১২. কাদৌ গ্রামের মোড়লের সাহায্যে

কাদৌ গ্রামের মোড়লের সাহায্যে জোগাড় করা ছয় জন কুলির পিঠে মালপত্র চাপিয়ে চব্বিশে ফেব্রুয়ারি আবার যাত্রা করল বারজাক মিশন। সবার মুখে হাসি। কিন্তু পসিঁ মুখ ভার করেই রেখেছেন। সত্যিই গণিত বিশারদের মতিগতি বোঝা ভার।

মালিককে নিজের ঘোড়ায় তুলে নিয়েছে টোনগানে। দেখে মুখ টিপে হাসছে অন্যেরা।

অবাধ্য হতচ্ছাড়া গাধাগুলো সঙ্গে নেই। হিসেব করে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো শুধু সঙ্গে নেয়া হয়েছে। বাকি জিনিসপত্র গাঁয়ের মোড়লকে উপহার দিয়ে দিয়েছেন বারজাক। জেনের জন্যে মাত্র একটা তাঁবু সঙ্গে নিয়ে বাকি তাঁবুগুলোও মোড়লকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং অভিযাত্রীদের জন্যে আন্তরিক ভাবেই খেটেছে মোড়ল।

বোঝা কম। দ্রুত চললে দশ থেকে পনেরোই মার্চ নাগাদ কৌবো পৌঁছার আশা করছে অভিযাত্রীরা।

পাঁচদিনেই নব্বই মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলল তারা। এ-পর্যন্ত এসে সানাবো গ্রাম থেকে খাবার পাওয়া গেল। এর আগে পর্যন্ত শিকার করেই খাওয়া হয়েছে। সঙ্গের খাবারে তেমন একটা হাত পড়েনি। রাতে খোলা আকাশের নিচে কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে পুরুষেরা। একমাত্র জেন তাঁবুতে।

মার্চ ২। সেন্ট বেরেনের পাশাপাশি ঘোড়ায় চেপে চলেছেন ফ্লোরেন্স।  সকাল থেকে হোঁচট খাচ্ছিল তার ঘোড়াটা! কারণটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। আচমকাই এক জায়গায় এসে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল; পিঠ থেকে ছিটকে দশ হাত দূরে গিয়ে পড়লেন ফ্লোরেন্স।

তাড়াতাড়ি ঘোড়া থেকে নেমে ছুটে এল সবাই। কিন্তু তার আগেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন ফ্লোরেন্স। ঘোড়াটাকে বাঁচানো গেল না, ব্যর্থ চেষ্টা করলেন ডাক্তার।

টোনগানে তার ঘোড়াটা ফ্লোরেন্সকে দান করে দিল। মালিককে নিজের ঘোড়ায় তুলে নিল জেন।

রাতে একটা টিলার নিচে ঝোপের ধারে আশ্রয় নিল সবাই। টিলার উপরে উঠলে চার দিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। উঠে দেখে এসেছেন ফ্লোরেন্স। একটা জিনিস নজর এড়ায়নি তার। তাঁদের কয়েক দিন আগে ঘোড়সওয়ারের একটা দল জিরেন দিয়ে গেছে এখানে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা প্রচুর চিহ্ন এখন পরিষ্কার বর্তমান।

কারা তারা? অবাক হলেন ফ্লোরেন্স -নিগ্রো, না সাদা মানুষ? সাদা মানুষই হবে। কারণ নিগ্রোরা পারতপক্ষে ঘোড়ায় চড়ে না। শেষ পর্যন্ত একটা তুচ্ছ জিনিস কুড়িয়ে পেয়ে স্থির নিশ্চিত হলেন ফ্লোরেন্স যে সাদা মানুষই। জিনিসটা হলো একটা বোতাম। এই বোতাম নিগ্রোরা লাগাবে না।

ডেকে দলের সবার দৃষ্টিগোচর করলেন ব্যাপারটা ফ্লোরেন্স। চিন্তিত হলো সকলেই।

উত্তর-পুবে সোজা এগিয়ে চলেছে বারজাক মিশন। এই একই পথে গিয়েছে, আগের ঘোড়সওয়ার দলটাও। পথে পথে প্রচুর চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

ফ্লোরেন্সের ঘোড়ার মতই আচমকা বারজাকের ঘোড়াটাও মুখ থুবড়ে পড়ল চৌঠা মার্চ।

মরে গেল, যদিও আন্তরিক চেষ্টা চালালেন ডাক্তার।

এ কি কান্ড!

এবারে মরা ঘোড়াটাকে ভাল করে পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। ফ্লোরেন্সকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, সাবধানে থাকবেন।

কেন? অবাক হলেন ফ্লোরেন্স।

দুটো ঘোড়াই বিষ খেয়ে মরেছে।

তা কি করে সম্ভব? কে বিষ খাওয়াবে ঘোড়াকে?

তা জানি না। তবে ঘোড়াকে যখন খাওয়াচ্ছে, মানুষকেও খাওয়াতে পারে। তাই বলছি, সাবধান!

কি করা যায় এখন? চিন্তিতভাবে বললেন ফ্লোরেন্স।

মিস ব্লেজনকে ছাড়া সবাইকে জানিয়ে রাখুন। মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে কোন লাভ হবে না।

বিষাক্ত আগাছাও তো খেতে পারে ঘোড়া দুটো?

তা সম্ভব নয়। আসলে ওদের খাবারে কেউ বিষ মিশিয়ে দিয়েছে।

এরপর থেকে চোখে চোখে রাখা হলো বাকি পাঁচটা ঘোড়াকে! পরের দুদিন তেমন কিছুই ঘটল না। পথে আরেকটা গ্রাম থেকে খাবার জোগাড় করা গেল। সঙ্গের রসদ এখনও প্রায় অটুটই রয়েছে।

তারপরের দিন দুপুরে কিন্তু খাবারে হাত দিতে হলো। এর আগের গ্রাম থেকে জোগাড় করা খাবারে মাত্র দুবেলা চলেছে! শিকার মিলছে না এদিকে। নদী-ডোবা কিছুই নেই যে মাছ ধরবেন বেরেন। কয়েকটা ব্যাঙ ধরে এনেছিলেন অবশ্য, কিন্তু অতি বিষাক্ত জাতের ব্যাঙ বলে ফেলে দিয়েছে টোনগানে।

ছয় তারিখে বিকেলের দিকে দূর থেকে একটা শহর চোখে পড়ল। কিন্তু ধারে কাছে ঘেষা গেল না। অভিযাত্রীরা আধমাইল দূরে থাকতেই গর্জে উঠল একটার পর একটা ফ্লিন্ট বন্দুক! বিকট রণহুঙ্কার ছেড়ে নগরের ভেতর থেকে দলে দলে বেরিয়ে এল কাফ্রীরা। আজব ব্যাপার! অত বন্দুক কোথায় পেল অসভ্যরা? সাদা পতাকা। ওড়াল অভিযাত্রীরা। কিন্তু অসভ্যরা এর মর্ম বুঝলে তো! অল্পের জন্যে গুলি থেকে বেঁচে গেল পতাকাধারী।

কাজেই ঝামেলা না বাড়িয়ে দূর দিয়ে নগর এড়িয়ে গেল অভিযাত্রীরা। কিন্তু এই অদ্ভুত ব্যাপারের অর্থ বোঝা গেল না।

মার্চ ৭। কাদৌ থেকে রওনা দেবার পর প্রায় দুশো মাইল পাড়ি দিয়েছে বারজাক মিশন। এখনও অনেক পথ বাকি, প্রায় অর্ধেক। সামনে কোন গায়ে খাবার না পাওয়া গেলে মুশকিল হবে।

কিন্তু সারাটা দিনেও কোন গাঁয়ের ছায়া চোখে পড়ল না। এদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মারা গেছে আরেকটা ঘোড়া!

এত তীক্ষ্ণ নজর রাখছি, তবু বিষ খাওয়ানো বন্ধ হলো না, বললেন ফ্লোরেন্স।

মনে হয় নতুন করে খাওয়ানো হচ্ছে না, চিন্তিতভাবে বললেন ডাক্তার। কে জানে, কাদৌতেই হয়তো ডোঔং খাওয়ানো হয়েছে ঘোড়াগুলোকে। সব ঘোড়ার সহ্য ক্ষমতা সমান নয়, তাই আগে-পিছে মারা যাচ্ছে।

মার্চ ৮। ফুরিয়ে এসেছে সঙ্গের খাবার। বড়জোর আর একদিন চলবে। বিকেল নাগাদ কোন গ্রামে খাবার না পাওয়া গেলে উপোস থাকতে হবে।

যাত্রার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দূরে একটা গ্রাম দেখা গেল। নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলল অভিযাত্রীরা। কিন্তু গ্রামের কাছে এসে হতাশ হতে হলো। একেবারে খাঁ খাঁ করছে গ্রাম। নীরব, নিস্তব্ধ। জনমানুষের চিহ্ন নেই।

ঘন ঘাসের পুরু কার্পেটের সোজা রাস্তা গিয়ে ঢুকেছে গায়ে। রাস্তার ওপর কালো কালো  দাগ। রক্তের দাগের মত।

দ্বিধা করলেন বারজাক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের সবাইকে গ্রামে ঢোকার আদেশ দিলেন, গিয়ে দেখাই যাক না কি ঘটেছে।

আগে গেলেন ফ্লোরেন্স আর ডাক্তার।

গায়ে ঢুকতেই বিশ্রী পচা দুর্গন্ধ এসে ঝাপটা মারল নাকে। আরও কয়েক গজ এগোতেই বোঝা গেল কারণটা। পচে ফুলে ঢোল হয়ে আছে একটা লাশ। মানুষের। তার গজ কয়েক পরেই আরও দশজন নিগ্রো। প্রথম লাশটারই মত অবস্থা।

নাকে রুমাল বেঁধে এগিয়ে গিয়ে একটা লাশ পরীক্ষা করে দেখলেন ডাক্তার। ফিরে এসে গম্ভীর গলায় জানালেন, পিঠ ফুড়ে ঢুকেছে গুলি। কিন্তু বেরোয়নি। উল্টো দিকে চাপ দিয়ে বুঝলাম, বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে গেছে। সেই বিস্ফোরক বুলেট।

আবার! শিউরে উঠলেন ফ্লোরেন্স।

হ্যা। আবার।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন ফ্লোরেন্স। ভয়ানক দুশ্চিন্তার ছাপ ডাক্তারের মুখেও। অন্যেরাও এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। সবাই জানতে চাইছে, ব্যাপার কি? তুমুল লড়াইয়ের চিহ্ন চারদিকে বর্তমান। প্রাণপণে লড়াই করেছে নিগ্রো গ্রামবাসীরা, কিন্তু ভয়াবহ অস্ত্রের ঘায়ে অসহায়ভাবে প্রাণ দিয়েছে শুধু। তাদের তীর বল্লম কোন কাজেই আসেনি।

দশদিন আগে মারা গেছে হতভাগ্য লোকগুলো, ঘোষণা করলেন ডাক্তার।

কিন্তু কারা এই নিষ্ঠুর হানাদার? জানতে চাইলেন সেন্ট বেরেন।

গত কদিন ধরেই যাদের এগিয়ে যাবার চিহ্ন দেখেছি আমরা, একটু থেমে বললেন ডাক্তার, আসলে এরাই নগরের অসভ্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। আমাদের পরিচিতই হয়তো। তাই বাইরে বেরিয়ে আসেনি। কায়দা করে কিংবা ভয় দেখিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিয়েছে অসভ্যদের।

কিন্তু অত কিছু না করে সোজা আমাদের খুন করে ফেললেই হয়?

নিশ্চয়ই গভীরে কোন রহস্য আছে। হয়তো আমাদের মারতে চায় না ওরা।

কেন?

তা তো জানি না।

কিন্তু খুনেদের অত কাছে থাকা কি আমাদের জন্যে নিরাপদ?

ওরা আমাদের ক্ষতি করতে চাইলে দূরে থেকেও নিরাপদ নই।

খাবারের জন্যে গ্রামটা তন্ন তন্ন করে খুঁজল অভিযাত্রীরা। কিন্তু কোন খাবার নেই। দেখা গেল, ইচ্ছে করেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে সব।

খোলা আকাশের নিচে আধপেটা খেয়ে রাত কাটাল পুরুষেরা, জেন তাঁবুতে। অল্প অল্প খেয়ে জমিয়ে রাখা খাবারে আর এক বেলা চলবে। কিন্তু তারপর?

মার্চ ৯। দুটো গ্রাম পড়ল পথে। কিন্তু পেছনে ফেলে আসা শহরের কাফ্রীদের মত দুটো গ্রামের লোকজনই অস্ত্র নিয়ে তেড়ে এল। অনুমান করলেন ডাক্তার, যেসব গ্রামের লোক শ্বেতাঙ্গদের কথা শোনেনি তাদেরই জান দিতে হয়েছে। তৃতীয় আরেকটা গ্রামের কাছে যেতে কোন নিগ্রো তেড়ে এল না। গ্রামে ঢুকতে শুধু মরা মানুষের লাশ দেখা গেল, খাবারদাবার সবই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

ইচ্ছে করেই আমাদের উপোস করিয়ে রাখছে হারামজাদারা। মাঝে থেকে প্রাণ দিচ্ছে কতগুলো নিরপরাধ মানুষ, ফুঁসে উঠে বললেন বারজাক।

আর তো মোটে একশো মাইল, জোর করে মুখে হাসি টেনে বললেন ফ্লোরেন্স। পথে শিকার পাওয়া যাবেই। দেখছেন না, সামনে জঙ্গল?

জঙ্গল ঠিকই, লম্বা ঘাসবনও আছে। কিন্তু শিকার পাওয়া গেল না বললেই চলে। আগেই হানা দেয়া হয়ে গেছে জঙ্গলে। অসংখ্য মৃত প্রাণীর লাশ দেখে তা বোঝা গেল। বাকি জানোয়ারগুলো ভয়ে জঙ্গল ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু তবু একেবারে হতাশ হতে হলো না অভিযাত্রীদের। সারাদিনের চেষ্টায় দুটো তিতির, দুটো গিনি ফাউল আর একটা বাস্টার্ড পাখি পাওয়া গেল। খুবই সামান্য, চোদ্দটা পেটের জন্যে কিছুই নয়, কিন্তু তবু তো খাবার।

জঙ্গলের ওপাশে বেরিয়ে এসে রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। অগ্রগামী ঘোড়সওয়ার দলটা অনেক চিহ্ন রেখে গেছে আশেপাশে। দুই দলের মধ্যে আর খুব একটা ব্যবধান বোধ হয় নেই।

হঠাৎ টোনগানের চিৎকার শোনা গেল। সবাই ছুটোছুটি করে এগিয়ে গেল তার কাছে। কি ব্যাপার? চারটে ঘোড়ার দুটো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে মাটিতে।

এক ঘন্টার মধ্যেই মারা গেল ঘোড়া দুটো।

বাকি দুটো ঘোড়াও মারা গেল মার্চের দশ তারিখে।

ঘোড়া নেই, খাবার নেই। ওদিকে সকালে উঠে দেখা গেল কেটে পড়েছে ছয় জন কুলি।

মন ভেঙে গেল এবার বারজাক মিশনের সবারই। জেন ব্লেজনের অবস্থাই সব চেয়ে কাহিল। বারবার নিজেকে দোষারোপ করছে সে। তার একগুঁয়েমির জন্যেই এতগুলো লোক অসহায়ভাবে মরতে বসেছে। বুঝিয়ে সুজিয়ে শান্ত করা হলো তাকে। কিন্তু এদিকে পেট তো মানে না।

কুলিরা পালিয়েছে, মালপত্র বয়ে নেবে কে? তাই ওগুলো ফেলে রেখেই এগিয়ে চলল সবাই। এগারো তারিখ গেল, খাবার মিলল না।

মার্চ ১২। আরেকটা গ্রাম পেরিয়ে গেল অভিযাত্রীরা। কিন্তু খাবার মিলল না এখানেও। উঠান ভর্তি পড়ে আছে মানুষের লাশ। সব কটা কুঁড়েঘর পোড়ানো। সদ্য পোড়ানোর চিহ্ন।

ভয় পেল অভিযাত্রীরা। আস্তে আস্তে কাছে আসছে খুনে দলটা।

কিন্তু ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। বরং সামনে এগোনোই নিরাপদ, ছাউনি আর বেশি দূরে নয়। নাইজার পর্যন্ত কোনমতে টিকতে পারলে বেঁচে যাওয়া যাবে এ যাত্রা।

কিন্তু এগোনো যায় কি করে? খাবার তো পাওয়া যাচ্ছে না। কোন গাঁয়ের কাছাকাছি হলেই হয় তেড়ে আসছে নিগ্রোরা, কিংবা দেখা যাচ্ছে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, মানুষ খুন করে ছারখার করে ফেলা হয়েছে। পথে নদী পড়ছে না এখন। জঙলীদের কুয়োগুলোও নষ্ট করে রাখা হচ্ছে। খাবার তো দূরের কথা, পানিও মিলছে না এখন আর।

শরীর ক্রমেই কাহিল হয়ে পড়ছে, কিন্তু মনোবলে চিড় ধরতে দিচ্ছে না বারজাক মিশনের কেউ। আফ্রিকার ভয়ঙ্কর রোদে পুড়ে তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে, পেটে অসহ্য খিদে নিয়েই একটু একটু করে উত্তরে এগিয়ে চলেছে অভিযাত্রীরা।

সবাইকে ছাড়িয়ে গেল মালিক আর টোনগানের সহ্যশক্তি।

খেপে আগুন হয়ে আছেন বারজাক। ক্রমাগত সরকারের মুন্ডপাত করছেন। বার বার হলপ করছেন, একবার দেশে ফিরতে পারলে হয়, সরকারকে গদিছাড়া করে নতুন সরকার গঠনের ব্যবস্থা করবেন।

আশ্চর্য। সারাক্ষণই হাসি আনন্দে সবাইকে মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ডক্টর চাতোম্নে।

মাঝেমধ্যে অতি সামান্য ফলমূল জোগাড় করে দিতে লাগল টোগানে। কিন্তু তাতে খিদের কিছুই হলো না, বরং আরও বেশি করে চেগিয়ে উঠল।

হাসেন না, কথা বলেন না, গজগজ করেন না কেবল একজন। সুযোগ পেলেই ইনি নোটবই খুলে অঙ্কের নেশায় পড়ে থাকেন। গণিত বিশারদ পসিঁ।

কোথায় আছেন, চারদিকের অবস্থা কি, সেসবের খেয়ালই নেই সেন্ট বেরেনের। নদী নেই। মাছ ধরবেন কোথা থেকে? তাই বড়শিতে গেথে সাপগিরগিটি যা খুশি ধরছেন। সবই অখাদ্য।

একেবারে চুপ হয়ে গেছে জেন ব্লেজন। অতিরিক্ত পথশ্রম, খিদের জ্বালা, তার ওপর এতগুলো লোককে বিপদের মধ্যে টেনে আনার অনুশোচনায় জ্বলে পুড়ে মরছে। দিন যাচ্ছে, আর ক্রমেই আরও বেশি কাহিল হয়ে পড়ছে শরীর। কিন্তু মনোবল ভাঙতে দিচ্ছে না। যাবেই সে কৌবো পর্যন্ত। কি আছে না দেখে ছাড়বে না।

একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার কথা কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারছেন না ফ্লোরেন্স। খুন তারা হবেনই তবে হয়তো এখন নয়, আরও কিছুদিন পরে। যে মুহূর্তে মিশন শেষ হবে তখন। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করছেন তিনি গত দুদিন ধরে; আশে পাশে অদৃশ্য থেকে সারাক্ষণ তাদের ওপর কারা যেন নজর রাখছে।

সন্দেহটা আরও দৃঢ় হলো বারোই মার্চ তারিখে, একটা গ্রাম পেরিয়ে আসার পর। মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আগে মানুষ খুন করা হয়েছে সে গ্রামে, কুঁড়েঘর জ্বালানো হয়েছে।

এদিনই রাতের অন্ধকারে পরিষ্কার ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনতে পান ফ্লোরেন্স। এগিয়ে এল সে শব্দ। ঘন্টাখানেক পরেই আশেপাশের ঘাসবন আর ঝোপঝাড়ে সড়সড় শব্দ হতে লাগল। লুকিয়ে পড়ছে কারা যেন।

টোনগানেও চুপিচুপি জানাল, জঙ্গলে ছায়ামূর্তি দেখেছে সে। একেবারে মাথার ওপর এসে গেছে বিপদ।

মার্চ ১৩। কৌবোর পাঁচ মাইলের মধ্যে এসে গেছে অভিযাত্রীরা। টোনগানে জানাল আর মাইলখানেক গেলেই পাওয়া যাবে ক্যাপ্টেন ব্লেজনের কবর।

উত্তেজনায় অধীর হয়ে পথ চলছে সবাই। কিন্তু গতি ধীর হয়ে পড়ছেই। ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাহিল শরীর নিয়ে তাড়াতাড়ি করা যায় না।

বিকেলের দিকে একটা শুয়োর মারতে পারলেন ফ্লোরেন্স। রাতের দিকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বৃষ্টিও নামল হঠাৎ। অতি সামান্য হলেও পানি ধরে রাখতে পারল অভিযাত্রীরা।

অনেক দিন পরে পেট ভরে খেল সবাই। অনেকখানি বল ফিরে এল শরীরে।

মাঝরাতে একটা সন্দেহজনক শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল ফ্লোরেন্সের। আস্তে করে উঠে বসলেন, হালকা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বনভূমি আর ঘাসজমিতে। উত্তর-পুবে প্রায় একশো গজ দূরে দলটাকে দেখতে পেলেন তিনি। চলে যাচ্ছে। গুনলেন, তেইশ জন। চকিতে সন্দেহ উঁকি দিল মনে, ল্যাকোর আর তার দলবল নয় তো?

সকালে ব্যাপারটা দলের সবাইকে জানালেন ফ্লোরেন্স। এখন করণীয় কি? আলোচনায় বসল সবাই। অনুমান করল তারা, শেষ রাতে গেছে, আজই রাতে আক্রমণ করবে ওরা; সুতরাং আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু তার আগে ক্যাপ্টেন ব্লেজনের কবরটা দেখা দরকার।

ছটায় রওনা দিল অভিযাত্রীরা। উত্তেজনায় অধীর সবাই; বার বার তাকাচ্ছে। টোনগানের দিকে। কোন একটা মাটির ঢিবি দেখলেই জিজ্ঞেস করছে, ওটা? ওইটাই?

শেষ পর্যন্ত একটা জায়গার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল টোনগানে, ওই যে, এসে গেছি।

সবাই তাকাল তার নির্দেশিত জায়গার দিকে। কিন্তু কোথায় কবর? একটা গাছ শুধু দেখা যাচ্ছে।

গাছটার কাছে এসেই থেমে দাঁড়াল টোনগানে। কোমর থেকে ছুরি খুলে নিয়ে এক জায়গার মাটি খুঁড়তে লাগল। হাত লাগালেন সেন্ট বেরেন আর ফ্লোরেন্সও।

ছুরি দিয়ে শক্ত মাটি খুঁড়তে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেল ওরা। একজন মানুষের কঙ্কাল। জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে হাড়।

কাছে গিয়ে ঝুঁকে বসলেন ডাক্তার। তার পাশেই ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল জেন। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল কঙ্কালটার দিকে।

কঙ্কালের ডান বাহুতে পেঁচিয়ে আছে সোনালি সুতো। অফিসারের ব্যাজের এই অবস্থা হয়েছে মাটির তলায় থেকে থেকে।

বুকের ওপর পড়ে আছে একটা মানিব্যাগ, জীর্ণ হয়ে গেছে। আস্তে করে ব্যাগটা তুলে নিল জেন। খুলে দেখল খুচরো কিছু টাকা আর ভেতরের পকেটে একটা চিঠি।

চিঠিটা খুলল জেন। একেবারে জীর্ণ হয়ে গেছে কাগজ। একটু জোরে চাপ লাগতেই ভেঙে যাচ্ছে। তবু যতটা পারা গেল আস্ত রাখার চেষ্টা করল সে। চিনতে পারল। সে-ই অনেকদিন আগে লিখেছিল ভাইয়ের কাছে। তারপর আর পারল না জেন। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।

সবাই চুপ, স্থির হয়ে আছে, কারও মুখে কোন কথা নেই। শুধু হাওয়া যেন হু হু করে কেঁদে কেঁদে যাচ্ছিল।

কতক্ষণ কেটে গেল বলতে পারবে না অভিযাত্রীরা। এক সময় মুখ তুলে চাইল জেন। ডাক্তারকে বলল, কঙ্কালটা একটু পরীক্ষা করে দেখবেন, ডক্টর? কি করে মারা গেল?

নিশ্চয়ই। হাত লাগালেন ডাক্তার। আবার নীরবতা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল সবাই।

ঠিক দশ মিনিট পরে উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার। রায় ঘোষণা করলেন, ক্যাপ্টেন ব্লেজন গুলিতে মারা যাননি। পেছন থেকে ছোরা মেরে খুন করা হয়েছে। বাটটা নিশ্চয় কাঠের ছিল, নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু ফলাটা এখনও আটকে আছে পাজরার হাড়ে। ঠিক হার্টে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল ছোরা।

খুন! অস্ফুটকণ্ঠে বলল জেন। জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে সে।

হ্যা, খুন। জবাব দিলেন ডাক্তার।

পেছন থেকে?

পেছন থেকে।

ভাইয়া তাহলে নিরপরাধ?

তা জানি না। তবে উনি ছোরার ঘায়ে মারা গেছেন, আমি রাইফেল কিংবা বেয়োনেটের খোঁচায় নয়।

একটা ডেথ সার্টিফিকেট দেবেন দয়া করে?

কেন দেব না? একশোবার দেব। কিন্তু একটা কাগজ।

এই যে, এই নিন কাগজ। নোটবইয়ের পাতা ছিড়ে বাড়িয়ে ধরলেন পসি! নিজের কলমটাও দিলেন।

সার্টিফিকেট লিখে দিলেন ডক্টর চাতোন্নে। উপস্থিত সবাই তাতে সাক্ষী হিসেবে সই করে দিলেন। কঙ্কালের পাঁজরা থেকে ছোরাটা বের করে নিলেন ডাক্তার। তারপর সার্টিফিকেট আর ফলাটা দিয়ে দিলেন জেন ব্লেজনকে।

কি মনে করে কবরের কাছে গিয়ে বসলেন আবার ফ্লোরেন্স। খুঁজতে লাগলেন কি যেন। খানিকক্ষণ হাতড়েই পেয়ে গেলেন জিনিসটা। ছোরার বাঁট। ভেঙে পড়ে আছে। অনেকখানিই মাটিতে খেয়ে ফেলেছে কিন্তু লোহাকাঠের বাঁট একেবারে খেয়ে ফেলতে পারেনি।

বাঁটটা নিয়ে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করলেন ফ্লোরেন্স। তারপর চোখের সামনে তুলে পরীক্ষা করে দেখলেন; যা অনুমান করেছিলেন তাই, খোদাই করা আছে বাঁটে।

খুনীর নাম আছে? জিজ্ঞেস করল জেন।

মনে হচ্ছে। আরও খুঁটিয়ে দেখলেন ফ্লোরেন্স, কিন্তু পড়া যাচ্ছে না ভালমত, শুধু দুটো অক্ষর ছাড়া। ইংরেজি আই, এবং আর। আর সব ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

কিন্তু এই দুটো অক্ষর থেকে তো খুনীর হদিস পাওয়া যাবে না, বললেন বারজাক।

এই দুটো অক্ষরের সূত্র ধরেই পিশাচটাকে খুঁজে বের করব আমি, দৃঢ় গলায় বলল জেন।

আবার মাটি চাপা দেয়া হলো কঙ্কালটিকে। ওপরে বুনো ফুল ছিটিয়ে দিল জেন। তারপর ঘুরে দাঁড়াল।

নীরবে আবার কৌবোর দিকে রওনা দিল অভিযাত্রীরা। দুপুরের আগে ঘাসভূমি থেকে একটা তিতির আর দুটো বাস্টার্ড মারলেন ফ্লোরেন্স। আগের দিনের শুয়োরের মাংসও ছিল খানিকটা, পানিও আছে। তাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আর কাতর হলেন না তারা।

বিকেল হলো, তারপর সাঁঝ; সাঁঝ গড়িয়ে রাত। আসল বিপদ দেখা দেবে আর একটু পরেই অভিযাত্রীরা নিশ্চিত। তাই খোলা জায়গায় রাত না কাটিয়ে ঘন জঙ্গল বেছে নিলেন তারা। এক পাশে পাহাড়।

একে একে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই, কিন্তু ঘুম এল না ফ্লোরেন্সের চোখে। কিছুর অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। রাত এগারোটা নাগাদ দেখতে পেলেন মশালের আলো। সার বেঁধে এগিয়ে আসছে এদিকেই, উত্তর থেকে।

আস্তে করে ঠেলা মেরে পাশে শোয়া টোনগানেকে জাগালেন ফ্লোরেন্স। টোনগানেও নীরবে দেখল ক্রম অগ্রসরমান আলোর সারি। একে একে সবাইকে তুললেন ফ্লোরেন্স আর টোনগানে।

ঠিক এই সময়ে শোনা গেল সেই রহস্যময় শব্দ। প্রচন্ড গর্জনে পাহাড়-বন কাঁপিয়ে পুবদিক থেকে এগিয়ে আসছে। দেখতে দেখতে মাথার ওপরে এসে গেল শব্দ। হঠাৎই গোটা বনভূমি আলোয় আলোকিত করে জ্বলে উঠল তীব্র আলো। মাথার ওপরে শব্দের উৎস থেকেই আসছে আলোটা, কয়েকটা সার্চ লাইট যেন জ্বলে উঠেছে এক সঙ্গে।

ওদিকে অভিযাত্রীদের ঘিরে ধরেছে মশালধারীরা, এগিয়ে আসছে আরও।

মশালধারীদের পেছন থেকে কথা বলে উঠল কেউ ফরাসী ভাষায়, সব কজনই আছে তো?

আছে, উত্তর দিল একজন মশালধারী।

ঠিক আছে, নিয়ে চলো।

এসো সবাই। অভিযাত্রীদের ডাকল মশালধারীদের সর্দার। সাবধান। একটু গোলমাল করলে মাথার খুলি উড়ে যাবে।

বিকট চেহারার লোকটা তার হাতের রিভলভার তুলে দেখাল।

****

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *