১২. ভাগ্য যখন বিরূপ

আমেরিকার ডাক কুইন্স-টাউনে নামতো। একটি দ্রুতগামী ট্রেনে সেই ডাক পাঠানো হতো ডাবলিনে। ডাবলিনে ডাক নেবার জন্যে লিভারপুলগামী স্টীমার প্রস্তুতই থাকতো। ফগ হিশেব করে দেখলেন, সেই পথে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের বারো ঘণ্টা আগেই লিভারপুল পৌঁছুনো যাবে—আর অনায়াসেই আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছুনো যাবে লণ্ডন।

রাত একটার সময় আঁরিয়েতা কুইন্সটাউনে নোঙর করলো। তিলমাত্র দেরি নাকরে ফগ ট্রেনে উঠলেন, আর পরদিন বেলা এগারোটা চল্লিশ মিনিটের সময় পৌঁছুলেন লিভারপুল।

লণ্ডন সেখান থেকে ছ-ঘণ্টার পথ। ট্রেনেরও অভাব ছিলো না। ফগ বুঝলেন, বিজয় সুনিশ্চিত। পাসপার্তু তো আনন্দে নেচেই উঠলো। ঠিক সেই সময় ফিক্স ফগের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন : মিস্টার ফিলিয়াস ফগ, চুরির অপরাধে রাজার নামে আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করলুম।

কিলিয়াস ফগ বন্দী হলেন। এতক্ষণে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। ফিক্স তাকে কাস্টমস-হাউসেরই একটা ঘরে বন্দী করে রাখলেন।

পুলিশ বাধা না দিলে পাসপার্তু নিশ্চয়ই ফিকে তখন ছিঁড়ে ফেলতে। মন তার ক্ষোভে-দুঃখে ভেঙে পড়লো। ঈশ! আগেই যদি সে ফগকে ফিক্সের পরিচয় দিতে, তাহলে তো এমনটা ঘটতো না! আর আউদাকে দেখে মনে হলো, তিনি যেন এইমাত্র আবার একবার জ্বলন্ত চিতা থেকে উঠে এসেছেন।

ঠিক যখন বাজি জিতে গৌরবের স্বর্ণমুকুট পরবেন মাথায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটলো সর্বনাশ! পথের ভিখিরি হয়ে পড়লেন ফগ। তখনও পৌনে ন-ঘণ্টা সময় ছিলো। লণ্ডন পৌঁছুতে ছ-ঘণ্টার বেশি লাগতো না। ভাগ্য বিরূপ বলেই বিনা-মেঘে এমনভাবে বজ্রাঘাত হলো।

ফগ নির্বাক হয়ে বন্ধ ঘরে বসে রইলেন। তার মনে তখন যে-ঝড় চলছিলো, তার কোনো চিহ্নই তার ভাবলেশহীন মুখে দেখা গেলো না। সকলেই দেখলো, ফগ তার ঘড়িটা সামনের টেবিলের উপর রেখে অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন একমনে সেকেণ্ড, মিনিট, ঘণ্টা প্রভৃতি গুনছেন। উজ্জ্বল চোখের তারায় একটা অস্বাভাবিক আলো ছাড়া এই ভীষণ দুর্ঘটনাতেও তার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হলো না।

অস্থির পদক্ষেপে সারা ঘরে পায়চারি করতে লাগলেন ফগ। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে আবার বসলেন চেয়ারে। পকেট থেকে ডায়রিটা বের করে পড়লেন : একুশে ডিসেম্বর, শনিবার-লিভারপুল। তার নিচে ফগ লিখলেন : আশিদিনের দিন, বেলা এগারোটা চল্লিশ মিনিট।

নির্বাক হয়ে ফিলিয়াস ফগ বসে রইলেন। কাস্টমস হাউসের ঘড়িতে ঢং করে বেলা একটা বাজলো। ফগ দেখলেন তাঁর নিজের ঘড়ি দু-মিনিট ফাস্ট।

ক্রমে বাজলো দুটো। তখনও মুক্তি পেলে একটি অত্যন্ত দ্রুতগামী এক্সপ্রেস ট্রেন ধরতে পারতেন ফগ-তাহলে তার জয় হতো।

পনেরো মিনিট গেলো, কুড়ি মিনিট গেলো, কাটলো আধঘণ্টা। আর-কোনো আশা নেই!

হঠাৎ সশব্দে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে গেলো। ফিক্স আর পাসপার্তুকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন আউদা। ব্যগ্রকণ্ঠে ফি বললেন : মিস্টার ফগ, ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন। ভুল করে ধরা হয়েছিলো আপনাকে। আসল চোর ধরা পড়েছে। আপনার চেহারার সঙ্গে তার চেহারার অদ্ভুত মিল ছিলো বলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আপনি মুক্ত।

ফিলিয়াস ফগ মুক্ত হলেন। ধীরপায়ে ফিক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। একমুহূর্তের জন্যে তাকালেন তার মুখের দিকে। পরমুহূর্তেই তার একটা প্রচণ্ড ঘুসিতে ফি পড়ে গেলেন ঘরের মেঝেয়। একটাও কথা না-বলে ফগ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠলেন।

ফগের দুর্ভাগ্য—রেল-স্টেশনে পৌঁছেই শুনলেন লণ্ডনের ট্রেন দুটো পাঁচ মিনিটের সময় চলে গেছে।

শিগগির কোনো ট্রেন নেই দেখে ফগ তখুনি একটা স্পেশ্যাল ট্রেনের বন্দোবস্ত করলেন। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালো। ড্রাইভারকে পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে গাড়িতে উঠলেন ফগ। চেষ্টার ত্রুটি করলে না ড্রাইভার। কিন্তু ট্রেন যখন লণ্ডনে এসে পৌঁছুলো তখন স্টেশনের ঘড়িতে আটটা পঞ্চাশ বেজে গেছে।

সারা পৃথিবী ঘুরে ফিরতে ফিলিয়াস ফগের শেষপর্যন্ত মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি হয়ে গেলো।

আর এই পাঁচ মিনিট দেরি হবার জন্যেই হার হলো ফিলিয়াস ফগের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *