ভাস্কর চক্রবর্তী

কবি ভাস্কর চক্রবর্তী। বিংশ শতকের ষাটের দশকের বিশিষ্ট কব। জন্ম ১৯৪৫। মৃত্যু ২০০৫। তিনি পেশায় শিক্ষক ছিলেন।

আঁধার বিষয়ে 

আঁধার বিষয়ে যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো। ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্তের রেখার মতো সময় চলেছে। -আমি কি অসুখ থেকে কোনোদিন উঠে দাঁড়াব না?আজো রাত জাগাজাগি হয়। শরীর মিলিয়ে যায় নরম শরীরে।-আমি শুধু আমার পৃথিবী দেখে যাই…। চারপাশে কেমন হাজারো আলো...

আঠাশে মে, আমার জীবনের

আঠাশে মে, আমার জীবনের আঠাশে মে, আমার জীবনের সুন্দরতম দিন হও তুমি এই সাতাশে মে-র সন্ধেবেলা আমি অন্ধকারে বসে লিখতে চাইছি তুমি কুয়োর বালতির মতো নাচতে নাচতে নীচে নামো, আর আমার জন্যে নিয়ে এসো মসৃণ পবিত্রতম জল নিয়ে এসো অভিমান পুরস্কার আর...

আনন্দ

আনন্দ মৃত্যুর পরেও, আমি কবিতা লিখে পাঠিয়ে দেব তোমাদের। সারাজীবন অদ্ভুত একটা মেয়ের কাছে তোমরা চিঠির পর চিঠি লিখবে। আর ঘুষোঘুষি করবে। আর হাওয়া এসে ধাক্কা মারবে তোমাদের ফাঁকা জীবনে। তোমরা ভালোবাসার কথা কিছুই জানোনা। তোমরা আনন্দের কথা কিছুই জানোনা। সারা সকাল আমি কবিতা...

আমার কবিতা

আমার কবিতা আমার আগেকার লেখাগুলোয় কবিতা করার চেষ্টা করতাম একটু ভাষাটাকে একটু সুন্দর করার ঝোঁক ছিলো আর জুতসই সব নাম লাগাতাম লেখাগুলোর কবিতা, তর্ক করতাম টেবিলে, সৌন্দর্য । কাকে বলে সৌন্দর্য ? এই যে বাবুরা গেলাস নিয়ে বসে পড়েছে সন্ধেবেলা আর মাছভাজা চাইছে ডিমভাজা চাইছে...

আরেকটি প্রেমের কবিতা 

আরেকটি প্রেমের কবিতা এসেছেন মন্থরতা আমাকে পরখ করে দেখছেন সম্প্রতি যুক্তিহীন দিন যায় যুক্তিহীন রাত বৃষ্টি এসে কখনো আঁধার আর কখনো নিঃস্ব করে তোলে রৌদ্র এসে, প্রাণীজগতের ইতিহাস, শোনায় আমাকে__ ইঁদুরের মতো কলে আটকে-থাকা মানুষেরা চায় বেঁচে থাকতে যে যার ছেলের কাছে যে যার...

উৎস

উৎস  কেউ-কেউ হারিয়ে যেতে চায়, চিঠি লেখে দুটো-একটা, হারিয়ে যায়। নৌকাগুলো দুলতে-দুলতে ফিরে আসে— গাছের নিচে আমরা বসে থাকি— তবু নিভতে চায় না আগুন। কতোরঙের ফুল সকালবেলা বিকেলবেলা ছাদের টবে ফুটে ওঠে। কথাটা, কথাটা তো সত্যি ওদের নিয়ে আমাদের আর তেমন কোনো মাথাব্যথা...

কবিতা ১৩৪ 

কবিতা ১৩৪ আমি দেখেছি ডানা ভাসিয়ে এগিয়ে আসছে মরুভূমি- আমি দেখেছি বিষণ্ণ ট্রেন আলো জ্বালিয়ে, ঝলমল, ছুটে যাচ্ছে জংশনের দিকে। এবার যখন আবার ফিরে এলো ক্লান্তির দিন তোমার অনুরোধে আবার আমি চিঠি লিখতে শুরু করলাম তোমাকে। -সেদিন, যখন চারিদিকে সন্ধে, তোমার চিঠি আমি বিছানায় ছড়িয়ে...

কেন

কেন কেন, উন্মাদ করে না ভালোবাসা- আমি শুধু, নতুন কাগজ কিনি-খালি গায়ে ঘুরে বেড়াই ঘরের মধ্যে-চারপাশ থেকে, কেশে ওঠে মানুষ-চারপাশ থেকে কতশত ব্যর্থ দিন বহে গেল- লাল মোটরগাড়িতে, আমার হাসা হলো না-বিয়েবাড়িতে, যথাযথ হাসা হলো না আমার-চিহ্ণহীন বছরগুলো, ওই, পড়ে আছে পেছনে-প্রত্যেক...

চৌ-রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা চারজন 

চৌ-রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা চারজন  ‘এদিকে স্বর্গের পথ’ — বলে একচক্ষু নারী হঠাৎ হারিয়ে গেল— চৌ-রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা চারজন হেসে উঠলাম— এ-ওর মুখের দিকে, তাকিয়ে আমরা হেসে উঠলাম যেন স্বর্গে যাবো বলে সেই ভোরবেলা— অদ্ভুত ছাতা হাতে আমরা...

জিজি 

জিজি  জিজি তোমার দেখা পাইনি অনেকদিন কেমন আছো তুমি? মনে পড়ে কি আমার কথা? বরানগর? দুহাত নেড়ে কথা বলছ, এই ছবিটা দেখতে পাই শুধু। আছো কেমন? ভালবাসছো কোন ছেলেকে? তোমার কথা চৈত্রমাস দুহাত দিয়ে ধরে রেখেছে— এদিকে আমি রদ্দি এক ভাষায় খুব গাল খেয়েছি সমালোচক নিয়েছে...

জিরাফের ভাষা ২৩ 

জিরাফের ভাষা ২৩  এই রাত আর এই অন্ধকার তুমি তার মুখোমুখি একা । শান্ত একটা হাওয়া আর রেডিয়ো চালিয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে । যে জীবন পেলে তুমি কেমন লাগছে সে জীবন ? কষ্টকর ? খুব একা ? খুব বেশি একা ? যেখানে পায়ের ছাপ পড়ে দেখি সেখানেই রক্ত ফুটে ওঠে...

জিরাফের ভাষা ৪৮ 

জিরাফের ভাষা ৪৮ এইসব সারেগামা পেরিয়ে তোমার কাছে দু-ঘন্টা বসতে ইচ্ছে করে। আমার তৃতীয় চোখ হারিয়ে গিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে যে উঠে আসছে আজ আমি তার মুখও দেখিনি। তোমাকে দু:খিত করা আমার জীবনধর্ম নয় চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, নাহলে তো, আরেকটু...

তবু কোনোদিন

তবু কোনোদিন  জামা দিয়েছিল আলাদীন ভাষা দিয়েছিল প্রেমিকারা মুছে যায় শেয়ারবাজারে আমাদের ভালবাসাবাসি। অথবা ছিল না ভালবাসা প্রতিদিন অপমান জ্বর চাল ডাল নুনের শাসনে নতুন পাচিল ওঠে রোজ। তবু তো হঠাৎ কোনোদিন এইসব রাহাজানি ভুলে মাঝরাতে ছাদে উঠে এসে চেয়ে দেখি পৃথিবীর মুখ…...

তাপমাত্রা 

তাপমাত্রা দু-একটা শব্দ নিয়ে সময়গুলো বেশ চেনা যায়। যেমন, ডানা। যদিও আমাদের কবিতা থেকে ঐ ডানাকে এবার আমরা ছেঁটে দিয়েছি। স্পর্শ শব্দটাকে আমরা ভালবাসার জন্য সরিয়ে রেখেছি, বৃত্তকে ফেলে রেখে এসেছি রাস্তায়। দ্যাখো ছোকরা আমি বলতে চাই; আগুন আগুনের মতো ব্যবহার করবে জল জলের...

দূরের টেবিল 

দূরের টেবিল এবার বয়স হলো। মাছরাঙাদের কথা কেন? আমার, তাঁতের শাড়ি ভালো লেগেছিল খুব ষাটের দশকে। আরো ভালো লেগেছিল তাঁতের শাড়ির মহিলাকে। অনেক বছর হলো সেইসব__ আজ কিছু ক্লান্ত, তবু ভালো লাগে যেই দেখি একটি মেয়েকে ঘিরে চার-পাঁচজন বসে আছে দূরের...

নীল সাপের মতো

নীল সাপের মতো নীল সাপের মতো, খুব রাতে আমি জড়িয়ে থাকবো তোমার গলা তুমি ভয় পেলেই, তোমার মুখ লক্ষ করে আমি ফণা তুলবো— তোমার স্বপ্নের ভেতর, তিব্বতী সেজে আমি বাঁশি বাজাবো নেচে-নেচে তুমি চমকে উঠলেই, আমি বহুদূর সমুদ্রের ধারে চলে যাবো। অচেনা পাহাড়ে, আমি নিয়ে যাবো তোমাকে...

প্রতিবহন 

প্রতিবহন যে সব দুপুরগুলো হারিয়েছি __ যে সব বিকেলগুলো__ ফিরে পেতে চাই না আবার। বিষন্নতা, তুমি আজ আমাকে ঘিরো না__ জেনো, আমি একডজন মোমবাতি কিনে এনে নতুন জীবন শুরু করে দেব আগামী সপ্তাহে__ নৌকোভর্তি আশাবাদ নিয়ে যাব পশ্চিমে বেড়াতে__ বিদঘুটে শুয়ার এক চেঁচায় পাশের জেলা থেকে...

প্রার্থনা ১ 

প্রার্থনা ১ এবং যে খেতে পায় না সারাদিন, তুমি প্লেট-ভর্তি খাবার পাঠিয়ো তাকে। এবং রাত্রিবেলা যার ঘুম হয় না তুমি লিখে জানিয়ো তাকে ঘুমিয়ে পড়ার সহজ উপায়গুলো। যার কোনো প্রেমিকা নেই, তুমি অঢেল বন্ধু দিয়ো তাকে___ এবং যে অসুখী আমার মতো, তুমি তাকে চিরকালীন শান্তি...

প্রেম

প্রেম আমার স্মৃতি ছিল জটিল ফলে ডাক্তারবাবু কিছুটা ছেঁটে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে সেই দিন হাঁটু পর্যন্ত মোজা, আর সকালবেলা চুল ছড়িয়ে পড়েছে পিঠে! অথবা, কিছুই ঘটেনি হয়তো কোনোদিন- আমিই হয়তো স্বপ্নে দেখেছিলাম পুরো ব্যাপারটা একটা কাঠবেড়ালী আমার জন্যে...

প্রেমিকেরা প্রেমিকারা

প্রেমিকেরা প্রেমিকারা প্রেমিকেরা একদিন স্বামী হয় । স্বামীরা তারপর আর প্রেমিক থাকে না । অথচ ওমলেট খায় । ফিশফ্রাই খায় । দু-তিন চারপাক রাস্তায় ঘুরে এসে বিড়ি খায় । আরো একটু রাত হলে ন্যাংটো ছবি দেখে । প্রেমিকারা ? তারা বা কোথায় যায় ?- তারা তো স্ত্রী হয়, আর পেটে বাচ্চা ধরে...