১-২. স্কুল ছুটি শুরু হয়েছে

দলের নাম ব্ল্যাক ড্রাগন কিশোর উপন্যাস মুহম্মদ জাফর ইকবাল

যেদিন আমাদের স্কুল ছুটি শুরু হয়েছে সেদিন সকালবেলাতেই আমি আর টিটন আমাদের পেয়ারা গাছটাতে উঠে বসেছিলাম। আমাদের মনে হচ্ছিল স্কুল ছুটি হয়েছে বলে আমাদের ফাটাফাটি আনন্দ শুরু হয়ে যাবে আর সেটা কীভাবে শুরু হয় সেটা দেখার জন্যে এতো সকালে আমরা পেয়ারা গাছে উঠে বসে আছি।

বড় মানুষেরা এই জিনিসগুলো একেবারেই বুঝতে পারে না। আমি যখন সকালবেলা বাসা থেকে বের হচ্ছি তখন আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, “রাতুল এতো সকালে কই যাচ্ছিস?”

আমি বললাম, “কোথাও না।”

“কোথাও না মানে? এই যে বের হচ্ছিস। বের হয়ে কোথায় যাবি?”

আমি বললাম, “এই তো!”

“এই তো মানে?”

“এই তো মানে পেয়ারা গাছে।”

“পেয়ারা গাছে?” মনে হল শুনে আম্মু খুবই অবাক হলেন, কিন্তু এতো অবাক হবার কী আছে আমি বুঝতে পারলাম না। সকালবেলা মানুষ কী পেয়ারা গাছে উঠে বসতে পারে না?

পাশেই মিথিলা দাঁড়িয়ে ছিল সে তখন নাকি সুরে নালিশ করতে শুরু করল, “জান, আঁম্মু, ভাইয়া না পেয়ারা গাছের ডালে পা দিয়ে উল্টা হয়ে ঝুলে থাকে। গাছের উপরে টিটন ভাইয়ার সাথে মারামারি করে। আঁমি গেলে আঁমার মাথার উপর বিষ পিঁপড়া ছেড়ে দেয়।”

আমি বললাম, “এই মিথিলা ওল্টাপাল্টা কথা বলবি না। ভালো হবে না কিন্তু খবরদার।”

তখন মিথিলা নাকি সুরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “আম্মু দেখো ভাইয়া আঁমাকে গালি দিচ্ছে।”

আম্মু আমাকে কী কী যেন বললেন, সেই কথাগুলো আমার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে গেল। আমি হু হা করে মাথা নাড়তে নাড়তে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। ছোট বোনদের যন্ত্রণায় পৃথিবীর কতো ভাইদের জীবন যে বরবাদ হয়ে গেছে কে জানে!

পেয়ারা গাছে বসে বসে আমি আর টিটন দুইটা কষা পেয়ারা খেয়ে ফেললাম। গাছ ভর্তি ছোট ছোট পেয়ারা, আমাদের কারণে কোনোদিন কোনো পেয়ারা বড় হতে পারে না। আরো একটা খাব কী না ভাবছিলাম তখন টিটন চিড়িক করে নড়ে উঠে বলল, “আউ!”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”

টিটন বলল, “বদমাইশ পাজী পিঁপড়ার বাচ্চা পিঁপড়া–” তারপর প্যান্টের ভিতরে যেখানে স্বাভাবিকভাবে কোনো পিঁপড়া যাবার কথা না–সেখান থেকে একটা পিঁপড়া ধরে বের করে নিয়ে আসে। মুখ খিঁচিয়ে বলে”এই পিঁপড়াটার আমি বোঝাব মজা! কত বড় সাহস–আমাকে কামড় দেয়? এটাকে আজকে আমি জন্মের মতো শিক্ষা দিব।”

একটা পিঁপড়াকে কেমন করে জন্মের মতো শিক্ষা দেওয়া হয় আমি নিজেও সেটা দেখতে চাচ্ছিলাম। টিটন দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “এর ছয়টা ঠ্যাং ছিঁড়ে আমি আলাদা করে দিব। তারপর দেখি সে কী করে। কেমন করে হটে।”

বিষ পিঁপড়ার পা ছেঁড়ার চেষ্টা করা নেহায়েতই বোকামির কাজ, কারণ তখন সেটা টিটনের বুড়ো আঙুলে আবার কামড়ে ধরল। টিটন বলল, “আউ! আউ!” এবং কিছু বোঝার আগে সেই পিঁপড়া তার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে প্রথমে গাছের ডালে তারপর পাতার আড়ালে গিয়ে অন্য পিঁপড়াদের মাঝে গা ঢাকা দিয়ে ফেলল। সেটাকে আলাদা করে আর খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। টিটন ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “দেখেছিস? দেখেছিস বদমাইশ পিঁপড়াটা কী করল?”

আমি বললাম, “টিটন? তোর শেষ পর্যন্ত পিঁপড়ার সাথে মারামারি করতে হবে? দুনিয়ায় তুই এর থেকে বড় কিছু খুঁজে পেলি না?”

টিটন বলল, “আমি মোটেও পিঁপড়ার সাথে মারামারি করছি না।”

“করছিস।”

“করছি না।”

“করছিস।”

তখন টিটন আমার সাথেই একটা মারামারি শুরু করে দিচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় চঞ্চল এসে গাছের নিচে দাঁড়াল তাই শেষ পর্যন্ত মারামারিটা আর শুরু হল না। চঞ্চল আমাদের আরেকজন বন্ধু, এই পাড়াতেই থাকে। আমরা জানি যে চঞ্চলের নামটা একেবারেই ঠিক হয়নি–তার নাম হওয়া উচিত ছিল ”ধীর-স্থির”। তার মতো ধীর-স্থির মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি, কিন্তু একজনের নাম তো আর ধীর-স্থির হতে পারে না তাই তাকে চঞ্চল এই ভুল নামটা নিয়েই থাকতে হচ্ছে।

চঞ্চল আমাদের ক্লাসের বৈজ্ঞানিক। অঙ্ক আর বিজ্ঞানে কেউ তার সমান নম্বর পায় না। আমাদের ক্লাসে অঙ্ক আর জ্যামিতি স্যার যখন ভুল-ভাল পড়াতে থাকেন তখন চঞ্চল ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলে, “হে ইউক্লিড আপনি এদের ক্ষমা করে দেন! প্লীজ ক্ষমা করে দেন! প্লীজ প্লীজ ক্ষমা করে দেন।”

চঞ্চলের পকেটে সবসময় কোনো না কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি থাকে–হয় একটা চুম্বক না হলে একটা লেন্স না হলে কিছু লিটমাস পেপার তা না হলে। কয়েলের তার। আমাদের ঘরে আমরা ক্রিকেট প্লেয়ারের ছবি টানিয়ে রাখি চঞ্চল তার ঘরে শুধু বৈজ্ঞানিক আর গণিতবিদদের ছবি টাঙিয়ে রাখে। শুধু যে টাঙিয়ে রাখে তা না–এমন ভান করে যে এগুলো ছবি না, যেন সত্যি সত্যি আইনস্টাইন হয় রামানুজন তার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের অসম্মান হবে সেই জন্যে ছবিগুলোর সামনে আমাদের কোনো খারাপ কথাও বলতে দেয় না।

চঞ্চল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে তোদের?”

আমি বললাম, “টিটনকে বিষ পিঁপড়া কামড় দিয়েছে আর সেই জন্যে টিটন পিঁপড়ার সাথে মারামারি করছে।”

চঞ্চল বলল, “বিষ পিঁপড়ার বিষ আসলে এক ধরনের এসিড। একটু চুন যদি লাগাতে পারিস এসিড বেস কাটাকাটি হয়ে যাবে।”

সে কী বলল আমি কিংবা টিটন কিছুই বুঝতে পারলাম না–কোনো সময়েই পারি না। টিটন ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বলল, “আমার তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নাই, যে আমি পকেটে চুন নিয়ে ঘুরি!”

আমি চঞ্চলকে বললাম, “আয় উপরে আয়।”

কোনো বড় মানুষ হলে জিজ্ঞেস করত, কেন? গাছের উপরে কেন উঠে বসতে হবে? চঞ্চল বড় মানুষ না তাই সেও কোনো কথা না বলে গাছের উপরে উঠে বসল। আমি বললাম, “কী মজা, স্কুলে যেতে হবে না!”

টিটন বলল, “হ্যাঁ, কী মজা!” তার সবগুলো দাঁত আনন্দে বের হয়ে এলো। টিটন আমাদের থেকে এক ক্লাস নিচে পড়ে। আমরা সব আশেপাশে থাকি তাই কে কোন ক্লাসে পড়ে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই না। তা ছাড়া টিটন যে এখনো লেখাপড়ার মাঝে আছে সেটাই একটা বিরাট ব্যাপার-তার অনেকদিন আগেই কোনো একটা ডাকাতের দলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, না হলে জলদস্য হওয়ার কথা ছিল। ছোট বলে কেউ তাকে নিবে না সে জন্যে যেতে পারছে না।

চঞ্চল বলল, “স্কুলটা সারা বছরই বন্ধ থাকা উচিত। আমাদের কী কী পড়তে হবে সেগুলো শুধু ই-মেইল করে জানিয়ে দেবে। আমরা পড়ে নেব।”

আমি বললাম, “যাদের ই-মেইল নেই?”

চঞ্চল মুখ শক্ত করে বলল, “যাদের ই-মেইল নেই তাদের লেখাপড়া করার দরকার নেই।”

আমাদের কারোই ই-মেইল নেই তাই আমরা গরম হয়ে উঠলাম। আমি বললাম, “তোকে বলেছে? সবার কি ই-মেইল আছে? নাই!”

“ঠিক আছে ঠিক আছে। যাদের ই-মেইল নাই তাদেরকে সেল ফোনে এসএমএস করে দেবে।”

আমরা সবাই বলি মোবাইল ফোন, চঞ্চল ঢং করে সেটাকে বলে সেল ফোন। টিটন বলল, “যাদের মোবাইল ফোন নাই?”

চঞ্চল বলল, “এখন সবারই বাসায় একটা না একটা সেল ফোন আছে।”

“যদি না থাকে?”

“আছে।”

টিটন গরম হয়ে বলল, “যদি থাকে কিন্তু ব্যবহার করতে না দেয়?”

আমাদের তখন মনে পড়ল টিটন কয়দিন আগে তার বড় বোনের মোবাইল ফোন দিয়ে তাদের ক্লাসের একটা ছেলের কাছে খুব খারাপ একটা এসএমএস পাঠিয়েছিল। ফোন নম্বরটা ঠিক করে লিখে নাই তাই সেটা ভুল করে চলে গিয়েছিল অন্য একজনের কাছে। সেই অন্য একজন আবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ–ডিসি না মন্ত্রী না যেন এমপি। সেই মানুষটা খবর দিল পুলিশকে, পুলিশ খবর দিল র‍্যাবকে, র‍্যাব খবর দিল মিলিটারিকে–সব মিলিয়ে হুলুস্থুল অবস্থা! আরেকটু হলে টিটনের আপুকে ধরে নিয়ে ক্রস ফায়ার করে মেরেই ফেলছিল! অনেক কষ্ট করে সেই ঝামেলাটা মিটেছে আর তারপর থেকে টিটন তার বাসায় কোনো মোবাইল ফোন ধরতে পারে না।

চঞ্চল বলল, ঠিক আছে, যাদের সেল ফোন নেই তাদের কাছে চিঠি পাঠাবে।”

চঞ্চলের আইডিয়াটা আমাদের খুব পছন্দ হল। ঘুম থেকে উঠে দেখব একটা চিঠি, সেই চিঠিতে লেখা আছে আজকে অমুক বাংলা কবিতাটা পড়, ইংরেজি বইয়ের অমুক চ্যাপ্টারটা ট্রানস্লেশন কর, অঙ্ক বইয়ের অমুক অঙ্কগুলো কর। ব্যস, আমরা তখন ঘরে বসে কিংবা এই পেয়ারা গাছে বসে সেটা করে ফেললাম। কোনো ঝামেলা নেই। টিটন বলল, “গভমেন্টের অনেক টাকা বেঁচে যাবে। মাস্টারদের বেতন দিতে হবে না। বেত কিনতে হবে না।”

আমি বললাম, “বেত মনে হয় গভমেন্টের টাকা দিয়ে কিনে না। স্যার ম্যাডামেরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কিনে।” “অসম্ভব।” টিটন মুখ শক্ত করে বলল, “স্যার-ম্যাডামেরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কোনোদিন কিছু কিনবে না। প্রত্যেক বছর যখন পাঠ্যবই ছাপায় তখন বেতগুলো রেডি করে। তারপর বইয়ের বান্ডিল আর বেতের বান্ডিল স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দেয়।”

চঞ্চল ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তুই কেমন করে জানিস?”

টিটন বলল, “না জানার কী আছে? সবাই জানে।”

এই রকম যুক্তির উপর তো আর তর্ক করা যায় না, তাই আমরা আর তর্ক করলাম না। তা ছাড়া টিটনের সাথে আমরা সাধারণত তর্ক করি না। তর্কে সুবিধে করতে না পারলে সে কথা নেই বার্তা নেই একটা ঘুষি মেরে দেয়।

আমরা তিনজন পেয়ারা গাছে পা দুলিয়ে বসে থাকলাম আর আমাদের মনে হতে লাগল সত্যি সত্যি বুঝি স্কুল ছুটির আনন্দটা শুরু হয়েছে। স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই, কোন ক্লাসে কোন স্যার কোন ম্যাডাম এসে কী পড়া জিজ্ঞেস করবেন সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। কোন হোমওয়ার্ক ভুল করে (কিংবা ইচ্ছা করে) করা হয় নাই সেটা নিয়েও অশান্তি নেই। ক্লাসে বসে কখন স্কুল ছুটি হবে সেটা নিয়েও সারাক্ষণ উশখুশ করা নেই। আমরা এখন যতক্ষণ খুশি পেয়ারা গাছের উপর বসে থাকতে পারব, তারপর যখন ইচ্ছে তখন গাছ থেকে নেমে রাস্তা ধরে হাঁটতে পারব। পুকুর ঘাটে গিয়ে শার্ট খুলে ঝপাং করে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব, পুকুর থেকে উঠে ভিজে কাপড়ে ঘুরাঘুরি করে শরীরের মাঝেই কাপড় শুকিয়ে বাসায় ফিরে আসতে পারব। কিছু একটা খেয়ে আবার বের হতে পারব, ইচ্ছে হলে সারাদিন একটা টেনিস বল দিয়ে বোম্বাস্টিক খেলতে পারব। শুধু সন্ধ্যে হলে বাসায় ফিরে আসতে হবে–যদি কোনোভাবে সন্ধ্যের সময় বাসায় ফিরে আসার নিয়মটা না থাকত তা হলে আমাদের আর কিছু চাওয়ার ছিল না!

চঞ্চল বলল, “এই ছুটিটা ভালো করে কাটাতে হবে।”

টিটন আর আমি দুজনেই মাথা নাড়লাম, বললাম, “হ্যাঁ। খুব ভালো করে কাটাতে হবে।” ছুটিতে আমরা কী কী করব সেটা চিন্তা করে আমাদের মুখে বিশাল একটা হাসি ফুটে উঠল আমরা তখন পা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসলাম।

চঞ্চল একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “ভালো করে কাটানো মানে—”

টিটন বলল, “ফূর্তি ফূর্তি ফূর্তি!”

চঞ্চল বলল, “না মানে ইয়ে-”

আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “কীয়ে?”

“এই ধর, মানে আমরা যদি একটা সায়েন্স ক্লাব করি।”

টিটন হাতে কিল দিয়ে বলল, “ঠিক বলেছিস! আমাদের একটা ক্লাব করতে হবে। আমরা সবাই হব মেম্বার এবং আমরা মেম্বাররা এই পাড়াটাকে পাহারা দেব। বাইরে থেকে কেউ এলে পিটিয়ে তক্তা করে দেব।”

চঞ্চল ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি পিটাপিটির ক্লাবের কথা বলি নাই। আমি বলেছি সায়েন্স ক্লাব। আমরা সায়েন্স প্রজেক্ট করব। কোনো

একটা জিনিস আবিষ্কার করব।”

টিটনকে সায়েন্স নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত মনে হল না। সে বলল, “ডিটেকটিভ ক্লাব করতে পারি। কেউ মার্ডার হলে আমরা খুঁজে বের করে ফেলব।”

আমি বললাম, “যদি কেউ মার্ডার না হয়?”

টিটন মাথা চুলকে বলল, “তা হলে অন্য কোনো অপরাধ। চুরি, ডাকাতি।”

“সেগুলোও যদি না হয়?”

“তা হলে আমরা নিজেরাই করে ফেলব।”

“ধুর!” আমি বললাম, “তার থেকে আমরা খেলাধুলার ক্লাব করতে পারি। বোম্বাস্টিক না হলে ফুটবল-ক্রিকেট ক্লাব।”

টিটন বলল, “তিনজনে ফুটবল ক্লাব হয় না। কমপক্ষে এগারোজন লাগে।”

“তিনজন দিয়ে শুরু করব, তারপর আস্তে আস্তে বাড়বে।”

চঞ্চল বলল, “সায়েন্স ক্লাব বানালে তিনজন দিয়েই শুরু করা যায়।”

টিটন রেগে গিয়ে বলল, “সায়েন্স ক্লাব একজনকে দিয়েই হয়।”

চঞ্চল গম্ভীর হয়ে বলল, “একজনের কোনো ক্লাব হয় না। ক্লাব মানেই হচ্ছে। একজন থেকে বেশি।”

আমি বললাম, “শুধু আমরা তিনজন কে বলেছে? অনু আছে না?”

তখন টিটন আর চঞ্চল মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ। হ্যাঁ। অনুও আছে।”

অনুর নামটাও ভুল নাম। অণু পরমাণু মানেই ছোট ছোট বিন্দু বিন্দু জিনিস, কিন্তু আমাদের অনু মোটাসোটা নাদুস-নুদুস গোলগাল। মোটাসোটা মানুষ সবসময় হাসি-খুশি হয় তাই অনুও হাসি-খুশি। চঞ্চল যেরকম আমাদের বৈজ্ঞানিক অনু সেরকম আমাদের কবি। দুনিয়ার যত বই সে পড়ে ফেলেছে। বড়দের জন্যে লেখা অসভ্য অসভ্য বই, যেগুলো আমাদের হাতে নেওয়া মানা অনু সেগুলোও পড়ে ফেলেছে। তাদের বাসা ভর্তি বই, সবাই সারাক্ষণ বসে বসে বই পড়ে। টিটন বলেছে একদিন সে না কি অনুদের বাসায় গিয়েছে তখন সে দেখে অনুদের বাসার একটা বিড়াল একটা ভোলা বইয়ের সামনে বসে বসে বই পড়ছে। টিটনের বেশিরভাগ কথা আমরা অবশ্যি বিশ্বাস করি না, কিন্তু এই কথাটা সত্যি হতেও পারে। অনুদের বাসার বিড়াল বই পড়লে অবাক হবার কিছুই নেই।

চঞ্চল বলল, “আজকে ছুটির দিনে অনু ঘরের ভিতরে বসে বসে কী করছে? বের হয় না কেন?”

আমি বললাম, “নিশ্চয়ই রাত দুইটা পর্যন্ত বই পড়ে এখন ঘুমিয়ে আছে।”

“চল গিয়ে ডেকে তুলি।”

“চল।” বলে আমরা গাছ থেকে নামতে শুরু করলাম। সাধারণত আমরা কাউকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি না, কিন্তু অনুদের বাসার কথা আলাদা। তাদের বাসাটা অন্যরকম, আমরা গেলে মনেই হয় না আমরা অন্য কারো বাসায় গেছি। বাসার সবগুলো মানুষ হাসি-খুশি সবচেয়ে বড় কথা অনু যে নাদুস-নুদুস মোটাসোটা তার একটা কারণ আছে। এমনি এমনি কেউ নাদুস-নুদুস মোটাসোটা হয় না–সেটা হবার জন্যে ভালো-মন্দ খেতে হয়। অনুদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া খুবই ভালো। আমরা যখনই যাই তখনই দেখি তারা মজার মজার খাবার খাচ্ছে। আমাদেরকে ডাকাডাকি করে বসিয়ে দেয় আর আমরাও গাপুস-গুপুস করে খাই। টিটন যে অনুকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার কথা বলেছে সেটা শুধু অনুর সাথে কথা বলার জন্যে না, অনুর আম্মু যেসব মজার মজার নাস্তা তৈরি করে রেখেছেন আর আমরা গেলেই যেগুলো আদর-যত্ন করে খাওয়াবেন সেটার জন্যেও। আমার মনে হয় সেইটাই আসল কারণ।

আমরা হেঁটে হেঁটে যেতে থাকি। পাশাপাশি অনেকগুলো বাসা–অনুদের বাসা একটু দূরে, সামনে একটা খোলা মাঠ, আমরা মাঠের মাঝখান দিয়ে যখন শর্টকাট মারছি তখন মিঠুদের বাসাটা চোখে পড়ল। মিঠু ছিল আমাদের প্রাণের বন্ধু, তিন মাস আগে তার আবু বদলি হয়ে কক্সবাজার চলে গেছেন। যাবার সময় মিঠু রীতিমতো আমাদের ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল। কক্সবাজার পোঁছে আমাদের বিশাল লম্বা একটা চিঠি দিয়েছে, তার মাঝে সমুদ্রের নানারকম বর্ণনা। আমাদের ছেড়ে একা একা থাকতে তার কত কষ্ট হয়েছে সেটাও লিখেছে। আমরা ভাবলাম চিঠির একটা লম্বা উত্তর দিব। টিটন বলল, তার চাইতে টেলিফোনে কথা বলি। চঞ্চল বলল, সবচেয়ে ভালো হয় ই-মেইল পাঠালে। লাভের মাঝে লাভ হল কোনোটাই করা হল না। এখন আমরা তার ঠিকানাও হারিয়ে ফেলেছি, টেলিফোন নম্বরও জানি না। বেচারা মিঠু নিশ্চয়ই ভাবছে আমরা তাকে ভুলে গেছি, আসলে মোটেও ভুলিনি, যতবার এই মাঠের মাঝখান দিয়ে শর্টকাট মারি আর মিঠুদের বাসাটা চোখে পড়ে ততবার তার কথা মনে পড়ে আর আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি।

অনুদের বাসায় গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতেই অনুর আম্মু দরজা খুলে দিলেন। আমাদের দেখে হাসি হাসি মুখে বললেন, “কী খবর, ত্রিরত্ন? চতুর্থ রত্নের খোঁজে?”

ঠিক কী বললে ভালো হবে বুঝতে পারলাম না বলে হাসি হাসি মুখ করে বললাম, “না মানে ইয়ে, অনু এখনো বের হচ্ছে না তাই ভাবলাম”

“আর আমার কাছে অনুর কথা বল না! তাকে ধাক্কাধাক্কি করেও ভোলা যায় না! যাও দেখি, চেষ্টা করে দেখ ঘুম থেকে তুলতে পার কী!”

টিটন বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না খালাম্মা, আমরা এক্ষুণি তুলে দেব।”

চঞ্চল বলল, “আমার ইনডাকশন কয়েলটা নিয়ে আসা উচিত ছিল। পায়ের আঙুলে বেঁধে একটা শক দিতাম, চিড়িক করে লাফ দিয়ে উঠত।”

আমি বললাম, “ইনডাকশন কয়েল ফয়েল লাগবে না, আমরা ধাক্কাধাক্কি করে তুলে ফেলব।”

কাজটা অবশ্যি এতো সহজ হল না। আমরা তার ঘরে গিয়ে অনুকে ধাক্কাধাক্কি করলাম, অনু আঁ উঁ করে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। তখন আমরা শেষ পর্যন্ত ধাক্কা দিয়ে অনুকে বিছানা থেকে ফেলে দিলাম, ধড়াস করে বিছানা থেকে নিচে পড়ে শেষ পর্যন্ত সে চোখ পিটপিট করে বলল, “ও! তোরা।”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমরা। এখনো ঘুমাচ্ছিস? আজ থেকে স্কুল ছুটি জানিস না?”

অনু ঘুম ঘুম গলায় বলল, “সেই জন্যেই তো ঘুমাচ্ছি।”

“ছুটির সময়টা ঘুমিয়ে নষ্ট করবি না কি গাধা কোথাকার?”

“তা হলে কী করব?”

আমি বললাম, “আমরা একটা ক্লাব করব ঠিক করেছি।”

“ক্লাব?” অনু চোখ বড় বড় করে বলল, “সাহিত্য ক্লাব? সবার কাছ থেকে গল্প, কবিতা নিয়ে দেয়াল পত্রিকা বের করব?”

চঞ্চল বলল, “কীসের ক্লাব সেইটা এখনো ঠিক হয় নাই। সায়েন্স ক্লাবও হতে পারে–”

টিটন বলল, “ডিটেকটিভ ক্লাবও হতে পারে।”

আমি বললাম, “ফুটবল না হয় ক্রিকেট ক্লাবও হতে পারে।”

সাহিত্য ক্লাবকে বেশি পাত্তা দিলাম না বলে অনুর মনটা একটু খারাপ হল, তাই আমি তার মন ভালো করার জন্যে বললাম, “আবার সবকিছু মিলিয়েও একটা ক্লাব হতে পারে! যেটা বৈজ্ঞানিক গবেষণা করবে আবার ফুটবল খেলবে আবার ডিটেকটিভ কাজ করবে। আমরা এখনো ঠিক করি নাই।”

থাকতাম অনুর আম্মু মজারীও বসে গেমা তো তাকে আর

টিটন বলল, “সেটা ঠিক করার জন্যেই এসেছি। চারজনে মিলে ঠিক করব।” আমি ধাক্কা দিয়ে বললাম, “ওঠ। ঘুম থেকে ওঠ।–”

অনু এবারে উঠল। হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা খেতে বসল। আমরা তো তাকে আর একা একা বসতে দিতে পারি না, তাই আমরাও বসে গেলাম। ঠিক আমরা যেরকম ভেবেছিলাম সেরকম অনুর আম্মু মজার মজার নাস্তা নিয়ে এলেন! আমরা যদি এই বাসায় থাকতাম তা হলে আমরাও নির্ঘাত অনুর মতো গোলগাল মোটাসোটা নাদুস-নুদুস হয়ে যেতাম। খেতে খেতে আমরা ক্লাব নিয়ে কথা বলতে থাকি। টিটন বলল, “বুঝলি, ভালো ক্লাব মানে হচ্ছে ভালো একটা নাম। একেবারে ফাটাফাটি একটা নাম। যেমন ধর ব্লড অ্যান্ড মার্ডার।” নামটা আমাদের কেমন পছন্দ হয়েছে সেটা বোঝার জন্যে টিটন আমাদের সবার মুখের দিকে তাকাল।

চঞ্চল ইতস্তত করে বলল, “ব্লাড অ্যান্ড মার্ডার? কীসের ব্লড? আর কে মার্ডার করবে? আমরা মার্ডার করব না কী আমাদের মার্ডার করবে?”

“ধুর গাধা।” টিটন বিরক্ত হয়ে বলল, “কেউ কাউকে মার্ডার করবে না। এটা একটা নাম। যেন নামটা শুনলেই মনে হয় সাংঘাতিক কিছু।”

অনু বলল, “ওহ। ইংরেজি নাম দিবি কেন? আমরা বাঙালি, তাই নামটা হবে বাংলা। আমাদের চারজনের ক্লাব তাই এটার নাম দিতে পারি চতুর্ভুজ। কিংবা চতুষ্কোণ।”

টিটন হই হই করে উঠল, “কক্ষনো না। মনে হচ্ছে জ্যামিতির ক্লাস! আমরা কী অঙ্কের ক্লাব করছি না কি?”

চঞ্চল গম্ভীর হয়ে বলল, “করলে দোষ আছে? পৃথিবীতে গণিতের ক্লাব নাই? বাংলাদেশে আছে। তারা অলিম্পিয়াডে গিয়ে মেডেল আনে।”

টিটন বলল, “মেডেলের খেতা পুড়ি। আমরা কী মেডেলের জন্যে ক্লাব বানাচ্ছি? মোটেই না। চতুর্ভুজ, চতুষ্কোণ-এইসব শুনলেই আমার জ্যামিতির ক্লাসের কথা মনে হয়। আর জ্যামিতি ক্লাসের কথা মানেই জ্যামিতি স্যারের কথা মনে হয় আর জ্যামিতি স্যারের কথা মনে হলেই স্যারের পিটুনির কথা মনে হয়। কাজেই এই নাম আমরা রাখতে পারব না।” কথা শেষ করে টিটন টেবিলে একটা কিল দিল আর তখন টেবিলের সব প্লেট-পিরিচ ঝনঝন করে উঠল।

টিটনের এতো জোরে কিল দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। তার যুক্তিটা কিল ছাড়াই আমরা মেনে নিতাম। যে ক্লাবের নাম শুনলেই পিটুনির কথা মনে হয়

সেই নাম রাখা ঠিক না। অনু তখন বলল, “তা হলে নাম রাখি অটিরাচ।”

“অটিরাচ?” চঞ্চল বলল, “অটিজম আছে জানি, কিন্তু অটিরাচ আবার কী?”

অনু হাসি হাসি মুখে বলল, “সেটাও বুঝলি না? অনুর অ টিটনের টি রাতুলের রা আর চঞ্চলের চ দিয়ে অটিরাচ!”

আমরা সবাই দুলে দুলে হাসলাম, নামটা ভালোই কিন্তু চঞ্চল আপত্তি করল, বলল, “আমাদের ক্লাবে আমরা কি আর কাউকে নিব না? ধর আরেকজন এলো, তার নাম ঝন্টু তখন ক্লাবের নাম হয়ে যাবে অটিরাচঝ। তারপর আরেকজন, তার নাম শওকত তখন ক্লাবের নাম হবে অটিরাচঝশ–উচ্চারণ করতেই দাঁত ভেঙে যাবে। তারপর যখন ক্লাবের মেম্বার হবে একশজন তখন সেই নাম আর কেউ মনে রাখতে পারবে না!”

চঞ্চলের কথায় যুক্তি আছে তাই অটিরাচ নামটাও বাতিল হয়ে গেল। টিটন তখন নতুন উৎসাহে বলল, “তা হলে নামটা ব্লাড অ্যান্ড মার্ডারই রেখে দিই। একেবারে ফাটাফাটি নাম। কী বলিস?”

চঞ্চল বলল, “উঁহু, আমার পছন্দের নাম হচ্ছে অয়লার।”

“অয়লার?” টিটন ভুরু কুঁচকে বলল, “মানে তৈলাক্ত? আমাদের ক্লাবের নাম কেন তৈলাক্ত হবে? আমরা কী লোকজনকে তেল দিয়ে বেড়াব না কি?”

চঞ্চল গরম হয়ে বলল, “অয়লার মানে তৈলাক্ত না গাধা। অয়লার হচ্ছেন একজন বিশাল গণিতবিদ।” নামটা উচ্চারণ করতেই চঞ্চলের মুখে একটা গভীর শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব চলে আসছিল, “খুব কম বয়সে অয়লার অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই অন্ধ অবস্থাতে গবেষণা করেছেন।”

অনু বলল, “সবাই একটা নাম বলেছে, রাতুল এখনো কোনোটা বলে নাই। রাতুল তুই একটা নাম বল।”

“আমি?”

“হ্যাঁ”

“ব্ল্যাক ড্রাগন।”

“ব্ল্যাক ড্রাগন?” চঞ্চল ভুরু কুঁচকে বলল, “ড্রাগন বলে কিছু নাই তুই জানিস? ড্রাগন ফ্লাই আছে। ড্রাগন ফ্লাই মানে হচ্ছে ফড়িং। তুই আমাদের ক্লাবের নাম রাখতে চাস ফড়িং?”

আমি রেগে বললাম, “মোটেও আমি ফড়িং রাখতে চাই না। তা হলে বলতাম ড্রাগন ফ্লাই। আমি কী ড্রাগন ফ্লাই বলেছি? বলি নাই। বলেছি ব্ল্যাক ড্রাগন।”

চঞ্চল মুখটা ভোলা করে বসে রইল। অনু বলল, “নামটার মাঝে কোনো সৌন্দর্য নাই। বাংলা করলে হবে কালা গুইসাপ। কালা গুইসাপ কোনো নাম হল?

আমি আরো রেগে উঠলাম, “ড্রাগনের বাংলা মোটেও গুইসাপ না।”

“ড্রাগনের বাংলা তা হলে কী?”

“ড্রাগনের বাংলা ড্রাগন।”

টিটন বলল, “ঝগড়াঝাটি বন্ধ করে আমার নামটা রেখে দে ব্লাড অ্যান্ড মার্ডার।”

আমি বললাম, “তার চাইতে একটা কাজ করা যাক।”

“কী কাজ।”

“আমরা সবাই একটা একটা করে নাম বলি। সেই নামগুলো আলাদা আলাদা কাগজের টুকরায় লিখব। তারপর লটারি করে যার নাম উঠবে সেইটাই হবে ক্লাবের নাম।”

“লটারি?”

“হ্যাঁ। এ ছাড়া আর উপায় কী? তোরা কী ভাবছিস কোনোদিন আমরা একজনের নামে আরেকজন রাজি হব? হব না।”

চঞ্চল মাথা নাড়ল, বলল, “সেটা ঠিক।”

অনু ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড় মানুষের মতো বলল, “এই জন্যে বাঙালি জাতির উন্নতি হচ্ছে না। আমাদের মাঝে পরমতসহিষ্ণুতা নাই।”

টিটন বলল, “কী নাই?”

”পরমতসহিষ্ণুতা।”

“সেইটা আবার কী জিনিস? জীবনেও এর নাম শুনি নাই।”

“তোর মাঝে এটা নাই সেই জন্যে তুই এর নাম শুনিস নাই।”

আমি বললাম, “জ্ঞানের কথা বাদ দিয়ে একটা কাগজ কলম নিয়ে আয়।”

 অনু উঠে গিয়ে কাগজ কলম নিয়ে এলো।

আমি কাগজটা চার টুকরা করে বললাম, “এখন একজন একজন করে তোদর পছন্দের নামগুলো বল, আমি লিখি।”

টিটন বলল, “রাড অ্যান্ড মার্ডার।”

আমি কাগজে লিখলাম ব্ল্যাক ড্রাগন-একটু আড়াল করে লিখলাম যেন কেউ দেখতে না পায়, তারপর কেউ দেখার আগে কাগজটা ভাঁজ করে ফেললাম।

চঞ্চল বলল, “অয়লার।” আমি লিখলাম ব্ল্যাক ড্রাগন। অনু বলল, “সোনালী ডানা।” আমি লিখলাম ব্ল্যাক ড্রাগন।

তারপর আমি নিজেরটা লিখলাম-ব্ল্যাক ড্রাগন। কাগজগুলো ভাজ করে টেবিলে রেখে আমি গম্ভীরভাবে বললাম, “এই লটারিতে আমাদের কোনো একজনের দেওয়া নাম উঠবে। অন্য সবাইকে সেটা মানতে হবে। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে।”

“সবাই একজন আরেকজনের গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর।”

চঞ্চল বলল, “গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলে কী হয়?”

“জানি না। মনে হয় প্রতিজ্ঞা ভাঙলে সে মরে যায়।”

চঞ্চল বাকা করে হেসে বলল, “তোকে বলেছে! মরে যাওয়া যেন এতো সোজা!”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “বকর বকর না করে প্রতিজ্ঞা কর।”

আমরা তখন একজন আরেকজনকে ধরলাম আর অনু আমাদের প্রতিজ্ঞা। করাল, “আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমরা এই লটারির ফলাফল মানিয়া চলিব। লটারিতে যাহাই উঠিবে তাহাই আমাদের ক্লাবের নাম হইবে। এই নাম নিয়া ভবিষ্যতে কেহ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করিব না।”

আমি তখন কাগজের টুকরাগুলো টেবিলে খুব ভালোভাবে ওলট-পালট করে মিশিয়ে দিয়ে বললাম, “এখন একজনকে একটা কাগজ তুলতে হবে। কে তুলবি?”

কোনো প্রশ্ন উহ আমাদের ক্লাকে লটারির ফলাফলীয়াদের প্রতিজ্ঞা

কেউ কিছু বলার আগেই টিটন বলল, “আমি! আমি!”

“ঠিক আছে। আগে চোখ বন্ধ কর।”

টিটন চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে একটা কাগজ তুলল, আমি বাকি কাগজগুলো সরিয়ে নিলাম। অনু বলল, “খোল।”

টিটন বলল, “ভয় লাগছে। যদি আমারটা না ওঠে?” অনু বলল, “আমারও ভয় লাগছে, যদি তোরটা ওঠে!” চঞ্চল বলল, “অনেক হয়েছে এখন খোল।”

টিটন তখন কাঁপা হাতে কাগজের ভাঁজ খুলল, আর আমি কাগজের মাঝে ব্ল্যাক ড্রাগন লেখা দেখে আনন্দে চিৎকার করে লাফাতে লাগলাম। খুশি হবার পুরো অভিনয়টা হল একেবারে ফাটাফাটি। কেউ কিছু সন্দেহ করল না।

অনু বিরক্ত হয়ে বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। এখন থাম।”

চঞ্চল ফেস করে একটা নিশ্বাস ফেলল, কিছু বলল না। টিটন বলল, “আমার লটারির কপালটাই খারাপ। জীবনে কোনো লটারিতে জিতি নাই। রাজি হওয়াটাই ঠিক হয় নাই।”

আমি বললাম, “এসব বলে কোনো লাভ নাই। এখন নাম ঠিক হয়ে গেছে, এই নামটাই সবার মেনে নিতে হবে।”

অনু গজগজ করে বলল, “ঠিক আছে ঠিক আছে।”

টিটন বলল, “আর ক্লাবের পুরো কাজ হবে গোপনে। পৃথিবীর আর কেউ এর কথা জানবে না।”

অনু বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে।”

আমি বললাম, “তা হলে এখানে বসে আমরা কথা বলছি কেন? সবাই আমাদের কথা শুনে ফেলছে না?”

আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে কথা বলছি, অনুর আম্মু মাঝে মাঝে এদিক সেদিক দিয়ে হাঁটছেন। অনুর বোন হাঁটছে, তারা নিশ্চয়ই সবাই আমাদের কথাবার্তা সবকিছু শুনছে। অনু মাথা নেড়ে বলল, “কেউ আমাদের কথা শুনছে না।”

“কেন?”

“বাসায় কেউ আমাদের কোনো পাত্তা দেয় না। কী বলি না বলি কেউ কিছু শুনে না। তোরা নিশ্চিন্ত মনে কথা বলতে পারিস।”

“ধুর! সবাই শুনছে আমাদের কথা।”

“শুনছে না।”

“শুনছে।”

অনু বলল, “ঠিক আছে দশ টাকা বাজি। কেউ শুনছে না।”

আমি রাজি হয়ে গেলাম, বললাম, “ঠিক আছে।”

 চঞ্চল বলল, “কিন্তু কেমন করে বুঝব কেউ শুনছে না কী শুনছে না?”

অনু বলল, “খুব সোজা। তোরা শুধু লক্ষ কর।”

আমরা লক্ষ করলাম, অনুর আপু যখন ডাইনিং টেবিলের কাছে ফ্রিজ থেকে কিছু একটা বের করছে তখন অনু আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “তোরা সবাই বোতলে করে কেরোসিন নিয়ে আসবি। সাথে ম্যাচ। বোতলের কেরোসিনটা ঢালব ঘরটাতে তারপর আগুন ধরিয়ে দিব। কাছে শুকনো গাছটাতে যখন আগুন লেগে যাবে তখন আর চিন্তা নাই, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকবে সারারাত।”

অনুর এই ভয়ংকর পরিকল্পনা তার আপু শুনল বলে মনে হল না। নিজের মতো কাজ করতে লাগল। তারপর আবার বসার ঘরে চলে গেল।

অনু বলল, “দেখেছিস?”

অন্যেরা মাথা নাড়ল, বলল, “অনু ঠিকই বলেছে। আমাদের কথা কেউ মন দিয়ে শুনে না!”

অনু হাত পেতে বলল, “আমার দশ টাকা দে।” আমি অনেক কষ্টে দশটা টাকা জোগাড় করেছিলাম অনুকে দিয়ে দিতে হল!

বোঝাই যাচ্ছে কেউই আমাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না। আমরা আমাদের সবচেয়ে গোপন কথাগুলো এখানে বসেই বলতে পারব কোনো সমস্যা হবে না, তারপরেও আমরা ঠিক করলাম আমাদের বাকি আলাপ আমরা বাসার বাইরে গিয়ে করব।

যখন আমরা বের হয়ে যাচ্ছি অনুর আপু আমাদের বিদায় দিয়ে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গিয়ে অনুকে বলল, “বেশি করে আনতে বলিস।”

অনু অবাক হয়ে বলল, “কী বেশি করে আনতে বলব?”

“কেরোসিন! আগুন লাগানো কিন্তু এতো সোজা না।”

অনু চিৎকার করে বলল, “আপু! তুমি আমাদের কথা শুনছিলে? তা হলে না শোনার ভান করলে কেন?”

অনুর আপু উত্তর না দিয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে দরজার ফাঁক দিয়ে বললেন, “আমার কিন্তু কালা গুইসাপ নামটাই বেশি পছন্দ!”

এবার শুধু অনু না, আমরাও চিৎকার করে উঠলাম, “আপনি আমাদের সব কথা শুনেছেন!”

“চোখের তো পাতি আছে তাই চোখ বন্ধ রাখা যায়। কানের তো পাতি নাই!” না চাইলেও সব কথা শুনতে হয় বলে অনুর আপু আমার দিকে তাকাল, বলল, “রাতুল! আমি তোমার সাথে জন্মেও কোনোদিন লটারি করব না! বাবারে বাবা!”

কথা শেষ করে অনুর আপু বাম চোখটা দিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে চোখ টিপলেন। শুধু আমি দেখলাম, আর কেউ দেখল না। কেন পিলেন সেটাও শুধু আমি বুঝলাম আর কেউ বুঝল না।

ঘর থেকে বের হয়ে আমি অনুর দিকে হাত পেতে বললাম, “আমার দশ টাকা ফেরত দে।”

অনু বিরস মুখে আমার টাকা ফেরত দিল। আমি বললাম, “এখন তোর আমার বাজির টাকা দেওয়ার কথা ছিল। যা, তোকে মাফ করে দিলাম! দিতে হবে না।”

আমরা যখন মাঠের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছি তখন দেখলাম মিঠুদের বাসার সামনে। একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। সেই ট্রাক থেকে মালপত্র নামানো হচ্ছে। আমি বললাম, “মিঠুদের বাসায় নতুন মানুষ এসেছে!”

আমরা খানিকক্ষণ দেখার চেষ্টা করলাম সেখানে আমাদের বয়সী কোনো ছেলেকে দেখা যায় কি না-দেখতে পেলাম না। বিকালবেলা এসে খোঁজ নিতে হবে। আমাদের কপাল সাধারণত ভালো হয় না, আমাদের বয়সী ছেলে পাওয়া যাবে না। যদিও বা পাওয়া যায় তা হলে নির্ঘাত সে হবে চূড়ান্ত পাজী যার তুলনায় টিটনকে মনে হবে ফেরেশতা!

.

০২.

অনুর বাসা থেকে বের হয়ে আমরা চারজন কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। চঞ্চল বলল, “বুঝলি, ভালো একটা ক্লাব মানে হচ্ছে ভালো একটা আস্তানা।”

টিটন বলল, “ঠিক বলেছিস।”

অনু বলল, “নামটা যখন ভালো হল না, তখন আস্তানাটা খুব ভালো হওয়া দরকার।”

আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, “কী বললি? নামটা ভালো হয় নাই?”

“হয় নাই তো। কালা গুইসাপ একটা নাম হল?”

“মোটেও নাম কালা গুইসাপ না, নাম হচ্ছে ব্ল্যাক ড্রাগন!”

“ঐ একই কথা। ইংরেজিতে ব্ল্যাক ড্রাগন বাংলায় কালা গুইসাপ।”

আমি রেগেমেগে বললাম, “বাংলায় মোটেও কালো গুইসাপ না।”

“তা হলে বাংলায় কী?”

“এটা একটা নাম। নামের আবার বাংলা ইংরেজি আছে? রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে কী তুই নবাব বাঙ্গাল বাঘ বলিস?”

আমার কথা শুনে চঞ্চল হি হি করে হাসতে লাগল। বলল, “নবাব বাঙ্গাল বাঘ! এই নাম শুনলে সুন্দরবনের সব রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুইসাইড করবে!”

টিটন বলল, “ঐসব ছেড়ে এখন বল আমাদের ক্লাবের আস্তানাটা কোথায় হবে। গোপন আস্তানা হতে হবে, কেউ যেন জানতে না পারে।”

চঞ্চল বলল, “আমাদের বাসার দোতলায় হতে পারে। আমি যে ঘরটা ল্যাবরেটরি বানিয়েছি তার পাশের ঘরটা খালি আছে।”

আমি বললাম, “উঁহু। কারো বাসায় বানানো যাবে না। তা হলে সবাই জেনে যাবে।”

“তা হলে কোথায় বানাবি?”

চঞ্চল বলল, “একটা ট্রি হাউজ বানালে কেমন হয়?”

“ট্রি হাউজ?”

“হ্যাঁ। গাছের উপরে একটা গোপন আস্তানা।”

“কোন গাছে?”

“একটা গাছ খুঁজে বের করতে হবে। বড় একটা গাছ।”

অনু বলল, “মিশকাত মঞ্জিলে বড় বড় গাছ আছে।”

“মিশকাত মঞ্জিল!” আমাদের সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

মিশকাত মঞ্জিল শুনে চোখ বড় বড় হওয়ার কারণ আছে। আমাদের পাড়া থেকে নদীর দিকে কিছু দূর হেঁটে গেলে দেয়াল ঘেরা যে বিশাল জায়গাটা আছে তার ভেতরে মিশকাত মঞ্জিল। বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভেতরে একটা বড় দালান আছে, গাছপালা ঝোঁপঝাড় দিয়ে ঢাকা তাই পুরানো দালানটা দেখাও যায় না। এক সময় সেখানে মানুষজন থাকত, আজকাল কেউ থাকে না। কেন থাকে না সেটা নিয়ে নানা রকম গল্প চালু আছে। সবচেয়ে বেশি চালু গল্পটা হচ্ছে এরকম : এই বাড়ির মালিক মিশকাত খান খুবই অত্যাচারী ধরনের মানুষ ছিল, তার না কী ডাকাতের দল ছিল। মিশকাত খানের বাসায় ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে কাজ করত। একদিন হঠাৎ করে সেই ছোট মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে গেল। মেয়েটার বাবা নেই, মা খোঁজ পেয়ে এসেছে মিশকাত খানের সাথে দেখা করতে। মিশকাত খান মা’কে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। বাচ্চা মেয়েটির মা তখন মিশকাত মঞ্জিলের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই হাত উপরে তুলে খোদার কাছে বলেছে, “খোদা যেই মানুষ আমার মাসুম বাচ্চাকে খুন করেছে তুমি তাকে নির্বংশ করে দাও। আমার আদরের ধনকে যে নিয়ে গেছে তুমি তার আদরের ধনকে নিয়ে যাও। সে আমাকে যে কষ্ট দিয়েছে তুমি তাকে সেই কষ্ট দাও। তার মুখে পানি দেবার জন্যে যেন কেউ না থাকে। শিয়াল-কুকুর যেন তার লাশ টেনে ছিঁড়ে খায়।”

মিশকাত মঞ্জিলের দারোয়ান সেই মাকে বাড়ির সামনে থেকে তাড়িয়ে দিল। মা কোথায় গেল সেটা আর কেউ জানতে পারল না। কিন্তু তারপর মিশকাত মঞ্জিলে ভয়ংকর সব ব্যাপার ঘটতে থাকল। সবার আগে মারা গেল মিশকাত খানের ছোট বউ। মিশকাত খান অপূর্ব সুন্দরী একটা মেয়েকে জোর করে ধরে এনে বিয়ে করেছিল। সেই বউয়ের সারা শরীরে দেখা গেল গুটি বসন্ত। ভুগে ভুগে মারা গেল সে। বসন্ত রোগের ভয়ে তার অনেক কর্মচারী ও কাজের লোক পালিয়ে গেল। ছোট বউ মারা যাবার কিছুদিন পর বড় বউ গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল। তারপর তার ছেলেমেয়েগুলো একজন একজন করে মারা যেতে লাগল। একজন মারা গেল পানিতে ডুবে। একজন মারা গেল পাগলা কুকুরের কামড়ে। একজন মারা গেল আগুনে পুড়ে। একজন মারা গেল বিষ খেয়ে। ঝড়ের রাতে একজন মাথায় বাজ পড়ে মারা গেল। একজন মারা গেল বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে। শেষ জনের লাশ পাওয়া গেল জঙ্গলে, মুখটা কেউ খুবলে খুবলে নিয়ে গেছে, কীভাবে নিয়েছে কেউ জানে না। এই বাড়িতে অন্য যারা ছিল তখন তারাও একজন একজন করে চলে গেল। পুরো বাড়িতে রয়ে গেল শুধু মিশকাত খান একা।

আস্তে আস্তে মিশকাত খানের মাথা খারাপ হয়ে গেল। মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, কোটরের মাঝে লাল জ্বলজ্বল চোখ, লম্বা লম্বা নখ। সে একা একা এই বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় আর বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলে।

এই এলাকার অনেক মানুষ দেখেছে গভীর রাতে মিশকাত খান তার বাড়ির ছাদের রেলিং ধরে হাঁটছে আর তার পিছু পিছু সাদা কাপড় পরা অনেকগুলো ছায়ামূর্তি হাঁটছে। সবাই ধারণা করে সেগুলো মিশকাত খানের বউ ছেলেমেয়ের প্রেতাত্মা। সেগুলো কোনো কথা বলে না, নিঃশব্দে মিশকাত খানের পিছনে হেঁটে যায়।

আরো যখন রাত গম্ভীর হয় তখন একটা ছোট মেয়ের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্নার শব্দ শোনা যায়–কখনো কখনো আবার খিলখিল করে রক্ত শীতল করা হাসি।

কাজেই অনু যখন মিশকাত মঞ্জিলের কথা বলল, আমরা সবাই রীতিমতো চমকে উঠলাম। টিটন বলল, “সর্বনাশ! ঐ ভূতের বাড়িতে? আমি ওর মাঝে নাই।”

আমিও মাথা নাড়লাম, বললাম, “মাথা খারাপ? আমাদের জানের মায়া নাই?”

চঞ্চল বলল, “জানের মায়া? তোর জান কে নিতে আসছে?”

“ভূত।”

চঞ্চল বলল, “এই দুপুরবেলা কটকটে রোদের মাঝে তোর ভূতের কথা বলতে লজ্জা করল না?”

“এখন কটকটে রোদ ঠিক আছে। যখন সন্ধ্যা হবে তখন? যখন রাত হবে তখন? তুই তখন যেতে পারবি মিশকাত মঞ্জিলে?”

চঞ্চল গম্ভীর গলায় বলল, “পারব।”

 টিটন বলল, “থাক। এতো সাহসের দরকার নাই।”

“এর মাঝে সাহসের কিছু নাই।”

চঞ্চল গম্ভীর গলায় বলল, “ভূত বলে কিছু নাই। যদি থাকত তা হলে এতোদিনে ভূতকে বৈজ্ঞানিকেরা ধরে ফেলত। ভূতদের চিড়িয়াখানা থাকত, সেখানে নানা রকম ভূত থাকত। আমরা টিকিট কেটে সেই সব ভূত দেখতে যেতাম।”

আমি বললাম, “বেশি বড় বড় কথা বলবি না। ভূতেরা যদি তোর কথা শুনে তা হলে তোর খবর আছে।”

চঞ্চল বলল, “কেন? কী হবে?”

“তোকে ধরে নিয়ে তাদের চিড়িয়াখানায় আটকে রাখবে। ভূতের বাচ্চারা টিকিট কেটে তোকে দেখতে আসবে!”

আমার কথা শুনে চঞ্চল হি হি করে হাসল যেন আমি খুব একটা মজার কথা বলেছি।

আমরা কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে কীভাবে কীভাবে জানি মিশকাত মঞ্জিলের কাছেই চলে এসেছি খেয়াল করিনি। ভাঙা গেটটার সামনে আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম, টিটন ভেতরে উঁকি দিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে বলল, “বাবারে বাবা!”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

“কিছু না।”

“তা হলে বাবারে বাবা বললি কেন?”

“ইচ্ছে হয়েছে তাই বলেছি। আমার ইচ্ছে হলে আমি বাবারে বাবা বলব, মা’রে মা বলব, চাচারে চাচা বলব, তোর কী?”

এই হচ্ছে আমাদের টিটন। তার সাথে কথা বলাই মুশকিল! কথায় কোনো ছিরি ছাদ নেই, কোনো যুক্তি নেই।

চঞ্চলও ভাঙা গেটটা দিয়ে ভিতরে উঁকি দিল। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আয় ভেতরে ঢুকি।”

টিটন বলল, “তোর মাথা খারাপ হয়েছে?”

“মাথা খারাপের কিছু হয় নাই। চল ভেতরটা কেমন দেখে আসি।”

আমরা কেউ ঢুকতে রাজি হলাম না বলে চঞ্চল একাই রওনা দিল। সেটা প্রমাণ করে আমরা সবাই ভীতুর ডিম তাই আমিও শেষ পর্যন্ত চঞ্চলের সাথে ভেতরে যেতে রাজি হলাম। আমাদের দুজনকে ভেতরে ঢুকতে দেখে অনুও ভেতরে যেতে রাজি হল তখন টিটনের আর না যেয়ে উপায় থাকল না। এমনিতে অন্য সবকিছুতে টিটনের সাহসের কোনো অভাব নেই কিন্তু ভূতের ব্যাপার হলেই তার এক ফোঁটা সাহস থাকে না।

মিশকাত মঞ্জিলের ভেতরে আমরা কখনো উঁকি দেইনি, আজ ভেতরে ঢুকে আবিষ্কার করলাম সেখানে অনেক জায়গা। বড় বড় গাছ, সেই গাছে পাখি কিচিরমিচির করছে। আসলে দালানটি বেশ অদ্ভুত, দেয়ালটি দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো দরজা-জানালা নেই। আমরা চঞ্চলের পিছু পিছু পুরো দালানটার চারদিক দিয়ে একবার ঘুরে এলাম। তখন টিটন বলল, “অনেক দেখা হয়েছে, আয় এখন যাই।”

চঞ্চল বলল, “এসেছি যখন তখন বিল্ডিংয়ের ভেতরটা দেখে যাই।”

টিটন বলল, “ভেতরে? সর্বনাশ!”

“সর্বনাশের কী আছে? দেখছিস না এখানে কিছু নাই।”

চঞ্চল একাই বিল্ডিংয়ের ভেতর ঢুকে গেল তাই শেষ পর্যন্ত আমরাও তার পিছু পিছু গেলাম। ভেতরে অনেকগুলো ঘর, সব ঘরই ফাঁকা। এক-দুইটা ঘরের দরজা আছে, বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি বলে কজায় মরচে পড়ে গেছে। খোলার সময় ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া যায়। সেখানে একটা বারান্দা, গাছের পাতা, জঙ্গল আর খড়কুটো দিয়ে ঢেকে আছে। দেয়ালে শ্যাওলা পড়েছে, এক জায়গায় ইটের ফাটলে একটা বট গাছ। দোতলার ঘরগুলো বেশ বড়। বহুদিন কেউ ব্যবহার করেনি তাই ধুলোবালি, গাছের পাতা, খড়কুটো দিয়ে বোঝাই। পিছনের দিকে একটা অংশের ছাদ ধসে পড়েছে, মনে হয় এদিকে আগুন লেগেছিল তাই সবকিছু পুড়ে গেছে।

চঞ্চল বলল, “এই মিশকাত মঞ্জিলই হতে পারে আমাদের গোপন আস্তানা।”

টিটন বলল, “কক্ষনো না।”

“কেন না?”

“আমরা কী ভূতের বাচ্চা না মানুষের বাচ্চা? ভূতের বাচ্চা হলে ঠিক আছে, মানুষের বাচ্চা হলে ঠিক নাই।”

“দেখছিস না কতো জায়গা খালি পড়ে আছে। বড় বড় গাছগুলোর কোনো একটাতে বানাব ট্রি হাউজ!”

টিটন মুখ শক্ত করে বলল, “আমার ট্রি হাউজের দরকার নাই। খালি জাগারও দরকার নাই।”

ঠিক তখন হুটোপুটির একটা শব্দ হল আর হঠাৎ করে দেখলাম ছোটখাটো ছাই রঙের একটা জন্তু কোথা থেকে যেন ছুটে বের হয়ে গেল। আমরা সবাই চমকে উঠলাম, টিটন ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।

চঞ্চল বলল, “বেজি!”

টিটন বলল, “এখন বেজি বের হয়েছে। একটু পরে বের হবে শেয়াল। তারপর বের হবে বাঘ।”

বেজিটা যেখান থেকে বের হয়েছে চঞ্চল সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আজব ব্যাপার!”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী আজব ব্যাপার?”

“বেজিটা কোথা থেকে এলো? এখানে তো দেয়াল। দেয়ালের ভেতর থেকে বেজি বের হয় কেমন করে?”

টিটন বলল, “মনে হয় ওটা বেজি ছিল না। ওটা ভূত ছিল।”

“ভূতের আর কাজ নাই, বেজি সেজে ঘুরে বেড়াবে!”

চঞ্চল দেয়ালটার কাছে গিয়ে দেয়ালটা পরীক্ষা করল, আমিও তার সাথে পরীক্ষা করলাম। নিচে একটু গর্ত, যে গর্তটা দিয়ে বেজিটা বের হয়েছে। আমি বললাম, “এই যে এই ফুটো দিয়ে বের হয়েছে।”

“কিন্তু ফুটোর অন্যদিকে কী আছে? বেজিটা থাকে কোথায়?”

“পাশের ঘরে।”

“তা হলে সে পাশের ঘর দিয়ে পালাল না কেন? এদিক দিয়ে পালাল কেন?”

অনু বলল, “তার কারণ বেজিটা তোর মতো সায়েন্টিস্ট না। সে জানে না তার দিক দিয়ে বের হওয়ার কথা। সে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অনুষ্ঠান দেখে নাই।”

“ফাজলেমি করবি না। পশু-পাখির বুদ্ধি তোর থেকে বেশি।”

আমি বললাম, “পাশের ঘরটা দেখলেই বোঝা যাবে কেন সেদিক দিয়ে বের হয় নাই। আয় দেখি।”

আমরা পাশের ঘরে গেলাম, টিটন খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের পিছু পিছু এলো, ঘরের দেয়ালটা দেখে আমরা বুঝতে পারলাম কেন বেজি এদিক দিয়ে বের হয়নি। তার কারণ এদিকের দেয়ালে কোনো ফুটো নেই! টিটন পর্যন্ত অবাক হয়ে বলল, “আজব ব্যাপার!”

আমরা তখন আবার আগের ঘরে গেলাম, ফুটোটা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, ভেতরে অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। চঞ্চল বলল, “একটা লাঠি হলে খুব ভালো হত তা হলে গর্তে ঢুকিয়ে দেখতাম অন্য দিক দিয়ে লাঠিটা বের হয় কি না।”

ঘরে নানা রকম জঞ্জাল কিন্তু লম্বা লাঠির মতো কিছু খুঁজে পাওয়া গেল না। বাইরে বড় বড় গাছ আছে তার একটা ডাল ভেঙে আনা যায় কিন্তু তার জন্যে আবার বাইরে যেতে হবে। এই মুহূর্তে কেউ বাইরে যেতে চাইছে না। চঞ্চল গম্ভীর হয়ে ঘরের চারদিকে তাকাল তারপর পা দিয়ে এক মাথা থেকে অন্য মাথা মাপল। তারপর বাইরে গিয়ে বারান্দাটা পা দিয়ে মাপল তারপর পাশের ঘরে গিয়ে মাপল। মাপামাপি শেষ হলে বলল, “ভেরি ইন্টারেস্টিং।”

“কী হয়েছে?”

“এখানে একটা গোপন কুঠুরি আছে।”

“গোপন কুঠুরি?”

“হ্যাঁ। দুইটা ঘর পনেরো পনেরো তিরিশ পা। কিন্তু বারান্দা হচ্ছে আটত্রিশ পা। তার মানে দুই ঘরের মাঝখানে আট পা লম্বা একটা ঘর। সেই ঘরের কোনো দরজা নাই।”

অনু বলল, “শুধু বেজির জন্যে একটা দরজা!”

চঞ্চল বলল, “সেই জন্যেই তো আমরা এটা আবিষ্কার করতে পারলাম! বেজিটাকে থ্যাংকু দেওয়া দরকার।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই ঘরে কী আছে?”

টিটন বলল, “গুপ্তধন!”

অনু বলল, “কিংবা মানুষের কঙ্কাল।”

চঞ্চল বলল, “আমাদের দেখতে হবে।”

“কীভাবে দেখবি?”

টিটন বলল, “শাবল দিয়ে দেয়ালটা ভেঙে ফেলতে হবে।”

চঞ্চল তখন বাড়াবাড়ি গম্ভীর মুখে বলল, “উঁহু। প্রথমে ভিতরে একটা ডিজিটাল ক্যামেরা ঢুকিয়ে ভিডিও করে দেখব কী আছে। তারপর ঠিক করব কী করা যায়।”

“তুই ক্যামেরা কোথায় পাবি?”

“জোগাড় করতে হবে।”

আমি বললাম, “দেখলি। আমরা আমাদের ব্ল্যাক ড্রাগন ক্লাবটা মাত্র খুলেছি সাথে সাথেই অ্যাডভেঞ্চার। সাথে সাথে গুপ্তধন!”

অনু বলল, “সাথে সাথে বেজি। সাথে সাথে গুইসাপ!”

আমি বললাম, “মোটেও গুইসাপ না। বেজি।”

টিটন বলল, “ভূত!”

“কোথায় ভূত?”

“এই গোপন ঘরটার ভিতরেই মনে হয় আটকা আছে। দেয়ালটা ভাঙতেই হাউমাউ করে বের হবে।”

চঞ্চল বলল, “যদি বের হয় তা হলে সেটা হবে গুপ্তধন থেকেও দামি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে সেটা কোটি টাকায় বিক্রি করতে পারবি?”

অনু বলল, “যদি ভূতটা ভালো হয় তা হলে তাদেরকে আমাদের ক্লাবের মেম্বারও করে ফেলতে পারি!”

টিটন গরম হয়ে বলল, “খবরদার ভূত নিয়ে ঠাট্টা করবি না।”

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *