০৫. ঊর্মির ঘরে নতুন ফ্যান

ঊর্মির ঘরে নতুন ফ্যান লাগানো হচ্ছে। কড়ই গাছ বিক্রির টাকায় কেনা ফ্যান। বিজুর উৎসাহের সীমা নেই। যদিও নীল গেঞ্জি গায়ে এক জন ইলেকট্রিশিয়ান আনা হয়েছে তবু পুরো কাজটা করল বিজু। কানেকশন দিয়ে সুইচ টিপল। ফ্যান ঘুরল না। ইলেকট্রিশিয়ান টেস্টার দিয়ে দেখে বলল, লাইন তো ভাইজান ঠিক আছে।

ঊর্মি বলল, ফ্যান ঠিক আছে তো? দোকানে চালিয়ে দেখেছ?

বিজু বিরক্ত গলায় বলল, না চালিয়ে ফ্যান কিনব না-কি?

ঊর্মি বলল, লোক-ঠকানো টাকায় কেনা তো, তাই ঘুরছে না।

বিজু চোখ লাল করে বলল, লোক-ঠকানো টাকা মানে? কি বলছিস তুই? গাছটা কার, আমাদের না অন্যদের?

আচ্ছা বাবা যাও—আমাদের। চিৎকার করছ কেন?

এমন চড় দেব না—জন্মের শিক্ষা হয়ে যাবে।

ঊর্মি বলল, চেঁচামেচি না করে চড় দিয়ে ফেল। তাও ভালো।

বিজু সত্যি-সত্যি চড় বসিয়ে দিল। ঊর্মি হতভম্ব হয়ে গেল। বিজ যে বাইরের একটা মানুষের সামনে চড় মারতে পারে তা তার কল্পনাতেও আসে নি। কেমন করে এটা সম্ভব হল? হচ্ছে কি এসব? নীল গেঞ্জি পরা ইলেকট্রিশিয়ান ব্যাপারটায় খুব মজা পাচ্ছে। দাঁত বের করে আসছে। ঊর্মির ইচ্ছা করছে বিজুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। ছোটবেলায় এই জিনিসই করত। ছোটবেলায় যা করা যায় এখন তা করা সম্ভব না। সে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

বারান্দায় জাহানারা কেলি থেকে কাপে চা ঢালছেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। কাজের ছেলেটা সকালে বাজারের টাকা নিয়ে পালিয়েছে, আর ফেরে নি। সত্তর টাকা নিয়ে ভেঙ্গে গেছে। অথচ তার বেতন পাওনা ছিল দেড় শ টাকার ওপরে।

জাহানারা বললেন, সোমা কোথায় গেছে তুই জানিস?

ঊর্মি জবাব দিল না। সে কান্না থামাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। জাহানারা বললেন, কথা বলছি না কেন? সোমা কোথায় গেছে জানিস?

না।

চাটা বিজুকে দিয়ে আয়।

আমি পারব না মা।

জাহানারা কঠিন চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ফর্সা গাল রাগে লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কি বললি?

কিছু বলি নি, দাওচা দাও দিয়ে আসছি।

ঊর্মি চায়ের কাপ বিজুর সামনে রেখে সহজ গলায় বলল, বিজু ভাইয়া চায়ে চিনি হয়েছে কি-না দেখ।

বিজু বলল, যা রহমানের জন্যে চা নিয়ে আয়—দেখ তাকিয়ে, প্রবলেম সলন্ড। ফ্যান বন-বন করছে। হা-হা।

ঊর্মি তাকাল। নীল-রঙা ফ্যান ঘুরছে। ঘরে প্রচুর বাতাস। অথচ তার নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে বারান্দার দিকে রওনা হল রহমানের জন্যে চা আনতে হবে। যে একটু আগে তাকে চড় খেতে দেখেছে। দেখে দাঁত বের করে হেসেছে।

ঊর্মি চা ঢালছে।

জাহানারা পাশের চেয়ারে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন। তিনি বিরস মুখে বললেন, কার চা?

রহমানের।

রহমানটা কে?

ইলেকট্রিশিয়ান।

ইলেকট্রিশিয়ানকে আবার চা-বিসকিট খাওয়াতে হচ্ছে? সোমা কোথায় গেছে। তুই জানিস না?

না, জানি না।

কাউকে কিছু না বলে গেল কোথায়?

ঊর্মি চা নিয়ে চলে গেল। বিজু এসে বলল, ফ্যান কেমন ঘুরছে দেখে যাও মা। বন- বন-ফন-ফন। ঘরে বাতাসের ফ্লাড হয়ে যাচ্ছে।

জাহানারা বললেন, সোমা কোথায় গেছে জানিস?

না।

কাউকে কিছু না বলে কোথায় গেল?

বিজু চিন্তিত গলায় বলল, কখন গেছে?

দুপুর থেকে তো দেখছি না।

মাই গড।

দুজনের মনেই যে চিন্তা একসঙ্গে কাজ করল তা হচ্ছে—আগের জায়গায় ফিরে যায় নি তো? কাউকে কিছু না বলে যাওয়ার অর্থ তো একটাই। বিজু বলল, এক বার চট করে দেখে আসব প্রফেসরের বাসাটায় আছে কি না?

সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। সন্ধ্যার মধ্যে যদি না ফেরে তখন না হয়…….

যদি দেখি ঐখানে আছে তখন কি করব?

জাহানারা কোনো জবাব দিলেন না।

 

সোমা দূরে কোথাও যায় নি। গিয়েছে তার চাচার বাসায়। একসময় বড় চাচা ছদরুদ্দিন তাকে খুব স্নেহ করতেন। ঈদে নিজের মেয়েদের জামার সঙ্গে বাড়তি একটি জামা কেনা হত সোমার জন্যে। এক রাতের কথা সোমার পরিষ্কার মনে আছে, সে তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। বড় চাচা থাকেন সোবহানবাগে। রাত তিনটার দিকে হেঁটে হেঁটে সোবহানবাগ থেকে এখানে এসে উপস্থিত। তিনি সোমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। দুঃস্বপ্ন দেখে মনটা অস্থির হয়েছে কাজেই খোঁজ নিতে এসেছেন।

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষ বদলায়, সোমার ধারণা, বড় চাচা অনেকখানি। বদলেছেন, তবু কিছুটা টান এখনো নিশ্চয়ই অবশিষ্ট আছে। তা বোঝা যায়। কড়ই গাছ। নিয়ে বিরাট একটা হৈ চৈ হত। সোমা এ-বাড়িতে উপস্থিত বলেই হয় নি। বড় চাচা চুপ করে গেছেন।

ছদরুদ্দিন সাহেব দুপুরে ঘুমের আয়োজন করছিলেন। সোমাকে ঢুকতে দেখে উঠে বসলেন। কোমল গলায় বললেন, আয় মা, আয়।

সোমা বলল, বাসা খালি কেন বড় চাচা চাচি কোথায়?

ও তার ভাইয়ের বাড়িতে গেছে। ঘোট মেয়েটাও গেছে। বাকি সব আছে ঐ ঘরে, কি যেন করছে। আসবে। তুই এখানে বোস খানিকক্ষণ।

আপনি ঘুমুচ্ছেন ঘুমুন। আমি ওদের সঙ্গে গল্প করি। ঘুমটুম কিছু না, শুয়ে থাকি। বিরাট যন্ত্রণার মধ্যে আছি। এর মধ্যে ঘুম হয় না। কীসের যন্ত্রণা?

আসছিস যখন সবই শুনবি। সরচেয়ে বড় যন্ত্রণা কি শুনবি? সংসার অচল। একটা পয়সা রোজগার নাই। তোর চাচি যায়—ভাইদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে কিছু আনে, ঐ দিয়ে সংসার চলে।

সোমা তাকিয়ে রইল। ছদরুদ্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন, মেয়েগুলো বড় হয়েছে–বিয়ে দেওয়া দরকার। একটা সম্বন্ধ আসে না। হাড় জিরজিরে শরীর। সম্বন্ধ আসবেই বা কেন? কোনো ছেলে চায় একটা কঙ্কাল বিয়ে করে বাড়িতে নিতে?

সোমা চুপ করে রইল। ছদরুদ্দিন বললেন, এমনিতে কঙ্কাল কিন্তু তেজ আবার সোল আনার ওপর দুই আনা-আঠারো আনা। মান-অপমানের যন্ত্রণায় কাছে যাওয়া যায় না।

মান-অপমান থাকা কি খারাপ চাচা?

অবশ্যই খারাপ। ভিক্ষুকের আবার মান-অপমান কি? ভিক্ষুক হচ্ছে ভিক্ষুক।

কী-যে বলেন চাচা।

কি বুলি মানে? আমার অবস্থা তুই জানিস? তোর চাচিরা টাকা-পয়সা দেওয়া বন্ধ করলে রাস্তায় ভিক্ষা করতে বের হব। সত্যি বের হব। তুই নিজের চোখে দেখবি।

চুপ করুন তো চাচা।

ছদরুদ্দিন খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর ভাবভঙ্গি সোমার ভালো লাগল না। কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ চাউনি। চোখ দুটো বড় বেশি জ্বল-জ্বল করছে।

ছদরুদ্দিন বললেন, তোর খবর কিছু কিছু শুনলাম। তোর চাচি বলছিল। এইসব কি সত্যি?

কোন সব?

চলে এসেছিস না-কি?

হুঁ।

কেন?

সে অনেক কথা চাচা, বাদ দিন।

বাদ দেব কেন? বল সবকথা।

বলার মতো কিছু না।

মারধর করত না-কি?

সে-সব কিছু না। স্বভাব খুব খারাপ। আজেবাজে কাজ করে বেড়ায়। জেলে পর্যন্ত গেছে। কিছু কিছু তো নিশ্চয়ই জানেন।

আগে একটা বিয়েও না-কি করেছিল?

বাদ দিন চাচা।

এইরকম একটা লোকের সঙ্গে তোর বিয়ে হল কি করে?

এইসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না চাচা।

শয়তান শয়তান-চারদিকে শয়তান। মানুষের মুখোশপরা শয়তান। বুঝলি শয়তান……..।

চাচা আমি ঐ ঘরে যাই, দেখি তিথিমিথিরা কি করছে।

কিছুই করছে না। তুই বোস এখানে–চা খাবি?

হ্যাঁ।

দেখি চায়ের ব্যবস্থা আছে কিনা, দেখা যাবে চায়ের পাতা নাই, চিনি নাই, দুধ নাই। এই সংসারে আর থাকা যাবে না। সংসার আমার জন্য না। ও তিথি, তিথি…. কানে শোনে না না-কি?

তিথি।

তিথি এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না।

তোর সোমা অপাকে চা দে। খুটখাট শব্দ হচ্ছে কীসের?

ক্যারাম খেলছি।

এর মধ্যে ক্যারাম খেলাও চলছে? বা ভালো-খুব ভালো। খেল, আরাম করে ক্যারাম খেল। সব গুটি গর্তে নিয়ে ফেলে দে।

তিথি মুখ কালো করে চলে গেল। সোমা ছাড়া পেল সন্ধ্যার আগে-আগে। সারাক্ষণ তাকে বড় চাচার পাশে বসে থাকতে হল। বড় চাচা ক্ৰমাগত কথা বলে গেলেন যার বেশিরভাগই হচ্ছে হা-হুতাশ।

বুঝলি সোমা, আমি এখন হয়েছি কীটস্য কীট, গরুর ঘাড়ে ঘা হয় দেখেছিস? ঐ ঘায়ে একরকম সাদা-সাদা কৃমি হয়। আমি হচ্ছি ঐ কৃমি। তিথির মামারা কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি একজন খানসামা। এক দিন কি হয়েছে শোন, তিথির বড় মামার বাড়িতে গিয়েছি। গিয়ে দেখি বিরাট মচ্ছব রাজ্যের লোকজন এসেছে। তিথির মামা আমাকে কী বলল জানিস? বলল দুলাভাই আপনি গাড়িটা নিয়ে যান ভালো দেখে কিছু দৈ-মিষ্টি নিয়ে আসুন। অবস্থা চিন্তা কর। আমি এখন হয়েছি বাসার চাকর। ঐদিকে এখন ভুলেও যাই না। ভয়েই যাই না। এখন যদি যাই তা হলে বলবে—দুলাভাই আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে, এক বালতি পানি নিয়ে বাইরে যান তো, ড্রাইভার গাড়ি ধুচ্ছে ওকে একটু সাহায্য করুন। বিচিত্র কিছু না বলবেই। না বলে পারে না—ঐ গুষ্ঠিরে আমি চিনি….।

সোমা যখন উঠে এল তখন তার রীতিমতো মাথা ধরে গেছে।

বাসায় পা দেওয়ামাত্র সবাই এক বার করে বলল, কোথায় ছিলে? বড় চাচার বাসায় ছিল শুনে জাহানারা বললেন, ঐখানে যাওয়ার দরকার কি? সোমা বলল, তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া চলছে—তোমরা যাচ্ছ না। ভালো কথা। আমি কেন যাব না?

বানিয়ে বানিয়ে যখন এক শ কথা বলবে তখন বুঝবি।

বলুক।

কিছু তো জানি না, তাই বলছিস বলুক। জানলে বলতিস না।

আমার জানার দরকার নেই মা।

তোর বড় চাচা এখন কি বলে বেড়াচ্ছে শুনবি?

থাক–বড় চাচা প্রসঙ্গ থাক।

 

রাতে খাবার সময় সোমা নিজেই আবার বড় চাচার প্রসঙ্গ তুলল। নিচু গলায় বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বড় চাচার অবস্থা যে কত খারাপ সেটা তুমি জান?

সাইফুদ্দিন সাহেব বললেন, এইসব তোকে বলল—আর তুই বিশ্বাস করে চলে এলি?

বিশ্বাস করব না কেন?

বিজু বলল, ওঁর একটা কথাও তুমি বিশ্বাস করবে না। বিগ লায়ার। সপ্তাহে এক দিন ঐ বাড়িতে পোলাও হয়। তুমি তো এইখানেই আছ—প্রতি শুক্রবারে পোলাওয়ের গন্ধ পাবে। বড় চাচির ভাইরা বিরাট পয়সা করেছে। বোনের নামে ব্যাংকে টাকা-পয়সা জমা করে রেখেছে। মাসে মাসে যেন হাতে টাকা আসে এই জন্যে রেস্টুরেন্টের শেয়ার কিনে দিয়েছে।

তুই এত খবর পেলি কোথায়?

চোখ-কান খোলা রাখি এই জন্যে সব জানি। কোনো কথা যদি ভুল বলি গালে একটা চড় দিও। কিছু বলব না। দিব্যি বাড়ি দখল করে বসে আছে। মতলব খুব খারাপ। তবে আমি ছাড়ার লোক না। তিন মাসের মধ্যে গেট আউট করে দেব। যদি না করি তো আমার নাম বিজু না।

সোমা ভাত ছেড়ে উঠে পড়ল। বিজুর কথাবার্তা অসহ্য লাগছে। অল্প বয়সের একটা ছেলে কেমন ভুরু কুঁচকে বুড়োদের মতো কথা বলছে। এসব কি?

বিজু বলল, মা, দেখলে আপা কেমন আমাদের ওপর রাগ করে উঠে গেল? না জেনে, না শুনে, শুধু শুধু রাগ করলে হয়? বড় চাচার সম্বন্ধে লেটেস্ট ইনফরমেশন কী পেয়েছি শুনবে?

জাহানারা বললেন, থাক এইসব।

আহ্‌ শোন না মা। ভেরি ইন্টারেস্টিং। এত দিন আমরা জানতাম বড় চাচা তাঁর দোতলাটা বিক্রি করে দিয়েছেন। ব্যাপারটা সত্যি না। বিক্রির কথা বলে টাকা নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কাগজপত্রে সই করেন নি, সবই মুখে মুখে।

সাইফুদ্দিন বললেন, বলিস কি তুই?

বিজু বলল, পাকা খবর বাবা। কোনো ভুলে নাই। এখন বড় চাচি বলছেনবাড়ি তো বিক্রি হয় নাই। বাড়ি ভাড়া অ্যাডভান্স নিয়েছি।

সাইফুদ্দিন খাওয়া বন্ধ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিজু বলল, এখন বাবা অবস্থাটা দেখ, নিজের অংশ তাঁর নিজেরই আছে, প্লাস আমাদের অর্ধেকটা তাঁর দখলে।

জাহানারা বললেন, এই খবর পেলি কবে?

অনেক আগেই পেয়েছি। তোমাদের কিছু বলি নি কারণ সিওর ছিলাম না। এখন সিওর হয়েছি।

 

আজ রাতটা এমনিতে ঠাণ্ডা। তার ওপর মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। অসহ্য গরমে জেগে থাকার কথা নয়, কিন্তু সোমা জেগে আছে। তার অনিদ্রা রোগ আজকের নয়, অনেক দিনের। বিয়ের পরপরই অসুখটা হল—সে জেগে আছে, পাশেই কামাল মরার মতো ঘুমুচ্ছে। মাঝে-মাঝে ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় করছে এবং কথা বলছে। খুব উত্তেজিত ভঙ্গির কথা। যেন ভয়াবহ কোনো স্বপ্ন দেখছে। প্রথম দিকে ভয় পেয়ে সোমা কামালের গায়ে ধাক্কা দিত।

এই, এরকম করছ কেন? কী হয়েছে—এই।

কামাল সঙ্গে-সঙ্গে জেগে যেত তবে কিছুই বলত না, চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকত। সোমা বলত, এরকম করছিলে কেন? কি স্বপ্ন দেখছিলে?

মনে নাই।

পানি খাবে? পানি এনে দেব?

দাও।

সোমা পানি এনে দেখত কামাল আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় কথা। উত্তেজিত ভঙ্গি। হো হো শব্দ। ভয়ে সোমা কাঠ। লোকটা এরকম করে কেন? আবার ডেকে তুলবে? পানি খেতে বলবে? এই মানুষটাকে তার গোড়া থেকেই পছন্দ হয় নি। বিয়ের রাতেই তার মনে হয়েছে এই মানুষটা অন্যরকম। আশেপাশে সে যাদের দেখে এ তাদের মতো নয়। আলাদা। কি রকম আলাদা? সোমা ঠিক বুঝতে পারে নি। গোড়াতে অবশ্যি বোঝার চেষ্টাও করে নি। এই মানুষটাকে বোঝর জন্যে সারা জীবনই তো সামনে পড়ে আছে। এত তাড়া কীসের?

অবশ্যি বাসর রাতে লোকটির প্রতি সে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা বোধ করছিল। তাকে বিয়ে করবার জন্যে কৃতজ্ঞ। এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কৃতজ্ঞ। সোমার কৃতজ্ঞ হবার কারণ ছিল। এই বাড়িতে কিংবা এই পাড়ায় সে আর থাকতে পারছিল না। তার সারাক্ষণ ইচ্ছা করত ছুটে পালিয়ে যেতে। এমন কোথাও যেতে, যেখানে একটি মানুষও তাকে খুঁজে পাবে না। কেউ আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলবে না—ঐ দেখ সোমা যাচ্ছে। কোন সোমা বুঝতে পারছে তো?

হুঁ হুঁ—ঐ সোমা।

দেখতে তো বেশ শান্তশিষ্ট বলে মনে হচ্ছে।

শান্ত? তা শান্ত তো বটেই। হা-হা-হা। নিজে শান্ত চারদিকে অশান্ত।

আঠার বছর বয়স পর্যন্ত সোমাকে সবাই শান্ত মেয়ে, ভদ্র মেয়ে এবং খুবই লাজুক ধরনের মেয়ে বলেই জানত। পাড়ার অতি বখা ছেলেও তাকে দেখে কোনোদিন শিস দেয় নি, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নি। কিংবা করলেও সোমা শোনে নি। সোমা রাস্তায় বেরুত মাথা নিচু করে। এমনভাবে হাঁটত মনে হত আশেপাশে কেউ নেই, সে যেন একা জনশূন্য পথে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

 

একটা ক্ষুদ্র এবং প্রায় তুচ্ছ ঘটনায় সব বদলে গেল। সোমাদের বাড়ির তিনটা বাড়ির পর নারকেল গাছওয়ালা বাড়ির দোতলায় নতুন ভাড়াটে এল। এক প্রফেসর তাঁর সাত বছরের ফুটফুটে মেয়ে এবং অসুস্থ স্ত্রী। ভদ্রলোক প্রথম দিনেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, কারণ ভদ্রলোকের সঙ্গে এল ট্রাক ভরতি বই। এত বই কারোর থাকে? বাড়িটাকে কি সে লাইব্রেরি বানাবে? মানুষগুলো থাকবে কোথায়? ভদ্রলোকের স্ত্রী এলেন এম্বুলেন্সে করে। এ-ও এক রহস্য। এম্বুলেন্স করে রুগীরা হাসপাতালে যায় এটাই জানা। এম্বুলেন্সে করে ভাড়া বাড়িতে থাকতে আসে এটা কারোর জানা ছিল না।

এক দুপুরে সোমা ভদ্রমহিলাকে দেখতে গেল।

মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে। প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে আছে। সমস্ত শরীর শুকিয়ে। কাঠি অথচ মুখটা ভরাট। চোখ জ্বল-জ্বল করছে। তার নাম অরুণা। তার স্বামী তাকে ডাকে অরু নামে এবং ডাকে খুব মিষ্টি করে।

ভদ্রমহিলা সোমার সঙ্গে তেমন কোন কথা বললেন না। কি নাম? কি পড়? বাসা কোথায়? এইটুকু জিজ্ঞেস করেই খুব সম্ভব ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ভদ্রমহিলার স্বামী অনেক কথা বললেন। তাঁর নাম আশরাফ হোসেন। ফিলসফির অধ্যাপক। ভদ্রলোকের গলার স্বর মোটা। কথা বলার সময় চারদিক গম-গম করে, তবে কথা বলার মাঝখানে মাঝখানে হঠাৎ করে তিনি থেমে যান এবং কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে পড়েন।

আশরাফ সাহেব বললেন, তোমার কি নাম খুকি?

সোমা লজ্জিত গলায় বলল, সোমা।

সুন্দর নাম তো। বলতে লজ্জা পাচ্ছ কেন? সোমবারে জন্ম নিশ্চয়ই? সোমবারে জন্ম হলে বাবা-মারা নাম রাখে সোমা। তোমার কি সোমবারে জন্ম?

জি।

কী পড়?

আই এস সি।

বাহ্, আমি আরো কম ভেবেছিলাম। বাচ্চা মেয়েরা আজকাল উঁচু-উঁচু ক্লাসে পড়ে।

সোমা কিছু বলল না। কেন জানি তার লজ্জা কিছুতেই কাটছে না।

তুমি কি গল্পের বই পড় সোমা?

অল্প-অল্প পড়ি।

অল্প অল্প পড়বে কেন? অনেক বেশি-বেশি পড়বে। বই যে মানুষের কত ভালো বন্ধু এটা বই পড়ার অভ্যাস না হলে বুঝতে পারবে না। আমার কাছে অসংখ্য বই আছে। গল্প-উপন্যাসই বেশি। এস তোমাকে দেখাই।

বইয়ের সংখ্যা, আলমারীতে সাজিয়ে রাখার কায়দা, ঘরের মাঝখানে পড়ার টেবিল সব দেখে সোমা মুগ্ধ হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, সব বই আপনি পড়েছেন?

না, অনেক বই-ই আছে পড়তে ভালো লাগে নি, দু এক পাতা পড়ে রেখে দিয়েছি। এখন আগের মতো পড়ার সময়ও পাই না। শুধু কিনে যাচ্ছি। তোমার যদি কোনো বই পড়তে ইচ্ছা করে এখান থেকে নিয়ে যাবে। টেবিলের ওপর যে লাল খাতাটা দেখছ ওখানে নাম লিখবে। কি বই নিতে চাও তার নাম লিখবে। তারিখ দেবে। যেদিন ফেরত দেবে মনে করে ফেরত দেওয়ার তারিখও লিখে রাখবে। কি—নেবে কোনো বই?

সোমার বই নিতে ইচ্ছা করছিল না, তবু ভদ্রলোকের আগ্রহ দেখে মাথা নাড়ল।

নিজে পছন্দ করে নেবে, না আমি পছন্দ করে দেব?

আপনিই দিন।

তোমার বয়সী মেয়েদের দারুণ ভালো লাগবে, পড়তে পড়তে কাঁদবে এইরকম একটা বই তোমাকে দিচ্ছি তবে একটা জিনিস মনে রেখো সোমা, পাঠকের চোখ ভিজিয়ে দেওয়া কিন্তু একটা বইয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে না। যদি হয় তাহলে বুঝতে হবে বইটি নিম্নমানের।

সোমা বই নিয়ে চলে এল। বইটির নাম: শোন বরনারী সুবোধ ঘোষের লেখা। একটা বই পড়েই সোমার বইয়ের নেশা ধরে গেল। বইটা সে তিনবার পড়ল এবং তিনবারই ফুঁপিয়ে কাঁদল। ঐ বাড়ির ভদ্রলোককে তার মনে হতে লাগল ডাক্তার হিমাদ্রী। হিমাদ্রীর মতোই কেমন যেন বিষ চেহারা ভদ্রলোকের। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন। এত ভালো লাগে দেখতে।

দুদিন পর পর লোমা বই আনতে যেত। বেশিরভাগ সময়ই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হত না। সোমা বই নিয়ে খাতায় নাম লিখে চলে আসবার সময় খানিকক্ষণ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলত। ভদ্রমহিলা তেমন কিছু বলতেন না তাকিয়ে থাকতেন, মাঝে-মাঝে হা হু করে জবাব দিতেন। কথা বেশিরভাগই বলত সোমা।

আজ আপনার শরীর কেমন?

ভালো।

আপনার গল্পের বই পড়তে ইচ্ছে করে না

একসময় করত, এখন করে না।

আপনার তো একটা হুইল চেয়ার আছে। হুইল চেয়ারে বসে এদিক-ওদিক গেলে নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগবে।

আমার ভালো লাগে না।

আপনার মেয়েটা এ-বাড়িতে বেশি থাকে না—তাই না?

ও তার মামার বাড়িতে থাকে। ওখানে ওর সমবয়েসী অনেকে আছে।

আমি যে প্রায়ই এসে বই নিয়ে যাই আপনি বিরক্ত হন না তো?

না।

ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় দেখা হত ছুটির দিনে। দেখা হলে তিনি প্রথম যে কথাটা বলতেন তা হচ্ছে—তারপর সোমা, বইয়ের নেশা ধরিয়ে দিয়েছি তাই না?

হ্যাঁ দিয়েছেন।

আফিমের নেশার চেয়েও কড়া নেশা হচ্ছে বইয়ের নেশা। আফিমের নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিন্তু বইয়ের নেশা থেকে কোন মুক্তি নেই।

মুক্তি থাকবে না কেন? আপনি তো আর এখন পড়েন না। আপনার তো মুক্তি ঘটেছে।

মোটই না। এখনো কোনো বই হাতে নিলে শেষ না করে উঠতে পারি না। এই ভয়েই বই হাতে নেই না। হা-হা-হা। বস সোমা, তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করি।

সোমা বসে। ভদ্রলোকে বক্তৃতা দেয়ার ভঙ্গিতে বলেন, আচ্ছা দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন? বলতো বই পড়তে মানুষের ভালো লাগে কেন?

সোমা জবাব দিতে পারে না। চট করে কোন জবাব মাথায় আসে না।

আচ্ছা আরো সহজ করে বলছি, গান শুনতে মানুষের ভালো লাগে কেন? একটা সুন্দর ছবি দেখলে মানুষের ভালো লাগে কেন?

আমি জানি না।

জানি না কথাটা বলতে সোমার খুব লজ্জা করে। ভদ্রলোক তা বুঝতে পারেন।

এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই। এখন থেকে চিন্তা করবে। চিন্তাটা শুরু করবে কোথায় জান? শুরু করবে ভালোলাগা ব্যাপারটা কি? বিষয়টা বেশ জটিল। তবে জানা দরকার। শুধু খাওয়া এবং ঘুমের মধ্যে আমাদের জীবন না—এই জন্যেই এসব জানা দরকার। ভাববে, মন লাগিয়ে ভাববে একসময় দেখবে তোমার ভাবতেও ভালো লাগছে। এবং বুঝতে পারবে আমাদেরকে প্রকৃতি কত ঐশ্বর্য দিয়ে পাঠিয়েছেন।

সোমার অনিদ্রার অসুখ এই সময় প্রথম হল। কিছুতেই ঘুম আসতে চাইত না। জেগে জেগে অদ্ভুত সব কল্পনা করতে ভালবাসত। সেইসব কল্পনার একটি ছিল সোমার খুবই প্রিয়। কল্পনাটা এরকম—এক দুপুরে সোেমা বই আনতে যাচ্ছে। দুপুরটা আর সব দুপুরের মতো নয়, একটু যেন অন্যরকম। মেঘলা দুপুর। ঐ বাড়ির কাছাকাছি যেতেই ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হল। সোমা দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে উঠতেই ঝড় শুরু হয়ে গেল।

ঐ বড়িতে ভদ্রলোক ছিলেন তিনি অবাক হয়ে কললেন, কি ব্যাপার সোমা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে, ইস ভিজে গেছ দেখি। যাও গামছা দিয়ে গা মোছ।

সোমা বলল, বাসায় কেউ নেই?

না। অরুণা মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের বাসায় গিয়েছে। কাজের মেয়েটাও সঙ্গে গেছে।

আপনি গেলেন না কেন?

আমার শরীরটা ভালো না–জ্বর।

বেশি জ্বর?

বেশি বলেই তো মনে হচ্ছে।

কই দেখি?

বলেই সোমা ভদ্রলোকের কপালে হাত রাখল। হাত রাখতেই তার শরীর ঝিম-ঝিম করতে লাগল। মনে হল তার নিজেরই প্রচণ্ড জ্বর এসে যাচ্ছে। সোমা বলল, আমি নতুন একটা বই নিয়ে বাসায় চলে যাব। আপনি শুয়ে থাকুন।

পাগল। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বাসায় যাবে কি? তুমি বরং একটা বই নিয়ে আসো। আমি শুয়ে তাকি তুমি পড়ে শোনাও।

সোমা তাই করল।

উনি সারা শরীর চাদরে ঢেকে শুয়ে আছেন। বই পড়তে পড়তে সোেমার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সোমার দিকে। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি। হাওয়ার তুমুল মাতামাতি। হঠাৎ…..

সোমার কল্পনা এই পর্যন্তই। বাকিটা সে আর ভাবতে পারে না। বুক ধড়ফড় করে। এই কল্পনাটা সে যতবারই করে ততবারই ঠিক করে রাখে আর কোনোদিন সে ঐ বাড়িতে যাবে না। কোনোদিন না, মরে গেলেও না। দিনের বেলা মনে হয়—আচ্ছা, আর একবার শুধু যাব। আর যাব না। শুধু একবার। বইটা শুধু দিয়ে চলে আসব। এই শেষবারের মত…….

জাহানারা একদিন বললেন, তোর চেহারা এমন খারাপ হয়েছে কেন? তোর কি কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছে?

বুঝতে পারছি না।

তোর বাবাকে দেখিয়ে ওষুধ-টষুধ খা। তোর দিকে তো তাকানো যাচ্ছে না।

সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে দেখে টেখে বললেন, লিভারের কোনো সমস্যা। হজমে গণ্ডগোল হচ্ছে। একটা ডাইজেসটিভ এনজাইম দিচ্ছি। ওতেই কাজ হবে। আর শোন মা, তুই রাতদিন মুখের ওপর বই নিয়ে পড়ে থাকবি না, একটু হাঁটাহাঁটি করবি। এক্সারসাইজের দরকার আছে। খুব ভোরবেলা উঠে খানিকক্ষণ ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করবি।

সেই সময় ঘটনাটা ঘটল।

খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, ঐদিনের দুপুরটা ছিল সোমার কল্পনার দুপুরের মতো মেঘলা-বাতাস ছিল মধুর। ঐ বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ৰূপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। সোমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজল। যোক-সবকিছু কল্পনার মতো হোক।

ভদ্রলোকই দরজা খুলে দিয়ে বিস্মিত হয়ে বললেন, এই বৃষ্টির মধ্যে? বাবা বইয়ের তো দেখি ভালো নেশা ধরে গেছে।

সোমা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, বাসায় আর কেউ নেই।

তিনি বললেন, থাকবে না কেন? সবাই আছে। এসো। আজ দেখি শাড়ি পড়ে এসেছ। ভেরি গুড। শাড়ি হচ্ছে একটা এলিগ্যান্ট ড্রেস। এবং এই ড্রেসের সবচেয়ে বড় বিউটি কি জান?

জ্বি না।

পৃথিবীর অন্য সব ড্রেসের সমস্যা হচ্ছে একজনেরটা অন্যজনের গায়ে লাগে না। দরজি দিয়ে বানাতে হয়। শাড়িতে এই সমস্যা নেই। কি ঠিক বলি নি?

হ্যাঁ ঠিক।

তুমি আজ এত গম্ভীর হয়ে আছ কেন বল তো? কি হয়েছে?

কিছু হয় নি।

জ্বর-জারি না তো?

জ্বি না।

সাবধান থাকবে। এখন খুব অসুখ বিসুখ হচ্ছে। এস আজ আমি নিজেই তোমাকে পছন্দ করে বই দেব। এস।

তারা লাইব্রেরি ঘরে ঢুকল।

ঘরটা এমনিতেই অন্ধকার অন্ধকার। আজ আকাশ মেঘলা থাকায় আরো যেন বেশি অন্ধকার লাগছে। সোমার কেমন যেন লাগছে। বুক শুকিয়ে কাঠ, অসম্ভব তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে মানুষটার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে।

কি ব্যাপার সোমা এত ঘামছ কেন? তুমি বস তো এই চেয়ারটায় আমার মনে হচ্ছে তোমার শরীর ভালো না। দাঁড়াও ফ্যানটা ছেড়ে দিচ্ছি।

সোমা কাতর গলায় বলল, আমি বাসায় যাব।

তিনি বিস্মিত হয়ে তাকালেন। আর ঠিক তখনি পাশের ঘর থেকে অরুণা তীব্র ও তীক্ষ্ণ গলায় চেচিয়ে উঠল, তোমরা ঐ-ঘরে কি করছ? তোমরা ঐ-ঘরে কি করছ? তোমরা দুজন ঐ-ঘরে কি করছ?

ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে তাকালেন সোমার দিকে। তারপরই শান্ত ভঙ্গিতে স্ত্রীর ঘরে ঢুকে ভারী গলায় বললেন, এরকম করছ কেন অরুণা? ছিঃ, এসব কি? আমার স্বভাব-চরিত্ৰ তুমি জান না?

অরুণা আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, আমি দেখেছি। আমি দেখেছি। আমি জানি তোমরা কি করছ। আমি জানি। আমি জানি।

কাজের মেয়েটি ছুটে এল। একতলার ভদ্রমহিলা ছুটে এলেন। পাশের ঘরের জানালা খুলে গেল। বাড়ির সামনের গেটে দুজন পথচারী থমকে দাঁড়ালেন। হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মতো অরুণা চেঁচাচ্ছেন, আমি জানি, আমি জানি।

সোমা ছুটে বের হয়ে গেল।

এরকম ঘটনা এ-পাড়ায় অনেকদিন ঘটে নি। সাইফুদ্দিন সাহেবের বাসার সামনে দেখতে দেখতে লোক জমে গেল। নিতান্ত অপরিচিত লোকজন দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, মেয়েটাকে ওরা কি করেছে বলেন দেখি ভাই। ঐ হারামজাদার আমরা চামড়া খুলে ফেলব।

প্রফেসর সাহেবের ঐ দোতলা বাড়ির চারদিকে ছেলেপুলে জমে গেল। ঢিল পড়তে লাগল—সেই সঙ্গে কুৎসিত গালাগাল—তলে তলে ফুর্তি। রস বেশি হয়ে গেছে। আয় হারামজাদা রস বের করে দিই।

সন্ধ্যার পর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে পাড়ায় পুলিশ চলে এল। সাইফুদ্দিন সাহেব সেই রাতেই মেয়েকে খালার বাড়ি টাঙ্গাইলের বড় বাসালিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। খালার সেই পাঁচিল ঘেরা বড়ি ছিল দুর্গের মতো। সোমার মনে হল এই দুর্গ থেকে কোনোদিন সে বেরুতে পারবে না। দু মাস পর সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। সোমার দিকে তখন তাকানো যায় না। চোখ বসে গেছে। মাথার সামনের দিকের চুল খানিকটা উঠে গেছে। কথা বাৰ্তাও কেমন অসংলগ্নভাবে বলে।

জাহানারা মেয়েকে দেখে কেঁদে ফেললেন।

পাড়ার মেয়েরা রোজ দল বেঁধে আসে। নানান কথা বার্তার পর একসময় বলে, কৈ, মেয়ে এসেছে শুনলাম। মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছেন কেন? লুকিয়ে রাখার দরকার কি?

তারা নিজেদের মধ্যে চোখে-চোখে কথা বলেন। সেই চোখের ভাষা জাহানারা পড়তে পারেন। তিনি আতঙ্কে শিউরে ওঠেন।

পাড়ার মেয়েরা নিজেদের মধ্যে প্রকাশ্যেই আলোচনা করে, পেট নামিয়ে এসেছে। দেখলেই বোঝা যায়। কোন আনাড়িকে দিয়ে কাজ করিয়েছে কে জানে-দেখেন না মেয়ের কি অবস্থা? প্রায় মেরে ফেলতে বসেছিল।

একদিন সন্ধ্যায় সোমা কি জন্যে যেন বাইরের বারান্দায় গিয়েছে—দুটি ছেলে তাকে দেখে শিশুদের কান্নার নকল করে ওঁয়া ঔয়া করতে লাগল। সোমা মাকে গিয়ে বলল, মা, ওরা এমন করছে কেন? জাহানারা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার পরেরদিন আবার তাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেওয়া হল। জাহানারা তাঁর বোনকে লিখলেন—আপা, তুমি যেভাবেই পার আমার এই মেয়েটাকে একটা বিয়ে দিয়ে দাও। কানা, খোঁড়া, অন্ধ যাই হোক। তুমি এটা কর, আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি। আমার মন কেমন করছে। মনে হচ্ছে এই মেয়ের কোনোদিন বিয়ে হবে না। আপা, তুমি আমাদের বাঁচাও।

পৌষ মাসে সোমার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে টাঙ্গাইলে হল, খুব তাড়াহুড়ার বিয়ে বলে কাউকে খবর দেওয়া গেল না। বিয়েতে বাবা-মা কিংবা ভাই-বোনেরা কেউ আসতে পারল না।

বিয়েতে সোমা খুশিই হয়েছিল।

সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল বিয়ের রাতে কামালের ব্যবহারে। সে তার স্ত্রীকে বিয়ের রাতে কোনোরকম বিরক্ত করে নিহাই তুলে বলেছে, সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়। রাত থাকতে উঠতে হবে, দিনে-দিনে চিটাগাং পৌঁছাতে হবে। বিরাট যন্ত্রণা চিটাগাংয়ে ফেলে এসেছি। বিয়েটা তিনদিন পরে করলে আরাম করা যেত। বলেই লোকটা শুয়ে পড়ল। আর শোয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুম। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটার নাক ডাকার শব্দ শোনা যেতে লাগল। কোনো আদর না। কোনো গল্প না। ভালবাসার কোনো কথা না। সোমা সারারাত খাটের এক মাথায় কাঠ হয়ে বসে রইল। তার সারাক্ষণ ভয় ভয় করছিল—এইবুঝি লোকটা জেগে বলবে, এই এদিকে আসতো। লোকটার চোখে থাকবে অন্য ধরনের আহ্বান।

সেরকম কিছুই হল না।

খুব ভোরে ফার্স্ট বাস ধরে তারা চলে এল ঢাকায়।

কামাল বলল, চল তোমাদের বাসায় যাই। চা-টা খেয়ে গোসল-টোসল করে চিটাগাংয়ের বাস ধরি।

সোমা বলল, আমি বাবার বাড়িতে যাব না।

লোকটা অবাক হয়ে বলল, যাবে না কেন?

ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছা না করলে দরকার নেই। জোর-জবরদস্তির কোনো ব্যপার না। জোর-জবরদস্তি আমার কাছে নাই।

দুই কামরার একটা বাসায় তাদের বিবাহিত জীবন শুরু হল। দামপাড়ায় বাসা। বাসার কাছেই মসজিদ। মাইক বাজিয়ে সারাদিন সেই মসজিদে ওয়াজ হয়। লোকটা দাঁত বের করে বলল, দিনরাত আল্লাহ-খোদার নাম শুনবে। নামাজ রোজা ছাড়াই সোয়াব হবে। বাসা পছন্দ?

সোমা পুরুষ-পুরুষ গন্ধের সেই ঘরের বিছানায় চুপচাপ বসে রইল। পছন্দ-অপছন্দের কিছুই তার তখন নেই। পৃথিবীর সবকিছুই তার পছন্দ আবার সবকিছুই তার অপছন্দ।

চা বানাতে পার? শিখেছ এইসব?

সোমা তাকিয়ে রইল। কি-রকম অমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলছে লোকটা। এই কথাগুলো কি আরো সুন্দর করে বলা যায় না?

যাওচা বানাও, রান্নাঘরে জিনিসপত্র আছে। চা খেয়ে হেভি গোসল দিব। তারপরে দিব ঘুম। শালা ঘুম কারে বলে দেখবে। ঘুম নাম্বার ওয়ান। হা-হা-হা।

সোমা চা বানিয়ে আনল। লোটা হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে খালি গায়ে বসে আছে। দৃশ্যটা যে কি পরিমাণ কুৎসিত সে বোধহয় জানেও না।

লোকটা বলল, তোমার জন্য চা আনলে না?

আমি চা খাই না।

না খেলে কি আর করা। না খেলে নাই। বস আমার সামনে, দু একটা কথা বলি।

সোমা বসল।

লোকটা চুক চুক করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, তোমার কিছু সমস্যা আছে, আমি জানি। এও জানি সমস্যাটা ভালো না। সমস্যা আছে বলেই আমার মতো ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হল। আমি কচি খোকা না। আল্লাহতায়ালা আমাকে কিছু বুদ্ধি দিয়ে পাঠিয়েছেন। এই জিনিস অনেককে তিনি দেন না। যাই হোক, এখন আমি কি বলছি মন দিয়ে শোন। তোমার কি সমস্যা আছে আমি জানতে চাই না। হয়ে গেছে শেষ হয়ে গেছে। গু কাটি দিয়ে ঘাঁটলে গন্ধ ছড়ায়। গন্ধের আমার দরকার নাই। তোমার যেমন কিছু সমস্যা আছে আমারও আছে। আগে একটা বিয়ে করেছিলাম। বিয়ে টিকে নাই। এই কথা তোমার আত্মীয়-স্বজনেরে বলি নাই। আগ বাড়িয়ে সব কথা বলার দরকার কি? তুমি যদি জানতে চাও বলব। জানতে না চাইলে বলব না। তারপর ধর…

সোমা তার কথা শেষ করতে দিল না। কথার মাঝখানেই স্পষ্ট করে বলল, আমার কোনো সমস্যা নেই।

লোকটা বিস্মিত কণ্ঠে বলল, কি বললে তুমি?

আমার কোনো সমস্যা নেই।

না থাকলে তো ভালো। কাছে আস।

সোমা কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে কাছে এগিয়ে গেল।

বস।

সোমা বসল।

লোকটা হাতের সিগারেট দূরে ছুঁড়ে ফেলে খুবই সহজ ভঙ্গিতে সোমার বুকে হাত রাখল। সোমা কাঠ হয়ে গেল। লোকটা বলল, যাও জানালাগুলো বন্ধ করে দাও।

সোমা তাকিয়ে রইল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে। না।

যাও জানালাগুলো বন্ধ কর। লজ্জার কিছু নাই।

সোমা উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করল। তার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। এই মানুষটার সঙ্গে তার বাকি জীবন কাটাতে হবে? কেন? সে এমন কি অপরাধ করেছে?

 

সোমাদের ঢাকা পৌঁছানোর সাত দিনের দিন সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে দেখতে এলেন। মেয়ের ছোট্ট এবং গোছানো সংসার দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। জামাইয়ের জন্যে দামি একটা ঘড়ি এবং পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে এসেছিলেন। ঘড়ি এবং টাকা দিয়ে জামাইকে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথাই বললেন যার তেমন কোন অর্থ নেই। কামাল নত মস্তকে সব শুনল এবং প্রতিবারই বলল, অবশ্যই। যা বলেছেন সবই খাঁটি কথা। একটাও ফেলে দেবার কথা না।

জামাইয়ের ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ হলেন। তাঁর কাছে মনে হল—ছেলেটার বয়স একটু বেশি হলেও সে অতি নম্ৰ, অতি ভদ্ৰ।

ঢাকায় ফিরে আসার আগে সোমাকে জিজ্ঞেস করলেন, জামাই কি করে সেটাতো বুঝলাম না? ছেলে করে কি?

সোমা ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল।

সাইফুদ্দিন সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা কি?

কামাল তার শ্বশুরকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল। সাইফুদ্দিন সাহেব ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা, তুমি কি কর ঠিক বুঝলাম না। ব্যবসা?

কামাল দাঁত বের করে হাসল। জবাব দিল না।

সাইফুদ্দিন সাহেব গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে ঢাকায় ফিরলেন। লম্বা চিঠি লিখলেন মেয়েকে। কোনো উত্তর পেলেন না। আবার লিখলেন, তার উত্তর নেই। তিনি আবার চিটাগাং গেলেন, সোমারা ঐ বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না।

বাড়িওয়ালা বলল, ঐ লোক আপনার কি হয়? বিরাট ফক্কড় লোক। তাকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে বিরাট যন্ত্রণায় পড়েছি। দু দিন পরে-পরে পুলিশ এসে খোঁজ করে। বাড়িটার বদনাম হয়ে গেছে।

সাইফুদ্দিন সাহেব মাটিতে বসে পড়লেন। পরের তিন মাস তিনি মেয়ে-জামাইয়ের কোনো খোঁজ বের করতে পারলেন না। তিন মাস পর খুলনা থেকে মেয়ের চিঠি পেলেন

বাবা,

আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে তোমরা দুশ্চিন্তা করবে না। ইতি,

তোমাদের
সোমা।

পুনশ্চ: মাকে সালাম দিও। বিজু এবং ঊর্মিকে আদর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *