ওরে বাবা! – আদনান মুকিত

পার্কে বসে বাদাম চিবাচ্ছি। নিজেকে একটি বিশেষ গোত্রের প্রাণী মনে হলেও কিছু করার নেই। প্রেমে পড়লে প্রেমিকার সঙ্গে পার্কে বসে বাদাম চিবানো মোটামুটি ঐতিহ্যের পর্যায়ে পড়ে। প্রেমিকা রিয়া অত্যন্ত ঐতিহ্য-সচেতন। আজকে অবশ্য তার মুড খারাপ; ঠিক এই বাদামগুলোর মতো।
রিয়া হতাশ কণ্ঠে বলল, বাবা বিয়ের কথা ভাবছেন।
আমি মুখ বিকৃত করে বললাম, (রিয়ার কথা শুনে না, পচা বাদামের কারণে) তোমার মায়ের কী মত?
মাও রাজি।
আমার বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পৃথিবীতে হচ্ছেটা কী? সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া একটা লোক আবার বিয়ে করার কথা ভাবছে। তার প্রথম স্ত্রীও এতে রাজি! একমাত্র কন্যা হতাশ হতেই পারে। আমি ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, তোমার বাবাকে বোঝাও। এ বয়সে বিয়ে করাটা কি ঠিক হবে? লোকে কী বলবে?
মানে?
এই সমাজে বয়স্ক লোকেরা দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা কেউ ভালোভাবে নেয় না, তাই বলছিলাম।
তুমি, তুমি এমন অসভ্য টাইপের একটা কথা কী করে বললে? বাবা আবার বিয়ে করবে কেন?
তুমিই তো বললে, উনি বিয়ের কথা ভাবছেন।
গাধা, বাবা আমার বিয়ের কথা ভাবছেন।
ও। মেয়ের বিয়ের কথা তো বাবাই ভাববেন। পাশের বাসার আঙ্কেল ভাবলে না হয় অবাক হতাম।
দেখ, আমার সঙ্গে রাজনীতি করবা না। বিয়ের কথা বাবার সামনে গিয়ে বলতে পারবে?
তোমাদের বাড়িতে দোনলা বন্দুক আছে?
না।
তাহলে পারব। এটা কোনো ব্যাপারই না। সমস্যা হলো, তোমার বাবাকে না হয় বললাম, কিন্তু আমার বাবাকে কী করে বলব? বাবার যে রাগ, নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
তুমি বলেছিলে ওনার হার্টে কোনো সমস্যা নেই।
তাতে কী? আমার তো আছে।
ওফ। তোমার মতো গাধাকে কেন যে আমার ভালো লাগল তা ভাবলেই অবাক লাগে।
বলো কী! আমারও অবাক লাগে! কী মিল!
মিল বুঝি না। তুমি আজই তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলবে।
অসম্ভব। বাবার একটা লাইসেন্স করা বন্দুক আছে। প্রতিবছর জঙ্গলে গিয়ে পশুপাখি শিকার করেন। এ বছর এখনো শিকারে যাননি। বিয়ের কথা বললে নিশ্চিত আমাকে গুলি করবেন। আমি পারব না। তারচেয়ে চলো খাজাবাবা বা অন্য কোনো বাবার লাইনে চলে যাই। তাঁদের আশীর্বাদে আমি বাবার সামনে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে পারব।
কী যে তুমি বলো। ওসব লাগবে না, চলো। আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। আজই বলবে।

রিয়াকে কিছুতেই দাবিয়ে রাখতে পারলাম না। আমি না গেলে নাকি সে একাই যাবে। তা কি হয়? একটা দায়িত্ব আছে না। রাজি হতেই হলো। বাবাকে যা বলব, তা একটা কাগজে লিখে নিলাম। রিয়া অবশ্য মানা করছিল, তবে আমি পাত্তা দিলাম না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও কাগজে লেখা থাকে। এতে দোষের কিছু নেই। বহুদিন পর আবার মুখস্থবিদ্যার চেতনা জেগে উঠল। প্রেম করলে যে কত কিছু করতে হয়! এর চেয়ে সব ছেড়েছুড়ে মুসা ইব্রাহীমের মতো এভারেস্টে চলে যেতাম, কোনো ভেজালই হতো না। আমি নিশ্চিত, বাবাকে বিয়ের কথা বলার চেয়ে এভারেস্টে ওঠা অনেক সহজ। দড়ি বেয়ে সোজা উঠে যাব। কোনো ঝামেলা নেই। ধুর, মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আজই বোধহয় আমার জীবনের শেষ দিন। রিয়াকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই বাবা ক্রসফায়ার করবেন। আমি শেষ। পার্কে বসে আর বাদাম খাওয়া হবে না। নিজেই বাদাম হয়ে যাব। পত্রিকায় খবর বেরোবে, প্রেমের করুণ পরিণতি, পিতার গুলিতে পুত্র খুন!
বাসার যত কাছে আসছি, টেনশন তত বাড়ছে। মনে হচ্ছে, এখনই দৌড়ে পালাই। কিন্তু রিয়া আবার শক্ত করে আমার হাত ধরে রেখেছে। কী বিপদ!
বাড়ির ঠিক সামনে এসে মনে হলো, রিয়াও ভয় পাচ্ছে। নিজেকে সাহসী প্রমাণের এই সুযোগ। আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই, আমি আছি না? দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। উঠোনের চেয়ার খালি। তার মানে বাবা ঘরে। ভেতরের দিকে এগোতেই ঘর থেকে বাবা বেরিয়ে এলেন। হাতে বন্দুক। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। বাবা বজ্রকণ্ঠে বললেন, আয়, তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম…
এখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার কোনো মানেই হয় না। কাগজপত্র ফেলে ঘুরে দৌড় দিলাম। বাড়ি থেকে অনেক দূরে এসে হঠাৎ খেয়াল হলো, রিয়া আমার সঙ্গে নেই। কী আশ্চর্য, ও বলেছিল চিরদিন আমার সঙ্গেই থাকবে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সব শেষ। আহা! বড় ভালো মেয়ে ছিল। শুধু খরচ একটু বেশি করত, এই যা। রিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, উঠোনের চেয়ারে বসে বাবা আর রিয়া চা খাচ্ছে! আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। রিয়া তো দেখছি ডেঞ্জারাস মেয়ে! বাবাকেও কায়দা করে ফেলেছে। আমি ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বন্দুকটা বাবার পাশেই আছে। ঘুরে আবার দৌড় দেব কি না তা ভাবছি, বাবা বললেন, এভাবে দৌড় দিলি কেন?
আমার মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। বহুকষ্টে বললাম, ‘বন্দুক’।
অনেক দিন বন্দুকটা পরিষ্কার করা হয় না, তাই বের করেছিলাম। তুই দৌড় দিলি কেন?
না মানে…দৌড় ভালো ব্যায়াম!
চোপ! পাঁচ লাইনের একটা লেখায় চারটা বানান ভুল! এই লেখাপড়া শিখেছিস?
আমি মাথা নিচু করে রইলাম। বাবা রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, বানানগুলোর সঙ্গে এই গাধাটাকেও একটু ঠিকঠাক করে দিয়ো। পারবে না?
রিয়া লাজুক মুখে মাথা নাড়ল। মানে সে পারবে। আমারও তাই ধারণা। যে মেয়ে বাবার সঙ্গে বসে হাসিমুখে চা খেতে পারে, তার কাছে আমাকে ঠিক করা কোনো ব্যাপারই না। আর আমিও এমন গাধা, শুধু শুধু বাবাকে ভয় পাই। বাবা মানুষটাকে আসলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ২০, ২০১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *