১০. ইয়াংকিদের হালচাল

যথাসময়ে জেনারেল গ্রান্ট সানফ্রান্সিসকোয় এসে নোঙর ফেললো। তখন সকাল। ফগ আমেরিকার মাটিতে পদার্পণ করেই শুনলেন নিউইয়র্কের ট্রেন সন্ধ্যার সময় ছাড়বে। তারা একটা হোটেলে গিয়ে উঠলেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হোটেলটায় কোনো জিনিশেরই অভাব ছিলো না। প্রাতরাশের পর ফিলিয়াস ফগ আউদাকে নিয়ে ইংরেজ কন্সলের আপিশে গেলেন পাসপোর্টে সই করিয়ে নিতে।

পাসপার্তু বললে : শুনেছি আমেরিকার রেলপথে ঠগ-জোচ্চোর দস্যু-ডাকাতের বড়ো ভয়। তারা চলতি ট্রেনে উঠেই লুঠতরাজ করে। গোটাকতক রিভলভার কিনে নিলে হয় না?

ফগ বললেন : ইচ্ছে হয় তো কিনতে পারো। তবে পথে হয়তো সে-সবের কোনো দরকারই হবে না।

রাস্তায় হঠাৎ ফগের সঙ্গে ফিক্সের মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলো। তাকে দেখেই ফগ বললেন : আশ্চর্য! আমরা এক জাহাজেই এসেছি, অথচ আপনার সঙ্গে জাহাজে একবারও দেখা হয়নি!

ফিক্স আগের কথা উল্লেখ করে ফগকে যারপরনেই কৃতজ্ঞতা জানালেন। বললেন : আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করা রীতিমতো সৌভাগ্যের কথা। আমিও কাজের খাতিরে ইওরোপেই যাচ্ছি। আপনার আপত্তি না-থাকলে আমরা বাকি রাস্তাটা একসঙ্গেই যেতে পারি।

সে-কী কথা! আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করা তো আমারই সৌভাগ্যের বিষয়। বেশতো, আমরা না-হয় একসঙ্গেই ইওরোপ যাবো।

ফিক্সের মৎসব সিদ্ধ হলো।

মানগোমারি টি দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। সামনেই দেখলেন লোকে লোকারণ্য। সেই জনারণ্য ভেদ করে সামনে এগুনো অসম্ভব। সেখানে কেউ-বা চীৎকার করছে, কেউবা বড়ো-বড়ো পোস্টার নিয়ে ছুটোছুটি করছে, কোথাও উড়ছে ঝাণ্ডা, কোথাও-বা অনেকে চেঁচিয়ে উঠছে, ক্যামেরফি জিন্দাবাদ, কেউ-বা বলছে, মভিবয় জিন্দাবাদ।

ফিক্সের মনে হলো এ নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক সভা। তাই তিনি বললেন : আসুন, আমরা চটপট এখান থেকে সরে পড়ি। এখানে দাঁড়ালে বিপদ ঘটতে পারে। ইয়াংকিদের কোনো বিশ্বাস নেই।

ফগও সায় দিলেন তার কথায়। কিন্তু তখন অন্যদিকে যাওয়ার আর-কোনো উপায় ছিলো না। রাস্তার এককিনারে সরে এসে তারা সেখান থেকে কেটে পড়বার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। চারদিক দেখে-শুনে ফগ ভাবলেন, হয়তো আমেরিকার ন্যাশনাল কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচন, নয়তো কোনো প্রাদেশিক শাসনকর্তা মনোনয়নের জনেই এই সভা ডাকা হয়েছে।

ক্রমশই কোলাহল বেড়ে উঠছিলো বটে, কিন্তু হঠাৎ যে ধুমধাড়াক্কা দাঙ্গা শুরু হয়ে যেতে পারে কেউই সে-কথা ভাবতে পারেননি। দেখতে-দেখতে সেই জনারণ্যের কোলাহল গেলো বেড়ে, শুরু হলো ঘুসোঘুসি, লাঠালাঠি। রিভলভারের শব্দও কানে এলো। দাঙ্গা ক্রমশ গুরুতর আকার ধারণ করলো দেখে তারা সরে পড়বার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় এক সবলদেহ ইয়াংকি ফগের মাথা লক্ষ্য করে লাঠি ওঠালে। ফিক্স যদি নিজের দেহে সে আঘাত না-নিতেন, তাহলে হয়তো ফিলিয়াস ফগ সাংঘাতিক আহত হতেন। লাঠির ঘায়ে ফিক্সের টুপি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।

অসহ্য ঘৃণায় ফেটে পড়লেন ফিলিয়াস ফগ : কী নীচ এই ইয়াংকিটা!

লাল দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাগড়াই সেই মার্কিন বললে : ওরে ইংরেজ, মনে থাকে যেন আবার আমাদের দেখা হবে!

ঠিক হ্যায়! যখন-ইচ্ছে তখনই তোমার সঙ্গে মোলাকাত করতে রাজি।

তোমার নাম কী?

ফিলিয়াস ফগ। তোমার?

কর্নেল স্ট্যাম্প প্রক্টর।

উম্মাদ জনারণ্যের কোলাহলে ও ধাক্কাধাক্কিতে কর্নেল প্রক্টরের সঙ্গে ফগের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো তখনকার মতো।

কী করে যে আউদাকে নিয়ে ফগ আর ফিক্স হোটেলে জীবন্ত ফিরতে পারলেন, তা তারা নিজেরাই জানেন না। পোশাক-আশাকের যে-দুর্দশা হয়েছিলো তাতে হোটেলে ফিরে সকলকেই নতুন জামাকপড় কিনতে হলো।

পাসপার্তু আগেই বারোটা অটোমেটিক রিভলভার ও প্রচুর কার্তুজ নিয়ে হোটেলে ফিরেছিলো। ফিক্সকে দেখেই তার ভুরু কুঁচকে গেলো। কিন্তু সে যখন শুনলে যে তার জন্যেই ফগ আহত হতে-হতে বেঁচে গেছেন, তখন সে কথঞ্চিৎ শান্ত হলো। দেখলো যে ফিক্স ভঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করেছেন।

সান্ধ্যভোজন শেষ করে সবাই স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে উঠলেন। ট্রেনে উঠতে উঠতে ফগ বললেন : সেই ইয়াংকিটার সঙ্গে আর দেখা হলো না। ইংরেজকে অপমান করার প্রতিশোধ নিতে আবার একদিন তার খোঁজে আমাকে এই নচ্ছার দেশে আসতে হবে।

এ-কথা শুনে ফিক্স কিন্তু মনে-মনে হেসেই কুটিপাট! ভাবলেন, একবার ইংল্যাণ্ডে গেলে হয়, তারপর আর তোমাকে ফিরতে হবে না বাছাধন! আমি নইলে সঙ্গে আছি কেন?

স্টেশনের একটি লোককে দেখে ফগ শুধোলেন : আজ অত গোলমাল হলো কীসের?

একটা সভা হচ্ছিলো।

কোনো সেনাপতি মনোনীত হচ্ছিলেন বুঝি?

লোকটি উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলো। না, না সেনাপতি নির্বাচন! ও কি আর যে-সে কথা! এ-সভায় একজন সাধারণ বিচারক মনোনীত হচ্ছিলেন।

আর-কোনো কথাই জিগেস করা গেলো না। ট্রেন ছেড়ে দিলো।

নিউইয়র্ক থেকে সান-ফ্রান্সিসকো পর্যন্ত রেল-লাইন তিন হাজার সাতশো ছিয়াশি মাইল লম্বা। এই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে একদা কম করেও ছ-মাস লাগতোসেই ছ-মাসের পথ এখন একহপ্তায় দাঁড়িয়েছে।

যে-ট্রেনে ফগরা উঠলেন, সেই ট্রেনে ড়ুয়িং-রুম, স্মােকিং-রুম, খাবার-ঘর সবকিছুই ছিলো। চলতি ট্রেনেই এক-কামরা থেকে অন্য-কামরায় যাওয়া যেতো। বইপত্র, খাবার-দাবার কোনোকিছুরই অভাব ছিলো না ট্রেনে। সঙ্গে-সঙ্গে একটা ছোট্ট প্রেসও ছিলো। সেই প্রেসে ছাপা হয়ে খবরের কাগজ পর্যন্ত বেরুতে। ট্রেনের সীটগুলো এমন কৌশলে তৈরি ছিলো যে, স্প্রিং টিপলেই তার পিছনের অংশ খুলে আসতো, বেরিয়ে পড়তো চমৎকার বিছানা—ধবধবে ও নরম। যে-গাড়িতে যতগুলো বিছানা, সেই গাড়িতে তার চেয়ে বেশি যাত্রী থাকবার নিয়ম ছিলো না।

কয়েক দিন ধরে নির্বিমেই ট্রেন চললো। সাতুই ডিসেম্বর ভোরবেলা গ্রীন-রিভার স্টেশনে এসে ট্রেন থামলো। গত রাতে প্রচুর বরফ পড়েছিলো, তার জের সকালবেলাতেও কাটেনি। পাসপার্তু ঠাণ্ডায় কাঁপতে-কাঁপতে ভাবছিলো, এ-সময়েও লোকে দেশ-ভ্রমণে বেরোয়! আর-একটু বরফ পড়লেই তো ট্রেন আর চলতে পারতো না।

ট্রেন থামবার সঙ্গে-সঙ্গে অনেকেই নামলো। হঠাৎ আউদা এক ভদ্রলোককে দেখে ভয়ে আঁৎকে উঠলেন। ভদ্রলোক আর-কেউ নন–সেই কর্নেল প্রক্টর, যিনি আবার দেখা হবে বলে ফিলিয়াস ফগকে শাসিয়েছিলেন। ফগ তখনও ঘুমোচ্ছিলেন। কর্নেলকে দেখে বিপদের আশঙ্কায় আউদার মন এতই বিচলিত হয়ে পড়লো যে তিনি ফিক্স আর পাসপার্তুকে কর্নেলের কথা খুলে বললেন।

ফিক্স বললেন : কোনো ভয় নেই আপনার, কিছু ভাববেন না। কর্নেলকে সবআগে আমার সঙ্গে বোঝা-পড়া করতে হবে। আমিই তো তার হাতে বেশি অপমানিত হয়েছি।

পাসপার্তুও দাঁত কিড়মিড় করে বললে : ও-সব কর্নেল-টর্নেলকে থোড়াই কেয়ার করি আমি। আমার সঙ্গেও তার অল্প-বিস্তর হিশেব-নিকেশ আছে।

এদের এইসব তড়পানি শুনেও শান্ত হতে পারলেন না আউদা। বললেন : মিস্টার ফিক্স, আপনি কি জানেন না যে মিস্টার ফগ কিছুতেই তাঁর নিজের দায় বা কলহ অন্যকারু ঘাড়ে নিতে দেবেন না। তিনিই তো বলেছেন যে তাকে অপমান করেছে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করবার জন্যে আবার আমেরিকায় আসবেন। তার সঙ্গে কর্নেলের যদি এখনই দেখা হয়, না-জানি কী-একটা বিষম কাণ্ড ঘটবে। দুজনের মধ্যে যাতে দেখা না-হয়, আপনারা বরং তারই ব্যবস্থা করুন। না-হলে অনৰ্থ হবে!

ফিক্স বললেন : আপনার কথাই ঠিক। দেখা হলেই সব পণ্ড হয়ে যাবে। মিস্টার ফগ বাজি জিততে পারুন আর না-পারুন, তার দেরি হলে—

ইশারায় তাকে চুপ করতে বলে পাসপার্তু বললে : তার দেরি হলে রিফর্ম ক্লাবের একটা মস্ত সুবিধে জুটে গেলো আর-কি! নিউইয়র্ক যেতে এখনও আমাদের চারদিন বাকি। যদি মিস্টার ফগ এর মধ্যে গাড়ি থেকে না-নামেন, তাহলেই কর্নেলের সঙ্গে তার আর দেখা হবে না। যে-করেই হোক, তাদের যাতে দেখা না-হয়, সে ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।

এমন সময় ফগের ঘুম ভাঙলো দেখে সবাই চুপ করে গেলেন। শুধু ফিক্স নিচুগলায় পাসপার্তুকে বললেন : মিস্টার ফগকে জিয়ন্ত বিলেতে নিয়ে যেতে যা-কিছু করা সম্ভব, আমি তা-ই করবো।

ফগ যাতে গাড়ি থেকে না-নামেন তারই ব্যবস্থা করবার জন্যে ফিক্স তাকে বললেন : সময় যেন আর কাটতেই চায় না। একটু হুইস্ট খেললে মন্দ হতো না।

ফগ বললেন : খেলার সঙ্গী আর তাশ পাওয়া গেলে সত্যিই বেশ হতো।

তাশ তো এখুনি আনতে পারা যায়। ট্রেনেই কিনতে পাওয়া যাবে। আর খেলার সঙ্গী? যদি মিসেস আউদা খেলেন

আউলা বললেন : আমি অল্পস্বল্প জানি।

আমিও একটু খেলতে পারি।

ফগ খুশি হয়ে বললেন : বেশ-তো।

পাসপার্তু তক্ষুনি গিয়ে কয়েক প্যাকেট তাশ কিনে আনলো।

ট্রেন নির্বিবাদে এগিয়ে চলো। ফগ নিশ্চিন্ত মনে হুইস্ট খেলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফগ খেলায় এত জমে গেলেন যে, পথের মধ্যে হঠাৎ–যখন ট্রেন থেমে গেলো, সেদিকে খেয়ালও করলেন না।

হাতে কোনো কাজ ছিলো না বলে পথের মধ্যে হঠাৎ কেন ট্রেন থেমে গেলো, সে-খবর নেবার জন্যে পাসপার্তু গাড়ি থেকে নামলে। অনেকেই ট্রেনের গার্ডকে ঘিরে ধরে নানান প্রশ্ন করছিলো। কর্নেল প্রক্টরও ছিলেন এদের মধ্যে।

মেডিসিন-বো স্টেশনের স্টেশন মাস্টার একটি লোক পাঠিয়ে খবর দিয়েছিলেন যে, সামনের একটা সেতু নিরাপদ নয়, কী-রকম যেন নড়বোড়ে হয়ে আছে; তার উপর দিয়ে ট্রেন চলতে পারবে না। গার্ড বললে যে, এই খবর পেয়েই সে গাড়ি থামিয়েছে। ট্রেনটা যেখানে থেমেছিলো, তার মাইল-খানেক দূরে ছিলো ব্রিজটা। ব্রিজটার তলা দিয়ে একটা পাহাড়ি নদী তীব্রবেগে ছুটে চলেছিলো। জানা গেলো, ব্রিজটার কয়েকটা বীম ভেঙে গেছে বলেই অমন নড়বোড়ে হয়ে আছে।

খবর শুনে পাসপার্তুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। ফগকে এই দুঃসংবাদ দেয়ার সাহস আর তার হলো না। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রুদ্ধনিশ্বাসে সে আরোহীদের আলোচনা শুনতে লাগলো।

কর্নেল প্রক্টর বললেন : বাঃ! বেড়ে মজা দেখছি! আমরা কি তবে এই বরফের মধ্যে অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি?

গার্ড জবাব দিলে : না, আমি আরেকটা ট্রেনের জন্যে ওমাহা স্টেশনে তার পাঠিয়েছি। কিন্তু ছ-ঘণ্টার আছে সে-গাড়ি মেডিসিন-বো স্টেশনে আসতে পারবে না। এদিকে একমাইল পথ হলেও ছ-ঘণ্টার আগে হেঁটেও যাওয়া যাবে না। নদী পার হতে হবে তো। নৌকোয় পার হওয়া এখন অসম্ভব। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। নদী এত ফুসে উঠেছে যে নৌকোর সাধ্যি নেই সাঁকোর কাছে নদী পার হয়। পার হবার একটাই ঘাট আছে। সে আবার দশমাইল দূরে।

যাত্রীদের মধ্যে তখন একটা বিষম শোরগোল উঠলো। ফগ যদি খেলায় মেতে–থাকতেন, তবে তিনিও নিশ্চয়ই গাড়ি থেকে নেমে খবর নিতেন এত হৈ-চৈ কীসের।

ড্রাইভার তখন বললে : একটা উপায় অবিশ্যি আছে—একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়। হ্যাঁ, সাঁকো পেরুবার কথাই বলছি।

ট্রেনখানা সমেত নাকি?

হ্যাঁ, সেই কথাই তো বলছি।

গার্ড বললে : পাগল হয়েছে? সাঁকো যে ভেঙে গেছে!

তা ভাঙলোই বা, পড়ে তো আর যায়নি। গোটা-দুই থাম ভেঙেছে মাত্র। আমি যদি খুব স্পীডে গাড়ি চালিয়ে দিই, তবে পলক ফেলতে-না-ফেলতে ট্রেন নিয়েই সাঁকো পেরিয়ে যেতে পারবো।

ড্রাইভারের কথা শুনে তো পাসপার্তুর আত্মারাম খাঁচা-ছাড়া। কিন্তু কথাটা অনেকেরই মনে ধরলো।

কর্নেল প্রক্টর বললেন : এ আর বেশি কথা কী। এ-তো হতেই পারে। এখানে তো তবু সাঁকোটা দাঁড়িয়ে আছে, ভেঙে পড়েনি। আমি এক ড্রাইভারকে জানি, যে বিনা সাঁকোতেই একবার একটা ছোটো নদী পার করে ট্রেন নিয়ে গিয়েছিলো। সে তখন কী সাংঘাতিক স্পীডেই যে গাড়ি চালিয়েছিলো, তা আর বলা যায় না। গোটা ট্রেনখানা লাইন থেকে যেন লাফিয়ে উঠে নদী পেরিয়ে গেলো। আমাদের ট্রেন তো তবু সাঁকোর উপর দিয়েই যাবে।

এ-কথা শুনে অনেকেই ড্রাইভারের পক্ষ সমর্থন করলো। একজন বললে : আমরা যে নির্বিঘ্নে যেতে পারবো, তার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সম্ভাবনা।

আর-একজন অমনি বলে উঠলো : পঞ্চাশ ভাগ কী–হে-ষাট ভাগ।

কর্নেল প্রক্টর বললেন : তোমাদের কোনো আন্দাজ নেই! যেখানে আশি-নব্বই ভাগ সম্ভাবনা সেখানে ষাট ভাগ বলছো।

ইয়াংকিদের হালচাল দেখে পাসপার্তুর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। এমন সময় একটু-নিরাপদ একটা উপায় তার মনে এলো। সে বললো : আমি বলছিলাম কী এই বিপজ্জনক–

তার কথা কেড়ে নিয়ে একটি লোক বললে : পার হবার আশি ভাগ সম্ভাবনা যেখানে দেখা গেলো, তা আবার বিপজ্জনক কী–হে? ড্রাইভার নিজেই তো বলছে যে সে যেতে পারবে।

তা পারতে পারে। কিন্তু আমি যা বলছিলুম সেইটেই বোধহয় ঠিক হতো।

ঠিক! কর্নেল প্রক্টর রেগে উঠলেন। ঠিক আবার কী! তুমি কি বুঝতে পারছো না যে আমরা ফুল-স্পীডে চালিয়ে যাবো? শুনলে? ফুল-স্পীডে। তারপর বিদ্রূপে ফেটে পড়লেন—

কী-হে ছোকরা, ভয় পেয়েছে নাকি?

ভয়? ভয় কাকে বলে পাসপার্তু জানে না!

গার্ড বললে : উঠুন, উঠুন-সবাই গাড়িতে উঠুন। গাড়ি এখুনি ছাড়বে।

পাসপার্তু নিচুগলায় বললে : তা না-হয় উঠছি। কিন্তু যাত্রীরা হেঁটে সাঁকো পেরুলে পর গাড়িটা সাঁকোর উপর তুললে ভালো হতো। কিন্তু তার যুক্তি কেউ শুনতেই চাইলো না–শুনলেও মানতে চাইতো কি না সন্দেহ।

সবাই গাড়িতে গিয়ে উঠলো। ফগ তখনও একমনে হুইস্ট খেলছিলেন। ড্রাইভার সিটি দিয়ে ট্রেনখানি একমাইল পেছনে নিয়ে গেলো। সেখান থেকে এগুলো প্রচণ্ড বেগে, ঝড়ের বেগে। ঘণ্টায় একশো মাইলের কম হবে না সে-স্পীড। ট্রেন যেন রেললাইন না-ছুঁয়েই ছুটলো।

বিদ্যুৎ যেমন করে চক্ষের পলকে আকাশের একপান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত স্পর্শ করে, ট্রেনটাও তেমনি নিমেষের মধ্যে সাঁকো পেরিয়ে গেলো। সবাই তাকিয়ে দেখলো, সাঁকোটা টুকরো-টুকরো হয়ে পড়ে যাচ্ছে নদীতে।

ট্রেন এগিয়ে চললো।…

ট্রেনে তিনদিন তিনরাত কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে তেরোশো বিরাশি মাইল পেরিয়ে এসেছে ট্রেন। ইভান্স-পাস স্টেশন ছাড়িয়ে সন্ধের পর ট্রেন ক্রমশ নিচের দিকে ছুটে চললো।…

সকালবেলা ফগ হুইস্ট খেলতে শুরু করলেন। ফিক্সও হুইস্টে রীতিমতো ওস্তাদ। অল্পক্ষণের মধ্যেই খেলা জমে উঠলো। সেবার ফগের পালা। যেই ফগ একটা চিড়েতন খেলতে যাবেন, অমনি কে যেন পিছন থেকে বলে উঠলো : আমি হলে হরতন খেলতুম। সবাই চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখলো, পিছনে কর্নেল প্রক্টর। ফগকে দেখেই কর্নেল বললেন : ও আপনিই আমার সেই পুরোনো ইংরেজ-বন্ধু। তা-ই তো বলি, ইংরেজ না-হলে গর্দভের মতো চিড়েতন খেলে কে?

ঠিক তা-ই। দেখুন-না, আমিও খেলছি তা-ই। ফগ তাঁশ দিলেন।

তাশটা তুলে নেয়ার চেষ্টা করতে-করতে দুঃসহ স্পর্ধায় কর্নেল বললেন : আমি হরতন খেলতে চাই। আপনি হুইস্ট খেলার কিছুই জানেন না দেখছি।

ফগ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অন্যেও যেমন জানে, আমিও তেমনি জানি।

বিদ্রূপে ফেটে পড়লেন কর্নেল।বেশ-তো। একহাত হয়ে যাক না!

ব্যাপার দেখে আউদার মুখ পাঁশুটে হয়ে গেলো। ফগের হাত ধরে তাকে টেনে বসালেন আউদা। পাসপার্তু রাগে যেভাবে ফুসে উঠলো, তাতে মনে হলো সে বুঝি এক্ষুনি কর্নেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!

ফগকে লক্ষ্য করে ফিক্স কিন্তু তক্ষুনি বললেন : আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে এঁর সঙ্গে আমাকেই আগে হিশেব-নিকেশ করতে হবে–

ফগ শান্তগলায় বললেন : মাপ করবেন, বোঝাপড়াটা আগে আমার সঙ্গেই হবে। কী করে হুইস্ট খেলতে হয় তা আমি জানিনে, এ-কথা বলে কর্নেল আমাকে অত্যন্ত অপমানিত করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই তার সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ দেবেন।

তীব্র কণ্ঠ কর্নেল বললেন : কৈফিয়ৎ? যেখানে-খুশি, যখন-ইচ্ছে, যেমন-করে চান-তা-ই পাবেন!

ট্রেন তখন একটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আউদা, ফিক্স ও পাসপার্তুর কোনো কথা না-শুনেই ফগ গাড়ি থেকে নামলেন। কর্নেলও তাঁর অনুসরণ করলেন।

প্ল্যাটফর্মে নেমে ফগ নম্বরে বললেন দেখুন কর্নেল, তাড়াতাড়ি ইওরোপে ফিরেযাওয়া আমার বিশেষ দরকার। এখানে দেরি হলে আমার খুব লোকশান হবে।

কর্নেল বললেন : তাতে আমার কী?

ফগ আগের মতোই নরমগলায় বললেন : সান-ফ্রান্সিসকোতে আপনার সঙ্গে কলহ হবার পর আমি শপথ করেছিলুম আমার ইংল্যাণ্ডের কাজ শেষ হলেই আমি আপনার খোঁজে আবার আমেরিকায় ফিরে আসবো।

তীব্র ব্যঙ্গে ফেটে পড়লেন কর্নেল! বটে!

আজ থেকে ছ-মাস পরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে কি?

ছ-মাস কেন, ছ-বছরই বলুন না!

আমি ছ-মাসের কথা বলছি। ছ-মাস পরে আমি ঠিক এখানে এসে হাজির হবো।

কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন : পাগল, না খ্যাপা? আমার কথাই হলো, নাউ অর নেভার।

বেশ, তা-ই হবে তাহলে। আপনি কি নিউইয়র্কে যাচ্ছেন?

আমি যেখানেই যাই না কেন, আপনার তাতে কী। এর পরের স্টেশনের নাম হলো প্লামফ্রিক। গাড়ি সেখানে দশমিনিট দাঁড়াবে। গোটাকতক বন্দুকের গুলি চালাতে সেখানে আর কতটুকু সময়ই বা লাগবে?

সে-ই ভালো। তবে আমি প্লামফ্রিকেই নামবো।

কর্নেল স্পর্ধা করে বললেন, সেখান থেকে আর উঠতে হবে না।

ধীরভাবে গাড়িতে উঠতে-উঠতে ফগ বললেন : কে জানে কী হবে?

গাড়ি ছেড়ে দিলো। আউদাকে আশ্বস্ত করে ফগ বললেন : যারা মুখে বেশি তড়পায়, তাদের কাছে আবার ভয় কী? মিস্টার ফিক্স, এই ড়ুয়েলে আপনি বোধহয় আমাকে সেকেণ্ড করবেন?

ফিক্স রাজি হলেন। ফগ আবার নির্বিকারভাবে হুইস্ট খেলা শুরু করলেন। একটু বাদেই যে তাকে প্রাণঘাতী ড়ুয়েল লড়তে হবে, সেজন্যে উদ্বেগের কোনো চিহ্নই ফগের মুখে দেখা গেলো না।

এগারোটার সময় ট্রেনের বাঁশি শুনে বোঝা গেলো প্লমফ্রিক স্টেশন এসে গেছে। ফগ উঠে দাঁড়ালেন। পাসপার্তু আর ফিকা রিভলভার নিয়ে তার সঙ্গে-সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। ফ্যাকাশে মুখে আউদা মড়ার মতো আসনেই বসে রইলেন।

পরমুহুর্তেই পাশেই কামরার পা-দানিতে দেখা গেলো কর্নেল প্রক্টরকে। অন্য কেএকজন আমেরিকান তার দোসর হয়েছিলো। সবাই ট্রেন থেকে নামবার উদ্যোগ করতেই গার্ড বারণ করলো : নামবেন না আপনারা। গাড়ি কুড়ি মিনিট পেছিয়ে পড়েছে। আমি এখানে আর দাঁড়াবো না।

ফগকে দেখিয়ে কর্নেল বললেন : আমি এঁর সঙ্গে একটু ড়ুয়েল লড়বো বলে ঠিক করেছি।

গার্ড বললে : বড়ো দুঃখিত হলুম। কিন্তু কী আর করবো বলুন। ঐ শুনুন গাড়ি ছাড়বার ঘণ্টা পড়লো। সঙ্গে-সঙ্গে গাড়ি ছেড়ে দিলে। গার্ড সবিনয়ে বললে, আমায় মাপ করবেন আপনারা। অন্যদিন হলে আপনাদের জন্যে আমি একটু অপেক্ষা করতে পারতুম। তা আপনারা যদি একান্তই ড়ুয়েল লড়তে চান, চলতি ট্রেনেও তো তা হতে পারে।

ফগকে বিদ্রূপ করে কর্নেল বললেন : বোধহয় ওঁর তাতে সুবিধে হবে।

ফগ বললেন : আমার কোনো অসুবিধে হবে না—আপনার সুবিধে হলেই হলো।

গার্ড তখন তাদের সঙ্গে নিয়ে ট্রেনের একেবারে শেষ কামরাটায় গেলেন। কামরাটায় দশ-বারোজন মাত্র যাত্রী ছিলো। গার্ড তাদের বললে, এই দু-জন ভদ্রলোকের নিজেদের মধ্যে একটু হিশেব-নিকেশ আছে। আপনারা যদি এঁদের একটু জায়গা দিতে পারেন, তবে খুব ভালো হয়।

তাঁদের অনুগৃহীত করে যাত্রীরা পাশের কামরায় চলে গেলো।

কামরাটা পঞ্চান্ন ফিট লম্বা, সুতরাং বন্দুকের ড়ুয়েলের পক্ষে কোনোই অসুবিধে ছিলো না। ফিলিয়াস ফগ আর কর্নেল প্রক্টর কামরার মধ্যে ঢুকলেন রিভলভার হাতে। কামরার দরজা বন্ধ করে আর-সবাই অন্যখানে অপেক্ষা করতে লাগলো। ঠিক হলো, এঞ্জিনের সিটি শুনলেই লড়াই শুরু হবে এবং সে-লড়াই পুরো দু-মিনিট ধরে চলবে। এত-সহজে এত-তাড়াতাড়ি সব বন্দোবস্ত হয়ে গেলো যে ফিক্স আর পাসপার্তু কিরকম যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন।

ট্রেনের সিটির জন্যে উৎকণ্ঠিত হয়ে সবাই যখন অপেক্ষা করছে, তখন হঠাৎ ভয়ানক গণ্ডগোল শুরু হলো। সেই হৈ-চৈ-এর মধ্যে ট্রেনের নানান জায়গা থেকে গর্জে উঠলো একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুক। যাত্রীরা চেঁচিয়ে উঠলো। আর্তনাদে-আর্তনাদে তখন চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে। কর্নেল প্রক্টর আর ফিলিয়াস ফগ রিভলভার হাতে যেখানে গোলযোগ সবচেয়ে বেশি, সেদিক পানে ছুটলেন।

একদল সিয়োক্স দস্যু চলতি ট্রেন আক্রমণ করেছিলো। আমেরিকার সেই নির্জন অঞ্চলে প্রায়ই তারা এ-ভাবে লুঠতরাজ চালাতো। তলোয়ার-বন্দুক নিয়ে ক্ষিপ্রবেগে ট্রেনের পা-দানির উপর উঠতে লাফিয়ে, লুঠ করতো যাত্রীদের যথাসর্বস্ব।

দস্যুদের মধ্যে একজন এঞ্জিনের উপর উঠে ড্রাইভার আর ফায়ারম্যানকে আহত করলে। তার ইচ্ছে ছিলো ট্রেন থামানোর, কিন্তু এঞ্জিনের ব্যবহার না-জানায় সে খুলে ফেললো বাষ্প-নলের মুখ। অমনি ট্রেন না-থেমে বরং উল্কার মতো ছুটতে লাগলো। অন্যান্য দস্যুদের সঙ্গে যাত্রীদের ভীষণ লড়াই শুরু হয়ে গেলো। রিভলভার আর বন্দুকের শব্দে কেঁপে উঠতে লাগলো চারদিক।

ট্রেন ছুটছিলো উল্কার মতো। গার্ড রিভলভার চালাতে চালাতে ফগকে বললে : যদি ট্রেন থামাতে না-পারেন, তাহলে একজনও বাঁচবে না। ফোর্ট-কিয়ার্নি স্টেশন আর মাত্র পাঁচ-ছ মাইল দূরে। গাড়ি যদি স্টেশন পেরিয়ে চলে যায়, তাহলে দস্যুদের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া অন্যকোনো উপায় থাকবে না। উঃ! গার্ড আরো-কী বলতে যাচ্ছিলো, এমন সময় দস্যুদের একটা গুলি এসে তার বুক ভেদ করল। গার্ড ছিটকে পড়লো। ভলকে-ভলকে রক্ত উঠলো তার মুখ দিয়ে।

ফগ গার্ডের কথা শুনেই ট্রেন থামাবার জন্যে অগ্রসর হলেন। পাসপার্তু তার পাশেই ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলো। সে চেঁচিয়ে উঠলো, আপনি যাবেন না—যাবেন না! এ একটা সামান্য কাজ—আমারই উপর্যুক্ত।

ফগ তাকে বারণ করবার আগেই সে জানলা দিয়ে কামরার বাইরে চলে গেলো, আর খুব-সাবধানে ঝুলতে-ঝুলতে ট্রেনের সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। লাগেজ-গাডি ও এঞ্জিনের মাঝখানের লোহার রডটা একহাতে ধরে অন্যহাতে দু-গাড়ির সংযোজনশৃঙ্খল খুলে দিলে। যে-লোহার রডটা দিয়ে এঞ্জিনের সঙ্গে লাগেজ-গাড়ি আটকানো ছিলো, তা তখন মুহূর্তের মধ্যে গেলো ভেঙে। খালি এঞ্জিন বিদ্যুৎবেগে ছুটে চললো সামনে দিকে, আর প্রতি মুহূর্তেই কমতে লাগলো বাদবাকি ট্রেনের গতি। দেখতেদেখতে ট্রেনটা ফোর্ট-কিয়ার্নি স্টেশনের কাছে এসে একেবারে থেমে গেলো। দস্যুদল তখন পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো।

আরোহীদের মধ্যে যারা জখম হয়েছিলো, তাদের কারু আঘাতই তেমন সাংঘাতিক ছিলো না। মৃতের সংখ্যাও খুব বেশি ছিলো না। কর্নেল প্রক্টর একটু-বেশি আহত হয়েছিলেন, অন্যান্য আহত যাত্রীদের সঙ্গে কর্নেলকে ফাস্ট-এডের জন্যে রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়া হলো।

আউদা আর ফগ কিন্তু একেবারেই আহত হননি। ফিল্মের কাঁধের খানিকটা মাংস দুড়ে গিয়েছিলো মাত্র। কিন্তু পাসপার্তুকে পাওয়াই গেলো না—কেউই তার কোনো সন্ধান। দিতে পারলে না। আউদা তার জন্যে কাঁদতে শুরু করলেন, আর ফগ অপলক চোখে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আউদা সকাতর চোখে ফগের দিকে তাকালেন। সে-দৃষ্টির মানে বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরি হলো না ফগের। কর্তব্য ঠিক করে নিয়ে আউদার দিকে তাকিয়ে বললেন : জ্যান্ত কিংবা মরা—আমি পাসপার্তুকে খুঁজে বার করবোই। আউদা সে-কথা শুনে আবেগভরে ফগের হাত চেপে ধরলেন।

ফিলিয়াস ফগ শপথ করলেন যে, যে করেই হোক পাসপাৰ্তর সন্ধান না-করে আমেরিকা ছেড়ে যাবেন না—সেজন্যে যদি যথাসর্বস্ব যায়, তাতেও রাজি। তাঁর এ-কথা ভালো করেই জানা ছিলো যে, পথে একদিন দেরি হলেই নিউইয়র্ক গিয়ে ইংল্যাণ্ড যাবার জাহাজ আর পাবেন না—আর নিই-ইয়র্কে জাহাজ ধরতে না পারলে বাজিতে নিশ্চিতভাবেই তাকে হারতে হবে। কিন্তু পাসপার্তুর অনুসন্ধান করাই কর্তব্যনিষ্ঠ ফগের কাছে বড়ো হয়ে দাঁড়ালো।

ফোটকিয়ানি একটা ছোটো দুর্গ। দুর্গের সৈন্যরা বন্দুকের আওয়াজ ও তুমুল হৈচৈ শুনে আগেই রেলস্টেশনে এসে হাজির হয়েছিলো। ফগ তাদের কম্যাণ্ডারকে বললেন : দেখুন, তিনজন যাত্রীর কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা মরে গেছে নাকি?

মরুক আর দস্যুর হাতে বন্দীই হোক, তাদের খোঁজ করতেই হবে। আপনি কি সৈন্য নিয়ে দস্যুদের অনুসরণ করতে চান?

কম্যাণ্ডার বললেন, এ তো বিষম সাংঘাতিক কথা! তারা যে পালাতে-পালাতে কোথায় যাবে তার কি কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে? আমি তো আর দুর্গ অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে পারিনে! কে জানে সুবিধে পেলে দস্যুরা এসে দুর্গ আক্রমণ করবে কি না। তিনজনের জন্যে তো আর পঞ্চাশজনের জীবন বিপন্ন করতে পারিনে। দস্যুর আক্রমণে অনেকেরই তো প্রাণ গিয়েছে। কিন্তু তার আর কী করবেন বলুন। এ-রকম অপঘাত মরণ তো এখানে আখছারই হচ্ছে।

পঞ্চাশজনের জীবন বিপন্ন হবে কি না জানিনে-কিন্তু আমার মনে হয় তিনজনকে বাঁচাবার চেষ্টা আপনার করাই উচিত।

কমাণ্ডার তীব্রক বললেন : আমাকে আমার কর্তব্য বুঝিয়ে দিতে পারে এমন লোক তো এখানে দেখছিনে!

শান্তগলায় ফগ বললেন : বেশ। আমি তাহলে একাই যাবো।

ফিক্সের কাছে ফগের একা যাওয়ার কথা ভালো লাগলো না। এতদুর অনুসরণ করে এসে কি শেষটায় ব্যাংক-দস্যুকে নাগাল থেকে হারাবেন? তিনি বললেন : আপনি একাই দস্যুদের অনুসরণ করতে চান? না, না—সে হবে না।

আপনি কি বলতে চান যার জন্যে আমরা প্রাণ পেয়েছি, সেই অকুতোভয় পাসপার্তুকে দস্যর কবলে ফেলে আমি চলে যাবো? ককখনো তা হবে না। আমি নিশ্চয়ই তার খোঁজ করতে যাবো!

ফগের কথা শুনে কম্যাণ্ডার কী ভাবলেন, কে জানে! বললেন : আপনাকে আর একা যেতে হবে না—আপনি দেখছি সত্যিকার বার। তারপর সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন : আমি ত্রিশজন লোক চাই-কে-কে যাবে, এসো।

ডাক শুনে সবাই যখন এগিয়ে এলো, তখন কমাণ্ডার ত্রিশজনকে বাছাই করে নিয়ে যাত্রার জন্যে কম দিলেন এক ধার-স্থির প্রবীণ অফিসার সেই দলের নেতৃত্ব নিলেন।

ফগ কাণ্ডারকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা হচ্ছেন দেখে ফিক্স এগিয়ে এলেন। বললেন : আমাকে কি সঙ্গে নেয়া যায় না?

আপনার যা-ইচ্ছে তা-ই করতে পারেন। তবে আপনি যদি মিসেস আউদার ভার নিতেন, তাহলেই আমার বেশি উপকার হতো। আমারও তো বিপদ ঘটতে পারে।

ফিক্সের মুখ শুকিয়ে গেলো। এত পরিশ্রম করে বিপদ-আপদ তুচ্ছ করে এতদিন ধরে যার অনুসরণ করে এলেন, আজ কি না তাকে একা ছেড়ে দিতে হচ্ছে, চোখের আড়াল করতে হচ্ছে তীব্র চোখে ফগের দিকে তাকালেন তিনি। দেখতে পেলেন, ফগের মুখে কুটিলতার কোনো চিহ্নই নেই। ফগের সরল দৃষ্টির কাছে হার মানলেন ফিক্স। গ্রহণ করলেন আউদার দেখাশোনার ভার।

ফিলিয়াস ফগ তার ব্যাংক-নোটে বোঝাই ব্যাগটা আউদার হাতে দিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে এগুলেন। যাত্রার সময় সৈন্যদের বললেন : যদি আমরা বন্দীদের উদ্ধার করতে পারি, তাহলে আপনাদের একহাজার পাউণ্ড পুরস্কার দেবো বলে শপথ করছি।

একটু বাদেই ফগ ফৌজ নিয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। আউদা তখন ওয়েটিংরুমে বসে-বসে ভাবছিলেন মহৎহৃদয় ফগের কথা। আর ফিক্স বাইরে একটা চেয়ারে বসে ভাবছিলেন, আমি কী গর্দভ! পকেটে ওয়ারেন্ট থাকতেও আমি কিনা দস্যুটাকে ছেড়ে দিলুম! আর কি সে ফিরে আসবে? বোধহয় না। সে আমাকে নিশ্চয়ই ফাঁকি দিয়েছে। অমনি তার মনে হলো, বরফের উপর পায়ের ছাপ দেখে-দেখে ফগকে এখনও অনুসরণ করা চলে! কিন্তু সে আশায় যে ছাই, তা বুঝতে তার দেরি হলো না। যেতেযেতেই আরো-বরফ পড়বে, আর তাহলেই কোনো পদচিহ্ন থাকবে না। ফিক্স হতাশ হয়ে পড়লেন। তার চোখের সামনে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো।

সময় কারু জন্যে বসে থাকে না। বরফের কুচি আর কুয়াশার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চললো সময়। দেখতে-দেখতে বাজলো তিনটে। এমন সময় হঠাৎ ট্রেনের সিটি শোনা গেলো। সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেলো, একটি ট্রেনের এঞ্জিন স্টেশনের কাছে এসে থেমেছে।

পাসপার্তু যে-এঞ্জিনটা ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো তা অনেক দূর অব্দি বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়েছিলো। কিন্তু ক্রমে কয়লা ফুরিয়ে যেতেই অনেক দূর গিয়ে ধীরেধীরে থেমে পড়েছিলো। আহত ড্রাইভারের ইতিমধ্যেই জ্ঞান ফিরে এসেছিলো। সে তক্ষুনি সকল অবস্থা বুঝতে পারলে। আবার আগুন জ্বেলে বিচ্ছিন্ন ট্রেনের খোঁজে সে ফের ফিরে আসতে লাগলো। কুয়াশায় কয়েক হাত দূরের জিনিশই দেখা যাচ্ছিলো না। ফোর্টকিয়ার্নি স্টেশন যাতে পেরিয়ে চলে না-যায়, সেজনে ড্রাইভার বার-বার সিটি দিচ্ছিলো।

এঞ্জিন আসতেই যাত্রীরা আনন্দিত হয়ে উঠলো। বিচ্ছিন্ন ট্রেন আবার এঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত করা হলে আউদা নতুন গার্ভকে শুধোলন, গাড়ি কখন ছাড়বে?

এক্ষুনি।

কিন্তু বন্দীরা? আর যারা তাদের খোঁজে গেছেন–

তা বলে তো আমি আর বসে থাকতে পারিনে। এমনিতেই গাড়ি তিন ঘণ্টা পেছিয়ে পড়েছে।

সান-ফ্রান্সিসকো থেকে আবার কখন গাড়ি আসবে?

কাল সন্ধের সময়।

তাহলে তো খুব দেরি হয়ে যাবে। আপনি কি একটুও অপেক্ষা করতে পারবেন।?

অসম্ভব। যদি যেতে হয় তবে আসুন, অযথা আর দেরি করবেন না।

তাদের ফেলে রেখে আমি কিছুতেই যাবো না।

আহত যাত্রীরা সকলেই গাড়িতে উঠে বসলো। ট্রেন ছেড়ে দিলে।

ফিক্স খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ট্রেন পেলেই চলে যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু সত্যি-সত্যিই যখন ট্রেন পাওয়া গেলো, তখন তিনি আর গেলেন না। ভাবলেন, দেখা যাক, শেষ অব্দি কী হয়। আবার তো ট্রেন পাওয়া যাবে।

বরফ যেমন পড়ছিলো তেমনি পড়তে লাগলো। আরো-ঘন হয়ে জল থেকে কুয়াশা উঠলো। আগের মতোই বইতে লাগলো ঠাণ্ডা হাওয়া। ক্রমে সন্ধ্যা হলো। রাত্রির অন্ধকারে স্টেশনটা ভুতের মতো নিঃঝুম হয়ে পড়ে রইলো। আশঙ্কায়, উৎকণ্ঠায় রাত্রে ঘুম হলো না আউদার। কিন্তু ফগদের কোনো খোঁজই পাওয়া গেলো না। ভোরবেলা আবহাওয়া অনেকটা ভালো হলো বটে, কিন্তু তখনও ফগের কোনো খবর পাওয়া গেলো না। আউদা আর ফি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। সৈন্যদের জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়লেন কম্যাণ্ডার।

ক্রমে বেলা বেড়ে চললো। চিন্তিত কমাণ্ডার তাদের খোঁজে দুর্গের বাকি সৈন্যদের পাঠাবেন বলে ঠিক করলেন। সৈন্যরা তৈরি হলো। এমন সময় হঠাৎ দূরে বন্দুকের আওয়াজ হলো। খানিকক্ষণের মধ্যে ফিলিয়াস ফগ, জাঁ পাসপার্তু ও আর-সবাই স্টেশনে এসে হাজির হলো।

ফোর্ট-কিয়ার্নি থেকে মাইল-দশেক দুরে দস্যুদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিলো। তারা দূর থেকেই পাসপার্তু আর অন্য দুজন যাত্রীকে দস্যুদের সঙ্গে লড়াই করতে দেখতে পেয়েছিলেন। এমন সময় ফগ ফৌজ নিয়ে সেখানে হাজির হয়ে সবাইকে উদ্ধার করলেন।

পাসপার্তু স্টেশনে এসেই ফিকে দেখে শুধোলে : ট্রেন কই? তার ভরসা ছিলো, তাদের এই বিপদের মধ্যে রেখে ট্রেন কখনোই চলে যাবে না।

ফিক্স ভারিগলায় বললেন : ট্রেন নেই, চলে গেছে।

ফগ শাতকণ্ঠে শুধোলেন : আবার কখন গাড়ি পাওয়া যাবে?

সন্ধ্যার আগে না।

এ-কথা শুনে ফিলিয়াস ফগ অস্ফুট স্বরে শুধু বললেন : তাই তো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *