০৬. নুরুজ্জামান মুগ্ধ চোখে চিড়িয়াখানা

নুরুজ্জামান মুগ্ধ চোখে চিড়িয়াখানার জলাধারের পাশে দাঁড়িয়ে। জলহস্তী পরিবারের কাণ্ডকারখানায় সে মুগ্ধ ও বিস্মিত। কিছুক্ষণ পর পর সে বলছে, কি আজিব জানোয়ার। তার ইচ্ছা করছে কলা বা বাদাম কিনে এদের খাওয়ায়। বাইরে সাইনবোর্ড ঝুলছে–চিড়িয়াখানার পশুদের কিছু খাওয়াবেন না। নোটিশ না থাকলে সে অবশ্যই কলা বা এই জাতীয় কিছু কিনে খাওয়াতো। এরা ফল-মূল খায় কিনা কে জানে। পানির জানোয়ার, মাছ খাওয়ারই কথা। তবে পানির জানোয়ার হলেও শুকনাতেও এরা অনেকক্ষণ থাকে। কাজেই সুলভূমির খাবার খেতেও পারে। কাকে জিজ্ঞেস করা যায়? চিড়িয়াখানার লোকজন নিশ্চয়ই জানবেন। নুরুজ্জামান চিড়িয়াখানার লোকজনদের খোঁজে বের করত। তার হাতে সময় বেশি নেই। সন্ধ্যা ৭ টায় মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট হয়েছে। পি. এ সাহেবের স্ত্রী ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কথা ছিল–এপায়েন্টমেন্ট হয়ে গেলে পি, এ সাহেব টেলিফোন করে জানাবেন। তা জানান নি। টেলিফোন নাম্বার হারিয়ে ফেলেছিলেন। নুরুজ্জামান আবার খোঁজ নিতে গিয়ে ব্যাপারটা জানল। ভাগ্যিস খোঁজ নিতে গিয়েছিল! মিনিস্টার সাহেবের আবার জাপান চলে যাবার কথা।

জলহস্তী কি খায় এই তথ্য নুরুজ্জামান বের করতে পারছে না। এই পর্যন্ত দুজনকে জিজ্ঞেস করল। প্রথমজন তাকে রীতিমত অপমানই করল। সে বলল, জলহস্তী কি খায় তা দিয়ে আপনার কি দরকার? আপনি কি জলহস্তী?

দ্বিতীয়জন এ জাতীয় অপমান করল না। সে বলল, জানি না। সে বালতিতে করে কুচি কুচি করে কাটা লাউ নিয়ে যাচ্ছে। কাকে খাওয়াবে কে জানে? লাউ কে খায়?

নুরুজ্জামান ঠিক করল আরেকদিন এসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকবে। এর মধ্যে একসময় না একসময় জলহস্তীকে খাবার দেবেই। তখন দেখে নিলেই হবে। আজ থাকা যাবে না। মিনিস্টার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এক্ষুণি রওনা দেয়া দরকার।

শিক্ষামন্ত্রী চৌধুরী নবী নেয়াজ খান বিরক্ত মুখে বসে আছেন। তাঁর আলসার আছে। বিকেলের পর থেকে আলসারের ব্যথাটা জানান দেয়। ব্যথা তেমন তীব্র নয়, তবে অস্বস্তিকর। বিকেল থেকে আলসারের ব্যথার থেকেও তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সেটা হল দর্শনার্থীর যন্ত্রণা। দেশটার কি হয়েছে কে জানে? অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আজকাল লোকজন মন্ত্রীর কাছে চলে আসে।

গতকাল একজন এসেছিল–তার টেলিফোনে বিল বেশি হচ্ছে। বিল বেশি হচ্ছে তো তিনি কি করবেন? তিনি টেলিফোনের মন্ত্রী না। তার হল শিক্ষা দপ্তর। শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে তার কাছে আসা যায়। তাও ছোটখাট কিছু নিয়ে না। বড় কিছু–তা আসবে না। তুচ্ছ সব ব্যাপার নিয়ে আসবে–সময় নষ্ট করবে। গত সপ্তাহে একজন আসল ক্লাস ফোরের ধর্ম বইয়ে ভুল আছে এই খবর নিয়ে। একা আসে নি। সঙ্গে বিরাট দল। তুমুল হৈ-চৈ।

স্যার বলুন, আপনি বলুন, আরবিতে কি ভ আছে?

তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মনে করতে পারলেন না আরবীতে ভ আছে কি না। মনে মনে আলিফ বে তে ছে পড়তে লাগলেন–

স্যার আপনি বলুন–আছে ভ?

তিনি অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, মূল ব্যাপারটা বলুন।

সূরা নাস-এর বাঙলা উচ্চারণ লিখেছে–মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খাসিল লাযি ইউয়াসভিসু ফী সুদূরিন্নাস। দেখুন অবস্থা–ইউয়াসভিসু। লেখা উচিত ইউয়াসফি। ফয়ের জায়গায় হয়েছে ভ।

তিনি বললেন, হুঁ।

জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে স্যার। ছাত্ররা খোদার পাক কালাম ভুল শিখবে–?

তিনি আবারও বললেন, হুঁ।

আপনি স্যার এই বই নিষিদ্ধ করুন। নতুন করে বই ছাপা হবে, তারপর ছাত্ররা পড়বে।

ছোটখাট ভুল তো থাকতেই পারে। শিক্ষকরা সেগুলি শুধরে দেবেন।

আপনি কি বলছেন স্যার! খোদার পাক কালামে ভুল থাকবে? এটা কি স্যার বিবেচনার কথা হল?…

প্রতিদিন এরকম কিছু সমস্যা নিয়ে তাকে সময় নষ্ট করতে হয়। আর শুনতে হয় তদবির। কত ধরনের তদবির নিয়ে লোকজন যে আসে তা আল্লাহ জানেন এবং তিনিই জানেন।

স্থানীয় দারোগা ঘুষ খাচ্ছে। তাকে বদলি করতে হবে।

সেই একই দারোগা অত্যন্ত সৎ। তাকে এখানেই রাখতে হবে।

এজি অফিসে টিএ বিল অটিকে রেখেছে। বিল পাশ করতে হবে।

অমুক ছেলে সন্ত্রাসী মামলায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। অতি ভাল ছেলে। পঁচ ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে। শেষ রাতে ফজরের নামাজ পড়তে বের হয়েছিল, টহল পুলিশ ধরে ফেলেছে। লম্বা চুল দেখে সন্দেহ করেছে। আশেপাশের লোকজনের শত্রুতাও আছে। তারাও তাল দিয়েছে। কিন্তু ছেলে সরকার পার্টি করে। আপনি স্যার এক্ষুণি আই, জি, সাহেবকে টেলিফোন করুন। আপনি না বললে আমাদের অন্য সোর্স ধরতে হবে।

চৌধুরী সাহেব সন্ধ্যা থেকে রাত নটা পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দেন-দরবার শুনেন। সন্ধ্যা থেকে তাঁর মাথাধরা শুরু হয়। রাত নটায় সেই ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠে। তিনি এক সঙ্গে দুটা প্যারাসিটামল এবং একটা সিডাকসিন খেয়ে বাতি নিভিয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকেন। মাথাব্যথা খানিকটা কমলে এশার নামাজ পড়েন। চার রাকাত নামাজ, তাতেই গণ্ডগোল হয়ে যায়। কত রাকাত পড়েছেন তার হিসাব থাকে না। তাঁর ধারণা, প্রতিবারই চার রাকাতের জায়গায় তিনি হয় তিন রাকাত কিংবা পঁচ রাকাত পড়েন। একবার অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন, তিনি রুকুতে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতিহা বাদ দিয়ে আত্তাহিয়াতু পড়েছেন। মাখা-খারাপের লক্ষণ ছাড়া আর কি?

আজ সন্ধ্যা থেকেই তার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। তিনি পি, এ.-কে বললেন, আজ আর কাউকে পাঠিও না। শরীর খারাপ।

কাউকেই না?

আচ্ছা পাঠাও। এতক্ষণ ধরে বসে আছে।

আপনি স্যার শুধু শুনে যান। আমিও বলে দেব যেন বেশিক্ষণ আপনাকে বিরক্ত না করে।

রাত আটটার পর আর কাউকে পাঠাবে না।

জি আচ্ছা স্যার।

নুরুজ্জামান মন্ত্রীর ঘরে-ঢুকল রাত ঠিক আটটায়। ঢুকেই সে বলল, স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ?

চৌধুরী সাহেব দর্শনপ্রার্থীর মধ্যে এই প্রথম এ-জাতীয় কথা শুনলেন। অন্যরা ঘরে ঢুকেই তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করে। সময় নষ্ট করতে চায় না।

চৌধুরী সাহেব বললেন, আপনি বসুন।

নুরুজ্জামান বলল, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার শরীরটা খুবই খারাপ। স্যার, আমি আরেকদিন আসব।

শরীর এমন কিছু খারাপ না। বসুন।

নুরুজ্জামান বলল, আপনার ঘরে খুব ভয়ে ভয়ে ঢুকেছিলাম। মন্ত্রীর ঘর। মন্ত্রীদের আগে শুধু দূর থেকে দেখেছি।

ভয় কেটেছে?

জি স্যার, কেটেছে।

চৌধুরী সাহেব বেল টিপে দুকাপ চা দিতে বললেন। নুরুজ্জামান বলল, স্যার, আমি চা খাই না। গ্রামাঞ্চলে থাকি। চায়ের অভ্যাস হয় নাই।

অভ্যাস না হলেও খান। মন্ত্রীর ঘরের চা খেয়ে দেখুন কেমন লাগে। দেশে ফিরে গল্প করতে পারবেন। বলতে পারবেন, মন্ত্রী সাহেব আমাকে খুব খাতির করেছেন। নিজের হাতে চা বানিয়ে খাইয়েছেন।

জি আচ্ছা স্যার, চা খাব।

চৌধুরী সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবেগশূন্য গলায় বললেন, এখন বলুন দেখি কি তদবির নিয়ে এসেছেন।

একটা স্কুলের ব্যাপারে এসেছি স্যার। আমি একটা গার্লস স্কুল দিয়েছি। নাম দিয়েছি বেগম রোকেয়া গার্লস হাইস্কুল। পায়রাবন্দের বেগম রোকেয়া।

ব্যাখ্যা লাগবে না। বেগম রোকেয়ার নাম আমি জানি। শিক্ষামন্ত্রী মানেই যে মূর্খ হতে হবে এমনতো কথা নেই।

আগে নাম ছিল মমিনুন্নেছা গার্লস হাইস্কুল। মমিনুন্নেছা আমার ফুপুর নাম। তারপর শেষ রাতে একটা স্বপ্ন দেখে নামটা বদলে দিলাম।

স্বপ্নে দেখলেন বেগম রোকেয়া আপনাকে বলছেন–তার নামে স্কুলের নাম রাখতে?

জি না। ব্যাপারটা কি আপনাকে বলব?

বলুন। যতক্ষণ আমি চা খাব ততক্ষণই বলবেন। চা শেষ হওয়া মাত্র আপনার ইতিহাস বর্ণনা বন্ধ করবেন এবং চলে যাবেন। পারবেন না?

পারব স্যার। আমার ফুপু মমিনুন্নেছা খুব দুঃখী মহিলা স্যার। বিয়ের দু বছরের মধ্যে স্বামী মারা গিয়েছিল। তাঁর তখন দুটা জমজ সন্তান–একটা ছেলে একটা মেয়ে। মেয়েটার নাম সাবেরা, ছেলেটার নাম …

নামের দরকার নেই। বলে যান। নাম বলতে গিয়ে সময় নষ্ট করছেন। আমার চা প্রায় শেষ হয়ে আসছে।

জমজ বাচ্চা দুটাকে নিয়ে স্বামীর সংসারে পড়ে রইলেন। কোথাও গেলেন না। বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিয়েও করলেন না। বাচ্চা দুটার বয়স যখন সাত বৎসর তখন দুজন একসঙ্গে পানিতে ড়ুবে মারা গেল। ভাইটা পানিতে পড়ে গিয়েছিল, তাকে বাঁচাতে গিয়ে বোনটাও মারা গেল।

বলেন কি?

তারপরেও ফুপু দীর্ঘদিন বেঁচে গেলেন। মারা গেলেন গত বৎসর শ্রাবণ মাসে। মরার সময় তার সব জমি জমা আমার নামে লিখে দিয়ে গেলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমি ভাবলাম, ফুপু খুব কষ্ট নিয়ে পৃথিবী থেকে গেছেন। তার জন্য যদি ভাল কিছু করতে পারি তাহলে তার আত্মা শান্তি পাবে। তখন তাঁর সবটা জমি আমি স্কুলের জন্যে দিয়ে দিলাম। স্কুলের নাম দিলাম ফুপুর নামে। তারপর স্বপ্ন দেখলাম।

কি স্বপ্ন দেখলেন?

স্যার দেখলাম, ফুপু খুব সুন্দর ঝকমকা শাড়ি পরা। কপালে টিপ। গা ভর্তি গয়না। গয়নার ভেতর লাল, নীল, সবুজ কত রকম পাথর। পান খেয়ে ফুপুর ঠোঁট টকটকে লাল। ফুপু বললেন, ওরে নুরু, দেখ, কি সুন্দর সুন্দর গয়না আমার গায়।

আমি বললাম, ফুপু, আপনি মনে হয় খুব সুখে আছেন?

ফুপু বললেন, হারে বোকা, খুব সুখে আছি। স্বামী-সন্তান সব সঙ্গে এছে। তবে ছেলেটা বড় দুষ্টুমি করে। সারাদিন আছে খেলার মধ্যে। একে নিয়ে আমি চিন্তায় অস্থির। শাসনও করতে পারি না। শাসন করতে গেলেই তোর ফুপা ছুটে এসে বলে–কর কি, কর কি! আর আমার মেয়েও হয়েছে ভাই-সোহাগী। তার ভাইকে কিছু বললেই তার মুখ ভার। বড় যন্ত্রণায় আছি রে নুরু { বলেই ফুপু অনন্দে হাসতে লাগলেন। আমি বললাম, আপনার আনন্দ দেখে ভাল লাগছে ফুপু।

ফুপু বললেন, তুই গরীব মানুষ, তোকে বিষয় সম্পত্তি দিয়ে এসেছিলাম। তুই তো স্কুল করে বসে আছিস।

আমি বললাম, আপনার কি এটা পছন্দ না ফুপু?

ফুপু বললেন, অবশ্যই পছন্দ। তবে তুই আমার নাম দিয়েছিস, এটাতে খুব লজ্জায় পড়েছি। নামটা বদলে দে।

জ্বি আচ্ছা, দেব।

ফুপু তখন বললেন, কাছে আয় তো গাধা, তোর মাথায় হাত রেখে আমি একটু দোয়া করি।

আমি ফুপুর কাছে যাবার চেষ্টা করলাম, তখনই ঘুম ভেঙে গেল।

চৌধুরী সাহেবের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। তিনি স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। তিনি দেখলেন, তার সামনে বসে থাকা বোকাসোকা ধরনের মানুষটির চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সে চোখের পানি মুছার জন্যে পকেট থেকে রুমাল বের করতেই রুমালের সঙ্গে দুটা গাছের পাতাও টেবিলে পড়ল। চৌধুরী সাহেব অন্য প্রসঙ্গে যাবার জন্যে বললেন,–

গাছের পাতা পকেটে নিয়ে ঘুরছেন কেন?

নুরুজ্জামান চোখ মুছতে মুছতে বলল, আমি স্যার পাতার বাঁশি বাজাই।

তাই নাকি? দেখি বাজান তো পাতার বাঁশি।

আজ স্বপ্নটা আপনাকে বলায় মনটা খারাপ হয়ে গেছে। অন্য একদিন এসে বাঁশি শুনিয়ে যাব।

আচ্ছা ঠিক আছে। অন্য একদিন আসবেন। বাঁশি শুনাবেন। স্কুলের কাজ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি করে দেব।

চৌধুরী সাহেব লক্ষ্য করলেন, তাঁর মাথাধরা সেরে গেছে। শরীরটা ঝরঝরে লাগছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *