১৩১.

ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা সিস্টিন চ্যাপেলের পথে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা টিভি সেট আছে। সেখানে সম্প্রচারিত হচ্ছে এমন এক দৃশ্য যা আসার কথা নয় এখানে। তাকাল সে ভিক্টোরিয়া স্ট্রোর দিকে। অধোমুখে বসে আছে মেয়েটা।

চোখ বন্ধ করল ক্যামারলেনগো। হয়ত মরফিনের প্রভাবে হ্যালুসিলেশন হচ্ছে। আবার খুলল সে চোখ। ব্যাপারটা এমন নয়।

তারা সব জানে।

হঠাৎ করেই, কোন ভয় কাজ করল না তার ভিতরে।

পথ দেখাও, পরমপিতা! এমন কিছু দেখাও যাতে আমি তাদের বিশ্বাস করাতে পারি।

কোন জবাব শুনতে পায় না ক্যামারলেনগো।

পরমপিতা! আমরা এতদূরে এসেছি ব্যর্থ হবার জন্য?

নিরবতা।

আমরা কী করেছি তা তারা বুঝতে পারবে না।

জানে না ক্যামারলেনগো, কার কথা শুনতে পাচ্ছে সে নিজের ভিতরে। কিন্তু একেবারে হতবাক হয়ে যায় সে।

আর সত্যিই তোমাকে মুক্ত করবে…

 

তাই সিস্টিন চ্যাপেলের কাছে এগিয়ে যেতে যেতে ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা মাথা উঁচু করে রাখে। তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা কার্ডিনালদের চোখে বিন্দুমাত্র নম্রতা নেই।

ব্যাখ্যা কর নিজের কাজ, চোখগুলো বলছে, এ কাজের একটা কারণ দাড়া করাও। জানাও, আমাদের ভয় অমূলক।

ভাবছে ক্যামারলেনগো, সত্যি! এ দেয়ালের পিছনে, সামনে অনেক সত্যি গুমরে মরছে। আর এমন এক সত্যির মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি যে তাতে আঁধার এগিয়ে আসে। সে আঁধারেই আমি সন্ধান পাই আলোকের।

আপনারা যদি আপনাদের আত্মা দিয়ে লাখ লাখ প্রাণ বাঁচাতে পারেন, করতেন কি তেমন কাজ?

পুরো চ্যাপেল চুপ থেকে তার কথা শুনে গেল।

এগিয়ে গেল সে উন্মত্তের মত, কার্ডিনালদের সামনে, বড় পাপ কোনটা? শত্রুকে খতম করা? নাকি আসল ভালবাসাকে বিকিয়ে যেতে দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা?

সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে সবাই গাচ্ছে গান!

সিস্টিনের ছাদের দিতে তাকিয়ে থাকল ক্যামারলেনগো। অন্ধকার ভল্ট থেকে তাকিয়ে আছে মাইকেলেঞ্জেলোর ঈশ্বর… দেখতে তৃপ্ত।

আসি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না… বলল সে।

সবাই এখনো মরা চোখে তাকিয়ে আছে। কোন আবেগ নেই সেখানে। তারা কি প্রয়োজনটা দেখতে পাচ্ছে না?

ব্যাপারটা একেবারে খাঁটি।

ইলুমিনেটি। বিজ্ঞান আর শয়তান এক মঞ্চে।

পুরনো ভয়কে সংশোধিত কর। তারপর ফেল ভেঙে।

ভয় আর আশা। তাদের বিশ্বাস করাও।

আজ রাতে ইলুমিনেটির ক্ষমতা প্রকাশিত হয়েছে। সারা রোম জুড়ে আতঙ্কের লহর বয়ে গেছে।

তারপর মানুষ দেখেছে ঈশ্বরের মহিমা।

ঈশ্বরের কন্ঠ যেন এখনো শুনতে পাচ্ছে সে। ওহ্! এই বিশ্বাসহীন পৃথিবী! কারো কারো তাদের কাছে পৌঁছতে হবে। তুমি। তুমি না হলে কে? তোমাকে রক্ষা করা হয়েছে একটা উদ্দেশ্য সামনে রেখে। তাদের সামনে উন্মোচিত কর অকল্যাণকে। তাদের ভয়ের কথা নতুন করে জানিয়ে দাও। নিরবতা মৃত্যুর সমতুল্য। অন্ধকার না থাকলে আলোর কোন মূল্য নেই। খারাপ না থাকলে ভালর কোন মর্যাদা নেই। তাদের। সামনে তুলে দাও বিচারের ভার। ভাল অথবা মন্দ। ভয় কোথায় গেল? কোথায় গেল বীরেরা? এখন না হলে কখন?

সবাই দাঁড়িয়ে আছে। পথে বিছানো আছে কার্পেট। তার মনে হল সে মোজেস। সাগর দ্বিখন্ডিত করে এগিয়ে যাওয়া মূসা।

এইযে রবার্ট ল্যাঙডন বেঁচে আছে, সেটাও ঈশ্বরের মর্জি। তিনি তাকে রক্ষা করেছেন। ভেবে পায় না ক্যামারলেনগো, কেন।

একটা কণ্ঠ চিরে দিল সিস্টিন চ্যাপেলের বুক, তুমি আমার বাবাকে হত্যা করেছ।

তাকাল সে ভিট্টোরিয়া ট্রোর চোখের দিকে। সেখানে ভয় নেই। আছে কষ্ট। এবং ঘৃণা। তাকে বুঝতে হবে, তার বাবার ক্ষমতা অকল্যাণের পথে চলে যাচ্ছিল। মানুষের কল্যানেই করা হয়েছে, যা করা হয়েছে।

তিনি ঈশ্বরের কাজ করছিলেন! এখনো চিৎকার করছে ভিট্টোরিয়া ভেট্রা।

ঈশ্বরের কাজ ল্যাবে করা যায় না। করতে হয় হৃদয়ে।

আমার বাবার হৃদয় ছিল পবিত্র! আর তার রিসার্চ প্রমাণ করেছিল–

তার রিসার্চ প্রমাণ করেছিল মানুষের মস্তিষ্ক তার আত্মার চেয়ে বেশি গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। যদি তোমার বাবার মত একটা লোক আজ রাতে দেখা অস্ত্রের মত বিধ্বংসী কোন কিছু তৈরি করে, তাহলে কল্পনা কর সাধারণ মানুষ সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করবে!

তোমার মত মানুষ?

একটা লম্বা শ্বাস নিল ক্যামারলেনগো। সে কি দেখতে পায়নি?

মানুষের নৈতিকতা বিজ্ঞানের সাথে সমান তালে এগুচ্ছে না। আমরা এখনো এমন কোন অস্ত্র তৈরি করিনি যেটার ব্যবহার হয়নি কখনো। মানুষ অনেক আগে থেকেই হত্যা করতে শিখেছে। আর তার মায়ের রক্ত গিয়েছে সে কারণেই।

শতাব্দিকাল ধরে, বলছে ক্যামারলেনগো, বিজ্ঞান যখনি অতিরিক্ত বাড় বেড়ে যায়, তখনি সেখানে একটা যতি চিহ্ন একে দেয় চার্চ। কৃত্রিম মিরাকল। হৃদয়কে আত্মা থেকে দূরে সরিয়ে আনার চেষ্টা। তারা ঈশ্বরকে হ্যালুসিলেশন হিসাবে আখ্যায়িত করে। প্রমাণ চায় তারা। প্রমাণ করে, তিনি নেই।

প্রমাণ? তার আগে বল, তোমরা কেন মেনে নিতে পার না যে তোমাদের ক্ষমতার বাইরে কোন একটা শক্তি আছে? যেদিন মানুষ ঈশ্বরকে তৈরি করবে একটা ল্যাবে, বুঝতে হবে সেদিন মানুষের মনে নতুন করে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, যেকোন মূল্যে।

তুমি বলতে চাও সেদিনের কথা, যেদিন মানুষের কাছে চার্চের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, বলল ভিট্টোরিয়া, ক্যামারলেনগার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, সন্দেহকে তুমি কাজে লাগিয়েছ। চার্চই কি পৃথিবীর বুকে একমাত্র আলোকিত প্রতিষ্ঠান? শুধু এখানেই : কি ঈশ্বরের আরাধনা করা হয়? খোঁজা হয় তাকে?

সব মানুষ, নানা পথে, তাকেই খুঁজে ফেরে। ঈশ্বর কি নিজের অসাধারণত্ব এই চার দেয়ালের বাইরে কোথাও দেখাতে পারেন না? পারেন না তিনি তার ক্ষমতাকে একটা ল্যাবে প্রকাশ করতে? তিনি কি এতই নাক উঁচু? এতই পক্ষপাতিত্ব তার সব সৃষ্টির উপর? ধর্ম জন্ম নিয়েছে বিশ্বাসের খোঁজে। সেই বিশ্বাসটাই অর্জনের চেষ্টা করেছিল আমার বাবা। সমান্তরাল পথে। কেন ব্যাপারটা তোমার চোখে পড়ল না? ঈশ্বর উপর থেকে তাকিয়ে থাকা কোন কুটিল, কুচক্রি অস্তিত্ব নন যিনি সারাক্ষণ উপর থেকে আমাদের দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে থেকে আমাদের নরকের শেষ কুন্ডে ফেলে দেয়ার পায়তাড়া ভাঁজবেন। তিনি সবখানে আছেন। সর্বত্র। তিনি এক এবং অদ্বিতীয় শক্তি যা পরিবাহিত হয় সকল জগতে, জীবে, জড়তে, শূণ্যতায়। তোমার রক্তে রক্তে, আমার হৃদয়ে, একটা শক্ত পাথরের মধ্যেও।

বিজ্ঞান ছাড়া। বলল সতেজে ক্যামারলেনগো, বিজ্ঞান, সায়েন্স, সংজ্ঞামতে, আত্মাহীন। এখানে কোন নীতি নেই। নেই কোন দিকনির্দেশনা। একটা কিছু আবিষ্কার করলেই হল। যে প্রতিবস্তু ঈশ্বর তৈরি করে আমাদের জগৎ থেকে অনেক অনেক অকল্পনীয় দূরত্বে রেখেছেন, সেটাকে তোমাদের নগ্ন বিজ্ঞান টেনে আনে এখানেই। ঈশ্বরহীন পথে চলে বিজ্ঞান। এই কি আলোকিত পথ? এমন সব প্রশ্নের জবাব খোঁজা যার আদৌ জবাব না থাকাই সুন্দর?

নাড়ল মাথা ক্যামারলেনগোগা, না!

হঠাৎ ক্লান্ত বোধ করে ক্যামারলেনগো। ভিট্টোরিয়ার কঠিন দৃষ্টির সামনে, নিরবতার সামনে নুয়ে পড়ে দুর্বল, নেশাচ্ছন্ন ক্যামারলেনগো। এটা কি ঈশ্বরের শেষ পরীক্ষা?

এবার নিরবতা ভাঙল মাটি। প্রেফারিতি… ব্যাজ্জিয়া আর অন্য তিন কার্ডিনাল… বলো না যে তুমি তাদেরও শেষ করে দিয়েছ!

অবশ্যই! তাকায় ক্যামারলেনগো। এখন প্রতিদিন মিরাকল ঘটায় বিজ্ঞান। আর ধর্ম? কত যুগ ধরে, কত শতাব্দি ধরে নিশ্ৰুপ আছে? ধর্মের দরকার ছিল একটা উজ্জীবনী শক্তির। অবিশ্বাসী পৃথিবীর সামনে একটা প্রমাণের প্রয়োজন ছিল খুব।

প্রেফারিতিরা সেই একই কাজ করত যা করে এসেছে তাদের পূর্বপুরুষরা। পুরননা, জঙ ধরা পদ্ধতি। পৃথিবীর নতুন একজন নেতা খুব দরকার। তরুণ। ক্ষমতাবান। অলৌকিকতায় ভরা।

ভয় আর আশা।

আত্মবলিদান কর লাখো মানুষকে বাঁচাতে।

কত হাজার হাজার মানুষ তাদের প্রাণ দিয়েছে চার্চের জন্য? আর তারা মাত্র চারজন। বেঁচে থাকলে কোন কাজেই লাগত না। মারা যাওয়ায় হয়ে থাকবে প্রাতঃস্মরণীয়।

প্রেফারিতি! বলল আবার মাটি।

আমি তাদের বেদনা ধারণ করেছি আমার শরীরেও। আর আমিও মারা যেতাম ঈশ্বরের জন্য। কিন্তু আমার কাজ মাত্র শুরু হতে যাচ্ছিল। তারা বসে আছে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে!

এমনভাবে মর্টাটি তাকিয়ে আছে তার দিকে যেন সে নিজহাতে খুন করেছে কার্ডিনালদের।

প্রয়োজনে তাও করতাম আমি!

আমি জ্যানাস! প্রয়োজনে আমি আমার ক্ষমতা দেখাতে পারি!

গানের দিকে মন দিন! বলল ক্যামারলেনগো, হাসতে হাসতে, তার হৃদয় পূর্ণ হয়ে আছে তৃপ্তিতে, অকল্যানের উপস্থিতি ছাড়া কিছুই হৃদয়গুলোকে একত্র করতে পারত না। একটা চার্চ জ্বালিয়ে দিন, তারপর দেখুন মানুষ কীভাবে একত্র হয়। কী করে প্রতিরোধ করে। ফিরে আসে বিশ্বাসে।

আজ রাতে হাজির হওয়া প্রতিটা মানুষের দিকে দৃকপাত করুন। ভয় তাদের একত্র করেছে। ভালর জন্য…

কথা বন্ধ করে দিল সে। তারপর আবার ভাবা শুরু করল। মর্ফিনের প্রভাবে। ইলুমিনেটি উঠে আসেনি। ইলুমিনেটি বলে কিছু নেই। অনেক অনেক আগেই তারা বিলীন হয়ে গেছে আড়ালে। শুধু তাদের মিথ বেঁচে আছে। যারা জানত, শিউরে উঠেছে, যারা জানত না, নিজের অজ্ঞতা দেখে লজ্জা পেয়েছে।

তাহলে ব্র্যান্ডগুলো? মাটির কণ্ঠে বিস্ময়।

জবাব দিল না ক্যামারলেনগো।

বর্গিয়া এ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে, তালাবদ্ধ অবস্থায়, লুকিয়ে ছিল সিলগুলো। ধূলিম লিন। এগুলো এক ভয়ানক, যে পোপের চোখ ছাড়া আর কোথাও পড়বে না।

কেন তারা সে জিনিসগুলো লুকিয়ে রেখেছিল যা ভয় তুলে আনে? ভয়ইতো একত্র করে মানুষকে ঈশ্বরের দিকে।

পোপ থেকে পোপে স্থানান্তরিত হয় চাবিগুলো। সেখানে লুকিয়ে আছে রাজ্যের বিস্ময়। বাইবেলের চৌদ্দটা আসল কপি। ফাতিমার তৃতীয় প্রফেসি। প্রথম দুটা সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে। আর তৃতীয়টা এমন ভয়ানক যে চার্চ ভুলেও হাত দেয়নি। রোম থেকে ইলুমিনেটিতে বিতাড়িত করে দেয়ার সময় চার্চ যে সিলমোহরগুলো উদ্ধার করে, তার আসল নমুনা ছিল সেখানে… ছিল পাথ অব ইলুমিনেশনের বর্ননা, ইউরোপের ডাকসাইটে বিজ্ঞানীরা বাসা বেঁধেছিল ভ্যাটিকানেরই নিজস্ব দুর্গে। কতক্ষণ তারা গোপন থাকতে পারবে?

কিন্তু এন্টিম্যাটার? ইতস্তত করছে ভিট্টোরিয়া, তুমি ভ্যাটিকানকে ধ্বসিয়ে দেয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলে?

ঈশ্বর যে পর্যন্ত তোমার পাশে আছেন, কোন ঝুঁকি নেই।

তুমি বিভ্রান্ত, উন্মাদ!

লাখ লাখ মানুষ রক্ষা পেয়েছে।

মানুষ নিহত হচ্ছিল।

রক্ষা পাচ্ছিল আত্মা!

কথাটা আমার বাবা আর ম্যাক্স কোহলারকে বল!

সার্নের কাজকর্ম নতুন করে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সেখানে এমন একটা ফোঁটা তৈরি করা হয় যা বাষ্প করে দেয় আধ মাইল এলাকা! আর তুমি পাগল বলছ আমাকে? যারা বিশ্বাস করে, পরিচালিত হয় ঈশ্বরের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। আব্রাহামকে ঈশ্বর আপন পুত্র বলিদান করতে বলেছিলেন। ইব্রাহিম, উদ্যত হয়েছিলেন তা করতে। ক্রুশবিদ্ধ হতে বলেছিলেন ঈশ্বর স্বয়ং যিশুকে। আমরা তাই ক্রুশকে আমাদের সামনে ঝুলিয়ে রাখি। তার যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি অকল্যানের স্বরূপ দেখার। অকল্যাণ আছে, কিন্তু ঈশ্বর আছেন তার উপরে।

তার ক্ষ্যাপাটে কথা প্রতিদ্ধণিত হয় দেয়ালে দেয়ালে। মাইকেলেঞ্জেলোর লাস্ট জাজমেন্ট জ্বলজ্বল করছে তার পিছনে।

আর কী করেছ তুমি, কার্লো? শিউরে ওঠে মর্টাটি, হিজ হোলিনেস…

একটা প্রয়োজনীয় কাজ…

কী বলছ! তিনি ভালবাসতেন তোমাকে!

আর আমি তাকে!

উহ্‌! কী ভালবাসতাম আমি তাকে! আর তিনি কিনা নিয়ম ভাঙলেন! ভাঙলেন ঈশ্বরের কঠিনতম নিয়ম!

জানে ক্যামারলেনগো, তারা এখন বুঝতে পারবে না। কিন্তু পারবে, একটু পরে। যখন বলবে সে, দেখতে পাবে তারা।

সে রাতে ক্যামারলেনগো আসছিল সার্ন থেকে বিজ্ঞানের ধৃষ্টতা দেখে। আশা করেছিল তিনি দেখতে পাবেন খারাপ দিকটা। কিন্তু তিনি শুধু ভাল দিকটা দেখতে পেলেন। এমনকি ভ্যাটিকানের তরফ থেকে ফান্ড দেয়ার কথাও বললেন।

পাগলামি! এমন একটা কাজে চার্চ ফান্ডিং করবে যেটা পুরো বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দেয়! এমন কাজ, যা মানুষের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয় ধ্বংসের বীজ। ধ্বংস হয়ে। গিয়েছিল তার মা এমন মানুষদের কারণেই…

কিন্তু… আপনি পারেননা! বলেছিল ক্যামারলেনগো।

বিজ্ঞানের কাছে আমার বড় একটা ঋণ আছে। এমন একটা কিছু যা আমি সারাটা জীবন ধরে লুকিয়ে রেখেছি। তরুণ বয়সে বিজ্ঞান আমাকে একটা উপহার দিয়েছিল। এমন এক উপহার যার কথা আমি কখনো ভুলতে পারিনি।

আমি বুঝলাম না। বিজ্ঞান ধার্মিক মানুষকে কী দিতে পারে?

ব্যাপারটা জটিল, বলেছিলেন পোপ, ব্যাখ্যা করতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু প্রথমেই, আমার সম্পর্কে একটা সাধারণ তথ্য আছে যা তোমার জানা দরকার। সারটা জীবন আমি তথ্যটা লুকিয়ে রেখেছি। মনে হয় তোমাকে বলার মত সময় এসেছে।

তারপর পোপ তাকে সেই বিস্ময়কর কথাটা বললেন।

 

১৩২.

ক্যামারলেনগো রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ন্যাক্রোপোলিসে। কেউ তাকে এখানে খুঁজে পাবে না।

ব্যাপারটা জটিল, পোপের কণ্ঠ ধ্বণিত প্রতিধ্বণিত হচ্ছিল তার মাথায়, বোঝানোর জন্য একটু সময় দরকার…

কিন্তু ক্যামারলেনগোর জানা ছিল যত বেশি সময়ই লাগুক, সে বুঝবে না।

মিথ্যক! বিশ্বাস করেছিলাম তোমার উপর। ঈশ্বর বিশ্বাস করেছিলেন তোমার উপর।

একটা মাত্র সরল বাক্যে পোপ ক্যামারলেনগোর সারাটা জগং দুমড়ে মুচড়ে দেন। সত্যিটা এত বড় আঘাত হয়ে আসে তার কাছে যে সে বেরিয়ে এসে বমি করে দেয় হলওয়েতে।

থাম! পিছনে পিছনে ছুটে আসেন বয়েসি পোপ, ব্যাখ্যা করতে দাও আমাকে!

কিন্তু দৌড়ে চলে যায় ক্যামারলেনগো। আর কী দরকার তার? পোপের পবিত্রতার কি কোনই মানদন্ড নেই?

পাগলামি এল দ্রুত। চিৎকার করছে তার মাথার ভিতরে। সেন্ট পিটারের সমাধির কাছে সে সজ্ঞান হয়। এমন সময় এসেছিলেন ঈশ্বর।

তোমারজন ক্ষমতাবান স্রষ্টা!

দুজনে মিলে তাদের পরিকল্পনা ঠিক করে। দুজনে মিলেই রক্ষা করতে পারবে গির্জাকে। দুজনে মিলে ফিরিয়ে আনতে পারবে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসহীন দুনিয়ায়। সর্বত্র অকল্যাণ। আর এখনো পৃথিবী স্থবির! দুজনে মিলে কালোকে প্রকাশিত করবে তারা। জিতবে ঈশ্বর। ভয় আর আশা! তখনি বিশ্বাস করবে পৃথিবী।

এগিয়ে গেল সে, পরিকল্পনা সাকার করবে।

পোপের কাছে এগিয়ে গেল সে। তারপর করল যা করার।

পোপের চোখ কিছু একটা বলতে চাচ্ছে।

কিন্তু যথেষ্ট বলেছে এরই মধ্যে।

 

১৩৩.

পোপ এক সন্তানের পিতা!

যা বলল ক্যামারলেনগো, তার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করল সিস্টিন চ্যাপেলের ভিতরে। চারটা শব্দ! থমকে গেল সবাই। স্থবির হয়ে গেল। যেন সকলে মিলে প্রার্থনা করছে ক্যামারলেনগোর কথা যেন সত্যি না হয়।

পোপ এক সন্তানের পিতা!

শকওয়েভ ধাক্কা দিল ল্যাঙডনকেও। স্থাণুর মত তাকিয়ে থাকল ভিট্টোরিয়াও।

আশা করছে ল্যাঙডন, দুঃস্বপ্ন দেখছে ক্যামারলেনগো।

অসম্ভব! মিথ্যা কথা! বলল এক কার্ডিনাল অবশেষে।

আমিও বিশ্বাস করব না! গর্জে উঠল আরেকজন, পোপ সারা জীবন সৎ ছিলেন!

এবার কথা বলে উঠল মর্টাটি, বন্ধুগণ! যা বলছে ক্যামারলেনগো তার সবই সত্যি। পোপ সত্যি সত্যি এক সন্তানের পিতা!

ভয়ে বিমূঢ় হয়ে গেল কার্ডিনালরা।

অবাক হয়েছে ক্যামারলেনগোও, আপনি জানতেন! কিন্তু কী করে?

হিজ হোলিনেস যখন ইলেক্টেড হন… আমিই ছিলাম শয়তানির সাক্ষী!

কী! রা ফুটল না কারো কণ্ঠে।

ডেভিলস এভোকেট ছিলাম আমি!

এ শব্দটা পরিচিত সবার কাছে। একজন একলা কার্ডিনালকে দায়িত্ব দেয়া হয় পোপের কীর্তি দেখার জন্য, নির্বাচনের আগেই। পোপের সব কথা জানার কথা তার। পরেও। এবং, কখনোই তার পরিচয় পেশ করা চলবে না সবার সামনে। কখনো না।

আমি ছিলাম ডেভিলস এভোকেট, এভাবেই জানতে পারি আমি।

ঝুলে পড়ল অনেকের চোয়াল। হয়ত আজ এমন এক রাত, যখন সব সত্য মিথ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

ক্যামারলেনগোর বিমূঢ়তাও কাটেনি, আর আপনি কাউকে বললেন না সেকথা?

আমি হিজ হোলিনেসের পাপের সাক্ষ্য নেই। আর তিনি স্বীকারোক্তি করেছেন আমার কাছে। তিনি সমস্ত খুলে বলেন আমার কাছে। তারপর সিদ্ধান্ত নিই আমি, কী করব আর কী করব না।

আর আপনার হৃদয় তথ্যটা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে বলল?

পাপাসির জন্য তিনি ছিলেন সবচে যোগ্য। মানুষ ভালবাসত তাকে। স্ক্যান্ডালটা চার্চকে গভীর আঘাত দিত।

কিন্তু তিনি ছিলেন এক সন্তানের পিতা! তিনি ভঙ্গ করেছেন প্রথম শর্ত। এবার গর্জন বেরুচ্ছে ক্যামারলেনগোর কণ্ঠ চিরে।

ঈশ্বরের কাছে দেয়া কথা সবচে বড় কথা… কখনো তাঁকে দেয়া কথা ভঙ্গ করোনা…

বলছে ক্যামারলেনগো, পোপ তার শর্ত ভেঙেছিলেন!

কালো, তার ভালবাসা… ছিল মহান। কোন শর্ত তিনি ভাঙেননি। ব্যাখ্যা করেননি তোমার কাছে?

ব্যাখ্যা করবেন কী? ক্যামারলেনগোর মনে গুমরে মরল কণ্ঠটা, ব্যাখ্যা করতে

দাও…

আস্তে আস্তে সবটা বলে গেল মর্টাটি। অনেক বছর আগে, যখন তিনি প্রিস্ট ছিলেন, এক তরুণী নানের প্রেমে পড়ে যান। তারা দুজনেই ওয়াদাবদ্ধ হন এবং ঈশ্বরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যান। কিন্তু তারা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেননি। করেননি কোন পাপ। বিজ্ঞান তখন একটা নতুন আবিষ্কারে আলোকিত। শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াই একটা সন্তান চেয়েছিল সেই নান। আর তা তাকে দেন হিজ হোলিনেস।

একথা… সত্যি হতে পারে না! বলল ক্যামারলেনগো।

এটাই সত্যি।

সে সন্তানের স্থান হবে কোথায়?

আর যেখানেই হোক, নরকে নয়।

সে কি এগিয়ে আসবে না?

এরই মধ্যে এসেছে, ইতস্তত করল কার্ডিনাল, সে… আর কেউ নয়, কার্লো… সে সন্তান তুমিই।

উঠে দাঁড়াল কার্লো ভেন্ট্রেস্কা। কাঁপতে কাঁপতে। তাকাল মাইকেলেঞ্জেলোর শিল্পকর্মের দিকে। লাস্ট জাজমেন্ট।

দেখল সে স্বচক্ষে। দেখল নরকের বিনাশী আগুন।

দেখতে পাচ্ছ না কি তুমি? বলছে মর্টাটি, তিনি পালার্মোর সেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তুমি তখন ছোট এক বালক। এজন্যেই তিনি তোমাকে তুলে আনেন। করেন প্রতিপালিত। সেই নানের নাম মারিয়া… তোমার মা। সে সন্যাব্রত ত্যাগ করেছিল তোমাকে জন্ম দেয়ার জন্য। কিন্তু ঈশ্বরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করেই। যখন তিনি জানতে পারলেন যে তুমি, তার সন্তান, সেখান থেকেই বেঁচে উঠে এসেছ… আর কখনো হাতছাড়া করবেন না বলে নিয়ে এলেন তোমাকে। তুমি এখনো একা, কার্লো। তোমার বাবা মা দুজনেই ছিলেন আঁটি। কৌমার্য বিসর্জন দেননি কেউই। তার পরও, তাদের ভালবাসাকে একটা আকার দেয়ার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন তোমাকে পৃথিবীতে আনার। বিজ্ঞানের মাধ্যমে। কার্লো  ভেস্কো, সত্যি বলতে গেলে, তুমি আর কেউ নও, যাকে সবচে বড় শত্রু ভাবছ তারই সন্তান। সেই বিজ্ঞানের সন্তান।

কান দুহাতে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে সে। পারছে না। শব্দগুলোকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। পারছে না। শক্ত মাটি খুঁজে পাবার চেষ্টা করছে। পারছে না।

পড়ে গেল ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা।

 

সেকেন্ড। মিনিট। ঘণ্টা।

চ্যাপেলের ভিতরে বয়ে গেল সময়।

আস্তে আস্তে অসাড়ত্ব কমে এল ভিট্টোরিয়ার। ছেড়ে দিল ল্যাঙডনের হাত। তারপর কার্ডিনালদের ভিতর দিয়ে পথ করে নিল সামনে। যেন পানির নিচে চলছে সে… ধীর, বাধাপ্রাপ্ত।

যখন সে এগিয়ে যাচ্ছিল রোবগুলোর মাঝ দিয়ে, যেন আস্তে আস্তে সচকিত হয়ে উঠছিল তারা। কাঁদছে কেউ কেউ। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে প্রার্থনায় রত। মেয়েটা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্নিমেষ চোখে দেখছে কেউ কেউ। বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে গেছে সব। একেবারে শেষ বিন্দুতে চলে যাবার পর একটা হাত তার বাহু আকড়ে ধরল। একজন কার্ডিনাল। তাকাল সে। কার্ডিনালের চোখ ভয়ে হতবিহ্বল।

না বলল কার্ডিনাল। আপনি পারেন না।

অনিমেষ তাকিয়ে থাকল ভিট্টোরিয়া তার দিকে।

এবার তার পাশে আরেক কার্ডিনাল চলে এল। কোন কাজ করে বসার আগে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে।

এবং আরো একজন। ব্যথাটা… এটা যে কোন…

ঘিরে ধরল তাকে কার্ডিনালরা। কিন্তু এই সত্যি, আজকের এই সত্যি… পৃথিবীর জানতে হবে।

আমার হৃদয়ও সমর্থন দেয়, বলল হাত ধরে রাখা কার্ডিনাল, কিন্তু এ এমন এক পথ যেখান থেকে কোন ফেরা নেই। ফিকে হয়ে আসা আশার দিকে তাকাতে হবে আমাদের। কী করে মানুষ আর কখনো বিশ্বাস করবে?, এই

আস্তে আস্তে কালো রোব আগলে রাখল তার পথ।

মানুষগুলোর কথা শুনুন। শুনুন তাদের হৃদস্পন্দন! তাদের ভিতরে কী প্রতিক্রিয়া হবে?

আমাদের ভাবার জন্য এবং প্রার্থনা করার জন্য সময় প্রয়োজন। বলল আরেকজন, দূরদৃষ্টি নিয়ে তাকাতে হবে আমাদের। এসব কথা…

কিন্তু সে তার নিজের জনককে হত্যা করেছে। খুন করেছে আমার বাবাকে।

আমি নিশ্চিত, এ পাপের ফল সে ভোগ করবে। বলল আরেকজন।

কিন্তু হাল ছেড়ে দিতে চায় না ভিট্টোরিয়া। এগিয়ে যায় দরজার কাছে। আরো ঘনিয়ে আসে কালো রোব। চোখে তাদের আতঙ্ক।

কী করবেন আপনারা? চিল্কার করল এবার মেয়েটা, খুন করবেন আমাকে?

সরে গেল বৃদ্ধ লোকগুলো। আর সাথে সাথে কথাটার জন্য অনুশোচনা হল ভিট্টোরিয়ার। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে, এই লোকগুলো বিশুদ্ধ আত্মার মানুষ। আজ রাতে অনেক ধ্বংস দেখেছে তারা।

আমি করতে চাই… বলল হাত ধরে রাখা কার্ডিনাল, … তাই, যা করা উচিৎ।

তাহলে আপনারা তাকে যেতে দিবেন। একটা গভীর কণ্ঠ বলল পিছন থেকে। আমি আর মিস ট্রো এ চ্যাপেল ছেড়ে যাচ্ছি এখনি।

একটু দ্বিধা করে সরে দাঁড়াল কার্ডিনালরা।

থামুন! এবার বলল মর্টাটি, এগিয়ে আসছে সে তাদের কাছে, অন্য প্রান্তে হেরে যাওয়া ক্যামারলেনগোর অবয়ব রেখে। এগিয়ে এল বেদনায় ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মর্টাটি। একটা হাত রাখল সে ল্যাঙডনের কাধে, আরেকটা ভিট্টোরিয়ার। তার চোখ এখন আরো বেশি অশ্রু সজল।

অবশ্যই আপনারা মুক্ত, যেতে পারেন এখনি, বলল মাটি, অবশ্যই, কথা বলতে পারছে না লোকটা, আমি শুধু এটুকু বলব… ল্যাঙডন আর ভিট্টোরিয়ার পায়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, কাজটা আমাকে করতে দিন। আমি এখনি স্কয়ারে যাব এবং একটা পথ বের করব। আমি বলব তাদের… জানি না কী করে, বলব একটা পথ বের করে। চার্চের স্বীকারোক্তি ভিতর থেকেই আসা উচিৎ। আমাদের ব্যর্থতার কথা আমাদের ভিতর থেকেই আসা উচিৎ।

পিছনে ফিরল সে, কালো, তুমি এ হাল করেছ চার্চের…

কিন্তু সেখানে একটা রেখা দেখা গেল সাদা রোবের… বন্ধ হয়ে গেল দরজা।

ক্যামারলেনগো নেই।

 

১৩৪.

সিস্টিন চ্যাপেল থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা, তার সাদা রোব উড়ছিল।

অবাক হয়ে তাকাল সুইস গার্ডরা। সে বলল, একটা মুহূর্ত একা থাকতে হবে তাকে।

মানল গার্ডরা।

এগিয়ে যাচ্ছে ঘোরলাগা ক্যামারলেনগো। তার মাথায় একটা কথাই ঘুরছে। সে সেই লোকটাকে বিষ দিয়েছে যাকে ডাকত হোলি ফাদার নামে। সব সময় যে তাকে মাই সন বলে ডাকত। তা যে আক্ষরিক অর্থে সত্যি কে ভাবতে পারে! সব সময় ক্যামারলেনগো মনে করত ফাদার আর সন ধর্মীয় বাতাবরন।

কয়েক সপ্তাহ আগের রাতের মত, এবারও অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দৌড়ে চলে গেল সে।

 

সেদিন সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল ভ্যাটিকানে। লোকজন ক্যামারলেনগোর দরজায় টোকা দেয়। পোপ তার দরজা খুলছেন না।

ঢুকল ক্যামারলেনগো পোপের অফিসে। গতরাতে যেমন ছিলেন পোপ, এখনো তেমনি। বাঁকা হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। মুখটা যেন শয়তানের। জিহ্বা মৃত্যুর মত কালো। পোপের বিছানায় শুয়ে আছে স্বয়ং ডেভিল।

এক বিন্দু অনুশোচনা হচ্ছে না তার।

ঘোষণা করল সে, পোপ মারা গেছেন স্ট্রোকে। তারপর প্রস্তুতি নিল কনক্লেভের জন্য।

 

মা মারিয়ার কণ্ঠ প্রতিধ্বণিত হচ্ছে তার ভিতরে, কখনো ঈশ্বরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা ভাঙবে না।

আমি তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি, মা, এ পৃথিবী বিশ্বাসহীন। তাদের আবার বিশ্বাসের পথে আনতে হবে। আতঙ্ক এবং প্রত্যাশা। এই একমাত্র পথ।

হ্যাঁ। বলেছিল মা, তুমি না হলে আর কে? কে গির্জাকে অন্ধকার থেকে আলোয় তুলে আনবে?

প্রেফারিতিরা? দুর্বল। ভঙ্গুর। প্রাচীণপন্থী।

তারা শুধু মৃত পোপের পতাকা বহন করবে। সারা দুনিয়া ছুটে চলেছে অসম্ভব গতিতে। সেখানে স্থবির হয়ে থাকবে চার্চ এটাই নিয়ম। কিন্তু এ পৃথিবীর নিয়ম বদলে দিতে হবে। সচল করতে হবে না চার্চকে। ভাঙতে হবে মাত্র কয়েকটা নিয়ম। পাপাসির জন্য নতুন, পরিষ্কার রক্ত চাই।

চার্চে নতুন, তরুণ, উজ্জীবিত করা, মিরাকল দেখানো রক্ত চাই।

 

চা উপভোগ করুন। বলল ক্যামারলেনগো প্রেফারিতিদের, কনক্লেভের আগে, পোপের লাইব্রেরিতে। এখানে আপনাদের গাইড দ্রুত চলে আসবে।

প্রেফারিতিরা তাকে ধন্যবাদ জানাল। তাদের সেই বিখ্যাত প্যাসেট্টোতে যাবার সুযোগ দিয়েছে ক্যামারলেনগো। অপ্রত্যাশিত।

একজন বিদেশি প্রিস্ট তাদের নিতে এল প্যাসেট্টোতে। বিনা দ্বিধায় তারা চলে গেল।

তারা হবে ভীতি, আমি হব প্রত্যাশা।

না… আমিই ভীতি…

বিধ্বস্ত ক্যামারলেনগো এগিয়ে যাচ্ছে নানা ভীতি সাথে নিয়ে। তার সাথে আছে মানা চিন্তা। যুক্তির বাঁধভাঙা জোয়ার। সেইসাথে এই সমাপ্তির ব্যাপারে আক্ষেপ।

ঈশ্বর কি এভাবে সবটাকে শেষ করে দেয়ার জন্য ল্যাঙডনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন?

না। তার অন্য কোন পরিকল্পনা আছে।

দৌড়ে যাচ্ছে ক্যামারলেনগো আরো আরো কালিগোলা অন্ধকারে।

সিস্টিন চ্যাপেল থেকে সুইস গার্ডদের নানা আদেশ নির্দেশ দিতে শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে হুঙ্কার।

এখন কোন ব্যাপরকেই পরোয়া করে না ক্যামারলেনগো ভেস্কো। সে এগিয়ে যায় সোজা।

চোখের সামনে প্রতিভাত হয় কুসিফিক্স। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর অবয়ব।

ঈশ্বর বেছে নেয়া মানুষদের জন্য কঠিন পরীক্ষা রাখেন। রাখেন কঠিন যন্ত্রণা।

তাকে কেন বেছে নেয়া হল তাহলে? এই ক্যাথলিক চার্চের করুণ স্ক্যান্ডাল দেখার। জন্য?

এগিয়ে গেল ক্যামারলেনগো। আরো। আরো। উপনীত হল নিচে অব প্যালিয়ামসে। যেখানে নিরানব্বইটা বাতি অহর্নিশি জ্বলছে। তাকাল সে সেদিকে। তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নেমে গেল নিচে। আবার কালিগোলা অন্ধকার গ্রাস করে নিল ক্যামারলেনগোর অবয়ব।

নিচে অনেক গোলকধাঁধা। কেউ পাবে না খুঁজে তাকে। পাবার দরকারও নেই। চলে এল সে সেন্ট পিটারের সমাধির আশপাশ জুড়ে গড়ে ওঠা মৃতদের নগরীতে।

ন্যাক্রোপোলিস!

এরপর শুনতে পেল মায়ের আর্তি, কার্লো, ঈশ্বরের তোমাকে নিয়ে বড় পরিকল্পনা আছে। আছে মহা পরিকল্পনা।

বিস্ফারিত নয়নে এগিয়ে চলল ক্যামারলেনগো।

এরপর, হাজির হলেন ঈশ্বর।

ক্যামারলেনগো থামল তাকিয়ে থেকে। তাকাল সামনে। নিরানব্বইটা বাতির আলোয় আলোকিত চারপাশ। মোহনীয় ছায়া পড়ছে তার। তাকাল সে মার্বেলের মেঝের দিকে।

ঈশ্বরের ইচ্ছা একেবারে স্পষ্ট।

 

তিন মিনিট হয়ে গেছে উধাও হয়েছে ক্যামারলেনগো। চারদিকে তাকে খোঁজার জন্য সাজ সাজ রব পড়ে গেল। একটা ফুল স্কেল সার্চ করবে কিনা তা ভাবছিল মাটি। এমন সময় সেন্ট পিটার্স স্কয়ার থেকে মুহূর্মুহু মানুষের হর্ষধ্বণি উঠল।

চোখ বন্ধ করল মর্টাটি।

ঈশ্বর রক্ষা করুন আমাদের!

বেরিয়ে পড়েছে কনক্লেভের সমস্ত কার্ডিনাল। বেরিয়ে এসেছে ল্যাঙডন আর ভিট্টোরিয়াও। তারা অবাক হয়ে দেখছে, সমস্ত মিডিয়া ভ্যানের আলো গিয়ে পড়েছে

ব্যাসিলিকার উপরে। সেখানে, পাপাল ব্যালকনির উপরে পড়ছে সবার নজর।

তাকাল ল্যাঙডন। তাকিয়েই জমে গেল।

আগে থেকেই ক্যামারলেনগোর পরনে ছিল শ্বেতশুভ্র রোব। পোপের মত।

পাপাল ব্যালকনি থেকে সেই রোব পরা অবস্থায় দু হাত উপরে তুলে প্রার্থনা করছে ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা। আলোয় ভেসে যাচ্ছে সে।

এবার হঠাৎ করে জোয়ার উঠল।

বাঁধভাঙা জোয়ার।

ব্যালকনিতে ক্যামারলেনগোর শরীর দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ছিল মানুষ প্রথম মুহূর্তে। তারপর তারা চিৎকার জুড়ে দেয়। অবশেষে সুইস গার্ডের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তারা ভেঙে পড়ে ভিতরে। প্রতি মুহূর্তে মানুষের কল্লোল বাড়ছে।

কাঁদছে কেউ কেউ চিৎকার করে।

কেউ কেউ হাত তুলে রেখেছে ক্যামারলেনগোর দিকে।

এবং দৌড়ে আসছে সবাই। এগিয়ে গেল ক্যামেরাম্যানরা, ভিডিওগ্রাফাররা, রিপোর্টাররা। প্রতি মুহূর্তে ঝলক খেলে যাচ্ছে ক্যামেরার ফ্ল্যাশগানে। আলোয় আলোকিত হয়ে অপার্থিব দেখাচ্ছে কার্লো ভেট্রোকে। এই উচ্ছ্বাস থামানোর উপায় নেই কোন।

এরপর একটা কিছু হল। থমকে গেল গোটা চত্বর।

অনেক উঁচুতে, হাতের একটু ইশারা দিল ক্যামারলেনগো।

তারপর মাথা নোয়লি। তারপর বসল প্রার্থনায়। অবনত মস্তকে।

একে একে, ভজনে ডজনে, শত শত, হাজার হাজার মানুষ তৎক্ষণাৎ নিচু হয়ে গেল। বসে পড়ল প্রার্থনায়। ক্যামারলেনগোর মত করে।

 

ক্যামারলেনগোর মনে, ঝড়ের মত, প্রার্থনা এল একই সাথে পাপের চিন্তায়, উচ্ছাসে, আবেগে।

… ক্ষমা কর আমাকে… বাবা… মা… দয়াময়… তোমরাই গির্জা… আশা করি তোমরা বুঝতে পারবে তোমাদের একমাত্র সন্তানের এই আত্মদানটাকে।

ওহ্! আমার যিশু… আমাদেরকে নরকের অগ্নিকুন্ডের হাত থেকে রক্ষা করুন… সব আত্মাকে নিয়ে চলুন স্বর্গে… বিশেষত তাদের, যাদের ক্ষমার প্রয়োজন…

ক্যামারলেনগ্যে চোখ খোলেনি নিচের দৃশ্য দেখার জন্য। নিচে শত শত ক্যামেরা দিয়ে সারা পৃথিবী এই দৃশ্য দেখছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে করে, স্যাটেলাইটে করে, সাবমেরিন ক্যাবলে করে, টেলিফোনের লাইনে, সবভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে দৃশ্যটা। সারা পৃথিবীর শত শত দেশে, শত শত ভাষায়, কোটি কোটি মানুষ যোগ দিয়েছে তার সাথে। তাদের অজান্তে, তার প্রার্থনায়।

সময় চলে এসেছে এবার।

পবিত্রতম ট্রিনিটি, ব্ৰিত্ব… আমি সবচে দামি তিনটা বিষয় উৎসর্গ করছি… মাংস… রক্ত… আত্মা…

ক্যামারলেনগো টের পেল, তার শারিরীক বেদনা বাড়ছে। বাড়ছে যন্ত্রণা। মরফিনের প্রভাব কমে আসছে।

ভুলে যেওনা যিশু কী যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন…

প্লেগের মত ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাথা।

এখানে আমার কাজ শেষ হয়েছে।

আতঙ্ক তার। আশা তাদের।

ন্যাক্রোপোলিসে সেই তেল ঢেলে দিয়েছে সে নিজের শরীরে। পদার্থটা তাকে জাপে ধরেছে মায়ের মমতায়।

পকেটে হাত দিল সে। বের করল একটা ছোট গোল্ডেন লাইটার। সাথে করে নিয়ে এসেছিল।

কোন দুর্নামের সাথে বেঁচে থাকতে চায় না কার্লো ভেন্ট্রেস্কা।

একটা ছত্র মনে পড়ে গেল তার।

যখন শিখা স্পর্শ করবে স্বৰ্গকে, তাঁর এ্যাঞ্জেলরা নেমে আসবে অগ্নিশিখার মধ্যে…

সে ঠিক করল বুড়ো আঙুল।

তারা, গান গাইছিল সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে…

 

এমন এক দৃশ্য দেখল সারা পৃথিবী যার কথা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না।

ভ্যাটিকান সিটির পোপের ব্যালকনিতে, একটা অগ্নিশিখা উঠে এল। তারপর সেটা দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল তাকে। সে উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করল না। করল না নড়াচড়া। শুধু তুলে রাখল হাত উপরের দিকে। তুলে দিল মুখাবয়বও। স্বর্গের দিকে। আলো আরো আরো তীব্র হচ্ছে। হচ্ছে আরো সুতীব্র। সারা পৃথিবী আবারো অবাক বিস্ময়ে দেখছে অবিশ্বাস্য দৃশ্য। শ্বাস বন্ধ করে। তারপর আস্তে আস্তে শিখার উজ্জ্বলতা কমে আসে। চলে গেছে ক্যামারলেনগো। সে পড়ে গেছে, নাকি উবে গেছে, বলা কঠিন। শুধু ধোঁয়ার এক রেখা উঠে যাচ্ছে আরো আরো উপরে। ভ্যাটিকান সিটির সবচে মূল্যবান ভবনটাকে পিছনে রেখে।

 

১৩৫.

রোমের প্রভাত দেরিতে এল।

বৃষ্টি আর ঝড়ের দাপটে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের সব মানুষ চলে গেছে আগেই। কিন্তু মিডিয়া নাছোড়বান্দা। তারা হাতে ছাতা নিয়ে গত রাতের কথা সবিস্তারে বলে যাচ্ছে। সারা দুনিয়ার সমস্ত গির্জা ভরে গেছে কানায় কানায়। কথা চলছে সব ধর্মের স্থাপনাগুলোয়।

উঠছে প্রশ্ন। আর উত্তরের ফলে আরো গভীর প্রশ্নের উদয় হচ্ছে।

এ পর্যন্ত ভ্যাটিকান একেবারে নিশুপ থাকল। কোন প্রকারের শব্দ করল না।

 

ভ্যাটিকানের কোন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন কুঠুরিতে নুয়ে পড়ে কার্ডিনাল মর্টাটি পোপের মুখের হা বন্ধ করে দিল। এখন শান্তিময় দেখাচ্ছে হিজ হোলিনেসকে। অনেক বেশি স্থির।

মর্টাটি একটু ছাই তুলে এনেছিল সোনালি বাক্সে করে। সেটা তুলে ধরল সে হিজ হোলিনেসের সামনে।

ক্ষমা করে দেয়ার একটা সুযোগ, কোন ভালবাসাই সন্তানের জন্য পিতার ভালবাসার চেয়ে বড় নয়।

সিনর? চার্ট্রান্ড এগিয়ে এল সামনে, তিনজন সুইস গার্ডকে সাথে করে। তারা আপনার জন্য কনক্লেভে অপেক্ষা করছে।

এক মুহূর্ত! বলল সে, এখন হিজ হোলিনেসের সেই শান্তি প্রাপ্য হয়েছে যা তার জন্য নির্ধারিত ছিল।

সাথে সাথে সুইস গার্ডরা পোপের মরদেহ সহ কফিনটাকে জায়গামত বসিয়ে দিল শব্দ করে।

 

মর্টাটি একা একা বর্গিয়া কান্ট্রিইয়ার্ড পেরিয়ে যাচ্ছিল সিস্টিন চ্যাপেলের দিকে। একটা উদাস বাতাস খেলে গেল তার গায়ে। একজন কার্ডিনাল বেরিয়ে এল এ্যাপোস্টোলিক প্যালেস থেকে, যোগ দিল তার সাথে।

আপনাকে কনক্লেভ পর্যন্ত নিয়ে যাবার সম্মান কি আমি পেতে পারি, সিনর?

সম্মানটা আমার প্রাপ্য।

সিনর, বলল ইতস্তত করে কার্ডিনাল, কাল রাতের ঘটনার জন্য কলেজ আপনার। কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

প্লিজ। আমাদের মন মাঝে মাঝে দেখতে পায় তাই যা আমাদের মন দেখতে চায়।

একটা দীর্ঘ সময় ধরে চুপ করে থাকল কার্ডিনাল। তারপর সে বলল। আপনাকে কি জানানো হয়েছে? আপনি আর আমাদের গ্রেট ইলেক্টর নন।

জানি। আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই ছোট ছোট আশীর্বাদগুলোর জন্য।

কলেজ চায় আপনি এগিয়ে থাকুন।

মনে হয় চার্চ থেকে এখনো চাওয়া উবে যায়নি।

আপনি বিজ্ঞ। আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করতে পারবেন।

আমি বয়োবৃদ্ধ। আপনাদের খুব বেশি সময় ধরে পথ দেখাতে পারব না।

তাদের দুজনেই হেসে উঠল।

বর্গিয়া কান্ট্রিইয়ার্ডের শেষপ্রান্তে এসে ইতস্তত করল কার্ডিনাল। তারপর একটু থেমে বলল, আপনি কি জানেন? ব্যালকনিতে আমরা কোন দেহাবশেষ পাইনি।

মৃদু হাসি ঝুলে রইল মাটির ঠোঁটে।

কে হয়ত বৃষ্টির পানি সেগুলোকে ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে।

লোকটা তাকাল ঝড়-ঝঞাময় স্বর্গের দিকে।

হ্যাঁ, হয়ত…

 

১৩৬.

মধ্য সকালের আলোয়, সিস্টিন চ্যাপেলের চিমনি দিয়ে সাদা ধোঁয়ার একটা হাল্কা ভাপ উঠে এল।

রিপোর্টার গুন্থার গ্লিক সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে দাঁড়িয়ে দেখল সেটা। আসল ধাপ… চিনিতা ম্যাক্রি তার পাশে এসে দাঁড়াল। সময় চলে এসেছে…

নড করল গ্লিক। চুল ঠিক করতে করতে ভিডিওগ্রাফারের দিকে তাকাল। আমার শেষ ট্রান্সমিশন…

ম্যাক্রি বড় করে একটা শ্বাস নিল, ষাট সেকেন্ডের মধ্যে সরাসরি সম্প্রচার।

লোকজনের একটা ছোট ঝক ঘিরে ধরল তাদের।

তুমি কি ধোয়াটাকে নিতে পারবে? তাকাল গ্লিক।

সাথে সাথে নড করল ম্যাক্রি। আমি জানি কী করে একটা শট ফ্রেমবন্দি করতে হয়, গুন্থার।

একটু তিতকুটে স্বাদ পেল গ্নিক। তাইতো! ম্যাক্রি জানে কী করে একটা শট ফ্রেমবন্দি করতে হয়। গত রাতে মাক্রির ক্যামেরার কারসাজি সম্ভবত তাকে একটা পুলিৎজার তুলে একে দিবে।

অন্যদিকে তার পারফর্ম্যান্স… সে আর ভাবতে চায় না।

কোন সন্দেহ নেই বিবিসি তাকে পাকড়াও করবে। সার্ন আর জর্জ বুশের কাছ থেকেও পেতে হবে অনেক উত্তম মাধ্যম, তাতেও কোন সন্দেহ নেই।

ম্যাক্রি তাকাল তার দিকে, দেখতে ভালই লাগছে তোমাকে। আমি যদি একটু কিছু অফার করি…

কোন উপদেশ?

আরো ভাল কিছু দৃশ্য?

 

ক্যামেরার ভিতর দিয়ে তাকাল চিনি ম্যাক্রি।

কাজ শুরু হতে যাচ্ছে… পাঁচ… চার… তিন…

লাইভ ফ্রম ভ্যাটিকান সিটি, বলছে গ্লিক হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে, দিস ইজ গুন্থার গ্লিক রিপোর্টিং। লেডিজ এ্যান্ড জেন্টলম্যান, দিস ইজ নাউ অফিসিয়াল। কার্ডিনাল স্যাভেরো মর্টাটি, উনআশি বছর বয়সের এক প্রগতিবাদী, এইমাত্র ভ্যাটিকান সিটির পরবর্তী পোপ নির্বাচিত হলেন। এই নির্বাচনে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটেছে। কার্ডিনাল মর্টাটি ভ্যাটিকান সিটির একচ্ছত্র ভোট পেয়েছেন।

অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকাল ম্যাক্রি। গিককে অনেক বেশি প্রফেশনাল মনে হচ্ছে। তার সেই জড়তা নেই। একেবারে নিখুঁত পেশাদার রিপোর্টার।

আগেই আমরা রিপোর্ট করেছি যে, বলছে গ্লিক এখনো, ভ্যাটিকান গত রাতের অলৌকিক ঘটনার কোন না কোন বাখ্যা দিবে।

গুড! ভাবছে চিনিতা মাক্রি। সো ফার, সো গুড!

এবার গ্লিকের কণ্ঠে যেন ভর করে রাজ্যের দুঃখ, এবং গতরাতের ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক, এ ছিল এক ট্রাজেডির রাত। বিষাদের রাত। গতকালের প্রতিদ্বন্দ্বীতায় চার কার্ডিনাল মারা পড়েছেন। নিহত হয়েছেন সুইস গার্ডের কমান্ডার ওলিভেট্টি আর ক্যাপ্টেন রোচার। একই সাথে নিহত হয়েছেন লিওনার্দো ভেট্রা, এন্টিম্যাটার টেকনোলজির পথপ্রদর্শক, সার্নের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি ভ্যাটিকানেও এসেছিলেন করণীয় ঠিক করার কাজে, কিন্তু প্রাণ হারান তিনি। মিস্টার কোহলার সার্নের ডিরেক্টর জেনারেল। তার মৃত্যুর ব্যাপারে এখনো কোন অফিসিয়াল এ্যানাউন্সমেন্ট আসেনি।

নড করল মাক্রি। রিপোর্ট তাদের কথামতই চলছে।

আর গতরাতে ভ্যাটিকানের উপরে এন্টিম্যাটারের ক্যানিস্টার বিস্ফোরিত হবার পর থেকেই সারা পৃথিবীতে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা; বিশেষত বিজ্ঞানী মহলে।

সার্ন থেকে কোহলারের ব্যক্তিগত সহকারি সিলভিয়া বোডেলক জানিয়েছেন যে এন্টিম্যাটার টেকনোলজিকে আরো নিশ্চয়তাময় করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবেন এবং তা রেজিস্টার করার কাজও চলছে।

অসাধারণ! ভাবল ম্যাক্রি।

আমাদের স্ক্রিন থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে, বলছে গ্লিক, রবার্ট ল্যাঙডনকে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিম্বলজির অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙডন গত রাতের ইলুমিনেটি ক্রাইসিসের সময় এখানে উপস্থিত ছিলেন। যদিও আমরা প্রথমে জানতে পারি এন্টিম্যাটার বিস্ফোরণের সময় তিনি হেলিকপ্টারে ছিলেন, পরে তাকে দেখা গেছে ভ্যাটিকানে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী একথা জানিয়েছেন। কীভাবে তিনি বেঁচেছেন তা কেউ বলতে না পারলেও হসপিটাল টাইবেরিনার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে তিনি টাইবার নদীতে বিস্ফোরণের পর পরই পতিত হন এবং সেখানে চিকিৎসা নিয়ে চলে আসেন ভ্যাটিকানে। থামল গ্লিক, নাটকীয়ভাবে, তারপর বলল, যদি কথাটা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এটা সত্যি সত্যি এক মিরাকলের রাত।

পারফেক্ট এন্ডিং! তাধৈ তাধৈ নাচতে ইচ্ছা করছে ম্যাক্রির। অসাধারণ। এবার বাছা বন্ধ কর!

কিন্তু সাইন অফ করল না গ্লিক। থেমে যাবার আগেই বলল সে, আমরা সাইন অফ করার আগে…

না!

বিশেষ এক মেহমানের দ্বারস্থ হচ্ছি।

সাথে সাথে জমে গেল ম্যাক্রির। আবার গড়বড় লাগাতে চাচ্ছে নাকি লোকটা। মেহমান? কোন নরকের মেহমান? লোকটা সাইন অফ করছে না কেন?

যে লোকটাকে আমি পরিচিত করিয়ে দিতে চাচ্ছি, তিনি একজন আমেরিকান স্কলার। সুপরিচিত।

এগিয়ে গেল গ্লিক।

আমাকে আবার বলো না যে রবার্ট ল্যাংডনকে পেয়ে গেছ! ভাবছে ম্যাক্রি।

যে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল গ্লিক, সে আর যেই হোক, রবার্ট ল্যাঙডন নয়। নীল জিন্স আর ফ্লানেলের শার্ট পরা লোকটার চোখে পুরু কাঁচের চশমা।

আমি পরিচিত করিয়ে দিচ্ছি…

দম বন্ধ হয়ে আসছে ম্যাক্রির।

শিকাগোর ডি পল ইউনিভার্সিটির বিশ্বখ্যাত ভ্যাটিকান স্কলার ডক্টর জোসেফ ভ্যানেকের সাথে।

তাকাল ম্যাক্রি। এখানে আবার নতুন করে কোন নাটক হবে নাতো!

ডক্টর ভ্যানেক, কাল রাতের কনক্লেভের ব্যাপারে আপনার আমাদের সাথে কিছু ব্যাপারে আলোচনা করার থাকতে পারে।

অবশ্যই আছে। এত সারপ্রাইজে ভরা রাতের পরে কল্পনা করা কঠিন যে আর কোন চমক বাকি থাকতে পারে… অথচ এখনো… থামল ডক্টর ভ্যানেক।

মুখ প্রসারিত করে হাসল গ্লিকও, এমনকি এখনো, এখানে একটা চমক বাকি রয়ে গেছে। রয়ে গেছে মোড়।

নড করল ভ্যানেক, এই সপ্তাহান্তে, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি কলেজ অব কার্ডিনালস নিজেদের অজান্তেই দুজন পেপ নির্বাচিত করে ফেলেছেন।

আর একটু হলেই পড়ে যেত ম্যাক্রির ক্যামেরা।

আরো প্রসারিত হাসি বের হল গ্রিকের মুখের ভিতর থেকে, দুজন পোপ, আপনি বলছেন?

নড করল স্কলার, তাই। আমি আগেই বলে নিচ্ছি, পাপাল ইলেকশনের উপর আমি সারা জীবন ধরে রিসার্চ করেছি। কনক্লেভের নিয়মকানুন খুব প্যাচানো এবং আজকাল তার বেশিরভাগই অচল হয়ে পড়েছে। এমনকি গ্রেট ইলেক্টরও সম্ভবত জানেন না কী বলতে যাচ্ছি আমি। পোপ নির্বাচনের জন্য যে ভোট দেয়াই একমাত্র পথ। নয় তা লেখা আছে রোমানো পন্টিফিসি এলিগেন্ডা, নিউমেরো সিক্সটি থ্রি তে। পোপ আরো একভাবে নির্বাচিত হতে পারেন। একে বলা হয় এ্যাক্লেমেশন বাই এ্যাডোরেশন। থামল স্কলার, এবং এটাই ঘটেছে গত রাতে।

প্লিজ, বলে যান।

আপনার কি মনে আছে, গত রাতে যখন ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছেন তখন তাকে সব কার্ডিনাল জোরে জোরে আহ্বান করছিলেন, ডাকছিলেন নাম ধরে?

মনে আছে।

সেই দৃশ্যের কথা ভাবতে ভাবতে আমাকে প্রাচীণ নিয়মের কথা মনে করতে দিন, পকেট থেকে কিছু পেপার বের করল লোকটা, গলা পরিষ্কার করে নিল, তারপর শুরু করল পড়া, ইলেকশন বাই এডোরেশন ঘটে যখন… সব কার্ডিনাল, পবিত্র স্পিরিটের তাড়নায়, মুক্ত ও স্বতস্ফূর্তভাবে, এক কণ্ঠে এবং জোরে জোরে, ঘোষণা করে

কোন ব্যক্তির নাম।

আবার আকর্ণবিস্তৃত হাসি দেয় গ্লিক, তার মানে আপনি বলতে চান, যে, কাল রাতে যখন সব কার্ডিনাল মিলে ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কাকে ডাকছিলেন, তখনি পোপ হিসাবে নির্বাচিত হয়ে গেছেন তিনি?

হ্যাঁ। এমনকি সেখানে আরো লেখা আছে যে সবাই মিলে ডাকার ফলে সে লোক যেমন যাজকই হোক না কেন, প্রিস্ট, বিশপ বা কার্ডিনাল, নির্বাচিত হয়ে যাবে। তাই আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে ক্যামারলেনগো কার্লো ভেন্ট্রেস্কা আসলে পোপ হিসাবে নির্বাচিত হয়ে গেছেন। তার শাসনকাল মাত্র সতের মিনিটের কিছু বেশি। আর সবচে আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি একটা আগুনের শিখায় পরিণত হন। তিনি নিশ্চই ভ্যাটিকানের গোট্টোতে শায়িত আছেন আর সব পোপের সাথে।

থ্যাঙ্ক ইউ, ডক্টর! বলল গ্লিক, তাকাল ম্যাক্রির দিকে, সবচে বড় কথা…

 

১৩৭.

রোমান কলোসিয়ামের উপরের ধাপে উঠে গিয়ে এক তরুণী মেয়ে, ভিট্টোরিয়া ভেট্রা তাকে ডাকে, নিচের দিকে তাকিয়ে। তাড়াতাড়ি কর, রবার্ট! আমি জানতাম, আরো কম বয়েসি কাউকে বিয়ে করা উচিৎ ছিল। হাসিতে তার জাদু ঝরে।

শ্রাগ করে সে, গতি বাড়াতে চায়। কিন্তু পা যেন গেঁথে গেছে পাথরের মত। সবুর কর! বলে সে, মিনতি করে, প্লিজ…

একটা ধাক্কার মত লাগে তার বুকে।

জেগে ওঠে রবার্ট ল্যাঙযন একটা ধাক্কা অনুভব করে সে ভিতের ভিতরে।

অন্ধকার।

বিছানা আরামিদয়ক। ভিনদেশি। এক চমৎকার বাতাস আসছে বাইরে থেকে। আসছে সুবাস। কোথায় সে? ভেবে পায় না।

একজন এ্যাঞ্জেল তাকে তাড়া করে ফেরে… রাতের আঁধারে এগিয়ে আসে সেই দেবদূত… হাত আকড়ে ধরে তার… নিয়ে চলে পথ দেখিয়ে…

উঠে বসল সে। পাশে আরও একটা বিছানা। সেটার চাদর একেবারে গোছানো নয়। একটু আগোছালো। বাথরুম থেকে পানির শব্দ উঠছে।

ভিট্টোরিয়ার বিছানার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায় সে। সেখানে একটা বাক্সে লেখা আছেঃ হোটেল বার্নিনি।

রোমে এরচে আরামদায়ক হোটেল আর নেই।

কোন শব্দে জেগে উঠেছে সে বুঝতে পারল। দরজায় তীব্র করাঘাত করছে কেউ একজন।

কেউ জানে না আমরা এখানে!

নেমে গেল সে একটা হোটেল বার্নিনি রোব গায়ে চাপিয়ে। ভারি, ওকের দরজার সামনে থামে একটু। তারপর খুলে ফেলে।

একজন কিম্ভুত পোশাক পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে।

আমি লেফটেন্যান্ট চার্ট্রান্ড। সুইস গার্ড।

কীভাবে… কীভাবে আপনারা আমাদের পেলেন?

গতরাতে আপনাকে স্কয়ার ছেড়ে যেতে দেখেছিলাম। ফলো করেছিলাম সাথে সাথে। মনে হল এখনো থাকতে পারেন।

ভেবে পায় না সে, কার্ডিনালরা তাদের দুজনকে ভ্যাটিকানে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য লোক পাঠায়নিতো! কলেজ অব কার্ডিনালসের বাইরে শুধু তারাই জানে সত্যিটা।

হিজ হোলিনেস এই চিঠিটা দিয়েছেন। একটা চিরকুট তুলে দেয় চার্ট্রান্ড।

 

মিস্টার ল্যাঙডন ও মিস ভেট্রা,

যদিও গত চব্বিশ ঘণ্টায় আপনাদের অবদানের কারণে আমার পক্ষে আপনাদের কাছ থেকে এরচে বেশি কিছু চাওয়ার নেই তবু আমার দ্বার আপনাদের জন্য সব সময় খোলা। কিছু কিছু সময় প্রশ্নের চেয়ে উত্তরগুলো বেশি জটিল হয়ে পড়ে।

হিজ হোলিনেস, স্যাভেরিও মর্টাটি

কোন সন্দেহ নেই, কলেজ অব কার্ডিনালস একজন মহান লোককে নির্বাচিত করেছে।

আর কিছু বলার আগে চার্ট্রান্ড একটা ব্যাপিং করা প্যাকেজ বের করল, এ টোকেন অব থ্যাঙ্কস ফ্রম হিজ হোলিনেস।

ল্যাঙডন নিল প্যাকেজটা। ভারি।

তার মতে, এই আর্টিফ্যাক্টটা আপনার প্রাপ্য। সব সময়।

খুলল ল্যাঙডন। খুলেই হতবাক হয়ে গেল। সেই ব্র্যান্ড! ইলুমিনেটি ডায়মন্ড।

হাসল চট্ৰান্ড, শান্তি আপনার সাথে থাকুক। ঘুরল সে।

থ্যাঙ্ক ইউ…

মিস্টার ল্যাঙডন, আপনাকে কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?

অবশ্যই!

আমার সাথের গার্ডরা সহ আমিও খুব জানতে চাই। শেষ মিনিটগুলোয় কী ঘটেছিল হেলিকপ্টারে?

একটু ধাক্কা অনুভব করল ল্যাঙডন। তারা জানত, এ মুহূর্ত আসছে। গতরাতে সত্যির মুহূর্তে কী করবে সে বিষয়ে সলা-পরমর্শও করেছে।

সারা দুনিয়ার মানুষ জাদুমন্ত্রে মুগ্ধ। কতক্ষণ থাকবে এ ঘোর বলা যায় না। কাল রাতে… হয়ত, হয়ত তার বেঁচে যাওয়াটা ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল।

মিস্টার ল্যাঙডন? আমি হেলিকপ্টারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিলাম।

হ্যাঁ, আমি জানি… হয়ত এটা, পতনের আঘাত… কিন্তু আমার স্মৃতি, যতদূর মনে হচ্ছে একেবারে অস্পষ্ট…

আপনার কিছুই মনে নেই?

আমার ভয় হয়, এর রহস্যটা চিরদিন বন্ধই থাকবে।

বার্নিানির ট্রাইটন ঝর্ণা দেখা যাচ্ছে ব্যালকনিতে, ভিট্টোরিয়ার পিছনে। ঝর্ণার উপর একটা হাল্কা মেঘের দল ভেসে যায়। উপরে পূর্ণ আলোকিত চাঁদ। মোহময়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা তাকে রোমান দেবীর মত মনে হচ্ছে সাদা টেরিক্লথের রোবে।

কোন কথা না বলে ল্যাঙডন বুঝতে পারে, ডুবে গেছে সে মেয়েটার ভিতরে। এগিয়ে যায় ইলুমিনেটি ডায়মন্ডটাকে নামিয়ে রেখে। পরে সব ব্যাখ্যা করা যাবে।

জেগেছ তাহলে… বলছে ভিট্টোরিয়া, অবশেষে!

লম্বা দিনের পর।

আর এখন, আমার মনে হয় তুমি পুরস্কার চাইবে।

আই এ্যাম স্যরি?

আমরা পরিণত, রবার্ট। ভাল করেই জান তুমি। আমি তোমার চোখে পিপাসা দেখতে পাচ্ছি। অনুভব করছি আমার ভিতরেও…

 

ফ্রিসে, ট্রাফলস আর রিসেট্টো দিয়ে করা খানাপিনাটা জম্পেশ হল চাঁদের আলোয় বিধৌত ব্যালকনিতে।

ভিট্টোরিয়া কী বোঝাচ্ছে তা বোঝার জন্য সিম্বলজিস্ট হতে হয় না। টেবিলের নিচ দিয়ে মেয়েটা একটা অবাক করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বোঝাই যায়, সে চাচ্ছে তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হোক ভিতরে।

কিন্তু মজা করার জন্য কিছুই করল না ল্যাঙডন।

আরো থেমে থাকল সে। তারপর একে একে সব খাবার গলাধঃকরণ করল। ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করতে শুরু করল ইলুমিনেটি ডায়মন্ডটা নিয়ে। একটা অভিমানের অশ্রুতে ভরে গেল মেয়েটার চোখ।

এই এ্যাম্বিগ্রামটায় তুমি অসম্ভব আনন্দ খুঁজে পাও,তাই না? বলল সে কর্কষ কণ্ঠে।

অকল্পনীয়।

তুমি কি বলতে চাও যে এ ঘরে এটাই সবচে কৌতুহলোদ্দীপক জিনিস?

যাক, আরো একটা ব্যাপার আছে যা আমাকে আকৃষ্ট করে।

সেটা হচ্ছে?

কী করে তুমি টুনা মাছের উপর কাজ করে আইনস্টাইন থিওরির বারোটা বাজালে!

ডিও মিও! টুনা ফিস নিয়ে অনেক কচকচি হয়েছে! আমাকে নিয়ে খেল না। ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।

হয়ত তোমার পরের অভিযানে তুমি অন্য কোন মাছ… যেমন কাঁচকির উপর পরীক্ষা নীরিক্ষা করে প্রমাণ করে ছাড়বে যে পৃথিবীটা আসলে চ্যাপ্টা।

ফর ইউর ইনফরমেশন, প্রফেসর, আমার পরবর্তী পরীক্ষা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটা মাইল ফলক হয়ে থাকবে। আমি প্রমাণ করতে যাচ্ছি যে নিউট্রিনোর ভর আছে।

কী! জিজ্ঞেস করল ল্যাঙডন, আমিতো জানতামই না যে তারা ক্যাথলিক।

আশা করি তুমি মরণের পরের জীবনে বিশ্বাস কর, রবার্ট ল্যাঙডন!

আসলে… এ দুনিয়ার বাইরে কোন কিছু কল্পনা করতে গেলেই আমি ভীষণভাবে বিষম খাই।

তাই? তার মানে কখনো তোমার ধার্মিক অভিজ্ঞতা হয়নি? আনন্দময় একটা পরিপূর্ণ মুহূর্ত?

না। আর আমি এমন এক লোক যে ধর্মীয় বাতাবরণে আনন্দ পেতে চায় না।

রোব ফেলে দিল ভিট্টোরিয়া সাথে সাথে, চোখে মোহময় দৃষ্টি, তুমি কখনোই একজন যোগ গুরুর সাথে বিছানায় যাওনি, মিস্টার ল্যাঙডন।

***