০১. রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ওহী নাযিলের সূচনা এবং প্রথম ওহী

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ওহী নাযিলের সূচনা এবং প্রথম ওহী

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ওহী নাযিলের সূচনা এবং প্রথম ওহী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন ওহীর সূচনা হয়।

ইবন জারীর (র) ইবন আব্বাস ও সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রা)-এর বরাতে উদ্ধৃত করেছেন। যে, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বয়স ছিল ৪৩ বছর।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, ইয়াহইয়া ইবন বুকােয়র হযরত আইশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ওহী নাযিলের সূচনা হয় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রভাত’ আলোর ন্যায় ফুটে উঠতো। এরপর তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে উঠলেন। তখন তিনি হেরাগুহায় একাকী অবস্থান করতে লাগলেন। সেখানে তিনি ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তিনি তাঁর পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তনের পূর্বে একাধারে কয়েক রাত সেখানে ইবাদতরত থাকতেন । এ সময়ের জন্যে প্রয়োজনীয় আহার্যাদি সঙ্গে নিয়ে যেতেন । তারপর হযরত খাদীজার কাছে ফিরে পুনরায় আহার্যাদি নিয়ে যেতেন। অবশেষে হেরা গুহায় তাঁর নিকট সত্য এল। তাঁর নিকট ফেরেশতা আসলেন এবং বললেন, আপনি পাঠ করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)। বললেন, আমি তো পাঠ করতে পারি না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, এরপর তিনি আমাকে সজোরে চেপে ধরলেন। তাতে আমি আমার সহ্যের শেষ সীমায় গিয়ে পৌছি। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দেন এবং বলেন, ঃ পড়ুন, আমি বললাম, আমি তো পাঠ করতে পারি না। তখন তিনি দ্বিতীয় বার আমাকে সজোরে চেপে ধরেন। তাতে আমি আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌছে যাই। তিনি আমাকে ছেড়ে দেন এবং বলেনঃ পড়ুন, আমি বললাম, আমি পাঠ করতে পারি না।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তিনি তৃতীয় বার আমাকে সজোরে চেপে ধরেন। আমি আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌছে যাই। এবারও তিনি আমাকে ছেড়ে দেন এবং বলেন, :

— পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন

জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন, আপনার প্রতিপালক তো মহান মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।

এ আয়াতগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফিরে এলেন। তখন তাঁর হৃৎপিণ্ড থারথার করে কপিছিল। তিনি ফিরে এলেন হযরত খাদীজা (রা)-এর নিকট এবং বললেন, আমাকে চাদরে ঢেকে দাও, আমাকে চাদরে ঢেকে দাও! তিনি তাকে চাদরে ঢেকে দিলেন। এক সময় তাঁর ভয় কেটে গেল। তিনি হযরত খাদীজা (রা)-এর নিকট ওই ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, আমি তো আমার জীবন সম্পর্কে শংকিত হয়ে পড়েছি। খাদীজা (রা) বললেন, না কখনো নয়, আল্লাহর কসম, তিনি কখনও আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়তা রক্ষা করেন, মেহমানদের সমাদর করেন, অন্যের বোঝা বহন করেন। নিঃস্ব ও কপর্দক হীনদের উপার্জনের ব্যবস্থা করেন। বিপদাপদে অন্যকে সাহায্য করেন।

এরপর হযরত খাদীজা (রা) তাঁকে নিয়ে তার চাচাত ভাই ওয়ারাক ইবন নাওফিল ইবন আসাদ ইবন আবদুল উষযা-এর নিকটে গেলেন। জাহিলী যুগে এ ব্যক্তি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি হিব্রু ভাষায় পুস্তকাদি লিপিবদ্ধ করতেন।

আল্লাহর দেওয়া সামর্থ অনুযায়ী তিনি ইনজীল থেকে হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করতেন। তিনি তখন বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তি হীন। হযরত খাদীজা (রা) বললেন, “চাচাত ভাই! আপনার ভাতিজা কী বলেন তা শুনুন! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সম্বোধন করে ওয়ারোকা বললেন, ভাতিজা! আপনি কি দেখেছেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) যা’ যা’ দেখেছেন তা তাঁকে অবহিত করলেন। ওয়ারোকা বললেন, ইনিতো গোপন বার্তাবাহক, যিনি মূসা (আ:)-এর নিকট আসতেন, হায়! ওই সময়ে আমি যদি শক্ত-সমর্থ যুবক থাকতাম, আমি যদি জীবিত থাকতাম, যে সময়ে আপনার সম্প্রদায় আপনাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবে! রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ওরা কি আমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, জী হ্যা, আপনি যা নিয়ে এসেছেন এরূপ বাণী নিয়ে ইতোপূর্বে যিনিই এসেছেন তার প্রতিই শক্ৰতা পোষণ করা হয়েছে। আপনার যুগে আমি যদি বেঁচে থাকতাম তবে আপনাকে দৃঢ়ভাবে সাহায্য করতাম। এ ঘটনার পর অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ারাকা ইবন নাওফিল ইনতিকাল করেন।

এদিকে সাময়িকভাবে ওহী আগমন বন্ধ হয়ে যায়। এতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আমাদের নিকট যে বর্ণনা এসেছে, তা থেকে বুঝা যায়, তিনি এতই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি কয়েক বার ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন পাহাড়ের চূড়া থেকে নিজেকে নীচে ফেলে দেয়ার জন্যে। বস্তৃত যখনই তিনি নিজেকে নীচের দিকে ফেলে দেয়ার জন্যে পাহাড়ের চূড়ায় উঠার পূর্ণ প্ৰস্তৃতি নিয়েছেন, তখনই হযরত জিবরাঈল তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলেছেন : “হে মুহাম্মদ (সা)! আপনিতো আল্লাহর রাসূল, এটি ধ্রুব সত্য। এতে তাঁর অস্থিরতা কেটে শান্তি আসত এবং তার মন শান্ত হত। তিনি ঘরে ফিরে আসতেন। ওহী বিরতির এই মেয়াদ দীর্ঘ হলে তিনি ঐ রূপ অস্থির হয়ে উঠতেন এবং অনুরূপভাবে পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ

১. . 31, 3–আমাকে উটের পিঠে তুলে দাও। ২. এ পর্যন্ত সহীহ বুখারীর বর্ণনা সমাপ্ত। বর্ণনায় শব্দগত তারতম্য আছে বটে। কিন্তু অর্থগত কোন পার্থক্য

নেই।

করতেন। সেখানে জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হতেন এবং তাকে অনুরূপ সান্তুনা দিতেন। সহীহ বুখারীর আততা’বীর অধ্যায়ে এ সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে।

ইবন শিহাব বলেন, আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান আমাকে জানিয়েছেন যে, ওহী বিরতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাবির ইবন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ আকাশের দিক থেকে একটি শব্দ শুনতে পাই। চোখ তুলে দেখি, সেই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন। আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে একটি কুরসীতে সমাসীন। তা’ দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই এবং ঘরে ফিরে আসি।। ঘরের লোকদেরকে আমি বলি, “আমাকে চাদরে ঢেকে দাও, আমাকে চাদরে ঢেকে দাও।” তখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন :

— “হে বস্ত্ৰাচ্ছাদিত! উঠুন, সতর্কবাণী প্রচার করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা করুন। আপনার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখুন। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন (৭৪ : ১-৫)। এরপর থেকে নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে ওহী আসতে থাকে।

তারপর ইমাম বুখারী (র) বলেন, লােয়ছের বর্ণনার সমর্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন আবদুল্লাহ ইবন ইউসুফ ও আবু সালিহ। হিলাল ইবন দাউদ ও যুহরীর বরাতে তার সমর্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন ইউসুফ ও মামার ১৫% (তাঁর হৃৎপিণ্ড কাপছিল)-এর পরিবর্তে তাঁর ঘাড়ের রগ কাপছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

ইমাম বুখারী (র) এই হাদীসটি তার সহীহ গ্রন্থের একাধিক স্থানে উল্লেখ করেছেন। আমরা সহীহ বুখারীর ভাষ্য গ্রন্থের প্রথমদিকে ওহীর সূচনা অধ্যায়ে এই হাদীছের সনদ ও মূল পাঠ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

ইমাম মুসলিম (র) তাঁর সহীহ গ্রন্থে লায়ছ সূত্রে অনুরূপ উল্লেখ করেছেন। ইউনুস ও মামারের বর্ণনা যুহরী থেকে সনদ বাদ দিয়ে উল্লেখ করেছেন যেমন করেছেন ইমাম বুখারী (র)। আমরা মুসলিম-এর অতিরিক্ত বর্ণনা পার্শ্ব টীকায় এ দিকে ইঙ্গিত করেছি যে, ওয়ারাকার বক্তব্য “আমি আপনাকে দৃঢ়ভাবে সাহায্য করতাম” পর্যন্ত বলেই তিনি ক্ষান্ত হয়েছেন।

বস্তৃত হযরত আইশা (রা)-এর উক্তি, সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ওহীর সূচনা হয়, তাঁর দেখা স্বপ্ন পরবতীতে প্ৰভাত আলোর ন্যায় ফুটে উঠতো। হযরত আইশার এই বক্তব্য উবায়দ ইবন উমার লায়াছী থেকে বর্ণনাকৃত মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ইবন ইয়াসারের বর্ণনাকে সমর্থন করে। এ বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন রেশমের তৈরী একটি চাদরে করে একটি কিতাব নিয়ে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার নিকট আসেন এবং বলেন, “পড়ুন”। আমি বললাম, আমি কি পড়ব? তিনি আমাকে সজোরে চেপে ধরলেন আমি আশঙ্কা করছিলাম তাতে আমার না মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দেন। এরপর থেকে তিনি হযরত আইশা (রা)-এর উল্লিখিত বৰ্ণনার অনুরূপ বর্ণনা করেন। বস্তৃত পরবতীতে সজাগ অবস্থায় যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার কথা এই স্বপ্ন ছিল

তার পূর্বাভাস। মূসা ইবন উকবা সংকলিত মাগায়ী গ্রন্থে যুহরী থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ঘুমের মধ্যে এরূপ দেখেছিলেন। তারপর সজাগ অবস্থায় ওই ফেরেশতা তার নিকট এসেছিলেন।

হাফিযী আবু নুআয়ম ইস্পাহানী তাঁর “দালাইলুন নবুওয়াত” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন আহমদ আলকামা ইবন কায়স থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, নবীগণকে যা দেয়া হত প্ৰথম অবস্থায় তা ঘুমের মধ্যেই দেয়া হত। যাতে তাদের অন্তঃকরণ ধৈর্যশীল ও সুস্থির হয়ে ওঠে। এরপর তাদের প্রতি ওহী নাযিল করা হত। এটি আলকামা ইবন কায়সের নিজস্ব ব্যাখ্যা।

এটি একটি সুন্দর বক্তব্য। পূর্বাপর বক্তব্যগুলো এটিকে সমর্থন করে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *