১.১৭ বিবাহেতর যৌনমিলন

বিবাহেতর যৌনমিলন

উহার প্রসার

স্বামী-স্ত্রীর যৌনমিলন স্বাভাবিক এবং সমাজসিদ্ধ। অপর নর ও নারীর মধ্যে যৌনমিলন স্বভাবসিদ্ধ হইলেও উহাকে বিবাহেতর যৌনমিলন বা ব্যভিচার বলা হয়। এইরূপ যৌনসম্পর্ক ধর্ম, নীতি ও অবৈধ বলিয়া গণ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু তথাপি উহা সকল সময়েই এবং সকল সমাজেই ব্যাপকভাবে বর্তমান রহিয়াছে। প্রফেসর ব্রুনো মেয়ার (Bruno Meyer) বলেন যে, অর্ধেকের বেশী সংখ্যক যৌনমিলনই আজকাল বিবাহেতর হইয়া থাকে।

কারণ সমুহঃ

(১) যৌনবোধের তীব্রতা নর ও নারীর পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক ও দুর্নিবার আকর্ষণ। এই আকর্ষণের মূল কারণ জরায়ু ও ডিম্বের প্রতি শুক্রকীটের আকর্ষণ। পরীক্ষাগারে দেখা গিয়াছে যে, শুক্রকীট শুক্ররসে ভাসিয়া বেড়ায় ও এদিক ওদিক চলিতে থাকে। নর বা নারীর শরীরের অন্য কোনও অংশ উহাদের সন্নিকটে স্থাপন করিলে উহাদের গতিবিধির কোনও রকম ব্যতিক্রম হয় না। কিন্তু নারীর জরায়ু বা ডিম্বকোষের কোনও অংশ কাছে রাখিলে তাহার দিকে চুম্বকাকৃষ্ট লৌহের মত শুক্রকীটগুলি ধাবমান হয়। উহাদের আধার অর্থাৎ পুরুষের স্ত্রীলোকের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া শুক্রকীটের জরায়ু বা ডিম্বের প্রতি ঐরূপ আকৃষ্ট হওয়ারই অনুরূপ। সুতরাং ইহা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নহে যে সমাজশাসন, ধর্মশাসন, আইনের ভয় বা নরকের ভীতি সত্ত্বেও যৌনমিলন সম্বন্ধে মনুষ্য সৃষ্টি বিধিনিষেধ নরনারীর পারস্পরিক আকর্ষণরূপ প্রাকৃতিক নিয়মের কাছে প্রতিনিয়ত পরাভূত হইতেছে।

(২) বিবাহিত জীবন নর ও নারীর পুর্ণ জীবনের অংশ মাত্র। অধিকাংশ সভ্য সমাজের বিবাহের পূর্বে নর ও নারীকে বহুদিন অপেক্ষা করিতে হয়। বিবাহ হইয়া গেলেও অনেক সময় স্বামী স্ত্রীর বিরহ বা বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়। একত্রে থাকিলেও অনেক ক্ষেত্রে অসুখ অশান্তি, গরমিল ইত্যাদি কারণে স্বামী ও স্ত্রী পূর্ণ দাম্পত্যব্যবহারে অনিচ্ছুক, অপারগ, বা অক্ষম থাকে।

(৩) উভয়ের, বিশেষত নরের, একে-অতৃপ্তি। নূতন ভোগর বাসনা।

(৪) বিবাহের পরেও একের মৃত্যুর পরে অপরের পুনর্বিবাহ করিবার অনিচ্ছা, অক্ষমতা বা বাধা থাকা। মৃতদারের পুনর্বিবাহ করা বা না করিতে পারা এবং বিধবার ঐরূপ না করা বা সমাজের বাধানিষেধের দরুন ইচ্ছা থাকিলেও না করিতে পারা।

এই সকল কারণ বিশ্লেষণ করিলেই আমরা বুঝিতে পারিব, ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যে নর ও নারীর সম্মুখে সম্পূর্ণ যৌন-নিষ্ঠার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করিয়া বাধা সত্ত্বেও প্রায় সকল পুরুষ এবং প্রায় অর্ধেক নারী সেই অস্বাভাবিক আদর্শচ্যুত হইয়া পড়ে, এইরূপ পদচ্যুতির প্রতিফল ছিল শাসন—অবশ্য শুধু ধরা পড়িয়াছে এমন কতকগুলি ক্ষেত্রে। মানবচক্ষুর অগোচরে যাহা ঘটিয়াছে বা ঘটিতেছে সে সম্বন্ধে ব্যবস্থা ছিল নীরবতা। কিন্তু চক্ষু মুদিলে সত্যকার পারিপার্শ্বিক জগৎ সাময়িকভাবে অদৃশ্য হইতে পারে, বিলুপ্ত হয় না। তাই জিজ্ঞাসু প্রাণ আজকাল প্রশ্ন করিয়া বসে, এসম্বন্ধে যৌনবিজ্ঞানের বলিবার কি আছে? কেন এমন হয়?

পদস্খলনের প্রধান কারণসমুহই আমরা সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করিব। আমরা বলিয়াছি, যৌনবোধ মানুষের একটি অতি তীব্র মনোবৃত্তি। শিশুকাল হইতে ইহার প্রভাব প্রকট হয়। সমাজ এবং সংস্কার এই বোধকে যেমন একদিকে সংযত রাখিবার চেষ্টা করিতে থাকে, এই বৃত্তিটি অপর দিকে তেমনই ৰাধা ভাঙিয়া চরিতার্থতার সুযোগ খুঁজিতে থাকে।

জন্তুদের মধ্যেও যে বিপরীত-লিঙ্গ প্রাণীর অভাবে অনেক সময়ে স্বয়ংমৈথুন বা সমমৈথুনের প্রচলন দেখা যায় এবং মানুষের মধ্যে অনুরূপ কার্যকলাপের বর্ণনা আমরা পূর্ব কয়েক অধ্যায়ে দিয়াছি।

.

ইতর প্রাণীর আচরণ

ইতর প্রাণীর মধ্যে যৌনতৃপ্তি মাত্র সুযোগের উপরেই নির্ভর করে পাত্ৰাপাত্রের বিচারের দরকার হয় না। বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে পুরুষ ও স্ত্রীজাতির জন্য পরস্পরের উপগত হইবে। এমন কি সন্তান জননীতে যৌনমিলন সচরাচর দেখা যায়। পুরুষ ও স্ত্রীজাতীয় জন্তু পরস্পরকে খুঁজিয়া এবং সময়বিশেষে যৌনমিলনে ব্রতী হয়। ইহাদের সমাজগত কোন বাধা নাই তবে শরীরের অবস্থার ব্যতিক্রমে বা সময় বিশেষে উহাদের যৌন-উত্তেজনা জাগ্রত হয়।

দুগ্ধপায়ী জন্তুদের মধ্যে লক্ষ্য করলে দেখা যাইবে যে, অনেক শ্রেণী প্রায় জন্মের কিছুকাল পর হইতেই যৌনমিলনের চেষ্টা করিতে থাকে এবং শারীরিক ভাবে সমর্থ হইলেই উহাতে লিপ্ত হয়। এমন কি কতক মানব সদৃশ শিম্পাঞ্জী এবং ওরাংওটাং জাতির মধ্যেও সকাল-সকাল ঐরূপ প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপ দেখা যায়। যদিও প্রায় মানুষের মতই উহাদের বয়ঃপ্রাপ্তি ৭ হইতে ১০ বৎসরের আগে হয় না। পুং জন্তুশাবকেরাই সকর্মক অংশ গ্রহণ করিয়া থাকে।

মানুষের মধ্যে ধর্ম ও সমাজের নামে মানুষই নানা বাধানিষেধ আরোপ করিয়া থাকিলেও সারা প্রাণীজগতে কামক্রীড়া ও মৈথুনক্রিয়া দেহ ও মনের দিক হইতে পাত্র-পাত্রী নির্বিশেষে একই প্রকার।

.

আদি মানব জাতির মধ্যে

আদিম মানবজাতিতে বাধা-বিপত্তি কতটা ছিল তাহা নির্ণয় করা মুশকিল। এখনও অনেক অসভ্য জাতির মধ্যে অবাধ যৌনমিলনের প্রচলন আছে। ইহাদের মধ্যে বালকবালিকা, কিশোরকিশোরী, যুবক যুবতী সমর্থ এবং ইচ্ছুক হইলেই উহা করিতে পারে। উহাদের মধ্যে সন্তান-জন্মের সহিত মিলনের প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ আছে বলিয়াই ধারণা নাই। ব্রিটিশ নিউগিনির আদিম অধিবাসীরা এই মনে করে যে, সন্তান স্ত্রীলোকের স্তনে প্রথম জন্মে পরে উহা তলপেটে নামিয়া যায়। অষ্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা মনে করে “রাতাপা” নামক গর্ভসঞ্চারক প্রেতাত্মা স্ত্রীলোকের শরীরে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং কতিপয় নির্দিষ্ট ফল খাইলেই গর্ভাধান হয়। অষ্ট্রেলিয়ার অন্তর্গত কুইন্সল্যাণ্ডের অধিবাসীরা মনে করে, সন্তান পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় স্ত্রীলোকের নাড়ীভুড়িতে সাপ বা পক্ষীর আকারে প্রবিষ্ট হয়। এস্কিমোরা বিশ্বাস করে, সন্তান ঐশ্বরিক উপায়ে উদ্ভূত হয়, পুরুষের শুক্র শুধু সন্তানের খোরাকরুপে যোগান হয়। ইহারা সহবাসকে শুধু একটি আনন্দজনক কার্য বলিয়া মনে করে।

ডঃ কিনযেরাও মন্তব্য করেন যে, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র তথাকথিত আদিম অধিবাসীদের মধ্যেকার বিবাহ-পূর্ব মৈথুন আজ সর্বজনস্বীকৃত এবং বর্তমান দুনিয়ার অন্যান্য সভ্যজাতির মধ্যে, প্রাচ্যের প্রাচীন জাতিদের মধ্যে এবং ইঙ্গমার্কিন গোষ্ঠী ছাড়াও অপর ইউরোপীয় জাতিদের অধিকাংশের মধ্যে বিবাহপূর্ব মৈথুন প্রায় প্রকাশ্যভাবে স্বীকার করিয়া লওয়া হয়।

কিনযেদের এইরূপ উক্তি অত্যন্ত বাড়াবাড়ি বলিয়া মনে হয়। ধর্মসর্বস্ব প্রাচ্য মৈথুন ত দুরের কথা এমন কি কিশোর-কিশোরীর মেলামেশা পর্যন্ত পছন্দ করে না। বোধ হয় জাপানের কথা স্বতন্ত্র। ইঙ্গ-মার্কিনদের শালীনতাবোধের পক্ষে অযথা ওকালতী করা বৈজ্ঞানিক অপক্ষপাতিত্বে পরিপন্থ ছাড়া কিই বা হইতে পারে। অবশ্য সভ্য প্রাচ্যের অতটা গোড়ামী ভাল কি মন্দ তাহার বিচার এখানে করিতেছি না। কথা হইল প্রকৃত পরিস্থিতি লইয়া।

আমেরিকার কামক্রীড়া যে প্রায় সার্বজনীন এবং বিবাহেতর মৈথুনের পরিমাণও যে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক একথা ডঃ কিন্‌যেদের অনুসন্ধানেই ধরা পড়িয়াছে। (Because of this public condemnation of premarital coitus, one might believe that such contacts would be rare among American females and males. But this is only the overt culture, the things that people openly profess to believe and to do. Our previous report (948) on the male has indicated how far publicly expressed attitudes may depart from the realities of behavior-the covert culture what males actually do. We may now examine the premarital coital behaviour of the female sample which has been available for this study.” (Kinsey-Vol II-pp 285)

যাহা হউক, যৌন তাড়নারই ফলে অনেক রকম যৌন-আচরণ যে যৌনপ্রাপ্তির পূর্বেই প্রকাশ পায় ইহার কারণ, যৌনবোধের তীব্রতা প্রায় কৈশোর হইতেই অনুভূত হয়। এত কঠোর যে তাড়না, এত ব্যাপক যে বৃত্তি, এত জ্বালাময় যে ক্ষুধা, সমাজ তাহার তৃপ্তি ব্যবস্থা করিয়াছে একমাত্র বিবাহের দ্বারা। উপদেশ দিয়াছে, বিবাহের পূর্বে সমস্ত যৌনবোধকে পিষ্ট করিয়া সংযত রাখিতে হইবে। ভয় দেখাইয়াছে, তাহা না করিলে ধরা পড়িবে ও কঠোর শান্তি পাইতে হইবে, ধরা না পড়িলেও ইহলোকে দুঃসহ ব্যাধি এবং পরলোকে নরকাদি এবং পরজন্মে অশেষ দুঃখ ভোগ করিতে হইবে। আদর্শ এত কঠিন বলিয়াই স্খলনও হয় এত সহজে।

.

 কিরূপে সংঘটিত হয়

বালক-বালিকার মধ্যে শিশুকাল হইতে যৌনবৃত্তি অধিক সজাগ থাকে বলিয়া, স্বয়ংমৈথুন ছাড়া বালক-বালিকার ক্রীড়াচ্ছলে সম্মিলনও কখনও কখনও হইয়া থাকে। পিতামাতার বা পশুপক্ষীর মিলনক্রিয়া দর্শনে ইহারা পরস্পরে ঐরূপ ক্রিয়ার অনুকরণ করিবার প্রয়াস পাইতে পারে। অপরিণত শৈশবে এই সকল কার্যকলাপ অনেকটা খেলাধূলার মতই গণ্য করা যায়।

কিশোর-কিশোরীর যৌনচেতনার সুযোগ গ্রহণ করিয়া অপর বয়োজ্যষ্ঠ নারী বা নরউহাদিগকে প্রলুব্ধ করিয়া যৌনসম্মিলনে রাজী করার দৃষ্টান্ত অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। স্কুলের বন্ধু, বান্ধবী, দাসদাসী, শিক্ষক বা নার্সের এইরূপ প্রচেষ্টার দৃষ্টান্তও দেখা যায়। বালকবালিকাদের ভিন্ন বিছানায় একাকী শুইবার ও কুসংসর্গ হইতে বাচাইবার ব্যবস্থার বিষয়ে পরামর্শ দিতে গিয়া আমরা পূর্বেই একথা আলোচনা করিয়াছি। রাজা, বাদশাহ, নওয়াব, জমিদার ইত্যাদি বড়লোকদের বাড়ীর ছেলেরা সাধারণত বয়োজ্যষ্ঠ দাস-দাসী প্রভৃতির দ্বারা প্রলুব্ধ হয় এবং বয়োকনিষ্ঠদের সহিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে।

অবিবাহিত বড়দের মধ্যে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতী রতিক্ষম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার প্রয়াস পায়। সমাজে অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকিলে এ ক্ষেত্রে উহাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে সম্মিলন সংঘটিত হওয়া বিচিত্র নহে। পাশ্চাত্য সমাজে ইহাদের মধ্যে যৌনমিলন বাড়িই চলিয়াছে।

প্রসার

প্রোফেসার টাবম্যান গবেষণা করিয়া আমেরিকা সম্বন্ধে তাহার Psychological Factors In Marital Happiness নামক গ্রন্থে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, বিবাহের পূর্বে যৌনমিলনের মাত্রা দ্রুতগতিতে বাড়িয়াই চলিয়াছে।

ইংলণ্ডে এইরূপ গবেষণা হয় নাই, তাহা হইলেও সমাজবিজ্ঞানবিদেরা যে সমস্ত তথ্য আহরণ করিয়াছেন তাহা হইতে ঐরূপই অনুমিত হয়।

নরম্যান হাইমস (Himes) দুইটি চার্ট উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়াছেন যে, আমেরিকায় ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দের পরবর্তীকালে প্রাগবিবাহ যৌনমিলনের মাত্রা ক্রমশই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া আসিতেছে এবং ক্রমশই কমসংখ্যক যুবক-যুবতীর পূর্ণ যৌন-পবিত্রতা লইয়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইতেছে। সকল যুবক-যুবতীর অনেকে প্রাগবিবাহ মন পাইবার চেষ্টাও যাচাই (courtship)-এর সময় কিংবা বাগদানের (engagement) পরে নিজেদের ভাবী স্ত্রী বা স্বামী সহিত বিবাহের পূর্বে আলাপ-পরিচয়ের সময়ে যৌন অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছে। অনেকে আবার অপর পুরুষ বা নারীর সহিতও ঐরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছে।।

১৯৩৮ সালে মিস ডবোথি ব্রমলি আমেরিকার নানা কলেজের ৭০০ ছাত্রী ও ৬০০ ছাত্রের যৌনজীবনের ইতিহাস প্রায় অর্ধেকের সহিত সাক্ষাতে কথা বলিয়া ও অপরের নিকট হইতে পত্রযোগ অবলম্বনে লিখিত Youth and Sex পুস্তকে দেখাইয়াছেন যে, গড়ে ২০ বৎসর বয়সের ছাত্রদের মধ্যে শতকরা ৫১ জন ও ছাত্রীদের মধ্যে ২৫ জনই সুবতাস্বাদ লাভ করিয়াছে।

এই সকল ধারা পর্যালোচনা করিয়া প্রোফেসার টারম্যান বলেন যে, যদি ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দের পরবর্তীকালের যুবক-যুবতীর যৌন-নিষ্ঠার এইরূপ ক্রমঅবনত ধারা চলিতে থাকে, তাহা হইলে ১৯৩০ খ্ৰীষ্টাব্দের পরে যে ছেলে এবং ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দের পরে যে মেয়ে জন্ম গ্রহণ করিবে তাহাদের মধ্যে বিবাহের প্রাক্কালে যৌন-নিষ্ঠার মাত্রা বিলুপ্ত হইবে।

ডাঃ ডিকিনসন (Dickinson) আমেরিকার গবেষকদের মধ্যে নেতৃস্থানী। তিনি The Single Woman পুস্তকে (তাঁহার শতশত কুমারী রোগিণীর যৌনজীবনের ইতিহাস অবলম্বনে) লিখিয়াছেন যে, বাগদত্তা কুমারীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ভাবী স্বামীর সহিত সহবাস করে। তিনিও দীর্ঘ গবেষণা করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, বিবাহের পূর্বে যৌন-উপভোগের মাত্রা বাড়িয়াই চলিয়াছে।

ডঃ কিনযেদের মতে আমেরিকার বেশীর ভাগ পুরুষই বিবাহের পূর্বে রতিক্রিয়া করিয়াছে। শতকরা ২২ জন কৈশোরের পূর্বেই ১০ বৎসর বয়স হইতে উহা করিয়াছে বা করিবার চেষ্টা করিয়াছে এবং ঐ অভ্যাস পরবর্তী জীবনেও রাখিয়া চলিয়াছে। বিভিন্ন সামাজিক স্তরের পুরুষের মধ্যে উহার প্রসারের তারতম্য আছে। শিক্ষামানের নীচের ধাপের প্রায় ৩ অংশ ঐ প্রকার অভ্যন্ত। কলেজের ছাত্রদের মধ্যে শতকরা ৬৭ জন, যাহারা হাই স্কুলে পড়িয়াছে এবং উহার উপরে আর যায় নাই তাহাদের শতকরা ৮৪ জন এবং নিম্নস্তরের স্কুলেই যাহাদের পড়া শেষ হইয়াছে তাহাদের মধ্যে শতকরা ৯৮ জন বিবাহের পূর্বে নারী সহবাস করিয়াছে।

নারী সহবাস ও হস্তমৈথুনই সারা আমেরিকার পুরুষদের প্রধান যৌনক্রিয়া। ব্যক্তিবিশেষের উভয় কার্যক্রমে যথেষ্ট ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। কেহ বা বিবাহের পূর্বে ভাবী স্ত্রীর সহিত মাত্র একবার সহবাস করিয়াছে, কেহ বা আবার সপ্তাহে ১০ বার পর্যন্ত চালাইয়াছে। কেহ মাত্র একজন কেহ বা ডজন ডজন মেয়ের সঙ্গে করিয়াছে। কেহ কেহ নূতন নূতন মেয়ের পিছনে ধাওয়া করিয়া আমোদ পায় ও বিজয় গৌরব বোধ করে।

প্রবল ধর্মীয় ভাবাপন্ন লোকদের এরূপ আচরণ অপেক্ষাকৃত কম—যথা : ইহুদী ও গোঁড়া খ্ৰীষ্টানদের মধ্যে। গ্রাম অপেক্ষা শহরে ইহার প্রকোপ বেশী। গ্রামে সুযোগের অভাব এবং সামাজিক অনুশাসন অপেক্ষাকৃত কঠোর বলিয়াই এরূপ তারতম্য হয়।

ডঃ কিন্‌যেদের অনুসন্ধান ক্ষেত্রে শতকরা ৫০% নারীই বিবাহের পূর্বে রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে বিবাহের ২-১ বৎসর পূর্বে বেশীর ভাগ ঐরূপ করিয়াছে। আবার কতক ভাবী স্বামীসহ যৌনমিলনে রত হইয়াছে।

বিবাহে বিলম্ব হইলে ঐরূপ আচরণেও দেরি হইয়াছে; আবার সকাল সকাল বিবাহ হইলে সকাল সকালই যৌনমিলন ঘটিয়াছে। এই তথ্যের তাৎপর্য ইহাই হইতে পারে যে সকাল সকাল যৌনমিলনে অভ্যস্ত নারীরা বিবাহও সকাল সকাল করিয়াছে অথবা বিবাহের পূর্বে নারীরা অনেকটা মনোভাব শিথিল করিয়াছে। ১৩-১৪ বৎসরের বালিকার যৌনমিলন খুব কমই পাওয়া গিয়াছে, শারীরিক অপরিপক্কতা ও সামাজিক কঠোর অনুশাসন উভয় কারণেই বোধ হয়।

যৌনমিলনের কেবল কতক ক্ষেত্রে মাত্র নারীর চরমতৃপ্তিলাভ ঘটিয়াছে। বিবাহিতা নারীর ক্ষেত্রেও এমনতরই হইয়া থাকে।

বিবাহিতদের যৌনমিলন অপেক্ষা বিবাহপূর্ব যৌনমিলন সংখ্যায় ও অনুপাতে কম। কারণ সাধারণতঃ পাত্র-পাত্রী, সুযোগ, সময় ইত্যাদির অভাব এবং সামাজিক বাধা-বিপত্তি। নারীদের মধ্যে অনেকে কেবলমাত্র এক বা কম সংখ্যক পুরুষের সহিত সীমাবদ্ধ মিলনের প্রয়াস পায়।

আমেরিকায় বিবাহ-পুর্ব যৌনমিলনের স্থান সম্পর্কে ড: কিনযেদের অভিমত এই যে, মেয়েদের নিজ গৃহে, ছেলেদের নিজ গৃহে, বন্ধুর গৃহে, স্কুল, কলেজ, হোটেল বা ভাড়া ঘরে, মোটর বা অন্য গাড়ীতে, খোলা জায়গায় এবং অনুরূপ নানা পরিবেশে উহা সংঘটিত হয়।

মিলন-পূর্ব কামক্রীড়ার কথা বলিতে যাইয়া ইহারা বলেন যে, পূর্ব অধ্যায়ে বর্ণিত কামক্রীড়ার (Petting) প্রায় সকল প্রকারই অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। স্বভাবতই নারীকে উত্তেজনা দিয়া সম্মত করিতে পুরুষ যথাসাধ্য চেষ্টা করে। বিবাহিতদের মধ্যে ঐরূপ কামক্রীড়া প্রায় স্বামী ভুলিয়াই যায় এই বলিয়া বোধহয় যে, স্ত্রী তাহার ভোগের বস্তু ও তাহার সম্মতি বা স্বীকৃতির ধার ধরিয়াই স্বামী নিজের কামচরিতাৰ্থ করিতে পারে।

প্রত্যেক স্বামীরই উচিত যে, প্রতিবার মিলনের পূর্বে নানা প্রকার প্রেমক্রীড়া করিয়া স্ত্রীর মন উহার জন্য প্রস্তুত ও আগ্রহান্বিত করতঃ তবেই যেন উহাতে ব্ৰতী হন। কারণ তবেই স্ত্রী উহাতে আনন্দ পাইবেন, সহযোগিতা করিবেন এবং শীঘ্রই (তাহার সহিত অথবা তাহারও পূর্বে) চরমতৃপ্তি লাভ করিবেন। ফলে, তাহারও আনন্দ দ্বিগুণ হইবে।

ডঃ কিনযেদের উদঘাটিত নিম্নলিখিত তুলনামুলক তথ্যাদি উল্লেখযোগ্য—

বিবাহ-পুর্ব যৌনমিলন

উৎপত্তি ও উত্তরাধিকার                     নারী                       নর

দুগ্ধপায়ী জন্তুদের মধ্যে শারীরিক
সামর্থ্য হইলেই উহার চেষ্টা        কম এবং অধিক বয়সে   বেশী এবং কম বয়সে

বহুপ্রাচীন সমাজে ছেলেমেয়েদের মধ্যে
উহার অনুমতি দেওয়া বা সহ্য করা         হ্যাঁ                      হ্যাঁ

প্রাচীন সমাজে কৈশোরে কতকটা অনুমতি
দেওয়া হইত                                   প্রায় ৭০%         প্রায় সব ক্ষেত্রে

পাত্র সংখ্যা (অভ্যস্তদের মধ্যে)
একই পাত্রের সহিত                          ৫৩%                ২৭%

শুধু ভাবী স্বামীর সহিত সঙ্গম                 ৪৬%              —–

ভাবী স্বামী ও অপরের সহিত                 ৪১%              —–

প্রক্রিয়া ভেদ

মুখমেহন বর্তমান যুগে বেশী                 হ্যাঁ                 হ্যাঁ

স্বামী-স্ত্রীর মিলন অপেক্ষা বেশী সময় লাগে    হ্যাঁ              হ্যাঁ

দম্পতিদের তুলনায় আসনের বৈচিত্র্য কম    হ্যাঁ              হ্যাঁ

উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে নগ্ন হইয়া বেশী       হ্যাঁ          হ্যাঁ

সুযোগের অভাবে অসুবিধাজনক পরিস্থিতি      প্রায়ই        প্রায়ই

দৈহিক ও মানসিক ফল

কামাবেগের প্রশমন করে                  কখনও ৪০%    সর্বদাই ৬৮-৯৮%

সতী কুমারীদের যৌনমিলন এড়াইবার ইচ্ছা    ৮০%       —–

অসতীদের        “            “         “        ৩০%      —–

যৌনমিলনের ইচ্ছা দমন করেঃ

নীতিবোধ                              ৮৯%           ২১-৬১%

কামভাবের অভাব                     ৪৫%           ১৯-৪৫%

গর্ভসঞ্চারের ভয়                       ৪৪%          ১৮-২৮%          

ধরা পড়িবার ভয়                      ৪৪%          ১৪-২৩%      

রতিজ রোগের ভয়                    ১৪%          ২৫-২৯%       

সুযোগের অভাব                       ২২%          ৩৫-৫২%   

সামাজিক ফলাফল

গর্ভসঞ্চার                              ১৮%         

 রতিজ রোগের সংক্রমণ        ২-৩%উচ্চ শিক্ষিতে কম, অল্প শিক্ষিতে বেশী

ব্যভিচারের অনুপাত

অনূর্ধ্ব ১৫ বৎসর                    ৩%                     ৪০%

১৬-২০      “                       ২০%                   ৭১%

২১-২৫      “                        ৩৫%                   ৬৮%

.

বিবাহেতর মিলনের প্রসারের কারণাবলী

প্রথমতঃ, ধর্ম ও সংস্কারের বন্ধন অনেকটা শিথিল হওয়া। অনেকে ইহাও মনে করিয়া থাকে যে, ধর্ম ও সমাজ অযৌক্তিক ও কুসংস্কারজনিত অনেক বাধা-নিষেধের বেড়াজাল গঠন করিয়া আনন্দের ব্যাঘাত ঘটাইতেছে। তরুণ-তরুণীর উচিত হইবে ইহার বিরুদ্ধতা করা।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক এবং সামাজিক কারণে বিবাহের বয়স পিছাইয়া যাওয়া। যৌবনপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে হইবে যৌনতৃপ্তির প্রয়োজন অথচ উহা সম্ভব হইবে বহুদিন পরে। এই অনিশ্চিত যোগের প্রতীক্ষায় যৌন-কামনা সম্পূর্ণ সংযত রাখা দুষ্কর।

তৃতীয়ত, জীবনে ভোগস্পৃহা। ইন্দ্রিয় দমনের জন্য কষ্ট স্বীকার অবশ্য কর্তব্য এইরূপ আদর্শ এখন অনেকটা অচল হইয়া পড়িয়াছে। জীবনকে উপভোগ করার মত ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকা এবং সমস্ত যোগের যথোচিত সদ্ব্যবহার করা উচিত—এই মতবাদই এখন দ্রুত প্রসারলাভ করিতেছে।

চতুর্থত, নরনারীর অবাধ মেলামেশার সুযোগ-সুবিধা। ব্যক্তিস্বাধীনতার যুগে নিজ নিজ আচরণের জন্য অন্যের কাছে জবারদিহির প্রয়োজন নাই। বন্ধু-বান্ধবীর চলাফেরা উপর অপরের অযথা কৌতূহল ও সন্দেহ প্রকাশ করার কোন অধিকার নাই। পূর্বে গ্রামের সমাজবন্ধন দৃঢ় ছিল। একে কার্যকলাপ অপরের বিচার, এমন কি পাড়াসুদ্ধ লোকের আন্দোলনের বিষয় হইত। এখন ততটা হয় না এবং শহরে একই বাড়ীর বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে কাহারা কি করিতেছে তাহাও জানিবার উৎসাহ বা প্রয়োজন কাহারও বড় একটা হয় না। গুরুজনদের শাসনও শিথিল হইয়া আসিতেছে, বিশেষতঃ বয়স্ক ও উপার্জনশীল যুবক-যুবতী সম্বন্ধে।

পঞ্চমত, বিবাহের পূর্বে বহুদিন পর্যন্ত কোর্টশিপের প্রথা। পাশ্চাত্য জগতে প্রেমই পরিণয়ে পর্যবসিত হয়। তাই উপযুক্ত পাত্রপাত্রীকে পরস্পরকে বুঝিবার ও ভালবাসিবার সুযোগ ও সময় দেওয়া হয়। এই সময়ে উভয়ের আদব সোহাগ ও কেলিকলায় উত্তেজনা হওয়া এবং পরিণামে মিলনে পর্যবসিত হওয়া কিছুই বিচিত্র নহে।

ষষ্ঠত, গর্ভসঞ্চারের ভয় প্রশমিত হওয়া। জন্মনিয়ন্ত্রণের কলা ও কৌশল পাশ্চাত্যজগতে এখন প্রায় সর্বজনবিদিত। তাই নরনারী উহার সুযোগ গ্রহণ করিয়া যৌন-অভিযানে অধিকতর অগ্রসর হইবে, ইহা মোটেই বিচিত্র নহে।।

সপ্তমত, নারীর উপার্জনের ক্ষেত্ৰ ক্ৰমশঃ বিস্তৃত হইতে থাকায় তাহাদের স্বাধীনতা ও সাহস বাড়িয়া চলিয়াছে।

অষ্টমত, মনের গহনে পুরুষের নিজের রতিশক্তি সম্বন্ধে সংশয় এবং তাহা ঢাকিবার চেষ্টা অথবা নারীসম্ভোগ নেশাখোরের নেশায় বস্তুর মত দুর্বার প্রয়োজনের বন্ধু হইয়া উঠা।

.

ভারতবর্ষে ব্যতিক্রমের কারণ

যৌনপ্রবৃত্তি সকলখানেই একইরূপ তীব্র। তাই আমাদের দেশেও যুবকযুবতীর বিবাহ-পূর্ব মিলন অল্পবিস্তর সংঘটিত হইবার কথা। তবে উপরোক্ত কারণসমূহের প্রভাবের তারতম্য এখানে লক্ষিত হইবে।

ধর্ম ও সমাজের বন্ধন এখনও অনেকটা দৃঢ় আছে। অবশ্য ইহা ভাল কি মন্দ, তাহার বিচার এখানে করা হইতেছে না।

এখানে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সমাজে বিবাহ বিলম্বে হয়। তাহা ছাড়া বাল্যবিবাহের প্রচলনই অধিক। সাদা আইনে (Sarda Act) ইহার প্রশমনের চেষ্টায় অজ্ঞতাপ্রসূত হিড়িকে যে লক্ষ লক্ষ বাল্যবিবাহ সংঘটিত হইয়াছে, তাহার বিষময় পরিণাম এখন প্রকট হইয়াছে।

জীবনে ভোগস্পৃহার আধিক্য এখানেও পরিলক্ষিত হইতেছে, যদিও দারিদ্রের নিষ্পেষণে উহার সুযোগ আপনা হইতেই সীমাবদ্ধ হইয়াছে।

এখানে নরনারীর অবাধ মেলামেশার সুযোগ কম। পর্দা প্রথা এখনও কারাপ্রাচীরে স্থলাভিষিক্ত। ইহা শিথিল হইয়া আসিতেছে বটে, তবে নারী স্বাধীনতা এখনও অতি সামান্যভাবে স্বীকার করা হইয়াছে। কোর্টশিপের প্রথা এখানে নাই, সামান্য যাহা আছে তাহা পাত্রপাত্রীকে অভিভাবক বা অভিভাবিকার সজাগ দৃষ্টির সম্মুখে সাময়িকভাবে আলাপ-আলোচনা করিবার সুযোগ দেওয়া মাত্র। এই অবস্থায় যৌনমিলনের অবকাশ হয়ই না।

জন্মনিয়ন্ত্রণের আলোচনা এখনও সামান্য, এবং তাহাও শিক্ষিত সমাজের অংশবিশেষে সীমাবদ্ধ। অসংখ্য শিক্ষিত পিতামাতার ক্রমবর্ধমান সন্তানের বহর দেখিয়া মনে হয়, ইহাদের গর্ভনিবারণের কৌশল আয়ত্ত করিবার সামান্য প্রচেষ্টাও নাই।

এই সকল বিবেচনা করিয়া মনে হয়, ভারতবর্ষের যৌন-নিষ্ঠা স্বেচ্ছায় বা পায়ে পড়িয়া পালন করা হয় পাশ্চাত্যদেশের চেয়ে অনেক বেশী ক্ষেত্রে। তবে বহির্জগতের সংস্পর্শে ক্রমেই উহার পরিমাণ বা মাত্রা কমিয়া যাওয়ারই সম্ভাবনা অধিক। পণপ্রথার চাপে বিবাহ পিছাইয়া যাওয়ায় এবং মেলামেশার সুযোগ বাড়িয়া যাওয়ায় এইরূপ হওয়া স্বাভাবিক।

বিবাহের পূর্বে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীর যৌনমিলন ইন্দ্রিয়তাড়নার ফল। উহা অনেকাংশে সুযোগের উপর নির্ভর করে। গণিকারা নির্বিচারে অর্থের লোভে দেহদান করে বলিয়া যুবকেরা উহাদের ফাঁদে পড়িয়া যাইতে পারে এবং কতক ক্ষেত্রে যায়ও। থিয়েটার ও সিনেমার অভিনেত্রীদের মধ্যে কেহ কেহ রূপবান অথবা অর্থশালী যুবকদের প্রলুব্ধ করে অথবা তাহাদের প্রেম নিবেদনে সহজেই সাড়া দেয়।

বিবাহিতদের মধ্যে— বিবাহ হইয়া গেলে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর যৌনতৃপ্তির অবাধ সুযোগ হয় বলিয়া অন্যদিকে মন আকৃষ্ট হইবার কারণ কম হয়। তথাপি বিবাহিত নর ও নারীর মধ্যে বিবাহেতর যৌনমিলনের পরিমাণ কম হইলেও একেবারে বিলুপ্ত হয় না।

.

যুগ-যুগান্তরে

আদিম মানবের মধ্যে বিবাহের পূর্বেকার অপেক্ষা বিবাহের পরের ব্যভিচারকে বেশী নিন্দনীয় মনে করা হইত। বিবাহিতা নারীর পক্ষে পরপুরুষ-সঙ্গ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল, পুরুষের পক্ষেও নারী ভোগের পথে বাধানিষেধ আরোপ করা হইত। নারীকে পুরুষের সম্পত্তি মনে করা হইত এবং নীতিগত কারণ অপেক্ষা ইহাতেই বেশী জোর দেওয়া হইত। ব্যাবিলনীয়, হিটীয়, আসিরীয় এবং ইহুদীয় ধর্ম-বিধিতে ইহার নিদর্শন দেখা যায়। খ্রীষ্টীয় এবং ইসলাম ধর্মে ইহুদীয় ধর্মের প্রভাব আসিয়া পড়িয়াছে।

মধ্যযুগে ইউরোপে এবং আজিও অসভ্য জাতিদের মধ্যে বিবাহের পূর্বেকার ও পরের যৌনমিলনমাত্রকেই কদাচার বলিয়া ঘৃণ্য মনে করা হইয়াছে। বিবাহের যৌনমিলনমাকেই কদাচার বলিয়া ঘৃণ্য মনে করা হইয়াছে। আধুনিক জগতে ও পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত এবং অন্যান্য কারণে এ সম্পর্কে মনোভাবের পরিবর্তন দেখা যায়।

বিবাহিত নর ও নারীর পক্ষে অপরের সহিত মিলন এখনও সমাজে নিন্দনীয় এবং আইনত দণ্ডনীয়। ধরা পড়িলে এখনও ঝগড়াঝাটি, মারামারি এমন কি খুন জখম পর্যন্ত গড়ায়। তথাপি গোপনে অগোচরে বিবাহিত নর ও নারীর অপর পক্ষের সহিত মিলন একেবারে কম নয়। যাহারা প্রকাশ্যে এইরূপ আচরণে ভীষণ উষ্মাপ্রকাশ করিয়া থাকে তাহারাও আবার ব্যক্তিগত জীবনে এইরূপ করিয়াছে বা সুযোগ পাইলে করিয়া থাকে।’

টারম্যান (Terman), হামিলটন (Hamilton) প্রমুখ পূর্ববর্তী গবেষকদের মতবাদের উল্লেখ করিয়া ডঃ কিন্‌যেরা অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, প্রায় শতকরা ৫০% পুরুষ বিবাহিত অবস্থায়ও অপর নারী ভোগ করে। পক্ষান্তরে, ৪০ বৎসর বয়সে নারীদের মধ্যে প্রায় শতকরা ২৫ জন বিবাহের পরে অপর পুরুষের ভোগ্য হইয়াছে।

বিবাহের পূর্বে মিলনে অভ্যস্ত হইলে বিবাহের পরও এরূপ অভ্যাস থাকিয়া যাওয়া বিশেষ আশ্চর্যের কিছুই নহে। সুযোগ ও তাড়নার তারতম্যে এইরূপ মিলনের পরিমাণ ও ব্যবধান বিভিন্ন হইতে বাধ্য। কেহ বা এক, কেহ বা একাধিক বার, কেহ বা মাঝে মাঝে, কেহ বা সুযোগ পাইলেই যথেষ্ট পরিমাণে এইরূপ আচরণ করিয়া থাকে। পতিতারা অবশ্য এইরূপ আচরণের বেশী সুযোগ করিয়া দেয়।

বিবাহের পরে পরেই স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে এত নিবিড় উপভোগে লাগিয়া যায় যে, তখন বিবাহেতর মিলনের কারণ অনেকটা কম হয়। বিবাহের প্রাথমিক মোহ কাটিয়া গেলে, যখন কোন একজন অপরের কাছে কতকটা পুরাতন হইয়া যায়, তখন আস্তে আস্তে ভোগের মাত্রা মাথাচাড়া দিয়া উঠে। লজ্জাব ভাব, সঙ্কোচ, মেলামেশায় কুণ্ঠার ভাব কাটিয়া গেলে এবং রতিসুখে অভ্যস্ত হইলে নারীরা একটু বেশী বয়সেই ঐরূপ যৌন-আচরণে সম্মত বা প্রবৃত্ত হয়। ডঃ কিনযের অনুসন্ধানে ৩৪-৩৫ বৎসর বয়সের পরেই নারীদের পদস্খলনের বেশী উদাহরণ পাওয়া গিয়াছে।

নারীদের পক্ষে বেশীর ভাগ বিবাহেতর যৌন-মিলনই শুধু কখনও কখনও মাত্র হয়। সুযোগ-সুবিধা, গোপনীয়তা রক্ষা করিবার ব্যবস্থা ইত্যাদি অহরহ নাই। পুরুষের প্রমোদের জন্য গণিকাবৃত্তি যত প্রাচীন ও সুদূরপ্রসারী, নারীদের জন্য দেহ ব্যবসায়ী পুরুষ তদপেক্ষা অত্যন্ত কম। বহু দেশে নাই বলিলেই চলে। স্বামী বা স্ত্রীর অপর নারী বা পুরুষের সহিত সহবাস করা কখনও সমর্থন করা যায় কিনা, এ বিষয়ে আমেরিকার উচ্চ শিক্ষিতা কুমারীদের মতামত “বিবাহের প্রয়োজনীয়তা” অধ্যায়ের ‘যৌন নিবৃত্তির সুযোগ’ অনুচ্ছেদে দেখুন।

কারণসমুহঃ

(১) দম্পতির সাময়িক বিরহ আজকাল পূর্বের মত এক স্থানে বসিয়া গার্হস্থ্য জীবন অবিচ্ছিন্নভাবে চালাইবার সুযোগ বহু লোকেরই হয়না। আর্থিক সুযোগ-সুবিধার জন্য চাকুরী, ব্যবসা, ভ্রমণ, বাপের বাড়ী বাস, গর্ভাবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ ইত্যাদির জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বহুদিনের জন্য ছাড়াছাড়ি হইয়া থাকে। অথচ যৌনপ্রবৃত্তি পূর্বের মতই সজাগ ও সুতীব্র থাকিয়া যায়। বরং দাম্পত্য বিরহের স্মৃতি উভয়কে আরও পীড়া দেয়। এইরূপ বিরহের সময় যত দীর্ঘ হয় পদস্খলনের সম্ভাবনা ততই বাড়িতে থাকে। সৈনিক, নাবিক, ভ্রমণকারী, প্রবাসী ইত্যাদির গণিকাবৃত্তির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়ার কথা একটু পরেই বর্ণনা করিতেছি। স্থানীয় অবিবাহিত যুবক অপেক্ষা প্রবাসী বা ভ্রাম্যমাণ বিবাহিত লোকেরাই অধিক সংখ্যায় বেশ্যাগমনে আসক্ত।

(২) সকল ক্ষেত্রেই যে বিবাহ সুখের হয় এমন নহে। কখনও কখনও স্বামী বা স্ত্রীর একের দুরারোগ্য ব্যাধির জন্য অপরে অতৃপ্ত থাকিয়া যায়। এইরূপ ক্ষেত্রে পদস্খলন হইবার সম্ভাবনা থাকে। ইসলামে এইরূপ ক্ষেত্রে সকর্মক ও ধৈর্যহীন বলিয়া পুরুষকে একাধিক বিবাহ করিয়াও যৌন-নিষ্ঠা পালনের আদেশ দিয়াছে। অবশ্য স্ত্রীর পক্ষে এরূপ কোন ব্যবস্থা করা হয় নাই, বোধ হয় তাহাকে মৃদুতর কাম, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার গৌরব দান করিয়া। ইহার সমাধান হিসাবে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিবাহ-বিচ্ছেদের ব্যবস্থা অপ্রীতিকর হইলেও হিতকর । ভাবতে নূতন হিন্দু বিবাহ সম্বন্ধীয় আইনে অল্প কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে এইরকম ব্যবস্থা করা হইয়াছে। ইহা মন্দের ভাল। আশা করি উদার হৃদয় সমাজসংস্কারকগণ যাতে আরও অধিক ক্ষেত্রে এই সুযোগ হয় তাহার চেষ্টা করিয়া যাইবেন।

(৩) উভয়ে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও দাম্পত্য-অপ্রীতি, কলহ-বিবাদ অনেক সময়ে একজনকে অপরের প্রতি বিরক্ত ও বিরূপ করিয়া তোলে। এই অবস্থায় অতৃপ্ত যৌন-অংশীদার ব্যভিচারের সুখ খুঁজিবার প্রয়াস পাইতে পারে। মন্ত্র পড়িয়া বিবাহসূত্রে গ্রথিত হইয়া গেলেই ভবিষ্যৎ জীবন একেবারে নিষ্কন্টক উপদ্রবহীন হইয়া গেল, এমন নহে। স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক বোঝাপড়া দাম্পত্যজীবনের প্রতিদিন প্রতিক্ষণে হইতে থাকে। মিলিয়া মিশিয়া থাকিবার কলাকৌশলও অনেকটা শিক্ষণীয় বিষয়। এই পুস্তকের উদ্দেশ্যই উহার শিক্ষাবিধান।

 (৪) স্বামী-স্ত্রী উভয়ই পরম তৃপ্ত থাকিলেও (বিশেষত পুরুষের) একে অতৃপ্তির জন্যও ব্যভিচার ঘটিয়া থাকে। স্ত্রীর পক্ষে অবশ্য দেহদান করিবার বিরুদ্ধে তাহার মৃদুতর কাম, লজ্জাশীলতা, গর্ভভয়, দুর্নামভীতি, সংযম, প্রেমের প্রয়োজন, রুচি ইত্যাদি কাজ করে। অর্থাৎ সাধারণতঃ স্ত্রীলোক দেহদান করে ভালবাসিবার পরে। স্বামিগতপ্রাণার পক্ষে সচরাচর অপরকে ভালবাসিবার অথবা দেহদান করিবার কারণ থাকিতে পারে না।

কিন্তু পুরুষের বেলায় ততটা নহে। তাহার প্রবৃত্তিই বৈচিত্র্যলোভী। সে বিবাহিত স্ত্রীকে মনপ্রাণ দিয়া ভালবাসা সত্ত্বেও যে-কোন সহজলভ্য স্ত্রীলোক উপভোগ করিতে পারে। ইহাকে সে সাময়িক স্মৃতিবিশেষই মনে করিয়া থাকে, কিন্তু নিজের স্ত্রীর প্রতি প্রেম বা শ্রদ্ধা হারায় না। শুধু নূতন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়েরজন্য সম্ভ্রান্ত পুরুষের বারনারীগমন বা অন্য প্রকারের বিবাহের যৌনমিলনে ব্ৰতী হওয়া বিচিত্র নহে।

পুরুষেরা, নিয়ন্তা হিসাবে স্বাধীনতা প্রমত্ততায় নিজেদের উপভোগের জন্য বহুবিবাহের প্রথা চালাইয়া আসিয়াছে। সলোমনের হাজারপত্নী ও উপপত্নী, দাযুদের শত পত্নী ইসলামেরচারি স্ত্রীর অধিক বা অবৈধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও বাদশাহ, নওয়াবদের বহু সংখ্যক বেগম রাখিয়া উচ্ছল যৌনজীবন যাপন, হিন্দু-সমাজে এবং অনেক প্রাচীন অসভ্য ও অর্ধসভ্য জাতিদের মধ্যে বহু– বিবাহ—এই সকলই পুরুষেরএকে-অতৃপ্তির উদাহবণ। স্ত্রীলোক স্বাধীন বাজ্ঞী হিসাবে অধিষ্ঠিত থাকিলেও এতদূর করিতে পারিত বলিয়া মনে হয় না।

বহুবিবাহ শাস্ত্রানুমোদিত বলিয়া পুরুষের বহু স্ত্রী উপভোগকে বিবাহেতর যৌনমিলন বলা হইত না। কিন্তু মুশকিল হইত এই সকল স্ত্রীলোকদের লইয়া। একজন পুরুষের পক্ষে এতগুলিকে তৃপ্তিদান সম্ভবপর হইত না, তাই স্বামীর অনুপস্থিতিতে বা অসাবধানতার সুযোগ পাইলে ইহাদের পদস্খলনের সম্ভাবনা বেশী থাকিত। বিবাহ ছাড়া শুধু কামলালসা চরিতার্থ করিবার জন্য দাস বা রক্ষিত রাখার প্রথাও বড়লোকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। বেশ্যার সঙ্গে ইহাদের বিভিন্নতা শুধু এই যে, গণিকারা সকলের, রক্ষিতা শুধু তাহার কর্তা বা রক্ষকদের উপভোগের পাত্র। অবস্থাপন্ন লোকেরা নিজেদের বাড়ীতে বা বিবাহিত স্ত্রীর ভয়ে বাগানবাড়ী বা প্রমোদাগারে ইহাদের ভরণপোষণ করিত। এমন কি, ইহুদীদের ধর্মপ্রণেতা মুসাব একটি রক্ষিতা ছিল এবং জেকবের দুইটি ছিল বলিয়া উল্লেখ আছে।

রক্ষিতার কর্তব্য ছিল রক্ষকের মনোরঞ্জন করা কিন্তু খাওয়া-পরা কিংবা বাঁধা মাহিয়ানা ছাড়া অন্য কোন কিছুতে তাহার অধিকার ছিল না। সামান্য কারণে তাহাকে ত্যাগ করা চলিত।

 চিরকুমার নোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের নিজেদেরই অনেকের এইরূপ রক্ষিতা থাকিত। সেন্ট আগষ্টাইন এই প্রথা সম্বন্ধে কতকটা উদার ছিলেন, কারণ তাহার নিজেরই প্রথম জীবনে একটি রক্ষিত ছিল।

ডঃ কিনযদের উদঘাটিত নিম্নলিখিত তুলনামূলক তথ্যাদি উল্লেখযোগ্য—

বিবাহেতর যৌনমিলন

 উৎপত্তি ও উত্তরাধিকার                     নারী                   নর

প্রাণীদের মধ্যে প্রবল পক্ষ বেশী
যৌন-সাথী পায়                                 না                     হ্যাঁ

 দুর্বলের পক্ষে সাথী পাওয়া দুষ্কর              না                     হ্যাঁ

যৌন-সাথী ছাড়া অপরক্ষেত্রে যৌনমিলন চাষ   কখনও কখনও      হ্যাঁ

নূতন ক্ষেত্রে উত্তেজনা বেশী হয়           হ্যাঁ                    হ্যাঁ

অপর কাহাবও সাথে যৌনমিলনে বাধা দেয়      সাথী             অপর নরেরা

প্রসার

পূর্ব হইতে আজকাল বেশী হয়            হ্যাঁ                   হ্যাঁ

ধর্মভাবের শিথিলতার জন্য বেশী হয়         হ্যাঁ                   হ্যাঁ

একই পক্ষের সহিত                    ৪১%                —– 

 দুই হইতে ৫ জনের সহিত                   ৪০%                ——        

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *