০৬. বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে অতর্কিতে

পঁচিশে অক্টোবর ভোরবেলা ফিলিয়াস ফগ কলকাতা পৌঁছুলেন। বেলা একটার সময় হংকং-এর জাহাজ ছাড়বে, সুতরাং তখনও ঘণ্টা-কয়েক সময় হাতে ছিলো। ডায়রি খুলে ফগ দেখলেন ছাব্বিশে অক্টোবর তার কলকাতা পৌঁছুবার কথা। আজ তেইশ দিন হলো তিনি লণ্ডন ছেড়েছেন। জাহাজ তাড়াতাড়ি আসায় হাতে যে-দু-দিন সময় প্রায় ফাউ পাওয়া গিয়েছিলো, আউদাকে উদ্ধার করতে গিয়েই তা কেটে গেছে। সময়ের হিশেব করে ফগ বুঝলেন যে, যে-করেই হোক বেলা একটার জাহাজেই তাকে হংকং যাত্রা করতে হবে।

হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থামতে-না-থামতেই পাসপার্তু গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। তার ইচ্ছে ছিলো আগেভাগেই হংকং-এর জাহাজে গিয়ে সব বন্দোবস্ত করে রাখবে।

এমন সময় ধরাচুড়ো পরা একজন ইংরেজ দারোগা এসে শুধোলে : আপনার নামই কি ফিলিয়াস ফগ?

ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দারোগার দিকে তাকাতেই দারোগা ফগকে জিগেস করলেন : এই বুঝি আপনার ফরাশি ভৃত্য?

হ্যাঁ।

আপনারা কি অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে একটু আসবেন?

ফিলিয়াস ফগ একটুও বিচলিত হলেন না। ইংরেজের চোখে আইন অতি পবিত্র জিনিশ, আর পুলিশ দেশের আইন-রক্ষক। কিন্তু পাসপার্তু তর্ক করতে উদ্যত হলো। ফিলিয়াস ফগ তাকে থামিয়ে দিয়ে শুধোলেন : এই ভদ্রমহিলা কি আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন?

অনায়াসে। জবাব দিলেন দারোগা।

তারা তখন একটা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসলেন। সাহেব-পাড়ার একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। দারোগা তার বন্দীদের নিয়ে একটা ঘরে ঢুকলেন। সেখানে তাদের বসতে বলে জানালেন যে : ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াদিয়ার কাছে সাড়ে-এগারোটার সময় আপনাদের বিচার হবে। এই বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দারোগা প্রস্থান করলেন।

আউদার চোখে জল এসে গেলো। আমার জন্যেই আপনাদের এই বিপদ। আমাকে রক্ষ করতে গিয়েই আপনারা বন্দী হলেন।

ফিলিয়াস ফগ শান্তগলায় তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। ইংরেজ রাজত্বে সতীদাহ নিবারণ করলে কোনো অপরাধ হয় না। বোধহয় পুলিশ ভুল করে কোনো-একজনকে ধরতে গিয়ে আমাদেরই ধরেছে। সে যা-ই হোক, নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি। যে-করেই হোক আপনাকে হংকং-এ নিয়ে যাবোই।

ফগের কথা শুনে পাসপার্তু বললে : জাহাজ যে বেলা একটার সময় ছাড়বে!

তার আগেই আমরা জাহাজে পৌঁছে যাবো।

ফগের দৃঢ় কণ্ঠস্বর কিন্তু পাসপার্তুর আশঙ্কা দূর করতে পারলো না।

সাড়ে-এগারোটার সময় দারোগা এসে তাদের আদালতে বিচারস্থানে নিয়ে গেলেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াদিয়া এসে চেয়ারে বসতেই আবদালি হাঁকলো : আসামী ফিলিয়াস ফগ হাজির?

হাজির।

পাসপার্তু?

হ্যাঁ, হাজির।

ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট তখন বললেন : বাদীদের ডাকো।

সঙ্গে-সঙ্গে একজন আরদালি তিনজন পুরোহিতকে সামনে এনে হাজির করলে। এরা তিনজনেই বম্বাইয়ের লোক। পাসপার্তু বিড়বিড় করে আপন মনে বললে : এ–যে দেখছি শেষে তা-ই! এরাই তো আউদাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলো!

অপরাধের বিবরণ পড়ে শোনানো হলো আসামীদের। হিন্দুদের কাছে অতীব পবিত্র একটি মন্দিরকে অপবিত্র করবার জন্যে ফিলিয়াস ফগ ও তার ভৃত্যের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে।

ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট ফিলিয়াস ফগের দিকে তাকালেন। অভিযোগ সম্পর্কে আসামীর কী বলবার আছে?

নিজের পকেট-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফগ বললেন : হ্যাঁ, আমি অপরাধ স্বীকার করছি।

আপনি অপরাধ স্বীকার করছেন?

হ্যাঁ, কিন্তু পিল্লাজির মন্দিরে পুরোহিতেরা যে-পৈশাচিক কাণ্ড করেছেন, সেসম্পর্কে তারা কী বলতে চান, কী কৈফিয়ৎ দিতে চান, সে-কথা জানবার জন্যেই ব্যগ্র। হয়ে আছি।

পুরোহিতেরা মুখ-চাওয়া-চাউয়ি করলে। ফিলিয়াস ফগ ঠিক কোন কথার উল্লেখ করছেন, তা তারা বুঝতে পারেনি।

পাসপার্তু বললে : হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। পিল্লাজির মন্দিরের কথাই জানতে চাই। সেখানে এঁরা একজন নিরীহ নির্বিরোধী নির্দোষী মহিলাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করছিলেন।

কথা শুনে তো পুরোহিতেরা একেবারে থ! তারা এত হতভম্ব হয়ে পড়েছিলো যে গোড়ায় কোনো কথাই বলতে পারেনি। ওয়াদিয়া অবাক হয়ে শুধোলেন : তার মানে? কাকে পুড়িয়ে মারবার আয়োজন হয়েছিলো? সে কোথায়? বম্বাই-এ নাকি?

পাসপার্তু বললে : হ্যাঁ, বম্বাই-এ।

আমরা পিল্লাজির মন্দিরের কথা বলছিনে, মালাবারের মন্দিরের কথা বলছি। পেশকার জানালে। অপরাধের প্রমাণ হিশেবে, সেই মন্দির-অপবিত্রকারীর জুতো এখানে আনা হয়েছে।

জুতো দেখেই পাসেপাণ্ডু বলে উঠলো : এ-কী! ও-যে আমার জুতো।

এখানে আগেকার কথা কিছু বলে নেয়া দরকার। বম্বাইয়ের রেলস্টেশনে ধুরন্ধর। গোয়েন্দা ফিক্স যখন দেখেছিলেন ব্যাংক-দস্য পালিয়ে যাচ্ছে, তখন মালাবারের পুরোহিতদের সঙ্গে পরামর্শ করে, তাদের প্রচুর পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে, মন্দির। অপবিত্র করবার জন্যে মোকদ্দমা দায়ের করতে রাজি করিয়েছিলেন। পুরোহিতদের মধ্যে কেউ-কেউ পরের ট্রেনেই ফগকে অনুসরণ করেছিলো।

কলকাতায় এসে ফিক্স দেখলেন, ফগ তখনও কলকাতায় পৌঁছোননি। তখনই তিনি আন্দাজ করলেন, ব্যাংক-দস্যু পলিশকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে পথে কোথাও নেমেছে, দু-এক দিনের মধ্যেই নিশ্চয়ই চুপি-চুপি এসে পড়বে। ফিক্স হাওড়া স্টেশনেই অপেক্ষা করতে লাগলেন। পঁচিশে অক্টোবর ভোরবেলা পাসপার্তু যখন ট্রেন থেকে নামলে, অমনি তার ইঙ্গিতে কলকাতার দারোগা তাদের গ্রেপ্তার করলেন। পাসপার্তু যদি মুহূর্তের জন্যেও আদালতের চারদিকে তাকিয়ে দেখতো, তবে দেখতে পেতো, সেই ঘরের এককোণে বসে ফিক্স বিপুল আগ্রহে এই মামলার শুনানি লক্ষ করছেন। তখনও ব্যাংক-দস্যুকে গ্রেপ্তার করবার আশা ফিক্স ছাড়েননি। বিলেতের ওয়ারেন্ট কলকাতায় পাবার আশা তখনও তার ছিলো।

ওয়াদিয়ার প্রশ্নের জবাবে অপরাধ স্বীকার করলে ম্যাজিস্ট্রেট রায় দিলেন : ইংরেজ গবর্মেন্ট ভারতবর্ষের সকল ধর্মই রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ কোনো ধর্মের কোনো অবমাননা করলে তাকে কঠোর সাজা দিতে কসুর করেন না। পাসপার্তু গত বিশে অক্টোবর বম্বাইয়ের অন্তর্গত মালাবারের মন্দিরে প্রবেশ করে মন্দির অপবিত্র করেছে। সে এই অপরাধ স্বীকারও করেছে। বিচার পনেরো দিনের জন্যে মুলতুবি রইলো। ততদিন হাজত।

পাসপার্তু বিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো : পনেরোদিন হাজতবাস?

আরদালি চীৎকার করে বললে : চুপ, চুপ!

ম্যাজিস্ট্রেট রায় পাঠ করতে লাগলেন : যদিও দেখা যাচ্ছে ফিলিয়াস ফগ মন্দির অপবিত্র করার কাজে জড়িয়ে ছিলেন না, তবু পাসপার্তুর পলায়নে সাহায্য করবার জন্যে তার প্রতিও ঐ আদেশ জারি করা হলো।

শুনে ফিক্স আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। ফিলিয়াস ফগ তো দু-হপ্তার জন্যে কলকাতায় আটকা পড়লো, এর মধ্যেই নিশ্চয়ই বিলেত থেকে ওয়ারেন্ট এসে পৌঁছুবে। আর পাসপার্তুর তখন নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিলো। তারই নির্বুদ্ধিতায় ফগের সর্বনাশ হতে চললো দেখে নিজের গালে ঠাশ-ঠাশ করে চড় কষাবার ইচ্ছে হচ্ছিলো তার।

কিন্তু ফিলিয়াস ফগ তখনও অবিচলিত রইলেন, যেন কিছুই হয়নি। দৃঢ়স্বরে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানালেন : আমি জামিন চাই।

এখানে আপনাদের কেউ চেনে না। এক-এক জন পনেরো হাজার টাকা দিতে রাজি থাকলে জামিন দেয়া যেতে পারে।

ফিরে বুক দুরুদুরু করে উঠলো। তিনি ভাবলেন, ফগ কি এতই নির্বোধ যে একমুহুর্তে এত টাকা নষ্ট করবে।

ফিলিয়াস ফগ কিন্তু দ্বিরুক্তি না-করে ব্যাগ থেকে একতাড়া নোট বের করে পেশকারের টেবলের উপর রেখে বললেন : টাকাটা আমি এক্ষুনি দাখিল করতে চাই।

ম্যাজিস্ট্রট জানালেন : বিচারের দিন হাজির হলেই টাকাটা আপনারা ফেরৎ পাবেন, এখনকার মতো আপনারা জামিনে খালাশ হলেন।

ব্যাপার দেখে ফিক্স বিমূঢ় হয়ে গেলেন।

মুহ্যমান পাসপার্তুর দিকে তাকিয়ে ফগ বললেন : চলে এসো, পাসপার্তু।

একটা বাজতে তখন মাত্র আধঘণ্টা বাকি। ফিলিয়াস ফগ একটা গাড়িতে উঠে সোজা জাহাজ-ঘাটের দিকে ছুটলেন।

বিমূঢ়ভাব অপসৃত হতেই ফিক্স ফগের অনুসরণ করলেন। তখনও তিনি আশা করছিলেন ফগ নিশ্চয়ই আদালতে মামলার দিন সময়মতো এসে হাজির হবেন, অত টাকা কিছুতেই জলে ফেলবেন না। কিন্তু যখন দেখলেন, ফিলিয়াস ফগ তার সঙ্গিনী ও পাসপার্তুকে নিয়ে রেঙ্গুন জাহাজে উঠলেন, তখন রাগে-ক্ষোভে নিজের মাথার চুল ছিড়তে-ছিড়তে বললেন : উঃ! কী ভয়ানক লোক! একমুহূর্তে অত টাকা নষ্ট করলে! নিশ্চয়ই ও দস্যু! যদি দরকার হয় তবে ওর সঙ্গে-সঙ্গে পৃথিবীর শেষসীমায় পর্যন্ত যেতে দ্বিধা করবো না। হেস্তনেস্ত একটা করতেই হবে!

এস. এস. রেঙ্গুন ছিলো মংগোলিয়ার মতোই দ্রুতগামী। কিন্তু আরোহীদের থাকবার বন্দোবস্ত ছিলো মংগোলিয়াতেই ভালো। যাতে রানী আউদার কোনো অসুবিধে না-হয়, সেজন্যে ফগ বিশেষ বন্দোবস্ত করলেন।

রানী আউদা ক্রমশ ফগের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছিলেন। তার প্রাণ-রক্ষার জন্যে সর্বদাই ফগকে কৃতজ্ঞতা জানাতেন। একদিন কথাপ্রসঙ্গে বললেন, বম্বাইয়ের বড়ো ব্যবসায়ী সার জামসেদজি জিজিভাইয়ের সঙ্গে তার আত্মীয়তা আছে। সার জামসেদজির ভাগ্নে থাকেন হংকং। আউদা তারই আশ্রয়ে যেতে চান। কিন্তু তিনি আউদাকে গ্রহণ করবেন কি না, কে জানে? যদি গ্রহণ না-করেন, তাহলে নিজের দশা কী হবে সেই ভাবনায় আউদাকে ব্যাকুল হয়ে পড়তে দেখে ফগ বললেন, সে-জন্যে ভাববেন না। সবই ঠিক হয়ে যাবে।

রেঙ্গুন জাহাজে সমুদ্রযাত্রার প্রথম ভাগ ভালোভাবেই কেটে গেলো। দেখতে-দেখতে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পেছনে ফেলে তরতর করে জল কেটে-কেটে রেঙ্গুন এগুতে লাগলো।

শিকার হাতছাড়া হয়ে যায় দেখে বিলেতের ওয়ারেন্ট হংকং-এ পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে ফিক্সও রেঙ্গুনে এসে উঠেছিলেন। পাছে পাসপার্তুর সঙ্গে জাহাজে দেখা হয়ে যায়, এই ভয়ে খুব সাবধানে থাকতে লাগলেন তিনি। হংকংই হলো তার শেষ আশার জায়গা। দস্যুকে হংকং-এ ধরতে না-পারলে আর ধরা যাবে না। হংকং-এর পরই তো চিন, জাপান, আমেরিকা। সাধারণ একটা ওয়ারেন্ট ব্রিটিশ এলাকার বাইরে চলবে না। এ-সব জায়গায় দস্যকে গ্রেপ্তার করতে হলে বিশেষ ওয়ারেন্ট আনতে হবে, সেজন্যে প্রচুর সময় চাই। তদ্দিনে ফিলিয়াস ফগ যে কোথায় লুকিয়ে পড়বেন, কে জানে!

ফিক্স মহাসমস্যার মধ্যে পড়লেন। হাজার চেষ্টা করেও এতক্ষণের মধ্যেও ফগের চুলের ডগাটি পর্যন্ত স্পর্শ করা গেলো না। হংকং-এ যদি দস্যুকে পাকড়াও করা নাযায়, তবে তো তাঁর নিজের সুনাম নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে। যে-করেই হোক হংকংএ কিস্তিমাৎ করতেই হবে। পাসপার্তুকে সব কথা খুলে বলা উচিত হবে কি না, ভাবতে লাগলেন ফিক্স। বললে সে হয়তো দস্যুর সঙ্গ ছেড়ে দিয়ে ফিক্সকেই সাহায্য করবে। কিন্তু, যদি না-করে? যদি ফগকে সে ফিক্সের মৎলব ফাস করে দেয়! তবে তো এত হয়রানি খামকা পণ্ড হয়ে যাবে। না— নেহাৎ দায়ে না-ঠেকলে কোনো কথা প্রকাশ করা চলবে না বলেই ফিক্স মনে-মনে ঠিক করলেন।

ফগের নতুন সঙ্গিনীটি কে, সে-প্রশ্নও ফিক্সের মনে আলোড়ন তুললো। তিনি বুঝতে পারলেন, বম্বাই থেকে কলকাতার পথেই এই ভদ্রমহিলা জুটেছেন। ভদ্রমহিলা অপূর্ব সুন্দরী—বোধহয় এর জন্যেই ফগ টাকা চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছেন। এবার সব সমস্যার উপর ফিক্স একটি আলোকসম্পাত করতে পারলেন। টাকা চুরি করে এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে ফগ অন্যকোথাও চলে যাবার মৎলব এঁটেছেন।

ভদ্রমহিলা বিবাহিতা কি-না ফিক্স সে-প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামালেন না। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন ফিলিয়াস ফগ ভদ্রমহিলাকে অপহরণ করেই নিয়ে যাচ্ছেন। অমনি এক মৎলব মাথায় খেলে গেলো ফিক্সের। নারীহরণের অপরাধে তো ফগকে গ্রেপ্তার করা যায়!

কী মুশকিল! রেঙ্গুন যে আবার হংকং চলেছে! ফগ যেমন জাহাজ থেকে জাহাজে, রেল থেকে রেলে লাফ দিতে-দিতে চলেছেন, তাতে হংকং-এ গিয়েও বেশি দেরি করবেন বলে বোধ হয় না। অবশ্যি একটা কাজ করা যায়। সিঙ্গাপুর থেকে হংকং-এর পুলিশকে তারে খবর পাঠিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলা যায়। তাহলে জাহাজ হংকং-এ ভেড়বার সঙ্গেসঙ্গেই ফগকে গ্রেপ্তার করা যাবে। কিন্তু আগে পাসপার্তুকে ধাপ্লা দিয়ে ভিতরের খবর বার করতে হবে।

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে ফিক্স জাহাজের ডেকে এসে দেখতে পেলেন, পাসপার্তু পায়চারি করছে। তাকে দেখেই সাগ্রহে ফিক্স এগিয়ে গেলেন। আরে! তুমি যে রেঙ্গুন জাহাজে?

কে? মিস্টার ফিক্স যে! সেই বম্বাইতে আপনার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছিলো, না? আপনিও সারা দুনিয়া ঘুরে আসতে বেরিয়েছেন নাকি?

উঁহু, ও-সব বদখেয়াল আমার নেই। কিছুদিন হংকং-এই থাকবো ভাবছি।

তা-ই নাকি! তা আপনাকে তো অ্যাদ্দিন ডেকের উপর দেখতে পাইনি। কলকাতা ছেড়েছি তো বেশ কিছুদিন হলো।

একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বলে একদিন বেরুতে পারিনি! কী জানি কেন, বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর আমার ধাতে সয় না। সে-কথা যাক, তা তোমার কর্তা মিস্টার ফগ কেমন আছেন?

ভালোই আছেন তিনি। ঠিক সময়েই সব কাজ হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মহা-মুশকিলে পড়েছিলাম। আমি হলে তো হালই ছেড়ে দিতাম, কিন্তু তিনি আলাদা ধাতুতে গড়া বলেই এখনও পেছ-পা হননি।

এই বলে পাসপার্তু ফিক্সের কাছে সব-কিছু খুলে বললে। মালাবারের মন্দিরে তার দুর্দশা, খোলবিতে হাতি কেনা, পিল্লাজির মন্দিরে সতীদাহ, কলকাতার আদালতে বিচার ও জামিনে খালাশ—সবকিছুই একে-একে ফিক্সকে বললো সে। ফিক্স এর কিছু কিছু ভালোই জানতেন। তবু না-জানার ভান করে মনোযোগ দিয়ে শুনে বললেন : আউদা তাহলে তোমাদের সঙ্গেই চলেছেন? মিস্টার ফগ কি তাকে ইওরোপে নিয়ে যাবেন নাকি?

না, তা কেন? সে কি আর হয় কখনও? হংকং-এ আউদার কে-এক আত্মীয় আছেন। শুনেছি তিনি হংকং-এর একজন বড়ো ব্যাবসাদার। তারই কাছে তাকে রাখতে যাচ্ছি আমরা।

সব শুনে ফিক্স কিন্তু খুব মুষড়ে পড়লেন। হতাশ হয়ে ভাবলেন, এ-পথে তাহলে কিছুই হবে না! মুহূর্তের মধ্যে হতাশার ভাব গোপন করে তিনি পাসপার্তুকে বললেন : এসো, একগেলাশ জিন খাওয়া যাক। অনেকদিন বাদে দেখা হলো।

পাসপার্তু শুনে তো খুব খুশি। বললে : চলুন। দু-এক গেলাশ জিন ছাড়া রেঙ্গুন জাহাজে আর কী করেই বা সময় কাটানো যাবে!

দুজনে জাহাজের খাবার-ঘরের দিকে এগুলো।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *