গলা ব্যথার জন্যে ওষুধ কিনতে গিয়েছি, দেখি ওষুধের দোকানে রফিকের ছোট ভাই। এ্যাসপিরিন কিনছে। আমাকে দেখে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমি অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে বললাম,  এই যে, কী ব্যাপার?

সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। যেন আমাকে ঠিক চিনতে পারছে না। আমি হাসি-হাসি মুখে বললাম, তারপর, সব খবর ভালো তো? হানিমুন কোথায় করলে?

সে তার উত্তর দিল না। এ্যাসপিরিনের দাম দিয়ে লম্বা মুখ করে বেরিয়ে গেল।

এই ছেলেটিকে আমি দু চোখে দেখতে পারি না। তবু রাস্তায় দেখা হলে কথা বলি। সে-ই সবজান্তার ভঙ্গিতে দু একটা জ্ঞানগর্ভ কথা বলেই গম্ভীর হয়ে থাকে। কিন্তু আজকে এ-রকম করল কেন? ছেলেটির সঙ্গে আমার মোটামুটি খাতির আছে। আমার নিজের ধারণা, আমি বোকা সেজে থাকি বলে ছেলেটা আমাকে খানিকটা পছন্দও করে। আমি ওষুধ কিনে বাড়ি না ফিরে চলে গেলাম রফিকের ওখানে। রফিক বাসায় ছিল না। তাঁর ছোট ভাই বেরিয়ে এসে পাথরের মতো মুখ করে বলল, আমাদের টেলিফোন নষ্ট।

টেলিফোন করতে আসি নি, রফিকের সঙ্গে কথা ছিল।

দাদা তো সন্ধ্যার আগে আসবে না।

রফিক এসে পড়ল মিনিট দশোকের মধ্যেই। কোনো কাজে এসেছিস? না, দেখা করতে আসলাম। কাদের ছাড়া পেয়েছে, জনিস নাকি?

জানব না কেন, তুই-ই তো টেলিফোন করেলি। আছে কেমন এখন?

ভালোই আছে। তোদের খবর কী?

রফিক মুখ কালো করে বলল, তুই জানিস না কিছু?

না। কী জানব?

সারা ঢাকার লোক জানে, আর তুই জনিস না! আয় আমার সাথে, চায়ের দোকানটাতে গিয়ে বসি। সিগারেট আছে?

চায়ের দোকানে রফিক খুব গম্ভীর হয়ে বসে রইল। আমি বললাম, বল কী হয়েছে?

আমার ছোট ভাই ফিরোজ, সে এখন আর তার বৌকে দেখতে পারে না। মেয়েটা থাকে বাপের বাড়ি। সে যায় না। ওখানে। খুবই অশান্তি।

কারণটা কী?

কোনোই কারণ নেই। একটা গুজব উঠেছে বুঝলি–দু-এক জন লোক বলাবলি করছে মেয়েটাকে নাকি এক বার মিলিটারিরা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দু রাত নাকি রেখেছিল।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

গুজব ছাড়া আর কিছুই না। এই সিগারেটের আগুন হাতে নিয়ে বলছি। কিন্তু ফিরোজের ধারণা এইটা গুজব না। ঐটা তো আসলে একটা গরু, চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে চিলের পিছে দৌড়ায়।

রফিক আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে নিচু গলায় বলল, ফিরোজকে দোষ দিয়ে কী হবে বল! আমার মায়েরও সেই রকম ধারণা। মা ঐদিন বলছিলেন-কোনো দোষ না থাকলে এই রকম একটা সুন্দরী মেয়েকে ফিরোজের কাছে বিয়ে দেয় কেন? ফিরোজের আছে কী?

রফিক আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিল। আমি বললাম, আর চা নিস না। দুপুরবেলা গাদাখানিক চা খাওয়-ঠিক না।

রফিক বলল, কাউকে বলিস না, তোকে একটা কথা বলছি।–আমি ঠিক করেছি। মুক্তিবাহিনীতে চলে যাব। আমার জীবনের কোনো দাম আছে নাকি? বেঁচে থাকলেই কি আর মরলেই কি! আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

মুক্তিবাহিনীতে যাবি কীভাবে?

প্রথম মেঘালয়ে যাব। সেখানে গেলেই ব্যবস্থা হবে। সোর্স পাওয়া গেছে।

কবে যাবি?

দু-এক দিনের মধ্যে যাব।

কাউকে বলেছিস বাড়িতে? বাবাকে বলেছি। চাচা কী বলেন?

কী বলেন, শুনে লাভ নেই। দে, আরেকটা সিগারেট দে।

উঠে আসবার সময় রফিক ইতস্তত করে বলল, এবণ্টা কথা শফিক, আমার ভাইয়ের ব্যাপারটা একটু গোপন রাখিস। বড়ো লজ্জার ব্যাপার হয়েছে রে ভাই। সে অবিষ্কার গত সোমবার নয়টা ফেনোবারবিটল খেয়েছে। চিন্তা করে দেখ।

কে খেয়েছে?

ফিরোজ, আর কে? কী লজ্জা ভেবে দেখ। ঈমাক ওয়াশ টোয়াশ করাতে হয়েছে।

ঘরে ফিরে দেখি বাচ্চ ভাই দরবেশের দোকানের সেই ছেলেটা (বাদশা মিয়া) এসে বসে আছে! কাদের বাচ্চ ভাই দরবেশের কোনো খবর পেয়েছে কিনা তাই জানতে এসেছে। কাদের গম্ভীর হয়ে বলছে, বাঁইচা আছে। এই খবর পাইছি।

কে কইছে?

ইজাবুদ্দিন সাব।

এইটা কেমুন কথা কাদের ভাই! ইজাবুদ্দিন সাব তো কইছে উল্টা কথা।

আমি কি তার সাথে মিছা কইছি?

না, তুমি মিছা কইবা ক্যান।

দরবেশ সাবের পরিবাররে কইছ।১,ন্তর কোনো কারণ নাই।

দেখা করনের কোনো উপায় আছে কাদের ভাই?

দেখা করনের চিন্তা বাদ দে বাদশা। বাইচা আছে–এইটাই বড়ো কথা। কয় জন বাঁচে কি দেখি?

তা ঠিক।

বাদশা মিয়া ছেলেটি খুব কাজের, সে একাই বাচ্চু ভাই দরবেশের দোকান চালু করে দিয়েছে। আগের মতো বিক্রি নেই, তবু বাজার খরচ উঠে যায়। বাচ্চু ভাইয়ের পরিবারকে পথে বসতে হয় নি।

এক দিন গেলাম তার ওখানে চা খেতে। লোকজন নেই, খালিদোকান সাজিয়ে বাদশা মিয়া বসে আছে।

কি রে, লোকজন তো কিছু নেই।

চা তুই একাই বানাস, না অন্য কেউ আছে?

জ্বি-না, আমি একলাই আছি, অন্য কেউ নাই।

কিছুতেই তাকে চায়ের দাম দেওয়া গেল না। চোখ কপালে তুলে বলল, আপনার কাছ থাইক্যা দাম নেই ক্যামনে? কন কী স্যার!

আমার প্রতি তার এই প্রগাঢ় ভক্তির কারণ কী, কে জানে?

বাড়িতে ফিরে এসে দেখি আজিজ সাহেবের কাছ থেকে লম্বা একটি চিঠি এসেছে। চিঠিটি লিখে দিয়েছে নীলু। দুটি খবর জানা গেল সে-চিঠিতে। আজিজ সাহেব তাঁর মেয়েদের জন্যে বিয়ে ঠিক করেছেন। বিলুর বিয়ে হচ্ছে যে-ছেলেটির সঙ্গে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিফথ ইয়ারে পড়ে; দেখতে ভালো, বংশও ভালো। ছেলের বাবা স্কুলের হেডমাস্টার। আজিজ সাহেব লিখেছেন।–বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। সমগ্র চিঠিতে নীলুর বিয়ে কোথায় হচ্ছে, কার সঙ্গে হচ্ছে, কিছুই লেখা নেই। নেজাম সাহেবের কথাও নেই। সেটিও বেশ রহস্যময়।

চিঠির সঙ্গে বিলুর একটি চিরকুটও আছে। আমি অসংখ্য বার পড়লাম সেটি।

শফিক ভাই
মাতিন ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। আপনাকে দেবার জন্যে। লিখেছিলাম এক মাসের মধ্যে অবশ্যি যেন তার জবাব দেন। আপনি দেন নি। এমন কেন আপনি?
বিলু।

মতিন সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, বিলুকি যাবার আগে আপনাকে কোনো চিঠি দিয়েছিল?

মতিন সাহেব অনেক ভেবেচিন্তে বললেন, হ্যাঁ, আপনাকে দিতে বলেছিল। খুব নাকি জরুরী।

কোথায় সে-চিঠি?

মতিন সাহেব চোখ কপালে তুলে বললেন, আমি কী করে বলব কোথায়?

সে চিঠি আর কোথাও পাওয়া গেল না।

Share This