১৪. আবিসিনিয়ায় হিজরতের জন্যে হযরত আবু বকর (রা)-এর সিদ্ধান্ত

আবিসিনিয়ায় হিজরতের জন্যে হযরত আবু বকর (রা)-এর সিদ্ধান্ত

ইবন ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবন মুসলিম উরওয়া সূত্রে হযরত আইশা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মক্কার জীবন যখন হযরত আবু বকর (রা)-এর জন্যে সংকটময় হয়ে উঠল, তিনি যখন সেখানে নানা প্রকারের জুলুম-অত্যাচারে জর্জরিত হচ্ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের বিরুদ্ধে কুরায়শদের শক্তিমত্তা প্রত্যক্ষ করলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট হিজরতের অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে অনুমতি দিলেন। হযরত আবু বকর (রা) আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মক্কা থেকে এক দিন কি দু’দিনের পথ অতিক্রম করার পর ইবন দাগিন্নার সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। সে ছিল বনু হারিছ ইবন বকর ইবন আবদ মানাত ইবন কিনানা-এর ভাই। তার নাম ছিল হারিছ। ইবন ইয়ায়ীদ। আবাদ মানাত ইবন কিনানা গোত্রের বনু বকর উপগোত্রের অন্তর্ভুক্ত। সুহায়লী বলেন, তার নাম ছিল মালিক। সে বলল, আবু বকর! কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আবু বকর (রা) বললেন, আমার সম্প্রদায় তো আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। তারা আমাকে নানা দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত করে তুলেছে এবং আমার জীবন সংকটাপন্ন করে দিয়েছে। সে বলল, ওরা কেন এমনটি করেছে? আপনি তো গোত্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন, বিপদে সাহায্য করেন, সৎকাজ করেন এবং দীন-দুঃখীদের জন্যে অর্থ ব্যয় করেন। আপনি ফিরে আসুন, আপনি আমার আশ্রয়ে থাকবেন। হযরত আবু বকর (রা) তার সাথে ফিরে এলেন। মক্কায় পৌছে ইবন দাগিন্না তার সাথে দাঁড়াল এবং ঘোষণা

দিয়ে বলল। হে কুরায়শ সম্প্রদায়! ইবন আবু কুহাফা অর্থাৎ আবু বকরকে আমি নিরাপত্তা দিয়েছি, কেউ যেন তার প্রতি অসদাচরণ না করে। ফলশ্রুতিতে তারা সকলে তার প্রতি অসদাচরণ থেকে বিরত থাকে।

হযরত আইশা (রা) বলেন, হযরত আবু বকর (রা)-এর একটি মসজিদ ছিল সেটি বনু জুমাহ গোত্রে তার দ্বার প্রান্তে অবস্থিত ছিল। তিনি ওই মসজিদে নামায আদায় করতেন। তিনি ছিলেন একজন কোমল হৃদয়ের লোক। কুরআন মজীদ পাঠ করার সময় তিনি অনবরত কাঁদতে থাকতেন। তাঁর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে নারী-শিশু ও দাস-দাসীরা তার চারিদিকে দাড়িয়ে থাকত। এ অবস্থায় কুরায়শের কতক লোক ইবন দাগিন্নার নিকট উপস্থিত হয়ে বলে, হে ইবন দাগিন্না! আপনি তো নিশ্চয়ই আমাদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এ লোককে আশ্রয় দেননি। সে যখন নামায আদায় করে এবং মুহাম্মদ (সা) যা নিয়ে এসেছে তা পাঠ করে, তখন সে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভয়-ভীতিতে বিগলিত হয়ে পড়ে এবং তার মধ্যে একটা অসাধারণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। আমরা তো আশংকা করছি যে, আমাদের নারী-শিশু ও দুর্বল লোকদেরকে সে বিভ্রান্ত করবে। সুতরাং তুমি তাকে বলে দেবে যে, সে যেন তার ঘরের মধ্যে থাকে এবং সেখানে তার মন যা চায় তা করে। হযরত আইশা (রা) বলেন, এরপর ইবন দাগিন্না উপস্থিত হয়। হযরত আবু বকর (রা)-এর নিকট আসে এবং সে বলে, আবু বকর! আপনার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে তো আমি আপনাকে আশ্রয় দিইনি। আপনার বর্তমান কর্মকাণ্ড তারা পসন্দ করছে না। আপনার কারণে তারা কষ্ট বােধ করছে। আপনি বরং আপনার গৃহের মধ্যে অবস্থান করুন এবং সেখানে যা ইচ্ছা তা করুন।

হযরত আবু বকর (রা) বললেন, তাহলে আমি কি তোমার আশ্রয় প্রত্যাহার করে আল্লাহর আশ্রয় গ্ৰহণ করব? সে বলল, তবে তাই হোক, আপনি আমার আশ্রয় থেকে মুক্ত হয়ে যান। আবু বকর (রা) বললেন, তোমার আশ্রয়জনিত দায়, দায়িত্ব আমি ফিরিয়ে দিলাম। তখন ইবন দাগিন্না দাঁড়িয়ে বলল, হে কুরায়শ সম্প্রদায়। ইবন আবু কুহাফা। আমার আশ্রয়ে থাকাজনিত দায়-দায়িত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন, এখন তোমাদের লোকের সাথে তোমাদের যা করার করতে পোর।

ইমাম বুখারী (র) এ বিষয়ক একটি হাদীছ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। ওই হাদীছে কিন্তু আরো সুন্দর ও বর্ধিত বিবরণ রয়েছে। তিনি বলেছেন ইয়াহইয়া ইবন বুকায়ার….. রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহধর্মিণী আইশা (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি আমার বাল্যকাল থেকেই আমার পিতামাতাকে দীনের অনুসারী বলেই দেখে এসেছি। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক দিন সকাল-বিকাল দু’বার আমাদের বাড়ীতে আসতেন। মুসলমানগণ যখন কাফির-মুশরিকদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তখন আবু বকর (রা) আবিসিনিয়ায় হিজরত করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। বারিক আল গামাদ নামক স্থানে পৌছার পর ইবন দাগিন্নার সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। সে ছিল ওই অঞ্চলের নেতা। সে বলল, আবু বকর! কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে বের করে দিয়েছে। আমি এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, দেশে দেশে ঘুরবো। আর আমার প্রতিপালকের ইবাদত করবো। ইবন দাগিন্না

বলল, হে আবু বকর! আপনার মত জ্ঞানী-গুণী লোককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা যায় না এবং এমন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যেতেও পারে না। আপনি তো দরিদ্র ও নিঃস্ব লোকদেরকে সাহায্য করেন। আত্মীয়তা রক্ষা করেন। অন্যের বোঝা নিজে বহন করেন। মেহমানদেরকে আদর-আপ্যায়ন করান এবং বিপদাপদে মানুষকে সাহায্য করেন। আমি আপনাকে আশ্রয় দেয়ার দায়িত্ব নিলাম। আপনি আপনার গৃহে ফিরে যান এবং আপন প্রতিপালকের ইবাদত করুন। হযরত আবু বকর (রা) ফিরে এলেন। তার সাথে ইবন দাগিন্নাও ফিরে আসলো। সন্ধ্যাবেলা ইবন দাগিন্না সন্ত্রান্ত কুরায়শী লোকদের সাথে সাক্ষাত করে এবং তাদেরকে বলে, আবু বকরের মত লোককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা যায় না। ওই ধরনের লোক স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যেতেও পারে না। তোমরা কি এমন এক লোককে বের করে দিতে চাও, যে লোক দরিদ্র ও নিঃস্বদেরকে অর্থ উপার্জন করে দেয়। আত্মীয়তা রক্ষা করে। অন্যের বোঝা বহন করে। মেহমানকে আদর-আপ্যায়ন করে এবং বিপদাপদে মানুষদেরকে সাহায্য করে? কুরায়শের লোকেরা ইবন দাগিন্নার আশ্রয় প্রদান বিষয়ক যিম্মাদারী প্রত্যাখ্যান করলো না। ইবন দাগিন্নাকে তারা বলে যে, তুমি আবু বকরকে বলে দাও সে যেন তার ঘরের মধ্যে নামায আদায় করে এবং যা ইচ্ছা ঘরের মধ্যেই করে। তার কাজ-কর্ম যেন প্ৰকাশ্যে না করে এবং এতদ্বারা আমাদেরকে যেন বিব্রত না করে। কারণ, আমরা আশংকা করছি যে, আমাদের নারী ও শিশুরা তাতে বিভ্রান্ত হতে পারে। ইবন দাগিন্না এসব আবু বকর।“(রা)-কে বলল। এভাবেই আবু বকর (রা) সেখানে অবস্থান করছিলেন। নিজ ঘরের মধ্যে আপন প্রতিপালকের ইবাদত করতেন। সশব্দে নামায আদায় করতেন না। নিজ গৃহ ব্যতীত অন্যত্র কুরআন পাঠ করতেন না।

এরপর আবু বকর (রা)-এর মনে নতুন ভাবের উদয় হয়। তাঁর ঘরের পাশে তিনি একটি মসজিদ তৈরী করেন। ওই মসজিদে তিনি নামায পড়তে এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে লাগলেন। তাকে দেখে মুশরিক নারী ও শিশুরা অবাক বিস্ময়ে তাঁর প্রতি তাকিয়ে থাকত। হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয় এবং ক্ৰন্দনকারী লোক। কুরআন পাঠের সময় তিনি তাঁর অশ্রু থামিয়ে রাখতে পারতেন না। এ অবস্থা দেখে কুরায়শী সন্ত্রান্ত লোকজন বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা ইবন দাগিন্নাকে ডেকে পাঠায়। সে তাদের নিকট উপস্থিত হলে তারা। বলল, হে ইবন দাগিন্না! তোমার আশ্রয়ে আবু বকরের অবস্থান আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এই শর্তে যে, সে তার ঘরের মধ্যে তার প্রতিপালকের ইবাদত করবে। এখন সে ওই শর্ত লংঘন করেছে। গৃহ-প্রাঙ্গণ সে একটি মসজিদ তৈরী করেছে। সেখানে সে প্রকাশ্যে নামায আদায় করে এবং সেখানে কুরআন তিলাওয়াত করে। আমরা আশংকা করছি যে, তাতে আমাদের নারী ও ছেলেমেয়েরা বিভ্রান্ত হবে। তুমি তাকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বল। তার ঘরের মধ্যে থেকে সে যদি নিজ প্রতিপালকের ইবাদত করতে রায়ী থাকে, তবে সে তা করবে। আর সে যদি প্রকাশ্যেই তা করতে চায়, তবে তুমি তাকে বলে দাও তোমার আশ্রয়ে থাকাজনিত যিম্মাদারী সে যেন ফিরিয়ে দেয়। তোমার আশ্রয় প্রদানের যিম্মাদারীর আমরা আমর্যাদা করতে চাই না। অন্যদিকে আবু বকর প্রকাশ্যে তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে সে সুযোগও আমরা তাকে দিতে পারি না।

হযরত আইশা (রা) বলেন, এরপর ইবন দাগিন্না আবু বকর (রা)-এর নিকট এসে বলে, হে আবু বকর! আপনি তো জানেন, কুরায়শগণ আপনার প্রতি কী শর্ত আরোপ করেছিল। আপনি হয়। ওই শর্ত মুতাবিক। আপনার কাজকর্ম সীমাবদ্ধ রাখবেন, নতুবা আমার আশ্রয়দান জনিত যিম্মাদারী আমাকে ফিরিয়ে দিবেন। কারণ, কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হবার পর ওই যিম্মাদারী পালনে আমি ব্যর্থ হয়েছি আরবরা এমন কথা শুনুক ও বলাবলি করুক আমি তা পসন্দ করি না। হযরত আবু বকর (রা) বললেন, আমি বরং তোমার যিম্মাদারী তোমার নিকট ফিরিয়ে দিচ্ছি। এবং মহান আল্লাহর আশ্রয় নিয়েই আমি সন্তুষ্ট।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গী হয়ে হযরত আবু বকর (রা)-এর মদীনায় হিজরতের পূর্ণ

ঘটনা তিনি বর্ণনা করেন। যা একটু পরেই বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।

ইবন ইসহাক বলেন, আবদুর রহমান ইবন কাসিম আমার নিকট তাঁর পিতা সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, ইবন দাগিন্নার আশ্রয় থেকে হযরত আবু বকর (রা) বেরিয়ে আসার পর কুরায়শের এক অজ্ঞ ও মুর্থ ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। হযরত আবু বকর (রা) তখন কা’বাগৃহের দিকে যাচ্ছিলেন। ওই লোকটি হযরত আবু বকর (র)-এর মাথায় ধূলা নিক্ষেপ করে। এরপর ওয়ালীদ ইবন মুগীরা কিংবা ‘আস ইবন ওয়াইল সে পথে যাচ্ছিল। আবু বকর (রা) তাকে বললেন, এ মুখটি কি করলো দেখেছি কি? ওয়ালীদ ইবন মুগীরা কিংবা ‘আস ইবন ওয়াইল বলল, ওতো নয় বরং তুমিই এজন্যে দায়ী। তখন হযরত আবু বকর (রা) বলছিলেন, হে প্ৰতিপালক! আপনি কতইনা ধৈর্যশীল! হে প্রতিপালক, আপনি কতই না। ধৈর্যশীল! হে প্রতিপালক, আপনি কতই না। ধৈর্যশীল!

পরিচ্ছেদ

ইবন ইসহাক (র) বনু হাশিম ও বনু আবদুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরায়শদের অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া, অন্যায় চুক্তি সম্পাদন, তাদেরকে আবু তালিব গিরিসঙ্কটে অবরুদ্ধ রাখা এবং ওই চুক্তিপত্র ভঙ্গ করার মাঝে একান্তই প্রাসঙ্গিকভাবে উপরোক্ত বৰ্ণনাগুলো উল্লেখ করেছেন। এজন্যে ইমাম শাফিঈ (র) বলেছেন, ইসলামের যুদ্ধের ইতিহাস জানতে যে আগ্রহী সে ইবন ইসহাকের উপর নির্ভরশীল না হয়ে পারে না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *