১.১৪ যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (৪)

যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (৪)

যৌনবিকৃতি (Perversions)

আমরা যৌনবোধের উন্মেষের যে ক্রমবিকাশের ধারা বর্ণনা করিয়াছি, তাহাই সাধারণ ধারা। কারণ, ঐ সমস্ত লক্ষণের অধিকাংশই মানসিক এবং উহাদের কোন একটি বা অধিকাংশের স্বল্পতা বা আধিক্যের জন্য মানুষ স্বাভাবিক যৌন জীবনের বৈশিষ্ট্যচ্যুত হয় না। সুতরাং পূর্ববণিত লক্ষণসমূহ স্বাভাবিক।

পূর্বকালে লোকের ধারণা ছিল যে, মানুষের যৌনক্রিয়ার রূপ ও প্রণালী একটি মাত্র। যৌনপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সকল দেশের সকল শ্রেণীর যুবক ইহা অনুমান করিয়া লইত এবং প্রকৃতি তাহাকে যতটা শিক্ষা দিত, তাহার পক্ষে তদপেক্ষা অধিক শিক্ষা পাইবার কোনও সম্ভবনা ছিল না, কারণ পিতামাতা ও গুরুজন এ বিষয়ে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরুত্তর। কিন্তু ইদানীং বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে অনুসন্ধানের ফলে দেখা যাইতেছে যে, বাহ্যত স্বীকার না করিলেও ভিতরে ভিতরে অনেকেই সদ্যোগে বহু প্রণালী অবিষ্কার ও অবলম্বন করিয়া আসিতেছে। ইহাদের যত প্রকার অবস্থান ও ক্রিয়ার বিভিন্নতাই বিদ্যমান থাকুক না কেন, সে সমস্তকে অস্বাভাবিক বলা উচিত হইবে না।

কেলির স্বাভাবিক বৈচিত্র্য

স্বাভাবিক রতিক্রিয়া সুসম্পন্ন করিবার উদ্দেশ্যে, উত্তেজনা সাধন করিবার জন্য যত প্রকার উপায় অবলম্বন করা হয়, তাহার সবগুলিই কৃষ্টি ও সুচিসম্পন্ন লোকের রুচিসঙ্গত না হইতে পারে, কিন্তু যেহেতু ঐ সমস্ত প্রক্রিয়া অবলম্বন করিবার একমাত্র উদ্দেশ্য স্বাভাবিক সঙ্গম করিবার যোগ্যতা ও শক্তি লাভ করা, সেইজন্যই উহাদের উক্ত পণ্ডিতগণ অস্বাভাবিক বলেন নাই।

গৌণ পন্থা

কোনও প্রক্রিয়ার সহিত যদি নারীপুরুষের স্বাভাবিক মিলনের সুস্পষ্ট বিরোধ বিদ্যমান থাকে এবং কোন স্তরেই যদি উহার সহিত প্রজনন-ক্রিয়ার কোনও সম্পর্ক না থাকে, তবে তাহা যতই দৈহিক ও মানসিক আনন্দদায়ক হউক না কেন, উহাকে স্বাভাবিক মিলন বলা যাইতে পারে না। এই সমস্ত কিয়াকে যৌনবিকৃতি না বলিয়া কামচরিতার্থতার গৌণ পন্থা বলা যাইতে পারে।

যে সমস্ত ক্রিয়াকে কোনও রূপেই স্বাভাবিক অর্থাৎ বিপরীত লিঙ্গের সহিত যৌনক্রিয়ার অবস্থাবিশেষ, আখ্যা দেওয়া যাইতে পারে না, উহা বাহ্যত যৌনক্ষুধার তৃপ্তির উদ্দেশ্যেই সাধিত হইয়া থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, আত্মরতি, সমমৈথুন, প্রভৃতি। এই সমস্ত ক্রিয়া কোনও অবস্থাতেই প্রজনন ক্রিয়ার সহায়ক হইতে পারে না। তাহা ছাড়া ইহাদের সহিত স্বাভাবিক নারীপুরুষ সঙ্গমের কোন সম্বন্ধ নাই। তথাপি এই সমস্ত ক্রিয়া মানুষ উত্তেজনা বর্ধন ও প্রশমনের জন্যই করিয়া থাকে।

যৌন-বৈপরীত্য (Transvestism or Eonism)

সংজ্ঞাবিপরীত লিঙ্গের আচার ব্যবহার ও বিশেষত্ব পরিগ্রহ করার নাম যৌন-বৈপরীত্য। Trans (অর্থাৎ Transference) এবং Vesta (অর্থাৎ clothing) শব্দের যোগে Transvestisn শব্দের উৎপত্তি। কতক নারী পুরুষের মত ও কতক পুরুষ নারীর মত পোষাক-পরিচ্ছদ ও আচার-ব্যবহারে আগ্রহ দেখাইয়া থাকে। Chevalier d’ Eon নামক এক ব্যক্তির নাম হইতে এই প্রবৃত্তির নাম Eonism রাখা হয়। এই লোকটির জীবনের ৪৯ বৎসর পুরুষ হিসাবে এবং ৩৪ বৎসর নারী হিসাবে কাটে। মৃত্যুর পর পরীক্ষায় তাহার প্রকৃত লিঙ্গ যে নর ছিল তাহা প্রকাশ পায়।

প্রসার— এইরূপ প্রবৃত্তিবিশিষ্ট লোক একেবারে বিরল নহে, তবে অনেকে নিজের স্বরূপ চেষ্টা করিয়া গোপন রাখে। সামান্য ঝোঁক সামলাইয়া যাওয়া কঠিন নহে। মেয়েলী ধরনের পুরুষ এবং পুরুষালী ধরনের নারী মাঝে মাঝে দেখা যায়। তবে উগ্র প্রকৃতির ঝোঁক প্রকাশ হইয়াই পড়ে।

সমধিক মাত্রা— উগ্ৰপ্ৰকৃতির দৃষ্টান্ত দিতে গিয়া হার্সফেল্ড জনৈক ৪০ বৎসর বয়স্ক লোকের কথা লিখিয়াছেন। ইনি বার্লিনের একটি বড় হোটেলে রান্নার কাজ করিতেন। ছয় বৎসর বয়সে ইহাকে বালকের মত পোষাক পরাইতে পিতামাতার বিষম বেগ পাইতে হয়; তিনি তাহার পুরুষাঙ্গ বাঁধিয়া রাখিয়া প্রকাশ করেন যে, ঐ অঙ্গটি তাহার ক্ষেত্রে অনাবশ্যক। ইহার পর হইতে তিনি নিজের ভগ্নীদের কাপড়-চোপড় পরিয়া মেয়েদের মত বেড়াইতে ভালবাসেন। তিনি লেখাপড়ায় বালকের মত কৃতিত্ব অর্জন করেন, কিন্তু ১৪ বৎসর বয়সে তাঁহাতে সমকামের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তিনি বাড়ী ছাড়িয়া অন্যত্র গিয়া নারীর বেশে জীবন যাপন করিতে থাকেন। পুরুষাঙ্গকে নারীর অঙ্গে রূপান্তরিত করিবার চেষ্টাও করিতে লাগিলেন। ১৯২১ সালে তিনি অস্ত্রোপচারে অণ্ডকোষ ছেদন করেন। ১৯৩০ সালে তিনি অস্ত্রোপচারে পুরুষাঙ্গ কাটিয়া ফেলিলেন এবং পরে কৃত্রিম নারী অঙ্গ সংযোগ করিলেন। কিছুদিন পূর্বে ডেনমার্কের শিল্পী Einer Wegener নিজের অণ্ডকোষ বা পুরুষাঙ্গ অস্ত্রোপচারে ছেদন করাইয়া, ডিম্বকোষ ও কৃত্রিম স্ত্রী-অঙ্গ স্থাপন করিবার প্রচেষ্টায় মারা যান।

যেখানে পুরুষ নারীর এবং নারী পুরুষের চরিত্রগত ও দেহগত বৈশিষ্ট্য পরিগ্রহ করে এবং তদনুসারে রতিকার্য সম্পন্ন করে বা ঐরূপ চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে যৌন-বৈপরীত্য বলা যাইতে পারে। কতকক্ষেত্রে ঐরূপ আচারব্যবহারের আজীবন চেষ্টা, আবার কতকক্ষেত্রে সাময়িক বা কিছুকাল স্থায়ী প্রবণতা দেখা যায়। পুরুষের মধ্যেই এই অভ্যাসের প্রচলন বেশী থাকিলেও নারীর মধ্যেও উহার প্রচলন নিতান্ত কম নহে। বড় বড় যৌন-বিজ্ঞানবিদ উহার বহুল প্রচার দর্শনে ইহাকে অস্বাভাবিক বলিতে সাহস করেন নাই। তাহাদের যুক্তি এই যে, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত মানুষের যাহা সাধারণ অভ্যাস, তাহাকে অস্বাভাবিক বলা যায় কিরূপে? সমমেহন উক্ত কারণে অস্বাভাবিক নাও হইতে পারে, কিন্তু উহা যে প্রকৃতিবিরুদ্ধ, তাহা অবশ্যই বলিতে হইবে। কারণ, দৈহিক গঠনপ্রণালী হইতে স্পষ্টই দেখা যায় যে, সমকাম প্রকৃতির অভিপ্রেত তো নহেই, বরং প্রকৃতির নির্দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই জন্য পুরুষের অকর্মক ও নারীর সকর্মক স্থায়ী সমমৈথুনকে আমরা যৌনবৈপরীত্য বলিব।

অবশ্য সাময়িক সমকামের কথা স্বতন্ত্র। উহা স্বাভাবিক মিলন বা কাম-চরিতার্থতার সুযোগের অভাবে প্রকাশ পায় মাত্র। কতকক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে, নর বা নারী তাহার নিজের শ্রেণীর উপর এত বিদ্বেষভাবাপন্ন হইয়া পড়ে যে, অপর শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য পরিগ্রহ করিতে চায়। কতকক্ষেত্রে অপর শ্রেণীর কাপড়-চোপড়ের প্রতীকানুরাগ এইরুপ যৌনবিকল্পে প্রকাশ পায়। ধর্ষণ করিবার বা ধর্ষিত হইবার বাতিকও এই বিকল্পে রূপান্তরিত হয়।

কিনযেদের সিদ্ধান্ত

ডঃ কিনষেদের অনুসন্ধানে প্রকাশ পায় পুরুষের মধ্যে নারী অপেক্ষা এই বাতিক বেশী।

অভিনয় নয় কোনও বিশেষ ব্যাপারে (যথা, মুখোশধারী নৃত্য, নাটকাভিনয় প্রভৃতিতে) বিপরীত শ্রেণীর পরিচ্ছদ পরিধান করাকে যৌন-বৈপরীত্য বলা যায় না। সমাজে বিপরীত শ্রেণীর ব্যক্তি বলিয়া গণ্য হইবার বাসনাকেই প্রকৃত যৌন-বৈপরীত্য বলা যায়।

কোনও কোনও মনোরোগ চিকিৎসক সমস্ত যৌন-বৈপরীত্যকে সমকাম মনে করেন। ইহা ঠিক নয়। এই দুইটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যাপার। যৌন-বিপরীত ব্যক্তিদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই তাহাদের শারীরিক সম্পর্কে সমকামী।

সমকামীর ছদ্মবেশ— অবশ্য কতক সমকামী পুরুষ নারীবেশ ধারণ ও নারীর চালচলন অনুকরণ এই জন্য করে যে তাহারা ঐ ভাবে অপর পুরুষদের আকর্ষণ করিতে পারিবে। অল্প কতকক্ষেত্রে বিপরীত শ্রেণীর পরিচ্ছদের প্রতি প্রতীকানুরাগ থাকায় যৌন-বৈপরীত্য গড়িয়া উঠে। কিন্তু বিপরীত শ্রেণীর পোষাক পরিলেই কাহারও মূল যৌন-প্রকৃতি-বিপরীতকাম বা সমকাম পরিবর্তিত হইয়া যায় না।

লম্পটের ছদ্মবেশ— কখনও কখনও কোনও সম্পূর্ণ বিপরীতকামী পুরুষ স্ত্রীবেশ এইজন্য ধারণ করিয়া থাকে যে, প্রতিবেশীরা তাহাকে নারী ভাবিলে সে কাহারও কোন সন্দেহের উদ্রেক না করিয়া প্রণয়িনীর সহিত বাস করিতে পারিবে এবং সুবিধা হইলে অপর রমণীদেরও উপভোগ করিতে পারিবে।

সমলিঙ্গের প্রতি ঘৃণা— কখনও কখনও কোন ব্যক্তি নিজ শ্রেণীর প্রতি ঘোর বিদ্বেষবশত বিপরীত শ্রেণীর পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া থাকে। বিপরীত শ্রেণীর প্রতি তাহার যৌন-আকর্ষণ হইতেও পারে নাও হইতে পারে।

নারীপূজা— কখনও কখনও কোন পুরুষ মনে মনে নারীকে এত উচ্চাসন দেয় যে, সে তাহাদের সহিত কামসম্পর্ক স্থাপনের চিন্তাতে বিরক্ত হয়। আবার নিজ শ্রেণীকে অপছন্দ করার জন্য তাহাদের সহিতও কাম সম্পর্ক স্থাপন করে না। এই ভাবে তাহার কামোপভোগের কোন সুযোগই থাকে না।

র্ষণকামীর ছদ্মবেশ— অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষিত হইবার বাসনাসম্পন্ন পুরুষ (ধর্ষণকামী—Masochist) নারীবেশ ধারণ এইজন্য করে যে, অপর পুরুষ তাহাকে নারী ভাবিয়া নারীদের যেরূপ অধীনস্থ (Subjugate) করে, তাহাকেও সেইরূপ করিবে।

ইহা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কোনও ব্যক্তির মানসিক ব্যাপারে বিশেষ ভাব গঠনের ক্ষমতার উপর যৌন-বৈপবীত্য বহুলাংশে নির্ভর করে।

নরনারীর পার্থক্য— প্রতি ১০০ জন যৌন-বিপরীত পুরুষের স্থলে ২, ৩ অথবা বড়জোর ৬ জন ঐরূপ নারী যৌন-বৈপরীত্য এই সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে, পুরুষেরা নারী অপেক্ষা অনেক অধিক ক্ষেত্রে ও অধিক পরিমাণে মানসিক উত্তেজনা দ্বারা মনোভাব গঠন করে। যে পুরুষেরা নারী বলিয়া গণ্য হইতে চাহে, তাহারা প্রকৃতপক্ষে কোনও মনোভাবে অভ্যস্ত হইবার ক্ষমতায় খুবই পুরুষালী।

পূর্বেই বলা হইয়াছে, এই সমস্ত যৌন-বিকল্পের মধ্যে সহজাত ও অভ্যাসজাত বলিয়া কোনও সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা সম্ভব নহে। কারণ, মানবের সহজাত ও অভ্যাসজাত গুণসমূহেব অধিকাংশ এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, উহার কোনটার কতখানি সহজাত এবং কোনটার কতখানি অভ্যাসজাত তাহা বলা কঠিন। মানবের অন্যান্য বৃত্তির ন্যায় যৌনবৃত্তিসমূহেরও কোনটা সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে সহজাত এবং কোনটা অভ্যাসজাত তাহা বলা আরও কঠিন।

ডাঃ বাডিন ও ডাঃ ফোবেল মানবের অধিকাংশ যৌন-বিকল্পকে সহজাত বলিয়াছেন। পক্ষান্তরে ডাঃ হার্সফেল্ড ও উলবীকস অধিকাংশ বিকল্পকে অভ্যাসজাত বলিয়াছেন এবং উভয় পক্ষ নিজ নিজ মত প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁহাদের চিকিৎসক-জীবনের দুই-একটা অভিজ্ঞতারও উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু যেহেতু আমাদের এ পুস্তক সাধারণ পাঠকের জন্যই লিখিত, সেই জন্য আমরা অসাধারণ সূত্রের দ্বারা কোনও সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার পক্ষপাতী নহি। সুতরাং যৌনবিকল্পসমূহকে অভ্যাসজাত ও সহজাত এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত না করিয়া আমরা সাধারণভাবে উহাদের বিবরণ প্রদান করিব এবং প্রসঙ্গত উহাদের সহজাততা এবং অভ্যাসজাততার আলোচনা করিব।

মানুষের যৌনবিকল্পের কতকগুলি শৈশবেই তাহাদের চরিত্রে সুস্পষ্টপে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথমতঃ এইগুলিকেই সহজাতবাদীরা সহজাত বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। এলিস ও ডাঃ গ্রেসহেলথ শিশুজীবনের এই সমস্ত বিকল্পকে প্রধানতঃ গৃহের পারিপার্শ্বিকতা ও পিতামাতার প্রভাবের ফল বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহার পর বিদ্যালয়ে সহপাঠীগণের প্রভাবও আছে। সহপাঠী ও খেলার সাথীদের প্রভাব শিশুজীবনের উপর এত বেশী যে, অধ্যাপক উইনিক্রেভ কালিস বলিয়াছেন—শিশুই শিশুদের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী শিক্ষক। সুতরাং কতকগুলি বিকল্প শৈশবেই দেখা দেয় বলিয়া উহাদিগকে সহজাত বলিবার কোনও বিজ্ঞানসম্মত কারণ নাই।

প্রতীকানুরাগ

ফ্রয়েড ও তাহার অনুবর্তীগণের অভিমত এই যে, শৈশবে বালকরালিকার মধ্যে যে যৌনবিকৃতি আত্মপ্রকাশ করে, তাহা প্রধানত মলমূত্রদ্বার-সম্পর্কিত। মলমূত্রদ্বারের সহিত মানবের যৌন-অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত যে, এই দুই শ্রেণীর প্রত্যঙ্গের দৈহিক ও মানসিক নৈকট্য অতি সহজেই উপলব্ধি হইয়া থাকে। পুরুষের মূত্রপথ তাহার যৌনপথের সহিত যতটা ঘনিষ্ঠ, নারীর মূত্রপথ ও যৌন-ইন্দ্রিয় বাহ্যত না হইলেও কার্যতঃ প্রায় ততটা ঘনিষ্ঠ। শিশুমনোবিজ্ঞানীদের অভিমত এই যে, যৌনক্রিয়া শিশুদের চক্ষের আড়ালে করা হয় বলিয়া এবং শিশুমনের কৌতূহল অতিশয় প্রবল বলিয়া, শিশুরা নিজেদের অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে যৌনক্রিয়া সম্বন্ধে একটা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিয়া থাকে। এই ধারণা হইতে মলমূত্র ত্যাগের ব্যাপার ও মলমূত্রদ্বার শিশুমনে একটা অসামান্য কৌতূহল সৃষ্টি করে।

যৌন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সহিত আকারগত ও ক্রিয়াগত সামঞ্জস্যবিশিষ্ট দ্রব্যাদি দর্শনে যৌনবৃত্তির জাগরণ ও তজ্জন্য ঐ সমস্ত জিনিসের প্রতি প্রতীকানুরাগ (Fetishism) নারীপুরুষের প্রায় সকল বয়সের একটি যৌনবৈশিষ্ট্য। যৌনবোধ ও রুচির পার্থক্য অনুসারে এই শ্রেণীর দ্রব্যের সংখ্যা এত বেশী যে, উহাদের শ্রেণী ও সংখ্যা নির্ধারণ করা এক প্রকার অসম্ভব, এবং অসম্ভব বলিয়াই আমাদের দেশের আইনে অশ্লীলতার যে সংজ্ঞা দেওয়া হইয়াছে, তাহা অসম্পূর্ণ এবং অকর্মণ্য।

মিঃ এলিস ডাঃ জেলিকীর এক রোগিণীর কথা উল্লেখ করিয়াছেন। এই রোগিণীর ১৩-১৪ বৎসর বয়সে যৌনবিকৃতি দেখা দেয়। এই বালিকা স্বীয় চিকিৎসকের কাছে লিখিতেছে-“আমার বয়স যখন ১৩-১৪ বৎসর, তখন হইতে আমাকে যৌনবিকৃতি তন্ময় করিয়া রাখিত। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইহা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আমি চতুর্দিকে সমস্ত দ্রব্যাদিতে কেবল পুরুষের লিঙ্গের ও রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখিতে পাইতাম।…”

ডাঃ মালিনোস্কিব এক ২৭ বৎসর বয়স্কা রোগিণীর যৌনবিকৃতি আরও অদ্ভুত। এই রমণী গতিশীল জাহাজ দেখিলেই রতিবাসনায় উন্মত্ত হইয়া উঠিত। ছুরি, সাপ, ঘোড়া, কুকুর, ইঞ্জিন, বৃক্ষ, কদলী, মৎস্য প্রভৃতিও তাহার মনে তীব্র বাসনা জাগ্রত করিত; বৃষ্টির জল, মূত্র এবং অশ্রু দেখিলে পুরুষের শুক্রের কথা মনে পড়িত এবং সে তৎক্ষণাৎ বিবাহের জন্য অধীর হইয়া উঠিত।

যৌন-অঙ্গের সহিত সাদৃশ্য ছাড়াও কোন কোন ক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের ব্যবহৃত বা ব্যবহার্য জুতা, ছাতা, কাপড় ইত্যাদি কোন দ্রব্যবিশেষের দর্শন ও স্পর্শনে স্বতঃই প্রবল কামোদ্রেক হওয়াও এই পর্যায়ে পড়ে। এই জন্য এই বাতিকগ্রস্ত লোকেরা এই সকল দ্রব্য চুরি করিয়াও সঞ্চিত করিতে থাকে।

অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়াছে যে, দুই চারজন স্ত্রীলোকের এই বাতিক থাকিলেও পুরুষদের মধ্যেই ইহার প্রকোপ বেশী। কিন্তু চুরির বাতিক অতৃপ্ত যৌন-জীবনযাপনকারী বয়স্কা নারীদের মধ্যে দেখা যায়।

উপরোল্লিখিত দ্রব্যাদি ও জীবজন্তু সর্বদাই সর্বত্র দৃষ্ট হয়। সুতরাং কি দেখিয়া কাহার মনে বাসনা জাগ্রত হইতেছে, তাহা নির্ণয় করা একরূপ অসম্ভব। তবে কথা এই যে, মনের একটা বিশেষ অবস্থা না হইলে এরূপ প্রতীকানুবাগ ও সাদৃশ্যানুভূতি জাগ্রত হয় না। এক ব্যক্তি যে জিনিসটির সহিত যৌনাঙ্গে সৌসাদৃশ্য লক্ষ্য করিবে, অন্য ব্যক্তি হয়ত তাহাতে কিছু লক্ষ্য করিবে না। সুতরাং স্নায়ুমণ্ডলী বিশেষভাবে প্রভাবিত না হইলে সচরাচর এইরূপ যৌনপ্রকৃতি দৃষ্টিগোচর হয় না। ইচ্ছা করিলে যে কেহ চেষ্টা করিয়া যে-কোনও জিনিসের সহিত যে-কোনও অঙ্গের সাদৃশ্য-কল্পনা করিতে পারে, কিন্তু তাহাকে আমরা যৌনবিকল্প বলিব না। যে সাদৃশ্যবোধ স্রষ্টার কষ্টকল্পিত নহে, বরঞ্চ যাহা তাহার মনে স্বতঃই উদিত হয়, এবং করিয়াও সে যে বৃত্তিকে সংযত করিতে পারে না, তাহাকেই প্রতীকানুরাগ বলিব।

সাধারণত শৈশবের কোনও বিশেষ অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা মনের উপর প্রগাঢ় ছাপ রাখিয়া যায় এবং উহার প্রভাবই এরূপ বাতিকের কারণ।

শুগমণ (Beastiality)

একশ্রেণীর নারীপুরুষ আছে, যাহারা স্বাভাবিক মৈথুন করিবার সুযোগের অভাবে পশুগমন করিয়া থাকে, আর একশ্রেণীর লোক স্বাভাবিক মৈথুনের সুবিধা থাকা সত্বেও উহা করিয়া থাকে। শেষোক্ত শ্রেণীর নরনারীকে স্নায়বিক ব্যাধিগ্রস্ত বলা যাইতে পারে।

পশুপক্ষীর মিলন দর্শনে মানুষের, বিশেষত রতিশক্তিসম্পন্ন মানুষের বাসনা জাগ্রত হয়। সেজন্য তরুণ বয়সে অনেকে ঐ সব দৃশ্য দেখিতে ভালবাসে। ইহাকে যৌনবিকৃতি বলা উচিত হইবে না। ষোড়শ শতাব্দীতে ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের রাজপরিবারের এবং অভিজাত বংশের মহিলাগণ পর্যন্ত দল বাঁধিয়া ঐরূপ দৃশ্য উপভোগ করিতেন; কিন্তু ইহা অভ্যাসে পরিণত হইলে এবং সম্ভোগের পরিবর্তে এই দর্শনসুখের দ্বারা শুক্ৰস্খলন বা যৌনতৃপ্তিলাভ করিতে আরম্ভ করিলে নিশ্চয়ই ইহাকে যৌনবিকৃতি বলিতে হইবে। মিঃ এলিসের মতে পুরুষ অপেক্ষা নারীর পশু-উপভোগ স্পৃহা কম নহে। তিনি বলেন, এই জন্য কামজীবনে অতৃপ্ত অনেক নারীকে কুকুর-বিড়াল পুষিতে দেখা গিয়াছে।

ইহা ছাড়া কোনও কোনও সমাজে পশুমৈথুন প্রথা হিসাবেও প্রচলিত আছে। আফ্রিকার কতক অঞ্চলে এইরূপ প্রথা আছে যে, যুবক শিকারী বড় যে শিকার পাইবে তাহার সহিত মৈথুন করিবে। আরবেরা নাকি মুরগী বাজারে নিবার পূর্বে উহার সহিত মৈথুন করে। চীনাদের বেলায়ও এইরূপ শোনা যায়। মন্টেগাজা বলেন, ইহারা নাকি হাঁসের গলা কাটিয়া উহার সহিত মৈথুন করিয়া থাকে। ইরাকে অনেকে গর্দভী ব্যবহার করে। আমাদের দেশে গর্দভী, গাভী, ছাগী ইত্যাদি ব্যবহারের কথা শোনা যায়। স্বাভাবিক মিলনের অভাবে রাখাল যুবকেবা কদাচিৎ ইহা করিলেও প্রথাহিসাবে পশুগমনের কথা এদেশে শোনা যায় না। পাশ্চাত্য দেশে মেয়েরা কুকুরই বেশী পছন্দ করে। বিড়ালও শিক্ষা দিলে পুরুষের মত আচরণ করিতে পারে। অন্তত কুকুর ও বিড়ালকে স্বীয় যৌনাঙ্গের উপর তাহাদের প্রিয় খাদ্যদ্রব্য রাখিয়া তাহা দেখাইলে উহারা লেহন করিবে।

ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে

ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে পশুগমনের অভ্যাসের কতকটা প্রকোপ ধরা পড়িয়াছে। তাহাদের অভিমতে মানুষের বরাবরই একটা বিশ্বাস ছিল যে, জীবজন্তুর মধ্যে শুধু স্বীয় শ্রেণীর পুং ও স্ত্রী পরস্পরের প্রতি যৌনভাব জাগ্রত হয়, অন্য শ্রেণীর জন্তুর প্রতি হয় না। এ সংস্কারে মূলে বোধ হয় প্রজননের উপর জোর দেওয়ার প্রবণতা এবং পুরাকালে পশুগমনের প্রতি ধর্মীয় নির্দেশের কঠোরতাও খানিকটা রহিয়াছে। ইহুদীদের ধর্মে পশুগমনের জন্য একেবারে মৃত্যুদণ্ড রাখা হইয়াছিল, খ্ৰীষ্টীয় ও মুসলমান ধর্মে উহারই প্রভাব পড়িয়াছে।

ইদানীং মুক্তবুদ্ধিপ্রণোদিত অনুসন্ধানক্ষেত্রে মানব পুরুষের স্ত্রী জন্তুর প্রতি যৌন-আকর্ষণ দেখা গিয়াছে এবং এমন কি রতিক্রিয়াও খুব কম নহে বলিয়া অনুমান করা যাইতেছে। সুতরাং একই শ্রেণীর জীবের মধ্যে পারস্পরিক যৌন-আকর্ষণ ও ক্রিয়ার মত ভিন্ন শ্রেণীর মধ্যেও উহার প্রকোপ কতকটা আছে।

পুরুষের বেলায় পশুগমনের প্রকোপ আমেরিকায় শতকরা ১ এরও কম এবং কিশোর বয়সের পর কমিতে থাকে। এমন কি যাহারা ইহা করিয়াছে তাহারাও হয়ত জীবনে ২-৩ বার করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছে। তবে কৃষিকার্যে রত গ্রামে বা ক্ষেতখামারে পুরুষদের পশুবিহারের বিস্তর সুযোগ থাকায় উহার প্রকোপ বেশী—এমন কি গণিকাগমন বা সমকামের প্রায় সমান।

ঐ সব লোকের প্রায় ১৭% পশুগমনে যৌনতৃপ্তি লাভ করে, বহু কিশোর বা যুবক তৃপ্তি লাভ না করিয়াও পশুবিহার করে। প্রায় ৪০% হইতে ৫০% ক্ষেতখামারে পালিত বা নিয়োজিত বালক, কিশোর ও যুবক জীবনে এক বা একাধিকবার পশুগমন করে বলিয়া ডঃ কিনযেরা মন্তব্য করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ইহাও বলেন যে, বোধ হয় ঐরূপ ব্যবহার গোপন না করিলে অনুপাত আরও বাড়িয়া যাইত। আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে নাকি ইহারা শতকরা ৬৫ ক্ষেত্রে এইরূপ অভ্যাসের সন্ধান পাইয়াছেন। এই বদভ্যান সারা দেশবাসীর উপরে চাপান ঠিক হইবে না, একথাও ভুলিলে চলিবে না।

পৌনঃপুনিকতার বেলায় দেখা গিয়াছে যে, এক বা একাধিকবার হইতে সপ্তাহে কয়েকবার নিয়মিত পশুবিহারের অভ্যাসও রহিয়াছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ২-৩ বৎসবের পর ঐরূপ অভ্যাস পরিত্যক্ত হয়। বালকদের মধ্যেই ইহার প্রকোপ বেশী। পশুদের মধ্যে পালিত প্রায় সকল প্রকার পশুই ব্যবহৃত হয়, যথা—গরু, মেষ, শূকর, বিড়াল, মুরগী, হাঁস ইত্যাদি।

পুরুষদের বেলায় পশুমৈথুনের প্রকোপ যতটা নারীদের বেলায় উহা তুলনায় অতি সামান্য। ইহার কারণ এই যে, মেয়েরা যৌন-সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে ছেলেদের মত আলোচনা করে না, রতিক্রিয়ার পদ্ধতি সম্বন্ধে অতটা অবহিত থাকে না, পণ্ডমিলন দেখিবার সুযোগও ততটা পায় না। তাই ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে নারীদের মধ্যে পশুমৈথুনের অভ্যাস অনেক কম পাওয়া গিয়াছে। তাহাদের অনুসন্ধানে কেবলমাত্র শতকরা ১.৫ নারী কৈশোরে বিড়াল, কুকুর ইত্যাদি পালিত জন্তুর সহিত আকস্মিকভাবে অথবা কৌতূহল বশত যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করে। যৌবনে ঐরূপ যৌন-ব্যবহারে দৃষ্টান্ত অল্প।

পশুগমন প্রবৃত্তি অনেকের মতে স্নায়বিক ব্যাধি ও বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচায়ক। ডাঃ ফোরেলের মতে অস্ত্রপ্রয়োগের দ্বারা ইহাদের রতিশক্তি নাশ করা উচিত, অন্যথায় ইহাদিগকে পাগলা গারদে আটক রাখা উচিত, কারাদণ্ড ইহাদের পক্ষে যথেষ্ট নহে। মিঃ এলিস্ অপেক্ষাকৃত উদারতার সহিত পর্যালোচনা করিয়াছেন। ইহাকে তিনিও খুব জঘন্য কাৰ্য বলিয়াছেন বটে, কিন্তু আইনকর্তা ও সমাজতত্ত্ববিদগণকে তিনি দুইটি উপদেশ দিয়াছেন।

প্রথমত অন্যান্য বিকৃতির ন্যায় ইহা সভ্যতাসঞ্জাত নহে। ইহা অশিক্ষিত অর্ধসভ্য, স্বল্পবুদ্ধি পল্লীমনের পরিচায়ক। বৃটিশ কলাম্বিয়া প্রভৃতি স্থানে আজও মানুষ ও পশুতে কোন উচ্চনীচ ভেদজ্ঞান স্ফুরিত হয় নাই। সেজন্য সেখানে ইহা স্বাভাবিক মৈথুন অপেক্ষা বিশেষ হেয় বিবেচিত হয় না।

জার্মানীর এক পল্লীগ্রামের কৃষক একবার এই জন্য ধৃত হইয়া বিচারালয়ে নীত হয়। সে অতি সহজ ও সরল ভাষায় বিনা দ্বিধায় হাকিমের কাছে বলিয়াছিল আমার স্ত্রী বহু দূরে ছিল, তাহার সংসর্গ পাওয়া সম্ভব ছিল না বলিয়াই আমি আমার শূকরী ব্যবহার করিয়াছিলাম।”

স্বাভাবিক মিলনের সুযোগের অভাবে সুস্থ-মস্তিষ্কের লোকেও যে অবস্থা বিশেষে ইহাতে লিপ্ত হয়, তাহার প্রমাণ—বিগত মহাযুদ্ধের সৈনিকগণ। বহুদিন স্ত্রীসংসর্গের অভাবে ইহারা ছাগল ও ভেডার সহিত মৈথুন করিত।

দ্বিতীয়ত পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ব্যতীত পশুমৈথুনে সমাজের বিশেষ কোনও অনিষ্ট হয় না। ইহাতে কামতৃপ্তি হয় অথচ অবৈধ গর্ভ, বজিতরোগ ও অর্থ নাশের আশঙ্কা নাই, দুর্নামের ঝুকি অপেক্ষাকৃত কম। মৈথুনক অনুচিত কার্য করে নিজের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে নহে। যে সমস্ত রুগ্ন ও বিকৃত মস্তিষ্ক লোক স্ত্রীসহবাসের দ্বারা সন্তানোৎপাদন করতঃ পৃথিবীতে রোগী ও উন্মাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতেছে, পশুগামী তাহাদের মত সমাজের শত্রু নহে। সুতরাং পশুর প্রতি সাধারণ নিষ্ঠুরতার যে শাস্তি, পশুমৈথুনের শাস্তি তদপেক্ষা অধিক হওয়া উচিত নহে।

পশুদের মধ্যে যৌনক্রিয়া দেখিয়া কিশোর ও যুবকদের উত্তেজনা হওয়া এবং ঐরূপ ব্যবহার করা আশ্চর্যের বিষয় কিছুই নহে। উহা নর ও নারীর মিলন দেখিবার সুযোগপ্রাপ্ত দর্শকদের উত্তেজনাই সমতুল্য। ইহা ছাড়া অপরের কাছে শুনিয়া বা অপরের কার্যকলাপ দেখিয়া উহার পুনরাবৃত্তিও স্বাভাবিক। এই জন্য উহাকে অস্বাভাবিক বা বিকৃতি আখ্যা দিবার উপযুক্ত কারণ নাই। উহা স্বাভাবিক যৌনমিলনের বিকল্প মাত্র।

পশুমৈথুনে গর্ভসঞ্চার হয় বলিয়া আমাদের দেশে একটি সাধারণ বিশ্বাস আছে। এ বিশ্বাস নিতান্ত ভ্রান্ত। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিঃসন্দেহ রূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, মানুষের শুক্র ও পশুর ডিম্ব অথবা মানুষের ডিম্ব ও পশুর শুক্রের সংস্পর্শে প্রজনন হইতে পারে না। পশু ব্যবহারের সবচেয়ে বিষময় ফল এই যে, ইহাতে নানা প্রকার রোগসংক্রমণের ভয় থাকে। টিটেনাস, ইবিসিপেলাস এবং এ্যান্থাক্স ইহাদের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক।

শিশুগমন (Infantilism)

এক শ্রেণীর বিকৃতমস্তিষ্ক লোক দেখিতে পাওয়া যায়, যাহারা শিশুদের উপর পাশবিক অত্যাচার করিয়া থাকে। ডাঃ ফোবেল ইহাকে সহজাতবৃত্তি বলিয়াছেন। কিন্তু ক্রাফট এবিং এই বৃত্তিকে সহজাত বলিয়া স্বীকার করেন নাই। ক্রাফট এবিং-এর মত এই যে, অস্বাভাবিকরূপে শিশু-অনুরাগ সাধারণতঃ অধিক বয়সেই হইয়া থাকে। শৈশবে যে যৌনবিকৃতি দেখা দেয়, উহাকে সমমৈথুন বলা যাইতে পারে, এবং অধিকাংশ স্থলে উহা পারস্পরিক। ক্রাফট এবিং ও লিপম্যান গবেষণা করিয়া সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, শিশুদের উপর বলাৎকারের যতগুলি ঘটনা তাহাদের চক্ষে পড়িয়াছে, তাহাদের প্রায় সবগুলির অপরাধীই বিগতযৌবন বৃদ্ধ। ইহার কারণ ইহা নয় যে, এই প্রকৃতি কাহারও কাহারও বৃদ্ধাবস্থায় হঠাৎ গজাইয়া উঠে, বরং সহজ বুদ্ধিতে এই মনে হয় যে, কোন কোন লম্পট বৃদ্ধ বয়সে যুবতীদের আকর্ষণ করিতে অপারগ হওয়াতে অগত্যা সহজলভ্য ছোট মেয়েদের দ্বারা বাসনাপূরণ করে। সহজ লভ্য ও বাধা দিতে অক্ষম বলিয়া কখনও কখনও বাড়ীর যুবক চাকর সামলাইতে না পারিয়া মনিবের বালিকা শিশুর উপর অত্যাচার করে।

ডাঃ ফোরেল একজন প্রতিভাশালী শিল্পীর কথা বলিয়াছেন। এই শিল্পীটি সম্পূর্ণ রতিশক্তিসম্পন্ন ছিল। তবু তাহার অনুরাগ ছিল কেবল অল্পবয়স্কা বালিকাদের প্রতি। বার বৎসরের অধিক বয়স্কা বালিকা সে মোটেই পছন্দ করিত না। বৃদ্ধা নারীর শিশু-অনুরাগের দৃষ্টান্তও নিতান্ত বিরল নহে। তিনি লিখিয়াছেন—“বিকৃতমস্তিষ্ক বা নষ্টযৌবন বৃদ্ধ ব্যতীত আর এক শ্রেণীর লোকও শিশুমৈথুন করিয়া থাকে। অনেকেরই একটি অন্ধ কুসংস্কার আছে যে, অক্ষতযোনি বালিকার সহিত রমণ করিতে পারিলে যৌন ব্যাধি বিশেষ করিয়া গনোবিয়া সারিয়া যায়। এই রোগগ্রস্ত অনেক পাপিষ্ঠ রোগ হইতে মুক্তি পাইবার জন্য বয়স্ক বালিকার অভাবে শিশুবালিকার উপর বলপ্রযোগে তাহাদের নিষ্পাপ দেহে এই রোগ সংক্রমিত করিয়া থাকে। এই শ্ৰেণীর শিশু-মৈথুনীদের সংখ্যাও কম নহে এবং এইভাবে বিশেষ করিয়া, বড় বড় শহরে অনেক শিশুই রোগাক্রান্ত হইয়া থাকে। এই শ্রেণীর শিশু-মৈথুন সর্বাপেক্ষা গুৰুতর সামাজিক অপরাধ বলিয়া গণ্য হওয়া উচিত। দুঃখের বিষয়, লোকলজ্জার ভয়ে, এইরূপে (চাকর-বাকর দ্বারা বা অন্য কোন ব্যক্তি দ্বারা) কোনও শিশু রোগাক্রান্ত হইলে, তাহার অভিভাবক সহজে ইহা প্রকাশ করিতে বা উপযুক্ত চিকিৎসকের সাহায্য লইতে চাহেন না। তাহার ফলে কত সুন্দর নিষ্পাপ শিশু অকালে ঝরিযা যায় বা অন্ধ ও বিকৃতাঙ্গ হইয়া কোনরুপে জীবন ধারণ করে।”

বালিকার এই রোগ বিশেষ যন্ত্রণাদায়ক ও দুরারোগ্য হয়। পশুগমন অপেক্ষা শিশুব্যবহার গুৰুতর দৈহিক ও সামাজিক পাপ। সুতরাং সমাজে ও রাষ্ট্রে এই পাপের প্রতিবিধানের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকা উচিত।

বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার প্রতি আকর্ষণ (Gerontophilia)

শিশুগমনের বিপরীত অবস্থারও দৃষ্টান্ত আছে। কুমারী বা যুবতী নারী অপেক্ষা বিগতযৌবনা বা বৃদ্ধা নারীর প্রতি পুরুষের আসক্তি বা তরুণীর বৃদ্ধের প্রতি আকর্ষণ এই পর্যায়ে পড়ে।

বিখ্যাত ফরাসী লেখক রুসো তাঁহার প্রকাশিত Confessions (স্বীকারোক্তিতে) এ লিখিয়া গিয়াছেন যে, তাহার অধিক বয়স্কা নারীর দিকে আকর্ষণ বেশী ছিল। ডাঃ হার্সফেল্ড অন্য একজন যুবকের কথা লিখিয়াছেন। যুবকটি একটি বৃদ্ধ লোক দেখিয়া আসক্ত হয়। বৃদ্ধ তাহার প্রেম-নিবেদনে সাড়া না দেওয়ায় সে তাহার কন্যাকে বিবাহ করে। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি তাহার মোটেই আসক্তি হইল না; বৃদ্ধের প্রতিই তাঁহার আবেদন-নিবেদন চলিতে লাগিল। ইহা সমকামী বৃদ্ধ-প্রীতিরই নজীর।

যুবতী নারীরাও কখনও কখনও বৃদ্ধ পুরুষের সঙ্গে ইচ্ছা করিয়া পরিণয়সূত্রে আরদ্ধ হয়। অর্থ বা সম্পত্তির লালসা আছে, এরূপ স্বার্থবুদ্ধি ও সুবিধাবাদীদের ক্ষেত্রে এই বিকল্পের কথা উঠেই না। তবে আমরা যে প্রবৃত্তির কথা বলিতেছি উহার প্রভাবও কোন কোনও ক্ষেত্রে থাকে বটে।

এই প্রবৃত্তির মূলে, ফ্রয়েডের মতে, একটা মানসিক উচ্ছাস থাকা সম্ভব। ফ্রয়েড ইহাকে (Edipus Complex) বলেন। ইহাতে পুত্রসন্তান মাতার প্রতি আসক্ত হয়। আবার Etectra Complex (শতরূপা কূটৈষা) এর ফলে কন্যাসন্তান পিতার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়ে। এই আসক্তি দৃঢ়মূল হইয়া গেলে উপযুক্ত বয়সে যুবকের বা যুবতীব পর্যায়ক্রমে মাতা বা পিতার সমবয়সী বা স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির প্রতি আসক্তি হইয়া থাকে।

মৃতদেহে আসক্তি (Necrophilia)

জীবিত ব্যক্তি অপেক্ষা মৃতদেহের প্রতি আসক্তিও কাহারও কাহারও দেখা গিযাছে। আর্ডিসন (Ardisson) নামক একব্যক্তি একটি বালিকার মৃতদেহ খুঁড়িয়া বাহির করিয়া লুকাইয়া বাখে। তাহার পর পচিয়া না যাওয়া পর্যন্ত উহার সহিত পুনঃপুনঃ মিলিত হইয়া নিজের কামের তৃপ্তি সাধন করে।

ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষকেরা বলেন যে, এই প্রবৃত্তির মূলে শিশুর নিজ মাতার নির্বিকার ঘুমন্ত দেহের প্রতি আসক্তির পুনবাভিনয়ের চেষ্টা থাকে। কেহ কেহ বলেন, এই প্রকার লোক বিনা প্রতিবাদে বাসনা পুরাইতে চাহে বলিয়া মৃতদেহ পছন্দ করে। এইরূপ বিকৃতি খুব কম দেখা যায়।

ধর্ষণেচ্ছা ও ধর্ষিত হইবার প্রবৃত্তি

কামপাত্রকে বেদনা দিবার কিংবা অপমান করিবার বা উহার নিকট হইতে বেদনা পাইবার কিংবা অপমানিত হইবার ইচ্ছার সহিতও যৌনবোধের তৃপ্তি সংশ্লিষ্ট থাকিতে পারে। প্রথম প্রকার প্রবৃত্তিকে ধর্ষণেচ্ছা (Sadism) এবং দ্বিতীয় প্রকার প্রবৃত্তিকে ধর্ষিত হইবার ইচ্ছা (Masochism) বলে। Marquis de Side (১৭৪০-১৮১৪) একজন সুলেখক ছিলেন। তিনি অত্যাচারমূলক কামক্রীড়ার বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার নাম হইতে Sadism কথার উদ্ভব হইয়াছে। পক্ষান্তরে বিপরীত প্রবৃত্তির নাম হইয়াছে জার্মান লেখক Sasher Masoch-এর (১৮৬৫-১৮৯৫) নাম হইতে।

প্রায় ক্ষেত্রেই শৃঙ্গার অথবা সহবাসের সময় অল্পবিস্তর অত্যাচার করিবার (যথা, চাপন, দংশন প্রভৃতি) বা অত্যাচারিত হইবার প্রবলেচ্ছা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। মোটের উপর কোন কোন লোকের অত্যাচারের পাত্র প্রেমাস্পদ আবার অপর কোন কোন লোক নিজেই প্রেমাস্পদের অত্যাচারের পাত্র হইতে চাহে।

সাধারণত এরূপ প্রকৃতিবিশিষ্ট লোকেরা স্বাভাবিক মিলন অপেক্ষা অত্যাচারমূলক কার্যাদি সমাধা করণে বা দর্শনে যৌনতৃপ্তি লাভ করিয়া থাকে। বেদনা দান বা লাভ এবং যৌনতৃপ্তি একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হইয়া যায়।

অনেকের মতে স্বাভাবিক মিলনে পুরুষের সক্রিয়তা ও নারীর বশ্যতা দৃশ্যত একের ধর্ষণ করিবার ও অপরের ধর্ষিত হইবার ইচ্ছার মতই দেখায়। কিন্তু এই দুই প্রকার ইচ্ছারই যদি প্রবলতা বা বাড়াবাড়ি এতদূর গড়ায় যে, স্বাভাবিক সম্ভোগ অপেক্ষা অন্য প্রকাবে অত্যাচার করিয়া বা অত্যাচার সহিয়া উত্তেজনা এবং তৃপ্তিলাভ হয়, তাহা হইলেই তাহা আলোচ্য প্রবৃত্তিদ্বয়ের পর্যায়ে পড়ে।

এই উভয় প্রকৃতি সাধারণ কঠোরতা হইতে অমানুষিক নিষ্ঠুরতা পর্যন্ত গড়াইতে পারে। কেহ নারীকে বেত্রাঘাত করিয়া আনন্দ পায়, কেহ তাহার শরীর হইতে রক্তপাত করিয়াও উপভোগ করে। পক্ষান্তরে কেহ প্রণয়ী বা প্রণয়িনীকে নিজের শরীরে নানাবিধ অত্যাচার করিতে প্ররোচিত করে। রমণকালে প্রেমাস্পদকে চাপন, দংশন ও তাহার পর বেত্রাঘাত, প্রহার এমন কি হত্যা করিয়াও অনেকে যৌনতৃপ্তি লাভ করে।

প্রদর্শনকাম (Exhibitionism)

নিজের যৌন-অঙ্গ বিষম-লিঙ্গের বা সমলিঙ্গের অপর ব্যক্তিকে প্রদর্শন করিয়া পুলক অনুভব করাব নাম প্রদর্শনকাম। ফ্রয়েডের মত এই যে, ইহা শৈশবেই মানবমনে জন্মলাভ করে। তাহার গবেষণার ফল এই যে, শিশুগণ উলঙ্গ থাকিতে ভালবাসে এবং তাহাদের যৌন-অঙ্গ অপরে দেখিতেছে, এই অনুভূতি হইতে তাহারা স্বতঃ-উৎসারিত পুলক বোধ করে। ফ্রয়েডের মতবাদ কেহ খণ্ডন করিবার প্রয়াস পান নাই। কিন্তু পুটনাম প্রভৃতি যৌনবিজ্ঞানবিদগণ বলিয়াছেন যে, এই বাতিক সাধারণতঃ যৌবনে উন্মেষ লাভ করে। ভাঃ লাসিগ ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে সর্বপ্রথম এই যৌনবিকৃতি সম্বন্ধে গবেষণা করেন। তিনি সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, এই বিকল্প প্রায়শ সার্বজনীন। ডাঃ নরউড ইষ্টের মত এই যে, ব্রিকষ্টন জেলের ২৯১ জন যৌন-অপরাধীর মধ্যে ১০১ জন ছিল প্রদর্শনবাতিকের অপরাধী।

প্রদর্শনকারীরা অদ্ভুত মনোবৃত্তিসম্পন্ন। তাহারা রতিশক্তিসম্পন্ন হইলেও নারীকে কখনও আক্রমণ করে না বা সম্ভাষণ করে না, এমন কি কথাটি পর্যন্ত বলে না। তাহারা নারীকে যৌন-অঙ্গ প্রদর্শন করিয়াই এক প্রকার পুলক অনুভব করে। অনেক ক্ষেত্রে তাহারা নারীকে দেখাইয়া শুক্রস্খলন করে,-এই পর্যন্ত। ইহার বেশী আর কিছুই চাহে না। ইহারা রাস্তার কোনও দেওয়ালের আড়ালে কিংবা জানালার ধারে অপেক্ষা করিতে থাকে, কোনও নারীকে সেখান দিয়া যাইতে দেখিলেই তাহারা উক্ত নারীকে দেখাইয়া নিজেদের অঙ্গ নাড়াচাড়া করে। নিজেদের উদ্দেশ্য সাধিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারা পুলিসের ভয়ে সেখান হইতে পলায়ন করে।

ডাঃ ক্রাফট এবিং-এর অভিমত এই যে, যৌবনের প্রারম্ভে অস্বাভাবিক যৌন-অত্যাচার ও অনিয়মের ফলে যাহারা রতিশক্তি হারাইয়া বসে, পরবর্তী জীবনে তাহারাই প্রদর্শনকামী হইয়া থাকে। ডাঃ ফোরেল এই মতের প্রতিবাদ করিয়াছেন। ইহার মত এই যে, প্রদর্শনবাতিক কোনও প্রকার অভ্যাস বা অনিয়মের ফল নহে—ইহা সহজাত। আমাদের বিবেচনায় এই দুই প্রকার মতবাদেই একটু বাড়াবাড়ি আছে। অন্যান্য কুপ্রবৃত্তির ন্যায় প্রদর্শনবৃত্তিও কতটা বংশজ অথবা জন্মগত হইতে পারে বটে, কিন্তু সংসর্গ ও অভ্যাসের দ্বারাও মানুষ প্রদর্শনবাতিকগ্রস্ত হইতে পারে।

ডাঃ মিডার (Maeder) প্রদর্শনবৃত্তিকে তিনভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। প্রথম শৈশবকালীন প্রদর্শনবৃত্তি। ডাঃ মিডারের মতে শিশুগণ সাধারণত যৌন-অঙ্গ দেখিতে এবং দেখাইতে এক প্রকার শিশুসুলভ পুলক অনুভব করিয়া থাকে। দ্বিতীয় অক্ষমের প্রদর্শনকাম। রতিশক্তিবিহীন লোকেরা প্রদর্শন দ্বারা লিঙ্গোদ্রেক করিয়া থাকে। তৃতীয়ত, আকর্ষণের উপায় স্বরূপ প্রদর্শন। সুস্থদেহ ও সুস্থমস্তিষ্ক বহু লোক স্বীয় যৌন-অঙ্গ প্রদর্শন করিয়া বাসনা জ্ঞাপন ও বিপরীত লিঙ্গের কামোদ্রেকের চেষ্টা করিয়া থাকে।

ডাঃ মিডারের এই শ্রেণীবিভাগ নির্দোষ ও সম্পূর্ণ না হইলেও, অন্যান্য শ্রেণীবিভাগ অপেক্ষা অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলা যাইতে পারে। কারণ, ডাঃ ক্রাফট এবিং-এর মতের যতই ক্রটি প্রদর্শিত হউক না কেন, একথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, রতিশক্তির অভাবহেতুই অধিকাংশ লোক প্রদর্শনকামে সন্তোষলাভ করিয়া থাকে। এই ধরনের প্রদর্শন কারীরা আনন্দলাভের আশায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া স্বীয় অঙ্গ প্রদর্শন করিয়া থাকে। মদ্যপান ইত্যাদি অমিতাচার দ্বারাও এই শ্রেণীর কদর্য অভ্যাস হইতে পারে। ডাঃ নরউড ইষ্ট লিখিয়াছেন যে, ইংলণ্ডে মদ্যপায়ীর সংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রদর্শনকারীর হ্রাসবৃদ্ধি হইতে দেখা গিয়াছে।

অপস্মার বা মৃগী-রোগগ্রস্ত ব্যক্তিগণও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগাক্রমণের সময়ে স্বীয় যৌনঅঙ্গ প্রদর্শন করিয়া থাকে। কিন্তু উহাদিগকে ঠিক ঐ শ্রেণীভুক্ত করা অন্যায় হইবে। কারণ, সজ্ঞান ও স্বেচ্ছাকৃত প্রদর্শনকেই আমরা যৌনবাসনাসঞ্জাত ক্রিয়ার পর্যায়ভুক্ত করিতে পারি—অজ্ঞান অবস্থায় কৃত কোনও কার্যকেই কোনও প্রকার যৌনবৃত্তিমূলক বলিতে পারি না।

অবশ্য একথাও ঠিক যে, যাহারা রতিবাসনা পূরণের জন্য কোনও প্রকার অস্বাভাবিক উপায় অবলম্বন করে, তাহাদিগকেও এক শ্রেণীর বিকৃতমস্তিষ্ক লোক বলা যাইতে পারে। কিন্তু যাহাদের বিকার যৌন-ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ অর্থাৎ যাহারা অন্যান্য সমস্ত বিষয়ে স্থিরমস্তিষ্ক হইয়াও কেবল যৌন-ব্যাপারে বিকৃত মস্তিস্ক, আমরা কেবল তাহাদের মনোবৃত্তিকে যৌনবিকৃতি বলিতে পারি। সম্পূর্ণ উন্মাদ—যে ব্যক্তি ড্রেনের ময়লা প্রভৃতিকে রসগোল্লা-বোধে পরম তৃপ্তির সহিত গলাধঃকরণ করিতেছে, সে যদি যৌন-ব্যাপারে কোনও প্রকার অসাধারণত্ব প্রদর্শন করে, তবে তাহার কার্যকে কোনও মতেই যৌনবিকৃতি বলা যাইতে পারে না।

পুরুষ অপেক্ষা নারীর মধ্যে প্রদর্শনস্পৃহা অতি কম দৃষ্ট হয়। মিঃ এলিসের মত এই যে, নারী জাতির মধ্যে শৈশবেই যা-কিছু প্রদর্শনবৃত্তি দেখা যায়, বয়স্কা নারীর মধ্যে ইহা কদাচিং দৃষ্ট হয়।

প্রদর্শনকামীর কার্য প্রথম দৃষ্টিতে একটা নিরর্থক কদর্যতা বলিয়া অনুমিত হইতে পারে। কারণ, ইহার মধ্যে দর্শন, স্পৰ্শন প্রভৃতি কোনও একটি যৌন-ইন্দ্রিয়ানুভূতির লেশ নাই। কিন্তু একটু গভীরভাবে তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে যে, মানুষ যে কারণে অশ্লীল বাক্য শ্রবণ করাইয়া আনন্দ পায়, ঠিক সেই কারণেই গোপন-অঙ্গ প্রদর্শন করিয়াও আনন্দ পায়। এই উভয় কার্যে বক্তা ও প্রদর্শকের উদ্দেশ্য শ্রোতা ও দর্শকের মধ্যে ভাববিপর্যয় সৃষ্টি করা। প্রদর্শনহেতু দর্শকের তিনটি অবস্থা ঘটিতে পারে : হয় (১) দর্শক লজ্জায় ও ভয়ে পলায়ন করিবে, (২) ক্রুদ্ধ হইয়া প্রদর্শককে গালি দিবে, অথবা, (৩) আনন্দলাভ ও কৌতুক বোধ করিয়া হাস্য করিবে। এই তিন অবস্থার যে কোনও অবস্থাতেই প্রদর্শক আনন্দলাভ করে, তবে শেষোক্ত অবস্থাতেই যে সে সর্বাপেক্ষা অধিক পুলক অনুভব করে, তাহা বলাই বাহুল্য।

কোনও প্রকার মানসিক তাবল্য দ্বারা উদ্বুদ্ধ হইয়া প্রদর্শকেরা যে প্রদর্শনকার্য করিয়া থাকে, তাহা নহে। বরঞ্চ পরম গাম্ভীর্যের সঙ্গেই তাহারা এইরূপ করিয়া থাকে। তাহারা দর্শকের প্রাণে একটা ছাপ রাখিয়া দিতে চায়। সেইজন্য প্রদর্শককে অধিকাংশক্ষেত্রে গাম্ভীর্যপূর্ণ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে প্রদর্শন কার্য করিতে দেখা যায়। সাধারণত যখন একাধিক নারী একত্র হাস্যকৌতুকে রত থাকিবে, সেই মুহূর্তকে কস্মিনকালেও প্রদর্শনের উপযুক্ত সময় মনে করিবে না। বরঞ্চ নারী যখন একা কোনও গুরুতর কার্যে রত থাকিবে, সেই সময়কেই সে প্রদর্শনের শুভ মুহূর্ত মনে করিবে।

ডাঃ গার্নিয়ার তাহার এক রোগীর মুখে প্রদর্শনকামেব এইরূপ বর্ণনা শুনিয়াছেন—“আমি সাধারণতঃ গীর্জাতেই প্রদর্শন করিতাম। গীর্জার পবিত্রতা নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যেই যে আমি গীর্জায় ঐ কার্য করিতাম তাহা নহে। ববঞ্চ আমি বিশ্বাস করি, গীর্জার ন্যায় পবিত্র স্থানই প্রদর্শনকার্যের একমাত্র উপযুক্ত স্থান। যখন অধিকাংশ হুজুগপ্রিয় গীর্জাগামী গীজা ছাড়িয়া চলিয়া যায় এবং খাটি ভক্ত কতিপয় ধর্মপ্রাণা নারী নতজানু হইয। বেদীর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া ভগবানের আরাধনা করিতে করিতে তন্ময় হইযা উঠে, তখন আমি বেদীব পার্শ্বে দাড়াইয়া আমার অঙ্গ প্রদর্শন করিষ থাকি। আমি তখন আশা করিয়া থাকি, ভক্ত নারীবা উল্লাসে বলিয়া উঠিবে, ‘প্রকৃতিব উন্মুক্ত রূপ কত সুন্দর।

পুরাকালে প্রায় সমস্ত সভ্যজাতির মধ্যেই পরম গাম্ভীর্যের সহিত লিঙ্গপূজার প্রচলন ছিল। আমাদের মনে হয়, তাহাও এই অনুভূতি হইতেই।

মিঃ এলিস্ ও ডাঃ নরউড ইষ্টের মতে প্রদর্শনকাম যৌনবিকাশের একটা সাধারণ রূপ। ডাঃ ইষ্ট ১৫০ জন প্রদর্শনকারীকে বিশেষভাবে পরীক্ষা করিয়া এই সিদ্ধান্তে পৌছিয়াছেন যে, অবিবাহিত যুবকগণের মধ্যেই প্রদর্শনবৃত্তি অতিশয় প্রবল। তাহার দেড়শত পাত্রের মধ্যে ৫৭ জনই ছিল ২৫ বৎসরের নিম্নবয়স্ক অবিবাহিত যুবক।

মিঃ এলিসের মত এই যে, যাহা আমাদের সমাজে স্বাভাবিক বলিয়া চলিতেছিল, তাহাই এক ধাপ বৃদ্ধি পাইয়া প্রদর্শনকামে পরিণত হইয়াছে। তিনি এ বিষয় লিখিয়াছেন—“আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, অতি অল্পদিন হইল ইংলণ্ডে নগ্নতা আইনে দণ্ডনীয় হইয়াছে। আয়ারল্যাণ্ডে সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দেও অভিজাত ঘরের মহিলারা পর্যন্ত বাড়ীর মধ্যে অপরিচিত আগন্তুকদের সম্মুখে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হইয়া চলাফেরা করিতেন।

স্পষ্টই দেখা যাইতেছে যে, প্রদর্শনকাম অন্যান্য যৌনবিকল্পের ন্যায় বিপজ্জনক নহে। কারণ প্রকৰ্শকরা কাহারও অঙ্গস্পর্শ করে না। কিন্তু তথাপি আমাদের দেশে ফৌজদারী আইনে যে প্রদর্শনকামকে দণ্ডনীয় করা হইয়াছে, তাহা ঠিকই করা হইয়াছে। কারণ প্রদর্শনকারীরা কাহারও অঙ্গ স্পর্শ না করিলেও তাহারা যে নারীর সম্ভ্রমের হানি করিয়া থাকে, তাহাও সামাজিক নীতিবোধের দিক হইতে কম দূষণীয় নহে। তাহা ছাড়া প্রদর্শনবাতিকও প্রশ্রয় পাইয়া ক্রমে আক্রমণাত্মক আকার ধারণ করিতে পারে।

ডাঃ ফোরেলও প্রদর্শনকামের তীব্র নিন্দা করিয়াছেন। কিন্তু তিনি এ কথাও বলিয়াছেন যে, প্রদর্শনকারীর অঙ্গদর্শনে যে সমস্ত তরুণী ভীতা হইয়াছে, তাহাদের অনেককে তিনি পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন যে, সে ভয়ের ফলে তাহাদের মানসিক বা মস্তিষ্কগত কোনও ক্ষতি হয় নাই। সুতরাং প্রদর্শন কারীদিগকে খুব গুরুতর শাস্তি দেওয়ার তিনি পক্ষপাতী নহেন।

অনুকুল অবস্থার মধ্যে চিকিৎসা করিলে অনেক প্রদর্শনকারীকে এই অভ্যাসের হাত হইতে মুক্ত করা যাইতে পারে বলিয়া অনেক চিকিৎসকের অভিমত। মিঃ এলিসের অভিমত এই যে, কোন প্রদর্শনকামীকে যদি নগ্নবাদীদের দলে ভর্তি করিয়া দেওয়া যায়, তবে সে প্রথম প্রথম প্রদর্শনের আনন্দ উপভোগ করিতে পারিবে, পক্ষান্তরে নগ্নবাদীদের সংসর্গচ্যুত হইবার ভয়ে সে কোনও প্রকার অন্যায় আচরণ করিতে সাহস পাইবে না। তাহা ছাড়া তাহার অঙ্গ দেখিয়া কাহারও ক্রোধ, ঘৃণা, লজ্জা, কৌতুক আমোদ বা কামোদ্রেক হইতেছে না দেখিয়া সে আর প্রদর্শনে আনন্দ পাইবে না। উহার ঐ বাতিক সারিয়া যাইবে। তিনি আরও বলিয়াছেন যে, উহাদের কখনও নিঃসঙ্গ অবস্থায় চলাফেরা করা উচিত নহে। সর্বদা লোকজনের মধ্যে থাকিলে প্রদর্শনকাম অনেকটা সংযত থাকে।

সৌভাগ্যবশত এই বিকৃতি খুব বেশীমাত্রায় পাক-ভারতে দেখা যায় না, অন্তত আমরা অনুসন্ধান পাই নাই। বিকৃতির সমস্তগুলি আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত না থাকিলেও যাতায়াত ও ভাবের আদান-প্রদানের অধিকতর সুবিধাহেতু ঐগুলি আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া বিচিত্র নহে। কুকাজ গোপন করিয়া লাভ নাই। প্রকাশ্য আলোচনার দ্বারা উহার প্রতিকার করা উচিত।

ডঃ কিন্‌যের অভিমত— পুরুষদের নিজ যৌনাঙ্গ সম্বন্ধে কৌতূহল ও আগ্রহ থাকায় এবং অপরদের যৌনাঙ্গ দেখিলে উত্তেজিত হওয়ায় তাহারা মনে করে যে, অপরেরাও তাহাদের যৌনাঙ্গ দেখিয়া সেইরূপ উত্তেজনা ও আনন্দ বোধ করিবে। এই জন্য তাহারা নিজেদের স্ত্রীদের, প্রণয়িনীদের এবং সমকামের অংশীদারগণকে নিজেদের যৌনাঙ্গ দেখায়। অধিকাংশ পুরুষ বুঝিতে পারে না যে, রমণীবৃন্দ পুরুষের অঙ্গ দেখিয়া উত্তেজিত হয় না। স্ত্রী ও প্রণয়িনীগণ যখন ঐরূপ উত্তেজিত হয় না তখন পুরুষেরা মনে করে যে, তাহারা আর তাহাদিগকে ভালবাসে না।

পক্ষান্তরে অনেক রমণী যখন দেখে যে, তাহাদের স্বামীগণ নিজেদের যৌনাঙ্গ দেখাইতে চাহে তখন তাহারা মনে করে যে, তাহাদের ভর্তাগণ মানসিক স্থূল ও কদর্য রুচির, অসভ্য ও গ্রাম্যভাবাপন্ন, যৌনবিকৃতি অথবা গোলযোগসম্পন্ন। এই ভুল বোঝাবুঝির জন্য দাম্পত্যজীবনে নানা জটিলতা ও গোলযোগের উৎপত্তি হয়, এমন কি বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়।

যে পুরুষেরা জনসমাগমের স্থানে নিজেদের যৌনাঙ্গ দেখায় তাহারা এই ভাবিয়া কামতৃপ্তি লাভ করে যে, রমণীগণ তাহাদের অঙ্গ দেখিয়া উত্তেজিত হইবে। কখনও কখনও রমণীগণ ইহাতে যেভাবে ভীত, চকিত বা কুপিত হয় তাহা দেখিয়া প্রদর্শনকারীরা উত্তেজিত হয়।

কামিনীগণ কর্তৃক প্রদর্শন– কতক স্ত্রীলোক তাহাদের যৌনাঙ্গ কোনও পুরুষদের এই জন্য দেখায় যে, তাহারা জানে যে, ইহাতে পুরুষেরা প্রীত হইবে। কদাচিৎ কোনও প্রদর্শনকারিণী নারী নিজে ইহাতে উত্তেজিত হয়।

দর্শনপ্রবৃত্তি (Voyeurism)

প্রদর্শনবাতিকের ঠিক বিপরীত এক প্রকার অভ্যাস আছে, যাহাকে দর্শন প্রবৃত্তি (voyeurism, Scoptophilia, Mixoscopia ৰা Peeping) বলে। এই অভ্যাস যাহাদের আছে তাহারা সাধারণত অত্যধিক সলজ্জভাব হেতু অথবা পুরুষত্বহীনতার জন্য প্রায়ই ইচ্ছানুযায়ী সঙ্গম করিতে পারে না। তাহারা অন্য কাহাকেও ঐরূপ ক্রিয়ারত দেখিতে ভালবাসে; কাহারও বা ক্রিয়ার আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত না দেখিলে তৃপ্তি হয় না, আবার কেহ কেহ শুধু বিপরীত লিঙ্গের কাহারও যৌনঅঙ্গ দর্শনেই তৃপ্ত হয়। ইহাদের প্রায় সকলেরই জীবজন্তুর মিলনক্রিয়া দেখিয়া আনন্দ হয়; অপরের মলমূত্র ত্যাগ লক্ষ্য করার প্রবৃত্তিও অনেকের হয়। তবে সাধারণ কৌতূহলপ্রবণতা বিকৃতির মধ্যে গণ্য হয় না, গণ্য হয় এমন সব অভ্যাস, যাহাতে নিজের তৃপ্তি বা রেতঃস্খলন অপরের ক্রিয়া দর্শন না করিলেও হয় না অথবা যখন স্বাভাবিক ভাবে সঙ্গম করা অপেক্ষা অপরের সঙ্গম-দৃশ্য দেখিতে বেশী ভাল লাগে। এই প্রকার অভ্যাসের দাস অনেক বিত্তশালী লোক দাসদাসী বা অপরকে সুযোগ দিবার জন্য অর্থব্যয় করিতেও কুণ্ঠিত হয় না, এমন কি নিজের স্ত্রীর সহিত অপরের মিলন ঘটাইয়া সমস্ত কামক্রীড়া দর্শনে আনন্দলাভ করে।

এই বৃত্তির সুযোগ গ্রহণ করিয়া অনেকে অশ্লীল চিত্র প্রদর্শন বা প্যারিস প্রভৃতি জায়গায় নগ্ননৃত্য বা অশ্লীল কামক্রীড়া প্রদর্শন করিয়া অর্থ অর্জন করিয়া থাকে। মনে রাখিতে হইবে যে, অন্যের কামক্রীড়া দেখিবার কৌতূহল নরনারীর স্বভাবজাত। ইহাকে স্বাভাবিক দর্শনেচ্ছা বলা যায়।

বাড়ীর দাসদাসীরা বালক-বালিকারা অনেক সময় তাহাদের গৃহে বাসকারী দম্পতিদের ঘরের জানালায় বা দরজার ফাঁক দিয়া অলক্ষ্যে উকি মারিয়া থাকে। পশুপক্ষীর মৈথুনক্রিয়া দেখিয়াও প্রায় সকলেই উত্তেজনা উপভোগ করে। ইহা ছাড়া নিজের স্ত্রীর বা স্বামীর নগ্নদেহ দর্শন করিবার আগ্রহের কথাও অস্বাভাবিক নহে। আমার পরিচিত একজন শিক্ষিত যুবক পাঁচ বৎসর হইল বিবাহ করিয়াছেন। যৌনমিলন ছাড়া তাহার স্ত্রীর নগ্ন-সৌন্দর্য প্রত্যহ উপভোগ করিয়া থাকেন। ইহা স্বাভাবিক দর্শনেচ্ছা—অল্পবিস্তর সকলের মধ্যেই আছে; কেহ সুবিধা থাকায় প্রায় প্রত্যহ উপভোগ করে, কেহ তাহা না থাকায় কালে-ভদ্রে; কেহ বা অহেতুক লজ্জার বশবর্তী হইয়া ইচ্ছা দমন করে মাত্র।

ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে ইহা পাওয়া গিয়াছে যে, পুরুষ স্ত্রীজাতির বক্ষ, নিতম্ব, পা ও যৌন-অঙ্গ দেখিয়া উত্তেজনা বোধ করে। কিন্তু নারীরা পুরুষের যৌনঅঙ্গ দেখিয়া আনন্দ ত পায়ই না বরং ঘৃণা বোধ করে। তাহারা বলেন যে, এরূপ বিপরীতকামী পুরুষ খুব কমই আছে যে, সুবিধা পাইলে বিবস্ত্রা নারী অথবা সুরত ক্রিয়া না দেখে। অনেক পুরুষের পক্ষে নারী যখন বস্ত্র পরিত্যাগ করিতেছে তখন তাহাকে দেখা, সম্পূর্ণ উলঙ্গ নারীকে দেখা অপেক্ষা অধিক উত্তেজক। কারণ তাহারা সম্পূর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগের পর কি দেখিতে পাইবে তাহা কল্পনা করে। রমণীদের মধ্যে এরূপ আচরণ অবশ্যই কদাচিৎ দেখা যায়।

নগ্নতাচর্চা (Nudism)

মিঃ এলিস নগ্নতাচর্চাকে প্রদর্শনবাতিকে চিকিৎসার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। নারী ও পুরুষ সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় একত্রে কাজকর্ম, চলাফেরা ও ব্যায়ামাদি করার নাম নগ্নতাচর্চা। মানুষ তাহার কয়েকটি প্রত্যঙ্গ ঢাকিয়া রাখিয়া বরঞ্চ সেদিকে অপরের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছে। যাহা গোপন করিবার প্রথা, আমরা তাহাই বেশী করিয়া দেখিতে চাই। মানুষ যদি তাহার যৌন-অঙ্গসমূহ গোপন করিয়া না চলিত, তবে যৌন-অঙ্গের প্রতি মানুষের আকর্ষণের এত তীব্রতা থাকিত না, সংসারে অপরাধ ও পাপের মাত্রাও কমিয়া যাইত।

স্বাস্থ্যের উপর প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধেও নগ্নবাদের উদ্যোক্তাদের অনেক কিছু বলিবার আছে। তাহাদের অভিমত এই যে, মানুষ সারা শরীরের চামড়ার মধ্যস্থতায় অপকারী বাষ্প ও ময়লা ঘামের সঙ্গে বাহির করিয়া থাকে, তাই শরীর যতটা উন্মুক্ত থাকে ততই এই শোধনকার্য সম্ভবপর হয়। সুইজারল্যাণ্ডে যক্ষ্মারোগীদের বেলায় এবং সর্বত্রই শিশুদের পক্ষে উন্মুক্ত স্থানে চলাফেরা, বায়ু সেবন এবং সূর্যতাপ উপভোগ করা উপকারী মনে করা হয়। এখন প্রায় সকল জায়গাতেই সূর্যতাপে স্নান (Sun bathing) স্নায়ুর পক্ষে উত্তেজক ও শক্তিবৃদ্ধিকর বলিয়া পরিগণিত হইতেছে। ডাক্তারী মতে ইহা অনেকটা প্রামাণ্য বলিয়াও স্থির হইয়াছে। তবে ভারতবর্ষের মত উষ্ণ দেশে সূর্যতাপের অভাব এমনিই বড় একটা হয় না।

নগ্নবাদীরা ইহাও দাবি করেন যে, নগ্ন ও উন্মুক্ত সমাজে লোকের মনে ভাবপ্রেরণা বেশী হয়। কবি আরও ভাল কবিতা লেখেন, ঔপন্যাসিকের উপন্যাস আরও উপভোগ্য হয়, কলাবিদের কলাচর্চার ঐশ্বর্য আরও বৃদ্ধি পায়। এই দাবি তাহাদের স্বাস্থ্যোন্নতির দাবিরই মতুল্য। শরীর ক্লেদমুক্ত ও স্নায়ুসমূহ সম্পূর্ণ কার্যকরী থাকিলে মস্তিষ্কচালনার সুবিধা হওয়া বিচিত্র নহে। উহারা আরও বলেন যে, দিনের পর দিন স্বভাবত অকৃত্রিম বিলাসিতাশূন্য জীবনযাপন করিয়া তাহারা সুখ ও শান্তি উপভোগ করিতে পারেন, এবং আদি মানুষের স্বর্ণযুগে প্রত্যাবর্তন করিবার ইহাই উৎকৃষ্ট পন্থা।

মানুষের ভিতরকার কৃত্রিম লজ্জার প্রাচীর ভাঙিয়া মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরাইয়া আনিবার উদ্দেশ্যে নগ্নবাদীরা জার্মানী ও আমেরিকায় সর্বপ্রথম প্রচার আরম্ভ করেন। কিন্তু সরকারী আইন তাহাদের উদ্দেশ্যে বাধাদান করায় তাহারা অগত্যা জনপদ হইতে দূরে অরণ্যাদির মধ্যস্থলে,অথবা অপ্রকাশ্য স্থলে উপনিবেশ স্থাপন করতঃ সেখানেই নগ্নতাচর্চা করিতেছেন।

নগ্নবাদীদের যুক্তি প্রথম দৃষ্টিতে খুব অসঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। মানুষ, তাহার কতিপয় প্রত্যঙ্গ ঢাকিয়া রাখে কেন? অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে অনুরূপ কোনও লজ্জানুভূতি দৃষ্টিগোচর হয় না। মনোবিজ্ঞানবিদ ওযাণ্ডের অভিমত এই যে, মানুষের মধ্যে সৃষ্টির আদিকাল হইতে যৌনলজ্জা বিদ্যমান ছিল। এ কথা কিছুতেই সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। কারণ, যৌনলজ্জা যদি মানুষের প্রকৃতিগত বৃত্তি হইত, তবে সভ্য-অসভ্য-নির্বিশেষে সমস্ত মানবজাতির মধ্যে এই লজ্জার ভাব দৃষ্টিগোচর হইত। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তাহা নহে। সভ্যজাতিসমূহ যে সমস্ত অঙ্গকে যৌন-অঙ্গ মনে করিয়া বস্ত্রাচ্ছাদিত করে, সমস্ত জাতি ও সমস্ত দেশের মানুষ ঐ সমস্ত অঙ্গকে লজ্জাস্থান ত মনে করেই না, কোনও কোনও জাতির আচার-ব্যবহার ঠিক বিপরীত। কোনও কোনও স্থানে মানুষ তাহাদের জননেন্দ্রিয় ব্যতীত অন্য সমস্ত অঙ্গ আচ্ছাদিত করিয়া রাখে কিন্তু জননেন্দ্রিয় আবৃত করাকে তাহারা বিশেষ লজ্জার বিষয় বলিয়া মনে করে। খাসা নামক নিগ্রো জাতির সম্প্রদায়বিশেষ জননেন্দ্রিয় আবৃত করাকে বিশেষ অসভ্যতা বলিয়া মনে করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের অসভ্য জাতির নারীরা কোমরবদ্ধ পরিয়া থাকে তাহাদের যৌনপ্রদেশকে সুন্দর ও প্রিয়দর্শন করিবার জন্য—উহাকে আবৃত করিবার জন্য নহে। যে সমস্ত জাতির নারীপুরুষ সকলে উলঙ্গ থাকে তাহাদের পক্ষে নগ্নতাই স্বাভাবিক। তাহাদের মধ্যে পরস্পরের জননেন্দ্রিয় দর্শনে লজ্জা বা কামভাবের উদ্রেক হয় না। আমাদের সভ্যজাতিসমূহের মধ্যে যেমন শারীরিক সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য টুপী, হ্যাট, জুতা, মোজা, নেকটাই পরিবার, মুখে পাউডার, পায়ে আলতা অথবা ঠোটে রং লাগাইবার, কর্ণে ও গলায় অলঙ্কার পরিবার প্রথা আছে, ঐ সমস্ত অসভ্য জাতির মধ্যে তেমনই নানাপ্রকার অলঙ্কার পরিয়া ও রং লাগাইয়া যৌন-প্রদেশকে প্রিয়দর্শন করিবার প্রথা প্রচলিত আছে।

আমরা কোনও মহিলাকে সুসজ্জিত দেখিলে তাহার রূপের ও সজ্জার প্রশংসা করিতে পারি, কিন্তু তাহাতেই আমাদের কামোদ্রেক হয় এ কথা যেমন বলা যায় না, তেমনি অসভ্য জাতিসমূহের মধ্যে চিত্রিত যৌনপ্রদেশসমূহ দর্শনে রূপে সমালোচনা হইতে পারে, কিন্তু তদ্দর্শনে কামোদ্রেকের কথা দর্শকের মনেও উদিত হয় না। নগ্নতা তাহাদের পক্ষে এমনই স্বাভাবিক সাধারণ ব্যাপার। এই জন্যই একজন প্রকৃতিবাদী পণ্ডিত মত প্রকাশ করিয়াছেন যে, সম্পূর্ণ নগ্নতা অপেক্ষা সামান্য আবৃত অঙ্গই আমাদের যৌনক্ষুধা অধিক জাগ্রত করিয়া থাকে। চীন, জাপান ও ইউরোপের নানা দেশে একাধিক পুরুষ স্নানাগার, পুষ্করিণী, নদী, সমুদ্র প্রভৃতিতে বিবস্ত্র হইয়া সহজভাবে স্থান করে। এই প্রথায় অভ্যস্ত থাকায় তাহাদের সেজন্য লজ্জা, সঙ্কোচ বিশেষ কৌতূহল বা কুৎসিত ইয়ার্কির ইচ্ছা বা কামোদ্রেক হয় না।

ডাঃ স্নো বলিয়াছেন—“আমাদের সমাজে পাতলা কাপড়ে সজ্জিত নারীদের সংসর্গে পুরুষের মনে যতটা বাসনা জাগ্রত হয়, অসভ্য জাতির নগ্ন নারীদের সংসর্গে তাহার শতাংশের একাংশও হয় না।”

মিঃ রীড আরও অধিক দূর অগ্ৰসর হইয়াছেন। তিনি বলেন-“নগ্নতা আমাদের কামনা যতটা নিবৃত্ত রাখে, সাজসজ্জা ততটা রাখিতে পারে না।”

এ সব কথা সত্য কেবল সেই জাতির জন্য, যাহারা স্বভাবতই উলঙ্গ থাকে। কারণ, অভিনবত্বেই লালসার উদ্রেক হইয়া থাকে—অন্য কিছুতেই নহে। প্রকৃতিবাদী পণ্ডিত ডাঃ ওয়ালেস এক পার্বত্য-নারীর কথা বলিতে গিয়া লিখিয়াছেন—“আমি একদা এক সুন্দরীকে পোষাক পরিধানে অভ্যস্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। আমাদের মহিলাদের পক্ষে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হইয়া জনতাপূর্ণ রাস্তায় বাহির হইতে যতটা লজ্জাবোধ করা সম্ভব বলিয়া কল্পনা করা যাইতে পারে, ঐ রমণী আমার দেওয়া পোষাক পরিয়া রাস্তায় বাহির হইতে তদপেক্ষা কিঞ্চিত্ৰও কম লজ্জিত হয় নাই।”

ক্যাপ্টেন কুক তাহিতীতে (Tahiti) প্রকাশ্য স্থানে বহু লোকের সম্মুখে একটি যুবক ও বালিকাকে রতিক্রিয়া করিতে দেখেন। ইহাতে সুরতকদ্বয়ের ত কোন লজ্জার ভাব ছিলই না, উপরন্তু দর্শকের মধ্যে সম্ভ্রান্ত মহিলারা পর্যন্ত বালিকাটিকে উপদেশ দিতেছেন। ঐ স্থানে নাকি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি প্রকাশ্যে চরিতার্থ করা হয়, নর ও নারী খোলাখুলিভাবে সমস্তই আলোচনা করে। আবার চীনদেশীয় রমণীদের মধ্যে সৌন্দর্যের আকরই হইয়াছে তাহাদের পদযুগল। অবিকৃত পা তাহাদের কাছে অভিশাপ বিশেষ। কেবল স্বামীই স্ত্রীর নগ্ন পা দেখিবার অধিকারী। তাহারা ডাক্তারকে পা দেখাইতে হইলে লজ্জায় অভিভূত হইয়া পড়েন। পা খাটো করিবার জন্য পায়ে খুব শক্ত জুতা পরাইয়া রাখা হয়।

নগ্ন অবস্থায় প্রকাশ্যে স্নান করার অভ্যাস পাশ্চাত্য দেশে এবং চীনে ও জাপানে অনেক জায়গায়ই বিশেষত স্নানাগারসমূহে প্রচলিত আছে। গত মহাযুদ্ধের সময় এদেশে ইংরেজ সৈনিকদিগকে অহরহ নগ্ন অবস্থায় প্রকাশ্য স্থানে স্নান করিতে দেখা গিয়াছে। লজ্জা যত সব দর্শকের, সৈনিকেরা দল বাঁধিয়াই স্নান করিত। মাত্র কয়েক বৎসর পূর্বে পর্যন্ত জাপানে নরনারী একত্রে স্নানাগারে স্নান করিত। পাঞ্জাবে অদ্যাবধি স্ত্রীলোকে পুষ্করিণী ও নদীর তীরে সমস্ত বস্ত্র রাখিয়া স্নান করে, পুরুষে দেখিলেও গ্রাহ্য করে না।

সুতরাং লজ্জা বলিয়া আমাদের সভ্যসমাজে যাহা প্রচলিত আছে, তাহা যে একটা প্রথামাত্র, একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কারণ লজ্জা যদি মানুষের স্বভাবজাত বৃত্তি হইত, তবে সভ্যজাতিসমূহের মধ্যেও লজ্জাস্থানের সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হইত না। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, আরব, তুরস্ক, পারস্য, আফগানিস্থান ও ভারতবর্ষের অধিকাংশ রমণী মুখ ঢাকিয়া চলাকে ভদ্রতা মনে করিয়া থাকেন। ইহাদের মধ্যে আবার রমণীরা প্রয়োজনবশে মুখ উন্মুক্ত করিতে পারেন, কিন্তু গ্রীবাদেশ প্রাণ গেলেও উন্মুক্ত করিবেন না, পক্ষান্তরে বর্তমান ইউরোপের মহিলারা সমস্ত পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত রাখেন এবং স্তনের প্রায় অর্ধেক গলদেশের সামিল করিয়া উহাকে উন্মুক্ত রাখিতে লজ্জা বোধ করেন না। সুতরাং স্পষ্ট দেখা যাইতেছে, লজ্জাস্থান প্রধানত প্রথাগত ব্যাপার এবং যৌনলজ্জাও কাজেই একটা অভ্যাসজাত বৃত্তি। যৌন-অঙ্গকে আমরা যতই আবৃত করিতেছি, উহার প্রতি আকর্ষণ আমাদের ততই বৃদ্ধি পাইতেছে।

আদি মানুষের বন্যজীবন কতটা সহজ ও সুন্দর ছিল সে সম্বন্ধে যথেষ্ট মতভেদ আছে। মোটের উপর, বেশভূষা ও কৃত্রিম সাজসজ্জার তারতম্য এবং শ্রেষ্ঠতো বোধ না থাকায়, ঐরূপ সমাজে হিংসা বা লোভ কমিয়া যাওয়া বিচিত্র নহে। সুখ ও শান্তির কোনও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ করা সম্ভব নহে; নিজ নিজ অবস্থায় সন্তোষ ও অনাবশ্যক অভাব-অভিযোগ হইতে মুক্তিই উহার উপায়।

মানুষের গঠন ও শারীরিক পরিবর্তন সব সময়ে উপভোগ্য নহে। ইহার উপর আবার বিকৃতি, সাময়িক অসুস্থতা, অঙ্গবিশেষের বৈকল্য অন্যের ঘৃণা উদ্রিক্ত করিতে পারে, নিজেদের মনেও কুণ্ঠার ভাব আনিয়া দিতে পারে। অবশ্য সবল, সুস্থ ও সুগঠিত শরীর সৌন্দর্যের নিদর্শন, কিন্তু যাহারা অতটা ঐশ্বর্যের অধিকারী নন, তাহারা কুশ্রী শরীর প্রদর্শন করিয়া খুব আত্মপ্রসাদ লাভ করিতে পারিবেন ইহা মনে হয় না।

আমাদের মনে হয়, মানুষের লজ্জার পরিমাণ ক্রমশ কমিয়াই আসিতেছে। কথাবার্তা, পোষাক-পরিচ্ছদ, পাঠ্যবস্তু, দৃশ্যকলা ইত্যাদিতে ক্রমেই অনাবশ্যক কুণ্ঠা ও অহেতুক অববোধ লাঘব হইয়া আসিতেছে।

তাই এই নগ্নবাদীদের মতবাদে ধৈর্য হারাইবার কোন কারণ নাই। তাহারা অন্যের বিরক্তি উৎপাদন না করিয়া নিজেদের মধ্যে তাহাদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ রাখিলে অপরের বলিবার বিশেষ কিছু নাই। তাহার বলেন যে, বিবস্ত্রা নারী দেখিয়া পুরুষদের কামভাব ও পুরুষ সম্মুখে নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করিতে স্ত্রীলোকদের লজ্জা এবং পুরুষদের যৌনাঙ্গ দেখিয়া তাহাদের কৌতূহল, কৌতুক বা ঘৃণাবোধ নূতন সদস্যদের প্রথম দিনই থাকে। সকলকে ঐ অবস্থায় দেখিয়া দেখিয়া পরের দিন হইতে উক্ত সমস্ত ভাবের উদয় আর হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *