়ে একটি ব্যাপার দেখে চমকে উঠলেন তিনি। কুলুঙ্গিতে রাখা গণেশ মূর্তিটির হাঁটুর একটা অংশ ভাঙা। যা প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এই ছবিতেও ধরা পড়েছে। অর্থাৎ এই সেই বাড়ি। দেশনায়ক যে এখানে এসেছিলেন এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে। উৎফুল্ল নীহার ভাবলেন এবার তাঁর নাগরিক সম্মান কে আটকায়! তাও বাড়ির ভিতরের বর্তমান অধিবাসীদের দেখার জন্য নড়বড়ে কাঠের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন তিনি। দেখলেন একটা শান বাঁধানো উঠোন। তার স্থানে স্থানে ফাটল হয়ে আগাছা জন্ম নিয়েছে। আর এই উঠোনকে কেন্দ্র করেই তিন দিকে নোনা ধরা, দাঁত বের করা ইটের সার সার ঘর। অধিকাংশই দরজা জানালা বিহীন। এক কালের বর্ধিষ্ণু বসতবাড়িটি এখন জনহীন নাকি? তিনি তাকালেন চারপাশে। হঠাৎ একটি কণ্ঠ ভেসে এল, ‘ভগা, ফিরলি নাকি?’

কাছেই একটি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অশীতিপর এক বৃদ্ধা। একটি ছেঁড়া ময়লা কাপড় তার শরীরে কোনোরকমে লজ্জা নিবারণ করছে। চোখে ভালো দেখতে পান না সম্ভবত। একটি হাত কপালের উপর দিয়ে ন্যুব্জভাবে দাঁড়িয়ে নীহারকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। নীহার জবাব দিলেন, ‘আমি স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক। আমার নাম…।’

ঠিক এই সময় একটি ঠক্ ঠক্ শব্দ শুনে পিছনে ফিরে তাকাতে দেখতে পেলেন তাঁরই পিছন পিছন আরও একজন ঢুকে পড়েছে উঠোনে। বছর তিরিশের ছেলেটির চোখের কালো চশমা আর হাতের ওয়াকিং স্টিকটি দেখে নীহার বুঝলেন সে অন্ধ। বিবর্ণ পোশাকের ছেলেটির কাঁধের ঝোলা থেকে উঁকি দিচ্ছে ধূপের প্যাকেট। বুড়ির আর নীহারের কথা শুনতে পেয়েছিল সে। তাই প্রথমে বুড়ির উদ্দেশে বলল, ‘এই তো ফিরলাম ঠাকুমা।’

এ কথা বলার পর সে নীহারের উদ্দেশে বলল, ‘আপনি মাস্টারমশাই! এখানে কেন এসেছেন? আমরা দু’জন ছাড়া অন্য কেউ তো এখানে থাকে না। কেউ আসেও না।’

নীহারের মিথ্যে বলার অভ্যাস নেই। তিনি সত্যিটাই বললেন, ‘এক কালে এক স্বনামধন্য দেশনায়ক এ বাড়িতে এসেছিলেন। বাড়িটা তাই দেখতে এসেছি।’

ছেলেটা শুনে বলল, ‘দেশনায়ক মানে যারা প্রতিবছর ভোট চাইতে আসে? কত পার্টির কত নেতাই তো ভোটের সময় আসে। কত প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়। কিন্তু কিছুই তো করে না ।’

অন্ধ যুবকটির কথা শুনে নীহার বললেন, ‘না না আমি তেমন কোনো লোকের কথা বলছি না। আমি এমন একজনের কথা বলছি যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে জীবন দিয়েছিলেন। তিনি একবার এ বাড়িতে রাত্রিবাস করেছিলেন। সে ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?’

প্রশ্ন শুনে অন্ধ সেই যুবক সখেদে বলল, ‘না জানি না। জানার দরকারও নেই। কি লাভ হল স্বাধীনতা পেয়ে? এত বছর পরও গরিব তো সেই গরিবই রয়ে গেল। এই যেমন আমরা দুজন। আমাদের কোনো থাকার জায়গা নেই। তাই এই ভাঙা বাড়িতে পড়ে আছি। আমাদের কেউ নেই। কোনোরকমে ট্রেনে ধুপ বিক্রি করে একবেলা খেয়ে বেঁচে আছি। দেশনেতা দেশ স্বাধীন করলেও আমাদের কি লাভ হয়েছে? উনি তো ফুলমালা পান। আর আমরা গরিবরা না খেয়ে মরি।’

সর্বকালের শ্রদ্ধেয় প্রয়াত দেশনেতার প্রতি স্পষ্টত ক্ষোভ ঝরে পড়ল অতি দরিদ্র অন্ধ যুবকটির কণ্ঠ থেকে। নীহার তবুও শেষবারের মতো বলার চেষ্টা করলেন, “তিনি কিন্তু সত্যি দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর নামটা যদি শোনেন…।’

কিন্তু তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এবার বৃদ্ধা বললেন, ‘তাঁর নাম শুনে আর কি হবে বাবা। দেখছই তো আমাদের অবস্থা। নইলে সাপ-খোপের সঙ্গে এই পোড়োবাড়িতে কেউ থাকে? নাতিটা আমার অন্ধ। আমিও প্রায় কিছুই দেখি না আজকাল। হয়তো অন্ধই হয়ে যাব কিছুদিনের ভিতর। ভাগ্যিস এই বাড়িটা ছিল। তাই কোনোমতে মাথা গুঁজে আছি।’

ছেলেটি হয়তো এরপর অনুমান করল যে একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে এমন কঠোরভাবে কথা বলা উচিত হচ্ছে না। তাই সে এরপর গলাটা একটু নরম করে বলল, ‘বাড়িটা দেখতে চাইলে ঘুরে দেখুন। বাড়িটা তো আর আমাদের নয়। তাই দেখতেই পারেন। কোনোদিন যদি বাড়ির মালিক এসে উপস্থিত হন তখন আমাদের কী অবস্থা হবে জানি না। এটাই আমাদের শেষ আশ্রয়।’

একথা বলার পর ছেলেটা আর তাঁর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখাল না। লাঠি ঠক ঠক করতে করতে বারান্দায় উঠে বৃদ্ধার হাত ধরে প্রায় অন্ধকার একটি ঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। বাড়িটার লাগেয়া গঙ্গা বক্ষে তখন সূর্য ডুবছে। খণ্ডহর বাড়িটার উঠোনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আশেপাশের ঘরগুলোকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন নীহার যে ঘরগুলির কোনো একটি একদিন আলোকজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সেই মহামানবের উপস্থিতিতে। কিন্তু ঘরগুলো বর্তমানে প্রায়ান্ধকার। আর তা ক্রমশ বাড়ছে। নীহারও এরপর ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলেন। নিজের বাড়ি ফিরে স্ত্রী সন্তানদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন যে তিনি সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিত ওই বাড়িতেই একদিন পদধূলি পড়েছিল দেশনেতার। আর তা জানাতে পরদিন সকালে সাক্ষাৎ করতে যাবেন চেয়ারম্যানসাহেবের সঙ্গে।

তিন

রাতে ভালো ঘুম হয়নি নীহারের। দেশনেতার স্মৃতি বিজতি বাড়িটা যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাঁর মনকে। আধো ঘুম আধো জাগরণের ভিতর সারারাত ধরে বাড়িটার কথাই ভেবেছেন তিনি। এ কথা সত্যি যে ওই বাড়িটি এই অখ্যাত, অকিঞ্চিৎকর মফস্সল শহরটিকে বিখ্যাত করে তুলতে পারে দেশে-বিদেশে। দেশনেতার সামান্য স্মৃতি নিয়ে তো উদ্বেল হয়ে ওঠে গোটা দেশ।

গৃহিণী আর সন্তানরা ইতিপূর্বে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি নীহারবাবুর লেখালিখি বা সাহিত্যচর্চা নিয়ে। কিন্তু এদিন নীহার বাড়ি থেকে বেরোবার সময় গিন্নি তাঁকে বললেন, ‘তুমি কিন্তু চেয়ারম্যানসাহেবকে ভালো করে বুঝিয়ে আসবে যে একমাত্র তোমার জন্যই সারা পৃথিবী এই বাড়িটা সম্পর্কে জানতে চলেছে।’

নীহার একথা শুনে বুঝতে পারলেন তাঁর সংবর্ধনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছেন তাঁর স্ত্রী। যা আত্মীয় পরিজন, পাড়া প্রতিবেশীর কাছে গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে তাঁদের। স্ত্রীর কথা শুনে মনে মনে হাসলেন তিনি ।

এদিন আর স্কুলে গেলেন না তিনি। একটা কাজ সেরে বেলা এগারোটা নাগাদ হাজির হলেন পৌরসভায়। অফিস সবে শুরু হয়েছে সেখানে। ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবুও তারই মধ্যে নীহারের আগমন বার্তা পেয়ে তাঁকে নিজের চেম্বারে ডেকে নিলেন চেয়ারম্যানসাহেব। নীহার তাঁর মুখোমুখি বসলে তিনি উৎসাহের সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘আপনি গেছিলেন ওই বাড়িতে?’

নীহার জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, গেছিলাম।’

চেয়ারম্যান উৎফুল্লভাবে বললেন, “কি দেখলেন? তাহলে আমি এগোতে পারি তো?’

জবাব দেওয়ার আগে নীহার একবার তাকালেন দেওয়ালে টাঙানো দেশনায়কের ছবিটার দিকে। মাথার উপর থেকে তিনি যেন উদগ্রীব ভরে দুজনের কথোপকথন শোনার জন্য চেয়ে আছেন! একটু চুপ করে থেকে তিনি চেয়ারম্যানকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমার মনে হয় এ ব্যাপারটা নিয়ে আর না এগোনোই ভালো। বাড়িটা থাকলেও বাড়ির নামের ফলকটা আর নেই। ও রকম স্তম্ভ, খিলানের সদর দরজাওয়ালা বাড়ি তো কতই ছিল সে সময়। ব্যাপারটা প্রমাণ করতে আপনার সমস্যা হবে। আর তাছাড়া…’

—‘তাছাড়া কি?’ প্রশ্ন করলেন চেয়ারম্যান ।

নীহার জবাব দিলেন, ‘গণেশ মূর্তিটা যদিও ভেঙেচুড়ে গেছে। আমাকে মার্জনা করবেন । আমি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলাম তাও। ছবির গণেশ মূর্তির সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে এক মনে হলেও আসলে সেটি আলাদা। যে কেউ ভালো করে পরীক্ষা করলেই তা বুঝতে পারবে।’

এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই হতাশায় চেয়ারম্যানসাহেবের চোয়ালটা যেন ঝুলে পড়ল।

বেশ কয়েক মুহূর্তর জন্য এক অপরিসীম নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই ঘরে। দেওয়ালের গা থেকে তাদের দিকে চেয়ে আছেন দেশনায়ক।

নীহারবাবুর উদ্দেশে শেষবারের জন্য মুখ খুললেন চেয়ারম্যান। তিনি বললেন, আপনি শিক্ষক। শিক্ষিত মানুষ। বইতে বিষয়টি লেখার সময় আপনার আরও দায়িত্ববান হওয়া প্রয়োজন ছিল। এবার আপনি আসতে পারেন।’

পৌরসভার বিল্ডিং ছেড়ে কলমলে আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালেন নীহার। তাঁর মনে হল তিনি যখন চেয়ারম্যানসাহেবকে কথাগুলো বলছিলেন ছবির ভিতর থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন দেশনায়ক। নীহারের বিশ্বাস এটাই তিনি চাইছিলেন। কারণ তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন ভারতের দেশবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান। মাথার উপর ছাদের, দু-মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করা। হতদরিদ্র অন্ধ ও বৃদ্ধ অসহায় দুটি মানুষের সামান্য বাসস্থান টুকু নীহার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে না দেওয়ায় নিশ্চিতরূপে খুশিই হয়েছেন তিনি। হয়তো বা সংবর্ধনা হাতছাড়া হয়ে যাওয়াতে তাঁর স্ত্রী-সন্তানরা কষ্ট পাবেন। কিন্তু দেশবাসী হিসেবে নীহারেরও তো কর্তব্য দেশনেতাকে শ্রদ্ধা জানানো। এভাবেই তিনি তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন সেই মহান দেশনায়কের প্রতি। ভগ্ন হলেও জীর্ণ হলেও ‘আশ্রয় কুটির’ ই যে দু’জন হতদরিদ্র অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়। আর এদের মতো মানুষের কথা ভেবেই তো দেশ স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন, নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশনায়ক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *