‘ঘরের বারান্দায় বিশ্বকাপ! স্টেডিয়ামে বসে খেলা না দেখলে পরকালে কী জবাব দিবি?’ মোবাইল ফোনে কথার ‘গুগলি’ ছুড়লেন মামা। অপর পাশের ব্যক্তি কী বললেন তা আমাদের জানার সুযোগ নেই। তবে লোকটার কথা শুনে মামা আনন্দে এমন হাসি দিলেন যেন মামার বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল। ফোন রেখেই হাতে তুলে নিলেন আধুনিক যুগের হাতিয়ার ‘ইলেকট্রনিক মসকিউটো ব্যাট’। মশা মারতে কামান দাগানো একেই বলে! পটপট শব্দে কয়েকটি মশার জীবনাবসান হলো। তালি মেরে মারার চেয়ে পটপট ফুটিয়ে মশা মারায় মনে হয় বেশি আনন্দ।
এমন সময় রুমে ঢুকল ভাগ্নে মফিজ। সদ্য বিলাতফেরত মুরগি। চলাফেরায় ডিসকো ডিসকো ভাব। মামা-ভাগ্নের টিকিট-বাণিজ্যের প্রধান বাণিজ্য কর্মকর্তা। বিদেশে থাকার সময় মফিজ ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিশ্বকাপ খেলার অনেকগুলো টিকিট কিনেছিল। তখন এ খবর পাওয়ামাত্র মামার তরফ থেকে ভাগ্নের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল বারোমাসি গোলাপের শুভেচ্ছা! ভাগ্নে দেশে পা রাখলে তাকে দেওয়া হলো লাল কার্পেট সংবর্ধনা। সেই আমদানিকৃত টিকিট দিয়ে শুরু হয়েছে মামা-ভাগ্নের কারবার। তারা ২০০ টাকার প্রতিটা টিকিটের দাম হেঁকেছে পাঁচ হাজার টাকা। বাঙালি ক্রিকেট-পাগল; কিন্তু কেউ টিকিট কেনায় পাগলামি দেখাচ্ছে না কেন তা তারা বুঝতে পারছে না!
আজকে মামা আফাজ উদ্দিনের মুখে হাসি দেখে মফিজও দাঁতগুলো বের করে দিল। ‘ভাগ্নে, নো টেনশন। আমার এক বন্ধু হানিমুনে কক্সবাজার যাচ্ছে। ওর ওয়াইফ নাকি স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে চায়। ব্যস, এই সুযোগে আমি চট্টগ্রামের ম্যাচের দুটো টিকিটের দাম চাইলাম ১৪ হাজার টাকা। শেষমেশ ১০ হাজারে রাজি হয়ে গেল।’ মফিজ বেচারা সারা দিন বন্ধুদের ডোর টু ডোর ঘুরে একটা টিকিটও বিক্রি করতে পারেনি। সবার এক দাবি, টিকিটের দাম কমাতে হবে। দাম কমালে তো আর মামা-ভাগ্নের ব্যবসা চলবে না।
টিকিট বিক্রির জন্য মামা তাঁর ফেসবুকের স্ট্যাটাসে নিজের মোবাইল ফোনের নম্বর দিয়েছেন। সেই সুবাদে হরদম ফোন আসছে। কিন্তু কাজের ফোন একটাও না। ফোন করে ক্রিকেট সম্পর্কে যে যার জ্ঞানগর্ভ মতামত প্রদান করছে। ‘ইন্ডিয়ার বিপক্ষে প্রথমে ব্যাটিং নিলে জয় অনিবার্য হতো’, ‘আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে ব্যাটিং নেওয়াই রান কম হওয়ার কারণ’—এমন নানা মত শুনে মামার মাথা গেল আউলে। রেগে গিয়ে মামা একজনকে বলেই বসলেন, ‘আরে ভাই, ম্যারাডোনা কেন ক্রিকেট খেলে নাই তা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন? (হঠাৎ আপনি থেকে তুই!) মাথাব্যথা করলে প্যারাসিটামল চুষে খা। যা ভাগ।’
সন্ধ্যায় কাজের মেয়ে কুলসুম এসে খবর দিল যে এক লোক মামার কাছে এসেছে। মামার বন্ধু মনে হয় টিকিট নিতে এসেছে! মামা-ভাগ্নে তাই ‘হাই জাম্প’ ‘লং জাম্প’ দিয়ে ড্রয়িংরুমে হাজির। কিন্তু অতিথিকে দেখে তাদের আশার সূচকে ধস নামল। একটু পরই অবশ্য চাঙাভাব ফিরে এল। ভদ্রলোকও টিকিট কিনতে এসেছেন। কথা পাকাপাকি করে গেলেন। কাল টিকিট নিতে আসবেন।
লোকটা চলে গেলেই বাড়ির দারোয়ান হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল। বলল, ‘মামা, যে লোকটা আইছলো ওরে চেনেন নাকি? আগের বছর ফোকলাগো বাড়িততে কানা ফোকলারে ধরে নিয়ে গিছলো। পরে তো ক্রসফায়ার!’ এটুকু শুনেই মামা বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তখনই ফোন বেজে উঠল। মফিজ রিসিভ করল। মামার সদ্য বিবাহিত বন্ধু টিকিট নেবে না। এ খবরে ভাগ্নেও মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। টিকিটগুলো কি তবে শেষ পর্যন্ত জাদুঘরে রাখতে হবে!
মামা হাইপ্রেশার আর ভাগ্নে লো-প্রেশারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাগত। মুমূর্ষু মামা-ভাগ্নেকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে টিকিটের ক্রেতা প্রয়োজন। আসল দামটুকু দিলেই হবে। বিস্তারিত ঠিকানার জন্য যোগাযোগ করুন রস+আলো কার্যালয়ে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ০৭, ২০১১