অধ্যায়-১৩ – অবিচল অবস্থার তত্ত্ব

অধ্যায়-১৩ – অবিচল অবস্থার তত্ত্ব

মহাবিশ্বের নন-স্ট্যান্ডার্ড মডেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি হল ‘অবিচল বা স্থির অবস্থার তত্ত্ব’। এই তত্ত্বটি অতীতে অনেক মতানৈক্যের জন্ম দিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি এই মতানৈক্য মহাজাগতিক বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণই ছিল। ফলস্বরূপ অনেক আগ্রহ জন্মেছিল। এমনকি এই মতানৈক্যের বিষয় বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণায় উদ্দীপিত করেছিল। ফলে সৃষ্টিতত্ত্বে এবং নভো পদার্থবিদ্যায় সাধিত হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

অবিচল অবস্থার তত্ত্বটি যৌথভাবে পেশ করেছিলেন এইচ. বন্ডি এবং টি. গোল্ড। একই বছরে (১৯৪৮) এককভাবে পেশ করেছিলেন ফ্রেড হোয়েল। বন্ডি- গোল্ডের এবং হোয়েলের অভিগমনে ভিন্নতা ছিল, কিন্তু অন্তিম ফলাফল ছিল একই। বন্ডি এবং গোল্ড তাঁদের তত্ত্বে পৌঁছতে মহাজাগতিক অনুমানগুলোকে পরিবর্তন করেছিলেন আর ফ্রেড হোয়েল করেছিলেন আইনস্টাইনের সমীকরণগুলোকে।

তৃতীয় অধ্যায়ে আমি একটি মহাজাগতিক মূলনীতি উল্লেখ করেছিলাম। এই নীতি অনুসারে মহাবিশ্ব যে কোনও প্রদত্ত সময়ে সর্বত্র সমভাবে বিন্যস্ত এবং আইসোট্রপিক। তত্ত্ব বলে মহাবিশ্ব সময়ের মধ্যে বিবর্ধিত। অন্যকথায়, মহাবিশ্ব তার ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান হতে পারে। বন্ডি এবং গোল্ড এই মহাজাগতিক মূলনীতিকে সম্প্রসারিত করেন। এই সম্প্রসারিত নীতি ‘পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক নীতি’ নামে পরিচিত হয়। তাঁদের এই নীতি বলে মহাবিশ্ব যে কোনও প্রদত্ত সময়ে সর্বত্র সমভাবে সজ্জিত ও আইসোট্রপিক এবং গড়পড়তায় যে কোনও সময়ে একই রকম মনে হয়। এই পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক নীতি অনুসারে মহাবিশ্বে সামগ্রিকভাবে কোনও বড়ো পরিসরের পরিবর্তন হয় না। বিশেষত এই মডেলে ‘বিগ ব্যাং’ এর অস্তিত্ব নেই কারণ মহাবিশ্ব বর্তমানের মতই সব সময়ে একই অবস্থায় আছে। অবশ্যই মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষণকৃত প্রসারণের সঙ্গে এই মডেলটিকে মিলাতে হবে। এখন যেহেতু গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তাই বস্তুর গড় ঘনত্বও কমে যায়। এই বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক নীতির পরিপন্থি। কারণ ঘনত্ব পরিমাপের মাধ্যমে আমরা বলতে সক্ষম যে, মহাবিশ্বের কোনও অধিযুগে আমরা রযেছি। অবিচল অবস্থার তত্ত্ব স্বীকার করে নেয় যে, মহাবিশ্বের সর্বত্র অবিরত পদার্থের সৃষ্টি হয়। আর পদার্থের সৃষ্টি হয় পার্থিব মানদণ্ড অনুসারে খুব অল্প পরিমাণে। যে পরিমাণ বস্তু সৃষ্টি হলে অবিচল অবস্থা বজায় থাকবে তা নির্ভর করে মহাবিশ্বের বর্তমান ঘনত্ব এবং হাবল ধ্রুবকের ওপর। কিন্তু একটি যুক্তিসংগত পরিমাণ হতে পারে ৪.৫×১০^-৪৫ কিলোগ্রাম/ঘনমিটার/সেকেন্ড অর্থাৎ তিন দিকেই ১ মিটার লম্বা পার্শ্ব বিশিষ্ট একটি ঘন বাক্সে ১ কিলোগ্রাম বস্তু পেতে আমাদেরকে ৭×১০^৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে। যদিও বস্তুর এই অবিরাম সৃষ্টি পদার্থবিদ্যার ভর শক্তির সংরক্ষণ সূত্রকে লঙ্ঘন করে তবে তা অতি নগণ্য যা পরিচিত পরীক্ষণগুলোর পরিপন্থি নয়। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, বস্তুর সৃষ্টির এই বিষয়টি আদর্শ মডেলেও ঘটে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিগ ব্যাং এ বস্তু কোথা থেকে এসেছিল? সুতরাং বস্তুর এই অবিরাম সৃজন শক্তির সংরক্ষণশীলতাকে বিভ্রান্ত করলেও অবিচল অবস্থাকে প্রত্যাখ্যানের কারণ নিজে বস্তুর সৃষ্টি নয়। অবিচল অবস্থার তত্ত্বের পরিপন্থি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ থেকে আসে।

বস্তুর অবিরাম সৃষ্টি ভর-শক্তির সংরক্ষণশীলতার সূত্রকে লঙ্ঘন করে এই বিষয়টি ফ্রড হোয়েল এড়িয়ে যান। কিন্তু তিনি তাঁর অবিচল অবস্থার তত্ত্বের গঠনে মহাবিশ্বে ঋণাত্মক শক্তির আধারের ব্যয় মেনে নিয়েছিলেন। দেখানো যেতে পারে যে, এই ঋণাত্মক শক্তির আধার বস্তুর ক্রমাগত সৃষ্টিকে পরিচালিত করে। আর বস্তুর এই সৃষ্টির হার সমন্বিত হতে পারে একটি অপরিবর্তনশীল মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে।

অবিচল অবস্থার তত্ত্বকে অগ্রাহ্য করার মূল কারণ হচ্ছে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ। যেমনটি তৃতীয় অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল যে, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ থেকে বোঝা যায় মহাবিশ্ব প্রাথমিক পর্যায়ে একটি উত্তপ্ত ও অতি ঘন অবস্থা পার হয়ে এসেছে। এই বিষয়টি অবিচল অবস্থার তত্ত্বের পরিপন্থি যেখানে অবিচল অবস্থার তত্ত্ব বলে মহাবিশ্ব সব সময় একই রকম অবস্থায় রয়েছে। এখানে অবিচল অবস্থার কাঠামোর মধ্যে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণকে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা করা হল। উদাহরণস্বরূপ, যদি দেখানো যেতে পারে যে, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ আদিম নয়। এই বিকিরণ কোনও উৎস থেকে উৎপন্ন হয়। যে উৎসগুলো অপরিবর্তনশীল মহাবিশ্বে অতীতে বিরাজমান ছিল এবং বর্তমানেও আছে। সুতরাং দেখা যায় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে মহাবিশ্ব উত্তপ্ত ও ঘন ছিল না এবং এই বিকিরণের বিষয়টি অবিচল অবস্থার বিরোধিতা করে না। কিন্তু এই রীতিতে মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা সফল হয় না।

কোয়েসার থেকে অবিচল অবস্থার তত্ত্বের বিপক্ষে আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় (সপ্তম অধ্যায়ে কোয়েসার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল)। এখানে ইঙ্গিত রয়েছে যে, বর্তমানের চেয়ে অতীতে অনেক বেশি সংখ্যক কোয়েসার ছিল। এই বিষয়টি নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্ব সে সময় থেকেই বিকশিত হয়েছে যখন কোয়েসারগুলো সংখ্যায় অধিক ছিল। সুতরাং বিষয়টি অবিচল অবস্থার বিরুদ্ধে যায়।

যদিও অবিচল অবস্থার তত্ত্বে সময়ের সঙ্গে মহাবিশ্ব গড়পড়তায় পরিবর্তিত হয় না তবু নক্ষত্রদের জন্ম এবং মৃত্যু হয়। যেমন গ্যালাক্সিগুলো বিলুপ্ত হয় তেমনই গ্যালাক্সিদের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে নতুন গ্যালাক্সির জন্ম হয়। এক্ষেত্রে ফাঁকা স্থানে নতুনভাবে বস্তুর সৃষ্টি হয়। অবিচল অবস্থার মহাবিশ্বে জীবন ও সভ্যতা সম্ভবত চিরকালই অস্তিত্বমান থাকবে যেহেতু এই মহাবিশ্বে পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তির উপযোগ থাকবে। অবিচল অবস্থার তত্ত্ব মহাবিশ্বের উৎসের বিষয়টিকেও বদলে দেয় : মহাবিশ্ব যেমন আছে ঠিক তেমনই এটি একই অবস্থায় থাকতে পারে। এই অবিচল বা স্থির অবস্থার তত্ত্ব অনেকের কাছে নান্দনিক ও দার্শনিকভাবে প্রীতিকর। আবার কারও কাছে এটি কোনও সঠিক মডেল নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *