২.২ বিবাহান্তর কর্তব্য

নব বধূর প্রতি কর্তব্য
নববধূর প্রতি অবশ্যই পালনীয় কতকগুলি কর্তব্যের নির্দেশ করা হয়েছে আমাদের শাস্ত্রে। শাস্ত্রমতে সেগুলি অতি অবশ্যই পালন করা উচিত।
এখানে একে একে সেগুলি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
১। নববধূ বাড়িতে প্রথম পদার্পণের পর প্রতিটি পরিজন তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা উচিত। এটি মনে রাখতে হবে, যেরকম তাকে দেখান হবে, তেমন আচরণ সে করবে। তাকে যদি প্রত্যেকে ভালবাসে, সেও প্রত্যেককে ভালবাসবে।
২। নববধূকে জোর করে বা হুকুম করে কোনও কাজ করাতে নেই। তাতে পরিবারের বা স্বামীর গৃহের প্রতি তার একটা বিরক্তির ভাব জন্মায়।
৩। নববধূ ইচ্ছা করে যদি কিছু কাজকর্ম সখ ক’রে নিজের হাতে তুলে নেয় তাতে কোন বাধা দিতে নেই। তাতে তার মনে দুঃখ বা ব্যথা লাগতে পারে।
৪। নববধুর প্রতি তার স্বামীর খুব ভদ্র ভ্যবহার করা উচিত। এটা অবশ্য মনে রাখা কর্তব্য, স্বামীর ভালবাসাই বিবাহিতা নারীর জীবনে সবচেয়ে বেশী কাম্য। তাতে স্বামীন আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত হলে কিছুতেই তার মনে শান্তি আসতে পারে না।
৫। নববধূ পিতামাতার স্নেহের আলয় ছেড়ে স্বামীগৃহে পদার্পণ করেছে একথা মনে রাখা উচিত। বিবাহের আগে সে পিতামাতাকে খুব ভালবাসত একথা অস্বীকার করা যায় না, তাই পিতামাতার নিন্দা তার কাছে মোটেই ভাল লাগে না- এতে সে মনে আঘাত পায়। তাই বিবাহিতা নববধূর সামনে কখনও তার পিতৃগৃহের নিন্দা করা উচিত নহে।
৬। ছোটখাটো আর্থিক বা ঐ ধরণের সামান্য বিষয় নিয়ে কখনও নববধূর মনে আঘাত দেওয়া উচিত নয়। এই কথা তুলে তার পিতাকে ছোট প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা কোনও মতেই উচিত নয়। এই ধরনের আলোচনা সর্বদা বর্জনীয়।
৭। আদর, সোহাগ, প্রীতি ও সেই সঙ্গে শ্বশুর গৃহের প্রকৃত অবস্থার বিষয়ে নববধূকে জ্ঞান দান করা কর্তব্য। নববধূ যদি স্বামীর প্রকৃত অবস্থা বোঝে, তবে সে নিশ্চয়ই প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা করবে।
৮। নারীর কোমলতা, প্রেম, অভিমান এগুলি যে নারীর সহজাত বৃত্তি- নববধূকে তা বলা উচিত নয়।

নববধূর বিশ্বাস উৎপাদন
স্বামী কি করে নববধূর বিশ্বাস উৎপাদন করবে, এ বিষেয়ে শাস্ত্রে যা বলা হয়েছে তা হচ্ছে-
১। স্বামী কখনও বাড়ির সম্বন্ধে কোনও মিথ্যা কথা নিজে নববধূকে কিছুতেই বলবে না- এটা অত্যন্ত অন্যায় এবং এর ফলে পরে সে বধূর কাছে ছোট হয়ে যায়।
২। স্বামী তার ব্যবহারের মধ্যে কোনও সময়েই স্ত্রীর প্রতি সহসা কামভাব প্রদর্শন করবে না।
৩। ধীরে ধীরে স্ত্রীর সঙ্গে নানা কথা বলে আনন্দ করবে এবং তার ফাঁকে ফাঁকে নিজের প্রকৃতি, বুদ্ধি ও সংযমের পরিচয় দেবে।
৪। প্রয়োজন হলে নববধূর প্রশংসা করবে- তার ব্যবহার, কথাবার্তা, রূপ-গুণের প্রশংসা করবে।
৫। নববধূ তার প্রতি ধীরে ধীরে আকৃষ্টা হ’লে, তা প্রকাশিত হবে তার ব্যবহার ও রতি-প্রকৃতিতে। তা না হলে জোর করে স্বামী যৌন আকর্ষণ বা দৃঢ়তা দেখাবে না।
৬। নববধূ নিজে থেকে প্রেম ও প্রীতি প্রকাশ করলে তার মন বুঝে স্বামী তার প্রতি চুম্বন, আলিঙ্গন ইত্যাদি ধীরভাবে করতে পারে, তবে দেখতে হবে সে তা চায় কিনা।
৭। নববধূ বিমুখ হলে তার প্রতি কখনও রূঢ় আচরণ বা কর্কশ বাক্য ব্যবহার করবে না।
৮। প্রয়োজন হ’লে বধূকে প্রসন্ন করার জন্যে তার কাছে সব নিজেকে নিচু করবে। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে- কোনরকম রূঢ়তা ও কর্কশতা সর্বদা পরিত্যাজ্য।
৯। যখন নববধূ চুম্বন নেবে তারপর আলিঙ্গন ও ধীরে ধীরে তার সম্মতি নিয়ে মিলনের কথা উঠতে পারে।
১০। নববধূর যদি প্রথম ঋতু না হয়ে থাকে, কদাচ মিলন উচিত নয়। নারী ঋতুমতী হবার আগে পর্যন্ত সে কখনও মিলনের উপযুক্তা হয় না।
এখানে একটা কথা।
আজকাল অধিকাংশ বিয়েই হয় নারীর ঋতুর পর-কিন্তু বাৎস্যায়নের আমলে তা হতো না।
উপরের নিয়মগুলি পালন না করলে বালিকার মনে স্বামীর প্রতি ঘৃণা বা বিরক্তির ভাব জাগতে পারে- তাতে দাম্পত্য জীবন কখনও সুখের হয় না।

যৌবনাগমন ও মাসিক ধর্ম
নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনেই বিভিন্ন সময়ে যৌবনের সঞ্চার ঘটে থাকে। তবে যৌবন আগমন উভয়ের ঠিক একই সময়ে ঘটে না- বিভিন্ন সময়ে ঘটে।
নারীর যৌবন আগমন ঘটে আগে- পুরুষের ঘটে কিছু পারে।
গ্রীষ্মপ্রধান দেশে পুরুষের যৌবন আগমন ঘটে আঠারো থেকে কুড়ি বছরের মধ্যে। শীতপ্রধান দেশে- অর্থাৎ ভারতের বহির্দেশে যুবকদের যৌবন আগমন ঘটে বাইশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সে।
নারীর যৌবন আগমন ঘটে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে চৌদ্দ থেকে ষোল বছর বয়সে- আর শীতপ্রধান দেশে আঠারো থেকে কুড়ির মধ্যে।

যৌবন ধর্মের তালিকা
শীতপ্রধান দেশে যৌবন আগমন
পুরুষ- ২২-২৫
নারী- ১৮-২০

গ্রীষ্মপ্রধান দেশে যৌবন আগমন
পুরুষ- ১৮-২০
নারী- ১৪-১৬

শীতপ্রধান দেশে যৌবন নিরোধন
পুরুষ- ৬৫-৭০
নারী- ৫০-৫৫

গ্রীষ্মপ্রধান দেশে যৌবন নিরোধন
পুরুষ- ৫৫-৬০
নারী- ৪৫-৫০

পুরুষের যৌবন আগমনের লক্ষণ
অবশ্য মাঝে মাঝে উপরের প্রকৃতিগত নিয়মেও ব্যতিক্রম দেখা যায়।
পুরুষের যৌবন আগমন বিভিন্ন লক্ষণের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে।
যেমন-
(১) কষ্ঠস্বর ভারী হয়।
(২) গোঁফের মধ্যে রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
(৩) বগলে ও বসি-দেশে লোম দেখা যায়।
(৪) তাদের দেহের মধ্যে বীর্য্য বা শক্তি সৃষ্টি হয়।
(৫) মানসিক পরিবর্তন ঘটে।

নারীর যৌবন আগমনের লক্ষণ
নারীর যৌবন আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তার দেহে যে সব চিহ্ন ফুটে ওঠে তা হলোঃ- তাদের দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন।
১। দেহে নারী-সুলভ কমনীয়তা ফুটে ওঠে।
২। হাত, পা, জঙ্ঘন, নিতম্ব ইত্যাদিতে মেদ জমে ওঠে।
৩। বক্ষদেশ উন্নত হ’য়ে ওঠে।
৪। মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়।
৫। প্রায় আঠাশ দিন অন্তর মাসিক বা ঋতুস্রাব হয়ে থাকে।
এই ঋতুস্রাব হলো নারীর যৌবন আগমনের সবচেয়ে বড় চিহ্ন।

মাসিক বা ঋতু
নারীর যৌবন আগমনর থেকে যৌবনের সীমা পর্যন্ত এই সময়ে প্রতি আঠাশ দিন অন্তর নারীর যোনি থেকে কিছুটা রক্ত ও শ্লেষ্মা বেরিয়ে আসে। একই বলা হয় মাসিক বা ঋতু।
বাৎস্যায়ন বলেন- এই ঋতু নারীর বিবাহের সূচনা বোঝায়।
বাৎস্যায়নের মত বিবাহের সূচনার সময়, ঋতুস্রাবের ঠিক প্রারম্ভে। কিন্তু আজকাল ও বিধান প্রাই মানা হয় না- কারণ ভারত সরকার আঠারো বছরের আগে কোনও নারীর বিবাহ অসিদ্ধ বলে ঘোষনা করেছেন।

ঋতুর সময়ে বিভিন্ন সতর্কতা
ঋতুমতী নারীর সময় বা ঐ সময়ের পরে কতকগুলি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য। তা না হলে তার দৈহিক ও মানসিক নানা প্রকার ক্ষতি হ’তে পারে। এ বিষয়ে এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হচ্ছে।
ঋতু যে একটি সাধারণ বস্তু নয়, তা আমাদের ভারতীয় সব শাস্ত্রকারদের বেশ জানা ছিল- তাই তাঁরা এটা মেনে চলতেন সব সময়ে।
শাস্ত্রের ভাষায়ঃ-
ঋতুমতী যদা নারী চণ্ডালী প্রথমেহনি।
পাপীয়সী দ্বিতীয়ে চ তৃতীয়ে নষ্টরূপিনী ॥
উপস্বিনী চতুর্থে চ লাতা চৈব বিশুদ্ধতি।
প্রথমেহ হ্নি অগত্যা চ গমনে জীবন ক্ষয় ॥
দিনভেদে ঋতুমতী নারীর বিভিন্ন নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় শাস্ত্রে। নারীর ঋতু হলে তিন দিন কোন নারীকে কি নামে ডাকা হয় এবং তার প্রকৃতি কি হয় তা বলা হয়েছে।
যেদিন নারী জাতি প্রথম ঋতুমতী হয় সেদিন সে চণ্ডালিনীসদৃশা হয়ে থাকে। তেমনি দ্বিতীয় দিনে সে হয় মহাপাপীয়সী, তৃতীয় দিনে হয় নষ্টরূপী, চতুর্থ দিনে সে হয় উপস্বিনীসদৃশা। চতুর্থ দিনে নারী যথাবিধি স্নান করলে সে পবিত্রা হয়ে থাকে।
ঋতু হলে প্রথম দিন নারী স্পর্শ করবে না। সেই দিন উপগত হ’লে পরমায়ু হ্রাস হ’য়ে থাকে। যদি দ্বিতীয় দিনে নারী গমন করা হয় তাহলে সেই পুরুষকে মহাপাপে লিপ্ত হতে হয়।
তৃতীয় দিনেও নারীকে পরিত্যাগ করা উচিত। সেই দিন নারীকে স্পর্শ করলে সেই নারী বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করে এবং সেই পুরুষকেও বেশ্যাগমনজনিত পাপে লিপ্ত হ’তে হয়। চতুর্থ দিনে নারী স্নান করে বিশুদ্ধা হলে তারপর তাকে স্পর্শ করবে।

ঋতুকালীন নিয়ম
শাস্ত্রের এই কথাগুলির মধ্যে যে কতটা বাস্তবতা প্রচ্ছন্ন আছে তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। তারপর ঋতুকালীন বিভিন্ন বিষয়ের ফলাফল বলা হচ্ছে।
(ক) ঋতুর পরই নারীর জরায়ু থাকে নরম ও সংবেদনশীল। ঐ সময় কোন ব্যায়াম, দৌড় ঝাঁপ, ছুটাছুটি, লাফালাফি করা উচিত নয়।
(খ) ঋতুর সময় নিয়মিতভাবে দৈহিক বিশ্রাম অবশ্য কর্তব্য। তাই আমাদের দেশে ঋতুর সময় তিন দিন পূর্ণভাবে নারীর অশৌচ পালন করা হয়ে থাকে। এর অর্থ আর কিছুই নয়। এই তিন দিন বিশেষ ভাবে গৃহকর্ম থেকে নারীকে বিশ্রাম দেওয়া কর্তব্য।
(গ) ঋতুর সময় ঋতুস্রাব মুছে ফেলার জন্যে বা রক্ত শুষে নেবার জন্যে অনেকে অত্যন্ত ময়লা কাপড়ের টুকরো ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে এটি যে কত বড় ভুল জিনিস এবং এর জন্যে যে কতটা অনিষ্ট হতে পারে এটি তারা গভীরভাবে দেখবার অবসর পান না।
যদি কাপড়ের বা কার্পাস তুলোর টুকরোতে কোন রোগের বা দুরারোগ্য ব্যাধির জীবাণু থাকে তবে তা যোনিনালী দিয়ে দেহের ভিতরে প্রবেশ করবে।
এর ফলে জরায়ু বা গর্ভাশয় কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হ’তে পারে। এজন্য অনেক সময় ধনুষ্টংকার বা রতিজ রোগ বা অন্য কোন রোগ হতে পারে। ঋতুমতী নারীর তাই এ বিষয়ে সাবধান থাকা একান্ত প্রয়োজন। ঋতুমতী নারীর উত্তর ধৌত কার্পাস বস্ত্র ব্যবহার করা উচিত।
(ঘ) ঋতুর সময় কখনও শরীরে ঠান্ডা লাগান উচিত নয়-রাত্রি জাগাও উচিত নয়। ঐ সময় শরীর দুর্বল থাকে। সহজেই ঠাণ্ডা লাগতে পারে। রাত জাগলেও শরীরের ক্ষতি হতে পারে।
(ঙ) ঋতুস্রাবের সময়ে পরিষ্কার কার্পাস টুকরো বা সাবান গরম জল ইত্যাদি দ্বারা পচা কাপড়ের টুকরো যোনিতে ব্যবহার করা উচিত।
(চ) ঋতুস্রাবের সময় অন্ততঃ তিন চার দিন কোন পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলনে ব্রতী হওয়া উচিত নয়। তাতে জরায়ু কোন না কোন ভাবে আহত হতে পারে। তার ফলে নানা ক্ষতি হতে পারে।
(ছ) ঋতু কালীন মাটির পাত্রে জলপান, কঠোর বিছানায় শয়ন করা উচিত। এ সময়ে চুলে তেল দেওয়া, গন্ধ দ্রব্য বা সুগন্ধি বস্তু ব্যবহার করা উচিত নয়। এ সব পর্যন্ত শাস্ত্রীয় মতে নিষিদ্ধ।
(জ) যদিও আজকাল ও সব নিয়ম পালন করা হয় না। তবু এগুলি পালন করা উচিত। তার কারণ ঋতুকালে এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে নারী কামাতুর হয়ে সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *