দেশ, কাল, বয়স ও পাত্রভেদে যৌনবোধের পার্থক্য

প্ৰাদেশিক প্রভাব-মানুষের শরীর ও মনের উপর প্রাদেশিক প্রভাবও সকল দেশের সকল যুগেব যৌনবিজ্ঞানীগণ স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু সে প্রভাব মানুষের যৌনপ্রবৃত্তিকে কতটা প্ৰভাবান্বিত করিয়াছে, সে সম্বন্ধে যৌনবিজ্ঞানীগণ একমত নহেন। আবার এই প্ৰাদেশিক প্রভাব নারীপুরুষভেদে কতটা বিভিন্ন, সে সম্বন্ধে কোনও বিশেষ মতবাদকে প্রাধান্য দেওয়া আজও নিরাপদ নহে বলিয়াই মনে হয়।

এ বিষয়ে ভারতীয় যৌনশাস্ত্রকারগণ একটু বাড়াবাড়ি করিয়াছেন বলিয়াই বোধ হয়। বাৎস্যায়ন ও কোক পণ্ডিত তদানীন্তন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের নারীগণের যৌনবাসনার তীব্রতার একটা পরিমাপ করিয়াছেন। ইহাদের মতে-পাঞ্জাব, সিন্ধু ও চেনাব প্রদেশের নারীগণের বাসনা আতি প্ৰবল এবং তাহারা প্রেমক্রীডারূপে চিমটি কাটা, আলিঙ্গন ও পুরুষের কোলে উঠা অতিশয় ভালবাসে। ইহারা সাধারণতঃ কোমলাঙ্গী হইয়া থাকে এবং সঙ্গমে পরিতোষ লাভ করিয়া থাকে। দেওগড়ের নারী অতিশয় কোমলাঙ্গী হইয়া থাকে। ইহা বা বতি-বিষয়ক বহু কৌশল জানে। বাদাউন প্ৰভৃতি অঞ্চলেব নারীরা চতুরা, বাকপটু মিষ্টভাষিণী ও কৌশল্যপরায়ণা হইয়া থাকে। গঙ্গা ও যমুনাব মধ্যস্থিত অঞ্চলেব নারীরা প্ৰত্যহ অভিনব উপায়ে সঙ্গম করিতে ভালবাসে এবং নিজেরা প্রত্যহ নূতন কৌশল আবিষ্কার করে, কিন্তু তাঁহারা চিমটি কাটা ও দংশন পছন্দ করে না। উহারা নিজেদের স্তনকে উন্নত ও সুগোল বাখিবার জন্য সযত্বে চেষ্টা করিয়া থাকে। গুজরাটের নারীরা অতিশয় কৌতুকপ্রিয় বমণবিলাসী হইয়া থাকে। মহারাষ্ট্র প্রদেশের নারীরা সাধারণত, (বিশেষত রতিক্রিয়ার সময়ে) অশ্লীল বাক্য উচ্চারণে বিশেষ পটু। পুরুষও তাহাদিগকে অশ্লীল গালি দিক ইহা তাঁহারা পছন্দ করে। পাটলীপুত্রের নারীগণও অশ্লীল কথা খুব ভালবালে, কিন্তু মহারাষ্ট্রের নারী-গণের দুষ্ঠায় প্ৰকাশ্যভাবে অশ্লীল কথা বলিতে পারে না, কেবলমাত্র রতিকার্যের সময় মুখরা হইয়া থাকে। দ্রাবিড় অঞ্চলের নারীগণকে পরিতুষ্ট করা অতিশয় কঠিন কাৰ্য। বাঁশাবল্লী অঞ্চলের নারীরা মোটেই কামাতুরা নহে, তবে পুরুষ করিতে চাহিলে উহাতে বাধা দেয় না। তাঁহারা অতিমাত্রায় লজ্জাশীলা বলিয়া বিহারে সকর্মক হয় না। অবন্তী প্রদেশের নারীরা রতিক্রিয়ার বহু কৌশল জানে, কিন্তু চুম্বন ও চিমটি কাটা মোটেই পছন্দ করে না। মালব প্রদেশের নারীরা আলিঙ্গন ও চুম্বন খুব বেশী পছন্দ করে। অযোধ্যা প্রদেশের নারীরা অতিশয় কামাতুরা। অন্ধ প্রদেশের নারীরা অতিশয় কোমলাঙ্গী। ইত্যাদি, ইত্যাদি!

প্ৰদেশভেদে নারীর যে বিভিন্ন বাতিপ্ৰকৃতির পরিচয় দেওয়া হইল, বহুদিন পুর্বের বলিয়া উহার ঐতিহাসিক মূল্য ব্যতীত আর কোনও মূল্য নাই। ঐতিহাসিক মূল্যও যে উহার কতটুকু, তাহাও নির্ণয় করিবার উপায় নাই। কারণ, সুবৰ্ণলতা প্ৰভৃতি যে সমস্ত প্ৰাচীন পণ্ডিতের অনুসন্ধানের উপর নির্ভর করিয়া বাৎস্যায়ণ ঐ সকল বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাঁহাদের অনুসন্ধান প্ৰণালী কতদুর নির্ভরযোগ্য ছিল, তাহা নির্ধারণ করা অসম্ভব।

ইউরোপীয় যৌনবিজ্ঞানীগণের অনেকে দেশভেদে নারীপুরুষের যৌনপ্ৰকৃতি লইয়া গবেষণা করিয়াছে। তাঁহাদের পুস্তক পাঠে জানা যায় যে, বিভিন্ন দেশের নারী পুরুষ, বিশেষত নারীরা, বিভিন্ন উপায়ে রতিক্রিয়া করিতে ভালবাসে। ক্রিয়াপ্ৰণালী মূলতঃ অভিন্ন হইলেও এক-এক দেশের নারীর প্রকৃতিভেদে তাহা এক-এক দিকে বিকাশ লাভ করে। অধ্যাপক নাবীর মিচেলুস তদীর্ঘ ‘সেক্সুয়াল এথিক্স’ নামক পুস্তকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নারী-পুরুষের, বিশেষ করিয়া নারীর, যৌনজীবনের গবেষণার ফলের উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ঐ সমস্ত দেশের নারীজাতির যৌনপ্রকৃতি সম্বন্ধে মতামত ঐ ঐ দেশের গাণকাদের যৌনপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করিয়াই গঠন করিয়াছেন। বেশ্যাদের যৌনপ্রবৃত্তি পর্যবেক্ষণ দ্বারা গৃহস্থ নারীর সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত করা খুব নিরাপদ না হইলেও উহা স্বারা যে বিভিন্ন দেশের নারীর রুচি, পছন্দ প্রভৃতি সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা করা যায়, ইহা স্বীকার করিতেই হইবে।

ডাঃ ক্রাফট্‌ এবিং ও হ্যাভলক এলিস—তাঁহাদের দীর্ঘদিনের গবেষণার ফলে নারীজীবনের যে সমস্ত বিচিত্র যৌন-বিকল্পের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা তে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের নারী বিভিন্ন উপায়ে স্ব স্ব বাসনার তৃপ্তি সাধন করিয়া থাকে। এই উদ্দেশ্যে তাঁহারা কুকুর, বিড়াল, শূকর রাজহাঁস, এমন কি সাপ পর্যন্ত ব্যবহার করিয়া থাকে।

এ সমস্ত তথ্যের মধ্যে কতটা প্ৰকৃত এবং কতটা জনশ্রুতি তাহা বলা যায় না। এই সমস্ত বিশিষ্ট প্ৰণালীকে জাতিগত বা আরহাওষাগত বৈশিষ্ট্য আখ্যা দিয়া উহাদিগকে দেশবিশেষের নারীজাতির সাধারণ ও সার্বজনীন বৈশিষ্টা বলা বোধ হয় ঠিক হইবে না।

 

যৌনবোধে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব

এই সমস্ত গবেষণায় একটা সত্য আমাদের চক্ষে সুস্পষ্ট প্ৰতিভাত হইতেছে–তাহা নারী পুরুষের, বিশেষ করিয়া নারীর যৌনজীবনের উপর পারিপার্থিকতার, বিশেষত আরহাওয়ার প্রভাব। অধিকাংশ পণ্ডিত এ বিষয়ে একমত যে :-

(১) আরহাওয়ার প্রভাবটা এত সুস্পষ্ট যে, গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশের নারীর ঋতুস্রাব শীতপ্রধান দেশের নারীর অপেক্ষা কম বয়সে হইয়া থাকে,

(২) বংশ ও কায়িক গঠনপ্রণালী যৌনজীবন অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত করে,

(৩) জীবনযাপনপ্রণালী, আবাসস্থল, সামাজিক অবস্থা ও ব্যবস্থা যৌনজীবনের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার কারিয়া থাকে, এবং

(৪) যৌনপ্রকৃতির উপর পিতামাতা ও বংশেব প্রভাবও বিদ্যমান। যৌনবৃত্তির উপর আরহাওয়ার প্রভাব আলোচনা করিয়া দেখা গিয়াছে যে, গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশে গড়ে বালিকাদের ১১ হইতে ১৪ বৎসর বয়সে, নাতিশীতোষ্ণ প্রদেশে ১৩ হইতে ১৬ বৎসর বয়সে, এবং শীতপ্রধান দেশে ১৫ হইতে ১৮ বৎসর বয়সে ঋতুস্রাব আরম্ভ হয়। অর্থাৎ যে দেশের আরহাওয়া যত উষ্ণ, সেই দেশের নারীরা তত অল্প বয়সে যৌবনপ্রাপ্ত হইয়া থাকে।

জার্মানীর প্লস ও বাটেল্‌স (Ploss and Bartels) বিভিন্ন দেশের নারীজাতি সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিয়া যে তালিকা প্ৰস্তুত করিয়াছেন, তাহা তে কোন্‌ দেশে কত বৎসর বয়সে মেয়েদের ঋতু আরম্ভ হয়, তাহা দেখা যায় :

গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশ আদ্য ঋতুর বয়স

আলজিরিয়ায় – ৯-১০
প্যালেস্টাইনে – ১০
সিরিয়ায় – ১২
পারস্যে – ১০-১৪
ভারতবর্ষে – ১২-১৩
কলিকাতায় – ১২.৫

শীতপ্রধান দেশ আদ্য ঋতুর বয়স
ইংলণ্ডে – ১৫
ফ্রান্সে – ১৬
জার্মানিতে – ১৫
ল্যাপ্‌ল্যাণ্ডে – ১৮
কোপেনহেগে – ১৬
জাপানে – ১৩-১৪

অনেক পণ্ডিত মনে করিয়া থাকেন, আরহাওয়ায় উষ্ণতাহেতু গ্ৰীষ্মপ্ৰধান দেশের অধিবাসীদের শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সঙ্গে সঙ্গে মনোবৃত্তিসমূহ অকালে পরিপক্ক হইয়া যায় এবং সেইজন্যই সেখানকাব বালক-বালিকাদের মধ্যে যৌনবোধ আতি অল্প বয়সেই জাগ্রত হয়। এই যুক্তির উপর নির্ভর করিয়া ভাব তবর্ষেব অনেক পণ্ডিত বাল্যবিবাহ সমর্থনা করিয়া থাকেন।

এ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীগণ একমত নহেন। ডাঃ কিশ আরহাওয়ার উষ্ণতাহেতু দেহের পরিপক্কতাকেই ইহার কারণ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু ডাঃ ফোরেল বলেন, শীতপ্রধান দেশের অধিবাসী দিগকে জীবনপারণেব জন্য যতটা কঠোর পরিশ্রম করিতে হয়, গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশের লোককে ততটা পরিশ্রম করিতে হয় না; সেজন্য গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশের অধিবাসীগণের বাজে চিন্তা করিবার সময় যথেষ্ট। এই কারণেই তাহাদের মধ্যে সকাল সকাল যৌনবোধ পবিস্কুট হয়। এই দুই মতের মধ্যে কোনটি ঠিক, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা না গেলেও আমাদের মনে হয়, ডাঃ কিশেব মত অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

জাতিগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব–নরনারীর যৌনবোধ-স্ফূরণে জাতিগত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, ইহাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডাঃ কিশোর মতে সেমিটক নারীরা আৰ্য নারীর অপেক্ষা অনেক অল্প বয়সেই ঋতুস্ৰাব হইয়া খাকে। অবশ্য ইহা দৈহিক গঠনের পার্থক্যের্ব উপরই নির্ভর করে। (ইরাকে ৭/৮/৯ বৎসর বয়সের স্তনবতী ইহুদী, আরব ও কুর্দ বালিকা অনেক দেখা যায়।) যে জাতির নারীদের দেহ বলিষ্ঠ ও সুগঠিত, সেই জাতিতেই এই বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। সাধারণতঃ দেখা গিয়াছে, স্বাস্থ্যবতী, সুগঠিত, ঘনকৃষ্ণকেশ, কৃষ্ণলোচন শ্যামাঙ্গীর যত শীঘ্ৰ ঋতুস্রাব আরন্ত হয়, স্বাস্থ্যহীন, অপূর্ণদেহ, পিঙ্গলকেশ, কোমলচৰ্ম, নীলচক্ষুবিশিষ্ট গৌরাঙ্গীর তত সকালে হয় না।

সামাজিক অবস্থা ও জীবনযাপন-প্ৰণালীর প্রভাব–যৌনবোধের উপর সামাজিক পবিস্থিতি ও জীবনযাপন-প্ৰণালীব প্ৰভাব সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট। প্ৰচুর অবসরভোগী, বিলাসী, অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে যত অল্প বয়সে ঋতুস্রাব হয়, কৃষক-শ্রমিক সম্প্রদায়েব মধ্যে তত সকালে ঋতুস্রাব হয় না। ঠিক এই কারণেই বড় বড় নগরীতে যত অল্পবয়সে নারীর রজোদর্শন হইয়া থাকে, ক্ষুদ্র শহরে ও পল্লীগ্রামে তত অল্পবয়সে হয় না। বড়লোকের মধ্যে অধিকতর পুষ্টিকর খাদ্যোব ব্যবস্থা থাকায়, অলস ও বিলাসী জীবনযাপনের এবং যৌনচিন্তার প্রচুর অবসর থাকার দরুনই এইরূপ হইয়া থাকে।

বংশের প্রভাব–যৌনবোধের উপর পিতামাতার প্রভাবও দৃষ্ট হইয়া থাকে। সাধারণতঃ যে মাতা সকালে যৌবনপ্রাপ্ত হইয়াছে, তাহার কন্যাগণও সাধারণতঃ সকালেই যৌবনপ্রাপ্ত হয়। ইহা সর্বত্র সত্য না হইতে পারে, কিন্তু যৌনবোধের উপর একটা সহজাত প্রভাব বিদ্যমান আছে, ইহা একরূপ ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে।

একজন চিন্তাশীল পাঠক লিখিয়া পাঠাইয়াছেন, “যৌন-জাগরণ ও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বয়সে যৌন-জাগরণের কারণ দর্শাইতে গিয়া গ্রন্থকার ডাঃ কিস ও ডাঃ ফোরেলের মতামত সম্বন্ধে যে মন্তব্য করিয়াছেন, আমার  মনে হয় উহা ঠিক নহে। এইভাবে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব অপেক্ষা আরহাওয়ার প্রভাবকে প্ৰাধান্য দেওয়া উচিত নহে। উহাতে নিশ্চেষ্টতা আনিয়া সমাজজীবনের অধোগতিই করিবে। পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও আরহাওয়ার প্রভাব, দুই-ই পরস্পর আপেক্ষিক। বরং আরহাওয়ার প্রভাব অপেক্ষা পারিপাৰ্ষিক প্রভাব অধিক। অনুশীলনের ফলেই অকালে যৌনপরিপক্কতা আসে। একই আরহাওয়ায় মানুষ দুইটি বিভিন্ন সমাজের ছেলেমেয়েকে পরীক্ষা করিলেই বুঝা যায়। যৌনপরিপক্কতা আরহাওয়া, খাদ্যের প্রাচুর্য ও পারিপার্থিকতার উপর যেমন নির্ভর করে, ততোধিক নির্ভর করে প্রচুর অবসব ও মনের গতি প্ৰকৃতি ও শিক্ষার উপর। অনুশীলনের ও পারিপাশ্বিকতার প্রভাবে অনেকে ইচডে পাকে। চেষ্টার ফালে এই যৌনবোধের বয়সকে যখন কমানে-বাড়ানো চলে, তখন আরহাওয়ার প্ৰভাবকে শ্রেষ্ঠত্ব দিই কি করিয়া?

কয়েকটি মেয়ের ৯-১০ বৎসর বয়সে এই প্ৰবৃত্তি জাগরণ এবং ১৩ বৎসর বয়সে তাহার বেগ উদ্দাম হইয়াছিল। কয়েকটি ছেলের ১২-১৩ বৎসর বয়সে যৌন-জাগরণের পরিচয় পাওয়া যায়। খবরের কাগজে একটি ১২ বৎসরের বালক একটি ৬-৭ বৎসরের বালিকার উপর পাশবিক অত্যাচার করায় বেত্রদণ্ড ও সংশোধনগারে প্রেরণের কথা পড়িয়াছিলাম। একটা ছেলের কথা জানি, অধ্যাপকের পুত্র, ধীশক্তিসম্পন্ন-২০-২১ বৎসর বয়সেও যৌনধারণা ক্ষীণ। তাহাকে কোনদিন যৌন-আলোচনা করিতে দেখি নাই বা মুখে যৌনসমাগমের চিহ্ন বয়স-ফোড়া বা অন্য কোন দাগ দেখি নাই। একটি ১৪ বৎসরের ছেলে দেখিয়াছি, ফাজিলের চূড়ান্ত। আমার এক বন্ধুর কাছে শুনিয়াছি, একটি মেয়ের ৮ বৎসর বয়সে বিবাহ হয়। ১০ বৎসর বয়সে সন্তান-সম্ভবা হইয়া সে বাপের বাড়ী ফিরিয়া আসে। আর একটি মেয়ে ১১ বৎসর বয়সে সন্তান-সম্ভবা হয়। একটি মেয়ের ১৫ বৎসর বয়সে বিবাহ হয়। তখন তাহার যৌন-ধারণা অস্ফূট। বিবাহরাত্রে স্বামীকে সে প্ৰত্যাখ্যান করিয়াছিল। একই আরহাওয়ায় এই বিভিন্নতা দেখিয়া আমার মনে হয়, মন আয়ত্ত হইলে আরহাওয়াকে অতিক্রম করা যায়।”

অনেক পাঠকের মনে এইরূপ সমালোচনা উদিত হইতে পারে বলিয়া এখানে পত্ৰখানি উদ্ধৃত কিবা হইল। বাস্তবিকপক্ষে শ্ৰদ্ধেয় পাঠকের উক্তি অনেকাংশে সত্য। তবে আমরা যে প্রভাবের কথা আলোচনা করিতেছি, উহা ব্যাপক ও স্থানবিশেষেবা সমস্ত নবনারীর সার্বজনীন প্ৰবণতার (tendency) কথা। ব্যক্তিবিশেষে ব্যতিক্রম হইবেই এবং ঐ রূপ ব্যতিক্রমের কারণ উল্লিখিত কারণসমূহের এক বা একাবিকেব। প্রভাব। শীতপ্রধান দেশের মেয়েদের গড়ের তুলনায় উষ্ণপ্রধান দেশের মেয়েদের গডে সকাল সকাল যৌনবোধের ক্ষুবণ সহজেই পরিলক্ষিত হয়। তবে অন্যান্য কারণের প্রভাবে বা অভাবে শীতপ্রধান দেশের মেয়েদের মধ্যেও কতক ক্ষেত্রে সকাল এবং গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশের মেয়েদের মধ্যে কতক ক্ষেত্রে বিলম্বে যৌনজাগরণ হওয়া বিচিত্র নহে।

তাহা ছাড়া আমরা স্বভাবজাত যৌনজাগরণের কথাই বলিতেছি। সঙ্গদুষ্ট বা প্রচেষ্টা-প্রসূত অকালপক্ষতার কথা স্বতন্ত্র।

উপরোক্ত কারণসমূহে বালিকাগণের মনে একটা অস্পষ্ট প্রেরণা সকাল সকাল জাগ্রত হইতে পারে বটে, বাহির হইতে কোনও উত্তেজক প্রেরণা না পাওযা পৰ্যন্ত উহা চাপা থাকে। সংসৰ্গ, মানুষের বা জীবজন্তুর মিলন দর্শন, বায়স্কোপ, থিয়েটার, অশ্লীল ছবি ও গান, কুসঙ্গ প্ৰভৃতি বহির্জাগতিক ব্যাপারসমূহ বালক-বালিকাগণকে যৌনমিলন সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা ও ঐ কাৰ্যে প্ৰবৃত্তি দিয়া থাকে।

 

আন্ত ঋতুর বয়সের তারতম্যের কারণ

এই প্ৰচলিত ধারণা ভুল যে, অসভ্য, বন্য, আদিম অনুন্নত সমাজে অথবা গ্রীষ্মপ্ৰধান দেশগুলিতে বালিকার সুসভ্য, অর্ধসভ্য জাতিদের অথবা শীতপ্রধান দেশবাসীদের অপেক্ষা শীঘ্ৰ ঋতুমতী হয়। এই প্ৰাচীন ভ্ৰান্ত ধারণার কারণ এই যে, (১) আদিম ও অসভ্য জাতির বালিকাদের প্রকৃত বয়স নির্ণয় করা কঠিন এবং (২) ঐরূপ অনেক অনুন্নত সমাজে আদ্যঋতুর পূর্বেই বিবাহ হইয়া যায়।

অত্যাধুনিক গবেষণার ফলে দেখা গিয়াছে যে, প্ৰকৃতপক্ষে অক্ষুদ্রত সমাজ অপেক্ষা সুসভ্য সমাজে বালক-বালিকাদের বয়োপ্ৰাপ্তি বা কৈশোর (puberty) শীঘ্ৰতর আসে। কারণ-পুষ্টকর খান্ত, স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা, জীবনযাত্রাব উন্নত উপায় ও উপকরণ প্রভৃতির জন্যই দাবিদ্র ও অশিক্ষিত সমাজেব অপেক্ষা ধনী ও শিক্ষিত সমাজের বালিকাদের ঋতু পূর্বে আরম্ভ হয়। ইতরপ্রাণী এবং উদ্ভিদ জগতেও এই ব্যাপার দেখা যায়। পশুপালকেরা বহুকাল পূর্ব হইতেই জানে যে, যে সমস্ত জন্তুরা উত্তম আহাব ও যত্ন পায় তাহারা অযত্নপালিত, অল্প ও কুখাদ্য ভোজীদেব অপেক্ষা শীঘ্ৰ পরিণত হয়। এইরূপ অভিজ্ঞ কৃষকেরাও জানে যে, যে সমস্ত গাছ উত্তম জমিতে জন্মায়, উত্তম সাব, জল ও যত্ন পায় সেগুলি অধিক শীঘ্ৰ বুদ্ধিপ্ৰাপ্ত ও মুকুলিত হয়।

একই দেশের তিন পুরুষের নারীদের আদ্যঋতুর বয়সের তুলনামূলক প্ৰমাণ–আমেরিকার সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাঃ মিলস। তাঁহার প্ৰবন্ধে দেখাইয়াছেন যে বর্তমানে পিতামহী মাতামহীদের বয়সী নারীদের ১৫ বৎসর বয়সে অথবা তাহারও পর আস্থ্যঝতু হইয়াছিল। বর্তমানে মা, মাসী, পিসীদেব প্ৰায় চতুর্দশ বৎসবে এবং বর্তমানে বিংশ বর্ষীয়াদের প্রায় ত্রয়োদশ বৎসরে হইয়াছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও জনসমাজ সম্বন্ধে লিখিত তথ্য হইতে দেখা যায় যে, বর্তমানকালে আমেরিকার বালিকাদের বয়োপ্ৰাপ্তিব বয়স গড়ে ১৩ বৎসর কিন্তু এক পুরুষ আগে ১৪ বৎসর ছিল। জার্মানীতে রক্ষিত হিসাব হইতে দেখা যায় যে, সেখানে প্ৰায় দেড়শত বৎসর পূর্বে (১৭৯৫ সালে) বালিকাদের বয়োপ্ৰাপ্তি (আন্তষ্কতু) প্ৰায় সাৰ্থ ষোড়শ বৎসর বয়সে হইত।

ব্যক্তিগত ব্যতিক্ৰম–অবশ্য গড়পড়তা ঋতুর বয়স অপেক্ষা বিশেষ বিশেষ বালিকাদের উক্ত বয়সের অনেক তারতম্য দেখা যায়। কোনও কোনও আমেরিকান বালিকা ৯-১০ বৎসরে, কেহ কেহ ১৬ বৎসরে বয়োপ্ৰাপ্ত হয়।

কারণ-(১) বংশগতি। যে সমস্ত বালিকার মাতা, মাতামহী প্ৰভৃতির আন্ধ্যথভু গড়ে যে বয়সে হইয়াছিল, তাহাদেরও প্রায় সে বয়সে হয়। (২) পারিপাৰ্থিক অবস্থা বা আবেষ্টনী বয়োপ্ৰাপ্তির যে সমন্ত গুণবীজ (gene) শিশুর মধ্যে থাকে, আবেষ্টনী তাহার উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া তাহাদের বিকাশের সুবিধা অথবা অসুবিধা ঘটাইবার ফলে আন্থখতু শীঘ্ৰ অথবা বিলম্বে হয়।

 

যৌন-অঙ্গের আকৃতিভেদে যৌনবোধের পার্থক্য

প্ৰাচীন ভারতীয় পণ্ডিতগণের মতে নারীপুরুষের যৌন-অঙ্গের আকৃতির সহিত তাহাদের কামেচ্ছার প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ বিদ্যমান রহিয়াছে। কোকা পণ্ডিতদের অভিমত এই যে, স্ত্রী-অঙ্গ সাধারণতঃ তিন প্রকারের হইয়া থাকে—বার আঙুল, নয় আঙুল, ছয় আঙুল লম্বা। ‘লুষযতন্নেসা’তেও যোনিকে এইভাবে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হইয়াছে। পুরুষের লিঙ্গকেও উক্ত পণ্ডিত দৈর্ঘ্য অনুযায়ী তিন ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। যে নারীর যোনি বা পুরুষের লিঙ্গ যত লম্বা, তাহার কামভাবও সেই পবিমাণে অধিক বলিয়া তাহারা অভিমত প্ৰকাশ করিয়াছেন।

এই ছয়-নয়-বার আঙুলের মতবাদকে সম্পূর্ণ অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলিয়া না মানিলেও যৌন-অঙ্গকে হ্রস্ব, মধ্যম ও দীর্ঘ—এই তিন শ্রেণীতে বিনা দ্বিধায় ভাগ করা যাইতে পারে। যাহার অঙ্গ যত দীর্ঘ ও বৃহৎ হইবে, তাহার স্পৃহা তত বেশী হইবে অসম্ভব না হইলে ও এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্য হইবার সম্ভাবনা থাকিলেও সকল ক্ষেত্রেই সত্য হইবে বলিয়া মানিয়া লওয়া যাইতে পারে না। ক্ষেত্র-বিশেষে হ্রস্ব লিঙ্গ-বিশিষ্ট নর এবং ক্ষুদ্র যোনি নারীও অতীব কামপ্রবণ হইতে পারে।

তবে এই কথা সত্য যে, গভীর অঙ্গ-বিশিষ্ট নারীকে যদি হ্রস্ব-লিঙ্গ-বিশিষ্ট পুরুষের সঙ্গ করিতে হয়, তবে সে মিলনে নারীর সম্যক্ তৃপ্তি হইতে পারে না এবং সে ক্ষেত্রে নারীকে অত্যন্ত অধিক কামাতুত বলিয়া মনে হওয়া স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে দীর্ঘলিঙ্গ-বিশিষ্ট পুরুষকে যদি হ্রস্বযোনি বিশিষ্ট নারীর সঙ্গে সহবাস করিতে হয়, তদাবস্থায় উক্ত পুরুষকে উক্ত নারীর কাছে বিশেষ কামাতুর বলিয়া মনে হওয়া স্বাভাবিক। ইহা ব্যতীত জননেন্দ্ৰিয়ের হ্রস্ব-দীর্ঘতার সহিত কামভাবের অল্পাধিক্যের যে বিশেষ কোনও সম্বন্ধ আছে তাহা মনে হয় না।

ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের অনেকের অভিমত এই যে, নারীর জননেন্দ্রিয়ের মধ্যে একমাত্ৰ ভগাঙ্কুরই বাসনার পরিমাপক, অর্থাৎ যে নারীর ভগাঙ্কুর যত বড় হইবে, সে নারী তত কামাতুরা হইবে। পক্ষান্তরে বাৎস্যায়ন, কোকা পণ্ডিত প্ৰভৃতি ভারতীয় যৌনশাস্ত্রকারগণ লিঙ্গের আকৃতি ও যৌন রুচিভেদে পুরুষকে শশক, মৃগ, বৃষ ও অশ্ব, এবং নারীকে পদ্মিনী, চিত্রাণী, শঙ্খিনী ও হস্তিনী এই চারি ভাবে বিভক্ত করিয়াছেন।

 

বয়সভেদে নারী-পুরুষের শরীর, মন ও রতি প্রকৃতি

ব্যক্তি, স্থান ও আরহাওয়াভেদে যেমন নারীপুরুষের রতিপ্ৰকৃতির বিভিন্নতা হইয়া থাকে তেমনই বয়সভেদে একই ব্যক্তির বাতিপ্ৰকৃতির বিভিন্নত হইয়া থাকে। বয়সভেদে সমস্ত দেশ ও সমস্ত সাহিত্যই মানুষকে শিশু, কিশোর যুবক, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ-এই পাঁচভাগে বিভক্ত করিয়াছে। মানব-জীবনের এই পাঁচ অধ্যায়ে মানুষের বিভিন্ন বৃত্তির বিভিন্নরূপ বিকাশ হইয়া থাকে। অন্যান্য বৃদ্ভিব ন্যান্য যৌনবৃত্তিও যে বিভিন্ন রূপে ও বিভিন্ন পবিমাণে বিকশিত হইয়া থাকে। ইহা বলাই বাহুল্য। তবে যৌনবৃত্তির বিকাশ সম্বন্ধে সমস্ত বিশেষজ্ঞ একমত নহেন। আমরা বিতর্কমূলক বিষয়ে অধিক সময়ক্ষেপ না করিয়া অধিকাংশ পণ্ডিতদের গৃহীত মতই এখানে লিপিবদ্ধ করিব।

শৈশবে–প্ৰসিদ্ধ যৌনবিজ্ঞানবিদ হাভলক্ এলিস বলেন যে, শৈশবে মানুষের যৌনবোধ সাধারণতঃ বিক্ষিপ্ত থাকে। সেইজন্য এই সময়ে যৌনবোধ নিশ্চিতরূপে বিপরীত-লিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি নিবদ্ধ হয় না। ডাঃ ম্যাকস ডেসাব বলেন যে, চৌদ্দ-পনার বৎসর বয়স পর্যন্ত বালক ও বালিকাদের যৌনরোগেব। প্ৰকৃতিগত কোনও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। ডাঃ ফ্রয়েড, উইলিয়ম জেমস প্রভৃতি পণ্ডিতগণেরও মোটামুটি এই মত। ইহারা বলেন যে, শৈশবে ও কৈশোরে মানুষের যৌনবোধ সাধারণতঃ সমলৈঙ্গিক হইয়া থাকে। ডাঃ হিপের অভিমত এই যে, কোনও প্রাণীই নিভাঁজ ও অবিমিশ্র স্ত্রী বা পুরুষ নহে। সকল স্ত্রীর মধ্যেই কিছুটা পুরুষপ্রকৃতি এবং সকল পুরুষের মধ্যেই কিছুটা স্ত্রীপ্ৰকৃতি বিদ্যমান। সেইজন্য বাল্যে পুরুষের মধ্যে পুরুষপ্রকৃতি ও স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রীপ্রকৃতি বিশিষ্ট রূপ লইয়া ফুটিয়া না উঠা পৰ্যন্ত উক্ত উভয় প্রকৃতি সমানভাবে ক্রিয়া করিতে থাকে।

সুতরাং দেখা যাইতেছে, প্ৰাচীন পণ্ডিতগণ যে বলিতেন মানুষের মধ্যে শৈশবে কোন যৌনবোধ থাকে না, সেই মত অধুনা পরিত্যক্ত হইয়াছে।

যৌনবোধের স্মরণ–শিশুদের লিঙ্গোত্থান সচরাচরই হইয়া থাকে। কিন্তু উহা শুধু দৈহিক, না উহাতে যৌনবোধরূপ মানসিক চৈতন্য বিদ্যমান আছে, সে কথা নিশ্চয় করিয়া বলা বড়ই দুরূহ ব্যাপার। কারণ, শৈশবে ঐ অবস্থায় কিরূপ মনোভাব হয়, তাহা স্মরণ রাখা কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যতদিনের চৈতন্য মানুষের স্মৃতিপটে জাগ্ৰত আছে, ততদিনকার স্মৃতি হাতড়াইয়া দেখা গিয়াছে যে, শৈশবে লিঙ্গোদ্রেকের সহিত একটা অব্যক্ত পুলকের অনুভূতি বিদ্যমান ছিল। সুতরাং ইহা স্বীকার করিতেই হইবে যে, সকল মানুষের মধ্যেই শৈশবে অল্পবিস্তর যৌনবোধ বিরাজমান থাকে।

অনেক পুরুষেরই স্মরণ থাকিতে পারে যে, শুক্রসঞ্চায়ের পূর্বেও আত্মরতির ফলে একটা পুলক অনুভূত হইত এবং উহার শেষ হইত একটা স্নায়ুবিক কাকানি বা বিস্ফোরণের মত হইয়া। তাহা না হইলে শুক্রসম্পন্ন হইবার পূর্বে বালকদের এবং ঋতুমতী হইবার পূর্বে বালিকাদের মধ্যে স্বয়ং-মৈথুনের প্ৰাদুৰ্ভাব দেখা যাইত না।

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, শৈশবে যৌনবোধ অনেকখানি বিক্ষিপ্ত থাকে। দেহের দিক দিয়া শিশুর যৌন-অঙ্গ তখনও পরিপুষ্ট হয় নাই, আর মনের দিক দিয়া শিশুর মনের দৃষ্টি তখনও বিপরীতলিঙ্গের প্রতি নিবদ্ধ হয় নাই। কাজেই এই বয়সে বালকের যৌনবোধের স্পষ্টতম বহিঃপ্রকাশ হয় হস্তমৈথুন। বাল্যে আরব্ধ হইলেও ইহা অভ্যাসে পরিণত হইয়া গেলে বাল্য, যৌবন, এমন কি প্রৌঢ়ত্বেও অনেকে এই অভ্যাসেব কবল হইতে মুক্ত হইতে পারে না। সাধারণতঃ এই অভ্যাস বাল্যে আরন্ধ হইয়া বিরুদ্ধলিঙ্গ সহবাসেব সুযোগ পাওয়ার সময় পৰ্যন্ত বিদ্যমান থাকে। এই সম্বন্ধে পারে বিস্তাবিত আলোচনা করিতেছি। এই অধ্যায়ে আমাদের এইটুকু মাত্র প্রতিপাদ্য যে, শৈশবে মানুষের যৌনবোধ সর্বপ্রথম আত্মবিকাশ করিয়া থাকে হস্তমৈথুনে।

দ্বিতীয়ত, শৈশবে যৌনবোধ সমকামেও বিকাশলাভ করিয়া থাকে। সমলিঙ্গ দুই ব্যক্তির মধ্যে যৌন-আকর্ষণের নাম সমকাম এবং আঙ্গিক ঘর্ষণ ও মর্দনে যৌনবোধ জাগ্রত ও তৃপ্ত করার নাম সমমৈথুন। এ সম্বন্ধেও পরে আলোচনা করিব বলিয়া এখানে উহার উল্লেখমাত্র কবিলাম। এই অভ্যাস। শৈশব ছাড়াইয়া যৌবনেও গড়াইতে পারে। কিন্তু সাধারণত বিপরীত লিঙ্গের সাহচর্যের সুযোগ লাভের পর এই অভ্যাস থাকে না।

কৈশোরে–শৈশবের পর কৈশোর। বালকের ১৩ ও বালিকায় ১১ বৎসর বয়সে ইহা আরম্ভ হয়। এই বয়সে নারীপুরুষ উভয় জাতির মধ্যে প্রকৃত যৌনভাব জাগ্রত হয়। এই বয়সে তাহারা নিজেদের যৌন-অঙ্গ-সমূহের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ধরিতে শিখে এবং তাহাদের ও বিপরীতলিঙ্গ ব্যক্তিগণের ঐ সমস্ত অঙ্গের পার্থক্য উপলব্ধি করিতে পারে। এই পার্থক্যচেতনা হইতে তাহাদের বিশেষত বালকদের প্রাণে বিপরীতলিঙ্গ ব্যক্তিগণের যৌনপ্রদেশসমূহ দৰ্শন ও স্পর্শনেব জন্য একটা দুৰ্বার আকাঙ্ক্ষা জন্মে। যে যে সমাজে নারীপুরুষের অবাধ মিলনের প্রথা আছে, সেই সেই সমাজের কিশোর-কিশোরীরা এই সময়ে যৌন-অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পাইতে পারে।

বিভিন্ন বয়সে বালক-বালিকার সম্পর্ক–সাধারণতঃ ৭-৮ বৎসর বয়স পৰ্যন্ত বালক-বালিকারা বালিকা ও বালকদের সঙ্গী হিসাবে সমান চক্ষে দেখে। অর্থাৎ কোন বিশেষ শ্রেণীকে বেশী পছন্দ করে না। প্ৰায় ৮ বৎসর বয়স হইতে বালক-বালিকার স্বশ্রেণীর সহিতই খেলাধূলা করিতে ভালবাসে। কখনও কখনও অধিক বয়স্ক ব্যক্তির প্রতি তাহাদের আকর্ষণ দেখা যায়। কৌতুকের বিষয় এই যে, বালকেরা কোনও অধিক বয়স্ক ভ্রাতার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধাবান হয়। কিন্তু বালিকারা সেই মত জ্যেষ্ঠ ভগিনীর প্রতি ততটা আকৃষ্ট হয় না। বরং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রতিই হয়। ১০ হইতে ১২ বৎসর বয়স পৰ্যন্ত বালক-বালিকারা পরস্পরেব প্ৰতি উদাসীন থাকে অথবা শত্রুভাবাপন্ন হয়। এই বিরুদ্ধভাব বালকদের মধ্যে অধিক দেখা যায়। কোন কোন মনঃসমীক্ষক বলেন যে, বাহ্য শত্রুভাব বাস্তব পক্ষে অন্তর্নিহিত উদীয়মান আকর্ষণের বিপরীত মূর্তি, বালক-বালিকারা যত বেশী স্বতন্ত্র হইয়া যায় প্রকৃতপক্ষে তত বেশী তাঁহারা একত্ৰ হইতে পারে।

১৩ হইতে ১৪ বৎসর বয়সে বালিকাদের বয়ঃসন্ধি (Puberty) আসে। তখন তাঁহারা বালকদিগের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে এবং তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করিবার চেষ্টা করে, কিন্তু ঐ বয়সের বালকেরা বয়োপ্রাপ্ত হয় না এবং বালিকাদের নিকট হইতে দূরে থাকিতেই চায়।

কৈশোরে দৈহিক পরিবর্তন–কৈশোরে পদাৰ্পণ করিতেই নারীপুরুষের কতকগুলি দৈহিক পশিবর্তন হয়; এই সময়ে বালকের কণ্ঠস্বরে একটা আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে, তাহার কণ্ঠস্বর মোটা হইয়া যায়, এবং গলদেশে কণ্ঠের অস্থি ঈষৎ বাহির হইয়া পড়ে। স্তনদ্বয়ের বোঁটা উন্নত হয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ গজাইতে আরম্ভ করে। সমস্ত শরীরে বিশেষত মুখে একটা উজ্জ্বল জ্যোতি দেখা দেয়। সমস্ত অঙ্গ বিশেষত নিতম্ব একটু স্থূল হইয় পড়ে।

বালিকার শরীরে অধিকতর পরিবর্তন দেখা দেয়। তাহার কণ্ঠস্বরে কোনও পরিবর্তন আসে না বটে, কিন্তু তাহার স্তনমূল শক্ত হইয়া উহা সুডৌল মাংসপিণ্ডের ন্যায বর্ধিত হইতে থাকে। তাহার নিতম্বযুগল উন্নত ও প্রশস্ত হয়। সমস্ত শরীরের ত্বকে একটা চমৎকার আভা দৃষ্ট হয়। তাহার চক্ষে লজ্জা আসে এবং তাহা হরিণীর চক্ষুর ন্যায় চঞ্চল হইয়া উঠে।

বালক ও বালিকার এই সমস্ত দৈহিক পরিবর্তনের লক্ষণসমূহ বাহির হইতে দেখা যায়। দৃষ্টির অগোচরে উভয়ের অঙ্গের, আরও পবিবর্তন আসে। উভয়ের কামাদ্রিতে ও বগলে কেশ গজাইতে থাকে। নিজ নিজ যৌনপ্রদেশে দৈহিক ও মানসিক বিপুল পরিবর্তনের জোয়ার দেখিয়া তাঁহারা বিস্মিত হয় এবং নিজ নিজ যৌনপ্রদেশে একটা অপূর্ব চাঞ্চল্য এবং ভালবাসার পাত্রের বা পাত্রীর আদর ও সোহাগ-স্পর্শে সৰ্বশরীরে পুলক শিহরণ অনুভব করিয়া থাকে। কিনযের গবেষণা অনুযায়ী বালিকাদের বস্তিলোম ও স্তন প্রায় একই সময়ে উদগত হয়। কিন্তু কতক ক্ষেত্রে বস্তিলোম কিছু পূর্বে। গড়পড়তা আমেরিকার মেয়েদের বস্তিলোম ১২-১৩ বৎসর বয়সে ও স্তন ১২-১৪ বৎসর বয়সে উদগত হয়। গড়ে ইহার সাড়ে আট মাস পারে প্রায় ১৩ বৎসর বয়সে আদ্য ঋতু হয়। আমাদের দেশে সম্পন্ন পরিবারের বালিকাদের ঐরূপই হইয়া থাকে। কিন্তু দরিদ্র ও অশিক্ষিত পবিবারে এই সমস্ত ২-১ বৎসর বিলম্বে হয়।

যৌবনে–বালকেরা ১৮ এবং বালিকারা ১৬ বৎসর বয়সে যৌবনে পদক্ষেপ করে, এবং এই সময়ে কিশোরীরা দৈহিক অন্যান্য পরিবর্তন ব্যতীত যে আর একটি বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়া থাকে তাহা হইতেছে মাসিক ঋতুস্রাব। যে সকল বালিকা ইতিপূর্বে যৌনজান লাভ করে নাই, তাঁহারা ঋতুস্রাবের সমষ হইতে নিজেদের যৌন অঙ্গসমূহ সম্বন্ধে অস্পষ্ট জ্ঞান লাভ করিতে থাকে।

যুবক-যুবতীর এই সমস্ত বাহ্য দৈহিক পরিবর্তন পরস্পরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাহারা অপরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করিবার চেষ্টা করিয়া থাকে। যৌবনের প্রারম্ভে যুবকদের মধ্যে শক্তির প্রাচুর্য থাকিলেও এই সময়ে তাঁহারা সঙ্গমে ততটা সমর্থ হয় না, যতটা হয় যৌবনের মধ্যাহ্নে। বস্তুত শক্তির প্ৰাচুৰ্যহেতুই হউক, আর অনভ্যাসের দরুনই হউক যৌবনের প্রারম্ভে যুবকেরা অতি-ব্যস্ততাবশে প্রায়ই উহাতে কৃতকাৰ্য হয় না। যৌবনের মধ্যভাগে সাফল্যের অবসানে যখন তাহাদের সকল কার্যে স্থৈৰ্য আসে, তখনই তাঁহারা সম্যকরূপে সমর্থ হইয়া থাকে। কিন্তু প্ৰথম যৌবনে শক্তির প্রাচুর্য হেতু অতিরিক্ত শুক্রক্ষয় না করিয়া ব্রহ্মচর্য বা আত্মসংযম অভ্যাস দ্বারা যৌনবেগের তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া শারীরিক পরিপুষ্টর সহায়তা করাই যুবকযুবতীর কর্তব্য। ভবিষ্যতে দাম্পত্য জীবনের সুখ দুঃখের, শান্তি-অশান্তির অনেকখানি এই সময়কার সদাচার অত্যাচারের উপর নির্ভর করিয়া থাকে।

যুবক সম্বন্ধে উপরে যাহা বলা হইল, যুবতী সম্বন্ধে তাহা অধিকতর প্ৰযোজ্য। নারীদেহের গঠনবৈশিষ্ট্যহেতু যৌবনের প্রারম্ভে যুবতীর ভয়, লজ্জার আধিক্য এবং অভিজ্ঞতা ও সুখানুভূতির স্বল্পতাহেতু সঙ্গমে তেমন পটু হইতে পারে না এবং আনন্দলাভ বা আনন্দদান করিতে পারে না। নারীর প্রকৃত রতিজীবন আরম্ভ হয় কিছুকালের অভিজ্ঞতার পর, এমন কি দুই-একটি সন্তান প্রসব করিবার পর হইতে। অনেক অনভিজ্ঞ পুরুষের ধারণা যে সন্তান-প্রসবের দ্বারা নারীর যোনিনালী প্ৰশস্ত হইয়া যাওয়ার ফলে সে তৃপ্তিদায়ক মিলনের অনুপযোগী হইয়া পড়ে। এ ধারণা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক ও ভ্ৰমাত্মক। নারীর যোনিনালী এমন সঙ্কোচন-প্রসারণশীল তন্তু দ্বারা গঠিত যে, প্রসবের পর প্রায় দেড় মাসের মধ্যে উহা প্ৰায় পূর্বাবস্থা প্ৰাপ্ত হয়। সন্তান-প্রসবের দ্বারা ঐ সমস্ত তন্তুর সঙ্কোচন-প্রসারণশীলতা বৃদ্ধি পাইয়া মিলনের অধিকতর উপযোগী হইয়া থাকে।

প্ৰৌঢ়ত্বে নারী–অনেকের বিশ্বাস, প্রৌঢ়ত্বে পদার্পণ করিলে নারীর যৌনবোধ ও রতিক্রিয়াশক্তি কমিয়া যায়। এ কথা সত্য নহে। ব্যক্তিভেদে নারীর সৌন্দর্যের ধারণা পৃথক বটে, কিন্তু বহু বিশেষজ্ঞের দৃঢ় অভিমত এই যে, নারীদেহের স্বাস্থ্যের নিয়মপালন, ব্যায়াম, যত্ন ও স্বাভাবিক প্রসাধনের সাহায্যে, একটু গোছানো রাখিলেই বুঝা যাইবে নারীর সৌন্দর্য যৌবনের অবসানে  প্রৌঢ়ত্বের প্রারম্ভে অমান থাকে। ইহার প্রধান কারণ এই যে, এই সময় নারীর ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ায় তাহার দেহ একটা ক্ষয়ের হাত হইতে রক্ষা পায়। দ্বিতীয়ত, এই ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ায় নারীকে এই সময় সন্তানধারণের ও প্রসবের ন্যায় একটা বিরাট ঝুঁকি সহ্য করিতে হয় না। কাজেই নারীদেহ এই সময় সকল দিক দিয়া পরিপুষ্ট থাকে। আমাদের দেশে পৌঢ় নারী নিজেকে, কিংবা তাহার স্বামী ও অন্য কেহই তাহাকে যত্নের উপযুক্ত মনে করে না বলিয়াই কতকটা অযত্নে, কতকটা সজ্জার অভাবে শীঘ্রই সে বার্ধক্যের কোঠায় নিক্ষিপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু হ্যাভলক্ এলিস, ডাঃ ফিল্ডিং, ডাঃ হফস্টেটর প্রভৃতির অভিমত এই যে, প্ৰৌঢ়ত্বেও নারীদেহ কতক ক্ষেত্রে যৌবন অপেক্ষা অধিক সুন্দর ও লোভনীয় হইয়া থাকে।

ইহা ত গেল দেহের দিককাব কথা। মন ও যৌনবোধের দিক দিয়াও এই কথাই সত্য। প্রৌঢ়ত্বে নারীদেহের সৌন্দৰ্য যদি বজায় থাকে, তবে সে পুরুষের যৌনবোধকেও নিশ্চয়ই জাগ্ৰত করিতে পারে। সে নিজেও এই সময় তীব্রভাবে রতিবাসনা অনুভব করিতে পারে। চিরকুমারী এবং যাহাদের দাম্পত্য জীবনে রাতসুখ লাভ হয় না। তাহাদের সম্বন্ধে এই কথা বিশেষভাবে খাটে। প্রৌঢ়ত্বেব শেষভাগে৷ ঋতুস্ৰাব না থাকায় সন্তান-ধারণের ভীতিও তাহার থাকে না। এই নিরাপদ ভীতিহীনতা তাহাকে রতিক্রিয়ায় অধিকতর উৎসাহী ও শক্তিশালিনী করিয়া থাকে। এই কারণেই ৪০ হইতে ৫০ বৎসরের অনেক ইউরোপীয় বিধবাকে পুনর্বিবাহের জন্য ব্যস্ত হইতে এবং তদভাবে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করিতে দেখা যায়।

ইহার বিপরীতও যে হয় না, তাহা ননে। বরঞ্চ অনেক সময় দেখা যায় স্ত্রীর ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ায় এবং স্বামীর শক্তি হ্রাস হওয়ার পর সত্যকার ভালবাসার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। এই সময় উভয়ের মধ্যে কামভাবের প্রাধান্য না থাকায় সে সম্বন্ধে উচ্ছ্বাস ও লালসাহীন প্রেমে পরিণত হয়। এই সময়েই আমাদের ভারতীয় পবিত্র আদর্শে স্ত্রী স্বামীর সত্যকার সহধর্মিণী হইয়া থাকে। এই সময় ধর্মনৈতিক, সমাজনৈতিক ও রাজনৈতিক সাধনায় এবং লোকহিতকর অনুষ্ঠানাদিতে স্বামীস্ত্রী পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতা করিবার অবসর পায়। পুরুষের দিক হইতে যাহাই হউক না কেন, নারীর দিক হইতে এ কথা অসঙ্কোচে বলা যাইতে পারে যে, যে সমস্ত নারী ধর্মে, রাষ্ট্রে, সাহিত্য বা লোকহিতকর অনুষ্ঠানাদিতে ইতিহাসবিখ্যাত হইয়া গিয়াছেন, তাহাদের অধিকাংশই প্রৌঢ়ত্বের কোঠায় পা দিয়াই তাহা করিয়াছেন।

বার্ধক্যে নারীর কাম-প্ৰৌঢ়ত্বের পরে বার্ধক্য আসে। বার্ধক্যের আগমনে নারীদেহে বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয়। এতদসহ যে মানসিক বিপ্লব উপস্থিত হয়, তাহা আরও আকস্মিক। হঠাৎ নারী একদিন নিজেকে সমস্ত দৈহিক ভোগের অযোগ্য অবস্থায় দর্শন করিয়া বিচলিত হইয়া পরে এবং কতক স্থলে নারীর মনে শেষবারের মত যৌনক্ষুধা প্রজ্বলিত হইয়া উঠে। বহু চিরকুমারী, বিধবা (বিশেষত সন্তানহীনা), সন্ন্যাসিনী ও মঠবাসিনী নারীকে বৃদ্ধ বয়সে পদস্খলিত হইতে দেখা গিয়াছে। অধিকাংশ স্থলেই বা সাধারণতই যে এইরূপ হইয়া থকে তাহা বলা যায় না। কারণ, বহু সন্তানবতী ও যৌনজীবনে সন্তুষ্ট বৃদ্ধ নিজের বার্ধক্যকে প্ৰকৃতির দুর্নিবার বিধান বলিয়া প্ৰশান্ত অন্তঃকরণে গ্ৰহণ করিয়া থাকে এবং অতীত যৌবনের ত্রুটি, বিচ্যুতি ও পদস্খলনের জন্য ধীরভাবে মানসিক প্ৰায়শ্চিত্ত করিতে প্ৰস্তুত হয়।

পুরুষের রতিশক্তি-রতিশক্তির দিক হইতে বিচার করিলে পুরুষকে প্রৌঢ় অবস্থাতেই বৃদ্ধ বলা যাইতে পারে। সত্য বটে। পুরুষ অধিকাংশ স্থলে শেষ বয়স পর্যন্ত সন্তানোৎপাদনের উপযুক্ত থাকে, কিন্তু সন্তানোৎপাদনের ক্ষমতা এক কথা, রতিশক্তি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কথা। সতেজাও যথেষ্ট সংখ্যক শুক্ৰকীট কোন কোন স্থলে অতিবৃদ্ধের শুক্রেও বিদ্যমান থাকে। ইহা কোন প্রকারে উৎপাদিক-শক্তিসম্পন্ন নারীর যোনিমুখে তাহার ডিম্বস্ফোটনের দিন, তাহার ২-১ দিন আগে অথবা ১ দিন পরে পতিত হইয়া জরায়ুমুখে প্ৰবেশ করিলেই সন্তানোৎপাদনের সম্ভাবনা হয়। তজ্জন্য বিশেষ রতিশক্তি অর্থাৎ লিঙ্গোত্থান ও কিছুক্ষণ সঙ্গম-ক্ষমতা থাকিবার প্রয়োজন হয় না, সুতরাং কোনও বৃদ্ধের শুক্রে সন্তানোৎপাদন হইলেই মনে করা উচিত নহে যে, তাহার রতিশক্তি অক্ষুন্ন আছে। ফলতঃ পুরুষ প্রৌঢ়ত্বের মধ্যসীমা অতিক্ৰম করিবার পর সাধারণতঃ রতিশক্তিতে আংশিক অসমর্থ হইয়া পড়ে। অনেক শরীরবিজ্ঞানবিদের মতানুসারে পঞ্চাশ বৎসর বয়সে পুরুষের এই অবস্থা দৃষ্ট হয়। অনেকের আবার মত এই যে, উহার অনেক পূর্বে—চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সেই পুরুষের রতিশক্তি হ্রাস পাইতে আরম্ভ করে।

বার্ধক্যে পুরুষের কাম–বার্ধক্যে পুরুষ তাহার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাহার বাসনার হ্রাস হয় না, বরং রতিশক্তিহীনতা কোন কোন ক্ষেত্রে তাহার প্রাণে বাসনার তীব্ৰতা বৃদ্ধি করিয়া থাকে। পুরুষদের মধ্যে যাহারা যৌবনে যথেষ্ট পরিমাণে নারী ভোগ করিয়াছে, কেবল তাঁহারাই যে বার্ধক্যে রতি-উন্মত্ত হইয়া ওঠে, তাহা নহে; এমনও দেখা গিয়াছে যে, যৌবনে সংযমী, চিরকুমার পুরুষ হঠাৎ বৃদ্ধ বয়সে অত্যধিক মাত্রায় কামোন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছে। আমার এক ডাক্তার বন্ধু যৌবনেই আকস্মিক দুর্ঘটনায় তাঁহার প্ৰেমাস্পদ স্ত্রীকে হারাইয়া ফেলেন। তারপর প্রায় ৫০ বৎসর পর্যন্ত পুনর্বিবার ত করেনই নাই, আর করিবার মত ইচ্ছাও একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছেন এইরূপ প্ৰকাশ করেন। হঠাৎ তাহার মত পরিবর্তন হয়–১৩ বৎসরের একটি বালিকার প্রেমে পড়িইয়া উহাকে বিবাহ করিবার জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া পড়েন! অবশেষে নানা বাধাবিঘ্নের মধ্যে তাঁহার বিবাহ হয়। তাঁহাদের দাম্পত্যজীবনের চিহ্নবাহী সন্তানও জন্মগ্রহণ করে।

পূর্বেই বলিয়াছি, পুরুষেরা রতিশক্তি এই বয়সে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। সমস্ত অঙ্গের শীর্ণতা ও সঙ্কোচনের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের লিঙ্গও সেই অনুপাতে ক্ষুদ্রাকৃতি হইয়া পড়ে। এমতাবস্থায় তাহারা কিরূপে বর্ধিত বাসনার তৃপ্তি সাধন করিয়া থাকে? হাভলক এলিস, ল্যাপম্যান প্রভৃতির অভিজ্ঞতা এই যে, বর্ধিতকাম বুদ্ধের এই সময় প্রধানতঃ দৰ্শন, প্ৰদৰ্শন ও স্পর্শের দ্বারাই নিজেদের বাসনার তৃপ্তিসাধন করিয়া থাকে।

জার্মান বিজ্ঞানী ক্রাফট এবিং-এ্র মত এই যে, বার্ধক্যে এই বর্ধিত যৌনস্পৃহা অস্বাভাবিক নহে এবং বৃদ্ধদের উপরি লিখিত কাৰ্যাবলীও অস্বাভাবিকত্বের নিদর্শন নহে। আমাদের বিবেচনায় এগুলি বার্ধক্যের অস্বাভাবিক অবস্থা ছাড়া আর কিছু নহে, এবং কদাচিৎ ঐরূপ পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। কাহারও কাহারও বার্ধক্যে যৌনস্পৃহা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধিপ্ৰাপ্ত হইলেও সুস্থ দৈহিক ও মানসিক অবস্থায় পুরুষ সে স্পৃহাকে সংযত রাখিতে পারে। অন্ততঃ আমাদের দেশে এরূপ কেলেঙ্কারী সচরাচর ঘটিতে দেখা যায় না।

নারীর যৌনতার বিকাশ সম্বন্ধে ডাঃ কিশের মত–ডাঃ কিশ মধ্য ইউরোপের নারীজীবনের যৌনচেতনার ক্রমবিকাশ ও হ্রাসবুদ্ধির একটি গ্ৰাফ উদ্ধৃত করিয়াছেন। পণ্ডিতদের গবেষণায় জার্মানী ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের নারীদের দৈহিক পরিণতি ও অবনতির গড় যেভাবে দাঁড়াইয়াছে, পরবর্তী পৃষ্ঠার গ্রাফে তাহা প্ৰদশিত হইয়াছে।

উক্ত চিত্ৰ হইতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হইবে যে, বালিকাদের সাবালকত্বের পর হইতে তাহাদের দৈহিক পরিণতি ও যৌনচেতনা দ্রুতবেগে বৃদ্ধিপ্ৰাপ্ত হইতে থাকে। বিবাহের পরে এত দ্রুত না হইলেও অনুরূপ পরিণতি হইতে হইতে প্ৰায় ৩১-৩২ বৎসর বয়সে উহারা যৌনজীবনের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হয়। ইহার পর ধীরে ধীরে তাহাদের যৌনজীবনের ক্রমাবনতি প্ৰকাশ পাইতে থাকে। ৪৬-৪৭ বৎসর বয়স হইতে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের যৌনচেতনা এবং দৈহিক পরিণতি অতি দ্রুতবেগে হ্রাস পাইতে থাকে। এই স্তর হইতেই নারীর বার্ধক্য আরম্ভ হয়।
 পাক-ভারতের রমণীদের সম্বন্ধে আমাদের মত–ভারতবর্ষে এ পৰ্যন্ত এইরূপ কোন গবেষণা হয় নাই। কারণ, এখানে নির্ভরযোগ্য কোন হিসাব বা সূত্র পাওয়া যায় না। আমাদের মতে এদেশ সম্বন্ধে ঐ রূপ বর্ণনা দিতে হইলে উক্ত চিহ্নগুলিকে নিম্নলিখিতরূপে ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে, যথা ঃ—

X–১২-১৩ বৎসরে প্রথম ঋতুদর্শন।

X X–১৫-১৬ বৎসরে বিবাহ।

X X X—২৬-২৭বৎসরে যৌনজীবনের সর্বোচ্চ স্তর।

X X X X—৪২-৪৩ বৎসরে ঋতু বন্ধ হওয়া।

১৯৩০ খ্ৰীষ্টাব্দে সার্দা আইন প্ৰচলিত হওয়ায় বিবাহ বয়সের গড় এখন ক্ৰমে বাড়িতে থাকিবে। ধরিয়া লওয়া যায়। বাল্যবিবাহই আমাদের দেশে অকালবার্ধক্যের অন্যতম কারণ বলিয়া মনে করা যাইতে পারে।

 

ব্যক্তিভেদে যৌনপ্রকৃতির পার্থক্য

দেশগত, জাতিগত ও আবহাওয়াগতভাবে এবং শ্রেণী হিসাবে নারী-পুরুষের মধ্যে যৌনপ্রকৃতির যে পার্থক্য আছে, বিভিন্ন ব্যক্তির ঐ প্রকৃতির পার্থক্য তদপেক্ষা অনেক ব্যাপক ও তীব্র। পৃথিবীর অধিকাংশ যৌন-বিজ্ঞানী এ কথা স্বীকার করিয়াছেন। ডাঃ ফোরেল প্রমুখ বলিয়াছেন যে ব্যক্তিগত রতিপ্রকৃতির পার্থক্য পুরুষ অপেক্ষা নারীজাতির মধ্যে অনেক বেশী।

ভারতীয় ও আরবীয় পণ্ডিতগণ এ বিষয়ে বিস্তৃত ও সুষ্মভাবে আলোচনা করিয়াছেন। ইউরোপীয় যৌনবিজ্ঞানীগণের মধ্যে মিডাব এ বিষয়ে গবেষণার সুচনা করেন।

 

প্রাচীন ভারতীয় মতে নর ও নারীর শ্রেণীবিভাগ

ভারতীয় পণ্ডিতগণ নারীপুরুষের বাসনার তীব্রতা ও অঙ্গের আকৃতিভেদে পুরুষকে শশক, মৃগ, বুষ ও অশ্ব এবং নারীকে পদ্মিনী, চিত্রাণী, শঙ্খিনী ও হস্তিনী এই চারি শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। এই শ্রেণীবিভাগ তাহাদের সূক্ষ্মতা ও বিস্তৃতির জন্য আমাদের নিকট অবৈজ্ঞানিক মনে হয়। উহার মধ্যে আমরা প্ৰাচীন ভারতীয় পণ্ডিতগণের অনুমানে সত্য নির্ণয় ও তাহা প্রচারের অভ্যাস দেখিতে পাই। অনেক বৈদেশিকের ধারণা শাস্ত্ৰ-পীড়িত প্ৰাচীন ভারতে মানুষের সমস্ত দোষগুণকে বর্ণ ও শ্রেণীবৈশিষ্ট্য বলিয়া মনে করা হইত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্ৰাচীন ভারতে একেবারে ছিল না। সেই প্রাচীন ভারতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কতটা স্বীকৃত হইয়াছিল। এই শ্রেণীবিভাগই তাহার প্রমাণ। শ্রেণী, সমাজ ও বর্ণেব উঞ্চেরও যে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে বহু গুণাগুণের অধিকারী হইতে পারে, এই শ্রেণীবিভাগে তাহা স্বীকৃত হইয়াছে। অন্য কোনও কারণে না হইলেও শুধু এই কারণে এই শ্রেণীবিভাগ ইতিহাসে স্থান পাইতে পারে।

ভারতীয় পণ্ডিতগণ উপরোক্ত চঋ শ্রেণীর পুরুষ ও চারি শ্রেণীর নারীর দৈহিক ও মানসিক বিবরণ দিয়াছেন। এই সমস্ত বিবরণ যদি সত্য বলিয়া পরিয়াও লওয়া যায়, তবু এক শ্রেণীর সমস্ত দোষগুণ সেই শ্রেণীর সমস্ত ব্যক্তিতে দেখা যায় না বলিয়া উহাদের মূল্য খুব বেশী নহে।

 

চারি প্রকার পুরুষ

শশক–শশকের কামপ্রবৃত্তি খুব কম বলিয়া অনুরূপ পুরুষেকে শশক নাম দেওয়া হইয়াছে। সহবাসে শশক এত দুর্বল যে, ঐ কর্মের পর শশক ভূপতিত হয়। সেইরূপ শশক জাতীয় পুরুষ সুরতে খুব অপটু এবং ঐ ক্রিয়াকে বিশেষ পরিশ্রমের কার্য বলিয়া মনে করে এবং ইহাতে বিরক্ত প্ৰকাশ করিয়া থাকে। শশক জাতীয় পুরুষের লিঙ্গ ক্ষুদ্র। এই শ্রেণীরপুরুষ মধ্যমাকৃতি, দেখিতে সুশ্রী, ভগবানে ও গুরুজনে ভক্তিপরায়ণ, দয়ার্দ্রচিত্ত এবং মিষ্টভাষী হইয়া থাকে। তাহারা সর্বদা সাধুসঙ্গে কালযাপন করিয়া থাকে এবং অল্পভোজী হয়।

মৃগ—মৃগ খুব দ্রুতগামী ও কর্মঠ জীব বটে কিন্তু সঙ্গমে ততদূর পটু নহে। সেই জন্য অনুরূপ গুণবিশিষ্ট পুরুষকে মৃগ বলা হইয়া থাকে। এই শ্ৰেণীর পুরুষের দেহ দীর্ঘায়ত ও সুগঠিত হইয়া থাকে। সে লম্বা লম্বা পদক্ষেপে ইটয়া থাকে, সর্বদা হাসিমুখে থাকে, ভগবদ্ভক্তি সুচক গান গাহিতে ভালবাসে এবং খুব বেশী খাইতে পারে।

বৃষ–এই শ্রেণীর লোক ষাড়ের মত যৌনক্ষুধার্তা। ষাড় যেমন রতিবাসনা পূরণের জন্য গাভীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ মাইলের পর মাইল অতিক্রম করিতে কুন্ঠিত নহে সেইরূপ বৃষজাতীয় পুরুষ তাহার অভিলষিত নারীর জন্য যে কোনও উপায় অবলম্বন করিতে প্ৰস্তুত। এই জাতীয় পুরুষ বেঁটে, মোটাসোটা। তাহার বক্ষ প্রশস্ত, বাহু পেশীবহুল ও মাথা খুব বড় হয়। তাহার গায়ের চামড়া অতিশয় পুরু, প্ৰকৃতি নিষ্ঠুর ও মেজাজ কড়া, জিহ্বা খুব লম্বা। সে খাইতে পারে খুব বেশী। কেবলই মেয়েদের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া থাকে।

অশ্ব–এই জাতীয় পুরুষ বিহারে অশ্বের মত শক্তিশালী বলিয়া ইহাদিগকে এই নাম দেওয়া হইয়াছে। ইহাদের অঙ্গ অস্বাভাবিক রকম দীর্ঘ। ইহাদের বর্ণ সাধারণতঃ কৃষ্ণ হয়। ইহাদের কৰ্ণ দীর্ঘ, শরীর দীর্ঘ ও মোটা, বুক প্রশস্ত, বাহু অতিশয় দীর্ঘ হইয়া থাকে। ইহাদের ঘুম খুব কম হয়। মিথ্যা বলা ইহাদের অভ্যাস। পরনিন্দাতে ইহারা খুব পটু। রতিক্রিয়ায় ইহারা রুচিশীল নহে; যে-কোন প্ৰকারের নারী হইলেই ইহারা সন্তুষ্ট। ইহারা সাধারণত উচ্চস্বরে কথা বলিয়া থাকে।

পুর্বেই বলিয়াছি, এক শ্রেণীর সমস্ত গুণ একই ব্যক্তির মধ্যে দুষ্প্রাপ্য। একই ব্যক্তির মধ্যে আমরা সচরাচর হয়ত মৃগের এক গুণ, শশকের আর এক গুণ, বৃষের অপর গুণ এবং অশ্বের এক গুণ দেখিয়া থাকি। কিংবা একজনের মধ্যে কতক মৃগের, কতক বৃষের-এইরূপে এক শ্রেণীর বেশী, এক শ্রেণীর কম গুণাবলী দেখিয়া থাকি। তাই এই শ্ৰেণীবিভাগের বিশেষ কোনও সার্থকতা নাই।

 

চারি প্রকার নারী

পদ্মিনী–পদ্মিনী নারী দেখিতে খুব সুন্দর। তাহার দেহ সুগঠিত, দীর্ঘ। তাহার চক্ষু পদ্মের ন্যায় প্রশস্ত ও দীর্ঘায়ত। তাহার শরীর সর্ষপ কুসুমের ন্যায় কোমল। পদ্মিনী নারীর চর্ম কখনও কৃষ্ণবর্ণ হইবে না। তাহার স্তন সুঠাম, সুগঠিত ও উন্নত। তাহার নাসিকা সুগঠিত ও ঋজু, গলা মধ্যমাকৃতি, ভগ পদ্মের পাপড়িসদৃশ ও সুগন্ধি। তাহার গমনভঙ্গী মরালসদৃশ, কণ্ঠস্বর সুমিষ্ট। সে অল্পাহারী। তাহার ঘুম খুব পাতলা। সে খুব বুদ্ধিমতী ও ধর্মপরায়ণা। সে সর্বদা সুরুচিসম্মত মূল্যবান সাদা পোষাক পরিতে ভালবাসে।

চিত্রাণী—চিত্রাণী নারী মধ্যমাকৃতি, ক্ষীনাঙ্গী, দেখিতে অতিশয় সুশ্রী। তাহার গ্রীবা গোলাকার ও সুগঠিত শঙ্খের মত। তাহার ওষ্ঠ সুগঠিত ও ঈষৎ উন্নত। তাহার চক্ষু মুগচক্ষুর ন্যায় চঞ্চল। তাহার কণ্ঠস্বব ঈষৎ তীব্র। তাহার গতিভঙ্গী হস্তীর ন্যায় মন্থর। তাহার পয়োধর পীনোন্নত ও সুগঠিত, নিতম্ব ও উরু অতিশয় সুদৃশ্য, কিন্তু পদদ্বয় সরু। তাহার যৌনকেশ অতিশয় পাতলা। তাহার কামাদ্রি ও ভগদেশ মাংসল, গোলাকার। সে স্বভাবত নৃত্যগীতপ্রিয়। সে চুম্বন, আলিঙ্গন, মর্দনাদি শৃঙ্গারক্রিয়ায় অত্যন্ত আসক্ত। বাদ্যযন্ত্র, চিত্র, সুন্দর সুন্দর পোশাক ও সুগন্ধি বিলাসদ্রব্য তাহার অতিশয় প্রিয়। সে সম্ভোগে অতিশয় আসক্ত নহে।

শঙ্খিনী–শঙ্খিনী নারী তন্বী, তাহার মস্তিষ্কে বিপুল কেশরাজি, ললাট প্ৰশস্ত ও উন্নত। তাহার হস্তদ্বয় দীর্ঘ ও নিতম্ব বৃহদাকার। তাহার স্তনদ্বয় শরীরের অন্যান্য অংশের সহিত মানানসই নহে–হয় খুব বড়, নয় আতিশয় ক্ষুদ্র। তাহার কণ্ঠস্বর অতিশয় উচ্চ ও কর্কশ। তাহার নাসিকা অতিশয় লম্বা। সে লালফুল ও লাল পোষাক অত্যন্ত ভালবাসে। তাহার কামাদ্রি ও ভগদেশ ঈষৎ নিম্নাভিমুখে ঝুলায়মান, ঘন ও মোটা কেশে আবৃত। সে অতিশয় কামুক এবং রতিক্রিয়ার সময় পুরুষকে দংশন করিয়া বা অন্য উপায়ে বিক্ষত করিয়া থাকে।

হস্তিনী–হস্তিনী নারী অতিশয় মোটা ও বেঁটে। তাহার ঘাড় অতিশয় মোটা। পদাঙ্গুলি ঈষৎ বক্রাকৃতি। তাহার নিতম্ব ও উরু অতিশয় বৃহৎ ও মাংসল। তাহার চক্ষু আতিশয় ক্ষুদ্র, তাহা হইতে কামভাব ও লোভ বিচ্ছুরিত হইতে থাকে। তাহার ঠোঁট মোটা ও কম্পমান। তাহার মাথার কেশ পিঙ্গলবর্ণ। সে স্বভারত নির্লজ্জ, শরীরের অঙ্গপ্ৰত্যঙ্গ ঢাকিয়া রাখা ব্যাপারে সে ইচ্ছা করিয়া আলস্যবতী। তাহার কণ্ঠস্বর কর্কশ ও উচ্চ। সে ঝাল ও টক খাইতে ভালবাসে। তাহার যোনি প্রশস্ত ও গভীর। তাহার কামাদ্রি সমুন্নত ও ভগপ্রদেশ বিস্তৃত। (অনেক দেশে এই কুসংস্কার আছে যে, প্রত্যেক নারীর ভগের ফাটল তাহার মুখের দুই ঠোঁটের মিলনাস্থলের মত বড় এবং মুখের ঘা যত বড় যোনিমুখও তত বড়।)

শ্ৰেণীবিভাগে দোষ–উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগে মোটামুটি বহুদৰ্শন, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আনুমানিক কল্পনাব পরিচয় আছে। কিন্তু এই প্রকৃতিবর্ণনার মধ্যে একটা অবৈজ্ঞানিক দোষ এই দেখিতে পাওয়া যায় যে, যৌনবোধের স্বল্পতা আতিশয্যের সঙ্গে চরিত্রগত অন্যান্য দোষগুণকে মিশাইয়া ফেলা হইয়াছে। ভারতীয় যৌনশাস্ত্রকারগণ যেন এই পূর্বসংস্কার দ্বারা পরিচালিত হইয়াছেন যে, কাম বা রতিশক্তি যেন জঘন্যবৃত্তি, এইগুলি যে পুরুষ বা নারীর মধ্যে বেশী থাকিবে, তাহার মধ্যে অন্য সদগুণ থাকিতে পারে না। কিন্তু এই ধারণা নিতান্ত ভ্ৰমাত্মক ও অবৈজ্ঞানিক। যৌনবাসনার স্বল্পতা ও আতিশষ্য দ্বারা মানুষের নৈতিক চরিত্র পরিমাপ করা উচিত হইবে না। বস্তুত শক্তি ও বাসনা কম থাকিলেই মানুষ ধামিক হইবে, আর তাহা বেশী থাকিলেই অধাৰ্মিক হইবে, ইহা কোনও কাজেরই কথা নহে। বরং অধিক রতিশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই জগতে অনেক বিষয়ে নেতৃত্ব করিয়া গিয়াছেন। হযরত মোহাম্মদের শক্তি অসাধারণ ছিল। ধর্ম, নীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে নেতৃত্ব করিয়াছেন এমন বহু লোকেরই অনুরূপ সামর্থ্যের কথা জানা গিয়াছে।

 

মিডারের শ্রেণীবিভাগ

রতিপ্ৰকৃতিভেদে কতকটা ভারতীয় পণ্ডিতগণের অনুসৃত অনুরূপ নীতিতে নারী জাতিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করিবার চেষ্টা ইউরোপেও হইয়াছে। যৌনবিজ্ঞানী মিডার মনোবিশ্লেষক নীতিতে নারীকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। তাঁহার মতে নারীজাতি মোটামুটি দুই শ্রেণীর। এক শ্রেণী সচ্চরিত্ৰা, ধর্মপরায়ণা, পতিব্ৰতা ও অল্পে তুষ্টা, ইহারা সম্ভোগে বিশেষ আগ্ৰহশীলা বা পটু নহে, স্বামীকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য এবং সন্তানোৎপাদনের জন্যই ইহারা স্বামী-সহবাস করিয়া থাকে। এই দুই উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনও কারণে উহাতে অতিরিক্ত উৎসাহ প্রদর্শন করাতে ইহারা নারীর পক্ষে অশোভন বেহায়াপনা মনে করিয়া থাকে। এই শ্রেণীর নারীকে মিডার জরায়ু প্ৰধান নারী নামে আখ্যায়িত করিয়াছে।

ইহা ব্যতীত আর এক শ্রেণীর নারী আছে, যাহারা বিলাসিনী ও সম্ভোগ-প্রিয়া। ইহারা সর্বদা রতিকার্ষে লিপ্ত থাকিতে ভালবাসে। নিজেকে পুরুষের চক্ষে মনোহারিণী করিবার জন্য ইহারা সাজ-সজ্জার বিশেষ পারিপাট্য বিধান করিয়া থাকে। এক শ্রেণীর নারীকে মিডার ভগাঙ্কুরপ্রধান নারী নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন। মিডারের এই শ্রেণীবিভাগ কতক মনোবিশ্লেষক যৌনবিজ্ঞানী কর্তৃক সত্য বলিয়া গৃহীত হইয়াছে। ফরাসী যৌনবিজ্ঞানী লমোনিয়ের (Laumonier) এবং রেনে গাইওঁ (Rene Guyon) মিডারের মতবাদকে জনপ্রিয় করিয়া তুলিয়াছেন। তবে গাইও উক্ত শ্রেণীবিভাগকে নারীজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া পুরুষেরাও উপর প্রয়োগের সমর্থন করিয়াছেন।

মিডারের এই শ্রেণীবিভাগ ভারতীয় পণ্ডিতগণের শ্রেণীবিভাগের ন্যায় ততটা স্বাক্ষর নয়। এবং ইহাতেও অনাবশ্যকভাবে বাসনা্র আধিক্যের সহিত নানা দোষের এবং অল্পতার সহিত নানাসদগুণেব একত্র অবস্থান কল্পনা কিবা হইয়াছে।

 

গাইওঁর শ্রেণীবিভাগ

রেনে গাইওঁ মিডারের শ্রেণীবিভাগের অনুরূপ নীতি অনুসরণ করিয়া পুরুষকেও এই প্ৰকৃতি অনুসারে যে দুই শ্রেণীতে ভাগ করিয়াছেন, তাহা আজও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন না কবিলেও এবং সকল শ্রেণীর যৌনবিজ্ঞানী কর্তৃক গৃহীত না হইলেও, এ-স্থলে উহার উল্লেখ করা। আমরা প্রয়োজন বোধ করিতেছি। গাইওঁ পুরুষকে শিরাপ্রধান ও লিঙ্গপ্রধান এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। শিরাপ্ৰধান পুরুষ জরায়ুপ্রধান নারীর ন্যায় অল্পে তুষ্ট। সে রতিক্রিয়ায় খুব বেশী আসক্ত নহে। মাঝে মাঝে কোন প্রকার শুক্ৰঙ্খালন করিতে পারিলেই সন্তুষ্ট। সে নিষ্ঠাবান স্বামী, স্নেহময় পিতা, ঘোর সংসারী। আর লিঙ্গপ্রধান পুরুষ ভগাঙ্কুরপ্রধান নারীর ন্যায় অতিশয় রতিকামী। সে এক নারীতে তৃপ্ত নয়, সর্বদা শৃঙ্গার ও ভোগচিন্তায় মগ্ন।

বলা বাহুল্য, ভারতীয় পণ্ডিতগণের শ্রেণীবিভাগে যেমন অনাবশ্যক সূক্ষ্মতা দৃষ্ট হয়, ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের শ্রেণীবিভাগে তেমনই অতিরিক্ত মাত্রায় স্থূলতা দৃষ্ট হইয়া থাকে। উভয় দলই একই ভুল করিয়া বসিয়াছেন এই ধরিয়া যে, অল্প সুরতে তুষ্ট নর ও নারী সদ্‌গুণ বিভূষিত এবং বেশী রতিপ্রিয় লোকেরা বহু দোষের আকর।

 

নারীর যৌন-বাসনার জোয়ার-ভাটা

বাৎস্যায়ন, কোকা পণ্ডিত, কল্যাণমল্প প্ৰভৃতি ভারতীয় পণ্ডিতগণ নারীর রতিবাসনার উপর চন্দ্রের প্রভাবের কথা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করিয়া গিয়াছেন। এইরূপ আলোচনা অনেকটা অনুমান ও পূর্বসংস্কারজনিত বলিয়া মনে হয়। পুরাকালের ধারণা ও মতামত হিসাবে ইহা আমাদের কৌতূহলের উদ্রেক করিতে পারে, সেজন্য উহার কিঞ্চিত বিবরণ উদ্ধৃত করিলাম।

চন্দ্রের প্রভাব

ভারতীয় ও আরবীয় যৌনবিজ্ঞানবিদদের অভিমত এই যে, চন্দ্রের উত্থানপতনের সঙ্গে নারীর যৌনবোধ তাহার শরীরে মাথা হইতে পা পৰ্যন্ত উঠানামা করে। শুক্লপক্ষের প্ৰথম তিথিতে স্ত্রীলোকের বাসনা তাহার দক্ষিণ পা হইতে দক্ষিণপার্শ্ব দিয়া উত্থিত হইয়া ক্ৰমে পায়ের পাতা, থোডা, পা, উরু, জঙ্ঘা, কটি, কোমর, নাভি, স্তন, ঘাড়, চিবুক, গাল, ঠোঁট, চক্ষু ও কপাল ভ্রমণ করিয়া পঞ্চদশ দিবসে মস্তকোপরি আবোহন করিয়া কৃষ্ণপক্ষে ঠিক ঐ রূপে বামপার্শ্ব দিয়া আবার পায়ে অবতবণ করিয়া থাকে।

‘লয্‌যতন্নিসা’ নামক সেকালে বহু প্ৰচলিত যৌনশাস্ত্রের মতে নারীর বাসনা চান্দ্ৰমাসের ১ম দিনে ডান কানে, ২য় দিনে বগলে, ৩য় দিনে বাহুতে, ৪র্থ দিনে পৃষ্ঠে, ৫ম দিনে স্তনে, ৬ষ্ঠ দিনে নাভিতে, ৭ম দিনে বাম কানে, ৮ম দিনে গলায়, ৯ম দিনে ডান উরুতে, ১০ম দিনে দক্ষিণ জানুতে, ১১শ দিনে চিবুকে, ১২শ দিনে বাম কাঁধে, ১৩শ দিনে ডান কাধে, ১৪শ দিনে কোমরে, ১৫শ দিনে পায়েব পাতায় অবস্থিত থাকে। উভয় মতের পণ্ডিতগণই বলিয়াছেন যে, নির্দিষ্ট তারিখে বর্ণিত স্থানে চুম্বন, মর্দন, ঘর্ষণ ও লেহন করিলে নারীর কামোচ্ছা উদ্দীপিত হইয়া থাকে। এই সমস্ত মতবাদ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে পরিত্যক্ত হইয়াছে।

আরব দেশেও চন্দ্রের উত্থান ও পূর্ণ বিকাশের সঙ্গে মানুষের যৌনবোধ তীব্ৰ হইয়া উঠে এই ধারণা প্রচলিত ছিল। পূর্ণমার দুই দিন পূর্ব হইতে ইহা চরমে উঠে বলিয়া মনে করা হইত। এই তিন দিনকে ‘আয়াম বীজ’ বা ‘শুক্ল দিন’ বলা হইত। মানুষের বাসনাকে সংযত রাখিবার জন্য ঐ তিন দিন ‘রোজা’ (উপবাস) রাখার ইঙ্গিত ও পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে।

ঠিক এই সময়ে সকল নারীর ঋতুস্রাব হইলে অবশ্য নারীর বাসনার উপর চন্দ্ৰের প্রভাব আছে কিনা তাহা প্ৰত্যক্ষত ধরা পড়িত। কিন্তু তাহা হয় না। আবার চান্দ্ৰমাসের মত প্ৰায় ২৮ দিন পর কতক নারীর ঋতুস্রাব হইয়া থাকে একথা ঠিক। ইহা লক্ষ্য করিয়া কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, প্ৰাচীনকালে মনুষ্য এবং মানুষ্যেতর প্রাণীরা বোধ হয় চন্দ্ৰের প্রভাবে এই ভাবে প্রভাবান্বিত হইত।  [হ্যাভলক লিখিয়া গিয়াছেন: ‘Bearing in mind the influence exerted on both the habits and the emotions even of animals by the brightness of noon light nights, it is perhaps not extravagant to suppose that, in organisms already ancestrally predisposed to the influence of rhythm in general and of cosmic rhythm in particular, the preodical recurring full moon, not merely by its stimulation of the nervous system, but possibly by the special opportunities waich it gave for the exercise of the sexual functions served to impart a lunar rhythm on menstruation.’]

গার্সন (Gerson) এ সম্বন্ধে অনেক কথা বলিয়াছেন। তাঁহার মতে, বোধ হয় আমাদের বহু-পূর্বপুরুষেরা দলবদ্ধভাবে থাকিত এবং চন্দ্রালোকের সুবিধা গ্ৰহণ করিয়া ঘোরাফেরা করিতে করিতে এক দল আর এক দলের সাক্ষাৎ পাইত। এই সময়েই তাই এক দলের পুরুষেরা অন্য দলের নারীদের সঙ্গ-লাভের সুযোগ পাইত। অসভ্য জাতিরা এখনও চন্দ্ৰালোকে নৃত্য-অভিসারের আয়োজন করে। মালিনোস্কি (Malimowski) নিউগিনির আদিম অধিবাসীদের মধ্যে এই প্ৰথা লক্ষ্য করিয়াছেন যে, উহাদের আমোদ-উৎসবের আড়ম্বর বাড়িতে বাড়িতে পূর্ণিমার কাছাকাছি সব চেয়ে বেশী হয়।

গার্সনের অভিমত পড়িয়া মনে হয় যে, তাঁহার ধারণা ঋতুস্রাব মানবজাতির মধ্যেই প্ৰথম প্ৰকাশ পায় এবং মানব জাতিতেই উহা সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইদানীং প্ৰকাশ পাইয়াছে যে, বানব জাতির মধ্যেও উহা মাসে মাসে সুচিত হয়। তাই অভিব্যক্তিবাদের (Evolution) সূত্র অনুসারে আমাদের মানবেতব পূৰ্বপুরুষের মধ্যেও প্রকৃত কারণের অনুসন্ধান করিতে হইবে।

মেরী স্টোপ্‌স এবিষয়ে বহুসংখ্যক স্ত্রীলোকের সাক্ষ্য গ্ৰহণ করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, নারীর বাসনার সহিত তাহার ঋতুস্রাবের কোন সংশ্ৰব নাই। তাঁহার গবেষণার ফল এই যে, সমস্ত প্ৰাণিজগতেই বৎসবের ঋতুবিশেষে যে গর্ভাধান ও প্রজনন কার্য হইয়া থাকে, তাহার অর্থ এই যে, ঐ সময় সমস্ত প্রাণীর মধ্যে কামনা তীব্র হয়। মানবের মধ্যেও চান্দ্ৰমাসের সময় বিশেষবাসনা তীব্র হয়। বিভিন্ন নারীতে চান্দ্রমাসের বিভিন্ন কামনা জাগ্রত হইতে পারে, কিন্তু মাসে মাসে নিয়মিতভাবে উহা জাগ্রত হইবেই। টোপসের মতে প্রত্যেক দুই সপ্তাহ অন্তত নারীর এই বাসনা জাগ্রত হয়। ফলে ২৮ দিনের প্ৰত্যেক চন্দ্ৰমাসে প্রত্যেক নারী দুইবার ইহার তীব্রতা অনুভব করে। ক্লেশ ও ক্লান্তি, মানসিক বিপ্লব, বর্তমান সভ্যতা প্রসূত নাগরিক জীবনের বৈচিত্র্য নানাপ্রকারে নারীপুরুষের বাসনার স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত ও বর্ধিত করিয়াছে। সুতরাং বর্তমান যুগে নরনারীর কামনার হ্রাসবৃদ্ধির কারণ বা নিয়ম সম্বন্ধে কোনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসার অসুবিধার কথা মেরী স্টোপসও স্বীকার করিয়াছেন।

অবশ্য মেরী স্টোপসের পূর্বেও মার্শাল, সেলহিম, ফন ওন্টু, হ্যাভলক এলিস প্রভৃতি অনেক যৌনতাত্ত্বিক চন্দ্রে্র সাহিত নারীর রতিবাসনার সম্বন্ধ থাকায় সম্ভাব্যতার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।

 

ঋতুস্রাবের সঙ্গে সম্বন্ধ

ঋতুস্রাবের ২-৩ পূর্ব হইতে ঋতুস্রাবের দিন পর্যন্ত এবং ঋতুভস্রাবের পরে ৪-৫ দিন নারীর বাসনা তীব্ৰ হয়। ইহাদের মধ্যে মার্শাল আবার তাহার Physiology of Reproduction পুস্তকে স্পষ্টই বলিয়াছেন—“The period of most acute sexual feeling is generally just after the close of the menstrual period,” অর্থাৎ ঋতুস্রাবের অব্যবহিত পরের কয়েকদিনই নারীর কামনা সর্বাপেক্ষা তীব্র হয়। এলিস ঋতুস্রাবের অব্যবহিত পুর্ব ও অব্যবহিত পরের কয়েক দিনের কথাই বলিয়াছেন। কিন্তু ইহারা সকলেই একটি বিষয়ে একমত যে, নারীর বাসনা ঋতুস্রাবের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। লণ্ডনের রয়াল-সোসাইটি অব মেডিসিন ১৯১৬’র কার্য বিবরণীতেও এই মতবাদকেই গ্ৰহণ করিয়াছেন।

আমাদের মতে, ঋতুস্রাবের পূর্ব, মধ্য ও পরের তীব্রতার কথা ঠিক বলিয়া মনে হয়। এই তথ্য সম্বন্ধে নারীদের নিকট হইতে অভিমত পাওয়া সহজ। কারণ, সাধারণভাবে লক্ষ্য করিলেই তাঁহারা তাঁহাদের অনুভূতি সম্বন্ধে বুঝিতে পারেন।

টারম্যান কামনার বৃদ্ধি সম্পর্কে কয়েকশত নারীকে জিজ্ঞাসা করেন : ‘আপনার সাধারণ যৌনকামনা কি ঋতুর পূর্বে বা উহার সময়ে বৃদ্ধি পায়? কয়েকদিন পূর্বে-অব্যবহিত পূর্বে-উহার মধ্যে-অব্যবহিত পরেকয়েকদিন পরে-দুই ঋতুর মধ্যবর্তীকালে? না, কোনও বৃদ্ধির টের পান না?’

১২২ জন কোন বৃদ্ধিই টের পান না বলেন। ৪৭ জন ঋতুর কয়েকদিন পূর্বে, ৯৫ জন অব্যবহিত পূর্বে, ১৮ জন মধ্যে, ২১৪ জন অব্যবহিত পরে, ৪৮ জন কয়েকদিন পরে এবং ১৬ জন দুই ঋতুর মধ্যবর্তীকালে কামনার বৃদ্ধি টের পান বলিয়া বলেন।

ডাঃ হ্যামিলটন তাঁহার A Research In marriage গ্রন্থে বলেন যে, ১০০জন বিবাহিতাকে জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি নিম্নমত তথ্য সঙ্কলন করিয়াছেন :

২৫ জন শুধু ঋতুর ঠিক পরেই এবং ১৪ জন শুধু ঋতুর ঠিক আগেই কাম-জোয়ার অনুভব করেন। ২১ জনের ঋতুর ঠিক আগে ও ঠিক পরে এবং ১১ জনের ঋতুর ঠিক আগে, ঠিক পরে এবং ঋতুর সময়েও কাম-জোয়ার অনুভূত হয়। কোনও সময়ে বিশেষ জোয়ার বা ভাঁটা লক্ষ্য করেন নাই মোট ২৯ জন।

১২০০ অবিবাহিতা নারীর (ইহাদের অধিকাংশই ৪ বৎসরের অধিক পুরাতন গ্রাজুয়েট) নিকট হইতে ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে প্রাপ্ত, তাঁহাদের যৌন-জীবন সম্বন্ধে নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর হইতে, ক্যাথারিন ডেডিস তাঁহার Factors In The Sex Life of Twenty Two Hundred Women গ্রন্থে নিম্নলিখিত তথ্য সংকলন করিয়াছেন–

১২০০ অবিবাহিতদের মধ্যে যৌন-আবেগ বা বাসনার অনুভূতি স্বীকার করেন ৮০৮ জন অর্থাৎ শতকরা ৬৭ ভাগ। ইহাদের মধ্যে–

(১) বাসনার নিয়মিত জোয়ার-ভাঁটা (periodicity) লক্ষ্য করিয়াছেন ২৭২ জন অর্থাৎ শতকরা ৩৪ ভাগ। (২) বাসনার অনিয়মিত জোয়ার-ভাঁটা লক্ষ্য করিয়াছেন ২৯৮ জন অর্থাৎ শতকরা ৩৭ ভাগ। (৩) বাসনার কোন জোয়ার-ভাঁটা লক্ষ্য করেন নাই ২৩৮ জন অর্থাৎ শতকরা ২৯ ভাগ।

লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, যাহারা বাসনার কোন পৰ্যায় লক্ষ্য করেন নাই, তাঁহাদের অনুপাতে ডাঃ হ্যামিলটন ও ক্তাথারিন ডেভিসের স্বাধীন ও সতন্ত্র গবেষণার ফল অবিকল একই—অর্থাৎ ২৯%।

ডাক্তার কেনেথ ওয়াকার তাঁহার Physiology of Sex গ্রন্থে (pelica Series) বলেন যে, ক্যাথরিন ডেভিসের মতে দুই হাজারের অধিক নারীদের অধিকাংশ ঋতু আরম্ভের দুইদিন পূর্বে ও ঋতুবন্ধ হইবার এক সপ্তাহ পরা পৰ্যন্ত অল্পাধিক কামজোয়ার অনুভব করেন।

জননেন্দ্ৰিয়সমূহে একটা পরিবর্তন আসিবার প্রাক্কালে, সমসময়ে এবং পরে খানিকটা অনুভূতির তীব্রত হওয়াই সম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋতুস্রাবের সময়ে নারীর পুরুষ-সংসর্গ কয়েকদিন বন্ধ থাকে বলিয়া ঋতুস্রাবের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাওয়াও আশ্চৰ্য নয়।

হ্যাভলক এলিস মেরী স্টোপসের অভিমতের সুদীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন। তিনি কয়েকটি নারীর স্বপ্নদোষ ও হস্তমৈথুনের পর্যায়ক্রম ও পৌনঃপুনিকতা লক্ষ্য করিয়া মেরী স্টোপসের অভিমতের দিকে খানিকটা ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। তাঁহার মতে, প্ৰতি ঋতু মাসে নারীর রতিবাসনার একটা জোয়ার আসে এবং এই জোয়ার দুইবার চরমে উঠে।

মেরী স্টোপস নিজে নারী। তিনি নারীদের মনোবৃত্তি লইয়া খুবই অনুশীলন করিয়াছেন। তাই তাঁহার কথা একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। দুই ঋতুর মধ্যবর্তী সময়েই সাধারণতঃ ডিম্বস্ফোটন হইয়া থাকে। এইজন্য তখনও কাহারও কাহারও অল্পাধিক কামাবেগ আসিতে পারে।

Share This