৯-১০. সুড়ঙ্গের দেয়ালে

আমরা সুড়ঙ্গের দেয়ালে হেলান দিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম। বাতাসে ধুলা উড়ছে। আমাদের চোখে-মুখে চুলে ধুলার একটা আস্তরণ পড়ছে। টর্চ লাইটের আলোতে সবাইকে কেমন জানি অপরিচিত মানুষের মতো দেখাচ্ছে। ভয় পেলে মানুষের চেহারা মনে হয় পাল্টে যায়।

টুনি বলল, “আমাদের মাথাটা খুব ঠাণ্ডা রাখতে হবে।”

চঞ্চল বলল, “হ্যাঁ, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।”

টুনি বলল, “খুব বড় যখন বিপদ হয় তখন কী করতে হয় জানিস?”

“কী?”

“প্রথমে দেখতে সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে। তারপর সেটাকে মেনে নিতে হয়। তারপর চেষ্টা করতে হয় তার থেকে কতটুকু ভালো করা যায়।”

টিটন মুখ শক্ত করে বলল, “সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে শুনতে চাস?”

আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

“আমরা সবাই এখানে আটকা পড়ে থাকব, না খেয়ে মরে ভূত হয়ে যাব। কেউ কোনোদিন জানতেও পারবে না আমরা কোথায় গেছি।”

টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না। আমাদের অবস্থা এতো খারাপ হবে না।”

টিটন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “কেন হবে না?”

“আমাদের কাছে অনেক খাবার আছে। আমরা আরো এক-দুই দিন সেই খাবার খেয়ে থাকতে পারব। কাজেই আমাদের হাতে কয়েকদিন সময় আছে। আমাদের কাছে দুইটা মোবাইল টেলিফোন আছে। মাটির নিচে বলে সেই মোবাইল বাইরে যাচ্ছে না। আমরা যদি সিঁড়ির উপরের ইট, পাথর সরিয়ে ছোট একটা গর্তও করতে পারি তা হলেই মোবাইলের লাইন পেয়ে যাব।”

টিটন জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে গর্ত করবি? সবাই মিলে বিল্ডিংটা ভাঙছে না?”

“রাতেরবেলা নিশ্চয়ই বন্ধ করবে। তখন আমরা কাজ শুরু করব।”

অনু বলল, “আমাদের কাছে একটা কবুতরও আছে। যদি ছোট একটা গর্ত করতে পারি তা হলে সেই কবুতরের পায়ে একটা মেসেজ লিখে সেই গর্ত দিয়ে ছেড়ে দিতে পারি!”

মিথিলা সিঁড়ির উপর জমে থাকা ইট কংক্রিটের বিশাল তূপের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ওখান দিয়ে কেমন করে গর্ত করবে? গর্ত করার জন্যে একটা হাতি লাগবে।”

আমি বললাম, “আমাদের একটা হাতিও আছে। দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে এসেছি। তার হাতে শাবলটা দিয়ে বলতে পারি, একটা গর্ত করে দাও।”

এতো বিপদের মাঝেও সবাই একটু হাসল। টুনি মাথা নেড়ে বলল, “না। ঐ মানুষটা খুবই ডেঞ্জারাস। তাকে ছাড়া ঠিক হবে না। হাতে শাবল তুলে দেওয়া আরো ডেঞ্জারাস! আগে আমাদের খুন করে ফেলবে, তারপর গর্ত করে বের হয়ে যাবে।”

চঞ্চল বলল, “আমি আরো একটা জিনিস চিন্তা করছি।”

“কী?”

“এই সুড়ঙ্গটা মাটির খুব বেশি নিচে না। আমরা যদি উপরের দিকে গর্ত করতে থাকি, তা হলে এক সময় নিশ্চয়ই বের হয়ে যাব। কপাল ভালো আমাদের কাছে একটা শাবল আছে।”

অনু উপরের দিকে তাকিয়ে বলল, “উপরে নিশ্চয়ই শক্ত মেঝে, ভেঙে বের হতে পারবি না।”

চঞ্চল বলল, “এখানে হয়তো তাই। কিন্তু যদি সুড়ঙ্গটা দিয়ে আরো দূরে যাই তা হলে হতে পারে আমরা বিল্ডিংয়ের বাইরে চলে যাব। তখন উপরে গর্ত করলে সেখানে থাকবে মাটি।”

আমি বললাম, “সুড়ঙ্গগুলো দেখেছিস? এটা সোজা যায় না, সবসময়ই আঁকাবাঁকা। একটু দূর গেলে আবার ঘুরে আগের জায়গা চলে আসে।”

চঞ্চল বলল, “প্রথমে সুড়ঙ্গের একটা ম্যাপ করতে হবে। আমরা এখনো জানি না সুড়ঙ্গগুলো কোনটা কোনদিকে গেছে।”

মিথিলা হাত তুলল, “আমি একটা কথা বলি?”

টুনি বলল, “বল।”

“আমার খিদে পেয়েছে।”

হঠাৎ করে আমাদের সবারই খিদে পেয়ে গেল। আমরা সবাই মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ। অনেক খিদে পেয়েছে। আয় খাই।”

টুনি তার ব্যাগ খুলল, সৈখানে স্যান্ডউইচ, চিপস, আপেল আর কোল্ড ড্রিংকস। আমরা সবাই কাড়াকাড়ি করে খেতে থাকি।

চঞ্চল দুর্বলভাবে বলল, “এখনই সব খেয়ে শেষ করে ফেলব? পরের জন্যে রাখব না?”

অনু বলল, “পরের জন্যে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা খাবারগুলো রাখব ঠিকই, ব্যাগের ভিতরে না রেখে পেটের ভিতরে।”

এতো বিপদের মাঝে থেকেও অনুর কথা শুনে সবাই একটু হাসল। তার যুক্তিটা খারাপ না, খাবারগুলো ব্যাগের মাঝে না রেখে পেটের মাঝে রাখা!

আমরা সবাই খুব সখ করে খেলাম এবং খাওয়ার পর মনে হল আমাদের মনের বল একটু বাড়ল। চঞ্চল বলল, “এখন আমাদের সবকিছু একটু সাবধানে খরচ করতে হবে। একসাথে সবগুলো টর্চ লাইট জ্বালিয়ে কাজ নেই। একটা করে জ্বালাবি আর যদি দরকার না থাকে নিভিয়ে রাখবি।”

টুনি বলল, “হ্যাঁ। মোবাইল টেলিফোন দুইটাও এখন বন্ধ করে রাখি। মোবাইল ফোনের চার্জ একটু বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”

আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, “ঠিক বলেছিস।”

“আর আমাদের সব ব্যাগ পিঠে করে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। এখানে থাকুক। পিঠে বোঝা নিয়ে হাঁটলে পরিশ্রম বেশি হবে। আমাদের শক্তি বাঁচাতে হবে।”

আমরা আবার মাথা নাড়লাম, বললাম, “গুড আইডিয়া।”

চঞ্চল বলল, “ঠিক আছে, প্রথমে তা হলে আমরা এই সুড়ঙ্গের একটা ম্যাপ তৈরি করার চেষ্টা করি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীভাবে করবি?”

চঞ্চল তার ব্যাগ থেকে কাগজ পেন্সিল বের করল। তারপর বলল, আমরা এই জায়গাটা ধরব সেন্টার। এখান থেকে কোন সুড়ঙ্গটা কোন দিকে কত দূর গেছে সেটা বের করতে হবে।”

আমি বললম, “সুড়ঙ্গটা সোজা নয়, আঁকাবাঁকা ঘুরে ঘুরে গেছে।”

চঞ্চল আবার তার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা কম্পাস বের করল, আমার হাতে দিয়ে বলল, “এই কম্পাসটা দিয়ে দিক ঠিক করতে হবে।”

টিটন জিজ্ঞেস করল, “কোন দিকে কত দূর গেছে মাপব কেমন করে?”

“কয় পা হাঁটছিস সেটা দিয়ে। যেমন দশ পা উত্তর দিকে তারপর তিন পা উত্তর-পশ্চিমে তারপর দুই পা পশ্চিমে–”

অনু বলল, “সুড়ঙ্গগুলো খুব জটিল, দেখিস কেউ যেন হারিয়ে যাস না।” টুনি বলল, “হ্যাঁ। কেউ একা যাবি না। দুজন দুজন করে।”

“কেউ হারিয়ে গেলে জোরে চিৎকার দিবি।”

চঞ্চল বলল, “গোলকধাঁধা থেকে বের হবার একটা নিয়ম আছে। তোরা সেটা জানিস?”

টিটন জিজ্ঞেস করল, “কী নিয়ম?”

“দেয়ালের একদিক ধরে এগিয়ে যাওয়া। তা হলে ঘুরেফিরে যেখান থেকে রওনা দিয়েছিস সেখানেই ফিরে আসবি।”

অনু অবাক হয়ে বলল, “সত্যি?”

“হ্যাঁ। আমার কথা বিশ্বাস না হলে কাগজে এঁকে দেখ।”

চঞ্চলের বৈজ্ঞানিক কথা বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই, তাই আমরা আর কাগজে এঁকে সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করলাম না, বিশ্বাস করে নিলাম।

কিছুক্ষণের মাঝে আমরা তিনটা দলে ভাগ হয়ে তিন দিকে চলে গেলাম। চঞ্চল আর মিথিলা, অনু আর টিটন, আমি আর টুনি। কম্পাসটা চঞ্চলের কাছে, কাজেই আমরা এখন পা গুনে গুনে মোটামুটি আন্দাজ করে মেপে যাচ্ছি, পরে ঠিক করে বসিয়ে নেব। হেঁটে যেতে যেতে আমি টুনিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই এতো ভালো কারাটে কেমন করে শিখলি?”

“যখন ছোট ছিলাম তখন একদিন স্কুলে গেছি। ভোমা টাইপের একটা ছেলে আমাকে ধরে আচ্ছা মতোন পিটিয়ে দিল। আমি বাসায় এসে কান্নাকাটি করে বললাম আর কোনোদিন স্কুলে যাব না! আব্বু বললেন, সেটা তো হতে পারে না। স্কুলে তো যেতে হবে। আমি রাজি হই না। তখন আল্লু বললেন, ঠিক আছে তোকে কারাটে স্কুলে ভর্তি করে দিই। এক বছর পর তুই ঐ ছেলেটাকে পিটিয়ে দিতে পারবি। তখন আমি রাজি হলাম!”

“ছেলেটাকে পিটিয়েছিলি?”

“নাহ্। শুধু একদিন সিঁড়ির নিচে চেপে ধরে নাকটা কচলে দিয়েছি। আসলে যখন বুঝতে পারি যে পিটাতে পারব তখন আর পিটাতে হয় না।”

“আজকে তো পিটাতে হল।”

“হ্যাঁ। আজকে অন্য ব্যাপার। ভয়ানক বিপদের ব্যাপার ছিল। যদি কিছু একটা হয়ে যেতো, সর্বনাশ!”

“হয় নাই।”

“ভাগ্যিস হয় নাই।”

আমি আর টুনি কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই হিসাবে গোলমাল করে ফেলছিলাম। তাই আবার একটু আগে থেকে শুরু করতে হচ্ছিল। এভাবে মেপে মেপে এক সময় আমরা দেখি যেখান থেকে রওনা দিয়েছি ঠিক সেই সিঁড়ির গোড়াতে চলে এসেছি। একটু দূর থেকে মনে হল কবুতরের পাখা ঝাঁপটানো শুনতে পাচ্ছি। কাছে এসে দেখি গোবদা সাইজের একটা গুইসাপ কবুতরের খাঁচাটা ধরে কামড়াকামড়ি করে কবুতরটা ধরার চেষ্টা করছে। আমরা হাত দিয়ে শব্দ করতেই সেটা মুখ তুলে আমাদের দেখল তারপর থপ থপ করে সরে গেল। টুনি বলল, “এটা কী?”

“গুইসাপ। কবুতরটা ধরার চেষ্টা করছে।”

হঠাৎ করে আমি চমকে উঠে বললাম, “আরে!”

“কী হয়েছে?”

“সাংঘাতিক ব্যাপার।”

“কী হল?”

“এখানে এই গুইসাপটা এসেছে, তার মানে কী বুঝতে পেরেছিস?”

“না।”

“তার মানে হচ্ছে এই সুড়ঙ্গ থেকে নিশ্চয়ই বাইরে যাওয়ার একটা গর্ত আছে, একটা ফাঁক-ফোকর আছে। সেই গর্ত দিয়ে গুইসাপটা ভিতরে ঢুকেছে!”

টুনির চোখ চকচক করে ওঠে। সে বলল, “ঠিক বলেছিস!”

“তার মানে আমরা যদি গুইসাপটাকে ধাওয়া করি সেটা নিশ্চয়ই সেই গর্ত দিয়ে বের হয়ে যাবে।”

টুনি বলল, “কিন্তু আমরা যে গুইসাপটাকে তাড়িয়ে দিলাম! কোন দিকে গেল?”

“এই তো এই দিকে!” গুইসাপটা যেদিকে গেছে আমরা সেদিকে একটু খোঁজাখুঁজি করলাম, কিন্তু কোন দিকে গেছে খুঁজে পেলাম না। একটু আগে যদি ব্যাপারটা মনে পড়ত তা হলে আমরা মোটেও সেটাকে এভাবে তাড়িয়ে না দিয়ে সাবধানে ধাওয়া করতাম। পিছন পিছন যেতাম।

আমি আর টুনি যখন আফসোস করছি তখন চঞ্চল আর মিথিলা ফিরে এলো, তারা একটা কাগজে সুড়ঙ্গের খানিকটা ম্যাপ তৈরি করে ফেলেছে। আমাকে আর টুনিকে মাথা ঝাঁকাতে দেখে বলল, “কী হয়েছে?”

“একটা গুইসাপ!”

“গুইসাপ? এখানে?”

“হ্যাঁ।” আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “তার মানে গুইসাপের যাওয়া-আসার একটা জায়গা আছে। সেই জায়গা দিয়ে আমরাও হয়তো যাওয়া-আসা করতে পারি।”

চঞ্চলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, বলল, “ঠিক বলেছিস।”

“কোন দিকে গেল গুইসাপটা?”

আমি দেখিয়ে বললাম, “এদিকে গিয়ে কোন দিকে যেন চলে গেছে। এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না।”

মিথিলা বলল, “আবার হয়তো আসবে।”

চঞ্চল বলল, “গুইসাপ হচ্ছে সরীসৃপ জাতীয়। ওদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম। মনে রেখে আবার এখানে আসার বুদ্ধিই হয়তো নাই।”

টুনি বলল, কবুতরটা ধরতে এসেছিল, খাঁচা থেকে বের করে কবুতরটার পা বেঁধে রেখে দিই। হয়তো আবার আসবে।

চঞ্চল বলল, “দেখি চেষ্টা করে!”

কাজেই আমরা প্রথমে অনু আর টিটনের ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, তারপর কবুতরটাকে বের করে তার পা চিকন দড়ি দিয়ে খাঁচার সাথে বেঁধে রাখলাম। কবুতরটা একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারে কিন্তু সরে যেতে পারে না। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার হলে আমরা কিছু দেখতে পাব না তাই খানিকটা দূরে ছোট একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা বেশ দূরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

চুপচাপ বসে থাকা খুব কঠিন। আমরা যদি পুরোপুরি নিশ্চিত হতাম যে আসলেই গুইসাপটা ফিরে আসবে তা হলে অপেক্ষা করা অনেক সহজ হত। কিন্তু যেহেতু আমরা জানি না তাই বুঝতে পারছি না চুপচাপ বসে থেকে আমরা শুধু শুধু সময় নষ্ট করছি কি না।

অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর টিটন ফিসফিস করে বলল, “মনে হয় আর আসবে না।”

অনু বলল, “আমারও মনে হয় আসবে না। সময় কাটছে না, আয় বাকি স্যান্ডউইচগুলো খাই।”

আমি অনুকে ধমক দিয়ে বললাম, “সারাক্ষণ খালি খাই খাই করবি না।”

টুনি বলল, “আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। তারপরেও যদি না আসে তা হলে আমরা নিজেরাই খোঁজা শুরু করব।”

আমি বললাম, “ঠিক আছে।”

বসে থাকতে থাকতে আমার মনে হয় চোখে একটু ঘুমের মতো চলে এসেছিল, হঠাৎ শুনলাম টুনি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, “স-স-স-স…”

সাথে সাথে আমি পুরোপুরি জেগে উঠলাম। তাকিয়ে দেখলাম একটু দূর থেকে ছায়ার মতো কিছু একটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। ছায়াটা আস্তে আস্তে একটু স্পষ্ট হল। আমরা দেখলাম বেশ বড়সড়ো গোবদা সাইজের একটা গুইসাপ-একটু আগে এটাকেই আমি আর টুনি দেখেছিলাম। আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকি তখন দেখলাম পিছন থেকে আরো একটা গুইসাপ আসছে–এটা আগেরটা থেকে সাইজে একটু ছোট। অনু ফিসফিস করে বলল, “একা আসে নাই। গার্ল ফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছে।”

টুনি হাসি চেপে বলল, “হ্যাঁ।”

আমি বললাম, “চল এখন ধাওয়া দিই।”

চঞ্চল বলল, “চল।”

“দুইটা যদি দুই দিকে যায়?”

“তা হলে আমরাও দুই দলে ভাগ হয়ে যাব।”

আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, “ঠিক আছে।”

চঞ্চল তখন তার টর্চ লাইটটা জ্বালিয়ে সেটা গুইসাপের উপর ফেলল। টর্চ লাইটের তীব্র আলোতে গুইসাপটা মনে হয় একটু হকচকিয়ে গেল, তারপর ঘুরে গিয়ে সেটা থপ থপ করে দৌড়াতে শুরু করে। পিছনের গার্ল ফ্রেন্ড গুইসাপটাও ঘুরে যায়–সেটাও ছুটতে থাকে। আমরা হইহই করে তখন গুইসাপ দুইটাকে তাড়া করি।

গুইসাপ দুটি প্রথমে সোজা সামনের দিকে গেল তারপর ডান দিকে ঘুরে গেল তারপর আবার সোজা আবার ডান দিকে। তারপর এক জায়গায় এসে হঠাৎ করে বাম দিকে ঘুরে লাফিয়ে উঠল। দেখলাম হাচড়-পাঁচড় করে কোথায় জানি ঢুকে এবং অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রথমে ছোট গুইসাপটা তারপরে বড় গুইসাপটা। গুইসাপটার পিছু পিছু আমরা সেই জায়গাটাতে হাজির হলাম, দেখলাম দেয়ালে ছোট একটা গর্ত এই গর্ত দিয়েই গুইসাপ দুটি বের হয়ে গেছে।

আমরা জায়গাটা ভালো করে লক্ষ করলাম, চঞ্চল দেয়ালটাতে হাত বুলিয়ে কী যেন দেখে চমকে উঠে বলল, “কী আশ্চর্য!”

“কী হয়েছে?”

“এটা একটা গেট!”

“গেট?”

“হ্যাঁ। এই দেখ। মাটি আর শ্যাওলা পড়ে পড়ে ঢেকে গেছে। কিন্তু আসলে এটা কাঠের গেট। কাঠ পচে ছোট গর্ত হয়েছে।”

আমরা এসে পরীক্ষা করে দেখি চঞ্চল ঠিকই বলেছে। সত্যিই এটা একটা গেট! মাটি, শ্যাওলা সরিয়ে আমরা গেটের কড়াগুলো খুঁজে পেলাম, সেখানে একটা জংধরা তালা ঝুলছে। টুনি বলল, “মিথিলা, এইটার চাবি কী তোর কাছে আছে?”

মিথিলা বলল, “না টুনি আপু। নাই।”

আমি বললাম, “না থাকলেও ক্ষতি নাই। এই তালাটা জং ধরে একেবারে ক্ষয়ে গেছে। শাবল দিয়ে জোরে দুইটা বাড়ি দিলে ভেঙে যাবে।”

“চল, তা হলে শাবলটা নিয়ে আসি।”

“শুধু শাবল না–আমাদের ব্যাগগুলোও নিয়ে আসি। মনে হয় এদিক দিয়ে বের হওয়া যাবে।”

টুনি বলল, “সবার যাওয়ার দরকার নাই। দুইজন এখানে থাক। অন্যরা যাই।”

টুনি আর মিথিলাকে রেখে আমরা আমাদের ব্যাগ আর শাবল নিয়ে ফিরে এলাম। শাবলটা দিয়ে তালাটায় জোরে একটা ঘা দিতেই সেটা খুলে গেল। গেটটা বহু বছর খোলা হয়নি তাই সেটা খুলতে চাইল না। আমরা শাবল দিয়ে চাপ দিয়ে কষ্ট করে পাল্লাগুলো একটু ফাঁক করলাম। ঘরটায় মাটি-শাবল দিয়ে সেখানে কয়েকটা ঘা দিতেই মাটির চাঙর ভেঙে ভেঙে পড়ল, আর আমরা বাইরের আলো দেখতে পেলাম, সাথে সাথে সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠি! আমরা সত্যি সত্যি বের হয়ে আসতে পেরেছি।

শাবল দিয়ে মাটিগুলো সরিয়ে আমরা একজন একজন করে বের হয়ে আসি, বাইরে সূর্যের আলোতে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল বলে প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমরা কিছু দেখতে পারলাম না। একটু পরে যখন চোখ সয়ে এলো তখন আমরা

অবাক হয়ে দেখলাম দুজন বয়স্ক মানুষ আরো বেশি অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। একজন তোতলাতে তোতলাতে বলল, “তোমরা এখানে কোথা থেকে বের হয়ে এসেছ?”

টুনি বলল, “সেটা অনেক লম্বা স্টোরি।”

বয়স্ক মানুষটা বলল, “জনশ্রুতি আছে এই মিশকাত মঞ্জিলের নিচে সুড়ঙ্গের একটা নেটওয়ার্ক আছে। ডাকাতেরা ডাকাতি করে এই সুড়ঙ্গ দিয়ে মিশকাত খানের সাথে দেখা করত। তোমরা কী বাই এনি চান্স সেই সুড়ঙ্গটা খুঁজে পেয়েছ?”

আমি বললাম, “আমরা আরো অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি।”

মানুষটা চমকে উঠল, বলল, “যক্ষের ধন?”

টুনি বলল, “তার থেকেও বেশি।”

“তার থেকে বেশি কী?”

“সেটা মনে হয় পুলিশকে বলতে হবে।”

“আমাকে বল, পুলিশকে আমিই জানাতে পারব। আমি একজন ম্যাজিস্ট্রেট। প্রপার্টি হ্যাঁন্ড ওভারের জন্যে সরকারি কাজে এসেছি।”

টুনি বলল, “দুইজন মানুষ। একজন ভোটকা একজন শুটকা।”

চঞ্চল ব্যাগ থেকে মানিকের রিভলবারটা বের করে বলল, “এই যে এটা শুটকা মানুষের রিভলবার। তার নাম মানিক, ডাকে মাইনকা।”

ম্যাজিস্ট্রেট বলল, “রি-রি-রিভলবার?”

টুনি মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ। আরেকজন যে আছে সে ভোটকা। তার হাত-পাগুলো থাম্বার মতো। তার কোনো অস্ত্র লাগে না-খালি হাতে চাপ দিয়ে

যে কোনো মানুষের মাথা পুটুস করে ভেঙে দিতে পারে।”

ম্যাজিস্ট্রেট ভদ্রলোক থতমত খেয়ে বললেন, “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ঐ রকম ডেঞ্জারাস মানুষ এখানে কী করছে? তোমরা কী করছ? তাদের রিভলবার তোমার হাতে কেন?”

টুনি বলল, “সেটা অনেক লম্বা স্টোরি।”

“ডেঞ্জারাস মানুষগুলো এখন কোথায়?”

“শুয়ে আছে।”

“শুয়ে আছে? শুয়ে আছে কেন?”

আমি বললাম, “আমরা বেঁধে রেখেছি। সেই জন্যে শুয়ে আছে।”

“তোমরা ছোট ছোট বাচ্চারা এরকম মানুষকে কেমন করে বেঁধে রাখলে?”

এবারে আমরা সবাই একসাথে বললাম, “সেটা অনেক লম্বা স্টোরি।” বলেই আমরা হি হি করে হাসতে লাগলাম। কেন হাসছি বুঝতে পারছি না, কিন্তু কিছুতেই হাসি থামাতে পারি না। কী মুশকিল!

ম্যাজিস্ট্রেট মানুষটা আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। চঞ্চল চাবি দুটি ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে দিয়ে বলল, “ভিতরে একটা ঘরের আর সিন্দুকের চাবি। ঐ ঘরেই আমরা মানুষ দুইটাকে তালা মেরে রেখেছি। মানুষগুলো নিশ্চয়ই এতক্ষণে অনেক ভয় পাচ্ছে।”

“কেন ভয় পাবে কেন?”

“সিন্দুকের উপর ছোট একটা মেয়ের কঙ্কাল।”

ম্যাজিস্ট্রেট চমকে উঠে চিৎকার করে বলল, “কঙ্কাল?”

“হ্যাঁ। মোমবাতি শেষ হয়ে গেলে যখন ঘরটা অন্ধকার হয়ে যাবে তখন মানুষ দুইটা অনেক ভয় পাবে মনে হয়।”

অনু বলল, “সিন্দুকের ভিতরে না কী অনেক সোনাদানা। কিন্তু সাবধান। মেয়েটা যক্ষ হয়ে সেই সোনাদানা পাহারা দিচ্ছে!”

ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে যে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি, আমাদের কথা শুনছিলেন। এবারে ম্যাজিস্ট্রেট ভদ্রলোককে বললেন, “বিল্ডিং ডেমোলিশান আপাতত বন্ধ রাখি। কি বলেন?”

“হ্যাঁ। এরা যদি সত্যিই সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক পেয়ে থাকে তা হলে সেটা একটা ঐতিহাসিক জিনিস হবে। মানুষ টিকিট কেটে দেখতে আসবে।–”

আমরা তখন ব্যাগগুলো ঘাড়ে নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম। অনু তার কবুতরটা ছেড়ে দিল, সেটা ডানা ঝাঁপটিয়ে আকাশে উড়ে গেল। আমরা সেটার দিকে হাত নাড়িয়ে যখন হাঁটতে শুরু করেছি তখন ম্যাজিস্ট্রেট ভদ্রলোক বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? তোমাদের সাথে আমাদের কথা শেষ হয় নাই।”

মিথিলা বলল, “কিন্তু এখন আমাদের বাসায় যেতে হবে। না হলে আম্মু চিন্তা করবে।”

“তা হলে তোমাদের বাসা কোথায় বল। তোমাদের নাম-ঠিকানা-টেলিফোন নম্বর—

.

বাসায় আসতে একটু দেরি হল। টেবিলে খাবার দিতে দিতে আম্মু বললেন, “স্কুল ছুটির জন্যে তোদের খেলা মনে হয় একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। ধুলাবালি মেখে চেহারা কী রকম সংয়ের মতো হয়েছে দেখেছিস? খেলা একটু কমা।”

মিথিলা বলল, “আম্মু আসলে এটা খেলা না।”

আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, “এটা তা হলে কী?”

“সেটা অনেক লম্বা স্টোরি!”

বলে আমি আর মিথিলা দুজনেই হি হি করে হাসতে থাকি।

.

১০.

১০ সুড়ঙ্গের ভিতরের সেই ঘর থেকে মানিক আর তার ওস্তাদকে পুলিশ সেদিনই ধরে এনেছিল। দুজনেই না কী ঘাগু আসামি, দুজনের নামেই অনেক কেস। পুলিশ না কী অনেকদিন থেকে তাদের খুঁজছে।

সিন্দুকের উপর যে কঙ্কালটা ছিল সেটাকে সপ্তাহখানেক পরে কফিনে ভরে এনে জানাজা পড়িয়ে কবরস্থানে কবর দিয়েছে। পুরো খবরটা খবরের কাগজে ও টেলিভিশনে বের হয়েছিল তাই জানাজায় অনেক মানুষ হয়েছিল। কবরটা বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে, মাথার কাছে লেখা আছে, “নাম পরিচয়হীন একটি দুঃখী বালিকা। মানুষের লোভ আর অবহেলায় শিকার। জন্ম-মৃত্যুর তারিখ অজানা।”

মিশকাত মঞ্জিল ভাঙা আপাতত বন্ধ আছে। মামলা করে যে জিতেছে সে না কী দোটানায় পড়ে গেছে। লোকজন তাকে বলছে মার্কেট করে সে যত টাকা আয় করবে তার থেকে বেশি আয় করবে পাবলিকদের সুড়ঙ্গ দেখিয়ে। সেখানে সুড়ঙ্গের ভিতর সিন্দুকটা আছে। ভেতরের সোনাদানা পুলিশের কাছে, সোনার অলংকারের মাঝে না কী রক্তের শুকনো দাগ। সোনাদানা কে পাবে সেটা এখনো পরিষ্কার হয়নি, শোনা যাচ্ছে জাদুঘরে দিয়ে দেওয়া হবে।

সেদিন মিশকাত মঞ্জিলের নিচে কী হয়েছিল সেটা জানার পর আমাদের আব্বু-আম্মুরা প্রথমে আমাদের উপর খুব রাগ করেছিল। প্রথম প্রথম হম্বিতম্বি করে বলেছে আমাদেরকে আর কখনো ঘর থেকেই বের হতে দেবে না। কিন্তু এরকম অসাধারণ একটা সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক বের করেছি, যক্ষ বের করেছি, যক্ষের ধন বের করেছি, শুটকা মানিক আর তার ভোটকা ওস্তাদকে আটক করেছি কাজেই তারা খুব বেশি দিন রাগ ধরে রাখতে পারেনি।

তবে আমাদের নিজেদের ভিতরে অনেক রাগারাগি হচ্ছে। টিটন রেগেছে চঞ্চলের ওপরে তার তাবিজের ভেতর ই ইকুয়েন্স টু এম সি স্কয়ার লিখে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে। অন্যেরা রেগেছে আমার উপর, আমি চোট্টামি করে লটারিতে সবাইকে ঠকিয়ে ব্ল্যাক ড্রাগন নামটা করে দিয়েছি সেই জন্যে। ভুলটা আমারই, গল্পের ফাঁকে একদিন নিজেই বলে দিয়েছিলাম-না বললেই হত। সবাই রেগে মেগে বলছে আবার নতুন করে ক্লাবের নাম দেওয়া হবে।

কিন্তু নতুন করে নাম দেওয়া মনে হয় সহজ হবে না। রেডিও-টেলিভিশনেও এই নামটার কথা বলা হয়ে গেছে! সবাই এখন এই নামটার কথা জানে! সবাই এখন এর মেম্বার হতে চায়–বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা। তারা পুরো ঘটনাটা শুনে মহা উত্তেজিত। দিনরাত আমাদের পিছনে পিছনে ঘোরে পরের অ্যাডভেঞ্চারে তাদের নেওয়ার জন্যে।

টুনি বাধ্য হয়ে এখন তাদেরকে বিকেলবেলা কারাটে শেখায়। দেখতে দেখতে আমাদের ব্ল্যাক ড্রাগনের বিশাল একটা দল হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে!

কিছু একটা হলে মিথিলা এখনো নাকি সুরে আম্মুকে নালিশ করে। তার নালিশ শুনে এখন আমি আর রেগে উঠি না। নালিশটা শুনতে ভালোই লাগে–কারণটা কী কে জানে!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *