ভদ্রতার কায়দা-কানুন

সবে বসেছি খাওয়ার টেবিলে, বাবা জিজ্ঞেস করল—
খেতে বসার আগে তোমরা হাত ধুয়েছ তো?
‘হ্যাঁ’, আমরা জানালাম।
‘ঠিক আছে, গুড অ্যাপেটাইট।’

যেই আমি স্যুপের চামচ ধরেছি মুখের সামনে, বাবা আমাকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলল—
‘খবরদার! জেট বিমানের ইঞ্জিনের মতো শব্দ করে চামচ থেকে স্যুপ টানবে না!’
‘কিন্তু স্যুপ তো গরম, বাবা!’ তার কথায় আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলাম।
‘গরম হোক বা না হোক, ভদ্রলোকেরা সব সময় নিঃশব্দে খায়।…আর তুমি শোনো,’ আমার ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বাবা বলল, ‘চামচ ভর্তি করে স্যুপ নিয়ো না। নিলে ফোঁটা ফোঁটা স্যুপ পড়বে প্লেটে আর টেবিলের চাদরে। এটা অভদ্রতা।’

নিঃশব্দে খাওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে গেলাম আমি। আর ছোট ভাই আধা চামচ করে স্যুপ নিয়ে খেতে থাকল। মনে হলো, এখন আমরা ভদ্রতার যাবতীয় কায়দা-কানুন মেনে চলছি। কিন্তু হঠাৎ বাবা আবার বলল আমাদের উদ্দেশে, ‘সোজা হয়ে বসো! অত কুঁজো হয়ে বসলে তোমাদের মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাবে। আমার বিশ্বাস, তোমাদের কুঁজ হোক, তা তোমরা নিশ্চয়ই চাও না।’

কুঁজ হোক, তা চাই না বলে আমরা চেষ্টা করলাম সোজা হয়ে বসে থাকার। কিন্তু অচিরেই লক্ষ করলাম, সোজা হয়ে বসে থাকা অবস্থায় স্যুপভর্তি চামচ মুখের কাছে নিয়ে আসাটা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। সেটা লক্ষ করল বাবাও, কিন্তু স্ববিরোধিতা এড়াতে চুপ করে রইল।

দ্বিতীয় কোর্স খাবার শুরু করার সময় আবার অসন্তোষ প্রকাশ করল বাবা, ‘শূকরছানার মতো শব্দ করে চিবাচ্ছ কেন?’
ছোট ভাই খিকখিক করে হেসে উঠল, কিন্তু গলার স্বরে পূর্বতন কাঠিন্য বজায় রেখে বাবা বলল, ‘আনন্দ করার কোনো কারণ তো আমি দেখছি না।’
‘তুমি ওদের পেছনে লেগেছ কেন?’ মা নাক গলাল অবশেষে, ‘বাচ্চারা এমনিতেই যথেষ্ট ভদ্র আচরণ করছে।’
‘ভদ্র আচরণ? এটাকে তুমি ভদ্র আচরণ বলতে চাও?’ বিদ্রূপাত্মক স্বরে কথাটা বলেই কাটলেটের অর্ধেকটা মুখের ভেতরে চালান করে দিল বাবা, ‘ওদের বয়সে আমি…’
ঠিক সেই সময় কাশি শুরু হওয়ায় বাবা তার কথা শেষ করতে পারল না। কাশি ঠেকাতে ন্যাপকিন ধরল মুখের কাছে এবং একটু পরেই সেদ্ধ করা গলদা চিংড়ির মতো লাল হয়ে উঠল তার মুখ। চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল টপটপ করে। বাবা বাথরুমের দিকে দৌড় লাগালে আমি আর আমার ছোট ভাই দম ফাটিয়ে হাসতে শুরু করলাম। কিন্তু মা তিরস্কারের দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিরস্ত করল আমাদের।
অবশেষে বাবা ফিরে এসে বসল টেবিলে, বলল, ‘কাশি এমন ভয়ংকরও হতে পারে!’
ছোট ভাই আবার হেসে উঠল খিকখিক করে, কিন্তু বাবার কঠোর দৃষ্টি লক্ষ করে নিশ্চুপ হয়ে গেল।

টেবিল থেকে প্লেটগুলো সরিয়ে মিষ্টি পিঠার প্লেট এনে রাখল মা।
‘পিঠা খেয়ে মাকে প্লেট ধুতে সাহায্য করবে,’ আঙুল উঁচিয়ে ধরে উপদেশমাখা স্বরে বাবা বলল, ‘ভদ্রলোকেরা তা-ই করে।’
খাওয়া শেষে বাবা উঠে চলে গেল শোবার ঘরে। একটু পরেই সেখান থেকে ভেসে আসতে লাগল নাক ডাকার গুরুগম্ভীর শব্দ।
প্লেট ধোয়ামোছা শেষ করে ছোট ভাই সাবধানে জিজ্ঞেস করল মাকে, ‘মা, বাবা কি ভদ্রলোক?’
মা প্রথমে ভান করল, যেন কথাটা শুনতে পায়নি, কিন্তু পরে মুচকি হেসে বলল,
‘অবশ্যই। তবে ও ভীষণ ক্লান্ত এখন।’

স্তেফান বিৎমান: চেক লেখক।
অনুবাদ: মাসুদ মাহমুদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ২৪, ২০১০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *