লাশ পড়ছে

লাশ পড়ছে

মন্টুর খবর পেলি?

ঘামে তৈমুরের বুকের কাছটা ভেজা। মুখে ক্লান্তির ছাপ।

 সারোয়াররা চারজন বসেছিল একটা টেবিলে। টেবিলের দুপাশে দুটো বেঞ্চ পাতা। একবার চা হয়ে গেছে। টেবিলের ওপর খালি কাপ পড়ে আছে। একটা কাপে সারোয়ার সিগারেটের ছাই ফেলছে। একটা স্টারের প্যাকেট টেবিলের ওপর।

তৈমুর চারদিক তাকিয়ে দোকানের ভেতরটা দেখে। এটা ওর অভ্যেস। কোথাও ঢুকে প্রথমেই পরিবেশটা দেখে নেয়। কে কে আছে এক পলকে তৈমুরের দেখা হয়ে যায়।

নেই, ওরা কেউ নেই। কটি বাংলার ছাত্র বসে সাহিত্যফাঁহিত্য নিয়ে মুগ্ধ হয়ে কথা বলছে।

 ওরা আছে ভালো। বাপের পয়সায় খাচ্ছে, হলে ঘুমুচ্ছে আর মুখে পাউডার মেখে বাংলা পড়ে যাচ্ছে।

তৈমুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর সারোয়ারকে একটু ঠেলে দেয়। সর। তারপর বসে পড়ে।

সারোয়ার সিগারেটে শেষ টান দিয়ে খালি কাপে সিগারেটটা ফেলে দেয়। তখন বাবুল আবার জিজ্ঞেস করে, মন্টুর খবর পেলি?

না।

শুনে সবাই চুপচাপ। কেবল সারোয়ার একপলক তৈমুরকে দেখে।

নাস্তা খেয়েছিস?

না।

সকাল থেকে করেছিস কী? এগারটা বাজে।

তৈমুর বিরক্ত হয়ে বলল, কী করব, ভোরবেলা ওঠে বেরিয়েছি। মন্টুর যত চেনা জায়গা আছে সব জায়গায় গেলাম। শালা আজ গরমও পড়েছে।

তৈমুর পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মোছে। পায়ে হেঁটে কত ঘোরা যায়। পকেটে একটা পয়সা নেই।

দোকানের বাচ্চা ছেলেটা খালি কাপ তুলে নিতে এসেছিল। রতন বলল, একটা নাস্তা দে।

 নাস্তার মানে ছেলেটা জানে। দু টুকরো পাউরুটি, একটা কলা আর এককাপ চা।

 তৈমুর রতনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। জ্যাবে নাল পড়েছে মনে হয়!

বাসা থেকে হাত পা ধরে পঞ্চাশটা টাকা ম্যানেজ করেছি। দিতে কি চায়! পঞ্চাশ টাকার জন্যে কত কথা!

সারোয়ার বলল, আমাদের আরো অনেককাল গার্জিয়ানদের কথা শুনতে হবে।

 তৈমুর বলল, তা হবে। সংসারের জন্য কিছু করছি আমরা। পড়াশুনা শেষ হওয়ার কথা আরো তিন বছর আগে। এখন চাকরিবাকরি করার কথা। সংসার দেখার কথা। তা না, শালা মাথায় ঢুকল রাজনীতি। গলাবাজি করো আর জানটা হাতের তালুতে নিয়ে ঘোর। পুলিশ তো আছেই তার ওপর আছে সরকারি গুণ্ডা। কখন একটা লাশ রাস্তায় পড়ে যাবে। না, এই শালার জীবন আর ভাল্লাগে না।

তখুনি বাচ্চা ছেলেটা নাস্তা দিয়ে যায়। তৈমুর একবার নাস্তার প্লেটটা দেখে। তারপর উদাস হয়ে সামনের দিকে তাকায়। শরীফ মিয়ার চায়ের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে কয়টি ছেলে চা খাচ্ছে। দোকানের ভেতর বসবার জায়গা নেই। দোকানটায় ভিড় লেগেই থাকে। ছেলেরা ভিড় দেখে জামতলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে চা খায়, সিগারেট খায়। কেউ কেউ অলসভাবে বসে থাকে মাটি থেকে ওঠে যাওয়া বেদির মতো রাস্তায়। রুটিতে কামড় দিয়ে সেই রাস্তাটার দিকে তাকায় তৈমুর। দল বেঁধে ছেলেমেয়েরা আর্টস ফ্যাকাল্টির দিকে যাচ্ছে, পাবলিক লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছে। এসবের ভেতরে কোথাও মন্টুর ছায়া পড়ে না।

চারদিন হয়ে গেল মন্টুর কোন খবর নেই। দলের সবচে তেজি কর্মী। কোন খোঁজখবর না দিয়ে চারদিন কোথাও কাটানো মন্টুর চরিত্রে নেই। পুলিশে খবর হয়ে যেত। তা হলে মন্টুর কোন অঘটন!

কথাটা ভাবতেই তৈমুরের গলায় শুকনো রুটি আটকে যায়। বুকটা কেঁপে ওঠে।

পানি খেয়ে তৈমুর আবার রুটিতে কামড় দেয়।

কাল বিকেলে মন্টুদের বাসায় গিয়েছিল তৈমুর। মন্টু চারদিন বাসায় ফেরে না, তাতে বাসার পরিবেশ একটুও পাল্টায়নি। বাবা নিয়মমাফিক বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে। রিটায়ার্ড মানুষ, বসে বসে সময় কাটান। মন্টুর ইমিডিয়েট ছোটভাই আর্ট কলেজে পড়ে। মহা আধুনিক পোলা। নিজের ঘরে বসে ডোনা সামার শুনছে। ও লাভ টু লাভ ইউ বেবি।

তৈমুরকে দেখে মন্টুর বাবা পুরু চশমার ভেতর থেকে তাকান। তারপর আবার মগ্ন হয়ে। যান নিজের ভাবনায়। তৈমুর হাত তুলে সালাম দিয়েছিল। শীতলভাবে সালাম নিয়েছেন। তিনি। মন্টুর কোনও বন্ধু-বান্ধবকে তিনি পছন্দ করেন না। মন্টুর মাথা বিগড়ানোর পেছনে এইসব বন্ধুর প্রধান অবদান, এটা তার বিশ্বাস। তৈমুররা কেউ কখনও মন্টুর বাসায় যায় না। মন্টু নিজেও বাসায় ফিরত না। হলে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় রাত কাটাত। মাঝেমধ্যে মার সঙ্গে দেখা করত টাকা-পয়সার জন্য।

এই বাড়িতে ওই একজনই মানুষ! মন্টুর জন্য যার খানিকটা ভালোবাসা এখন রয়ে গেছে। একটা জিনিস তৈমুর কখন বুঝতে পারে না, এইরকম ফ্যামিলিতে জন্মে মন্টু কেন সব ছেড়েছুঁড়ে রাজনীতিতে নামল। ওর তো পড়াশুনা করার কথা। বড় চাকরি বাকরি করার কথা! সুন্দর বউ নিয়ে সংসার করার কথা।

বাবা ছিলেন সেক্রেটারী। ওপর লেবেলে দারুণ হাত। চাকরিবাকরি করলে বাবার জায়গায় পৌঁছুতে মন্টুর বেশিদিন লাগত না। তবুও মন্টু সব ছেড়ে কী আশায়! তৈমুর বুঝতে পারে না।

 গতকাল মন্টুদের বাসায় ঢুকে কেন যেন তৈমুরের মনে হয়েছিল এই বাসায় মন্টু আর কখনও ফিরবে না। বুকের ভেতরটা একটুখানি কেঁপে ওঠেছিল। কেন যে এমন ইচ্ছে!

তৈমুরকে দেখে মন্টুর মা বেরিয়ে এসেছিলেন খানিক পর। তৈমুরকে ডেকে নিয়েছেন নিজের ঘরে। এই মহিলার কাছাকাছি এলে তৈমুর বরাবরই একটু দুর্বল হয়ে যায়। ছেলেবেলার মা মা গন্ধটা ফিরে পায়। মা মারা গেছেন সেই কবে। ছেলেবেলায়। মার কথা তৈমুরের মনে পড়ে না। কেবল এই মহিলার কাছাকাছি এলে মনে হয় মার শরীরেও এরকম গন্ধ ছিল। সব মায়ের শরীরেই বুঝি এক রকমের গন্ধ থাকে। মন্টুর মা বললেন, মন্টু বেশ কদিন বাড়ি ফেরে না। এর মধ্যে ওর বাবা একটু রাগারাগি করেছিলেন। এটা তো নতুন কিছু নয়। আগেও এমন হয়েছে। বেশ কবার। মন্টু কখনও এতটা রাগ করেনি। আমি পেছন থেকে কতবার ডাকলাম। ফিরেও তাকাল না। মন্টুর মা আঁচলে চোখ মোছেন। আগে বকাবকি করলেও মন্টু ঠিকই বাড়ি ফিরত। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে আমাকে ডাকত। রাতেরবেলা আমি ওর খাবার ঢেকে রাখি। কাল রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। বুকের ভেতরটা কেমন করছে। কেন যে বারবার মনে হয়েছে মন্টু আর ফিরবে না!

 মন্টুর মা আবার চোখ মোছেন। মন্টুটা ছোটবেলা থেকেই এরকম। ও যখন বার তের বছরের তখন থেকেই ওকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। ওর জন্যে আমি ঘুমুতে পারি না কতকাল। কতকাল যে ও আমাকে শান্তিতে ঘুমুতে দেবে না।

তৈমুর চুপচাপ বসেছিল চেয়ারে। কোনও কথা বলতে পারেনি। এসব কথার জবাব তৈমুরের জানা নেই। নিজেকে বড় অপরাধী লাগছে। মন্টু, আমরাই কি তোকে সুখী জীবন থেকে সরিয়ে নিলাম! তৈমুর যখন বেরিয়ে আসবে, মন্টুর মা আঁচলের গিট খুলে একশো টাকার একটা নোট দিয়েছেন। মন্টুর সঙ্গে দেখা হলে দিও। ওর হাতে টাকা নেই, আমি জানি। আর বলো, আমি ওর জন্যে রাত জেগে বসে থাকি। খাবার নিয়ে বসে থাকি।

এ কথায় কেন যে তৈমুরের বুকের ভেতরটা একটু দুলে ওঠেছে! চোখ ছলছল করে ওঠেছে। রাজনীতি করে কী হবে! লক্ষ্যে কি কখনও পৌঁছানো যাবে!

বাংলাদেশ। জঘন্য। রাজনীতি মানে হাউকাউ। কয়েকদিন গলাবাজি করে একেক শালা ক্ষমতায় যাবে, তারপর আর দেশ কী, জনগণ কী! নিজের পেট মোটা করবে শালারা, গাল বানাবে সেদ্ধ গোল আলুর মতো। মার্সিডিস চড়ে যাবে বক্তৃতা দিতে। দেশ যা আছে তাই থাকবে। গুষ্টি মারি শালা রাজনীতির। মা, প্রেমিকাদের চোখের ঘুম কেড়ে কী হবে এসব করে! মন্টুদের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তৈমুর ডিসিশান নিয়েছে লাইনটা ছেড়ে দেবে। হল ছেড়ে ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ওঠবে। এখনও মাস তিনেক সময় আছে। তিন মাস এনাফ টাইম। পড়াশুনা করলে সেকেন্ড ক্লাস সিওর। তারপর চাকরি। পিয়া আর কতকাল অপেক্ষা করবে!

 রাতটা এসব ভেবে কেটেছে তৈমুরের। ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছে পাঁচটায়। তারপরই মনে। পড়েছে মন্টুর কথা। মন্টুকে খুঁজতে বেরিয়েছে। নেই, মন্টু কোথাও নেই।

মন্টু যে কোথায় গেল! কথাটা ভাবতেই মন্টুর মায়ের কথা মনে পড়ে। মন্টুর মা একশো টাকা দিয়েছেন মন্টুর জন্যে। টাকাটা বুক পকেটে আছে। সারা সকাল পায়ে হেঁটে মন্টুকে খুঁজেছে তৈমুর। টাকাটা ভাঙেনি। মন্টু কি এই নিয়ে পরে হাসাহাসি করবে! তুই একটা ছাগল। শালা। এসব বলবে!

 তৈমুরের দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

সারোয়ার বলল, পিয়ার খবর কীরে? বহুদিন দেখি না।

টেবিলের ওপর থেকে স্টারের প্যাকেটটা নেয় তৈমুর। তারপর সিগারেট ধরিয়ে টানে। আমার সঙ্গেও দেখা হয় না।

মেয়েটাকে তুই বড় কষ্ট দিচ্ছিস।

 তৈমুরের তখন চোখ পড়ে ডান হাতের দুটো আঙ্গুলের দিকে। সিগারেটের তাপে আঙুলের মাথায় হলদে দাগ পড়ে গেছে। দেখে তার মনে হয়, পিয়াকে কি আমি খুব পোড়াই! পিয়ার বুকের ভেতরও কি এরকম দাগ পড়েছে! তৈমুর তারপর একটু উদাস হয়ে যায়। আমি এসব ছেড়ে দেব। কালই বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়ে উঠব। পরীক্ষাটা দিয়ে ফেলব। পিয়াকে আর কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না।

রতন বলল, পারবি না। এসবের একটা নেশা আছে। নেশায় আমাদের পেয়ে বসেছে। এই নেশা কাটাতে পারবি না।

আমাকে পারতেই হবে।

বাবুল বলল, এই ট্র্যাপ থেকে বেরুবার কোনও উপায় নেই দোস্ত। দল ছেড়ে দিলে দলের ছেলেরাই তোর লাশ ফেলে দেবে।

এখনই কি সুখে আছি! ছায়ার মতো পেছনে লেগে আছে শালারা। কখন মেরে দেবে টেরও পাব না।

এ কথায় সারোয়ার একটু রেগে ওঠে। মেয়েমানুষের মতো প্যানপ্যানাস না তো! আমাদের মারলে কি আমরা হাত খুলে বসে থাকব! আমাদের একটা ছেলের গায়ে হাত তুলুক না! পুরো দেশ জ্বালিয়ে দেব শালা। সেদিনের সব পুঁচকে পোলাপান, শালাদের বহর দ্যাখো না! যন্ত্রের জোর। যন্ত্র পাছা দিয়ে ভরে দেব।

রতন বলল, জোর তো ওখানেই। ওদের ব্যাক করছে সরকারি দল। দরকার হলে পুলিশ ওদের সঙ্গে থাকবে। কী করবি?

শোন এ সব বেশি দিনে থাকে না। সারোয়ার একটা সিগারেট ধরায়। একাত্তরে দেখলি না পাকিস্তানি বাবাদের শক্তিশালী মনে করে কুত্তার বাচ্চারা কেমন রাজাকার হয়েছিল! আলবদর আলসামস হয়েছিল। তার রেজাল্টটা কী হল? স্বাধীনতার পর শালাদের পাছায় বাঁশ দিয়ে চৌরাস্তা মোড়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছি না? এই শালাদের অবস্থাও তাই। হবে। দেখিস, দিন আসবে।

কটা রাজাকার মারতে পেরেছ! বেশির ভাগ রাজাকারই তো দেখি এখন চমৎকার হালে আছে।

ওই তো! ভুলটাই তো ওখানে। শালাদের ক্ষমা করা হয়েছিল। এবার আর ক্ষমা নেই। শালাদের বংশ আর রাখব না।

তৈমুর কোনও কথা বলছিল না। সিগারেট টানতে টানতে উদাস হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ জামতলার দিকে চোখ যেতেই চমকে ওঠে সে। চারজন দাঁড়িয়ে আছে। জিনসের স্কিন টাইট প্যান্ট পরা, গায়ে চক্রাবক্রা শার্ট। মাথায় লম্বাচুল প্রত্যেকের। আর চোখ কী লাল একেকটার! তৈমুর এদের চেনে। জুনিয়ার পোলাপান। ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েই নেমে গেছে। যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছে হলে, ইউনিভার্সিটিতে। প্রত্যেকের কাছেই অস্ত্র আছে। ওরাই তো, ওরাই তো বেশ কিছুদিন ধরে চোখ রাখছে তৈমুরদের ওপর!

 তৈমুর দেখে রাস্তার ওপর হোন্ডা দুটোও দাঁড়িয়ে। শালারা এল কখন! হোন্ডায় কি শব্দ হয়নি! তৈমুর এত আনমনা হয়ে কী ভাবছিল! হোন্ডার শব্দ পায়নি কেন?

 ততক্ষণে সারোয়াররা সব চুপচাপ হয়ে গেছে। সবার চোখ এখন জামতলায়। তক্ষুনি, ঠিক তক্ষুনি তৈমুরের বুকের ভেতরটা কি একটু কেঁপে ওঠে! মন্টুকে কি তাহলে এরাই কোথাও আটকে রেখেছে, না কি?

 তৈমুররা সবাই তাকিয়েছে, ওরা টের পায়। তারপর কী কথায় নিজেরা খুব হাসাহাসি করে। একজন লাল শার্টের পকেট থেকে ট্রিপল ফাঁইভের প্যাকেট বের করে। তারপর সিগারেট ধরিয়ে হোন্ডায় গিয়ে চড়ে। এক হোন্ডায় দুজন করে। তারপর তীব্র শব্দ, সাইলেন্সার পাইপে সাদা ধোয়া। হোন্ডা চলে যায়। সেই দিকে তাকিয়ে তৈমুরের মন কু ডাক ডাকে। মন্টু, তোর পর কে?

 মন বলে, তুমি! তুমি!

.

বহুকাল পর বাড়ি থেকে বেরুল পিয়া। মাসখানেক হবে। আজকাল বাড়ি থেকে বেরুতে ভাল্লাগে না। কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে। তৈমুরের সঙ্গে দেখা হয় না অনেকদিন। ইউনিভার্সিটির দিকে না গেলে তৈমুরকে পাওয়া যায় না। হলে কখন ফেরে কখন বেরোয় তার ঠিক নেই। আগে দু একবার হলে গিয়ে তৈমুরের সঙ্গে দেখা করেছে। হলে যাওয়া হয় না বহুদিন। তৈমুরকে একা পাওয়া হয় না বহুদিন। পুরো একটা বছর পেরিয়ে গেল ইউনির্ভাসিটি ছেড়েছে পিয়া। এই এক বছর তৈমুরকে আর বুকের কাছে পায়নি। বুকটা মাঝে মধ্যে কেমন করে পিয়ার।

 কিন্তু হলে না গেলে তৈমুরকে নিবিড় করে পাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু হলে যেতে তৈমুরের মানা। হলে কী কী সব কাণ্ড হচ্ছে বহুদিন ধরে। তৈমুরদের হলের কয়েকটি ছেলে আছে পাণ্ডামি করে বেড়ায়। ইউনিভার্সিটি ওদের ভয়ে কাঁপে। পকেটে রিভলভার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পুলিশ কিছু বলে না। সরকারি দল করে। পুলিশ ওদের ভাই। প্রয়োজনে পুলিশ সব রকমের সাহায্য করবে।

কিছুদিন আগে তৈমুরের পাশের রুমে কী একটা কাণ্ড ঘটে গেল। দুপুরবেলা একটা মেয়ে গেছে তার ক্লাসমেটের কাছে নোট আনতে। সামনে পরীক্ষা। গিয়ে হলের গেটে দাঁড়িয়ে স্লিপ পাঠিয়েছে ভেতরে। তক্ষুনি সুবোধ গোছের একটা অচেনা ছেলে এসে বলল, আপনি অমুকের কাছে এসেছেন? আমি ওকে চিনি। চলুন পৌঁছে দিচ্ছি।

 মেয়েটি সরল বিশ্বাসে গেছে। তারপর, উ মাগো। ছেলেটি তার নিজের রুমে নিয়ে দরজা বন্ধ করেছে। তারপর একের পর এক দশ পনেরজন। মেয়েটির চিৎকারে সারা হল কেঁপে উঠেছে। কেউ সাহায্য করতে এগোয়নি। দরজার বাইরে খোলা রিভলভার হাতে পাহারায় ছিল চারজন। কে যাবে মরতে!

পিয়া শুনেছে মেয়েটি আর ইউনিভার্সিটিতে আসে না। মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। এরপর কোন সাহসে হলে তৈমুরকে খুঁজতে যাবে পিয়া! ইউনিভার্সিটির দিকে যেতেই বুকের ভেতরটা কাঁপে আজকাল। তবুও যেতে তো হবেই। তৈমুরের সঙ্গে দেখা না করে পিয়া থাকবে কেমন করে!

কিন্তু তৈমুর, তৈমুর তুমি আমাকে অত কষ্ট দিচ্ছ কেন? আমি আর কতকাল অপেক্ষা করব?

ইউনিভার্সিটি শেষ হওয়ার পর থেকেই পিয়ার বিয়ের চেষ্টা হচ্ছে। বাড়ি থেকে ওঠে পড়ে লেগেছে সবাই। পিয়ার জন্য টিয়ার বিয়েটা আটকে আছে। টিয়া বাচ্চা মেয়ে। ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। হলে কি হবে, টিয়ার শরীর খুব বাড়ন্ত। এই বয়সেই মহিলাদের মতো আচার-আচরণ। পড়াশুনোয়ও খুব খারাপ টিয়া। সারাজীবন পড়াশুনো করেও ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেতে পারবে না। মা বাবা এখনি টিয়ার বিয়ের কথা ভাবছে। পিয়ার হয়ে গেলেই টিয়া। দুটো মাত্র মেয়ে। তাড়াতাড়ি বিদেয় হলেই সংসারের ভার কমে।

পিয়া মাকে বলেছিল, আমার জন্য টিয়া আটকে থাকবে কেন? ওর বিয়ে দিয়ে দাও।

কথাটা বাবার কানে যেতেই ভীষণ হয়ে গেল। বাবার মান-সম্মানের ব্যাপার। বড় মেয়ে রেখে ছোটটির বিয়ে হলে লোকে দুর্নাম গাইবে। বড়টির হল না কেন, ইউনিভার্সিটি পড়া মেয়ে, চরিত্রের প্রশ্ন। শুনে পিয়া মনে মনে হেসেছে। মধ্যবিত্তের অহংকার। এইট্টুকুই সম্বল এদের।

তবুও তৈমুরের কথা মা বাবাকে বলা হয়নি। বলতে সাহস পায়নি পিয়া।

ছেলে এখনো এম. এ. পাশ করেনি। তার ওপর রাজনীতি করে। রাজনীতি করা ছেলেরা সংসারী হয় না। মেয়েটার জীবন বরবাদ হয়ে যাবে। বাবা কিছুতেই রাজি হবেন না। প্রয়োজনে অমন মেয়ের মুখ দেখবেন না সারাজীবন। সেই ভয়ে পিয়ার কিছু বলা হয়নি। বাবা একবার মুখ থেকে না বের করলে মরে গেলেও হা করবেন না। অসম্ভব জেদি মানুষ। কেরানিগিরি করে মেয়েকে ইউনিভার্সিটি পড়িয়েছেন সেই বাবাকে কেমন করে কষ্ট দেবে পিয়া। কেমন করে! কেমন করে!

তৈমুরের কথা কেবল টিয়া জানে। রাতেরবেলা এক চৌকিতে ঘুমোয় দুবোন। একরাতে কী জানি কী মনে করে টিয়াকে বলে ফেলেছিল। শুনে টিয়া সরলভাবে বলল, তোরা পালিয়ে বিয়ে কর। তারপর দেখা যাবে।

শুনে ভয়ে কুঁকড়ে গেছে পিয়া। মাগো আমার অত সাহস নাই। ভাবলেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

এতো দুর্বল মন তো পিরিত কর কেন? টিয়া রেগে গেছে।

কিন্তু পিয়া কী করে? তৈমুরকে ছাড়া তার কোনও উপায় নেই। তৈমুরের গায়ে সারাক্ষণ ঘামের কটু গন্ধ। চেহারায় একধরনের রুক্ষ্মতা। কথায় ড্যাম কেয়ার ভাব। এর সবই পিয়ার খুব প্রিয়। পিয়ার কাছে পুরুষ মানুষ মানেই তৈমুর।

অথচ বাবা যেখানে বিয়ের চেষ্টা করছে ছেলেপক্ষও খুব এগিয়েছে। এখনো কিছু না করলে হয়ে যাবে। ছেলে লিবিয়া থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। পাকা কথা হয়ে গেলে মাসখানেকের ছুটি নিয়ে দেশে আসবে তারপর বউ নিয়ে আবার লিবিয়া।

বিদেশে থাকা লোকজন কেমন হয়?

কদিন ধরে এই কথাটা ভাবছে পিয়া। ছিমছাম পরিপাটি। গায়ে পাউডার না মেখে ঘুমোতে পারে না। পুরুষমানুষের গায়ে পাউডারের গন্ধ! ইস কী বিচ্ছিরি!

কাল সারারাত এই সব ভেবেছে পিয়া। তারপর সকালবেলা ওঠে ঠিক করেছে যেমন করেই হোক আজ তৈমুরের সঙ্গে দেখা করবে। তৈমুরকে সব খুলে বলবে। তৈমুর বললে পালিয়ে বিয়েটা করে ফেলবে। নয় তো আর কোনও উপায় নেই। পিয়া চলল।

পিয়া বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সাড়ে দশটার দিকে। গলির মাথা পেরিয়ে বড় রাস্তা। তারপর বাসস্ট্যান্ড। ফার্মগেট থেকে ইউনিভার্সিটি রিকশায় যাওয়া অসম্ভব। ভাড়া নেবে আড়াই টাকা। ব্যাগে একটা দশ টাকার নোট আছে। তবুও বাসস্ট্যান্ডের দিকে যায় পিয়া।

কিন্তু বাসে কী ভিড়! মনে হয় সাড়ে সাত কোটি বাঙালী সবাই একটা বাসে চড়ে বসে আছে। দ্রুত কোন একটা গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া দরকার তাদের। একটা পিঁপড়ে ঢোকারও জায়গা নেই। মন খারাপ করে পিয়া একটা রিকশা নেয়।

কাউরান বাজার তেরাস্তার মোড়ে একটা ফাঁইভস্টার হোটেল হচ্ছে। তার ডান পাশে নতুন রাস্তা। রাস্তার পাশে জলাভূমি। জলের ওপর টং বেঁধে দুঃখী মানুষেরা থাকে। অথচ সেখানেই বিরাট টিনের সাইনবোর্ড। পরিবার পরিকল্পনার বিজ্ঞাপন। ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিদিন দশ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। এত ছোট্ট দেশে এত লোক থাকবে কোথায়! দু পাঁচ বছর পর বঙ্গোপসাগরের ওপরও বুঝি তৈরি হবে মানুষের ঘরবাড়ি।

এখানটায় এলে বরাবরই বিজ্ঞাপনটার দিকে তাকায় পিয়া। পিয়া কখনো রিকশার হুড ফেলে বসে না। হুডের ভেতর থেকেই গলা বাড়িয়ে বিজ্ঞাপনটা দেখে।

আজ বিজ্ঞাপনটার দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় পিয়া। জায়গাটা লোকে গিজ গিজ করছে। কী হয়েছে ওখানে?

রিকশাওয়ালা বলল, আফা পাইনতে একটা মানুষের লাশ পইড়া রইছে। মাথাডা নাই। অল্প বয়েস। একখান নীল শার্ট পরা আর সাদা ফুলপেন।

শুনে পিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। ইচ্ছে করে নেমে একবার দেখে আসে। কিন্তু লোকের যা ভিড়। পিয়া এই ভিড়ের ভেতরে গেলে লাশ রেখে লোকে পিয়াকেই দেখবে।

পিয়ার দেখা হয় না। রিকশাঅলা জায়গাটা পেরিয়ে যায়।

পিয়ার তখন বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। আহা, কোন মায়ের বুক যে খালি হয়ে গেল! কোন প্রেমিকের স্বপ্ন যে শেষ হয়ে গেল!

পাবলিক লাইব্রেরির সামনে এসে রিকশা ছাড়ে পিয়া। তৈমুর থাকলে এই এলাকাতেই থাকবে। হয়তো চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিংবা পাবলিক লাইব্রেরির সামনের বারান্দায় বসে আছে। কিংবা টিএসসিতে।

রোকেয়া হলের উল্টোদিক থেকে পাবলিক লাইব্রেরি এলাকায় ঢোকে পিয়া। সামনের মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে কয়েকটি ছেলেমেয়ে। নেই, ওখানে তৈমুর নেই। পিয়া আস্তে ধীরে হেঁটে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে যায়। নেই। তারপর শরীফ মিয়ার দোকানের দিকে। নেই, তৈমুর কোথাও নেই। পিয়ার খুব মন খারাপ হয়ে যায়। বুকের ভেতর নড়েচড়ে ওঠে কান্না। তৈমুর, এতকাল পর আমি এলাম তোমার সঙ্গে কি দেখা হবে না! পিয়া তারপর টিএসসির দিকে যায়। টিএসসির কাছাকাছি আসতেই দেখে রাস্তার ধারে লম্বা দড়ি থেকে সিগারেট ধরাচ্ছে তৈমুর। দেখে খুশিতে চেঁচিয়ে ওঠতে ইচ্ছে করে পিয়ার। তারপর কেমন করে যে রাস্তাটা পেরিয়ে আসে সে। এসে একদম তৈমুরের মুখোমুখি। তৈমুর পিয়াকে দেখে একটু চমকে ওঠে! তৈমুরের চেহারা অমন উদভ্রান্তের মতো কেন?

পিয়ার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, তৈমুর তোমার কী হয়েছে? তার আগে তৈমুর বলল, ও তুমি! দেখা হয়ে ভালোই হল। চল, কথা আছে।

ওরা তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যায়। পার্কের ভেতর ঢুকে অনেকটা দূর পেরিয়ে আসে। তৈমুর কোনও কথা বলে না।

দুপুরবেলার তীব্র রোদ ছিল চারদিকে। পার্কের গাছপালা থেকে উঠে আসছিল এক ধরনের উত্তাপ। একটা ঝোপের আড়ালে ছায়ায় ওরা বসে পড়ে। বসেই তৈমুর আবার সিগারেট ধরায়। তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলে, মন্টু খুন হয়েছে।

এ্যা!

কথাটা শুনে আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে পিয়া।

হা! কাউরান বাজারের সামনে একটা পুকুরে মন্টুর লাশ পাওয়া গেছে। মাথা নেই। মন্টুর নীল শার্ট আর সাদা প্যান্ট দেখে চেনা গেছে।

আমি এখন তো ওখান দিয়েই এলাম। একটা পুকুরপাড়ে খুব ভিড় দেখলাম। রিকশাঅলা বলল একটা লাশ পড়ে আছে।

ওই আমাদের মন্টু।

তৈমুর আবার চুপ। দেখে পিয়ার বুকের ভেতর কেমন করে। হঠাৎ তৈমুরের একটা হাত জড়িয়ে ধরে পিয়া, তুমি এখন কী করবে?

ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি। এ জন্যেই তোমার সঙ্গে আজ দেখা হওয়া দরকার ছিল।

তৈমুর আবার থেমে যায়। তারপর বলে, আজকের পর তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না পিয়া। মা-বাবার কথায় রাজি হয়ে যাও। আমার পক্ষে কিছু সম্ভব নয়। কাল থেকে আমরা অন্যরকম এক জীবনে চলে যাব। মন্টুকে কারা খুন করেছে, খবর হয়ে গেছে। আমরাও ছাড়ব না শালাদের। তুমি আমাকে ক্ষমা কর।

এ কথায় পিয়া কি পৃথিবীর সবচে দুঃখী মানুষ হয়ে যায়? পিয়ার যে আজ কত কথা বলার ছিল। কিছুই বলা হল না। মনে রয়ে গেল মনের কথা।

তৈমুর বলল, তুমি বাড়ি যাও। আমাকে এখুনি যেতে হবে।

তৈমুর তারপর ওঠে দাঁড়ায়।

পিয়া বলল, একটু দাঁড়াও। তারপর তৈমুরের চোখের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে। পিয়ার চোখে কী ছিল কে জানে। তৈমুর হঠাৎ করে হাটু গেড়ে বসে পিয়ার সামনে। তারপর দুহাতে পিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে। তুমি আমাকে ক্ষমা কর, ক্ষমা কর।

পিয়ার কী যে হয়! একটুও কান্না পায় না। দুই করতলে তৈমুরের মুখ তুলে ধরে সে। তারপর আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় তৈমুরের কপালে। তুমি ভালো থেকো তৈমুর। আমার কোনও কষ্ট হবে না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *