১.১৬ যৌনবোধের স্বাভাবিক পরিণতি

যৌনবোধের স্বাভাবিক পরিণতি

নরনারীর যৌনসম্পর্ক

আমরা পূর্ব পূর্ব অধ্যায়ে যে সমস্ত বিকল্প অভ্যাসের উল্লেখ করিয়াছি, তাহার অনেকগুলিতেই অপর লোকের দরকার হয় না। যৌনবোধের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠ প্রণালী নরনারীর যৌনসন্মিলন। উহাদের যৌন-অঙ্গসমূহকে পরস্পরের মিলনের উপযোগী করিয়া পরস্পরের প্রতি দুর্বার আকর্ষণের প্রতিষ্ঠা করিয়া, ভবিষ্যৎ বংশবৃদ্ধির ভার যৌনমিলনের উপর ন্যস্ত করিয়া প্রকৃতি নরনারীর যৌনসম্পর্ককে গৌরব ও সৌষ্ঠব দান করিয়াছে।

প্রাচীনকালের নীতিশাস্ত্রে এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রায় সর্বত্র আত্মরতিকে বদভ্যাস বলা হইয়াছে। কিন্তু আবার ইহার প্রসারও কম ছিল কারণ তৎকালে বাল্যবিবাহ প্রচলিত থাকায় স্বাভাবিক যৌনমিলন সকাল সকালই সম্ভবপর হইত। এই সকল বিকল্প-অভ্যাসের উদ্ভব বা প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে প্রথম যৌবনে বিবাহ না হওয়ার দরুন। উহাদের প্রসার হয় বিশেষ করিয়া স্বাভাবিক যৌনমিলনের অভাবে।

আমরা অন্যত্র বাল্য বিবাহ বিষবৎ পরিত্যাজ্য বলিয়া আবার অধিক বিলম্বিত বিবাহকেও অসমর্থনীয় বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছি।

মাতাপিতা ও গুরুজনের কাছে কিন্তু ইহা একটি জটিল সমস্যা। তাহারা কি চোখ বুজিয়া উদাসীন থাকিবেন? অথবা সতর্ক পাহারা দিয়া কঠোর শাসনের ব্যবস্থা করিবেন?

সমাজতত্ত্ববিদগণের সম্মুখেও ইহা একটি মহা প্রশ্ন। কৈশোর হইতেই ছেলেমেয়েদের যৌনবৃত্তির তাড়না সহ্য করিতে হইবে অথচ সমাজ স্বীকৃত একমাত্র চরিতার্থতার উপায় যে বিবাহ তাহা হইবে অনেক পরে, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে যৌবনের শেষপ্রান্তে! তবে উপায়?

নর ও নারীর মিলনেতর কামক্রীড়া

নর ও নারীর যৌনবোধ এককে অপরের দিকে আকৃষ্ট করে ও পরস্পরের যৌনমিলন বা রতিক্রিয়ার পরিণতি লাভ করে। আঙ্গিক মিলনকে ও উহার সহায়তায় উভয়ের কাম চরিতার্থতাকে আমরা প্রকৃতির অভিপ্রেত বলিয়া মনে করিতে পারি। সমাজসিদ্ধ বিবাহের দ্বারা এইরূপ মিলনের বৈধ অবাধ সুযোগ হইয়া থাকে। বস্তুত বিবাহিত এক পক্ষ অপর পক্ষকে এই উপভোগ হইতে বঞ্চিত করিলে বিবাহের কোন অর্থই হয় না—উহা ভাঙিয়া দিবার কারণ উপস্থিত হয়।

বিবাহ ছাড়া যৌনমিলন সমাজ গর্হিত বলিয়া মনে করে। এই হেতু সতীত্বনিষ্ঠা রক্ষা করার সঙ্কল্প, গর্ভভয়, রজিত রোগের ভয়, ব্যথা পাইবার ভয় ইত্যাদি নানা কারণে বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী এমন কি বিবাহিত পক্ষও অপর পক্ষের অভাবে বা অলক্ষ্যে মিলনের কামক্রীড়ায় লিপ্ত হয়, অর্থাৎ ঐ ক্রীড়া আঙ্গিক মিলন ছাড়া আর সব কিছু যথা : আদর, সোহাগ, স্পৰ্শন-চুম্বন, আলিঙ্গন, ঊরুমৈথুন, মুখমেহন প্রভৃতি পর্যন্ত গড়ায়। ইহাকে আমরা মিলনেতর কামক্রীড়া বা রতিবিহীন উপাচার (Heterosexual Petting) বলিব।

কামক্রীড়ারই লঘু পর্যায় যাহা গলদেশের নীচে গড়ায় না অর্থাৎ চুম্বনাদিতেই শেষ হয় তাহাকে ইংরাজীতে নেকিং (Necking) বলে।

মিলনেতর কামক্রীড়ার উদ্দেশ্যই যৌন-উত্তেজনা সম্পাদন। তাই আকস্মিক স্পর্শন বা চুম্বনে উত্তেজনা হইলেও উহাকে ঐ পর্যায়ে ফেলা যায় না। অথচ উদ্দেশ্যমূলক কামক্রীড়া স্পর্শন চুম্বন হইতে আরম্ভ করিয়া বহুদূর গিয়া গড়াইতে পারে। চরমতৃপ্তি লাভে শেষ হইলেও হইতে পারে– পুরুষের পক্ষে হওয়াই স্বাভাবিক। নারীর পক্ষেও মাঝে মাঝে হইয়া থাকে। প্রধানত উচ্চ শ্ৰেণীর যুবক-যুবতীরা সতীচ্ছদ বক্ষা, গর্ভ ও রতিজ রোগ গুলির আশঙ্কা নিবারণের জন্য মিলন এড়াইবার উদ্দেশ্যে ইহা করে।

বিবাহের পূর্বে বিশেষ করিয়া আমেরিকায় স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এইরূপ যৌন-আচার খুব প্রচলিত। বিবাহিত নর ও নারীও পার্টি, নাচ, মোটর বিহার, ভ্রমণ ইত্যাদিতে নিজেদের মধ্যে ও পরের সহিত এইরূপ ব্যবহার করিয়া থাকে। আঙ্গিক মিলন না হওয়ায় এইরূপ আচারকে সাধারণত মার্জিত রুচিসম্মত প্রমোদ (Flirtation) বলিয়া গণ্য করা হয়।

আদিযুগে কামক্রীড়া

বহু লোক প্রাণীজগতের পূর্ব ইতিহাস না জানিয়া অথবা আদিমানবগোষ্ঠীর কার্যকলাপ সম্বন্ধে অবহিত না থাকায় ইহাই মনে করে যে, এইরূপ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ আমেরিকার বর্তমান সমাজের নারীর অতি শিক্ষা, অবাধ স্বাধীনতা, অতি সভ্যতার ও প্রচুর ধনসম্পদের ফল। ঐ সমাজের আসন্ন ধবংস বা ক্ষয়ক্ষতিরও ইহা একটি প্রধান কারণ এইরূপ বিশ্বাসও করে।

ডঃ কিন্‌যেরা মনে করেন যে এই রীতি বহু পুরাতন। ইহাকে ইংরেজীতে Flirting, flirtage, courting, bundling, spooning, mugging smooching. larkins, sparking ইত্যাদি বলা হইত। পুরাতন সভ্যতার ইতিহাসে ইহার পরিচয় পাওয়া যায়—এমন কি পুরাতন সাহিত্যে বিশেষ করিয়া সংস্কৃত, চীন, জাপানী, গ্রীক, রোমীয়, আরবীয় গ্রন্থে এইরূপ কামক্রীড়ার শ্রেণী বিভাগ, তাহাদের বর্ণনা ও প্রত্যেকের সম্বন্ধে নির্দেশ ও উপদেশ আছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, পেরুর মৃৎশিল্পে খ্ৰীষ্টপূর্ব ৭০০ বৎসর হইতে নানারূপ কামক্রীড়ার খোদাই করা চিত্র দেখা যায়। একাদশ শতাব্দীতে নির্মিত পুরী, কোনারক প্রভৃতি স্থানের মন্দির গাত্রে নানাবিধ কামক্রীড়ায় রত বিভিন্ন আসনে মিথুনিভূত নরনারীর মূর্তি দেখা যায়। ইহুদী-খ্রীষ্টান-ইসলাম ধর্মে বিবাহের কামক্রীড়াকে নিষিদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে বোধ হয় এই বলিয়া যে, উহার প্রসার বাড়িয়া গিয়াছিল।

আমেরিকায় আজকাল উহার প্রসার বাড়িয়াছে মাত্র এবং ঐ সম্পর্কে ওখানকার সমাজের মনোভাব আর ততটা কঠোর নহে।

কলাভেদ

আমেরিকাবাসীদের মধ্যে চুম্বন আলিঙ্গন হইতে আরম্ভ করিয়া আঙ্গিক মিলন বাদে যে কোনও প্রকার কায়িক সংস্পর্শ ও দেহ ব্যবহার প্রচলিত আছে।

লঘুচুম্বন— সাধারণতঃ শুধু সংস্পর্শ, আদর সোহাগ, ও লঘু চুম্বন হইতেই ক্রীড়া আরম্ভ হয়। প্রথম বার বা প্রথম প্রথম হয়ত আর অগ্রসর নাও হইতে পারে। কেহ কেহ আবার ইহাতে কেবলমাত্র সূচনা মনে করে।

গভীর চুম্বন— ইহাতে গাল, ঠোঁট, দাঁত, জিহবা ইত্যাদির অবধি ব্যবহার হয়। চুম্বন, চোষণ, দংশন পর্যন্ত গড়ায়। স্তন ও গোপনাঙ্গ চুম্বন ক্ষেত্র বিশেষে হইয়া থাকে।

স্তন ব্যবহার— নারীর স্তন অনুভূতিশীল। ইহার ব্যবহার পুরুষের পক্ষে এক সার্বজনীন আনন্দজনক অভ্যাস। হস্ত ও মুখ স্থাপন, প্রচাপন ও চোষণ চলিয়া থাকে। তাহাতে নারীর বিশেষ সুখ অনুভূতি হয়। আমেরিকায় নাকি নারীস্তনের দিকে পুরুষের ঝোঁক ইউরোপের চেয়ে বেশী। ইউরোপের বহু জায়গায় নারীর পায়ের গোছের (ankle) ও নিতম্বের নাকি কদর অত্যধিক।

মানবেতর দুগ্ধপায়ী জন্তুদের মধ্যে স্তনের ব্যবহার কদাচিত দৃষ্ট হয়। কুকুর ও শূকরের মধ্যে কখনও কখনও ইহা দেখা যায়। মানুষের মধ্যে স্তনে মুখ প্রয়োগ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

যৌনাঙ্গে হস্তসঞ্চালন— এরূপ আচরণ নারী অপেক্ষা পুরুষ অনেক বেশী করে এবং অনেক পুরুষ চায় যে নারী তাহাদের অঙ্গ ঘাটাঘাটি করুক। নারীর সঙ্কোচ, সলজ্জভাব এবং প্রকৃতিগত সূক্ষ্ম সুরুচি বোধ হয় ইহার জন্য দায়ী। ইহাতে তাহার বেশী সুখানুভূতি জাগে না এবং পুরুষের অনুরোধে বা পীড়াপীড়িতেই সে এইরূপ আচরণে সম্মত হয়। ডঃ কিনযেরা সংখ্যানুপাত দিয়া এই তারতম্য বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন।

যৌনাঙ্গে মুখপ্রয়োগ— মানবেতর জন্তুতে এইরূপ কামক্রীড়া সচরাচরই দৃষ্ট হয়। ইহুদী, খ্ৰীষ্টান ও ইসলাম ধর্মনীতি মানুষের মধ্যে ঐরূপ আচরণ গর্হিত বলিয়া নির্দেশ দিয়াছে। এই হেতু এবং সাধারণ শালীনতা বোধের দরুন এইরূপ আচরণ হইলেও খুব কম এবং কামক্রীড়ার নিবিড় পর্যায়ে হইয়া থাকে। পুরুষের চেয়ে নারীর ইহাতে আপত্তি আরও বেশী। সংস্কারসৃষ্ট লজ্জা, শালীনতাভাব, ঘৃণার উদ্রেক ইত্যাদি কারণেই এইরূপ আচরণের অনুপাত কম হইয়া থাকে।

যৌনাঙ্গ-সংস্পর্শ— প্রকৃত রতিক্রিয়া বাদ দিবার সংকল্প লইয়াও কামক্রীড়ার পর্যায় বিশেষে পরস্পরের অঙ্গ-সংস্থাপন হইয়া থাকে। নারীর ঊরুদ্বয়ের মধ্যে ভগের উপরে শিশ্ন ঘর্ষণ করা হয়। গর্ভ ও রতিজ রোগগুলির ভয়ে এবং সতীচ্ছদ রক্ষার জন্য নারী সাধারণত ইহার বেশী অনুমতি দেয় না, অথবা উভয়েই সুবিবেচক ও সংযমী হইলে এই সীমা অতিক্রম করে না। অবশ্য ইহার বেশী অর্থাৎ প্রকৃত যৌনমিলন হইয়া গেলে উহা বিবাহের মিলনের পর্যায়েই পৌছে।

প্রসার পৌনঃপুনিকতা

বাল্যে সাধারণতঃ যাহা হয় তাহা নিছক ক্রীড়াচ্ছলেই বেশী হয়। কৈশোরে পুরুষ উহার স্বাদ বা সুখ উপভোগ করে এবং উদ্দেশ্যমূলক ক্রীড়ায় রত হয়। এইভাবে আমেরিকার কিছু কিছু কিশোর তাহাদের প্রথম রেতঃপাত করে এবং ১৫ বৎসর বয়সের মধ্যে উহাদের সংখ্যা বেশ বাড়িয়া যায়। তারপর ক্রমেই বাড়িতে থাকে।

ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে প্রায় শতকরা ৮৮ জন পুরুষ বিবাহের পূর্বে এইরূপ কামক্রীড়া করিয়াছে বা করিবে। বিবাহের পূর্বে ২৮% ইহাতে চরম তৃপ্তি লাভ করে। ১৬ হইতে ২০ বৎসর বয়সের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক অর্থাৎ ৩৩% করে। নারীদের মধ্যে শতকরা ৪০ জন ১৫ বৎসর পর্ষন্ত বয়সের মধ্যে শতকরা ৫৯ হইতে ৯৫ জন ১৮ বৎসর বয়সের মধ্যে এবং যাহারা বিবাহ করিয়াছে তাহাদের মধ্যে শতকরা প্রায় ১০০ জনই কোনও-না-কোনও সময়ে এইরূপ আচরণে লিপ্ত হইয়াছে। প্রায় এই সমস্ত শ্রেণীর মেয়েদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ উহাতে চরম তৃপ্তি লাভ করিয়াছে। কিনযেদের মতে এই অভ্যাসের প্রসার পূর্ব পূর্ব কাল হইতে বর্তমানেই সমধিক।

অভ্যস্তদের মধ্যে কেহ কেহ প্রায় প্রতিদিন বা রাত্রেই চরম তৃপ্তি লাভ করে। কেহ কেহ সপ্তাহে, মাসে বা বৎসরে এক বা একাধিকবার এরূপ করিবার সুযোগ পায়। অবশ্য হস্তমৈথুন ইত্যাদি প্রক্রিয়াও চলিতে থাকে। হাই স্কুল ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই ইহার প্রকোপ খুব বেণী (প্রায় ৯২%) নিম্নশ্রেণীর অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিতদের মধ্যে ইহা অপেক্ষাকৃত অনেক কম। তাহারা ইহাকে যৌনবিকৃতি মনে করে। তাহাদের কিশোর-কিশোরীর মধ্যে উচ্চ শ্রেণীর অপেক্ষা সহবাস অল্প ঘনিষ্ঠতাতেই হয়, সুতরাং তাহাই অপেক্ষাকৃত অধিক দেখা যায়। কেহ পর পর বহু সঙ্গীর সংস্পর্শে আসে আর কেহ কয়েকজন আবার কেহ বা ২-১ জনেই সীমাবদ্ধ থাকে।

স্বপ্নদোষের চেয়ে খানিকটা কম ক্ষেত্রে পুরুষের রেতঃপাত এই প্রক্রিয়ায় হয়। সামাজিক তাৎপর্যে কিন্তু ইহার গুরুত্ব বেশী। কিশোর-কিশোরীর মধ্যে আলাপ, আলোচনা, আদর, সোহাগ ও ভদ্র ব্যবহার ছাড়া জোরপূর্বক ইহা ঘটে না, এই হেতু ইহা সামাজিক মেলামেশা খানিকটা সুগম করে। অপর পক্ষে এই ক্রীড়া শেষ পর্যন্ত যৌন-মিলনে পর্যবসিত হইয়া ব্যভিচার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও থাকিয়া যায়।

সাধারণত পুরুষ পক্ষই এই ক্রীড়ার সূত্রপাত করে এবং সকর্মক অংশ গ্রহণ করে। উম্মুক্তস্থানে বা প্রকাশ্যভাবে লঘুক্রীড়া সচরাচর আমেরিকায় দৃষ্ট হয়। গোপনে উহা আরও ব্যাপক ও গুরুতর পর্যায় ধারণা করে। ডঃ কিনযের মতে আঙ্গিক রতিক্রিয়াকে এড়াইয়াই এই ক্রীড়া বেশীর ভাগ অনুষ্ঠিত হয়। এই ক্রীড়ার প্রসার বাড়িয়া থাকিলেও নাকি বিবাহ-পূর্ব যৌন-মিলনের অনুপাত বাড়ে নাই।

ফলাফল

এরূপ কামক্রীড়ার ফলাফল সম্পর্কে অভ্যস্তদের মধ্যে নানারকম অভিমত ও আশঙ্কা থাকে। ভবিষ্যৎ বিবাহজীবনে ইহার প্রতিক্রিয়া কি হইবে তাহা লইয়া অনেকে চিন্তিত হইয়া পড়ে। মোটের উপর, কামাবেগের চরমতৃপ্তি পর্যন্ত পৌছিলে শরীর বা মনের উপর উহার অনিষ্টকর পরিণতির কোনও আশঙ্কা নাই। অপরিণত বা অপরিমিত উত্তেজনা ও অশান্ত-সমাপন ক্ষতিকর হইতে বাধ্য। সমস্ত দেহ ও মন উত্তেজিত বহিয়া গেলে এবং এইরূপ বারে বারে হইতে থাকিলে কোমর, অণ্ডকোষ ও কুঁচকিতে বেদনা, অনিদ্রা, মাথাঘোরা, অজীর্ণতা ও নানাবিধ স্নায়বিক গোলযোগ উপস্থিত হইতে পারে।

সামাজিক গুরুত্ব

আমাদের দেশে–তথা প্রাচ্যে-নর ও নারীর অবাধ মেলামেশার সুযোগ না থাকায় এইরূপ কামক্রীড়ার প্রকোপ অপেক্ষাকৃত বহু কম। কিন্তু পর্দাপ্রথার অন্তরালেও যে ইহা একেবারে নাই তাহা বলা চলে না। নরনারীর আরও ব্যাপক মেলামেশার সুযোগ দিবারই আমরা পক্ষপাতী এই হেতু—আমাদেরও এ সম্পর্কে অবহিত হইতে হইবে। বস্তুত এদেশেও গুরুজন, শিক্ষকগোষ্ঠী ও নীতিবাগীশদের এই অভ্যাসের প্রসার ভাবাইয়া তুলিয়াছে।

সারা প্রাণীজগতে জীবজন্তুর একটা সার্বজনীন অভ্যাস প্রিয় বস্তু অঙ্গ বা অপর জীবের স্পৰ্শন বা প্রচাপনে সুখবোধ করা। মানব শিশুও শৈশব হইতে এইভাবে অভ্যস্ত হয়—মাতা, নার্স বা বন্ধুবান্ধবের শরীরের সংস্পর্শে আসিয়া উত্তাপ, মায়া-মমতা ও অবস্থাবিশেষে স্নায়বিক উত্তেজনা লাভ করিয়া সুশ্রী হয়।

একটু বয়স বাড়িলেই পিতামাতার কায়িক সংস্পর্শ কমিয়া যায়, গুরুজন অপরের স্পর্শন গর্হিত বলিয়া বুঝাইয়া দেন, এবং মেয়েদেরকে ছেলেদের নিকট সম্পর্ক স্থাপনের বিরুদ্ধে সাবধান করেন। অর্থাৎ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যে কায়িক সংস্পর্শ পুলকপ্রদ ছিল তাহাকে বর্জন করিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই পৃথক ও ভিন্ন জীবন যাপন বহু বৎসর পর্যন্ত করিয়া বিবাহের পর আবার নিবিড় সংযোগের পরিস্থিতি উপস্থিত হয়। তখন উভয়ের সংকোচ বোধ, উদ্ভটআচরণ বিশেষ করিয়া-নারীর উৎকণ্ঠা, উদাসীনতা, কামশীলতা পীড়াদায়ক হওয়া আশ্চর্যের বিষয় নহে।

পাশ্চাত্যদেশে–-বিশেষ করিয়া আমেরিকায় ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকায় তাহাদের মধ্যে মিলনের নানাপ্রকার কামক্রীড়ার প্রসার দেখা দিয়াছে। নীতিবাগীশদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করিয়া তাহারা বিবাহ পূর্ব উত্তেজনা প্রশমন চাহে –একান্ত আঙ্গিক মিলন বা রতিক্রিয়াকে এড়াইয়া তাহারা মনে করে ইহাতে তাহাদের সতীত্ব বজায় থাকে শুধু নির্দোষ আমোদ-প্রমোদে উত্তেজনা প্রশমিত হয় মাত্র।

প্রাচ্যের লোকেরা এরূপ মতবাদকে সমর্থন নাও করিতে পারে। ইহাদের মতে ত চুম্বন আলিঙ্গন, আঙ্গিকবেষ্টনীসহ নৃত্য ইত্যাদিও দুষণীয়। এরূপ মনোভাবের জন্য ইহাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন, ঐতিহ্য ও প্রথা দায়ী।

পাশ্চাত্য বহু পণ্ডিত- বিশেষ করি ফ্রয়েড ও তাহার অনুবর্তীরা প্রচণ্ড কাম নিষ্পেষণের যে ভয়াবহ কুফলাদি অঙ্কিত করিয়াছেন তাহা হইতে প্রতীয়মান হইবে যে, বিবাহপূর্বে খানিকটা শিথিল যৌন-আচরণের অভাবে নর ও নারীর পরবর্তী দাম্পত্য জীবন অসুখী না হইয়া আরও ফলপ্রসূ হওয়াই স্বাভাবিক। উভয়েই সম্মতিক্রমে, আস্তে আস্তে এমন কি বহুবারের সংস্পর্শে নারীদের কামক্রীড়া লঘু হইতে গুরু পর্যায়ে পৌছে। তাই ক্রমবর্ধমান যৌন অভিজ্ঞতা বিবাহকে আর ভীতিপ্রদ অনুষ্ঠান বলিয়া মনে করিতে দেয় না। মনের মত স্বামী হইলে শুরুতে নারীর চরমতৃপ্তি সহজে ও প্রায়ই হয়। পক্ষান্তরে আমাদের দেশের অজানা বা অল্পজানা পাত্রীকে বিবাহের প্রথম দিকেই পূর্ণ রতিক্রিয়ার প্রায় আকস্মিক আক্রমণে সাধারণতঃ আতঙ্কিত, ঘৃণান্বিত, ব্যথিত কিংবা আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়।

বহু নারী অপরের উপদেশ বা পুস্তকপাঠের চেয়ে বেশী এইরূপ কামক্রীড়ায়ই যৌন-আচরণের এবং নরনারীর কায়িক ও মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণের প্রকৃত স্বরূপ, তাহার ফলাফল ও সে সম্বন্ধে কর্তব্যাকর্তব্য বুঝিতে পরে।

ডঃ কিনযেদের মতে ঐরূপ আচরণ ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী বিবাহ জীবনে সচ্ছলতা আনয়ন করে। বিবাহিতা নারীদের চরমপুলকলাভে অপারগতা এইরূপ পূর্ব অভিজ্ঞতা অনেকটা দূর করে।

বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবার যোগ্য এই যে প্রথা বা আচরণ বিশেষের নিজস্ব ক্ষয়-ক্ষতি করণের চেয়ে সমাজের ভ্রূকুটি, নিন্দাবাদ এবং অভ্যস্তদের ধরা পড়িবার উৎকণ্ঠা ও ভীতি বেশী মারাত্মক হয়। স্বমেহনের অপকারিতাও এইজন্য। কুফলের ভীতি অপসারিত হইলে এইরূপ ক্রিয়াকলাপ সাময়িক উপভোগের মতই নির্দোষ বলিয়া সাব্যস্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *