অগ্রিম পেমেন্ট – মিখাইল জ্ভানেৎস্কি

আমাদের বুঝতে চেষ্টা করুন। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা সাহায্য চাই না, চাই সহযোগিতা। তা কীভাবে ঘটে থাকে, সেটা বুঝিয়ে বলি।
আপনারা টাকা দেবেন, আমরা সমান অধিকার নিয়ে অংশগ্রহণ করব। অর্থাৎ আমাদের সমস্যা বিষয়ে আমাদের মতামত পেশ করব। আপনারা শুধু শুধু টাকা দিচ্ছেন, তা কিন্তু নয়! বদলে আপনারা পাচ্ছেন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
এই যেমন এই রেস্টুরেন্টে। আমরা আপনাদের নিমন্ত্রণ করেছি, আপনারা বিল পরিশোধ করবেন এবং বদলে খাদ্য পাবেন। তবে আমাদের মনোযোগ ও পরামর্শ থেকে আমরা আপনাদের বঞ্চিত করব না। এ ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আসলে অমূল্য। কারণ এখানেই আমাদের বসবাস। আমাদের সাম্প্রতিক অর্থনীতির এটাই বৈশিষ্ট্য—অকপটতা।
হ্যাঁ, আজ আমরা আপনাদের টাকায় আপনাদেরই খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আপনাদের আপ্যায়ন করছি। পরিবর্তে আপনারা আমাদের কাছ থেকে পাচ্ছেন এর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান কিছু—বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, এমনকি বলা যায়, পূর্বাভাস।
শুধুই কি তাই? সেই সাহায্যকেই আমরা শ্রেয়তর মনে করব, যে সাহায্যের পরে অবধারিতভাবে প্রয়োজন হবে আরেকটি সাহায্যের। আগেরটির চেয়ে জোরালো ও দীর্ঘমেয়াদি।
অর্থাৎ, কথা হচ্ছে সেই সাহায্য বিষয়ে, যা আপনারা আমাদের দিতে পারেন, তবে এর জন্য আপনাদের সংগ্রাম করতে হবে আরও কিছুর সঙ্গে।
ঠিক এটাই, আবারও উল্লেখ করি, আমাদের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে—সারকথা। আরও একটা কথা বলে রাখা ভালো, আমাদেরকে সাহায্য করার অধিকার অর্জনের জন্য আপনাদের দেওয়া প্রথম ইনস্টলমেন্টের টাকাটা একেবারেই তুচ্ছ সেই সংগ্রামের তুলনায়, যার মুখোমুখি আপনাদের হতে হবে দুই-তিন বছর পর আমাদেরকে সত্যিকারের সাহায্য করার অধিকার অর্জন করতে।
আমরা কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে সবকিছুই গ্রহণ করতে পারি।
ওষুধ থেকে শুরু করে টাকা পর্যন্ত, সব। এ ব্যাপারে আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন। আমরা আপনাদের কাছ থেকে চলচ্চিত্র নেব, নেব টিভি প্রোগ্রাম, এমনকি ‘আমাদের সঙ্গে থাকুন’ বাক্যটিও।
এ ছাড়া ওপরে উল্লিখিত সবকিছু বাস্তবায়নের জন্য টাকাও আমরা নেব। এবং সেটা হবে সূচনামাত্র। আমাদের সাহায্য করার অধিকার আদায় করতে আপনাদের আরও সংগ্রাম করতে হবে।
মূলত আমাদেরই সঙ্গে। শুরুর দিকে।

আমাদের ‘মেন্টালিটি’। দেখেছেন, শব্দটা কিন্তু আমরা আপনাদের কাছ থেকে নিয়েছি। তো যা বলছিলাম, আমাদের মেন্টালিটি এমন যে, আপনাদের দেওয়া সাহায্য গ্রহণে তা সম্মতি দেয় শুধু সেই ক্ষেত্রে, যদি আপনাদের উদ্দেশে দেওয়া আমাদের গালিগালাজ ও অভিশাপ আপনারা কৃতজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করেন।
আপনাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে, ভিসা বাতিল করে, আপনাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে, মুনাফা করার আশা ত্যাগ করতে বাধ্য করে এবং আমাদের নব্য ধনীদের অস্ত্রের মুখোমুখি করিয়ে আমরা আপনাদের সঙ্গে আমাদের স্বার্থের ভারসাম্য আনব।
যা বলছি, বুঝতে পেরেছেন?
এটা হবে আপনাদের জন্য উদ্দীপকের মতো, যা আপনাদের আমাদের দেশি বাজারে ঢুকতে সাহায্য করবে। আর আমাদের বাজারটা কিন্তু বিশাল!
তাই বলি, টাকা আনুন। আনুন ট্রাকভর্তি খাদ্যদ্রব্য। প্রতিদান হিসেবে আমাদের দাবি থাকবে শুধু একটাই, উন্নত দেশগুলোর সংগঠনে আমাদেরকে গ্রহণ করতে এবং বিশ্বে শান্তিস্থাপন-প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দিতে হবে।
ন্যাটো যেন সম্প্রসারিত হতে গিয়ে আমাদের সীমানার কাছে না আসে, সে দাবি করার অধিকার আমাদের থাকবে। অর্থাৎ আপনাদের সংকুচিত হয়ে সম্প্রসারিত হতে হবে। এটা অবশ্য সামরিক ব্যাপারস্যাপার।
আমাদের আরও একটি অধিকার দিতে হবে—আপনাদেরকে হুমকি দেওয়ার। বা সম্ভব হলে প্রথম পারমাণবিক আঘাত হানার।
শুধু কথায় নয়, কাজেও, আমাদের সামরিক শিল্পে আপনাদের অর্থ বিনিয়োগের পর আমাদের প্রস্তাবিত পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে, যাতে আমরা হানতে পারি প্রথম আঘাত। এবং আকস্মিক। এটাই আমাদের শর্ত। ও, হ্যাঁ, আর নয় বিলিয়ন ডলার অগ্রিম পেমেন্ট।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ২৭, ২০১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *