আত্মজীবনীর অংশ-১

আত্মজীবনীর অংশ-১

জীবন দলিল হয়ে উঠতে চায়। প্রায়শই লক্ষ করেছি, সে লিখিত রূপ দাবি করে। অন্তর থেকে অবিরাম তাগিদ সৃষ্টি করে চলে। সে এক প্রবল পীড়াদায়ক পরিস্থিতি। অস্থির হয়ে উঠি। নিজেকে ছিন্নভিন্ন করি কেবল। কিন্তু পরিত্রাণ নেই। পাঠক আজ আর আক্রান্ত হতে পছন্দ করে না। সে আলতো নাটকে জড়িয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজে থাকে। ইচ্ছাপূরণ হলেই তার সুখ। আর ধ্যানস্থ হই না। অভিজ্ঞতায় দেখেছি পর্যটকগণ নিরাপদ সি-বিচ পছন্দ করে। সমুদ্র পায়ের প্রান্তে এসে আদর করে যাবে, কখনওই উন্মত্ত হয়ে বিপন্ন করবে না৷ আমিও অতএব আমার উপন্যাসে গদ্যের নিরাপদ সি-বিচ নির্মাণ করতে চাই! প্রিয়জন আমাকে বার বার সাবধান করে, “খবরদার! অনেক হয়েছে। রিফিউজি জীবন-টিবন আর লিখিস না। ওই নস্টালজিয়ার মৃত্যু হয়েছে।”

সে এক চরম পরীক্ষা। নিজেকে বুঝিয়েছি কতশত। ভেবেছি, জখমে আলো ফেলবার দরকার নেই। তদুপরি, এটাও সত্য, জখম তো আমার নয়। সব ফেলে আমি আসিনি, আমি এই ভূখণ্ডেই জন্মেছি। কিন্তু কিছু কি মূল্য দিতে হয়নি? অন্যমনস্ক, স্বভাব-বিষণ্ণ, স্বপ্নবাদী মানুষগুলির অনিচ্ছুক সংসারে জন্ম হয়েছে। ফলত, আমিও অন্যমনস্ক। বন্ধুরা বলে থাকে, বিষণ্ণতা আমার অসুখ। আকাশকুসুম ভেবে ভেবেই আমার দিন কাটে। কিছুই হয়ে উঠলাম না। প্রেম প্রার্থনা করলাম, প্রেম থেকে পালালামও। নির্বিকার প্রকৃতি আমাকে ছাড়ল? কবে যেন চল্লিশের কোটায় পৌঁছে গেছি। যে বয়সে দায়িত্ব এসে ঘিরে ধরে। সমাজ প্রশ্ন করতে থাকে, “তুমি কী? তুমি কী? তুমি কেন? তুমি কেন?”

বিড়বিড় করি, “কিছু কি হতেই হবে?”

সে নাছোড়, “সবাইকেই কিছু না কিছু ভূমিকা নিতে হবে। নইলে চলবে কেন মানুষের গড়া এই সংঘ?”

ঝুল তর্ক করে থাকি। ক্রমশ উপলব্ধি হয়, তর্কে জিতবার উপায় নেই। দুনিয়া জুড়ে চলছে বিরাট কর্মকাণ্ড। কোটি কোটি মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চাহিদা ও জোগানের খেলা বানানো হয়েছে। চক্করে পড়তেই হবে। আমি অন্যমনস্ক-এর সন্তান আনমনা’ বললে কেউই মানবে না। জঙ্গল উধাও হয়েছে। অবশিষ্ট জঙ্গলটুকুতে সাধারণ মানুষের অধিকার নেই। সংবাদপত্রে পড়ি, জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা জঙ্গলের কাঠ কাটলে, শালপাতা কুড়ালে আইনভঙ্গ হয়ে থাকে অর্থাৎ, নিজের ইচ্ছায় বেঁচে থাকার উপায় নেই। কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেই হবে। শ্রম বিক্রি করতে হবে। বুদ্ধি বিক্রি করতে হবে। দাসানুদাস না হলে বিলুপ্ত হয়ে যাও—এটাই বর্তমান সভ্যতার মর্মবাণী।

আমার পিতৃ-মাতৃগৃহ নেই। অন্যের আশ্রয়ে থাকি। ধানাই-পানাই করে দিন কাটাই। প্রেমিকা নেই। সংসার নেই। কর্মব্যস্ত মানুষের লক্ষ নেই আমার মতো বাতিল মানুষের প্রতি, এটাই এক বাঁচোয়া। তবে কি আমি মুক্ত? সে আর বলি কী করে? স্মৃতি! স্মৃতি এসে আমাকে নিয়ত দংশন করে যায়। যে-ভাড়াবাড়িতে বাস করি তার সংশ্লিষ্ট মানুষরা অবসর পেলেই বিস্ময় প্রকাশের ছলে আমার অস্তিত্বকে পীড়া দিয়ে থাকে। যে-বাড়িগুলিতে যাতায়াত করি শিশুদের চিত্রাঙ্কন শেখানোর জন্য, যারা নামমাত্র মূল্য দেয় প্রতি মাসে, যেমূল্যে আমি ন্যূনতম জীবনযাপন করি, তারা ফাঁক পেলেই ঘেঁটি চেপে ধরে, “মাস্টারমশাই, আপনি এত কষ্ট করেন কেন? শুনেছি তো পড়াশোনায় ভাল ছিলেন!”

ম্লান হেসে পলায়ন করি। লেখাপড়ায় ভাল হবার সঙ্গে অর্থনৈতিক জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার কী সম্পর্ক? অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া পৃথক সংগ্রাম। তাতে ছল-চাতুরি আছে, নিষ্ঠুরতা আছে, একরকম ‘আমি’ থেকে অন্যরকম ‘আমি’ হওয়া রয়েছে। আমি এই প্রাণান্তকারী প্রচেষ্টার যোগ্য নই। অতএব, বাতিল হয়ে যাওয়ার নিয়তি মেনে নিয়েছি। বিপুল অবসরই আমার জীবনের অর্জন। নানা বিষয়ের গ্রন্থপাঠ করি। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াই। চারপাশের ইতিহাসের অলস সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকি, এটাই বা কম কী? ভেবে দেখেছি, বারো-তেরো বছর বয়সে বাবা যখন তাঁর বাবার হাত ধরে ভিখিরির মতো এই দেশে ঢুকেছিলেন, ১৯৪৮ সাল হবে তখন, সেই সময় থেকে তিনি এক হতভাগ্য সময়ের কুশীলব, আমার সৃষ্টিলগ্নের নায়ক তিনিই, তাঁকে বুঝলেই তবে আমাকে বোঝা যাবে, আমার অকর্মণ্যতা নিয়ে সমকালের প্রশ্নে অতএব নীরব থাকি। কোনও প্রশ্নেরই আকস্মিক উত্তর হয় না। তীব্র গতিতে ছুটতেছুটতে দিশাহারা মানুষের প্রশ্নগুলি তাৎক্ষণিক কৌতূহল, উত্তর জানবার জন্য তারা কি একবারও থমকাবে? এক মুহূর্তও সময় দান করবে? অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মাথা নিচু করবার আগেই প্রশ্নদাতা অদৃশ্য হয়েছে। ক্ষোভের আঁচ টের পাচ্ছেন? নিয়ত সংঘর্ষে জড়িয়ে রয়েছি, আমার দিক থেকে দু’-একটি ফুলকি উড়বে না? যাই হোক, এটা তো একপ্রকার পর্যালোচনা। যেমন ভেবেছি, তেমন জীবনযাপন করার চেষ্টা চালাচ্ছি। ক্লান্তও হয়েছি খানিক। তবু থামবার কি কোনও উপায় আছে?

ইদানীং নিজের নানারকম মৃত্যুদৃশ্য কল্পনা করে থাকি। গ্রন্থপাঠ করতে করতে আমার কল্পনার দোষ হয়েছে। সেই দৃশ্যেরই একটি। এক ভোরে মৃত্যু হয়েছে আমার। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। কেউ আসছে না, খোঁজ করছে না বলে আমার মৃত্যুর ঘটনাটিও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। মৃত অবস্থাতেই প্রচণ্ড ভয় পেলাম। এত একাকিত্ব! নতুন এক উপলব্ধি হল, কেউ জানতে না চাইলে যেমন বোঝা যায় না বেঁচে আছি কি না, তেমনই কেউ জানতে না-চাইলে টের পাওয়া যাবে না মরে গিয়েছি কি না। সংযোগ, বন্ধন তা হলে তো ভীষণ জরুরি। কিন্তু কার সঙ্গে সংযোগ করব? আমি চাইলেও তারা সাড়া দিতে রাজি হবে তো? সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি পত্রে পড়লাম, ইউরোপের একটি পার্কে পর পর কয়েক দিন একই স্থানে এক বৃদ্ধাকে নীরব বসে থাকতে দেখে কৌতূহলী ভারতীয় পর্যটকটি তাঁর সম্মুখে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “কেমন আছেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “তিন মাস পরে কেউ জিজ্ঞেস করল আমাকে, কেমন আছি আমি। তোমার প্রশ্ন শুনে আমার খুব ভাল লাগছে। আমি সুস্থ বোধ করছি।” তবে কি ওই একাকিত্ব এই সুদূর প্রাচ্যেও হানা দিতে আরম্ভ করেছে? অবশ্য, আমরাও তো এখন পরিবারভাঙা বিচ্ছিন্ন শ্রমিক মানুষ। সভ্যতার উন্নয়ন জন্ম দিচ্ছে এরকম বাইপ্রোডাক্ট—একাকিত্ব, অবসাদ। পশ্চিমে উন্নয়ন আগে এসেছে, পাশ্চাত্য সাহিত্যের একটি বড় উপাদানই তো বিষণ্ণতা আর অবসাদ। প্রাচ্য সাহিত্যে ছিল সম্পর্ক, মিলন-উৎসব। যা হোক, স্বপ্নবর্ণনায় ফিরে যাই। যখন কেউ আসছে না আমার খোঁজ করতে, ফলত চিহ্নিত হচ্ছে না আমার মৃত্যু, একটি পাখি এল। সুন্দর শিসে শুধাল, “হ্যাঁ গো, তুমি বেঁচে, না মরে?”

দু’চোখে আনন্দাশ্রু জমল আমার। রুদ্ধকণ্ঠে বললাম, “তুমি এসেছ, সকালবেলার পাখি?”

পাখি বলল, “বহুক্ষণ দেখছি পড়ে আছ। নড়ছ-চড়ছ না। কেউ আসছেও না তোমার কাছে। তাই উড়ে এলাম। তা তুমি বেঁচে আছ, না মরে গেছ?”

বললাম, “ঠিক বুঝতে পারছি না।”

পাখি জানতে চাইল, “তুমি কি মানুষের পৃথিবীতে একজন লেখক?”

বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। এই প্রশ্নের নিকটে আমি দুর্বল। বললাম, “মনে তো হয় না।”

পাখি—তোমার ভাড়াবাড়ির জানলা থেকে মাঝে মাঝে দেখি, ভোরে কী। সব লিখছ!

আমি—ও কিছু না। নিজেকে নিয়ে কাটাকুটি করি।

পাখি—সেসব বইয়ে ছাপা হয়?

আমি—ঠিক বুঝতে পারি না। আমার তো কল্পনার দোষ! কখনও ভাবি, শ্যামলদাদের লিটল ম্যাগাজিনে গল্প লিখেছি, ছোট উপন্যাস লিখেছি। কখনও ভাবি, কিছুই করিনি, ওসব আমার কল্পনাই হবে।

পাখি—ওরে বাবা! কীসব বলছ, তার মানে বোঝা ভার।

আমি—কেউই আমাকে বুঝতে পারে না।

পাখি—যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে। তা এটা তো বলবে অন্তত তুমি বেঁচে আছ, না মরে গেছ?

আমি—বেঁচে আছি বললে কী হবে?

পাখি—নিশ্চিন্তে নিজের কাজে চলে যাব। তুমিও তোমার কাজ করবে।

আমি—যদি বলি মরে গেছি?

পাখি—চেনা পাখিদের ডেকে আনব। বাগান থেকে ফুলের পরাগ ঠোঁটে করে এনে তোমার সারা শরীর সাজিয়ে দেব। মৃত্যুর একটা সম্মান আছে না? আর তোমার তো কেউ নেই, যে করবে।

চিৎকার করে উঠলাম তখন, “পাখি, আমি মরে গেছি, মরে গেছি, আমাকে সাজাও!” মিথ্যা সকল সময়েই চিৎকৃত হয়ে থাকে। পাখি উড়ে গেল! ঘুম ভেঙে আমি ছোট্ট ভাড়াঘরে সেই দিন থম মেরে বসে ছিলাম। এই ভাবেই দিন কাটছে। ভাবনার ভিতর মুহুর্মুহু পাল্টে যাচ্ছে আমার চরিত্র। কেউ আপস করে লিখছে, কেউ মরে যেতে চাইছে। কেউ বাড়ি-বাড়ি শিশুদের অঙ্কনশিক্ষা দিয়ে দেহধারণ করছে। কেউ ভাবছে নিজের জীবনের ইতিহাসের পূর্ব-অংশটুকু, এমনকী সমান্তরাল কিয়দংশের ব্যাখ্যাটুকু ভাল করে বুঝবে। দুর-ছাই করবেন তো করুন। সহজ জীবন পাইনি বলেই অধুনা আমি জটিল হয়েছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কী, আমি কেন, আমি কোথায়। কোনও উত্তরই সম্পূর্ণ হয় না স্বভাবত। উত্তর সকল সময়েই আংশিক। এ ক্ষেত্রে আংশিক উত্তর হল, আমি একজন বাতিল মানুষ। এই রচনায় একটি বেসুর হয়ে বাজব ঠিক করেছি, যা লেখক-জীবনের অনুতাপ-প্রসূত, এর বেশি ভেঙে বলার প্রয়োজন মনে করছি না। আপনার নাসিকাকুঞ্চন লক্ষ করছি, অধৈর্য হলে এটা একটা পরিচিত লক্ষণ বটে, কিন্তু সব উড়িয়ে দিয়ে তৃতীয় প্রশ্নটির উত্তরে যাচ্ছি। আমি কোথায়? হ্যাঁ, আমার কাহিনির প্রবেশমুখ এইখানেই নিহিত।

বর্তমানে আমি দাঁড়িয়ে আছি হাসপাতাল চত্বরের নিকটবর্তী একটি গলিরাস্তার অন্ধকারে। মফস্‌সল শহর হলেও আমাদের অঞ্চলের হাসপাতালটি যথেষ্ট বৃহৎ অবয়বের। বড় রাস্তার পাশে পুরনো বিল্ডিং। তার বিপরীতে নির্মিত হয়েছে নতুন সদন। পিছনের বিস্তৃত চত্বরে সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্তদের আলাদা একতলা ভবন। মাঝখানে ফাঁকা মাঠ রেখে কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসাভবন। দূরে নার্সেস কোয়ার্টার। আর ডাক্তারদের থাকবার জায়গা তো আধুনিক চতুর্থ তলবিশিষ্ট প্রাসাদ। শুনেছি এই একশো বিঘা জমিতে অতীতে অর্থাৎ স্বাধীনতার পূর্বে ছিল একটি সভা-ময়দান। এই অঞ্চলে প্রচুর মুসলমান বাস করত। তাদের ধর্মীয় সম্মেলন, প্রার্থনা সভা এইখানেই হত। বড় রাস্তার অপর পাড়ে ছিল কবরখানা, যা ক্রীড়াঙ্গনে পরিণত হয়েছে। এত সব রূপান্তরের কারণ, এই অঞ্চল থেকে মুসলমানেরা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে গিয়েছে। হিন্দু উদ্বাস্তুদের আগমনে আমাদের শহরটি হয়ে উঠেছে হিন্দুপ্রধান। যা হোক, সেই পার্ক আর মুসলমান স্বত্বাধিকারীদের দানে স্বাধীনতা-সংলগ্ন সময়ে হাসপাতালটি নির্মিত হয়। এখন প্রায় মধ্যরাত। এপ্রিলের পচা গরম। হাসপাতাল চত্বরে বেশ কিছু মানুষ রয়েছে, যাদের পরিচিত কেউ সংকটাপন্ন রোগী। রাত্রিজাগা মানুষদের জন্য একটি চায়ের দোকান খোলা আছে দেখছি দূর থেকে। সম্ভবত মানুষগুলির ভিতর আমার ভাই, তার বন্ধুবান্ধব রয়েছে। ওরা যে কারণে রাত্রি জাগছে, সেই একই কারণে ভাড়াবাড়ি না-ফিরে আমি চোরের মতন লুকিয়ে লুকিয়ে রয়েছি অন্ধকারাচ্ছন্ন এক গলিরাস্তায়, কাদের যেন বাড়ির সামনের বড় আমগাছের ছায়ায়। কারণটি হল, আমার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে গতকাল। বাড়িতে সেই যে তার জ্ঞান চলে গেছে আক্রান্ত হওয়া মাত্র, তা এখনও অবধি ফিরে আসেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থের প্রয়োজন হয়নি, ততক্ষণ জানতে পারিনি। বাতিল মানুষের কথা সঙ্গে সঙ্গে তো কারও মনে পড়ে না। ভাই একটি ছোট কাজ করে থাকে একটি ব্যবসাকেন্দ্রে। তাতে তারই ভাল করে চলে না। অতএব আজ সকালে ভাইয়ের এক বন্ধু এসে হাজির। তাকে আমি পাড়ার ছেলে হিসাবে চিনতাম একদা। বহু দিন নানা কারণে ওই পাড়ায় যাই না। অবশ্য আমার বর্তমান আশ্রয় বেশি দূরে না। তবু হরেক প্রশ্নের মুখোমুখি হবার ভয়েই নিজেকে অনুপস্থিত রাখি।

অজয় বলল, “দাদা, একবার অবশ্যই চলুন। খুব বিপদ।”

বিস্মিত হলাম, “কোথায় যাব? কী বিপদ?”

অজয় তড়িঘড়ি বলল, “জ্যাঠামশাই হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার নানারকম পরীক্ষা করতে দিয়েছে।”

শুনেই ভয় পেলাম। বাস্তব থেকে পালিয়ে আনমনা জীবন কাটাচ্ছি। কল্পনা-নির্ভর, অভিমান-নির্ভর, আজগুবি ভাব-নির্ভর জীবন আমার। বাস্তবের সামনে ধোপে টিকবে? মুহূর্তে চূর্ণ হয়ে যাবে। অকস্মাৎ টের পেলাম, আমি প্রায় কপর্দকশূন্য এক মানুষ। কাষ্ঠবৎ দাঁড়িয়ে থাকলাম অজয়ের সামনে।

অজয় ভাবল, আমি শোকাহত। আমার হাত ধরে বলল, “আপনি বড় ছেলে। ভেঙে পড়লে চলবে? আপনার কত দায়িত্ব!”

পায়ের নীচে মেদিনী বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে না কেন? বাবা যদি চলে যায়, একটা ইতিহাসের সাক্ষী অবলুপ্ত হবে। ইতিহাসটিকে অনুভব করা, তা লিপিবদ্ধ করা, আমার উপযুক্ত কাজ। বস্তুত, এইসব ভাবনাকে সম্বল করেই বেঁচে আছি। কিন্তু অর্থ কোথায় পাব এখন? অজয়কে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাই কোথায়?”

বলল, “ও তো দোকানে গেল। আমাকে পাঠাল আপনার কাছে। দোকানে না গেলে ওর মাইনে কাটা যাবে।”

কোনও উপায় রইল না। ফ্যালফ্যাল করে শূন্যে তাকিয়ে থাকলাম।

অজয় আবার বলল, “একবার বাড়ি ঘুরে যাবেন। জেঠিমা খুব কান্নাকাটি করছেন।”

বুক চমকিয়ে উঠল। কতকাল বাড়ি ছেড়েছি। সংসার থেকে নিজেকে অদৃশ্য করেছি। এটাই আমার সাধনা। শৈবসাধনা। কষ্ট সহ্য করবার সাধনা। সংসারের কাজে যখন লাগব না, তাদের বিব্রতও করব না। বারো বছরে একবারও বাড়ি ফিরিনি। রাস্তাঘাটে মা-বাবাকে অকস্মাৎ দুই-একবার দেখলেও অগ্রাহ্য করেছি। ওরাও তাই। ওদের ধারণা আমি বেইমানি করেছি। সর্বহারা মানুষের পক্ষে এরকম ভেবে নেওয়া অস্বাভাবিক না। তারা তো চাইবেই নতুন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে। সন্তানদের খাইয়ে-পরিয়ে পরিশ্রম করে মানুষ করেছে তো সেই আশাতেই।

যা হোক, ব্যাখ্যার মুহূর্ত এখন নয়। অজয়কে প্রশ্ন করলাম, “ডাক্তার কী বলছেন?”

অজয় বলল, “জ্যাঠামশাইয়ের মাথায় ব্লাড-ক্লট্‌ আছে বলে সন্দেহ করছেন। ইমিডিয়েট স্ক্যান করাতে হবে। তাছাড়া ইঞ্জেকশান লিখেছেন। গত সন্ধের ঘটনা। এখনও জ্ঞান ফেরেনি। ঠিকঠাক চিকিৎসাও হয়নি।” আর বাক্য বিনিময়ের প্রয়োজন নেই। সাইকেলে চেপে এক ছাত্রের বাড়ি চললাম। ছাত্রটির বাবা-মা শিক্ষিত। আমার প্রতি অন্যরকম ভালবাসা আছে বলেই মনে হয়। অসহায় মানুষকে ভালবেসে ফেলা, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রিয় কর্ম। অফিসে রওনা হবার আগেই নীলার্ণবের বাবাকে ধরলাম। সব খুলে বললাম। ঋণ চাইলাম। উনি বুঝলেন, অন্তত দু’ হাজার টাকা এখন আমার প্রয়োজন। যথেষ্ট বিনয় প্রকাশ করেই দিলেন। আমার গোপন অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। হাত পেতে টাকা ক’টি নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে চললাম। গেটের কাছে দাঁড়াতে বলেছি অজয়কে। অজয় ছেলেটি বোধহয় পরোপকারী স্বভাবের। দুই ছেলে যাচ্ছে না, সে আর একটি ছেলে জোগাড় করে রানাঘাটে বাবাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করল।

হাসপাতাল চত্বরেই সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাইভেট গাড়ি। অ্যাম্বুল্যান্স কখনওই পাওয়া যাবে না। যখনই খোঁজ পড়ে, তখনই দেখা যাবে তা মেরামতের জন্য গ্যারেজে গিয়েছে, অথবা বিরল ভাগ্যবান কোনও মানুষ তার চেনা রোগীকে অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে কলকাতার পথে যাত্রা করেছে। এসব কথা হাসপাতাল-চত্বরে কেবলই গুঞ্জরিত হয়। কিন্তু মানুষ সব মেনে নিয়েছে। কখনওই ক্ষোভে পরিণত হয় না তাদের আক্ষেপ। সকলে খুঁজতে থাকে বিভিন্ন ক্লাবের অ্যাম্বুল্যান্সগুলিকে। ইদানীং সর্বত্রই ক্লাবগুলির সেবামূলক বাণিজ্যের মনোভাব হয়েছে। বাবার ক্ষেত্রে কোনও অ্যাম্বুল্যান্সই জুটল না। অজয় আর আমি বৃথাই এখানে ওখানে ছুটে মরলাম। অবশেষে প্রাইভেট গাড়িই ঠিক করা হল। অজয় আর তার বন্ধু হাসপাতালের ভিতর ঢুকে বাবাকে স্ট্রেচারে তুলে আনল। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখামাত্র হাঁফাতে লাগলাম। কী এক তোলপাড় শুরু হল মনে। মুখোমুখি হওয়ার সাহস উধাও হল। অভাবিত জীবন আমাকে তাড়া করল। আড়ালে চলে গেলাম।

একটু সময় পর অজয় আমাকে মর্গের কাছে আবিষ্কার করল, বলল, “দাদা, আপনি এখানে? এটা কী একটা দাঁড়াবার জায়গা? গন্ধ পাচ্ছেন না?”

আমার মুখ থেকে বাক্য সরল না। অজয়ের অনুগমন করলাম। ভাড়া নেওয়া গাড়ির অদুরে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অজয় লক্ষ করল। বলল, “জ্যাঠামশাইকে একবার দেখবেন না?”

অসহায় কণ্ঠে বললাম, “অজয়, আমি সহ্য করতে পারব না। তোমার কাছে আমি ঋণী থাকলাম। এই দু’ হাজার টাকা রাখো। এতে হবে না?”

অজয় টাকাটা নিল মাথা নেড়ে। একটু হেসে বলল, “আচ্ছা, আমরা বেরোলাম। আপনি চিন্তা করবেন না।”

এটা ছিল বেলা সাড়ে বারোটার ঘটনা। পাঁচটার ভিতরেই অজয় বাবাকে নিয়ে ফিরেছিল। তার সঙ্গের ছেলেটি আসেনি। রিপোর্ট নিয়ে ট্রেনে ফিরবে। সে আরও দু’ ঘণ্টার ব্যাপার। বাবার জ্ঞান ফেরেনি। বাবা কিছুই বুঝতে পারছে না যে তাকে নিয়ে কী কাণ্ড চলছে!

দুপুরে ভাড়া ঘরে ঢুকে শূন্যমানুষ হয়ে পড়েছিলাম। উথাল-পাথাল হচ্ছিল ভিতরে। এক ধরনের ভয় হল, যা শৈশবের গন্ধ বহন করছে। বিড়ি শ্রমিকের পাশাপাশি বাবা সরকারি অফিসে ঠিকা শ্রমিকের কাজ করত প্রথম দিকে। বছরে এক-আধবার সেই রাত আসত, যে রাতে বাবা বাড়িতে থাকবে না। নদীর উপরে ছিল কাঠের সেতু। বাবাদের অফিস সেতুটির দেখভাল করত। কাঠ পালটাতে হবে বা অন্য মেরামত প্রয়োজন, তখন মধ্যরাত্রিকেই বেছে নেওয়া হত। প্রধান সড়কে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। রাতে সেতুটি ব্যবহার করতে নিষেধাজ্ঞা রাখলে সাধারণ মানুষের সুবিধা হত। তখন গাড়িঘোড়াও কম ছোটাছুটি করে। রাতভর বাবা সেতু মেরামতে ব্যস্ত থাকত। বাড়ি ফিরতে পারত না। সেই রাত্রিগুলিতে আগে থেকেই অদ্ভুত এক ভয় করত। বাবা থাকবে না! বাবা থাকবে না! মা-কেও দেখতাম একটু অস্বাভাবিক। সেই রাত্রে শিয়াল বেশি ডাকত। বাড়ির চারপাশে ভূতেরা বেশি হাঁটত, মেঘ বেশি গর্জন করত। বহু দিন বাবা না-থাকবার ভয়টি জীবনে টের পাইনি। পরবর্তীতে তো বাবা-বিষয়টাকেই সহ্য করতে পারতাম না। অথচ, এতকাল পর, ভাড়াঘরে, দুপুরবেলায়, সেই বুক ঢিপঢিপ ভয়টি কোথা থেকে হাজির হল। খুব ভয় পেলাম, খুব ভয়। রাতে হাসপাতালে গিয়ে অজয়ের কাছে যখন রিপোর্ট শুনলাম, ভয় আরও বেড়ে গেল। বাবার মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ডাক্তার গম্ভীর হয়ে আছেন।

অজয়কে ছেড়ে আমি হাসপাতালের পিছনে অন্ধকারে মিশে গেলাম। অচেতন বাবাকে নিরালায় বুঝি ডাকলাম, “বাবা, বাবা, ফিরে এসো।” পরক্ষণেই খুব লজ্জা হল আমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *