একাদশ অধ্যায় – বিশ্বরূপদর্শন

“অর্জুন কহিলেন, ‘হে বাসুদেব! তুমি আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়া যে পরম গুহ্য আত্মা ও দেহ প্রভৃতির বিষয় কীর্তন করিলে, তদ্দ্বারা আমার ভ্রান্তি দূর হইয়াছে। হে পদ্মপলাশলোচন! আমি তোমার মুখে ভূতগণের উৎপত্তি, প্রলয় এবং তোমার অক্ষয়মাহাত্ম্য সবিস্তর শ্রবণ করিলাম। হে পুরুষোত্তম! তুমি আপনার ঐশ্বররূপের (ঈশ্বরাত্মকরূপ–ঐশ্বর্য্যযুক্তরূপ) বিষয় যেরূপ কীর্তন করিলে, তাহা আমি দর্শন লাভ করিতে অভিলাষ করি; হে যোগেশ্বর! এক্ষণে তুমি যদি আমাকে তাহা দর্শন করিবার উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া থাক, তাহা হইলে সেই অব্যয় রূপ প্রদর্শন কর।’
“বাসুদেব কহিলেন, ‘হে অর্জুন! তুমি আমার নানাবর্ণ ও নানাপ্রকার আকারবিশিষ্ট শত শত সহস্র সহস্র রূপ প্রত্যক্ষ কর। অদ্য আমার কলেরবে আদিত্য, বসু, রুদ্র ও মরুদ্‌গণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, অদৃষ্টপূর্ব অত্যাশ্চর্য্য বহুতর বস্তু-সকল দর্শন কর। হে অর্জুন! সচরাচর বিশ্ব এবং অন্য যে কিছু অবলোকন করিবার অভিলাষ থাকে, তাহাও নিরীক্ষণ কর। কিন্তু তুমি এই চক্ষু দ্বারা আমার রূপ প্রত্যক্ষ করিতে সমর্থ হইবে না; এক্ষণে আমি তোমাকে দিব্যচক্ষু প্রদান করিতেছি; তুমি তদ্দ্বারা আমার অসাধারণ যোগ অবলোকন কর।’ ”
সঞ্জয় কহিলেন, “হে মহারাজ! অনন্তর মহাযোগেশ্বর হরি পার্থকে বহুমুখ ও বহুনয়নসম্পন্ন, দিব্যালঙ্কারে অলঙ্কৃত, দিব্যায়ূধধারী, দিব্য মাল্য ও অম্বরে পরিশোভিত, দিব্যগন্ধচর্চ্চিত (উত্তম গন্ধে অনুলিপ্ত), সর্বতোমুখ, অদ্ভুতদর্শন, পরম ঐশ্বর রূপ প্রদর্শন করিলেন। যদি নভোমণ্ডলে এককালে সহস্র সূর্য সমুদিত হয়, তাহা হইলে তাহার তৎকালীন তেজঃপুঞ্জের উপমা হইতে পারে। ধনঞ্জয় তখন তাঁহার দেহে বহু প্রকারে বিভক্ত, একস্থানস্থিত, সমগ্র বিশ্ব নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় বিস্মিত ও পুলকিত হইলেন। পরে কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে নমস্কার করিয়া কহিলেন, ‘হে দেব! আমি তোমার দেহমধ্যে সমস্ত দেবতা, জরায়ুজ ও অণ্ডজ প্রভৃতি সমস্ত ভূত, পদ্মাসনস্থিত ভগবান্‌ ব্রহ্মা এবং দিব্য মহর্ষি ও উরগগণ অবলোকন করিতেছি। হে বিশ্বেশ্বর! আমি তোমার বহুতর বাহু, উদর, বক্ত্র ও নেত্রসম্পন্ন অনন্ত রূপ নিরীক্ষণ করিলাম; কিন্তু ইহার আদি, অন্ত ও মধ্যে কিছুই দেখিতে পাইলাম না। আমি তোমাকে কিরীটধারী, গদাচক্রলাঞ্ছিত (গদা ও চক্রচিহ্নে চিহ্নিত), প্রদীপ হুতাশন ও সূর্যসঙ্কাশ, নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য এবং অপ্রমেয় নিরীক্ষণ করিতেছি। তুমি অক্ষয়, পরব্রহ্ম, জ্ঞাতব্য বিশ্বের একমাত্র আশ্রয়, নিত্য, সনাতন-ধর্মপ্রতিপালক পরমপুরুষ। তোমার আদি নাই, মধ্য নাই ও অন্ত নাই। তুমি অনন্তবীর্য ও অনন্তবাহু; হুতাশন তোমার মুখমণ্ডলে সতত প্রদীপ্ত হইতেছে; চন্দ্র ও সূর্য তোমার নেত্র; তুমি স্বীয় তেজঃপ্রভাবে এই বিশ্বকে সন্তপ্ত করিতেছ এবং একাকী হইয়াও অন্তরীক্ষ ও সমস্ত দিগ্বলয় ব্যাপ্ত করিয়া রহিয়াছ। তোমার এই ভীষণ অত্যদ্ভুত রূপ নিরীক্ষণ করিয়া এই লোকত্রয় ব্যথিত হইতেছে। সকল সুরগণ শঙ্কিতমনে তোমার শরণাপন্ন হইতেছেন। কেহ কেহ বা ‘আমাদিগকে রক্ষা কর’ বলিয়া কৃতঞ্জলিপুটে প্রার্থনা করিতেছেন; সিদ্ধ ও মহর্ষিগণ ‘স্বস্তি’ বলিয়া তোমার স্তুতিবাদে প্রবৃত্ত হইতেছেন। রুদ্র, আদিত্য, বসু, সাধ্য, মতুৎ পিতৃগণ, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর, বিশ্বদেব ও সিদ্ধগণ এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয় সাতিশয় বিস্মিত হইয়া তোমাকে দর্শন করিতেছেন। আমি এই সমস্ত লোক-সমভিব্যাহারে তোমার বহু নয়ন ও অনেক মুখসম্পন্ন, বহু বাহু, বহু ঊরু ও বহু চরণসংযুক্ত, অনেক উদরপরিশোভিত ও বহুদংষ্ট্রাকরাল (ভীষণ দন্তসমন্বিত) আকার নিরীক্ষণ করিয়া নিতান্ত ব্যথিত হইতেছি; আমি তোমার নভোমণ্ডলস্পর্শী, বহু-বর্ণসম্পন্ন, বিবৃতানন, বিশাললোচন ও অতি প্রকাণ্ড মূর্তি সন্দর্শন করিয়া কোনক্রমেই ধৈর্য ও শান্তি অবলম্বন করিতে সমর্থ হইতেছি না। আমার অন্তঃকরণ নিতান্ত বিচলিত হইয়াছে। হে জগন্নাথ! তুমি প্রসন্ন হও, তমার কালাগ্নিসন্নিভ দংষ্ট্রাকরাল মুখমণ্ডল অবলোকন করিয়া আমার দিগ্‌ভ্রম জন্মিয়াছে; আমি কিছুতেই সুখলাভ করিতে সমর্থ হইতেছি না।
“মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও ধার্ত্তরাষ্ট্রেরা অন্যান্য মহীপালগণ ও আমাদিগের যোদ্ধৃবর্গ সমভিব্যাহারে সত্বর তোমার ভয়ঙ্কর আস্য বিবরে প্রবেশ করিতেছে; তন্মধ্যে কাহার উত্তমাঙ্গ চূর্ণীকৃত এবং কেহ বা তোমার বিশাল দশনসন্ধিতে (দাঁতের ফাঁকে) সংলগ্ন হইয়াছে। যেমন নদীপ্রবাহ সাগরাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া থাকে, তদ্রুপ এই সকল বীরপুরুষেরা তোমার অতি প্রদীপ্ত মুখমধ্যে প্রবেশ করিতেছেন। যেমন সমৃদ্ধ বেগশালী পতঙ্গসকল বিনাশের নিমিত্ত অতি প্রদীপ্ত হুতাশনমধ্যে প্রবিষ্ট হয়, তদ্রুপ এই সমস্ত লোকেরা বিনিষ্ট হইবার নিমিত্ত তোমার মুখমধ্যে প্রবেশ করিতেছে। তুমি প্রজ্বলিত মুখ বিস্তার করিয়া এই সমুদয় লোককে গ্রাস করিতেছ এবং তোমার প্রখর তেজ বিশ্বকে পরিপূর্ণ করিয়া লোক-সকলকে সন্তপ্ত করিতেছে। হে দেবাদিদেব! আমি তোমাকে নমস্কার করি; তুমি প্রসন্ন হও। আমি তোমার কোন বৃতান্তই অবগত নহি; এক্ষণে তুমি কে, তাহা কীর্তন কর; আমি তোমাকে বিদিত হইতে অভিলাষী হইয়াছি।’
“বাসুদেব বলিলেন, ‘হে অর্জুন! আমি লোকক্ষয়কারী ভয়ঙ্কর সাক্ষাৎ কালরূপী হইয়া লোক-সকলকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্তি হয়াছি। এক্ষণে কেবল তোমা ব্যতিরেকে প্রতিপক্ষীয় বীরপুরুষ সকলেই বিনষ্ট হইবেন; অতএব তুমি যুদ্ধার্থ উদ্যুক্ত হইয়া শত্রুগণকে পরাজিত করিয়া যশোলাভ ও অতি সমৃদ্ধ রাজ্য উপভোগ কর। হে অর্জুন! আমি পূর্বেই ইহাদিগকে নিহত করিয়া রাখিয়াছি; এক্ষণে তুমি এই বিনাশের নিমিত্তমাত্র হও। হে অর্জুন! আমি দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ ও কর্ণ প্রভৃতি বীরগণকে বিনষ্ট করিয়া রাখিয়াছি; তুমি ইহাদিগকে সংহার কর; ব্যথিত হইও না; অনতিবিলম্বে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও; তুমি অবশ্যই শত্রুদিগকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে।’ ” সঞ্জয় কহিলেন, “তখন অর্জুন কম্পিতকলেরবে ও কৃতাঞ্জলিপুটে কৃষ্ণকে নমস্কার করিয়া ভীতমনে ও গদ্‌গদ্‌বচনে কহিলেন, “বাসুদেব! তোমার নাম কীর্তন করিলে সকলে যে নিতান্ত হৃষ্ট ও একান্ত অনুরক্ত হইয়া থাকে, সিদ্ধগণ যে তোমাকে নমস্কার করিয়া থাকেন এবং রাক্ষসেরা যে ভীত হইয়া চতুর্দিকে পলায়ণ করিয়া থাকে, তাহা যুক্তিযুক্ত। তুমি ভগবান্‌ ব্রহ্মা অপেক্ষা গুরুতর ও জগতের আদিকর্তা এবং ব্যক্ত ও অব্যক্তের মূলকারণ অবিনাশী ব্রহ্ম; এই নিমিত্তই সকলে তোমাকে নমস্কার করিয়া থাকে। তুমি আদিদেব, পুরাতন পুরুষ ও বিশ্বের একমাত্র বিধান (আধার); তুমি বেত্তা (সর্বজ্ঞ), বেদ্য (জ্ঞেয়) ও পরম তেজ; হে অনন্তমূর্তি! তুমি এই বিশ্বের সর্বত্রই বিরাজমান আছ। তুমি বায়ু, যম, অগ্নি, বরুণ, শশাঙ্ক (চন্দ্র), প্রজাপতি ও প্রপিতামহ (ব্রহ্মা)। হে সর্বেশ্বর! আমি তোমাকে সহস্র সহস্রবার নমস্কার করি; আমি তোমার সম্মুখে নমস্কার করি; আমি তোমার পশ্চাতে নমস্কার করি; আমি তোমার চতুর্দিকেই নমস্কার করি। তুমি অনন্তবীর্য ও অমিতপরাক্রমসম্পন্ন; তুমি সমুদয় বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছ; এই নিমিত্ত সকলে তোমাকে সর্বস্বরূপ বলিয়া কীর্তন করিয়া থাকে। আমি তোমাকে মিত্র বিবেচনা করিয়া ‘হে কৃষ্ণ! এ যাদব! হে সখা!’ বলিয়া যে সম্বোধন করিয়াছি এবং তুমি একাকীই থাক বা বন্ধুজনসমক্ষেই অবস্থান কর, বিহার, শয়ন, উপবেশন ও ভোজন সময়ে তোমাকে যে উপহাস করিবার নিমিত্ত তিরস্কার করিয়াছি, এক্ষণে তুমি সেই সকল ক্ষমা কর; আমি তোমার মহিমা অবগত না হইয়া প্রমাদ বা প্রণয়পূর্বক ঐরূপ ব্যবহার করিতাম। তুমি স্থাবরজঙ্গমাত্মক জগতের পিতা, পূজ্য ও গুরু, ত্রিলোকমধ্যে তোমা অপেক্ষা সমধিক বা তোমার তুল্য প্রভাবসম্পন্ন আর কেহই নাই; অতএব আমি দণ্ডবৎ পতিত হইয়া তোমায় প্রণাম করিয়া প্রসণ্ন করিতেছি; যেমন পিতা পুত্রের, মিত্র মিত্রের ও স্বামী প্রিয়তমার অপরাধ সহ্য করিয়া থাকেন, সেইরূপ তুমিও আমার অপরাধ মার্জনা করিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। আমি তোমার অদৃষ্টপূর্ব (যাহা পূর্বে কখনও দেখা যায় নাই, তদ্রুপ) রূপ নিরীক্ষণ করিয়া নিতান্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি; কিন্তু আমার অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার হইতেছে। হে কৃষ্ণ! তুমি প্রসন্ন হইয়া পূর্বরূপ ধারণ ও আমাকে প্রদর্শন কর, আমি তোমার কিরীটসমলঙ্কৃত গদা-চক্রলাঞ্ছিত সেই চতুর্ভূজ মূর্তি অবলোকন করিতে ইচ্ছা করি।’
“বাসুদেব কহিলেন, ‘হে অর্জুন! আমি প্রসন্ন হইয়া যোগমায়া-প্রভাবে তোমাকে তেজোময় অনন্ত বিশ্বরূপ পরম রূপ প্রদর্শন করিয়াছি; তোমা ব্যতিরেকে আর কেহই ইহা পূর্বে নিরীক্ষণ করেন নাই। তোমা ব্যতিরেকে মনুষ্যলোকে আর কেহই বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান, দান, ক্রিয়াকলাপ ও অতি কঠোর তপস্যা দ্বারা আমার ঈদৃশ রূপ অবলোকন করিতে সমর্থ হয়েন না। তুমি ইহা নয়নগোচর করিয়া ব্যথিত ও বিমোহিত হইও না; এক্ষনে ভয় পরিত্যাগপূর্বক প্রীতমনে পুনরায় আমার পূর্বরূপ প্রত্যক্ষ কর।’ ” সঞ্জয় কহিলেন, “এই বলিয়া বাসুদেব নিতান্ত ভীত অর্জুনকে পুনরায় স্বকীয় সৌম্যমূর্তি প্রদর্শনপূর্বক আশ্বাস প্রদান করিলেন।
“তখন অর্জুন কৃষ্ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে জনার্দন! আমি এক্ষণে তোমার প্রশান্ত মানুষ-মূর্তি নিরীক্ষণ করিয়া প্রকৃতিস্থ হইলাম।’
“কৃষ্ণ কহিলেন, ‘হে অর্জুন! তুমি আমার যে নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য মূর্তি অবলোকন করিলে, দেবগণ উহা নেত্রগোচর করিবার নিমিত্ত নিয়ত অভিলাষ করিয়া থাকেন। কিন্তু কেহই বেদাধ্যয়ন, দান, তপঃ ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা আমার ঐ মূর্তি প্রত্যক্ষ করিতে সমর্থ হয় না; অনন্যসাধারণ ভক্তিপ্রদর্শন করিলেই আমাতে এইরূপে জ্ঞাত হইতে পারে এবং আমাকে দর্শন ও আমাতে প্রবেশ করিতে সমর্থ হয়। হে অর্জুন! যে ব্যক্তি আমার কর্মানুষ্ঠান করে, যে আমার ভক্ত ও একান্ত অনুরক্ত, যে পুত্র-কলত্র প্রভৃতি পরিবারের সহিত আসক্তিরহিত, যাহার কাহারও সহিত বিরোধ নাই এবং আমিই যাহার পরমপুরুষার্থ, সেই ব্যক্তিই আমাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে।’”