সাক্ষাৎকারভিত্তিক লেখা – বাংলানিউজ, অক্টোবর ২০১০

২০১০ এর ২৭ অক্টোবর বাংলানিউজে  সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই লেখাটি প্রকাশিত হয়।

সে এক বিশাল আয়োজন, ব্যয়বহুল প্রস্তুতি। স্বঘোষিত শেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র সেটকে আকর্ষণীয় ও সময়োপযোগী করে তোলার জন্য দীর্ঘ চার মাস ব্যয় করেছেন জনপ্রিয় কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ। নূহাশপল্লীর স্টুডিওতে সেই  সেট এখন শুটিংয়ের জন্য প্রস্তুত। বর্তমানে ব্রা‏হ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়াতে চলছে ছবিটির আউটডোরের শুটিং। ২ নভেম্বর থেকে নূহাশপল্লীতে শুরু হবে ইনডোর শুটিং।

প্রায় দেড়শ বছর আগে হবিগঞ্জ জেলার জলসুখা গ্রামের এক বৈষ্ণব আখড়ায় ঘেটুগান নামে নতুন সঙ্গীতধারা সৃষ্টি হয়েছিল। মেয়ের পোশাক পরে কিছু সুদর্শন কিশোর নাচগান করত। এদের নামই ঘেটু। গান হতো প্রচলিত সুরে, কিন্তু সেখানে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। অতি জনপ্রিয় এই সঙ্গীতধারায় নারী বেশধারী কিশোরদের উপস্থিতির কারণেই এর মধ্যে অশ্লীলতা ঢুকে পড়ে। বিত্তবানরা এইসব কিশোরকে যৌনসঙ্গী হিসেবে পাবার জন্যে লালায়িত হতে শুরু করেন। একসময় সামাজিকভাবে বিষয়টা স্বীকৃতি পেয়ে যায়। হাওর অঞ্চলের বিত্তবান শৌখিন মানুষরা জলবন্দি সময়টায় কিছুদিনের জন্যে হলেও ঘেটুপুত্র নিজের কাছে রাখবেন এই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে বিবেচিত হতে থাকে। আর তাদের স্ত্রীরা ঘেটুপুত্রদের দেখতেন সতীন হিসেবে। এমন এক ঘেটুপুত্রের গল্প নিয়েই হুমায়ুন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’।

গল্পের প্রধান পটভূমি ভাটি-অঞ্চলের এক বিত্তবান জমিদার বাড়ি। ১৫০ বছর আগে ওই অঞ্চলের জমিদারবাড়ির আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র ইনডোর সেটে তুলে ধরতে চেষ্টার কোনও কমতি রাখেননি হুমায়ূন আহমেদ। ২৬ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুরে নূহাশপল্লীতে গিয়ে দেখা গেল এই চিত্র।  দ্বিতল প্রাসাদের অবকাঠামো, সিংহমূর্তিবিশিষ্ট প্রবেশ দরোজা, নকশাখচিত দেয়াল ও কার্নিশ, অন্দরমহল, বৈঠকখানা, রঙমহল ইত্যাদি সবকিছুতে রয়েছে পরিকল্পনার ছোঁয়া। আসবাবপত্র এবং উপকরণ-সামগ্রী সংগ্রহেও নির্মাতা দিয়েছেন যথেষ্ট গুরুত্ব। প্রাচীন আমলের তিনটি খাট তৈরিতেই ব্যয় করা হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। কারুকাজ করা এ ধরনের খাট আজকাল শুধু জাদুঘরেই দেখা যায়। রেলিং দেওয়া একটি কাঠের সিন্দুক বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। পুরনো দিনের আরাম কেদারা, আলমিরা, জলচৌকি, ক্যাশবাক্স, বজরা ইত্যাদি সংগ্রহ ও তৈরির পেছনেও খরচের কথা নির্মাতা মাথায় রাখেন নি। উপকরণাদির মধ্যে আগের আমলের দুরবিন, হাতপাখা, বাঘের চামড়া, হরিণের মাথা, পিতলের হুকো, বল্লম, চাবুক, ঝাড়বাতি, গালিচা, বালিশ, বিছানাপত্র, বাসনকোসন, পানপাত্র, গয়নাগাটি, শো-পিস সবমিলিয়ে নূহাশপল্লীর স্টুডিওটাকে যেন মিনি জাদুঘরে রূপান্তর করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রডাকশন সূত্রে জানা যায়, পনের লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে গেছে ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র জন্য সেট নির্মাণ ও উপকরণাদি সংগ্রহের পেছনে।

ছবির সেট ডিজাইন ও সামগ্রী সংগ্রহের কথা জানতে চাইলে বাংলানিউজকে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, ভাটি অঞ্চলের বিত্তবান জমিদারদের গল্প আমি ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। তাদের বিলাসিতার নমুনা পাওয়া যায় হাওড় এলাকার প্রাচীন কিছু জমিদারবাড়িতে। আমি তাদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন সম্পর্কে যতোটা পারি তথ্য সংগ্রহ করেছি। নূহাশ চলচ্চিত্রের একটি টিম এজন্য সুনামগঞ্জ আর হবিগঞ্জে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মতভাবে দেড়শ বছর আগের বিলাসিতা ও শৌখিনতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা আমাদের আছে। সেট নির্মাণ ও উপকরণাদি সংগ্রহ করতে চার মাসেরও বেশি সময় লেগে গেছে। খরচের কথা নাইবা বললাম। তারপরও আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। মনে হয়েছে ফাঁক-ফোকর রয়েই গেছে। আমার কাছে যদি একটা টাইমমেশিন থাকতো তাহলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে আমি ওই সময়ের কোনো জমিদার বাড়িতে চলে যেতাম। বলতাম, ভাই আমি আপনাদের নিয়ে একটা ছবি বানাতে চাই। দয়া করে আমাকে অনুমতি দিন। কিন্তু আমার কাছে তো কোনো টাইমমেশিন নেই। তাই দেড়শ বছর আগের সময়টা ধরার জন্য আমাদের যতো চেষ্টা।

ঘেটুপুত্র কমলা’র সেট নির্মাণ ও সামগ্রী সংগ্রহে নির্মাতার পাশে ছিলেন শিল্প-নির্দেশক মাসুম রহমান। হুমায়ূন আহমেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট সময় ও শ্রম তিনি ব্যয় করেছেন বলে জানা গেছে।

ঘেটুপুত্র কমলা’-এর মহরতের দিন হঠাৎ করেই হুমায়ূন আহমেদ ঘোষণা দেন, এটিই তার শেষ ছবি। মহরতে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবে হুমায়ূন আহমেদকে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।

[সংগ্রহ : আনোয়ার জাহান ঐরি, চলন্তিকা ডট কম।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *