১৯. জেনারেল টিক্কা খান

জেনারেল টিক্কা খান আজ চোস্ত পায়জামার সঙ্গে মিলিয়ে হালকা ঘি কালারের পাঞ্জাবি পরেছেন। পায়ে পরেছেন কাবুলি চপ্পল। পাঞ্জাবির উপর নকশাদার কাশ্মিরী কটি পরেছিলেন। কাটির লাল, হলুদ এবং কড়া সবুজ রঙ বেশি কটকট করছিল বলে কটি খুলে ফেলেছেন। কানের লতিতে সামান্য আতর দিয়েছেন। আতরের নাম মেশক-এ আম্বর। তাঁর ফুপাতো ভাই এই আন্তর সৌদি-আরব থেকে পাঠান। আতরের কড়া গন্ধ তাঁর ভালো লাগে না। তবে আজ খারাপ গছে না। মেজাজে সামান্য ফুরফুরে ভাব চলে এসেছে। আগামী দুঘণ্টা তাকে এই ফুরফুরে ভাব ধরে রাখতে হবে।

আজ তার জন্মদিন। জনদিন উপলক্ষে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে দুটি কেক আনা হয়েছে। দুটি কেকের উপর উর্দুতে লেখা জিন্দা পাকিস্তান। অর্ডার দিয়ে বানানো এই দুটা কেক আজ রাতে দুই দফায় কাটা হবে। প্রথম দফায় কাটবেন ঢাকা শহরের কিছু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আছেন, কবি-সাহিত্যিক আছেন, শিল্পী আছেন, ফিল্ম লাইনের কিছু লোকজন আছেন। তাদের সময় দেয়া হয়েছে সন্ধ্যা সাতটা। গাড়ি যাবে, তাদের নিয়ে আসবে। অনুষ্ঠান শেষে গাড়ি তাদের পৌঁছে দেবে।

অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা যখন করা হয়, তখন তার এডিসি ইসমত খান বলেছিল, কেউ আসবে না। টিক্কা খান বলেছেন, যাদের দাওয়াত করা হবে, তারা সবাই আসবে। কেউ বাদ যাবে না।

ইসমত খান তারপরেও বলল, স্যার, মনে হয় না কেউ আসবে।

টিক্কা খান বললেন, বাজি ধরতে চাও? এসে তোমার সঙ্গে ছোট একটা বাজি হয়ে যাক।

এডিসি বলল, বাজি রাখলে আপনি হেরে যাবেন। কারণ আমার বাজির ভাগ্য খুব ভালো। আমি সবসময় বাজিতে জিতি।

চলো দেখা যাক। if you win you get a big fruit basket. কেন তুমি উইন করবে না শুনতে চাও?

If you please.

ইন্টেলেকচুয়ালস আর কাউয়ার্ডস। শেকসপিয়ার বলে গিয়েছেন, cowards die many times before their death. V53TT KŘ মৃত। মৃতদের ইচ্ছাঅনিচ্ছা বলে কিছু নেই। বুঝেছ?

চেষ্টা করছি।

জীবন বঁচিয়ে রাখার জন্যে তারা মাটি চাটবে। দুএকটা ব্যতিক্রম থাকতে পারে। যে-কোনো নিয়মেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। ভালো কথা, আমি গায়ে যে আতর দিয়েছি, তার গন্ধ তোমার কাছে কেমন লাগছে?

কড়া।

ওয়াটার কালারের মতো হালকা টান না। তেলরঙের কঠিন ব্ৰাসের টান। ঠিক বলেছি?

ইয়েস স্যার।

যুদ্ধাবস্থায় ওয়াটার কালার থাকে না। তখন সবই তেলরঙ। সেই অর্থে আন্তরটা মানিয়ে যাচ্ছে।

ইয়েস স্যার।

 

অতিথিরা সময়মতো এসে পড়লেন। তারা ভীত। তাদের দাড়াবার ভঙ্গি, বসার ভঙ্গি–সব কিছুর মধ্যেই জবুথবু ভাব। তাদের নিঃশ্বাস ফেলার ভঙ্গিও বলে দিচ্ছে তারা ঠিকমতো নিঃশ্বাস ফেলতে ভয় পাচ্ছেন। সবাই মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছেন। ভীত মানুষ মেরুদণ্ড সোজা করে বসে। তখন তাদের স্নায়ু টানটান হয়ে থাকে।

জেনারেল টিক্কা বললেন, আপনারা আমার নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্যে কষ্ট করে এসেছেন, এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আপনাদের কাউকে কাউকে আমি চিনি, সবাইকে চিনি না। আপনারা যদি নিজের পরিচয় দেন, তাহলে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করব। না না, উঠে দাঁড়াতে হবে না। বসে বসে বলুন। Please.

আমি ডঃ …। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক।

Thank you sir, thank you for coming.

আমি ডঃ …। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

Thank you sir, thank you for coming.

আমি …। আমি একজন কবি।

I am honoured to meet a poet.

পরিচয়পর্ব শেষ হতে সময় লাগল, কারণ জেনারেল টিক্কা সবার সামনেই কিছুক্ষণ দাঁড়াচ্ছেন। ভদ্রতার হাসি হাসছেন। কারো কারো সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। একজনের সঙ্গে কোলাকুলিও করলেন। পরিচয়পর্ব শেষ হবার পর জেনারেল সুন্দর একটা ভাষণ দিলেন। ভাষণটা পুরোপুরি ইংরেজিতে দেয়া হলো।

আমার মতো সামান্য একজন সৈনিকের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আপনাদের মতো গুণী-জ্ঞানীরা যে এসেছেন তাতে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আমার জন্যে আজকের দিনটি একটি বিশেষ দিন। এই দিনে পাঞ্জাবের এক অখ্যাত দুৰ্গম গ্রামে আমার জন্ম হয়। জন্মদিন পালন করার মতো হাস্যকর ছেলেমানুষি করা কোনো সৈনিকের শোভা পায় না। আমি এই ছেলেমানুষিটা করছি মূলত আপনাদের কাছে পাওয়ার একটি অজুহাত হিসেবে।

আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, দুষ্কৃতকারীদের সব চক্রান্ত আমরা গুড়িয়ে দিয়েছি। দুষ্কৃতকারীদের পেছনে আছে বেঈমান আওয়ামী লীগ। এক বেঈমানকে সাহায্য করবে: অন্য বেঈমান। আওয়ামী লীগকে সাহায্য করছে বেঈমান হিন্দুস্তান। আমরা এখন প্ৰস্তুত হচ্ছি বেঈমান হিন্দুস্তানকে শায়েস্তা করার জন্যে। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই শায়েস্তা হয়েছে। বড় শয়তান খাঁচায় ঢুকে গেছে। আমরা আমাদের সুবিধামতো সময়ে বড় শয়তানটাকে খাঁচা থেকে বের করব। তাকে নিয়ে আমাদের ইন্টারেস্টিং পরিকল্পনা আছে।

স্বাধীন বাংলা বেতার নামে হিন্দুস্তানের আকাশবাণীর একটি শাখা এতদিন প্রচার করছিল–শেখ মুজিব বিদ্রোহীদের সঙ্গে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আশা করি, আমার ভাষণের পর এই বিষয়ে আপনাদের মনে আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। আগামীকালের সংবাদপত্রে করাচি এয়ারপোর্টে বসে থাকা শেখ মুজিবের একটি ছবি ছাপা হবার কথা।

আমি আমার বক্তৃতার শেষপর্যায়ে চলে এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেক কাটা হবে। তারপর আপনারা আমার সঙ্গে এক কাপ চা খাবেন। আপনাদের সবার জন্যে সামান্য কিছু উপহারও আছে। Fruit basket. ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে Say it with flowers. আমি প্রবচনটা  সামান্য বদলেছি। আমি বলছি Say it with fruits.

আপনারা সবাই পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করবেন। বেঈমানদের কথায় প্রতারিত হবেন না। দেশে যুদ্ধাবস্থা চলছে। যুদ্ধাবস্থায় আমাদের কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আপনারা এমন কিছু করবেন না যাতে আমাদের কঠিন অবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়।

কেক কাটা হলো। কেকের এক কোনায় সবুজ রঙের বড় সাইজের একটা মোমবাতি। জেনারেল টিক্কা বললেন, I am making a wish. বলেই চোখ বন্ধ করলেন। চোখ বন্ধ অবস্থায় ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে বললেন, আমার wish ছিল শান্তি ও ফ্রেন্ডশিপের। আসুন কেক খাওয়া যাক। উনি নিজেই সবার হাতে কেক তুলে দিলেন। উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিরা জেনারেলের ভদ্রতায় মোহিত হলেন।

পরবর্তী আধঘণ্টা জেনারেল নানান গল্পগুজব করলেন। কচ্ছের রান এলাকায় তিনি জেভলিন দিয়ে একটা বন্য শূকরী মেরেছিলেন সেই গল্প। অতিথিদের একজন কচ্ছের রান মরুভূমিতে বন্য শূকর আছে কিনা সেই সন্দেহ প্রকাশ করায় তাৎক্ষণিকভাবে ফটো অ্যালবাম এনে বন্য শূকরীসহ তার ছবি দেখালেন।

যুদ্ধবিদ্যা সম্পর্কে কিছু কথাও হলো। তিনি ইতিহাসের অধ্যাপককে বললেন, পৃথিবীর প্রধান যুদ্ধবিশারদ হলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। পবিত্র কোরআন শরিফে যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নাম আছে, তা কি আপনি জানেন?

ইতিহাসের অধ্যাপক বিস্মিত হয়ে বললেন, জানি না স্যার।

আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নাম আছে। তাকে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে জুলকারনাইন নামে।

জেনারেলের কথাবার্তায় সবাই চমৎকৃত এবং বিস্মিত। তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতায়ও মুগ্ধ। ইনি যে মোটামুটি ভয়াবহ একজন মানুষ এবং বালুচিস্তানের জল্লাদ নামে খ্যাত–সেটা কারোর মনেই রইল না। জেনারেল সবাইকে নিজে উপস্থিত থেকে গাড়িতে তুলে দিলেন।

তাঁর দ্বিতীয় দফা মিটিং শুরু হলো পুলিশের উপরের দিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। আইজি ছিলেন না। তিনজন ডিআইজি এবং দুজন এআইজি। এদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই বাঙালি। জেনারেল তাদের জন্যে দ্বিতীয় কেকটি কাটলেন। প্ৰথম দফায় তিনি যা যা করেছেন এবং বলেছেন তার সবই আবারো করলেন। কোনো কিছুই বাদ পড়ল না। কচ্ছের রানে বন্য শূকরী শিকারের গল্পটাও করলেন। এইবার অবশ্যি মরুভূমিতে বন্য শূকরী পাওয়া যায় কি যায় না–এই নিয়ে কেউ কোনো সন্দেহ প্ৰকাশ করল না। তারপরেও তিনি মৃত শূকরীর পাশে বর্শা হাতে তার দাঁড়িয়ে থাকার ছবি দেখালেন। বাঙালি পুলিশকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বক্তৃতা হলো অল্প।

কাজের কথা আমি সংক্ষেপে বলতে পছন্দ করি। আপনারা মন দিয়ে আমার কথা শুনুন। আমি বাঙালি পুলিশের কাছ থেকে ৯৫ ভাগ লায়েলটি আশা করছি। তারা পাঁচ ভাগ লয়েলটি তাদের বাঙালি ভাইদের জন্যে রাখুক। এই পাঁচ ভাগ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আপনাদের কাজে সাহায্য করার জন্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পুলিশ অফিসার আসছেন। প্যারামিলিশিয়া বাহিনীও আপনাদের সঙ্গে থাকবে। আপনাদের কিছু বলার আছে?

স্পেশাল ব্রাঞ্চের এআইজি বললেন, আমাদের কিছু বলার নেই স্যার।

জেনারেল বিরক্ত গলায় বললেন, সবার হয়ে আপনি কথা বলছেন কেন? আপনার কিছু বলার নেই, সেটা আপনি বলবেন। অন্যদেরও যে কিছু বলার নেই তা। আপনি জানেন কীভাবে?

এআইজির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জেনারেল টিক্কা বললেন, প্রত্যেকেই প্ৰত্যেকের কথা আলাদাভাবে বলবে।

সবাই জানালেন, তাদের বলার কিছু নেই।

জেনারেল বললেন, আপনাদের সঙ্গে আমার কথা শেষ হয়েছে। আপনারা যেতে পারেন। আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশ–আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনারা পুলিশের শাসন কাঠামো ঠিকঠাক করবেন। সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখছে–এই তথ্যটা আপনাদের জানিয়ে রাখলাম। আপনাদের প্রত্যেকের জন্যে একটা ফুট বাসকেট রাখা হয়েছে। দয়া করে নিয়ে যাবেন। Good day officers.

 

জেনারেল ডিনার করতে গেলেন। আমি অফিসার্স মেসে। তিনি সামরিক বাহিনীর উধৰ্ব্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিনার করবেন–এই খবর আগেই দেয়া ছিল। ডিনারের আয়োজন ব্যাপক। নৌ-বাহিনীর বাবুর্চি আব্দুল খালেককে এই উদ্দেশ্যেই আজকের রাতের খাবার তৈরির জন্যে কমিশন করা হয়েছে। জাফরান-মুরগি নামের একটি আইটেম রান্নার ব্যাপারে তার খ্যাতি প্রবাদের মতো। বিশেষ আইটেমটি রান্না হয়েছে। গরুর মাংসের কাবাব রান্নার জন্যে মিরপুর এলাকা থেকে এক বিহারিকে আনা হয়েছে। সে মেসের বাইরে আগুন করে কাবাব তৈরি করছে। যারা কাবাব খেতে ইচ্ছুক, তাদের প্লেট হাতে কাবাবওয়ালার কাছে আসতে হচ্ছে। কাবাবওয়ালা আগুনগরম কাবাব তাদের প্লেটে তুলে দিচ্ছে।

মেসের বাইরে খোলা মাঠেও কিছু চেয়ার-টেবিল রাখা হয়েছে। অনেকে সেখানেও বসেছেন।

উত্তম খাদ্যের সঙ্গে পানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান রেড ওয়াইন, রাশিয়ান ভদকা এবং ব্ল্যাক লেভেল হুইস্কি। কয়েক ধরনের বিয়ার আছে, তবে সবচেয়ে বেশি চলছে ভদকা। বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ কোনো একটা ড্রিংক ক্লিক করে। আজ ক্লিক করেছে ভদকা। সবাই দামি ব্ল্যাক লেভেল বাদ দিয়ে ভদকা টানছেন। শুধু জেনারেল টিক্কার হাতে রেড ওয়াইনের একটা গ্লাস। তিনি প্ৰথম গ্রাস রেডওয়াইন শেষ করেছেন। এখন আছেন। দ্বিতীয় গ্রাসের মাঝামাঝি। আবহাওয়া মনোরম। গুমোট গরমের পর ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হয়।

বৃষ্টির কথা মনে আসায় জেনারেলের ক্ৰ কুঞ্চিত হলো। বৃষ্টি ভালো জিনিস না। মনসুন এসে পড়ার অর্থ আমি চলাচলের সমস্যা। বিচিত্র এক দেশ–নদী, খাল,বিল, পানি। তিনি শুনেছেন সিলেটের দিকের বিশাল এক অঞ্চল নাকি বৃষ্টি নামলেই অতলে তলিয়ে যায়। যখন বাতাস বয়, তখন নাকি সেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ঢেউ ওঠে। এসব এলাকা কাজ করা সেনাবাহিনীর কর্ম না। নৌবাহিনীর ব্যাপার। জেনারেল এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে আবার গ্লাস ভর্তি করলেন। ওয়াইন খাবার নিয়ম এরকম না। ওয়াইন খেতে হয়। হালকা চুমুকে। ঠোট ভিজল কি ভিজল না–এই ভঙ্গিতে। ভদকা-হুইস্কি এসব হলো ঢোল, খোল-করতাল, আর ওয়াইন হলো কোমল বাঁশি।

ব্রিগেডিয়ার শামস হঠাৎ লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে ভদকার গ্লাস উঁচু করে বললেন, জেনারেলের জন্মদিন উপলক্ষে চিয়ার্স। যারা বসেছিল তারা উঠে দাঁড়াল। একের পর এক টেষ্ট হতে থাকল।

টেস্ট ফর পাকিস্তান।

টেস্ট ফর দ্য গ্রেট পিপল অব পাকিস্তান।

টেস্ট ফর দ্য লস্ট সোলজার্স।

আর্মি অফিসারদের পার্টি সাধারণত দ্রুত জমে যায়। এতকিছুর পরেও আজ পার্টি জমছে না। ক্যাটালিস্টের অভাবই কি এর মূল কারণ? আর্মি অফিসারদের রূপবতী বধুরা এইসব পার্টিতে থাকেন। তারাই ক্যাটালিষ্ট। তারা পার্টি জমাবার অনেক কায়দা জানেন। অনেক ঢং করতে পারেন। আজকের পার্টি নারী বিবর্জিত।

কর্নেল জামশেদকে সবাই ধরে বসল ম্যাজিক দেখানোর জন্যে। ম্যাজিকের কিছু কলাকৌশল সবসময় তাঁর পকেটে থাকে। কিছু মুদ্রা, দড়ি কাটার খেলা দেখানোর জন্যে দড়ি এবং কাঁচি, এক প্যাকেট তাস, পিংপং বল। দেখা গেল আজ তিনি কিছুই আনেন নি। একজনের কাছ থেকে এক টাকার একটা মুদ্রা নিয়ে তিনি কয়েন ভ্যানিসিং দেখালেন। হাতের মুঠোয় কয়েন রাখা হচ্ছে। মুঠো খুলতে দেখা যাচ্ছে কয়েন নেই। কয়েন রাখা হলো ডান হাতের মুঠোয়, পাওয়া গেল বাম হাতের মুঠোয়।

কর্নেল জামশেদের হাত সাফাইর খেলাও জমছে না। পার্টি শেষ করা উচিত। যে পার্টি জমে না, তাকে দীর্ঘসময় চলতে দিলে শেষে নানান সমস্যা হয়। জেনারেল টিক্কা পার্টির সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। ছোট্ট একটা সমাপনী ভাষণও দিলেন। এই ভাষণটি দিলেন উর্দুতে।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর অন্যতম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এই বাহিনী দেশরক্ষার যে পবিত্র কর্তব্য নিয়ে নেমেছে, সে-কর্তব্য তারা এমনভাবে পালন করবে। যে জাতির ইতিহাসে তা লেখা থাকবে। মুর্থ পূর্ব পাকিস্তানিদের আমরা বুদ্ধিমান বানিয়ে ছাড়ব। বুদ্ধিমান বানানোর এই প্রক্রিয়া এমনই কঠিন হবে যে কাঠিন্য সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি। যুদ্ধাবস্থায় দয়া, মায়া, করুণা নামক মানবিক গুণগুলি মাটির নিচে তিন হাত গর্ত কবে পুতে রাখতে হয়। আমরা সাত হাত গর্ত করে পুতে রাখব। মানবিক গুণাবলি মানুষদের জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানিদের মতো সুবিধাবাদী, হিন্দুর পাছা চাটা বাহেনচোদদের জন্যে না।

আমি ডেজার্ট ফক্স টেংক সেনাপতি রোমেলের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এবং আপনাদের সবাইকে আগাম অভিনন্দন জানিয়ে বক্তৃতা শেষ করছি। জেনারেল রোমেল মিশর এক্সপিডিসনের সময় বলেছেন–তুমি যখন শক্রকে দয়া দেখাবে, তখন বুঝবে তুমি সৈনিক নও। তুমি শক্রর বুকের উপর বেয়োনেট উঁচু করে ধরেছ। হঠাৎ শত্রুর করুণ মুখ দেখে তোমার মায়া হলো। তুমি দ্বিধাগ্ৰস্ত হয়ে বেয়োনেট নামিয়ে নিলে। শত্রু তখন তোমার করণীয় কাজটি নিজে সুন্দরভাবে সমাধা করবে। তার বেয়োনেট তোমার হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দেবে।

জেনারেল আর্মি মেস থেকে ফিরেছেন। ড্রাইভারকে সরিয়ে তিনি নিজেই স্টিয়ারিং হুইল ধরলেন। চমৎকার লাগছে গাড়ি চালাতে। ঢাকা শহর স্বাভাবিক হয়ে আসছে। ভালো, খুব ভালো। পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টিভিতে এই স্বাভাবিকতার খবর পৌঁছে দিতে হবে। বিদেশী সাংবাদিকদের ডাকা হবে। তারা দেখবে একটি পরিচ্ছন্ন নগরী।

ঢাকার খবরের কাগজগুলি দুপৃষ্ঠা করে বের হচ্ছে। এটা কাজের কথা না। পত্রিকা বের হবে পত্রিকার মতো। মেজর সিদিক সালেককে বলতে হবে। এই দায়িত্ব ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স অফিসারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *