১. রাশান লোকটা

১১.

রাশান লোকটার প্রশ্নের জবাব না দেয়ায় তার দলের এক পাণ্ডা অস্ত্র তাক করেছে রানার চোখে।

আমি যদি মরেই যাই, আর একটা শব্দ বেরোবে না মুখ থেকে, বলল রানা।

ভয়ঙ্কর কঠিন চেহারা করে চেয়ে আছে চাইনিজ মাস্তান, কিন্তু রানার কথাটা শুনে হেসে ফেলল রাশান। ঠিক আছে, আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো ওকে।

পেছন থেকে কে যেন খসখসে এক তোয়ালে দিয়ে বেঁধে দিল রানার চোখ, তারপর ঠেলে ওকে তোলা হলো একটু দূরের ভ্যানে। কিছুক্ষণ পর ওরা পৌঁছুল সাগরতীরে। পিঠে গুঁতো খেয়ে রানা উঠল ডিজেল ইঞ্জিনওয়ালা এক জাঙ্ক-এ।

ইঞ্জিনের বিকট ভ্যাট-ভ্যাট শব্দ তুলে বন্দরের মাঝ দিয়ে চলল প্রাচীন যুগের ভারী নৌকা। বেঞ্চে বসে রানা বুঝতে চাইছে কোথায় চলেছে, বা গতি কেমন। কয়েক মিনিট পর জিজ্ঞেস করল, আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছ?

খুশি মনে বলব সব, কিন্তু তার আগে আমার জানতে হবে, আসলে কী কারণে এসেছ তুমি, জবাব দিল রাশান লোকটা।

চুপ করে থাকল রানা। বুঝতে চাইছে পরিস্থিতি।

ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে গেল না?

ধরে এনে বাঙালী এক গুপ্তচরকে জেরা করছে এক রাশান লোক কেন ও হংকঙে!

কসেকেণ্ড পর পাটাতনের নিচে ভ্যাট-ভ্যাট-ভুট-ভুট পুট-পুট-পুট-পুট-ফুস্! শব্দে থেমে গেল ডিজেল ইঞ্জিন। আর এগোল না জাঙ্ক, একবার এদিক, আবার ওদিক দুলছে। সাগরের ঢেউয়ে।

উঠে দাঁড়াও, আদেশ দিল রাশান।

রেলিং ধরে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা। বাঁধন খুলে সরিয়ে নেয়া হলো চোখের ওপর থেকে তোয়ালে। ঘুরে দাঁড়াতে গেল রানা। কিন্তু নির্দেশ এল, তাকাও সোজা সামনে!

ওর পিঠে খোঁচা দিল রাইফেলের মাল।

নির্দেশ মত সরাসরি তীরে তাকাল রানা। ও আছে নড়বড়ে জাঙ্কে, তীর থেকে এক মাইল দূরে।

ওই যে ভিক্টোরিয়া হার্বার!

ওদিকেই আছে হংকঙের আকাশে খোঁচা দেয়া মস্ত উঁচু সব বহুতল অফিস।

শুনেছি, বর্তমান পৃথিবীর সেরা একজন স্পাই তুমি। শুধু তাই নও, নিজের ছোট্ট ওই দেশের জন্যে প্রাণ দিতেও দ্বিধা নেই তোমার। কাউকে ভয় পাও না।

চুপ করে থাকল রানা।

তোমার নাম মাসুদ রানা, বলল রাশান। বাঙালী গুপ্তচর। এমন তো নয় যে দল বদল করেছ? বাংলাদেশের জন্মের আগে থেকেই তোমাদের দেশের প্রাপ্য স্বাধীনতা ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে আমেরিকান সরকার বা সিআইএ। সেক্ষেত্রে মার্কিন সংস্থার হয়ে কাজ করতে এ দেশে এলে কেন? এর জবাব জানতে চাই।

রেলিঙে হাত রেখে রানা ভাবল, এরই ভেতর বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছে রাশান লোকটা।

নীরবতা ভাঙল না ও।

তুমি হয়তো আছ বন্ধুদের ভেতর, কাজেই মুখ খোলো, বলল লোকটা। নইলে বুঝব, সত্যিই বেঈমানি করেছ। দেশের সঙ্গে। আমেরিকার হয়ে ক্ষতি করতে চাও চিনের। সেক্ষেত্রে জানব, যা ভাবতাম তোমার ব্যাপারে, সবই মিথ্যা। সত্যিই কি কোনও চাইনিজ কর্মকর্তাকে খুন করতে এসেছ?

আমি খুনি নই, বলল রানা, আমাকে মেরে ফেলতে না চাইলে কাউকে খুন করি না।

তা হলে এ দেশে এলে কেন?

রানা একবার ভাবল, রেলিং টপকে ঝাঁপিয়ে পড়বে সাগরে। পরক্ষণে বুঝল, পেছন থেকে আসা গুলি ঝাঁঝরা করবে ওর পিঠ।

জানতে চাইছি, কেন তুমি এই দেশে?

এসেছি আমার ব্যক্তিগত একটা কাজে, মুখ খুলল রানা।

তার মানে এনআরআই থেকে তোমাকে পাঠানো হয়নি?

ওই সংগঠনের চিফের সঙ্গে সম্পর্ক আছে আমার কাজের।

সেক্ষেত্রে এসেছ হারিয়ে যাওয়া ওই মেয়ের জন্যে?

যা খুশি ভেবে নিতে পারো।

এফএসবি ভাল করেই জানে, ওই মেয়েকে আটকে রেখেছে ল্যাং।

চুপ করে আছে রানা।

তোমার মিশন সফল করা খুব কঠিন, বলল রাশান, তবে ওই যে, সরাসরি সামনে টার্গেট।

রানা দেখল, তীরে সোনালি রোদে ঝিকঝিক করছে সাদা মার্বেল দিয়ে কারুকাজ করা বহুতল ভবন, টাওয়ার ল্যাং।

ওই মেয়ের কাছ থেকে কী যেন আদায় করতে চায় ল্যাং।

টাওয়ারের পাথরের ভিত্তি দেখছে রানা। ভাবছে, উবে গেছে ওর কাভার। সবই জানে রাশান ইন্টেলিজেন্সের এই লোক। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল ও। এবার বাধা দিল না কেউ।

জাঙ্কের পাইলট হাউসের ছাউনির ছায়ায় আরাম করে দাঁড়িয়ে আছে শক্তপোক্ত দেহের এক লোক, পরনে কালো পিকোট, হাতে চামড়ার গ্লাভস্। দৈর্ঘ্যে বড়জোর পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। চুল ধূসর। তুবড়ে গেছে ফ্যাকাসে গোল মুখ। দুগালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। কৌতূহলী চোখ, আত্মবিশ্বাসী। আশপাশে দলের লোক নেই। অস্ত্রও নেই রাশানের হাতে।

এই লোকের বয়স আন্দাজ চল্লিশ, ভাবল রানা। গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল, কে তুমি?

নাম ইগোর দিমিতভ, বলল লোকটা।

তুমি কি আমার কন্ট্যাক্ট?

 না, তা নই।

সে কোথায়?

ডানহাতে মাছি তাড়াবার ভঙ্গি করল ইগোর দিমিতভ। ওর মত হারামজাদা পাওয়া দায়। এদেরকে অন্তর দিয়ে ভালবাসি। আমার দেয়া ঘুষ খেয়ে ল্যাং মেরে দিয়েছে। তোমাকে। এদিকে তুমি চাইছ হুয়াং লি ল্যাংকে ল্যাং মারতে। তাতে আগ্রহ কম নেই আমারও। বলতে পারো, আমরা আসলে একই দলের লোক।

আমার কাছে কী চাও?

ওই যে, আগেই বলেছি, চাই সাহায্য করতে, বলল ইগোর, যাতে ল্যাং-এর হাত থেকে ছুটিয়ে নিতে পারো ওই মেয়েকে।

বদলে কী দিতে হবে?

ছাউনির তলা থেকে বেরিয়ে রানার পাশে থেমে টাওয়ার ল্যাং-এর দিকে তাকাল ইগোর দিমিতভ। রাশান এক বাচ্চা ছেলেকে আটকে রেখেছে ল্যাং। সায়েন্স ডিরেক্টোরেটের বড় পদে আছেন ওর মা। আমার কাজ ওই ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে নৈয়া।

ছেলেটাকে কিডন্যাপ করল কেন? জানতে চাইল রানা।

কারণ, ওর মা কাজ করেন হাই-এনার্জি ফিযিক্সের ওপর, কাঁধ ঝাঁকাল ইগোর। টাকা দিয়ে কিছু কিনতে না পারলে, তা চুরি করে ল্যাং। তা না পারলে, আদায় করে গায়ের জোরে। ওই ছেলের মা-র কাছ থেকে জরুরি তথ্য চাইছে সে।

হাই-এনার্জি ফিক্সি, ভাবল রানা। ওই বিষয়ে লেখাপড়া করেছে মিতা। সেজন্যেই গেছে আর্কিওলজিস্ট হ্যারিসনের সঙ্গে মেক্সিকোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী স্ফটিক খুঁজতে।

হাই-এনার্জি ব্যবহার করে অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে। রাশা? জানতে চাইল রানা।

কয়েক সেকেণ্ড পর বলল ইগোর, জানি না। তবে সায়েন্সের নানান দিকে গভীর আগ্রহ ল্যাং-এর। সেসবের ভেতর একটি হচ্ছে: জেনেটিক ডিফর্মেশন বিষয়ে মেডিকেল সায়েন্স। শুনেছি, জন্ম থেকে ত্রুটিপূর্ণ এমন একদল মানুষকে নিয়ে চিড়িয়াখানা তৈরি করেছে সে।

বাহ্! আরও গম্ভীর হলো রানা। কিন্তু কী কারণে আমাকে চাই তোমার? নিজেই তো সরিয়ে নিতে পারো ওই ছেলেকে।

বড় করে শ্বাস ফেলল ইগোর। বাধ্য হলে তাই করব। কিন্তু জানলাম, ওই একই কাজ করতে এসেছ তুমি, উদ্ধার করবে মেয়েটাকে। তখন ভাবলাম, ওকে ছুটিয়ে আনার সময় এনে দিতে পারবে ওই ছেলেটাকেও। তাতে কাজ কমবে আমার। এজন্যে তোমার যা লাগবে, সবই দেব। বলতে পারো, ঘোলা পানিতে মাছ ধরছি। হঠাৎ ল্যাং খেয়ে ল্যাং কিছু বোঝার আগেই ওই মেয়ে আর ছেলেটাকে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাব আমরা। তুমি তোমার পথে, আমি আমার পথে। প্রস্তাবটা ভেবে দেখতে পারো।

একা কিছু না করে রাশানদের সাহায্য নেয়াই তো ভাল, মনে হচ্ছে রানার। আরেকবার দেখল টাওয়ার ল্যাং। ভাবছ, ওরা আছে ওই টাওয়ারে?

মাথা দোলাল ইগোর। আমাদের কাছে সার্ভেইল্যান্স ভিডিয়ো আছে। ওদেরকে ওখানে নিয়েছে, কিন্তু তারপর বের করেনি।

মিতাকে কিডন্যাপের পর পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েক দিন।

তোমরা পুরো শিয়োর নও, আন্দাজ করল রানা।

ল্যাংকে ভাল করেই চিনি, জোর দিয়ে বলল ইগোর, জানি তার প্রতিটা পদক্ষেপ। মিতা দত্ত বেঁচে থাকলে, সে আছে ওই টাওয়ারের ভেতরেই। তা ছাড়া, তখন তখনই খুন করবে ভাবলে ওখানে নেবে কেন?

টাওয়ার ল্যাং আবারও দেখল রানা। এক শর বেশি তলা। জানতে হবে কোথায় আছে ওরা।

ভাবতে হবে না তোমাকে, বলল রাশান। তুমি শুধু ভাববে একটা তলা নিয়ে। রানার হাতে ছোট বিনকিউলার ধরিয়ে দিল সে। খেয়াল করো টাওয়ারের ভিত্তি।

চোখে বিনকিউলার তুলে কালো পাথরের গোড়া দেখল রানা। ওখান থেকেই আকাশে উঠেছে টাওয়ার। একেবারে নিচে প্রাচীন দুর্গের বেসমেন্ট ও পাথরের দেয়াল থেকে সাগরে নেমেছে ভাঙা ধাপের সিঁড়ি।

ভিক্টোরিয়া ফোর্টের ধ্বংসস্তূপের ওপর নিজের টাওয়ার তৈরি করেছে ল্যাং, বলল ইগোর, আঠারো শ পঁয়তাল্লিশ সালে নিরেট পাথর খুঁড়ে ব্রিটিশরা গড়ে ওই দুর্গ। কয়েক বছর পর ফোর্ট স্ট্যানলি নির্মাণের পর সরিয়ে নেয় বেশিরভাগ সৈনিক। ফোর্ট ভিক্টোরিয়ার পুরনো কারাগার ব্যক্তিগত জেলখানা হিসেবে ব্যবহার করছে ল্যাং। যাদের কাছে কিছু পায়, অথচ দেয়ার মত কিছুই নেই, তাদেরকে আটকে রাখে ওখানে। কেউ বেঈমানি করলেও তার ঠাই হয় ওই নরকে। খুব কম মানুষই মুক্তিপণ দিয়ে রেহাই পায় ওর কাছ থেকে।

এবড়োখেবড়ো, কালো পাথরের ভিত্তি দেখল রানা। নিচের অংশে লেগে ছিটকে ফিরছে সাগরের ঢেউ।

মিতা দত্ত আর পাবলো এখন ওই জেলখানায়, বলল ইগোর দিমিতভ।

.

১২.

কানে ফোনের রিসিভার ঠেকিয়ে অপেক্ষা করছেন সিআইএর বর্তমান ডিরেক্টর মার্ল ক্যালাগু। ডেস্কের ওপর সতীর্থ এক ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির বিষয়ে কঠোর ভাষায় লেখা ইন্টারনাল রিপোর্ট। ওই সংগঠন এনআরআই, বেশ কবছর ধরে জংধরা পেরেকের মত খোঁচা মারছে মার্ণ ক্যালাগুর পশ্চাদ্দেশে।

এনআরআই-এর সৃষ্টির আদি থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাটিকে নানানভাবে দমাতে চেয়েছে সিআইএ। বেশ কয়েকবার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে, যেন ল্যাংলির অধীনে কাজ করে এনআরআই। কিন্তু বারবার আবদার করেও কোনও ফল মেলেনি।

মার্ল ক্যালাগুর চরম ব্যর্থতার কারণ, প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত, পুরনো বন্ধু জেমস ব্রায়ান এনআরআই-এর চিফ। তবে কয়েক বছর আপ্রাণ চেষ্টার পর, নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন। ক্যালাগু। এবার সম্ভাবনা খুবই বেশি, ডিগবাজি খেয়ে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বেন এনআরআই চিফ।

যতই জেমস ব্রায়ানের পুরনো বন্ধু হন প্রেসিডেন্ট, তাঁর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তিনি রাজনৈতিক দলনেতা। আর সব উচ্চপর্যায়ের নেতার মতই, তিনিও অনৈতিক কিছু বরদাস্ত করেন না। অন্যায় হবে বা হয়েছে বুঝলেই ওই বিষয় থেকে সরিয়ে নেন নিজেকে।

ওটা মাথায় রেখেই নতুন উদ্যমে যুদ্ধে নেমেছেন ক্যালাগু। ঠিক করেছেন, এনআরআই-এর নামে প্রচার করবেন কেলেঙ্কারি। ওসবের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়া হবে জেমস ব্রায়ানকে। উনি যেহেতু বন্ধু, সাধারণ অন্যায়কারীর চেয়েও বেশি কঠোরভাবে তাঁকে দমন করবেন প্রেসিডেন্ট। তা করবেন, কারণ, সবাইকে দেখাতে হবে, পেয়ারের লোক বলে কাউকে ছাড় দেন না তিনি।

যা চান, সবই এবার পাবেন, ভাবছেন মার্ল ক্যালাগু। বড় কথা, নিজে থেকে টু শব্দও করতে হবে না, তাকে।

রিসিভারে সামান্য খুট আওয়াজ পেয়ে ক্যালাগু বুঝলেন, তাঁর কল গেছে ওভাল অফিসে। এখন লাইনে আছেন প্রেসিডেন্ট।

শুভ বিকেল, ক্যালাগু, বললেন তিনি; কী কারণে ফোন করেছেন?

ক্যালাগু চোখ রাখলেন সামনের রিপোর্টে। বেছে নেয়ার মত বেশ কয়েকটা আপত্তিকর গুজব আছে ওটাতে। একটাতে লেখা: এনআরআই তাদের ভার্জিনিয়া কমপ্লেক্স-এ গোপনে বিপজ্জনক নিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্ট করছে। এ কথা মিথ্যা বলেই মনে হয়েছে ক্যালার। কিন্তু অন্যান্য যেসব তথ্য খুঁড়ে বের করেছে তার লোক, সেসব যথেষ্ট ক্ষতিকর হবে জেমস ব্রায়ানের জন্যে।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট, দক্ষিণাঞ্চলের মিষ্টি সুরে কয়েক পাউণ্ড দুশ্চিন্তা মিশিয়ে বললেন ক্যালাগু, ফোন করেছি আপনাকে সতর্ক করতে। স্যর, বোধহয় বেশ কিছুদিন আপনার বন্ধু এনআরআই চিফের সঙ্গে আলাপ করেন না? এ কথা বলছি, কারণ আপনার আপত্তি থাকবে, এমন কজনের মাথায় খাড়া নামাতে চাইছেন জেমস ব্রায়ান।

কী হয়েছে খুলে বলুন তো, ক্যালাগু? বললেন প্রেসিডেন্ট।

বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু ব্রায়ান বোধহয় নষ্ট করছেন দেশের সম্মান, বললেন ক্যালাগু, এরই ভেতর বাংলাদেশের গুপ্তচর মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন চিনে সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত এক যুদ্ধে।

কী কারণে এমন মনে হচ্ছে আপনার? ক্লান্ত সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট।

হংকং থেকে রিপোর্ট এসেছে, বললেন ক্যালাগু, আবারও সীমানার বাইরে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে গেছে এনআরআই।

বাঙালি গুপ্তচর মাসুদ রানার সাহায্য নিয়েছে?

 জী। যে লোক বারবার ধোঁকা দিয়েছে আমাদেরকে!

 ধোঁকা দিয়েছে? আপত্তির সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট, আমার কিন্তু ধারণা, আপনারাই তাকে নানাভাবে খুন করার চেষ্টা করেছেন।

স্যর, সে আমেরিকার ক্ষতি করছে ভেবেই…

আগেও ওই যুবকের সাহায্য নিয়েছি আমরা, থামিয়ে দিয়ে বললেন প্রেসিডেন্ট, বেশ কবার আগের প্রেসিডেন্টের প্রাণ রক্ষা করেছেন। প্রয়োজন না পড়লে ব্রায়ান নিশ্চয়ই তাকে জড়াত না।

জেমস ব্রায়ানকে এবার বাগে পাবেন ভেবেছিলেন ক্যালাগু, কিন্তু কপাল মন্দ, কঠোর সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট, আপনি যেসব সোর্স থেকে তথ্য পেয়েছেন, তাদের বলুন, তারা যেন সরাসরি আমার কাছে রিপোর্ট করে। যে রিপোর্ট পেয়েছেন, ওটা দেরি না করে মাটিচাপা দিন। আমার কথা বুঝেছেন? বাস্তবিক কী ঘটেছে, তা বোঝার আগে এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে, ঠিকই বুঝে নেব, পদ থেকে কাকে সরিয়ে দেয়া উচিত।

সবই ফাঁস হলে খুশি হতেন ক্যালাগু। কিন্তু তাতে লোভনীয় চাকরি হারাবার সমূহ সম্ভাবনা। তিনি ঠিক করলেন, প্রেসিডেন্টকে বুঝিয়ে দেবেন, আসলে কারা চালায় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স। জী, তা তো বটেই, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বললেন ক্যালাগু, সত্যি, ব্রায়ান মস্ত কোনও ভুল করে বসলে, আমার উচিত সাধ্য অনুযায়ী তার পিঠ রক্ষা করা।

ফালতু বকবক বাদ দিয়ে কাজের কথায় আসুন, ক্যালাগু, বললেন প্রেসিডেন্ট, আপনার অত দরদি হতে হবে না, আপনি তো আর নির্বাচনে নামছেন না। আগামীকাল সকাল সাতটায় উপস্থিত থাকবেন পশ্চিমের ফয়েতে। ড্রাইভ করবেন নিজের গাড়ি। সঙ্গে কোনও সহকারী চাই না।

ঠাস্ করে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন প্রেসিডেন্ট।

ওই শব্দটা চড়ের মত লেগেছে ক্যালাগুর কানে। জানেন, তিনি যা বলেছেন, তা ঠিকই বুঝেছেন প্রেসিডেন্ট। রেগে গেছেন তাই। মনে হয়নি বিস্মিত। বিরক্ত হয়েছেন। ব্যাপারটা এমন: যে দুর্ঘটনা এড়াতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন, এখন দেখা যাচ্ছে ওটাই ঘটেছে তার জীবনে।

ফোনের রিসিভার রাখার সময় মার্ল ক্যালাগুর মুখে ফুটে উঠল টিটকারির হাসি। আদরের সঙ্গে বন্ধ করলেন রিপোর্টের ফাইল। যা ভেবেছেন, তার চেয়েও অনেক মজা পাবেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ানকে কোণঠাসা করতে পারলে।

.

১৩.

 কারুকাজ করা টিন্টেড কাঁচ গায়ে জড়িয়ে থম মেরে আছে। বিশাল, উঁচু টাওয়ার ল্যাং। ডানে হংকঙের সারি সারি আকাশছোঁয়া স্কাইস্ক্র্যাপার। মস্ত শহরের এক পাশে কাউলুন ও ভিক্টোরিয়া হার্বার। মাঝে ব্যস্ত, নীল জলের শিপিং চ্যানেল। বামে খোলা সাগরে সালফার চ্যানেল ও ডিসকভারি বে, একটু দূরেই ল্যান্টাউ আইল্যাণ্ডের নতুন এয়ারপোর্ট।

সবমিলে দারুণ দৃশ্য। টাওয়ার ল্যাং-এর এক শ একতলা থেকে ওসব দেখতে আরও অনেক সুন্দর।

একসময়ে ওখান থেকে অদ্ভুত মায়াবী প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্টি সৌন্দর্য দেখে বিভোর হতো হুয়াং লি ল্যাং। তবে আজকাল ওই দৃশ্য কাঁটা হয়ে বেঁধে তার বুকে।

বন্ধ করো সব শাটার! হুঙ্কার ছাড়ল হুয়াং লি ল্যাং।

প্রায় দৌড়ে গিয়ে নিজের ডেস্কের সামনে হাজির হলো ল্যাং-এর সেক্রেটারি, পটাপট টিপল একপাশের বোর্ডের চারটে বাটন। সরসর করে ছাত থেকে নামল স্টিলের শাটার। অদৃশ্য করছে চারপাশের চমৎকার দৃশ্য। মাত্র দশ সেকেণ্ডে প্রকাণ্ড ওই ঘর হলো স্টিলের একটা বাক্স। সিলিঙে জ্বলে উঠেছে নরম, সাদা আলো।

সামান্য মাথা কাত করল ল্যাং, সঙ্গে সঙ্গে চালু হলো যান্ত্রিক হুইলচেয়ারের ইলেকট্রিক মোটর। বন্ধ জানালা ছেড়ে ঘরের মাঝে এসে থামল হুইলচেয়ার। বিলিয়নেয়ার খেয়াল করছে, তাকে দেখছে বেশ কয়েকজন লোক।

তারা সেক্রেটারি, টেকনিশিয়ান, সিকিউরিটি প্রধান, আন-অফিশিয়াল চিফ অভ স্টাফ ও মোটা এক লোক।

শেষজনের নাম ক্যাং লাউ।

এরা সবাই বোকা, অবজ্ঞা নিয়ে দেখছে কী করুণ পরিণতি হয়েছে দুর্দান্ত ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ী ল্যাং-এর।

সবই টের পাচ্ছে ল্যাং। একসময়ে সত্যি দেখার মত পুরুষ ছিল সে। দৈর্ঘ্যে ছয় ফুট, ওজনে এক শ আশি পাউণ্ড। দুহাতে সঁড়ের ঘাড় মুচড়ে ফেলে দিত ওটাকে মাটিতে।

আর আজ?

গত কবছরের নিউরোলোজিকাল ডিসঅর্ডার শেষ করে দিয়েছে তাকে। ওই অসুখ প্রথমে ফুরিয়ে দিল কর্মশক্তি ও দৈহিক সমন্বয়, তারপর চুরি করল গায়ের সব জোর।

এখনও হাঁটে ল্যাং, তবে সেটা চিকিৎসা ও থেরাপির জন্যে। দিনে দিনে বাড়ছে অসুখ। এ কারণেই আজকাল বেশিরভাগ সময় বসে থাকে হুইলচেয়ারে। বারবার মুচড়ে ওঠে শরীর, থরথর করে কাঁপে। এসব হচ্ছে অসুখের জন্যে। রোগ কমিয়ে দিতে দেহে যোগ করতে হয়েছে ইলেকট্রিকাল স্টিমুলেটর, নইলে আরও ক্ষয়িষ্ণুতার কবলে পড়বে দুর্বল পেশি।

চোখে বিস্ময় ও করুণা নিয়ে চেয়ে আছে সবাই।

কিন্তু সেজন্যে তাদেরকে অন্তর থেকে ঘৃণা করছে ল্যাং।

তার আপত্তির আরেকটা কারণ: আজকাল বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে এদের ওপর। বিশেষ করে ক্যাং লাউ খুবই কঠিন হয়ে উঠছে ওকে সহ্য করা।

ওই মেয়ে এখন ফাটকে? জানতে চাইল ল্যাং।

আপনার হুকুম অনুযায়ী ওকে ওখানে রাখা হয়েছে, বলল ক্যাং লাউ। কিন্তু আমার মনে হয়…

হাতের ঝাপ্টায় তাকে থামিয়ে দিল বিলিয়নেয়ার, তোমার ধারণা জানতে চাইনি। আমাকে বিরক্ত না করে তোমার চিন্তা নিজের কাছেই রাখো।

জী, স্যর, মাথা দোলাল লাউ, তবে ওই মেয়ে আমাদের কোনও কাজেই আসবে না। আমাদের জানা নেই, এমন কিছুই জানে না সে। আমাদের বোধহয় উচিত ওকে মেরে ফেলা, বা বিক্রি করে দেয়া। আপনি তো জানেন, স্যর, ওই মেয়ে যেরকম সুন্দরী, অনেকেই লাখ লাখ ডলারে ওকে কিনতে চাইবে। তা ছাড়া, ওই মেয়ে এখানে রয়ে গেলে, যে কোনও সময়ে হামলা করবে আমেরিকান কোনও আইনী সংস্থা। ঝুঁকিটা না নেয়াই ভাল।

সময় ও ঝুঁকি, ভাবল হুয়াং লি ল্যাং। ওই সময় আর ঝুঁকিই সব!

কৃপার সুরে বলল ল্যাং, তুমি যা জানো, তার বাইরেও কিছু ব্যাপার আছে। আমি যতদূর দেখছি, তা দেখতে পাবে না তুমি।

হুইলচেয়ার সরিয়ে লাউয়ের মুখোমুখি হলো বিলিয়নেয়ার। আপাতত ওই মেয়ে কাজে আসবে না, এ কথা ঠিক। কিন্তু পরে ওর কাছ থেকেই আসবে জরুরি তথ্য। ওগুলো আমার দরকার। এখন তোমার কথা মত ওই মেয়েকে খুন করলে, বা পতিতালয়ে বিক্রি করলে কী হবে? তোমার তো জানা আছে, টাকার কোনও অভাব নেই আমার!

ক্যাং লাউ মাথা খাঁটিয়ে কিছু বুঝতে চাইছে। তাকে চুপচাপ দেখছে ল্যাং। একসময়ে পরস্পরের সহায়তা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মাস্তানি করে ধাপে ধাপে উঠেছে তারা সমাজের ওপরতলায়।

আজ ল্যাং-এর আছে আধুনিক সব জিনিসের উৎপাদনকারী ফ্যাক্টরি, শিপিং ও নির্মাণ ব্যবসা। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের গোড়া ছিল নানান রকম অপরাধ। মাস্তানি, কিডন্যাপিং, পতিতালয়, স্মাগলিং, আদম পাচার বা ড্রাগ চোরাচালান। কিছুই বাদ দেয়নি ল্যাং ও লাউ।

এসবে ওদের সঙ্গে ছিল আরও তিনজন।

কিন্তু তারা ক্ষমতা চাইলে এক এক করে তাদেরকে খুন করিয়ে নেতৃত্ব বজায় রেখেছে ল্যাং।

যখন দৈহিক শক্তি ছিল, খালিহাতে ছিঁড়ে ফেলত যে কোনও মানুষের গলা। এখনও মনে পড়ে সেই পাশবিক শক্তির কথা।

কী ভালই না লাগত আঙুলের মাঝ দিয়ে অসহায় মানুষের রক্ত বইলে! আবারও চাই তার ওই আনন্দ! জগৎকে বুঝিয়ে দিতে হবে, সে কী পারে!

লাউ কোনও ঝামেলা করবে, তা হতে দেবে না সে!

কিন্তু, স্যর… বলল লাউ।

আমার কথার ওপর কথা বলবে না, গর্জে উঠল ল্যাং। যেন থরথর করে কেঁপে উঠেছে প্রকাণ্ড ঘর। থতমত খেয়ে গেছে সবাই।

মুখ বন্ধ করে ফেলেছে ক্যাং লাউ।

তার চোখে আপত্তি দেখল ল্যাং। বুঝে গেল, তার দোসরের মনে জেগে উঠেছে বিদ্রোহ। বহু বছর বিশ্বস্ত ছিল লাউ, কিন্তু আজকাল নিজেকে ভাবছে আরও বড় কিছু। এমনই হওয়ার কথা। মানুষ তো!

হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে কনফারেন্স রুমের দিকে চলল হুয়াং লি ল্যাং। সে এগিয়ে যেতেই আপনাআপনি খুলে গেল বৈদ্যুতিক দরজা। বিলিয়নেয়ারের জন্যে ভেতরে রয়েছে দুটো জিনিস। এ ছাড়া, অপেক্ষা করছে একদল টেকনিশিয়ান ও দুজন ডাক্তার।

একপাশে ল্যাং-এর দুজন লোক পরীক্ষা করছে মেক্সিকো থেকে আনা পাথরের প্রাচীন মূর্তি। ভেতরের অবস্থা বুঝতে ব্যবহার করা হচ্ছে ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট।

আর কী জানলে? জিজ্ঞেস করল ল্যাং।

এই মূর্তির ভেতরে কিছুই নেই, বলল ডানদিকের কর্মচারী। সলিড গ্র্যানেটের। ফাটল বা গর্ত নেই। আসছে

কোনও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ডিসচার্জ। এনআরআই যে ধরনের জিনিস খুঁজছে, তেমন কিছুই নেই এই মূর্তির ভেতর।

তাই? বলল ল্যাং। কিন্তু তোমরা যখন ছেলেটাকে নিয়ে এলে, তখন কিন্তু ছিল মৃদু ডিসচার্জ। মূর্তির গায়ের লেখা থেকে কিছু বোঝা গেল?

কমপিউটারের সামনে বসে আছে আরেক কর্মচারী, সে বলল, আমরা এখন কমপিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে তৈরি করছি মূর্তির চুরমার হয়ে যাওয়া অংশের ছবি। বেশকিছু ছবি পেয়েছি মেয়েটার কাছ থেকে। কিন্তু ওগুলোর রেযোলুশন খুব খারাপ। অবশ্য বড় করে নেয়ার পর বুঝতে শুরু করেছি। হায়ারোগ্লিফের কোড।

আর কত দিন লাগবে?

কাঁধ ঝাঁকাল কমপিউটার বিশেষজ্ঞ। মূর্তির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে ওই মেয়ে।

চেষ্টার ত্রুটি করছি না, স্যর, বলল দ্বিতীয় টেকনিশিয়ান।

সময় ফুরিয়ে আসছে, বলল ল্যাং, তোমাদের চেষ্টা আরও বাড়াতে হবে।

লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করল বিলিয়নেয়ার। চোখের কোণে দেখেছে, হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বড় করে দম ফেলেছে ক্যাং লাউ।

ল্যাং-এর মনে হলো, সবাই মিলে মস্করা করছে তার সঙ্গে। বিশেষ করে লাউ। হাসছে লোকটা আড়ালে!

দাঁতে দাঁত পিষে ল্যাং ভাবল, মন্দ হতো না এদের সবকটাকে খুন করলে। কাজটা কঠিন নয়, সিকিউরিটি চিফকে নির্দেশ দিলেই এ ঘরে বইয়ে দেবে রক্তের স্রোত।

কিন্তু এখন নয়!

নিজেকে সামলে নিল ল্যাং। হিসেব ভুল না হলে, আগামী কদিনেই সুস্থ হয়ে উঠবে সে। তখন, দৈহিকভাবে সক্ষম হলেই নিজ হাতে খুন করবে এই বেয়াদবগুলোকে!

.

১৪.

মেঘভরা কালচে আকাশ। হঠাৎ হঠাৎ ওপর থেকে খসে এসে এখানে-ওখানে পড়ছে বৃষ্টির বড় ফোঁটা। বন্দরের একটা টাগ-এর বো-তে দাঁড়িয়ে আছে রানা। পরনে উলের ভারী কোট। পায়ে বুট। মাথায় কালো ক্যাপ। কেউ দেখলে ভাববে, টাগের ক্রু।

কার্গো নিয়ে দক্ষিণে চলেছে টাগ।

নদীর দূরে চেয়ে অতীত স্মৃতির মাঝে ডুব দিয়েছে রানা।

.

ম্যানুয়াস শহরের নামকরা এক হোটেলের বার-এ বসে ছিল ও। ওই হোটেলেই উঠেছিল ওরা। আরেকটা ড্রিঙ্ক নেবে, এমনসময় ওর পাশের টুলে এসে বসল মেয়েটা। মৃদু মাথা দুলিয়ে নিচু স্বরে বলল, আপনি খুব নিঃসঙ্গ, তাই না?

কখনও কখনও, বলল রানা। আপনি?

আমি? মিষ্টি হাসল মিতা। বেশ কয়েক বছর ধরেই একা।

তাই? তার আগে একা ছিলেন না? জানতে চাইল রানা।

না, মাথা নাড়ল মিতা। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই একা।

মিতার ডোশিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে সোহেল। ওটা পড়েছে রানা। মেয়েটার বাবার মৃত্যু হয়েছে ফুসফুঁসের ক্যান্সারে। শেষ দেড় বছর খুবই কষ্ট পেয়েছেন বিনয় দত্ত। তখন প্রায় সারাক্ষণ পাশে ছিল মিতা। ওর মা কয়েক বছর আগেই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায় লস অ্যাঞ্জেলিসে প্রেমিকের কাছে। এজন্যে কখনও মাকে ক্ষমা করতে পারেনি মিতা।

দুঃখিত, নরম সুরে বলল রানা, বুঝিনি কষ্ট দিয়ে বসব।

না, ঠিক আছে, বলল, মিতা। আজ কেন যেন মনে পড়ছে শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি।

রানার হাতের ইশারায় মিতার সামনে সফট ড্রিঙ্ক রেখে গেল বারটেণ্ডার।

থ্যাঙ্কস। স্পাইটের গ্লাসে চুমুক দিল মিতা। খুব মন চাইছে নিজের কথা কাউকে বলি।

বলুন না, বলল রানা।

খুব ভালবাসতাম বাবাকে। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে হোক, কিন্তু হলাম আমি মেয়ে। জেদ কাজ করত আমার মাঝে। মেয়ে বলে পিছিয়ে পড়ব না। দশ বছর বয়সে পেলাম কারাতে দো-র ব্ল্যাক বেল্ট। চোদ্দ বছরে শুটিং-এ প্রথম। পনেরো বছরে সাইক্লিং-এ দ্বিতীয়। বাবা শেখালেন কীভাবে মেরামত করতে হয় গাড়ির ইঞ্জিন। হয়ে উঠলাম দক্ষ মেকানিক। আঠারো বছর বয়সে ভর্তি হলাম নিউ ইয়র্কের নামকরা ইউনিভার্সিটিতে। চুপ হয়ে গেল মিতা। কিছুক্ষণ পর বলল, কিন্তু একমাস পরেই ধরা পড়ল বাবার ক্যান্সার। ফিযিক্স পড়া বাদ দিয়ে ফিরলাম বাড়িতে। খুব বকলেন বাবা। বললেন, আমি নাকি হেরে গেছি। একটা কথাও বলিনি। সাধ্যমত সেবা করলাম তাঁর, কিন্তু ফেরাতে পারলাম না, চলেই গেলেন তিনি। এরপর পুরো মনোযোগ দিলাম ফিযিক্সের বইয়ে। নতুন করে ভর্তি হলাম। বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী যে সময় দেয় বইয়ে, তার দ্বিগুণ দিলাম। আড়াই বছরের ভেতর শেষ করলাম অনার্স। এরপর মাস্টার্স ও ডক্টরেট। ভাল কোনও চাকরি খুঁজছি, তখনই যোগাযোগ করলেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। বাবার বন্ধু, প্রায় আদর করেই দায়িত্ব দিলেন, যেন একটা অভিযানে ফিযিক্সের দিকটা দেখি। চলে এলাম ডক্টর জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে যোগ দিতে। তার পরের ঘটনা আপনার জানা।

সে রাতে অতীত-বর্তমান এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলেছিল মিতা। আপনি থেকে সম্বোধন নেমে এসেছিল তুমি-তে।

বাবাকে ফেলে গিয়েছিল বলে মাকে মানুষ বলেই মনে করে না। আদর যা পেয়েছে, সবই বাবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে। এ কারণে অদ্ভুত ভালবাসা আছে ওর বুকে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির প্রতি। দায়িত্বপূর্ণ চাকরি পেলে চলে যাবে সহজ, সরল মানুষের ওই সবুজ দেশে।

ভাঁপ-ভাঁপ বিকট শব্দ শুনে চমকে বাস্তবে ফিরল রানা। সামনেই একটা বার্জ, উপচে পড়ছে কয়লায়। দূরের পাওয়ার প্ল্যান্টেশনে নামিয়ে দেবে পেটের বোঝা। টাওয়ার ল্যাং-এর ঠিক সামনে দিয়ে যাবে বার্জ। সেসময়ে টাগ থেকে নদীতে নেমে পড়বে রানা, ডুব সাঁতার কেটে হাজির হবে পুরনো দুর্গের পায়ের কাছে।

মিতা ও পাবলোকে উদ্ধারের জন্যে কয়েকটা পরিকল্পনার বিষয়ে ইগোরের সঙ্গে কবার আলাপ হয়েছে রানার।

ইগোরের যুক্তি ছিল: চিরকাল ওদেরকে কারাগারে রাখবে না ল্যাং। যখন সরাতে যাবে, তখনই হামলা করা ভাল। সেজন্যে চাই ল্যাং-এর পরিকল্পনার শেকলে দুর্বল একটা

রানা বুঝে গেল, ইগোরের পরিকল্পনায় ত্রুটি আছে।

রাশানের কথা অনুযায়ী: প্রথমেই জানতে হবে কখন কোথায় তারা নেবে মিতা বা পাবলোকে। অথচ এটা স্বাভাবিক, কারাগার থেকে বেরোলেই পালাতে চাইবে বন্দি, কাজেই অত্যন্ত সতর্ক থাকবে প্রহরীরা। সেক্ষেত্রে খুব কঠিন হবে হামলা করে কাউকে ছিনিয়ে নেয়া। তা ছাড়া, ল্যাং কখন কোথায় সরাবে ওদেরকে, সেজন্যে অপেক্ষা করতে হবে। অথচ, নরকে কাটছে মিতা ও পাবলোর প্রতিটা পল।

দুর্গ ও টাওয়ারের স্কিম্যাটিক দেখে ওরা বুঝেছে, পুরনো দুর্গে আছে অদ্ভুত স্যানিটেশন সিস্টেম। ওটা তৈরি করেছিল ব্রিটিশ সৈনিকরা। কারাগারের বন্দিদের টয়লেটের সঙ্গে যুক্ত দুটো সুড়ঙ্গ, জোয়ারের সময় ওই দুই টানেলের কাঠের দরজা খুললে নদীতে বেরিয়ে যায় সমস্ত বর্জ্য।

শেষে ইঁদুরের মত সুয়ারেজ দিয়ে ঢুকবে? জানতে চেয়েছে ইগোর।

মন্তব্য করেনি গম্ভীর রানা।

পরে দেখা গেল, আজ আর নেই সে কাঠের দরজা, সেখানে আছে কংক্রিটের প্লাগ। তখন মিতা ও পাবলোকে ছুটিয়ে আনার মাত্র একটা উপায়ই থাকল।

বাধ্য হয়ে বাঙালী গুপ্তচরের যুক্তি মানল ইগোর দিমিতভ।

মুখ তুলে কালচে আকাশ দেখল রানা। ঘনিয়ে এসেছে সন্ধ্যা, যে-কোনও সময়ে ঝাঁপিয়ে নামবে বৃষ্টি। আঁধারে সহজেই লুকিয়ে পড়তে পারবে ও।

টাগ-এর পাইলট হাউসে এসে ঢুকল রানা। কোনও কথা হলো না ইগোরের সঙ্গে। চুপচাপ হাত লাগাল ওরা, পরীক্ষা করছে দরকারি গিয়ার।

হেলিকপ্টার তৈরি রাখতে বোললা, বলল রানা, কাজে ব্যস্ত। মাত্র একটাই সুযোগ পাব।

দুমিনিট পর টাগ-এর উল্টোদিক দিয়ে নদীতে নামল ও। পরনে কালো ওয়েট সুট, পিঠে রিব্রিদার। খয়েরি আকাশ হয়ে গেছে প্রায় কালো।

পানির নিচে তলিয়ে অপেক্ষা করল রানা। টাগ পেরোবার পর সাঁতার কেটে এগোল দুর্গের দিকে। চলেছে পানির পনেরো ফুট তলা দিয়ে। গতি ধীর, ছন্দোবদ্ধভাবে চলছে দুপা।

প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পাচ্ছে সিসিআর থেকে। স্কুবা গিয়ারের মত ভারী নয় হালকা ক্লোযড-সার্কিট রিব্রিদার। ব্যবহৃত বাতাস আবারও ফিল্টার করবে। উঠবে না কোনও বুদবুদ।

শত্রুপক্ষ বিপদের আশঙ্কা করবে, তা মনে করছে না রানা। কিন্তু প্যারাননাইয়া আছে হুয়াং লি ল্যাং-এর। হয়তো দলের লোককে বলেছে নদীর দিকে চোখ রাখতে। সেক্ষেত্রেও কিছুই দেখবে না তারা।

কয়েক মিনিট সাঁতরে দুর্গের কাছে পৌঁছুল রানা। বন্দরের এদিকে উঠে এসেছে নদীর তলদেশ। কাদাগোলা পানি। সাবধানে এগোবার পর হঠাৎ থামল ও। নাকের এক ইঞ্চি দূরে দুর্গের ঢালু ভেড়িবাঁধ। উঠতে শুরু করে কাদাটে পানির স্তর ছেড়ে বেরিয়ে এল রানা। সামনে কালো রঙের রুক্ষ পাথরের ভিত্তি।

জলসমতল থেকে দুফুট নিচে থেমে, চিত হয়ে ওপরে চোখ রাখল রানা। কালচে পানি ভেদ করে আসছে সামান্য আলো, তবে ওটার মালিক ডিসেম্বরের সূর্য নয়। জেগে উঠেছে ঝলমলে শহর। বিশেষ করে টাওয়ার, ল্যাং নদীতে ফেলেছে সাদা রশ্মি।

ঘুটঘুটে আঁধার নামবে, সে আশা নেই, বুঝে গেল রানা। চট করে একবার দেখল হাতঘড়ি। কাজে নেমেছে শিডিউলের চেয়ে আগে। সমতল পাথরের স্তরে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে থাকল। চুপচাপ দেখছে ওপরের পানি। নদীর বুকে টুপটাপ করে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, তৈরি করছে গোল আংটি। ছড়িয়ে গিয়ে মিশে যাচ্ছে অন্য ফোঁটার আংটির সঙ্গে। বোঝার উপায় নেই, এবার কোথায় হবে আলোড়ন। একটু পর শুরু হলো মাঝারি বর্ষণ।

মৃদু হাসল রানা। কপাল ভাল ওর। বর্ষার কারণে বেশিদূর দেখবে না কেউ। নদীতীরে শীতের রাতে যে ভিজতে আসবে পাহারাদার, সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তা ছাড়া, রানা যাবে এমন দিকে, যেখানে ভুলেও কারও যাওয়ার কথা নয়।

সতর্ক কুমিরের মত চোখ জাগাল রানা। সামনেই ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো কালো পাথরের ভেড়িবাঁধ ঢালু হয়ে গেছে ওপরে। নদীতীর থেকে আশি ফুট দূরে আকাশে উঠেছে কারুকাজ করা সাদাটে ইটালিয়ান এ্যানেট দিয়ে তৈরি এক শ এগারোতলা দালান। ওটার বুক থেকে বেরোচ্ছে উজ্জ্বল আলো। নিচের কালো পাথরের মাঝ দিয়ে কালো পোশাক পরা এক লোক উঠে এলে টের পাওয়া কঠিন।

নদীতীরের পাথরে বসে ফ্লিপার, সিসিআর ও মুখোশ খুলল রানা, তারপর কালো পাথরের ঢালু ভেড়িবাঁধ বেয়ে উঠতে লাগল কাঁকড়ার মত। খুঁজে নিল আগেই দেখে রাখা ফাটলটা। ওটা বেয়ে দশ ফুট ওঠার পর পেল দুর্গের দেয়াল। একফুট চওড়া স্ল্যাব দিয়ে তৈরি ওটা। ক্ষয়ে গেছে চুন সুরকি। শুধু ওজনের কারণে এখনও জায়গামত রয়ে গেছে দেয়াল।

ওখানে বুক ঠেকিয়ে দাঁড়াল রানা। চারতলা ওপরে প্রাচীন দুর্গের ছাত এখন ম্যানিকিওর করা উঠান। এক পাশে ফুলের বেড, আরেকদিকে ওয়াকওয়ে, সোজা থেমেছে ল্যাং-এর টাওয়ারের প্রবেশপথে।

অনেক নিচে কালো নদী। পাথুরে দেয়ালে বুক ঠেকিয়ে এক পাশে সরতে লাগল রানা। একটু পর থামল উল্লম্ব এক ফাটলের সামনে। ওটা মাত্র একফুট উঁচু, চওড়ায় ছয় ইঞ্চি। আগে ছিল পুরনো কেল্লার গানপোর্ট। মাস্কেট ব্যবহার করে ওদিক দিয়ে গুলি চালাত শত্রুপক্ষের ওপর। রানা ঠিক করেছে, ওখানেই বসাবে বিস্ফোরক। কিন্তু তার আগে বুঝতে হবে, ঠিক জায়গায় পৌচেছে কি না।

ব্যাকপ্যাক পিঠ থেকে নামিয়ে ওখানে বসল রানা। ব্যাগ থেকে বের করল ছোট এক স্বচ্ছ বাক্স। ওটার পাশে রয়েছে, ব্যাটারি, ট্রান্সফর্মার, মাইক্রোফোন, ক্যামেরা ও অ্যান্টেনা।

এনআরআই ওই জিনিসের নাম দিয়েছে: দুর্ধর্ষ মাকড়সা।

আমেরিকা থেকে রওনার সময় ওটা জেমস ব্রায়ান দিয়েছিলেন রানাকে। বাটন টিপলে বাক্স থেকে বেরোয় সরু আট পাওয়ালা পোকা, দুর্গম জমিতে এগুলো চলে অনায়াসে। এমন কী লাফিয়ে উঠতে পারে সিঁড়ির ধাপ। তবে এ মিশনে তার প্রয়োজন পড়বে না। ইগোরের জোগাড় করা নক্সা অনুযায়ী নিচে নামতে হবে মাকড়সাকে।

যন্ত্রটা চালু করে সরু গানপোর্টের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল রানা। ওদিকে কেউ নেই, ভেতরে ফেলতেই টুপ শব্দে নিচে পড়ল ডিভাইসটা।

একটু ডেবে যাওয়া দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসল রানা। বৃষ্টির ছাঁট ওখানে লাগছে না। ব্যাকপ্যাক থেকে নিল কন্ট্রোল ইউনিট। কানে পরল হেডসেট। ওটায় আছে ছোট্ট স্পিকার। মাইক্রোফোনের ধরা শব্দ শুনতে পাবে ও। ডান চোখে দেখবে ক্যামেরায় ধরা দৃশ্য। সেজন্যে আছে খুদে এলএসডি স্ক্রিন।

ডিভাইস অন করতেই চালু হলো আইপিস। দুর্গের ভেতর অংশ ষোলো শতকের কারাগারের মত। নোংরা, ঘিঞ্জি। নিচু ছাত। নানাদিকে জংধরা লোহার দরজা। সবই মেডেইভেল আমলের মত, কিন্তু দূর কোণে স্টিল ও রিএনফোর্সড় দশ ফুটি বৃত্তাকার কলাম। ওটা কারাগার ভেদ করে নেমেছে পাথরের বুকে। এ ধরনের কলাম ধরে রেখেছে ল্যাং-এর সুউচ্চ টাওয়ার। এক পাশে এলিভেটর শাফট।

বাটন টিপে যন্ত্রটাকে সামনে পাঠাল রানা।

একটু দুলছে ক্যামেরার দৃশ্য। মালিকের নির্দেশে শিকারে বেরিয়ে পড়েছে মাকড়সা!

.

১৫.

ল্যাং-এর কারাগারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানান উঁচু জায়গা বেছে শুয়ে-বসে আছে বন্দিরা। এ ছাড়া উপায়ও নেই। বৃষ্টির ছাঁট লেগে ভিজে গেছে শীতল মেঝে। একদিকের সেল-এ গিয়ে ঢুকেছে মিতার হাতে পিট্টি খাওয়া, আহত দুই বন্দি। মিতার সেল-এ রয়ে গেছে ও নিজে, দিমিতভ, পাবলো, বুড়ো চাইনিজ ও ভারতীয় মহিলা।

আপাতত জেগে আছে মিতা ও পাবলো। ঘুমিয়ে পড়েছে অন্যরা। একটু আগে নেমেছে সন্ধ্যা। এ নরকের মত গারদে বাস করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে উঠছে ওরা, তাই চাই বিশ্রাম। জানে, জীবনেও আর কখনও বেরোতে পারবে না এখান থেকে।

মিতা অবশ্য হাল ছেড়ে দেয়নি। নিজেকে বুঝিয়েছে, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। আগের চেয়ে হয়ে উঠেছে অনেক সতর্ক। ঠিক সময়ে খাবার পেলে খেয়ে নিচ্ছে। শরীর ঠিক রাখতে হবে। প্রথম সুযোগেই চেষ্টা করবে এখান থেকে বেরোবার।

পাবলোর দিকে তাকাল মিতা।

মাথা না ঘুরিয়েই ওর দিকে তাকাল ছেলেটা। কী করে যেন বুঝে গিয়েছে, ওর দিকে চেয়েছে কেউ। সত্যি কথাই বলেছে দিমিতভ, কখনও ঘুমায় না এই ছেলে।

মিষ্টি করে হাসল মিতা।

বদলে পেল মধুর হাসি।

পাবলোর দিকে চেয়ে চোখ পিটপিট করল মিতা। একই কাজ করল ছেলেটা। দুষ্টুমি করছে? বোঝা মুশকিল।

হঠাৎ ঝট করে ঝাঁকি খেল পাবলোর মাথা। কিছু শুনলে ওভাবে চমকে ওঠে অনেকে। ছেলেটার চোখ গেল করিডোরে।

কান পাতল মিতা। বাইরে দমকা হাওয়ায় ভর করে কাত হয়ে নামছে তুমুল বৃষ্টি। না, এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। আগেই দেখেছে, এলিভেটর নামলে কীভাবে যেন জেনে যায় ছেলেটা। কিন্তু এবার তেমন কিছু তো হয়নি?

উঠে বসল পাবলো। চুপ করে চেয়ে আছে করিডোরের দূরে। সাবধানে গা থেকে ফেলে দিল পাতলা কাঁথা।

হাতের ইশারায় ওকে কাছে ডাকল মিতা। এসো। আমার কাছে বসবে।

দ্বিধা করল বাচ্চা, তারপর এসে বসল মিতার উঁচু বাঙ্কে।

মাত্র কয়েকটা রাশান শব্দ জানে মিতা, তাতে কোনও কাজ হবে না। আসলে উপায় নেই আলাপ করার। আলতো হাতে পাবলোর কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিল মিতা।

খুশি হয়ে ওকে দেখল বাচ্চাটা, পরক্ষণে আড়ষ্ট হয়ে গেল। হাত তুলে মেঝে দেখিয়ে রাশান ভাষায় বলল, ওদিকে! ওদিকে!

করিডোরে চোখ বোলাল মিতা।

 কেউ নেই।

কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড পর ও শুনল তবলার বোলের মত মৃদু আওয়াজ। ওটা আসছে এলিভেটরের কাছ থেকে। থেমে গেল শব্দটা। শুরু হলো আবার। এবার আবছা অন্ধকারে ওর মনে হলো, কী যেন এসে থামল সেল-এর দরজার সামনে।

মিতা ভাবল, ওটা হয়তো ইঁদুর। আগেও এখানে দেখেছে ওই প্রাণী। কিন্তু আলোর অভাব বলেই ঠিক বোঝা গেল না, কী করছে ওটা। এটা ঠিক, থেমে গেছে। একদম নড়ছে না।

বাঙ্ক থেকে দশফুট দূরে দরজা। আঙুল তুলে বারবার ওটাকে দেখাচ্ছে পাবলো। মিতা কিছুই করছে না দেখে হাতের তালু ওদিকে তাক করল ছেলেটা। ভাব দেখে মনে হলো ঠেকিয়ে দেবে কিছু। বার কয়েক বলল, মেশিন… মেশিন!

ঠিক আছে, ভয়ের কিছু নেই, ওকে শান্ত করতে চাইল মিতা। বাচ্চাটার হাত ধরে নিজের মুঠোয় নিল। ভয় নেই।

মেশিন! মেশিন! আবারও বলল পাবলো।

বাঙ্ক থেকে নেমে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে চমকে গেল মিতা। ধক-ধক করছে হৃৎপিণ্ড।

সত্যিই একটা যন্ত্র!

আগেও ওই জিনিস দেখেছে ও এনআরআই অফিসে!

 তা হলে কি সাহায্য করতে পৌঁছে গেছে কেউ?

 মুক্তি পাবে ও?

আঙুল তাক করে যন্ত্রটা বারবার দেখাচ্ছে পাবলো।

ওই যন্ত্রে আছে ছোট মাইক্রোফোন, মনে পড়ল মিতার। দেরি না করে নিচু স্বরে বলতে লাগল এদিকের পরিস্থিতি।

আমরা সাতজন বন্দি। কোনও পাহারাদার নেই। কোনও ক্যামেরা নেই। বেরোবার কোনও পথও নেই। উঠতে বা নামতে ব্যবহার করতে হয় এলিভেটর। বুঝতে পেরেছেন?

চার পা ব্যবহার করে কয়েকবার ওপর-নিচ করল মাকড়সা। যেন বুঝিয়ে দিল সবই বুঝতে পেরেছে সে।

চারপাশ দেখে নিয়ে বলল মিতা, আপনি কি রেকি করতে এসেছেন?

এদিক-ওদিক দুলল মাকড়সা।

তা হলে মুক্ত করতে এসেছেন?

কয়েক সেকেণ্ড পর পায়ে ভর করে উঁচু-নিচু হলো মাকড়সা। তিনবার ওঠা-নামার পর থামল। বোকার মত যন্ত্রটার দিকে চেয়ে রইল মিতা। কী বলতে চাইছে লোকটা?

একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কী বোঝাতে চেয়েছেন বুঝলাম!

আবারও তিনবার ওঠা-নামার পর থামল মেশিন। হতাশ হয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাঙ্কে জুত হয়ে বসল মিতা। তখনই এল করিডোর থেকে বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ।

থরথর করে চারপাশ কাঁপিয়ে দিল শকওয়েভ। আরেকটু হলে কাত হয়ে বাঙ্ক থেকে পড়ে যেত মিতা। পুরনো কারাগারের ভেতরে ঢুকেছে একরাশ ধুলো ও ধোয়া।

কাশতে শুরু করে করিডোরের দিকে তাকাল মিতা। ওর হাত ধরে আছে পাবলো। জেগে গেছে এ ঘরের সবাই, হতবাক।

কী হয়েছে? বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল চাইনিজ বৃদ্ধ।

ওপর থেকে এল আবছা আওয়াজ। মিতা বুঝল না, ওটা আর্থকোয়েক না ফায়ার অ্যালার্ম। বেজে চলেছে একটানা।

পাবলোর টানে বাঙ্ক থেকে নেমে পড়ল মিতা। তখনই দেখল করিডোরের উড়ন্ত ধুলোর মাঝ দিয়ে হাজির হয়েছে এক লোক। জানতে চাইল সে, মিতা, ঠিক আছ তো?

ওই গম্ভীর কণ্ঠ চেনা চেনা লাগল মিতার। ধুলো ও ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে এসে ওর সামনে থামল লোকটা।

ভীষণ অবাক হলো মিতা। রানা? তুমি? এখানে কী করে?

জবাব দিল না রানা, ব্যস্ত। ব্যাকপ্যাক থেকে বের করছে কী যেন! কী করে তা পরে শুনো, আগে ভাগতে হবে এখান থেকে!

বাজতে শুরু করেছে আরও কয়েকটা অ্যালার্ম।

ল্যাং-এর সিকিউরিটি অফিসাররা জেনে গেছে, জোর করে কারাগারে ঢুকেছে কেউ।

এখন কী করব আমরা? জানতে চাইল মিতা। রানাকে পাশে পেয়ে নিশ্চিন্ত।

কিন্তু যাব কোথায়? জানতে চাইল চাইনিজ বৃদ্ধ।

করিডোরের সামনে পাবেন ভাঙা গানপোর্ট, ওদিক দিয়ে বেরিয়ে নেমে পড়বেন নদীতে, বলল রানা, দক্ষিণে গেলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে গিয়ে উঠবেন তীরে। পালাতে চাইলে এখনই।

চাইনিজ বৃদ্ধ বা ভারতীয় মহিলা যে এত চালু, আগে বুঝতে পারেনি মিতা। রানার কথা শেষ হতে না হতেই আঁধারে হারিয়ে গেল তারা।

চারপাশ দেখল রানা। তুমি বলেছিলে তোমরা সাতজন।

করিডোরের ওদিকের সেল দেখাল মিতা। আহত লৌ এবং তার মার খাওয়া বন্ধু গিয়ে ঢুকেছে ওদিকে।

ওরা আসছে না কেন? জানতে চাইল রানা।

আমাদের মতাদর্শে বিভেদ তৈরি হয়েছিল, নরম সুরে বলল মিতা। এখন দেহে-মনে কষ্ট নিয়ে শুয়ে আছে। কাউকে না কাউকে তো কয়েদখানার মালিক হতে হবে!

ও, তার মানে মার খেয়েছে?

হুঁ, চলো, বেরিয়ে যাই।

ছেলেটাকে সঙ্গে নেব, বলল রানা, ওর দায়িত্ব থাকল তোমার ওপর।

চেনো পাবলোকে? জানতে চাইল মিতা।

আমাদের চুক্তির অর্ধেক অংশ ও, বলল রানা। পরে বলব কী হয়েছে।

আরও কিছু বলত মিতা, কিন্তু লোহার গেটের সামনে থামল রানা। ওই গেট পেরোলেই সামনে এলিভেটর। তালার ভেতর সামান্য প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ঠুসে দিল ও, তারপর পিছিয়ে এল।

চিৎকার জুড়ল পাবলো। যে কারণেই হোক, ভীষণ ভয় পেয়েছে। এক হাতে চেপে ধরেছে: ডান কান, বাম হাতে দেখাচ্ছে এলিভেটর। ওরা! ওরা!

হঠাৎ খুলে গেল এলিভেটরের দরজা, ভেতর থেকে ছিটকে এল কয়েকটা ডার্ট। পেছনে রয়েছে কেবল। রাইফেলের মত দেখতে কোনও টেইযার থেকে এসেছে। ওগুলো। রানা ঝট করে সরে গেলেও একটা ডার্ট লাগল মিতার গায়ে। হায়-হায় করে উঠল ওর মন, যাহ্, আবারও বন্দি হয়ে গেলাম!

শরীর জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র ব্যথা।

কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে মিতা। কিন্তু এক টানে ওর দেহ থেকে ডার্ট খুলে নিল রানা। বাম হাতে ধরল মিতাকে। পরক্ষণে পাবলো আর ওকে ঠেলে সরিয়ে নিল দেয়ালের ওদিকে। নিজেও আড়াল নিল ওখানে।

নিজের ওপর রেগে গেছে রানা। সিকিউরিটির লোক নেমে আসবে, আগেই জানত। কিন্তু এরা নিভিয়ে দিয়েছিল এলিভেটরের ভেতরের বাতি। দরজা খুলে যাচ্ছে, এমনসময় চেঁচিয়ে উঠল রাশান ছেলেটা তখন সামান্য মনোযোগ হারিয়ে বসে।

হাতের কারবাইন দিয়ে ওদিকে গুলি পাঠাল রানা।

বুকে গুলি, বিঁধতেই করিডোরের মাঝে শিয়ালের মত হুক্কাহুয়া করে উঠল এক লোক। ধুপ আওয়াজ হলো মেঝেতে লাশ পড়ার।

একজন গেল, বিড়বিড় করল মিতা।

এদিকে ডেটোনেটর সুইচ টিপেছে রানা।

গেটের তালায় গুঁজে রাখা সি-৪ বিস্ফোরিত হতেই ছিটকে খুলল লোহার শিকের দরজা। ওটার বাড়ি খেয়ে নাক ও চোয়াল ভেঙে অচেতন হলো দ্বিতীয় গার্ড।

কিন্তু তখনই করিডোর থেকে গুলি পাঠাল তৃতীয় গার্ড।

পাথরের ঘরে নানান দিকে ছিটকে যাচ্ছে বুলেট। ব্যাকপ্যাক থেকে গ্রেনেড নিয়ে পিন খুলে করিডোরে ছুঁড়ল রানা। ঠং শব্দে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ল হাতবোমা।

জানা আছে বলে এক এক করে সেকেণ্ড গুনতে শুরু করেছিল মিতা, কিন্তু তিন বলার আগেই করিডোরের ওদিকে বিস্ফোরিত হলো গ্রেনেড। ওই কংকাশন ছিটকে ফেলে দিয়েছে তৃতীয় গার্ডকে।

এক সেকেণ্ড পর দেয়ালের বাঁক ঘুরে বুলড়োযারের মত করিডোরে বেরোল রানা। দুই লাফে পৌঁছুল গার্ডের পাশে। মাত্র উঠে বসেছে সে। তার হাত থেকে টেইযারের মত অস্ত্রটা কেড়ে নিল রানা, পরক্ষণে ট্রিগারে তর্জনী ভরে মাযল তাক করল গার্ডের বুকে। বিদ্যুতের প্রচণ্ড শক খেয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল লোকটা, মাত্র পাঁচ সেকেণ্ডে হয়ে উঠল সত্যিকারের যোম্বি।

এলিভেটরের দিকে তাকাল রানা। শাফট থেকে আসছে বেশ কয়েকটা অ্যালার্মের কান্না। তাল মিলিয়ে সুর ধরেছে বাইরের কিছু অ্যালার্ম। ওদিকে রাতের ঘুটঘুটে আঁধার ও ধোয়া চিরে নানা দিকে গেছে ফ্লাডলাইটের উজ্জ্বল সাদা আলো। চিৎকার শোনা গেল প্রাচীন দুর্গের ছাতে।

ওদিক দিয়ে গার্ডদের নামতে লাগবে কয়েক মিনিট। এখন ভাঙা গানপোর্ট দিয়ে বেরোলে খুন হবে রানারা।

মিতা, ছেলেটাকে নিয়ে এসো, ডাকল রানা। কটুগন্ধী ধোঁয়ার মাঝে দেখল, আরেক বন্দিকে উঠতে সাহায্য করছে মিতা ও পাবলো। হাতে একফোঁটা বাড়তি সময় নেই, তবুও ওদিকে পা বাড়াল রানা।

এমনিতেই মরব, রেখে যান, জড়ানো কণ্ঠে বলল লোকটা। পাবলোকে নিয়ে বেরিয়ে যান আপনারা!

না, আপনাকে রেখে যাব না, শক্ত হাতে দিমিতভের কবজি ধরল মিতা।

তা হলে খুন হবেন, বলেই উল্টো মিতাকে রানার দিকে ঠেলে দিল ট্রলারের ক্যাপ্টেন। ভারসাম্য সামলাতে না পেরে পড়ে গেল এক পাশের বাঙ্কের পাশে।বাঁচান পাবলোকে!

তার পাশে থামতেই রানা দেখল, কাটা হাঁটু রক্তাক্ত ন্যাকড়ায় মুড়িয়ে রেখেছে রাশান। তখনই নাকে লাগল গ্যাংগ্রিনের দুর্গন্ধ। এই লোক মারাত্মকভাবে আহত, বাঁচবে না।

দয়া করে পাবলোকে নিয়ে যান, ওকে বাঁচান! আবারও বলল রাশান। তার একটা হাত ধরে বসে পড়েছে ছেলেটা। নীরবে কাঁদছে। যাবে না বন্ধুকে ফেলে।

আবছা আলোয় রানার চোখে তাকাল মিতা, পরক্ষণে নিল সিদ্ধান্ত। খপ করে ধরল পাবলোর হাত, টান দিয়ে সরিয়ে নিল রাশান ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে। গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগল বাচ্চা ছেলেটা।

আমাকে একটা অস্ত্র দিয়ে যান, কাঁপা কণ্ঠে বলল দিমিতভ।

মানুষটা বন্দি হতে চায় না। ব্যাকপ্যাক থেকে রাশান পিস্তল ও একটি ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড নিল রানা, ধরিয়ে দিল লোকটার দুহাতে। উঠে দাঁড়িয়ে মিতার হাত ধরে ছুটল এলিভেটরের দরজা লক্ষ্য করে।

পাবলোর কনুই শক্ত করে ধরে রেখেছে মিতা। বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল, আমরা এলিভেটরে উঠব?

ওরা বাইরের সীমানা পাহারা দিচ্ছে, কাজেই ছাতে উঠব, বলল রানা। ওদের নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে যাব।

এলিভেটরে চাপল ওরা। রানা দেখল, এখনও সুট-এ ঝুলছে গার্ডের চাবি। ওটা মুচড়ে দিলে ওপরে উঠবে এলিভেটর কার। কিন্তু তার আগে কাজ আছে। এক পাশে রাইফেল ঠেস দিয়ে রেখে কন্ট্রোল প্যানেল টেনে খুলল রানা।

কী করছ? জানতে চাইল মিতা।

ওভাররাইড করব ওদের কমপিউটার, বলল রানা। প্যানেলের ভেতর থেকে টান দিয়ে বের করল চিরুনির মত দেখতে ইলেকট্রনিক ইন্টারফেস। ওটার সঙ্গে যুক্ত ক্যালকুলেটর আকৃতির কী যেন।

এলিভেটরের ইন্টারফেস-এ ঢুকেছে অসংখ্য তার। ওগুলো সাবধানে বের করে নিল রানা, তারপর আটকে নিল ওর আনা ইলেকট্রনিক ইন্টারফেস-এ। চিরুনি গেঁথে দিল ক্যালকুলেটরের বুকে। কি প্যাডে টাইপ করল: ১১১। কাজটা শেষ করেই টিপল এন্টার। ডিসপ্লেতে দেখা গেল: লক। বন্ধ হয়ে গেল এলিভেটরের দরজা, তীব্র গতি তুলে উঠতে লাগল এক্সপ্রেস কার।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে পাবলো। দুহাতে তুলে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল মিতা। কিচ্ছু হয়নি। কাঁদে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

সত্যিই ভাল মা হবে মিতা, ভাবল রানা। পরক্ষণে পরীক্ষা করল ডিসপ্লের রিডআউট। পেরিয়ে যাচ্ছে বিশতলা। গতি আরও বাড়ছে। যে ডিভাইস ব্যবহার করছে রানা, ওটা পেয়েছে এনআরআই চিফের কাছ থেকে। এই টাওয়ারের এলিভেটরের কমপিউটার সিকিউরিটি প্রোটোকল ওভাররাইড তো করছেই, কমপিউটারকে জানাচ্ছে ভুল তথ্য: এলিভেটর রয়ে গেছে এখনও জেলখানায়।

দুর্গ ঘিরে রাখবে হুয়াং লি ল্যাং-এর বাহিনী, আর আরেক দল লবিতে দাঁড়িয়ে বারবার কল বাটন টিপে ডাকবে এলিভেটর। এই বুঝি এল ওটা।

কিন্তু ততক্ষণে তাদেরকে কাঁচকলা দেখিয়ে ওরা উঠে যাবে ছাতে।

রানার মগজে ঘুরছে একটা চিন্তা: ঠিক সময়ে আসবে তো ইগোর দিমিতভের হেলিকপ্টার?

ব্যাকপ্যাক থেকে তিনটে হার্নেস বের করল রানা, ওগুলোর সঙ্গে রয়েছে স্টিলের তার। শেষমাথায় স্ন্যাপ রিং। একটা মিতার জন্যে, একটা পাবলোর জন্যে, অন্যটা ওর।

পাবলোকে হার্নেস পরাতে শুরু করে বলল রানা, মিতা, পরে নাও।

হার্নেস নিয়ে প্রথমে পা ওটার ভেতর ভরল মিতা, তারপর দুই হাত।

রানা হার্নেস পরিয়ে দিচ্ছে বলে খুব অবাক হয়েছে পাবলো। বন্ধ হয়েছে কান্না। ফোলা চোখ লাল। গালে লোনা জলের দাগ।

জানলে কী করে, আমি এখানে? জানতে চাইল মিতা।

মিস্টার ব্রায়ান নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন তোমার খবর দিতে। অনুরোধ করেন, যেন হংকং থেকে তোমাকে নিয়ে পৌঁছে দিই আমেরিকায়।

উনি জানলেন কী করে যে আমি এখানে?

হুয়াং লি ল্যাং-এর লোক তোমাকে কিডন্যাপ করলে ব্রায়ানকে ফোন দেন প্রফেসর হ্যারিসন। এরপর কোথায় আছ। তা খুঁজে বের করেন ব্রায়ান।

তা হলে বেঁচে আছেন ডক্টর জর্জ হ্যারিসন? ঝলমল করছে মিতার দুই চোখ। ভেবেছিলাম খুন হয়ে গেছেন  বুঝি।

এলিভেটর রিডআউট দেখল রানা। ঝড়ের গতি তুলে উঠছে ওরা। নব্বই তলা। পনেরো সেকেণ্ড পর পৌঁছাব ছাতে।  

তারপর কী করবে? জানতে চাইল মিতা।

আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে হেলিকপ্টার।

তা হলে হার্নেস আনলে কেন?

 ছাতে নামতে পারবে না হেলিকপ্টার।

বৃষ্টিভেজা, আঁধার ছাতে উঠে থামল এলিভেটর, খুলে গেল দরজা।

রানা রাইফেল হাতে বেরোতেই পাবলোর হাত ধরে ছাতে পা রাখল মিতা। জানতে চাইল, কোথায় হেলিকপ্টার?

মস্ত ছাতের আশপাশে কোথাও নেই ওই জিনিস!

তুমুল বৃষ্টি, সেই সঙ্গে দমকা হাওয়া।

রানার মনে হলো, গতরাতের মতই শহরের রঙিন আলো মেখে মাথার কাছে নেমে এসেছে ধূসর মেঘ। বাস্তবে ছাত থেকে আছে অন্তত সিকি মাইল ওপরে। ভাবছে রানা, স্কাইস্ক্র্যাপার ভরা শহরে বাজে এ আবহাওয়ায় কপ্টার আকাশে তুলবে না সুস্থ মগজের পাইলট। বৃষ্টির কারণে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

অবশ্য ইগোরের বক্তব্য অনুযায়ী, সঠিক সময়ে পৌঁছাবে যান্ত্রিক ফড়িং। রাশান ছেলেটাকে খুব দরকার তাদের।

ছাতে রেলিং বলতে কিছুই নেই, কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল রানা। অনেক নিচে পাথুরে জমিন। আকাশ ভেঙে নেমেছে বৃষ্টি।

এল না কেউ, ভিজতে ভিজতে বলল হতাশ মিতা।

বৃষ্টির শব্দ পাত্তা না দিয়ে কান পাতল রানা। কোথাও নেই পাখার ধুব-ধুব আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে এল চাপা বিস্ফোরণের শব্দ। একবার মৃদু কাঁপল গোটা ছাত।

চট করে রানার দিকে তাকাল মিতা। বুঝে গেছে, কী হয়েছে। গ্রেনেড ফাটিয়ে দিয়েছে ট্রলারের ক্যাপ্টেন দিমিতভ, মারা যাওয়ার আগে বোধহয় সঙ্গে নিয়েছে কয়েকজন গার্ডকে।

এবার ওরা বুঝবে, এলিভেটর নিচে নেই, বলল মিতা।

মৃদু মাথা দোলাল রানা। একটু আগেই হয়তো টের পেয়েছে সিকিউরিটির লোক।

ওরা শুনল ভারী মেশিনের গুঞ্জন। দ্রুত উঠে আসছে দ্বিতীয় এলিভেটর।

নিশ্চয়ই ব্যাকআপ প্ল্যান আছে? আশা নিয়ে রানার দিকে তাকাল মিতা।

নেই। ব্যাকপ্যাক থেকে পিস্তল নিয়ে মিতার হাতে দিল রানা। রাইফেল হাতে নিজে কাভার করল এলিভেটর শাফট ও সিঁড়িঘর।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু দূরে সরে বসল মিতা। একহাতে ধরে রেখেছে পাবলোর কনুই, অন্য হাতে ম্যাকারভ পিস্তল।

গন্তব্যে পৌঁছে টুং আওয়াজ তুলল এলিভেটর। রানা দেখল, দরজার তলা দিয়ে আসছে আলো। রাইফেল হাতে ওদিকে চোখ রাখল। তিন সেকেণ্ড পর খুলে গেল এলিভেটরের দরজা। ভেতরে কেউ নেই!

ঝট করে সিঁড়িঘরের দিকে রাইফেল তাক করল রানা।

তখনই পেছন থেকে এল কড়া ধমক: অস্ত্র ফেলো, নইলে খুন হবে!

কুঁচকে গেল রানার ভুরু। অস্বাভাবিক হলেও এই ছাতের পাশে উঠেছে ফায়ার এস্কেপ, ওই পথে এসেছে ল্যাং-এর লোক!

হাত থেকে রাইফেল ফেলে দিল রানা। ঠনাৎ আওয়াজে ছাতে পড়ল মিতার পিস্তল।

ঘুরে দাঁড়াও!

পাবলোকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিতা। খুব ধীর গতি তুলে ঘুরল রানা। তিনজন গার্ডকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোটা এক চাইনিজ লোক। আগে তাকে দেখেনি রানা, কিন্তু ডোশিয়ে পড়েছে, বুঝে গেল এই লোকই ক্যাং লাউ ল্যাং এর খাস লোক, ডানহাত!

ছাতে শুয়ে পড়ো, আরেক ধমক দিল মোটকু।

অলসভঙ্গিতে ছাতে শুয়ে পড়ল রানা। দূর থেকে এল ভারী ধুব-ধুব আওয়াজ। আসছে খুব দ্রুত। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে হাজির হলো দালানের ছাতের ওপরে।

ঘাড় কাত করে হেলিকপ্টারের দিকে তাকাল রানা। ওটা চকচকে কালো ইউরোপিয়ান জিনিস। খুলে গেছে একদিকের দরজা। ওখান থেকে এল এক পশলা গুলি।

কিছু বোঝার আগেই বুক-পেটের বেশিরভাগ রক্ত ছড়িয়ে ছাতে লাশ হলো দুই গার্ড। জান বাঁচাতে ফায়ার এস্কেপের দিকে ছুটল ক্যাং লাউ এবং অন্য গার্ড।

রানাদের খুব কাছে এসে ঘুরে গেল হেলিকপ্টার।

 সিঁড়িঘর থেকে হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে এল গুলি।

আবারও রাইফেল তুলে নিয়েছে রানা, অর্ধেক ম্যাগাযিন খালি করল ওদিকের গার্ডদের উদ্দেশে।

এদিকে আরও কাছে এল হেলিকপ্টার। ওটার দরজা থেকে নিচে পড়ল স্টিলের কে। রানা গুলি ছুঁড়তে ব্যস্ত, লাফিয়ে উঠে কে টেনে নিল মিতা।

হার্নেসে আটকে নাও! নির্দেশ দিল রানা।

আগে পাবলোর হার্নেসে কেবল আটকে দিল মিতা। ফায়ার এস্কেপ থেকে এল একরাশ গুলি। হেলিকপ্টারের ফিউজেলাজে লেগে ফুলকি তুলল।

জলদি! তাড়া দিল রানা। আরেক পশলা গুলি পাঠাল সিঁড়িঘরের দিকে। মিতা ঝুলে পড়তেই নিজের হার্নেসের আঙটা চট করে কেবৃ-এ আটকে নিল।

হৈ-হৈ করে সিঁড়িঘর ও ফায়ার এস্কেপ থেকে তেড়ে এল ল্যাং-এর গার্ডরা। গুলি করছে ককপিট লক্ষ্য করে। পাল্টা গুলি পাঠাল রানা। কিন্তু ওকে ঝুলিয়ে-দুলিয়ে সরে গেল হেলিকপ্টার, ল্যাং টাওয়ারের ছাত ছেড়ে সোজা চলল নদীর ওপর দিয়ে।

রানার মনে হলো, বহু ওপর থেকে লাফ দিয়েছে। জাম্পারদের মত। ওরা যেন মস্ত ঘড়ির পেণ্ডুলাম। কেবল-এ ঘুরতে ঘুরতে গলা ছেড়ে কাঁদছে পাবলো। মিতার দিকে তাকাল রানা। নিচে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। গুলির ভয়ে অনেক নেমে এসেছে কপ্টার। সাঁই-সাঁই করে পিছিয়ে পড়ছে নদী। ওদের গতি কমপক্ষে ঘন্টায় এক শ মাইল। বৃষ্টি ও তুমুল বাতাসের ভেতর আঁধার আকাশ চিরে ছুটে চলেছে। দেখতে না দেখতে এক হাজার ফুট পেছনে পড়ল ভিক্টোরিয়া হার্বারের ব্যস্ত এলাকা।

সামনে দুলতে দুলতে যাচ্ছে রানারা, পরক্ষণে হয়ে উঠছে ওজনশূন্য। আবার ধপ করে পড়ছে নিচে। তবে পাইলট স্পিড স্বাভাবিক করার পর কমল ঝকি। হেলিকপ্টারের পেছনে লেজের মত ঝুলতে ঝুলতে চলল ওরা। মুখে-হাতে গুলির মত লাগছে বৃষ্টির ফোঁটা। মিতা ও পাবলোকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল রানা, তাতে একটু কমল দুলুনি।

হেলিকপ্টারের হালকা উইঞ্চ টেনে তুলতে পারবে না তিনজনকে, কাজেই ঠিক করা হয়েছে, কাউলুনের দিকে যাওয়ার পর ল্যাণ্ড করবে পাইলট। তখন দেরি না করে যে যার পথে সরে পড়বে ওরা।

শোঁ-শোঁ আওয়াজের ওপর দিয়ে চিৎকার করে জানতে চাইল মিতা, রানা, কে চালাচ্ছে হেলিকপ্টার?

আমার অচেনা কেউ, জবাব দিল রানা।

এরা কারা? আবার কিডন্যাপ করবে না তো আমাদেরকে?

এরা রাশান, বলল রানা।

আমার ধারণা হয়েছিল আঙ্কেল ব্রায়ান সবকিছু জানিয়েছে তোমাকে।

 ঠিক তা নয়।

তা হলে কী?

এখানে পৌঁছেই পড়েছি রাশানদের প্যাঁচে।

 রাশান? এরা কী চায় আবার?

ওরা ছেলেটাকে ফেরত চায়। পাবলোর মা বিজ্ঞানী, তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে ওকে কিডন্যাপ করেছে হুয়াং লি ল্যাং।

মাথা কাত করল মিতা। মনে হল ভুল শুনেছে। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, একদম মিথ্যা! পাবলো এতিম। ওর ওপর নানান কঠিন এক্সপেরিমেন্ট করছে ওরা।

খুব গম্ভীর হয়ে গেল রানা। ওরও মনে হয়েছিল, অর্ধসত্য বলছে ইগোর দিমিতভ। এ ধরনের তথ্যের জন্যে তৈরি ছিল না। তুমি ঠিক জানো তো, মিতা?

আমার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

পাবলোকে একবার দেখে নিয়ে মিতার চোখে চোখ রাখল রানা।

আমি ওদের হাতে পারলোকে তুলে দেব না, বলল মিতা।

নিচের নদী দেখল রানা, আবারও দেখল মেয়েটাকে।

একজনকে কথা দিয়েছি, বলল মিতা। পাবলোকে কারও হাতে তুলে দেব না। জোরালো হাওয়া ও বৃষ্টির মাঝ দিয়ে অনুনয়ের দৃষ্টিতে তাকাল ও।

ভাবছে রানা। ওরা আছে জলসমতল থেকে বড়জোর পঞ্চাশ ফুট ওপরে। পাঁচ শ গজ দূরেই তীর।

আমি কিন্তু ওদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম, বোঝাতে চাইল রানা। এখন সেটা ভঙ্গ করা অনুচিত হবে।

জান থাকতে ওকে দেব না! ছেলেটাকে আরও আঁকড়ে ধরল মিতা। ওকে নিয়ে যাব আমার সঙ্গে আমেরিকায়!

কয়েক সেকেণ্ড ভাবল রানা, তারপর বলল, তো তৈরি হও। কনুইয়ের ভঁজে পাবলোকে রেখে চট করে মিতার স্টিলের কেবল খুলে দিল ও। মেয়েটা আলুর বস্তার মত নিচে রওনা হতেই পাবলো আর ওর নিজের কেবল খুলল রানা। মিতাকে পেছনে ফেলে অন্ধকার নদীতে পড়ছে ওরা।

পাথরের মত পড়তে পড়তে রানার মনে হলো: ওই রাশান ব্যাটা সহজে ছাড়বে না! ঝামেলা হওয়ার আগেই মিতা আর পাবলোকে পৌঁছে দিতে হবে আমেরিকায়! কাজেই গোপনে বেরিয়ে যেতে হবে এই দেশ ছেড়ে!

নতুন কিছু ভাবতে পারল না রানা, অনেক ওপর থেকে ঝপাস করে নামল নদীতে। পরক্ষণে একহাতে পাবলোকে জাপ্টে রেখে তলিয়ে গেল পানির ত্রিশ ফুট নিচে!

.

১৬.

 তাঁর সর্বনাশ করতেই এসেছেন সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু, ভাবলেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। ওই লোকের সঙ্গে এসেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। এবার চেপে ধরা হবে তাকে: কার অনুমতি নিয়ে হংকং থেকে সরানো হয়েছে মিতা দত্তকে?

ভার্জিনিয়া ইণ্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের পঞ্চম ভবনে নিজ অফিসে প্রেসিডেন্ট ও সিআইএ চিফকে আপ্যায়ন করছেন ব্রায়ান। চট করে একবার দেখলেন সিনিয়র বন্ধুর চোখ। কী যেন ভাবছেন তিনি, অস্বাভাবিক গম্ভীর। মনে হচ্ছে, কী যেন দায়িত্ব দিয়েছেন সিআইএ চিফ ক্যালাগুর ওপর। এ কারণেই খুব চিন্তিত ব্রায়ান।

এদিকে কেমন যেন হতোদ্যম মনে হচ্ছে কমাণ্ডার ইন চিফকে, ভাবলেন ক্যালাগু।

আসল কথা, আমরা যখন শুনলাম আপনি আমেরিকার শত্রুর সাহায্য নিয়েছেন, অবাক না হয়ে পারিনি, নতুন উদ্যমে বললেন সিআইএ চিফ। আমরা আশা করেছিলাম, সহযোগী এবং অনেক দক্ষ কোনও এজেন্সির সহায়তা চাইবেন আপনি।

ফাঁদের ছক বুঝতে পারছেন ব্রায়ান। মাসুদ রানার অফিসে গিয়ে সাহায্য চেয়েছেন, এটা যদি প্রেসিডেন্টের কাছে অস্বীকার করেন, দেরি না করে প্রমাণ দেখাবেন ক্যালাগু। আবার যদি স্বীকার করেন কী করেছেন, তা হলেও বলা হবে বোকার মত ঝুঁকি নিয়েছেন তিনি।

আপাতত কিছুই করার নেই বুঝে আত্মরক্ষা করতে চাইলেন ব্রায়ান, নরম সুরে বললেন, এনআরআই অফিসকে ব্যবহার করে কিছুই করিনি।

তার মানেটা কী? ঘেউ করে উঠলেন ক্যালাগু।

ওই অপারেশনে ব্যবহার করা হয়নি এনআরআই ফাণ্ড, বললেন ব্রায়ান।

তো টাকা এল কোথা থেকে? জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

এনআরআই ফাণ্ড থেকে আমার প্রাপ্য সব টাকা তুলে নিয়ে ট্রান্সফার করেছি মাসুদ রানার অ্যাকাউন্টে।

চট করে প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন ক্যালাগু। আশা করছেন, এবার কঠিন একখানা গযল ঝাড়বেন তিনি। কিন্তু প্রেসিডেন্টকে চুপ দেখে বাধ্য হয়েই আবার তাকালেন ব্রায়ানের দিকে। আপনি কি পাগল হয়েছেন, ব্রায়ান? আপনার তো বোঝার কথা, চাইলেও সাধারণ নাগরিকের মত যা খুশি তাই করতে পারেন না। আপনি গুরুত্বপূর্ণ একটা অফিস চালান। আপনার জানার কথা, কতবড় ঝুঁকির ভেতর ফেলেছেন আমাদেরকে। তা ছাড়া…

রস পেরো যদি নিজের লোককে শত্রুদেশ থেকে তুলে আনতে পারেন, এবং সেজন্যে হিরো হয়ে যান, তো আমি কেন আমার প্রিয় কাউকে ফিরিয়ে আনতে পারব না? আইনের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের কোনও নাগরিক আমার দেশের নাগরিককে তুলে নিয়ে গেলে আমি বসে থাকব?

বিস্ফোরিত হলেন ক্যালাগু, স্রেফ পাগল হয়ে গেছেন, ব্রায়ান! আপনি যদি আমার চাকরি করতেন, পেছনে লাথি দিয়ে চাকরি থেকে বের করে দিতাম, বা গ্রেফতার করাতাম।

চুপ করে নিজের সিটে বসে আছেন ব্রায়ান। নিজের আসল ইচ্ছে জানিয়ে ফেলেছেন ক্যালাগু। খুব নরম সুরে বললেন এআরআই চিফ, ও, তা হলে এটাই আপনার মনের খায়েশ? যেভাবে হোক এনআরআইকে পায়ের নিচে দলবেন? অর্থাৎ আপনার চাই আরও ক্ষমতা? যা খুশি করবে সিআইএ?

যথেষ্ট কারণ আছে বলেই আমার সংগঠনকে বলা হয় সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স, আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন ক্যালাগু।

আপনারা একদল খুনি ছাড়া আর কিছুই নন; বললেন ব্রায়ান। ইন্টেলিজেন্স বা বুদ্ধি আবার কোথায় পেলেন?

সান লোশন ছাড়াই যেন বসে আছেন সাহারা মরুভূমির মাঝে, রাগে লাল হয়ে গেল ক্যালার চেহারা। ধমকে ওঠার আগেই এক হাত ওপরে তুললেন প্রেসিডেন্ট। ধরে নিন বক্সিঙের এই রাউণ্ড শেষ। আপনার কথায় পয়েন্ট আছে, ক্যালাগু। কিন্তু ব্রায়ান যা বলেছেন বা করেছেন, তাতে আমেরিকার বেশিরভাগ মানুষ খুশি হবে; আদালতে গেলেও বাহবা পাবেন ব্রায়ান।

চুপ করে কথাটা শুনলেন ব্রায়ান। বুঝে গেলেন, এখনও তার পক্ষেই আছেন প্রেসিডেন্ট।

তা ছাড়া, মৌখিকভাবে নির্দেশ দেয়ার পর কাজে নামেন ব্রায়ান।

হতভম্ব হয়ে গেলেন ক্যালাগু। মৌখিক নির্দেশ? ভুরু কুঁচকে গেল তার। দয়া করে খুলে বলবেন, স্যর?

সহজ কথা, বললেন প্রেসিডেন্ট। চেয়েছি পরবর্তী সময়ে আদালত যেন আমাকে দায়ী না করে। আবার এ-ও চাইনি, আমার দেশের মানুষকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবে অন্য দেশের লোক, অথচ কিছুই করতে পারব না। কাজেই মিতা দত্তকে চিন থেকে তুলে আনার দায়িত্ব চেপে বসে ব্রায়ানের ওপর। একবার এনআরআই, চিফকে দেখলেন তিনি, তারপর বললেন, হুয়াং লি ল্যাং-এর কপাল ভাল, সে আছে চিনে। ওই দেশকে ঘাটাতে চাই না। কিন্তু মাসুদ রানা যখন ঝুঁকি নিয়ে মেয়েটাকে সরিয়ে আনতে রাজি হলেন, খুবই খুশি হয়েছি।

মুচকি হাসলেন প্রেসিডেন্ট। খারাপ কিছু হলে ভুলে যেতাম, এসবের সঙ্গে আমি জড়িত। আর আপনিও কিছুই টের পেতেন না, ক্যালাগু।

বিমর্ষ হয়ে গেছেন সিআইএ চিফ।

 চুপ করে আছেন ব্রায়ান। বাস্তবে তাঁকে কোনও মৌখিক নির্দেশ দেননি প্রেসিডেন্ট। কাজেই বুঝতে পারছেন, তাঁকে রক্ষা করছেন তিনি। ঋণী ও কৃতজ্ঞ হয়ে গেলেন ব্রায়ান।

কথা তো শেষ, নাকি? বললেন প্রেসিডেন্ট। এবার আলাপ হোক… যে কাজে এসেছি।

চুপ করে অপেক্ষা করছেন ব্রায়ান।

গতকাল আপত্তিকর কিছু তথ্য পেয়েছেন ক্যালাগু, বললেন প্রেসিডেন্ট। সিআইএ গুজব শুনেছে এনআরআই সম্পর্কে। এখানে, কমপ্লেক্স-এ নাকি তৈরি করা হয়েছে এক্সপেরিমেন্টাল ফিউশন রিঅ্যাক্টর। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ বেআইনী। এ ধরনের কিছু ঘটে থাকলে, রাজধানীর সাধারণ মানুষ ভয়ঙ্কর ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ব্রায়ান ভাবলেন, সিআইএর গুজব ভুল, কিন্তু ওই কাহিনির মাঝে যে একতিল সত্যি নেই, তা নয়। প্রথম দিনই প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে কাজে নেমেছেন তিনি। ইচ্ছে করলে যে-কোনও সময়ে ওই তথ্য ক্যালাগু বা অন্য কাউকে দিতে পারতেন প্রেসিডেন্ট। এজন্যে ভার্জিনিয়ার এনআরআই অফিস ভিযিট করা প্রয়োজন ছিল না তার।

অর্থাৎ, অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে তাঁর।

ব্রায়ান আন্দাজ করলেন, প্রেসিডেন্ট চাইছেন এবার খুলে বলা হোক সব।

অনেক দিন ধরেই এমনসময় আসবে ভেবে আতঙ্কে ছিলেন ব্রায়ান। এবার হয়তো বন্ধ হবে সব। প্রেসিডেন্ট হয়তো চাইছেন সিআইএকে জানাতে, যাতে তারাও জড়াতে পারে এনআরআই-এর পঞ্চম ভবনের নিচতলার প্রোগ্রাম-এ। নিজ চোখে দেখবেন তিনি। বুঝে নেবেন জিনিসটা আসলে কী।

তার মানে নিজের চোখে আপনারা ওই প্রোগ্রাম দেখতে চান, বললেন ব্রায়ান।

 মৃদু নড করলেন-প্রেসিডেন্ট।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ব্রায়ান। আপনি অনুমতি দিলে, চলুন, যাওয়া যাক।

ব্রায়ানের পেছনে চললেন প্রেসিডেন্ট ও দ্বিধান্বিত সিআইএ চিফ। সবাইকে ঘিরে এগোল প্রেসিডেন্টের সিকিউরিটি ডিটেইল। কিন্তু সিকিয়োর এক এলিভেটরের সামনে থামলেন এনআরআই চিফ, তাকালেন সিনিয়র বন্ধুর দিকে।

হাত তুলে দলের অন্যদেরকে নিষেধ করলেন প্রেসিডেন্ট। এখানেই অপেক্ষা করো। আমাদের সময় লাগবে।

ব্রায়ান কোড দেয়ার পর খুলে গেল এলিভেটরের দরজা। তারা তিনজন উঠে পড়ার পর পেছনে রয়ে গেল সিকিউরিটির লোকগুলো। একবার ভাবলেন এনআরআই চিফ, বলবেন নাকি: না-ই-বা গেলেন ওই প্রোগ্রাম দেখতে, স্যর! কিন্তু গম্ভীর চেহারায় দাঁড়িয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট। এখন আর ওই বিষয়ে আলাপ করার উপায় নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট চাইছেন সিআইএ জড়িয়ে যাক এনআরআই-এর এই প্রোগ্রামে। আর কোনও কথা চলে না।

এক মিনিট পেরোবার আগেই তারা নেমে এলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ল্যাবোরেটরিতে। এয়ার ফিল্টারেশনের জন্যে মৃদু গুনগুন আওয়াজ ছাড়া চারপাশ নীরব। প্রকাণ্ড ঘরের দেয়াল ও ছাতে জ্বলছে, নরম বিশেষ নীলচে লেড বাতি।

চুপচাপ বসে কমপিউটারের মনিটরে রিডআউট দেখছে। এনআরআই-এর দুই টেকনিশিয়ান। এনআরআই চিহ্ন, সিআইএ চিফ এবং স্বয়ং প্রেসিডেন্টকে দেখে উঠে দাঁড়াল তারা।

নিজের কাজ করুন, বললেন প্রেসিডেন্ট।

দুই অতিথিকে কাচের একটা প্যান-এর সামনে নিয়ে গেলেন ব্রায়ান। দুই ইঞ্চি পুরু কাঁচ আসলে কেভলার, রাইফেলের বুলেট লাগলেও কিছুই হবে না। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বাঁকা, সহজেই যেন দেখা যায় ভেতরের জিনিস।

পাঁচ ফুট নিচে বৃত্তাকার জ্বলন্ত লেড বাতির মাঝে মুকুটের মত বসে আছে ত্রিকোণ এক স্ফটিক। খুব সুন্দর করে পলিশ করা। নীলচে আলোয় ঝিকঝিক করছে হীরার মত।

কোনও পরিবর্তন? জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

টেকনিশিয়ানদের একজন বলল, না, স্যর। গত মাসের বাইশ তারিখ থেকে আর কিছুই ঘটেনি।

কোহিনূর হীরার মত ঝলমলে স্ফটিক মনোযোগ দিয়ে দেখছেন সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু।

আগেও বহুবার দেখেছেন, তবুও ওই জিনিসের দিকে না চেয়ে পারলেন না ব্রায়ান।

আগে মাত্র দুবার ওই স্ফটিক দেখেছেন প্রেসিডেন্ট। অবশ্য, অতীতের কৌতূহল এখন নেই, এবার দেখছেন অস্বস্তি নিয়ে। চান না ওটার কারণে মস্ত কোনও ক্ষতি হোক মানুষের।

ওটা আসলে কী? জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

আমরা ওটার নাম দিয়েছিঃ ব্রাযিল স্টোন, বললেন ব্রায়ান। আমাযন থেকে উদ্ধার করে এ দেশে আনা হয়েছে এক বছর আগে। প্রেসিডেন্টের দিকে মাথা কাত করলেন তিনি। দেরি না করে জানানো হয়েছে প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেসের বড় মাপের কয়েক নেতাকে।

দুজনের চেহারা ও মনোভাব ভালভাবে বুঝতে একটু সরে দাঁড়ালেন ব্রায়ান।

ওই জিনিস কী করে? জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

শক্তি উৎপাদন করে, বললেন ব্রায়ান, কীভাবে কী হচ্ছে তা আমরা এখনও জানি না। 

এখানে রেখেছেন কেন? জানতে চাইলেন ক্যালাগু। ওটা কি রেডিয়োঅ্যাকটিভ বা ওই ধরনের কিছু?

না, তেমন নয়, বললেন ব্রায়ান, তবুও এই ভল্ট এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশন হলেও ক্ষতি হবে না মানুষের। চারপাশের দেয়াল দেখালেন তিনি। আমরা আছি মাটির পঞ্চাশ ফুট নিচে। এই ভল্ট বাক্সের মত, টাইটানিয়ামের তৈরি। বাইরে ষোলো ইঞ্চি সীসার দেয়াল। তার বাইরে আছে চার-পাঁচ ইঞ্চি সিরামিক সিলিকন। সব আবার ঘিরে রেখেছে একফুট চওড়া স্টিল রিএনফোর্সড কংক্রিট। এ ছাড়া, ব্যবহার করা হচ্ছে শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ড্যামপেনিং ফিল্ড।

আসলে আমাদেরকে কী থেকে বাঁচাতে চাইছেন, ব্রায়ান? জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ডিসচার্জ। বিচ্ছুরণ হচ্ছে গামা ও এক্স-রে। হাই-এনার্জি। ছিটকে বেরোলে বারোটা বাজিয়ে দেবে ইলেক্ট্রনিক ইকুইপমেন্টের। ক্ষতি হতে পারে মানব দেহের টিশুর।

চারপাশ দেখলেন ক্যালাগু। দেখে তো মনে হচ্ছে সবই ঠিকঠাক চলছে।

সতেরো ঘণ্টা চৌত্রিশ মিনিট পর পর নিয়মিতভাবে বিচ্ছুরণ হচ্ছে। সে সময়ে সব সিস্টেম বা ইকুইপমেন্ট বন্ধ রাখা হয়। ওই সময় পেরোলে নতুন করে আবারও চালু করা হয় সব। এসব যথেষ্ট সহজভাবেই করতে পারি আমরা। কিন্তু নভেম্বরের বাইশ তারিখে অন্য কিছু হলো।

নভেম্বরের বাইশ তারিখ, আউড়ালেন ক্যালাগু। কী যেন মনে পড়তে গিয়েও পড়ছে না।

ওই দিন সার্চ পার্টি নিয়ে বেরিয়েছিল রাশান ও চিনারা, বললেন ব্রায়ান। সেদিন গামা-রে বিচ্ছুরণ হয়েছিল বেরিং সি-র আর্কটিক সার্কেলে। কাজ থামিয়ে দিয়েছিল আমাদের চারটে জিপিএস স্যাটেলাইটের।

চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ক্যালাগু, হঠাৎ গভীর পানিতে পড়ে বুঝতে চাইছেন, কীভাবে উঠবেন তীরে। কিছুই তো বুঝছেন তিনি! একইসময়ে রাগ, কৌতূহল, দ্বিধা এল তাঁর মনে।

তাঁকে রক্ষা করলেন প্রেসিডেন্ট। ব্রায়ান, ওই একই দিনে হংকং থেকে মিতা দত্তকে তুলে আনার বিষয়ে তোমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। আলাপ হয় রাশান ও চিনাদের বিষয়ে। সার্চ পার্টি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাদের নেভি। অন্যরা না জানলেও এনআরআই পেয়েছিল একটা তথ্য: এনার্জির বিচ্ছুরণ হয়েছে ওই দুই দেশের তৈরি কোনও এনার্জি ওয়েপন থেকে। দুই দেশের কোনওটা সম্ভবত হারিয়ে বসে তাদের অস্ত্র।

তার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এই জিনিসের? রাগ নিয়ে ব্রায়ানের দিকে তাকালেনক্যালাগু।

আমি তা বলছি না, বললেন ব্রায়ান। কিন্তু ওই বিচ্ছুরণের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে এই জিনিসের।

জ্বলজ্বলে স্ফটিকের দিকে তাকালেন ক্যালাগু। সন্দেহ নিয়ে দেখলেন প্রেসিডেন্ট ও ব্রায়ানকে। বুঝতে চাইছেন, সত্যি কথা বলা হয়েছে কি না। আপনারা ওটা নিয়ে কোনও এক্সপেরিমেন্ট করছেন?

না, তা করছি না, বললেন, ব্রায়ান, ওই স্ফটিক আমরা তৈরি করিনি। খুঁজে পেয়েছি। এখন স্টাডি করছি। এখনও জানি না এ থেকে নতুন কী বেরোবে।

কী জানতে পারবেন ভাবছেন?

আগেই বলেছি, এটা এমন কোনও উপায়ে শক্তি তৈরি করছে, যেটা আমরা বুঝি না। ভেঙে দিয়েছে ফিযিক্সের প্রথম সূত্র।

আমি এনআরআই-এর বিজ্ঞানী নই, ব্রায়ান। তবে উজবুকও নই। সব সহজ করে বুঝিয়ে বলুন।

এ ধরনের ঝামেলায় পড়বেন বলেই সিআইএকে এসবে জড়ানো হোক, তা চাননি ব্রায়ান। এনআরআই প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞান সংস্থা, এর একটা কাজ অন্য দেশের আবিষ্কার হাতিয়ে আনা। এদিকে সিআইএর কাজ ক্ষমতা বদল করা এবং রাজনৈতিক জ্ঞান সংগ্রহ করা। এরা হুমকি দেয়: তোমরা এটা করলে, আমরা ওটা করব। চাইলেও, সিআইএ বা ক্যালাগুকে সহজে কিছু বোঝাতে পারবেন না ব্রায়ান। তবুও চেষ্টা করতে হবে। নরম সুরে বললেন তিনি, ফিযিক্সের প্রথম সূত্রের কথা ভাবুন। আমরা কিছুই তৈরি করি না বা নষ্ট করতে পারি না। ধরুন, আপনি চালু করলেন আপনার গাড়ি। তাতে পুড়তে লাগল তেল। ওটা জ্বলছে বলে তৈরি হলো তাপ। ওই তাপ আবার সৃষ্টি করল প্রসারিত গ্যাস। ওই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে বলেই নড়তে লাগল পিস্টন। এত শক্তি এসেছে পেট্রোলিয়াম থেকে। ওই কেমিকেল ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। কী থেকে হয়েছে? লাখে লাখে মৃত ডাইনোসরের দেহ থেকে। নইলে পেতেন না ক্রুড অয়েল।

ক্যালাগু বুঝলেন কি না, তা জানতে গিয়ে থেমে গেলেন ব্রায়ান। কয়েক সেকেণ্ড পর বললেন, আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন বলে বিচ্ছুরণ হচ্ছে এনার্জির। নিজে কিছুই তৈরি করছেন না। ওই একই কাজ করে নিউক্লিয়ার প্লান্ট, অবশ্য সেটা করে অন্য উপায়ে, ভাঙতে থাকে অ্যাটম। ওটা পেট্রোলিয়ামের কেমিকেলের বন্ধনের মতই। বেরিয়ে আসে জমে থাকা প্রচণ্ড নিউক্লিয়ার শক্তি বা এনার্জি। এই দুই ক্ষেত্রে কিন্তু আগে থেকেই ছিল শক্তি, আমরা শুধু জেনে নিয়েছি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে।

স্ফটিকের দিকে আঙুল তুললেন ব্রায়ান। কিন্তু ওই পাথর একেবারেই অন্যরকম। আমাদের জানা কোনও উপায়ে ওটা তৈরি করছে না শক্তি। কখনও কখনও ওটা থেকে বেরোচ্ছে বিপুল পরিমাণের এনার্জি। আমরা শুধু আঁচ করছি, যেভাবেই হোক কোয়ান্টাম কোনও কারণে শক্তি তৈরি করছে ওটা, বা অন্য কোথাও থেকে নিয়ে আসছে শক্তি।

ব্রায়ান থেমে যাওয়ার পর কেমন অসহায় চোখে তাঁকে দেখলেন ক্যালাগু। ও, বুঝলাম। শক্তি তৈরি করে। এমন এক পাথর, যেটা এনার্জি দিচ্ছে। খুবই ভাল, তো ব্যবহার করুন গ্রিড-এ, কয়লার প্লান্ট বাতিল করে বন্ধ করুন গ্লোবাল ওঅর্মিং।…কিন্তু আমি এসব জানতে চাইনি। জানতে চাইছি, কী কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই পাথর। সাধারণ কেউ ওটার ব্যাপারে কিছু জানল না কেন? বা কী কারণে এখন জানাচ্ছেন আমাদেরকে?

প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন ব্রায়ান।

আস্তে করে মাথা দোলালেন প্রেসিডেন্ট। সময় হয়েছে সব খুলে বলার।

প্রাকৃতিক কোনও পদার্থ নয় এই স্ফটিক, বললেন ব্রায়ান। নিরেট পাথর নয়। এক ধরনের মেশিন। অতীতে কখনও তৈরি করেছে মানুষ।

নাকের কাছে কালাকুত্তার গু দেখেছেন এমন ভঙ্গিতে নাক বাঁকা করে ফেললেন ক্যালাগু। বলতে চাইছেন হাজার হাজার বছর আগে তৈরি করেছে মানুষ ওই জিনিস?

প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন যেসব মায়ান গ্রিফ পান, ওগুলো থেকে তা-ই জেনেছেন, বললেন ব্রায়ান। মাত্র সামান্য কিছু বোঝা গেছে, অনেক কিছুই আমরা জানতে পারিনি। আসলে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি বললেও ভুল হবে না।

বিরক্ত হয়ে তার দিকে চেয়ে আছেন ক্যালাগু।

ব্যাখ্যার দায়িত্ব নিলেন প্রেসিডেন্ট। এনআরআই ভাবছে, ওই পাথর বা স্ফটিক তৈরি করা হয়েছে হাজার হাজার বছর আগে। ওটা তৈরি করেছিল অন্য কোনও সভ্যতা। হয়তো আমাদের সভ্যতার চেয়েও অনেক আধুনিক ছিল তারা।

প্রেসিডেন্টের দিকে না চেয়ে ব্রায়ানকে বললেন ক্যালাগু, তা হলে এই জিনিস মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে?

পারে, বললেন ব্রায়ান, ডক্টর হ্যারিসন ব্রাযিলে পাওয়া হায়ারোগ্লিফ পড়ে যে ডেটা পেয়েছেন, তাতে পৃথিবীতে আছে এমন আরও তিনটে স্ফটিক বা পাথর।

আরও তিনটে?

হ্যাঁ। দুটো মধ্য আমেরিকায়। একটা ইউরোশিয়ান প্লেইন-এ। সম্ভবত মধ্য রাশায়।

আমরা কি এ কথা রাশাকে জানিয়েছি? প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন ক্যালাগু।

মাথা নাড়লেন প্রেসিডেন্ট।

আচ্ছা, বললেন ক্যালাগু। এই পাথরের মত কিছু কী খুঁজছে এফএসবি?

জানি না, বললেন ব্রায়ান, ওই পাথর খুঁজতে গিয়ে ওদেরকে সতর্ক করতে চাইনি আমরা।

গুড, খুশি হলেন ক্যালাগু। কিন্তু পরক্ষণে আবারও হামলে পড়লেন, ধরে নিন আপনার কথা বিশ্বাস করলাম, কিন্তু তাতে এ পাথরের ব্যাপারে জরুরি কিছুই তো জানা গেল না। সেক্ষেত্রে কী বুঝব?

আমরা ঠিক জানি না, তবে একটা ব্যাপার আন্দাজ করছি, হাজার হাজার বছর আগের ওই পরিবেশ এখনকার মত সহজ ছিল না। তখন অনেক বেশি পরিমাণে ছিল রেডিয়োঅ্যাকটিভ পদার্থ, আকাশ থেকে পড়ত অ্যাসিড বৃষ্টি। তার সঙ্গে থাকত কার্বন ও সালফার।

তো এই পাথর এমন কিছু করেছে, যে কারণে হ্রাস পেয়েছে ওসব ক্ষতিকর পদার্থ?

এটা অযৌক্তিক নয়, বললেন ব্রায়ান।

এই পাথর এত গুরুত্বপূর্ণ হলে, আজ হঠাৎ কী মনে করে সব খুলে বলছেন?

প্রেসিডেন্টের দিকে তাকালেন ব্রায়ান। কারণ, আমি চাই এনআরআই এবং সিআইএ মিলেমিশে এ বিষয়ে কাজ করুক, বললেন প্রেসিডেন্ট, আপনারা কাজে লাগাবেন আপনাদের সেরা লোকজন।

এর ভেতরে সিআইএকে জড়িয়ে নেয়া কেন, স্যর? জানতে চাইলেন ক্যালাগু।

জবাবটা এবার দিলেন ব্রায়ান, কারণ স্ফটিক তৈরি করছে স্রোতের মত বিপুল এনার্জি। আমরা এখনও জানি না, ওই ভয়ঙ্কর শক্তি কী করবে। কমপিউটার সঠিক হলে ওটা চরম পর্যায়ে যাবে এবছরই ডিসেম্বরের বাইশ তারিখে।

.

১৭.

মালবাহী পুরনো জাহাজের ডেক থেকে হংকং শহর পিছিয়ে পড়তে দেখছে মিতা দত্ত। পাশেই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে পাবলো। একটু দূরে রানা, হাতে স্যাটেলাইট ফোন।

ক্যাপ্টেনকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে নিজেদের জন্যে কেবিনের ব্যবস্থা করেছে রানা। ভোর হতে না হতেই রওনা হয়েছে এই জাহাজ। ছোট সব ইঞ্জিনের পার্ট দিয়ে ভরা পেট। দক্ষিণ-পুবে গিয়ে সব উগরে দেবে ম্যানিলা বন্দরে।

আরও হাজার মাইল দূরে মিতার বাড়ি। কিন্তু ঠিক করেছে, আপাতত ফিরবে না ইউনাইটেড স্টেট অভ আমেরিকায়।

রানার সঙ্গে কথা হয়েছে ওর।

প্রায় রাজিও হয়েছে রানা।

প্রথম সুযোগেই মিতা চলেছে দক্ষিণ আমেরিকায়।

হংকং ছেড়ে আমরা বেরিয়ে এসেছি, ওদিক থেকে ফোন কল রিসিভ হতেই জানাল রানা।

ল্যাং-এর টাওয়ারে বিস্ফোরণ হওয়ায় দুশ্চিন্তায় ছিলাম, বললেন এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ান। চিনের প্রতিটি টিভি চ্যানেলে এসেছে ওই নিউয। মারা গেছে কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড, তাদের হাতে খতম হয়েছে একদল টেরোরিস্ট। আপনি মিতাকে নিয়ে ডুব দিলে, মনে হচ্ছিল খুব খারাপ কিছু হয়েছে।

সত্যিই ডুব দিতে হয়েছে নদীর মাঝে, বলল রানা। ওর মনে পড়ল হাঁটু কেটে ফেলা লোকটার কথা। মারা গেছে দুএকজন। কিন্তু তারা টেরোরিস্ট ছিল না। মিতা এখন চাইছে দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে প্রফেসর জর্জ হ্যারিসনকে খুঁজে বের করতে।

আপনি কি ওর পাশে থাকবেন? অনুরোধের সুরে জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

ওকে বলেছি, ভেবে দেখব।

খুব ভাল হয় ওকে একা ছেড়ে না দিলে, বললেন ব্রায়ান।

অফিস থেকে জরুরি কোনও কাজ না এলে থাকছি ওর পাশে।

মিতা কিডন্যাপ হওয়ার পর যোগাযোগ করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন, বললেন ব্রায়ান। বলেছিলেন, তিনি আহত। তবে গুরুতর কিছু নয়। তারপর থেকে কোনও খবর নেই। বিশাল দেশ মেক্সিকো। লোক পাঠিয়েও তার কোনও খোঁজ পাইনি।

মিতার কাছে শুনেছি, সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই প্রাণের ভয়ে পালাবেন প্রফেসর, বলল রানা। ল্যাং-এর লোক তাকে ধরে নিয়ে যায়নি তো?

মনে হয় না, বললেন ব্রায়ান, আমাদের ডেটা অনুযায়ী পুরো ইউক্যাটান জুড়ে তল্লাসী করছে বিলিয়নেয়ারের লোক। এমন কোনও তথ্য পাইনি যে ধরা পড়েছেন প্রফেসর। বুদ্ধি খাঁটিয়ে লুকিয়ে পড়েছেন উনি। এখন তাকে খুঁজে বের করা জরুরি। আপনার বা মিতার কথা শুনবেন তিনি।

প্রফেসরের কথা মনে আছে রানার। সৎ মানুষ। তবে একবার মগজে কিছু ঢুকলে সেটা বেরোয় না। কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছেন। তবে নিজের কাজ শেষ না করে কোনওভাবেই ফিরবেন না দেশে।

এখন আপনার সঙ্গেই আছে মিতা? জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

একটু দূরেই পাবলোর কাঁধে হাত রেখে তীরের দিকে চেয়ে আছে মিতা। কেউ দেখছে টের পেয়ে ঘুরে তাকাল। চোখে রানার প্রতি শ্রদ্ধা, সেই সঙ্গে আরও কী যেন অচেনা কিছু।

রানা ঠিক বুঝল না, তবে ওর মন বলল, মস্তবড় কিছু। হারিয়ে বসেছে মেয়েটা, তাই এত কষ্ট ওর চোখে।

হ্যাঁ, কাছেই আছে, কথা বলবেন? বলল রানা।

আশপাশের পরিস্থিতি কেমন বুঝছেন?

কর্তৃপক্ষ বা শত্রুপক্ষ টের পায়নি আমরা ছেড়ে এসেছি হংকং। তবে অন্য ঝামেলা হয়েছে।  

একটু খুলে বলুন। দেখি দূর করতে পারি কি না।

সমস্যার নাম ইগোর দিমিতভ। একজন রাশান। নামটা আগে শুনেছেন?

ইগোর দিমিতভ? বললেন ব্রায়ান, পড়েছি ওর ফাইল। এফএসবির প্রডেজি। তরুণ বয়সেই নাম করে। তারপর অবসর নিলেও তাকে প্রয়োজনে ডাকতে থাকে ওরা। এতদিনে যত টাকা রোজগার করেছে, ওর তো অবসর নেয়ার কথা। আপনাদের এসবের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

অবসর নেয়নি, বলল রানা। আপনার কন্ট্যাক্টকে ঘুষ দিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে গেছিল।

তারপর? বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন ব্রায়ান।

রাশান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কিছু চুরি করে ল্যাং, ওটা ফেরত নেয়ার চেষ্টা করছে।

জিনিসটা কী?

জিনিস নয়, এক ছেলে। বয়স পাঁচ বছর। নাম পাবলো।

ওকে নিয়ে কী করবে?

ইগোর দিমিতভের কাছ থেকে যা শুনেছে রানা, সংক্ষেপে বলল। এবার জানাল, ছেলেটা অনেকটা অটিস্টিক টাইপের। তবে ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বোধহয় কাজ করে এনার্জি ফিল্ড, ইলেকট্রিসিটি ও ম্যাগনেটিযমের বিষয়ে।

তাই? বললেন ব্রায়ান, সেক্ষেত্রে ব্রাযিলে আপনাদের আবিষ্কার করা ওই স্ফটিকের সঙ্গে ওর কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে।

ছেলেটার ওপর চোখ পড়েছে ল্যাং-এর। ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক বিষয়ে হয়তো ওর ওপর এক্সপেরিমেন্ট করতে চাইছে।

তাই? বললেন ব্রায়ান, অনেক দিন ধরেই সাইকিক বা অলোকদৃষ্টির ব্যাপারে পরীক্ষা চালাচ্ছে রাশানরা। অবাক হচ্ছি না, ওই ছেলের ওপর এক্সপেরিমেন্ট করেছে ওরা। আজ পর্যন্ত কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু ইগোর দিমিতভ যেহেতু এসবে জড়িত, ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিতে হবে।

সব কথা না জানিয়ে আমার সঙ্গে চুক্তি করেছিল ইগোর দিমিতভ, কাজেই ওই চুক্তি ভেঙেছি, বলল রানা। আমার ভুল না হয়ে থাকলে, উন্মাদের মত আমাদেরকে খুঁজছে ও এখন।

মিস্টার রানা, খুব গর্বিত লোক সে, বললেন ব্রায়ান। এফএসবি মানা করে দিলেও ধরে নিন, জান থাকতে আপনার পিছু ছাড়বে না সে।

চুপ করে আছে রানা।

আমি চেষ্টা করব ওকে অন্য পথে সরিয়ে দিতে, জানালেন ব্রায়ান। ফলে বাড়তি সময় পাবেন। একটু চুপ করে থেকে তারপর বললেন তিনি, এবার কী করবেন, মিস্টার রানা?

কয়েক দিনের ভেতর পৌঁছুব ম্যানিলা।

গুড। আপনাদের আবিষ্কৃত ব্রাযিল স্টোন নিয়ে আমিও আছি বিপদে, বললেন ব্রায়ান, প্রেসিডেন্ট চাইছেন, আমরা যেন সিআইএর সঙ্গে মিলে গবেষণা করি।

তাই করুন, বলল রানা। অসুবিধে কী?

ওরা ওয়াশিংটনে আমাদের কমপ্লেক্স থেকে ওটাকে সরাতে চাইছে নেভাডায়, বললেন ব্রায়ান। আপনাকে আমার এসব বলার কথা নয়। বলছি, কারণ আপনিই আবিষ্কার করেছিলেন ওটা। ইয়াকা মাউন্টেনে একটা ল্যাবরেটরিতে রাখা হবে ওটা। ওখানেই ফেলার কথা ছিল সব নিউক্লিয়ার বর্জ্য।

রানা জানতে চাইল, এখনও এনার্জি বেরোচ্ছে ওই স্ফটিক থেকে?

বিপদ হতে পারে আমাদের কন্টেইনমেন্ট এরিয়ায়, তাই ভয় পেয়েছেন সিআইএ চিফ যখন-তখন বিস্ফোরিত হবে ব্রাযিল স্টোন বা ওটার কারণে অন্যকিছু। সুপার কমপিউটার থেকে জানা গেছে, ডিসেম্বরের বাইশ তারিখে প্রচণ্ড শক্তি বিচ্ছুরণ করবে ওটা। জর্জ হ্যারিসন বলেছিলেন, ওটার মত আরও তিনটে স্ফটিক আছে কোথাও। জরুরি কোনও কাজ করে ওগুলো।

কবে আপনাদের স্ফটিক সরিয়ে নেবেন? জানতে চাইল রানা।

এই সপ্তাহের শেষ দিকে। এর ভেতর যদি বুঝতে না পারি আসলে কী ওটা, হয়তো ধ্বংস করে দিতে হবে। আমাদের ওপর চাপ তৈরি করছে সিআইএ চিফ মার্ল ক্যালাগু।

সিআইএ চিফ চাপ সৃষ্টি করছে শুনে রানা ভাবল, ওই হারামি লোক অন্যের ক্ষতি করতে পারলে খুব খুশি হয়।

ক্যালাগু হয়তো এনআরআই-এর কাছ থেকে আদায় করে নেবে স্ফটিক, ওটা ধ্বংস না করে ব্যবহার করবে অস্ত্র তৈরিতে, বললেন ব্রায়ান, তাতে খুব খুশি হবে আমেরিকান আর্মি। আবার অন্য কিছুও করতে পারে। একবছর ধরে আরও বাড়ছে ব্রাযিল স্টোনের শক্তি। কে জানে, সত্যিই হয়তো ওটা ভয়ঙ্কর কোনও অস্ত্রই!

হয়তো গ্লিফ পড়ে এ বিষয়ে আরও অনেক কিছুই জানাতে পারবেন প্রফেসর জর্জ হ্যারিসন, বলল রানা। আগে দরকার তাকে খুঁজে বের করা।

কিন্তু আমাদের জানা নেই, কোথায় আছেন তিনি। …এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, ওই ছেলের ব্যাপারে কী করবেন? মনে করি না এ দেশে ওকে আনা উচিত। আর্মি বা সিআইএ ওকে পেলে কী করবে বলা মুশকিল। নিজেরা কাজে লাগাতে না পারলে সোজা ফেরত দেয়া হবে রাশান কর্তৃপক্ষের কাছে।

আমিও এটা নিয়ে ভেবেছি, বলল রানা। আপাতত থাকুক মিতার কাছে। ভাল খাতির হয়েছে ওদের। অন্য কোনও সমস্যা না এলে, আমরা তিনজনই যাচ্ছি ঘুরতে। ঠিক করেছে, মিতার কাছ থেকে জরুরি আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করবে।

কোথায় যাবেন? জানতে চাইলেন এনআরআই চিফ।

মেক্সিকোর ক্যামপেচেতে, বলল রানা, ওখান থেকেই খুঁজতে শুরু করব প্রফেসরকে।

এনআরআই চিফ জেমস ব্রায়ানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্যান্টের পকেটে স্যাটেলাইট ফোন রাখল রানা। মিতার সামনে গিয়ে থামল।

ওর চোখের দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা, কৌতূহলী। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, পাবলোকে উড়তে শেখাচ্ছি। পেলব দুহাত দুদিকে মেলে দিয়েছে ও।

ওকে অনুকরণ করছে ছেলেটা।

আদর করে পাবলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল রানা। ইউক্যাটানের কোথাও লুকিয়ে পড়েছেন প্রফেসর হ্যারিসন। যোগাযোগ করছেন না কারও সঙ্গে।

আমি যাব তাঁকে খুঁজতে, দৃঢ় স্বরে বলল মিতা। পাশে কি পাব তোমাকে?

তিনি বিপদে আছেন, আর সেজন্যে নিজেকে দায়ী ভাবছ তুমি, বলল রানা।

আস্তে করে মাথা দোলাল মিতা। যে দায়িত্ব নিয়েছি, সেটা পালন করতে পারিনি। উচিত ছিল না দায়িত্ব নেয়া। আমি তো আর মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ায় তোমার মত দক্ষ নই।

আবারও মেক্সিকোতে গেলে হয়তো পড়বে আরও বড় বিপদে, বলল রানা।

জানি। সাগরের দূরে তাকাল মিতা।

এনআরআই চিফের সঙ্গে কথা হয়েছে। কাঁধ ঝাঁকাল রানা। আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।

মধুর চেয়েও মিষ্টি এক টুকরো হাসি ফুটল মিতার লোভনীয় ঠোঁটে। থ্যাঙ্কস!

দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।

পাবলো, আমরা বেড়াতে যাব, মজা হবে না? ছেলেটার কাঁধে আলতো চাপড় দিল মিতা।

জবাব দিল না পিচ্চি। একবার মিতাকে আবার রানাকে, দেখছে। মনোযোগ পেয়ে খুশি।

মুখে স্বীকার করবে না মিতা, কিন্তু যাকে সবসময় চেয়েছে পাশে, আচমকা পেয়ে গেছে সেই দেবতাকে!

রানা তাকাতেই রক্তিম হলো ওর ফর্সা দুই কপোল।

.

১৮.

 রঙচটা, পোভড়া দোতলা বাড়ি ছেড়ে বেরোলেন প্রফেসর হ্যারিসন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পৌঁছুলেন জেলে গ্রাম পুয়ের্তো আযুলের বুলেভার্ড-এ। যে বাড়িতে উঠেছেন, ওটা হোটেল বা মোটেল নয়। এ কারণেই বেছে নিয়েছেন। সদর দরজা ছাড়া অন্য কোনও গেট নেই। খাড়া সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলে বারান্দার একপাশে পাঁচটা ঘর ও অ্যাটাচড় বাথরুম। তার মনে হয়েছে, ওখানে ঢুকে চট্ করে তাঁকে কিডন্যাপ করতে পারবে না কেউ।

আরও একটি কারণ: প্রিয় স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে এসে ওই বাড়িতেই উঠেছিলেন। একটু দূরেই ছিল তাঁর খননের সাইট।

চিয়াপাস গ্রামে পড়ে থাকার সময় হ্যারিসনের মনে হয়েছে, আবারও ফিরে এসেছেন তাঁর স্ত্রী। তাঁকে আড়াল করে রেখেছেন, সাহায্য করছেন, বিপদ হলে আগেই জানিয়ে দেবেন।

গত কয়েক দিন বারবার দেখেছেন স্বপ্ন। সব ছিল সিনেমার মত। কোনওটা আনন্দের, কোনওটা প্রায় দুঃস্বপ্নের। আজকাল সবার সামনেই আলাপ করছেন অদৃশ্য স্ত্রীর সঙ্গে, তাতে মন্দ লাগছে না তাঁর।

অসুখ রয়ে গেছে, দূর হয়নি ইনফেকশন; তবে দুষ্ট ওঝার খপ্পরে পড়ে চুড়ান্ত ভুগে যাই-যাই অবস্থা, এমনসময় পাহাড়ি গ্রামে তরুণ গাইড পিকো আনল এক বোতল অ্যান্টিবায়োটিক। ওটা খেয়ে একটু সুস্থ হলেন। হাঁটার শক্তি ফিরতেই, তিন দিন হলো বদমাশ ওঝাকে লুকিয়ে ভেগে এসেছেন।

প্রথমে ভেবে পাননি, কোথায় যাবেন। পরে মনে হলো, যারা হামলা করেছে, তারা ধরে নিয়েছে মারা গেছেন তিনি। নইলে আর রক্ষা ছিল না। তখনই ভাবলেন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা অনুচিত। মিতার কাছ থেকে সব শুনতেন এনআরআই চিফ, হয়তো তার অফিস থেকেই সব তথ্য পেয়েছে শত্রুরা। কাজেই, কাউকে জানানো যাবে না যে তিনি বেঁচে আছেন।

যেখানে উঠেছিলেন মিতা ও তিনি, ভুলেও সেখানে যাননি। প্রাণরক্ষা প্রথম কাজ, হোটেলে থাক দামি, দরকারী মালপত্র। চলে এলেন উত্তরদিকে ইউক্যাটান উপকূলে ক্যানকুন থেকে আশি মাইল দূরে। এ গ্রামেই আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে স্ত্রীসহ উঠেছিলেন পুরনো ওই বোর্ডিং হাউসে।

গত কয়েক দিনে বড় হয়েছে দাড়ি, চট করে কেউ চিনবে না তাঁকে। প্রতিদিন গ্রামটা ঘুরে দেখতে আসে শদুয়েক টুরিস্ট। কাজেই সহজে তাঁকে খুঁজে পাবে না শত্রুরা। উপকূলীয় এই এলাকায় রয়েছে অজস্র মায়ান সাইট। মিতা ও তিনি ধারণা করেছিলেন, এদিকেই কোথাও আছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী পরের স্ফটিক।

বুলেভার্ড ছেড়ে ধুলোময় পথে চললেন প্রফেসর হ্যারিসন। প্রতিদিন একই রুটিন তাঁর। এমনিতেই চুল-দাড়ি সব ধূসর, তার ওপর হাতে মোটা লাঠি, অন্যহাতে কালো নোটবুক- এসব দেখে আজকেও হৈ-হৈ করে উঠল গ্রামের ছেলেরা: মোযেস নিগ্রো! ওই যায় কুচকুচে কালো মুসা নবী!

নিজেকেও তেমনই মনে হয় প্রফেসরের। এনআরআইকে পথ দেখাচ্ছেন। ওই স্ফটিক খুঁজতে গিয়ে ইহুদি জাতির মত চল্লিশ বছর পার করতে হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

ব্রাযিলের জঙ্গলে ও মেক্সিকোর দ্বীপে যেসব গ্লিফ পেয়েছেন, তা থেকে জানতে পেরেছেন বহু কিছুই। এ ছাড়া, সাহায্য করেছে দুর্গম, পাহাড়ি গ্রামের মানুষগুলোর ফিসফিস করে বলা কথা, স্যাটেলাইট ইমেজারি ও ইনফ্রারেড এরিয়াল ফোটোগ্রাফি।

আগ্নেয় দ্বীপে স্ফটিক বিষয়ে সূত্র পাবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু সেসময়ে হামলা করল শত্রুরা। কোনওমতে পাথরের গ্লিফের ছাপ লিনেন শার্টে তুলেই পালাতে হয়েছে। শার্টটা থেকে উদ্ধার করেছেন কিছু তথ্য। ওই দ্বীপের পাথরে লেখা ছিল: আহাউ বালামের মাধ্যমে শুরু আত্মার পথ। বর্শার ডগা গেছে বিশাল ওই শহরের যোদ্ধার মন্দিরে। ওখানেই হবে আত্মা বলিদান। তারপর যেতে হবে দেবতার ঝলমলে পথে, ত্যাগ করতে হবে দেহ। আর তখনই জাগুয়ারের ঢালের সাহায্য পেয়ে পৌঁছুবে স্বর্গে।

এসবের মানে জানেন না হ্যারিসন। দ্বীপের ওই রাজার কোনও ঢাল বা বর্শা ছিল না। শত শত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই দেখেননি। লেখা ছিল: ওই পথে যাও অন্যসব পথে, তারপর যাও তৃতীয় পথে।

প্রফেসর বুঝেছেন, এসব কোনও কাজে আসবে না। দরকার আরও তথ্য। সৈকতে যাওয়ার সময় মাঝপথে পেয়ে গেলেন ছোট এক ইন্টারনেট ক্যাফে। পয়সা দেয়ার পর নড়বড়ে চেয়ারে বসে লগ ইন করলেন। ট্যাপ করতে চাইলেন তাঁর ইউনিভার্সিটির মেইনফ্রেম কমপিউটার। ওটাতে আছে ইউক্যাটানের স্যাটেলাইট সার্ভের ডেটা। কানেকশন হওয়ার সময় ভাবলেন, চোখ রাখেনি তো শত্রুরা তার অ্যাকাউন্টে? সেক্ষেত্রে তারা জেনে যাবে, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন মেক্সিকোতে।

হ্যারিসন ভাবলেন, কেমন হয় বাসে চেপে অন্য শহরে গিয়ে কোনও ইন্টারনেট ক্যাফে থেকে ইউনিভার্সিটির কমপিউটার ট্যাপ করলে? কিন্তু কাজটা কঠিন। রাতে বারবার লাগে শীত, আবার একটু পর ঘেমে ওঠেন গরুমে। গুলির ইনফেকশনের কারণে বড্ড ক্লান্ত তিনি।

সাবধানে নিজের পাসওঅর্ড লেখার পর এন্টার টিপে দিলেন প্রফেসর। একটু পর স্ক্রিনে দেখলেন এদিকের এলাকার বড় ছোট সব মায়ান সাইট। বেশিরভাগ ধ্বংসাবশেষে গিজগিজ করছে টুরিস্ট। এসব সাইট দিয়ে চলবে না তাঁর। অনেক পুরনো হবে স্ফটিকের মন্দির। এত দিনে গভীর জঙ্গল ঘিরে ফেলেছে ওটাকে।

মনোযোগ দিয়ে ইনফ্রারেড ইমেজ দেখতে লাগলেন তিনি। জঙ্গলের নানান ধরনের তাপ অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে ছবি। এ এলাকার নিচের দিকের জমির তাপ খেয়াল করতে গিয়ে নতুন করে মনে আশা জন্মাল তাঁর।

কিন্তু একটু পর আবারও হতাশ হয়ে গেলেন।

ইউক্যাটানে রয়েছে অনাবিষ্কৃত হাজারো মায়ান ধ্বংসাবশেষ। এ গ্রামের বিশ মাইলের ভেতর রয়েছে অন্তত এক ডজন। কোন সাইট দিয়ে কাজ শুরু করবেন তিনি?

হঠাৎ ভীষণ চমকে গেলেন প্রফেসর।

ঠাস করে পড়েছে পেছনের চেয়ারটা।

সরি! বলে উঠল এক কাস্টোমার।

হামলার ভয়ে বুক ধড়াস ধড়াস্ করছে হ্যারিসনের। ঘুরে তাকালেন লোকটার দিকে।

শেয়ালের চোয়ালের মত ভাঙা চোয়াল যুবকের। মাথা ভরা বাদামি চুল। চেয়ার তুলে ওটাতে বসে পড়ল সে।

হঠাৎ প্রফেসরের মনে হলো, তিনি আছেন মস্ত বিপদে। কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে কমপিউটার লগ অফ করে বেরিয়ে এলেন বাইরে। পাশের দোকানের মালিক তীক্ষ্ণ চোখে দেখল তাঁকে।

তাতে খুব অস্বস্তি লাগল। এরা কি চোখ রেখেছে তার ওপর?

ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া সব টুরিস্ট।

না, এরা শক্ত হতে পারে না।

আমাকে সাহায্য করো, হান্না, বিড়বিড় করলেন তিনি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!

জবাব দিল না কেউ।

ভীষণ একা লাগল তাঁর।

নিরাপত্তা চাইলে ফিরতে হবে নিজের ঘরে।

তাই করলেন তিনি। ফিরলেন ওই বাড়িতে। দোতলার ঘরে ঢুকে ধপ করে বসলেন চেয়ারে। প্রিন্টআউট ও ডেটা রাখলেন টেবিলে। ভাবছেন, এসব তথ্য পেলে খুব খুশি হবে শক্ররা। নতুন কিছু পেলেই তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেবে। তখন মেরেও ফেলতে পারে তাকে।

ঠিক করলেন, এখন থেকে কোনও নোট রাখবেন না। সবই জমিয়ে রাখবেন নিজের মগজে। কিন্তু তা খুব কঠিন কাজ।

না, অন্য কিছু করতে হবে। সহজ উপায় আছে। চকবোর্ড কিনবেন তিনি। চক দিয়ে লিখবেন ডেটা। কাজ শেষ হলে ভেজা রুমাল দিয়ে মুছে ফেলবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রায় ঘুমন্ত এই গ্রামে কোথায় পাবেন তিনি চকবোর্ড?

না, পাবেন না।

খুব অসহায় বোধ করলেন হ্যারিসন। জানালাপথে চোখ গেল দূরে। ওই যে, সাগরে চলছে ভাটা। সরু রাস্তা মিশেছে। মসৃণভাবে লেপে থাকা রুপোলি বালির সৈকতে। মন চাইলে যা খুশি লিখতে বা আঁকতে পারেন।

একবার মাথা দোলালেন প্রফেসর হ্যারিসন।

 পেয়ে গেছেন তিনি মস্ত এক চকবোর্ড!

খুশিমনে আবারও সব গুছিয়ে নিয়ে নেমে এলেন। সৈকতের দিকে হাঁটতে শুরু করে বিড়বিড় করলেন, তুমিই কি পথ দেখালে, হান্না? ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না!

সৈকতে লুটিয়ে পড়ছে মেক্সিকো উপসাগরের ঢেউ, তার পাঁচ ফুট আগে থামলেন। ভেজা বালি বেশ জমাট।

একবার চারপাশ দেখলেন প্রফেসর।

কেউ নেই।

বহু রাত ঘুমুতে পারেননি। মনে এসেছে নানান থিয়োরি। বসলেন ভেজা বালিতে, তর্জনী ব্যবহার করে লিখতে লাগলেন দরকারী সব তথ্য।

আগ্নেয় দ্বীপের মূর্তির মত আরও কিছু মূর্তি দেখেছেন। ওগুলোতেও ছিল প্রায় একই তথ্য। তথ্যের পাশে মানচিত্রের মত করে আঁকতে লাগলেন গুরুত্বপূর্ণ মায়ান মন্দির। ওগুলো থেকে সোজা সামনে বাড়বে বর্শা। ওটাই দেখিয়ে দেবে যোদ্ধার মন্দির। ছোট নুড়িপাথর হলো ছোট মন্দির, বালির ঢিবি হলো বড় মন্দির।

নিজের কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি।

পেরিয়ে গেল কয়েক ঘণ্টা।

বারবার পরিবর্তন করলেন নানান সাইট।

পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হাসিহাসি চোখে তাঁকে দেখল টুরিস্টরা, পাত্তা দিলেন না তিনি।

ওরা ভাবুক না, তিনি আসলে পাগল! কী যায়-আসে?

বুঝতে চাইলেন কোন্ ধ্বংসাবশেষ হিসেবের ভেতর রাখবেন, আর কোন্‌গুলো বাদ দেবেন।

আরও অনেকক্ষণ পর তৃতীয়বারের মত আঁকলেন বর্শা। এবার ওই রেখা গেছে উত্তরদিকে।

কিন্তু ওদিকে বড় কোনও মায়ান সাইট নেই!

নতুন করে বর্শা এঁকে দেখলেন, উপকূলের ঘন জঙ্গল।

হতাশ হলেন হ্যারিসন। হাতের চেটো দিয়ে সরাতে চাইলেন ভুরুর ওপর থেকে ঘাম। ফলে বালিতে মেখে গেল তার পুরো কপাল। মন খারাপ করে ঢালু সৈকত থেকে চোখ রাখলেন সাগরে।

প্রায় বিকেল, রোদ উষ্ণ করে তুলেছে বালি।

মৃদু ঢেউ সৈকত থেকে আবারও ফিরছে উপসাগরে।

ডক থেকে প্রচণ্ড শব্দে দূরে গেল স্পিডবোট। ফেনাভরা বড় ঢেউ এসে মুছে দিল তার আঁকা বর্শার সামনের অংশ। ঘুরপাক খেল পানি। আবারও ফিরল উপসাগরে।

মুছে দিতে চায় চকবোর্ড, বিড়বিড় করলেন প্রফেসর। তা হলে কি আবারও নতুন করে আঁকতে হবে সব?

উঠে দাঁড়ালেন। চোখ পড়ল তার তৈরি মানচিত্রে।

মন্দির বা অন্যসব সাইট না মুছে বর্শার ডগা গায়েব করে দিয়েছে ঢেউ। হঠাৎ প্রফেসরের মনে পড়ল একটা তথ্য। চট করে দেখলেন নিজের প্রিন্টআউট।

আজ থেকে হাজার বছর আগে নিচু ছিল সাগর!

তখন তৈরি হয়েছে ওই মন্দির!

 তার তৈরি বর্শা এখন সোজা দেখাচ্ছে এই উপসাগর!

নিশ্চয়ই অজস্র ঢেউয়ের নিচে রয়েছে যোদ্ধার মন্দির?

হান্না, ডার্লিং? বিড়বিড় করলেন তিনি, অনেক ধন্যবাদ!

.

১৯.

গভীর রাত।

প্রশান্ত মহাসাগরের সাঁইত্রিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে মেঘভরা আকাশ চিরে ছুটে চলেছে এয়ারবাস এ-থ্রিএইটি বিমান।

ল্যাং-এর ব্যক্তিগত কমিউনিকেশন সুইটে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাং লাউ। দেয়াল ঘেঁষে এক সারি ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট, রেডিয়ো ও স্যাটেলাইট ট্র্যান্সিভার। অপরিসর ককপিটের কথা মনে পড়ল লাউয়ের। ওখানে জানালা আছে। এখানে সেসবও নেই।

অবশ্য, জানালা থাকলেই বা কী হতো?

 কিছুই দেখার নেই আঁধারে।

লাউয়ের হাতে একটা প্রিন্টআউট দিল রেডিয়ো অফিসার। একটু আগে ডিক্রিপ্ট করেছে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিশন।

কাগজে চোখ বুলিয়ে খুশি হয়ে উঠল লাউ। বিমানের মাঝের সরু পথে গিয়ে থামল হুয়াং লি ল্যাং-এর ব্যক্তিগত সুইটের সামনে। এমনিতে জরুরি তথ্য পেলেও ভোরের আগে ল্যাং-কে ঘুম থেকে তোলে না সে, কিন্তু আজ অপেক্ষা করতে হবে না, বিলিয়নেয়ারের চিকিৎসায় ব্যস্ত বেশ কয়েকজন ডাক্তার।

কেবিনের দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে কবাট খুলল সুন্দরী এক চাইনিজ নার্স। আজ ল্যাং-এর দেহে ব্যবহার করা হচ্ছে নতুন এক শক্তিশালী ইলেকট্রিকাল স্টিমুলেটর। বরাবরের মত ত্বকে ইলেকট্রোড নেই, তার বদলে অপারেশন করে শরীরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কিছু ওয়ায়্যার। ডাক্তাররা আশা করছেন, এবার নতুন করে আবারও কাজ করবে বিশেষ কিছু নার্ভ। তার ফলে ল্যাং ব্যবহার করতে পারবে সদ্য আবিষ্কৃত কিছু যন্ত্র।

চিকিৎসার এ পর্যায়ে মস্ত ঝুঁকি নিয়েছেন ডাক্তাররা। রাজি হতেন না, কিন্তু হুইলচেয়ারের বন্দিজীবন আর সহ্য হচ্ছিল না ল্যাং-এর। গত কবছরে মেডিকেল সায়েন্সের আধুনিক প্রত্যেকটা চিকিৎসা নিয়েছে সে। স্টেম সেল, নিউরোলজিকাল ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট, অপরীক্ষিত ড্রাগ থেকে শুরু করে কবিরাজের হাজারো ওষুধ কোনও কাজেই আসেনি।

রোগের আক্রমণ কমিয়ে দিয়েছে ইলেকট্রিকাল স্টিমুলেশন। কিন্তু ওই চিকিৎসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ল্যাং। পেশির ক্ষয় কমলেই খুশি হওয়ার কিছু নেই। বারবার তাগিদ দেয়ায় নতুন থিয়োরি অনুযায়ী কাজ করছেন ডাক্তাররা। সঠিক ইলেকট্রিকাল স্টিমুলেশন ব্যবহার করেই সুস্থ করা হবে নার্ভ।

এগযামিনেশন টেবিলে ল্যাং-কে দেখল লাউ। প্রতিবার স্টিমুলেটর চালু হলেই ভীষণভাবে মুচড়ে উঠছে বিলিয়নেয়ারের দেহ। প্রথমে ঝাঁকি শুরু হচ্ছে হাতে, তারপর ছড়িয়ে পড়ছে পায়ে। আড়ষ্ট আঙুল সোজা হয়ে কাঁপছে থরথর করে। তারপর বিদ্যুৎ বন্ধ হলেই আঙুলগুলো আবারও কুঁকড়ে তৈরি করছে। ছোট একটা বল।

গত কয়েক বছর ধরে অসুস্থ ল্যাং। আজ হঠাৎ তার হাত পা নড়তেই চমকে উঠল লাউ। কেমন বিরক্তি এল তার।

ব্যথায় মুখ কুঁকড়ে ফেলেছে ল্যাং।

লাউয়ের মনে হলো, ভাল হতো এখান থেকে সে চলে যেতে পারলে।

কয়েকটা ঝাঁকুনির পর আবারও শিথিল হলো ল্যাং-এর দেহ। ডাক্তারের দিকে তাকাল সে। নরম আলোর এলসিডি মনিটরে ডেটা দেখছেন ডাক্তার।

মুখ খুলতে সময় নিচ্ছেন, বলল বিলিয়নেয়ার, দুঃসংবাদটা কি এতই খারাপ?

সরি, ডাক্তারদের নেতা বললেন, আপনার নিউরোলজিকাল রেসপন্স এখনও খুব দুর্বল।

সেক্ষেত্রে বাড়ান স্টিমুলেশন, বলল ল্যাং।

তাতে লাগবে প্রচণ্ড ব্যথা, বললেন ডাক্তার। আপনার মনে হবে দাউদাউ আগুনে পুড়ছে সারাদেহ। সহ্য করতে পারবেন না। চট করে দূরও হবে না সেই যন্ত্রণা।

আমার যা অবস্থা, ব্যথাও আজকাল হয়ে উঠেছে। আনন্দের, বলল ল্যাং।

মৃদু মাথা দোলালেন ডাক্তার। কয়েক মিনিট লাগবে সেটিং অ্যাডজাস্ট করতে। কিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সামনে গেলেন তিনি।

টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল লাউ।

তার চেহারা পড়ছে ল্যাং। কড়া সুরে বলল, তোমার এসব ভাল লাগছে না।

ভাল-মন্দ স্থির করার মালিক তো আমি নই, বলল লাউ।

তা ঠিকই বলেছ, বলল ল্যাং। কিছু বলবে?

নতুন তথ্য পেয়েছি। ওই যে, আমেরিকান কালো প্রফেসর, যাকে আমরা মনে করেছিলাম মরে গেছে? ওই লোক নাকি বেঁচে আছে।

তোমার আরেকটা ভুল, বলল ল্যাং। ওই লোককে অনেক আগেই মেরে ফেলা উচিত ছিল।

অপমান বোধ করতেই রেগে গেল লাউ। তবে চেহারা রাখল নিস্পৃহ। আজকাল একটু সুযোগ পেলেই জিভের ক্ষুর চালায় মৃতপ্রায় বস।

ওই ইউনিভার্সিটির মেইনফ্রেম কমপিউটারে ট্যাপ করেছিল প্রফেসর হ্যারিসন বা তার চেনা কেউ। কিছু তথ্য ডাউনলোড করেছে। তার ভেতর আছে ইউক্যাটানের স্যাটেলাইট ফোটো।

জানতে পেরেছ ওই লোক এখন কোথায়?

না। তবে যে কমপিউটার টার্মিনাল ব্যবহার করেছে, ওটা আছে মেক্সিকোর এক গ্রামে। যেখান থেকে কাজ শুরু করেছিল, সেখান থেকে অনেক সরে গেছে সে। ওই মেয়ে যদি যোগাযোগ করে তার সঙ্গে…চুপ হয়ে গেল লাউ।

অবশ্যই যোগাযোগ করবে, জোর দিয়ে বলল ল্যাং। এখন কোথায় আছে তোমার লোক?

তুলুম আর পুয়ের্তো মোরেলসে। এ ছাড়া আছে মেক্সিকো সিটির অ্যানথ্রোপলজির জাদুঘরে। ওখানে কিছু রিসার্চ করেছিল প্রফেসর আর ওই মেয়ে।

গুড, বলল ল্যাং, চোখের আড়ালে থাকুক ওরা। এবার সময়ের অনেক আগেই কাজে নেমে পড়েছ।

মাথা দোলাল লাউ।

যন্ত্রপাতির আড়াল থেকে মাথা বের করলেন ডাক্তার। আমরা তৈরি।

লাউকে বিদায় করতে হাত নাড়ল বিলিয়নেয়ার।

মৃদু নড করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল লাউ। পেছনে বন্ধ করে দিল দরজা। আবারও ফিরছে কমিউনিকেশন সুইটে। শুনতে পেল পেছনের ঘরে শুরু হয়েছে যান্ত্রিক গুঞ্জন। ব্যথা ও আনন্দের মিশেলে বিকট চিৎকার ছাড়ল হুয়াং লি ল্যাং।

.

২০.

ঝরঝরে পুরনো, প্রায় বাতিল জিপ ড্রাইভ করছে রানা। পাশের সিটে মিতা। পেছনে পাবলো। কয়েক ঘণ্টা ভাজা ভাজা হয়েছে ওরা মেক্সিকোর কড়া রোদে। হংকং ও দক্ষিণ চিন সাগরের বিশ্রী বৃষ্টির চেয়ে তা অনেক ভাল।

উপকূলীয় সড়ক ধরে চলেছে পুয়ের্তো আবুল গ্রাম লক্ষ্য করে। যাওয়ার পথে সাগরের বুকে সূর্যের ঝিকিমিকি দেখছে রানা। কেন যেন মনে হচ্ছে, ওরা এসেছে বেড়াতে। যেখানেই থেমেছে, সবাই ধরে নিয়েছে, মিতা এবং ও বিবাহিত। যে কারণেই হোক, পাবলোকে দত্তক নিয়েছে ওরা।

রিয়ারভিউ মিররে তাকাল রানা।

চুপ করে বসে আছে পাবলো। মাথায় টুরিস্টদের সমব্রেরো হ্যাট। চোখে প্লাস্টিকের সানগ্লাস। প্রায় কোনও কথাই বলে না ছেলেটা। রানা রাশান ভাষায় আলাপ করতে গিয়ে বুঝেছে, দুনিয়ার কোনও দিকেই মনোযোগ নেই পাবলোর। এখন দূরে চেয়ে দেখছে সবুজ জঙ্গল, নীলাকাশ ও সাগর।

ওর সত্যি কী হয়েছে? আনমনে বলল মিতা। পাবলো একটু পর পর খোলে সানগ্লাস। উঁটা দিয়ে ঠুকঠুক আওয়াজ করে, তারপর আবারও চশমা পরে। প্রথমে ভেবেছিলাম অটিস্টিক। কিন্তু পরে বুঝলাম, তা নয়। দুঃখের ছাপ পড়ল মিতার মুখে। নরম সুরে বলল, আসলে ওর ওপর দিয়ে অনেক গেছে।

চুপ করে থাকল রানা। গত কদিন ধরে ভাবছে, যে-কোনও সময় হামলা করবে ল্যাং বা দিমিতভ।

কোথায় রাখবে ছেলেটাকে?

ওকে ফেরত চাইবে রাশা, ঠেকাবার উপায় থাকবে না।

কী করে যেন রানার দুশ্চিন্তা টের পেয়ে বলল মিতা, আমরা হয়তো লুকিয়ে ফেললাম ওকে?

তা প্রায় অসম্ভব, বলল রানা।

ঝড়ের বেগে পিছনে পড়ছে পিচঢালা পথ।

 আবারও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখায় মন দিল মিতা।

ধুলোবালিতে মেখে আছে ওরা।

 পুরো নয় ঘণ্টা হলো গাড়ি চালাচ্ছে রানা।

 মিতার পরনে টি-শার্ট, সাদা জিন্সের প্যান্ট, মাথায় কাউবয় হ্যাট। সোনালি রোদে ঝিকঝিক করছে ফর্সা ত্বক। হ্যাঁ, দেখতে ভাল। মনে মনে ওর রূপের প্রশংসা না করে পারল না রানা।

কিছুক্ষণ পর ওরা ঢুকল মাঝারি এক জেলে গ্রামে।

জেলেরা তীরে তুলে রেখেছে রঙিন কিছু নৌকা।

একটু দূরেই ছোট কিছু বাড়িঘর।

 ব্যস, আপাতত যাত্রা শেষ, বলল রানা।

প্রফেসর এখনও মেক্সিকোতে রয়ে গেলে, এখানেই থাকবেন, বলল মিতা।

নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, বলল রানা।

বারবার বলতেন এখানে এসে কদিন বিশ্রাম নেবেন, বলল মিতা। আগেও কয়েক মাস এখানে ছিলেন স্ত্রীকে নিয়ে।

রাস্তার পাশে জিপ রাখল রানা। পরের পুরো একঘণ্টা ধরে গ্রামের সব মোটেল ছুঁড়ে দেখল ওরা।

কোথাও নেই প্রফেসর হ্যারিসন।

সাগরতীরে ছোট এক খাবারের হোটেলের মালিক জানাল, কালো লোকটা তো? তাকে, পাবেন ওদিকে। আঙুল তুলে দূরের দোতলা এক বাড়ি দেখাল সে।

পাঁচ মিনিট পর বোর্ডিং হাউসের সামনে জিপ রাখল রানা। মিতা নেমে পড়ার আগেই বলল, অপেক্ষা করো, আশা করি পাঁচ মিনিটের ভেতর ফিরব।

বাড়ির প্রথম ঘরে ডেস্কের পেছনে বসে আছে এক ক্লার্ক। প্রফেসরের গায়ের রঙ ও চেহারার বর্ণনা দিতেই মাথা দোলাল সে। মোয়েস নিগ্রো! বদ্ধ উন্মাদ!

কথাটা মানতে পারল না রানা। ব্রাযিলের ওই অভিযানে গিয়ে খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ বলে মনে হয়েছে ওর হ্যারিসনকে।

সিঁড়ি দেখিয়ে দিল ক্লার্ক। দোতলা। তৃতীয় ঘর।

কট-মট আওয়াজ তুলে নড়বড়ে সিঁড়ির ধাপ পেরোতে লাগল রানা, উঠে এল চওড়া এক বারান্দায়।

বাইরে থেকে বাড়িটা দেখলে ভুতুড়ে মনে হলেও ভেতর দিক পরিষ্কার। দেয়ালে সাদা রঙ। ঘরগুলোর দরজার সামনে পাতলা কার্পেট। উল্টো দিকে মাঝারি সব ড্রামে লতাগাছ, নেমে গেছে একতলায়। ফুটেছে লাল ফুল। একপাশে উঠান। মাঝখানে পাথরের তৈরি ভাঙা ফোয়ারা। ছড়া-ছড়াৎ শব্দে পড়ছে পানি। পাশের চাতালে কিচিরমিচির করছে এক ঝাঁক পাখি।

তিন নম্বর ঘরের দরজায় থেমে টোকা দিল রানা। প্রফেসর হ্যারিসন?

জবাব দিল না কেউ।

ক্লার্ক বলেছে, আজ এখনও বেরিয়ে যাননি হ্যারিসন।

স্কেলিটন কি বের করে তালায় ভরল রানা, ডানহাতে বেরিয়ে এল .৩৮ ক্যালিবারের ওয়ালথার পি.পি.কে. পিস্তল।

প্রায় নিঃশব্দে তালা খুলে কবাট সরাল। ঘরে পা রেখেই কাভার করল চারপাশ। ভেবেছিল ঘর খালি, কিন্তু আছে কেউ!

পিছু নিয়ে ঘরে ঢুকেছে সোনালি রোদ, মেঝেতে পড়েছে ওর ছায়া, ওদিকে চেয়ে রানা দেখল, দরজার পাশ থেকে লাঠির মত কিছু সরাসরি নামছে ওর মাথা লক্ষ্য করে!

একলাফে সরে গেল রানা, পরক্ষণে ঘুরেই পিস্তল তাক করল আততায়ীর বুকে।

থমকে গেছেন প্রফেসর। উদ্যত পিস্তল বুকে তাক করা দেখে হাত থেকে ফেলে দিলেন লাঠি। কেমন বিভ্রান্ত চেহারা। বিড়বিড় করে বললেন, রানা? মাই গড!

সত্যিই মানুষটাকে পাগলাটে লাগছে, ভাবল রানা।

উস্কোখুস্কো চুল, মুখ ভরা গোঁফ-দাড়ি, চোখ গাঁজাখোরদের মতই লাল। কেমন আছেন, প্রফেসর?জানতে চাইল ও।

তুমি সত্যিই কি বাস্তব, রানা? বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইলেন হ্যারিসন। খসখস করে চুলকে নিলেন গাল।

তাই তো মনে হচ্ছে, মৃদু হাসল রানা।

একটু শিথিল হলেন প্রফেসর। ঠিক… কিন্তু কোথা থেকে এলে তুমি?

আমেরিকা, হংকং, ম্যানিলা, মেক্সিকো… নানান জায়গা ঘুরে, প্রফেসর, বলল রানা। আপনি কি সুস্থ?

বিছানার কিনারায় বসলেন হ্যারিসন। মাথা নাড়লেন। জানি না। কখনও হান্নার সঙ্গে গল্প করে চমৎকার কাটছে সময়। মনে হচ্ছে ভাল আছি, একটু পরেই মনে হচ্ছে, আমি খুব অসুস্থ।

হাই হিলের আওয়াজ উঠে এসেছে দোতলায়।

রানা বুঝল, গাড়িতে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে চলে এসেছে মিতা। কয়েক সেকেণ্ড পর দরজা দিয়ে উঁকি দিল মেয়েটা। এক হাতে পাবলোর কবজি। আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। প্রফেসর, কেমন আছেন?

ভীষণ চিন্তিত হয়ে গেলেন হ্যারিসন। খুব ভাল করেই চেনেন মিতাকে। কিন্তু ওর তো বিয়েই হয়নি! হচ্ছেটা কী? কোত্থেকে এল এই ছেলে?

ও কে? জানতে চাইলেন।

অনেক দীর্ঘ কাহিনি, স্যর, বলল মিতা। পরে সবই খুলে বলব। প্রফেসরের পাশে বসল। তাঁর ক্ষতের পুঁজ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে প্যান্টের ওপর। চমকে গেল মিতা। বুঝতে দেরি হলো না, ক্ষতটা এখনও দগদগে হয়ে আছে।

ওঝা বা আমার নানা চেষ্টার পরেও রাতে বারবার দেখি দুঃস্বপ্ন, নালিশ করলেন হ্যারিসন, ভীষণ ভয় লাগে। আগে কখনও এমন হতো না।

একে জ্বর, তার ওপর নেই ঘুম, বলল মিতা, এ ছাড়া আছে হামলার ভয়! স্যর, আপনার বোধহয় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত।

প্রফেসরের টেবিলে চোখ গেল ওর। ওখানে এক বোতল বড়ি। মাথা নাড়ল মিতা। না, এগুলো ইনফেকশন ঠেকাতে যথেষ্ট নয়। আপনি বাড়তে দিয়েছেন ওটাকে। এবার সত্যিকারের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ চাই। সুস্থ হলেই সোজা আপনাকে পাঠিয়ে দেব আমেরিকায়।

কোথাও যাব না, গোঁ ধরলেন হ্যারিসন। কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝলেন, মনে কষ্ট পাবে মিতা। এবার বললেন, আসলে, ইয়ে, মিতা, আমিই তো শুরু করেছি সব, তাই কাজ শেষ না করে দেশে ফিরতে চাই না।

প্রফেসরের মন ঘুরিয়ে দিতে বলল মিতা, সেক্ষেত্রে কিন্তু আরও বড় কোনও বিপদে পড়বেন!

নরম সুরে বললেন হ্যারিসন, তুমি বরং বাড়ি ফেরো।

আপনাকে না নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তা হলে রয়েই যাও, দেখবে কদিনের মধ্যে পেয়ে গেছি পরের স্ফটিক।

বুঝলে, মিতা, তোমার মতই উনি, নিজের কাজ ফেলে রাখবেন না, বলল রানা।

ঠিকই পাব ওই স্ফটিক। ঠেকাতে পারবে না কেউ।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিতা। আপনি রয়ে গেলে, বাধ্য হয়েই আপনার পাশে থাকতে হবে আমাকে। দায়িত্ব এড়াব না আমি।

তুমি কী করবে ভাবছ? রানার কাছে জানতে চাইলেন বৃদ্ধ প্রফেসর।

বিশেষ কোনও কাজ নেই আমার, কাঁধ ঝাঁকাল রানা।

জানালা দিয়ে দূরে দেখলেন প্রফেসর। পাতলা পর্দা নেড়ে ঘরে ঢুকছে সাগরের ঝিরঝিরে হাওয়া। তাতে নোনা জলের গন্ধ। আনমনে বললেন তিনি, তোমাকে দেখে ভরসা পাচ্ছি, এবার ঠিকই ওই মন্দির খুঁজে পাব আমরা।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *