১.০৩ নির্ভুল যৌনজ্ঞানের আবশ্যকতা

নির্ভুল যৌনজ্ঞানের আবশ্যকতা

নির্ভুল যৌনজ্ঞানের আবশ্যকতা

আধুনিক পাকভারতে যৌনতত্ত্বে অবহেলা

ইউরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতার সংস্পর্শে আসিয়া পাক-ভারতও এই গুরুতর বিষয়ে নূতনভাবে চিন্তা করিতেছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের দেশে এমন এক শ্রেণীর লোক আছেন, যাঁহারা যাহা কিছু ইউরোপের তাহা ই নিঃসন্দেহে গ্ৰহণীয় বলিয়া মনে করেন, আবার আর এক শ্রেণীর লোক আছেন, যাঁহারা যাহা-কিছু ইউরোপীয় তাহা ই বৰ্জনীয় মনে করিয়া থাকেন। বলা বাহুল্য, এই দুই দলের কোন দলই যৌনবিজ্ঞানের প্ৰকৃত তত্ত্বোদঘাটনে সমর্থ হইবেন না। কারণ যৌনবিজ্ঞান ফ্যাশানের বস্তু নয়, ইহা মানবজীবনের সর্বাপেক্ষা সত্যকার বিজ্ঞান।

বিজ্ঞানের শাখা বহু। কিন্তু যৌনবিজ্ঞান জীবন-বিজ্ঞান। জীবনের সঙ্গে আর কোনও বিজ্ঞানশাখার বোধ হয় এমন প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নাই। এই প্ৰত্যক্ষতা ও ঘনিষ্ঠতার হিসাবে অত প্ৰযোজনীয় যে চিকিৎসাবিজ্ঞান, যৌনবিজ্ঞানের তুলনায় তাহা ও পরোক্ষ ও কনিষ্ঠ প্ৰতীয়মান হইবে। কারণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি মানুষের অস্বাভাবিক অবস্থা-তাহার রোগ; আর যৌনবিজ্ঞানের ভিত্তি মানুষেরা সর্বাপেক্ষা স্বাভাবিক অবস্থা-তাহার প্ৰায় সমস্ত প্ৰবৃত্তি ও কর্মের উপর আকৈশোর সারা জীবনব্যাপী প্রভাব বিস্তারকারী, গুরুত্বনুসাবে দ্বিতীয় প্রবল, সহজাত সংস্কার।*

তথাপি ভারতের সমস্ত শিক্ষা মন্দিরে যৌনতত্ত্ব অসঙ্গত অনাদর ও অবহেলা পাইয়া আসিয়াছে। কলেজের ছাত্ৰ-ছাত্রীরা অহাবহ মনোবিজ্ঞানের কত জীবনযাত্রায় অনাবশ্যক তত্ত্বকথা মুখস্থ করিতেছে, কিন্তু যৌনবোধের মত অমন কঠোব মানসিক সত্য সম্বন্ধে কোনও কথা তাহাদের মনোবিজ্ঞানের পুস্তকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ইহাদের পাঠ্য মনোবিজ্ঞানের বিরাট বিরাট গ্রন্থের ভূমিকা হইতে আরম্ভ করিয়া শেষপৃষ্ঠা পৰ্যন্ত গভীর মনোযোগের সহিত পাঠ করিলে পাঠকের মনে হইবে, যৌনবোধ মানবমনের কোনও অংশ ত নহেই, উপরন্তু কোনও যুগেই মানুষের মনে যৌনবোধ ছিল না। অথচ সমস্ত গ্ৰন্থলেখক ভাল করিয়াই জানেন যে, যৌনমিনোবৃত্তি মানুষের তীব্রতম মনোবৃত্তি ও যৌনস্বাস্থ্যপালন শরীবচৰ্যার ও সুখময় জীবনযাত্রার অন্যতম প্ৰধান আবশ্যকীয় কাৰ্য। উন্নত ধরনের চিকিৎসাশাস্ত্ৰ অধ্যয়ন করিয়াও যৌনতত্ত্ব সম্বন্ধে সম্যক উপদেশ পাওয়া যায় না। অনেক চিকিৎসককে দেখিয়াছি। যাহাদের যৌনতত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান অতি সামান্য, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে ভ্ৰমাত্মক। সাধারণ লোক তাঁহাদের নিকট হইতে উপদেশ পাইবার আশা করিতে পারে না।

পৃথিবীর ওজন কত লক্ষ টন, পৃথিবী হইতে সুর্যের দূরত্ব কত লক্ষ মাইল, খ্ৰীষ্টপূর্ব কত শতাব্দীতে কোন রাজা কোন জঙ্গলে কত বড় প্রাসাদ নির্মাণে কত টাকা খরচ করিয়াছিলেন প্রভৃতি ব্যবহাবিক জীবনের পক্ষে অপ্রয়োজনীয় শত কথা আমাদের শিক্ষার্থীগণকে মুখস্থ করানো হয়, পরন্তু কৈশোরে যৌবনে ও বিবাহিত জীবনে স্বাভাবিক শান্তিময় যথাযথ যৌনজীবন যাপন করিতে শিক্ষা দিবার, সন্দেহ, সংশয়, ভ্রান্ত ধারণা দূর করিবার, দুখকষ্ট ও ব্যাধিজনক ভ্রম প্ৰমাদপূর্ণ কাৰ্য হইতে নিবারণ করিবার, এবং বেশ্যাগমন ও মদ্যপানে ভীষণ অপকারিতা সম্বন্ধে উহাদিগকে অবহিত করিবার, এবং রতিজ রোগের হাত হইতে জনসাধারণকে এবং অবাঞ্ছিত সন্তান-জন্মের হাত হইতে পিতামাতাকে রক্ষা করিয়া জীবনকে সুষ্ঠ, সুন্দর, নিয়মিত ও সুখময় করিবার কোনও শিক্ষা প্ৰদান, চেষ্টা বা গবেষণা হইতেছে না।

এ উপেক্ষা ও অবহেলা আমাদের সমাজে কি ঘোর কুফল প্ৰসব করিয়াছে, তাহা আমরা বুঝিয়াও বুঝিতেছি না। এই সমস্ত বিষয়ে ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়’ ও চুপ চুপ নীতিই চলিয়া আসিতেছে। প্রকৃতি নিয়মের অধীন। সে কোন নিয়মই লঙ্ঘন করে না। যাহারা নিয়ম লঙ্ঘন করে, প্ৰকৃতি তাহাদের উপর ভীষণ প্ৰতিশোধ লইয়া থাকে। জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির সদ্ব্যবহার না করিলে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্ত করিলে প্রকৃতি নির্মমভাবে আমাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করিবে।

যৌন-ব্যাপার প্রকৃতির একটা বিরাট রহস্য। এ রহস্যোদ্ঘাটনে প্রকৃতির দানস্বরূপ জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আমরা নিয়োজিত না করায় আমাদের ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও গাৰ্হস্থ্য জীবন বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে, আমাদের সমাজদেহের সর্বত্ৰ অগণিত বিষ-ফোড়া দেখা দিয়াছে। কারণ, মানুষের জননেন্দ্ৰিয় তাহার রসনার ন্যায়ই দুইটি বিপরীত গুণের অধিকারী। এই দুইটি প্রত্যঙ্গই চরম শুভের মত চরম অশুভ ও সাধনে সমর্থ। বসনার তৃপ্তিকরি আহার সম্বন্ধে আমরা যে সাবধানতা অবলম্বন করিতেছি, জননেন্দ্ৰিয় পরিচালনা সম্বন্ধে তাহা করিতেছি না। তাহার ফল আমাদিগকে ভোগ করিতে হইতেছে।

—————
*সর্বাপেক্ষা প্রবল সহজাত সংস্কার বা বৃত্তি বাঁচিয়া থাকার বা টিকিয়া থাকার ইচ্ছে। উদরপূর্তির বাসনা বা ক্ষুধা ইহারই একটি দিক। অপর দিক স্বার্থপরতা।

—————

ধর্মে

যেখানে রহস্য সেখানেই দৈব, অলৌকিক বা ঐশীশক্তি আরোপ কিবা মানুষের সাধারণ মনোবৃত্তি। যৌনক্রিয়া সাধারণ ব্যাপার হইলেও মানবসৃষ্টি একটা রহস্যপূর্ণ ঘটনা। সুতরাং যৌন-ব্যাপারে মানুষেরা সাধারণ অজ্ঞতার দরুন কত ভ্রান্ত ধারণা মানুষকে পীড়িত করিয়াছে, তাহার কিঞ্চিৎ উদাহরণ এই অধ্যায়ের শেষার্ধে দিয়াছি। উহার সুযোগ গ্রহণ করিয়া অনেক ভণ্ডতপস্বী সম্প্রদায় ধর্মেব নামে যৌন-স্বৈরাচার সাধন করিয়া চলিয়াছে। বিভিন্ন জাতির ধর্মমন্দিরে ধর্মের নামে যে বেশ্যাবৃত্তি যুগ-যুগান্তব ধরিয়া চলিয়াছে, তাহার দ্বারা বুদ্ধিমান ভণ্ডেরা শুধু যে নিজেদেরই লালসার তৃপ্তি-সাধন করিয়াছে তাহা নহে, সাধারণ মানুষের ধর্মসম্বন্ধে ধারণাকেও নিতান্ত নিম্নস্তরে নামাইয়া দিয়াছে। স্ত্রীকে মৃত স্বামীর সহিত দগ্ধ করা বা জীবন্ত সমাহিত করা, শিশুকন্যাকে হত্যা করা, জামাতার কাছে প্ৰথমবোব কন্যা পাঠাইবার পুর্বে তাহাকে গুরু বা রাজার নিকট পাঠাইয়া প্ৰসাদ করাইয়া লওয়া, ঈশ্বরকে দেহদানের নামে ধর্মযাজক বা মঠাধিকারী শয্যাসঙ্গিনী হওয়া, সন্তান লাভের আশায় মন্দির বিশেষে পরপুরুষের অঙ্কশায়িনী হওয়া, অতিথির সেবার জন্য নিজ স্ত্রী বা কন্যাকে উহার শয্যায় পাঠানো, স্বামীর পদতলে স্বর্গের অবস্থিতিহেতু পুরুষের সহস্ৰ অত্যাচার নীরবে সহ্য করা ইত্যাদি সহস্ৰ যৌন-অনাচার ধর্মের নামে চলিয়াছে।* ইহাতে কেবল ষে নারীজাতির উপরই পুরুষের অবিচার সাধিত হইয়াছে তাহা নহে, ইহাতে মানুষের অনেকখানি আধ্যাত্মিক অবনতিও ঘটিয়াছে। যে সত্য জানিবার ও বুঝিবার অধিকার সকল মানুষেরই আছে, সেই সত্যকে প্রহেলিকার আবরণে গোপন রাখার অবশ্যম্ভাবী ফল এই হইয়াছে যে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানেরা জনসাধারণকে যেভাবে ইচ্ছা সেইভাবে প্রবঞ্চিত করিয়াছে। ইহারা জনসাধারণের স্বাভাবিক ধর্মপ্ৰাণতার সুবিধা লইয়া স্বার্থসিদ্ধি করিয়াছে এবং জগতের বহু অকল্যাণ সাধন করিয়াছে।

—————-
* কাঁচুলিয়া, সহজিয়া, বিন্দুসাধক, বামমার্গী, কর্তাভজা, তান্ত্রিক প্রভৃতি সম্প্রদায় আমাদের দেশে এখনও দেখা যায়। ইহারা অন্ধবিশ্বাসী ও কুসংস্কারপন্ন এবং নানা কদাচারে লিপ্ত।
—————-

নীতিতে

ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ যে নীতিজ্ঞান, যৌন-অজ্ঞতা সেই নীতিজ্ঞানকেও পরিস্ফুট হইতে দেয় নাই। মানুষের তীব্রতম অনুভূতিকে একটা কৃত্রিম আবরণের চালে পিষ্ট করিয়া রাখায় মানুষ সমাজের বহিরাবরণের সহিত সামঞ্জস্য রাখিবার জন্য ভণ্ডামি আয়ত্ত করিয়াছে। সভা-সমিতিতে দাঁড়াইয়া মানুষ অনর্গল বক্ততা করিয়া যে কাজটির তীব্র নিন্দা করিতে পারে, মুহুৰ্ত পরে লোকচক্ষুর অন্তরালে সেই কাজটিই সাধন করিতে তাহার বিবেকে বিন্দুমাত্রও বাধে না। সাহিত্য ও সমাজ-জীবনের সর্বত্র একটা কৃত্রিমতা ও ভণ্ডামির আবহাওয়া বিরাজমান। সমাজ ও রাষ্ট্র-জীওনের মূলভিত্তি যে সত্যবাদিতা, সরলতা, সততা, সৎসাহস ও স্পষ্টবাদিতা, মানবচরিত্রের সেই মহৎ গুণসমূহ আজ বিরল হইয়া পড়িয়াছে। বলা বাহুল্য, যৌনজীবনের কৃত্রিমতা ও ভণ্ডামিই মানবোব কর্মজীবনের। সকল স্তরে সংক্রামিত হইয়াছে। আমাদের সমাজ-জীবনে ভণ্ডামি ও মিথ্যাবাদিতার এত প্ৰাদুৰ্ভাব হইয়াছে যে, যে বলে সে জীবনে মিথ্যাকথা বলে নাই সে যেমন ভণ্ড, সেইরূপ যে বলে সে জীবনে ভণ্ডামি করে নাই সে তেমনই মিথ্যাবাদী।

সমাজে ও রাষ্ট্রে

সমাজ-জীবনে এই অজ্ঞতার কুফল আরও শোচনীয় আকারে দেখা দিয়াছে। দাম্পত্য অশান্তি হইতে আরম্ভ করিয়া বিবাহ-বিচ্ছেদ, ব্যভিচার, বলাৎকার, গর্ভপাত, ভ্রূণহত্যা, আত্মহত্যা, গণিকাবৃত্তি, মদ্যপান, রতিজ রোগ প্ৰভৃতি সমাজ-অঙ্গের সহস্র প্রকারের কুফলের এবং দুঃসাধ্য ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধির প্রধান এবং অনেক স্থানে একমাত্র, নিদান প্রকৃত যৌনবিজ্ঞানের অভাব।

রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে এই অজ্ঞতার কুফল বোধহয় সর্বাপেক্ষা শোচনীয়ভাবে মারাত্মক হইয়াছে। যৌন-অজ্ঞতার ফলে দ্রুতস্খলন, ধ্বজভঙ্গ, রতিজ রোগসমূহ, নানাবিধ স্ত্রী রোগ, গর্ভিণী ও প্রস্থতির বিবিধ রোগ ও মৃত্যু, সুরতে নারীর অতৃপ্তি, মাতার গনোরিয়াব পুজি প্রসবের সময় শিশুর চক্ষুতে লাগিয়া আঁতুড়েই তাহার অন্ধত্ব প্রভৃতি ভয়ার্ত ব্যাধিতে সমাজদেহ জর্জরিত হইয়া গিয়াছে। মানবজাতির একটা বিপুল অংশ আজি ঐ সমস্ত বহু কুফলপ্ৰসু ও সংক্ৰামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হইয়া নিজেরা ত পঙ্গু হইয়া আছেই, উপরন্তু অহরহ ঐ সমস্ত ব্যাধি বিস্তাব করিয়া বেড়াইতেছে। এই সমস্ত যৌনব্যাধি মানুষেরা শারীরিক ও মানসিক শক্তি ও আয়ুর উপর ভীষণভাবে ক্রিয়া করিতেছে। তরুণদের মধ্যে যৌনস্বাস্থ্য-সম্পন্ন সবল সুপুরুষ পাওযা দুঃসাধ্য। তরুণীদের মধ্যেও তথৈবচ। এক কথায় মানবসমাজের এই ভাবী মাতাপিতার অনেকেই স্বাভাবিক স্বাস্থ্য হইতে বঞ্চিত। এই সমস্ত স্বাস্থ্যহীন ও ব্যাবিগ্ৰস্ত ছেলেমেয়ে ভবিষ্যতে যে সমস্ত সন্তানের জন্মদান করিবে, তাহারা স্বভারতই দুর্বল, অল্পায়ু ও ব্যাধিগ্রস্ত হইবে। আমাদের দেশের শিশুমৃত্যুর ভযাবহ হারেব কারণও প্রধানত ইহাই। সুতরাং বিবিধ যৌনব্যাধির ফলে মানবসমাজের যে বিরাট অংশ আজ নানাবিধ শক্তিনাশক ব্যাধিতে আক্ৰান্ত হইয়া জগৎকে নিরানন্দ ও বাষ্ট্রকে বিপন্ন করিতেছে, তাহাদের জীবন মানবকল্যাণকামী সমাজবিজ্ঞানীগণের সম্মুখে জটিল সমস্যা উপস্থিত করিয়াছে। যৌনস্বাস্থ্যকর্ষণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও আইনবলে অস্ত্ৰোপচার দ্বারা বংশানুক্রমিক ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের জনননিরোধের কার্যক্রম লইয়া তাহারা গবেষণা করিতেছেন। এই সমস্ত গবেষণার ফল সারা পৃথিরীতে কাৰ্যকরী না হওয়া পৰ্যন্ত মানবজাতির কল্যাণ হইবে না।

যৌনশিক্ষায় বিপদ

আমরা যৌন-অজ্ঞতার কুফলের কথা খুব জোর গলায় বলিলাম বটে, কিন্তু দুৰ্ভাগ্যবশতঃ যৌনশিক্ষা-বিস্তারের কথা ততটা জোর গলায় বলিতে পারিতেছি না। কারণ, যৌনতত্ত্বকে বিজ্ঞানরূপে আলোচনা করিবার পক্ষে কতকগুলি বাধা আছে, অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয়ের মত ইহার শিক্ষাদান কাৰ্যে তদপেক্ষাও অসুবিধা ও বিপদ আছে।

যৌনবৃত্তি মানবের দ্বিতীয় তীব্রতম বৃত্তি এ কথা এই অধ্যায়ের প্রারম্ভে বলিয়াছি। কিন্তু ঐ সঙ্গে এ কথাও বলা দরকার যে, এই বৃত্তি ক্ষুধা তৃষ্ণার মত স্বাভাবিক ও সার্বজনীন বৃত্তিও বটে। শিশুসমাজকে বাদ দিলে এ কথাও নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে যে, সমস্ত মানুষেরই চেতন, অবচেতন, বা অচেতন মনে কোনও-না-কোন প্রকারের কামেচ্ছা বা, কাম-বাসনা এবং যৌন-অভিজ্ঞতা আছে। সুতরাং এই তত্বের আলোচনা হইতে এই বাসনাকে পৃথক করা একরূপ অসম্ভব।

মানুষের এই সাধারণ দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করিয়া সমস্ত সভ্যজাতির সাহিত্যে যৌনশাস্ত্রের নামে এবং বেনামীতে বিষাক্ত রাবিশের তুপ সৃষ্টি হইয়াছে। আবার যৌনবিষয়ক পুস্তকাদির উপর রাষ্ট্রসমূহের শ্যেনদৃষ্টি দর্শন করিয়া অনেক সরলপ্ৰাণ, ভদ্র, উত্তেজনাহীন, শান্ত, সংযত, বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচনাকারী, অনুসন্ধিৎসু, জ্ঞানপিপাসু যৌনতাত্বিক দুঃখেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন। ফরাসী যৌনতাত্ত্বিক ডাঃ মাইকেল দ্য মন্তেন বিরক্ত হইয়া বলিয়াছিলেন- “ইহা কিরূপে সম্ভব হইতেছে যে যৌনক্রিয়ার মত, স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত কাৰ্য সম্বন্ধে কথা বলিতে আমরা লজাবোধ করি এবং ঐ সম্বন্ধে আমরা গম্ভীরভাবে ও যুক্তিসঙ্গতরূপে আলোচনা করিতে পারি না। আমরা নরহত্যা, চৌর্যবৃত্তি ও বিশ্বাসঘাতকতা সম্বন্ধে প্ৰকাশ্যভাবে আলোচনা করিতে পারি, কিন্তু যৌন-ব্যাপারের ন্যান্য স্বাভাবিক কাৰ্য সম্বন্ধে স্বচ্ছন্দে কথা বলিতে পারি না।”

শাসনের প্রয়োজনীয়তা

কিন্তু এই না পারাব কি ন্যায়সঙ্গত কারণ নাই? আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারে যৌনতত্ত্বের নামে যে সমস্ত পুস্তক স্তুপীকৃত হইয়াছে, তাহাদের শতকরা আশিটাই কি কামোদ্দীপক ও উপভোগের বিবিধ উপায় বর্ণনাকারী রতিতত্ত্ব নহে? জনহিত ও সমাজকল্যাণের সদুদ্দেশ্য হইতেই কি ঐ সমস্ত পুস্তক রচিত হইয়াছে? তাহা নহে। মানুষের স্বাভাবিক লালসায় ইন্ধন যোগাইয়া অর্থলাভের অসদুদ্দেশ্যেই এই সমস্ত পুস্তক রচিত হইয়াছে। এই সমস্ত কামশাস্ত্ৰ তথা রতি শাস্ত্রের কুপ্ৰভাব হইতে অজ্ঞ জনসাধারণকে রক্ষা করা প্ৰত্যেক সমাজ-কল্যাণকামীর, তথা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

শাসনের জটিলতা

কিন্তু বাষ্ট্র অর্থাৎ পুলিস ও আদালতের হাকিম, স্বভারতই কলা ও বিজ্ঞান এবং উত্তেজক অশ্লীলতার ও বীভৎসতার পার্থক্যের সূক্ষ্ম ও নির্ভুল বিচারক নহেন। সার চার্লস হল, হ্যাভলকি এলিসের বহুদিনের সাধনার ফল, তাঁহার পুস্তকখণ্ডের বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করিয়া উহার বিক্রেতাকে আনিনত দণ্ডনীয় সাব্যস্ত করেন। হ্যাভলকি এলিস সেই উপলক্ষে আক্ষেপ করিয়া বলেন,–মানুষের খাঁটি অভিপ্ৰায় বুঝিবার ও বৈজ্ঞানিক প্ৰণালীব সমাদর করিবার মত অক্ষম লোকের হাতেই মানবমনের সাধারণ হইতে সৰ্বোচ্চ সৃষ্টির (অর্থাৎ প্রকৃত বৈজ্ঞানিকভাবে লিখিত পুস্তকের।) বিচারের ভার আমরা দিয়া থাকি। শুধু তাহা ই নহে, ইহাদের আমরা শাস্তি দিবারও ক্ষমতা দিই। এইরূপ স্বষ্টির সহিত নিতান্ত পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্ট সাদভিপ্ৰাযপ্রণোদিত নিরপরাধকে (অর্থাৎ মুদ্রাকর ও প্ৰকাশককেও) ভারী জরিমানা ও দীর্ঘ কারাবাসের আদেশ দিবার অনুমতি দিই।

এমনভাবেই আইন-সম্মার্জনীব মুখে অশ্লীলতার আগাছার সঙ্গে বহু বিজ্ঞানসম্মত সদিচ্ছা প্রণোদিত ও সংযত আলোচনা এবং শিল্প-নিদর্শনও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হইতেছে, ইহা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বাঞ্ছনীয় নহে। শিল্পকে যেমন বীভৎসতা হইতে পৃথক করিয়া দেখিতে হইবে, তেমনই যৌনবিজ্ঞানকেও উত্তেজক রতিশাস্ত্ৰ হইতে পৃথক করিয়া বিচার করিতে হইবে। বিষয়টি খুব জটিল, সন্দেহ নাই, কিন্তু মানবকল্যাণেব জন্য রাষ্ট্রকে তাহার দাযিত্ব পালন ও কর্তব্য সম্পাদন করিতেই হইবে। সুতরাং যৌন-বিজ্ঞান আলোচনা বহুক্ষেত্রে কামোদ্দীপক হইবার সম্ভাবনা থাকিলেও বৃহত্তর অমঙ্গলের প্রতিরোধের জন্য এ বিষয়ে অনেকটা স্বাধীনভাবে আলোচনা করিতে হইবে।

গোপনতা স্পষ্টতা

ইহার প্রথম কারণ, বহু যৌন-বিজ্ঞানীর দৃঢ় মত এই যে, গোপনতা অপেক্ষা স্পষ্টতা আমাদের ঢের বেশী কল্যাণ সাধন করিবে। সাধারণ বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের কাছেও কথাটি যুক্তিসঙ্গত বলিয়াই বোধ হইবে। আমাদের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, যৌন-ব্যাপারে কানাকানি করিয়াই আমরা মানুষের এত সব অকল্যাণ করিয়াছি। আমরা যদি এ সব ব্যাপারে অস্পষ্ট, অর্ধ-স্পষ্ট, দ্বার্থক, ছদ্মার্থক শব্দ ব্যবহার না করি যা আন্তরিকতা, সরলতা ও স্পষ্টবাদিত সহকারে জোরের সঙ্গে স্পষ্ট অর্থযুক্ত শব্দ ব্যবহার করিতাম এবং সাংসারিক অন্যান্য বিষয়ের আলোচনার মতই ইহাকে সাধারণভাবে গ্রহণ করিতে পারিতাম, তবে এ ব্যাপারে কৃত্রিম লজা ও সাধিত ভণ্ডামি আমাদের কথা ও কাৰ্যকে অমন অর্থহীন ও সন্দেহাত্মক করিয়া তুলিতে পারিত না। “ভালর কাছে সব ভাল” বলিয়া আমাদের দেশে যে প্রাচীন কথাটি প্রচলিত আছে, তাহা ফাঁকা কথা নহে।

অন্যান্য সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ন্যায় যৌন-ব্যাপারের আলোচনাও অনেকটা স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দভাবে করিতে হইবে। দৃঢ় সবল-চিত্তে নিষ্কলঙ্ক পবিত্রতা না থাকিলে কেহ প্ৰকাশ্যভাবে এ সব ব্যাপারে স্বচ্ছন্দে কথা বলিতে পরিবে না, আশা করি সকলেই ইহা স্বীকার করিবেন। বলিবার ভঙ্গীতেই যত পার্থক্য।  আমার এই পুস্তক যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন অনেক সম্ভ্রান্ত পণ্ডিত ও সংবাদপত্রই মন্তব্য করিয়াছিলেন যে ইহার ভাষা ও বলিবার ভঙ্গী এত সুমার্জিত যে এই পুস্তকখানি পিতামাতা বয়স্থ কন্যাকেও নিঃসঙ্কোচে উপহার দিতে পারেন, যদিও যৌনজীবনের এমন কোনই নিগূঢ় তত্ত্ব নাই, যাহার বিজ্ঞানসন্মত ব্যাখ্যা ইহাতে করা হয় নাই। একজনের মুখে যাহা পরম শ্ৰীল ও কলাপূর্ণ, অপরের মুখে তাহাই অশ্লীল ও বীভৎস। আবার যাহার মনে পবিত্ৰতা নাই, সে নিলিপ্তভাবে এ বিষয়ে কোন কথা বলিতে পরিবে না। আন্তরিকতাপূর্ণ সরল চিত্তের সুস্পষ্ট প্রকাশ যৌনতত্ত্বের যত বড় নিগূঢ় কথা বহন করুক না কেন, শ্রোতার মনে উগ্র বাসনার উদ্রেক করিবে না। বক্তার আন্তরিকতা শ্রোতার প্রাণের বীভৎস রসের সম্ভাবনাকে নিশ্চিতভাবে নিরস্ত করিয়া দিবে।

গোপনতার কুফল

পক্ষান্তরে আমাদের কানাকানি, আমাদের গোপনতা, আমাদের অস্পষ্ট ভাষা, সর্বোপরি আমাদের আন্তরিকতাবিহীন কৃত্রিম ও দুর্বল শাসন তরুণ ও জিজ্ঞাসু প্ৰাণে একটা সন্দেহের ছায়াপাত করিতেছে এবং তরুণ প্ৰাণের স্বাভা“বিক কল্পনাপ্রিয়তা সেই সন্দেহের কঙ্কালকে অভিনব কাল্পনিক রূপের রক্তমাংসে সজীব করিয়া তুলিতেছে। সকলেই একদিন তরুণ ছিলেন; তরুণ্যের স্মৃতির দ্বার উদ্ঘাটন করিয়া সকলেই একবার নিজের নিজের তদানীন্তন মনোভাবটির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখুন, দেখিবেন তরুণ মনের সে কাল্পনিক স্মৃতি লোভনীয়তায় ও আকর্ষণীয়তায় বাস্তবকে অনেক ছাড়াইয়া উঠিয়াছিল। সকলেই জানেন, পাপের বাস্তব রূপ অপেক্ষা তাহার কাল্পনিক রূপ অনেক বেশী লোভনীয় এবং ইহাও সকলে জানেন যে, “বনের বাঘ অপেক্ষা মনের বাঘ” অনেক বেশী মারাত্মক।

যৌনঅজ্ঞতার স্বরূপ

তরুণ-তরুণীর জিজ্ঞাসু প্ৰাণে আমাদের কানাকানি, গোপনতা, অস্পষ্ট ভাষার কি প্ৰতিক্রিয়া হয় তাহা আমাদের নিজেব নিজের তদানীন্তন মনোভাবের কথা স্মরণ করিলেই অনেকটা বুঝিতে পারি। হ্যাভলকি এলিস নিজেব অবস্থাব কথা স্মরণ করিয়া বলেন, তরুণ অবস্থায় রহস্যপূর্ণ যৌন-জীবনের কোনও তত্ত্বের বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি কোন সদুত্তর তা পাইতেনই না, ববং অসভ্য ও অমার্জিত ব্যবহারের জন্য সকলের নির্যাতন ভোগ করিতেন। ইহা হইতেই অহেতুক গোডামিব প্রতি প্ৰবল বিরুদ্ধ-ভাব তাহার যুবক-মনে বদ্ধমূল হয় এবং ভবিষ্যৎ তরুণ-তরুণীর সকল জিজ্ঞাসার সদুত্তর যাহাতে পাওয়া সম্ভবপর হয়, তিনি সেইরূপ তথ্য সংগ্ৰহ করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া যাইরাবি, দৃঢ় প্ৰতিজ্ঞা করেন। বলা বাহুল্য, ঘোর প্ৰতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি তাঁহার মনস্কাম সিদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।

বালক-বালিকা অপেক্ষাকৃত শিশুকাল হইতেই প্ৰকৃতিব রহস্যোদঘাটনে প্ৰবৃত্ত হয়। “কি কারণে কোনটা সংঘটিত হয়, কেন অন্য রকমে অমন হয় না।” ইত্যাদি প্রশ্নে তাঁহারা বয়োজ্যেষ্ঠদিগকে অতিষ্ঠ করিয়া তোলে। যৌনজীবনের প্ৰাথমিক তথ্যগুলির বিষয়েও তাহারা সবল ও আন্তরিকভাবে প্রশ্ন করে এবং সদুত্তরের প্রত্যাশা করে।

কিভাবে হইল এবং কোথা হইতে আসিল–এই প্রশ্ন সকল দেশে সকল সময়ের ছেলেমেয়েরাই করিয়া থাকে। আর প্ৰায় সকল ক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া হয়, অথবা ধমক দিয়া বা কল্পিত কোন কারণপরম্পরার কথা আওড়াইয় তাহাদিগকে সাময়িকভাবে নিবৃত্ত করা হয়।

স্ট্যানলী হল তাঁহার Adolescence পুস্তকে এ সম্বন্ধে কতকগুলি মিথ্যা উক্তির দৃষ্টান্ত দিয়াছেন : ভগবান স্বৰ্গে ছেলেমেয়েদের গড়িয়া মর্ত্যে ফেলিয়া বা নামাইয়া দেন ও পিতামাতা তাহাদিগকে কুড়াইয়া আনেন, তাহাদিগকে কখনও কলের পাইপে অথবা বাঁধাকপির ভিতবে পাওয়া যায়, ভগবান তাহাদিগকে জলের মধ্যে রাখিয়া দেন এবং ডাক্তার তাহাদিগকে উঠাইয়া আনিয়া প্ৰত্যুষে রাখিয়া যান; মাটির মধ্য হইতে খুঁড়িয়া তাহাদিগকে বাহির করিয়া আনা হয়, শিশু-বিক্রেতাদের দোকান হইতে কিনিয়া আনা হয়–ইত্যাদি নানারকম অদ্ভুত উত্তরের প্রচলন আছে। জার্মানীতে সারস পক্ষী শিশুকে দিয়া যায় ইত্যাদিও বলা হয়; কোথাও আবার মাতার স্তন দিয়া শিশু বাহির হইয়া আসে, অথবা গৃহের ধূম নিৰ্গত হইবার চিমনির মধ্য দিয়া, আকাশ হইতে ভগবান ফেলিয়া দেন এইরূপও বলা হয়।

মাতার শরীরের প্রকাশ্য অনেক জায়গাই শিশুর উৎস বলা হইয়া থাকে। তাঁহার নাভি দিয়াই শিশু বাহির হয়, এরূপ ধারণা অনেক সময়ে ছেলেমেয়েদের কিশোর কাল বা তৎপরবর্তী কাল পর্যন্ত থাকিয়া যায়। আমাদের দেশে অনেকে মাতার গুহ্যদ্বারের কথা ভাবিয়া থাকে, কারণ বালক-বালিকার মলনিৰ্গম প্রক্রিয়ার প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা থাকে। অনেক মাতা শিশুকে তাহাদের পেট কাটিয়া বাহির করা হইয়াছিল বলিয়া থাকেন এবং পেটে দাগ থাকিলে উহা সেলাইয়ের দাগ বলেন। জনৈক ডাক্তার বন্ধু লিখিয়াছেন-“এ স্থলে একটা উদাহরণ দিতে পারি। জনৈকা ভদ্রমহিলার বিবাহের কিছুদিন পর পৰ্যন্তও। (২২ বৎসর বয়সে তাহার বিবাহ হয়) ধারণা ছিল যে, প্ৰসব বেদনা উঠিলেই পেট কাটিয়া ছেলে বাহির করা হয়। পেট কাটিবার ভয়ে তাহার গৰ্ভধারণে অনিচ্ছা ছিল বলিয়া যৌনসংযোগ ত দূরের কথা, স্বামীর চুম্বনআলিঙ্গনও তিনি পবিহার করিয়া চলিতেন। তাঁহার ধারণা ছিল, পুরুষ মানুষ আদর (চুম্বন, আলিঙ্গন) করিলেই মেয়েদের মাসিক বন্ধ হইয়া ছেলেমেয়ে পেটে আসে। সেই জন্য বিবাহের পূর্বে কোনও মাস মাসিকের দুই একদিন দেরি হইলেই তাহার ভাবনার অবধি থাকিত না।

“২২ বৎসব বয়স হওয়া সত্ত্বে ও স্বামীস্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না। সৌভাগ্যের বিষয় স্বামী যৌনশাস্ত্ৰ অভিজ্ঞ সদ্বিবেচক ও অসীম ধৈৰ্যশালী ছিলেন বলিয়া তাহাদের মধ্যে কোনও অশান্তির উদয় হয় নাই। স্ত্রীকে ধৈৰ্য সহকারে শিক্ষা দিয়া বুঝাইয়া তৈয়ার করিয়া লইয়া বিবাহের প্ৰায় দুই মাস পরে উহাদের পূর্ণ সহবাস হয়। এখন স্ত্রী বুঝিতে পারিয়াছেন যে, তাহার দিকে চাহিয়া তাহার স্বামী কতটা ধৈৰ্য ধারণ করিয়াছিলেন। স্বামীকে তিনি দেবতার মত ভক্তি করেন এবং স্বামীর কোনও আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ রাখেন না। তাঁহাদের ন্যায় সুখী দম্পতি দেখা যায় না। স্বামীর যৌনজ্ঞান ও ধৈর্য না থাকিলে তাঁহাদের জীবনে যে কি অশান্তি হইত তাহা বলা যায় না।”

ফ্ৰয়েড সূক্ষ্ম অনুসন্ধান করিয়া বলিয়াছেন যে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রধানত তিন প্রকারের ধারণা দেখা যায়। প্রথমত, বালক ও বালিকার মধ্যে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিক দিয়া কোন ব্যবধানই নাই। বালিকার পুরুষাঙ্গের অভাব লক্ষ্য করিলে ও বালক মনে করে, হয়ত ভবিষ্যতে উহার আবির্ভাব হইবে; বালিকাও অনেক ক্ষেত্রে এইরূপ আশা করিয়া থাকে। দ্বিতীয়ত, তাঁহারা মাতা হইতে উদ্ভূত এ কথা জানিতে পারিলেও তাঁহারা মলমূত্ৰত্যাগের পদ্ধতির কথা স্মরণ করিয়া উহার সহিত সন্তান-জন্মপদ্ধতির সামঞ্জস্য ধরিয়া লয়। তৃতীয়ত, শিশু মনে করে যে, তাহার পিতাও তাহার জন্য কষ্ট স্বীকার করিয়াছেন এবং পিতা ও মাতা খানিকটা হেঁচড়াহেঁচড়ি করিয়াই তাহাকে লাভ করিয়াছেন। বিবাহ অর্থে সে বোঝে তাহার পিতা ও মাতার এইরূপে আপোসে কাজ করিবার অধিকার পাওয়া।

আবার অনেক সময় ছেলেমেয়েরা গুরুজনের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনাও করিয়া থাকে। একটি তিন বৎসরের ছেলে একদিন তাহার মাতাকে বলিয়া বসে-এখন আমি জানি ছেলেমেয়েরা মায়ের পেটের মধ্যে জন্মায়। তুমি মনে করেছ। আমি পুকুরেব তলায় হয়েছি, একথা বিশ্বাস করি? তা নয়; তা হলে তা আমার সাদি হয়ে যেত। সাবস পার্থী। আবার কেমন ক’রে আমায় আনল? তুমি বলেছ ও আমায় চিমনি দিযে ফেলে দিয়েছে! তা হ’লে ত আমার সারা গা ময়লা হয়ে যেত আর পড়ে গিয়ে আমি ভা-রী আঘাত পেতুম!

অন্য একটি মেয়ে তাহার মাতার এক বান্ধবীর সন্তান হইবার প্রাক্কালে তাহার অবস্থা ও সকলের চাঞ্চল্য লক্ষ্য করিয়া মাতাকে জিজ্ঞাসা করে–সত্যি বল মা সারস পাখীর কথা ঠিক, না পেট? মাতা স্বীকার করিতে বাধ্য হইলেন যে, মাতার পেটেই সন্তান জন্মায়। মেয়েটি তৎক্ষণাৎ স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়িয়া মন্তব্য করিল,–এখন ঠিক বুঝলুম, কিত্নু এটা ত বুঝলুম না তুমি আগে গিলেছিলে কি করে?

দুই এক ক্ষেত্রে শিশুরা আসল কথা জানিয়া লইবার চেষ্টা করিলেও মোটের উপরে সর্বত্রই সদুত্তরের অভাবে তাঁহারা ভুল ধারণাই পায় ও  পোষণ করে। অবশেষে তাহাদের অবস্থা শোচনীয় হইয়া দাঁড়ায়।

নিতাইচন্দ্ৰ বসু লেখেন :

…“প্ৰায় ১২১৩ বৎসর অবধি ধারণা ছিল যে, বিবাহের আগে সঙ্গল করিলে ছেলে হয় আর বিবাহ হইলে সঙ্গম করিতে হয় না।–উহা বিবাহের সময়ে যে মন্ত্র পাঠ হয় তাহারই ফলাফল। তারপর ১৫/১৬ বৎসবে ধারণা হয় যে, না, প্ৰথমে একবার সঙ্গম করিতে হয় এবং মেয়েদের পেটে একটা থলি আছে তাহা হইতে ক্ৰমান্বয়ে সস্তান হইতে থাকে। যেমন গাছ রোপণ করিয়া প্ৰথমে একটু জল দিতে হয়, পরে সে মাটি হইতে আপনাআপনি রস শোষণ করিয়া বাডিতে থাকে। আবও একটা কারণ যে, কাহারও কাহারও অনেক বুদ্ধ বয়সে সন্তান হয়-তখন কি আর কেউ সঙ্গম করে? কারণ তখন চারিদিকে বড় বড় ছেলেরা ও মেয়েরা ঘোরাফেরা করিতে থাকে। আমার এই বদ্ধমূল ধারণা আমার এক বন্ধু ভাঙিযা দেয়।–”

আশ্চর্যেব কথা নয়। বেচারা বুদ্ধি খাটাইয়া আর কি করিবে?

গর্ভপ্রকারণ সম্বন্ধে জ্ঞানের অভাব এবং কুসংস্কারেব প্রভাব আমি আমার ‘মাতৃমঙ্গল, জন্ম-বিজ্ঞান ও সুসন্তানলাভ” নামক পুস্তকে উল্লেখ করিয়াছি। ঐ আলোচনা হইতে বুঝিতে পাবা। যাইবে যে, যে মাতা সন্তানের উৎস, যাহার শাৰীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের এবং ব্যবহারিক পবিচৰ্যার সহিত সন্তানেব স্বাস্থ্য ও পরিণতি এত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট, তাহার নিজের সম্বন্ধেই তিনি কত অজ্ঞ, কত কুসংস্কারাচ্ছন্ন। বিবাহোত্তর কর্তব্য সম্বন্ধেও ভবিষ্যৎ মাতার অজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই শোচনীয়।

বহু পাঠক-পাঠিকার গোপনীয় পত্ৰালাপ হইতে আমি বলিতে বাধ্য যে, অনেকেরই বিবাহের মুখ্য উদ্দেশু শারীরিক সম্বন্ধের বিষয়ে ধারণা অদ্ভুত রকমের ছিল। আমার এক বন্ধুর স্ত্রী সম্পূর্ণ সাবালিকা থাকা সত্ত্বেও বিবাহের পরে অন্তত ছয় মাসের মধ্যে মিলনের প্রস্তাবটি পৰ্যন্ত শুনিতে পারেন নাই। তাঁহার মতে নাকি বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল পাশাপাশি শুইবার ব্যবস্থামাত্র।*

 

 

হ্যাভলিক এলিস বলেন যে, স্ত্রীলোকদের মধ্যে যৌনজ্ঞানের অভাব এত বেশী যে, কেহ কেহ স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক মিলনের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজই থাকেন। কাহারও ধারণায় মিলনের পদ্ধতি পাশাপাশি শুইবার ব্যবস্থা মাত্র, কাহারও বিশ্বাস থাকে যে, যৌনমিলন তাঁহাদের নাভি দিয়া হয়, কাহারও বিশ্বাস ঐ কার্য সারা রাত্রিব্যাপী চলে।

এলিস তাহার সুবৃহৎ পুস্তকে বহু নবনারীর যে স্বীকারোক্তি প্ৰকাশ করিয়াছেন, তাহা হইতে এই রকম বহু অদ্ভুত ধারণার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

মেরী স্টোপাস একটি শিক্ষিতা যুবতীর কথা উল্লেখ করিয়া বলেন যে, প্রিয়জনের চুম্বনের পরেই তিনি ধরিয়া লইয়াছিলেন, তাহার গর্ভসঞ্চার হইয়া পড়িয়াছে। আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া তিনি রাত্রিদিন অত্যন্ত উদ্বেগ ও অস্বস্তিতে পড়িয়া ছিলেন।

এলিস মন্তব্য করিয়াছেন–সভ্যসমাজে এখনও প্রায়ই বালিকারা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়-বিবাহজীবনের প্ৰাথমিক কর্তব্যগুলি সম্বন্ধে কিছুমাত্র না জানিয়া, অথবা ভুল ধারণা লইয়া। এডওয়ার্ড কার্পেণ্টারও এইরূপ অভিমত করেন।

—————-

*একজন প্রবীণ ডাক্তারের স্বীকারোক্তি হইতে জানিতে পারি, তিনি এম, বি, পাস করিয়া বিবাহ করেন কিন্তু বৎসর খানেকের মধ্যেও স্ত্রী সঙ্গে যৌনমিলন হয় নাই। তাঁহার ভাবী সন্দেহ করিয়া তাঁহাকে নাকি তিরস্কারসহ উপদেশ দেন।
——————

শাসনের ব্যর্থতা

দ্বিতীয় কারণ, আইন ও সামাজিক দমননীতি দ্বারা অশ্লীল শিল্প ও  সাহিত্যকে নিমুলি করা অসম্ভব। দমননীতির উদ্দেশ্য ত তাহা তে সফল হইবেনই না, বরঞ্চ আইন ও সমাজকে ফাঁকি দিয়া উহা অধিকরত বীভৎস হইয়া  আত্মপ্ৰকাশ করিবে। ‘নিষিদ্ধ ফল’-এর প্রতি মানুষের স্বাভাবিক লোভ উহার মূল্য এবং বিক্রয় অসম্ভব ও আশাতীত রূপে বাড়াইয়া দিবে মাত্র। অশ্লীলতা দূরীকরণের জন্য অত্যুৎসাহী প্ৰবক্তাগণের অসহিষ্ণুতা আমাদের উদ্দেশ্যের সাফল্যের পক্ষে মোটেই অনুকূল নহে। শ্লীলতাবাদীগণ বোধ হয় মনে করেন যে, অশ্লীল আর্ট ও সাহিত্য শয়তানের সৃষ্টি, ঐ সমস্ত আর্ট ও সাহিত্যকে অগ্নিমুখে নিক্ষেপ করিলেই স্বয়ং শয়তানকে ভস্মীভূত করা হইল। কিন্তু মানুষের যৌনক্ষুধার জন্য অশ্লীল সাহিত্যকে দায়ী করা, দুনিয়ার রোগবৃদ্ধিব জন্য চিকিৎসা বিষয়ক পুস্তকাবলী ও ডাক্তারের আধিক্যকে, অপরাধ-বৃদ্ধির জন্য দণ্ডবিধি আইনের পুস্তকাবলী এবং আদালত ও উকিলের আধিক্যকে এবং মানুষের বার্থক্যের জন্য ঘড়ির আধিক্যকে দায়ী করার মতই ভ্ৰান্ত ও অযৌক্তিকর ফলতঃ অশ্লীল আর্টিষ্ট ও সাহিত্যিককে জেলে পুরিয়া বা অশ্লীল আর্ট ও সাহিত্যকে অগ্নিমুখে নিক্ষেপ করিয়া দেশ হইতে অশ্লীলতা দূর করা সম্ভর হইবে না। সে উদ্দেশ্য সফল করিতে হইলে মূলের সংস্কার করিতে হইবে, অশ্লীল আর্ট ও সাহিত্য যে-অগ্নির ইন্ধনমাত্র সেই অগ্নি সংযত করিতে হইবে। সমাজের ভ্ৰকুটি বা পুলিসের লাঠির সাহায্যে চারিদিকে ‘চুপ চুপ’ চীৎকার করিয়া মানুষের প্রকৃতিকে দমন করা সম্ভব। হইবে না। সুশিক্ষার দ্বারা যৌন-ব্যাপার সম্বন্ধে মানুষের মনকে শুদ্ধ-প্রবুদ্ধ নির্মল ও জ্ঞানবান করিতে হইবে। যৌনব্যাপারের প্ৰতি কুটিল ও বক্রদৃষ্টিপাতের পবিবর্তে সোজা সরল দৃষ্টিপাত করিবার মত মানসিক সরলতা মানুষের মধ্যে স্মৃষ্টি করিতে হইবে।

যে সমস্ত জাতির মধ্যে নারীর জন্য অবরোধ-প্ৰথা প্ৰচলিত আছে, সেই সমস্ত জাতির পুরুষেরা নারীর মুখের দিকে সহজ সরল দৃষ্টি দিতে পারেন না বলিয়াই তাঁহাদের বক্ৰদৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য সহচর কামলালসা। কিন্তু যে জাতির মধ্যে নারীর অবরোধ-প্রথা নাই, সে জাতির পুরুষেরা অনেকটা নিষ্কাম ও নির্লিপ্তভাবে শুধু পরস্ত্রীর মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত নয়, তাহাদের সহিত বাক্যালাপ করিতে এবং তাহাদের গাত্ৰস্পর্শও করিতে পারে।

এ সমস্ত ব্যাপার স্বতঃই শিক্ষা ও অভ্যাসের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে। যৌন-ব্যাপারেও তাঁহাই। অধ্যাপক মিচেলসি সত্যই বলিয়াছেন-মানুষ যদি আশৈশব এই শিক্ষা প্ৰাপ্ত হয় যে, যৌন-ব্যাপার তাহার অন্যান্য দৈহিক ব্যাপারের মতই নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার, তবে উহাতে অন্যায় আচরণের অহেতুক প্রবৃত্তি কম হইবার কথা।

বিরুদ্ধ মতবাদ

কিন্তু আশৈশব শিক্ষাদ্বারা যৌনশিক্ষাকে সহজ ও যৌন-ব্যাপারকে স্বচ্ছন্দ করিয়া তুলিতে প্ৰবল প্ৰতিবন্ধকতা বিদ্যমান রহিয়াছে; কারণ, শিশুকে যৌনশিক্ষা দিবার চেষ্টা আগুন লইয়া খেলা করার সমান। জার্মান চিকিৎসাবিদ ডাঃ হানস ডানবাৰ্গ বলিয়াছেন-“শিশুকে মিষ্টান্নের দোকানে বসাইয়া রাখিয়া তাহাকে মিষ্টান্ন না দেওয়া যেরূপ বিপজ্জনক, তাহাকে যৌনতত্ত্ব শিখাইবার চেষ্টাও সেইরূপ বিপজ্জনক, লোভনীয় বস্তুকে শিশুর দৃষ্টিপথের অন্তরালে রাখাই নিবাপদ। অজ্ঞতাজনিত ভীরুতা মানুষকে অনেক অকল্যাণের হাত হইতে রক্ষা করিয়া থাকে।”

ডাঃ ডানবার্গেব এই কথা নিতান্ত উপেক্ষণীয় নহে। পক্ষান্তরে ক্যাথারিন ডেভিস গবেষণা করিয়া দেখিয়াছেন যে, সুখী দম্পতিসমূহের শতকরা সাতায় জনই শৈশবে যৌন-ব্যাপারে উপদেশ লাভ করিয়াছিল। ডাঃ হ্যামিণ্টনের গবেষণাব ফল এই যে, তাহাদের শতকরা পঁয়ষট্টি জনই শৈশবে যৌন-বিষয়ে উপদেশ পাইয়াছিল।

প্রকৃতির শিক্ষা গোপনতার অসম্ভাব্যতা

এই সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়াও আমাদের সাধারণ জ্ঞানলভ্য একটা বিষয়ের প্রতি আমাদেবী লক্ষ্য রাখা উচিত। যৌন-ব্যাপারটা আমরা শিশুদের দৃষ্টিপথ হইতে দুরে রাখিতে পারি না। গরু, ভেড়া, ছাগল, কুকুব, স্থাস, মুবগী প্রভৃতি গৃহপালিত পশুপক্ষীসমূহ শিশুদেব সম্মুখেই অহরহ মিলিত হইতেছে এবং তাহার। ফলে সন্তান প্রসবও শিশুদের চক্ষুর সম্মুখেই হইতেছে। শিশুদের দৃষ্টিপথ হইতে এই সমস্ত ব্যাপার গোপন রাখিবার কোনও উপায় নাই। এতদ্ব্যতীত বালকদের মধ্যে অতি অল্পবয়সেই লিঙ্গোদ্রেক হইয়া থাকে। যৌন-প্রদেশে তাঁহারা সমযে সময়ে যে একটা অভিনব অনুভূতি বোধ করিয়া থাকে, ইহাও সত্য কথা। সুতবাং স্পষ্টই প্ৰতিপন্ন হইতেছে যে, যৌনব্যাপারটা শিশুমন হইতে একেবাবে গোপন ব্যাখা সম্ভব নহে।

এখন প্রশ্ন এই যে, আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বে ও যৌন-ব্যাপার। যদি শিশুদের নিকট প্ৰকাশিত হইয়াই পডে, তবে ঐ সম্বন্ধে সরলভাবে সুশিক্ষা দিয়া শিশুদিগের সত্য ও প্রকৃত ব্যাপার জানিতে দেওয়াই উচিত, না ঐ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীবব থাকিযা শিশুগণকে নিজ বুদ্ধি ও কল্পনাশক্তি-প্ৰসুত সিদ্ধান্ত করিতে দেওয়া উচিত? কোনটা মানবকল্যাণের মাপকাঠিতে অধিকতর গ্রহণীয়? মাতাপিত প্ৰভৃতি গুরুজন যদি এইসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব থাকিয়া যান, যদি শিশুর সরল প্রশ্নের উত্তরে তাহাকে ধমকাইয়া দেন, তবে হয় শিশুকে নিজের কল্পনাশক্তি প্রয়োগ করিয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে, নয়ত ভ্ৰমজ্ঞানপূর্ণ ও কদৰ্য রুচি সম্পন্ন অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সঙ্গীর নিকট হইতে হাসি, তামাশা ও ইয়াকির মারফত ভ্রান্ত ধারণাসমূহ ও অসম্পূর্ণ জানলাভ করিতে হইবে। বয়োজ্যেষ্ঠ সঙ্গীর নিকট হইতে কোমলমতি বালক-বালিকাগণ এসব ব্যাপারে অশ্লীলভাবে যে বিকৃত জ্ঞানলাভ করিয়া থাকে, নানারূপ কদৰ্য অভ্যাস সেই বিকৃত শিক্ষারই বিষময় ফল।*

যে সকল মাতাপিতা মনে করেন, ছেলেমেয়েদের যতদিন পর্যন্ত পারা যায়, যৌনশিক্ষা না দেওয়াই উচিত, এবং আশা করেন, তাহা হইলেই তাহারা নিষ্পাপ কোমল স্বভাব বজায় রাখিয়া চলিবে, তাঁহাদের অবগতির জন্য বলিয়া রাখা ভাল যে, তাঁহাদের ছেলেমেয়েরা যে বাল্যকালেই উহা সংগ্ৰহ কুরিয়া লয় নাই তাহার কিছুই নিশ্চয়তা নাই। বার্লিন ইনষ্টিটিউট অফ্‌ সেক্সলজী কতকগুলি তথ্য প্ৰকাশ করিয়া দেখাইয়াছেন যে, ছেলেমেয়েরা এদিক ওদিক হইতে এই সব বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করিয়াই থাকে।

ঐ সকল গবেষকদের মতে সংগৃহীত বহুক্ষেত্রে, ছেলেদের যৌনজ্ঞানলাভ (যতই আংশিক ও অপরিপূর্ণ হউক না কেন) ৬০% ক্ষেত্রে ১০ হইতে ১২ বৎসরের মধ্যে, ১৫% ক্ষেত্রে ৭ হইতে ৯ বৎসবের মধ্যে, ২০% ক্ষেত্রে ১৩ হইতে ১৬ বৎসরেব মধ্যে এবং ৫% ক্ষেত্রে ৬ বৎসরের পূর্বে এবং ১৬ বৎসরের পরে হইয়াছিল। মেয়েদের বেলায় সাধারণত এক বৎসব পরে পরে মোটামুটি ঐ অনুপাতে জ্ঞানলাভ হইয়াছিল। ৩% ক্ষেত্রে বিবাহের প্রাক্কালে জ্ঞানলাভ হইয়াছিল এবং ৬% ক্ষেত্রে একেবারেই হয় নাই।

কিভাবে এইরূপ জ্ঞানলাভ হইয়াছিল তাহার হিসাব আরও চমকপ্ৰদ। মাত্র শতকরা একটি ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মাতা বা পিতা শিক্ষা দিয়াছিলেন, ৭০% ক্ষেত্রেই তাহার সমপাঠী বন্ধু, খেলার সাখী, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বা ভী, বারনারী, দাসী, নাস, হোটেলেব চাকরাণী প্ৰভৃতির নিকট হইতে শিখিয়াছিল, ১৮% ক্ষেত্রে পুস্তকাদি পড়িয়া জানিতে পারিয়াছিল, এবং ২% ক্ষেত্রে পশুপক্ষীর মৈথুনক্রিয়া দেখিয়া শিখিয়াছিল। অনেক ছেলেমেয়ে ইহাও স্বীকার করিয়াছিল যে, অত্যন্ত জঘন্য ও নোংরা গোছের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়াই তাহাদিগকে যৌনজ্ঞান আংশিকভাবে লাভ করিতে হইয়াছিল। আমাদের দেশেও বোধ হয় এইরূপই হইবে, বরং গ্রীষ্মপ্রধান দেশ বলিয়া একটু সকাল সকাল হইবারই কথা।

এইরূপে প্ৰাপ্ত জ্ঞান ভ্রান্ত, অপূর্ণ, অসন্তোষজনক, এমন কি ক্ষতিকর হইতে বাধ্য। যাঁহারা শিক্ষাদাতা তাহাদের নিজেদেরই বিদ্যা অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ, তাহার উপবে। আবার গোপনে, কুটিল ও বক্ৰ ভাষা প্রয়োগে তাহাদের মনোভাব ব্যক্তি করিতে হয়, শিষ্যেরাও চঞ্চল ও মুচকি হাসির সহিত মজার ব্যাপার মনে করিয়া উপভোগ করে। কোন পক্ষই বিষযটিকে অত্যাবশ্যক, জ্ঞানগর্ভ বিষয় হিসাবে শিক্ষণীয় মনে করে না।

—————
* কেহ যদি বলেন যে, ছেলেমেঘেরা যখন এ সম্বন্ধে যে কোনও প্রকারে জানিয়াই লইবে তখন আর অভিভারক বা শিক্ষকের উহাদিগকে উপদেশ দিবার দরকার নাই, তবে এ কথাও বলা যাইতে পারে যে, যেহেতু গ্রাম ও শহরবাসীরা রাস্তার ধারের ডোবা হইতেই জল পান করিতে পারে, তখন শহরে আর বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করিবার প্রয়োজন নাই।  

—————

কিং কর্তব্যম্‌

নীরবতা ও অশিক্ষার বিষময় ফলের সঙ্গে পূর্বোল্লিখিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলসমূহ নিরপেক্ষভাবে বিচার করিলে শিশুগণকে যৌনশিক্ষা দান করিবার প্ৰয়োজনীয়তা স্বীকার করিতেই হয়। পক্ষান্তরে ডাঃ ডানবার্গের সতর্কবাণীও বিস্মৃত হইবার উপায় নাই। শিশুগণকে যৌন-ব্যাপারে শিক্ষাদান করিতে গেলে তাহাদের দৃষ্টি ও মন যৌন-ব্যাপারের প্রতি আতিবিক্ত মাত্রায় নিবন্ধ হইয়া যাইবার এবং লব্ধ জ্ঞান যাচাই ও কার্যে পরিণত করিতে চেষ্টা করিবার আশঙ্কা অনেক বেশী। সুতবাং এইখানে উভয়সঙ্কট। এবং সামাজিক অবস্থা ও ব্যবস্থানুযায়ী প্ৰকৃতিব নিয়মানুসারে শিশুদের নিকট যৌন-ব্যাপারে যখন গোপন বাধিবার কোনও উপায় নাই, তখন শিশুগণকে যৌন-ব্যাপারে শিক্ষাদান করিব কি না, আসল সমস্যা তাহা নহে, উহা হইতেছে এই যে, কি ভাবে শিশুগণকে যৌন শিক্ষা দান করিলে তাহাদিগকে তাহাদের অলীক কল্পনা ভ্ৰান্ত বয়োজ্যেষ্ঠ সঙ্গীদের হাত হইতে রক্ষা করা যায়, এবং তাঁহারা যৌন-ব্যাপারের প্রতি আতিবির্ভূক্ত মাত্রায় মনোযোগী হইয়া রহস্যময় নতুন বিষয়ে অজিত জ্ঞান পরীক্ষা করিতে গিয়া নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করিয়া না বসে, তাহারই বা কি ব্যবস্থা করা যায়।

যোগ্য শিক্ষক এই দুইটি দিকই বিচার করিয়া যৌনশিক্ষা দান করা সম্ভব কি না ডাঃ ফোরেল, এলিস, অধ্যাপক মিচেলসি প্রভৃতি নানা চিন্তাশীল সমাজ-কল্যাণকামী সে বিষয়ে মূল্যবান গবেষণা করিয়াছেন। তাঁহারা সকলেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, কন্যাদের কেবলমাত্র মাতা এবং পুত্রদের পিতা ও মাতা উভয়েই এবং বালক ও বালিকা উভয়ের ক্ষেত্রে যৌনবিদ সহানুভূতিসম্পন্ন সুকৌশলী চিকিৎসক অথবা ঐ রূপ সুযোগ্য শিক্ষক বা শিক্ষয়িত্রী যৌন-জ্ঞান-শিক্ষক হইতে পারেন, অন্য কেহ নহে।

ম্যাডাম স্মিথ জেগার একজন ফরাসী মহিলা। তিনি বহু সন্তানের মাতা ও আদর্শ গৃহিনী। তিনি তাঁহার “L’education sociale de no filles” নামক বিখ্যাত গ্রন্থে বলিয়াছেন,–যদি আমরা আমাদের সন্তানগণকে যৌনবিকৃতির হাত হইতে রক্ষা করিতে চাই, যদি তাহাদিগকে বয়োজ্যোষ্ঠ সঙ্গীর, বাড়ীর চাকর-চাকরাণীর ও অশ্লীল পুস্তকাদির কবল হইতে রক্ষা করিতে চাই, তবে দুর্বোধ্য নীতিকথা বলিয়া বা কৃত্রিম লজ্জা দেখাইয়া উদ্দেশ্য সফল হইবে না। সন্তানগণকে স্নেহ ও সরলতার দ্বারা সহজভাবে সত্যের সন্মুখীন করিতে হইবে। বালকের বেলা পিতা বা শিক্ষক এবং বালিকার বেলা মাতা বা শিক্ষয়িত্রীই যৌন-ব্যাপারে উপযুক্ত-উপদেষ্টা।

শিক্ষা প্রণালী

শিক্ষার প্রণালী সম্বন্ধে ফ্রয়েড, ফোরেল, মিচেলস ও এলিস সকলেই মোটামুটি একমত। প্ৰকৃতিই শিশুগণকে শিক্ষা দিবে, শিক্ষকের কর্তব্য হইবে শুধু সেই শিক্ষার ব্যাখ্যা করা। প্রকৃতি শিশুর মনে জিজ্ঞাসা সৃষ্টি করিয়া দিবে, শিশু সরলভাবে পিতামাতার কাছে সেই জিজ্ঞাসার উত্তর চাহিবে। পিতামাতা যদি স্নেহভরে শিশুর সেই জিজ্ঞাসার উত্তরটুকু সংক্ষেপে তাহার বয়সোপযোগী সরলভাবে দেন, তবেই তাঁহাদের উপদেষ্ট হিসাবে কর্তব্য সমাপ্ত হইল।

ডাঃ ডানবাৰ্গ শিশুকে যৌনশিক্ষা দিবার নামে আঁতকাইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু যৌনশিক্ষা অর্থে তিনি সম্ভবত বুঝিয়াছিলেন যে, অন্যান্য শিক্ষশীয় বিষয়ের মতই যৌন-ব্যাপারকেও কতকগুলি পাঠে বিভক্ত করিয়া শিশুগণকে ধারাবাহিকভাবে সেই পাঠ দেওয়া হইবে। কিন্তু সেইভাবে যৌনশিক্ষণ দিবার কথা কেহ বলে না। যৌনশিক্ষার অর্থ হইতেছে, যৌন ব্যাপারে। শিশুদের স্বাভাবিক কৌতুহলের সত্য সরল উত্তর দেওয়া। প্ৰকৃতি যতদিন যে শিশুর মধ্যে যে বিষয়ের জিজ্ঞাসা জাগ্ৰত না করিবে ততদিন – সেই শিশুকে সেই বিষয়ের কোনও শিক্ষা দিবার প্রয়োজন নাই। পক্ষান্তরে প্রকৃতির দ্বারা জাগ্ৰত কোনও কৌতুহলকে দমনও করিতে নাই। শিশুর, সরল প্রশ্নের উত্তরে, এমন সরলভাবে ব্যাপারটি বুঝাইবার চেষ্টা করিতে হইবে যাহাতে তাহার মন একদিকে যেমন যৌনব্যাপারের গভীর ও সূক্ষ্ম-তত্বের দিকে নিবন্ধ হইবে না, পক্ষান্তরে তেমনই তাহার শিশু-মনের কৌতুহল নিবৃত্তি লাভ করিবে। উত্তর শিশুকে দেওয়া হইবে, তাহা যেন কুসংস্কার সৃষ্টিকারক কোনও মিথ্যা স্তোকবাক্য না হয়। মনে রাখা উচিত যে, মিথ্যা কথা শিশুরু কাছে ধরা পড়িয়াই যাইবে। কারণ, শিশুকে সত্য কথা শিক্ষা দিবার জন্য এক দিকে প্ৰকৃতি অপর দিকে সঙ্গী প্ৰভৃতি সর্বদাই ব্যস্ত। পিতামাতা যদি সে সত্য গোপন করিবার জন্য শিশুকে কোনও ব্যাপারে মিথ্যাকথা বলেন। তবে শিশু শীঘ্রই সেই মিথ্যা ধরিয়া ফেলিবে ও পিতামাতার সততায় বিশ্বাস হারাইবে। তাহার। ফলে, সে আর সেরূপ কোনো কথা তাহাদের জিজ্ঞাসা না করিয়া সঙ্গী প্ৰভৃতিদেরই জিজ্ঞাসা করিবে। পিতামাতােব প্রতি এই আস্থাহীনতা শুধু যৌন-ব্যাপারে নহে, সাংসারিক আরও বহু-ব্যাপারে শিশুর ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের কারণ হইবে। আবার পিতামাতার কোন মিথ্যা কথা ধরা না পড়িলেও যৌন-ব্যাপারে কুসংস্কারেব সৃষ্টি করিয়াও তাঁহারা শিশুর কল্যাণের চেয়ে ঢেব বেশী অকল্যাণ করিবেন।

মোট কথা শিশুমনে। শৈশব হইতেই যৌন-ব্যাপার সম্বন্ধে এমন ধারণা সৃষ্টি করিতে হইবে, যাহাতে শিশু এই ব্যাপারকে অতি সরলভাবে গ্রহণ ও সহজভাবে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে। সমস্তই অভ্যাসেব উপর নির্ভর করে। পিতামাতার শিক্ষাগুণে এমন অনেক ছেলেমেয়ে দেখা যায যাহাদিগকে পিতা অথবা মাতা ডাকিয়া সকালে পায়খানা কেমন হইয়াছে জিজ্ঞাসা করিলে, তাহারা অমানবিদনে বাহা শক্ত কি নরম কি রং ইত্যাদি বিষয় বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করিতেছে। পক্ষান্তরে এমন ছেলেমেয়েও দেখা যায়, যাহারা কিছুতেই মলমূত্র সম্বন্ধে কোন উত্তর দেয় না; লজ্জায় মাথা নত করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। শৈশবকাল হইতে মলমূত্র সম্বন্ধে এই সহজ স্বাভাবিক সরলতা যৌবনে যৌন-ব্যাপারে সরলতায় পরিণত হইতে পারে। মলমূত্র সম্বন্ধে সরলতা যদি সম্ভব হয়, তবে ঋতুস্রাব ও শুক্রস্রাব সম্বন্ধেই বা সম্ভব হইবে না কেন?

সুতরাং বালক-বালিকার যৌনশিক্ষা শৈশবেই আরম্ভ হওয়া। প্ৰয়োজন। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও প্ৰণালী নির্ধারণ করা সম্ভব নহে। এ শিক্ষা স্বভারতই শিক্ষার্থীর জিজ্ঞাসা ও শিক্ষকের যোগ্যতার উপর নির্ভর করিবে। কিন্তু মোটের উপর এ কথা খুব দৃঢ়তার সহিত বলা যাইতে পারে যে, শিক্ষা-প্ৰণালী যতই ত্রুটিপূর্ণ হউক না কেন, সদুদ্দেশ্য-প্রণোদিত সরলতার দ্বারা শিক্ষা দেওয়া হইলে তাহা সর্বত্রই গোপনত অপেক্ষা সুফল প্ৰদান করিবে।

শিক্ষকের অভাব

কিন্তু মুশকিল হইবে পিতামাতাকে লইয়া। পিতামাতা যে শিক্ষা ও সংস্কার লইয়া বড় হইয়াছেন তাহা তে নিজেদের যৌবনপ্রাপ্ত সন্তানের ঋতুস্রাব বা শুক্রস্রাব সম্বন্ধে তাহার সঙ্গে বাক্যালাপ করা ত দূরের কথা, অপেক্ষাকৃত অল্প বযসের শিশুসন্তানকেও এ বিষয়ে সদুত্তব্য দিতে পারিবেন না। বর্তমান মতবাদ ও ধারণা এমনই যে, যৌবনপ্রাপ্ত সন্তানদিগকে যৌন-ব্যাপারে কোনও কথা বলা পিতামাতার পক্ষে প্রকৃতই অসম্ভব।

পক্ষান্তরে, শিক্ষার দিক হইতেও, শিশুর বয়ঃপ্ৰাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনেক বিপদ আছে। শৈশব হইতেই বিষয়ের পাব বিষয়, সত্যের পর সত্য, ক্ৰমে যদি শিশুমানে বিকাশ লাভ না করে, যৌন-ব্যাপারে প্রাকৃতিক রহস্য যদি ধীৰে ধীবে ক্ৰমে ক্ৰমে শিশুমািনব নিকট নিজেকে প্ৰকট না করে, তবে তাহার ফল বিষময় হইয়া থাকে। ঐ অবস্থায্য হয় শিশুমন সম্পূর্ণ অজ্ঞতার অন্ধকাবে নিমজ্জিত থাকে, অন্যথায় কুসংসর্গের ফলে বিকৃত ধারণায় ভ্ৰান্ত থাকে। এই উভয় অবস্থাতেই যৌবনাগমে সহসা সতে্যুব বিকাশে তাহার মনের। উপর একটা অবাঞ্ছনীয বিপৰ্যয ঘটিয়া থাকে। যৌন-জ্ঞানলাভের এই আকস্মিকতা মানুষের বহু বিসদৃশ চিন্তা ও আচবণ এবং শাৰীবিক ও মানসিক ব্যাধির কারণ হইয়া থাকে।

যাহা হউক, যৌবনাগমে যৌন শিক্ষাকে অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত ও গভীর করা যাইতে পারে। হ্যাভলক এলিস বলেন, এই সমযে মাতা যে উপদেশ দিতে পারেন বা দিতে চাহেন, তাহা অপেক্ষাও সূক্ষ্ম ও পবিপূর্ণ উপদেশ দিতে হইবে। সুখের বিষয়, তখন মাতা সুনিৰ্বাচিত ও সুলিখিত যৌনসাহিত্য ছেলে বা মেয়েকে অনায়াসে পড়িতে দিতে পারেন। লেখাপড়া না জানিলে অবশ্য মৌখিক উপদেশেব উপর নির্ভর করিতে হইবে। এই পুস্তকের শেষে কতকগুলি প্রামাণ্য যৌনগ্রন্থের উল্লেখ করা হইয়াছে।

প্রকৃত যৌনশাস্ত্রের অভাব

দুৰ্ভাগ্যবশতঃ আমাদেয় মাতৃভাষার সাহিত্যভাণ্ডার অন্যান্য বহু প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয সামগ্রীতে প্ৰায় পূর্ণ হইয়া উঠিলেও, এই অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপারটর দিকে লোকোব দৃষ্টি ততটা আকৃষ্ট হয় নাই। যে দুই-একজন এ কাজে হাত দিয়াছেন, তাঁহারা প্ৰধানত দুই সীমারেখা হইতে তাহা করিয়াছেন, বিষয়টির মধ্যে প্ৰবেশ করেন নাই। এক শ্রেণীর লেখক যুবকদের যৌনচাঞ্চল্যের সুযোগ গ্রহণ করিয়া অর্থে পাজন করিবার মানসে, কুরুচিপূর্ণ পুস্তিক রচনা করিয়াছেন। এই সমস্ত লেখা কোনও সমাজ-হিতৈষীব হইতে পারে না, কারণ, মাতৃভাষার সেবাবৃত্তিকে এমন জঘন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিবার প্ৰবৃত্তি কোনও সমাজ-সেবকের হইতে পারে না বলিয়া আমি ধরিয়া  লইয়াছি। পুলিস ও আদালত এই শ্রেণীর পুস্তকের উপর নিতান্ত ন্যায়সঙ্গত-রূপেই আক্ৰমণ চালাইয়া থাকে। পক্ষান্তরে অন্য এক শ্রেণীর পুস্তক আছে, যাহাতে লেখকগণ শালীনতা রক্ষা করিতে গিয়া যৌন-ব্যাপারে দার্শনিক বক্তৃতা করিয়াই কর্তব্য সমাধা করিয়াছেন, প্রকৃত সমস্যাটির সম্মুখীন হন নাই।

এই দুই শ্রেণীর পুস্তক ছাড়া আর এক শ্রেণীর পুস্তক আছে, যাহা যৌনশাস্ত্র নামেই চলিতেছে বটে, কিন্তু প্ৰকৃতপক্ষে উহা ধাত্রীবিদ্যার পুস্তক মাত্র। এই সমস্ত পুস্তক পাঠে আমাদের মনে হয় যে, লেখকগণ যৌনবিজ্ঞান ও ধাত্রীবিদ্যার পার্থক্য ধরিতে পারেন নাই। শ্ৰীযুক্ত নৃপেন্দ্ৰকুমার বসু, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ পশুপতি ভট্টাচাৰ্য, ডাঃ রুন্দ্রেন্দ্ৰ পাল, ডাঃ মদন বাণ প্ৰমুখের প্রচেষ্টাকে আমি অভিনন্দন জানাইতেছি। তবে দুই-একজন লেখকের চেষ্টা শিক্ষাক্ষেত্রের ও শিক্ষণীয় বিষয়ের বিস্তৃতি ও বহুলতার দিক হইতে কত নগণ্য তাহা পাশ্চাত্য যৌনবিদদের প্রচেষ্টার বিশালতা দেখিলে স্পষ্টই প্ৰতীয়মান হইবে।

এই পুস্তকের উপকরণ

ধাত্রীবিদ্যা সকলের সমস্যা নয়, কবিত্বপূর্ণ শ্লীলতা দ্বারা যৌন-সমস্যাকে ঢাকিয়া রাখাও প্ৰকৃত সমাধান নয়। আর যৌন-উত্তেজনাব সৃষ্টি করিয়া তরুণতরুণীদের চঞ্চল বৃত্তিকে আরও চঞ্চল করিয়া তোলাও দস্তুবমত অপরাধ।

আমাদের সাহিত্যে আন্তরিকতার সহিত যৌনসমস্যার আলোচনার নিতান্তই অভাব, একথা সকলেই স্বীকার করিতে বাধ্য হইবেন। এই অভাব দূরীকরণের উদ্দেশ্যেই আমি এই দায়িত্বপূর্ণ কার্ধে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলাম। বিষয়টির গুরুত্ব এবং আশুপ্রয়োজনীয়তার উপলব্ধিই আমাকে এ বিষয়ে প্ররোচিত করিয়াছিল। এই উদ্দেশ্যে আমি কোকা পণ্ডিত, ঋষি বাৎস্যায়ন, মহর্ষি সিদ্ধ নাগাজুন ও পণ্ডিত কল্যাণমল্প প্ৰভৃতি প্ৰাচীন ভারতীয় যৌনশাস্ত্ৰবিদ হইতে আরম্ভ করিয়া আবব, পাবস্য ও মিশর দেশীয় পণ্ডিতগণের এবং ডাঃ ফ্রয়েড, ডাঃ ফোরেল, এলিস, ক্রাফটু এবিং, ওয়েষ্টারমার্ক, ক্যাথারিন ডেভিস, মেবী স্টোপস, ডাঃ ভেন্ডি, স্কট, ফিল্ডিং, অধ্যাপক মিচেলসি, ডাঃ মাশাল, কিনযে প্রভৃতি বহু আধুনিক যৌনবিজ্ঞানীগণেব সহায়তা গ্ৰহণ করিয়াছি। ধাত্রীবিদ্যা-বিভাগে আমি বহু আধুনিক প্রামাণ্য পুস্তকের উপর নির্ভর করিয়াছি। জন্মনিয়ন্ত্রণ-ব্যাপারে আমি ফিল্ডিং, স্কট, ডাঃ নরম্যান হেয়ার, স্টোপস, ডাঃ ডিকিনসন, ডাঃ আব্রাহাম স্টোন ও তদজায়া ডাঃ হ্যানা স্টোন প্ৰভৃতিব মতবাদ বিচার করিয়াছি। কিন্তু পাঠকের বিরক্তির জন্য আমি পুস্তক উদ্ধৃতির দ্বারা কণ্টকিত করি নাই। উদ্ধৃত না করিলেও আমি যেখানে যাঁহার নাম উল্লেখ করিয়াছি, পরম সততার সহিত তাঁহার মতবাদের উল্লেখ করিয়াছি।

এই স্থলে আমার বক্তব্য এই যে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষযটিকে আলোচনার উপযোগী নির্ভবযোগ্য উপাদানেব উপর ভিত্তি করিয়া দেশবাসীব সম্মুখে উপস্থাপিত করিবার চেষ্টার ত্রুটি করি নাই। এই গুৰুতব বিষয়ের আলোচনাব, যোগ্যতা অর্জন করিবার জন্য বহুবৎসবকাল আমাকে এ বিষয়ে আরবী ও ফাবাসী হস্তলিপি এবং সংস্কৃত প্ৰাচীন গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করিতে হইয়াছে। ইংরাজি, ফবাসী ও জার্মান পণ্ডিতগণেব পুস্তক ও পত্রিকায় এ বিষয়ে যে সমস্ত গবেষণাসুত্র পাওযা যায, ভারতীয় মাপকাঠিতে তাহা প্ৰযুক্ত হইতেছে, কি না, তাহা নির্ধারণের জন্য বহু ভারতীয় ডাক্তার, কবিরাজ ও হেকিমের সহিত আমাকে এ বিষয়ে আলোচনা করিতে হইয়াছে।

পাঠকপাঠিকার সহযোগিতা

প্রথম সংস্করণ বাহির হইবার পর হইতেই দেশসুদ্ধ লোকের আগ্রহবাণী, উৎসাহ, পরামর্শ ও সহযোগিতা পাইবার সুযোগ আমার হইয়াছে। পরবর্তী আলোচনা ও অধ্যয়নের। ফলে আমার এই সংস্করণটি বর্তমান আকার প্ৰাপ্ত হইয়াছে। পাঠক-পাঠিকা লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে, আমার প্রত্যেক সংস্করণে পূৰ্ববতী তথ্যসমূহের আমূল সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন করিয়া আসিতেছি। কারণ, বিজ্ঞান নিত্য নূতন তথ্যের সন্ধান দিতেছে। অথচ বহু লেখক, এমন কি পাশ্চাত্য দেশের লেখকও একখানি বহি লিখিয়া উহাকেই বৎসবের পর বৎসর একইভাবে ছাপাইয়া অর্থোপার্জন করিয়া চলিয়াছেন।

পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীগণের যে সকল মতামতকে ভিত্তি করিয়া আমি এই পুস্তকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি, সেগুলি প্ৰতীচ্য জগতে নির্ভুল বলিয়া গৃহীত হইলেও আমাদের দেশে তাহা সম্পূর্ণ নির্ভুল নাও হইতে পারে, এ জ্ঞান ও আমার আছে। ভারতীয় পাত্রে এগুলি প্রয়োগ করিবার যে চেষ্টা আমি করিয়াছি, তাহার প্রয়োগক্ষেত্র অতিশয় সীমাবদ্ধ। সুতবাং পাঠকপাঠিকার নিকট আমার অনুবোধ এই যে, তাঁহার আলোচিত বিষয়গুলিকে নিজ নিজ দেহ ও মনের সহিত তুলনা করিয়া নিজেদের মতামত আমাকে জানাইবেন। যাহারা ইতিমধ্যে তাঁহাদের মতামত জানাইয়াছেন, তাঁহাদের মতামত অত্যন্ত গোপনীয় বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে এবং দৃঢ়ভাবে সে গোপনীয়তা রক্ষা করা হইবে, একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার জন্য ইহা যে কত প্ৰযোজনীয়, আশা করি প্ৰত্যেক পাঠক-পাঠিকা তাহা স্বীকার করিবেন। এই উদ্দেশ্যে এই সংস্করণের শেষেও একটি প্রশ্নমালা সন্নিবেশিত হইল।

অজ্ঞতা ধর্মের ভিত্তি নহে

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যৌন ব্যাপারকে সরলভাবে শিক্ষণীয় বিষয়ের শ্রেণীভূক্ত করিয়া যথারীতি অধ্যয়নের দ্বারা মানবজাতির প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইবে। যৌনবিষয়ে আলোচনায় তরলমতি বালক-বালিকা পথভ্রষ্ট হইবে বলিয়া যাঁহারা আশঙ্কা করেন, তাহাদের ভ্ৰমপূৰ্ণ মনোভাবেব ও যুক্তির অসারতা আমি বিস্তৃত আলোচনার দ্বারা প্ৰদৰ্শন করিয়াছি। আমি আবার তঁহাদিগকে স্মরণ করাইয়া দিতে চাই যে, অজ্ঞতা কস্মিনকালেও নীতির রক্ষাকবচ নাহে। যৌন-ব্যাপারে মানুষকে অজ্ঞ রাখা অসম্ভব, কারণ প্ৰকৃতিই তাহার শিক্ষাদাত্রী। সুতরাং সত্যকে স্বীকার করিয়া লইয়া সুশিক্ষার ব্যবস্থা কারাই বুদ্ধিমানের কার্য।

আমাদের শুনিয়া বোধ হয় আশ্চৰ্য লাগিবে যে, আমেরিকাব্য অসংখ্য কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালযে “বিবাহ” বিষয়টিকে পাঠ্য বলিয়া পড়ানো হয়। প্ৰায় আট বৎসব পূর্বে সর্বপ্রথম মিশৌরীতে একটি মেয়ে-কলেজে এবং তাহার পরেই আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উক্তরূপ শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তাহার পরে দ্রুতগতিতে ঐ রূপ ব্যবস্থা অন্যত্র করা হয়।

বিবাহের প্রাক্কালে এবং তাহার পর বিবাহেচ্ছু যুবতীকে যে যে বিষয়ে অবহিত এবং সাবধান হইতে হয়, তাহার সমস্তই তাঁহাকে সম্যক্‌রূপে শিক্ষা দেওয়া হয়। নিম্ন শিক্ষাতালিকা হইতে বিষয়গুলি প্রতীয়মান হইবে :

(১) বিবাহবদ্ধ হইবার নানাবিধ কারণ; (২) বিবাহের স্বাভাবিকতা; (৩) যৌন অংশীদার নির্বাচন, (৪) কোর্টশীপ বা পূর্ব-সাহচৰ্য, (৫) উদ্বাহ-বন্ধন; (৬) প্ৰকৃত বিবাহ), (৭) দাম্পত্য জীবন-যাপন, (৮) বিবাহ-জীবনকে সুখী করিবারে উপকরণ; (৯) পরিবারে আয়-ব্যয়, (১০) বিবাহিত নারীদের আয়ের সংস্থান; (১১) সন্তান-ধারণা ও পালন এবং (১২) অবসব-বিনোদন।

ভবিষ্যতে স্কুল ও কলেজে অনুরূপ পাঠ্য প্রবর্তনের চেষ্টা ও হইতেছে। পাক-ভারতে ও ঐরূপ ব্যবস্থা করা। আমরা সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করি।

উপযুক্ত যৌনগ্রন্থের উপহার প্রদান

তবে এইরূপ ব্যবস্থা করা হইলেও আমাদের যুবক-যুবতীর বিরাট সংখ্যার মাত্ৰ আতি অল্পজনেই ইহার সুযোগ গ্ৰহণ করিবার সৌভাগ্য হইবে। তাই, বলা বাহুল্য, মাতা-পিতা, গুরুজন, আত্মীয়-স্বজন, এমন কি হিতাকাজক্ষী বন্ধু-বান্ধবীদের সকলের কর্তব্য বিবাহের প্রাক্কালে অথবা সঙ্গে সঙ্গে বর ও বধু তাহাদের দাম্পত্য জীবন-যাপনের উপযোগী জ্ঞানলাভ করিয়াছে কিনা তাহা নির্ণয় করা, এবং উহা করে নাই বা শুধু অসম্পূর্ণভাবে করিয়াছে জানিতে পারিলে, উহাদের হাতে দুই চারিখানি প্রামাণ্য যৌনগ্ৰন্থ দেওয়া-যাহাতে তাঁহারা নিজেদের পথ বাছিয়া লইয়া চলিতে পারে। তাহা না করিলে তাহাদিগকে শুধু আদর-আহ্লাদ দিয়া, টাকা পয়সা খরচ করিয়া, বেশভূষা পরাইয়া একটি বিপদসঙ্কল রাস্তায় আগাইয়া দেওয়া হইবে মাত্র। সকল উপহারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উপহার হইবে-যাহাতে তাঁহারা পথ চলিবার মত জ্ঞান ও উপদেশ পায় এমন ব্যবস্থা করা।

অন্যান্য ভাষায় কত শত-সহস্ৰ পুস্তক-পুস্তিকার সাহায্য বর ও বধূ পাইতে পারে, তাহার আভাষ এই পুস্তকে আলোচিত এবং প্ৰমাণপঞ্জীতে উল্লিখিত যৌনসাহিত্যেব বিরাট তালিকা হইতেই পাওয়া যাইবে। বাংলাভাষা এ বিষয়ে অত্যন্ত দীন।

যৌন-বিকল্পের প্রসার প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি যৌন-বিকল্পের এমন বিস্তৃত আলোচনা করায় উহাতে বালক-বালিকা বিপথগামী হইতে পারে কি না। আমি বলিব, এ ধারণা নিতান্ত ভ্রান্ত। তাহা অহরহ ঘটিতেছে, আমি তাহাই লিপিবদ্ধ করিয়াছি। লিপিবদ্ধ অধিকাংশ বিষয়ই বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের নৈষ্ঠিক সাধনা ও অনুসন্ধানের ফল। সরলমনা পাঠক-পাঠিকা হয়ত মনে নৈষ্ঠিক সাধনা ও অনুসন্ধানের ফল। সবলমনা পাঠক-পাঠিকা হয়ত মনে করিতেছেন যে, এই পুস্তকপাঠে তঁহাদেব পুত্রকন্যাগণ এই সমস্ত যৌনবিকল্প শিক্ষা করিতে পারে। কিন্তু একটু পর্যবেক্ষণ সহকাবে লক্ষ্য করিলে তাঁহারা জানিয়া বিস্থিত হইবেন যে, তাহাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্ৰকৃতিদাত্ত এবং সঙ্গী প্রভৃতিদের শিক্ষাগুণে ঐ সমস্ত অভ্যাস বোধ হয় ইতিপূর্বেই মূল বিস্তাব করিয়া বসিযাছে। সুতবাং কি হইবে, তাহা প্রশ্ন নষ . যাহা হইয়াছে, তাহার সংস্কার কিভাবে কব৷ যাষ তাঙ্কাই আসল সমস্যা। এ সমস্ত অভ্যাস দুব করিবার জন্য আমরা ব্ৰহ্মচৰ্য, মনশ্চিকিৎসা, ইচ্ছাশক্তিসাধনা প্ৰভৃতি প্ৰতিকাবোপায় নির্দেশ করিয়াছি। হইতে পারে, বিশেষ বিশেষ পাঠক এই পুস্তকের বিশেষ বিশেষ অংশই অধিক মনোযোগের সহিত পাঠ করিবেন। কিন্তু আমি সমস্ত বিষয়টিকে জ্ঞানের ভিত্তিভূমিতে দাড় করাইয়া বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ হইতে দেখিয়াছি, এবং সেই ভাবেই পাঠকে বা সম্মুখে উহা উপস্থাপিত করিয়াছি।

পূর্বসংস্কার জ্ঞানাহরণের পরিপন্থী

পাঠক-পাঠিকাগণকে আমি স্মরণ কারাইয়া দিতে চাই যে, যৌনবিজ্ঞানের ন্যান্য জটিল বিষয় অধ্যয়ন করিতে গেলে জ্ঞানাহরণের তীব্ৰ ক্ষুধা লইয়াই করিতে হইবে। বাল্যকালে শ্রুত ও দৃষ্ট বস্তুসমূহ হইতে উৎপন্ন ধারণা ধর্ম, সমাজ, নীতি, দেশ, কাল এই সমস্ত পূর্বসংস্কার কোন বিষয়েই আমাদিগকে স্বাধীনভাবে জ্ঞানাহরণ করিতে দেয় না। বর্তমাণ বিষয়ের আলোচনায় আমি সকল ব্যাপারে সংস্কারবর্জিত হুইয়া নিরপেক্ষভাবে বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ হইতে সমস্ত বিষযটি দেখিবার চেষ্টা করিয়াছি। কতটা সাফল্যলাভ করিয়াছি, পাঠক-পাঠিকাগণ তাহার বিচার করিবেন। কিন্তু  আমার নিবেদন এই যে, কেবলমাত্র সত্যানুসন্ধিৎসা ও সমাজ-কল্যাণই আমাকে এ কার্যে পরিচালিত করিয়াছে।

বিজ্ঞানসাধনায় ক্রমবিকাশ

আমি স্বীকার করি, সকল বিষয়ে হয়ত আমি সুন্মাতিসূক্ষ্মীরূপে সত্যের রূপ দৰ্শন করিতে পাবি নাই। কিন্তু সে দোষ আমার বা কোন ব্যক্তি বিশেষের নহে। দেহতত্ত্ব, শরীব বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, গ্ৰন্থি-রসতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বংশগতি, সৌজাত্যবিদ্যা, প্রভৃতি যে সমস্ত বিজ্ঞানের উপর যৌনবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত, সেই সমস্ত বিজ্ঞান নিজেরাই সূক্ষ্মরূপে নির্ভুল নয়। সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণাই মানব-মনের একটা অফুরন্ত জিজ্ঞাসা। এ সাধনা, এ গবেষণা অনন্তকাল চলিবে। যৌনবিজ্ঞানও এই ত্রুটিমুক্ত নয। সুতবাং আমি বর্তমান গ্রন্থে শুধু সেই সমস্ত বৈজ্ঞানিক অভিমতই গ্রহণ করিয়াছি, যাহা ভবিষ্যতে নূতন আবিষ্কাবের আলোকে পবিবতিত হইবার সম্ভাবনা থাকিলেও বর্তমানে অধিকাংশ বিজ্ঞানী কর্তৃক সত্য বলিয়া গৃহীত হইতেছে। যে সমস্ত মতবাদকে এককালে আমাদের পূর্বপুরুষগণ ধর্মীয় তত্ত্বকথারূপে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিলেন, সে সমস্তেরও বহু সংস্কার ও রদ-বদল হইয়াছে। ইহাই দেখাইবার জন্য আমি বর্তমান গ্রন্থে প্রাচীন মতবাদের উল্লেখ করিয়া তাহার সঙ্গে আধুনিক মতবাদের তুলনামূলক সমালোচনা করিতে ক্ৰটি করি নাই। এমন কি, পূর্ব সংস্করণের কতক মতবাদও সংশোধিত করিয়া এই সংস্করণে উপস্থাপিত করা যাইতেছে।

মত-পার্থক্য স্বাভাবিক

কোনও বিষয় সম্বন্ধেই সকলের একমত হওয়া সম্ভবপর নহে। যৌনবিজ্ঞানের অনেক বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্ৰবল মতবাদ আছে এবং থাকিবেই। কিন্তু শ্রদ্ধার সঙ্গে সত্যানুন্ধান যাঁহারা করেন, মতভেদের জন্য তাঁহারা পরস্পরের প্ৰতি শ্রদ্ধা হারান না। সত্যের সঙ্গে স্বার্থের এইটুকুই পার্থক্য। বহু বিভিন্ন মতেব মধ্য হইতে আমি একটি মাত্র মত গ্ৰহণ করিয়াছি বলিয়া অন্য মতগুলিকে আমার অশ্রদ্ধা আছে, তাহা নহে। আমি একটি মত গ্রহণ করিয়াছি এই জন্য যে সত্যানুসন্ধানের এককালীন একটির বেশী মত গ্ৰহণ করিয়াছি এবং অপর সকল মতের সঙ্গে আমার মতভেদ সম্প্রদ্ধভাবে প্ৰকাশ করিয়াছি।

আশা করি আমার পাঠক-পাঠিকাগণও আমার প্রতি অনুরূপ সদয় ব্যবহার করিবেন। গ্রন্থাকার একা, পাঠক-পাঠিকা বহু। সকলকে সন্তুষ্ট করা আমার পক্ষে সম্ভব নয, কাহারও পক্ষেই নয়। পাঠকের। নিকট অনুরোধ, বক্তব্য পাঠ না করিয়াই তাঁহারা যেন কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত না হন।

সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাই জ্ঞানের উৎস

পর-মত-সহিষ্ণুতার অভাব আমাদিগকে জ্ঞানান্বেষণে প্রতি পদে বাধা দিতেছে। আমরা সংস্কারমুক্তভাবে জ্ঞানাহরণের চেষ্টা করিতেছি না। আমরা আমাদের জরাজীর্ণ সংস্কারগুলিকে যক্ষের মত পাহারা দিতেছি। আমি আমার পাঠক-পাঠিকাকে জিজ্ঞাসা করি, তাঁহারা কি বুকে হাত দিয়া বলিতে পারেন যে, তাহাদের সমস্ত মতবাদই জ্ঞানানুশীলনের উপর প্ৰতিষ্ঠিত? তাহা যদি না হইয়া থাকে, তবে আমার প্রচাবিত কোন মত গ্রহণ বা বর্জন করিবার পূর্বে আমি তাহাদিগকে জ্ঞান ও বিচারের নিক্তিতে সমস্ত ব্যাপারকে ওজন করিবার অনুরোধ করিতেছি। কোনও একটি বিষয় প্রথম দৃষ্টিতে যতই অসম্ভব ও অযৌক্তিক মনে হউক না কেন, যতই বিপ্লবমূলক বোধ হউক না কেন, আমাদের চিরপোষিত ধারণার যত বিরোধীই হউক না। কেন, তাহাকে (পূর্ণ ধারণার বিরুদ্ধ বলিষ্যা) এক কথায় বিনাবিচারে অগ্রাহ করিবেন না। তাহা যদি করেন, দুনিযার অনেক সত্য হইতেই আপনি বঞ্চিত থাকিবেন। আর সত্য আসিযা যখন সম্মুখে দাঁড়াইবে, সাহসেব সঙ্গে গ্ৰহণ করিবেন। সত্য গ্রহণে সংস্কারবজিত মুক্ত বুদ্ধি, খোলা মন, নিবপেক্ষ ভাব, বিচাব বুদ্ধি, যুক্তি-নিষ্ঠতা ও সাহস চাই বলিয়াই আমি এ কথা বলিতেছি। সত্য কাহার ও মুখাপেক্ষী নয—সে সত্যই, আপনি চাহিলেও সে সত্য, আপনি না চাহিলেও সে সত্যই। এ কথা পাঠক-পাঠিকাকে স্মাবণ করাইয়া দিবার বিশেষ কারণ এই যে, মানুষ তাহার পূর্ব-সংস্কাবের অনুকুল মতগুলিকে যত সহজে গ্রহণ করে, উহার বিরুদ্ধ মতগুলিকে ঠিক তত সহজেই অগ্রাহ কারিয়া থাকে। অগ্রাহ করিবেন করুন, কিন্তু বিরুদ্ধ মতের প্রচারকে বিনাবিচারে নিন্দা করিবার মত অসহিষ্ণু হওয়া কি উচিত?

আমরা জানি এবং দৃঢ়তাঘ সহিত বিশ্বাসও করি, মানুষ মরিলে আর বঁাচে না। কিন্তু কোন বিজ্ঞানী যদি মব মানুষ বঁাচাইবার জন্য গবেষণা করেন, তবে তাহা তে আমাদের ক্রুদ্ধ হইবোব কোন কারণই নাই। যদি তিনি বিফলমনোরথ হন, তাহা তে কাহারও কোনও লোকসান হইবে না; কিন্তু যদি সফলকাম হন, তাহা হইলে সকলেই একটা নৃতন সত্যের সন্ধান পাইব।

আমি ইহাও বিশ্বাস করি যে আমার পাঠক-পাঠিকার মধ্যে এমনও অনেক আছেন, যাঁহারা জ্ঞানের কষ্টিপাথরে সমস্ত বিষয়ই যাচাই করিয়া থাকেন। আমি জানি, তাঁহারা আমার এ উদ্যমের প্রশংসা করিয়াছেন। আমার এ সাধনায় অনেকে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন, আমার এ গ্রন্থের ক্ৰটি ও অসম্পূর্ণতা দূরীকরণে তাঁহারা আমাকে তাঁহাদের অধ্যয়ন ও গবেষণার ফলভাগী করিয়াছেন। তাঁহাদের এই সহযোগিতার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। এই জটিল বিজ্ঞানালোচনায় পাঠক-পাঠিকা যখন যে পরামর্শ দিবেন, আমি পরবর্তী সংস্করণের সংস্কাবের জন্য সে পরামর্শ শ্রদ্ধার সহিত গ্ৰহণ করিতে চেষ্টা করিব। উপসংহারে আমার নিবেদন এই যে, আমি দিব্য-চক্ষে দেখিতেছি, শ্রদ্ধা ও অনুসন্ধিৎসা লইয়া এ বিষয়ে অধ্যয়ন কবিলে বাঙালীর পারিবারিক জীবন সুখেব আকব হইবে, বাংলাব দম্পতিরা আদর্শ প্রেমিক-প্ৰেমিকা হইবেন, ব্যভিচাব ও যৌনবিকল্প বাংলার পারিবারিক ও সামাজিক জীবন হইতে দূৰীভূত হইবে, যৌনসুখের সন্ধানে যাহারা বিবাহ-প্রথার উচ্ছেদের চেষ্টা করিতেছে, তাঁহারা বুঝিতে পরিবে শিক্ষা ও সাধনার দ্বারা বিবাহিত জীবনকেই চরম সুখের কেন্দ্ৰে পরিণত করা সম্ভব। আমি উপসংহাবে দাম্পত্য জীবন সম্বন্ধে ডাঃ ফোরেলের ভবিষ্যদ্বাণী উদ্ধৃত করিয়া এই অধ্যায় শেষ করিতেছি।

ফোরেলের কল্পিত দাম্পত্য জীবন

ফোরেল লিখিয়াছেন—ভবিষ্যতের মানুষ শৈশব হইতেই যৌনবিজ্ঞান ও উহার বিভিন্ন দিকের। উপকারিতা ও অপকারিতা সম্বন্ধে সুশিক্ষিত হইবে। মানুষ মদ্য পান বা কোনও প্রকার নেশা কবিবে না। মানুষ কাঞ্চনকৌলীন্যে বিশ্বাসী থাকিবে না, সহস্ৰ লোকের রক্ত শোষণ করিয়া এক ব্যক্তি ঐশ্বর্ষের অধিকারী হইবে না, সুতবাং ব্যক্তিবিশেষের কামলালসার ইন্ধন যোগাইবার জন্য সহস্ৰ প্রেমিকের প্রাণ ও সহস্ৰ নারীব সতীত্ব বিসর্জন দিতে হইবে না। মানুষ বিলাসী থাকিবে না; শিল্পকলা ও ললিতকলা সম্বন্ধে মানুষের ধারণার পরিবর্তন হইবে, মানুষের পোষাক-পরিচ্ছদ ও অলঙ্কারের বাহুল্য থাকিবে না। স্বাস্থ্যসম্মত, স্বল্পব্যয়সাপেক্ষ পোষাকে মানুষ তৃপ্ত থাকিবে। আড়ম্বর ও বিলাসিত যে শিল্পকলা নহে, একথা মানুষ হৃদয়ঙ্গম করিবে। সুতরাং মানুষের আবাসভবন আড়ম্বরপূর্ণ ইষ্টক ভূপ মাত্ৰ থাকিবে না, তাহা মানুষের বাসোপযোগী কবিত্বময়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, শিল্পকলার নিদর্শন হইবে। মানুষ ভণ্ডামি ভুলিয়া যাইবে; সত্যব্যথা সত্য করিয়া জোরের সঙ্গে বলিবার অভ্যাস করিবে।

যৌন-বিষয়ে অভিজ্ঞ তরুণ-তরুণী অন্যান্য দশ বৈষয়িক ব্যাপারের ন্যায় নিজেদের যৌন উপযোগিতা আলোচনা ও বিচার করিবে। তাঁহারা পয়সার হিসাব করিতে যেমন ভুল করে না, যৌন-ব্যাপারে কিংবা অংশীদার নির্বাচনেও তেমনি ভুল করিবে না। নারীপুরুষ উভয়েরই তালাকের অধিকার থাকিবে, কিন্তু তালাকের প্রয়োজন থাকিবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *