আমার আছে জল – ০৫ম পরিচ্ছেদ

তারা নীলগঞ্জে ডাকবাংলোয় এসে পৌঁছলো বিকেল চারটার দিকে, তখন আলো নরম হয়ে এসেছে। শীতের উত্তরী হাওয়া বইছে।

ডাকবাংলোটি চমৎকার। ফিসারিজের বাংলো। হাফ বিল্ডিং। উপরের ছাদ টালীর, মন্দিরের গম্বুজের মত উঁচু হয়ে গেছে। বাড়ি যত বড় তার চেয়েও বড় তার বারান্দা। সেখানে কালো একটি গোল টেবিলের চারপাশে গোটাপাঁচেক ইজিচেয়ার। দেখলেই শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। বাড়িটির চারপাশে রেণ্টি (রেইন ট্রি) গাছ। বিকেল বেলাতেই বাড়িটিকে অন্ধকার করে ফেলেছে। পেছনে বেশ বড়সড় একটা পুকুর। কাকের চোখের মত জল।

রেহানা অবাক হয়ে বললেন—এই জঙ্গলে এত চমৎকার বাড়ি গভর্ণমেণ্ট কেন বানিয়েছে? ওসমান সাহেব নিজেও হকচকিয়ে গেছেন। এদিকে তাঁর প্রথম আসা। খোঁজ-খবর এসেছে জামিলের কাছ থেকে। জামিল, এই ডাকবাংলো তৈরী হয় কবে?

এটা সুসং দুর্গাপুরের মহারাজার শিকার বাড়ি। পরের সরকার নিয়ে নেয়। এখন ফিসারিজ ডিপার্টমেণ্টের হাতে দেয়া হয়েছে। আগে আরো সুন্দর ছিলো।

এরচে সুন্দর আর কি হবে?

একটা কাঁচঘর ছিলো। গোটা ঘরটাই কাঁচের তৈরী। লোকজন কাঁচটাচ সব নিয়ে গেছে। অনেক ঝাড় লণ্ঠন ছিলো। বড় বড় অফিসার একেকজন এসেছেন, একেকটা করে নিয়ে গেছেন। পেছনের পুকুরের ঘাটে মার্বেল পাথরের একটা দেবশিশু ছিলো ঢাকা মিউজিয়াম নিয়ে গেছে।

তুমি এতো কিছু জান কিভাবে?

আমি তো এখানে প্রায়ই আসি।

দিলু বললো—বাবা আমি একটা একটা ঘরে থাকব। ওসমান সাহেব উত্তর দিলেন না। জামিল বললো—তা পারবি না দিলু—সব পুরনো ডাকবাংলোয় ভূত থাকে।

আপনাকে বলেছে।

সন্ধ্যা হলেই টের পাবি। সন্ধায় নামুক। তখন দেখা যাবে।

 

বাবুর্চি আছে দু’জন। তারা রান্নাবান্না সেরে ফেলেছে। খাবার ঘরে খাবার দিতে শুরু করেছে। খাবার ঘরটা তুলনামূলকভাবে অন্ধকার। একটা হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হয়েছে। সবাই হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছে শুধু নিশাত নেই। রেহানা খোঁজ নিতে গেলেন। নিশাত শুয়েছিলো। সে ক্লান্তগলায় বললো—আমি কিছু খাব না।

কেন খাবি না?

খেতে ইচ্ছে করছে না, তাই খাব না।

সারা দিন তো কিছুই মুখে তুলিসনি। কিছু মুখে দে।

আমি গোসল না করে কিছু মুখে দেব না। আমার গা ঘিনঘিন করছে।

জ্বর গায়ে গোসল করবি কি!

প্লীজ মা, আমার ব্যাপারের নাক গলিও না। বাবুকে খাওয়াও। তোমরা খাওয়া-দাওয়া কর।

রেহানা মুখ কালো করে বের হয়ে এলেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করলো নিশাত। ঠাণ্ডা পানি। গায়ে জ্বর থাকার জন্যে পানি বরফ শীতল মনে হচ্ছে। তবু ভালো লাগছে। ঝকঝকে বাথরুম। পেতলের বালতিতে পরিষ্কার জল। মোড়ক খোলা নতুন সাবান।

নিশাত যখন বেরিয়ে এলো তখন সত্যি সত্যি অন্ধকার নেমে এসেছে। নিশাত একটি ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিলো। উঁকি দিলো মায়ের ঘরে। বাবু অবেলায় হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আজ সারাদিন বাবুর সঙ্গে তার কোন কথাবার্তা হয়নি। বাবু কি ক্রমেই তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? রাতে সে এখন তার সঙ্গে ঘুমায় না। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—দাদীর কাছে যাব। রেহানাকে সে দাদী বলে। কেন বলে কে জানে!

নিশাত বললো—ও কি কিছু খেয়েছে?

ভাত মুখে দেয়নি। দুধ খেয়েছে।

নিশাত নিচু হয়ে ছেলের কপালে চুমু খেলো। রেহানা বললেন—কিছু খাবি মা?

না। চা খাব এক কাপ।

বস তুই এখানে। আমি চায়ের কথা বলে আসি। মশারি খাটানোর কথাও বলতে হবে। খুব মশা এদিকে।

দরজায় কার যেন ছায়া পড়েছে। নিশাত মুখ তুলে দেখলো জামিল ভাই।

নিশাত, তোমার নাকি জ্বর?

ব্যস্ত হবার মত কিছু না।

ব্যস্ত হইনি নিশাত, খোঁজ নিচ্ছি। খোঁজ নেয়াটা অপরাধ নয় নিশ্চয়ই।

আমি ভাল আছি।

জামিল ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস গোপন করলো। চলে যেতে চাইলো। নিশাত বললো—আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে জামিল ভাই।

বল।

আপনি বারান্দায় বসুন, আমি আসছি।

ঝগড়া করবে মনে হচ্ছে।

নিশাত জবাব দিলো না। বাবুর গালে একটা মশা বসেছিল। হাত দিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দিলো। ছেলেটিকে বড় রোগা রোগা লাগছে। এই ক’দিন ওর দিকে একটুও নজর দেয়া হয়নি। নিশাতের মনে হলো সে ক্রমের দূরে সরে যাচ্ছে। বাবু এখন আর মা’র জন্যে খুব ব্যস্ত নয়। শিশুরা অবহেলা খুব সহজেই টের পায়। নিশাত বাবুর চুলে হাত রাখলো। পাতলা লালচে ধরনের চুল। বাবার মত। কবিরের চেহারার সঙ্গে বাবুর খুব বেশী মিল নেই। কবিরের নাক ছিল খাড়া, বাবুর তা নয়। সে হয়েছে মা’র মত। নিশাত নিচু হয়ে বাবুর ঠোঁটে চুমু খেলো। কেমন দুধ দুধ গন্ধ। নিশাত আবার নিচু হলো। বাবু ঘুমের মধ্যেই তাকে হাত দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো।

 

বারান্দা অন্ধকার। এখানে কোন বাতি দিয়ে যায়নি। জামিল বসে ছিলো একা। নিশাত এসে ঢুকতেই সে সোজা হয়ে বসলো—হালকা গলায় বললো—ভেতরে বসলেই হতো, এখানে বড় হাওয়া।

থাকুক হাওয়া। বারান্দাই ভালো।

আলো দিতে বলব?

জামিল একটা সিগারেট ধরালো। সহজভাবে বললো—বল কি বলবে?

আপনি আমাদের এই বাংলোয় কেন নিয়ে এসেছেন?

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তুমি কি মিন করছ।

আপনি ঠিকই বুঝতে পারছেন। এখন ভান করছেন বুঝতে পারছেন না।

দেখো নিশাত। আমি ভান করি না। ঐ একটা জিনিস আমি কখনো করি না।

তাহলে বলুন এত ডাকবাংলো থাকতে আপনি এখানে আমাকে নিয়ে এসেছেন কেন?

নিশাত, কবির এবং আমি অনেক রাত এই ডাকবাংলোয় কাটিয়েছি। এই ডাকবাংলোর উপর ওর একটা দুর্বলতা ছিলো। আমি জানি বিয়ের পরও অনেকবার তোমাকে নিয়ে এসেখানে আসতে চেয়েছে। আসা হয়ে ওঠেনি। আমি তাই ভাবলাম এখানে এলে তোমার ভালই লাগবে।

আমি ওর সঙ্গেই এখানে আসতে চেয়েছিলাম, আর কারো সঙ্গে নয়।

ভেবে নাও ও তোমার সঙ্গেই আছে।

সব কিছু কি ভেবে নেওয়া যায়। জীবন এত সহজ মনে করেন?

জীবন সহজও নয় জটিলও নয়। জীবন জীবনের মতো। আমরাই একে জটিল করি—সহজ করি। তুমি একে ক্রমেই জটিল করছো।

নিশাত চুপ করে গেলো। জামিল হালকা সুরে বললো—দুঃখ শুধু কি তোমার একার? আমাদের সবারই দুঃখ আছে।

আপনার আবার কিসের দুঃখ? দুঃখের আপনি কি জানেন?

নিশাত উঠে দাঁড়ালো। বাবু জেগে উঠে কাঁদছে। কে একজন এসে বারান্দায় একটি হ্যারিকেন রেখে গেলো। হ্যারিকেনের আলোয় সব কেমন অদ্ভুত লাগছে।

জামিল সাহেব, আপনি যেভাবে বসে আছেন বসে থাকুন। একটা ছবি তুলব। নড়বেন না, শাটার স্পীড খুব কম।

অনেকখানি সময় নিয়ে সাব্বির ছবি তুললো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *