০১-৫. বাড়ি ফিরছিল তিতির

কাছের মানুষ – উপন্যাস – সুচিত্রা ভট্টাচার্য

বাস থেকে নেমে প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরছিল তিতির। দেরি হয়ে গেছে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। মা এত করে তিনটের মধ্যে ফিরতে বলল, সেই এখন তিনটে চল্লিশ। কী কুক্ষণে যে দেবস্মিতার বাড়ি গেল আজ!

তিতিরের আজ বাড়ি থেকে বেরোনোর একটুও ইচ্ছে ছিল না। কি করবে, বন্ধুরা জোর করে টেনে নিয়ে গেল। মাধ্যমিক পরীক্ষা কবে শেষ হয়ে গেছে, মাসখানেক কারুর সঙ্গে যোগাযোগ নেই তাই আজ জোর আড্ডার আয়োজন। দেবস্মিতাদের বাড়ি। গেটটুগেদার। লাঞ্চ। অবিরাম ভিডিও। হই-হল্লা। অমন একটা দঙ্গলে গিয়ে পড়লে সহজে ছাড়ান পাওয়া যায়!

দোকানপাট এখনও খোলেনি। চৈত্রের দুপুর সবে দিবানিদ্রা সেরে আড়মোড়া ভাঙছে। রোদের ঝাঁঝ এখনও বেশ প্রখর।

লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হল তিতির। বেঁটে পাঁচিল ঘেরা আধবুড়ো বাড়িটার সামনে এসে হাঁপ জিরোল দুপলক। মরচে ধরা লোহার গেট হাঁ হয়ে আছে। যেমন থাকে। গ্যারেজঘরে প্রেস চলছে। যেমন চলে। সদর বন্ধ।

কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে গেছে। খুলেছে সন্ধ্যার মা। তাকে ভেদ করে বড়ঘর টপকে গেল তিতির। কোনওদিকে না তাকিয়ে ওপরে উঠছে। উঠতে উঠতে তীর ছুঁড়ে চলেছে, মা কখন বেরোল?

-এই তো মিনিট দশেক।

–একা গেল?

সঙ্গে তোমার দাদা গেছে।

কিছু বলে গেছে?

–কই না তো!

সন্ধ্যার মা’র শেষ উত্তরের আগেই তিতির দোতলায়। বাঁয়ে কাকিমাদের ঘর তালা বন্ধ। ডান দিকে তিতিরদের ঘর দুটোও। মাঝখানের প্যাসেজে একা একা গড়াগড়ি খাচ্ছে রোদ্দুর।

চাবি কোথায় আছে তিতির জানে। প্যাসেজের মাঝামাঝি টেলিফোন স্ট্যান্ড, স্ট্যান্ডের ঢাকার নিচে চাবি রেখে যায় মা।

ধীরেসুস্থে দুটো ঘরেরই তালা খুলল তিতির। নিজেদের ঘরে ঢুকতে গিয়েও কি ভেবে পাশের ঘরে এসেছে। ইশ, যা ভেবেছে তাই। বিশ্রী ছত্রাকার হয়ে আছে গোটা ঘর। এতদিন পর বাবা বাড়ি ফিরবে, আজও এ ঘর এমন অগোছাল থাকার কোনও মানে হয়!

ঝটপট চোখ মুখে একটু জল দিয়ে এসে কাজে নেমে পড়ল তিতির। ত্বরিত হাতে। লঘু ছন্দে। বাবার খাটে ফরসা চাদর বিছিয়ে দিল একটা। সব দিক টান করে তোশকের নিচে গুঁজে দিল সযত্নে। পরিষ্কার পিলোকভার বার করে ঢাকা পরাল বালিশে, পরিপাটি করে মাথার দিকে রাখল। চেপে চেপে ফুলিয়ে দিল বাবার প্রিয় গোদা পাশবালিশ। খাটের বাজুতে বাবার পাজামা পাঞ্জাবি ভাঁজ করে রাখল, সঙ্গে সাদা তোয়ালে। দ্রুত হাতে কোনার টেবিল সাফসুফ করে নিল একটু। দাদার বিদেশি ডটপেন টেবিলের তলায় গড়াচ্ছে, তুলে ড্রয়ারে ভরল। ময়ুরপাখা ঝাড়ন আলতো বোলাল কাঠের আলমারির গায়ে, টেবিলে, বুককেসে, দাদার বিছানায়। আলনাতে ডাঁই প্যান্টশার্ট পাজামা সবই প্রায় দাদার, আলগা গুছিয়ে রাখল এক এক করে।

উফ, দাদাটা যেন কী! সব কিছুতে এত আমার আমার ভাব অথচ একটা জিনিসের ওপর এতটুকু মায়া নেই! দামি অ্যাভিস জিনসটা পর্যন্ত হেলাফেলায় মাটিতে গড়াচ্ছে! টু-ইন-ওয়ানের চতুর্দিকে গাদাখানেক ক্যাসেট যেমন তেমন ছড়ানো!

দাদার জিনস আলমারিতে তুলে তিতির দরজায় সরে এল। ঘাড় অল্প কাত করে ভুরুতে ভাঁজ ফেলে নিরীক্ষণ করল পুরো ঘরটাকে। নাহ্, মোটামুটি মন্দ সাজানো হয়নি। দেরি করে বাড়ি ফেরার ঝাড়টা বোধহয় বেঁচে গেল।

নিজেদের ঘরে এসে সালোয়ার কামিজ ছেড়ে নাইটি পরল তিতির। নিজেদের ঘর মানে তিতির আর তিতিরের মা’র ঘর। এ ঘরে কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা নেই। ব্রিটিশ আমলের কুড়ি বাই ষোলো ঘরে ডবল বেড খাট আলমারি ড্রেসিংটেবিল টিভি শোকেস, সবই ঝকঝকে তকতকে। শুধু আলোটাই যা কম এ ঘরে। সকালের দিকে পুবের জানলা দুটো দিয়ে তাও যা হোক আলো আসত, পাশেই পাঁচতলা ফ্ল্যাট উঠে রুখে দিয়েছে আলোটুকু। উত্তরের জানলারাই যা ভরসা এখন। তবে ওই দুটো জানলা দিয়েও বাইরের খুব একটা কিছু দেখা যায় না। নীচের এক ফালি জংলা ঝোপ, ঝোপের গায়ে তিতিরদের আধভাঙা পাঁচিল, তার পাশে কাচের টুকরো বসানো এক খাড়াই দেওয়াল, দেওয়ালের ওপারে রুন্টুদের ডানামেলা চারতলা বাড়ি আর এক চিলতে আকাশ, ব্যস।

এতে অবশ্য কাজ চলে যায় তিতিরের। জানলার সামনে চোখ বুজে দাঁড়ালে ঠিক একটা গন্ধ পেয়ে যায় সে। তাদের বাড়ির সামনের দিকের খোলামেলা জায়গাটার গন্ধ। রোদে পোড়া দুপুর ক্রমশ জুড়িয়ে আসার গন্ধ। মায়াবী বিকেল মাখা পৃথিবীর গন্ধ। ওই ঘ্রাণ বলে দেয় সামনের রাস্তায় লোক চলাচল বাড়ছে, না কমছে, উল্টো পারের লালে লাল কৃষ্ণচূড়া গাছ কতটা ঝুঁকে আছে বুড়োটে বাড়িটার দিকে, সাইকেল রিকশার অবিরাম হাঁকাহাঁকিতে কিভাবে টগবগ ফুটছে গোটা পাড়া, রোদ্দুর কেমন বিরস মুখে সরে যাচ্ছে ঢাকুরিয়া ব্রিজের দিকে।

ইচ্ছে করলে তিতির অবশ্য দৃশ্যগুলো চর্মচক্ষেও দেখতে পারে। সামনের ঝুলবারান্দায় গিয়ে। তবে এখন তার জো নেই। বারান্দাটা তার বড় কাকার। লাগোয়া ঘর দুটোতে তালা এখন। কাকিমা আউট। আজ শনিবার, অ্যাটমকে নিয়ে আঁকার ক্লাসে গেছে কাকিমা, সেখান থেকে সুইমিং ক্লাব ঘুরিয়ে টেবিল টেনিস কোচিং-এ নিয়ে যাবে। ফিরতে কম করে সাতটা।

তিতির উত্তরের জানলায় এসে দাঁড়াল। গ্যারেজ ঘর থেকে একটানা শব্দ ভেসে আসছে। মোটা মোটা দেওয়াল টপকে নিচের ওই আওয়াজ দোতলার এই পিছন দিকটায় তেমন প্রকটভাবে পৌঁছয় না। তবু শব্দটা থাকে সারাদিন। ঘটাংঘট। ঘটাংঘট। কোলাহলহীন সময়ে ওই একঘেয়ে শব্দের সুরে বড় নির্জন হয়ে ওঠে বাড়িটা।

অথচ বাড়ি এখন ঠিক তত নির্জনও নয়। তিতির জানে, এ মুহূর্তে একতলার ঘরে দাদু আছে, ছোটকাকারও বাড়ি থাকা বিচিত্র নয়, সন্ধ্যার মাকে তো দেখেই এল, মিনতিদিও নিশ্চয়ই টুকটাক কাজ সারছে একতলায়। এ ছাড়া প্রেসঘরে মেশিনদাদু আর কম্পোজিটার দুজন তো আছেই। তবু যে কেন বাড়িটাকে এত নিঝুম লাগে এখন!

মেঘহীন আকাশ অনেক উঁচুতে উঠে আছে। রুন্টুদের বাড়ির ডগায় লেপটে আছে নিস্তেজ সূর্যরশ্মি। ভাঙা পাঁচিল টপকে একটা ছোট্ট ঘূর্ণি ঢুকে পড়ল জংলা ঝোপে। কাঠিকুটি কুড়িয়ে পালাতে গিয়েও নেমে যাচ্ছে বার বার। পাক খেয়ে মরছে।

হঠাৎই তিতিরের মনের ভেতর থেকে অন্য মন কথা বলে উঠল, তিতির, তোমার বাবা আজ আসবে না।

তিতির শিউরে উঠল। কেউ জানে না তিতিরের আসল মনটার ভেতরে, অনেক অনেক ভেতরে, আলাদা একটা ছোট্ট মন ঘাপটি মেরে থাকে। খুব ছোট্ট। সর্ষের্দানার মতন। না না, তার থেকেও ছোট। পোস্তদানার মতন। হুটহাট যত সব বেয়াড়া কথা বলতে শুরু করে মনটা। যা ইচ্ছে তাই বলে। আর আশ্চর্য, কথাগুলো সব ফলেও যায়!

এই যেমন কাল রাত্রে মা খাটে বসে স্কুলের খাতা দেখছে, তিতিরের চোখ শব্দ কমানো  টিভির পর্দায় মগ্ন, দুম করে মনটা বলে উঠল, একটু পরেই বাড়িতে একটা হল্লাগুল্লা হবে তিতির।

তিতির বলল,- বেট!

–বেট।

হলও তাই। দাদা আড্ডা মেরে নটার পর বাড়ি ফিরল, ফিরেই ও ঘরে গাঁকগাঁক করে রোলিংস্টোন চালিয়ে দিয়েছে, মা খাতা ফেলে ও ঘরে গিয়ে কি বলল, ওমনি সঙ্গে সঙ্গে ধুন্ধুমার! দাদা কাঁই কাঁই করতে করতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, রাত্তির এগারোটা অবধি তার টিকিটি নেই।

গত মাসে শেষ রোববার ছোটকাকা বলল পার্ক স্ট্রিটে চাইনিজ খাওয়াবে। সন্ধে থেকে সেজেগুজে বসে আছে তিতির, টুক করে মন বলল, ড্রেসটা ছেড়ে ফ্যালো তিতির, ছোটকাকা আজ তোমার কথা ভুলেই গেছে।

তিতির বলল,– লাগি শর্ত?

– লাগি শর্ত।

ও মা, অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল কথাটা। ছোটকাকা সেদিন বাড়িই ফিরল না। ফিরল পাঁচ দিন পর। কোন ফিল্ম-পার্টির সঙ্গে নাকি আউটডোরে চলে গিয়েছিল। চাঁদিপুর। ফিরে এসে দু হাতে কান মুলল,–এমা, একদম তোর কথা মনে ছিল না রে!

পোস্তদানা মন আবার কুনকুন করছে, তোমার বাবা আজ রিলিজ হবে না তিতির।

তিতির বিড়বিড় করে বলল, হতেই পারে না। হসপিটালে কাল আমার সামনে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে মার কথা হয়েছে। আজ বাবাকে ছেড়ে দেবে। মা, দাদা এক্ষুনি এসে পড়বে বাবাকে নিয়ে।

-নো চান্স। তোমার বাবা আজ আসতেই পারে না।

–ইশশ, বাবা আজ আসবেই।

 কক্ষনও না।

বিস্বাদ মুখে জানলা থেকে ফিরল তিতির। বাবা আজ দু সপ্তাহ হল বাড়ি নেই। ঠিক ঠিক হিসেব করলে পুরো পনেরো দিন। যদি অবশ্য হসপিটালে ভর্তি হওয়ার রাতটাকে বাদ দেওয়া হয়। কদিন ধরেই মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা হচ্ছিল বাবার, টুকটাক পেইন কিলার খেয়ে চেপে রাখছিল। সেদিন সন্ধেবেলা যন্ত্রণায় প্রায় সেন্সলেস। ডাক্তার অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতাল সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। কি কেস? না, লিভার গেছে। তা লিভারের আর দোষ কি! তার ওপরে তো কম অত্যাচার যায় না! কেন যে বাবা ওসব ছাইপাঁশ গেলে! ভাল লাগে না, একটুও ভাল লাগে না তিতিরের। এবার থেকে বাবাকে কড়া ওয়াচে রাখতে হবে।

প্যাসেজে ফোন বাজছে। অন্যমনস্ক পায়ে ফোনের দিকে গেল তিতির।

–কে? তিতির কথা বলছ? আমি ছন্দা আন্টি।

 তিতির সামান্য উচ্ছ্বসিত হল, কেমন আছ আন্টি?

–ভাল। তোমার বাবা বাড়ি চলে এসেছেন?

এখনও আসেনি। মা আনতে গেছে।

–ও। আচ্ছা, তোমার আঙ্কল হসপিটালে গেছে কিনা জানো?

না তো আন্টি। দাদা গেছে। আঙ্কলেরও কি হসপিটালে যাওয়ার কথা?

–ও, তুমি জানো না? আসলে তোমার আঙ্কল, নার্সিংহোম থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল তো, আমি ভাবলাম বোধহয় তাহলে যাবে। … দেশ থেকে লোক এসেছে জরুরি খবর নিয়ে …

–আজ আঙ্কলের ল্যান্সডাউনের চেম্বার আছে না?

–হাঁ। ঠিক আছে, আমি একটু পরে ওখানেই ফোন করে নিচ্ছি। তোমরা সবাই কেমন আছ? ভাল আছ তো?

-হ্যাঁ আন্টি। টোটো কেমন আছে?

–টোটো আর বাড়ি থাকে কই! পরীক্ষার পর থেকে তো সারাক্ষণ উড়ছে। রাখি এখন, কেমন?

টেলিফোন রেখেও রিসিভারটা খানিকক্ষণ ছুঁয়ে রইল তিতির। ডাক্তার আঙ্কল কি গেছে হসপিটালে? যেতেই পারে। বাবাকে নিয়ে যা ভাবনা আঙ্কলের! মা-টা যেন কী! কতবার করে আঙ্কল বাবাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করতে বলল, মা কেয়ারই করল না! কী এমন হাতিঘোড়া খরচা হত নার্সিংহোমে রাখলে! ডাক্তার আঙ্কলের রেকমেন্ডেশান থাকলে ঠিক ডিসকাউন্ট পাওয়া যেত। মা কিছুতেই কথা শুনল না। এত্ত জেদ মা’র!

তিতিরের বাবা আর বড়কাকার পৃথক পৃথক দুই এলাকার মাঝখানে চওড়া প্যাসেজটা অনেকটা সেতুর মতো। পশ্চিমে সার সার তিনটে কাচের জানলা, মাথায় লাল নীল সবুজ কাচের নকশা। শেষ বেলার আলো পড়ে রঙের মলিন ছটা তিরতির করে কাঁপছে প্যাসেজে।

তিতির কাঁপনটা দেখছিল। দেখছিল আর ভাবছিল নার্সিংহোমে কত আরামে থাকতে পারত বাবা! ধবধবে ঘর! মিল্ক হোয়াইট নরম বিছানা! এসির আরাম। সদাসতর্ক সেবা! তার বদলে হসপিটালের ওই আধানোংরা পেয়িং বেড, ছারপোকা, ধেড়ে-ইঁদুর আর নিমপাতা খাওয়া নার্স!

মা কি বাবাকে আরও কষ্ট দিতে চায়!

 তিতির পায়ে পায়ে নেমে এল একতলায়।

নীচে কন্দর্পের ঘর তালাবন্ধ। মানে ছোটকাকা হাওয়া। তিতির বড়ঘরে উঁকি মারল। জয়মোহন এক মনে বসে পেশেন্স খেলছেন।

ঘরে ঢুকতে ঠিক সাহস পাচ্ছিল না তিতির। সে নাইটি পরে রয়েছে, নাইটি পরে নীচে ঘোরাঘুরি করলে তার দাদু রাগ করেন।

জয়মোহন নাতনির উপস্থিতি টের পেয়েছেন, ডাকলেন, আয়।

দোনামোনা করে শেষ পর্যন্ত তিতির ঢুকেই পড়ল।

সামনের দিকের ওই ঘর এ বাড়ির যৌথ সম্পদ। আগে নাম ছিল বৈঠকখানা, এখন বলে বড়ঘর। নামই বদলেছে, চেহারা নয়। জন্ম থেকে এ ঘরের খুব একটা বদল দেখেনি তিতির। মেঝে থেকে একটুখানি লতাপাতা আঁকা সবজে দেওয়াল। কড়ি বরগা থেকে লম্বাডাঁটি ফ্যান ঝুলছে। তিন দেওয়ালে তিনটে পালিশ ওঠা কাচের আলমারি, পুতুল আর কাপ-মেডেলে ঠাসা। পিছন দেওয়ালে এক অভিসারিকার অয়েল পেন্টিং। বিবর্ণ। পাশের দেওয়ালে একটা হলদেটে বাঁধানো ছবি। জয়মোহনের বাবা দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ অফিসার রায়বাহাদুর কালীমোহন ব্রিটিশ গভর্নরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন। প্রখর অনুমানশক্তি ছাড়া পঞ্চান্ন বছর আগের তোলা ওই ছবির নাক মুখ চোখ কিছুই বোঝা যায় না। তবু ঝুলছে ছবিটা। ঘরের মাঝ বরাবর গোটা পাঁচেক সাবেকি আমলের টানা সোফা ইউ শেপে সাজানো। রঙ-জ্বলা কাশ্মীরি কার্পেট। ঢাউস সেন্টার টেবিল।

সেন্টার টেবিলে ছড়িয়ে রয়েছে তাস। সেদিক থেকে চোখ না তুলে জয়মোহন বললেন, মিনতি কী করছে রে? এখনও আমার ছানা দিল না!

–দেবে, দেবে। ছটফট করছ কেন?

–আর কখন দেবে! পাঁচটা বেজে গেল, এরপর আর হজম হবে?

মিনতি সুদীপদের রাতদিনের কাজের লোক। জয়মোহনের দেখাশুনা করার জন্য সুদীপ একটা আলাদা টাকাও দেয় তাকে। তবু প্রয়োজনের সময়ে জয়মোহনের সঙ্গে একটা সূক্ষ্ম লুকোচুরি খেলা চলে তার।

তিতির হাঁক দিল, মিনতিদি, দাদুকে ছানা দাওনি এখনও?

মিনতির বদলে রান্নাঘর থেকে তিতিরদের সন্ধ্যার মার উত্তর ভেসে এল, মিনতি তো এখানে নেই।

নির্ঘাত মেশিনঘরে গেছে। এত চুলবুলি হয়েছে মেয়েটার।

তিতির ফিক করে হেসে ফেলল। দাদুর মুখের যা ভাষা হচ্ছে দিনদিন। মিনতিদিও পারে। স্বামী নেয় না, দু বেলা পেটের ভাত জুটত না, কোথায় প্রাণ ঢেলে কাজ করবি, তা নয় কাকিমা না থাকলেই পুট করে প্রেসে চলে যায়। দুই কম্পোজিটারের সঙ্গেই সমান তালে মোহব্বত চালিয়ে যাচ্ছে।

তিতির বলল,-সন্ধ্যার মা আমাদের কি জলখাবার করছে দেখব? খাবে কিছু?

দ্যাখ। যদি বেশি তেল-ফেলে ভাজা না হয় দিতে বল একটু।

 রান্নাঘর থেকে ঝপ করে ঘুরে এল তিতির, ঘুগনি করছে। চলবে?

বল একটু দিতে। ক্ষিদে পেয়েছে। দীপু আসুক, ওই মিনতিটাকে আমি তাড়াচ্ছি।

–ওর পেছনে আদাজল খেয়ে লাগলে কেন? তিতির হাসছে, তাস দ্যাখো। মিলল একবারও?

এবার মিলে যাবে। তুই ঘুগনিটা দ্যাখ।

 দাদুর জন্য ঘুগনি এনেও একটু সিঁটিয়ে গেল তিতির। খুব অল্পই এনেছে, তবু কাকিমা জানতে পারলে ঠিক বকাবকি করবে। তিতিরদের ঘর থেকে দাদুর আবোল-তাবোল খাবার দেওয়া কাকিমা একদম পছন্দ করে না। কাকিমাকেও দোষ দেওয়া যায় না। একটুতেই এমন পেটখারাপ হয়ে যায় দাদুর!

জয়মোহনের শরীর ভাল মতোই গেছে। হার্টের অসুখ তাঁর বহুদিনের, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই। না ভুল হল। তার আগে থেকেই শরীর ভাঙছিল। বারো বছর আগে ব্যবসাটা পুরোপুরি উঠে যাওয়ার পর থেকেই ভাঙনের শুরু। তবু তখনও বিস্তর হাঁটাচলা করতেন। ছোট্ট তিতিরকে নিয়ে লেকে চক্কর তো বাঁধা রুটিন ছিল তাঁর। তিতির নিজের মনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে চরে বেড়াত, বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা জমাতেন জয়মোহন। ফিরে এসে মগ্ন থাকতেন রেডিওতে। পরের দিকে টিভিতে। সাত বছর আগে স্ত্রী গত হলেন, জয়মোহনের নিশ্বাসের কষ্টও বাড়তে লাগল। বাইরে বেরোনো কমে এল ক্রমশ। মেজাজও ক্রমে তিরিক্ষি। গত বছরের আগের বছর থেকে মানুষটা সম্পূর্ণ ঘরবন্দি। হৃদযন্ত্রে নতুন উপসর্গ এসেছে। ডাইলেটেড হার্ট। লেকের এক-আধজন পুরনো বন্ধু তাও এখনও দেখা করতে আসেন মাঝে মাঝে। ভারী, কিন্তু বাইরের পৃথিবীর বাতাসের মতো। সারাদিন ধরে জয়মোহনের এখন তিনটিই কাজ। পেশেন্স। খিটখিট। আর খাইখাই।

তাস ফেলে চাকুম-চুকুম শব্দে ঘুগনি খাচ্ছেন জয়মোহন। শেষ মটরদানাটাও তারিয়ে তারিয়ে চুষলেন। তারপর বাঁধানো দাঁতে একটু চিবিয়ে কোঁৎ করে গিলে ফেললেন দানাটা।

–তোদের সন্ধ্যার মা তো বেশ বানিয়েছে রে!

–তাই?

একটু ভাজা জিরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলে আরও ভাল হত।

–একেই বলে নোলা! তিতির মৃদু ধমক দিল, তোমার তাসটা এবার মেলাও।

 জয়মোহন টাগরায় জিভ বোলাচ্ছেন, ধুস, ও আর মিলবে না।

–হাল ছেড়ে দিলে?

–হাল তো ছেড়ে বসেই আছি রে বুড়ি। এখন শুধু ধৈর্যের পরীক্ষা। কথাটা বলেই হঠাৎ থম মেরে গেলেন জয়মোহন। খুব বেশি ভাল লাগার মুহূর্তে, অথবা খুব বিষণ্ণ সময়ে জয়মোহন তিতিরকে বুড়ি বলে ডেকে ওঠেন। তিতিরের ঠাকুমার দেওয়া নামে।

তিতির নিষ্পলক দেখছিল জয়মোহনকে। এক সময়ে কত মজার মজার গল্প বলত দাদু! নিজের ছোটবেলার গল্প। এই ঢাকুরিয়া জায়গাটার শহর হয়ে ওঠার গল্প। কোথায় জলা ছিল, কোথায় আমবাগান ছিল, কোথায় শেয়াল ডাকত সব যেন দাদুর ঠোঁটের ডগায় ঘুরে বেড়াত সারাক্ষণ। তিতির শুনতে না চাইলেও দাদু শোনাবেই। ভাঙা রেকর্ডের মতো একই গল্প। একই ইতিহাস।

কবে থেকে সব গল্প ফুরিয়ে গেল দাদুর!

ঘরে আলো এখন অতি ক্ষীণ। চশমা খুলে চেপে চেপে দু চোখ ঘষছেন জয়মোহন। দৃষ্টি বাইরের মরা দিনের দিকে। আনমনে বলে উঠলেন,- তোর মা এখনও ফিরল না যে বড়।

প্রশ্নটা মাকে ঘিরে নয়, বাবাকে ঘিরে। তিতির বুঝল। বাবার সঙ্গে ইদানীং দাদুর বাক্যালাপ প্রায় বন্ধ। কাট্টি। মুখোমুখি হলেই দুজনে লাল চোখে দেখে দুজনকে। গরগর। ঘড়ঘড়। তবু বাবাকে নিয়েই দাদুর সব থেকে বেশি উদ্বেগ। তিতির এ কথাও বোঝে।

তিতির কোমল স্বরে প্রশ্ন করল, তোমার মন কেমন করছে, না দাদু?

–উঁ-উঁ? কই, না তো।

লাই।

 কার জন্য মন কেমন করবে? ওই কুলাঙ্গারটার জন্য? মদোমাতালটার জন্য?

দাদু ভাল হবে না। তুমি যাকে গালাগাল করছ, সে কিন্তু আমার বাবা।

–তোর বাবা তো আমার কি? সে আমার ছেলে নয়? তার সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারব না!

পারবে। আমার আড়ালে।

ইহহ, খুব যে বাবার জন্য দরদ! তোর বাবা তোর দিকে তাকায়? তোদের কথা ভাবে? ফুলের মতো ছেলেমেয়ে দুটো ফুটে উঠল, কোনওদিন তাদের চোখ মেলে দেখেছে? সারাক্ষণ তো চুর হয়ে আছে।

–আহ দাদু!

–তুইই শুধু ফোঁস করিস, তোর দাদা মোটেই এত সাপোর্ট করে না বাবাকে। বাপ্পা তোর বাবার নামে কত ঝুড়ি ঝুড়ি নালিশ করে যায় জানিস?

–জানতেও চাই না। সাপোর্টও করি না। তিতির উঠে ঘরের টিউব লাইট জ্বেলে দিল। আবার এসে বসেছে জয়মোহনের সামনে– বাবার অনেক দুঃখ আছে, এ কথা তো এগ্রি করবে?

–তুই আর প্যালা দিস না। কিসের দুঃখ, অ্যাঁ!

বা রে, বাবার একটা বিজনেসও লাগল না যে! দুধের এজেন্সি নিল, লোকে টাকা মেরে দিল। ক্যাটারিং-এর বিজনেস ধরল, জমল না … প্রেসটা..

–ও ব্যবসার জানেটা কি, যে জমবে? জয়মোহন তপ্ত হলেন, আমার রানিং বিজনেসটাকে এক্কেবারে শুইয়ে দিল! লোনের পর লোন তুলে গেল ব্যাঙ্ক থেকে, ও ডি বাড়িয়েই যাচ্ছে, এদিকে পার্টিকে ক্রেডিটে মাল দেওয়ার কোনও কমতি নেই। আর টাকা আদায়ের সময় বাবু চিৎপাত হয়ে শুধু ঠ্যাং নাচাচ্ছেন!

লোন, ও ডি, ক্রেডিটের মারপ্যাঁচ বোঝে না তিতির। তবে হ্যাঁ, বাবা লোকটা একটু কুঁড়ে আছে। মা বলে ঠাকুমাই নাকি পুতুপুতু করে বাবার বারোটা বাজিয়েছে। যে যাই বলুক, বারোটা বাজা লোকদের কি বাবার মতো অত বড় একটা মন থাকে? এই দুনিয়ার সব লোকই যে ভাল এটা ভাববার মতো হার্ট কটা আছে? বাবার ছাড়া?

জয়মোহন সমানে গজগজ করে চলেছেন, বাবার কথা ভুলে যা। মাকে দেখে শেখ। যে দিন থেকে তোর বাবার প্রেসার হাল ধরেছে সেদিন থেকেই কেমন চলছে রমরমিয়ে! দুর্লভ তো বলছিল, ও নাকি আর একা হাতে সামাল দিতে পারছে না, আরেকটা মেশিন বসালে ভাল হয়।

জাগতিক সব বিষয়েই ইন্দ্রাণীর দক্ষতা অসীম। ইন্দ্রাণী অনেক বেশি হিসেবি। গোছানো। গভীর শৃঙ্খলাপরায়ণ। আদিত্যর থেকে সে অনেক বেশি বুদ্ধি রাখে। এসব তিতিরের ছোট থেকে দেখা। তিতিরের ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর কী নিপুণ চালে সংসারটাকে ভাগ করে নিল ইন্দ্রাণী। আদিত্যর প্রেসের তখন টরেটক্কা দশা, ইন্দ্রাণীর তখন শুধু স্কুলের চাকরিটাই সম্বল, তবু ইন্দ্রাণী আর দেওরের বোঝা হয়ে থাকতে চায়নি। সুদীপ অনেক বড় চাকরি করে, গোটা সংসার সে মুখ বুজে টেনেছে অনেক দিন, তাও ইন্দ্রাণী বুঝতে পারত সুদীপ যা করে সবটাই তার বাবা-মা’র মুখ চেয়ে। করে। দাদা-বৌদিদের ভালবেসে নয়। মার শ্রাদ্ধের সময় কথাটা বেশ ফুটে উঠেছিল তাদের হাবভাবে। সুদীপেরও। রুনারও। পৃথগন্ন হওয়ার সময় সুদীপ স্বেচ্ছায় ভার নিল বাবার, চতুর খেলোয়াড়ের মতো ইন্দ্রাণী মেনে নিল ব্যবস্থাটাকে। আদিত্য হাউমাউ করা সত্ত্বেও। ইন্দ্রাণী জানত শ্বশুরকে তখন তার কষ্টেশিষ্টে দু বেলা ভাত দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো আছে, কিন্তু বুড়ো মানুষের ভাতই সব নয়। শ্বশুরমশাইয়ের হার্টের অসুখ দিন দিন বাড়ছে, তাঁর ডাক্তার ওষুধের রাজসিক খরচা চালিয়ে যাওয়া তার সাধ্যের বাইরে। যদি জোর করে ভার নেয়ও, বাপ্পা তিতিরের টিউটর ছাড়াতে হবে, তাদের দুধটা মাছটা বন্ধ করতে হবে, আরও অনেক ছোটখাট সাধআহ্লাদ বিসর্জন দিতে হবে বহুদিনের জন্য। এত সব তথ্য তিতির জেনেছে তার মার ক্রোধের সংলাপ থেকে।

শুধু একটা কথাই তিতিরের মাথায় ঢোকে না। মা কেন জোর করে ছোটকাকাকে টেনে নিল নিজের ভাগে? ছোটকার তো রোজগারপাতির কোনও স্থিরতাই নেই! কবে, কোন জন্মে একটা সিনেমায় বা টিভি সিরিয়ালে একটা রোল পাবে, সেই অ্যাক্টিং-এর টাকাও হয়তো খেয়েই উড়িয়ে দেবে, নয়তো নিজের স্কুটারে পোড়াবে, তবুও?

সন্ধ্যার মা ঘুগনি দিয়ে গেছে, তিতির অন্যমনস্ক মুখে বাটিতে চামচ ডোবাল। মার আরও অনেক আচরণেরই থই পায় না তিতির। গত মাসে তিতিরের মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ে দাদা তিন দিন পৌঁছে দিয়ে এল তাকে, একদিন স্কুটারে ছোটকাও। বাকি ক’দিন রোজ বাবাই সঙ্গে গেছে, নিয়েও এসেছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে সেন্টারের গেটে। মা একদিনও গেল না, নিয়েও এল না। অথচ দাদার হায়ার সেকেন্ডারির সময়ে মা স্কুল থেকে ফিরেই ছেলেকে টিফিন দিতে ছুটত। পড়িমরি করে। তিতির যেদিন প্রথম বড় হল সেদিনও মা তাকে কিছুই শেখায়নি। কাকিমা বুঝিয়ে দিয়েছিল সব। আদর করে। ভালবেসে।

মা দাদাকে অনেক বেশি ভালবাসে। বাসুক গে যাক, তিতিরের বাবা আছে।

বাইরে ট্যাক্সির শব্দ। তিতির লাফিয়ে উঠেও বসে পড়ল। জয়মোহনও নড়েচড়ে উঠেছেন। মিটারের টুং টুং-এ দুজনেই টানটান।

ইন্দ্রাণীরা নয়, রুনা ফিরল।

রুনা ঘরে ঢোকার আগে মিসাইলের বেগে ছুটে এসেছে আট বছরের অ্যাটম। ঘরে ঢুকেই সাঁ সাঁ দুটো পাক খেয়ে নিল।

পোস্তদানা মন কি আজও জিতে যাবে?

তিতির নিবে গিয়েও সামলে নিল নিজেকে, কি রে, তোর টিটি ক্লাস আজ হল না?

হচ্ছে। আমি করলাম না। দাদুর তাসগুলো ঘাঁটছে অ্যাটম।

তিতির চোখ নাচাল,– কেন?

–সুইমিং-এর সময় মাসলপুল হল তো, তাই।

রুনা স্তব্ধ চোখে ছেলের লাফঝাঁপ দেখছিল, গটগট করে ভেতরে এল, ছেলের কান ধরে টানল হিড়হিড়,- এই তোমার মাসলপুল, অ্যাঁ? বাড়ি এসেই তিড়িংবিড়িং? চলো, তোমার হবে আজ।

অ্যাটম ঝাঁকি দিয়ে কান ছাড়িয়ে নিল, আমার তখন সত্যিই পায়ে ব্যথা লাগছিল। বাড়ি এসে ভ্যানিশ হয়ে গেল।

–পাজি কোথাকার! তিতির ভাই-এর গাল টিপে দিল, আজ কী ড্রয়িং শিখলি রে?

–কোকোনাট ট্রি আর ভেজিটেবলস।

জয়মোহন নীরবে শুনছিলেন, টকাস করে বললেন, বেগুন কী করে আঁকতে হয় শিখেছিস?

–বেগুন? মানে ব্রিঞ্জল? বোধহয় শিখেছি। অ্যাটমকে খানিক চিন্তান্বিত দেখাল, কেন বলো তো?

অনেক দিন বেগুন ভাজা খাওয়া হয়নি। একটা এঁকে দিস তো, ভেজে খাব।

বান ঠিক জায়গাতেই বিঁধেছে। রুনার ভুরুতে ভাঁজ, খেতে শখ হয়েছে বললেই হয়। অত প্যাঁচের কি দরকার?

–থাক। জয়মোহন দমে গেলেন, ডাক্তার বারণ করেছে, কোত্থেকে আবার কি হবে?

রুনা কথা বাড়াল না। তিতিরের দিকে ফিরল, দিদিরা এখনও ফেরেনি? প

লকে তিতিরের মুখ আবার ফ্যাকাশে, কি জানি কি করছে মারা!

রুনা অ্যাটমের হাত ধরে দরজার দিকে টানল। অ্যাটম এখনই ওপরে যেতে রাজি নয়। কাতর অনুনয় জুড়েছে- আরেকটু থাকি না মা এ ঘরে। দাদু আমাকে কার্ডস চেনাবে।

না। তোমাকে সামস প্র্যাকটিস করতে হবে।

 কাল তো সানডে মা। কাল করব।

কালও করবে। আজও করবে। লাস্ট উইকের ক্লাস টেস্টে তুমি দুটো কেয়ারলেস মিসটেক করেছ। টুয়েন্টিতে সিক্সটিন পেয়েছ, লজ্জা করে না!

অ্যাটমের ঘাড় ঝুলে গেল। বোধহয় লজ্জাতেই। তাকে নিয়ে রুনা যখন প্রায় সিঁড়ির মুখে, জয়মোহন চেঁচিয়ে বললেন, আজ কিন্তু মিনতি আমাকে ছানা দেয়নি।

রুনার উত্তর উড়ে এল, আজ দুধ আসেনি। কাগজে দেখেননি, আজ গভর্নমেন্টের দুধের গাড়ির স্ট্রাইক।

–তাহলে তোমরা চা খাচ্ছ কী দিয়ে?

 -গুঁড়ো দুধ। ওতে ভাল ছানা হয় না।

–অ।

জয়মোহন ঝিম মেরে গেলেন।

দাদু-নাতনি বসে আছে শব্দহীন। টিউব লাইটের আলোতেও ঘরটা কেমন যেন নিষ্প্রভ। বাইরের অন্ধকার থেকে একটা হাওয়া ঘুরে ফিরে আসছিল। সঙ্গে পথচলতি লোকেদের টুকরো কথাবার্তা। প্রেস থেমে গেছে।

এক সময়ে জয়মোহন উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর দীর্ঘ ঋজু শরীর এখন বেশ কুঁজোটে মেরে গেছে। হাঁটার গতিও বড় মন্থর। নিজের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বললেন,– যাই, একটু টিভি খুলে বসি। খবর শুনব।

তিতির বলল, আমিও ওপরে যাচ্ছি।

-যাওয়ার আগে বাইরের দরজাটা বন্ধ করে যাস। দিনকাল ভাল নয়, হুটহাট লোক ঢুকে পড়তে পারে।

নিজের বিছানায় শুয়ে একটা মিলস অ্যান্ড বুনের পাতা ওল্টাচ্ছিল তিতির। বইটা দারুণ রোমান্টিক। ম্যাচো হিরো বার বার নরম মেয়েটাকে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। ছেলেটা যত তাকে দূরে সরায়, মেয়েটার আকর্ষণ বাড়ে তত। এরকম গল্প পড়তে পড়তে শিহরন জাগে তিতিরের শরীরে, চোখে জল এসে যায়। দুনিয়া ভোলে তিতির।

আজ বইটাতেও তিতিরের একটুও মন বসছিল না। নিচে একটা বেল বাজার প্রতীক্ষায় তার স্নায়ু সজাগ।

সাড়ে আটটা নাগাদ বেল বাজল। হরিণ পায়ে ছুটে যাচ্ছিল তিতির, পোস্তদানা মন ধমকে উঠল, থামো তিতির।

শ্রান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে সুদীপ। তার পিছনে রেলিং ধরে এক-পা এক-পা করে বাপ্পা। সবার শেষে ইন্দ্রাণী। তার মুখে যেন ডাঙশ মেরেছে কেউ।

.

০২.

আদিত্য ফেরেনি। কবে ফিরবে তার ঠিকও নেই।

হাসপাতালে বেশ একটা রই রই কাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছে আদিত্য। কাল রাত্রে কোন এক ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে দিশি পাঁইট আনিয়েছিল, মনের সুখে চড়িয়েছে রাতভর। ব্যস, শেষ রাত থেকে ব্যথা শুরু। কাটা পাঁঠার মতো বিছানায় দাপিয়েছে সারা সকাল। দুপুর থেকে কড়া সিডেটিভ দিয়ে ফেলে রেখেছে ডাক্তার। ইন্দ্রাণী আর বাপ্পা যখন হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছয়, আদিত্যর ঘোর তখন সবে কাটছে। কুঁই কুঁই করছে যন্ত্রণায়। ভিজিটিং আওয়ার। ওয়ার্ড ভর্তি রুগীদের দর্শনার্থী। অনেকেই আড়ে-ঠারে আদিত্যর বিছানার দিকে তাকাচ্ছে, রুগীরা চাপা স্বরে শোনাচ্ছে আদিত্যর কীর্তিকলাপ, বেশ কয়েকটা নার্সও হেসে হেসে ঢলে পড়ছে এ ওর গায়ে।

মাথা কুটে মরতে ইচ্ছে হচ্ছিল ইন্দ্রাণীর। কী অপমান! কী লজ্জা!

রুনা ইন্দ্রাণীর কাঁধে হাত রাখল, আর ভেবে কি হবে? যাও, হাতমুখ ধুয়ে এসো। কী হাল হয়েছে মুখচোখের!

ইন্দ্রাণী বসেই রইল বিছানায়। নড়ল না। খাটের এক পাশে পা ঝুলিয়ে তিতিরও গুম। সব শুনে কেমন যেন ভেবলু মেরে গেছে মেয়েটা। ও ঘরে বাপ্পাও চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। আলো নিবিয়ে।

সুদীপ দরজায় এসে দাঁড়াল, একটু চা দিতে বলো তো।

 রুনা স্বামীর দিকে ফিরল, এখন চা? একবারে রাতের খাওয়া সেরে নিলে হত না?

সবে তো নটা। বলো না একটু। মাথাটা একদম জ্যাম মেরে গেছে। বৌদিকেও দাও। যা টেনশানটা গেল।

রুনা মিনতিকে হুকুম করে ঘুরে এল, তোমরা সেই ওয়ার্ডবয়টাকে ধরতে পারলে না?

কাকে ছেড়ে কাকে ধরব? সব কটাই তো সমান।

–তবু লোকটার তো একটা শাস্তি হওয়া উচিত!

ইন্দ্রাণীর ঠোঁটের ফাঁকে শুকনো হাসি ফুটল, একজন লোভে ছোঁকছোঁক করছিল, আরেক জন তাকে সাপ্লাই দিয়েছ, দোষ তো দুজনেরই।

–এটা একটা কথা হল দিদি! পেশেন্ট বিষ চাইলে তুই তাকে বিষ এনে দিবি?

–টাকা পেলে কেন দেবে না? রোজগার করতে গেলে অত বাছবিচার চলে না।

–কিন্তু আমার প্রশ্ন একটাই। দাদা ওখানে টাকা পেল কোত্থেকে?

 একথা তো মাথায় আসেনি! ইন্দ্রাণী চকিতে মেয়ের দিকে তাকাল। মেয়েও চমকে তাকিয়েছে মা’র দিকে। দু দিকে ঘাড় নেড়ে ডুকরে উঠল মেয়ে, বিশ্বাস করো, আমি দিইনি।

ইন্দ্রাণী কঠোর চোখে দেখছিল মেয়েকে, তোর কাছে চেয়েছিল?

তিতির চোখ মুছল, নননা।

ইন্দ্রাণীর বিশ্বাস হল না। কাল সে যখন নার্সের সঙ্গে কথা বলছিল, অনেকক্ষণ আদিত্যর কাছে একা ছিল মেয়ে। তখন যদি দিয়েও থাকে মেয়ে কি স্বীকার করবে?

সুদীপ খাটে এসে বসেছে। ফিরেই স্নান টান সেরে সে এখন বেশ তাজা। ফরসা পাজামা গেঞ্জি পরেছে। গায়ে বডিট্যাল্কের হালকা হালকা ছোপ। সুবাস।

একটা সিগারেট ধরাল সুদীপ, তোমাকে একটা কথা বলব বৌদি?

কী?

আমার পরামর্শ শুনবে? কাল যদি দ্যাখো দাদা খুব একটা ইমপ্রুভ করেনি তাহলে স্ট্রেট নার্সিংহোমে ঢুকিয়ে দাও। নাহলে বলো, আমি ব্যবস্থা করছি।

ইন্দ্রাণী ঠাণ্ডা চোখে সমবয়সী দেওরের দিকে তাকাল, কী লাভ? সেখানেও ঠিক একটা ওয়ার্ডবয় জুটে যাবে। বড় জোর দিশির জায়গায় বিলিতি আসবে।

–তোমার সব সময়ে কেমন নেগেটিভ অ্যাটিচিউড বৌদি! শুভাশিসদা বলে দিলে নার্সিংহোমে টোয়েন্টিফোর আওয়ার্স ওয়াচে রাখত।

হুঁহ। একটা পঁয়তাল্লিশ বছরের লোকের যদি নিজের ওপর নিজেরই না কনট্রোল থাকে, অন্য লোক ওয়াচ রেখে কতক্ষণ ঠেকাবে!

–অ্যালকোহলিক পেশেন্ট নিয়ে কি এসব অভিমান সাজে বৌদি? আই মাস্ট সে, তোমার শুভাশিসদার অ্যাডভাইসই শোনা উচিত ছিল। ব্লু হেভেনে থাকলে অ্যাদ্দিনে দাদা পুরো ফিট হয়ে যেত।

ইন্দ্রাণীর চোয়াল শক্ত হল। যেখানে মানুষের জোর, সেখানেই মানুষের দুর্বলতা, এ কথা কে বোঝে? কথা ঘোরানোর জন্য বলল, কাল যাই। দেখি। তারপর যা ভাবার ভাবা যাবে।

–বেশি ভেবো না। ডু সামথিং। আর তুমি যা নিয়ে চিন্তা করছ সেটার জন্য কোনও প্রবলেম হবে না। আমি অফিসে মেডিকেলের জন্য যা পাই তাতে বাবার ওষুধপত্র কভার করেও কিছু পড়ে থাকে। সো আই ক্যান প্রোভাইড সামথিং। বলতে বলতে ইন্দ্রাণীর চোখ দেখে একটু হোঁচট খেল সুদীপ,– এমনি না নাও, টেক ইট অ্যাজ লোন।

–সে হবেখন। ইন্দ্রাণী উঠে পড়ল, তুমি তো আছই।

বাই দা বাই। সুদীপও দাঁড়িয়েছে, আমাদের কি কারুর আজ রাতে হাসপাতালে থাকার দরকার ছিল?

–ডাক্তার তো সেরকম কিছু বলল না!

শিথিল পায়ে ইন্দ্রাণী বাথরুমের দিকে এগোল। সুদীপ যেন আজ বড় বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছে দাদাকে নিয়ে। সুদীপের প্রকৃতির সঙ্গে ঠিক মিলতে চায় না ব্যাপারটা।

প্যাসেজের বাঁ দিকে পাশাপাশি দুটো বাথরুম। সমান সাইজের। সুদীপদেরটা অনেক আধুনিক। গিজার, টেলিফোন শাওয়ার, কমোড, কী নেই! গত বছর বাথরুমের দেওয়ালে ইটালিয়ান টাইলস বসিয়েছে সুদীপ। সঙ্গে বাহারি বেসিন-আয়নাও। তুলনায় ইন্দ্রাণীর বাথরুম বেশ শ্রীহীন। সাদামাটা। শুধু বেসিনের আয়নাখানা দারুণ চকচকে। বেসিনটাও। রোজ নিজের হাতে বেসিন-আয়না পরিষ্কার করে ইন্দ্রাণী।

আয়নায় ইন্দ্রাণী নিজেকে দেখছিল। সামনের অগাস্টে তার বয়স হবে ঊনচল্লিশ, কিন্তু এখনও তার ত্বক বিস্ময়কর রকমের মসৃণ। তার ছিপছিপে শরীর এখনও প্রায় নির্মেদ। ছোট্ট কপাল। ঘন ভুরু। ডিম্বাকৃতি মুখ। এত পরিশ্রমেও তার চেহারা এতটুকু টাল খায়নি। এখনও অনায়াসে তাকে তিরিশ-টিরিশ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথার পাশের শিরা দুটো আবার দপদপ করে উঠল। শরীর জুড়ে অসহ্য জ্বালা জ্বালা ভাব। টান মেরে একে একে দেহের সমস্ত আবরণ খুলে ফেলল ইন্দ্রাণী। ফুলফোর্সে ছেড়ে দিল শাওয়ার। মরুভূমির তৃষিতা নারীর মতো স্নান করছে সে, প্রতিটি জলকণা শুষে নিচ্ছে রোমকূপে। আহ্ আরাম। আরাম। আরাম।

শরীর কিছুটা শীতল হওয়ার পর ইন্দ্রাণী চেঁচিয়ে মেয়েকে ডাকল, তিতির আমার একটা শাড়ি সায়া দিয়ে যা তো। সাদা ব্লাউজটাও।

তিতির দরজার ফাঁকে জামাকাপড় গলিয়ে দিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি বেরোও। মিনতিদি চা রেখে গেছে।

চায়ে চুমুক দিয়ে ইন্দ্রাণীর শরীর-মন আরও ঝরঝরে হল। নাহ্, চা-টার খুব দরকার ছিল। সন্ধ্যার মা রাতের রান্না সেরে চলে গেছে, এ সময়ে চা খেতে হলে ইন্দ্রাণীকে নিজেকেই বানাতে হত। প্যাসেজের এপাশটায় কাঠের টেবিলে ছোট্ট স্টোভ রাখা আছে, সঙ্গে টুকটাক কাপ ডিশ বাসনপত্র। চা, গুঁড়ো দুধ, চিনি। লোকজন এলে লাগে। স্টোভটা পাম্প স্টোভ, তিতিরকে পারতপক্ষে ইন্দ্রাণী ওই স্টোভে হাত দিতে দেয় না। তিতির চাইলেও।

পাশের বাড়িতে খুব জোরে টিভি চলছে। হিন্দি সিরিয়ালের সিংহনাদে হুমহুম দশ দিক। উত্তরের জানলার পর্দা সরানো, ওপারে থমকে আছে তরল অন্ধকার। তাপ বিকিরণ করে করে শীতল হচ্ছে পৃথিবী।

তিতির ঘরে নেই। টেবিলের ওপর ডাঁই পরীক্ষার খাতা। ইন্দ্রাণী খাতাগুলো গুনছিল। এখনও আটত্রিশটা দেখা বাকি। তার স্কুল বাংলা মিডিয়াম, এখনও অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোয়নি, সামনের বৃহস্পতিবার নাগাদ বেরোনোর কথা। নাহ, কাল কি হয় না হয়, রাত্তিরে কিছু দেখে রাখতেই হবে। দিয়ে দেবে সোমবার। স্কুলে তার দেরি নিয়ে কোনও কথা উঠুক একদম চায় না ইন্দ্রাণী।

ইন্দ্রাণী খাতাগুলো খাটে রাখল। রোল ধরে সাজাচ্ছে। টিকটিক স্কুটারের আওয়াজ হচ্ছে নীচে। বিপুল শব্দ তুলে গ্যারেজের শাটার উঠছে। নামল। প্রেস মেশিনের পাশে রাত্রে স্কুটারটা রাখে কন্দর্প।

একটা খাতা শেষ করার আগেই কন্দর্প ওপরে হাজির। ঠোঁটে শিস, হাতে ঘুরন্ত চাবি। চেয়ার টেনে বসল,–কী? বড়সাহেব আজ খুব খেল দেখিয়েছে তো?

–ফাজলামি কোরো না। আমি মরছি নিজের জ্বালায়।

আরে, এ হল বিগিনিং অফ দা এন্ড। ধসছে। ঝট উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে কন্দর্প। সে যতক্ষণ বসে থাকে তার চেয়ে বেশি সময় আয়নায় দেখে নিজেকে। তার গোঁফ-দাড়ি সব সময়েই মোলায়েম করে কামানো। টকটকে ফরসা রঙ। চ্যাপ্টা নাক। ঈষৎ ঢুলুঢুলু চোখ। একেবারে ইন্দ্রাণীর সুন্দরী শাশুড়ি বসানো।

ইন্দ্রাণী বলল, নিজের দাদা সম্পর্কে এভাবে বলতে বাধে না তোমার?

তুম তো জানতি হো, যো সহি বাৎ হ্যায়, উও, কন্দর্প জরুর বোলেগা। দাদা তো কি আছে? সব লোকই তো কারুর না কারুর দাদা বাবা কাকা।

তুমি তো বলবেই! তোমরা সব এক গাছের ফল। তোমাদের কারুর মধ্যেই কোনও মায়াদয়া টান নেই।

ভুল কনসেপশান। গাছ এক ঠিকই, তবে সব ফল এক ট্রিটমেন্ট পায়নি ভাবীজান। তোমার পতিদেবতার মতো কে আর তুলোয় মুড়ে মানুষ হয়েছে?

–যে ছেলে রোগাভোগা হয়, তার ওপর মায়ের একটু বেশি টান থাকেই।

রোগ? রোগ তো মনগড়া।

-তোমার দাদার ছোটবেলায় প্লুরিসি হয়নি?

ছাড়ো তো! কবে ছ বছর বয়সে কার প্লুরিসি হয়েছে, না টিবি হয়েছে, তার জন্য তার সারাজীবন ভারী কাজ করা বারণ? বেশি পড়াশুনো করা বারণ? মাঠে খেলাধুলো করা বারণ? তার জন্য সব স্পেশাল স্পেশাল খাবার! দুধের সর তোলা থাকবে! মাছের পেটিটি রাখা থাকবে! আলাদা করে মাংস! ডিম!

কন্দর্পের কথার ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ গোমড়া থাকা কঠিন। ইন্দ্রাণী হেসে ফেলল, অ্যাই, তুই এত জেলাস কেন রে?

–হব না? উনি নাদাপেটা হয়ে খাচ্ছেন, আর আমরা ভাইবোনরা বেড়ালবাচ্চার মতো জুলজুল করে দেখছি! যদি কিছু এঁটোকাঁটা জোটে! তার পরও জেলাসি আসবে না বলছ?

–সেই জেলাসি এখনও আছে? দাদাটির এই হাল দেখেও

–নো। আমার এখন করুণা হয়। এ টোটাল ব্যর্থ লোক, দিনরাত বউ-এর ঝাড় খাচ্ছে …!

 কন্দর্প হাসতে হাসতেই বলছে কথাগুলো। ইন্দ্রাণীর শুনতে ভাল লাগছিল না। নিশ্বাস চেপে বলল,- সে যে কত দুঃখে ঝাড়ি, তা যদি কেউ বুঝত!

–অ্যাই দ্যাখো। সিরিয়াস হয়ে গেলে! তোমার সঙ্গে একটু মজাও করা যায় না মাইরি! আরে বাবা, আমিও কি খুব সাকসেসফুল ম্যান নাকি?

–নও বুঝি? তবে যে খুব বাতচিৎ শুনি?

–চিমটি কাটছ? কাটো। আমি অলপ্রুফ। কন্দর্প দরজার দিকে গেল একবার, সুদীপদের ঘরের দিকে কি যেন দেখছে, ফিরে এসে চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল,– আচ্ছা বৌদি, আজ ব্যাপারটা কী বলো তো?

কী ব্যাপার?

–মেজসাহেব আজ যে বড় হসপিটালে গিয়েছিল?

 সুদীপ পারতপক্ষে হাসপাতালে যায় না। যাওয়ার কথাও ছিল না আজ। অফিস থেকে ফিরতে তার সাধারণত দেরিই হয়। নটা। সাড়ে নটা। ফিরে নিজের ঘরে ঢোকার আগে একবার এদিকে আসে, দাদার শরীরের খোঁজখবর নিয়ে যায়। আজ বাপ্পাই ঘাবড়ে গিয়ে হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিল সুদীপকে। ইন্দ্রাণীকে না জানিয়েই। জানলে কক্ষনও ফোন করতে দিত না ইন্দ্রাণী।

কন্দর্পকে অবশ্য কথাটা বলল না ইন্দ্রাণী, উল্টো প্রশ্ন করল,- কেন? দাদার ওপর ভাই-এর টান থাকতে পারে না?

-হুঁ, তা পারে।

–পারে নয়, আছে। জানো, আমাকে জোরাজুরি করছিল কালই তোমার দাদাকে নার্সিংহোমে ট্রান্সফার করার জন্য? বলেছে যা খরচা লাগে দিয়ে দেবে।

-বলছিল বুঝি? কন্দর্প খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। যেন কিছু ভাবছে। সিগারেটটা চেপে চেপে নেবাল অ্যাশট্রেতে। উঠে দাঁড়াল, খেতে যাবে না?

হুঁ। যেতে তো হবেই।

–আমি এগোচ্ছি। তোমরা খাওয়ার ঘরে এসো।

কন্দর্প চলে গেল।

আদিত্যর খাটের উল্টোদিকে বাপ্পার সিঙ্গল খাট, খাটে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে বাপ্পা, তিতির কি সব লিখছে টেবিলচেয়ারে বসে। ইন্দ্রাণী ঘরে ঢুকে ছেলেকে ঠেলল,-অ্যাই ওঠ। খাবি না?

বাপ্পা অল্প নড়ল, উঁ উঁ উঁ।

চল বাবা, খেয়ে আসবি চল।

 চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল বাপ্পা, কটা বাজে?

–অনেক বাজে। চল, দুপুরের পর থেকে তো কিছু পেটে পড়েনি।

খাটের প্রান্তে বসে উনিশ বছরের শরীরটাকে নিয়ে কিঞ্চিৎ কসরত করল বাপ্পা। ছেলেটার ওপরেও বেশ ধকল গেছে আজ। সে এ সবে একটুও অভ্যস্ত নয়, করতে ভালও লাগে না তার। সুদীপ এসে না পৌঁছনো পর্যন্ত বিস্তর ছোটাছুটি করতে হয়েছে তাকে। ডাক্তার, ওষুধ, একটা ওষুধ তো আবার আট-নটা দোকান ঢুঁড়ে আনতে হয়েছিল। তার ওপর আবার ছেলের মানেও লেগেছে খুব।

তিতির কখন নিঃসাড়ে নীচে নেমে গেছে। বাপ্পাও টলতে টলতে এগোচ্ছে। আলো পাখা নিবিয়ে ঘর দুটো টেনে দিল ইন্দ্রাণী।

সিঁড়ির সামনে এসে সুদীপদের ঘরের দিকে ইন্দ্রাণীর চোখ চলে গেল। হাওয়ায় পর্দা উড়ছে। রুনা নাইটি পরে ক্রিম ঘষছে মুখে। খুব লো ভলিয়ুমে শব্দ বাজছে টিভির। সুদীপ দেখছে বোধহয়।

তিতির গ্যাসে খাবার দাবার গরম করে নিয়েছে। খাওয়ার আয়োজন খুব সামান্য। রুটি, বিকেলের ঘুগনি, ডিমের কারি, স্যালাড। বাপ্পা স্যালাড খেতে ভীষণ ভালবাসে।

চারটে প্রাণী নিঃশব্দে খাচ্ছিল। বরফ ভাঙতে কন্দর্প মাঝে মাঝে খুচখাচ রসিকতা জুড়ছিল তিতিরের সঙ্গে, ঠিক জমছিল না। নিজেও যেন ঠিক উৎসাহ পাচ্ছিল না কন্দর্প।

তিতির প্রায় কিছুই না খেয়ে উঠে গেল। ইন্দ্রাণীরও মুখে তেমন রুচি নেই। একটা রুটি আর একটু ঘুগনি বহুক্ষণ ধরে খুঁটল সে। বাপ্পাই শুধু গোগ্রাসে খাচ্ছে। ঝড়ের গতিতে গোটা সাতেক রুটি খেয়ে ফেলল, নিজের ডিম শেষ করে হাত বাড়াল মায়ের ডিমের দিকে।

পুরনো আমলের ঢাউস ফ্রিজ ইন্দ্রাণীর ভাগে পড়েছে, খুব একটা ঠাণ্ডা হয় না আর। রিলেটা প্রায়ই গণ্ডগোল করছে। ইন্দ্রাণী পড়ে থাকা খাবার ফ্রিজে তুলে বাসনকোসন সিঙ্কে নামাল। ওপরে ওঠার আগে জয়মোহনের ঘরে গেল একবার। রুটিন মাফিক।

হাল্কা নীল নাইটল্যাম্প জ্বলছে ঘরে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে পুরোপুরি ঘর অন্ধকার করে ঘুমোতে পারেন না জয়মোহন। ভয় পান।

আবছা আলোয় মানুষটাকে ভাল ঠাহর হচ্ছিল না ইন্দ্রাণীর। পায়ে পায়ে মশারির খুব কাছে গেল। জয়মোহনের চোখ বন্ধ। সমান বিরতিতে ওঠানামা করছে জীর্ণ খাঁচা। হঠাৎ দেখলে বৃদ্ধ আদিত্য বলে ভ্রম হয়। একই রকম লম্বাটে গড়ন। ভরাট চৌকো মুখ। তীক্ষ্ণ নাক। প্রশস্ত কপাল। চিবুকের কাছটা সামান্য ছুঁচোলো।

ইন্দ্রাণী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল খানিকক্ষণ। ঘুমন্ত মানুষকে কী যে অসহায় দেখায়! ড্রিপ লাগানো অসুস্থ মানুষকেও! আদিত্য কেমন ছেতরে পড়ে ছিল হাসপাতালের বেডে! নির্জীব! প্রতিরোধহীন!

সন্তর্পণে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে এল ইন্দ্রাণী। সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে কি যেন ঠেকল পায়ে। শুকনো পাতা একটা। কাল বিকেলে ছোটখাট কালবৈশাখী এসেছিল, তখনই বোধহয় উড়ে এসেছে। ইন্দ্রাণী পাতাটা তুলে ফেলে দিল। ঠিক তখনই আবার কন্দর্প ডাকল, বৌদি?

ইন্দ্রাণী কন্দর্পের দরজায় এল, কী হল?

–এই টাকাটা রাখো। পাঁচশো আছে।

 ইন্দ্রাণী হেসে ফেলল,- বাবুর খুব আঁতে লেগেছে বুঝি? সত্যিই তুমি এক্কেবারে ছেলেমানুষ।

কন্দর্প মাথা চুলকোল, তা নয়। টাকাটা তোমাকে আমি আগেই দিতাম। গত মাসে চাঁদিপুরে ওই বইটার শুটিং করতে গেলাম না, সেই যে গো ছোট পিসিমা’… দুহাজার দেওয়ার কথা, আটশো পেয়েছি। তাও ব্যাটারা দিতে চায় না, পাঁচশো ঠেকাচ্ছিল….

ইন্দ্রাণী আবারও বলল, তুমি আর বড় হলে না।

–আবার ঠাট্টা করছ? নাও, টাকাটা রেখে দাও। এ মাসে আবার দেব। একটা টিভি সিরিয়ালে কাজ পাচ্ছি। হিরোর প্যারালাল রোল। একটু ভিলেন ভিলেন ভাব আছে। আমাকে কি ভিলেন বেমানান লাগবে বৌদি?

লাগবে। ইন্দ্রাণী হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিল– তোমাকে একমাত্র জোকারটাই ভাল মানায়। হাত পা নেড়ে হাসবে, লাফাবে, ডিগবাজি খাবে, গাছ থেকে ঝুলবে..বলতে বলতে মুখে আঁচল চেপে হাসছিল ইন্দ্রাণী, তোমাকে যা দেখাবে না!

কন্দর্প ভুরু কুঁচকোল,–অত হেসো না। একটা গম্ভীর খবর আছে। স্কুপ।

–তোমার স্কুপ? মানে আবার কেউ তোমার প্রেমে পড়েছে? ইন্দ্রাণীর হাসির দমক বাড়ছে, আবার তো ল্যাং খেয়ে হাত পা ভেঙে পড়ে থাকবে। এই নিয়ে কবার হল? তেত্রিশ?

–আজ্ঞে না। এটা প্রেম ফ্রেম নয়, রিয়েলিটির স্কুপ। মেজসাহেব একটা জম্পেশ মতলব ভাঁজছে, খবর রাখো?

-কী মতলব?

 –ভেতরে এসো, বলছি।

কন্দর্পর ঘর ঠিক ব্যাচেলারদের ঘরের মতো নয়। বেশ সুশৃঙ্খল। ঘরের কোণে সেতার ঢাকা দেওয়া আছে। পাশে বাঁয়া তবলাও। র‍্যাকে কিছু নাটকের বই। টেবিলে ভি সি পি। কয়েকটা ভিডিও ক্যাসেট। ভি সি পি ওপরে নিয়ে গিয়ে মাঝে মাঝে ক্যাসেটগুলো দেখে কন্দর্প। বেশির ভাগই ইংরিজি সিনেমা। দু-একটা নিজের অভিনয়ের ক্যাসেটও আছে। সবই যত্ন করে রাখা। এমনকী বিছানার ওপরের চাদরটা পর্যন্ত টানটান।

ইন্দ্রাণী বিছানায় বসল, কী হল, বলো?

–ভাবছি তোমাকে বলব কি না। মানে বলা ঠিক হবে কি না! কন্দর্প সিগারেট ধরিয়ে ফুক ফুক টানছে, আচ্ছা, এই বাড়িটা আর পেছনের জায়গাটা মিলিয়ে কতটা জমি আছে বলো তো?

–আমি অত জমির মাপ টাপ বুঝি না। তোমার দাদা তো বলে আট কাঠা।

বাহ, তুমি তো ফাইন ইনফরমেশান রাখ! এবার বলো তো, আট ইন্টু দেড় লাখ কত হয়?

 বারো। কেন? কী হয়েছে?

দাঁড়াও না, ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আচ্ছা, এ বাড়ির ভ্যালুয়েশান কত হবে?

–জানি না।

–জানা উচিত ছিল।

 –আমার জানার দরকার নেই।

–আছে। আছে। কন্দর্প চোখ ঘোরাল, মেজসাহেব বাবাকে পটানোর চেষ্টা করছে। এ বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট বানাবে।

ইন্দ্রাণী থ হয়ে গেছে। এত বড় একটা প্ল্যান আঁটছে, অথচ সুদীপ একবারও তো তার সঙ্গে আলোচনা করেনি! আদিত্য নয় এখন এ বাড়ির ফালতু, ইন্দ্রাণীও কেউ নয়? ইন্দ্রাণীর ছেলেমেয়ে কেউ নয়?

কন্দর্প হাসছে মিটিমিটি, কী? ব্যোম মেরে গেলে যে? তবে যাই বলল, প্রোপোজিশানটা মন্দ নয়। আমাদের পার হেড একটা করে ফ্ল্যাট অ্যান্ড ওয়ান ল্যাক ক্যাশ।

আত্মাভিমানে ইন্দ্রাণী পলকে রুখে দিল কষ্টটাকে, বাবা কি বলছেন?

–ওটাই তো মেজদার মেন হার্ডল। বাবাকে কাটাতে পারলেই গোল ফাঁকা। বাট নিধিরাম সর্দারকে বাগে আনা যাচ্ছে না। বুঢঢাবাবুর এ বাড়ি নিয়ে যা সেন্টিমেন্ট! ঢাকার জমি বেচে এসে গ্র্যান্ডফাদার এখানে বাড়ি বানিয়েছিলেন। কত জলাজঙ্গল সাফ করে। ডাকাত তাড়িয়ে। দ্যাখো না, পুরনো কথা বলতে গেলে কেমন তুলতুলে হয়ে যায় লোকটা!

হবেই তো। বাবার কাছে এ বাড়ি কি শুধু বাড়ি? কত স্মৃতি!

–স্মৃতি-ফিতি সব হাতে লণ্ঠন করে ধরিয়ে দেবে। নিধিরাম বেশি দিন লড়তে পারবে না। অলরেডি একটা প্রোমোটার এসে গেছিল থলি নাচাতে।

কবে?

–তা, ধরো দিন সাতেক আগে।

ইন্দ্রাণীর বুকে কুটুস করে একটা পিঁপড়ে কামড়াল। তার প্রতি জয়মোহনের একটা আলাদা দুর্বলতা আছে, ইন্দ্রাণী জানে। এ বাড়িতে সে বউ হয়ে আসার ঠিক দুমাসের মাথায় জয়মোহনের একমাত্র মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। এক মোটর মেকানিকের সঙ্গে। জয়মোহন তখন উন্মাদ প্রায়। অন্নজল ত্যাগ করার দশা। সে সময়ে ইন্দ্রাণীই ঘিরে রেখেছিল শ্বশুরকে। কখনও জোর করে, কখনও বুঝিয়ে সুজিয়ে ক্রমে স্বাভাবিক করে তুলেছিল মানুষটাকে। তখন থেকেই এক অদৃশ্য মায়াবন্ধনে জড়িয়ে গেছেন জয়মোহন। তিনি বলতেন, এ শুধু আমার বড় বউ নয়, এই আমার মেয়ে। তারপর অবশ্য অনেক জল বয়ে গেছে গঙ্গায়। জয়শ্রী এখন আর তত পর নেই। তার সন্তানটি জন্মানোর পরেই জয়মোহন দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা করেছিলেন মেয়েকে। কিছুটা স্ত্রীর চাপে, কিছুটা ইন্দ্রাণীর উপরোধে। রাগটাও তখন কমে এসেছিল অনেক, সময়ের পলি পড়ে।

ইন্দ্রাণীর ওপর জয়মোহনের বিশেষ দুর্বলতার আর একটা কারণও আছে। মোটা দাগের। সেটা হল অনুশোচনা। আদিত্যর মতো অকালকুষ্মণ্ডের জন্য ইন্দ্রাণীকে নিয়ে আসার পরিতাপ।

সেই জয়মোহন এত প্রোমোটার-টোমোটার কিছুই জানালেন না ইন্দ্রাণীকে? হাঁড়ি আলাদা হয়ে ইন্দ্রাণী এখন এত পর?

ইন্দ্রাণী ক্ষুণ্ণ মুখে বলল, বাবার তো একটা মেয়েও আছে। তাকে তোমরা হিসেবে ধরেছ তো?

-নো তোমরা। শুধু মেজদা। আমাকে একদম এর মধ্যে ট্যাগ করবে না।

–কেন? তুমি ভাগ নেবে না?

–নেব? কন্দর্প যেন উদাসী বাউল,–নিলেও হয়, না নিলেও হয়।

–অ্যাক্টিং কোরো না। ইন্দ্রাণীর গলা ধরে এসেছে,–এ বাড়ির সব্বাইকে চেনা হয়ে গেছে আমার। কেউ নিজেরটুকু কম বোঝে না।

কন্দর্প হেসে ফেলল, দাদাও?

-হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার দাদাও। তিনি হলেন সব থেকে সেয়ানা। ভাল মতো বুঝে গেছে যাই করে বেড়াক না কেন, ছেলেমেয়েদের আমি ঠিক সামলে নেব। স্বার্থপর। স্বার্থপর।

কথাটা যেন ধাক্কা মারল কন্দর্পকে। জানলার দিকে মুখ ফিরিয়েছে সে। বাইরে এখন কিছুই দৃশ্যমান নয়, শুধু এক আধভাঙা পাঁচিল পাহারা দিচ্ছে জানলাকে। টিউবের আলো পড়ে পাঁচিলের ক্ষত যেন আরও দগদগে।

কন্দর্প ক্ষতগুলো দেখছিল। বলল, রাগ কোরো না বৌদি, তুমিও কিন্তু কোনওদিন দাদার হাল ধরার চেষ্টা করোনি। তুমি যদি গোড়ায় একটু শক্ত হতে, কিংবা একটু নরম, তাহলে হয়তো দাদা…

ইন্দ্রাণী নিঝুম হয়ে গেল। কথাটা তো মিথ্যে নয়। আবার সত্যি ভাবলেও এই মুহূর্তের ক্ষোভ, এই মর্মবেদনা, সব নিরর্থক হয়ে যায়।

ছোট্ট শ্বাস ফেলে ইন্দ্রাণী প্রসঙ্গ ঘোরাল,-সাত দিন আগে প্রোমোটার এসেছিল সে কথা তুমি আজ বলতে গেলে কেন? সাত দিন আগেই তো বলতে পারতে!

–প্লেন অ্যান্ড সিম্পল। খবরটা আজই পেয়েছি বলে।

–কে বলল তোমাকে? বাবা?

—ছি বৌদি, স্কুপের সোর্স জানতে নেই। ধরে নাও এটা আমার সিক্রেট এজেন্সির খবর।

ইন্দ্রাণী উঠে পড়ল। কন্দর্পকে এখন খুঁচিয়ে লাভ নেই। তার এই দেওরটি মাঝে মাঝেই কথা নিয়ে এরকম রহস্য করে, আবার মন হলে নিজেই ব্যাকব্যাক করে বলে ফেলে সব কিছু। এটাও বলবে।

রাত গাঢ় হচ্ছিল। শহরের কোলাহল এখন অনেক ঝিমিয়ে এসেছে। হঠাৎ হঠাৎ রাস্তা মাড়িয়ে উদ্দাম ছুটে যাচ্ছে কোনও সাইকেল রিকশা। তার হর্নের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ পলকের জন্য ছিঁড়ে দিচ্ছে স্তব্ধতাকে। রাতচরা পাখির মতো। যান্ত্রিক শব্দ ছড়িয়ে একটা ইলেকট্রিক ট্রেন পার হল ঢাকুরিয়া। বোধহয় শেষ ট্রেন। ক্রমশ বিলীয়মান তার আওয়াজ দীর্ঘক্ষণ রেশ রেখে দিল ঘরের বাতাসে।

একটা হিংস্র মশার বাহিনী হইহই করে বেরিয়ে পড়েছে। কাজেকর্মে জেগে থাকা মানুষকে তারা একটুও তিষ্ঠোতে দেয় না এ সময়ে। গান শোনায় আর পিন ফোটায়। তাদের এড়াতে মশারির ভেতর বসে খাতা দেখছিল ইন্দ্রাণী। ঝড়ের গতিতে নটা খাতা দেখে ফেলল। দশটা। এগারোটা। ক্লাস নাইনের ইংরিজির খাতা, বেশ মন দিয়ে দেখতে হয়। উফ, এখনও সাতাশটা?

ইন্দ্রাণীর শরীর ভেঙে আসছিল। পাশে তিতির অঘোরে ঘুমোচ্ছ। গুটিসুটি মেরে। ছোট থেকেই মেয়েটার এরকম কুঁকড়ে শোওয়ার অভ্যেস। যেন ঘুমের মধ্যেও অরক্ষিত। যেন আত্মরক্ষা করছে।

আচম্বিতে ফোন বেজে উঠল। লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেছে ইন্দ্রাণীর স্নায়ুতে। হৃৎপিণ্ড কেঁপে গেল।

এত রাতে কার ফোন এল! হাসপাতাল থেকে এল না তো!

আদিত্যর কি তাহলে…!

সুদীপের দরজায় খিল নামছে। ত্রস্ত পায়ে টেলিফোনের দিকে ছুটল ইন্দ্রাণী।

.

০৩.

শুভাশিস ফোন ধরে আছে। ধরেই আছে।

বেশ খানিকক্ষণ রিঙ বাজার পর ওপারে স্বর ফুটল। কাঁপা কাঁপা, হ্যালো?

–শুয়ে পড়েছিলে?

–শুয়েই তো পড়ার কথা। ইন্দ্রাণীর স্বরে বিরক্তি, এত রাতে ফোন করার কোনও মানে হয়! রুনা নার্ভাস হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এত টেনশানের পরে…

–কেন? আবার টেনশন কিসের?

–ও। তুমি তো জানো না। আদিত্যকে আজ হসপিটাল থেকে ছাড়েনি। ও আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

–সে কি! স্কচের পলকা দোলা ঝাঁকুনি মারল শুভাশিসের মাথায়, কালও আমার পাইনের সঙ্গে ফোনে কথা হল! পাইন বলল হি ইজ পারফেক্টলি অলরাইট।

–ঠিক বলেছিলেন। কিন্তু কাল রাতে… ইন্দ্রাণী শীতল স্বরে আদিত্যর আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়ে চলেছে, শুভাশিস মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিল। পারছে না। দু-এক পেগের বেশি সে খায় না। কখনও। আজ কথা বলতে বলতে একটু মাত্রা চড়ে গেছে। শব্দের শীতল ধারা কানে এসেও জড়িয়ে যাচ্ছে বার বার।

পার্টি প্রায় শেষের মুখে। একে একে বিদায় নিচ্ছে অভ্যাগতরা। পুলকরা চলে গেল। ভাস্কর-দীপারা দরজায় এগোচ্ছে। যেতে গিয়েও ভাস্কর পিছন ফিরে শুভাশিসকে হাত নাড়ল। কেউ তেমন নেই আর। যারা আছে তাদের বেশির ভাগেরই চরণ ক্রমশ শিথিল। যুগলনাচ যদিও থেমেছে অনেকক্ষণ, নীপা-সমীরণ এখনও দোলার চেষ্টা করছে। স্টিরিওতে নিচু পর্দায় বেজে চলেছে মাদক অ্যারাবিয়ান টিউন।

শুভাশিস জড়ানো শব্দরাজিকে কোনওক্রমে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে শুনল। খানিকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, আমি এরকমই একটা ভয় পাচ্ছিলাম। ভোগো আরও কয়েকদিন।

হুঁ। ইন্দ্রাণী একটু চুপ থেকে প্রশ্ন করল, কোত্থেকে ফোন করছ? বাড়ি থেকে?

না, নিউ আলিপুর থেকে। অরূপদের আজ ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।

 চৈত্র মাসে ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি!

 –ওদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজ। ওরা অত দিনক্ষণ মানে না।

–ও। ছন্দা যায়নি?

–পার্টি হবে, ছন্দা আসবে না? শুভাশিস আরও নির্লিপ্ত করল গলাটাকে, — এসেছে। নিজের মতোই আছে। গ্লাস নিয়ে বসেছে একটা।

ও প্রান্ত চুপ।

কী হল, চুপ করে গেলে? রুনা এখনও সামনে আছে নাকি?

–না। ইন্দ্রাণীর গলা নেমে গেছে হঠাৎ, তুমিও তো খাচ্ছ!

শুভাশিস হা হা করে হাসল। খুশিহীন সশব্দ হাসি, আমি খাই, তবে তোমার বরের মতো নয়। আমাকে নিয়ে অন্তত তোমাকে হসপিটালে ছুটতে হবে না।

–আদিত্যও ও কথা বলত এক সময়। প্রসঙ্গটা থাক। আমার ঘুম পাচ্ছে। এক কাঁড়ি খাতা ছড়ানো আছে। আর কিছু বলবে তুমি?

শুভাশিস রিসিভারে গরম নিশ্বাস ফেলল, আমার কথা শুনতে আজকাল তোমার ক্লান্তি লাগে, না রানি?

 দূরভাষ নির্বাক।

 রিসিভারে শব্দহীন তরঙ্গের অস্তিত্ব বড় শূন্য লাগছিল শুভাশিসের। কোনও এক অদৃশ্য শক্তি যেন মুহূর্তগুলোকে দীর্ঘায়িত করে দিচ্ছে। স্বর নামিয়ে শুভাশিস শূন্যকে শোনাল, কাল দেশে যাচ্ছি।

হঠাৎ?

–বিকেলে তুফান এসেছিল। বাবা খবর পাঠিয়েছে মা’র কন্ডিশন আবার ডিটোরিয়েট করছে। শুভাশিস দম নিল, সময় বোধহয় এসে গেল।

-তারপরও তোমরা পার্টিতে গেছ! খবরটা পেয়েও!

শুভাশিস একটু সময় নিয়ে বলল, ঘরে বসে থেকেই বা কি করতাম? দুশ্চিন্তা? আজ এমনিও কি যাওয়া হত? হুট করে তো আর চেম্বার বন্ধ করে দেওয়া যায় না। সোম-মঙ্গলবার গোটাপাঁচেক অপারেশনের ডেট দেওয়া আছে, নার্সিংহোমগুলোতে ফোন করে ডেট ডেফার করলাম…

–তুমি একা যাচ্ছ?

না। সবাই। কাল ভোরে।

-যাও। ইন্দ্রাণীর স্বর সামান্য কোমল শোনাল, যত খারাপ ভাবছ, তত খারাপ তো নাও হতে পারে।

ইন্দ্রাণী সান্ত্বনা দিচ্ছে শুভাশিসকে! হাসি পেয়ে গেল শুভাশিসের। এসব ছেঁদো কথায় কি সান্ত্বনা পায় মানুষ? আর সান্ত্বনাই বা কিসের? মা’র মৃত্যু বলতে যে শোকময় দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেরকম কোনও ছবি তার চোখে নেই। মা’র মৃত্যুসম্ভাবনার কথা শুনলে তবেই তো মনে পড়ে, মা বেঁচে আছে! এরকম একজন না বেঁচে-থাকা মানুষের জীবনে একটা লিখিত পূর্ণচ্ছেদ কি নতুন কোনও মাত্রা যোগ করে দুঃখে?

শুকনো হেসে শুভাশিস বলল, নাথিং টু কনসোল রানি। মা’র ডেথ ইজ ওভারডিউ। পরোয়ানা এসে গেছে, মা রিসিভ করতে চাইছে না। দু-এক পল থেমে আবার বলল, –লেটস টক অ্যাবাউট দা লিভিং। ব্লু হেভেনে আমার বলাই আছে, এখনও তোমার বরকে আমার নাম করে অ্যাডমিট করতে পারো।

–ভাবি একটু।

–এখনও দ্বিধা? শুভাশিস কপালে বুড়ো আঙুল ঠুকল, দ্বিধা থাকা ভাল রানি। তবে দেখো দ্বিধা যেন কারুর বিপদের কারণ না হয়।

–তুমি বলছ একথা?

বলছি। যাই হোক, ভাল থেকো। অ্যান্ড রিমেমবার, নাথিং টু ওরি।

ফোন রেখে শুভাশিস বসে রইল চুপচাপ। দু-হাত ছড়িয়ে দিল সোফার কাঁধে। আরও কি একটা কথা যেন বলার ছিল ইন্দ্রাণীকে? কি কথা? কি কথা? মনে পড়ছে না। অনেক দরকারি কথা আজকাল বড় তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায় মন থেকে। পরে মনে পড়লেও কথাটা আর তেমন দরকারি থাকে না। উদ্বেগের ঘর্ষণে কি ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে স্মৃতি!

অতিকায় ড্রয়িংরুমের অন্য প্রান্তে উৎপল আর উৎপলের বউয়ের সঙ্গে কথা বলছে ছন্দা। ছন্দা কি লক্ষ করছিল শুভাশিসকে? বোঝা যাচ্ছে না। ঘরটাতে ইচ্ছাকৃতভাবেই আলো বড় কম। এ ধরনের জমায়েতে আলো বেশি থাকলে মেজাজ আসে না, মৌতাত এসে এসে ফিরে যায়।

বাজনা থেমে গান বাজছে এখন। এলটন জন। কোমল গাঢ় স্বরে আন্দোলিত হচ্ছে কক্ষ, বিষণ্ণতার সুখে ডুবে যাচ্ছে আবদ্ধ পৃথিবী।

শালিনী হই হই করে সামনে এল, এই শুভাশিস, আর কিছু নাও।

–না গো, ভাল লাগছে না। বুশ শার্টের পকেটে সিগারেট খুঁজল শুভাশিস। প্যান্টের পকেটও হাতড়াল। নেই। নিচে গাড়িতে কি প্যাকেটটা পড়ে আছে? সেটাও মনে পড়ছে না।

শালিনী দেখছিল শুভাশিসকে। বলল, তুমি আজ এত খামোশ কেন বলো তো? মাকে নিয়ে ওরিড?

না, তেমন কিছু না। যা হওয়ার তা তো হবেই। উপর দিকে আঙুল দেখাল শুভাশিস, ফেট। ডেসটিনি।

–দেন? থিংকিং অ্যাবাউট এনি পেশেন্ট? এত রাতে কোথায় ফোন করছিলে?

শালিনীর কিছুই নজর এড়ায় না। সবার খাওয়া-দাওয়াও তদারক করছে, কার কখন গ্লাস খালি হচ্ছে তারও। অরূপ ভাগ্য করে একটা বউ পেয়েছে বটে। মারাঠি মেয়ে, দিল্লিতে পড়াশুনো, এখন দিব্যি কলকাতায় গুছিয়ে বাঙালি বরের সংসার সামলাচ্ছে। প্র্যাকটিসও করছে চুটিয়ে। গাইনি হিসেবে কলকাতায় যথেষ্ট নামও হয়ে গেছে শালিনীর। তীক্ষ্ণবুদ্ধি এই নারীটিকে বেশ পছন্দই করে শুভাশিস। কেবল মহিলার এই প্রশ্ন করার অভ্যাসটিই শুভাশিসের বিলকুল না পসন্দ।

শুভাশিস এড়ানোর ভঙ্গিতে বলল,- ও একটা রুটিন কোয়্যারি করছিলাম। নাথিং সিরিয়াস। কিন্তু ম্যাডাম, আমার যে এখন সিগারেটের স্টক ফিনিশ। দ্যাখো না, তোমার বরের কাছে পাও কিনা!

–তোমরা বাঙালিরা এত স্মোক করো কেন বলো তো? স্পেশালি বাঙালি পুরুষরা?

কারণ আমরা বাঙালিরা জানি পুরুষদের পেটে বাচ্চা হয় না।

শালিনী খিলখিল হেসে উঠল, –ইউ নটি! বিয়িং এ ডক্টর এটা কিন্তু অমার্জনীয় অপরাধ।

শুভাশিস আরও তরল হওয়ার চেষ্টা করল, কি অপরাধ বললে? আরেকবার বলো।

–অমার্জনীয়। আনপারডেনেবল।

বাহ! তোমার বাংলার ভোকাবুলারি তো বেশ বেড়ে গেছে! অরূপ কি রোজ শেখাচ্ছে? টাইম পায় কখন?

–নো স্যার। আমি নিজেই শিখে নিই। অরূপ ফরূপ লাগে না। অ্যান্ড ফর ইওর ইনফরমেশান দা ওয়ার্ড ইজ ফ্রম স্যানসক্রিট। শালিনী ভুরু নাচাল, ডোন্ট সিট আইডল। টেক সামথিং। শিভাস রিগ্যালটা খোলা হল, একটুও নেবে না?

নিজে তো খাও না, অন্যকে খাওয়াতে এত উৎসাহ কেন? মাতাল দেখতে মজা লাগে বুঝি?

–মন্দ লাগে না। দ্বিতীয় ব্যোমশেলটা ছুঁড়ল শালিনী, টলটলায়মান পুরুষ আমার বহুৎ ফানি লাগে।

টলটলায়মান! এটাও কি সংস্কৃত থেকে?

–ঢেঙা। শালিনী দু-হাতের বুড়ো আঙুল নাচাল, একটু কাবাব নেবে? প্রচুর পড়ে আছে এখনও। লিকুইড পেলে কেউই সলিড টাচ করতে চায় না!

–ট্যানজিবল সলিড হলে চাইবে না কেন? বন্ধুর বউয়ের সঙ্গে একটু নিয়মমাফিক মাপা আদিরসাত্মক রসিকতা করল শুভাশিস, ছদ্ম উৎসাহে বলল,- যেমন ধরো তুমি। তোমার বাহুবল্লরী আমাকে আলিঙ্গন করলে, অথবা তোমার ওষ্ঠ আমার অধর স্পর্শ করলে, অথবা তোমার…

–দাঁড়াও। আমি ছন্দাকে বলছি। শুভাশিসের কাঁধে আলগা চাপড় মেরে শালিনী হাওয়া হয়ে গেল।

ছন্দা নয়, অরূপকে পাঠিয়েছে শালিনী। সঙ্গে শিবাজি। অরূপের বন্ধু। কবি হিসেবে শিবাজির মোটামুটি পরিচিতি আছে কলকাতায়। মেডিকেল কলেজে পড়তে অরূপের খুব কবিতার নেশা ছিল, তিন বন্ধু মিলে লিটল ম্যাগাজিনও বার করত একটা। আকাশ। তা সেই আকাশ কবেই উবে গেছে, কিন্তু তার সুবাদে কিছু কবিবন্ধু রয়ে গেছে অরূপের। শিবাজির আবার অন্য পরিচয়ও আছে। সে এক নামজাদা পেন্ট কোম্পানির উঁচুতলার অফিসার।

অরূপের থেকে নিয়ে বিলিতি সিগারেট ধরাল শুভাশিস। জোরে জোরে টানল কয়েকবার, চোখ বন্ধ করে বসে রইল। আহ! চাপ চাপ ধোঁয়া ঢুকছে মাথায়। উজ্জীবিত হচ্ছে মস্তিষ্কের কোষ।

চোখ খুলে শুভাশিস ঘড়ি দেখল, এবার তো উঠতে হয় রে।

 ঘরময় সোফা টেবিল ছড়ানো। অরূপ সোফায় বসে টেবিলে পা তুলে দিল,- আরে বোস, তাড়া কিসের? কাল তো রোববার!

বাহ, বললাম না কাল দেশে যাচ্ছি! ভোর ভোর বেরোতে হবে। রোদ্দুরে ড্রাইভ করতে কষ্ট হয় রে।

অরূপ থমকে গেল, ঠিক আছে, আরেকটু বোস। গেলেই তো চলে যাবি। আজকাল তো আমাদের আর আড্ডাই মারা হয় না।

–আজ অনেক হয়েছে। রাত কত হল খেয়াল আছে?

অফিসার কবি একটু তফাতে ছোট সোফায় বসেছে। নেশাচ্ছন্ন চোখে ঘোষণা করল, রাত কত হল? উত্তর মেলে না।

শুভাশিস আড়ে দেখে নিল কবিকে, তারপর অরূপকে বলল,- সারারাত যদি আমরাই বসে থাকি তাহলে তোর আর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি করে কি লাভ? খাট-ফাট সাজিয়েছিস ফুল দিয়ে? জানিস তো বিয়ের বারো বছর পর নতুন করে ফুলশয্যা করতে হয়?

–হাঃ! ফুলশয্যা! আমার বউ এখন বিছানায় পড়বে আর নাক ডাকিয়ে ঘুমোবে। আমাদের শালা বিয়েতেই ফুলশয্যা হল না, এখন বুড়ো বয়সে পুষ্পচয়ন!

-কেন? ফুলশয্যা হয়নি কেন? কবি অফিসার ঢক করে পুরো গ্লাস গলায় ঢেলে দিল, তোমরা কি দিল্লিতে লিভ টুগেদার করতে নাকি?

না রে ভাই, আমার অত বুকের পাটা নেই। তাছাড়া আমার মনে হয় বিয়ে না করা মেয়েমানুষের সঙ্গে শুলে গা দিয়ে কেমন আঁশটে গন্ধ বেরোবে।

-আঁশটে গন্ধ! হোয়াই আঁশটে গন্ধ?

ব্যাপারটা খুব ফিশি তো, তাই।

কথাটা বেশ মনে ধরল শিবাজির। খালি গ্লাস চেটোর উল্টো পিঠে রেখে ব্যালান্স করছে, গন্ধটা পেয়েছেন আপনি কোনওদিন?

–ছি। আজকে কোনও পাপ আলোচনা করতে নেই। আজ বড় পুণ্যের দিন। অরূপের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল।

–কেন? পুণ্যের দিন কেন? কবি-মাতালেরও চোখ পিটপিট, তুমি আজকের দিনে একজন মহিলার ফিজিক্যাল জুরিসডিকশনে এনক্রোওচ করেছিলে বলে?

প্রলাপগুলো কানে আসছিল শুভাশিসের, কিন্তু সে কিছু শুনছিল না। শুনতে চাইছিলও না। কানের ভেতর দিয়ে শব্দরাজি ঢুকলেও বধিরত্বের আকাঙ্ক্ষায় মস্তিষ্কের দরজা বন্ধ করে রেখেছিল সে। দরজা ভেদ করে তবু দু-একটা শব্দের কুচি অগ্নিময় অঙ্গার হয়ে বিঁধছে। পোড়াচ্ছে।

শুভাশিস উঠে দাঁড়াল। একটু তাজা হাওয়া চাই।

–কি রে, কী হল?

–নাহ, একটু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। ঘরটা কেমন স্টাফি হয়ে গেছে।

 ড্রয়িং হল সংলগ্ন অরূপদের ব্যালকনিটাও বেশ প্রকাণ্ড। শোভিত। পুরোটা গ্রিলে মোড়া। মাঝখানে বেতের দোলনা স্টিল চেনে ঝুলছে। গ্রিলে ঝুলন্ত কিছু কারুকাজ করা রঙিন টব, বারান্দা ঘিরে টবে টবে উদ্যানের সমারোহ। বেলফুল, মল্লিকা, পাতাবাহার। আলোমাখা অন্ধকারে শুভাশিস বেলফুলের গন্ধ পাচ্ছিল। বেতের দোলনায় বসে সাততলা থেকে দেখছিল নীচের পৃথিবী। কোন অতলে লিলিপুট লাইটপোস্টগুলো নতমস্তকে আলো ফেলছে রাস্তায়। সুনসান রাস্তা বেয়ে একটা গাড়ি ছুটে গেল। বোধহয় জিপ। পুলিশের।

অরূপ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কখন, হাতে পানীয়ের গ্লাস। সেও জোরে জোরে নিশ্বাস টানছে।

শুভাশিস আনমনে বলল,- তোদের ফ্ল্যাটটা কিন্তু দারুণ। মাটির পৃথিবী কত শান্ত লাগে না এখান থেকে?

–হুঁ, ধুলোমশা নেই, ঝুটঝামেলা নেই। শালুর জেদেই কেনা হল, এখন দেখছি ইনভেস্টমেন্টটা খারাপ হয়নি।

শালিনীর জেদ বলছিস কেন? তোর এদিকটা ভাল লাগে না?

-সত্যি বলব? প্রথম প্রথম ভাল লাগত না। নর্থের ছেলে, ভেবেছিলাম ওদিকেই থাকব। বড়জোর সল্টলেক ফল্টলেক। বাবা-মা’র কাছাকাছিও থাকা হত! পিপিটাও গোড়ার দিকে খুব মনমরা ছিল। স্কুল থেকে ফিরে সারাক্ষণ একা একা থাকা… মেড সারভেন্টসদের কাছে… এখন অবশ্য ফ্ল্যাটে অনেক বন্ধু হয়ে গেছে। আমিও ভাল আছি। বেশ নিরবলম্ব শুন্যে বিরাজ করছি।

–তোর মেয়ের কোন ক্লাস হল রে?

ফাইভে উঠল। অরূপ নেশাচোখে হাসল,- তোর ছেলে তো এবার মাধ্যমিক দিল, তাই না?

হুঁ, আমি অনেক এগিয়ে আছি।

–তোর শালা আর্লি ম্যারেজ, ওখানেই তুই হ্যান্ডিক্যাপ নিয়ে নিয়েছিস।

ভেতরে এক তুমুল হাসির রোল উঠেছে। মহিলারা হেসে কুটিপাটি। নীপা ঢলে ঢলে পড়ছে ছন্দার পিঠে। ছন্দা শালিনীর পিঠে গুম গুম কিল মারছে।

অরূপ মুখ বাড়াল, ব্যাপার কী, অ্যাঁ? রাতদুপুরে ঘরে শেয়াল ডাকে কেন?

দেখুন না অরূপদা, আপনার বউটা… ছন্দা হাসির তোড়ে আর এগোতে পারল না।

নীপারও ঘোরলাগা চোখে হাসির বুদবুদ,-ইশশ, শালুটা কি অসভ্য অসভ্য জোকস শোনাচ্ছে!

–কী জোকস? আমরাও একটু শুনি।

–শুনবেন? একটা মেয়ে না একদিন স্নান করতে গেছে…

–অ্যাই নীপা, কী হচ্ছে কি? এগুলো সব ফিমেল জোকস না? দরকার হলে শালু নিজে বরকে শোনাক, আমরা কেন?

নীপা ঢলে পড়ছে,- কেন? বললে কী হয়েছে? বলি না।

ইত্যকার কথোপকথনের মধ্যে অরূপ উৎসাহ হারিয়েছে রসিকতা শোনার। শুভাশিসকে বলল, তুই তখন ভাস্করের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিস তো?

বিব বির সিগনাল পাঠাচ্ছে মগজ। অরূপ এবার কাজের কথায় আসবে। আড্ডা তো স্রেফ বাহানা! এসব পার্টিতে কে আর নিছক আড্ডা চায়! শুভাশিস অল্প খেলল, কি ব্যাপারে বল তো?

নার্সিংহোমের ব্যাপারে। আর দেরি করে কী লাভ? বেয়াল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেল, আর কবে শুরু করব?

কর না। আমি তো আছিই সঙ্গে। শুভাশিস মনোযোগী কিন্তু ভঙ্গিটা উদাস, বাট ভাস্করের ওপরে বেশি ডিপেন্ড করিস না।

–কেন? হি ইজ আ রিয়েল বুল। অসুরের মতো খাটতে পারে। সব হসপিটালের সঙ্গে ওর চেন আছে। আমরা ওকে ইউটিলাইজ করতে পারব। আর এটা তো মানবি, ভাস্কর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজটা ভাল বোঝে?

-ওটা কোনও ব্যাপার নয়, এনি লেম্যান ক্যান ডু ইট। তাছাড়া আমরা অ্যাকাউন্টস, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজে প্রফেশনাল লোক লাগাব। পাকা মাথা। তারাই ট্যাক্স ফ্যাক্স ঝুটঝামেলা যা আছে সামলাবে। ভাস্করকে নিয়ে কি প্রবলেম জানিস? ওর নেচারটাই খারাপ হয়ে গেছে। খালি অন্যের কেস খাওয়ার টেন্ডেন্সি! ওকে ঠিক রিলাই করা যায় না।

অরূপের চটকা ভেঙে গেছে– ও থাকলে তুই থাকবি না?

–ওর না থাকাটাই প্রেফার করব। বাঘ ফেউ নিয়ে ঘোরা পছন্দ করে না। তাছাড়া হোয়াই ভাস্কর? নিজেরা নার্সিংহোম করলে আমরা তিনজনই কি যথেষ্ট নয়? তুই পেডিয়াট্রিকস, শালিনী গাইনি আর আমি সার্জারি।

–তাহলে ভাস্করকে অফই করে দিই, কী বল? অরূপের পাকস্থলী থেকে অ্যালকোহল যেন উবে গেছে, ব্যবসায়িক স্বরে বলল, তাহলে এস্টিমেটটা শুরু করে ফেলি?

গভীর বৈষয়িক আলোচনায় ডুবে গিয়ে দুই বন্ধুর হুঁশ নেই আর, চেতনা ফিরল ছন্দার ডাকে, ফিরবে না? একটা বাজে কিন্তু। সকালে উঠে আবার গোছগাছ আছে।

–এই যাই। এখনই। বলে আবার ডুবে গেল শুভাশিস। একটা নতুন কিছু গড়তে গেলে কতরকম প্যাঁচপয়জার করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করতে ভারি ভাল লাগছিল তার। তবে বেশিক্ষণ সে সুযোগ হল না, ছন্দা এসে হিড়হিড় করে টানছে তাকে। অরূপের ফ্ল্যাট এখন পুরো ফাঁকা।

পথ জনহীন। পাশে নির্বাক ছন্দা। সোঁ সোঁ ছুটছে শুভাশিসের সাদা মারুতি। রক্তলাল ক্রসচিহ্ন নিয়ে। নিঃসাড়ে। ছন্দা এত চুপ কেন আজ? নেশা হলে ছন্দা বেশি বকে। অবিরল পরচর্চা করে যায়। উত্তরের তোয়াক্কা না করেই ভেঙে পড়ে হাসিতে। আজও তো বেশ টানছিল! তবে!

পাশে বাকহীন প্রতিমা বসিয়ে গাড়ি চালাতে কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল শুভাশিসের। সে কি এখন গাড়ির যন্ত্রাংশ? ক্লাচ ব্রেক স্টিয়ারিং এরকম কিছু একটা?

সাঁই করে দুর্গাপুর ব্রিজ পেরিয়ে শুভাশিস আর চুপ থাকতে পারল না। আলগাভাবে বলল, তখন কী জোকস শোনাচ্ছিল শালিনী?

ছন্দার সিটে হেলানো মাথা একদিকে কাত। দখিনা বাতাসে তার চোখের পাতা যেন লক্ষ টন পাথরের মতো ওজনদার। বন্ধ চোখে ঠোঁট নাড়ল ছন্দা, তুমি শুনে কী করবে!

শুভাশিস আরেক বার আড়েঠারে দেখল বউকে,–বলবে না?

গাড়ি চেতলা ব্রিজে উঠল। বাতাস বাড়ছে। আরও বাড়ছে। ছন্দা নিথর।

হাওয়াটা বেশ লাগছিল শুভাশিসের। অ্যালকোহল আর হাওয়া যেন রাজঘোটক। চিন্তাভাবনা থিতিয়ে আসে। উদ্বেগ সরে যায়। এই কি সুখ?

শুভাশিস ঠাট্টা করল,–ক পেগ খেয়েছ আজ?

যতই খাই, তোমার কী!

সাদার্ন মার্কেটের গায়ে শুভাশিসের ফ্ল্যাট। রাসবিহারীর মোড়ে এসে শুভাশিস গাড়ি ঘোরাল, হঠাৎ মুড অফ কেন? বেশ তো ছিলে এতক্ষণ!

অকস্মাৎ ছন্দার গলা ভারী, তুমি তখন কাকে ফোন করছিলে? অত রাত্তিরে?

-কই? কখন! না তো!

যাহ বাবা! না চাইতেই কেন মিথ্যে বেরিয়ে এল মুখ থেকে? অপাঙ্গে ছন্দাকে দেখল শুভাশিস। ছন্দার চোখ খুলে গেছে। একটা ফুটপাতের ছেলে ফাঁকা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছে, তাকে সামলে শুভাশিস এগোল। সাবধানী স্বরে বলল,- ও হাঁ, একটা ফোন করেছিলাম বটে। সানশাইনে পরশু একটা অপারেশান করেছিলাম, কেসটার কিছু পোস্ট অপারেশনাল কমপ্লিকেশান হচ্ছে তাই নিয়ে… ছন্দা দুম করে বলল,- ইন্দ্রাণীর বরের আজ হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা না?

শুভাশিসের সতর্ক চোখ উইন্ডস্ক্রিনে স্থির, আজই তো ডিসচার্জ হওয়ার কথা।

–তুমি খোঁজ নিলে না?

শালা আচ্ছা জাঁহাবাজ মেয়ে তো! প্রশ্ন করছে না, যেন টিপে টিপে পরীক্ষা করছে। ধুস, গোড়াতেই সত্যি বলে দিলে হত। শুভাশিস চাল ঘোরাল, ভেবেছিলাম চেম্বার থেকে বেরোবার আগে খবরটা নেব… চেম্বারেও এত ভিড় ছিল…! মার ব্যাপারটা নিয়েও মনটা এমন ডিসটার্বড হয়ে আছে।

ছন্দা যেন টুক টুক করে দাবার বোর্ডে বোড়ে এগোচ্ছে, অরূপদার বাড়ি থেকে একটা ফোন করতে পারতে!

–দেখলে না রাতদুপুর অবধি কী গ্যাঞ্জামটা ছিল ওখানে? শুভাশিস পাল্টা চালে নৌকো বাঁচানোর চেষ্টা করল, তারপর কি কোনও ভদ্রলোকের বাড়িতে ফোন করা যায়?

নৌকো বোধহয় বাঁচল না, ছন্দা মুখ বেঁকাল, তাও তো বটে।

মরিয়া হয়ে শেষ চাল দিল শুভাশিস, তুমিও তো ফোন করে একটা খোঁজ নিতে পারতে।

–আমার অত সময় নেই।

খেলা মুলতুবি হয়ে গেল।

বাড়ি ফিরে ঝটিতি পোশাক বদলে নাইটিতে ঢুকে পড়ল ছন্দা, ছেলের ঘরের দরজা ঠেলে একবার দেখে নিল ছেলেকে। ঘুমোচ্ছ। শুভাশিস যখন বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরোল তখন ছন্দা শুয়ে পড়েছে নিজের খাটে।

শুভাশিস খানিকটা স্বস্তি বোধ করছিল। শোওয়ার ঘরের লাগোয়া অ্যান্টিরুমে ঢাউস আলমারি, আলমারির মাথা থেকে স্যুটকেস পাড়ল। প্রায়ই তাকে কলকাতার বাইরে যেতে হয়। সেমিনারে। কনফারেন্সে। দিল্লি। বোম্বে। ম্যাড্রাস। বাইরে কোথাও যাওয়ার আগে নিজের জিনিসপত্র নিজের হাতে গোছায় শুভাশিস। সেই কৈশোর থেকেই। কে আর কবে তাকে গুছিয়ে দিয়েছে। মা? সে তত থেকেও নেই। বউ? সে তো নিজেরটুকু ছাড়া আর ছেলেরটুকু ছাড়া কিছুই বোঝে না পৃথিবীতে। টাকা ছাপানোর মেশিনকে বিয়ে করেছে ছন্দা, মেশিনটা তার কাছে মেশিনই। মাঝেমধ্যে মোবিল গ্রিজ দেয়, এই না কত! তার কাছে শুভাশিসের কোনও প্রত্যাশা নেই।

যত্ন করে সুটকেসটা মুছল শুভাশিস। নভেম্বরে একবার বম্বে গিয়েছিল, তারপর আর যাওয়া হয়নি কোথাও, বেশ ধুলো জমেছে খাঁজখোঁজে। সময় নিয়ে খুব যত্ন করে পরিষ্কার করল বাক্সটা।

ওয়াড্রোব খুলে শুভাশিস মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। হ্যাঙারে সার সার সুট ঝুলছে। খাসির মাংসর মতো। প্রতি শীতে নিয়ম করে একটা-দুটো করে বানানো হয়, পরা হয় না। জমে যায়। ভরে যায় ওয়াড্রোব। পুলওভার আর বুশ শার্টেই কেটে যায় শুভাশিসের হিমঋতু। বাইরে শার্ট-ট্রাউজারস, বাড়িতে পাজামা-পাঞ্জাবি, এতেই শুভাশিস ভারি স্বচ্ছন্দ থাকে।

শুভাশিস দু সেট করে পাজামা-পাঞ্জাবি আর শার্ট-ট্রাউজারস চালান করল সুটকেসে। স্টিল আলমারির লকার থেকে টাকা বার করল কিছু। থাক, কোথায় কি লাগে না লাগে, হাজার দশেকই সঙ্গে থাক। টর্চ আর ক্যালকুলেটারও নিয়ে নিল। যদি সময় সুযোগ পাওয়া যায় মাধবপুরে বসে নার্সিংহোমের একটা রাফ এস্টিমেট করবে। অরূপের সঙ্গে ভাল করে বসার আগে নিজের একটা স্কেচ মাথায় থাকা দরকার। তবে মাধবপুরে গিয়ে এবার সময় পাওয়া যাবে কি! কে জানে কি অবস্থা ওখানকার! যত সকালে পারা যায় কাল বেরিয়ে পড়তে হবে।

বেরোতে বেরোতে পরদিন অবশ্য খানিকটা বেলাই হয়ে গেল। এখান থেকে এটুকু যাবে, ছন্দার গোছগাছ শেষই হতে চায় না। ঠিক মতো ব্রেকফার্স্ট হল না বলে একগাদা স্ন্যাকস সঙ্গে নিল। ক’দিনের জন্য যাচ্ছে তার ঠিক নেই স্যুটকেস ভর্তি করে শাড়ি নিয়েছে। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নাইটি হাউসকোট পরে না বলে সুতির শাড়ি নিল গোটা ছয়েক। দামি শাড়ি দু-তিনখানা। নেব না নেব না করে টুকটাক কসমেটিকসও নিল কিছু। শেষ মুহূর্তে ম্যাজেন্টা রঙের ব্লাউজ খুঁজে পেল না বলে দুটো শাড়ি বার করে রাখল, তার বদলে আর দুটো বাছতে নষ্ট করল আরও খানিক সময়। ঠাণ্ডা জল ভর্তি ওয়াটার কনটেনার, চা ভর্তি ফ্লাস্ক আর গাদা খানেক স্ন্যাকসের প্যাকেট নিয়ে সে যখন গাড়িতে উঠল, তখন সূর্য বেশ কটমট করে তাকাচ্ছে।

টোটো বহুক্ষণ আগে নিজের কিটসব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে, গাড়িতে বসে অধৈর্য হাতে হর্ন বাজাচ্ছে বার বার। তার পরনে ফিকে নীল জিনস আর ষাঁড় খ্যাপানো লাল টিশার্ট। শুভাশিস গাড়ি স্টার্ট করতেই সে ছন্দাকে খোঁচাল, আমরা কত দূরে যাচ্ছি মা?

ছন্দা ভ্রূকূটি করল,–কেন, তুই জানিস না?

মাধবপুরের ডিসট্যান্স ঠিক কতটা মা?

 ছন্দা ফিক করে হাসল,–পঞ্চাশ ষাট কিলোমিটার হবে।

তাই বলো। আমি ভাবলাম মাধবপুর বোধহয় ম্যাপ থেকে অনেক অনেক দূরে সরে গেছে। হুগলি ডিস্ট্রিক্ট থেকে সেই কাশ্মীর পাঞ্জাবের কাছাকাছি।

ছন্দা বলল,-ঠাট্টা হচ্ছে আমার সঙ্গে?

শুভাশিস গাড়ির রেয়ারভিউতে ছেলেকে দেখছিল। মাধ্যমিক দিয়েই টোটো যেন কদিনে হঠাৎ বেশ বড়সড় হয়ে গেছে। মাথায় অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে শুভাশিসকে, এখনই প্রায় পাঁচ নয়! নরম কালচে ঘাসে ভরে গেছে তার মুখ। পেশিতে কাঠিন্য আসছে। কণ্ঠস্বরেও। কী গম্ভীর ভঙ্গিতে খ্যাপাছে মাকে!

টোটো বলল, -মা, কটা বেডকভার সঙ্গে নিয়েছ তো?

ছন্দার মুখ থেকে কাল রাতের বিষাদ মুছে গেছে, তার মুখ এখন ঝকঝকে আকাশটার মতো হাস্যময়। ঠোঁট টিপে বলল,–নিয়েছি।

টুথপিক?

–তাও নিয়েছি।

 –তাহলে এখন মাধবপুর না গিয়ে যদি জঙ্গলেও যাই কোনও প্রবলেম হবে না, কী বলো?

এবার কিন্তু মারব টোটো। নীল প্রিন্টেড বাঙ্গালোর সিল্কের আঁচল কাঁধে গুছিয়ে পিছনের সিটের দিকে ঘাড় ঘোরাল ছন্দা,–হ্যাঁ রে, আমি কি সব নিজের জন্য নিই? তোদের জিনিস তোদেরই কাজে লাগে। সেই সে সেবার মুসৌরি বেড়াতে যাওয়ার সময়ে আমি যখন সঙ্গে ব্ল্যাঙ্কেট নিচ্ছিলাম, তোরা হেসে কুটিপাটি হলি, মনে আছে? হোটেলে কি ব্ল্যাঙ্কেট দেয় না মা! কেন ফালতু লাগেছ বাড়াচ্ছ! তোর বাবা তো আমাকে বলল লাগেজ ম্যানিয়াক। শেষপর্যন্ত কাজে লাগেনি? ট্রেনের এসিতে যখন দুজনে রাত্তিরে কাঁপছিলি, তখন কী হয়েছিল? কারা গায়ে দিয়েছিল ব্ল্যাঙ্কেট?

টোটো তবু খ্যাপাচ্ছে, তোমার তো হেভি মেমারি মা! পাঁচ বছর আগের কথা এখনও ভোলোনি! রিয়েলি ইউ আর গ্রেট মম!

–আমি কিছুই ভুলি না। ছন্দা সুযোগ পেয়ে একটু কটাক্ষ করে নিল শুভাশিসকে,–চিপসের প্যাকেটটা খোল এবার।

.

মা-ছেলেতে লঘু মেজাজে কথা বলে চলেছে, যেন কোনও আনন্দভ্রমণে চলেছে দুজনে! শুভাশিস একটাও কথা বলছিল না। তার মা’র সঙ্গে তার বউ ছেলের মানসিক সংযোগ প্রায় নেই বললেই হয়। থাকার কথাও নয়। বিয়ের পর প্রথম দুটো বছর ছন্দা যখন বাবা-মার সঙ্গে ছিল, একটু-আধটু সেবা করেছিল বিকৃতমস্তিষ্ক শাশুড়ির। কাছে যেতে ভয় পেত খুব, তবুও। তাও তখন মা অনেক শান্ত হয়ে এসেছে। এখনও ছন্দা যায়, কাছে গিয়ে একটু বসে ভয়ে ভয়ে। টোটো তো ঠাকুমার ধার মাড়ায় না। কোনও দিনই না। ওদের যে মা’র জন্য তেমন মানসিক উদ্বেগ আসবে না, এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু শুভাশিসেরও কি আসছে? তেমনভাবে? তারও কি কোনও দিন একটুও নিকট সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল মা’র সঙ্গে? কারুর সঙ্গেই কি তার তেমন মানসিক সম্পর্ক আছে? এই পৃথিবীতে?

ভাবনাটা আসতেই চকিতে কাল ফোনে ইন্দ্রাণীকে না বলা কথাটা মনে পড়ে গেল শুভাশিসের। তিতির। কাল ফোনে তিতিরের কথাই জিজ্ঞাসা করবে ভাবছিল। গত সপ্তাহে সর্দিজ্বর হয়েছিল মেয়েটার, সেদিন খুব কাশছিল হাসপাতালে। আদিত্যকে দেখতে গিয়ে। মেয়েটার কাশি কমল কি না কে জানে!

আশ্চর্য! কথাটা কেন এখনই মনে পড়ল শুভাশিসের!

.

০৪.

শিবসুন্দর বললেন, কী মনে হচ্ছে তোমার?

পলকহীন চোখে মনোরমাকে দেখছিল শুভাশিস। কী বিশীর্ণ চেহারা হয়েছে মার! অশীতিপর বৃদ্ধার মতো হাত-পায়ের চামড়া শিথিল! খসখসে! ফাটাফাটা! কপালে গালে অসংখ্য বলিরেখা। গলা কুঁচকে ঝুলে পড়েছে! মাথার প্রতিটি চুল সাদা! মাত্র বাষট্টি বছর বয়সে তার মা এখন এক লোলচর্ম বৃদ্ধা! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ঘুরন্ত পাখাটার দিকে। পিঙ্গল চোখের মণি সম্পূর্ণ বোধহীন। ডিসেম্বরে কয়েক ঘণ্টার জন্য এসেছিল শুভাশিস, সেদিনও মাকে তার এত জরতী লাগেনি।

শিবসুন্দর আবার প্রশ্ন করলেন, কী বুঝছ?

শুভাশিস বিড়বিড় করে বলল,–অ্যালজাইমার।

–সে তো হয়েছেই। ব্রেন সেল শুকিয়ে আসছে।

খুব র‍্যাপিড বাড়ছে, তাই না? একটা সি.টি. স্ক্যান করাবে? স্টেজটা ক্লিয়ার বোঝা যেত।

–আর নাড়াঘাটা করে কী লাভ! শিবসুন্দর যেন একটু দূরমনস্ক,–স্ক্যান করে তো আর ব্রেনের চেহারা বদলানো যাবে না!

মনোরমার মাথার কাছে অলকা দাঁড়িয়ে। অলকা তুফানের বউ, এই সংসারযন্ত্রটাকে সেই এখন চালায়। রান্নাবান্না, ঘরদোর সামলানো, আর শিবসুন্দরের দেখাশুনা করা ছাড়াও মনোরমার সেবাশুশ্রূষার বড় একটা ভার এখন তার ওপর বর্তেছে।

অলকা বলে উঠল, বৃহস্পতিবার থেকে মা কিছু মুখে তুলতে চাইছিলেন না। খাওয়াতে গেলে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দিচ্ছিলেন।

শিবসুন্দর জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, জানলার বাইরে চোখ ফেলে বললেন,–তার পরই সুগারটা সাডেনলি ফল করল। আবার হাইপোগ্লাইসিমিয়ার অ্যাটাক। সুগার কাউন্ট পঞ্চাশে নেমে গেছিল। 

শুভাশিস মনোরমার দিক থেকে চোখ সরাল না,-এবার কদ্দিনের ইন্টারভ্যালে হল?

–তা ধরো প্রায় চার মাস। পরশু গ্লুকোজ ইঞ্জেকশান দিলাম, গতবারের মতো তাড়াতাড়ি রেসপন্ড করছিল না। সেকেন্ড দিন ইঞ্জেকশানের পর থেকে রেসপন্স বেটার এল।

–আজ সুগার কাউন্ট দেখেছ?

সকালে দেখেছিলাম। বাড়ছে। সত্তর মতন উঠেছে। অ্যান্ড দি গুড থিং ইজ, ফ্লাকচুয়েট করছে না। মনে হচ্ছে কন্ডিশনটা স্টেডি হয়ে গেল।

শিবসুন্দর পুরনো আমলের ডাক্তার হলেও তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি যথেষ্ট আধুনিক, শুভাশিস জানে। বাবার ডায়োগনিসিসেও বড় একটা ভুল হতে দেখিনি সে। এখনও বাবা নিয়মিত মেডিকেল জার্নাল উল্টোয়, বেশ কয়েকটা বিদেশি পত্রপত্রিকাও আসে এই গ্রামের বাড়িতে। সেই বাবা যখন বলছে অবস্থা স্টেডি, তখন নিশ্চয়ই স্টেডি।

আসার পথে কোত্থেকে যেন এক টুকরো বাতাস জমাট বেঁধেছিল বুকে, ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বাতাসটা।

ইন্দ্রাণীর কথাই ফলে গেল!

শুভাশিসের ঠিক ভাল লাগছিল না। মা এবারেও মুক্তি পেল না। বাবা যে কী অদ্ভুত ক্ষ্যাপাটে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে! বিয়াল্লিশ বছর ধরে!

তুফান নিচের উঠোন থেকে ডাকছে,শুভদা, বৌদি, বাথরুমে জল দেওয়া হয়েছে, তোমরা চান করবে তো করে নিতে পারো। এই টোটো, তুই যাবি নাকি আমার সঙ্গে? পুকুরে?

ছন্দা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে শাশুড়িকে, টোটো দরজায় নিশ্চল।

তুফানের ডাকে সামান্য ইতস্তত করল টোটো। দোতলার বারান্দায় গিয়ে ঝুঁকল,–পুকুরে যাব? আগের বারের মতো গায়ে র‍্যাশ-ট্যাশ বেরোবে না তো?

–কিচ্ছু হবে না, চলে আয়। ফাল্গুন মাসে পুকুর পরিষ্কার করা হয়েছে, পানা টানা কিচ্ছুটি নেই।

পুকুরটা পিছনে। পাড় ঘেঁষে একটুখানি সবজি বাগান, অলকার তৈরি। সামনে কিছুটা কাঁচা মাটির উঠোন, কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেড়ার ওপারে প্রকাণ্ড এক আমগাছ। মাঝখানে শিবসুন্দরের পাকা দোতলা বাড়ি। দোতলায় তিনটি ঘর। একতলাতেও। আগে তুফান ওপরে শিবসুন্দরের কাছাকাছি থাকত, এখন বউবাচ্চা নিয়ে নেমে গেছে নীচে, চেম্বারের পাশের ঘর দুটোতে। ইদানীং শিবসুন্দর স্ত্রী নিয়ে ওপরে একা থাকাই পছন্দ করেন। দোতলা থেকে নামেনও না খুব একটা। চেম্বার, রুগী অথবা বিশেষ কোথাও যাওয়া ছাড়া। শুভাশিসরা এলে তাদের জন্য দোতলার কোণের দিকের অর্ধবৃত্তাকার বড় ঘর খুলে দেওয়া হয়। ঘরটা রোজই ঝাড়পোঁছ হয়, ধুলো ময়লার চিহ্নটুকুও থাকে না কোথাও। শুভাশিসরা এক আধদিনের জন্য এলেও। শিবসুন্দর আধুনিকমনস্ক মানুষ, দোতলাতেও দুখানা বাথরুম পায়খানার ব্যবস্থা রেখেছেন। বাথরুম দুটোও তকতকে থাকে সবসময়।

শুভাশিসের মাঝে মাঝে ভারি আশ্চর্য লাগে। কার জন্য এই বয়সে গৃহ সাজিয়ে বসে আছে বাবা? কিসের প্রত্যাশায়? শুভাশিসরা এ গ্রামে এসে কি থাকবে কোনওদিন? অসম্ভব।

বাবাও যে শেষজীবনে এখানে এসে থাকবে, এটাই কি ভাবা গিয়েছিল? শুভাশিস জানে বাবার প্ল্যান ছিল শেষ চাকরিস্থলে বাড়ি বানিয়ে থেকে যাওয়ার। সেই মতোই এগোচ্ছিল সব কিছু। রিটায়ারমেন্টের ঠিক আগে, বারাসত হাসপাতালে পোস্টেড যখন, বাবা আমডাঙায় একটা জমিও পছন্দ করেছিল। কাঠা দশেক। স্কোয়ার টাইপের। একেবারে বাস-রাস্তার ধারে। শেষ পর্যন্ত কেনা হল না। বাবার হাতে টাকাপয়সা বেশি ছিল না, দেশের জমি বাড়ি বেচতে এসেছিল, দেশ থেকে ফিরে গিয়েই মত বদলাল। বলল, আমডাঙাতেই যদি থাকতে পারি, তো মাধবপুর নয় কেন?

যে কথা, সেই কাজ। রিটায়ার করেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে সোজা মাধবপুর। ঠাকুর্দা মারা যাওয়ার প্রায় বাইশ বছর পর পাকাপাকিভাবে এ বাড়ির তালা খুলল। ঝড়ের গতিতে দোতলা উঠে গেল। একটু একটু করে বাবার শিকড় গজিয়ে গেল এখানে। মাত্র দশ বছরে। বাড়ির এতদিনকার পাহারাদার জ্ঞাতিস্বজনরা খুশি। মাধবপুরের মানুষজনও খুশি। গ্রামে একজন ভাল ডাক্তার এসেছেন। কথায় কথায় আর তাদের রামনগর ছুটতে হবে না।

প্রথম দিকে বাবার এই মাধবপুরে আসাটা শুভাশিসের একদম পছন্দ ছিল না। অনেক বার বলেছিল, রিটায়ারমেন্টের পর তোমরা আমার কাছে এসে থাকো। বাবা রাজি হয়নি। কলকাতার ওপর বাবার তীব্র বিতৃষ্ণা। বোধহয় কিছুতেই ভুলতে পারে না, ওই শহর বাবার স্ত্রীকে চিরজীবনের মতো অসুস্থ করে দিয়েছে।

শুভাশিস বারান্দায় এসে দাঁড়াল। চৈত্রের রোদ্দুর ঝাঁপাচ্ছে উঠোনে। শুকনো বাতাসে দোল খাচ্ছে ঝাঁকড়া গাছের গোছা গোছা কচি আম। হালকা গরম ভাপ উঠছে মাটি থেকে। বেড়ার ধারের টিউবওয়েল পাম্প করে খাওয়ার জল তুলছে অলকা। ছন্দা বাথরুমে।

শিবসুন্দরও বারান্দায় এলেন,–তোর কাছে সিগারেট আছে?

–আছে। শুভাশিস প্যাকেট লাইটার বাড়িয়ে দিল। মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থাকার সময় থেকেই সিগারেট ধরেছে শুভাশিস। ছুটিছাটাতে বাড়ি এলে প্রথম প্রথম লুকিয়ে লুকিয়ে টানত।

হঠাৎই একদিন শিবসুন্দর ধরলেন ছেলেকে,–কবে থেকে হল অভ্যেসটা?

 শুভাশিস আমতা আমতা করেছিল,–মানে আমি …।

শিবসুন্দর হেসেছিলেন,–আমিও মেডিকেল কলেজে ঢুকে ধরেছিলাম। ডেলি কটা খাও?

শুভাশিস মাথা নিচু করেছিল,–তেমন একটা খাই না।

দাঁতে নিকোটিনের ছোপ পড়ে গেছে যে! শিবসুন্দর হাসছিলেন, অভ্যেসটা না করলেই ভাল করতে হে। আমি ধরে পস্তাচ্ছি। এনিওয়ে, লুকিয়ে খেয়ো না, তাতে লাঙসের সঙ্গে ব্রেনটাও অ্যাফেক্টেড হয়।

শুভাশিস অবাক,–ব্রেন অ্যাফেক্ট করবে কেন?

–এসব ছোটখাট ব্যাপার আনডিউলি গোপন করার চেষ্টা করলে মনে একটা পাপবোধ জাগে। মস্তিষ্কের পক্ষে সেটা স্বাস্থ্যকর নয়। অ্যান্ড ইউ নো, আ ডক্টর মাস্ট অলওয়েজ হ্যাভ এ ক্লিয়ার কনসেন্স। বড়দের সম্মান অসম্মান সিগারেটের ধোঁয়ার ওপর ডিপেন্ড করে না। সম্মানবোধ হৃদয় থেকে আসে। তুমি আমার সামনেই খেয়ো।

হায় রে! হৃদয় কি কখনও বিবেককে সাফ থাকতে দেয়! এত চাহিদা হৃদয়ের!

 সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা নাড়াচাড়া করছিলেন শিবসুন্দর। বললেন, তুমি কি আজকাল আর দিশি খাও না?

শুভাশিস প্রশ্নটা এড়াতে চাইল। গম্ভীরভাবে বলল,–তোমার কিন্তু এবার সিগারেটটা ছেড়ে দেওয়া উচিত বাবা।

শিবসুন্দর বালকের মতো হাসলেন,–চেষ্টা তো করছি। কমিয়েও দিয়েছি অনেক। সারা দিনে বড় জোর পাঁচটা।

–এই সিগারেট দু প্যাকেট রেখে যাব, ধীরেসুস্থে খেয়ো। এগুলো মাইল্ড আছে, পেপারের কোয়ালিটি ভাল, তোমার পক্ষে লেস হার্মফুল।

–অলরাইট। যাও, চানটান সারোগে। অলকা এক্ষুনি খাওয়ার তাড়া লাগাবে।

শুভাশিস বাবার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিটা দেখছিল। হাইট খুব বেশি নয় মানুষটার, কিন্তু চেহারায় এক উঁচু ব্যক্তিত্ব আছে। এখনও দিব্যি শক্তপোক্ত শরীর, চলাফেরাটি দৃপ্ত, যাকে বলে–ম্যান অফ ফুল কনফিডেন্স। কে বলবে সত্তর পেরিয়ে গেছে বাবা!

ভরপেট খেয়ে আমগাছতলায় নেয়ারের খাটিয়া পেতে শুল শুভাশিস। গ্রীষ্মকালের দিকে দেশে এলে এখানেই দুপুরটা কাটে ভাল। ঘন পাতাভরা গাছের ছায়ায়, হালকা ঢুলুনিমাখা হাওয়ায় যে আরাম লুকিয়ে থাকে, এ বাড়ির দোতলার ঘরখানায় সেটা পায় না শুভাশিস। কিংবা বলা যায়, এটা এক ধরনের শহুরে বিলাস। তা যাই হোক, পথের ক্লান্তি আর বিশ্রামের স্বস্তি মিলিয়ে শুভাশিসের ঘুমটিও হল ভারি চমৎকার। গাছতলায় সে যখন জেগে উঠল তখন তার শরীর বেশ টাটকা। মেজাজ ফুরফুরে।

সূর্য ক্ষয়াটে মেরে গেছে। বাড়িতে কারুর সাড়াশব্দ নেই। শুধু অলকা একতলার দাওয়ায় বসে কি একটা সেলাই করছে। পাশে আপন মনে খেলা করছে তার দেড় বছরের মেয়ে।

অলকা শুভাশিসকে দেখে উঠে দাঁড়াল,–দাদা, চা করব?

–হ্যাঁ করো। এক্ষুনি এক কাপ গরম চা দরকার। শুভাশিস উঠোনে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল,–কাউকে দেখছি না যে? কোথায় সব?

–দিদি একটু রাঙাজেঠিমাদের বাড়ি গেছে। ঝিমলি ডেকে নিয়ে গেল। বাবা গেলেন বেতিয়া। জরুরি কল এসেছিল। ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে।

বাকি দুই মক্কেল? টোটোবাবু কি এখনও পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছন?

না। এই তো দুজন হাঁটতে বেরোল। শ্মশানের দিকে গেল মনে হয়।

মাধবপুরের শ্মশানটি রীতিমতো বিখ্যাত। আশপাশের বিশ গাঁয়ের লোক বলে মাধবপুরের শ্মশান সাক্ষাৎ শিবের থান। দূর দূর থেকে অনেকেই এ শ্মশানে দাহ করতে আসে। শিবের মন্দিরও আছে। একটা। বারো মাসই সেখানে দু-চারটে জটাজুটধারী সন্ন্যাসী এসে আস্তানা গাড়ে। জম্পেশ গাঁজার আসর চলে দিনরাত। গত বছর এক রক্তচক্ষু তান্ত্রিক এসে আসর জমিয়েছিল। লোকটা গ্রামে ঢুকে খাবার-দাবারের জন্য হামলা করত, কারণবারি পান করে টঙ হয়ে থাকত সর্বক্ষণ, পঞ্চায়েতের লোকজন ধমকধামক দিয়ে তাড়িয়েছিল লোকটাকে। শ্মশানের ধারে প্রকাণ্ড এক অশত্থ গাছও আছে, গাছটাকে ঘিরে ছোটখাটো মেলা বসে। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে। ওই শ্মশান সম্পর্কে টোটোর ভীষণ কৌতূহল।

অলকা চা এনেছে।

শুভাশিস চায়ে চুমুক দিচ্ছে, অলকা নড়ছে না সামনে থেকে। মৃদু কণ্ঠে বলল,–বিস্কুট দেব?

-না না, ওরে বাবাহ। দুপুরে যা খাইয়েছ, গলা অব্দি উঠে আছে। ফাইন রেঁধেছিলে মুরগিটা।

কী আর এমন যত্ন করতে পারি? আপনি একটু বাড়িয়ে বলেন। অলকা লজ্জা পেল যেন,–দাদা, আপনারা কি কালই চলে যাচ্ছেন?

দূরে, বহু দূরে, অথচ দূরত্বের হিসেবে যেটা মাত্র পঞ্চাশ ষাট কিলোমিটার, সেখানে যে একটা শহর আছে সে কথাটা প্রায় স্মরণে ছিল না শুভাশিসের। মনে পড়তেই গলায় একটা টক ঢেকুর উঠল। বেজার মুখে বলল,–দেখি। মার যখন ইমিডিয়েট কোনও ডেঞ্জার নেই … ওদিকে অনেক কাজও তো …

–দাদা, একটা কথা বলব?

বলো।

–এটা তো ঠিক আপনাদের নিয়মের আসা নয়, উপরি আসা। এক-দু দিন থেকে যান না। আপনারা এলে বাবার খুব ভাল লাগে।

-বাবা বুঝি বলেছে তোমাকে?

না। আমার মনে হয়। তাছাড়া শুধু বাবা কেন, আমাদেরও ভাল লাগে।

শুভাশিস হেসে ফেলল; উত্তর দিল না। তুফানের বউটি বেশ লক্ষ্মীমন্ত হয়েছে। হাতে পায়ে খাটতে পারে। বুদ্ধিমতী। চাপাডাঙা কলেজের অফিস ক্লার্কের মেয়ে। ওই কলেজেরই পাস গ্র্যাজুয়েট। বাবার নিজের পছন্দ করা মেয়ে, দেখতে সুন্দরী নয়, তবে শরীরে বেশ যৌবন আছে। অলকা আসার পর তুফান এখন অনেক ঝাড়া হাত-পা, সংসারের কাজকর্ম বউয়ের হাতে ছেড়ে কম্পাউন্ডারিতেই বেশি মনোযোগী এখন।

শুভাশিস চা খেয়ে দোতলায় উঠছিল, অলকা পিছন থেকে ডাকল,–দাদা, একটা কথা তখন আপনাকে বাবার সামনে বলিনি। মা সত্যিই কেমন হয়ে গেছিলেন সেদিন!

শুভাশিস ভুরু কোঁচকাল,–কেমন?

কী যে বলি! সে এক ভয়ঙ্কর মূর্তি। এই চার বছরে এক দিনও মায়ের ওরকম মূর্তি দেখিনি। সকালবেলা বাবা তখন চেম্বারে, আমি মাকে চান করাতে এসেছি, হঠাৎ কী যে হয়ে গেল মার! আমাকে খামচে ধরেছেন! জামাকাপড় গায়ে রাখতে চাইছেন না! বিছানায় ধরে রাখা যায় না! গঁগঁ আওয়াজ উঠছে মুখ থেকে! ঠিক মনে হচ্ছিল, একটা সাংঘাতিক রাগী মানুষ কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু রাগে গলা দিয়ে কথা ফুটছে না! আমি তো ভয়ে বাবাকে …! তারপরই তো একদম অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

–হুঁ। শুভাশিস সামান্য চিন্তিত,–স্কিজোফ্রেনিয়ার পেশেন্ট তো, কখন কি আচরণ করবে কিছুই প্রেডিক্ট করা যায় না। সেরিব্রাল অ্যাটাক যে হয়নি, এটাই ভাগ্য।

শুভাশিস দোতলায় এসে গেঞ্জির ওপর একটা পাঞ্জাবি চড়াল। মনোরম এক বিকেল গুটিগুটি পায়ে আঁধারের দিকে এগোচ্ছে। হুশহাশ বাতাস বইছে। চারদিকে একটা চক্কর দিয়ে এলে মন্দ হয় না। কি ভেবে মত বদলাল শুভাশিস। পাঞ্জাবি খুলে টাঙিয়ে দিল দেওয়ালের হুকে। পায়ে পায়ে মনোরমার ঘরে এসেছে।

মনোরমা ঘুমোচ্ছেন। পাতলা চাদরে শরীর আকণ্ঠ ঢাকা। ঈষৎ ফোলা ঘুমন্ত মুখ ফ্যাকাশে, সাদা। খুব আস্তে আস্তে ওঠানামা করছে মনোরমার বুক।

হঠাৎই শুভাশিসের একটু ছুঁতে ইচ্ছে হচ্ছিল মাকে। পালসটা একবার দেখবে কি? আটফাটা মাটির মতো শুখা চামড়ায় আস্তে হাত বোলাবে? থাক, যদি মা জেগে যায়!

দৃশ্যটা পুরনো। বহু পুরনো। তবু হুড়মুড় করে ধেয়ে এল আচমকাই। খুব ছোটবেলায়, তখন বোধহয় বয়স পাঁচ কি ছয়, একবার চুপিসাড়ে মা’র ঘরে ঢুকেছিল শুভাশিস। বাবা হাসপাতালে গেলে দরজা বন্ধ থাকত মা’র ঘরের, ছোট শুভাশিস টুলে উঠে দরজা খুলেছিল। শীতের দুপুর, বালিশে চুল বিছিয়ে ঘুমোচ্ছে মা, লাল সিঁদুরের চাকা লেপটে আছে কপালে। মাকে দেখে একটুও পাগল মনে হচ্ছে না, এত প্রশান্তি, এত মাধুর্য মা’র মুখে! মার খুব কাছে মুখ এনে বালক দেখছিল মাকে। ঝট করে মায়ের চোখ খুলে গেল। দৃষ্টি দু-এক সেকেন্ড স্থির। যেন চেনার চেষ্টা করছে। তারপর হঠাৎই ভয়ার্ত শিশুর মতো চিৎকার করে উঠেছে মা। বুঝি শুভাশিস নয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক রক্তখেকো খুনি। দেখতে দেখতে চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। হাত মুঠো হয়ে গেছে। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত সজোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে চাইল সামনের প্রাণীটিকে। পর মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে বালকের দেহে। পাঁচ বছরের ছেলেটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলল। ছেলের বুকের ওপর চেপে বসে প্রাণপণ শক্তিতে গলা টিপে ধরেছে মা। জান্তব গর্জনে শিউরে উঠল নিঝুম দুপুর। ছোট্ট শুভাশিস কোনওক্রমে ছাড়িয়ে নিয়েছিল নিজেকে। আত্মরক্ষার স্বাভাবিক তাগিদে। ছিটকে পালিয়েছিল ঠাকুমার কাছে।

এই তার মা! তার গর্ভধারিণী!

মনোরমার ঘর থেকে এক পা এক পা করে বেরিয়ে এল শুভাশিস। এতদিন পর নতুন করে মন খারাপ হওয়ার কোনও মানে হয় না, মন আর খারাপ হয়ও না, তবু আজ শুভাশিস কেমন এক বিষাদে ভরে যাচ্ছিল। একদল নির্বোধ মানুষের নৃশংসতা কিভাবে পিষে দিয়ে গেছে একটা জীবনকে!

শুভাশিস যখন দু মাসের, ঠিক তখনই ঘটেছিল দুর্ঘটনাটা। ছেচল্লিশের ষোলোই অগাস্ট। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। কলকাতায় সেদিন শুরু হয়েছে ভয়াবহ দাঙ্গা। শহর কেঁপে উঠছে রণোন্মাদদের হিংস্র উল্লাসে। এন্টালিতে, বাপের বাড়িতে, শিশুপুত্র কোলে ত্রাসে কাঁপছে এক যুবতী। তার দাদা সারা রাত বাড়ি ফেরেনি, দাদার সন্ধান করতে গিয়ে বাবাও নিখোঁজ। তিনটে বাড়ি পরে এক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে গভীর হৃদ্যতা ছিল মনোরমার বাবার। তাদেরই পাহারায় দুঃস্বপ্নের রাত কাটল। মনোরমার। মনোরমার মা’র। পরদিন সকালে খোঁজ পাওয়া গেল দাদার। নোনাপুকুর ডিপোর সামনে ট্রাম লাইনে পড়েছিল তার লাশ। তলোয়ারের কোপে ক্ষতবিক্ষত। আর বাবাকে পাওয়া গেল হাসপাতালে। তাঁরও বুকে পিঠে ছুরির আঘাত।

ভয়ঙ্কর আতঙ্কে সেদিন থেকেই মস্তিষ্ক বিকল হতে শুরু করে মনোরমার। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকেন, মুখে কোনও শব্দ নেই, শুধু দু হাতে আঁকড়ে আছেন তাঁর শিশু সন্তানকে। শিবসুন্দর তখন কলকাতায় ছিলেন না, ছিলেন মেদিনীপুরে। খবর পেয়ে তিনি যখন এসে পৌঁছোন তখন পিউপেরিয়াম সাইকোসিস ভাল মতন গেড়ে বসেছে মনোরমার মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বেশ কয়েকজন বড় ডাক্তারকে দেখানো হল। ওষুধ ইঞ্জেকশান শক থেরাপি কিছুই বাদ যায়নি। কোনও লাভ হল না, খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটল মনোরমার। কখনও বা একদম চুপ, কখনও বা নিজের মনে বিড়বিড়, কখনও আবার হিংস্র ধরনের উন্মাদিনী। প্রথম প্রথম চেনা লোক দেখলে কিছু মানসিক প্রতিক্রিয়া হত, পরে সেটুকুও মুছে গেল। নিজের স্বামীকেও আর চিনতে পারেন না। বেঁচে থাকার কয়েকটা ন্যূনতম ধর্ম ছাড়া আর কিছুই টিকে নেই মানুষটার।

পুরনো কথা বড় তেতো। হাঁ হাঁ করে গিলে খায় সময়কে। ফুটে ওঠা বিকেল ঝুপ করে নিবে গেল। একটা একটা করে নক্ষত্র জাগল আকাশে। তারায় তারায় ভরে গেল নভোমণ্ডল। গ্রামদেশের বিজলি আলো কমতে কমতে চলে গেল একেবারে। আবার এল। আবার গেল। এল। ঝিঁঝি ডাকছিল।

রাতে শোওয়ার আগে ছন্দা জিজ্ঞাসা করল, আমরা কাল ফিরছি তো?

শুভাশিস অন্যমনস্ক। বিকেলটা এখনও সেঁধিয়ে আছে মনে। বলল, -কী যে করি? কালকের দিনটা ভাবছি থেকেই যাই। ওখানে দু দিন কাজকর্মও অফ করা আছে!

থেকে যাবে? বাবা যে বলছিলেন মা এখন ভাল!

–এসব পেশেন্টদের কিছুই বলা যায় না। হেলথের যা কন্ডিশান, যে কোনও সময়ে ওয়ার্স হয়ে যেতে পারে। শুভাশিস বিছানায় শুল, তাছাড়া অলকাও বলছিল, আমরা এলে বাবার ভাল লাগে…

–অলকার কথা বাদ দাও। মহা ঘোড়েল মেয়ে। সামনাসামনি মুখমিষ্টি, পেছনে যা চালানোর চালিয়ে যাচ্ছে। সংসার খরচের টাকাও তো এখন ওর কাছে থাকে।

-তো?

–চান্স পেলেই বাপের বাড়িতে টাকা সাপ্লাই দিচ্ছে। অঘ্রান মাসে বোনের বিয়ে হল, দামি নেকলেস দিয়েছে একটা।

–তুমি কোত্থেকে জানলে?

মাধবপুরের সবাই জানে। রাঙাজেঠিমা বলছিলেন, তোমরা এবার একটু নজরটজর দাও, নইলে যে সব বারো ভূতে খেয়ে শেষ করবে।

যত সব আগলি রিমার্ক! শুভাশিস বিরক্ত, –তুফানরা কি বারো ভূত?

–ওই হল। মুখে তোমরা যাই বলো, আশ্রিত তো বটে!

শুভাশিসের হাই উঠছিল। লো ভোল্টেজে অলস গতিতে ঘুরছে পাখা। জানলার বাইরেও বাতাস বড় কম।

ছন্দা আঁচলে ঘাড় গলা মুছল, তুফানকেও যত তোমরা আলাভোলা ভাব, তত আর নেই। বিয়ে করে তুফান অনেক পাল্টে গেছে।

কে এসব কূটকচালি ঢোকাচ্ছে ছন্দার মাথায়! জ্ঞাতিরা? প্রতিবেশীরা? শুভাশিসের হাসি পেয়ে গেল। তুফান পাল্টে যাবে?

সেই তুফান! নর্থবেঙ্গলের তুফানগঞ্জ থেকে বাবার তুলে আনা তুফান! বাপ-মা মরা ছেলে, হেলথ সেন্টারের দাওয়ায় পড়ে থাকত, ক্লাস সিক্সের শুভাশিসের সঙ্গী হবে ভেবে ছেলেটাকে বাড়ি নিয়ে এল বাবা। সেই থেকে তুফান এই পরিবারের সদস্য। শুভাশিসের ভাই। জামা জুতো খাওয়া থাকা শোওয়া কোনও কিছুতেই ছেলের সঙ্গে তার তফাত রাখেননি শিবসুন্দর। লেখাপড়ায় তুফানের মাথা খুব ভাল ছিল না, তবু অনেকটাই শিখেছে। টেনেটুনে হায়ার সেকেন্ডারিতে সেকেন্ড ডিভিশান। ঘষে ঘষে দু বারে বি এ। শিবসুন্দরকে ছেড়ে নড়বে না বলে চাকরির চেষ্টাই করেনি কোনও দিন। শুভাশিসের জন্যও প্রাণ দিয়ে দিতে পারে সে। শুভাশিস জানে।

শুভাশিস চোখ বুজে বলল, –শুয়ে পড়ো। আমার ঘুম পাচ্ছে।

অলকা বিছানা করে মশারি টাঙিয়ে দিয়ে গেছে, ছন্দা মশারির ভেতরে এল। আলগোছে বালিশে মাথা রেখে বলল, –আজকাল আমার মশারির ভেতর শুলে কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে।

শুভাশিস দেওয়ালের দিকে ফিরল, কী করতে হবে? মশারিটা খুলে দেব?

–হ্যাঁ, তারপর ম্যালেরিয়ায় কোঁ কোঁ করি! তুমি তো তাই চাও। ছন্দাও পিছন ঘুরে শুয়েছে, –আমার কী? আমি যেখানে খুশি থাকতে পারি।

–শুধু এই মাধবপুরে ছাড়া।

–মোটেই না। এখানে আমার ভালই লাগে। কলকাতার থেকে ফার বেটার। তোমারই এখানে মন বসে না।

ইঙ্গিতটা কোন দিকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছিল শুভাশিস। আবার একটা হাই তুলে বলল, তুমি কি এখন একটা ফুল ফ্লেজেড ঝগড়া করতে চাও নাকি? চলো, বারান্দায় গিয়ে বসি। হয়ে যাক ঘণ্টা খানেক।

ছন্দা সাড়া করল না, কাঠ হয়ে শুয়ে রইল। খানিক পরে বলল, -টোটোটা এখানে একদম বোর হয়ে যায়। ভোল্টেজের যা হাল, টিভি দেখা যায় না, নিজের কোনও সার্কল নেই …

–একটু হ্যাবিট করুক। দেশ বলে কথা!

.

সকালে পিছনের সবজিক্ষেতটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল শুভাশিস। ছোট্ট জমিতে পটল ঝিঙে ঢ্যাঁড়োশ কুমড়ো আর কত রকম শাক ফলিয়েছে অলকা! একটা কুমড়ো তো একেবারে ম্যাগনাম সাইজ! মিনিমাম কিলো পাঁচেক! ক্ষেত পরিক্রমা সেরে শুভাশিস বাবার চেম্বারেও উঁকি দিল একবার। বারান্দার বেঞ্চিতে ভাল ভিড়। এ গ্রামের থেকেও আশপাশের গ্রামের লোকই বেশি। গোটা অঞ্চলে বাবার চিকিৎসার খ্যাতি আছে। তুফানও কম্পাউন্ডারিতে রীতিমতো দক্ষ এখন। ক্ষিপ্ত হাতে মিকশ্চার বানিয়ে চলেছে। রুগীদের নাম ধাম লিখছে জাবেদা খাতায়। চেম্বারের কোণে যথারীতি বাক্স রাখা, রুগীদের সাধ্য মতো ফিজ জমা পড়ে বাক্সে। শুভাশিস দেখল তুফানের পাশে বসে টোটো টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে বাক্সটাকে।

শুভাশিস ছেলের দিকে চোখ নাচাল। মানে, কি রকম হচ্ছে?

টোটোও ইঙ্গিতে উত্তর দিল। ভালই। বেশ নোট-ফোট পড়ছে।

বারান্দার এক রুগী শুভাশিসের দিকে তাকিয়ে হাসল। লোকটাকে চেনে শুভাশিস। মাধবপুরেরই লোক। কপালে ইয়া বড় আব। দেখলেই হাত নিশপিশ করে। গত বার লোকটাকে বলেওছিল কলকাতায় এলে বিনা পয়সায় কাটিয়ে দেবে। লোকটা আমল দেয়নি। কেন দেয়নি, বোঝে শুভাশিস। কলকাতায় তার যতই রমরমা থাক, মাধবপুরে সে শুধুই শিবডাক্তারের ছেলে। যদিও বাবা মাঝে মাঝেই এখান থেকে পেশেন্ট পাঠায় তার কাছে। সার্জারির কেস। তারাও ফিরে এসে বলে শিবডাক্তারের ছেলে অপারেশান করল। ব্যাপারটা অবশ্য উপভোগই করে শুভাশিস। সফল মানুষের তত-সফল-নয় বাবার পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মধ্যে এক ধরনের আত্মগরিমাও থাকে।

বিকেলের দিকে এলোমেলো হাঁটতে বেরোচ্ছিল শুভাশিস। দুপুরভর বিশ্রী গুমোট ছিল, ছোট্ট এক ঝলক ঝড় হয়ে গেছে খানিক আগে। সঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা বারিবিন্দু। জলকণার স্পর্শে প্রকৃতি ভারি স্নিগ্ধ। কোমল। শুভাশিসের মনটাও চিন্তাশূন্য এখন। দুপুরে নিজের হাতে গ্লুকোজ স্টিকে মা’র রক্তবিন্দু পরীক্ষা করেছে, সুগার একেবারে নরমাল। নব্বই। অঘোরে ঘুমোচ্ছে মা।

শিবসুন্দর স্ত্রীকে একবার দেখে এসে বললেন, চলো, আমিও একটু ঘুরে আসি। অলকা, তুমি একটু নজর রেখো তো।

টোটো বলল, চলো তুফানকাকা, আমরাও যাই।

তুফান বলল, –কোন দিকে যাবি? আজও শ্মশান?

–না। আজ রাজবাড়ি।

মাধবপুরের রাজবাড়ি অবশ্য দর্শনীয় কিছু নয়। শুধুই এক অতিকায় ধ্বংসস্তূপ। ভাঙাচোরা খাঁচা। রাজাবিহীন। রাজ্যবিহীন। দরজা জানলাবিহীন। ছাদবিহীন। লাল পাতলা ইটের পিঞ্জরে এখন সাপখোপের বাস। মানুষ দূরে থাক, কুকুর বিড়ালও ওই ধ্বংসস্তূপে ঢুকতে অস্বস্তি বোধ করে। এ অঞ্চলের বাসিন্দারা পুরুষানুক্রমে দেখে আসছে বাড়িটাকে। রাজবাড়িতে রাজা কে ছিল, আদৌ কেউ ছিল কি না, এ নিয়ে বিস্তর কিংবদন্তি চালু আছে। এর কোনওটাকেই সত্যি বলে বিশ্বাস হয় না শুভাশিসের।

টোটো তুফান দ্রুত চলে গেছে। শুভাশিস আর শিবসুন্দর রাস্তা ধরে ধীর লয়ে হাঁটছিল। বহুকাল পরে বাবার পাশে পাশে হাঁটছে শুভাশিস। ভাল লাগছে। শৈশবের মতো। এ সময়ে স্মৃতিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে মাথায়।

অসাবধানে শুভাশিস হোঁচট খেল একটা। সদ্য ফেলা ইট এখনও রাস্তার সব জায়গায় বসেনি ভাল করে, উঁচু হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়।

শিবসুন্দর বললেন, –সাবধান।

শুভাশিস বলল, রাস্তাটা পিটোয়নি দেখছি।

আর পিটোনো! ফেব্রুয়ারি মার্চে দু হাততা টাকা আসে পঞ্চায়েতে, কি করবে ভেবে না পেয়ে রাস্তায় কাঁড়ি কাঁড়ি ইট ফেলে দেয়। তারপর কে কার কড়ি ধারে!

–তা যাই বলো, যখন এসেছিলে তখন তো সবই কাঁচা পথ। নানারকম অ্যাকশন প্ল্যানে তাও মোরাম বেছানো রাস্তা পেয়েছ! মেন রোড থেকে রাস্তাটা তো পিচ-টিচ ঢেলে একেবারে দারুণ করে দিয়েছে।

হুঁ, কাজ হচ্ছে না, তা নয়। আটাত্তরের বড় ফ্লাডটার পর থেকেই হচ্ছে। দশ বছরে কতগুলো ডিপ টিউবওয়েল বসে গেল! শ্যালো বসল।

কথা বলতে বলতে খালপাড়ে এসে পড়েছে দুজনে। খাল বলতে, দামোদরের একটা সরু স্রোত। কোন কালে পথ ভুলে নদী থেকে বেরিয়ে এসেছিল স্রোতটা। দামোদরও মজে গেছে, স্রোতটাও এখন এক শীর্ণ নালা মাত্র। তবে বর্ষাকালে উপচে যায়। তখন মরা স্রোত ছুটে যায় মাইল দশেক দূরের বড় জলায়। এ অঞ্চলের লোকরা যাকে বলে কালিয়ার বিল।

দূরে তুফানের সঙ্গে হাঁটছে টোটো। খালের ওপারে ক্ষেতের আল বেয়ে। ভাঙা রাজবাড়ির সামনে দিয়ে। তুফান দু হাত নেড়ে টোটোকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে, টোটো প্রবলভাবে ঘাড় নাড়ছে। ভগ্নস্তূপের ওপারে সূর্য অস্তগামী। প্রাচীন বাড়ি, তুফান, টোটো, দুজনের হাতমুখ নাড়া, এখন এক অনুপম সিলুয়েট।

শুভাশিস সিলুয়েটটা দেখছিল।

শিবসুন্দর মৃদু স্বরে বললেন, কাকা ভাইপোয় খুব ভাব।

শুভাশিস হাসল, –ভাব আছে, তবে দুজনের মতের মিল হয় না। তুফান যত সব আজগুবি গল্প শোনাবে আর টোটো কলকাতায় গিয়ে আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করবে। স্ট্রেঞ্জ! তুফানের একটা কথাও বিশ্বাস করে না, তাও বাবুর শোনা চাই।

–তা হোক। এভাবেই যদি টান গড়ে ওঠে! শিবসুন্দর মুহূর্তের জন্য উদাস, –তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম।

কী?

ছন্দা বলছিল, তুমি নাকি শিগগির নিজের নার্সিংহোম খুলছ?

–এখনও কিছু ঠিক নেই, প্ল্যান চলছে।

–তোমার তো প্র্যাকটিস যথেষ্ট ভাল, আলাদা করে নার্সিংহোম খোলার দরকার পড়ল কেন?

–অন্যের নার্সিংহোমে অনেক ঝামেলা হয়। ইচ্ছে মতো অপারেশানের ডেট ফেলা যায় না। পছন্দ মতো স্টাফ থাকে না সব জায়গায়।

–এগুলো কি তোমার যথেষ্ট যুক্তি বলে মনে হয়?

শুভাশিস ফস করে সিগারেট ধরাল, যুক্তি কি না জানি না, পরের নার্সিংহোমে কাজ করে সুখ নেই বাবা।

সুখ জিনিসটা নিজের মনের ব্যাপার শুভ। আমি তো হসপিটালে হসপিটালে কাজ করেই জীবন কাটিয়ে দিলাম। রিটায়ারমেন্টের আগে কোনওদিন প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করিনি। তোমার কি মনে হয় আমি খুব আনহ্যাপি ছিলাম? অথবা তুমি খুব কষ্টে বড় হয়েছ?

শুভাশিস নীরব।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *