০৯. খাটের নিচে মিউ-মিউ শব্দ

খাটের নিচে মিউ-মিউ শব্দ হচ্ছে। রাতে কামালের ঘুম সচরাচর ভাঙে না। আজ মিউ-মিউ শুনে ঘুম ভাঙল। বিড়াল নিৰ্ঘাত বাচ্চা দিয়ে দিয়েছে। শালি তা হলে খালাস হয়েছে। কামাল খাট থেকে নেমে বাতি জ্বালালউঁচু সুরে ডাকল, মিনু ও মিনু। কেউ সাড়া দিল না। কারণ মিনু বাড়িতে নেই। আজ সন্ধ্যায় তাকে কামাল নিজেই তার খালার বাড়িতে রেখে এসেছে।

ও মিনু।

কামাল খাটের নিচে উকি দিল। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। দেয়াশলাই কাঠি জ্বালাতেই বিড়ালের জ্বলজ্বলে চোখ নজরে এল।

ঐ বেটি, এবার কটা?

বিড়াল বিরক্ত স্বরে মিউ করল। রাতদুপুরে এই জ্বালাতন আর সহ্য হচ্ছে না।

কামাল বলল, সর না একটু দেখি। দেখি বাচ্চাগুলোকে।

বিড়াল কি মানুষের কথা বুঝতে পারে? সে সত্যি-সত্যি সরে দাঁড়াল। ইদুরের মতো চারটা ক্ষুদে-ক্ষুদে বাচ্চা। চারটাই ধবধবে সাদা। চোখ ফোটে নি।

কামাল ওয়াদ্রবের ওপর থেকে টর্চ লাইট নিয়ে এসে ধরল। কি সুন্দরই না লাগছে। বাচ্চাগুলোকে। এখন চোখ ফোটে নি। এক জন গড়িয়ে অন্য জনের গায়ে পড়ে যাচ্ছে। মা বিড়ালটা তখন বিরক্ত মুখে মিউ করছে।

কামাল আবার ডাকল, সোমা ও সোমা। তখন মনে পড়ল সোমা নেই। মনটা একটু খারাপ হল। আনন্দের জিনিস একা-একা ভোগ করা যায় না। কাউকে পাশে লাগে। কামাল পিরিচে দুধ ঢেলে এগিয়ে দিল। দরাজ গলায় বলল, খা বেটি, বেশি করে খা। বিড়ালটা যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় পিরিচের দুধে জিভ ভেজাল। মানুষটা এত করে বলছে না খেলে ভালো দেখায় না এরকম একটা ভাব।

কামাল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাত বেশি বাকি নেই। আবার ঘুমুতে যাবার মানে হয় না। ভরে উঠে মানিকগঞ্জ যেতে হবে। একটা পার্টি পাওয়া গেছে। খোঁজ এনেছে। মোশতাক আলি। মোশতাক আলি লোকটা বদের হাড়ি, অন্য কোনো মতলব আছে কি-না বোঝা যাচ্ছে না। মতলব থাকা বিচিত্র নয়। মানিকগঞ্জে যাওয়াটা ঠিক হবে কি-না কে জানে। কামাল বারান্দায় চেয়ারে এসে বসল। তার সামনেই ফুলের টবে-টবে বগনভিলিয়া। লাল-লাল পাতা ছেড়েছে। রাতে অবশ্যি কেমন কালচে দেখায়, কিন্তু দিনে অপূর্ব লাগে। টব দুটো সোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া দরকার। দুটো কেন, সবগুলোই পাঠিয়ে দিলে হয়। বেচারির শখের জিনিস। একটা ঠেলাগাড়ি ডেকে ঠিকানা দিয়ে দিলেই হয়। ঘর তো এমনিতেই খালি করতে হবে। একা মানুষ, এরকম বাড়ি নিয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। সব বিক্রি-টিক্রি করে একটা হোটেলে গিয়ে উঠলেই হয়। এতে কাজকর্মের সুবিধা। চট করে হোটেল বদল করা যায়। বাড়ি তো আর চট করে বদল করা যায় না। চিঠিপত্রের জন্যে সে অবশ্যি জি পি ও পোস্টবক্স ব্যবহার করে। পোস্ট অফিসের এই ব্যবস্থাটা ভালো।

কামাল নিজেই চা বানিয়ে আনল। বানাতে বানাতে চা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মেয়েরা চা বানালে এত দীর্ঘ সময় গরম থাকে কি করে কে জানে।

ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দিতে দিতে কামাল ভাবতে লাগল মানিকগঞ্জে যাওয়াটা ঠিক হবে কি ঠিক হবে না। মানিকগঞ্জ না গেলে অনেকগুলো কাজ শেষ করা যায়। আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ অনেক দিন নেওয়া হয় না। খোঁজ নেওয়া দরকার। ঢাকায় তার আত্মীয় আছে তিন জন। তার বড় বোন, ভাবি এবং ছোট মামা। আরেক বোন আছে বগুড়ায়। এদের সবাইকেই সে মাসে-মাসে নিয়মিত টাকা দেয়। কামালের টাকাটা তাদের খুবই দরকার। ছোট মামা তাদের দুই ভাই এবং দুই বোনকে নানান দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও নিজের কাছে রেখেছেন। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন বিপাকে পড়েছেন। ছেলেপুলে সব কটা অপদার্থ হয়েছে। ছোট মামাকে টাকা না দিয়ে সাহায্য করলে বিরাট অধর্ম হবে। আর বড় ভাবি, কামাল টাকা না পাঠালে না খেয়ে থাকবেন। চারটা বাচ্চা নিয়ে বিধবা হয়েছেন, এখন আছেন তার বনের বাসায়। বোন এবং বোনের জামাই যে তাদের বের করে দিচ্ছে না তার কারণ কামালের পাঠানো টাকা। কামাল ভালো করেই জানে যেদিন সে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে সেদিনই তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সোজা হিসাব। বোন দুজনের মধ্যে বগুড়ায় যে আছে তার অবস্থা ভালো। তবু তাকে মাঝে-মাঝে টাকা পাঠাতে হয়। বগুড়ার বোন হচ্ছে। সবচেয়ে ছোট। বড় ভাইয়ের একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। তা ছাড়া সবাই যখন পাচ্ছে, সেই বেচারি একা বাদ যাবে কেন?

শেষ পর্যন্ত মানিকগঞ্জ যাবার পরিকল্পনা সে বাদ দিল। খবরের কাগজের কাজটা সেরে ফেলা যাক। শুধু-শুধু দেরি হচ্ছে।

দুটি দৈনিকে সে বিজ্ঞাপন দিল। সব জিনিসের দাম বাড়ছে, সামান্য কয়েকটা শব্দের বিজ্ঞাপনে সাত শ আঠার টাকা বের হয়ে গেল। বিজ্ঞাপনটা এরকম।

জমি বিক্রয়

ঢাকার অদূরে ১১ কাঠার একটি প্লট জরুরি ভিত্তিতে বিক্রয় হইবে। উঁচু জমি। এই মুহূর্তে বাড়ি করা যাইবে, তবে জমিতে ব্যাংক-সংক্রান্ত লোনের জটিলতা আছে। যোগাযোগ করুন

সালামত শেখ, জিপিও বক্স নং-৬১৩

বিজ্ঞাপনের মূল আকর্ষণ হচ্ছে সামান্য জটিলতা। সামান্য জটিলতার লোভ লোকজন যোগাযোগ করবে। এদের মাঝখান থেকে এক জনের মাথায় কাঁঠাল ভাঙা হবে। দেশটা ভর্তি বুদ্ধিমান গাধায়। কাঁঠাল ভাঙা হবে ওদেরই কারোর মাথায়।

আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা কামাল বাতিল করে দিল। ইচ্ছা করছে না। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক কম থাকাই ভালো। সম্পর্ক কম থাকলেই টান থাকবে। সবসময় গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে রাখলে টান থাকে না। এটা হচ্ছে। জগতের নিয়ম। ছোট মামার কাছে অবশ্যি তার যেতে ইচ্ছা করছে। তবে নানান কারণেই যাওয়াটা ঠিক হবে না। বয়স বাড়ায় ছোট মামার প্যাচালপাড়া স্বভাব হয়েছে। সব জিনিস নিয়ে প্যাচাল পাড়বে। সোমা চলে গেল কেন এই প্রসঙ্গ উঠলে প্যাচাল পাড়তে পাড়তে মাথা ধরিয়ে দেবে।

চলে গেল কেন? তুই কি করেছিলি?

আগের বৌটাও তো চলে গেল।

বাচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলে তো এরকম হত না।

তোর বাচ্চা হয় না কেন? অসুবিধাটা কি? এক জন ডাক্তার দেখা। পীর-ফকিরের কাছে যা।

এক লক্ষ কথা বলবে। কথা আর উপদেশ। নিজের ছেলেকে উপদেশ দিয়ে কিছু করতে পারল না আর সে হল গিয়ে ভাগ্নে। বুড়ো হয়ে গেলে সত্যি-সত্যি ভীমরতি হয়। খালি উপদেশ দিতে ইচ্ছা করে। মামাকে এইবার বলতে হবে- মামা, উপদেশ খাতায় লিখে আমাকে দিয়ে দিও। অবসর সময়ে পড়ব। মুখে প্ৰত্যেক বার বল—কষ্ট হয়।

কামাল দুপুরে দুটা খবরের কাগজ কিনে হোটেলে খেতে গেল। খবরের কাগজে মাঝে-মাঝে বেশ ইন্টারেস্টিং কেইস পাওয়া যায়। আজকের কাগজে তেমন কিছু ছিল না, তবে এক জন বিজ্ঞাপন দিয়েছে সেকেন্ডহ্যান্ড মিউজিক সেন্টার কিংবা ক্যাসেট ডেক কিনতে চায়। টেলিফোন নাম্বার দেওয়া আছে—এই ব্যাটাকে একটু খেলিয়ে দেখা যেতে পারে।

কামাল বিকালে টেলিফোন করল।

ভাই আপনার বিজ্ঞাপনটা দেখলাম। ক্যাসেট ডেক একটা আমার কাছে আছে।

ওপাশ থেকে আগ্রহের সুর শোনা গেল।

কোন কোম্পানি সেটা তো ভাই বলতে পারব না। প্যাকেট খোলা হয় নি। ব্রান্ড নিউ জিনিস।

তা হলে তো হবে না, আমি চাচ্ছিলাম সেকেন্ডহ্যান্ড যাতে কি-না কম দামে,ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা দেওয়া তো সম্ভব না। তাহলে তো দোকান থেকেই কিনতাম। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেব কেন?

সেকেন্ডহ্যান্ডের কমে পাবেন—চোরাই মাল।

চোরাই মাল মানে?

স্মাগলড করা জিনিস।

ও, আই সি।

দশ হাজারে দিয়ে দিতে পারি, জিনিসটা নিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। আমার টাকার দরকার।

কোন কোম্পানির?

বললাম তো ভাই আমি জানি না।

আমি কি এসে দেখতে পারি?

আপনার আসার দরকার নাই। আমি বাসায় এসে আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে যাব।

তা হলে তো খুবই ভালো হয়। এখন আনতে পারবেন?

এখন পারব না। পরশু দিন নিয়ে আসব। আপনার অ্যাড্রেসটা বলেন।

কামাল অ্যাড্রেস লিখে নিল। এই পার্টিকে শেষ পর্যন্ত ধরা হবে কি-না এটা পরে ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে। এক দিন সময় আছে, তাড়া নেই। কামাল হোটেল দেখতে বের হল। সস্তার মধ্যে ভালো হোহাটেল। এত দিন বাড়িতে থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে। হোটেল খুঁজতে যেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু উপায় কি? মানুষের ইচ্ছার উপর তো আর দুনিয়া চলে না। দুনিয়া চলে তার নিজের নিয়মে।

চোখ জ্বালা করছে। এই আরেক যন্ত্রণা হল চোখ নিয়ে। ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছা করে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *